Home » বিশেষ নিবন্ধ » সমতল মাঠ আর পশ্চিমীদের ইভিএম পরিত্যাগ

সমতল মাঠ আর পশ্চিমীদের ইভিএম পরিত্যাগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. ২৪ নভেম্বর সিইসি জানালেন, “লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। পুলিশ তাদের কথা মান্য করছে। অকারনে কাউকে গ্রেফতার করছে না”। একইদিন নির্বাচন কমিশন সচিব জানান, ৬টি সংসদীয় আসনে পূর্নাঙ্গভাবেই ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ আসনগুলি ঠিক করা হবে দৈবচয়ন ভিত্তিতে। কমিশনের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ অনেকগুলি দলের নির্বাচনে সমান সুযোগ এবং ইভিএম ব্যবহার না করার  মূল দাবি উপেক্ষিত হলো। এর ফলে নির্বাচনের আগামী দিনগুলো কেমন যাবে- সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া একটি প্রথা। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর অন্যতম শর্তও বটে। কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বর্তমান রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ বর্তমান সংসদ সদস্যরা স্বপদে থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখছে না, আগত নির্বাচনে সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে, প্রয়োগ দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, নির্বাচনকালে সংসদ নিষ্ক্রিয় থাকবে, এর কোন কার্যকারীতা দেখা যাবে না। সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের আকার ছোট করলে উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এসব কথা বলার অর্থই হচ্ছে, নামে নির্বাচনকালীন সরকার হলেও তারা অন্য সময়ের মতই সকল কাজ অব্যাহত রাখবেন,  শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন সরকারের মত রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন না।

সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা তফসিল ঘোষণার পরে থাকবে না- এমনটিও কিন্তু সংবিধানে লেখা নেই। নির্বাচনী আচরন বিধিতেও “সংসদ সদস্যদের কোন ক্ষমতা থাকবে না”-এমন কোন বিধানও সংযোজন করা হয়নি। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, সংসদ সদস্যদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের বক্তব্য নিছকই রাজনৈতিক। মন্ত্রী বা এমপি পদে থেকে নির্বাচন করবেন, কিন্তু কোন ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না-এটি কি বিশ্বাসযোগ্য? এমন উদারতা এদেশের রাজনীতি কখনও দেখেছে? সুতরাং মুখে যাই বলা হোক, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটি সবচেয়ে বড় বাধা।

পৃথিবীর বহু দেশে ইভিএম ব্যবহার হয়- এটি নির্বাচন কমিশনের যুক্তি এবং তারা সীমিত আকারে ব্যবহার করবেনই এটি এখন বাস্তবতা। মজার বিষয় হচ্ছে, ইউরোপে, জার্মানী, নেদারল্যান্ডস, ইতালী, ফ্রান্সসহ আরো অনেক দেশ ইভিএম ব্যবহার করে না। জার্মানীর সুপ্রীম কোর্ট নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকে ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে আদেশ দিয়েছেন। ইউরোপের বড় দেশগুলো ইভিএম ব্যবহার শুরু করে ‘নির্ভরযোগ্য’ নয় বলে ফিরে গেছে ব্যালটে। মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে ব্যালটে ফিরতে হবে”।

দুই. “পৃথিবীর কোন দেশে ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব হয় না। ‘শতভাগ’ সুষ্ঠ নির্বাচন সম্ভব নয়”-এ বক্তব্য কোন রাজনৈতিক দলের নয়, খোদ নির্বাচন কমিশনের। যদিও তারা শপথ নিয়েছিলেন এবং দায়বদ্ধ শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে এবং সেমত করার জন্য সাংবিধানিক ক্ষমতাও তাদের হাতে ন্যস্ত। যে কোন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সংবিধান তাদের অপার ক্ষমতা দিয়েছে, সুপ্রীম কোর্টের রায়ও কার্যকর আছে – সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনে যা যা দরকার সবই তারা করতে পারবেন। সুতরাং কমিশনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন উঠছে,  ‘নির্বাচনী যুদ্ধ শুরুর আগেই কি তারা পিছু হটছেন’?

“শতভাগ সুষ্ঠ নির্বাচন হয় না”- এটি একটি ভুল তথ্য। অনেকের মত নির্বাচন কমিশনেরও জানা আছে, ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচন নিয়ে সামান্য কোন প্রশ্ন উঠে না। সুতরাং সাংবিধানিক পদে থেকে এমন বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করার দায় কিন্তু তাদের। সেটির বদলে বিতর্কিত ইভিএম এর পেছনে কমিশন নিয়োগ করেছেন সর্বশক্তি। এমন অকার্যকর আচরন দৃশ্যমান হয়ে উঠলে তাদের কার্যকারীতা প্রসঙ্গে গোটা নির্বাচনের সময় তো বটেই, নির্বাচনের পরেও প্রশ্ন উঠতে থাকবে।

