Home » প্রচ্ছদ কথা » সমান সুযোগ প্রাপ্তির জন্য কাকুতি-মিনতি

সমান সুযোগ প্রাপ্তির জন্য কাকুতি-মিনতি

আমীর খসরু ::

প্রথমেই বিষয়টি স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন যে, মনে-প্রাণে অগণতান্ত্রিক শাসককূল এবং তাদের নানা কিসিমের তাবেদাররা বহু চেষ্টার পরে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এই ধারণাটিকে নিয়ম বা নিয়তি বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, আসলে নির্বাচনই হচ্ছে সামগ্রিক গণতন্ত্র। অর্থাৎ নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় কায়েম ও জারি হয়ে যাবে। সার্বিক ও সামগ্রিক গণতন্ত্রকে বিদায় জানিয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রহীন বা খুবই স্বল্পমাত্রার কথিত গণতান্ত্রিক শাসন- খোদ গণতন্ত্রের জন্য একটি বিশাল সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোটি নড়বড়ে করে ফেলেছে। আর এই নড়বড়ে পরিস্থিতির সুযোগে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কার্যত: অগণতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান হচ্ছে দেশে দেশে। সংকটাপন্ন নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও আরও সংকটময় করে তুলেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রও এখন বিভিন্ন দেশে কার্যত অচল অবস্থার মুখোমুখি।

ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রই কাঠামোগত এবং প্রায়োগিক সংকটকে সঙ্গী করে, বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝের অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রেরও চরম বিপন্ন ও বিপর্যস্তার কাল। এবারের নির্বাচন নিয়ে এখনো জনমনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার যে প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে- তাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কারণ এর ফলে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ বড় মাপে বদলে গেছে। একতরফা নির্বাচনের অথবা নির্বাচনে ভোটারের প্রয়োজন হয় না বলে এই জমিনে যেসব কলংকজনক ঘটনাবলী ঘটেছে ইতোপূর্বে-এটি তার বিপক্ষে এবং বলা যায়, জনগণ যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কামনা করে এটি তারই স্বপক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক হলেও আগামী নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বা রাখার চেষ্টা হচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে নিশ্চিত করার কোনো কারণ ঘটেনি। কারণ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে গেলে ক্ষমতাসীনদের ‘রুটিন ওয়ার্ক বা সরকার পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যতোটুকু না করলেই নয়’, ততোটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়; প্রশাসনের সব বিভাগকে চলতে হবে দলীয় নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক। কিন্তু বাস্তবে তা কি বিদ্যমান রয়েছে? বরং নির্বাচন কমিশনই এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি বা কমিশনও এপর্যন্ত এমত কোন নজীর সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচন কমিশনকে ‘পুরোপুরি নিরপেক্ষ’ নয় বলে আখ্যা দিচ্ছে।

আসলে নির্বাচন কমিশন কতোটা শক্তিশালী, সক্ষমতা ও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে এবং ভবিষ্যতে পারবে তার উপরই সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্ভর করে। কিন্তু যেভাবে গ্রেফতার ও নানা ধরনের মামলা চলছে, ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে একপক্ষের নেতাকর্মীদের মনে এবং সরকার ও কর্তা ব্যক্তিদের ভাষা ও ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ দেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জনআস্থা তৈরি হয় না। এমন একটি আস্থাহীনতার পরিবেশ এখনো পর্যন্ত বজায় থাকলেও সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে, প্রত্যক্ষ করতে চায়, আস্থাশীল হতে ইচ্ছুক যে, সবার জন্য সমান সুযোগ অচিরেই তৈরি হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ বিদ্যমান থাকা গণতন্ত্রে প্রতিদিনের, নিত্যদিনের বিষয় হওয়াই  বাঞ্চনীয় ও প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কয়েকটা দিনের জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি ও প্রাপ্তির জন্য ভিক্ষা চাওয়া, কাকুতি-মিনতি করা- নির্বাচনী গণতন্ত্র তো অবশ্যই খোদ গণতন্ত্রের জন্যও একদিকে যেমন সংকটের তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিশাল দুর্ভাগ্যেরও বিষয়।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’। প্রখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল-এর বিখ্যাত বই ‘‘এ্যনিমেল  ফার্ম’’-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমার নিচের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে.- ‘সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষ সমান; তবে কোন কোন রাজনৈতিক দল ও পক্ষ একটু বেশিভাবেই সমান।’ কারণ দক্ষতা, যোগ্যতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গি, আর এর বিপরীতে যারা তাদের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়- দেখার চোখও আলাদা, মন-মস্তিক এবং মনোজগতও ভিন্ন। আর এখানেই অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে।