Home » বিশেষ নিবন্ধ » নির্বাচন : রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে?

নির্বাচন : রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

অর্ধদশকের বড়মাত্রার অগনতান্ত্রিক শাসনেরও বোধ করি ক্লান্তি আছে। সেজন্যই কী প্রাক-নির্বাচনকালে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ নেতৃত্ব একটু-আধটু গণতান্ত্রিক বাত্যাবরণ চাচ্ছিলেন? অন্তত:পক্ষে দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এটি জানান দেয়া যে, তারা আলোচনা করেছেন বিরোধীপক্ষের সাথে, হোক না তা নিঃস্ফল। কিন্তু সূচনা হিসেবে এটি একেবারে মন্দ নয়। এর মধ্য দিয়ে খানিকটা হলেও বোঝানো যাচ্ছে, সবকিছু একতরফা হচ্ছেনা !

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপ চেয়ে চিঠি পাঠানোর পরে সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক সাড়া এই বার্তা দেয় যে, সরকার বরফ ভাঙ্গতে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আরো অনেকগুলি দল এবং জোটকে গণভবনে সংলাপের আমন্ত্রন জানান প্রধানমন্ত্রী। ‘সংলাপ’ চলতে থাকে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ এবং ক্ষমতার অংশীদার তার দলের সাথেও সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে যায়।

সংলাপ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল ছিল অনেকটাই নির্ভার। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে জেলে এবং নির্বাচনে তার অংশগ্রহন নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। ভাইস চেয়ারপারসন তারেক রহমান যাবজ্জীবন দন্ডিত, লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে, নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন না। সুতরাং শর্তহীন আলোচনায় ঐক্যফ্রন্ট উত্থাপিত সাতদফার একটি দাবিও না মেনে পরপর দু’দফায় সংলাপ শেষ করে ক্ষমতাসীনরা এক ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্ত্ইি বাগালেন বটে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রশ্ন অনেকগুলো। নির্বাচন কী যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে? ইতিমধ্যে সাত দিন পিছিয়েছে। পুণ:তফসিল ঘোষিত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের দাবি আরো তিন সপ্তাহ পেছানোর। আওয়ামী লীগও জানিয়ে দেয়, নির্বাচন আর পেছানো যাবেনা। একদিনও নয়, এক ঘন্টাও নয়। নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট জানিয়েছে, তারিখ পেছানো হবেনা।

তারপরেও কী নির্বাচন কাঙ্খিত মান অর্জনে সক্ষম হবে? জনতুষ্টিরওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিশন কতটা অনড় থাকতে পারবে, সকল চাপ-তাপ উপেক্ষা করে? আপাতত: এর উত্তর হচ্ছে, না। সে পরীক্ষার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে, সিটি-কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ফলে তফসিল ঘোষণার পরেও আশঙ্কা বাড়ছে। মামলাসহ, প্রতিপক্ষ দমন প্রবৃত্তির অব্যাহত ধারা দেখে।

গত কয়েক দশক ধরেই রাষ্ট্র-সমাজ বিভাজিত। প্রতিহিংসা পরায়নতায় যে অবস্থান সমাজে তৈরী হয়েছে, তার পরিনতি দেখি নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হওয়ার পরে। কি ভয়ঙ্কর তান্ডব নেমে আসে জনগোষ্ঠির ওপর, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী- সমর্থকদের ওপর- তা বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করছে ২০০১ সাল থেকে। এ কারনে একটি চমৎকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর ভয় কিংবা ক্ষমতায় না যেতে পারার আক্ষেপ!

ক্ষমতাসীনদের একটি হিসেবে বোধ করি গরমিল হয়ে গেছে! তারা ধরে নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেকের বিষয় সুরাহা না করে বিএনপি নির্বাচনে আসছে না। তারা এও সম্ভবত আশা করেছিলেন, এবার নির্বাচনে না এলে বিএনপিতে ভাঙ্গন দেখা দেবে এবং নেতা-কর্মীদের ভাগিয়ে আনা যাবে। বাস্তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়া এবং এর বড়  শরীক হিসেবে বিএনপি’র নির্বাচনে আসা এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার ঘোষণা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী কৌশল পাল্টে দিয়েছে। তারা আবারও মহাজোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, ক্ষমতা ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে।

