Home » প্রচ্ছদ কথা » একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা

একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

‘মনুষ্য ধর্ম’হারিয়ে যাচ্ছে। হারাচ্ছে রাজনৈতিক মর্যাদাবোধও। যে ‘রক্তপাতময়তা’ রাজনীতিকে বিভাজিত করেছে, পরস্পরকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার প্ররোচনা দিচ্ছে, তার মূল কারণ হচ্ছে, ন্যূনতম সুষ্ঠ একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ের প্রকৃত প্রতিফলনে প্রাতিষ্ঠানিকতা তো দুরের কথা, বিকাশমান কোন পথ তৈরী হয়নি। সবসময়ই ক্ষমতাসীনরা জনরায়কে মেনে নেয়াকে তাদের ‘অক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ‘প্রতিশোধ’র আশংকায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকত্বটুকুও আর অবশিষ্ট রাখেনি।

এক. সিইসি নুরুল হুদা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন, ভোট সুষ্ঠ হবে। এর মাঝে ইসি মাহবুব তালুকদার ‘বাগড়া দিলেন একথা বলে যে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সিইসি জানালেন, ইসি মাহবুব ‘অসত্য’বলেছেন। জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, একথা বলে সিইসি তার অস্তিত্বে আঘাত করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে নিট রেজাল্ট, নির্বাচন কমিশনের মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক কমিশনের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’র মতামতই গ্রহনীয় বলে জানালেন। কিন্ত জনগণ উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন, পার্লামেন্ট এবং মন্ত্রীসভা বহাল রেখে যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে বলে দাবি করছেন, তা নিয়ে তাদের মতবিরোধ প্রকাশ্য।

আরও উদ্বেগের যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন যে, বিএনপি ভূয়া ব্যালট ছাপাচ্ছে। কর্মীদের তিনি কোথায় এবং কোন কোন ছাপাখানায় এসব ব্যালট ছাপানো হচ্ছে, কর্মীদের তিনি তা খুঁজে বের করতে বলেছেন। ভোটের দিন মুজিব কোট পরে ভোটকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর এরকম আশঙ্কা এবং সন্দেহ নিশ্চয়ই তথ্যভিত্তিক। জনগণ এই সন্দেহের ভিত্তির যথার্থতা দেখতে চান – আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কথিত ভুয়া ব্যালট উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে।

দুই. কমজোরি গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে নির্বাচন সব দেশে সবকালে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত। এটি আসলে মাও সেতুং এর ভাষায় ‘রক্তপাতময় রাজনীতি’। ফলে এর মধ্যে মানবিকতার কোন স্থান নেই। সব নিয়ম, নীতি-নৈতিকতা ভঙ্গ করে জেতাটা হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র লক্ষ্য। আর সেটি যে কোন মূল্যেই। ’ভোটযুদ্ধ’ জয়ের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্নটিও জড়িয়ে যায়। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন প্রাণঘাতী হয়ে উঠে জয়-পরাজয়ের দিকে হাঁটতে থাকে, অনিবার্য পরিনতি হিসেবে।

সারাদেশে নির্বাচন ক্রমাগত সহিংস রূপ ধারন করতে করতে অবশেষে প্রাণ সংহারী হয়ে উঠে। যারা নির্বাচনের কাজটি পরিচালনা করছেন বা দেখ-ভালের কাজ করছেন, তাদের জন্য চাপ বাড়ছে। সেটা কতটা বোঝার জন্য সবশেষ ঐক্যফ্রন্টের সাথে ইসি’র বৈঠক একটি প্রমান। সিইসি’র সাথে উত্তেজিত বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ আলোচনা থেকে ওয়াক আউট করেন। অব্যবহিত পরে একজন কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য প্রমান করে সুষ্ঠ নির্বাচন বিষয়ে কমিশনেই রয়েছে মতানৈক্য।

