Home » অর্থনীতি » প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-২ : ধনিক শ্রেণী গঠন : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-২ : ধনিক শ্রেণী গঠন : বাংলাদেশে সর্বোচ্চ

আনু মুহাম্মদ ::

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে (ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮) ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থান লাভ করেছে অর্থাৎ বিশ্বে ধনিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ধনী ব্যক্তি বলতে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের বোঝানো হয়েছে।[1]

বাংলাদেশে পুঁজিবাদ বিকাশ প্রক্রিয়ায় ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এই গঠনের প্রথম পর্বে ছিলো লাইসেন্স, পারমিট, চোরাচালানী, মজুতদারি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্বে এর সাথে যোগ হয় ব্যাংক ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ। ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়ে, ঋণখেলাপীও বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা ও সরকারি ক্ষমতার মধ্যে যোগাযোগ ও চুক্তির নতুন বিন্যাস ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণীর উপস্থিতি যতো স্পষ্ট হতে থাকে ততো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় যাবার হার বাড়তে থাকে, আবার এই হস্তান্তরে ধনিক গোষ্ঠীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ৮০ দশকের শুরুতেই ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক এর যাত্রা শুরু হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ খেলাপীদেরই নতুন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক হিসেবে দেখা যেতে থাকে। দেখা যায়, একজন যতো পরিমাণ ঋণ খেলাফী তার একাংশ দিয়েই তারা নতুন ব্যাংক খুলে বসে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে নামে বেনামে ঋণ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক যোগাযোগ, লেনদেন ব্যবস্থা সম্পদ কেন্দ্রীভবনের একটি কার্যকর পথ হিসেবে দাঁড়াতে থাকে।

বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণী গঠনের ধরন বোঝাতে আমি ৮০ দশকের শুরুতে ‘লুম্পেন কোটিপতি’ পদ ব্যবহার করি। লুম্পেন কোটিপতি বলতে আমি বুঝিয়েছি এমন একটি শ্রেণী যারা নিজেদের বিত্ত অর্জনের জন্য উৎপাদনশীল পথের চাইতে দ্রুত মুনাফা অর্জনে অন্যান্য সহজ ও চোরাই পথ গ্রহণে বেশি আগ্রহী থাকে, এগুলোর মধ্যে চোরাচালানি, মাদক ব্যবসা, ব্যাংক ঋণ লোপাট, জবরদখল, জালিয়াতি ইত্যাদি অন্যতম। এরজন্য সব অপরাধের পথ তারা গ্রহণ করে নির্দ্বিধায়।[2]

বাংলাদেশে ৮০ দশক ছিলো নব্য ধনিক শ্রেণীর ভিত্তি সংহত করবার জন্য খুবই সুবর্ণ-সময়। একদিকে তখন বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তির নেতৃত্বে স্বৈরাচারী শাসন অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’র অধীনে সংস্কার কর্মসূচিতে ব্যক্তি গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তরের নীতিমালার চাপ নব্য ধনিকদের জন্য খুবই অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও থিংকট্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার মূল পথপ্রদর্শক ছিলো বরাবরই। বর্তমান বাংলাদেশেও তাদের মতাদর্শই উন্নয়ন পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করছে।[3]

যাইহোক, ৮০ দশক থেকেই  ক্ষমতাবানদের সাথে যোগাযোগে দক্ষ ব্যক্তিরা রাতারাতি তখন অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যায়, এরজন্য তাদের উদারভাবে ব্যাংক ঋণও দেওয়া হয়। [4] এটা সম্ভব হয় ক্ষমতার সাথে একটা অংশীদারীত্বের চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করবার কারণে। রাষ্ট্র-ব্যবসা-ধর্ম-লুন্ঠনের এরকম প্যাকেজ বাংলাদেশে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। দুর্নীতি-লুন্ঠন-ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের যে ভিত্তি তখন নির্মিত হয় তা দিনে দিনে আরও শক্ত হয়েছে। কেননা সেইসময় বিন্যস্ত শাসন-দুর্নীতির পথেই পরবর্তী সরকারগুলোও অগ্রসর হয়েছে। তাই একদিকে দুর্নীতির শত হাতপা বিস্তার এবং অন্যদিকে সম্পদ ও ক্ষমতায় কেন্দ্রীভবন দুটোই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সেই হিসেবে ৮০ দশকের দুর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী শাসককে পরবর্তী শাসকদের গুরু হিসেবে উল্লেখ করা চলে। পরবর্তী সময়ের শাসকেরা বহুভাবে তাঁকে অনুসরণ করে লুন্ঠন দুর্নীতি ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের ক্ষেত্রে পরিমাণগত দিক থেকে ধাপে ধাপে বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।

গত এক দশকে আমরা প্রবেশ করেছি পুঁজি সংবর্ধনের তৃতীয় পর্বে, যখন ব্যাংক ঋণের মধ্যে সম্পদ লুন্ঠন সীমিত নেই। আকাঙ্খা এবং সুযোগ দুটোই এখন অনেক বেশি। তাই পুরো ব্যাংক, ভবন, সেতু, সড়ক খেয়ে ফেলাই এখনকার সফল প্রজেক্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তার বাইরে নয়। শেয়ার বাজারও একটি লোভনীয় ক্ষেত্র। এটা প্রমাণিত যে, প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃঢ় সমর্থন বা অংশীদারীত্ব ছাড়া কোনো বড় দুর্নীতি ঘটতে বা তা বিচারের উর্ধ্বে থাকতে পারে না। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারের ধ্বস হয়েছে। এর পেছনে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছিলো খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ফরাসউদ্দীন। কিন্তু দুটো তদন্ত কমিটির ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে অভিন্ন। পুরো রিপোর্ট প্রকাশিতও হয়নি। মূল দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তারা ক্ষমতার ছড়ি নিয়ে আরও নতুন নতুন অপরাধের কাহিনী তৈরি করছেন।

শুধু ব্যাংক বা শেয়ার বাজার নয়, সর্বজনের (পাবলিক) সব সম্পদই এখন অসীম ক্ষুধায় কাতর এই শ্রেণীর লক্ষ্যবস্তু। বৃহৎ চুক্তিতে বৃহৎ কমিশন, জমি-নদী-খাল-বন দখল, সর্বজনের সম্পদ আত্মসাৎ, মেগা প্রকল্পে মেগা অনিয়মের রাস্তা তৈরিসহ পুরো দেশই এখন ভোগ্যবস্তু। আগেই বলেছি, পুঁজি সঞ্চয়নের বিভিন্ন পর্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমর্থন বা অংশগ্রহণ বরাবরই ছিলো নির্ধারক। মন্ত্রী, আমলাদের সহযোগিতা  বা অংশীদারীত্বের ব্যবস্থারও তাই বিকাশ ঘটেছে নানাভাবে। লুম্পেন রাজনীতিবিদ ও লুম্পেন আমলার বিকাশ ঘটেছে যারা বৃহৎ কমিশন, বড় আকারের ঘুষের মাধ্যমে অর্থবিত্ত অর্জন করে নতুন শ্রেণীতে উত্তরণ লাভ করছেন। আমলাতন্ত্র বস্তুত দেশি-বিদেশি কর্পোরেট গোষ্ঠীর সম্প্রসারিত হস্ত। এর সাথে যুক্ত আরেক গোষ্ঠীর কথা বলা দরকার, এরা লুম্পেন বিশেষজ্ঞ/কনসালট্যান্ট যারা এসব কাজে বৈধতা দিতে নিজের বিশেষজ্ঞ পরিচয় বিক্রি করে, ধ্বংসের প্রকল্পকে উপকারী প্রকল্প বলে ঘোষণা দেয়, এর বদলে নিজেরাও দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়। উচ্ছিষ্টভোজী সমর্থক হিসেবে এমবেডেড বুদ্ধিজীবীর আয়তন বিস্তৃত হয়েছে গত এক দশকে। লুম্পেন শ্রেণীর সকল অংশের একটি বৈশিষ্ট অভিন্ন: এই দেশে সম্পদ আত্মসাৎ আর অন্য দেশে ভবিষ্যৎ তৈরি। সুতরাং শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, নদী, বায়ু, পরিবেশ বিপর্যস্ত করে এই দেশকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এই শ্রেণী যেভাবে সংহত হয়েছে তার সাথে রাজনীতির নির্দিষ্ট ধরনের বিকাশও সম্পর্কিত। নানা চোরাই পথে কোটি-কোটিপতি হবার চেষ্টা যারা করে তাদের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ও অর্থবরাদ্দে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, স্বাধীন বিদ্যাচর্চা-সংস্কৃতিচর্চা বিপদজনক। তাই এই গোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতা কতিপয় ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা, যাদের সাথে সহজেই সমঝোতা, অংশীদারীত্ব, চুক্তি করা সম্ভব। তাদের অংশীদার বানিয়ে তরতর করে বিত্তের সিঁড়ি অতিক্রম করা সহজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যতো অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক হবে ততো তাদের সুবিধা। তাদের জন্য তাই একই সাথে দরকার একটি নিপীড়ন মূলক শাসন ব্যবস্থা, স্বৈরতন্ত্রী আবহাওয়া যেখানে ভিন্নমত ও স্বাধীন চর্চার ওপর চড়াও হবার জন্য নানা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে। যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বা বিচার ব্যবস্থার আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

যেসব খাত এগিয়ে :

সরকার যেসব বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে, নিচ্ছে তার আকার ও বরাদ্দ আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। এসব প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দের কোন উর্ধ্বসীমা নেই, এর যৌক্তিক বিন্যাসেরও কোনো ব্যবস্থা নেই, যৌক্তিকতা বিচারের কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানও আর কার্যকর নেই। তার ফলে এগুলোর ব্যয় অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ২/৩ গুণ এমনকি ১০ গুণ বেশি হলেও তার জবাবদিহিতার কোনো প্রক্রিয়া নেই। বরং সরকারি অনুমোদন নিয়েই এগুলোর ব্যয় শনৈ শনৈ বেড়ে যাচ্ছে। দেশি বিদেশি বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, সড়ক মহাসড়ক ফ্লাইওভার রেলপথ সেতু সবক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার কোনোদেশেই এতো ব্যয় হয় না।[5] এর পেছনে উর্ধ্বমুখি কমিশন এবং ঋণদাতা সংস্থা বা সরকার প্রভাবিত ঠিকাদার নিয়োগ অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়। গত ৬ বছরে এই অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধিতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন নির্মাণখাত সবচাইতে বর্ধনশীল। ইটভাটা অসংখ্য, বৈধ যত তার চাইতে অবৈধ সংখ্যা বেশি। সিমেন্ট কারখানার সংখ্যাও বেড়েছে। শীতলক্ষাসহ বিভিন্ন নদীর বাতাসে পানিতে এর প্রবল ছোঁয়া পাওযা যায়। দূষণরোধের কোনো ব্যবস্থা কাজ করে না। রডের উৎপাদন বেড়েছে। নিয়ম মেনে বা না মেনে বালু তোলার পরিমাণ বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি। ফার্নিচারের ব্যবসাও বেড়েছে। এরজন্য বনের গাছের ব্যবসা ভালো। দেশে নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করায় প্রশাসন বরাবর সক্রিয় সহযোগী।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পরিবেশ বিনাশ ক্ষেত্রে অগ্রণী। দায়মুক্তি আইন এক্ষেত্রে অন্যতম রক্ষাকবচ। সরকার দেশের বিদ্যমান আইন ও নিয়মনীতি অমান্য করে দেশি বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিকে উচ্চমূল্যে কাজ দিচ্ছে, আইনের  হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০১০ সাল থেকে সরকার চলছে ‘দায়মুক্তি আইন’ ঢাল দিয়ে, নানা সুবিধা ছাড়াও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় থেকে বাঁচানোর জন্য দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে রাশিয়ান ও ভারতীয়সহ বিদেশি কোম্পানিকেও (রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রষ্টব্য)। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশি-বিদেশি কোম্পানির উচ্চলাভ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশে কয়লা, পারমাণবিক ও এলএনজি নির্ভর ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। বন, জমি, উপকূলবিনাশ, অধিক ঋণ ও বিদেশ নির্ভরতা এবং ব্যয়বহুল এই পথ নেয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদার কথা। কিন্তু যখন পরিবেশবান্ধব, সুলভ এবং টেকসই বিকল্প পথ দেখানো হচ্ছে তখন সরকার সেদিকে যাচ্ছে না কারণ সেই পথ দেশ ও জনগণের জন্য অনেক নির্ভরযোগ্য হয়েও কর্পোরেট গোষ্টীর তাতে লাভ নেই, আমলা মন্ত্রীদের কমিশনের সুযোগ নেই।[6]

