Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 28)

Author Archives: আমাদের বুধবার

নির্বাচন কমিশন গঠন : শুভবুদ্ধি ও সদিচ্ছার আলামত দেখার ব্যর্থ প্রতীক্ষা

আমীর খসরু ::

রাজনীতিতে এবং শাসনকাজে মাঝে মাঝে নীরবতা এবং সব কিছুই চুপচাপ ঠিকঠাক চলছে – অনেকের ধারণা মতে এমন একটি সময়কাল বর্তমানে অতিক্রান্ত হচ্ছে। জনঅংশগ্রহণ যদিও এই গণতান্ত্রিক সমাজে দিনে দিনে কমেছে এবং এর দেখা পাওয়াটা এখন দুষ্কর। তবে জনঅংশগ্রহণবিহীন কথিত গণতন্ত্রে কতোটা সিস্টেমের অন্তর্গত দুর্বলতা অথবা শাসকসৃষ্ট এহেন পরিস্থিতি – তা নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হতে পারে। আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক এবং রাজনীতিতে অতিসজ্জন বলে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ বছরেই এ ধরনের নীরবতামূলক পরিস্থিতির বিদ্যমানতায় বেশ কিছুটা শংকা প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য সৈয়দ আশরাফের প্যাটার্নটাই এমন যে, তিনি আকার-ইঙ্গিতে বহু কথা বলেন, বহু কথা না বলেই। বিষয়টা এমন যে, ‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোনো কথা না বলে।’ এসব নীরবতাকে কখনো কখনো অস্বস্থিকর, যাকে ইংরেজিতে ‘আনইজি কাম’ বলা হয়ে থাকে। আর এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে কোন কিছু নিয়েই এখন আর প্রকাশ্য কোনো মাথা ব্যথা নেই। দিনে দিনে পরিস্থিতি যা দাড়াচ্ছে তাতে এসব বিষয়ে তাদের মাথাও যেমন থাকবে না, তেমনি ব্যথারও কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রথমেই অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা বৃহদাকার ধারন করায় প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। তবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার প্রণেতা এবং দার্শনিকরা নিজেরাই এ কথা গোড়াতেই কবুল করে নিয়েছেন যে, আদতে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থাটি ঘুরেফিরে সেই কতিপয়ের শাসনই পরিণত হয়- যদি না আগেভাগে যথাযথ ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বর্তমানে ‘আমার ভোট আমি দেবো’ এমন ব্যবস্থাটি অর্থাৎ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষমতাই আর চালু নেই। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বহু দেশে এমনটা ঘটছে। তবে এখানে জোর দিয়েই একটি কথা বলতে হচ্ছে, নির্বাচন বা ভোট যখন গণতন্ত্রের অপর নাম হয়ে দাড়ায় অথবা সমাথর্ক বলে কতিপয়কেন্দ্রীক শাসন এবং স্বৈরশাসকগণ স্বজ্ঞানে, কূটকৌশলের অংশ হিসেবে যখন এমনটা চর্চা বা প্র্যাকটিস করতে শুরু করলো -তখনই প্রকৃত গণতন্ত্রের ছিটেফোটাও যা বাকি ছিল, তারও বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। কারণ নির্বাচন বা ভোট এবং গণতন্ত্র যে এক কথা নয়, সাধারণের মনোজগত থেকে সে কথাটি পর্যন্ত স্বৈরশাসকবর্গ সুকৌশলে মুছে দিয়েছে। বাংলাদেশও কোনোক্রমেই এর বাইরে নয়।

এক্ষেত্রে অবিভক্ত পাকিস্তানের বহু উদাহরণ দেয়া যায়। গণতান্ত্রিক পথ-প্রথা, পদ্ধতি ভাঙ্গার জন্য প্রথমে মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেছিলেন আইয়ুব। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তার শুরুটা যেসব কারণে হয়েছিল তার অন্যতমটি ছিল গণতন্ত্র। অর্থাৎ স্বাধীনতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রাপ্তি ও চর্চার মধ্যদিয়ে সবার জন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শুধুমাত্র ভোটই যে গণতন্ত্র এমন একটি অপকৌশল বাস্তবায়ন করা হয় শাসকবর্গের পক্ষ থেকে, দেশটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অল্পকাল পরেই। যার স্পষ্ট আলামত প্রথমবারে দেখা যায় ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এরপরে ছোট বড় যতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার প্রায় সবই অনুষ্ঠিত হয়েছে দলীয়, নানাবিধ প্রভাব আর পেশী ও অস্ত্রশক্তির উপর ভর করে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পরে সামরিক শাসন আমলের নির্বাচনে আমরা আইয়ুব খানের নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি দেখেছি কমবেশি। আমাদের দেখতে হয়েছে হ্যাঁ-না ভোট, এরশাদ জামানার নানা কিসিমের নির্বাচন।

একটি বিষয় বলতেই হবে, যৎসামান্য হলেও নির্বাচন জনগণের জন্য গণতন্ত্র প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও সুরক্ষা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে জনমনে সামান্য হলেও অধিকার আদায়ের শক্তিটুকু দিয়ে থাকে; যার সবকিছুই এখন বিদায় নিয়েছে। একথাটিও বলতে হবে, ১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের বিদায়ের পরে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে একে একে নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানোর যে ত্বরিৎ কর্মটি আমরা নানা সময়ে বাধ্য হয়ে প্রত্যক্ষ করেছি, তা প্রতিবারই নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবনকারী এবং অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে ২০১৪’র ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন তথাকথিত ভোটদান পর্বকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নেতিবাচক ইতিহাস হিসেবেই বহু বহুকাল বিবেচিত হবে। অথচ এ কথাও আমাদের স্মরণে আছে, ২০০৮-এ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে নানা সুন্দর সুন্দর কথা বলা হয়েছিল। এতে আরো নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল; যার দু’একটির উল্লেখ করা প্রয়োজন। নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারের প্রধান ৫টি বিষয়ের ৫.৩ দফায় নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পদ্ধতির ইতিবাচক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। ওই ইশতেহারে ভিশন ২০২১-এর প্রথম দফায়ই বলা হয়েছিল, ‘একটি নির্ভরযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা, নিয়মিত নির্বাচন, সরকারের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হবে।’

এসব প্রতিশ্রুতির পরে শুধু সংসদ নির্বাচনই নয়, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, এমনকি বাজার-স্কুল কমিটির নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন পক্ষের নানা তেলেসমাতি আমাদের দেখতে হচ্ছে ও হয়েছে। নির্বাচনকে অকার্যকর মাধ্যম হিসেবে পরিণত করে এমন প্রথা-পদ্ধতি ও ঐতিহ্যকে নির্বাসনে পাঠানোর যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্নের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক  সরকার ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়। অর্থাৎ পরে জিগিরও তোলা হয়- গণতন্ত্র নয়, উন্নয়ন।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এমন ওলোট-পালট অবস্থার প্রেক্ষাপটে বর্তমানে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন হঠাৎ কেন জানি সরগরম হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন সম্পর্কে যে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তা যে নতুন কোনো উদ্ভাবন বা আবিষ্কার তা মনে করার কোনো কারণ নেই। বিএনপির প্রধান যে দাবি তা হচ্ছে – একজন যোগ্য ও নিরপেক্ষ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনারদের তালাশ-তল্লাশি করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা। তাছাড়া সামরিক বাহিনীকে নির্বাচনকালীন কিছু ক্ষমতা প্রদানের জন্যও বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিএনপি রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চায়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী অর্থাৎ সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি গঠন করবেন।

বাস্তবে আওয়ামী লীগ বিশেষভাবে জানে যে, বাস্তবে কি ঘটতে যাচ্ছে। আর বিএনপি এতোকাল পরেও নানা অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হয়ে রাষ্ট্রপতির শুভবুদ্ধি ও সদিচ্ছার উন্মেষ ও উদয়ের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির শুভবুদ্ধির বা সদিচ্ছার মূল্য আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান অনুযায়ী কতোটুকু দেবে বা শুভবুদ্ধির অংকুর কতোটুকু বাড়তে দেবে-তা তাদের উপরই নির্ভর করে। সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও  ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেনঃ

তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।

কাজেই ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন যথারীতি সাংবিধানিক নিয়মে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমেই গঠিত হবে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিএনপির ১৩ দফার মধ্যে প্রকারান্তরে সরকারের সাথে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্যের কথা আকার ইঙ্গিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এবারে এবং আগেও আওয়ামী লীগ এসব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সব সময়ই রাজনৈতিক সংলাপ এবং জাতীয় ঐকমত্যের প্রস্তাব নাকচ করে দিচ্ছে-এবারেও দিয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিকসহ নানা রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এনিয়ে নানা ফায়দা লুটবে- এটাই স্বাভাবিক।

