Home » প্রচ্ছদ কথা » ভোটটি দিতে পারা না পারার শঙ্কা-উদ্বেগ

ভোটটি দিতে পারা না পারার শঙ্কা-উদ্বেগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

মাও সে তুং যেমনটি বলেছিলেন-“যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি, আর রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ”– সে বিবেচনায় গত সাতচল্লিশ বছরই কী কাটলো যুদ্ধের মধ্যে? কারন কি এই যে, গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেললে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি রাজনীতি আর নাগরিকদের মিত্র থাকে না? বিশেষ করে দুর্বল নাগরিকদের সাথে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। সেজন্যই রাজনীতিতে কেবল অভিগম্যতা সেই সব নাগরিকদের বা পরিবারের, যারা সবল অর্থে-বিত্তে ও বংশ মর্যাদায়। দুর্বলরা কেবলই রক্তপাতময়তার বলি।

এক. বিজয়ের মাস এবং শীতের আমেজ- সব ছাপিয়ে উঠেছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সর্বত্র আলোচনার বিষয় এখন একটি। খানিকটা আশা-আশঙ্কা অথবা নিস্পৃহতার দোলাচল। নির্বাচন হবে? হলে সুষ্ঠ হবে? জনমনে এই গুঞ্জরণ ও ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত আলোচনা ক্রমশ আকার নিচ্ছে। কারন হচ্ছে, অতীত তিক্ত এবং রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। সাতচল্লিশ বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে সারাটা কাল জুড়ে ছিল রক্তপাতময়-সহিংস এবং নিয়ন্ত্রিত।

জনগনের অভিজ্ঞতা বলছে, কোন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, এই দেশে অমন নির্বাচন কখনই সুষ্ঠ হয় না। অতীতে কখনও হয়নি। সামরিক সরকারগুলোর আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলি ছিল চরম প্রহসন ও সামরিক স্বৈরাচারের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার মহড়া। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে আওয়ামী লীগ খন্দকার মোশতাকসহ কয়েকজন নেতাকে জেতাতে নিজেরাই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, যার ছিল সূদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিল থেকে শুরু করে প্রচারনাকালে ইতিমধ্যে খুন হয়েছে অনধিক ১০ জন। কোন দলের সেটি বড় প্রশ্ন নয়, তারা সবাই আদম সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী। এই হানাহানির মূল কারন হচ্ছে, নির্বাচনী মাঠটি মোটেই সমতল নয়। ক্ষমতাসীন দলের জন্য যতটা মসৃন, বিরোধী দলের জন্য ততটাই এবড়ো-থেবড়ো। এজন্য বড় দুই দল বা জোটের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমেই হয় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন না হয় হামলা করছেন, ক্রমশ: হয়ে উঠছেন সহিংস।

হামলায় শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী প্রার্থী- সমর্থকরা এগিয়ে। তাই বলে ক্ষমতাসীনরা এর শিকার হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। মোট কথা একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশজুড়ে। জাতীয় সংসদ বহাল, এমপি পদে বহাল থেকে এক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন, অন্যদিকে রয়েছেন মামলার বোঝায় ন্যূব্জ ও তাড়া খাওয়া প্রার্থীরা। তাদের জন্য মাঠটি অবতল। যেমনটি ঘটেছে গত বুধবার, নির্বাচনী প্রচারকালে একজন প্রার্থীকে পূর্বাপর মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকছে।

দুই. এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’। খোদ সিইসি সেটি প্রকাশ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে ঠেকলে তাঁকে ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’ হতে হচ্ছে। এর আগে আমরা আদালতকে ‘বিব্রত’ হতে দেখেছি। সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন, মামলাটি অন্য আদালতে স্থানান্তর করে। কিন্তু সিইসি’র ‘বিব্রত’ হওয়া নিয়ে কি হবে? তিনি শুধু ‘বিব্রত’ হয়েই থাকবেন নাকি রেফারীর ভূমিকায় শক্ত অবস্থান নিয়ে ‘হলুদ কার্ড’ এবং ‘লাল কার্ড’ ব্যবহার করা শুরু করবেন? অথবা বিব্রত হবেন এবং নিরপেক্ষতার নামে পক্ষাবলম্বন করবেন? তাদের এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশ এবং সুষ্ঠ নির্বাচন।

নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে- সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ সরকারের অনুকূলেই থাকবে-জনমনের এই ধারনা কমিশন দুর করতে সক্ষম হবেন কী ? সম্ভাবনা ক্ষীণ। নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সাহসী হতে পারবেন, সেটি দেখার জন্যও কি হাতে সময় আছে? বিগত ইউপি নির্বাচনে দেশ দেখেছে হত্যাকান্ড, সন্ত্রাস ও লাগামহীন জাল ভোট। তার আগের উপজেলা নির্বাচন ! সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে জনগন কখনই দেখেনি। এমনকি সক্রিয় হতেও না। বরং ধামাচাপা দিতে অতীতকালের ধারাবাহিক রেকর্ডটি বাজিয়েছে-“দু’একটি ঘটনা বাদে নির্বাচন মোটামুটি অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহনযোগ্য হয়েছে”। মাত্র ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনসমূহের নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়টিও ধামাচাপা দেয়া হয়েছে পুরোনো কায়দাই। এর ফলে সাধারন ভোটাররা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কিত এটা ভেবে যে,  তার ভোটটি দিতে পারবেন তো ?

এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরুতেই অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে আরেকরকম সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজমান ছিল। অন্যদলের চেয়ে নিজ দলের ভেতরকার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল বেশি। সেটি দুই বড় দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের মধ্যে ঘটেছে এবং নিহত হয়েছে আধা ডজন দলীয় নেতা-কর্মী। একটি দলের চেয়ারপার্সনের অফিস ভাংচুর হয়েছে। নেতা-কর্মীরা অবরুদ্ধ করেছে দলের মহাসচিবকে। এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে দেয়া প্রার্থীকে ঘোষণা করেছে অবাঞ্ছিত। এসবই নির্বাচনী শঙ্কায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দেশী পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আস্থাহীনতা এবং কমিশনের প্রতি ধোঁয়াশা- অদ্ভুত এক পরিস্থিতি তৈরী করছে। জনগনের বিশ্বাস প্রায় উঠে যাচ্ছে যে, নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। দেখে-শুনে এই দেশের জনগনের মধ্যে অদ্ভুত একটি ধারনা গড়ে উঠছে যে, সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে এবং বিদেশীরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়! মনে করা হয়, তারা কারো প্রতি পক্ষপাত করে না। কিন্ত সেনাসদস্যদের মাঠে নামানোর তারিখ ১৫’র বদলে ২৪ ডিসেম্বর পেছানোয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ।

ক্ষমতায় থেকে গড়ে-বেড়ে ওঠা বিএনপি কম-বেশি একযুগ ক্ষমতার বাইরে। দমন-পীড়নে পিষ্ট। দলীয় চেয়ারপারসন দন্ডিত হয়ে জেলে। তার ডেপুটি ও পুত্রও দন্ডিত এবং বিদেশে অবস্থানরত। তাদের এমত প্রতীতি রয়েছে যে, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন। তাদের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোটে তারা জিতে যাবেন। এটি ধরে নিয়ে নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা। এজন্যই, তাদের ভাষায় সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য তারা মরিয়া। এই মরিয়া ভাব বজায় রেখে তারা কি কৌশল নেবেন, সেটিও দেখার বিষয়।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দলের ন্যায্যতা ও সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা হচ্ছে সংবিধানিক প্রথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব দেশে এটি করা হয় না ঠিক, কিন্তু ওয়েষ্ট মিনিষ্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে এটি প্রথা ও পালনীয় হিসেবে স্বীকৃত। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়াটাই ‘সঠিক অভ্যাস’ বলে মনে করা হয়। যে যাই বলুক, এখানে সংসদ ও মন্ত্রীসভা বহাল রয়েছে- তার সুবিধা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই যাবে।

জনমনে যে বিষয়গুলি হামেশাই ঘুরে-ফিরে আসছে তা হচ্ছে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষ নেবে। আবার দু’চারজন বিশ্বাস করছেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন নির্বাাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। সেজন্য অন্তিমে একটি ভাল নির্বাচন দেখা যাবে। সাম্প্রতিক নজিরগুলো এই বক্তব্যের পক্ষে যায় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সন্ত্রাস ও দখলবাজির এন্তার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টদের বাড়ি তল্লাশিসহ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ ছিল।

এবারের আশঙ্কা, “গায়েবী” মামলার। যে কেউ আসামী হয়ে গ্রেফতার হতে পারে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে এসব আশঙ্কা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়েছে। যদিও মামলা-গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অতীতের মত পক্ষ হয়ে এসব অভিযোগ খন্ডণ করবেন, এমনটি আশা করা হচ্ছে না। এরই প্রতিফলন হিসেবে কি নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ হতে শুরু করেছেন? দেখার বিষয়, ‘বিব্রত’ হওয়ার পরে তাঁরা এর প্রতিকারে কি ধরনের কৌশল গ্রহন করেন?

নির্বাচনকে ঘিরে এরকম শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলাচলে সরকার মনে করছে, এগুলি কেবলই বিরোধী দলের অপপ্রচার। সরকারের নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময়মত নির্বাচন হবে। সহিংসতা মোকাবেলা করার কথাও বলছেন। অথচ দিয়েছিলেন লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি । এমনকি ইভিএম ‘ম্যানিপুলেট’ না করার নিশ্চয়তা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কথা। সরকার ও ক্ষমতাসীন মহল আকছার দাবি করে আসছেন, সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন তারা।

বাস্তবতা কি? বিরোধী দল ও জোট বলছে, এসব প্রতিশ্রুতিই সরকারের কৌশল। নির্বাচনকে নিজেদের মতো করার যে কোন সক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারন অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, নির্বাচন এগিয়ে এলে রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি বইয়ে দেন এবং এর অধিকাংশ যে কথার কথা তা জানা হয়ে গেছে। উদাহরন, গত সিটি নির্বাচনে প্রায় সকল মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হলে ‘সিটি গভার্ণমেন্ট’ চালু করার কথা ইশতেহারে ও মুখে বলেছেন।

এরকম অবাস্তব এবং আকাশচারী সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা জনগনের ভোট নিতে চান। কারন রাজনীতিবিদ, অর্থে-বিত্তে প্রতাপশালী এবং কথিত সুশীল সমাজের কাছে জনগন এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছে বলে ধারনা পোষণ করে থাকেন। কারণ, এদের প্রত্যেকেরই দল, সংঘ-সমিতি রয়েছে। কিন্তু এদেশে কেবল সাধারন মানুষের কোন দল নেই-ঠাঁইও নেই। নেই আপাত: কোন সংঘবদ্ধতা।