Home » প্রচ্ছদ কথা » মন শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধির নির্বাচন কমিশনের দাওয়াই

মন শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বৃদ্ধির নির্বাচন কমিশনের দাওয়াই

আমীর খসরু ::

অনেকেই প্রত্যাশার পারদ উপরে উঠিয়ে এমনটা ধারণা করেছিলেন যে, বিএনপিসহ বিরোধী দল ও পক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে নির্বাচন কমিশনে কর্তাব্যক্তিদের – মন মস্তিষ্ক ও মনোজগতে সামান্য হলেও একটা ঝাকুনি লাগলেও লাগতে পারে। কারো কারো এমনটাও মনে হয়েছিল যে, পুরো নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে জনমনে যে বদ্ধমূল  নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে – তা বদলের চেষ্টায় হলেও তারা অন্তত ‘কিছু একটা করবে’ এবং সেটি হবে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সব প্রত্যাশা উল্টিয়ে, ‘যা আগে ছিল তাই পরে রয়ে গেল’। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিটি করপোরেশনের সময়ের মন্তব্যের পথ ধরে একজন নির্বাচন কমিশনার এবার আগে ভাগেই আগামী নির্বাচনটি কেমন হতে পারে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে আগাম জানান দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, ‘‘পৃথিবীর কোনো দেশে শতভাগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হয় না, বাংলাদেশেও হবে না’’। (প্রথম আলো- ১৬ নভেম্বর)। এর আগে-পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শোনানো হলো নিয়ম-নীতির নামে নানা নসিহত। নির্বাচন কমিশন সচিব ১১ নভেম্বর স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিলেন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা ভোট কেন্দ্রের ছবি তুলতে পারবেন না, সংবাদ মাধ্যমের সাথে নির্বাচনের দিন কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া, মতামত প্রকাশ, এমনকি আনুষ্ঠানিক কথা পর্যন্ত বলতে পারবেন না। তাদের ‘মূর্তির মতো’ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই ধারায় আরও কয়েক দফা নীতিমালা ঘোষণা করা হলো পর্যবেক্ষকদের জন্য। সংবাদ মাধ্যমের উদ্দেশ্যও ইতোপূর্বে এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই যেসব নিয়মনীতি ও নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে-তাতে সংবাদ মাধ্যম কর্মীদেরও সরাসরি ‘মূর্তি’ হতে না বললেও প্রায় ‘মূতির্’ হওয়ার নির্দেশনামা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এবার চোখ পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপরেও।  নির্বাচন কমিশনের সচিব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে যাতে তারা ভাষায় ‘প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানো না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য ওই মাধ্যম মনিটর করা হবে। সরকার কথিত ‘প্রোপাগান্ডা’রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে; নানা বিভাগ ও নানা উদ্যোগে এ কাজটি কৌশলে বহুদিন ধরে করা হচ্ছে। সম্ভবত নির্বাচন কমিশন এতেও নিশ্চিত হতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কাকে প্রোপাগান্ডা বলছে ও বলবে। এবং এর মাপকাঠি কি? ইতোমধ্যে কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, কিছুসংখ্যক সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাকে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলে দিয়েছে। তাহলে এই কর্মকর্তারাই কি ঠিক করবেন প্রোপাগান্ডা কোনটি এবং কোনটি প্রোপাগান্ডা নয় ?

