Home » প্রচ্ছদ কথা » ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ক্রমাগত ভাঙ্গন : সম্পর্কের নতুন মাত্রা আওয়ামী লীগের সঙ্গে

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ক্রমাগত ভাঙ্গন : সম্পর্কের নতুন মাত্রা আওয়ামী লীগের সঙ্গে

জহির উদ্দিন বাবর ::

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একটি প্রভাব বরাবরই ছিল। তারা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে না যেতে পারলেও বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলে অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে এবং নিজেদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য করার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব দলের অবস্থান মূলত; আওয়ামী ও বাম শিবিরের বিপরীতে। তবে জামায়াতসহ কোনকোন দল কৌশল ও নিজেদের অতীত কর্মকান্ডের কারনে মানসিক দূরত্বের আওয়ামী লীগের সাথেও ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তুলেছে। তবে ডানপন্থি বিএনপির সঙ্গে সার্বিকভাবে তাদের সখ্য দীর্ঘদিনের। তবে বামঘেষা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামপন্থিদের দূরত্ব আগের চেয়ে অনেকটা ঘুচে গেছে। বিভিন্ন কারণে ইসলামি দলগুলো আর আগের মতো আওয়ামী বিরোধিতা করে না। আওয়ামী লীগও আর ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে আগের মতো তাদের প্রতিপক্ষ ভাবে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, ‘এককালের বাম ও সেক্যুলার ভাবধারার আওয়ামী লীগে ধর্মভিত্তিক দলের সংখ্যাই বেশি’। বাস্তবতা হলো, ধর্মভিত্তিক শক্তির মূলধারাটি এখনও আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই চলছে। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্টতার নানা কারণে ধর্মভিত্তিক দলের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে ইসলামপন্থিদের একটি বড় অংশ এখনও আওয়ামী লীগ ও বামধারার রাজনীতির প্রতি আগের অবস্থান ও মনোভাব থেকে সরে আসেনি।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যেও আছে নানা ধারা-উপধারা। জামায়াতে ইসলামীকেন্দ্রিক ধারাটি সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ; এখনও মাঠ পর্যায়ে তারাই বেশি শক্তিশালী। যদিও যুদ্ধাপরাধ অপরাধের মামলায় দলের প্রথম সারির নেতাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার পর তাদের আগের সেই অবস্থান আর নেই। চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে দলটির অনুসারীরা। দলটি একটা সময় এদেশে আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন ধরে আছে আওয়ামীবিরোধী শিবিরে। সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও আছে বিএনপি জোটের সঙ্গেই। তবে জামায়াতে ইসলামী নিছক ধর্মভিত্তিক দল নয়, সংসদীয় মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে তাদের সামঞ্জস্য থাকার কারণে তাদেরকে ইসলামি দল হিসেবে মানতে অনেকের আপত্তি আছে।

ইসলামপন্থিদের আরেকটি ধারার সম্পর্ক মাজার ও দরবারকেন্দ্রিক। তারা সাধারণত পীর, খানকা, দরবার, মুরিদ এসবের দ্বারা আবর্তিত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে বরাবরই আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালো। বিশেষ করে গত ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার অন্যতম অংশীদার তারা। জামায়াতে ইসলামী ও কওমিপন্থিরা যেন আওয়ামী লীগের ধারেকাছেও ভিড়তে না পারে এ ব্যাপারে তারা সবসময় তৎপর থাকে।

দেশে ইসলামপন্থিদের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশটি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলেমদের নেতৃত্বে পরিচালিত। দেশের ধর্মীয় অঙ্গন মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন তারাই। সমাজের মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ততটা না থাকলেও প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তাদের আছে। দেশের কয়েক লাখ মসজিদ, হাজার হাজার মাদ্রাসা সরাসরি তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ একটা সম্পর্ক আছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সাধারণ জনগণকে নিজের মতের পক্ষে নাড়া দিতে পারে।

কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রায় দেড়শ বছর ধরে সরকারের কোনো স্বীকৃতি ও হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কয়েক মাস আগে জাতীয় সংসদে কওমি সনদের স্বীকৃতি বিল পাস হওয়ার পর তারা সমাজের মূলধারা সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ঐতিহ্যগত দিক থেকে কওমি আলেমদের মধ্যে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। বৈষয়িক প্রাপ্তির নানা সমীকরণ যুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না এটাই চরম সত্য।

দুই.

