Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 29)

Author Archives: আমাদের বুধবার

মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’

আনু মুহাম্মদ ::

‘মওলানা ভাসানী’ বলে যাকে আমরা চিনি সে ব্যক্তির প্রকৃত নাম তা নয়। তাঁর আসল নামে এই দুই শব্দের কোনটিই ছিল না। মওলানা ও ভাসানী এই দুটো শব্দই পরবর্তীসময়ে তাঁর অর্জিত পদবী বা বিশেষণ। ‘মওলানা’ তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও চর্চার পরিচয়, আর ‘ভাসানী’ সংগ্রাম ও বিদ্রোহের স্মারক। তাঁর জীবন ও তৎপরতা এমনভাবে দাঁড়িয়েছিলো যাতে পদবী আর বিশেষণের আড়ালে তাঁর আসল নামই হারিয়ে গেছে। আসলে তাঁর নাম ছিল আবদুল হামিদ খান। ডাক নাম ছিল চ্যাগা, শৈশবে এই নামই ছিল তাঁর পরিচয়।

প্রাচুর্য্য বিত্ত বৈভব আভিজাত্য যেগুলো রাজনৈতিক সামাজিক প্রতিষ্ঠায় সাধারণত কাজে লাগে সেগুলোর কোনটাই তাঁর ছিল না। জীবনে তিনি যাত্রাদল থেকে শুরু করে দেওবন্দ মাদ্রাসা সব অভিজ্ঞতাই ধারণ করেছিলেন। এসবের মধ্যে তাঁর সাধারণ যে প্রবণতা তাঁকে পরবর্তীকালে বিশিষ্ট করে তুলেছিল তা হলো তাঁর গণসম্পৃক্ততা। এই গণসম্পৃক্ততা তাঁকে নিজের ও চারপাশের সমষ্টির জীবনকে এক করে দেখার ক্ষমতা দান করেছিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদকে দেখেছিলেন উপর থেকে নয়, চারপাশের পিষ্ট মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। দারিদ্র অসহায়ত্ব মানবেতর জীবন যে নিয়তি নয়; নির্দিষ্ট কিছু কারণ ব্যবস্থা ও ক্ষমতা এগুলোকে সৃজন করে, টিকিয়ে রাখে এই উপলব্ধি তাঁকে আর সব মওলানা পীর থেকে ভিন্ন করে ফেলে। এই জগতে তিনি হয়ে পড়েন নি:সঙ্গ আর জনতার মধ্যে তিনি পরিণত হন মজলুম জননেতায়।

মওলানা পীর মাশায়েখরা আমাদের সমাজে এমনিতেই খুবই ক্ষমতাবান। শাসক ও শোষকেরা এদের সবসময়ই পৃষ্ঠপোষকতা দেয় নিজেদের ভিত্তি শক্ত রাখবার জন্য। আর অন্যদিকে বহু মানুষ নিজেদের অসহনীয় জীবনকে সহনীয় করবার জন্য এই ধর্মীয় নেতা বা পেশাজীবী হুজুরের কাছেই হাজির হন। দোয়া, ভরসা, ঝাড়ফুক তাবিজ দিয়ে অসহায় মানুষ শরীরের অসুখ সারাতে চান, সন্তানের নিরাপত্তা চান, বিপদে আপদে আল্লাহর আশ্রয় চান, জমিদার জোতদারসহ বিভিন্ন কায়দার জালেম-এর হাত থেকে বাঁচবার জন্য কোন অলৌকিক সহায়তার প্রার্থনা করেন।

যেখানে চিকিৎসার পয়সা নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই; যেখানে নিজেদের আলাদা শক্তি আছে – সেই বোধ স্পষ্ট নয়; যেখানে নদী ভাঙন, জমিদার মহাজন কিংবা জুলুমবাজ ক্ষমতাবানদের অত্যাচার শোষণে বর্তমান রক্তাক্ত ভবিষ্যৎ ভীতিকর, সেখানে এই পথ ছাড়া মানুষের সামনে আর কী পথ আছে? অধিকাংশ পীর মওলানা পয়সা নেন, খাওয়া দাওয়া করেন, এসব বিষয়ে দাওয়াই দেন এবং মানুষকে ধৈয্য ধরতে বলেন, সবর করতে বলেন, কপাল আর বরাত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেন। কিন্তু নিজেরা নানাভাবে আটকে থাকেন তাদের সাথেই, যারা সংখ্যালঘু কিন্তু জালেম ক্ষমতাবান। জালেমদের উপর ধর্মীয় নেতাদের নির্ভরতা, আবার ধর্মীয় সার্টিফিকেটের ব্যাপারে জালেমদের নির্ভরতা এক দুষ্টচক্র তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে তারা রক্ষা করে পরস্পর পরস্পরকে। কিন্তু মানুষের সামনে তৈরি হয় এক অচলায়তন। সেজন্য অধিকাংশ পীর মওলানা মানুষকে ইহকালের দুর্বিষহ জীবনের কারণ নির্দেশ করতে অপারগ এবং অনিচ্ছুক থাকেন। নানা ঝড়ঝাপটা আর আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত মানুষদের কাছে তাঁদের একমাত্র বক্তব্য থাকে ধর্মীয় আচারপালনে, পরকালের অসীম সুখ পাবার জন্য ইহকালের বিষয়ে ধৈর্য্য ধারণ করতে। এইধরনের ধর্মীয় নেতাদের বয়ানে তাই ক্ষমতার তোয়াজ, নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বিষ থাকে।

মওলানা ভাসানীও পীর ছিলেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর মুরিদ ছিলেন। ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ ভেদ না থাকাতে তাঁর কাছে কারও আসতে বাধা ছিল না। বিভিন্ন ধর্মের নারী পুরুষ এবং বলাই বাহুল্য গরীব মানুষ যাঁরা জমিদার মহাজন আর মালিক শ্রেণীর শোষণ পীড়নে বিপর্যস্ত ক্লিষ্ট তাঁর কাছে এসে হাজির হতেন। অন্যান্য ধর্মজীবীর মতো এইসব মানুষের দু:খ দুর্দশা মওলানার আয় উপার্জনের উৎস ছিল না। মওলানা দোয়া পানিপড়া ঝাড়ফুঁক সবই দিতেন, কিন্তু অসুখ বেশি হলে পরামর্শ দিতেন ডাক্তার দেখাতে, প্রয়োজনে ওষুধ কেনার জন্য টাকাও দিতেন।

আরও যে জায়গায় এসে তিনি অন্যদের থেকে শুধু আলাদা নয়, প্রায় বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন নিজেকে সেটিই এক মওলানাকে যুক্ত করেছিল এক ভাসানীর সঙ্গে। মানুষ তাঁর কাছে ভরসা চাইতেন আর বলতেন কিংবা জীবন্ত স্বাক্ষর হিসেবে হাজির হতেন অবর্ণনীয় অন্যায় এবং অবিচারের। এই জীবন নিয়তির বিধান, আল্লাহ এভাবেই বেশিরভাগ মানুষের জীবন নরক করে নির্ধারণ করেছেন, আর সব ক্ষমতা সম্পদ দান করেছেন লম্পট জালেমদের হাতে, এই বিশ্বাসচর্চা থেকে তিনি সরে এসেছিলেন অনেক আগেই। বরঞ্চ তাঁর অবস্থান ছিল এই যে, এই নারকীয় অবস্থা নিয়তি নয়, এটা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান নয় আর সর্বোপরি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে এই অবস্থা পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই তিনি জীবনের তরুণ কাল থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত’ এটা তাঁর জীবনের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ইসলাম ধর্ম তাই অন্য প্রতিষ্ঠিত শাসকদের পেয়ারা পীর মওলানা থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন বিশ্লেষণে উপস্থিত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর জীবন, উচ্চারণ এবং সংগ্রামে। যা ইসলাম ধর্মের মালিকানায় অধিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র, সামরিক শাসক, জোতদার মহাজন সামন্তপ্রভু, তাদের পেয়ারা পীর মওলানাদের ক্ষিপ্ত করেছিল। তিনি অভিহিত হয়েছিলেন ‘ভারতের দালাল’, ‘লুঙ্গিসর্বস্ব মওলানা’ এমনকি ‘মুরতাদ’ হিসেবে। শাসক শোষকদের এই ক্ষিপ্ততা আসলে ছিল একটা শ্রেণীগত রোষ। সবদিক থেকেই, পোশাক জীবনযাপন বয়ান আওয়াজ সবদিক থেকেই, ভাসানী ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষ। এবং লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অভিজাত ইসলামের বিপরীতে তাঁর কাছে অন্য ইসলামের ভাষা তৈরি হয়। ধর্ম যেখানে শাসক জালেমদের একচেটিয়া মালিকানাধীন নিরাপদ অবলম্বন সেখানে মওলানা ভাসানী সেই নিরাপদ দুর্গকেই হুমকির মুখে নিক্ষেপ করেছিলেন।

