Home » অর্থনীতি » ৭১ এর শক্তি

৭১ এর শক্তি

আনু মুহাম্মদ ::

‘‘আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়’’

নির্বাচনের হট্টগোলের মধ্যেও বিজয় দিবসের ডাক আসে, প্রশ্ন আসে, আনন্দ বেদনার সাথে আসে ক্ষোভ। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে দানবীয় অপশক্তির ভয়ংকর থাবার মধ্যে, নির্যাতন ও প্রতিরোধের যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এইদেশের মানুষ গেছেন, তা যারা দেখেননি তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন। সেই অভিজ্ঞতা এই জনপদের সেইসময়ের ও পরবর্তী সকল প্রজন্মের জন্য অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের ভয়ংকর কারাগার থেকে মুক্ত হবার আনন্দ নিয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে এসেছিল নতুন করে শ্বাস নেবার দিন। বেদনার পাহাড় বুকে নিয়েও মানুষের তখন অনেক স্বপ্ন।

কিন্তু এরপর থেকে একে একে দুমড়ে মুচড়ে যায় তার অনেককিছু। সবকিছু দখলে চলে যেতে থাকে ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠীর হাতে, তৈরি হয় লুটেরা কোটিপতি, স্বৈরশাসন আসে নানা রূপে। যুদ্ধাপরাধীদের দল আসে, ব্যবসা হয়, ক্ষমতা হয়, গাড়ি হয়,- তাতে উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। সাম্রাজ্যবাদ নতুন করে খুঁটি বসায়। তাই সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীপুরুষের ওপর শোষণ নির্যাতন চলতে থাকে। অসম্পূর্ণ বিজয়ের পর একেকটা পরাজয় জমতে থাকে।

এই বিজয় দিবসে আমাদের সামনে ত্বকী, সাগর-রুনী, তনু, মিতুর লাশ, রামুর বিধ্বস্ত জনপদ, ভাঙাচোরা বুদ্ধের শরীর, গোবিন্দগঞ্জের গুলিবিদ্ধ আগুনে পোড়া মানুষের হাহাকার, নাসিরনগর সাঁথিয়াসহ বহু অঞ্চলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত মুখ, পার্বত্য চট্টগ্রামে উজাড় পাহাড় আর সহিংসতায় বিপন্ন মানুষ ও প্রকৃতি। আমাদের সামনে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত – গুম হয়ে যাওয়া হাজার মানুষ। আসে শত হাজার নিহত শ্রমিকের মুখ। নিপীড়িত কিশোর ও তরুণেরা। জীবন্ত কবরে সহস্রাধিক, কয়লা হয়ে যাওয়া শতাধিক শ্রমিকের শরীর। সড়কে লঞ্চে হাজার হাজার মানুষ। কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়, লোভের খুন। আমাদের চোখের সামনে বিশ্বজিতের বিস্ময়, চিৎকার আর রক্তাক্ত দেহের ছায়া। পুলিশের সামনে দলবদ্ধ হয়ে একজন নিরীহ অচেনা তরুণকে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা। নদী দূষণ ও দখল, পাহাড় বন উজাড় আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন বর্তমান সময়ের উন্নয়ন যাত্রার প্রধান চিহ্ন। সমুদ্রের ব্লক নিয়ে আত্মঘাতী তৎপরতা চলছে। বিশেষজ্ঞ মত, জনমত অগ্রাহ্য করে সুন্দরবন বিনাশীবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা বাণিজ্যিক বনগ্রাসী ভূমিগ্রাসী তৎপরতাও চলতে পারছে। চলতে পারছে দেশবিনাশী রূপপুর প্রকল্পের কাজ।

