Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 32)

Author Archives: আমাদের বুধবার

ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কী আদৌ শক্তিশালী : ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ

কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এখন প্রবল উত্তেজনা। এমন এক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্ট। প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

অনেক ভারতীয়ের কাছে তাদের দেশের কৌশলগত অবস্থানটাই উদ্বেগজনক। তাদের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী হলো চীন ও পাকিস্তান। অতীতে উভয়ের বিরুদ্ধেই তারা যুদ্ধ করেছে, সীমান্ত ইস্যু এখনো উত্তেজনাকর। উভয়ই পরমাণুসজ্জিত, একে অপরকে সহায়তা করতে জোটবদ্ধ। ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি জিডিপি-সমৃদ্ধ উদীয়মান পরাশক্তি চীন নিঃশব্দে ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাবে থাকা এলাকায় ঢুকে পড়ছে, উপমহাদেশজুড়ে ‘মুক্তার মালা’ জোট গড়ার প্রয়াস চালাচ্ছে। পাকিস্তান তুলনামূলক দুর্বল হলেও পরমাণু ঢালের আড়ালে সুরক্ষিত থেকে ইসলামি গেরিলাদের আশ্রয়দাতায় পরিণত হয়েছে, প্রায়ই ভারতীয় টার্গেটে আঘাত হানছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা অনেক দিন ধরেই আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

এ কারণেই ১৮ সেপ্টেম্বর যখন ব্যাপক অস্ত্রে সজ্জিত চার অনুপ্রবেশকারী একটি ভারতীয় সেনা ঘাঁটিতে প্রবেশ করে আত্মহত্যা করার আগে ১৮ সৈন্যকে হত্যা করল, তখন যৌক্তিক কারণেই আশঙ্কা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘাঁটিটির অবস্থান ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিতর্কিত সীমান্ত ‘লাইন অব কন্ট্রোল’-এর কাছাকাছি পর্বতমালার ঢালে। ভারতীয় কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়; প্রচন্ড জবাব দেয়ার দাবি জানাতে রাজনীতিবিদ আর বিশেষজ্ঞরা প্রতিযোগিতায় নামে। ‘অনুপ্রবেশ ঘটে, এমন প্রতিটি পাকিস্তানি চৌকি গোলায় উড়িয়ে দেয়া উচিত’- বলেছেন এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার, তিনি এখন ভারতীয় রাজধানী নয়া দিল্লিতে একটি থিঙ্ক ট্যাংকের কর্তা।

পাকিস্তানের প্রতি কঠোর হওয়ার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকার তার পূর্বসূরীদের মতোই নমনীয় পথ অবলম্বন করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর লঘু শাস্তির জন্য পাকিস্তানি দূতকে তলব করে হামলাকারীরা যে সীমান্ত অতিক্রম করে এসেছিল, তার প্রমাণ তুলে ধরে, উল্লেখ করে, চলতি বছর শুরু থেকে এ ধরনের ১৭টি অনুপ্রবেশ ভারত রুখে দিয়েছে। ভারতের ‘সৌখিন’ যোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক।

এমনটা হওয়ার যৌক্তিক কারণও রয়েছে। পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করে ভারত কূটনৈতিক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে।  পরমাণু বিস্তার এবং তার অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভালোভাবেই বোঝে, পাকিস্তানে তারা অস্বাভাবিক বৈরিতার মুখোমুখি হয় : দেশটির রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা এমন এক মাত্রায় রয়েছে যে, যেকোনো ধরনের ভারতীয় উগ্র ও হুমকিসৃষ্টিকারী আচরণ পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে থাকা উপাদানগুলোকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করে ফেলে, যা ভারতের নিজের স্বার্থেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

তবে সংযত থাকার জন্য আরেকটি, যদিও অনেক কম দৃষ্টিগোচর হওয়া, কারণ রয়েছে। সংখ্যা দিয়ে যতটুকু মনে হয়, ভারত সামরিকভাবে ততটা শক্তিশালী নয়। এটা একটা গোলকধাঁধা। দেশটির অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে তার আন্তর্জাতিক উচ্চাভিলাষ বাড়া এবং তার কৌশলগত অবস্থান উদ্বেগজনক থাকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, ভারত প্রমাণ করেছে, সে সত্যিকার অর্থেই সামরিক শক্তি গঠনে ‘‘বিস্ময়করভাবে অসমর্থ’’।

ভারতের সশস্ত্র বাহিনী কাগজে-কলমে ভালোই দেখা যায়। চীনের পর সে-ই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী, বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিস্থিতিতে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে সে বিশ্বে অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষ দেশ হিসেবে বিরাজ করছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্রসম্ভার সে সংগ্রহ করছে। রাশিয়ার যুদ্ধবিমান, ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র, আমেরিকার পরিবহন বিমান, ফরাসি সাবমেরিন আছে তার কাছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও বেশ ভালো কিছু জিনিস উৎপাদন করে। বিশেষ করে বলা যায়, জঙ্গিবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা। তাছাড়া কোচির শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে ৪০ হাজার টনের বিমানবাহী রণতরী।

 

শক্তির ভারসাম্যহীনতা

২০১৫ সালের সামরিক সামর্থ্য

সশস্ত্র বাহিনী

 

সক্রিয় রিজার্ভ আধাসামরিক পরমাণু অস্ত্র
ভারত ১৩ লাখ ১২ লাখ ১৪ লাখ ৯০-১১০
চীন ২৩ লাখ ৫ লাখ ৬ লাখ ২৬০
পাকিস্তান ৬ লাখ            – ৩ লাখ ১০০-১২০

প্রতিরক্ষা বাজেট

বিলিয়ন ডলারে জিডিপির হার
ভারত ৫১.৩ ২.৩
চীন ২১৪.৮ ১.৯
পাকিস্তান ৯.৫ ৩.৪

 

কিন্তু তারপরও ভারতীয় অস্ত্রসজ্জায় বড় ধরনের ফাঁক আছে। সত্যিকার অর্থেই ভারতের অস্ত্রশস্ত্র পুরনো বা অবহেলিত। ‘আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা রয়েছে করুণ দশায়,’ বলেন সামরিক বিষয়ক ভাষ্যকার অজয় শুক্লা। ‘সক্রিয় যেগুলো দেখা যায়, সেগুলোর সবই ১৯৭০-এর দশকের পুরনো জিনিস। চমকপ্রদ নতুন কিছু স্থাপন করতে হয়তো আরো ১০ বছর লাগবে।’ প্রায় দুই হাজার বিমান নিয়ে কাগজে-কলমে ভারতের বিমানবাহিনী বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম। কিন্তু ২০১৪ সালে প্রতিরক্ষা প্রকাশনা জেনস ডিফেন্স-এর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এগুলোর মাত্র ৬০ ভাগ উড়ার মতো সক্ষম। চলতি বছরের প্রথম দিকের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমান শাখার গর্ব বিবেচিত ৪৫টি মিগ-২কে বিমানের মাত্র ১৬ ভাগ থেকে ৩৮ ভাগের কাজ করার সামর্থ্য রয়েছে। যে রণতরীটি তৈরি করা হচ্ছে, সেটি থেকে এসব বিমান উড়বে বলে ধরা হচ্ছে। ওই বিমানবাহী রণতরীটি ১৫ বছর আগে অর্ডার দেয়া হয়েছিল, ২০১০ সালে উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা হয়েছিল। সরকারি নিরীক্ষকদের হিসাব অনুযায়ী,  প্রায় ১,১৫০টি পরিবর্তনের পর এখন সেটি ২০২৩ সালের আগে পানিতে ভাসবে বলে মনে হচ্ছে না।

এ ধরনের বিলম্ব কিন্তু মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৮২ সাল থেকে নতুন স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসাল্ট রাইফেল চাচ্ছে। কিন্তু আমদানি করা হবে, না দেশেই উৎপাদন করা হবে; অধিকতর ভারী গোলাবর্ষণ না বেশি ক্ষিপ্র- কোনটা হবে- তা নিয়ে অব্যাহত বিতর্কের মধ্যেই বিষয়টা আটকে রয়েছে। সোভিয়েত আমলের জীর্ণ মডেলগুলোর স্থানে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের জন্য ভারতের বিমানবাহিনী ১৬ বছর ধরে বলে আসছে। অতি-উচ্চাভিলাষী সরঞ্জাম, দরদাম, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের কোটা পূরণে প্রায় অসম্ভব হওয়া ইত্যাদি কারণে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর বিদেশীদের দ্বারস্থই হতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। চার বছর আগে ফ্রান্স ১২৬টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি করার অবস্থায় পৌঁছেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা কমতে কমতে নেমে এসেছে ৩৬-এ।

ভারতীয় সেনাবাহিনীরও রয়েছে দুর্নামের ইতিহাস। অতীতেও দুর্নীতি ছিল একটা সমস্যা। বিশ্লেষকেরা সত্যিই ভেবে অবাক হয়ে যান, গেরিলারা কিভাবে দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে বারবার প্রবেশ করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সেইসাথে যোগ হয়েছে জেনারেলদের পদোন্নতির জন্য প্রকাশ্যে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়া, বেতন নিয়ে সোচ্চার হওয়া এবং অফিসারদের ওজন কমানোর নির্দেশ জারির মতো ঘটনাগুলো। গত জুলাই মাসে একটি সামরিক পরিবহণ বিমান ২৯ জন আরোহী নিয়ে বঙ্গোপসাগরে হাওয়া হয়ে গিয়েছে, এখন পর্যন্ত এর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গত আগস্টে একটি অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকা ভারতের নতুন ফরাসি সাবমেরিনের কারিগরি বিষয়াদির বিস্তারিত বিবরণ ফাঁস করে দেয়।

ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আরো বড় সমস্যা হলো কাঠামোগত। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, তিন বাহিনীর প্রতিটিই সত্যিকার অর্থেই সামর্থপূর্ণ। তবে সমস্যা হলো, তারা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে কাজ করে। শুক্লা বলেন, ‘কোনো বাহিনীই অন্য বাহিনীর সাথে কথা বলে না, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক কর্মকর্তারাও তাদের সাথে কথা বলেন না।’ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মন্ত্রণালয়টিতে একজনও সামরিক ব্যক্তি নেই। ভারতের অন্য সব মন্ত্রণালয়ের মতো, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও পরিচালিত হয় পরিবর্তনশীল বেসামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে, রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তরা আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়ে ব্যালট বাক্সের দিকেই বেশি নজর দিয়ে থাকেন। মন্ত্রণালয়টির পরামর্শক হিসেবে দায়িত্বপালনকারী অভিজিত আয়ার মিত্র বলেন, ‘তারা সম্ভবত মনে করে, সাধারণ যে কোনো চিকিৎসকই অস্ত্রোপচারও করতে পারেন।’ ক্রমবর্ধমান শাররীক শক্তি সত্ত্বেও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী এখনো যথাযথ বুদ্ধি-বিবেচনার অভাবে ভুগছে।

নদী-বন ধ্বংসে আর কতো বিনাশী আয়োজন

হায়দার আকবর খান রনো ::

ফারাক্কা বাধ যখন নির্মিত হয়, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। ফলে সেদিকে নজর দেয়ার সুযোগ আমাদের হয়নি। ভারত তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সাহায্য করেছিল, তা কখনোই ভোলার নয়। কিন্তু একই সময়ে ভারত যে বাংলাদেশের জন্য এতো বড় সর্বনাশ করে চলছিল, সেদিকটি দেখার সময়-সুযোগ অবকাশ কোনটাই হয়নি আমাদের। ভারতের উচিত হয়নি, ভাটির দেশের সাথে কোন রকম সমঝোতা না করে গঙ্গা নদীর উপর বাধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার তদানীন্তন পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশ) ভবিষ্যত স্বার্থ নিয়ে তো কখনোই মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথম বিপদের দিকটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার বিখ্যাত ফারাক্কা মার্চ বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করে তুলেছিল।

সেই জন্য মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতবিরোধী’ বলে বদনাম কুড়াতে হয়েছিল। কিন্তু জনগণের নেতা কুৎসার প্রতি কর্ণপাত না করে যা সত্য, জনগণের যা ন্যায্য দাবি তা তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি।

ভারত বিরোধীতার দুটো দিক আছে। একটি হলো- ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অন্ধভারত বিরোধীতা, যা পাকিস্তানি রাজনীতির সম্প্রসারণ মাত্র। ঐতিহাসিক কারণেই এই ধরনের ভারত-বিরোধীতার সাথে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি জড়িত থাকে; যা একদা মুসলিম লীগ করেছিল। জামায়াত ও বিএনপির রাজনীতিও তাই। অন্যটি হলো- ভারত একদা আমাদের স্বাধীনতার জন্য সাহায্য করেছিল বলে যে ভারতের সব অন্যায় আচরণ মেনে নিতে হবে, এ তো কোনো কাজের কথা হলো না। আমরা লক্ষ্য করছি, শাসকবর্গ ভারতের প্রতি একপেশে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে চলেছে। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং কিভাবে ঢাকায় অবস্থান করে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন সে কথা তো ফাঁস করে দিয়েছিলেন বর্তমান সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদ। এছাড়া প্রতিদিন ভারতের বিএসএফ যেভাবে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে, তা কি কোন বন্ধুত্বের লক্ষণ? বন্ধুত্ব কখনো একতরফা হয় না।

বাংলাদেশের জন্য ভারত সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর যে কাজটি করেছে তাহলো-ভাটির দেশকে বঞ্চিত করে গঙ্গা-তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি সরিয়ে ফেলা। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তা তারা পারে না। কিন্তু গায়ের জোরে করছে। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশ সরকার মৃদুকণ্ঠেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে না।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নদীশূন্য, এমনকি পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এমন আশংকা করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তথ্য, উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

মরার উপর খাড়ার ঘা। এবার ভারত ও বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রীয় কোম্পানী মিলে সুন্দরবনও শেষ করতে চলেছে। সুন্দরবনের গা ঘেষে বাগেরহাটের রামপালে যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে উজাড় পর্যন্ত হয়ে যাবে, এমন আশংকা করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। গণপ্রতিবাদও গড়ে উঠেছে দেশব্যাপী। কিন্তু সরকার জেদ ধরে বসে আছে, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ওখানেই করবে। ক’দিন আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা বলেছি, এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাতাসের তাপ বৃদ্ধি পাবে, ছাই ও কয়লার কণা বনাঞ্চলে ও নদীতে ছড়িয়ে পড়বে, পশুর নদীর পানি ব্যবহার করে তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে ইত্যাদি। এতো বড় সর্বনাশ না করার জন্য আমরা অনেক বলেছি। সরকার বলেছেন, ওসব নাকি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। তাদের উন্নত প্রযুক্তির কারণে নাকি কোনো ক্ষতিই হবে না। এমনকি সরকার একথাও বলছেন যে, রামপাল নাকি সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে। আমরা বলছি ১৪ কিলোমিটারের চেয়েও কম দূরত্বে (বাফার জোন ধরলে নয় কিলোমিটারেরও কম)। সরকার দূরত্ব নিয়েও অবান্তর কথা বলছেন।

এবার জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোও বলেছে, সুন্দরবনের নিকটস্থ রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে। এই প্রকল্প এবং মংলা বন্দরের পাশে আরেকটি প্রস্তাবিত প্রাইভেট কোম্পানীর কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে ইউনেস্কো আপত্তি জানিয়েছে। আপত্তির কারণ হিসেবে আমরা এ পর্যন্ত যে সকল কথা বলে এসেছি, সেই একই কথা তারাও বলেছেন। কারণ বিজ্ঞান তো দুই রকম হতে পারে না। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯০০ ফুট উচু চিমনি দিয়ে যে তাপ বের হবে তা বাতাসকে উত্তপ্ত করবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে নদীর পানি ব্যবহার করা হবে, তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে। প্রতিদিন অনেক জাহাজ যাতায়াত করবে। তার শব্দ দূষণ তো আছেই। তাছাড়াও নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য ৩৫ কিলোমিটার নদীপথ খনন করা হবে। এতে ৩ কোটি ২১ লাখ ঘনমিটার মাটি নদী থেকে উত্তোলন করা হবে। ফেলা হবে কোথায়? সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ গাছপালা জীববৈচিত্র দারুনভাবে হুমকির মুখে পড়বে। গত দুই বছরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেল, সার, সিমেন্ট ও কয়লাবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনার উল্লেখ করে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এতো দুর্ঘটনার পরও জাহাজ চলাফেরার ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল, তা নেয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারকে রামপাল প্রকল্প বাতিল করার জন্য আহবান জানিয়েছে। দেখা যাক, এবার সরকার কি করে?

জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। সেটি হলো- ফারাক্ক বাধ সংক্রান্ত। গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনটি বলছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুন্দরবনের নদীসমূহে মিষ্টি পানি প্রবাহ কমে গেছে। পানির স্রোতও কম। ফলে সাগরের লবণাক্ত পানি অনেক বেশি। ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনের গাছ কম জন্মাচ্ছে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকেই অনেক বিজ্ঞানী একথা বলেছিলেন। ফারাক্কার অন্যান্য বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়টিও ছিল। তাহলে সুন্দরবন ধ্বংসের প্রক্রিয়া চার দশকের আগের থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধ্বংসের বাকি কাজটি দ্রুতই সম্পন্ন হবে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার যেন ভারতের সাথে আলোচনা করে পদ্মার পানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। আমি জানি না, সরকার সেই উদ্যোগ নেবে কি না। অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। তারপরেও দেখা যাক, ভারত তাতে সাড়া দেবে কি না।

ফারাক্কার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের অনেক নদী হারিয়ে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার আটটি নদী এবং বাগেরহাটের ২৩টি নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের অপরিকল্পিত সুইস গেট নির্মাণের কারণেও চলনবিলের বিভিন্ন নদনদী ও বিল জলাশয় পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে তিস্তা নদীতে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে যে বাধ দিয়েছে, তাতে উত্তরবঙ্গের বহু নদী হারিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায়, প্রমত্ত পদ্মায় ধুধু বালি। তিস্তা নদীতে পানি নেই।

প্রকৃতিকে এইভাবে হত্যা করা বড় ধরনের অপরাধ, যে কাজটি ভারত সরকার নির্বিচারে করেই চলেছে।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে একদিকে আমরা পানিশূন্য হচ্ছি, অন্যদিকে খোদ ভারতের বিহারেও ব্যাপক বন্যা হচ্ছে। ভারতের অঙ্গরাজ্য বিহারের মুখমন্ত্রী নিতিশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। হায়! একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে। একদা নাকি উগ্রভারত বিরোধীরা ফারাক্কা বাধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য শ্লোগান  দিত। এখন স্বয়ং ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একই কথা বলছেন।

বস্তুত ইঞ্জিনিয়ারিং দিক দিয়ে ফারাক্কা একটি ব্যর্থ প্রকল্প। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য এই বাধটি নির্মাণ করা হয়েছিল; কিন্তু তা সফল হয়নি। এখন এটাকে ভেঙ্গে ফেলা ও বন্ধ করাই উত্তম হবে। বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের জনগণের স্বার্থে, কল্যানে। পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলাই উচিত, এটা হচ্ছে আধুনিক চিন্তা। পরিবেশকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু পরিবেশের উপর জবরদস্তি করতে গেলে ফল খারাপ হবে। এই উপলব্ধি কি ভারত-বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের আছে?

ভারত-রাশিয়া দীর্ঘ বন্ধুত্বে ফাটল : নতুন মিত্র পাকিস্তান!

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

সেই ১৯৫০-এর দশকের প্রথম ভাগ। স্নায়ুযুদ্ধের টালমাটাল সময়। মাত্র কয়েক বছর হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে। তীব্র বৈরী দেশ দুটির প্রতি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কমতি নেই। পাকিস্তান ও ভারতও এ নিয়ে ভাবছে। সব হিসাব মিলিয়ে যখন প্রায় সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ভারত যাচ্ছে মার্কিন বলয়ে, কাজেই পাকিস্তান সোভিয়েতের দিকে। কিন্তু হঠাৎ কী থেকে কী যেন হয়ে গেল। ভারত চলে গেল সোভিয়েত বলয়ে। পরিণতিতে পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে।

ওই দিন যা হয়নি, সেটাই কী আজ হতে চলেছে? কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে শুরু হয়েছে রাশিয়া-পাকিস্তান যৌথ সামরিক মহড়া। ভারত প্রচন্ড আপত্তি জানিয়েছিল। দুই নৌকায় পা দেওয়া নিয়ে রাশিয়াকে হুঁশিয়ারও করে দিয়েছিল। অর্থাৎ শিথিল হতে থাকা রুশ-ভারত সম্পর্ক আরো ঢিলে হবে, এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবুও রাশিয়ার সৈন্যরা যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়ে পাকিস্তানে গেছে।

রাশিয়া-পাকিস্তান এই মহড়ার নাম দিয়েছে ‘ফ্রেন্ডশিপ ২০১৬’। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর এই মহড়া হচ্ছে বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখার প্রধান লে. জেনারেল আসিম সেলিম বাজওয়া জানিয়েছেন। দিল্লিতে রুশ দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও মহড়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। তবে ভারতকে সান্তনা দিতে গিয়ে বলেছে, গিলগিট-বাল্টিস্তানের মতো সমস্যাসঙ্কুল বা স্পর্শকাতর কোনো স্থানে নয়, বরং রাট্টোর সামরিক স্কুলে এই মহড়া হবে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাথে সামরিক সহযোগিতা জোরদার ও বিকাশ করার লক্ষ্যে এই মহড়া হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হবে অবৈধ সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে নির্মূল করা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বেও রাশিয়া এখনো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মিত্র এবং অন্যতম অস্ত্র যোগানদাতা। তাহলে কেন পাকিস্তান-রাশিয়া মহড়া? কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানে বলেন, ‘ভারতের যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি রাশিয়াকে পাকিস্তানের সাথে প্রথমবারের মতো সামরিক মহড়া আয়োজন করতে উৎসাহিত করেছে।’

পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে ২০১৪ সালে। ইসলামাবাদের ওপর থেকে দীর্ঘকালীন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় মস্কো। আর এর মাধ্যমে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটি দ্রুতগতিতে বদলে যেতে থাকে। এবারের মহড়ার আগে রাশিয়া-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকটি স্থাপিত হয় ২০১৫ সালে ইসলামাবাদের কাছে মস্কোর এমআই-৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিক্রির সিদ্ধান্তে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি রাশিয়া লক্ষ্য করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের সফর বিনিময়, যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক পুনবির্ন্যাসের আলোকে নয়া দিল্লির প্রাচ্যনীতি গ্রহণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সহযোগিতা রাশিয়ার জন্য সুখকর হওয়ার কথা ছিল না।

ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রসীমানা। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অবস্থানকে সমর্থন করে ভারত। আর এ ব্যাপারে রাশিয়া সমর্থন করে চীনকে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সেনাদের পাকিস্তানে গিয়ে যৌথ মহড়ায় অংশ নেওয়া বিরাট ঘটনা। বিশেষ করে কাশ্মিরের এক সেনা ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ১৮ সেনাকে হত্যা করার প্রেক্ষাপটে। ভারত চাইছিল, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করতে। কিন্তু রাশিয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকাতে ভারত আরেক দফা পরাজিত হলো বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানে আরও জানান, ভারত এখনো পাকিস্তানের সাথে নিজের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ‘পাকিস্তানের সাথে দিল্লি এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাসও করেনি। এখন পর্যন্ত সে গলাবাজিই করেছে, কাজের কাজ কিছুই করেনি।’ (টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে)

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৪৯ : সংস্কারের বেইজিং মডেলের বৈশিষ্ট্য

আনু মুহাম্মদ ::

চীন কীভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলো এবং এতোবছর তা ধরে রাখতে পারলো, কীভাবে এতো দ্রুত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হলো, কীভাবে এতোবড় দেশে বাজার অর্থনীতিমুখি সংস্কার কোনো বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করলো না তা অর্থশাস্ত্র এবং অর্থনীতি বিষয়ক সব গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠেছে। বিশ্বের মহাজন শক্তিগুলো এভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চায় যে, ওয়াশিংটন ঐকমত্য বা নয়া উদারতাবাদ বা বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ নির্দেশিত পথে অর্থনীতির উদারীকরণ বা ব্যক্তিপুঁজির অবাধ বিকাশই এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি সম্ভব করেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই মডেল তো বিশ্বের বহুদেশেই অনুসরণ করা হয়েছে, সে সব দেশে এ রকম ফলাফল দেখা যায়নি। আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার বহুদেশ, বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান সর্বত্রই বাজারমুখি সংস্কারের ফলাফলে অনেক উঠানামা আছে। বহুদেশ হোঁচট খেয়েছে, বহুরকম সংকটে হাবুডুবু খেয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে তা দেখা গেলো না কেন? মোটাদাগে সংস্কারের দুই ধারার তুলনামূলক চিত্র নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতি বিশ্লেষক কাভালজিৎ সিং গবেষণা করেছেন। চীনের সংস্কারের মৌলিক ভিন্নতার কারণে কাভালজিৎ ‘ওয়াশিংটন ঐকমত্য’ থেকে আলাদা করে একে ‘বেইজিং ঐকমত্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এবিষয়ে তাঁর নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত আমি গ্রহণ যোগ্য মনে করি।[i]

প্রথমত, ১৯৭৮ সালে যখন চীন অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করে ততোদিনে তার অনেক শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিলো। এর আগেই দারিদ্র ব্যাপকভাবে দূরীভূত হয়েছিলো। শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সামাজিক সূচকগুলোতে এর আগেই উচ্চমাত্রার সাফল্য ছিলো। এসব সাফল্য নষ্ট করে নয়, বরং এগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হয়েছিলো।

দ্বিতীয়ত, অন্য বহু দেশে যেমন ভারত, পাকিস্তান বা ব্রাজিলে এসব সংস্কার শুরু হয়েছে একেকটি অর্থকরী সংকটের মধ্যে (ঋণ, মুদ্রামান, লেনদেনের হিসাব ইত্যাদি), সংকট থেকে বের হবার উপায় হিসেবে। কিন্তু চীন কোনো অর্থকরী সংকটের চাপের কারণে সংস্কার শুরু করেনি, করেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তায় উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে, বিশ্বশক্তি হবার আকাঙ্খায়। এরকম নিজস্ব পরিকল্পনা ও কর্তৃত্ব অন্যদেশগুলোর সংস্কারের বেলায় দেখা যায়নি। এখানে তাই অন্যদেশগুলোর বিশ্বব্যাংক আইএমএফের কোনো ভূমিকা বা কর্তৃত্ব ছিলো না। সে কারণে করণীয়, গতি, অগ্রাধিকারে কোনো অসামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।

তৃতীয়ত, চীন ধাপে ধাপে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। প্রথমে কৃষি, পরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শেষে শিল্প। এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিখাতের প্রসার ঘটানো হলেও অর্থকরী খাতের ওপর প্রধানত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে। যে কারণে ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থকরী খাতে ধ্বস নামলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ফটকাবাজারি দ্বারা চীন কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক সংস্কার বা ব্যক্তিখাতের প্রসার কর্মসূচি পুরো চীনের ক্ষেত্রে নেয়া হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে চীন। যেমন, উপকূলীয় ও পূর্ব চীন এলাকায় বিনিয়োগ, কর ব্যবস্থার সংস্কার সীমিত রাখা হয়েছে শুধু কিছু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

