Home » বিশেষ নিবন্ধ » ‘অনিশ্চয়তা, ভয়ভীতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি গড়ে উঠুক’

‘অনিশ্চয়তা, ভয়ভীতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি গড়ে উঠুক’

নির্বাচনে জনগণের ঢল নামুক । ভোটকেন্দ্র হোক ভোটারের

নাগরিকদের পক্ষে আমরা নামে একটি নাগরিক সংগঠনের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য-

গণতান্ত্রিক সমাজ এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। বিশ্বের বহুদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও বাংলাদেশে তা এখনও একটি প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু আসন্ন নির্বাচন কেমন হবে, আদৌ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে কিনা কিংবা তা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কিনাজনমনে তা নিয়ে বিরাজ করছে প্রবল সংশয় এবং অবিশ্বাস। উৎসবের পরিবর্তে আতঙ্ক আর উদ্বেগ ঘিরে রেখেছে মানুষকে।

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। এর আগেও বাংলাদেশ এরকম ভোটারবিহীন অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখেছে আরও দুবার: ১৯৮৮ সালে, এরশাদ শাসনামলে এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপি আমলে। তবে পার্থক্য হলো এই যে, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ এর (১৫ই ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ ক্ষণস্থায়ী হলেও বর্তমান সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করেছে।

নানা প্রতিকূলতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও সকল দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করবার পথে একটি ভালো খবর। কিন্তু নির্বাচনী প্রচার শুরু হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ক্ষমতাসীন দল ও জোটের বাইরে বিভিন্ন দল ও জোটের প্রার্থীরা হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নিকট অতীতে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে, ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে, জনগণের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আড়িপাতা হয়েছে এবং প্রোপাগান্ডার ঢংয়ে তাকে মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মতপ্রকাশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করবার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনী ও বেআইনী পথ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভয়ের শাসন। ক্ষেত্রবিশেষে এমন দমনপীড়নের নজির কুখ্যাত সামরিক শাসনামলেও বাংলাদেশে কমই দেখা গেছে। যখন একটা সমাজে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একরকম হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে, তখনই আমরা উপলব্ধি করি, কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জারি থাকাটা কতোটা মূল্যবান। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছি।

আমরা জানি যে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবল ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন হলেই তাতে জনগণের সত্যিকারের মুক্তি আসবে এমন নয়। নব্বইয়ের গণআন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশ তার সাক্ষী হয়ে আছে। চোরাই টাকা, পেশী শক্তি আর মাস্তানতন্ত্রের কাছে, দেশি বিদেশি লুটেরা শক্তির কাছে নতজানু দলের শাসন তথা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের অবসান যতদিন না ঘটবে, ততদিন জনগণের প্রান্তিক অবস্থার কোনো বদল হবেনা। সে অর্থে আসন্ন নির্বাচন আমাদের জন্য আশু কোনো সুদিনের বার্তা বয়ে আনবে এতোটা প্রত্যাশা করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থাকা, জনমতের তোয়াক্কা না করা রাজনীতিবিদরা অন্তত একবার জনগণের সামনে এসে দাঁড়াক সেটা এই মূহুর্তে দেশের সকল মানুষের ন্যূনতম চাওয়া।

একথা সত্য যে, একটানা একদলের শাসনের অধীনে থাকতে থাকতে, দমনপীড়ন ও ভয়ের রাজত্বে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে জনমানুষের আশাবাদের জায়গাটা ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়েছে। সরকার মুখে যা-ই বলুক না কেন, জনগণের একটা বড় অংশের মধ্যে এই অবিশ্বাস খুঁটি গেঁড়ে বসেছে যে নির্বাচনটি সরকারের সাজানো ছক অনুযায়ী-ই হবে। তাঁরা এও আশঙ্কা করেন যে, এই সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নানা নির্বাচনের মতো এখানেও তাঁদের ভোটটি অন্য কেউ দিয়ে দেবে। নির্বাচনের দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে এইসব আশঙ্কা ক্রমশঃ জোরদার হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভূমিকা, সরকারের মন্ত্রী, দলীয় নেতাদের কথাবার্তা অনিশ্চয়তার বাতাবরণকে লঘু করেনা, বরং ভীতি আরো বাড়ে। মিডিয়াতে খবর এলো যে প্রধানমন্ত্রী রিটার্নিং অফিসারদেরকে ডেকে কথা বলেছেন। টেলিভিশনে ‘উন্নয়ন’ কার্যক্রমের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে সকাল-বিকাল। অন্যদিকে সরকারী দল/জোটের বাইরে বিভিন্নপ্রার্থীর প্রচারকাজে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বাধা, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শনের খবর পাচ্ছি, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, ফেস্টুনে আগুন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচার শুরুর মুখেই সংঘটিত সহিংসতায় প্রাণহানীর খবরে আমরা যুগপৎ শঙ্কিত এবং মর্মাহত হয়েছি। এসবকিছু দেখে শুনে এই ধারণাই মানুষের মনে পোক্ত হয় যে নির্বাচন কমিশন সংবিধানের কাছে নয় সরকারের কাছেই অধিকতর দায়বদ্ধ; কমিশনাররা স্বাধীনভাবে কাজ না করে অনেকক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবাহীর মতো আচরণ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দিহান হবে, এটাই স্বাভাবিক। বিরাজমান বাস্তবতায় এটা মনে করবার যথেষ্ট কারণ আছে যে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›দ্বীদলগুলোর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির কথাটা একটা ফাঁকাবুলিতে পর্যবসিত হয়েছে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমরা কিছু জরুরি দাবি সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত করা দায়িত্ব বলে মনে করছি। এগুলো হলো :-