দেশে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বেশ কিছু দল রয়েছে। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনেকটা মিল থাকলেও তাদের মধ্যে মতভিন্নত প্রকট। বিভাজন হয়নি, ব্র্যাকেটবন্দি হয়নি – এমন ইসলামি দল খুব কমই আছে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুরের হাত ধরে কওমিপন্থিদের ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আগমন। হাফেজ্জি হুজুরের সেই খেলাফত আন্দোলন থেকে এখন এক ডজনের বেশি দল হয়েছে। দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছে, নেতৃত্বের লড়াই অব্যাহত আছে বছরের পর বছর ধরে। নব্বই দশকের শেষ দিকে সবগুলো ইসলামি দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল ইসলামী ঐক্যজোট। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সেই ইসলামি ঐক্যজোট ভেঙে যায়। এরপর প্রচলিত ধারার স্বার্থের রাজনীতির চর্চা শুরু হয়ে যায় এখানে। কখনও এর সঙ্গে, কখনও ওর সঙ্গে করতে করতে এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলো অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। প্রায় কোনো দলেরই আগের সেই অবস্থান নেই। প্রতিটি দলই একটি সুনির্দিষ্ট গন্ডিতে আবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা খুব একটা নেই। মসজিদ-মাদ্রাসা আর ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের বেশির ভাগ কর্মসূচি। ফলে ইসলামি দলগুলো এখনও এদেশের জনগণের কাছে তাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে পারেনি।

সবশেষ ২০১৩ সালে ইসলামপন্থিদের বড় একটি উত্থান চোখে পড়ে। সেই সময় অনলাইনে ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তির অভিযোগে নাস্তিক ব্লগারদের বিচার দাবিতে চাঙা হয়ে উঠে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। ওই বছরের ৬ জুলাই মতিঝিলে ঐতিহাসিক লংমার্চে তারা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়। অনেকে এটাকে ‘নতুন শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে ঠিক এর এক মাস পর ৫ মে শাপলা চত্বরেই পতন ঘটে হেফাজতের। এরপর আর হেফাজত মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। বিভিন্ন সময় নানা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তা হালে পানি পায়নি। তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই হেফাজতে ইসলাম এখন আর আওয়ামী লীগের শত্রু  নয়, পরম বন্ধু। সংগঠনের আমির ও দেশের সবচেয়ে প্রবীণ আলেম আল্লামা আহমদ শফী নিজেই আওয়ামী লীগের প্রশংসা করেছেন। জাতীয় সংসদে স্বীকৃতি ঘোষণার পর কওমি আলেমরা ঘটা করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথিত শুকরিয়া মাহফিলের নামে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। এর দ্বারা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে। জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই সংবর্ধনা নিজেদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। এর আগে কোনো সরকার প্রধানকে এভাবে সব আলেম একমঞ্চে এসে সংবর্ধনা জানানোর নজির নেই।

শাসক দলের সঙ্গে এভাবে আলেমদের মাখামাখিকে ভালো চোখে দেখছে না খোদ ইসলামপন্থিদের অনেকেই। তবে নানা কারণে কেই সরাসরি বিরোধিতাও করতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে নানা অসন্তোষ ও ক্ষোভ কাজ করলেও কেউ তা প্রকাশের সাহস করছে না। আর নেতৃত্বের আসনে থাকা আলেমরাও নানা কারণে সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে গেছেন। একদিকে প্রলোভন আরেক দিকে নানা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে ঊঠে তারা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারছেন না বলে মনে করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ এটা কৌশল হিসেবে দেখছেন। সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় টিকে থাকার স্বার্থে আলেমরা একটু কৌশলী ভূমিকা নিয়েছেন বলে মনে করেন কেউ কেউ।

তিন.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মভিত্তিক দলগুলোও আছে আলোচনায়। তবে এবারের নির্বাচনে কোনো দলই তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। মার্কাহীন, নিবন্ধনবিহীন জামায়াতে ইসলামীর কথা বাদ দিলে বর্তমানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই নির্বাচনে দলটি তিনশ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। এই নির্বাচনে তারাই একমাত্র ইসলামী দল যারা সব আসনে একক প্রার্থী দিয়েছে। যদিও একটি আসনেও পাস করার মতো অবস্থান গড়ে উঠেনি তাদের। এই দলটির বিরুদ্ধে বরাবরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ করে আসছে অন্যান্য ইসলামি দলগুলো। যদিও এর কোনো ‘‘দালিলিক প্রমাণ’’  নেই ।