অন্যায় অবিচার তো বিমূর্ত নয়, দু:খ দুর্দশাও অজানা গ্রহ থেকে নেমে আসা ব্যাপার নয়। দায়িত্ব আর সংবেদনশীলতা দিয়ে মানুষের এসব অভিজ্ঞতা দেখলে উন্মোচিত হয় এক বিরাট রহস্য। আবিষ্কার করা যায় মানুষের মানবেতর জীবনের কারণ, সনাক্ত করা যায় এর পেছনের সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ম বিধি। পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করা যায় সেসব শ্রেণী গোষ্ঠী যারা এসব ব্যবস্থার উপরই দাঁড়িয়ে থাকে, এসব ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করে, ধর্মও যা থেকে বাদ যায় না। এর থেকে সার্বিক মুক্তি লাভের লড়াই তাই অনির্দিষ্ট হতে পারে না, লক্ষ্যহীন হতে পারে না। এরজন্য দরকার এমন একটা সমাজ এর চিন্তা করা স্বপ্ন দেখা ও দেখানো, যার প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে মানুষ এই নারকীয় অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করবে। সৌদী আরব নয়, ভাসানী তাই লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন সমাজতন্ত্র। যে সমাজ মানুষকে হাসি দিতে পারে মানবিক জীবন দিতে পারে সেরকম সমাজই তিনি লক্ষ্য হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থিত করেছিলেন।

সুতরাং অন্যায় অবিচার আর দু:খ দুর্দশা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য দোয়া দরূদ নয়, দরকার সমষ্টিগত লড়াই – এর রাস্তা তৈরি, এই উপলব্ধি মওলানাকে একই সঙ্গে সক্ষম করেছিল সংগ্রামের প্রতীক ভাসানী হয়ে উঠতে। যে ভাসানী সবরকম জালেমদের প্রবল দাপট আর আগ্রাসনের সামনে লক্ষ মানুষের স্বর নিজের কন্ঠে ধারণ করে পাল্টা ক্ষমতার প্রবল শক্তিতে রুখে দাঁড়াতেন, এক কন্ঠে জনতার ভেতর থেকে উঠে আসা অসীম শক্তিকে মূর্ত রূপ দিতেন। ক্লান্ত বিবর্ণ ক্লিষ্ট মানুষ শুধু নয়, প্রকৃতিকেও প্রাণবন্ত তরতাজা করে তুলতো জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের হুশিয়ারি: ‘খামোশ’!

এই উচ্চারণ নিয়ে তিনি ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীনতা উত্তর কালে স্বপ্নভঙ্গের কালে মানুষের হতাশা ও প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, ভারতের শাসক শ্রেণীর পরাক্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফারাক্কার অভিশাপের বিরুদ্ধে সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বামপন্থী নেতাদের ভ্রান্তিও হঠকারিতায় ভাসানীর ক্ষমতা নানা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনিও হতাশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাঁর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটোই তাই আমাদের লড়াই-এর শিক্ষা। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও বাংলাদেশের মানুষ যখন সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের শাসক শ্রেণীর নতুন নতুন আগ্রাসনে বিপর্যস্ত, লুটেরা শাসক শ্রেণীর দখল লুন্ঠনে দিশেহারা, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্প্রসারণে বিভ্রান্ত, তখন নিপীড়িতের ধর্মের মুক্তির ভাষা নিয়ে মওলানা ভাসানী দেশি বিদেশি দানবের বিরুদ্ধে বিশ্বমানবের প্রবল আওয়াজ হয়ে বারবার হাজির হন: ‘খামোশ’!!

 

 

মওলানা ভাসানী : ইতিহাসের নির্মাতা ও স্রষ্টা – (প্রথম পর্ব)

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

গোটা বিশ শতকের সত্তর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে হিসেবে মজলুম জনগনের নেতৃত্বের প্রতীক হয়েই ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। শুধু উপমহাদেশ বলছি কেন, পঞ্চাশ-ষাট দশকে বিশ্বের দেশে দেশে শোষণমুক্তির লড়াইয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আফ্রো-এশিয়া-লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অন্যতম প্রতীক। প্রায় আশি বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সবটা জুড়েই ছিল ইতিহাস সৃষ্টির। আট দশকের রাজনীতির ইতিহাস পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁকে তিনি ছিলেন প্রধান বা অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। পাকিস্তান জন্মের পর আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে শেষ ইতিহাসটি সৃষ্টি করেছেন, ফারাক্কা মিছিলের মধ্য দিয়ে। তখন তার বয়স ৯৬ বছর।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাকালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী এই নেতা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের প্রতি অনুরক্ত। তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ অসম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করে। তৎকালীন পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছিলো ততদিনে। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ব্যাপারে মোহমুক্তি ঘটছিল। ধীরে ধীরে গোটা জাতি সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। আর এই ধারার নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী।

পাকিস্তানের জমিদার ও নব্য পুঁজিপতিদের প্রতিভূ পরিবারগুলির শোষনের নীল নকশা বাঙালীদের অগ্রবর্তী অংশ অনুধাবন করতে পারছিল। এর ফলে স্বতন্ত্র নির্বাচনের বদলে যুক্ত নির্বাচনের দাবি ওঠে। ভাষা ও স্বাধিকারভিত্তিক স্বায়ত্তশাসিত পূর্ববাংলা গঠনের দাবিও সামনে চলে আসে। শিল্প-বাণিজ্যে বঞ্চনার শিকার হওয়া সত্ত্বেও একটি নগরভিত্তিক শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেনী গড়ে উঠতে শুরু করে। সমাজ চেতনায় অধুনিক ও প্রগতিশীল এই শ্রেনী রাজনীতির সামনের কাতারে চলে আসে। ফলে রাজনীতির নতুন মেরুকরণ ও গুনগত পরিবর্তন সূচিত হয়।

যুক্তফ্রন্ট গঠন করে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। দল হিসেবে এটি আওয়ামী লীগকে পেছন যাত্রায় সামিল করে দিয়েছিল। ক্ষমতার প্রতি মোহহীন ভাসানী দলীয় সভাপতি হিসেবে প্রাণপন চেষ্টায়ও এই পেছন যাত্রা রুখতে পারেননি। এর মূল কারণ ছিল, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সরকারে অংশগ্রহনকারী নেতৃবৃন্দ ছিলেন রাজনীতিতে ডান ঘরানার অনুসারী এবং পাকিস্তানের সামন্ত প্রভু ও নব্য পুঁজিপতিদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন।

সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতালোভীরা সংগ্রামের চেয়ে আপোষে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক অবাঙালী শাসকদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। সময়টি ছিল পৃথিবী জুড়ে স্নায়ুযুদ্ধের এবং মার্কিন ও সোভিয়েত বলয় বিস্তারের আগ্রাসী কাল। এ সময়ে সম্পাদিত পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো ও সেন্টোসহ মার্কিন সহযোগিতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার। কেন্দ্রে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য এ কাজগুলি করলেও তিনি শেষ রক্ষা করতে পারেননি।

১৯৫৪ সালের ১৯ মে স্বাক্ষরিত হয় পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি। দলের মধ্যে মওলানা ভাসানী ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি সরকারের করা এই চুক্তির কট্টর বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে সে সময়ে বিরোধী দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দী চুক্তির স্বপক্ষে ছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৫৫ সালে যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। আওয়ামী লীগে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। এই নীতিগত দ্বন্দ্বের মূলে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, পূর্ববাংলার স্বাধিকার ও স্বায়ত্ত্বশাসন, বৈদেশিক নীতিতে জোট নিরপেক্ষ পদ্ধতি অনুসরন।

এরকম একটি আন্ত:দলীয় বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে ১৯৫৭ সালের ০৭ ও ০৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্মেলনে দলের মধ্যে ভাঙ্গনের আলামত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্মেলনের আগে ১৩ জানুয়ারি ভাসানীর রাজনৈতিক বক্তব্যভিত্তিক প্রচারপত্রে কেন্দ্র ও প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী সরকারের প্রতি দলীয় সভাপতির তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছিল। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত “কাগমারির ডাক” শিরোনামের প্রচারপত্রে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দলীয় সভাপতি হিসেবে ভাসানীর মতামত দলের প্রতিই নির্দেশ করা হয়।

কাগমারির ডাক প্রচারপত্রে আহবান জানানো হয়;

এক. সাড়ে চার কোটি বাঙালীর বাঁচার দাবি আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ডাক;

দুই. ঐতিহাসিক মহান একুশ দফা আদায়ের ডাক;

তিন. চাষী, মজুর, কামার, কুমার, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি ও শিল্পী সকল শ্রেনীর মিলনের ডাক;

চার. সাম্রাজ্যবাদের কবল হইতে এশিয়া আফ্রিকার সংগঠিত হইবার ডাক;

পাঁচ. পূর্ববাংলায় ষাট হাজার গ্রামে আওয়ামী লীগকে সংগঠনের ডাক;

প্রচারপত্রে মওলানা ভাসানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়; “একুশ দফার পূর্ণ রূপায়নের জন্য আমাদের নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলন চালাইয়া যাইতে হইবে। ইহা সারা পাকিস্তানের সামাজিক ও আর্থিক পরাধীনতার হাত হইতে মুক্তির মহান শপথ, ইহা যেন আমরা কখনও বিস্মৃত না হই”।

কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক সরকারে অংশগ্রহনকারী আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমতায় গিয়ে একুশ দফা সত্যি বিস্মৃত হয়েছিলেন এবং প্রচারপত্রে দাবিগুলো তুলে তাদের গৃহীত নীতিকেই আঘাত করা হয়েছিল। একমাত্র পাঁচ নম্বর ছাড়া বাকি দফাগুলি উপস্থাপিত হয়েছিল কারন বিদ্যমান আওয়ামী লীগ সরকার সেগুলি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। চার নম্বর দফা সোহরাওয়ার্দীর বৈদেশিক নীতির প্রত্যক্ষ সমালোচনা। স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিও উপস্থাপিত হয়েছিল সরকারের আপোষকামীতা ও সীমাবদ্ধতার জন্য।

