Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 33)

Author Archives: আমাদের বুধবার

কর দেয়না কোটিপতিরা : চাপে স্বল্প আয়ের মানুষ

সরকারি হিসাবেই দেশে সোয়া লাখ কোটিপতি

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কর ভারে নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত বা স্বল্প মানুষের আয়ের ওপর ব্যাপকমাত্রায় করারোপের কথা জানান দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৬ হাজার টাকা মাসিক আয় হলেই তাকে কর দিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অসম কর ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অনৈতিকভাবে উপার্জনের সুযোগ বন্ধ করার নির্দেশনার বিপরীত। উল্লেখ্য, গত জুন মাসেই ৩ লাখ টাকার বেশি আছে এমন ব্যাংক হিসাবগুলোকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন হিসাবের সংখ্যা সংখ্যা ৩১ লাখ ৮০ হাজার যার মধ্যে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান দুই’ই আছে। সঞ্চয়ী  হিসাবের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি, যার অধিকাংশ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প সংখ্যক উচ্চ মধ্যবিত্ত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দাড়ায়, আসলে যারা বৈধ এবং অবৈধভাবে কোটিপতি হয়েছে তারা কি ঠিকমতো কর দেয়? এনবিআর কি তাদেরকে করের আওতায় আনতে পেরেছে বা এমন কোন উদ্যোগ কী আছে?

ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে কিংবা চাকরিজীবিদের বেতনের ওপর উৎসে করারোপের মাধ্যমে এনবিআর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করছে। অর্থ বিল ২০১২ অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) আছে এমন আমানতকারীদের থেকে ১০ শতাংশহারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। যাদের টিআইএন নেই তাদের মুনাফায় ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে জানান, গত ৭ বছরে দেশে বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবধারীদের  সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ছিলো, ২০১৩ সালে ৯৮ হাজার ৫৯১টি, ২০১২ সালে ৯০ হাজার ৬৫৫টি এবং ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার ১৫০টি। কিন্তু ওই সংখ্যার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যার হিসাব সংখ্যা একশ’রও বেশি। তাই ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা রয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কোটিপতির সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি উদ্যোগে এক কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিলো ৩৭ হাজার ১৭৭টি এবং মোট জমার পরিমাণ ছিলো এক লাখ ৫৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪২টি। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব তিন হাজার ৬৮৭টি, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাব আছে এক হাজার ৮৯টি। আর ৫০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক ছিল ২৪৮টি। তবে বেসরকারি হিসাবে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত প্রায় আড়াই লাখ কোটিপতি রয়েছে বাংলাদেশে। অথচ ১৯৭৫ সালে কোটি টাকার বেশি অর্থ আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭টি।

বাস্তবে কোটিপতিদের উপার্জনের তুলনায় কর দাতার সংখ্যা রীতিমত হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১ কোটি টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন করদাতা। ২০১৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের কিছু বেশি, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন, ২০১১ করবর্ষে সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী চূড়ান্ত হিসাবে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে এমন করদাতার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩০৩ জন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, বাঁকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার হিসাব বা সংশ্লিষ্ট কোটিপতিরা কেন এখনো কর আওতার বাইরে? এসব কোটিপতির সম্পর্কে কোনো তথ্য কি এনবিআর এর কাছে নেই? একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন করদানে সক্ষম মানুষ প্রায় ৯৬ লাখ। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মাত্র ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯৪ জন করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। এর বিপরীতে আয়কর জমা পড়ে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। শুধু কোটিপতি নয় প্রজাতন্ত্রের বা সরকারি কাজে নিয়োজিত ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর  মধ্যে প্রায় তিন লাখ কর্মকর্তা বৈধভাবে করযোগ্য অর্থ উপার্জন করলেও আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৬৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার। অর্থাৎ আয়কর রিটার্ন জমা দেন না ৭৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ।

কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই এনবিআর-এর অভিযানের প্রেক্ষিতে ল্যান্ড রোভার, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তার পাশে আনাচে কানাচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোটি টাকার ওপরে (আমদানি শুল্কসহ) দাম এমন প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ি নিবন্ধিত আছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। এর বাইরেও অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে অন্তত ৩০০ গাড়ি। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ হাজার বিলাসবহুল গাড়ির যে নিবন্ধন আছে তার মধ্যে মার্সিডিজ বেঞ্জই প্রায় ২৫ হাজার। একেকটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ও লেক্সাস গাড়ি কিনতে খরচ পড়ে গড়ে চার কোটি টাকা, বিএমডব্লিউ ও ল্যান্ড রোভার কিনতে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। প্রশ্ন হলো- প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ির মালিকও যদি কর দেয় তাহলে কোটিপতি করদাতার সংখ্যা মাত্র ৬ হাজারের বেশি হয় কিভাবে? শুধু তাই নয়, রিহ্যাব সূত্র অনুযায়ী, ধানমন্ডি, গুলশান এবং বনানীতে ফ্ল্যাটের মূল্য প্রতি বর্গফুট গড়ে ১৫ থেকে ২২ হাজার টাকা। সে হিসাবে এসব এলাকায় একেকটি মধ্যম মানের ফ্লাটের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। কয়েক হাজার প্লাট মালিকের মধ্যে কতজন ঠিকমতো কর দেয়?

কর প্রদানে কোটিপতিদের এ অনীহা নতুন কিছু নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান এর মতে, এটা অপ্রত্যাশিত যে, এত কম সংখ্যক ব্যক্তি কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে, কোটিপতিদের কাছ থেকে কর আদায় করা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিয়ে কোটিপতিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ এনবিআরের গ্রহণ করা উচিত। এরপর তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে না। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কর রাজস্ব এবং জিডিপি অনুপাত ৩৩.৮ শতাংশ থেকে ৩৩.৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে এ হার ৮%-১২% হলে ও বাংলাদেশের কর রাজস্ব অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশে নিম্ন রাজস্ব আয়ের প্রধান কারণ ব্যাপক কর ফাঁকি। গোপন বা অনৈতিক উৎস হতে উপার্জনের অবারিত সুযোগ থাকায় রাজস্ব  আয়ের ঘাটতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কালো অর্থনীতির সুযোগ বাড়ছে এবং সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন নয়, করারোপ নীতি এবং কর ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সময়কালে মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় হয় মাত্র ১,৪৫৫ কোটি টাকা, যা এনবিআরের ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সংশোধিত সর্বমোট রাজস্ব করের মাত্র ১.১৬ শতাংশ। এ ব্যবস্থা চলমান থাকায় অবৈধ অর্থ উপার্জন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পাচ্ছে। আর কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অবৈধ অর্থ বিদেশে কর-স্বর্গ বলে পরিচিত দেশসমূহে পাঁচার করে তা আবার দেশে নিয়ে আসলেও এনবিআর বা দুদক এসব অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে পারেনি বা চায়নি। উল্টো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রুই-কাতলাদের নির্বিচারে সততার সনদ দিয়েছে দুদক। উল্লেখ্য, এনবিআর সুত্রে জানা যায়, করস্বর্গ বলে খ্যাত বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেমান আইল্যান্ড, মরিশাস, পানামা, মাল্টা, ফিলিপাইনসহ বিভিন্নস্থানে বাংলাদেশীদের অবৈধ অর্থ পাচার হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস বাজেট এবং পলিসি সেন্টার এর কূর্ট ওয়াইজ এবং নোয়াহ এর মতে, ‘করারোপে’র উল্লম্বন সমতা’র আওতায় নাগরিকের ওপর করারোপের ক্ষেত্রে কর প্রদানের সক্ষমতাকে বিবেচনা করার কথা এবং যার আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় ধনীরা তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রদানের কথা’। এ প্রেক্ষিতে কর ব্যবস্থাকে সুষম এবং দারিদ্র-বান্ধব করে তোলার প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনবিআর এর সমন্বয়ে কোটিপতিদের করের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে দেশের প্রচলিত কর আইন সংশোধন করা; পরোক্ষ কর পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান বৃদ্ধি করে কর নীতিমালা দরিদ্রবান্ধব ও কর কাঠামো অধিকতর প্রগতিশীল করা; অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাতকে মূল্য সংযোজন করের আওতামুক্ত রাখা; আয়-বৈষম্য এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে (ব্যক্তি এবং কর্পোরেট দেশীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ) আয়স্তর, আয়কর হার নির্ধারণ; ব্যক্তির টিআইএন, জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্টের নম্বর এবং কর প্রদান সংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা; একটি ন্যুনতম সীমার উর্দ্ধে সকল লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা প্রদান করা; সকল বৈধ টিআইএনধারীর নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা; এবং সর্বেপারি সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ অটোমেশন এবং কার্যকর ই-গভর্নেন্স নিশ্চিত করা; কর ন্যায়পালের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করতে এনবিআরকে আইনী ক্ষমতা দেয়া জরুরি।

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(দ্বিতীয় পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষনের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই । তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির  বক্তা  অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

দার্শনিক হেগেল ভারতবর্ষ সম্পর্কে বলেছিলেন যে ভারতবর্ষের কোন ইতিহাস নেই। একথা দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন যে, সমাজ নিশ্চল ছিল, সময়ের সঙ্গে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ‘এশীয় স্বৈরতন্ত্র’ সম্পর্কিত মার্কসের বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝতে না পারার কারণে অনেক ভারতীয় মার্কসবাদীও অনেকটা হেগেলের মতই অনুধাবনযোগ্য মনে করতেন। ভারতের বিখ্যাত মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ, গণিতজ্ঞ ও পন্ডিত দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী এই মতের কড়া সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ভারতের সমাজের মধ্যেও তীব্র শ্রেণীসংগ্রাম ছিল। হয়তো তা ইউরোপের মতো নয়। কিন্তু সমাজ একেবারে নিশ্চল, অপরিবর্তনীয় ছিল এমনটা মনে করা হবে খুবই বড়  ভুল ও অনৈতিহাসিক। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়ার ভূমিকা’ (An Introduction to the Study of Indian History) গ্রন্থটির একেবারে প্রথম প্যারাতেই কোসাম্বী এই রকম ভুল ধারণা খন্ডন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের বৃত্তান্তে কিছু ঘটনা পরস্পর আছে, কোন ইতিহাস নেই’ (India has some episodes but no history)-এই সিদ্ধান্তকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। গোটা বইয়ে অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে শ্রমজীবী মানুষ শ্রেণীসংগ্রাম করেছে এবং ইতিহাস নির্মাণ করেছে। শুধু ইউরোপেই না, ভারতবর্ষেও। (D. D. Kosambi, An Introduction to the Study of Indian History (Bombay: Popular Prakashan, 1956).