তাহলে প্রশ্ন উঠে যে, ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে কেন একটি সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছিল? যতোদূর জানা যায়, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পরে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকগণ এটা মনে-প্রাণে দেখাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হলেও অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ ও সদিচ্ছার কোনোই কমতি নেই। কিন্তু লোক দেখানো ওই ব্যবস্থা যেমন বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার নয়, তেমনি তা হয়ওনি।

এবারেও ঐকমত্য, সংলাপ, বিএনপির কথা মতো সার্চ কমিটি গঠন এবং এ জাতীয় কর্মকান্ডের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা ও শুভবুদ্ধির উদয় হবে-তা মনে করার আদৌ কোনো কারণ নেই। শুভবুদ্ধির উদয় এবং সদিচ্ছার উত্থান ঘটতো যদি বিএনপি তার নেতৃত্বের দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শন করে আওয়ামী লীগকে বাধ্য করতে পারতো। বিএনপিকে এ বিষয়টিকেও মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন ও ১৩ দফা প্রস্তাবনা যদি রাজনৈতিক কৌশল হয়েই থাকে তবে তা অচিরেই ব্যর্থ হবে। এখানে বিএনপির বড় দুর্বলতা হচ্ছে, বিএনপি নিজেই।

রোহিঙ্গা নিধন : সু চি’র হাতে কিভাবে এখনও নোবেল শান্তি পুরস্কার?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, সিএনএন ও ইকোনমিস্ট অবলম্বনে

‘ভাইয়েরা, দেখো, এটা দেখো,’ লোকটা একটা পোড়া বাড়ির ছবি তুলছিলেন। কাদা আর ছাইয়ের মধ্য থেকে লাশগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বাংলাদেশ লাগোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে গুটিকতেক যে ভয়াবহ ভিডিও বাইরের দুনিয়ায় এসেছে, এটা তারই একটা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্যানুযায়ী, গত মাসের সহিংসতার পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী চলমান দমন অভিযানের অংশ হিসেবে গ্রামের পর গ্রাম ধরে শত শত বাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, স্থানীয় জঙ্গি গ্রুপগুলো এসব আগুন লাগিয়েছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্য ভিন্ন। গত কয়েক দিনে সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসারও চেষ্টা করেছে।

সহিংসতা ও নীরবতা :

রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বশেষ দফার সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে অক্টোবরের প্রথম দিকে। ওই সময় ৩০০’র মতো সশস্ত্র একটি গ্রুপের হামলায় কয়েকজন সৈন্য ও পুলিশ নিহত হয়। তারপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী অভিযান শুরু করে। এতে কয়েক ডজন নিহত হয়, গ্রেফতার হয় অন্তত ২৩০ জন। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর হিসাব মতে, মৃতের সংখ্যা কয়েক শ’ হবে।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরাট অংশের বাস। রাষ্ট্রহীন এই সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীটি বছরের পর বছর ধরে বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার তাদেরকে ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাদের মতে, এরা হলো অবৈধ বাঙালি অভিবাসী।

অনেকেই আশা করেছিল, মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার, বিশেষ করে নোবেল পুরস্কারজয়ী অঙ সান সু চি সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন।

গত বছরের জাতীয় নির্বাচনে সু চি’র নেতৃত্বে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) বিপুল বিজয় লাভ করে। এতে করে দুই যুগের বেশি স্থায়ী নির্মম সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।

অবশ্য সাবেক জান্তার প্রণীয় সংবিধানের আওতায় সামরিক বাহিনী পার্লামেন্টের ২৫ ভাগ আসন ধরে রেখেছে। নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিও তারা তদারকি করে।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর, তাতমাডো, নেতৃত্বে আছেন সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হ্লাইঙ। সাবেক লৌহমানব থান শু ২০১১ সালে তার উত্তরসূরি হিসেবে তাকে নিয়োগ করেছিলেন।

রাখাইনে অভিযান চালাচ্ছে সামরিক বাহিনী। তবে সরকার কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় মানবাধিকার গ্রুপগুলো হতাশা প্রকাশ করেছে।

ব্যাংককভিত্তিক ফোরটিফাই রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু স্মিথ বলেন, ‘সরকার সরাসরি মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। সরকার যে ধরনের লংঘনকে অস্বীকার করছে, তা দেশের সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি :

মিয়ানমারে এক কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, রাখাইনে এ ধরনের সহিংসতা অব্যাহত থাকলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

জাতিসংঘ দূত জয়নব হাওয়া বাঙ্গুরাও নারীদের প্রতি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ভয়াবহ জাতিবিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতার উল্লেখ করেছেন। ওই অঞ্চলে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমার সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।

সিএনএন অনেকবার সু চি’র অফিসের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

হতাশা :

গত সেপ্টেম্বরে সিএনএনের সাথে এক সাক্ষাতকারে সু চি বলেছিলেন, তার সরকার আমরা যেমন চাই, তেমন সম্প্রীতি, সমঝোতা ও সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় অনেক ঝামেলার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, এটাই আমাদের সামনে আসা একমাত্র সমস্যা নয়। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়  এটার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি কফি আনান কমিশনের দিকে ইঙ্গিত করেন।

তবে এখন সু চি’র এ ব্যাপারে ভয়াবহ নীরবতা মনে হচ্ছে, তিনি কিছুই শুনছেন না। আর এটাই বিশ্লেষকদের কাছে ভয়াবহ উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী প্রবল অনুভূতি রয়েছে। দেশটির মূলধারায় মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বরতা দিন দিন বাড়ছে। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা।

সামরিক বাহিনীর নির্যাতন :

গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের আগে ও পরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের ভয়াবহ অনেক অভিযোগ ছিলে ও আছে। সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের অনেক ঘটনা মানবাধিকার সংস্থাগুলো তুলে ধরেছে। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে রোহিঙ্গারা। রাখাইন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সামরিক বাহিনী। তারা নানা আশঙ্কার কথা বলে অন্য কাউকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ দিতে চায় না।

ম্যাথু স্মিথের মতে, এখন রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘নির্মূল অভিযান’ শুরু হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

তিনি বলেন, অক্টোবরের কথিত হামলার আগেই রাখাইন রাজ্য কর্তৃপক্ষ মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তি ধ্বংস করার কাজ শুরু করেছিল। আরেকটি ঘটনার জের ধরে তারা বর্তমান কাজটি করছে।

ইকোনমিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছে, চার শতাধিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর বাস্তুহারা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি। ১,২৫০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এসব নির্যাতন, নৃশংসতায় একটুও শব্দ করছেন না শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি। তার এই দুর্বোধ্য আচরণে বিশ্ববিবেক হতবাক। অনেকে ক্ষোভে, ক্রোধে তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে। এমন অশান্তির মধ্যেও যে শান্তিতে ঘুমাতে পারে, তার হাতে কিভাবে শান্তি পুরস্কার থাকতে পারে, সে প্রশ্ন তারা তুলছে।

মওলানা ভাসানী :: ইতিহাসের নির্মাতা ও স্রষ্টা- (দ্বিতীয় পর্ব)

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতৃত্বে মুসলিম লীগের একাধিপত্য ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে। কিন্তু ১৯৫৭ সালের বিরোধিতার মূল লক্ষ্য সেটি ছিল না। কারণ পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগের অস্তিত্ব ততদিনে বিপন্ন। দলটি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনধিকৃত ও প্রত্যাখ্যাত। সে সময়ে পাকিস্তানে পাঞ্জাবকেন্দ্রিক সিভিল-সামরিক ও বিকাশমান মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেনীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই শাসন পূর্ববাংলার শুধু নয় পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশসহ দুর্বল জাতিসত্তার বিকাশে ছিল প্রধান অন্তবায়।

১৯৫৭ সালেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বাস্তবতা নিয়ে কমিউনিষ্ট, বিশেষ করে তরুন সমাজের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিলেও মওলানা ভাসানী বাদে আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বের কারো মধ্যেই এরকম প্রশ্ন দেখা দেয়নি। মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বিখ্যাত ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম’ উচ্চারন করলেও তিনি এটি বাস্তবে কতটুকু বোঝাতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিটের বিরোধিতা করছিলেন; পাঞ্জাব ছাড়া অন্যান্য প্রদেশের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের স্বপক্ষে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তাতে কোনভাবেই ভাবা যাচ্ছে না তিনি একক পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিলেন। ভাসানী কমিউনিষ্ট আদর্শেও অনুপ্রাণিত থাকলেও লেনিনের জাতি বিষয়ক তত্ত্ব তাকে প্রভাবিত করেনি যে, একটি দেশের মধ্যে বিভিন্ন জাতির অভ্যন্তরীন বিরোধ মীমাংসার কথা তখনও ভেবেছিলেন।

মওলানা ভাসানী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বের আমলে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল থেকে রাজনৈতিক প্লাটফর্মে পরিনত হয়। দলে ডান-বাম, সেক্যুলার-ননসেক্যুলার, প্রতিক্রিয়াশীল, সব ধরনের মানুষের জমায়েত ঘটে। কিন্তু আওয়মী লীগ প্লাটফর্ম হিসেবে কখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। পাকিস্তানে কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ হবার পর বিরাট সংখ্যক নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। ভাসানীর নেতৃত্বে বাম প্রগতিশীলরা ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ডান প্রতিক্রিয়াশীলরা কাজ করছিলেন। ১৯৫৭ সালের ক্রান্তিলগ্নে বৈদেশিক নীতির, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্নে দল স্পষ্টতই দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

সোহরাওয়ার্দী নিজে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতেন পার্লামেন্টের স্থায়িত্বের ব্যাপারে। যে কোন ধরনের আপোষ-মীমাংসায় তার আপত্তি ছিল না। কিন্তু দলের মধ্যে শেখ মুজিব ঝলসে উঠেছিলেন সামরিক-আমলাতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি তার ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ঔপনিবেশিক মনোভাবের ব্যাপারে। উত্তরকালে এটি তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করে। এর বাইরে সোহরাওয়ার্দীর সাথেই ছিল তার অধিকতর ঐক্য।

এ প্রেক্ষাপটে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের পর একক পাকিস্তানের অস্তিত্ব বজায় রেখে জাতিসমূহের সমস্যা সমাধানের বিষয়টি ভিত্তি পেয়েছিল। ভাসানীর আহবানে গঠিত ন্যাপই ছিল মুসলিম লীগের পরে প্রথম সারা পাকিস্তানভিত্তিক রাজনৈতিক দল। এ দলের সাথে যোগ দিয়েছিলেন পাকিস্তান ন্যাশনাল পার্টির জি. এম. সৈয়দ, সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফফার খান, পাঞ্জাবের প্রগতিশীল বাম ধারার নেতা মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, বেলুচিস্তানের নেতা খান আব্দুস সামাদ, পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানীসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ।

রাজনৈতিক দল হিসেবে ন্যাপ সর্বপাকিস্তানব্যাপী পার্টি হয়ে উঠলেও আওয়ামী লীগ তখনও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নে সঠিক মীমাংসা করে উঠতে পারেনি। আওয়ামী লীগে ভাঙ্গনের পরে সোহরাওয়ার্দী ছাড়া কোন নেতা ছিলেন না, যিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে রাজনীতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহন করেছিলেন। পাকিস্তানের উভয় অংশের ঐক্যের গুরুত্ব সোহরাওয়ার্দী ছাড়া কেউ বিবেচনা করতেন না। শেখ মুজিব তো বটেই, আবুল মনসুর আহমেদসহ সকল নেতাই পার্লামেন্টসহ সব জায়গায় স্বায়ত্ত্বশাসনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তারপরেও আওয়ামী লীগের মধ্যে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অনুসারী ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের ঘোরতর একটি সমর্থক গোষ্ঠি ছিল,  যারা চিন্তা-চেতনায় ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের মধ্যে একক পাকিস্তানের প্রতি আগ্রহ হারানো তরুণ রাজনীতিকরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আনুগত্যের বিপরীতে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা ও প্রধান্যে বিশ্বাস করতেন। এই গোষ্ঠির মূল শক্তি ছিল তারুণ্য এবং শেখ মুজিব এদের নেতা হিসেবে দলের মধ্যে অপরিমেয় প্রভাব বিস্তার এবং সহসাই জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপে চলে আসেন। আদর্শের চেয়েও আত্মপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল কাছে মুখ্য এবং সেক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করতেন অবলীলায় ও মন্ত্রীসহ পদ পাবার জন্য এদের তখনকার তৎপরতা ছিল লক্ষ্যণীয়।

ভাঙ্গনের পর মওলানা ভাসানী চলে গেলে আওয়ামী লীগের সাথে শেরে-বাংলার কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টির রাজনীতি সমিল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত বিরোধ ও ধর্মীয় মতাদর্শ দুই দলকে এক হতে দেয়নি। মওলানা ভাসানী বাম সমর্থকদের নিয়ে আলাদা হয়ে যাবার পর দলত্যাগীদের ডান ঘরানার অধিকাংশ আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছিলেন। এ সময়ে ন্যাপের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু হয় যে, দলটি ভারতের দালাল ও পাকিস্তান ভাঙ্গতে চায়। কমিউনিষ্টদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নাস্তিকতার অভিযোগ নিয়ে আসে। অন্যদিকে, কৃষক প্রজা পার্টির সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও রাজনীতিতে ইসলামকে ব্যবহার করার আগ্রহে নেজামে ইসলামের সাথে নৈকট্য গড়ে দেয়।

অন্যদিকে, ন্যাপ গঠনের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার ব্যাপারে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি হয়। সঙ্গত কারনে আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, নেজামে ইসলামীসহ কোন দলই এটিকে ভালভাবে নেয়নি। ন্যাপের উভয় অংশের নেতারা ভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো থেকে উঠে এসেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ নেতা ছিলেন সামন্ত পরিবারভুক্ত, পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা আইন ব্যবসা, শিক্ষকতা, কৃষি বা ট্রেড ইউনিয়ন থেকে উঠে এসেছিলেন। এ পার্থক্য সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যে কোন কর্মসূচিতে অংশগ্রহনে পিছু হটেননি বা শ্রেনীগত অবস্থান বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ তখনকার জাতীয় রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলে, যা একই সাথে জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা ও জনগনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির যথার্থতা সৃষ্টি করে। ফলে নতুন প্রক্রিয়ার অনিবার্যতায় রাজনীতি উচ্চ-মধ্য শ্রেনীর বৃত্ত ভেঙ্গে সব স্তরের জনগনের অংশগ্রহনের সুযোগ তৈরী করে। একসময় আওয়ামী লীগে ভাসানীপন্থীরা শ্রমজীবিদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নিলেও সোহরাওয়ার্দীপন্থীদের বিরোধিতায় জাতীয় বা প্রাদেশিক ভিত্তিতে তার সাংগঠনিক রূপ দেয়া সম্ভব হয়নি। ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-চট্টগ্রামসহ সারাদেশে শ্রমিক শ্রেনীকে সংগঠিত করার কাজ অব্যাহত ছিল। বাম-প্রগতিশীল কর্মীরা ৪০ হাজার রেলশ্রমিককে সংগঠিত করার কাজ সোহরাওয়ার্দীপন্থীদের হস্তক্ষেপে ভেস্তে গিয়েছিল। কিন্তু ন্যাপ গঠনের পর পূর্ববাংলার বিভিন্ন জেলায় শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয় ও মূলধারার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার জন্য মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে গঠিত হয় মজদুর ফেডারেশন।

১৯৫৫ সালেই সন্তোষে কৃষক সমিতি গঠনের উদ্দেশ্যে কর্মী সম্মেলন আহবান করেছিলেন মওলানা ভাসানী। শেখ মুজিবের বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে শ্রমিক ফেডারেশন গঠনের বছর ৩ জানুয়ারি ফুলছড়ি ঘাটের বিন্নাফৈর নামক স্থানে বিশাল কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জাতীয়ভিত্তিক শ্রমিক-কৃষকদের সংগঠিত করে সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ছিল বাম-প্রগতিশীলদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

ন্যাপ গঠনের মধ্য দিয়ে গণমুখী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন ধারা গড়ে উঠলেও পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী অতিরিক্ত নির্ভরশীল ছিলেন যাদের ওপর, তাদের অধিকাংশই বাম-প্রগতিশীল ঘরানার এবং কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত। ফলে কমিউনিষ্ট পার্টির গৃহীত কর্মকৌশল, অভ্যন্তরীন কোন্দলের প্রভাব প্রথমে আওয়ামী লীগ ও পরবর্তীতে ন্যাপের রাজনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। এ কারনে ষাট দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কমিউনিষ্টদের কর্মকৌশল দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে ন্যাপকে।

ষাট দশকের মাঝামাঝি সারা বিশ্বে কমিউনিষ্ট আন্দোলন মতাদর্শগত বিভক্তির কারনে ভাগ হয়ে যায়। সোভিয়েত পার্টি দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় সমাজ মূল্যায়নের দাবি করে সমাজতান্ত্রিক গঠন কর্মপরিচালনার ফলে সমাজতন্ত্রে উপনীত হয়েছে। পুজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার হুমকি থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য শ্রমিক শ্রেনীর একনায়কত্ব চালু রাখার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা সোভিয়েত সমাজে এমন কোন শ্রেনীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার ওপর শ্রমিক শ্রেনীর একনায়কত্ব প্রয়োগ করা যেতে পারে। শ্রমিক বা কৃষক সমাজ অস্তিত্বের দিক থেকে এতটাই পরিবর্তিত যে অপরাপর শ্রেনীর সাথে তাদের পার্থক্য ঘুচে গেছে।