১৯৫৭ সালের ৬ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর বক্তব্য তুলে ধরে দৈনিক সংবাদ; “আমি কোন প্রকার যুদ্ধজোটে বিশ্বাস করি না। বিশ্বশান্তি পরিপন্থী যে কোন প্রকার যুদ্ধজোট মানব সভ্যতা ও মুক্তির পথে বাধা স্বরূপ। … যত কঠিন বাধাই আসুক না কেন আমি পাকিস্তানের জনগনের ভবিষ্যত কল্যানের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির জন্য সংগ্রাম করে যাব। কারন আমি বিশ্বাস করি এই সত্যিই পাকিস্তানের জনগনের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তির পথ প্রশস্ত করিবে”।

কাউন্সিলের প্রাক্কালে সভাপতির পক্ষ থেকে দলীয় সরকারের বিরোধিতায় প্রকাশ্য বক্তব্য প্রচার, ইত্তেফাকে জবাব দেয়া ও ভাসানীর তীব্র সমালোচনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্মেলনের আগের দিন ৬ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে সমবেত চার হাজার দলীয় কর্মীর সামনে মওলানা ভাসানী বলেন, “আমাকে যদি কেহ সামরিক চুক্তি সমর্থন করিতে বলেন, তাহা হইলে কবর হইতেও আমি বলিব না, না, না”।

এসব নিয়ে তীব্র বাক-বিতন্ডার পর ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে সমর্থকদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় চলে আসেন। কাউন্সিল সভা পুনরায় শুরু হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থার (সিয়াটো) সদস্যপদ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। সোহরাওয়ার্দী ও সমর্থকগন এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ভাসানীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হন। পরিনামে ১৯৫৭ সালের ১৮ মার্চ মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন সাধারন সম্পাদকের বরাবরে। কয়েকদিন পরেই স্ব-নামে প্রকাশিত প্রচারপত্রে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন;

“গদির মোহে মুসলিম লীগের সহিত হাত মিলাইয়া যাহারা সাড়ে চার কোটি বাঙালীকে চিরকালের জন্য ক্রীতদাস বানাইতে, আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি বিসর্জন দিয়া পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র পাশ করিয়াছিল, তাহারাই আমার ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে বিবৃতি, পোষ্টার, বিজ্ঞাপন ছড়াইয়া সারা দেশময় মিথ্যা প্রচার শুরু করিয়াছে। এইসব কুচক্রীদের দেশবাসী ভাল করিয়া চিনে। তাহারাই গত নয় বছর ধরিয়া পূর্ববাংলা তথা পাকিস্তানের অর্থনীতির কাঠামোকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে”।

চূড়ান্ত ভাঙ্গনের দিকে আওয়ামী লীগ এগোতে থাকে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি, বহিষ্কার-পদত্যাগ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। পরবর্তী জুন মাসের ভোটাভুাটিতে সোহরাওয়ার্দীর বৈদেশিক নীতির পক্ষেই অধিকাংশ প্রতিনিধি ভোট দেন। সুস্পষ্ট অভিযোগ ওঠে যে, ভাসানীর সমর্থকদের একটি বড় অংশকে ভোট প্রয়োগের সুযোগ দেয়া হয়নি। সোহরাওয়ার্দীর সাথে দলের মূল নেতৃত্বের অধিকাংশ এবং প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় মাহমুদ আলী ছাড়া সকলে এর পক্ষে থাকায় এ কারচুপি সম্ভব হয়েছিল।

আওয়ামী লীগে বিবাদমান দুই উপদলই পূর্ববাংলায় স্বায়ত্ত্বশাসন প্রশ্নে একমত ছিলেন, পার্থক্য ছিল প্রকাশভঙ্গির ক্ষেত্রে। ভাসানীপন্থীদের যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্ব পূর্ববাংলাকে শোষণ করে চলেছে, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির ওপর পাঞ্জাবীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রন চলছে, তাদের সাথে আপোষের কোন স্থান নেই। বরং অধিকারবিহীন জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাঞ্জাবকেন্দ্রিক শাসন-শোষণের অবসান ঘটাতে হবে। সোহরাওয়ার্দী পন্থীদের যুক্তি ছিল, আপোষের মাধ্যমে কৌশলে সায়ত্ত্বশাসনের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এই যুক্তির নেপথ্যে ছিল, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিরাপদ রাখা। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য জায়গা তৈরী করে দেয়ার বিষয়টি ছিল বাঙালীর স্বাধিকার এবং সায়ত্ত্বশাসনের বিপক্ষে। ইতিহাস প্রমান করে দিয়েছে আপোষকামীতার মাধ্যমে আর যাই হোক দাবি আদায় করা সম্ভব না। এর পরিনতিতে ১৯৬২ সালে বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর রহস্যময় মৃত্যুর পেছনে পাকিস্তানীর সেনাশাসকদের হাত ছিল, সেটি প্রমানের অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীতে এই মূলগত দাবি পরিনত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

পঞ্চাশ-ষাট দশকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং ইসলামী সাম্যবাদে বিশ্বাসী মওলানা ভাসানী ক্ষমতালোভী নেতাদের বিপরীতে শোষিত জনগনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সোচ্চার ছিলেন যে কোন ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল কমিউনিষ্ট মতাদর্শে উদ্ভুদ্ধ ও শ্রমজীবি মানুষের অধিকার আদায়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ বিশাল রাজনৈতিক কর্মীদল। বুর্জোয়া গণতন্ত্রে তাদের আস্থা-বিশ্বাস না থাকায় এর মাধ্যমে পূর্ববাংলায় স্বায়ত্ত্বশাসন বা একুশ দফা বাস্তবায়িত হবে-এ বিশ্বাস তাদের ছিল সামান্যই। (চলবে)

টার্গেট ‘সংখ্যালঘু’

হায়দার আকবর খান রনো ::

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা, মন্দির ভাঙ্গা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার পর এবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাওতাল পল্লীতেও একই ধরনের আক্রমণ করা হয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু অথবা আদিবাসী হবার কারণে যারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, তাদের উপর এই রকম হামলা কিছুদিন পর পরই হচ্ছে। বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি, বিশেষ করে জমি দখলের জন্য এই ধরনের জঘন্য কাজে অগ্রসর হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় মদদ অর্থাৎ সরকার দলীয় উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি এবং প্রশাসনের সমর্থন বা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের ঘটনা বা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে গঠিত এই দেশে এমনটি ভাবা না গেলেও এটাই এখন বাস্তব।

পাকিস্তানী ভাবাদর্শ-দ্বিজাতিতত্ত্বকে রাজনৈতিকভাবে ও সংস্কৃতিগতভাবে খন্ডন ও পরাভূত করা গিয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতে পেরেছিল। কিন্তু এই মহান যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিল যে রাজনৈতিক দল-তারা সেই সময় জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলেও তার সীমাবদ্ধতা যে ছিল, তা আমরা যারা সেই সময় যুদ্ধ করেছি, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। ’৭১-এর সংগ্রামের উত্তাপ থাকতে থাকতেই যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা ছিল বিরাট বড় ধাপ্পা। জনগণকে বোকা বানানোর কৌশল। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ? তদানীন্তন শাসকদল যে এই ব্যাপারেও খুব স্পষ্ট ও আন্তরিক ছিল না, তা তখনকার বেশ কিছু ঘটনাবলী দেখলেই বোঝা যাবে। আজকের প্রজন্ম অবশ্য সে সব কথা জানে না। কিন্তু আমার বয়েসী যারা, তারা তো চোখের সামনেই দেখেছে ঘটনাবলী।

তবু ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। এটি ছিল একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা এসে নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পাকিস্তানী ভাবাদর্শের সাথে আপোস করলেন, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ছেটে ফেললেন, সংবিধানকে ইসলামীকরণের উদ্যোগ নিলেন, মুসলিম লীগ, জামায়াতে প্রভৃতি দলকে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন এবং কাউকে কাউকে স্বীয় দলে ও মন্ত্রীসভায় স্থান দিলেন। এইভাবে রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা আবার ফিরে এলো। এরপর স্বৈরশাসক এরশাদ সংবিধানে যোগ করলেন ‘ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম।’ এরশাদের ভন্ডামির চূড়ান্ত পর্যায়। ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে গেল।

এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই নানাভাবে ওই অপশক্তির সাথে আপোস করেছে। কথায় ও পোশাকে নিজেদের অধিকতর মুসলমান পরিচয় তুলে ধরতে তারা তৎপর। আওয়ামী লীগও যে এই আপোস ও আত্মসমর্পণের পথ নিয়েছিল তাও বহু ঘটনা দ্বারা দেখানো যাবে। কিন্তু বিএনপি, যার একদা মধ্যপন্থী দল হিসাবে পরিচয় ছিল, সেই বিএনপির অধঃপতন ঘটেছিল অনেক বেশি ও দ্রুততর। জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ বিএনপি এখন পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও রূপান্তর ঘটেছে। একদা যেটুকু জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ কাজ করতো, এখন তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আওয়ামী নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনীর মধ্যে কোন আদর্শবোধ কাজ করে না। টেন্ডারবাজী, মাস্তানী, বেপরোয়া লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল, নদী দখল, পরের জমি দখল এবং লুটপাটের ভাগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ, যার পরিণতিতে নিজেদের লোকও যেমন প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে, তেমনি মায়ের পেটের শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়। এই সবই এখন শাসক দলের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। দখল করার প্রবৃত্তি যেখানে প্রধান সেখানে সবচেয়ে দুর্বল অংশের জমি সম্পত্তি দখল করার আকাঙ্খা থাকবে না কেন? সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাবে-এই তীব্র আকাঙ্খাই কাজ করেছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাতের এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে, অর্পিত সম্পত্তির নামে যে সকল হিন্দু সম্পত্তি দখল করা হয়েছে, তার ৬০ শতাংশ করেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে কয়েকটি জায়গায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী কারবার চালানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের দেশত্যাগ করানো। কারণ হিন্দুভোট আওয়ামী লীগের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ভাবে, হিন্দুরা দেশে থাকলে ভোটটা নিশ্চিত, আর দেশত্যাগ করলে জমিটা দখল করা যাবে।