পঞ্চমত, রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে যেভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোরকম আইনী ব্যবস্থা না রেখেই   ফালতু দামে বিতরণ করা হয়েছে- যার ফলে মাফিয়া পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটেছে; চীনে সেরকম ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের হাতেই রাখা হয়েছে।

ষষ্ঠত, বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ অনেক বেড়েছে চীনে। কিন্তু অন্য অন্য দেশের মতো তা বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য বাড়াতে পারে নি। প্রথম দিকে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হয়েছে শুধুমাত্র বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে, হংকং ও তাইওয়ানে প্রবাসী চীনাদের থেকে। এই এলাকার বাইরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর বহুরকম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছে।

কিন্তু অনেকরকম সতর্কতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সাফল্য সত্ত্বেও পুঁজিমুখি সংস্কারের অপরিহার্য অভিঘাত ঠিকই দেখা গেছে। গ্রাম শহর ও শ্রেণীগত বৈষম্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সম্পদ কেন্দ্রীভবন, পরিবেশ দূষণ তার অন্যতম।

__________________________________________________________

[i] Kavaljit Singh: “From Beijing Consensus to Washington Consensus: China’s Journey to Liberalization and Globalization”, 2008.

 

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(তৃতীয় পর্ব)

 

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

একথা অনস্বীকার্য যে আমাদের দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল ইংরেজি ও ইউরোপীয় সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসার ফলেই। ইংরেজরা চেয়েছিল এই দেশের কিছু লোককে ইংরেজি শিক্ষাদান করে তাদের কেরানি ও নিচু প্রশাসনিক পদে নিয়োগ করতে-তাতে প্রশাসনিক খরচ কম হবে। মোগল আমলে টোল-মাদ্রাসার বাইরে কোন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। মুদ্রণ শিল্পও ছিল না। সংবাদপত্র এসেছে ইংরেজ শাসনের পরই। এইভাবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইংরেজ শাসন এ দেশের সমাজজীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছিল সেকথা ইংরেজ শাসনের ঘোর সমালোচক ও তৎকালীন পরাধীন ভারতের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু কার্ল মার্কস পর্যন্ত স্বীকার করেছেন। (কার্ল মার্কস, ‘ভারতে বৃটিশ শাসন’)। পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শ আসার ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীতে। সৃষ্টি হয়েছিল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর যার প্রায় পুরোটাই ছিল বর্ণহিন্দু। তাঁদের অনেকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছিলেন এবং হিন্দুসমাজ সংস্কারে মনোযোগী হয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, নারীমুক্তি ইত্যাদি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তখনও পুঁজিবাদ আর বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেনি। সে সময় জমিদার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুৎসুদ্দিগিরি করা একটা সংকীর্ণ ধনিকশ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। তারাও ছিল বর্ণহিন্দু।

হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল, শিক্ষায় ও বিত্তে। এই যে জাগরণ হয়েছিল, যাকে অনেক সময় রেনেসাঁস বলা হয় (যদিও এই শব্দ নিয়ে বিতর্ক আছে) তা সীমাবদ্ধ ছিল বর্ণহিন্দুদের এক সংকীর্ণ অংশের মধ্যে। এর বাইরে ছিল ব্যাপক মুসলমান জনগোষ্ঠী এবং হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কৃষক ও মেহনতি জনগণ এবং তারাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাছাড়া যে সকল মহাপুরুষ উনবিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যে ও সমাজ সংস্কারে ঐতিহাসিক ও মহৎ অবদান রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে কিন্তু নানা ধরনের স্ববিরোধিতা দেখা যায়।

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ প্রথম আধুনিক ভারতীয় ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। কিন্তু তিনি সামন্তবাদী জমিদারী ব্যবস্থা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক ছিলেন। ফরাশি বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন দরকার বলে মনে করতেন। সবদিক দিয়ে সবচেয়ে র‌্যাডিকাল বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ছিলেন ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী ও ডিরোজিওর শিষ্যরা। তাঁরা সরাসরি না বললেও স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন নাস্তিক এবং অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক। তাঁরা নারী পুরুষের সমতার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ডিরোজিওর র‌্যাডিক্যাল ভাবধারা পরবর্তীতে খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। বরং রামমোহন-বিদ্যাসাগরের আপোসপন্থী লিবারেল ধারার পথেই শিক্ষিত হিন্দু সমাজ অগ্রসর হয়েছিল। অবশ্য বিদ্যাসাগর ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক, সম্ভবত নাস্তিকও। পরাধীনতার গ্লানি তাঁকে পীড়িত করত, কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করেননি, জমিদারী ব্যবস্থা সম্পর্কেও নিরব ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক শিক্ষার প্রসারের জন্য আগ্রহী ও তৎপর ছিলেন। একথা সকলেই জানেন যে রাজা রামমোহন রায়ের একান্ত প্রচেষ্টার ফলে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছিল (১৮২৯ সালে) আর হিন্দুসমাজে বিধবা বিবাহ আইন সিদ্ধ হয়েছিল (১৮৫৬ সালে) বিদ্যাসাগরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে। আমার বিবেচনায় বিদ্যাসাগর ছিলেন এই মাটির মহত্তম পুরুষ।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত পৈত্রিক জমিদারি ও পৈত্রিক ধর্ম পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ভালভাবে পরিস্ফুট। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এলেন আরেক প্রতিভাবান সাহিত্যিক যার সামাজিক ভূমিকাও ছিল বিরাট। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে তিনি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। কিছুটা সাম্যের ধারণাও। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠলেন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের প্রধান প্রবক্তা। তিনি হয়ে উঠলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক, ইংরেজ শাসনের ভক্ত এবং মুসলিম বিদ্বেষী। বিরাট সাহিত্য-প্রতিভার অধিকারী বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তাবাদের আবেগ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আনন্দমঠে’র অন্তর্ভূক্ত গান থেকে নেয়া ‘বন্দে মাতরম’ শব্দদ্বয় বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের মন্ত্রধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এই উপন্যাসেই তিনি দেখাচ্ছেন, ইংরেজরা এসেছে জনগণকে রক্ষা করতে। তাঁর জাতীয়তাবাদের শত্রু কিন্তু ইংরেজ নয়, বরং প্রতিবেশী মুসলমানরা শত্রু বলে চিহ্নিত হয়েছিল। এইভাবে রামমোহন-বিদ্যাসাগর যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও উদার মানবতাবাদী ধারার সৃষ্টি করছিলেন তা হিন্দু পুনর্জাগরণবাদে পরিণত হয়েছিল।