এই ক্রান্তিলগ্নে চীনা পার্টি তাদের ধারনা পরিষ্কার করে যে, সর্বহারা সংস্কৃতির স্বপক্ষের সংগ্রামে যে কোন দুর্বলতাই বুর্জোয়া উৎপাদনের ধারকদের রূপান্তরিত করে পুরানো ও অধঃপতিত নতুন বুর্জোয়া গোষ্ঠি মিলে সংশোধনবাদ সামাজিক ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ কারনে সোভিয়েত পার্টি তার দেশে পুরানো ও নতুন বুর্জোয়াদের স্বপক্ষে কাজ করছে। চীনারা পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, সোভিয়েত পার্টি এসব কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সংশোধনবাদী হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। সর্বহারা শ্রেনীর একনায়কত্ব হচ্ছে, সমাজতন্ত্রের সকল পক্ষ শক্তির পরিপূর্ণ গণতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক দেশে এটি সর্বহারা শ্রেনীর একনায়কত্ব।

বিশ্ব কমিউনিষ্ট আন্দোলনের এই বিতর্ক ও বিভক্তি পূর্ববাংলার বাম রাজনীতিতে প্রবল বিতর্কের অবতারনা করে। যে প্রশ্নটি এখানে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় সেটি হচ্ছে, সশস্ত্র না শান্তিপূর্ণ পথে এই দেশে বিপ্লব অনুষ্ঠিত হবে? কার্যত: এই প্রশ্নেই পূর্ববাংলায় কমিউনিষ্ট পার্টি ভাগ হয়ে যায়। পরিচিত হয় পিকিংপন্থী ও মস্কোপন্থী নামে। মূল পার্টির আগেই দ্বিধাবিভক্ত হয় ছাত্র ইউনিয়ন। ১৯৬৪ সালে পার্টিতে দুটি ধারা সুস্পষ্ট হয়ে উঠলে ১৯৬৫ সালে বিভক্ত ছাত্র ইউনিয়ন মেনন ও মতিয়া গ্রুপ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

চীনা লাইনের অনুসারীদের কাছে সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রেনী সংগ্রামের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব লাভ করায় দেশের অভ্যন্তরে সামরিক স্বৈরাচার বা জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের মত ইস্যু গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। ষাট দশকে সরকারের সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে পিকিংপন্থীরা আইয়ুবের মার্কিন বিরোধী অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করেন। এর মধ্য দিয়ে নিকৃষ্ট সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুবের প্রতি কমিউনিষ্টরা নমনীয় হয়ে পড়েছিলেন এবং কুখ্যাত “ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব” নীতি গ্রহন করেছিলেন। এই নীতিতে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গড়ে না তুলে তাদের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছিলেন শ্রেনী সংগ্রামে।

পিকিংপন্থীদের আইয়ুব প্রীতি এতটাই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে উঠেছিল যে, তাদের মুখপত্র সাপ্তাহিক দুই কন্ঠ ও জনতার সম্পাদকীয় এবং প্রতিবেদনে আইয়ুব খান ও মওলানা ভাসানীকে পাকিস্তানের দুই জাতীয় বীর বা দুই কন্ঠস্বর আখ্যা দেয়া হয়। একজন সামরিক একনায়ককে এভাবে চিহ্নিত করায় সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ঐতিহাসিক চীন সফরের পরে মওলানা ভাসানী নিজেও আইয়ুবের বিষয়ে “রহস্যময় নীরবতায়” আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে সময়ে পূর্বপাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি বা ইপিসিপি-এমএল নামক উপদলটির আইয়ুব দুর্বলতার প্রমান মেলে ১৯৬৭ কংগ্রেসের রিপোর্টে। বলা হয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিরোধকে কাজে লাগিয়ে আইয়ুব সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে আওয়ামী লীগ মার্কিন সহায়তায় ক্ষমতায় যেতে চায়।

একটি বিষয় ঐতিহাসিকভাবে পরিষ্কার যে, তৎকালীন ইপিসিপি-এমএল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি হিসেবে আইয়ুবকে বিবেচনা করতো। সরকার ও মুৎসুদ্দী শ্রেনীর মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতো এবং আইয়ুব সরকারকে দুইয়ের মাঝে সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এজন্য সরকার উৎখাতে গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া দলগুলোর ঐক্যকেও তারা সমর্থন দেয়নি। এটি গভীর বিষ্ময়ের যে, সেনাশক্তির ওপর দাঁড়িয়ে জনগনের সব অধিকার হরণ করেছে যে সরকার, কিভাবে তাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আখ্যা দেয়া হয়েছিল তার কোন যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি।

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫২ :: অর্থকরী খাতের পুনর্বিন্যাস

আনু মুহাম্মদ ::

চীনের পুঁজিমুখি অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য অর্থকরী খাতের খোল-নলচে পাল্টানো বা এর আমূল সংস্কার ছিল অপরিহার্য। সংস্কারের ধারায় তাই পুরনো ব্যাংকসহ নানা অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের সাথে সাথে অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। চীনা ধরনে পুঁজিবাদের বিকাশে এই সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চীনে শুধু একটি ব্যাংক ছিলো, ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’। পরের ১০ বছরে ২০টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠান, ৭৪৫টি ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ কোম্পানি এবং ৩৪টি সিকিউরিটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের বর্তমান অর্থকরী খাতের উল্লেখযোগ্য  সংস্কার শুরু হয় ১৯৯০ দশকের একেবারে শুরু থেকে। সাংহাই ও শেনজেন এই দুটো বৃহৎ স্টক এক্সচেঞ্জই খোলা হয়  ১৯৯০ সালের শেষ কয়দিনে। ১৯৯৪ সালে অনেকগুলো আইন তৈরি করা হয় বৃহৎ ও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য। এই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যাংক অব চায়না’, ‘চায়না কনস্ট্র্রাকশন ব্যাংক’, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না’ এবং ‘এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না’। অর্থকরী খাতে এগুলোই প্রধান প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ প্রাপ্ত হিসাবে চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিলো ১৫ কোটি মার্কিন ডলার, উপরের চারটি ব্যাংকের সম্পদ এর শতকরা ৬০ ভাগ।

এখন চীনে ব্যাংকসহ মোট ৩৭৬৯টি অর্থকরী প্রতিষ্ঠান আছে যার শাখা সংখ্যা ১ লক্ষ ৯৬ হাজার। এতে কর্মরত আছেন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ। এগুলোর মধ্যে আছে ৫টি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৩টি নীতি নির্ধারণী ব্যাংক, ১২টি মাঝারি আকারের অংশীদারী ব্যাংক,  একটি ডাক সঞ্চয়ী ব্যাংক,  ১৪৭টি নগর বাণিজ্যিক ব্যাংক,  ৮৫টি গ্রামীণ বাণিজ্যিক ব্যাংক,  ২২৩টি গ্রামীণ সমবায়ী ব্যাংক,  ৬৩টি ট্রাস্ট ও বিনিয়োগ কোম্পানি,  বহুসংখ্যক অর্থকরী লিজিং ও  অর্থ ব্রোকারি প্রতিষ্ঠান,  ৪০টি বিদেশি ব্যাংকের চীনা শাখা।  এতোগুলো ব্যাংক থাকলেও মাত্র ৫টি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকই পুরো অর্থকরী খাত নিয়ন্ত্রণ করে। এই ৫টি ব্যাংক সরকারের শতকরা ৫৯ ভাগ বন্ড, শতকরা ৮৫ ভাগ রাষ্ট্রীয় বিল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শতকরা ৪৪ ভাগ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে।  এছাড়া ব্যাংকের আয়ের মধ্যে নাগরিকদের অর্থজমার শতকরা ৫৮ ভাগ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শতকরা ৫০ ভাগ জমা এদের হাতেই।  চীনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সংখ্যা ক্রমে বাড়লেও এখনও অর্থকরী খাতে তাদের অবস্থান শতকরা ২ ভাগের কম।[1]