নাসিরনগরের ঘটনায় শাসক দল যে জড়িত তার বহু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। জনৈক মন্ত্রী ও জনৈক সংসদ সদস্য হিন্দুর প্রতি বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলেছেন, অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন- এমন অভিযোগও আছে। ইতোপূর্বে রামুর ঘটনাতেও আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে সকলেই জড়িত ছিল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির বলেছেন, গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগের জামায়েতীকরণ হয়েছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত অভিযোগ করেছেন, ‘গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপরে হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে অংশ নিতে দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি দলের লোকরা যদি এ ধরনের হামলায় জড়িত হয়, তাহলে এই দেশে হিন্দুরা আর বেশিদিন থাকতে পারবে না।’

দেখা যাচ্ছে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করার ক্ষেত্রে বড় দুটি দলেরই স্বার্থ রয়েছে। বিএনপির ক্ষেত্রে ভোটের হিসাব। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে জমি দখলের আকাঙ্খা।

হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাধারণ মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলার সহজ উপায় হল, ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগ আনা। নাসিরনগরের ক্ষেত্রেও দেখা গেল একজন নিরীহ গরিব হিন্দুর বিরুদ্ধে এমনই ভুয়া অভিযোগ তোলা হলো। সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হলো। তারপরও হিন্দু বাড়িঘরে আক্রমণ করা হলো। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ছিল সন্দেহজনক। শাসক দল, প্রশাসন ও মৌলবাদী শক্তি-সবাই একত্রে হলে তো আসলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

কিছুদিন আগের আরেকটি ঘটনার কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে। শাসকদের স্নেহধন্য নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের সদস্য ও সংসদ সদস্য তার লোকজন নিয়ে জনৈক হিন্দু শিক্ষককে কানধরে উঠবস করিয়েছিলেন। অভিযোগ, উক্ত শিক্ষক নাকি ইসলামবিরোধী বক্তব্য রেখেছেন। হিন্দু নাগরিককে শায়েস্তা করার জন্য এর চেয়ে শস্তা ও সহজ উপায় আর কি আছে।

আমরা দেখলাম, সারাদেশের প্রগতিশীল মানুষ শিক্ষকের পক্ষে দাড়িয়েছিল। কিন্তু ওসমান পরিবারের পক্ষে দাড়িয়ে হিন্দু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সভা করে চরম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রেখেছিল হেফাজতে ইসলাম। কি চমৎকারভাবে মৌলবাদী হেফাজত ও শাসক আওয়ামী লীগ একত্রে মিলে গেল একজন হিন্দু শিক্ষককে মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত করার ও অপমাণিত করার ক্ষেত্রে। অথচ ২০১৩ সালে এই হেফাজতকে দিয়ে খালেদা জিয়া সরকার পতনের ও ইসলামী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন।

এখন শ্রেণী স্বার্থে সবাই এক কাতারে দাড়িয়েছে। লুটপাট যেখানে শ্রেণী বৈশিষ্ট, সেখানে বুর্জোয়া দলগুলোর মধ্যে কোন ফারাক থাকছে না। এই একই কারণে শাসক আওয়ামী লীগ সংবিধানে বড় বড় পরিবর্তন আনলেও এরশাদের অবদান ‘ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম’কে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এক সভায় মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অভিযোগ করেছেন, ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে রাজনীতি। ওই সংবিধানে ফিরে না গেলে রামু, সাথিয়া ও নাসিরনগরের মতো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

বলাই বাহুল্য, এটা মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কথা। সরকারের ভাষ্য নয়। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বলে দাবিদার, সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দল ও প্রশাসনের মদদে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়, তা ভাবতেও বিস্মিত হতে হয়। যে আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোট হল হিন্দু নাগরিকগণ, সেই আওয়ামী লীগের লোকজন হিন্দুর বাড়িঘর, মন্দিরের হামলা চালায়, অগ্নিসংযোগ করে, হিন্দুবিদ্বেষী বক্তব্য দেন, এটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। কারণ সবার উপরে শ্রেণী সত্য। আওয়ামী লীগ এখন যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে সেই শ্রেণী কোন উৎপাদক শ্রেণী নয়, তাহলো নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা বুর্জোয়া। আর লুটপাট করার সহজ টার্গেট হলো ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী।

বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে হলে নির্ভর করতে হবে বামশক্তির ওপর। নাসিরনগরের ঘটনা এই শিক্ষাটি আরেকবার তুলে ধরলো।

রাষ্ট্র কী সংখ্যালঘু আর সাধারন মানুষের বিপক্ষে?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজন স্বপন বিশ্বাস, একসাথে বাম ছাত্র সংগঠন করতাম, হিন্দু-মুসলিম ভেদ তখনও মাথায় ঢোকেনি। ও ছিল খুবই সম্পন্ন পরিবারের। শ’বিঘা ধানের জমি, দশ বিঘার বাড়ি, মহকুমা শহরে কাপড়ের দোকান, অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু পরিবার। আশির দশকের গোড়াতেই পাড়ি জমাতে হলো ভারতে। মিথ্যে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল। ওদের গাঁয়ের বাড়ি অনেকবার গিয়েছি। বাড়ি, বিশাল পুকুর, নিকোনো উঠোন, বিরাট পরিবার-গম্ গম্ করতো সারাক্ষণ। সেই স্বপনরা বাড়িশুদ্ধ ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, সবকিছু ফেলে। কলজে ছিঁড়ে গিয়েছিল প্রিয় বন্ধু চলে যাওয়ায়। অভিমানও হয়েছিল তীব্র।

আরো আগে চলে গিয়েছিল নিরঞ্জন, বাসু, মীরারা। মীরার ওপর দৃষ্টি পড়েছিল এক নেতার। হিন্দুর মেয়ে, বিপদ পদেপদে। একরাতে তারা সবাই উধাও। আগের বিকেলেও নিরঞ্জন, বাসুর সাথে ফুটবল খেলেছি ঈদগাঁহ মাঠে। সকালে গিয়ে দেখি শূন্য ভিটে, কিছু ভাঙ্গা বাসন- কোসন ইতস্তত: ছড়িয়ে আছে। আর আছে ওদের পোষা কুকুরটা। অবিশ্রাম কেঁউ কেঁউ করছে শুণ্য ভিটেয় একা। সেবারেও ছোট্ট কিশোরের হৃদয় ভেঙ্গেছে। এভাবে চলে গেল, না বলেই! মনে হয়েছে,ওরা খুব ভাল মানুষ নয়!

স্বপনরা চলে যাওয়ার সময় বুঝেছি। এ রাষ্ট্র সাধারনের, সংখ্যালঘুদের অধিকার স্বীকার করে না। রাষ্ট্র- সমাজ সাধারন মানুষের নিরাপত্তা দেয় না। নিরঞ্জন, বাসুদের বাবা পানির দামে বসতজমি বেচে দিয়ে চলে গেছেন। স্বপনরা সে সুযোগও পায়নি। স্থানীয় প্রতাপশালীরা লুটে-পুটে নিয়েছে সবকিছু। আমরা কি করছি? শুধু হা-হুতাশ। আর এখনও ফি-বছর দেখছি ভোলা, রামু, নওগাঁ, সাঁথিয়া, গাইবান্ধা, নাসিরনগর…. এর কি কোন শেষ নেই? সকলে মিলে এইসব নারকীয় ঘটনার সাক্ষী হয়েই থাকবো?

অবশেষে বার্ধক্যে এসে বুঝেছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। যিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও গণতন্ত্রী পার্টি হয়ে সবশেষে আওয়ামী লীগে। শেষতক বলেই ফেলেছেন, “বাংলাদেশে যে ধরনের সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবার মধ্যেই সংখ্যালঘু বিতাড়নে ঐক্যবদ্ধ মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। …একটা মজার ব্যাপার হলো, সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, জঙ্গীবাদী কিংবা উগ্র সাম্প্রদায়িক যে সরকারই থাকুক না কেন, হিন্দু বা সংখ্যালঘু বিতাড়নে এখানে একটি প্রবল ঐক্যমত্য আছে”…।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, সংসদ সদস্য, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। প্রাক্তন আইন ও রেলমন্ত্রী। সংসদীয় কমিটিতে তারা সাদা-কালো অনেক আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, প্রণয়নের সুপারিশ করেন। মোটকথা প্রবীন এই নেতা সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের একটি বড় স্তম্ভ। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, অন্যান্য দলের মত সংখ্যালঘু বিতাড়নে তার দলও পিছিয়ে নেই। কি প্রতিকার করবেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বা কার কাছে প্রতিকার চাইবেন?