আমরা দেখছি, আর্যদের দখলে চলে যাবার পর এই ভূখন্ডের আদিবাসী অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষেরা বর্ণাশ্রমের শিকার হতে বাধ্য হয়েছিল। সেটি ছিল বিরাট ঐতিহাসিক পরাজয়। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এ দেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিতম উৎস।’          (ঐ, পৃষ্ঠা ৩৪।) এর সঙ্গে দ্বিমত করার কিছুই নাই। হিন্দু সমাজে এখনও জাতপাত প্রথা বিষফোড়ার মতো টিকে আছে। সেই প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করছি না। আমাদের আলোচ্য বিষয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং বর্তমানের ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গিবাদ। আহমদ ছফা আবার একই সঙ্গে লিখেছেন, ‘বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ঐ বিদেশী উন্নত শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন-ছড়াতে, খেলার বোলে তার অজস্র প্রকাশ ছড়ানো আছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ট আর্যশক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। (ঐ পৃষ্ঠা ৩৩) আহমদ ছফার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী। সেই ঐতিহ্য পরবর্তীতেও আমাদের পূর্বপুরুষরা বহন করে এসেছেন বংশানুক্রমিকভাবে। বৌদ্ধধর্ম ছিল আর্যশাসনের বিরুদ্ধে অর্থাৎ শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিত জনগণের প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের একটি রূপ। প্রাচীন যুগে রাজনৈতিক দল ছিল না। তখন বিদ্রোহ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের আবরণে আত্মপ্রকাশ করত। তা পশ্চিম এশিয়ায় যেমন খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বাংলায় পাল রাজবংশের উৎপত্তি ছিল জনগণের বিদ্রোহের ফলস্বরূপ। পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল ছিলেন জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও জনদরদী শাসক ছিলেন, এমনটা মনে করা সঠিক নয়। সেই প্রাচীন বা মধ্যযুগে রাজাবাদশা শাসক মাত্রই ছিলেন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী। পাল রাজাদের বিরুদ্ধে কৈবর্ত বিদ্রোহ আরেকবার প্রমাণ করে যে এই জনপদের সাধারণ শ্রমজীবী ও কৃষকরা ছিলেন সংগ্রামী মনোভাবাপন্ন। মার্কসবাদী রাজনীতিবিদ লেখক সত্যেন সেনের একটি উপন্যাস আছে কৈবর্ত বিদ্রোহ ভিত্তি করে। উপন্যাসের নামও ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’। (সত্যেন সেন, বিদ্রোহী কৈবর্ত) কৈবর্ত রাজারা (দিব্যক, রুদ্রক, ভীম) গৌড়ে কয়েক বছর রাজত্ব করেন। পরে পালরা মগধ থেকে এসে আবার গৌড় দখল করেছিলেন। ১১২০ সালে কর্ণাটক থেকে আসা সেনরা বাংলা দখল করেন এবং তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্ম পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জাতিভেদ প্রথা আবার চাপিয়ে দেয়া হল এবং বৌদ্ধদের নিশ্চিহ্ন করার ব্যবস্থা করা হল। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এবং বুদ্ধের বাণী যারা প্রচার করতেন তাঁরা আত্মগোপনে গেলেন। তাঁরা কিভাবে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ একটিভিটি চালাতেন, তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। ঠিক একইভাবে ইতিহাসের একটি পর্বে রোমান সাম্প্রাজ্যও খ্রিস্টধর্মের প্রচারকগণ আত্মগোপনে থেকে ধর্মমত প্রচার করতেন। এইসব ছিল শ্রেণী সংগ্রামের এক একটি রূপ। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতায় দেখা যায়, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু রাজারা কিভাবে বৌদ্ধ প্রচারক ও বুদ্ধভক্তদের হত্যা করত।

‘অজাতশত্রু করেছে রচনা

স্তুপে যে করিবে অর্ঘ্যরচনা

শূলের উপরে মরিবে সে জনা অথবা নির্বাসনে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘পূজারিনি’-কথা কাব্যগ্রন্থ, সঞ্চয়িতায় সংকলিত)

এটি উত্তর ভারতের ক্ষেত্রেও যেমন, তেমনি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য ছিল।

আহমদ ছফা বলেছেন, ‘বাঙ্গালি মুসলমান শুরু থেকেই তাদের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে আসছিল।’ (ঐ পৃষ্ঠা ৩৪) কিন্তু আমরা ধর্মান্তরিত হবার ব্যাপারটিকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারি। এই জনগোষ্ঠী একবার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল, পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসনামলে তো তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেনি। বরং ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সংগ্রামী মনোভাব দেখিয়ে আসছে। বাংলার সাধারণ মানুষ যে দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তা তাদের প্রতিবাদী মনেরই পরিচয় বহন করে। সেন রাজাদের নিষ্ঠুর দমনের কারণে প্রকাশ্যে বৌদ্ধধর্ম অবলুপ্ত হল। আর ঠিক সেই সময়ই এল ইসলাম ধর্ম ও বিজয়ী মুসলমান শাসকরা। এমনই পরিস্থিতিতে বাংলার নিম্নবর্ণের শ্রমজীবী মানুষের বিরাট অংশ দলে দলে মুসলমান হয়ে গেল। একদিকে হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথা, অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের তুলনামূলক উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও কিছুটা সামাজিক সাম্যের আদর্শ (এই সাম্য অর্থনৈতিক সাম্য নয়) এই মানুষদের আকৃষ্ট করেছিল। এই সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলার মানুষ নতুন আদর্শকে, তুলনামূলক প্রগতিশীল আদর্শকে সহজেই গ্রহণ করতে পারে অর্থাৎ তারা চরিত্রগতভাবে রক্ষণশীল নয়। এই জনপদের মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা নেই, এমন অপবাদ মেনে নেয়া যায় না।

ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য বলেছেন, ইসলাম ধর্ম এই দেশে তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ইসলাম তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হলে, উত্তর ভারতে মুসলিম শাসনের রাজধানী দিল্লি আগ্রার আশেপাশের অঞ্চলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু হত না। (সুজিত আচার্য, বাংলায় ইসলাম ধর্মের আদিপর্ব) তবে একথা সত্য যে মুসলমানদের হাতে রাজদন্ড থাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার সহজ হয়েছিল। বাংলায় যারা ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন তারা ছিলেন সুফি মতবাদের অনুসারী, মানবতাবাদী ও উদারপন্থী। কট্টর মৌলবাদী ও শরিয়তপন্থীদের থেকে সুফি সাধকদের জীবনদর্শন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুফি ধর্ম-প্রচারকদের জীবন-প্রণালীও এই দেশের নিম্নবর্ণের খেটেখাওয়া মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই আশরাফদের তুলনায় আতরাফ বা নিচু জাতের মুসলমান, যারা আবার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা ছিলেন বরাবরই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। ধর্মীয় গোঁড়ামি তাদের কখনও স্পর্শ করেনি।

আমাদের এই জনপদে বহু প্রাচীনকালেই বেদবিরোধী একটি লোকায়ত দর্শন ছিল। বাংলায় বৌদ্ধধর্মের যে সংস্করণটি জনপ্রিয় হয়েছিল তা সহজিয়া ধর্ম নামে পরিচিত। সহজিয়া ধর্মের মধ্যে মানবিক দিক অনেক বেশি ছিল। সহজিয়া ধর্মের সাহিত্যে বৈদিক ধর্ম, পৌরাণিক পূজাপদ্ধতি, এমনকি বৌদ্ধধর্মের অনেক আচার-নিষ্ঠাকে কটাক্ষ করা হয়েছিল। ‘সহজিয়া’ মতবাদ কেবল বৌদ্ধধর্মের ব্যাপার ছিল না। ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগেই হিন্দু সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে তার প্রভাব ছিল। ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের সুফি মতবাদের সঙ্গে সহজিয়া মতবাদের অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিল মধ্যযুগের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। তাই তারা খুব সহজে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

সহজিয়া ঐতিহ্যের দুইটি ধারা-সগুণ ও নির্গুণ। মধ্যযুগে জন্মগ্রহণকারী (১৪৮৬ সালে) শ্রীচৈতন্য নিজে ব্রাহ্মণ হলেও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন এবং মানবতাবাদী ছিলেন। তাঁর অনেক মুসলমান শিষ্যও ছিল। বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্য এবং কবি চন্ডীদাস ছিলেন সগুণ ধারার শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। (চন্ডীদাস-‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’) অন্যদিকে নির্গুণ পথের পথিক বাউল সাধকরা ছিলেন অধিকতর মানবিক এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের পক্ষে। মধ্যযুগে বাংলাদেশে এবং উত্তর ভারতে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও গরিব মুসলমানদের মধ্যে অনেক প্রতিভাবান কবি ও সমাজ সংস্কারকের উদ্ভব ঘটেছিল যাঁরা ছিলেন প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের পক্ষে। তাঁরা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী। তাঁদের অনেকেই ছিলেন গরিব ও শ্রমজীবী-যথা কবীর (মুসলমান ও তাঁতি), শোন (নাপিত), রামদাস (মুচি), ধন (শূদ্র) প্রমুখ।

মধ্যযুগে বাংলায় পাচালি, যাত্রা, সঙ্গীত প্রভৃতি রচনা ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। কোন কোন রচনায় ধর্মের আবরণ বা রাজরাজড়ার কাহিনী থাকলেও (শেক্সপিয়ারের নাটকেও রাজারাজড়া ও ভূতপ্রেতের কাহিনী আছে) তা মানবতাবাদী গুণেও সমৃদ্ধ ছিল। এই যে জনপ্রিয় সাহিত্য গড়ে উঠেছিল তা অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতেও সাহায্য করেছিল। যে মানুষ এমন সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারে, তাদের ছোট করে দেখা হবে অনৈতিহাসিক।