শক্তিশালী গণতন্ত্রে কর্তৃত্ববাদের স্থান নেই। ক্ষমতা সেখানে ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়, বিকেন্দ্রীকৃত। সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব শক্তি থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে এবং প্রয়োগটি দেখা যায় দায়িত্ব নির্বিঘ্ন করতে। বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। এই প্রতিষ্ঠানিক শক্তি নির্বাচন পরিচালনাকারীদের এক ধরনের সুরক্ষা দেয় এবং গোটা বিষয়টি তারা ’রুলস অব বিজনেস ’ হিসেবে পরিচালনা করে থাকে। ফলে কারো মুখাপেক্ষী থাকতে হয়না।

কিন্তু কমজোরি গণতন্ত্রেও বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পরিচালনাকারীরা তাকিয়ে থাকেন শক্তিমান বা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দিকেই। অহেতুক তারা ক্ষমতাবানদের বিরাগভাজন হতে চান না। গা বাঁচিয়ে  কিভাবে শক্তিমান পক্ষগুলোর পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আসা যায়, সে কাজটিই পারঙ্গমতার সাথে তারা করে থাকেন। এই জায়গাটিতে তারা দৃষ্টিগ্রাহ্যরকম একপেশে এবং একদেশদর্শী।

বাংলাদেশ এ যাবতকাল পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন পরিচালনাকারী হিসেবে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান প্রদত্ত অভূতপূর্ব শক্তি এবং ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্ব আজ অবধি স্বাধীনভাবে, সক্ষমতার সাথে পালন করতে পারেনি, বলা যেতে পারে করেনি।

ফলে ’স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান’ বলে নির্বাচন কমিশনের কথা ফি-বছর জনগন শুনে আসছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫.৩ ধারায় বলা হয়েছিল,”নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে…”। কিন্তু এটি অধরাই থেকে গেছে। অনেকটাই ’কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ বা কখনই ছিল না। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এটিই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। যে তিনটি নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, তারাও যেভাবে চেয়েছে কমিশন ঠিক সেভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করেছে।

তিন. বর্তমান  নির্বাচন কমিশনও তার বাত্যয় নয়- জনগন এটি বিশ্বাস করেন। এখন পর্যন্ত কমিশনের রোজনামচা দেখে বলতেই হবে, তারা নির্বাচনটি অংশগ্রহনমূলক করতে চাচ্ছেন, কিন্তু সুষ্ঠ নয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বাইরে যারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন, এমন প্রার্থীদের ওপর নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটছে। কর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেফতার চলছে। সবকিছু দেখে-শুনে, বিবেচনায় নিয়েই কি সিইসি বলেছেন তিনি আদতেই সুষ্ঠ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন?

প্রশ্নটি গুঞ্জরিত হতে শুরু করেছে, অচিরেই পল্লবিত হবে। একটি ভাল নির্বাচন না হলে শেষতক কি হবে? দশম সংসদ নির্বাচনে একক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতার ওপর ভর করে গত পাঁচ বছরের দাপটে শাসন জনগন প্রত্যক্ষ করেছে। আগামীতেও ’উন্নয়ন জোয়ার’ সচল রাখতে যদি সেরকম ব্যবস্থাই ফিরে আসে, তাহলে আপত্তিই বা কোথায়? এই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর নেই। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এতে লাভ কার? নির্বাচন ব্যবস্থা ভঙ্গুর হলে দল বা শাসন ব্যবস্থা-কোথাওই গণতন্ত্র বিকশিত হয়না। ফলে ন্যায্যতা ও আইনের শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সম্ভবনা তৈরী হয় চরমপন্থা ও অরাজনৈতিক শক্তির উত্থানের। সেজন্য আজকে যে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আনন্দিত এবং উল্লাসিত, সেটি নিকট ভবিষ্যতেই যে নেতিবাচক হয়ে উঠবে না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? মনে রাখতে হবে, একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা। কার্ল মার্কস হেগেল’কে উদ্বৃত করতেন এভাবে, ”ইতিহাস পূনরাবৃত্তি ঘটায়। তবে প্রথমটি যদি হয় সত্যি ও সঠিক, তাহলে পরেরটি অবধারিতভাবে কৌতুকপ্রদ’অথবা এর বিপরীত।