১৯৯৭ সালে আর্থিক খাতে বিরাট সংকট পূর্ব এশীয় দেশগুলোর বেশিরভাগ অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় তৈরি করে।  এই সংকট চীনের জন্য বিরাট শিক্ষণীয় ছিলো।  সেসময় মন্দ ঋণ দূর করবার জন্য চারটি বৃহৎ ব্যাংকের সাথে যুক্তভাবে চারটি ব্যাংক খোলা হয়।  এই নতুন ব্যাংকগুলোতে  ২০০৩ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মন্দ ঋণের হিসাব স্থানান্তর করা হয়। এরপর ব্যাংকগুলোতে পুঁজির যোগান দেয়া হয় এবং বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। ২০০৫ ও ২০০৬ সালে হংকং ও সাংহাই-র শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তোলা হয়।  চীনের বৃহৎ ব্যাংকগুলোর শেয়ার বাজারে প্রবেশ একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব,  যার মধ্য দিয়ে এগুলো বিশ্বের বৃহৎ ব্যাংকগুলোর সাথে একতালে অবস্থান গ্রহণ করে। হংকংসহ চীনের পুঁজি বাজার এখন বিশ্বের পুঁজি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম মনোযোগ ক্ষেত্র।  এর পুঁজি প্রবাহের পরিমাণ এখন ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।  এটি এখন নিউইয়র্কের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পুঁজিবাজার।  চীনের রাষ্ট্রীয় অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানও শেয়ার বাজারের মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয় করেছে।  সাংহাই ও শেনজেন-এর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ১৮০০। ১৯৯৩ সালে হংকং পুঁজিবাজারে চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশ শুরু হয়।এখন হংকং-এর পুঁজি বাজারে শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ কোম্পানিই চীনের।

১৫ বছরের অনেক কঠিন দরকষাকষির পর নানা শর্ত পূরণ করে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে ২০০১ সালে।  ১৯৯০ দশকে চীনের বিভিন্ন প্রদেশে বহুসংখ্যক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠে। বিদেশি বিনিয়োগও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।  প্রথমদিকে বিদেশি বিনিয়োগের  কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে হয়েছে।  বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণের পর এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।  ২০০৯ সালের মধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগ বিদেশি বিনিয়োগ আসে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে।  বিদেশি বিনিয়োগের কেন্দ্রীভবন ঘটেছে প্রধানত দুটো এলাকায়।  এগুলো হলো: গুয়াংদং এবং ইয়াংসী নদী অববাহিকা বা সাংহাই ও দক্ষিণ জিয়াংসু প্রদেশ। এই দুটি অঞ্চল মোট বিদেশি বিনিয়োগের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে যা চীনের মোট রফতানির শতকরা ৭০ ভাগ গঠন করেছে।


[1] Carl E. Walter, Fraser J.T. Howie: Red Capitalism, The Fragile Financial Foundation of China’s Extraordinary Rise, Wiley, 2012. pp 5-35.

ট্রাম্পের জয় কী প্রভাব ফেলবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে?

সি রাজা মোহন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

একটি আতঙ্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আতঙ্ক ইউরেশিয়াকে তাড়া করে ফিরছে। কারণ ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ ও এশিয়া প্রশ্নে আমেরিকান কৌশলের মূলনীতি তিনি বাতিল করে দেবেন। ইউরেশিয়াজুড়ে তথা প্যারিস থেকে টোকিও, ব্রাসেলস থেকে সিঙ্গাপুর, বার্লিন থেকে সিউল পর্যন্ত সরকারগুলো ট্রাম্পের একেবারে অপ্রত্যাশিত বিজয়ের পরপরই সম্ভাব্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন শুরু করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় সামরিক জোট গঠনের মাধ্যমে ইউরেশিয়ান নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে দূরবর্তী শক্তি আমেরিকা প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ১৯৭০-এর দশকের সূচনায় পূর্ব সুয়েজ থেকে গ্রেট ব্রিটেন নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় উপকূলজুড়ে প্রধান বহিঃশক্তিতে পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্র।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনান্ড ট্রাম্প আমেরিকান গাঁটছড়ার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরেশিয়ান অংশীদারদের মধ্যকার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পুনঃবণ্টন দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যদি তাদের প্রতিবেশীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে তবে তিনি তাতেও তেমন উদ্বিগ্ন হবেন না।

রাজনৈতিক দৃশ্যপটে থাকা উভয় পক্ষের হস্তক্ষেপবাদীদের বিপরীতে ট্রাম্প জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধকে মারাত্মক ভুল হিসেবে সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, সর্বজনীন মূল্যবোধ বিকাশের কল্পনার পিছু ধাওয়া না করে এবং বিশ্বজুড়ে ব্যয়বহুল ও অসফল জাতিগঠন কাজে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত বরং আত্ম-স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া।

‘রুশ হুমকি’ প্রশ্নে ওয়াশিংটনের কান্ডজ্ঞানহীন অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন ট্রাম্প। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, তার সাথে কাজ করা যায়। ইরাক ও সিরিয়ার আইএস-কে পরাজিত করতে তিনি মস্কোর সাথে অংশিদারিত্বের আহবান জানিয়েছেন। তিনি দেশে ও মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চরম পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দক্ষিণ থেকে অভিবাসন ঠেকাতে তিনি একটি দেওয়াল নির্মাণ করবেন, এবং এজন্য মেক্সিকোকে খরচ দিতে বাধ্য করবেন। তিনি আমেরিকায় বেইজিংয়ের ‘অর্থনৈতিক ধর্ষর্ণের’ সমাপ্তি টানার জন্য যে সস্তা চীনা পণ্যরাজি আমেরিকান চাকরিগুলো শেষ করছে, তার ওপর বিপুল মাত্রায় কর আরোপ করবেন।

ট্রাম্পের নির্বাচন ও  জয় ন্যাটো ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দফতর  ব্রাসেলসে ভয়াবহ ভীতির সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাটো কমান্ডাররা ইউরোপ থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারে ট্রাম্পের নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতারা রোববার জরুরি এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ট্রাম্পের নির্বাচন বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন কনভেনশন এবং ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি এবং ভবিষ্যতে আমেরিকার সাথে যুদ্ধপরবর্তী জোটের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা নির্বাচনী প্রচারণার সময় পুতিনের সাথে ট্রাম্পের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের জয়ের ফলে ইউরোপে উগ্র জনপ্রিয় দলগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠবে বলেও মূলধারার ইউরোপিয়ান দলগুলো ভীত।

আমেরিকার এশিয়ার মিত্ররা তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল, সে ব্যাপারে ট্রাম্পের কাছ থেকে নতুন করে আশ্বাস চাচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সাথে বৈঠকে বসবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। জাপানের সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী জোটের ব্যাপারে ট্রাম্পের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করবেন তিনি।

নির্বাচনের পরপরই চীনা নেতা শি জিনপিং টেলিফোনে আলাপ করেছেন ট্রাম্পের সাথে। তিনি বলেছেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একমাত্র পথ হলো দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা। শি ছিলেন

কার্যত: বেশ বিনীত। কিন্তু দেশটির পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বেশ অসংযত মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক কর বসায় তবে সেটার সমুচিত জবাব দিতে চীন প্রস্তুত। সোমবারের সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি ট্রাম্পকে হুঁশিয়ার করে জানায়, তিনি চীনের সাথে নিশ্চিত পরাজয়মূলক বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িত হয়, তবে তাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন, অজ্ঞ ও অযোগ্য হিসেবে নিন্দিত হতে হবে।’

বিশ্বের একেবারে প্রত্যেকেই ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের গদি লাভ নিয়ে আতঙ্কে ভুগছে, এমন নয়। ট্রাম্পকে নিয়ে ভালো কিছু হওয়ার আশা করতেই পারে রাশিয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। জাপানের অনেক আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের জোট নিয়ে নতুন সমঝোতা হবে এবং এতে করে এই অঞ্চলে টোকিওর নিরাপত্তাগত ভূমিকা বৈধ ও সম্প্রসারিত হবে। বারাক ওবামার বিদায়ে মধ্যেপ্রাচ্যের ইসরাইল, মিশর ও সৌদি আরব খুশি হয়েছে। তারা এই অঞ্চলে বন্ধুদের পরিত্যাগের জন্য ওবামাকে দায়ী করে ট্রাম্পের কাছ থেকে আশা করতে পারে, তিনি পুরনো মিত্রতা ঝালাই করবেন, ইরানের প্রতি আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবেন।

আপনি যদি বড় শক্তি হন এবং আপনার মন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে অনেক দেশের সামনেই আপনার নীতি মেনে নিতে বাধ্য হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। আমেরিকার প্রতিবেশী ও বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডা ইতোমধ্যেই নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট নিয়ে নতুন করে আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায় এই চুক্তিটি হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড় চাকরিখোর।

অবশ্য অনেকে এমন আশাও করছেন, ওয়াশিংটনে দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে চরম বাগাম্বড়তাপূর্নতা ছেড়ে ট্রাম্প মধ্যপন্থাই অবলম্বন করবেন। অন্য কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে নানা ধরনের বিপরীতমুখী বক্তব্য ছিল। এগুলো প্রয়োগ করা সহজ নয়।

তবে দিল্লির কর্মকর্তাদের উচিত ওয়াশিংটনে ধারাবাহিকতার বদলে ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা। ট্রাম্প অবশ্যই ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের সাথে কোনো না কোনো ধরনের খাপ খাওয়ানোর পন্থা খুঁজে নেবেন। কিন্তু তবুও তার অনেক সমর্থকের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি প্রবল ভাবাবেগকে তিনি স্রেফ উড়িয়ে দিতে পারবেন না। ট্রাম্প তার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতিতে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে এলেও ইউরেশিয়ার ভূরাজনীতি আর আগের মতো থাকবে না।