তবে একটি বিষয় দৃশ্যমান, অন্যান্য ইসলামি দলকে আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে চরমোনাই পীরের দলকে সেটা মনে করে না। কয়েকটি সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থী তৃতীয় অবস্থান লাভ করে বেশ আলোচনায় আসে। অনেকে মনে করেন, তারা ইসলামপন্থিদের যে ভোট কাটেন তা সাধারণত বিএনপির বাক্সে যাওয়ার কথা ছিল। সরাসরি না হলেও তাদের ভোট কাটা সুবিধা করে দেয় আওয়ামী লীগকে। মূলত এই কারণে আওয়ামী লীগ তাদেরকে অনেকটা আনুকূল্য দেয় বলে কারও কারও ধারণা। যদিও তারা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এই অভিযোগ। অন্যান্য দলের সঙ্গে বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে তারা যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই এটার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করেছে।

মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলাম ঐক্যজোট দীর্ঘ সময় বিএনপি জোটে থাকলেও বছর দুয়েক আগে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনের আগে ইসলামী ঐক্যজোট নৌকায় চড়ছে বলে জোর প্রচারণা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় তারা নৌকা পায়নি। পরে কয়েকটি আসনে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। যদিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও খুবই মধুর। তাদেরকে নির্বাচনী খরচসহ নানা সুবিধা আওয়ামী লীগ দিচ্ছে বলে কানাঘুষা আছে। তবে তাদেরকে জোরে বা কৌশলে বিএনপি জোট থেকে বের করতে পারাই আওয়ামী লীগের বড় সাফল্য। তবে মুফতি আমিনীর জীবদ্দশায় তাকে নানাভাবে চেষ্টা করেও নত করা যায়নি। নিঃসন্দেহে এটা তাদের কৃতিত্ব। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামি ঐক্যজোটকে বিএনপি জোট থেকে বের করলেও একটি ভগ্নাংশ এখনও রয়ে গেছে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে। যদিও অ্যাডভোকেট আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন অংশটির কার্যক্রম খুব একটা নেই।

শায়খুল হাদিস আল্লাম আজিজুল হকের দল খেলাফত মজলিস ভেঙে যায় তার জীবদ্দশায়ই। দুই ভাগে বিভক্ত খেলাফত মজলিসের যে অংশটির সঙ্গে শায়খুল হাদিসের পরিবারের সম্পৃক্ততা আছে তারা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে নিবন্ধন পায়। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করে এই দলটি আলোচনায় আসে। যদিও এক-এগারোর পর সেই চুক্তি কার্যকারিতা পায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের নৌকা প্রতীকে ভোটও করা হয়নি। সেই দলটি চলতি বছর নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জোট হলেও চরমভাবে হতাশ হয় দলটি। জাতীয় পার্টি যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের ভাগ-ভাটোয়ারা মেটাতে হিমশিম খেয়েছে সেখানে শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য কিছুই করতে পারেনি। এখন হাতে গোনা কয়েকটি আসনে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে কোনোরকম মুখরক্ষা করেছে দলটি। শায়খুল হাদিসের ইন্তেকালের পর দলটির আভ্যন্তরীণ অবস্থা তেমন ভালো নয়। শায়খুল হাদিসের পরিবারের বলয়ে কোনোরকম টিকে আছে।

শুধু ‘খেলাফত মজলিস’ নামে নিবন্ধন পাওয়া দলটির নেতৃত্বে আছেন মাওলানা ইসহাক ও আহমদ আবদুল কাদের। দলটি এখনও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে। এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তারা হবিগঞ্জের দুটি আসন পেয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসন দুটিতে তাদের পাস করে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।  এই দলটিতে জামায়াতে ইসলামীর কিছুটা ছায়া আছে। এই দলের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের একসময় ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। যদিও পরে জামায়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং তিনি হাফেজ্জি হুজুরের তওবার রাজনীতির মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন।

২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। প্রাচীন এই দলটি এখন দুই অংশে বিভক্ত। একটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা আবদুল মুমিন। তবে বয়োবৃদ্ধ এই আলেম ততটা পরিচিত নন। সামনে রয়েছেন মহাসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমি। মূলত মাওলানা কাসেমির নামেই পরিচিত এই অংশটি। অপর অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। তিনি এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চারদলীয় জোট সরকারের সাংসদ ছিলেন। এবারের নির্বাচনেও তিনি যশোরের একটি আসন থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এবারের নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দুই অংশ মিলে বিএনপির কাছ থেকে তিনটি আসন পেয়েছে। অন্তত দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসার সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

