Home » বিশেষ নিবন্ধ » একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ

একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ

তোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে গত ১০ বছরে কৌশলগত একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকাশ ঘটছে – যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সুশাসনকে অধিকতর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কৌশলগত একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলতে বুঝাতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল উপাদানগুলিকে এমনভাবে বিন্যাস ও উপকারভোগী করে রাখা যা দীর্ঘমেয়াদে  ক্ষমতায় টিকে থাকার শক্তিশালী সহায়ক হয়। একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, এই অবস্থায় রাষ্ট্রের আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ একই কেন্দ্রের অধীন হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থা ক্ষয় হতে হতে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই অবনতি ধারা আরো বিস্তৃত হয়েছে দু’ভাবে। এক. টার্গেটেড দমন পীড়ন, দ্বিতীয়. নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত করে জনগণকে বিরাজনৈতিক করণ প্রক্রিয়ার অংশ করে ফেলা। সংসদ সদস্যদের স্থানীয় রাজনীতি-অর্থনীতি-প্রশাসন কেন্দ্র পরিনত করার মধ্যদিয়ে স্থানীয় সরকার আরো ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে। এর ফলে জনগণ আরো বেশী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়েছে। গত দশ বছরে জনগণ বা নাগরিক সবচেয়ে বেশী ক্ষমতাহীন হয়েছে। বর্তমান শাসকদলের রাজনীতি পূর্বের একদলীয় রাজনীতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। শাসকদল আরো কৌশলগতভাবে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা রাখতে চাচ্ছে। তারা সিনেমার হিরোদের মত কোন প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধে পরাজিত হতে চায় না। পরাজিত হলেও পছন্দ অনুযায়ী পরাজিত হতে চায় । বিরোধী পক্ষ থাকবে দু’ভাবে; এক. জাতীয় পার্টির মতো ‘পোষমানা গৃহপালিত’ দল এবং দুই. বিএনপি ও জামায়তের মতো দমিত -অবরুদ্ধ ভিলেন হিসেবে। বর্তমানে শাসকদল সত্যিকার বিরোধী দল হিসেবে চাচ্ছে ভিলেনদেরকে- বিএনপি, জামায়াতকে। এখন বিরোধী বিএনপি, এই দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে এক নম্বর দল হতে পারবে কি?

শাসকদল জানে বিএনপির এই নির্বাচন খেলায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। তবু সেই ঝুঁকি মেনে নিয়েছে। একথা মনে রাখতে হবে বিএনপি ২০১৪  সালে ভোটের মাধ্যমে শাসকদলের হাত থেকে ক্ষমতা নেয়া কঠিন মনে করেছিল। কারণ শাসকদলের নয়, তারা নির্বাচন করতে চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি রাস্তার আন্দোলন দিয়ে  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জন করতে  পারেনি। এখানে অনেকে বলেন, বিএনপির তুলনামূলক সুবিধা ভোটযুদ্ধে রাস্তার আন্দোলনে নয়। এটাও সত্য নয় কারণ খালেদা জিয়ার বিএনপি’র উত্থান এরশাদ বিরোধী রাস্তার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কাজেই বিএনপি আন্দোলনে দূর্বল এই যুক্তিতে ২০১৪-এ রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, এটা বলা সম্পূর্ণভাবে সঠিক নয়। বিএনপি জোট ২০১৪ আন্দোলন লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা  নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। বিএনপি লক্ষ্য অর্জন না করা ছবির একটা দিক মাত্র, অন্যদিক হচ্ছে শাসকদলের আন্দোলন দমনে ‘‘সফলতা’’। গত ৫ বছর শাসনকে স্বাভাবিক করা মেনে সেবার পরিস্থিতি তৈরী করা। ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্ব বিবেচনায় বর্তমান ভোটযুদ্ধের পটভূমি তৈরী করেছে। এ পর্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে; কেউ কেউ বলেছেন ভারতের কৌশলগত অবস্থান ২০১৪ এর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তাই শাসকদলকে আন্দোলন দমনে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল। কেউ কেউ বলেন বিএনপি আন্দোলন কৌশলই জনগণ গ্রহণ করে নাই। অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্ণ কোন পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভবের পিছনে পুরোনো অনেকগুলো রাজনৈতিক পূর্ব অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে, এক. ভোটার বিহীন নির্বাচনকে আন্তজার্তিক ও পশ্চিমাদের চাপে পূর্ণ ৫ বছর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতে পারবেন- মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে। দ্বিতীয়ঃ শাসক দলের দমন-পীড়ন-দূনীর্তির কারণে বিপুল জনরোষ তৈরী হবে, ক্ষোভে বিক্ষোভে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে; বিএনপির এই অনুমান এটা ভুল প্রমানিত হয়েছে। বিরোধীরা যেভাবে জনপ্রিয়হীনতার কথা বলেন তাও কোন সমীক্ষা দ্বারা প্রমানিত হয়নি। জনপ্রিয়তা বর্তমান সময়ে এখন খুবই অষ্পস্ট ধারণায় পরিনত হয়েছে, এমনকি ভোটের জয় পরাজয় দিয়ে যা প্রমান হয়, তাও যথেষ্ট নয়। তবে একটা কথা বলা যায়, শাসকদল নড়েবড়ে নয় যথেষ্ট শক্তিশালী- একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী ভূমিকার জন্য। বাংলাদেশে প্রথাগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও শাসকের পিছনে জনগণ জড়ো হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ শক্তির পরিচয় অন্তত তিনটি বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে দিয়েছে। প্রথমতঃ ১৫ ই আগষ্ট হত্যাকান্ডের বিচার, দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া, তৃতীয়তঃ ২১ আগষ্টের বিচার প্রক্রিয়া। এ তিনটি বিচার শাসকদলের রাজনৈতিক স্কোর কার্ডকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনের অন্যতম কারণ হতে পারে ক্ষমতাসীনদের ব্যপারে ক্ষমতাসীনতার ক্রমাগত অসুন্তষ্টি । তবে একটা বিষয় ষ্পষ্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ক্ষমতা বদল এখন সরল-রৈখিক নয়, পূর্বের অনেক নির্দেশক এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হলেই সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামবে সেরকম পরিস্থিতি নাই। রাজনৈতিক প্যারাডাইম সিফট হয়েছে। আর সেটা হয়েছে একক কর্তৃত্ব ও  আধিপত্যবিস্তারী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উন্মোচনের মধ্য দিয়ে, যদিও রাষ্ট্রের মধ্যেই সবসময় আধিপত্যবিস্তারী ক্ষমতা থাকে। বর্তমান শাসকদল সেই ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলছে এবং দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। গত ১০ বছরে রাজনৈতিক প্যারাডাইম সিফট পরির্তনের কথা বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে।