Home » প্রচ্ছদ কথা » ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্ত নির্বাচন কমিশন

‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্ত নির্বাচন কমিশন

আমীর খসরু ::

গত কয়েকদিন সবার জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তি বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়েছে কি হয়নি – তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এখনো যে হচ্ছে না তা নয়, তবে বেশ কিছুটা কমেছে। কমার কারণ, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়ে গেছে- এমনটা নয়, এটা হয়নি একবিন্দু-বিসর্গও। বরং এটা যারা নিশ্চিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবেন সেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েই আমজনতা ধন্ধে পড়েছেন; বড় আকারে প্রশ্ন উঠেছে। আবার প্রশ্নের মধ্যদিয়ে উত্তর খোজারও চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকগণ। সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে ‘‘আসলে তারা কোনো কিছু দেখতে না চাইলে, জোর করে তো আর তাদের দেখানো যাবে না’’ বলে ডেইলি স্টারকে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন এই সোমবারে। বদিউল আলম মজুমদারের মতো ড. শাহদীন মালিকসহ অন্যান্যরাও উদ্বেগ ও শংকা প্রকাশ করছেন নির্বাচন কমিশনের একপেশে নীতি নিয়ে।

কিন্তু এসব বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকগণ সম্ভবত নির্বাচন কমিশনের উপসর্গগুলোই দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু আসল রোগটি ধরতেই পারেননি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার হচ্ছে, হ্যামিএ্যনোপিয়া (Hemianopia) নামের চোখের একটি রোগ-যা দৃষ্টিশক্তির সাথে জড়িত। এ রোগটির প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে, কোনো জিনিসের অর্ধেক দেখতে পাওয়া বা দৃষ্টিশক্তি অর্ধেকটা সাময়িক অথবা স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যিনি বা যারা হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত তারা অর্ধেকটাই শুধু দেখতে পাবেন; বাকি অর্ধেকটা তাদের দৃষ্টিশক্তির বাইরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক উন্নয়ন ঘটেছে-রোগটির নানা ধরন-ধারন এবং কারণও কালোক্রমে আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী  এও বলছেন, এটি মানসিক বিষয়াশয়ের সাথে জড়িত। যেহেতু আমি চিকিৎসক নই, তাই এ রোগটির বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলেও- রাজনীতির মাঠেও নিশ্চয়ই ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় আক্রান্তদের দেখা মিলছে বলে ধারণা করি। রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়ার লক্ষণও নিশ্চয়ই অর্ধেক দেখা এবং এর সাথে রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত বলে ধারণা করা যায়। রাজনৈতিক এই রোগটির উপসর্গ হচ্ছে, যতোটুকু দেখার ততোটুকু দেখবে এবং যতোটুকু দেখতে চাইবে না তা দেখবে না-এমন জাতীয়। নির্বাচন কমিশন এখন ‘রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া’য় সবচেয়ে বেশিভাবে আক্রান্ত।

ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. শাহদীন মালিক থেকে শুরু করে নির্বাচন বিষয়ক সব বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকসহ তাবৎ আমজনতার এ কথাটি জানা উচিত যে, দুর্ভোগ্যজনকভাবে আগের মতো এবারের নির্বাচন কমিশনটিও রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত। আর এটা বুঝতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে অর্থাৎ নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘিত হলো কিনা, এর ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে দেশবাসী দেখলো কিনা, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়েছে কি হয়নি ইত্যাকার নানা বিষয় নিয়ে আর উদ্বেগ, শংকা তো থাকবেই না, কোনো প্রশ্নও মনের মধ্যে উকিঝুকিও দেবে না।

নির্বাচন কমিশনের আসল রোগটি জানা থাকলে– কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে কোথায় বদলি করে আবার কোথায় পদায়ন করা হয়েছে; কোন কোন কর্মকর্তা কার হয়ে কার পক্ষে কাজ করছেন; কেন গায়েবী মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আগে এবং এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে; কেনই বা একজন জীবিত মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকায় আসার পরে তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করতে হলো; কেনই বা তফসিল ঘোষণার পরে ৬ জন দলীয় অর্ন্তদ্বন্দ্বে নিহত হওয়ার পরেও কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এবং উল্লিখিত ঘটনাবলীর কোনো ব্যবস্থা কোনোদিনই নেয়া হবে না – সে সব নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।

তবে রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগের মুশকিলটি হচ্ছে- এই রোগে আক্রান্তরা কোন অর্ধেক দেখতে পাবেন বা দেখবেন আর কোন অর্ধেক দেখবেন না? এখানে বলা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনবিরোধী প্রচারণা বা নির্বাচনে গুজব সৃষ্টিকারী কোনো কিছু প্রকাশিত হলো কিনা তা দিনের ২৪ ঘন্টাই  মনিটর করতে থাকবে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, এটা নির্বাচন কমিশনের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে কিনা। ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের জন্যও নানা নিয়মনীতি জারি করা হয়েছে – যা অতীতে কখনো দেখাও যায়নি, শোনা তো দূরে থাক।

আগেই বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগে আক্রান্ত। আর আক্রান্ত হওয়ার কারণে বর্তমানে সবার মনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শংকা বিদ্যমান রয়েছে-তারও কোনো কারণ খুজে ফেরার প্রয়োজন আর বোধকরি দরকার হবে না। আগামী নির্বাচনে আমজনতা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন কিনা, সব ভোটারের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত হলো কি হলো না – তারও খোজখবর এবং জবাব প্রাপ্তিরও কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ রোগটি যে ধরা পড়ে গেছে-তা ক্রমান্বয়ে সবাই জানতে থাকবে।

তবে এখন সম্মিলিতভাবে সবার পক্ষ থেকে প্রার্থনা হওয়া উচিত, নির্বাচন কমিশন যেন রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগটি থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। অবশ্য একটি সুখবর হচ্ছে, হ্যামিএ্যনোপিয়া রোগের একটি ধরন আছে; আর তা হলো- এই রোগটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িক স্থায়ী হয়। আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা ও  প্রত্যাশা করি, এই রাজনৈতিক হ্যামিএ্যনোপিয়া যেন সাময়িক হয়। প্রার্থনা করা ছাড়া আমভোটারদের আর সাধারণ মানুষের কিই বা করার আছে। তাই আসুন সবাই সম্মিলিতভাবে নির্বাচন কমিশনের রোগমুক্তির প্রার্থনায় মিলিত হই। আমীন!