আরেকটি ক্ষেত্র সর্বজনের অর্থ দিয়ে বিশাল কেনাকাটা। যন্ত্রপাতি  কেনা হচ্ছে, কাজ নাই; বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই সেগুলো হাওয়া; ডেমু ট্রেন কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই তার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হচ্ছে; সিসিটিভি কেনা হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজনের সময় তা নষ্ট; ঋণ করে সাবমেরিন সহ সমরাস্ত্র কেনা হচ্ছে। ভারত থেকে ঋণ করে শত শত বাস কেনা হচ্ছে, কিছুদিন পরই যেগুলো বিকল হচ্ছে;  কেনা হচ্ছে গাড়ি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার  মধ্যে গাড়ির মডেল পরিবর্তন করা, আরও বড় আরও দামি গাড়ি কেনার পথে প্রবল উৎসাহ। সর্বজনের অর্থ যে কোনোভাবে বরাদ্দে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নেই। কিন্তু এই অর্থ জোগাড়ে বাড়ছে মানুষের ওপরই চাপ। গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, ভ্যাট বসছে সর্বত্র, খাজনা বাড়ছে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতও এখন কিছুলোকের খুব দ্রুত টাকার মালিক হবার জায়গা। এর অন্যতম সুফলভোগী কতিপয় শিক্ষকও। প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং আর টিউশনি নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন বিষময়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করার কারণে গাইড বই, কোচিং এর বাণিজ্যের পথ খুলেছে। চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। চিকিৎসা খাতের অবস্থাও তাই। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে তাই একদিকে জৌলুস বাড়ছে অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ বিশ্বে নীচের সারিতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, জিডিপি অনুপাতে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম।[7]  ফলে সর্বজন প্রতিষ্ঠানের বিকাশ সংকটগ্রস্ত, লক্ষ শিক্ষকের জীবনও বিপর্যস্ত। স্কুল কলেজ মাদ্রাসার বহু প্রতিষ্ঠানের অনাহারী শিক্ষকেরা বারবার ঢাকা আসেন কিন্তু তাঁদের ন্যায্য দাবি পূরণ হয়না। তাঁরা অনশনও করেছেন বহুবার। নন এমপিও এডুকেশনাল ইন্সটিটিউশন টিচারস এ্যান্ড এমপ্লয়ীজ  ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ  বলেছেন, ‘২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দাবি নিয়ে আমরা ২৮ বার ঢাকা শহরে এসেছি।[8]’  কোনো কাজ হয়নি।