গত ৪৭ বছরে দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন এখনও মানুষের হয়নি। এখন অর্থনীতি ধরে রেখেছেন দেশের গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক আর কৃষকেরা। দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকেরা জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেশে বছরে আনেন প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এই প্রবাহ না থাকলে লুটেরাদের দাপটে অনেক আগেই ধ্বস নামতো অর্থনীতিতে। আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়। এর জন্য তো মানুষ অসম্ভব সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে জীবন দিয়ে বাংলাদেশ আনেনি। অথচ এর মধ্যেই এখন আমরা ‘আছি’। দুর্নীতি দখলদারিত্ব, নানা অগণতান্ত্রিক আইনী বেআইনী তৎপরতা, সন্ত্রাস-টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি বিস্তারের সুবিধাভোগী খুবই নগণ্য কিন্তু তারাই ক্ষমতাবান।

যাদের ২৪ ঘন্টা রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিপালিত নানা বাহিনীর পাহারায় কাটে তারা ছাড়া বাকি কারও তাই আতংক আর কাটে না। নিজের ও স্বজনের জীবন নিয়ে, পথের নিরাপত্তা নিয়ে, জিনিষপত্রের দাম, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠা দিনরাত। উদ্বেগ উৎকন্ঠা নির্বাচন নিয়েও। সবচাইতে বড় ভয়, দিনের পর দিন সবকিছুতে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা এখন এমনই যে, মানুষের জন্য মানুষের শোক, আতংক কিংবা উদ্বেগ নিয়েও একটু স্থির হয়ে বসা যায় না। নতুন আরেক আঘাত পুরনো শোক বা আতংককে ছাড়িয়ে যায়। টিভি বা সংবাদপত্রেরও ঠাঁই নাই সবগুলোকে জায়গা দেবার, কিংবা লেগে থাকার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুইদল বা জোটের সংঘাত কখনোই জমিদারী লড়াই এর চরিত্র থেকে বের হতে পারেনি। যে অংশ ক্ষমতায় থাকে তাদের ইচ্ছা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেবার। তাই একপর্যায়ে বিরোধ চরমে ওঠে। আফ্রিকার দেশগুলোর মতো এদেশে গোত্র বা এথনিক সংঘাতের অবস্থা নাই। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপি লড়াই যেনো তার স্থানই পূরণ করতে যাচ্ছে, রাজনৈতিক বৈরীতা ও সংঘাত নিয়েছে ট্রাইবাল বৈরীতা ও সংঘাতের রূপ। আসলে দলের ব্যানার দেখে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে ব্যানারের পেছনে দাঁড়ানো লুটেরা, দখলদার ও কমিশনভোগীদের। দলের ব্যানার আসলে ব্যবহৃত হয় তাদের মুখ ঢাকার জন্য। মানুষ দল দিয়ে বিচার করে, দলের উপর ভরসা করে, দলের উপর বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, ক্ষোভে-দুঃখে চিৎকার করে। দল আসে যায়, আসে যাবে। কিন্তু কমিশনভোগী, দখলদার, লুটেরাদের কোন পরিবর্তন হয় না। তাদের শক্তি ও অবস্থান আরও জোরদার হয়।

প্রক্রিয়া যদি একই থাকে ক্ষুধা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেট তো ভরতে হবে। তাই এইভাবে চলতে চলতে মাঠ, গাছ, বন, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, নালা, খালবিল সব হজম হতে থাকে। ক আর খ এর  যখন যার সুযোগ আসে। কখনও প্রতিযোগিতা কখনও সহযোগিতা। কখনও ঐক্য কখনও সংঘাত। দখল, কমিশনের উপর দাঁড়ানো বিত্ত বৈভব শানশওকতে শহরের কিছু কিছু স্থান ঝলমল করতে থাকে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন সেলিম আল দীনের ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’  নাটক। সবকিছুই ছিলো প্রধান চরিত্র মুনতাসিরের খাদ্য। তার ক্ষুধার কোন শেষ নাই। আমাদের দেশে একের পর এক শাসক গোষ্ঠী একজনের থেকে অন্যজন আরও বেশি ‘মুনতাসির’। ক্ষমতাবানরা যখন এভাবে নিজের অর্থনীতি তৈরি করেন তখন রাজনীতি কেন জমিদারী থেকে আলাদা হবে? আমাদেরই বা সদা আতংক ছাড়া আর কী পাবার আছে?