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য এবং আমলা সচিবের বক্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা যা বলছেন তা তারা সহি ও সত্য কথা বলছেন বলেই মনে করাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ তারা আগেভাগেই ‘হয়তো’ জানান দিয়ে যাচ্ছেন যে, আগামী নির্বাচনটি তারা কেমন ভাবে করতে চান বা অনুষ্ঠিত হবে। তাদের এই মনোবাসনা কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এই কারণে যে, ভোটারসহ দেশবাসী এবং বিদেশীরা আশাহতের বেদনায় যেন ভবিষ্যতে হঠাৎ করে বড় ধরনের নিরাশার মুখোমুখি না হন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন কেমন হতে পারে তার জন্য সাধারণ মানুষের বা আম-ভোটারের মন শক্ত ও কঠিন করার লক্ষ্যে, সহ্যক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে – মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতোই- এক ধরনের দাওয়াই দিয়ে যাচ্ছেন।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আছে। সর্বসাম্প্রতিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তার ব্যাপারে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একটি তালিকা দিয়ে তাদের বদলি করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু এতোদিন নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এক চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, ওই কর্মকর্তাদের কোনোক্রমেই বদলি করা উচিত হবে না। এক পক্ষের দিক থেকে চিঠির পর চিঠি যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু এসব অভিযোগের ব্যাপারে কমিশন নিশ্চুপ রয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন এক্ষেত্রে তারা মতামত জানিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিটি অভিযোগই খতিয়ে দেখতে হবে’। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সে পথে হাটছে না। হাটছে না যে, তার আরও উদাহরণ আছে। রাজধানীর আদাবরে ২জন এবং নরসিংদিতে ২জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের অর্ন্তদ্বন্দ্বে তফসিল ঘোষণার পরে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। যশোর বিএনপির একজন নেতার মরদেহ কয়েকদিন নিখোজ থাকার পরে ঢাকায় নদী থেকে উদ্ধার করা হলো এবং এক্ষেত্রে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক্ষেত্রে বরাবরের মতোই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন বলে তার কর্মসম্পাদন করেছেন। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সমর্থকদের ভিড়কে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী উচ্ছাস হিসেবে দেখেছেন; আবার বিএনপি অফিসের সামনের ভিড়কে তারা দেখেছেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারদের ব্রিফ করাসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো তেমন কোনো আমলেই নিলেন না। শত শত নেতাকর্মীকে তফসিল ঘোষণার পরে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলে দিয়েছেন এই মামলাগুলো তফসিল ঘোষণার পরে হয়নি। তিনি এও বললেন, বিএনপি অনেক মামলার বিস্তারিত নথিপত্রই দিতে পারেনি। পুলিশ সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একই। তিনি জোরের সাথেই বলেছেন, পুলিশ বিনা কারনে কাউকে গ্রেফতার করেনা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসব বাদ দিয়ে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের দিকেই পুরো মনোযোগী হয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা যায় বললেও, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন ইভিএম ব্যবহার থেকে তারা পিছপা হবেন না। যে ব্যবস্থাটির সামান্যতম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হলো না, এমন কি জনসম্মুখে যেসব ত্রু টির কথা বলা হচ্ছে তা যে সঠিক নয়- তা জনসম্মুখে ওই ইভিএম মেশিন ব্যবহার করেই পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী পর্যন্ত না করে ‘অসীম আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে’ ইভিএম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী ভারতেও ইভিএম-এর ত্রু টি যে কতো ভয়াবহ হতে পারে, নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার ক্ষেত্রে তা নিয়ে তোলপাড় চলছে। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে বিজেপি, কংগ্রেসসহ সবদলের সামনে আম-আদমী পার্টির পক্ষ থেকে পার্লামেন্টের অধিবেশনের সময়েই একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। আর এতে দেখানো হয় যে, কিভাবে ইভিএম ব্যবহারে ফলাফল ম্যানিপুলেশন করা যায়।

এতোসব পরিস্থিতির মধ্যেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বাক্যটি হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। এমন প্রত্যাশার আসল অর্থ হচ্ছে এখানে যে, এই পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান নেই। অর্থাৎ এর চরম অনুপস্থিতি রয়েছে। এই চরম অনুপস্থিতির বিষয়টি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচনে অনুভূত হয়নি। কারণ ওই নির্বাচনটি ’৯০ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারে সবার জন্য সমান সুযোগের অভাবটি অনুভূত হচ্ছে সব দল ও পক্ষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে। এ কথাটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, যোগ্যতার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হচ্ছে-একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তাদের মনেপ্রাণজুড়ে ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি অনুপস্থিত বলেই জনগণ ধারণা করে নেতিবাচক এবং এ কারণে জনমনে শংকা, উদ্বেগ ভীতির সৃষ্টি হয়। এই শংকা, ভীতি ও উদ্বেগ আরও বহু গুণে বেড়ে যায় সরকারের ভূমিকার কারণে।

আর এ কারণেই জনগণ এখন পর্যন্ত আস্থাশীল হতে পারছে না যে, আগামী নির্বাচনটিতে তারা নির্বিঘ্নে, নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। আর এটাই হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এখন পর্যন্ত প্রধান অন্তরায়। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এমন পরিস্থিতির নিশ্চয়তা নির্বাচন কমিশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এটাই নির্বাচন কমিশনের বড় ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের বড় সাফল্য।