দুই. প্রযুক্তিই এখন এই দেশে সাম্প্রদায়িক দস্যুবৃত্তির হাতিয়ার হয়ে উঠলো। সাম্প্রদায়িক হামলা ও সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ক্ষেত্র তৈরীতে এটি ভালভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। রামুর ঘটনার সূত্র ধরেই যেন তান্ডব চলেছিল পাবনার সাঁথিয়ায়; যশোরের মালোপাড়ায়। সেই ধারাবাহিকতা ঘটেছে নাসিরনগরে। রামুতে আক্রান্ত হয়েছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়। পাবনায়, যশোরে হিন্দু সম্প্রদায় । নওগাঁ, গাইবান্ধায় সাঁওতাল সম্প্রদায়। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে তান্ডব। কারা গুজব ছড়ায় ফেসবুকে জানা যায়নি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, এটি পরিকল্পিত- যাতে হামলে পড়া যায় সংখ্যালঘুদের ওপর।

মুখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলে ফেনা তোলা এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষয় নতুন নয়। ঘটনা ঘটতে থাকে। আকষ্মিকতায় গরম হয়ে ওঠে মধ্যরাতের মিডিয়া, টক-শো। প্রশাসন-পুলিশের তৎপরতা বাড়ে, ঘটনা ঘটার পরে। হুমকি চলতেই থাকে “কেউ ছাড়া পাবে না, যে দলেরই হোক”। দেশজুড়ে সমাবেশ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি, সড়ক অবরোধ চলে কিছুদিন। ভেতরে তৈরী হয় ক্ষোভ-ঘৃনা-ক্ষুব্দতা। তারপর হঠাৎই স্থবিরতায় আক্রান্ত হলে বিচারহীনতায় ধামাচাপা পড়ে সবকিছু।

মনে পড়ছে, সাঁথিয়ায় যখন তান্ডব চলছিল, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ওই এলাকাতেই। ঘটনাস্থলের পাঁচ মিনিটের দুরত্বে থানা। প্রতিমন্ত্রীর অবস্থান থেকে ঘটনাস্থলে আসতে সময় লাগার কথা বেশি হলে বিশ মিনিট। তার সাথে ছিলেন পুলিশ, র‌্যাব, দলীয় নেতা-কর্মীরা। তিনি আসেননি। পুলিশ অবশেষে পৌঁছেছিল, এক থেকে দেড় ঘন্টা পর। তান্ডব, আগুনে ঝলসানো ঘর-বাড়ি ধ্বংসযজ্ঞ, ছাড়া তখন সেখানে আর কিছুই ছিল না।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সাঁথিয়ার ঘটনা তদন্ত করেছিল। তারা প্রতিবেদন দিয়েছিলেন সরকারের কাছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার জন্য দায়ি করেছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের। ঐসব নেতা-কর্মীরা ছায়া বা আর্শীবাদপুষ্ট ছিল প্রতিমন্ত্রীর। সুতরাং মানবাধিকার কমিশনের এরকম ‘ঔদ্বত্বের’ কারনে তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর মিজানুর রহমান অভিযুক্ত হয়েছিলেন ‘‘জঙ্গীবাদের কথিত অর্থদাতা’’ হিসেবে। অভিযোগ এনেছিলেন সরকারের দু’জন সিনিয়র মন্ত্রী। যদিও ভয়াবহ এই অভিযোগের কোন তদন্ত  হয়নি এবং অচিরেই সাঁথিয়া হামলার তদন্ত-বিচার ধামাচাপা পড়ে যায়।

নাসিরনগরে ফেসবুক নাটকের পুনঃমঞ্চায়ন। হামলার আগে একটি মৌলবাদী সংগঠনের সমাবেশে নাসিরনগরের ইউএনও ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যোগ দিয়েছিলেন। এরপরে হামলা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। এন্তার অভিযোগ থাকলেও এলাকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছায়েদুল হক হামলায় তার সম্পৃক্ততার আভিযোগ এবং হিন্দুদের নিয়ে জঘন্য মন্তব্য করেন অস্বীকার করেন অবশেষে। এ হামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ জড়িয়ে পড়েছিল। তারা ছিল মন্ত্রীর ছত্রছায়ায়, মতান্তরে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির। প্রশাসন ছিল সবকালের মত নিস্ক্রিয়। ঘটনার পর ইউএনও প্রত্যাহার হয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা বহিষ্কার হয়েছেন, কিন্তু আইন-আদালত আমলে আসেননি।

যশোরের মালোপাড়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, আগুন, লুটের ঘটনা হিমাগারে চলে গেছে সেই কবে। ঐ ঘটনায় অভিযোগ ছিল জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ আবদুল ওহাবের দিকে। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছিলেন। ভোটের দিন নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে মালোপাড়ায় হামলে পড়েছিল তার দলবল। এই ঘটনায় অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের সাথেই যুক্ত রয়েছে। কাউকেই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগে কক্সবাজার জেলার রামুতে ১২ টি বৌদ্ধবিহার ও মন্দির এবং ৪০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর পাশের পটিয়ায় হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা চলে। এখানেও ছিল ফেসবুক নাটক। কথিত অবমাননাকারী উত্তম বড়ুয়ার শাস্তি দাবি করে প্রথম মিছিল করেছিল ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা আনসারুল ভুট্টো। ৩০ সেপ্টেম্বর সেখানে সমাবেশে হরতাল ঘোষনায়ও ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এরপরে তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল বিএনপিও। প্রশাসন ছিল যথারীতি নিস্ক্রিয়। সংখ্যালঘু দলনে কি অপূর্ব ঐক্য!

জমিতে ধান চাষ করবে সাঁওতালরা। সেই ধান কেটে নিয়ে যাবে সংখ্যাগরিষ্ঠরা। বাধা দিলে হামলা। রুখে দাঁড়ালে খুন। রাষ্ট্র-প্রশাসন সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে। আদিবাসী সাঁওতাল নেতা আলফ্রেড সরেনকে মনে আছে? নওগাঁর সাঁওতালদের ধান রক্ষার সংগ্রামে জোতদারদের লাঠিয়ালরা পিটিয়ে হত্যা করেছিল তাকে। হত্যাকারীরা ছিল ক্ষমতাসীন দলের। তারা সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের। হয় বিনপি না হয় আওয়ামী লীগ।

আজ থেকে ১৬ বছর আগে। ক্ষমতায় তখন আওয়ামী লীগ। বিচার হয়নি সরেন হত্যাকান্ডের। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল সাঁওতাল পল্লী। পুলিশ এসেছিল বটে, তবে খুন, ধংসযজ্ঞের পরে বিরান ভূমিতে। জোতদারদের সাথে স্থানীয় প্রশাসনের সমঝোতা হয়ে যায়। বিচার হারিয়ে যায় কানাগলিতে। ১৬ বছর পর আবার গাইবান্ধায় সাঁওতাল কৃষকদের ওপর চিনিকল মালিকের সন্ত্রাসী ও পুলিশের সম্মিলিত হামলা। চার সাঁওতাল খুন। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ঘর-বাড়ি। এরও বিচার হবে না, এ সত্য জানে সকলে।

তিন. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আসলে কি? এই চেতনার অবয়ব বা আকারটি কি? সংবিধান সেটির অবয়ব দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা আছে, “… আমরা আরো অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষনমুক্ত সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে”…।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা শপথ নিয়েছিলেন সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকার। তার দল ক্ষমতায়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সকলেই শপথ নিয়েছেন সাংবিধানিক আনুগত্যের। যদিও শপথ ভঙ্গের দায়ে আদালতে শাস্তিপ্রাপ্ত দুইমন্ত্রী এখনও মন্ত্রীসভায়। কি করে সংবিধানে বর্ণিত সামাজিক সাম্য ও ন্যায্যতার দিকে এই রাষ্ট্র হাঁটবে? এখানে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংখ্যালঘুদের জন্য তো বটেই, সাধারনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাবান কতিপয় দুর্বৃত্ত।

এইসব ক্ষমতাধর দুর্বৃত্তরা দাপিয়ে-কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। যা খুশি করতে পারছে। তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ নামিয়ে আনছে। এমপির বোন ক্যাডারদের নিয়ে পুলিশ সার্জেন্ট পেটাচ্ছে, পুলিশের কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়ে খবর হচ্ছে। প্রতিপক্ষ না পেলে নিজেরাই মেতে উঠছে খুনোখুনিতে। ক্ষমতাধরদের এখনকার মিশন, দশ টাকা কেজি দরের চাল লুটপাট। এক্ষেত্রে একাকার হয়ে গেছে, রাজনীতিক-জনপ্রতিনিধি ও কতিপয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা। প্রতিরোধহীন, প্রতিকারহীন, বিচারহীন, জবাবদিহিতাহীন চলছে এইসব কর্মকান্ড।

চার. একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার ও আলবদর-রাজাকারদের মূল টার্গেট ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। মুক্তিযুদ্ধের পরে এরা টার্গেটই থাকলো। শত্রু সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল অর্পিত সম্পত্তি। আদিবাসীদের বলা হয়েছিল বাঙালী হয়ে যাও। যাদেরকে তারা আপন মনে করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির দাবিদার, তাদের স্থানীয় নেতারা দখল করে নিয়েছিল সংখ্যালঘুদের বাড়ি-সম্পত্তি। যে বাড়ি রেখে তিনি ভারতের শরনার্থী হয়েছিলেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, ফিরে দেখলেন, বসত-জমি বেহাত হয়ে গেছে। বছরের পর বছর এ ধারা অব্যাহত আছে। হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি আতঙ্কে যাদের আপন মনে করে সংখ্যালঘুরা, সেই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাও বারবার হামলে পড়ছে তাদের ওপর।

