Home » অর্থনীতি » প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-৩ : মুনাফার পাহাড় : প্রাণ প্রকৃতির বিপর্যয়

প্রাণ প্রকৃতি বাংলাদেশ-৩ : মুনাফার পাহাড় : প্রাণ প্রকৃতির বিপর্যয়

আনু মুহাম্মদ ::

তাই পুঁজি সংবর্ধনের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে প্রাণ প্রকৃতির অভূতপূর্ব বিপর্যয় হয়েছে। কারণ এই ‘উন্নয়ন’ধারার মূল কথাই হলো প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণ ও দখল করা। সামাজিক পরিবেশগত ফলাফল বিবেচনা না করে, ভবিষ্যত প্রজন্মের বিবেচনা না করে চটজলদি মুনাফার লক্ষ্যে সকল তৎপরতা পরিচালনা তাই এই দৃষ্টিতে যৌক্তিক। অতীতে নদী-নালা, খাল-বিল নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে শত হাজার কোটি টাকার ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প করা হয়েছে, এখন দেখছি এর ফল- স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশ বিপর্যয়। দ্রুত মুনাফার লক্ষ্যে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধ, কৃত্রিম রং ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর বিষ প্রভাব পড়েছে মৎস্য, বৃক্ষ, তরুলতাসহ জীববৈচিত্র্যের ওপর। বর্তমান নিরাপদ খাদ্যের সংকট, পানি দূষণ সবকিছুই ঐ বিদেশি ঋণনির্ভর ‘উন্নয়ন চর্চার’ ফলাফল।[1]

গত তিন দশকে একদিকে পাহাড় ও সমতলের বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে বিদেশী ঋণের টাকায় এমন সব আমদানি করা গাছ লাগানো হয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে বেমানান এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।[2] এসব গাছে পাখি বসে না, এসব গাছপালা অন্যান্য গাছ কিংবা তরুলতা টিকে থাকতে দেয় না। ফুল, ফলহীন এসব গাছ গবাদিপশুকেও সমর্থন দেয় না। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি কিংবা শাল, গর্জন কিংবা বটগাছ না লাগিয়ে এসব আমদানি করা গাছ লাগানোর ফলে প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং নাজুকতা তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিলো প্রধানত বনাঞ্চল, সেখানে নিরাপত্তার নামে বনবিনাশ এবং পাহাড় দখল প্রক্রিয়া চলছে কয়েক দশক ধরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা, বনবিনাশ ও সামরিকীকরণের উৎসও একটি বিদেশি ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।[3]

নদীর কথা-

নদীর পানি প্রবাহের ওপরই বদ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম, নদী বিপন্ন হলে তাই বাংলাদেশের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। নদী হারানোর সর্বনাশ ১/২  বছরে,  ১/২ দশকে বোঝা যায় না। গত কয়দশকে বাংলাদেশে জিডিপি যে বহুগুণ বেড়েছে তার হিসাব আমাদের কাছে আছে, কিন্তু একইসময়ে বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীমালার কতটা জীবনহানি ও জীবনক্ষয় হয়েছে তার ক্ষতির কোন পরিসংখ্যানগত হিসাব আমাদের কাছে নেই।

বাংলাদেশের নদীগুলো যে ভাবে খুন হচ্ছে, কারণ হিসেবে ভাগ করলে,এর পেছনে তিনটি উৎস সনাক্ত করা যায়। এগুলো হল: প্রথমত, ভারতের অন্যায় একতরফা আগ্রাসী তৎপরতা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নদী বিদ্বেষী উন্নয়ন কৌশল। এবং তৃতীয়ত, দেশের নদী দখলদারদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসাজস।

ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ৫৪টি। এগুলোর সাথে সম্পর্কিত ছোট নদী, শাখা নদীর সংখ্যা বাংলাদেশে আগে ছিলো সহস্রাধিক। এখনও ২ শতাধিক নদী কোনভাবে বেঁচে আছে। কংক্রিটকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ বড় শিকার বাংলাদেশ ও ভারত দুইদেশেরই নদীমালা। বাংলাদেশ অংশে নদীর বিপন্নতা ঘটেছে তুলনায় অনেক বেশি। একতরফা আক্রমণে বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট নদী এখন একেকটি মৃতদেহ, কিংবা মুমূর্ষু। কার্যত বাংলাদেশের বৃহৎ চার নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা এখন বিপর্যস্ত এবং আরও আক্রমণের মুখে।[4]

ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারতের নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন যাত্রা গত চারদশকে বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও সম্পর্কিত অসংখ্য ছোট নদী খালবিলকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুকিয়ে গেছে। ভারসাম্যহীন পানি প্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের বিশাল অঞ্চলের কৃষি। সেচের জন্য চাপ বাড়ছে ভ’গর্ভস্থ পানির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল প্রতিবেশগত সংকট তৈরি করছে।

শুধু তাই নয়, পদ্মা নদীর এই ক্ষয় তার সাথে সংযুক্ত নদীগুলোকেও দুর্বল করেছে যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে সুন্দরবন পর্যন্ত। সুন্দরবনের কাছে নদীর প্রবাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লবনাক্ততা বেড়েছে আর তাতে ক্রমাগত ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে পানিনির্ভর বনের জীবন। ফারাক্কার বিষক্রিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গ ও তার আশেপাশেও পড়ছে। একদিকে পানিশূন্যতা অন্যদিকে অসময়ের বন্যা এবং অতিরিক্ত পলি। সম্প্রতি বিহারের মানুষ শাবল নিয়ে মিছিল করেছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেবার দাবিতে।  বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও এই বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাও ভারতের বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীকে থামাতে পারেনি। তাছাড়া ভারতের শাসকদের চিন্তা পদ্ধতিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার বিষয় একেবারেই অনুপস্থিত। মণিপুরে টিপাইমুখ বাঁধের প্রস্তুতি পুরোটাই চলেছে একতরফাভাবে। এখনও এর হুমকি চলে যায়নি। এই বাঁধ বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ নদী মেঘনার জন্য যে বড় হুমকি হবে তা বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন।

ম্যাপ দেখলে দেখা যায় ভারত থেকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর বিভিন্ন স্থানে কাঁটার মতো সব বাঁধ। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ভাটির দেশকে না জানিয়ে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যেভাবে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। গ্রীষ্মে তাই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশাল অঞ্চল পানির অভাবে খা খা করে। তিস্তা নদীর প্রবাহ এখন শতকরা ১০ ভাগে নেমে এসেছে। ফারাক্কা ও গজলডোবা ছাড়াও মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরে কোদলা নদীর উপর বাঁধ, খোয়াই নদীর উপর চাকমা ঘাট বাঁধ, বাংলাবন্ধে মহানন্দা নদীর উপর বাঁধ, গোমতি নদীর উপর মহারানি বাঁধ এবং মুহুরি নদীর উপর কলসী বাঁধসহ আরও ১৫/২০টি অস্থায়ী কাঁচা বাঁধ কার্যকর রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। ভারত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্প অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি ১৪টি নতুন খননকৃত খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের দিকে প্রবাহিত করা হবে। এটি কার্যকর হলে অন্যান্য নদীর সাথে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ নদী যমুনা আক্রান্ত হবে। শুকিয়ে যাবে অধিকাংশ নদী উপনদী।

দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের নদনদী খাল অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে পানি প্রবাহের উপর ৫০ দশক থেকে ধারাবাহিক আক্রমণ এসেছে ‘উন্নয়ন’ নামক বিভিন্ন প্রকল্পের সুবাদে।[5]  এই প্রকল্পগুলি করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থার ঋণের টাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বাঁধসহ নির্মাণমুখি কর্মসূচি হিসেবে। দেখা গেছে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও একপর্যায়ে গিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয়নি, সেচসুবিধা কাজ করেনি এবং সর্বোপরি মূল লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনেও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়ন বা নির্মাণ কাজ প্রধানত বিদেশি ঋণের টাকায় হয়। ফলাফল যাই হোক, ঋণদাতা, কনসালট্যান্ট, ঠিকাদার, আমলা এবং ভুমিদস্যুদের লাভ অনেক। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এখানে শুধু একটি দৃষ্টান্ত দেই।

বড়াল নদী বাংলাদেশের দুই প্রধান নদী পদ্মা এবং যমুনার সংযোগ নদী।  দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০৪ কিলোমিটার, ১২০ মিটার প্রস্থ, এর অববাহিকা ৭৭২ বর্গকিলোমিটার। এর সাথেই চলনবিল। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এই নদীর মুখে স্লুইস গেট, ক্রসড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অন্য প্রকল্পগুলোর মতো এটিও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি প্রবাহ বৃদ্ধি, নৌপথ সম্পসারণ লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম তিনবছর উৎপাদন ভালোই দেখা যায়। এরপরে শুরু হয় বিপর্যয়। ফারাক্কার কারণে এমনিতেই পদ্মা নদীর প্রবাহ কম ছিলো, উপরন্তু বরাল নদীর মুখে স্লুইস গেট বসানোতে পদ্মা থেকে আসা পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। স্রোত কমে যায়, বহু জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা যায়। যমুনায় যেখানে গিয়ে বড়াল গিয়ে মেশে সেখানে পানিপ্রবাহ খুবই নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় যমুনা নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভাঙ্গন বিস্তৃত হয়। অববাহিকার প্রায় ১ কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বড়াল শুকিয়ে যে জমি উঠেছে তা এখন নানাজনের দখলে।[6]

তৃতীয়ত, বিভিন্ন নদীর মরণদশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা সহজ। নদী বাঁচলে তার মূল্য/টাকার অংকে পরিমাপ করা যায় না, কিন্তু মরলে তার থেকে উঠে আসা জমির দাম শত/হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সেজন্যই নদীবিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতে অনেকেই আগ্রহী। খোদ রাজধানীতে বুড়িগঙ্গা, পাশে তুরাগ, বালু নদীর পাশ দিয়ে যাবার সময় এই দৃশ্য আমাদের সবাইকে  জানিয়ে দেয় এই দেশে সরকারের কাজ শুধু দখলদারদের সমর্থন দেয়া, জনপ্রতিরোধের মুখে তাকে রক্ষা করা, নদীদূষণের মাধ্যমে দখলদারদের পথ প্রশস্ত করা।

শুধু নদী বা খালবিল নয়, অপরিকল্পিত প্রকল্প ও দুর্নীতিযুক্ত উন্নয়ন তৎপরতায় ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে। ২০০৬ ও ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক পরিচালিত বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এই সময়ে আশংকাজনক ভাবে নীচে নেমে গেছে। ঢাকার বেশ কয়েকটি নদীতে অক্সিজেন নেই।[7]  সরকারের কেন্দ্রে নদী বিষাক্ত হলে বা লেক দখল হয়ে গেলেও কোনো প্রতিকার দেখা যায় না। কারণ দখলদাররা ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্কিত।[8]

এতোসব বিপর্যয় বাংলাদেশের শাসকদের বা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করেনি। আগের প্রকল্পগুলোর ফলাফল নিয়ে কোনো যথাযথ পর্যালোচনাও নেই। বরং আশি দশকে সমালোচিত ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যান এখন আরও বৃহত্তর আকারে বিপুল ব্যয়বহুল ডেল্টা প্ল্যান নামে সরকার গ্রহণ করেছে।

বন, সুন্দরবনের কথা

‘বঙ্গের দক্ষিণে সাগরকূ’লে যদি বিশাল অরণ্য না থাকিত, তাহা হইলে বঙ্গোপসাগরের মেঘসমূহ উত্তর মুখে দূরে চলিয়া গিয়া হিমালয়ের উপত্যকায় বারিবর্ষণ করিত; তখন দক্ষিণ বঙ্গ বালুকা প্রান্তরে পরিণত হইয়া একপ্রকার মানুষের বাসের অযোগ্য হইয়া পড়িত। এখন যেমন ভাটিরাজ্যের উত্তর হইতে দক্ষিণদিকে অগ্রসর হইতে লাগিলে, প্রথমে পদ্মার প্রবল প্রবাহ, পরে নদীমাতৃক উচ্চদেশে মানুষের বসতি, তাহার পরে মানুষের খাদ্যের জন্য নিম্নতল উর্বর ক্ষেত্রে ধানের প্রাচুর্য এবং সর্বশেষে দুর্ভেদ্য প্রাকারের মত সুন্দরবনের এই নিবিড় জঙ্গলশ্রেণী- এমন দৃশ্য আর দেখা যাইত না। জঙ্গলের জন্য আরও অনেক বিপদ হইতে দেশ রক্ষা হইতেছে। সমুদ্রের জলোচ্ছাস একান্ত প্রবল হইলেও সম্পূর্ণভাবে দেশ ভাসাইতে পারে না; সমুদ্রের ঝটিকাবর্ত বা বায়ুপ্রবাহ বসতিস্থানসমূহ উৎখাত করিতে পারে না।’ [9]