১.       নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের অবশিষ্ট সময়টুকুতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্ত প্রশাসন যাতে করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে;

২.       স্বাধীনভাবে দেশি এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে;

৩.       হামলা, মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এসবে জড়িত ব্যক্তি/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সক্রিয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের ও ধরপাকড় বন্ধ করতে হবে, হয়রানিমূলক মামলায় গ্রেফতারকৃতদের এই মুহূর্তে মুক্তি দিতে হবে;

৪.       সকল প্রকার যোগাযোগে বাধা সৃষ্টির বদলে তাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে; এবং

৫.       নির্বাচন কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিকজনগোষ্ঠীর মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; তাদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শনকারী এবং তাদের ওপরে হামলাকারীদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমরা মনে করি অন্তত এই ব্যবস্থাগুলো নেয়া গেলেই কেবল গুজব, ধোঁয়াশা কিংবা ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। আমরা আশা করি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশন এবং সরকার এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে।

সরকার বরাবরই দাবি করেছেন তাঁদের নেতৃত্বে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধীরা দাবি করেছেন বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার ও তার সমর্থকদের দায়িত্ব ভয়মুক্ত পরিবেশে মানুষ যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

জনগণ দীর্ঘদিন পরে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। শঙ্কা আছে, আছে অনিশ্চয়তা, কিন্তু আপনার আমার মতো সকল নাগরিকের কর্তব্য হলো সকল শঙ্কাকে দূরে সরিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হওয়া। চোরাই টাকা এবং পেশী শক্তির দাপট, ব্যক্তি, পরিবার এবং গোষ্ঠীতন্ত্রের করাল থাবা থেকে আমরা যদি আগামীর বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চাই, যদি আমরা রাষ্ট্রের তথা জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল/গোষ্ঠীর হাত থেকে অবমুক্ত করে জনতার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই, তাহলে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা বাদে অন্য কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক: আমার ভোট আমিই দেবো, জনবিরোধী লুটেরা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে আমরা আমাদের আকাঙ্খার বাংলাদেশকে তুলে দেবো না।

আগামী ৩০শে ডিসেম্বরযেমন সরকার ও সকল দলের পরীক্ষা, তেমনি জনগণের জন্যও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে  না পারলে বাংলাদেশ এক মহাবিপর্যয়ে পতিত হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করুক। আর ভোটকেন্দ্রগুলোতে জনতার ঢল নামুক; জনগণের শক্তিতেই বাংলাদেশ রক্ষা পাক, ভোটের অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে জনগণ সকল শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করুক। এই চরম অনিশ্চয়তাকালে দেশবাসীর কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নাগরিকদের পক্ষে আমরা’র পক্ষে- অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শাহদীন মালিক, শহিদুল আলম,  অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, নূরুল কবীর, শিরীন হক, অধ্যাপক সি আর আবরার, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, অমল আকাশ, জাকির হোসেন, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, তাসলিমা আক্তার, পার্সা সাঞ্জানা সাজিদ, শহিদুল ইসলাম সবুজ, কামরুল হাসান, কৃষ্ণকলি ইসলাম, নাসরিন সিরাজ অ্যানি, বীথি ঘোষ, ড. রুশাদ ফরিদী, মেহজাবীন রহমান নাভা,  ড. সামিনা লুৎফা, ড. মোঃ তাঞ্জীমউদ্দিন খান , মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, সায়দিয়া গুলরুখ, অরূপ রাহী, রায়হান রাইন, পারভীন জলি, বাকী বিল্লাহ, লাকী আক্তার, ওমর তারেক চৌধুরী, রেহনুমা আহমেদ।