এই অপকর্ম মুক্তিযুদ্ধের পর পর শুরু হলেও শেষ হয়নি কোনকালে। ধারাবাহিকতা রয়েছে সবসময়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বাড়ি-জমি দখল করানো হয়েছে সেটেলার বাঙালীদের দিয়ে। খুন-ধর্ষণ-লুট-ডাকাতি এমন কোন নির্মমতা নেই, যা করা হয়নি পাহাড়ী বা সমতলে আদিবাসীদের ওপর। মুখে বলা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা, সম্প্রীতি  ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা। রাষ্ট্র সেক্যুলার নয়। বলতে গেলে গায়ে লাগে সকলের, কিন্তু কৃতকর্ম তো ভিন্ন কিছু বলছে না।

‘আরব বসন্তে’র আর্থিক ক্ষতি ৮৩ হাজার কোটি ডলার

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও বিবিসি অবলম্বনে বুধবার-এর বিশ্লেষণ

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো ‘আরব বসন্ত’। সবচেয়ে স্থবির, স্বৈরতান্ত্রিক, জটিল একটি অঞ্চল হঠাৎ করেই জেগে ওঠেছিল ওই সময়টাতে। অবশ্য, এখন আর সেই সময় নেই; ওই বসন্তের পর এখন ভয়াবহ শীত নেমেছে। তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র কোনোভাবে টিকে থাকলেও মিশরে আরো ভয়াবহ মাত্রায় একনায়কতন্ত্র চেপে বসেছে, লিবিয়া, ইয়েমেন আর সিরিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তির সার্বিক সহায়তায়। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে সরকারের বজ্রমুষ্টি আরো জোরালো হয়েছে।

অবশ্য কেবল রাজনৈতিকই নয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও কম ছিল না আরব বসন্তের। দুবাইয়ে প্রকাশিত আরব স্ট্র্যাটেজি ফোরামের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ২০১১ সালের ওই ঘটনার জের ধরে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৩০ বিলিয়ন ডলার বা ৮৩ হাজার কোটি ডলার। এটা ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের মোট জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশের সমান।

বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্যের আলোকে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। তারা চার বছরের স্টক ও বিনিয়োগ, জিডিপি, অবকাঠামোগত ক্ষতি, হতাহত, পর্যটন খাতে মন্দা এবং উদ্বাস্তু জটিলতাগুলো হিসাবে নিয়েছে।

তবে এই হিসাবের মধ্যে প্রাণহানিজনিত ক্ষতি কিংবা উদ্বাস্তুদের মানসিক বিপর্যয়ের মূল্যটি হিসাব করা হয়নি। সেটা সম্ভবও নয়। তাছাড়া কোন দেশে ঠিক কত পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, সেটাও এই প্রতিবেদনে জানানো হয়নি।

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব বসন্তের নামে যে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে তাতে বিনাশ হয়েছে ৬১৪ বিলিয়ন ডলার বা ৬১ হাজার ৪শ কোটি ডলার। আর এই অর্থের পরিমাণ ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সমগ্র আরব জামানার দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র ৬ শতাংশের সমান। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের হিসেবে বলা হয়েছে, এই আরব বসন্ত ৪টি দেশে যুদ্ধ বয়ে এনেছে। সাথে সাথে গোটা এলাকায় এনে দিয়েছে ঋণ নির্ভরতা, চরম বেকারত্ব, উচ্চ মাত্রার দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়া শরণার্থী পরিস্থিতির। যদিও কতিপয় অর্থনীতিবিদ আরব বসন্তের আগে উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধির নানা গল্প আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করেছিল নির্দ্ধিধায়।

আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিশিয়ায়। মোহাম্মদ বুআজিজি নামের এক তরুণ ফলবিক্রেতা বেকারত্ব আর সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন। তার আত্মহত্যায় তার দেশে গণবিস্ফোরণ ঘটে। প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করে নির্বাসনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই আগুন মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার আরো কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মিশর, ইয়েমেন, বাহরাইন, লিবিয়া, ওমান, জর্ডান ও মরক্কোতে প্রবলভাবে তা অনুভূত হয়। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা কার্যকর আর দুর্নীতি অবসানের দাবিতে জনসাধারণ রাজপথে নেমে আসে। মিশরে গণতন্ত্রের জয় হয়। আরো কয়েকটি দেশ প্রয়োজনীয় সংস্কারে রাজি হয়।

তবে নানা কারণে গণমানুষের জয়টি বহাল থাকেনি। স্বৈরতন্ত্রী আরো জোরালোভাবে চেপে বসে। লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়া এখনো গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত। মিশরে স্বৈরাচার আরো কঠোরভাবে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।

হয়তো শীতের অবসান হবে। আবার বসন্ত আসবে। তবে তার মাঝখানে ক্ষতি হয়ে গেল বিপুল।

তবে এতোদিন পরে এসে আরব বসন্তের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি ছিল একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য। আর এর বৈরী হাওয়া বিশ্বকেও করেছে টালমাটাল। দুর্ভাগ্য এই কারণে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে, স্বাধীন, মুক্ত, স্বচ্ছল জীবনের আশা-আকাঙ্খা নিয়ে আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল-তা আসলে আখেরে বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তিকেই বড় মাপের এক সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(শেষ পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এটিই শেষ পর্ব।

পাকিস্তান আন্দোলন মৌলবাদী আন্দোলন ছিল না। তবে সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল তো বটেই। উনবিংশ শতাব্দীতে নবাব আবদুল লতিফ অভিজাত মুসলমানদের জন্য যে ধারা সৃষ্টি করেছিলেন যারা বিংশ শতাব্দীতেও ‘বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা নিয়ে বাহাস করেছিলেন’ তাদেরই দল ছিল মুসলিম লীগ। (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। পৃ. ৮২)। মুসলিম লীগ সাধারণ গরিব মুসলমানদের দল কখনই ছিল না। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তারা বাংলার আইন পরিষদে মুসলিম আসনেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। তবে চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ্ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন না। এমনকি নামাজ পড়তেও জানতেন না। তিনি মনের দিক থেকে সেকুলার ছিলেন, মৌলবাদী তো কখনই নন। যিনি বরং বিলাতি সাহেবী কায়দায় অভ্যস্ত ছিলেন। তিনিই হয়ে উঠলেন ভারতের মুসলমানদের প্রধান নেতা।

পাকিস্তান দাবির মধ্যে বাঙ্গালি মুসলমানের সকল শ্রেণীই নিজ নিজ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল। পাকিস্তান দাবী ছিল প্রধানত উঠতি মুসলিম বুর্জোয়ার (যার মধ্যে বাঙ্গালি মুসলমান ছিল না) দাবি যারা চেয়েছিল শোষণ লুন্ঠনের জন্য পৃথক এলাকা, যেখানে অধিকতর শক্তিশালী হিন্দু বুর্জোয়ার আধিপত্য থাকবে না। বাঙ্গালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ভেবেছিল, চাকরি ও ব্যবসার দিক দিয়ে উচ্চতর অবস্থানে থাকা হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে না। মুসলমান কৃষক ভেবেছিল হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার থেকে বাঁচবে। তখন জমিদার মহাজনদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। সব মিলিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন মুসলমান জনগনের মধ্যে দারুন জনপ্রিয়তা পেল। এই দেশের মুসলমান স্বেচ্ছায় ভোট দিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

১৯৪৬ সালে নির্বাচন হল। এই নির্বাচনে অবশ্য গরিব মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। উপরন্তু হিন্দু ও মুসলমানের জন্য পৃথক পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল। মুসলিম এলাকায় মুসলিম লীগ একচেটিয়া জয়লাভ করছিল। জনরায় গেল পাকিস্তানের পক্ষে। তাছাড়া ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট জিন্নাহ্ ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে কলকাতায় শুরু হল ভয়ানক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। পরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা এমনটাই চেয়েছিল। আর বাংলার মুসলিম লীগ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাষ্ট্রীয় পদ কাজে লাগিয়ে দাঙ্গা বাধিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। মুসলিম লীগ, জিন্নাহ্, সোহরাওয়ার্দী-এঁরা সকলেই ছিলেন ব্রিটিশের অনুগত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও উপরতলার রাজনৈতিক পরিকল্পনারই অংশ ছিল, মোটেও স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। তাই দেখা যায়, এর পরপরই নভেম্বর মাসে হিন্দু-মুসলমান কৃষক মিলিতভাবে নেমেছে তেভাগা আন্দোলনে।

সোহরাওয়ার্দী সাহেব অবশ্য পরে স্বাধীন যুক্তবাংলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তা হিন্দু জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলে (হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের বেশির ভাগ) হিন্দু নেতারা ভারত ভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাগও চাইলেন। সেই সময় যদি ফজলুল হকের মতো নেতা বাংলায় প্রধানমন্ত্রী থাকতেন এবং চিত্তরঞ্জন দাস বা সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতা বাংলায় থাকতেন তাহলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। জয়া চ্যাটার্জি তাঁর ‘বাঙলা ভাগ হলো’ গ্রন্থে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করে লিখেছেন, ‘পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা একজন কুখ্যাত অবিশ্বস্ত, মুসলমান মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে থাকার চেয়ে নিজেদের হিন্দুরাষ্ট্রে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর পূর্ববাংলার হিন্দুরা ইতিমধ্যে তিক্ত বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে যে তাদের গাট্টা-বোঁচকা বেঁধে পশ্চিমবাংলায় পালাতে হবে।’ (Joya Chatterji, Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947 (Cambridge: Cambridge University Press, 2002).