লেখক : পরিচালক, কার্নেগি ইন্ডিয়া, দিল্লি এবং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সম্পাদক

বৈষম্যপূর্ণ কর্মহীন প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘রাজনৈতিক উচ্ছাস’

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অনেক অর্থনীতিবিদই বলেছেন, জিডিপির মধ্যে একটি দেশের মানুষের উন্নয়ন, সন্তুষ্টি বা সমৃদ্ধি পরিমাপের কিছু নেই। এসব বোঝার জন্য ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। তাদের মতে, জিডিপি দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাপা যায়, কিন্তু দেশের মানুষের ভালো-মন্দের কিছুই বোঝা যায় না। একটি সুষম অর্থনীতির দেশ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে; অর্থাৎ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ও সুখী জীবন যাপন করবে, চরম বৈষম্য ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাবে। কিন্তু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধিও এসবের নির্দেশক নয়। অর্থাৎ জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ কতটা ভালো আছে তা জানার জন্য যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো জিডিপির বাইরে পাঁচটি সূচক ব্যবহার করার ঘোষণা দেন। এগুলো হলো- ভালো চাকরি, সরকারি নীতির ভালো-মন্দ, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও সুস্বাস্থ্য।

বাংলাদেশ এক দশকের বেশি সময় ধরে ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে। গেল অর্থবছরে সেটি ৭ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে দাবি করছে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে কি মানুষের অবস্থার খুব কী বেশি উন্নতি হয়েছে? এ প্রবৃদ্ধি কর্মহীন ও বৈষম্যপূর্ণ। কর্মহীন প্রবৃদ্ধি কথাটি প্রথম ব্যবহার করে ইউএনডিপি। সংস্থাটি ১৯৯৩ সালে তাদের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এই পদবাচ্য সর্বপ্রথম ব্যবহার করে। এই প্রতিবেদনের ভাষ্য মতে, বিশ্বের অনেক দেশই এই এক নতুন পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে। এসব দেশে উচ্চ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। এমন এক কর্মহীন প্রবৃদ্ধি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তাই আমাদের ভাবতে হবে কর্মহীন প্রবৃদ্ধি না বাড়িয়ে দেশকে কী করে আমরা কর্মসমৃদ্ধ প্রবৃদ্ধির বলয়ে উন্নীত করতে পারি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে জানা যায়- ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি; বরং কর্মসংস্থান কমছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহযোগিতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রণীত ‘এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক পর্যালোচনায় এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে এ সংস্থাটি বলেছে, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর থেকে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছর থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১১ শতাংশ।  এ সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি না বেড়ে বরং কমে যায়। এ সময় কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিদেশি কর্মীরা যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে, তাও এ দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভ‚মিকা রাখছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করেছে, সেটিও চলতি অর্থবছরের জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  এ টাকা ফেরত পাওয়া গেলেও নতুন করে জিডিপিতে যোগ করা হবে না। প্রবাস থেকে বাংলাদেশিরা যে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠায় বছর বছর, তার জায়গাও নেই জিডিপির হিসাবে। এক্ষেত্রে দুটি দেশের কথা ভাবা যাক। দুটি দেশই এক বছরে ১০০ টাকার পণ্য ও সেবা উৎপাদন করেছে। অর্থাৎ তাদের জিডিপি সমান। কিন্তু একটি দেশের সরকার ১০০ টাকার মধ্যে ৯০ টাকা অপ-ব্যবহার করেছে। আরেক দেশের সরকার ১০০ টাকা জনগণের কল্যাণে সমহারে ব্যয় করেছে। এই দুই দেশের মধ্যে কোনটি ভালো, তা জিডিপি দেখে বোঝা যায় না। ফলে শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঠিক চিত্রও বোঝা যায় না। তা সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলো জিডিপির উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিসের মতে, জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা পরিমাপের সঠিক উপায় নয়। এটি নাগরিকের অবস্থার ভালো-মন্দ তুলে ধরতে পারে না। ২০০৯ সাল বাদে প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। কিন্তু বেশির ভাগ নাগরিকের জীবনমান ৩৩ বছর আগের মানের চেয়েও খারাপ দশায় পৌঁছেছে। অর্থনীতির সুফল চলে গেছে সর্বোচ্চ সম্পদশালীদের কাছে। আর নিচের দিকে এখন যে মজুরি রয়েছে, প্রকৃত অর্থে এটি ৬০ বছর আগের মজুরির চেয়ে কম।

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করেছে ধনীক শ্রেণী। বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে মানুষের সম্পদ বেড়েছে তিনগুণ; আর প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা সংস্থা ক্রেডিট সুসির সাম্প্রতিক  এক জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন বাড়তে থাকায় বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে। ক্রেডিট সুসির তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মোট প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২৬ লাখের বেশি। আর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি এসে তা ১০ কোটি ৭২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মানুষের হাতে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ছিল। ১৫ বছরের মাথায় তা বেড়ে হয়েছে ২৩৭ বিলিয়ন। ক্রেডিট সুসির হিসেবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি। পূর্ণবয়স্ক নাগরিকদের ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তার পরিমাণ মাথাপিছু দশ হাজার ডলার বা ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার কম। বাকিদের সম্পদের পরিমাণ গড়ে দশ হাজার থেকে এক লাখ ডলারের মধ্যে। এদের মধ্যে ১২ লাখ বাংলাদেশিকে ‘মধ্যবিত্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ক্রেডিট সুসি, যাদের প্রত্যেকের হাতে অন্তত ১৭ হাজার ৮৮৬ ডলারের সম্পদ রয়েছে। মানুষের সম্পদ বাড়লেও বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অবস্থানের খুব একটা নড়চড় হয়নি।  দুই হাজার সালে বাংলাদেশিদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল বৈশ্বিক সম্পদের শুন্য দশমিক ১ শতাংশের কম; এখনও তাই।

সরকার গেল কয়েক দিনে দাবি করছে, তারা দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে পেরেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ এখনো খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট প্রকট। এমনকি তিনবেলা পেটপুরে খাওয়া তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইচ্ছেমতো বৈচিত্র্যময় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না; তারা অপুষ্টিরও শিকার। নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও এখনো প্রতি তিনজনে একটি শিশু নিপীড়নের শিকার। নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও গত কয়েকবছরে দেশের অতি অপুষ্টিহীনতার হার সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। দেশের গ্রামাঞ্চল ও বস্তিতে এ প্রবণতার হার বেশি। সরকারের কথা সত্য ধরে নিলে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ হতদরিদ্র। এরা অনেকেই ভিক্ষুক; দুই বেলা খেতে পায় না। হতদরিদ্র এসব লোকজন তাদের ভাগ্যকে অভিসম্পাত দেয়। অথচ তাদের স্বজন এবং পরিবারের লোকজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ দিয়েছে, চরম নির্যাতন ভোগ করেছে,  দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ হচ্ছে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ। এর অর্থ হচ্ছে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ দুই বেলা খেতে পায় না। জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিদিন-প্রতিরাত সংগ্রাম করে তারা, বেদনায় অশ্রু বিসর্জন করে নীরবে-নিভৃতে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আনন্দ তাদের কাছে অপরিচিত শব্দ। তারা শুধু শুনতে পায় কান্না, নবজাতকের আর্তনাদ, প্রবীণের আহাজারি। বিশ্বের প্রায় ১৭৫টি দেশ আছে যাদের মোট জনসংখ্যা দুই কোটির কম। সাম্প্রতিক হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকজনের পরিমান হচ্ছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যার অর্থ হচ্ছে- প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ সীমার নিচে বসবাস করে। এই চার কোটি মানুষ সত্যিই গরিব।

হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে বা খানা আয় ও ব্যয় জরিপ মোতাবেক এ দেশের আয়-বৈষম্য পরিমাপক ’গিনি সহগ’ ২০০৫ সালে শূন্য দশমিক ৪৬৭ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং ২০১০ সালের একই জরিপে ওই সহগ শূন্য দশমিক ৪৬৫-এ রয়ে গেছে। তার মানে ওই পাঁচ বছরে আয়-বৈষম্য আর না বাড়লেও কমানো যায়নি। (২০১৫ সালের হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের ফল এখনো পাওয়া যায়নি)। কোনো দেশের গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৫ অতিক্রম করলে ওই দেশকে ‘উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; আমরা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ২০১০ সালের উপাত্ত মোতাবেক এ দেশের ১০ শতাংশ ধনী ব্যক্তি দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৮ গুণ বেশি আয় ও সম্পদের মালিক। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের, এ কে খান ও ইস্পাহানি (অবাঙালি)। ওই বাংলাদেশেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২০১৫ সালে কোটিপতির সংখ্যা ৫৭ হাজার অতিক্রম করেছে। গত ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে এক কোটি টাকার বেশি আমানতের অ্যাকাউন্ট রয়েছে লক্ষাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল একটি ক্ষুদ্র অথচ ধনীক জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়ার বিপদ সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যাথা নেই।