হাফেজ্জি হুজুরের হাতেগড়া খেলাফত আন্দোলন এখন আছে অনেকটা করুণ অবস্থায়। এই দলটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর উপকণ্ঠ কামরাঙ্গীচরে নুরিয়া মাদ্রাসার বাইরে তাদের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। হাফেজ্জি হুজুরের পরিবারের সদস্যদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই মূলত দলের এই করুণ দশা। অন্যদিকে অনেক প্রাচীন দল নেজামে ইসলামের অবস্থাও হ-য-ব-র-ল। দলটি যে কয়টি অংশে বিভক্ত খুঁজে বের করাও মুশকিল। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম, আরেকটি অংশের নেতৃত্বে মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, তিনি আবার ইসলামী ঐক্যজোটেরও চেয়ারম্যান। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন অ্যাডভোকেট আবদুর রকিব। একসময় মিসবাহুর রহমান চৌধুরী একটি অংশের নেতৃত্বের দাবি করলেও তিনি এখন ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত। এছাড়া মাওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য আন্দোলন একসময় আলোচনায় থাকলেও এখন তেমন কোনো কার্যক্রম নেই দলটির। এ ধরনের আরও কিছু দল তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এসবের কোনো প্রভাব আমাদের সমাজ বা রাজনীতিতে খুব একটা নেই।

চার.

মূলত ইসলামি দলগুলোর এই ভঙ্গুর অবস্থার জন্য দায়ী পরিকল্পনাহীনতা। তারা কী করতে চায়, কোন পথ ধরে এগুতে চায়, আর এর জন্য কী করতে হবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো ছক নেই ইসলামি দলগুলোর। গতানুগতিক ধারায় চলছে দল ও রাজনীতি। দলগুলোর গঠনতন্ত্র থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা অনুসরণ করা হয় না। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক ব্যক্তি, পরিবার বা বলয়েই চলছে দল। এখানে তাদের কথাই মুখ্য; গঠনতন্ত্রের কোনো মূল্য নেই। ব্যক্তি ও পরিবার পূজা ইসলামি দলগুলোর বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামি রাজনীতি এখনও পরিচালিত হয় মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। বেশির ভাগ দলেরই মূল জনশক্তি কোনো না কোনো মাদ্রাাসা। সারা দেশ থেকে নানা মত ও পথের মানুষের সন্তানেরা রাজধানীর মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে আসে। কিন্তু মাদ্রাসাটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বলয়ে হলে ওই ছাত্রটিকেও বাধ্যতামূলক এই দলটির কর্মী হয়ে যেতে হয়। কোনো ইস্যুতে মিটিং-মিছিলের প্রয়োজন হলে তাকে নামতে হয় রাজপথে। ওই দলটির মূল জনশক্তি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তারা কেউ বুঝে আবার কেউ বাধ্যতামূলকভাবে দলীয় কর্মী হয়ে মাদ্রাসা পরিচালক বা কর্তৃপক্ষের রাজনীতির হাতিয়ার হন। এর বাইরে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর নেই তেমন কোনো প্রভাব। কেউ কেউ পীর হিসেবে মুরিদদেরও দলীয় কর্মী মনে করেন। কিন্তু নির্বাচনের সময় ওই মুরিদেরাও দলকে ভোট দেয় না।

সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর তেমন কোনো যোগসূত্রতা নেই। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদারও হয় না ইসলামি দলগুলো। শুধু ধর্মীয় কোনো ইস্যু তৈরি হলেই ইসলামি দলগুলো সরব হয়। অন্যথায় তেমন কোনো কার্যক্রমই থাকে না এ দলগুলোর। সাধারণ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক নানা সমস্যার ব্যাপারে মাথা ঘামান না ইসলামি দলের নেতারা। ইসলাম সম্পর্কে কেউ কটূক্তি করলে ইসলামি দলগুলো বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেটা দেখা যায় না জাতীয় কোনো ইস্যুতে। এসব কারণে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব দিন দিন কমে আসছে। এক সময় দেশের শীর্ষ আলেমরা ইসলামি দলগুলোর নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু এখন এসব দলে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে নেতৃত্ব সংকট। তাছাড়া নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে বারবার আপস করায় ইসলামি দলগুলোর ভেতরেই তৈরি হয়েছে সংকট। তাদের নিজেদের কর্মী সংখ্যা তেমন বাড়ছে না, বরং উল্টো দলীয় কর্মীরা নানা কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। সবমিলিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।