এরপর ১৯৫০ সালে যে দাঙ্গা হয়েছিল সেটাও ছিল রাজনৈতিক কূটকৌশলের পরিণতি। অসচেতন জনগণ হয়েছিল তার অসহায় শিকার। কিন্তু ১৯৬৪ সালে সরাসরি সরকারের মদদে এবং বিহারী জনগোষ্ঠীর একাংশের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল তার বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান মধ্যবিত্ত। তারপরও বিভিন্ন সময়ে কোন না কোন অজুহাতে ছোটখাট দাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই কোন বিশেষ মহলের স্বার্থবুদ্ধি কাজ করেছে, সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেনি।

মুসলিম লীগ সেই অভিজাত মুসলমানদের দল ছিল যারা ঘরে উর্দু বলাকে আভিজাত্যের চিহ্ন বলে মনে করত। জিন্নাহ্ সাহেব সেই অভিজাত শ্রেণীর মনোভাবকে সাধারণ বাঙ্গালির মনোভাব মনে করে ভুল করেছিলেন। তিনি-এবং দল হিসাবে মুসলিম লীগ-‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বুঝতে পারেননি। তাই জিন্নাহ্ অমনভাবে বলতে পেরেছিলেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। প্রতিবাদী জাতি বাঙ্গালি তাঁর মুখের উপর প্রতিবাদ করেছিল। শোনা যায়, জিন্নাহ্ সাহেব পরে তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, অবশ্য একটা বড়রকম ধাক্কা খাবার পরই। মুসলিম লীগ ভেবেছিল, ধর্মের দোহাই তুলে তারা বাঙ্গালিত্ব মুছে দেবে। রাষ্ট্রভাষা উর্দু, রোমান হরফে বাংলা লেখা, বাংলা সাহিত্যে মুসলমানি শব্দ আনা, রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করা-সবরকম চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সবটাই ব্যর্থ হয়েছে। যে মুসলিম লীগ ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করল, কয়েক বৎসরের মধ্যে তা সমাজজীবন থেকে একেবারে হারিয়ে গেল-১৯৫৪ এর নির্বাচনে ভরাডুবি সেই কথাই বলে। সেই যে ডুবল আর কোনদিন উঠতে পারল না।

১৯৫৪ এর নির্বাচনের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল পীর এক যৌথবিবৃতিতে ফতোয়া জারি করেছিলেন, মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভোট দিলে আপনা থেকেই বিবিতালাক হয়ে যাবে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা সত্য ঘটনা। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে পীরের মুরিদরা পর্যন্ত এই ফতোয়াকে সামান্যতম গুরুত্ব দেয়নি। মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যে বাঙ্গালি মুসলমানের মোহভঙ্গ হয়েছিল। তারা আরও বুঝেছিল যে তারা নতুন করে আরেকটি পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক শাসক ও শোষকশ্রেণীর জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ। তাই ধর্মভিত্তিক আবেদন কোন কাজে আসেনি। ক্রমান্বয়ে তারা নতুন করে ভাষাভিত্তিক বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদে দীক্ষিত হয়।

এটা ভাবতে অবাক লাগে, যারা একদা পাকিস্তানের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল মাত্র এক প্রজন্ম পরে ২৪ বছর পরে তাদেরই সন্তানরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করছিল। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রবক্তা হয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, যিনি যৌবনকালে ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের ও মুসলিম লীগের তরুণ কর্মী। আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি-যিনি সিলেট জিলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করার জন্য প্রচার চালিয়েছিলেন সেই মজলুম জনগণের নেতা-মওলানা ভাসানী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার হুমকি দিয়েছিলেন।

ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি সবচেয়ে জনপ্রিয় শ্লোগানে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনিও ছিল ‘জয় বাংলা’। মুসলিম লীগ, জামায়াত প্রভৃতি দলের নেতারা বলতে চাইল, এই শ্লোগানের মধ্যে হিন্দুয়ানি গন্ধ আছে, কিন্তু তা কোন কাজে আসেনি। আমার মনে পড়ে ১৯৭০ এর নির্বাচনের সময় পুরানো ঢাকায় মুসলিম লীগ নেতা খাঁজা খয়ের উদ্দীনের পক্ষে শ্লোগান দেয়া হয়েছিল ‘জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি ছেড়ে ধুতি পিন্দ’। লুঙ্গি যেন মুসলমানের আর ধুতি যেন হিন্দুর পোশাক। পোশাক সংক্রান্ত এই ধারণাটি কিন্তু অতীতে, মধ্যযুগে ছিল না। ফরায়জি আন্দোলনের সময় যে এমন একটা ভ্রান্ত ধারণা আমদানি করা হয়েছিল তা আগেই বলা হয়েছে। যাই হোক, মোট কথা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এবং মুসলিম লীগ, জামায়াত প্রভৃতি দল কর্তৃক ধর্মের আবেদন, ধর্মীয় সুড়সুড়ি, সাম্প্রদায়িক উস্কানি কোনটাই কাজে লাগেনি। তার মূল কারণ-আমার মতে-বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্যের মধ্যেই রয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং উদার ও মানবিক আদর্শবোধ।

একথা অনস্বীকার্য যে জিন্নাহ্ দ্বিজাতিতত্ত্ব খন্ডন করেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হতে পেরেছিল। এই অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বটির আয়ুও ছিল খুব স্বল্প সময়ের। কারণ এই দেশের মানুষ কখনই সাম্প্রদায়িক নয় এবং তারা কখনই বাঙ্গালি জাতিসত্তা বিসর্জন দেয়নি। পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয় হবার কারণটা পূর্বেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তা ছিল সাময়িক বিভ্রান্তি, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী তাই প্রমাণ করে। তবে কেন মাঝে মধ্যে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়? কেন ভিতরে ভিতরে সাম্প্রদায়িক মনোভাব কাজ করে? এর উত্তরও সহজ। এখানে কিছু প্রভাবশালী লোকের স্বার্থবুদ্ধি কাজ করে, তাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেই।

আবারও প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। এত বড় মহান সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম যে জাতি করতে পেরেছে সেই জাতি কিভাবে মৌলবাদ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে? কিভাবে মৌলবাদ জায়গা করে নিতে পারল? আমি বলব প্রশ্নটি উত্থাপনের মধ্যেই কিছুটা ভ্রান্তি আছে। বস্তুত মৌলবাদ এখনও জায়গা করে নিতে পারেনি। মৌলবাদী জামায়াতের সমর্থন ও ভোটের পরিমাণ পাঁচ শতাংশের বেশি নয়। তবে জঙ্গি মৌলবাদী তৎপরতা এখন বিপদ হিশাবে উপস্থিত আছে। কিন্তু তা অতি অল্প লোকের কাজ, যা সাধারণভাবে সাধারণ জনগণ কর্তৃক ধিকৃত। তারপরও অস্বীকার করা যাবে না যে সামাজিক চেতনায় বেশ খানিকটা দক্ষিণমুখী পশ্চাদপসরণ হয়েছে। এর কারণ কয়েকটি।

প্রথমত কতকগুলি বাস্তব কারণে জনগণের ব্যাপক অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব দানা বেঁধেছে। বিএনপি সেই মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করতে চায়। জনগণের বেশ বড় অংশের মধ্যে বিএনপির সমর্থনের অন্যতম কারণও এটি। ঐতিহাসিক কারণে ভারত-বিরোধিতার সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার একটা সম্পর্ক আছে। সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। তারপরও বলব, তীব্র ভারত-বিরোধী (বস্তুত ভারতের শাসকশ্রেণী-বিরোধী) মনোভাব সত্ত্বেও সাধারণ বাঙ্গালি মুসলমান সাম্প্রদায়িক হয়ে যায়নি, কারণ তাদের ঐতিহ্যের মধ্যে এটা ছিল না।

দ্বিতীয়ত দুইটি প্রধান বুর্জোয়া দল, যারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করেন (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি), পালাক্রমে ক্ষমতায় গেলেও তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, জনগণকে দারুনভাবে হতাশ করেছে। ফলে গণমনে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূরণ করতে পারত বামধারার রাজনৈতিক দল। বামদের জন্য আসলেই খুবই চমৎকার পরিস্থিতি ছিল, কিন্তু বহুধাবিভক্ত বামশক্তি বারবার বড় বড় ভুল করেছে, তাই বুর্জোয়াদের জায়গাটা তারা দখল করতে পারেনি, বরং তাদের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। বামদের ভোট এখন মৌলবাদীদের চেয়েও কম। উপরন্তু বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাময়িক বিপর্যয়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রধান বুর্জোয়া দলগুলোর এবং বামপন্থীদের ব্যর্থতার কারণে ধর্মান্ধ শক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদ খানিকটা জায়গা করে নিয়েছে, তবে তা কখনই মধ্যপ্রাচ্যের মতো ভয়াবহ ছিল না-হবেও না -কারণ বাঙ্গালি মুসলমানের মন ভিন্ন ধাতুতে গড়া।