মোট আয়ে দরিদ্রদের আয়ের অংশ ১৯৯১-৯২ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ; যা ২০১০ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২২ শতাংশে। নিম্ন মধ্যবিত্তদের আয়ের অংশও এ সময়ে ১০ দশমিক ৮৯ থেকে ৯ দশমিক ১০ শতাংশে নামে। আর মধ্যবিত্তদের আয়ের অংশ ১৫ দশমিক ৫৩ থেকে কমে গিয়ে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে যায়। অন্যদিকে সবচেয়ে উপরের ১০ শতাংশের আয়ের অংশ ২৯ দশমিক ২৩ থেকে বেড়ে ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশে উঠে যায়। এসব পরিসংখ্যান (যেগুলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ থেকে প্রাপ্ত) থেকে এটা স্পষ্ট যে, আয়ের বণ্টনের দিক থেকে দেখলে গত দুই দশকে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থার অবনতি ঘটেছে, আর উচ্চবিত্তরা উঠেছে উপরের দিকে।

আয়ের বণ্টনে অসাম্য বৈষম্যের একটি মাত্র দিক। আসলে বৈষম্য বহুমাত্রিক বিষয়; আয় ছাড়াও রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে শ্রেণীবৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য। শিক্ষার কথাই ধরা যাক। এ কথা বলতে হবে যে, দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জন্য শিক্ষা খাতে অনেক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এ শ্রেণীর শিশু-কিশোররা যে ধরনের স্কুলে যায় আর সেসব স্কুলে কী মানের শিক্ষা দেয়া হয়, সেটা উচ্চবিত্তদের শিক্ষার মানের সঙ্গে তুলনা করলেই এক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্রটি কিছুটা হলেও পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যে বিরাট, তা সহজেই বলা যায়। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে চিত্রটা এত পরিষ্কার নয়। শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য হয়তো কমেছে, কিন্তু জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বেতন ও মজুরির ক্ষেত্রে এ কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়? খুব সম্ভবত না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে, ২০০৫-১০ সময়কালে গ্রাম ও শহরের মধ্যে গড় আয়ের পার্থক্য কমেছে। বস্তুত গত কয়েক দশকে গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে, ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ সুসংবাদের পেছনেও রয়েছে শ্রেণীবৈষম্য। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ১৯৯১-৯২ থেকে গ্রামাঞ্চলেও আয় বণ্টনে অসাম্য বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন হতে প্রাপ্ত আয় থেকে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তরা উচ্চবিত্তদের তুলনায় কম সুফল পেয়েছে।

অনেক কারণেই অসাম্য বৃদ্ধি কাম্য নয়। প্রথমত. নৈতিক অবস্থান থেকে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, শুধু প্রবৃদ্ধিও যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে অসাম্যের লাগাম টেনে রাখা উচিত। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাজার সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আয় দ্রুত বাড়লে তা ভোগ ও চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে-এটা বোঝার জন্য শক্তিশালী অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। চতুর্থত, উচ্চপ্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাস (এবং সম্পূর্ণভাবে দূর করা) যদি লক্ষ্য হয়, তাহলেও অসাম্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কেন? প্রবৃদ্ধি হলেই তো দারিদ্র্য কমে যাওয়ার কথা। অবশ্যই প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমানোর একটি জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি যথেষ্ট নয়। কী ধরনের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী প্রশ্ন- অসাম্য কমছে না বাড়ছে, সে বিষয়টি। উন্নয়নের নিম্ন স্তরে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য যে হারে বাড়ে, উপরের স্তরে কিন্তু সে হার কমে যায়। সুতরাং এখন লক্ষ রাখতে হবে যে, দারিদ্র্য হ্রাসের হারে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। দারিদ্র্য হ্রাসের হার ধরে রাখতে হলে অসাম্য হ্রাসের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

মওলানা ভাসানীর প্রাসঙ্গিকতা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

মওলানা ভাসানী সব সময়ই প্রাসঙ্গিক ছিলেন এবং থাকবেন। এখনো আছেন। কেননা তিনি তার সময়ের প্রধান দ্বন্দ্বকে সঠিকভাবে সনাক্ত করেছেন। ওই দ্বন্দ্বে তিনি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। মিত্র শত্রুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মওলানা ভাসানী দাঁড়িয়েছেন জনগণের পক্ষেই। জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই তিনি সব সময়েই প্রাসঙ্গিক।

শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, তিনি অনুপ্রেরণারও উৎস। তিনি দৃষ্টান্তও বটে। মওলানা পীড়িত মানুষের একজন। এই বাংলায় জনগণের পক্ষে দাঁড়ায় এমন বড় মাপের রাজনীতিবিদ দ্বিতীয়টি আর নেই। আমরা দেখেছি এখানে চিত্তরঞ্জন, সুভাষ বসু প্রমূখ এসেছেন। তাঁদের রাজনীতি ছিলো ভারতীয় রাজনীতির অংশ। মওলানাই প্রথম নেতা যিনি এ অঞ্চলের রাজনীতিকে বাঙলার রাজনীতিতে স্থির রেখেছেন। মওলানা পাকিস্তানের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আসাম মুসলিমলীগের সভাপতি ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য লড়েছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তার জন্য ছিলো কৃষকের মুক্তির আন্দোলন। আসামে যে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন হচ্ছিল, তাতে তিনি কৃষকের পক্ষে লড়েছিলেন। পাকিস্তান গঠনের মাধ্যমে তিনি জনগণের মুক্তিই চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন – তিনি যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন, সেটি এটি নয়। তিনি পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোহের মধ্যে আটকে থাকেননি। পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে তিনি আর সম্পৃক্ত থাকলেন না। কেননা তিনি লড়েছেন জনগণের পক্ষে। এখানেই তিনি অসামান্য। এ বাঙলায় তার মতো দ্বিতীয় দেশপ্রেমিক মেলা ভার। দেশপ্রেমিক এ জন্য যে তিনি কৃষকের বন্ধু, কৃষকের জন্য আন্দোলন করছেন। এই কৃষকের কথা মুসলিম লীগ, কংগ্রেস কখনো বলেনি। তাদের রাজনীতিতেও এদের স্থান ছিল না। মওলানাই প্রথম কৃষকের পক্ষে কথা বলেছেন, তাদের বিষয় তুলে এনেছেন সামনে।

১৯৪৮ সালে মওলানা যখন বুঝলেন এ পাকিস্তান জনগণের পাকিস্তান নয়। তখন তাঁরই নেতৃত্বে অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে গঠিত হলো আওয়ামী-মুসলিম লীগ। তার নেতৃত্বেই ১৯৫৬ সালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ নামটি বাদ দেয়া হলো। বোঝা গেলো তিনি দলটিকে অসাম্প্রদায়িক করতে চাচ্ছেন। তিনি কৃষক ও শ্রমিকের আন্দোলন চাঙা করেছেন। তিনি কৃষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। শ্রমিক ফেডারেশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মওলানা। কৃষক ও শ্রমিকদের বাদ দিয়ে দেশের সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণ অসম্ভব – তিনি এটা ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। দেশের উন্নয়নে কৃষকের ভূমিকা বোঝা কিন্তু জরুরি। কৃষককে রাজনীতিতে আনতে কমিউনিস্টরাও ব্যর্থ হয়েছেন। কমিউনিস্টদের ভেতর ধারণা ছিলো, শ্রমিকই প্রধান চালিকাশক্তি। তারাই দেশকে পরিবর্তন করবে। মওলানা বুঝেছিলেন, আমাদের দেশে শ্রমিক প্রধান চালিকাশক্তি হবে না, কেননা তাদের সংখ্যা কম। অধিকাংশই কৃষক এবং কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি এ কারণে কৃষক ও শ্রমিক উভয়কেই সংগঠিত করেছেন।