জনমনে একটি নেতিবাচক ধারণা সম্ভবত: স্থায়ী হতে চলেছে। ধারণাটি হচ্ছে, সব আমলে নির্বাচন কমিশন সরকারের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ইভিএম নিয়ে তাড়াহুড়ো না করা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে সিইসি যেমনটি বলেছিলেন, “সরকার ও সংসদ চাইলে ইভিএম ব্যবহার হবে”। সরকার ও সংসদ যেহেতু এখানে সমার্থক, সেজন্য অন্যান্য দলগুলোর মতামত কমিশন বিবেচনায় নেবেন না। মানে দাঁড়ালো, সরকার চাইলেই কেবল তারা বিবেচনায় নেবেন। আর সংসদ তো কাগজে-কলমে নিষ্ক্রিয় থাকছে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সংবিধান সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রয়োজনে যে কোন আইন-বিধি জারি করার এখতিয়ার রয়েছে কমিশনের। ক্ষমতাসীন দলসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে দিক নির্দেশনা দেয়ার এখতিয়ারও আছে কমিশনের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশনা-এমনকি আকার-ইঙ্গিতেও যথেষ্ট হয়ে ওঠে কমিশনের কাছে। অতীত-বর্তমানের সকল কমিশনের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।

তিন. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ‘উন্নয়ন তত্ত্ব’ ১৪ দলীয় জোটের শরীকদের পুনর্বার ক্ষমতায় আসাকে অনিবার্য করে তুলতে চেয়েছে। তাদের দাবি এই উন্নয়ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে আবারও সরকার গঠন করতে হবে। না হলে ধারাবাহিকতা থাকবে না। একথা ২০১৩-১৪-এর প্রতিধ্বনি। সুতরাং যে কোন মূল্যে জয় চাইবে আওয়ামী লীগ। তাদের সংসদ, তাদের সরকার, তাদের প্রশাসন বজায় রেখেই হচ্ছে যে নির্বাচন, সেখানে জয় ছাড়া অন্য কিছু তাদের পক্ষে আশা করা সম্ভব নয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মত ২০০১ সালে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সেমত করেই বলেছেন, এবারের নির্বাচন খুব কঠিন হবে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা সমীকরন হিসেব করে মহাজোটের আঙ্গিকে নৌকা প্রতীককে সামনে রেখেই নির্বাচন করছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে আসুক- এটি তাদের জন্য খুব স্বস্তিকর নয়, সেজন্যই সতর্কতা অনেক বেশি। স্বয়ং শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন।

কারান্তরালে থাকা খালেদা জিয়াও তার দলের নেতাদের যেকোন মূল্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানেন, দোধারী ক্ষুরের ওপর রয়েছেন তিনি, এবারের নির্বাচন তারজন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ! সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে নির্বাচনের মাঠে-অতল খাদের কিনারায় এটি তাদের টিকে থাকার সবশেষ সুযোগ, খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নেতারা সেটি ভালো করেই জানেন। ফলে তাদের জন্য আগত নির্বাচন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই, নির্বাচনকালীন সরকারের দেখা নেই, খালেদা জিয়ার মুক্তি নেই- তবুও বিএনপিকে নামতে হচ্ছে নির্বাচনে। এতো ছাড় দিয়ে, দলের অভ্যন্তরের কট্টরপন্থীদের দাবিয়ে রেখে বিএনপি কেন নির্বাচনমুখী? সাদা কথায়- নির্বাচনকেই তারা আন্দোলনের পথ হিসেবে নিয়েছে। এজন্যই নীতি ও পুরানো বৈরীতা ভুলে গিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে গঠন করেছে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। আবার ২০ দলীয় জোটের কাঠামো বজায় রাখছে তারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে এই তত্ত¡ ছিল কোথায়? নির্বাচনকে তখন আন্দোলনের পথ ভাবা হয়নি কেন? প্রতিরোধে সহিংস-রক্তাক্ত পথ বেছে নিতে হলো কেন? রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তত্ত্ব-তালাশ বা মূল্যায়ন কোনটিই বিএনপি আজতক করেনি। গত একযুগে শক্তিমান প্রতিপক্ষের ‘নিশ্চিহ্নকরণ’ চেষ্টার আত্মরক্ষায় রত থেকেছে, কর্ম আর কর্মফলের বিশ্লেষণের সুযোগ পায়নি। সেটিই কি একমাত্র কারণ?

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করতে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এখানে কোন পক্ষই পরাজয় বরণ করতে চায় না। আবার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে আকছার প্রশ্ন উঠছে, তৈরী হচ্ছে নেতিবাচক পারসেপশন। বিবাদমান পক্ষগুলি পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করদে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নির্বাহী বিভাগগুলি প্রজাতন্ত্রের হওয়ার বদলে কতটা দলীয়-সে নিয়েও নানা প্রশ্ন। এখানে রাষ্ট্র কিংবা দল বা প্রতিষ্ঠান-কোথাও গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি।

তারপরেও এই দেশের মানুষের আকাঙ্খা একটি সুন্দর নির্বাচনের, এই জনআকাঙ্খাটি সরকার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা অনুধাবন করলেই মঙ্গল।