সেজন্য গুম, খুন, ক্রসফায়ার, উর্দিপরা বা উর্দিছাড়া লোকজনদের ডাকাতি চাঁদাবাজী, কৃত্রিম কিংবা উস্কে তোলা রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা, দখল, দুর্নীতি এই সবকিছু নিয়ে মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসুস্থতার কালে পর্দার আড়ালে আরও অনেককিছু হয়ে যেতে থাকে। সহিংসতা বা অস্থিরতায় শতকরা ১ ভাগের হাতে আরও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে কোনো বাধা নেই। পাহাড় নদী বন দখলকাজে কোন সমস্যা নেই। দেশের সমুদ্র, সম্পদ, অর্থনীতিতে দেশি বিদেশি লুটেরাদের আধিপত্য বৃদ্ধির আয়োজনে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।নির্বাচনের হট্টগোলের আড়ালেও এইসব অপকর্ম চলতে থাকে।

এই অবস্থায় তাহলে কী হবে বাংলাদেশের? দুই জমিদার বা দুই ডাইনাস্টির আড়ালে, চোরাই টাকার মালিক সন্ত্রাসী প্রতারক দখলদার ব্যাংক লুটেরা আর কমিশনভোগীদের হাতে, নিজেদের সর্বনাশ দেখতেই থাকবে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ? তাহলে কী আর কোন উপায় নেই? শক্তিশালী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের দরবারে এই বলয়ের বাইরে আলোচনারও সুযোগ কম। নিপীড়নের খড়গ সর্বত্র। ভিন্নস্বর ভিন্নসত্য ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মানুষের চিন্তার সুযোগও সংকুচিত হতে থাকে। ফলে জনগণের মধ্যে এক অসহায়ত্বের বোধ প্রায় স্থায়ীরূপ নেয়।

এসব দেখে বারবার প্রশ্ন আসে, তাহলে কি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অগণিত নারী পুরষের অসম্ভব সাহস ও লড়াই-এর অভিজ্ঞতা বৃথা? না। ১৯৭১ এর সেই সাহস এখনও আমাদের শক্তি। এই শক্তি নিয়েই যুদ্ধাপরাধী ও লুটেরাশক্তির, দখলদার ও জমিদারদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক প্রভাব অতিক্রম করে জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। নিষ্ক্রিয়, আচ্ছন্ন আর সন্ত্রস্ত জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বোধ বিকশিত হওয়া ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আচ্ছন্নতা আর ভয় থেকে মুক্ত হলে, নিজেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হলে, জনগণ তার অন্তর্গত বিশাল শক্তিও অনুভব করতে সক্ষম হবে। তখন সম্ভব হবে পথের সন্ধান পাওয়া, সম্ভব হবে তার রাজনীতির বিকাশে স্বাধীন পথ গ্রহণ।

বারবার ৭১ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মানুষ, তা সে শারীরিকভাবে যতই দুর্বল অপুষ্ট হোক, জাগ্রত হলে যে কোনো দেশি বিদেশি দানবের মোকাবিলা করতে তারা সক্ষম। সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসন, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন লড়াই-এ জনগণের শক্তির স্ফুরণ তারই বহিপ্রকাশ। তাই শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশের প্রতারণামূলক বাগাড়ম্বরের মধ্যে নয়, শোষণ বৈষম্য নিপীড়ন আধিপত্য বিরোধী সকল লড়াই-এর মধ্যেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত। আত্নসমর্পণ আর পরাজয়ের বিপরীতে তার অবস্থান। চোরাই টাকা, প্রতারণা, বাগাড়ম্বর আর রক্তচক্ষু দ্বারা পরিচালিত নির্বাচনের মধ্যে পথ হারালে চলবে না। কারণ মানুষ যখন নিজের ভেতরে মুক্ত হয়, তখনই তার মুক্তির পথ তৈরি হয়।