তিনি বুঝলেন পাকিস্তান টিকবে না। মওলানা ওই সময়ের দ্বন্দ্বটা ধরে ফেলেছিলেন। ব্রিটিশ আমলে জনগণের প্রধান দ্বন্দ্ব ছিলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে। পাকিস্তান আমলে দ্বন্দ্বটি দাঁড়ালো পাঞ্জাবি শাসনের বিরুদ্ধে। তিনিই প্রথম ১৯৫৬ সালে কাগমারি সম্মেলনে বলেছিলেন (তার আগে পল্টনেও বলেছিলেন) যে, এভাবে চলতে থাকলে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। যিনি মুসলীম লীগ ত্যাগ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ করলেন, পরে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে গঠন করলেন আওয়ামী লীগ, সেই মওলানা ভাসানীই ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করলেন। কেন করলেন? দুটো প্রশ্নে করলেন। তখন সোহরাওয়ার্দী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি পাক-মার্কিন চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেন। মওলানা এটির বিরোধিতা করেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী তখন ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গেছে বলেছিলেন। মওলানা তার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির পক্ষে, মওলানা তার বিরুদ্ধে। এসব কারণে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দলের বামপন্থী নেতা-কর্মীদের নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন (ন্যাপ) করেন। একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের বামপন্থী নেতা-কর্মীরাও এই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যুক্ত হয়। এ পর্যায়ে মওলানা সারা পাকিস্তানের নেতা হয়ে গেছেন। তখন তিনি কেবল পূর্ব পাকিস্তানের নেতা নন। ন্যাপের মধ্যে বেলুচিস্তান, সিন্ধু প্রদেশ, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও পাঞ্জাবের নেতা-কর্মী রয়েছে। সবাই তাকে নেতা মানছেন। কারণ তার মতো নেতা পশ্চিম পাকিস্তানেও নেই।

পাকিস্তান যে একটি ভ্রান্ত রাষ্ট্র ছিলো, সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো। এখানকার মানুষের মতোই ওখানেও অর্থাৎ বেলুচ, সিন্ধ, মহাজের, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মানুষও পাঞ্জাবি শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলো। মওলানা বামপন্থী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ব্রিটিশ আমলে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের দুটো ধারা ছিলো। একটি জাতীয়তাবাদী অন্যটি সমাজতান্ত্রিক। মওলানা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য থেকে এসেছেন। এ কারণে তিনি মুসলিম লীগেই ছিলেন। যখন আওয়ামী মুসলীম লীগ থেকে বের হয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করলেন তখন আর জাতীয়তাবাদী রইলেন না।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বেও হতে পারতো। কেননা মওলানাই স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন বামপন্থী ও সমাজতন্ত্রীরা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান – আমাদের দেশের বড় এ দুই ঘটনায় বামপন্থী তরুণরাই ছিল সবচেয়ে বেশি অগ্রসর। কিন্তু বিভ্রান্তির জন্য তারা খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। তারা ন্যাপকে ভাগ করে ফেলল। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েতপন্থীরা মাওলানার নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর ১৯৭০ সালে বের হয়ে যায় চীনাপন্থীরা। বিশেষত চীনাপন্থীরা চলে যাওয়ার পর মওলানা বড় অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়লেন। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তোয়াহা পদত্যাগ করে যোগ দিলেন নকশালবাড়ী আন্দোলনে। তিনি আবার ছিলেন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি। মওলানাই ছিলেন এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এর মাধ্যমে তোয়াহার সঙ্গে শ্রমিকরাও চলে গেল। ওই সময় শ্রমিক ফেডারেশনও ভেঙ্গে গেল। কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুল হক। তিনিও নকশালবাড়ী আন্দোলনে অন্তর্ভুক্ত হলেন। এতে মওলানার ডান ও বাম হাত, কোনোটিই আর রইল না।

এ পরিস্থিতিতেও মওলানা ভাসানী স্বাধীনতার কথা বলেছেন। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের সময় তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, এর কোনো ফল হবে না। বঙ্গবন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে। তিনি যেন বিষয়গুলো দেখতে পাচ্ছিলেন। ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের পর আইয়ুব খান যখন গোল টেবিল বৈঠক ডাকলেন, তখন মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেখানে না যাওয়ার। তিনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, এতে সমাধান আসবে না। ধরতে পেরেছিলেন, আরেকটি সামরিক সরকার ক্ষমতা নিতে যাচ্ছে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী যখন ঢাকায় অপারেশন চালাচ্ছিলেন তখন তিনি ছিলেন টাঙ্গাইলে। তার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হচ্ছে না – সেটাও তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এ অবস্থায় তিনি কী করতে পারেন? শুনেছি, তাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল মিয়ানমারের মধ্যে দিয়ে চীনে চলে যাওয়ার। কিন্তু তিনি সেখানে যাননি। বাড়িতেই থেকে গেলেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করতে টাঙাইল যায়। এ খবর শুনে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। গায়ের গামছাটিও নেননি। ফতুয়া ও টুপি পড়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন তার এক মুরীদের বাড়িতে। ওই সময় ধরা পড়লে তার কী হতো, আমরা জানি না। মুরীদের বাড়ি থেকে সিরাজগঞ্জ ন্যাপের সাইফুল ইসলাম ও মুরাদুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে চলে গেলেন আসামে।

পড়ে শোনা যায়, তার আকাঙ্ক্ষা ছিল, ভারত হয়ে লন্ডনে চলে যাবেন। বাইরে গিয়ে সর্বদলীয় বিপ্লবী প্রবাসী সরকার গঠন করবেন। কিন্তু তাকে আশ্রয় দেয়ার নাম করে আটকে ফেলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তবে একদিনও তিনি আভাস দেননি যে, তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাকে কারো সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হলেও সেখানে তিনি নিজে যাননি, সাইফুল ইসলামকে দিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন। তার এ বক্তব্য ওখানে প্রচার করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, স্বাধীনতার পক্ষ সমর্থনের জন্য তিনি বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে তার লিখিত বক্তব্য প্রচার করা হয়, তাতেও তিনি পাকিস্তানীবাহিনীর হত্যাকাণ্ড ও নির্মম নিপীড়নে বিরুদ্ধে বিশ্বের জনগণকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে বলেন।

মওলানা জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগাশাহী তাকে জানান এটা তো সব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের নয়; আওয়ামী লীগের যুদ্ধ। এতে ভারত অসুবিধায় পড়ে যায়। যুদ্ধে যে অন্যরাও আছে, সেটা দেখানো তাদের পক্ষে জরুরি হয়ে পড়েছিল। সেজন্য মওলানাকে সভাপতি করে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। তাতে কংগ্রেস, ন্যাপ (মুজাফফর আহমদ), কমিউনিস্ট পার্টির ব্যক্তিরাও ছিলেন। তাদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। তাদের একটি মাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং মওলানা সেখানে সভাপতিত্ব করেন। ওই ছবি পরে প্রচার করা হয়েছে সারা বিশ্বে। তাতে প্রমাণ হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্যরাও আছে। মওলানা কিন্তু একদিনও বলেননি যে এটা সাজানো। সভাপতিত্ব করার জন্য তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পরে তিনি বলতে থাকলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের প্রভাব আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। এটি ছিল তার ঐতিহাসিক উপলব্ধি। সেজন্য ফারাক্কার বিরুদ্ধে তিনি লংমার্চ শুরু করেছিলেন।

এখানে ফারাক্কার ইতিহাস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যারাজটি নির্মাণ করা হচ্ছিল পাকিস্তান আমল থেকেই। সে সময়ে ওটা চালু হয়নি। পাকিস্তান আমলে চালু না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, পাকিস্তান সেটি কিছুতেই মানতে চাইছিল না। সংঘাত সৃষ্টি হবে ভেবে ভারতও কিছু করেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি চালু হলে মওলানা লংমার্চ আয়োজন করলেন এবং সীমান্ত পর্যন্ত গেলেন। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি চলে আসেন।

সব সময় মওলানা ছিলেন জনগণের পক্ষে। মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধিতা, ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ সব আমলেই সত্য ছিল। রাষ্ট্রের জনবিরোধিতার বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। মানুষের কথা তিনি তুলে ধরেছেন, বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে। তিনি ছিলেন জনগণের নেতা।

আমাদের উপমহাদেশে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল। কৃষকের পক্ষে আন্তর্জাতিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি আন্দোলন করেছেন। তিনি ভিয়েনা ও কিউবার শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। তিনি ভিয়েনায় যাওয়ার সময় ইস্কান্দার মির্জা গভর্নর হয়ে এক ধরনের জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। তখন বলা হয়েছিল, মওলানা বিমানবন্দরে নামলে গুলি করে হত্যা করা হবে। এরই মধ্যে তিনি লন্ডন ও কোলকাতা হয়ে দেশে চলে এসেছেন। ইস্কান্দার মির্জা তাকে গুলি করতে পারেননি। বরং নিজেই নির্বাসনে গেছেন।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষের ওপর শোষণ চালাচ্ছে, এটাই হলো তার প্রাসঙ্গিকতার বিশেষ জায়গা। জনগণের পক্ষে থাকার অর্থ এই নয় যে, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়। জনগণের বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলাই তাদের পক্ষে থাকা। জনগণের বিরুদ্ধ শক্তি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী দাঁড়িয়েছেন সব সময়ই। এখনো আমাদের দেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা রয়েছে। এ শাসনের কবল থেকে জনগণ মুক্ত হতে পারেনি। তাই তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক।।