সগুণ ধারার তুলনায় নির্গুণ সহজিয়া ধারার প্রবক্তাগণ অর্থাৎ বাউলরা ইসলাম ধর্মের সুফি মতবাদের প্রতি অধিক সহিষ্ণু ছিলেন। অন্যদিকে শরিয়তপন্থী কট্টর মোল্লাতন্ত্র হিন্দুধর্মকে যেভাবে শত্রুতার মনোভাব নিয়ে দেখেছে, সুফি সাধকদের মনোভাবের সঙ্গে তার দুস্তর তফাৎ ছিল। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলায় ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে সুফি মতবাদের সাধকদের হাত দিয়ে। তাই অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রথম থেকেই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিরাজ করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ মিলবে বাউল সাধকদের মধ্যে (তাঁদের সঙ্গীতেও)। মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন বাউল গানের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন ১৯২৭ সালে ‘হারামণি’ নামক গ্রন্থে। সেই সংকলনের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন, তারা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। … কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্ত মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে সেই সাধনা দেখি-এ জিনিস হিন্দু-মুসলমানের উভয়েরই, একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়নি, এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে। কোরান-পুরাণ ঝগড়া বাধেনি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদ-বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা স্কুল কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কি রকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু ও মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তার পরিচয় পাওয়া যায়। (মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন, হারামনি)এই জনপদের গরিব শ্রমজীবী, যারা ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং যাদের অধিকাংশ ইতিহাসের এক কালপর্বে দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তারা ঐতিহ্যগতভাবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। এইটুকু বললেই যথেষ্ট বলা হল না। তারা ইতিহাসে সক্রিয় ভূমিকাও পালন করেছেন, সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি যেমন নির্মাণ করেছেন, তেমনি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে এবং পরে। কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা ছিল এদেশে ইসলামের অভ্যুদয়ের আগের ঘটনা। কিন্তু পরেও আমরা হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম দেখব, মিলিত সাহিত্য-সংস্কৃতি নির্মাণও দেখব।

মধ্যযুগে যে সকল বাঙ্গালি কবির সাক্ষাৎ আমরা পাই তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুকুন্দরাম, দৌলত কাজী, আলাউল, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ প্রমুখ। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন তাঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মেরই কবিরা ছিলেন। তাঁরা ছিলেন গরিব। তাঁদের কবিতায় শোষিত মানুষের ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। তবে পরবর্তীতে উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য মুসলমানের অবদান হিন্দুর তুলনায় কম হল কেন? এই প্রশ্নটি আহমদ ছফা উত্থাপন করেছেন। সেই প্রসঙ্গে আমরা একটু পরেই আসছি।

আমরা আরও দেখব নিম্নবর্ণের হিন্দু ও ধর্মান্তরিত মুসলমান অর্থাৎ গরিব শ্রমজীবী মানুষ অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বারবার সংগ্রাম করেছে, বিদ্রোহ করেছে। দুই একটি উদাহরণ দেয়া থাক। সুলতান আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে স্থানীয় কোতোয়ালের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হাজি মোল্লা নামক জনৈক কোষাগার রক্ষীর নেতৃত্বে স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। যশোরের জমিদার কেদার রায়ের রাজত্বকালে নোওয়াপাড়ার কৃষক জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। দেখা যাবে, অত্যাচারী শাসক ও জমিদারদের মধ্যে যেমন হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের লোক ছিল তেমনি বিদ্রোহী জনগণের মধ্যেও দুই ধর্মেরই মানুষ ছিল।