উন্নয়নের ধরনে যদি দুর্নীতি অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা হীনতা, দখল, দূষণ থাকে অর্থাৎ যদি উন্নয়ন প্রকল্প অতি উচ্চ মাত্রায় সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি/বিপর্যয়ের কারণ হয় তাহলে তা কুশাসন অবধারিত করে তোলে। ব্যবসা- লবিষ্ট- রাজনীতিবিদ- প্রশাসনের দুষ্ট আঁতাত আরো অনেক অপরাধ-সহিংসতাকেও ডাকে। বলপূর্বক টেন্ডার দখল, জমি-ব্যবসা দখল করতে গিয়ে খুন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় সহযোগিতা গুম, আটক বাণিজ্য, দরকষাকষি এগুলোও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায়। প্রশাসন আর দল একাকার হয়ে গেলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের বল্গাহীন প্রতিযোগিতা চলবেই। বাড়তেই থাকবে ধর্ষণ, নারী-শিশু- সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা, ক্রসফায়ার, হেফাজতে নির্যাতন, এবং সরকারি দলে বিভিন্ন গোষ্ঠী হানাহানি। এসব কিছু মিলিয়েই পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধির জৌলুস বাড়তে থাকে প্রাণ প্রকৃতির বিনাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা-অপমান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]https://www.wealthmanagement.com/sites/wealthmanagement.com/files/wealth-x-wealth-report.pdf

[2]পুঁজিপতি শ্রেণীর উৎপাদন বিচ্ছিন্ন-লুটেরা- ধরন বোঝাতে ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ প্রথম ব্যবহার করেন একজন অষ্ট্রিয়ান  লেখক, ১৯২৬ সালে। প্রথম ইংরেজী ভাষায় এর ব্যবহার করেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত পলিটিক্যাল ইকনমি অব গ্রোথ গ্রন্থে। পরে এ শব্দবন্ধ বিশেষ পরিচিতি পায়  জার্মান-মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী  আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাংক এর (১৯৭২) লুম্পেন বুর্জোয়া লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট গ্রন্থের মাধ্যমে। তিনি এই গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্থ প্রান্তস্থ দেশগুলোতে পুঁজিবাদের বিকাশ আলোচনায় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন এমন একটি শ্রেণীর বিকাশ যারা সা¤্রাজ্যবাদের সাথে ঝুলে থাকে, নিজস্ব অর্থনীতির উৎপাদনশীল বিকাশের বদলে তারা যে কোনো ভাবে অর্থবিত্ত অর্জনের পথ গ্রহণ করে, নিজেদের স্বার্থে বহুজাতিক পুঁজির আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে।

 

[3] আমার বেশ কয়টি বইতে এবিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। কয়টির নাম এখানে উল্লেখ করছি- কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিমুখ, বিশ্বায়নের বৈপরীত্য, উন্নয়ন বৈপরীত্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারত প্রশ্ন।

 

 

 

[4]কয়েকদশকে ব্যাংকঋণ লোপাট কাহিনী ও তার বিবর্তনের বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- কল্লোল মোস্তফা: সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১৮। এছাড়া ব্যাংকের খেলাফী ঋণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এখনও বিষয়টি বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক। দেখুন মইনুল …..

 

[5] এবিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণার সূত্র ধরে বিভিন্ন রিপোর্ট দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলো, বণিকবার্তা ছাড়াও এসম্পর্কিত আরও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি:https://www.jamuna.tv/news/24438, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2016/05/31/364233, http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/14/451818, https://www.thedailystar.net/frontpage/road-construction-cost-way-too-high-1423132

[6]এ বিষয়ে দ্রষ্টব্য তেল গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বিকল্প মহাপরকিল্পনার খসড়া। দেখুন: https://drive.google.com/file/d/1hPjRITBhY9cizuxfMJ2eAwieaSXP_EtI/view

[7]গত এক দশকের উন্নয়ন বরাদ্দের ধরন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- মাহতাব উদ্দীন আহমদ: বাজেট এবং এক দশকের ‘উন্নয়ন চিত্র’, সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১

[8] নিউ এইজ, জুলাই ৫, ২০১৮