অবশ্য হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিলেন। যেমন হিন্দু পেট্রিয়টের সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তিনি জমিদারের বিরুদ্ধে কৃষকপ্রজার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পাবনার প্রজাবিদ্রোহের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র যখন কৃষকের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, তখন হরিশচন্দ্র বিদ্রোহী কৃষকের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। এমনকি ১৮৫৭ সালের  মহাবিদ্রোহের সময় তিনি কৌশলের সঙ্গে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। নীলকুঠির অত্যাচারের বিরুদ্ধে নাটক লিখেছেন দীনবন্ধু মিত্র। ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা তুলে ধরেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আর্যদর্শনের সম্পাদক যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ প্রমুখ হিন্দু বুদ্ধিজীবী। শ্রমজীবীর পক্ষে গান রচনা করেছেন এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। এইরকম আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে মুসলমান সমাজের চিন্তাচেতনা কোন স্তরে ছিল? হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল গরিব ও কৃষক। উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিতরা যখন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদ অথবা মুসলিম জাতীয়তাবাদ নিয়ে মাতামাতি করছেন, অথবা বিপরীতে উভয় সম্প্রদায়ের উদার অংশ যখন হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য সচেষ্ট তখন গরিব শ্রমজীবী হিন্দু-মুসলমান আপনা থেকেই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন এবং মিলিতভাবে লড়াই করেছেন ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে, জমিদারদের বিরুদ্ধেও। তবে এই শ্রমজীবীরা ছিলেন অক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত। অভিজাত মুসলমান শ্রেণী প্রথমে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। শাসন-ক্ষমতা হারানোর ক্ষোভে এই তার প্রতিক্রিয়া। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উচ্চবিত্ত ও বর্ণহিন্দুরা ছিল রাজভক্ত, কিন্তু তাদের একটি অংশ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা ছিল ইংরেজ বিরোধী, তবে চিন্তাচেতনায় পশ্চাৎপদ। উভয় সমাজের মধ্যে এই যে অদ্ভূত ধরনের বৈপরীত্য তা ছিল ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

আহমদ ছফা মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত যে দুইটি গণ-সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে তিতুমীরের নেতৃত্বাধীন ওয়াহাবি আন্দোলন ও দুদুমিয়ার নেতৃত্বাধীন ফরায়জি আন্দোলন। এই আন্দোলন ব্রিটিশ রাজ ও জমিদার বিরোধী ছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইটি জনপ্রিয় আন্দোলন ছিল মহৎ। কিন্তু একই সঙ্গে এই আন্দোলন দুইটির মধ্যে যে ধর্মীয় রং ছিল এবং তা যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারেনি সেটাও ভুললে চলবে না। এক কথায় বলা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষিত হিন্দুরা ছিলেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজভক্ত, কিন্তু বহুবিধ সামাজিক বিষয়ে তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। অন্যদিকে অভিজাত ও কিছুটা শিক্ষিত (আরবি-ফার্সি ভাষায় শিক্ষিত) মুসলমানরা ছিল ব্রিটিশ বিরোধী কিন্তু সামন্ত ধ্যান-ধারণা দ্বারা আচ্ছন্ন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিত্রটি বদলে গেল। হিন্দু শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়ে উঠলো বৃটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী। অন্যদিকে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ-প্রীতি তৈরি হয়েছিল। মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ এবং বাংলায় নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী। মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজের প্রতি আনুগত্যের মনোভাব তৈরির জন্য তাঁরা সচেষ্ট হয়েছিলেন।

 

 

 

আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা কতোটুকু

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন কি সমাগত এবং সেটি কি ২০১৭ সালের শেষার্ধে অনুষ্ঠিত হবে? এরকম একটি সম্ভাবনাময় আলোচনা যখন বাতাসে ভাসমান অবস্থায়, ঠিক তখনই নিউইয়র্ক সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোন মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়। যদিও সরকারের নীতি-নির্ধারকরা আকছার বলে আসছেন, ২০১৯-এর আগে কোন নির্বাচন নয়। এমনকি সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধরকরাও ওরকমটিই বলে আসছেন।

কিন্ত সরকার মুখে যাই বলুক একটি আগাম নির্বাচনের বিষয় তাদের ভেতরে ভেতরে আলোচিত হচ্ছে এরকম আভাস একাধিকবার পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা যতগুলি জনসভা করেছেন, সেখানেই তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরে নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাইছেন। যদি মেয়াদ শেষেই নির্বাচন হয়, তাহলে স্বয়ং দলীয় প্রধান এখনই কেন এত গুরুত্ব সহকারে ভোট চাইছেন? নাকি এটি রুটিন প্রচারের অংশ?

২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় বলা হয়েছিল এটি ‘নিয়ম রক্ষার’। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে পরবর্তীকালে আন্দোলনের মাঠ ত্যাগ করায়, বলা যায় নাশকতা পরিত্যাগ করে ‘ক্ষ্যামা’ দিলে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন বা এধরণের যে কোন আলোচনা থেকে সরে আসে। কারণ আলোচনায় বসিয়ে বা আন্দোলনের পথে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করার সকল অবস্থানই দলটি হারিয়ে ফেলতে থাকে বিএনপি নেতৃত্বের অযোগ্যতার কারণে। বিএনপির সীমাহীন ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের কূটকৌশল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এবং সক্ষমতায় রাজনীতির গতিপথ সরকারের হাতেই ন্যস্ত হয়ে যায়।

২০১৪ সালের নির্বাচনকে নানাভাবে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা স্বত্ত্বেও ক্ষমতাসীনরা খুব ভালভাবেই জানে যে, সেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে  এখন পর্যন্ত গ্রহনীয় হয়নি এবং একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের ওপর তাগাদা রয়েছে। তবে হাতেগোনা দু’একটি দেশের সমর্থণ সরকারকে এ বিষয়ে অনেকটা নির্ভার রেখেছে। একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারেরও আগ্রহ রয়েছে এবং সেজন্য একটি সুবিধেজনক সময় তারা বের করতে চাইছে, যার ওপর তাদের থাকবে একক নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে, আগামী বছর নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেখার বিষয় হচ্ছে, এটি কি হবে একটি অনুগত কমিশন, নাকি সত্যিকারের স্বাধীন এবং শক্তিশালী কমিশন?

তবে, সরকার না চাইলে ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। হিসেব মত ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। মেয়াদ শেষের আগেই নির্বাচন প্রস্তুতির মধ্যে ক্ষমতাহীনদের কিছু লক্ষ্যভেদী কৌশল রয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের পরে আগামী নির্বাচন কৌশল অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠবে। সম্মেলনে নতুন আঙ্গিকে ঘোষণাপত্র পেশ করা হলে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দলীয় কৌশল ও দিক-নির্দেশনাগুলি অনুধাবন করা যাবে।

গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ সদস্যদের এলাকায় গিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পরবর্তী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের সম্ভাব্য তালিকা তৈরীর জন্য মাঠ পর্যায়ে খোঁজ-খবর করতে একাধিক সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বহুকাল আগে থেকে সরকারী প্রার্থী দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরন করা হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি আসনে অন্তত: পাঁচ জনের একটি তালিকা তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদেশী একটি জরিপ প্রতিষ্ঠানকে মাঠের অবস্থা জরিপ করে প্রতিবেদন তৈরীর দায়িত্বও দেয়া হয়েছে।