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনী পরিবেশ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না করেই, এমনকি সাত দফার প্রায় কোন দফা না মানার পরেও নির্বাচনে যেতে হচ্ছে বিএনপিকে। কারন, এই মূহুর্তে তাদের আর কোন বিকল্প নেই। একটি নির্বাচনমুখী দল হিসেবে এখন তারা যে ট্রাকে রয়েছে, তার বাইরে তাদের কর্মী সমর্থকদের আবেগকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। নির্বাচন ও আন্দোলন-এই দুইফ্রন্ট খোলা রাখার ঝুঁকি বিএনপিকে নিতেই হচ্ছে। যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ২০১৩-১৪ সালে, সেখান থেকে বেরোনোর এটিই তাদের সর্বশেষ সুযোগ।

যে কোন জাতীয় নির্বাচন আসলে নাম সর্বস্ব ক্ষুদ্র দল, গোষ্ঠি ও ব্যক্তিদের তৎপরতা শুরু হয়। ধর্মকেন্দ্রিক দলগুলোর সক্রিয়তাও হয়ে ওঠে লক্ষ্যণীয়। বড় দলগুলো নানা লোভ- টোপ ফেলে তাদের সাথে জোটবদ্ধ হয় অথবা সরাসরি দলে টেনে নেয়। এক্ষেত্রে এরশাদেও অবস্থান সবচেয়ে সুবিধাজনক। রাজনীতির মল্লযুদ্ধে বড় দুই দলের অবস্থান দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি, আবারও ফিরেছেন মহাজোটে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত হয়েও তিনি ও তার দল ছিলেন ক্ষমতার অংশীদার, আবার সংসদের বিরোধী দলও বটে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শক্তি বিএনপি। আবার বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে ২০ দলীয় জোট। বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা দুইভাগে ভাগ হওয়ার পর তারা সরকারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখিয়ে আছে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গ পাবার জন্য। এক্ষেত্রে বিএনপির পুরানো সঙ্গী জামাতের সাথে ক্ষমতাসীনদেও সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের সমর্থন আওয়ামী লীগের দিকে। নির্বাচন যতই নিকটবর্তী হবে রাজনৈতিক খেলাধুলাএবং ভাঙ্গা-গড়া বাড়বে। ধর্মীয় দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানও এই খেলায় সক্রিয় থাকবে।

বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সরকারী জোটের অংশীজন এবং ক্ষমতার ভাগীদার। গত দশ বছরে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। তাদের এখন মহাজোটে থাকা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখলেও বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। ভোটের ফলাফল যাই হোক, রাজনীতির মাঠে ছোট হলেও বাম দলগুলোর ভিন্ন ইমেজ রয়েছে। বড় দলগুলি তা পূঁজি করতে চাইবে। সুতরাং ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় বাম দলগুলি সামিল হবেনা, এমনটি আপাতত জানান হয়েছে।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সামরিক শাসকদের কথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের আবহে শুরু হয়েছিল দল ভাঙ্গা-গড়ার খেলা’। এই ভাঙ্গা-গড়ার প্রভাব একসময় বড় রাজনৈতিক দলগুলিতেও চাপ তৈরী করে। নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত এই দেশের রাজনীতি এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলা প্রত্যক্ষ করেছে। সে সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও ভাঙ্গনের মুখে পড়তে হয়। বাম ঘরানার দলগুলির ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। তাদের অহরহ ভাঙ্গন দলের বদলে ‘ওয়ানম্যান শো’ তৈরী করে আসছে।

গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা এই দেশে সাতচল্লিশ বছরেও কোন রূপ পরিগ্রহ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিকতার চর্চা দাঁড়ায়নি। ব্যক্তি বা একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল দল বা বিবদমান পক্ষগুলি যে যার মত জিততে চাইবে। নির্বাচনে যেই জিতুক, প্রশ্ন হচ্ছে, এ রাষ্ট্র কী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নিশানা খুঁজে পাবে? নাকি আবারও একক কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিগঢ়ে বাঁধা পড়বে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এখানে এখন এ সকল সংকট ও সম্ভাবনা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সকল দলকে একীভূত করার একটি রাজনৈতিক চেষ্টা হয়েছিল। শেষাবধি তা রক্তাক্ত পরিনতির মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষণটি রেখে গিয়েছিল। কিন্তু শাসকশ্রেনী ইতিহাসের অমূল্য শিক্ষণগুলি কখনই মেনে নিতে চায়না। দার্শনিক হেগেলকে উদ্ধৃত্ত করে কার্ল মার্কস সেজন্যই বলতেন, “ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি ঘটে, প্রথমটি যদি হয় ট্রাজেডি, তাহলে পরেরটি অবশ্যই কমেডি। আর প্রথমটি কমেডি হলে পরেরটি অবশ্যই ট্রাজেডি’’।