তৃতীয়ত বুর্জোয়া দলগুলো মৌলবাদী ভাবাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। মৌলবাদী দলের সঙ্গে জোট করে এ সরকারে অংশীদারিত্ব দিয়ে উৎসাহিত করেছে। ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তিকে তারাই বাঁচিয়ে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর সৃষ্টি ও অকস্মাৎ এর তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ রয়েছে দেশের বাইরে। সত্তরের দশকে পেট্রোডলারের আবির্ভাব বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে ইসলামী মৌলবাদকে চাঙ্গা করেছিল, একথা অস্বীকার করা যাবে না। পরবর্তীতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অস্ত্র অর্থ ও রাজনৈতিক সমর্থন দ্বারা আল-কায়দা ও তালেবান সৃষ্টি করেছিল। পরে তা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছিল। অনেক পরে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আইএস এর মতো নৃশংস জঙ্গি সংগঠন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তুরস্কের মদদে তৈরি হয়েছিল। এখন তা একইভাবে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে। এই সকল সংগঠনের আন্তর্জাতিক প্রভাব আছে। বাংলাদেশের ইসলামী ফ্যাসিস্ট জঙ্গী গ্রুপগুলি ঐ সকল আন্তর্জাতিক মৌলবাদী সংগঠনের শাখা হিসাবে আছে অথবা তাদের আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা আর্থিক সাহায্যও পেয়ে থাকে। এটি একটি ভয়ানক বিপদ। তাকে অবশ্যই মোকাবিলা ও নির্মূল করতে হবে। এবং তা সম্ভবও এ কারণ আমাদের সমাজে ইসলামী জঙ্গিবাদী মতাদর্শের কোন বীজ নেই।

বাংলার মাটিতে মৌলবাদের চাষ সম্ভব নয়। শত শত বৎসর ধরে বাঙ্গালি মুসলমানের মনে যে ভাবাদর্শগত উপাদান দ্বারা তৈরি হয়ে আছে, তা হল মানবতাবাদ, উদারতাবাদ ও অসম্প্রদায়িকতা। যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বাংলার শ্রমজীবী জনগণ বহন করে আসছে তা হল বেদ-বিরোধী সহজিয়া মতবাদ ও সুফিবাদী ধর্মীয় মতবাদ, বাউল সঙ্গীতের সুর, শোষক ও অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত লড়াই এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ। বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের কারণে ইতিহাসে সাময়িক পশ্চাদপসরণ হয়ে থাকে। কখনও কখনও সেই পশ্চাদপসরণের কালপর্বটি একটু দীর্ঘও হতে পারে। তবে আমাদের আস্থা রাখতে হবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙ্গালি শ্রমজীবী মানুষের উপর। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ কথাটি বোধহয় বাংলাদেশের শ্রমজীবী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রসঙ্গে আরও বেশি প্রযোজ্য।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় : সিস্টেমে ধস

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়কে বিশ্লেষকেরা নজিরবিহীন হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে এটাকে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক ঘটনা । কিন্তু ট্রাম্পের জয় কি সত্যিই পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল? সাম্প্রতিক  সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে যেসব সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিলে ট্রাম্পের জয়কে একেবারে স্বাভাবিক পরিণতিই বলা যায় ।

‘যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেম’ এতোদিন ধরে প্রচার-প্রচারণাসহ নানা মাধ্যমে ধামা-চাপা দিয়ে আসছিল যে, ওই সমাজটিতে কোনো বিভক্তি নেই, বিভাজন নেই, কোনো ভাঙ্গন নেই। কিন্তু এই নির্বাচনের অনিবার্য ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভক্তি, ভাঙ্গন আর ফাটল এখন স্পষ্টাকারে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ঐক্যবদ্ধ সমাজ নয়; বিভক্ত । এই বিভক্তি আর ফাটল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকসহ সব ক্ষেত্রেই। ওই সমাজটিতে ধনী-গরীবের, সাদা-কালোর অর্থাৎ বর্ণবৈষম্যের, নারী-পুরুষের, বিশ্বাস আর আস্থার এমনকি সামগ্রিকভাবে  বিভক্তি বিদ্যমান । ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সংকট কবলিত সমাজেরই সত্যিকারের একজন প্রতিনিধি, এক বড় মাত্রার উদাহরণ, প্রতিচ্ছবি।

যদিও আশ্বাস রয়েছে, আশ্বস্ত করা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘‘গ্রেট এগেইন’’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে; কিন্তু বহু মার্কিনীর এতে রয়েছে অবিশ্বাস আর অনাস্থা । এ জন্যই তারা মাঠে নেমেছেন, প্রতিবাদ করছেন । যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভোটের ইতিহাসে এ ধরনের অবিশ্বাস অনাস্থা রীতিমতো অবিশ্বাস্য বলেই তারা মনে করছেন । সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল হচ্ছে ভাঙ্গন কবলিত সিস্টেমে ধস ।

আর এই সিস্টেমের ধস উপলব্ধি করে, ভাঙ্গন কবলিত সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখে সমগ্র বিশ্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ।

এসব সঙ্কট প্রকটভাবে চোখে পড়েনি; বরং চাপা পড়ে ছিল । বার্নি স্যান্ডার্সদের চোখে অবশ্যই পড়েছিল এবং তারা প্রবলভাবে তা বলেছিলেন । স্যান্ডার্স তৃতীয় কোনো ধারার সৃষ্টি করে রিপাবলিকান প্রার্থীর জয় আগে-ভাগে নিশ্চিত না করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্ধারে নেমেছিলেন । কিন্তু দুর্ভাগ্য তার এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির; সেইসাথে আমেরিকা ও বিশ্ববাসীরও । তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ফলাফল এখন সবার সামনে ।

স্যান্ডার্স সঙ্কটগুলো চাপা না রেখে সমাধানের কথা বলেছিলেন । তিনি মনোনয়ন লাভের প্রয়াসে যেসব প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন, তাতে মার্কিন যুবসমাজে চমক সৃষ্টি হয়েছিল। এসব প্রশ্ন ছিল তাদের মনেও। ফলে তাদের মধ্যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটন কিন্তু এসব সঙ্কট সমাধানের দিকে যাননি । ফলে ভোটাররাও তার সাথে চলতে মন থেকে উৎসাহ পায়নি । হিলারি বরং নতুন নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন । একদিকে নিজের অবৈধ উপার্জন, ই-মেইল কেলেঙ্কারিতে বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের উল্টা-পাল্টা কথা ও কাজ থেকে ফায়দা হাসিলের সহজ পথে চলতে থাকায় নতুন নতুন জটিলতায় পড়েছেন।

মিডিয়া বিশ্লেষকেরা এখন এই ফলাফল নানাভাবে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চাইছেন কেন এমনটা হলো। তারা মোটামুটিভাবে বিভিন্ন বর্ণগত ও পরিচিতিমূলক গ্রুপে ভোটারদের বিভক্ত করে তাদের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা এই সত্যটা অগ্রাহ্য করছেন, নির্বাচনটা পরিণত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যস্ত সামাজিক সঙ্কট ও পঙ্কিলতার ব্যাপারে একটা গণভোট। আর তাতে ট্রাম্প ঝোপ বুঝে কোপ দিতে পেরেছেন এবং বাজিমাত করেছেন।

ট্রাম্প কিন্তু নিজে কোনো ফ্যাক্টর নয়। তিনি বরং একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই গোষ্ঠীটি হলো যুদ্ধবাজদের দল। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ অর্থনীতি হিসেবে দেখতে চায়। যুদ্ধের ‘ম্যাকানিজম’ বহাল রাখতে হলে তাদের এমন একজন প্রার্থীর প্রয়োজন ছিল। ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রচারকালে প্রায়ই আবোল-তাবোল বকতে দেখা যেত। একটু ভালোভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, এগুলো মোটেই প্রলাপ ছিল না। অনেকের মনের কথাই তিনি এভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন।

কাজেই ট্রাম্পের বিজয় সত্যিকার অর্থে কোনো অঘটন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পরাশক্তিটি যেভাবে চলছিল, তার স্বাভাবিক পরিণতি ফুটে ওঠেছে এই ফলাফলে।

এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শ্রেণী যুদ্ধ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং পুলিশি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবেন। নির্বাহী শাখা ছাড়াও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ, সুপ্রিম কোর্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলে যাবে চরম ডানপন্থীদের হাতে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা ‘আবার গ্রেট’ হবে না, ঐক্যবদ্ধ থাকবে না, বরং নানাভাবে বিভক্ত হয়ে জঘন্য ধরনের পঙ্কিলতায় ডুবে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে সীমিত ভোটাধিকার, গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসন এবং এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও সম্ভবত আর থাকলো না।

এই কিছু দিন আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের সরে যাওয়া নিয়ে হৈ চৈ হয়েছিল। এর ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই ভয়ঙ্করভাবে এমনটা প্রত্যক্ষ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ বছর আগে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আসলে সেটা এখনো থামেনি। ধনী-গরিব লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্য রাজপথে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের কৃষ্ণাঙ্গদের গুলি করে হত্যার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, পুলিশি কুকুরের হানা, মরিচ স্পে, টেসার বুলেট নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণ ইত্যাদি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় আফ্রিকান আমেরিকানদের দিকে তাক করা হয় তিন গুণ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৬টি রাজ্যে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। এর ফলে এসব রাজ্যে আয় বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এসব রাজ্যেই শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

অনেক রাজ্যে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্লোরিডা। সেখানে এখনই ১০ লাখের বেশি লোকের ভোটাধিকার নেই। বঞ্চিতদের বেশির ভাগই আফ্রিকান আমেরিকান। নানা বিধিনিষেধের বেড়াজাল দিয়ে এসব লোককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এসব সমস্যার আর সুরাহা হচ্ছে না, এমনটাই ধরে নেওয়া যায়। অনিশ্চয়তার পথে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে না। তারা অবিশিষ্ট বিশ্বকেও একই দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেটা আরো বড় ভয়ের কারণ।