নির্বাচন ঘোষিত হলে এড়িয়ে যাবার কোন উপায় বিএনপির নেই। দলটির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহনের কোন বিকল্প নেই। তাদের বহুল কথিত “আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন বা সরকারকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য করা’’-র কোন অবস্থায় ও অবস্থানে তারা নেই, অন্তত: ২০১৪-এর অভিজ্ঞতায়। ২০১৩-১৫ সালে আন্দোলন ও নাশকতা এবং এর পরিনাম বিএনপিকে বুঝিয়ে দিয়েছে রাজনীতির মূলধারায় টিকতে হলে নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। তাছাড়া এই মূহুর্তে বিএনপি সামান্য দর কষাকষির অবস্থানেও নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, খালেদা জিয়া, তারেক ও তাদের অনুগত কয়েক নেতাকে ছাড়াই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা,  তারেকসহ অনুগতদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলির বিচার ২০১৭ সালের মধ্যে নিস্পন্ন হতে যাচ্ছে। মামলাগুলোয় সাজা হলে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিষয়টি পুরোপুরি আইনী জটিলতা ও আইনী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এরকম পরিস্থিতির সবরকম সুবিধে নেয়ার জন্য সরকার তৈরী আছে এবং এজন্যই আগামী নির্বাচনটি হবে তাদের অধীনে মেয়াদ শেষে বা সুবিধেজনক কোন সময়ে।

বিএনপির অপর চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, নির্বাচন হবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। মুখে বিএনপি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলছে বটে, কিন্তু দাবি আদায়ে তাদের কোন অঙ্গীকার বা সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। এটি বিএনপিও যেমন বোঝে, সরকারও তেমনি জানে। ফলে নির্বাচন হলে তাদের অংশ নিতে হবে। অংশ নিয়ে তাদের বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করতে হবে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকার ন্যূনতম নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম নয়। গত ইউপি নির্বাচন এর বড় উদাহরন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মত্ত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা কিছুটা অতীতকেন্দ্রীক নীতিগত ও আদর্শিক দ্বন্দ, তবে প্রায় সবটাই ক্ষমতার। রাজনৈতিক খেলায় গত আট বছর বিএনপি প্রায় পর্যদুস্ত ও বিপর্যস্ত। আর এই খেলায় ক্ষমতাসীনদের সফল করতে বিএনপির আত্মঘাতী প্রবণতা অনেকটা সহযোগিতা করেছে। সামরিক ছাউনিতে জন্ম নেয়া দলটি আশির দশকে মধ্যপন্থায় সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হলেও গত দু”দশকে তৈরী হয়েছে চরম ডানপন্থার ঝোঁক। এরপরেও দলটি সম্বিত ফিরে পায়নি। দল গোছানোর প্রচেষ্টায় গত কাউন্সিলের কথিত পুণর্গঠন এর সবচেয়ে বড় প্রমান।

এই আত্মঘাতী রাজনীতি সরকারের জন্য সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। নমুনা হচ্ছে, সারাদেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সাড়ে বাইশ হাজারেরও বেশি। খালেদা জিয়াসহ ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সাড়ে চার হাজার। এর অনেকগুলি মামলাই বিচার প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যায়ে। এর পরিনতিই বলে দেবে, এসব মামলায় খালেদা, তারেকসহ নেতাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। আইনী প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলার বদলে তারেক আপাতত: প্রবাসেই থাকছেন-এটি নিশ্চিত।

সরকারের উৎসাহ ও সাম্প্রতিক প্রবণতায় মনে হচ্ছে, এ মূহুর্তে খালেদা ও তারেকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পেতে উদগ্রীব। এক্ষেত্রে বিএনপির অভিযোগ, দলের দুই শীর্ষ নেতাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের আচরন ও পদক্ষেপ এই অভিযোগকে উস্কে দেয় এবং বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়ে একটি নির্বাচন আয়োজনের আভাস মেলে। এরকম সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে নির্বাচন হলে পুনরায় ক্ষমতাসীন হতে সরকারের আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই।

একটি জাতীয় নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অব্যাহত চাপ ও আগ্রহ এবং তাদের লবি’র স্বক্রিয়তা সরকারকে কিছুকাল আগেও সমঝে চলতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জঙ্গী তৎপরতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের আপাত: সাফল্য দেখিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চাপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা সরকারকে স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতামত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া জঙ্গীবাদ দমন সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকায় এসে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক  রাজনীতির ট্রেন্ড দেখে মনে হচ্ছে, সরকার রাজনীতিতে বিএনপিকে কিছুটা স্পেস দিলেও মামলা, গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

টিভি টক শো’গুলিতে সরকারপক্ষীয় বুদ্ধিজীবিরা যাই বলুন না কেন, সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির রিপোর্ট সরকারের জন্য মোটেই স্বস্তিকর নয়। সবকিছু উপেক্ষা করে, চাপ কাটিয়ে ২০১৮ সালের নির্বাচন এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্যাশন। ক্ষমতাসীনদের বড় স্বপ্ন ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী উদযাপনে। এটি নিশ্চিত করতে সরকার নির্বাচনে জিততে যে কোন কৌশল গ্রহন করতে পারে-এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

নির্বাচনে জেতার সামগ্রিক ক্ষেত্র তৈরী করার জন্য সরকারের কিছু পদক্ষেপ আগামীতে আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে। গ্রামীন জনপদে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিগুলিকে দেয়া হচ্ছে অলিখিত নির্দেশ। একনেক সভায় পাশ করা হচ্ছে মেগা সাইজের সব প্রকল্প এবং এসব অবকাঠামোর উদ্বোধন ও সুপারসনিক গতিতে এগুলো বাস্তবায়নে সরকার আগ্রহী। এসব প্রকল্প নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়গুলো দেখেও না দেখার ভান করছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প নির্বাচনের আগেই সরকার শেষ করতে চায় এবং আগামী নির্বাচনে এই সেতুর বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম নির্বাচনী ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মূলত: গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়াকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন কাজকে দৃশ্যমান করে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনী বৈতরনী পাড় হতে চায়। এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বিএনপিকে সামাল দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের পাশাপাশি ভাঙ্গন আনার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

বিএনপির মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বহুভাবে। একটি হচ্ছে, ভিন্নমাত্রার চাপ, অন্যটি হচ্ছে, নানারকমের প্রলোভন দেখিয়ে, মামলা-হামলার মাধ্যমে কাবু করে। এ লাইনে কিছুটা সাফল্য অর্জন করা গেলেও মূলধারার বিএনপির গায়ে এখনও খুব একটা আঁচড় কাটা যায়নি। বহিস্কৃত বিএনপি নেতা ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত তৃণমূল বিএনপির কার্যক্রমে সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকছে। ২০ দলীয় জোট থেকে নামসর্বস্ব দলগুলোকে বের করে নিয়ে আলাদা একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বিএনপির একটি অভিযোগের বাস্তবতা রয়েছে যে, সরকার হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে, যাতে বিএনপি আবারও নির্বাচনে অংশ না নিতে পারে।

