Home » অর্থনীতি » বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

জমো  সানদারাম ও আনিস চৌধুরী ::

আয় ও সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ – উভয় ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই বেড়েছে। বিশ শতকজুড়েই, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মোটা দাগে বৈষম্য ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, এতো ব্যাপক বৈষম্য  মানব ইতিহাসে আর কোনো কালেই ছিল না।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ দখল করে আছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক মাত্র ১২ ভাগ আয়ের অধিকারী। ইউরোপে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ পেয়েছে ১৮ ভাগ, নিচের অর্ধেক পেয়েছে ১৪ ভাগ।

অক্সাফামের ‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৮২ ভাগ চলে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের হাতে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব যারা অর্ধেকে রয়েছে তারা প্রায় ৩.৭ ভাগ মানুষ বলতে গেলে কিছুই পায়নি। ইতিহাসে ২০১৬ সালেই সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি দুদিনে একজন করে বিলিওনিয়ার সৃষ্টি হয় ওই বছরে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বাড়ে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, বৈষম্য বৃদ্ধি যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা ও সমাধান করা না হলে এটি নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

‘দি গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্র্যাসি ২০১৭ : এক্সপ্লোরিং ডেমোক্র্যাসিস রেসিলেন্স’ ধারণা করছে, বৈষম্য গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। বৈষম্যের ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, সামাজিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত করছে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও সমর্থন ধসিয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অগ্রগতির পথে বাধা :

আলেক্সি ডি টকভিল বিশ্বাস করেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে, সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণ সমাজে আয় ও সম্পদের মারাত্মক বিভেদের ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি উন্নতিতে তেমন কিছু করা না হয় বা অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক সাম্যের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ ধনীরা অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব রাখে ও কবস্তার করে,  গরিবরা এই ধরনের সুযোগ পায় না।

আর অমর্ত্য সেনের মতে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গরিবের ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ বা ‘সামর্থ্য’ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। যাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকে, তারা কেবল ইতিবাচক পুনঃবণ্টনেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, সেইসাথে তাদের নিজেদের অনুকূলে বিধিবিধান ও নীতি প্রণয়ন করে নেয়।

রবার্ট পুটনামের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আস্থার’ মতো নাগরিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

যোশেফ স্টিগলিসের মতে, বৈষম্য বাড়লে সামাজিক কাঠামো এবং সংযোগ শিথিল করে দেয়। সবক্ষেত্রে আস্থা হ্রাস, উদাসীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ প্রশ্নে আগ্রহের অভাব ও স্বভাব রুক্ষতা-কটুতা বাড়ায়। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ায়, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়ও নি:শেষ করে, সমাজবিরোধী আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অর্থপূর্ণ গণতন্ত্রের প্রয়োজন সামাজিক বিষয়াদিতে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তভুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মেরুকরণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ফাঁপা করে তোলে, নাগরিক সম্পৃক্ততা হ্রাস করে।

লোকরঞ্জকতা বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ হুমকি সৃষ্টি করে বহুত্ববাদকে। আলেক্সি ডি টকভিলের  কাছে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য গণতন্ত্রের ‘সাম্য’ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে, এমনকি উচ্চ আয়ের সমাজেও তা হতে পারে। ‘ধনবাদী লোকরঞ্জকবাদ বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বশেষ পরিচিতি রাজনীতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে।

জনসমাবেশ আর মিডিয়া ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য ‘অন্যদের’ তথা অভিবাসী ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন লোকদের দায়ী করে। অর্থাৎ ধনিকশ্রেণি  সুযোগ-সুবিধা ও ‘বিভক্ত করে শাসন করার’ চলতি পদ্ধতির ‘অধিকার’ ব্যবহার করে ‘তাদের জনগণকে’ সন্তুষ্ট রাখতে সফল হয় প্রায়ই।

মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে তারা প্রায়ই ধনিকতন্ত্র শাসনকে আড়াল করে রাখে, এমনকি সবচেয়ে জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে অনেক সময় সাফাইয়ের ব্যবস্থাও করে। যেমন নির্বাহী পদে থাকাদের ‘উচ্চ পারিতোষক’, টাইকুনদের উদারভাবে কর হ্রাস, বিনিয়োগ ইনসেনটিভ। আর এসবই করা হয় সামাজিক ব্যয় ও গণপরিষেবার ব্যয় ছাঁটাই করে।

বর্তমানের ‘বিজয়ী সবই নেবে’ বা “winner – take -all” এর মাধ্যমে  অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সফলভাবে লবি করে কর হার কম রাখতে সক্ষম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় থেকে এক শতাংশের হাতেই সর্বোচ্চ মাত্রায় আয় পঞ্জিভূত হচ্ছে।  আর ১৯৮০ সাল থেকে তলানিতে থাকা অর্ধেক আমেরিকান মোট প্রবৃদ্ধির মাত্র ৩ ভাগ অর্জন করতে পারছে। আধুনিক সময়ে এত ব্যবধান আর কখনো দেখা যায়নি।

অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে শীর্ষে থাকা ০.০১ ভাগ তথা ১৪ হাজার আমেরিকান পরিবার মার্কিন সম্পদের ২২.৩ ভাগের মালিক ছিল। আর নিচে থাকা ৯০ ভাগ তথা ১৩৩ মিলিয়ন পরিমার মাত্র ৪ ভাগের মালিকছিল। সবচেয়ে ধনী ১ ভাগ এক প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন আয়ে তাদের অংশ তিনগুণ করতে সক্ষম হয়।

একদিকে আইনগত ও অন্যান্য সংস্কার, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সবই ক্ষমতা বা প্রভাববঞ্চিতদের ভয়াবহ বিপরীত অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্প-আয়ের আমেরিকান পরিবারগুলোর ৭০ ভাগের বেশি আগের বছরের তুলনায়  ফৌজদারি মামলায় বেশী জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের ৮০ ভাগের বেশি পরিবার আইনগত সুবিধাও তেমন পাচ্ছে না।

তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়ায় তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়া ও বাদ পড়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেক আমেরিকান মোহমুক্তি ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে এই তারাই আবার ‘অন্য’ তথা আমদানি ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উগ্র দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতিতে অনেক বেশি সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।