সাধারণভাবে একটি দেশের প্রতিবেশগত ভারসাম্যের জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ভূমি বনে আচ্ছাদিত থাকা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ৭ থেকে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।[10]     বাংলাদেশ সরকারের সর্বশেষ ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যান-এ বলা হয়েছে, ‘সমতলের শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ প্রাকৃতিক শালবন এবং পার্বত্যাঞ্চলের শতকরা মাত্র ১১ ভাগ বন এখনও টিকে আছে আর সেগুলোর অবস্থাও খুবই খারাপ।’ [11]

বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য থেকেই জানা গেছে, ‘দেশে সবচেয়ে বেশি বন উজাড় হয়েছে উচ্চপ্রবৃদ্ধির এই এক দশকেই।..শুধু গাজীপুরেই এক দশকে ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ বনাঞ্চল।’  মন্ত্রণালয়ের ওই তথ্যে আরও বলা হয়েছে, ‘১৯৩০-৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখন্ডে বার্ষিক বন উজাড়ের হার ছিল দশমিক ৭৪ শতাংশ। ১৯৭৫-৮৫ সাল পর্যন্ত বন উজাড় হয় বার্ষিক দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে। ১৯৮৫-৯৫ সালে এ হার খানিকটা কমে দাঁড়ায় দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর থেকে বন উজাড়ের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বন উজাড়ের নিট হার ছিল দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বন উজাড় হয়েছে। এত বেশি হারে বন উজাড়ের ঘটনা এর আগে কোনো দশকেই ঘটেনি।[12]

‘উন্নয়ন’ নামে পুঁজি সংবর্ধনের উন্মাদনার সর্বশেষ শিকার সুন্দরবন, যাকে বলা যায় বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রাকৃতিক বন। এই সুন্দরবনের মোহনায় যত প্রজাতির মাছ আবিষ্কার করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে ইউরোপে তত প্রজাতির মাছ নেই। সুন্দরবনের যে বৃক্ষ এবং লতাগুল্ম, যে জীববৈচিত্র্য তৈরি করেছে সেটাও বিশ্বের গবেষকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের মানুষ ও সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সুন্দরবন বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্ট নানাবিধ প্রকৃতি বিধ্বংসী মুনাফামুখী তৎপরতার কারণে সুন্দরবন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সুন্দরবন এখনো প্রকৃতি-প্রাচীর হিসেবে রক্ষকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। সুন্দরবনে বছর দশেক আগে সিডর যে আঘাত হেনেছে তাকে মোকাবিলা করে সুন্দরবন আবার নিজেকে নতুনভাবে পুনরুৎপাদন করেছে অন্তর্গত শক্তির বলেই।

প্রকৃতির মধ্য থেকে সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা সুন্দরবনের পক্ষে যে সম্ভব সেটা যেমন বারবার প্রমাণিত হয়েছে তেমনি এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের মুনাফা  লোভ সৃষ্ট আঘাত মোকাবিলা করা তার পক্ষে খুবই কঠিন।  মুনাফামুখী তৎপরতায় সেখানকার পানি লবণাক্ত হয়েছে, লবণাক্ত পানি সেখানকার প্রাণবৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনের মধ্যেকার ভারসাম্য বিপন্ন হয়েছে। যে ফুলবাড়ী প্রকল্প উত্তরবঙ্গের পানি আবাদী জমি এবং মানুষ এমন কি দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবনের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছিল, শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটি দিয়ে দেশের কয়লা বিদেশে পাচারের এই প্রকল্পকেই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বলে ঢোল পেটানো হয়েছিলো। জনপ্রতিরোধে তা কার্যকর হয়নি। পরে এসেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ তিন শতাধিক বাণিজ্যিক প্রকল্প দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার যৌথভাবে কার্যত সুন্দরবনের মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করেছে।

লবণ ও মিষ্টি পানির সমন্বিত প্রবাহে, ভূমি ও নদীর সম্মিলিত যোগে সুন্দরবন এক বিশেষ বাস্তুসংস্থান যা বিশ্বে বিরল এবং সেই কারণে প্রাণবৈচিত্রে তার সমাহার অনেক বেশি। পরিবেশদূষণ হ্রাসেও তার ক্ষমতা অনেক। একদিকে তা খুব নাজুক উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে, আবার তা প্রবল শক্তিধর প্রকৃতির দুর্যোগ মোকাবিলায় তার ক্ষমতার কারণে। সেজন্যই বাংলাদেশের সুন্দরবন শুধু এদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক অতুলনীয় সম্পদ। যেহেতু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট এবং বিশ্ব ঐতিহ্য এই সুন্দরবন এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর  হিসেবে কাজ করে সেকারণেই উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ এই সুন্দরবনের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। আমরা সবাই জানি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম বিপদগ্রস্ত দেশ। এই বিপদের মোকাবেলায়ও আমাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন এই সুন্দরবন। তাছাড়া ৩৫-৪০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর উপর নির্ভরশীল। এগুলো বিনষ্ট হলে তাদের উদ্বাস্তু হওয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। আমাদের হিসাবে প্রতিদিনই ঢাকা শহরে ‘উন্নয়ন’-দুর্যোগে বা পরিবেশ উদ্বাস্তু হিসেবে মানুষের ভীড় বাড়ছে। তাঁদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে যদি সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।

সবার জানাকথা আমরা বারবারই বলি যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নাই। সুঁই থেকে রকেট, গণভবন থেকে তাজমহল সবই আমরা বানাতে পারবো, কিন্তু সুন্দরবন আর বানাতে পারবো না। সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প দিয়ে কিছু গোষ্ঠী দ্রুত মুনাফা বানাতে পারবে, বনবিনাশ করে জমি দখল করে টাকার জোয়ার তৈরি করতে পারবে, তাতে জিডিপিও বাড়বে কিন্তু বাংলাদেশ শিকার হবে চিরস্থায়ী বিপর্যয়ের। (নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা ২০১৮)

[1]বাংলাদেশের মতো দেশে‘উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নী সংস্থা ও লুম্পেন কনসালট্যান্টদের আগ্রহ বরাবরই বেশি। কেননা এখানে বাছবিচার, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার কোনো দরকার হয় না। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক জালসহ এসব বিষয়ে বিভিন্ন অনুসন্ধানী লেখার জন্য দেখুন: Salim Rashid: Rotting from the Head, Donors and LDC Corruption, UPL, Dhaka, 2004.

[2]বনবিনাশ ও সামাজিক বনায়নের বিবরণী ও বিশ্লেষণের জন্য দেখুন- ফিলিপ গাইন (সম্পাদিত): বন, বনবিনাশ ও বনবাসীর জীবন সংগ্রাম, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)। ঢাকা, ২০০৪

[3]দেখুন: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: অধিকতর উন্নযনের আগমনধ্বনি’, বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র, শ্রাবণ, ২০০০।

[4]বাংণাদেশের নদী ও পানিসম্পদ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য M Inamul Haque: Water Resources, Anushilon, Dhaka 2008.  মাহবুব সিদ্দিকী: গঙ্গা পদ্মা পদ্মাবতী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৪।

 

[5]বাংলাদেশে নদী বিষয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমস্যা ও বিকল্প নিয়ে বিশ্লেষণের জন্য দেখুন Nazrul Islam: Let the Delta be a Delta, Eastern Academic, Dhaka, 2016

[6]বড়াল নদীর দুর্দশার কারণ ও বরাল উদ্ধার চেষ্টার কাহিনীর জন্য পড়ুন- নথিবদ্ধ বড়াল-তথ্য তত্ত্ব ও সম্ভাবনা, রিভারাইন পিপল ও বড়াল রক্ষা আন্দোলন,  শ্রাবণ, ২০১১।

[7]প্রথম আলো ১১ ডিসেম্বর ২০১৭

[8]প্রথম আলো, ‘২২ একর লেক দখল, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

 

[9]সতীশচন্দ্র মিত্র: যশোহর খুলনার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, দেজ, কলকাতা, পৃ. ২৫৩

 

[10]বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট আয়োজিত ওয়ার্কশপে প্রদত্ত বক্তব্য:  https://www.dhakatribune.com/bangladesh/environment/2018/03/23/experts-bangladeshs-forest-coverage-10

[11]Bangladesh Forest Department: Bangladesh Forestry Master Plan 2017-2036 (Draft Final) December 2016

[12]উদ্ধৃতি: ‘উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনের ক্ষত বাড়াচ্ছে’, বণিকবার্তা, নভেম্বর ৪, ২০১৭।