দশম সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জনগন নির্ভর ছিলেন না। তার আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি নির্বাচনে ভরাডুবির পর সংসদ নির্বাচনে কি ঘটতে পারে সে মেসেজ তো তারা আগাম পেয়ে গিয়েছিলেন। ফলে প্রশাসন ও বাহিনী নির্ভর ঐ নির্বাচন অনুষ্ঠান জানিয়ে দিয়েছিল সরকার কতটা নির্ভরশীল প্রশাসনযন্ত্রের ওপর। এই নির্ভরতা অনিবার্যভাবে ক্ষমতাসীনদের যে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য তেমন কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিও তাদের নেই। বিপরীতে বিএনপির অবস্থা আরো শোচনীয় এবং তারা রাজনীতির মূলধারায় ফিরতে ক্রমাগত যুজতে হচ্ছে নিজেদের ও ক্ষমতাসীনদের সাথে।

টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ভিত এখন অত্যন্ত সূদৃঢ়। রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন তাদের হাতে। এই দলকে ঘিরে বিশাল একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠি দাঁড়িয়ে গেছে। অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক এই গোষ্ঠি। এদের সুফল প্রাপ্তি অব্যাহত ও নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ক্ষমতার সবুজ মাঠের দিকে। সেজন্যই আগামী জাতীয় নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তারা।

মেয়াদ পূর্ণ হবার আগে বেশ কয়েকবার গুজব সৃষ্টি হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোন ঝুঁকি নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। এজন্য তারা অপেক্ষা করে আছে খালেদা জিয়া, তারেকসহ বিএনপির প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার ফলাফলের ওপর। ঐ সকল মামলার বিএনপির প্রধান নেতৃত্ব দন্ডিত হলে নির্বাচনে যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, নয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত সার্চ কমিটির বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, তারা ‘আজিজ’ মার্কা নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন না। সম্ভবত: তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এবারেও ‘কাজী রকিব উদ্দীন’ মার্কা কমিশনই গঠিত হবে, কিম্বা তার চেয়েও বেশি…!

২০১৫ সালেই যুদ্ধ-ব্যয় ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার, কিন্তু শান্তিতে?

ক্যামিলা স্কিপা ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালটি ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুাকপূর্ন ও খারাপ একটি খারাপ বছর। ঐতিহাসিক প্রবণতা অনুযায়ী, বৈশ্বিক শান্তি আরো নাজুক অবস্থায় পড়েছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে ২০১৫ সালেই বৈশ্বিক যুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ভয়াবহ মাত্রায় সন্ত্রাস দেখা গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত বছরই সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত লোক দেখা গেছে।

এই সহিংসতার মূল্য বিপুল। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্রয় ক্ষমতা মানদন্ডে (পিপিপি) ২০১৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য দিনে ৫ ডলারের সমান, কিংবা বৈশ্বিক বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) আয়তনের ১১ গুণ।

সহিংসতার ক্ষতি আসলে হিসাব করা উচিত মানবীয় ও আবেগগত মানদন্ডে। অবশ্য অর্থনীতিতে ক্ষতির হিসাবটাও বিবেচনায় আনা দরকার। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের সময় সহিংসতা প্রতিরোধ ও সংযত করার ব্যয় এবং সেইসাথে এর পরিণতিও পরিমাপ করা দরকার। এই বিবেচনাটা খুবই দরকার। কারণ সহিংসতা সংযত রাখতে ব্যয় করাটা দরকারি হলেও এটা অর্থনৈতিকভাবে মূলত অনুৎপাদনশীল।

সহিংসতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধে এবং এর পরিণামে যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে, সেটা পরিমাপ করার একটি পদ্ধতি হলো ‘আইইপি’ পদ্ধতি। এতে কেবল সামরিক ব্যয়ই হিসাব করা হয় না, বরং সেইসাথে নিরাপত্তা ও পুলিশের পেছনে অভ্যন্তরীণ ব্যয় এবং সশস্ত্র সংঘাত, নরহত্যা, সহিংস অপরাধ এবং যৌন নিপীড়নে ক্ষয়ক্ষতিও বিবেচনায় আনা হয়।

১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় ও ক্ষতি বিশ্ব জিডিপির ১৩.৩ ভাগের সমান। এই টাকাটা এই দুনিয়ার সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে চাইলে প্রতিটি লোক পাবে ১,৮৭৬ ডলার করে।  এই হিসাব করাটা দুটি কারণে খুবই দরকার। প্রথমত, এই ব্যয়ের ৭০ ভাগের বেশি করে সরকার তার সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়; অর্থাৎ সরকারি ব্যয়ের বড় অংশটাই যাচ্ছে এই খাতে। বিশ্ব যদি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ হয়, তবে এই বিপুল সম্পদ অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ত, সহিংসতা ও সংঘাত অবসানের পরও যে ক্ষতিটা বিরাজ করতে থাকে, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ। তাতেও কিন্তু বিপুল খরচ হতে থাকে।

একটু নজর বুলালেই দেখা যাবে, সহিংসতা সৃষ্টি এবং সেটা থামানোর জন্য বিশ্ব অব্যাহতভাবে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় শান্তির পেছনে খরচ করছে অতি সামান্য। কেবল ২০১৫ সালেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কাজে ব্যয় হয়েছে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার; যা সশস্ত্র সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হওয়া ৭৪২ বিলিয়ন ডলারের মাত্র ১.১ ভাগ। দীর্ঘ মেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের দরকার ৬.৮ বিলিয়ন ডলার, যা সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতি হচ্ছে তার মাত্র ০.৯ ভাগ।

ভবিষ্যত যাতে শান্তিপূর্ণ হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিরক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ।

বর্তমানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমগুলোর লক্ষ্য মূলত সংঘাত সৃষ্টি হলে সেটা থামানোর চেষ্টা করা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে চাইলে প্রয়োজন সংঘাত যাতে সৃষ্টিই না হয়, সেটার ব্যবস্থা করাই সবার আগে জরুরী।

শান্তি প্রতিষ্ঠা মিশনের লক্ষ্য হবে- সহিংস সংঘাত প্রতিরোধে জাতীয় সামর্থ্য জোরদার করা, এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা- যেগুলো টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে।

কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতার পেছনে ব্যয় করছে বিপুল অর্থ, শান্তিতে খুবই সামান্য। অবশ্য, এ কারণেই শান্তির পেছনে ব্যয় বাড়ানোর অর্থনৈতিক যুক্তিও প্রবল হয়ে ওঠছে।

কোনো কোনো দেশে আরো শান্তির দাবি জোরদার হতে থাকলেও এবং তারা শান্তির চেষ্টা বাড়াতে থাকলেও সার্বিকভাবে বিশ্বজুড়ে সহিংসতা বাড়ছে। এতে করে দেশগুলোর মধ্যে আরো বেশি বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। কম শান্তিপূর্ণ দেশগুলো বেশি বেশি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে তারা আরো বেশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ছে।

(লেখক- পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পিস।)