আসা যাক ব্রিটিশ যুগে। ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তিতুমীরের ওয়াহাবি আন্দোলন ও দুদুমিয়ার নেতৃত্বাধীন ফরায়েজি আন্দোলন ছাড়া অন্য কোন গণ আন্দোলনে বাঙ্গালি মুসলমানের অংশগ্রহণ দেখতে পেলেন না আহমদ ছফা। (ঐ পৃ. ৩৬) কিন্তু ইংরেজ শাসকের ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশে যে অসংখ্য সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বী বিদ্রোহীরা ছিলেন। ফকির সন্যাসী বিদ্রোহ কৃষক বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৮৫৭) ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যুদ্ধ। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যে নীলবিদ্রোহ ও প্রজাবিদ্রোহ হয়েছিল, সেখানেও হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম আমরা দেখব।

তবে একথা ঠিক যে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন বিকাশ লাভ করেছিল তাতে সাধারণভাবে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কম ছিল। সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে স্বদেশী আন্দোলনের একটি বড় দুর্বলতা তা রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে দেখিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনেও কয়েকজন মুসলমান বুদ্ধিজীবীর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে যাঁরা আন্দোলনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। যেমন ব্যারিস্টার আবদুল রসুল (তিনি চরমপন্থী বলেও পরিচিত), লিয়াকত হোসেন (তিনিও চরমপন্থী বলে পরিচিত), মৌলবী আবুল কাশেম, আবদুল হালিম গজনভী প্রমুখ।

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ (সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী) আন্দোলনে অবশ্য বাঙ্গালি মুসলমানের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। তার কারণ এই সকল গোপন দলের নেতারা মুসলমানদের দলে নিতে চাননি। তবে বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রতি যে স্থানীয় মুসলমান কৃষকদের সহানুভূতি ছিল একথা আমাকে বলছিলেন সূর্যসেনের এক কিশোর শিষ্য (পরবর্তীতে কমিউনিস্ট নেতা) প্রয়াত শরবিন্দু দস্তিদার। নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সকলেই ছিলেন, অফিসার হিশাবে, সেনাপতি হিশাবে এবং সাধারণ সৈন্য হিশাবেও।

১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক নৌ বিদ্রোহ ছিল হিন্দু-মুসলমান নাবিকদের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ। আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের বিচার শুরু করে হলে কলকাতায় রশীদ আলী দিবসকে কেন্দ্র করে যে গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল সেখানে বাঙ্গালি হিন্দু ও বাঙ্গালি মুসলমান কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করেছেন। সেই লড়াই যে ভিত্তি করে মানিক বন্দোপাধ্যায় ‘চিহ্ন’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানে সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী যে চরিত্রগুলি দেখি তার মধ্যে হিন্দুও আছে, মুসলমানও আছে। ১৯৪৬ সালে যে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন গ্রাম বাংলাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের কৃষকরা ছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ। তিনি নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙ্গালি মুসলিম পরিবার থেকেই এসেছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির আদি গঠনপর্বে বাংলাদেশে যে সামান্য কয়জন উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে কমরেড আবদুল হালিম ও কমরেড আবদুর রাজ্জাক খানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাঙ্গালি মুসলমানের সংগ্রামী ঐতিহ্য তুলে ধরার মানে এই নয় যে, এই জনগোষ্ঠীর দুর্বলতাকে আড়াল করতে চাই। আহমদ ছফা দুর্বলতার দিকটাই তুলে ধরেছেন অত্যন্ত তীক্ষ্ম ভাষায়। সেই দিকটার প্রতি এবার আমি দৃষ্টিপাত করার চেষ্টা করব। আহমদ ছফা যথার্থই বলেছেন যে বাংলা সাহিত্যে নজরুল ও জসিম উদ্দিন-মাত্র দুইজন মুসলমান কবির নাম করা যায় যাঁরা ‘কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।’ ছফা আরও লিখেছেন, ‘এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দুসমাজ, মুসলমান সমাজ নয়।’ (আহমদ ছফা, ঐ, পৃষ্ঠা ৩৭) সত্যি তো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্বের (এবং এখনও) দিকপাল কারা? ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম। মুসলমানের সংখ্যা এত কম কেন? আমরা এখন সেই আলোচনায় প্রবেশ করব।

দুইদেশের বন্ধুত্বের কাঁটা : রামপাল থেকে ফারাক্কা

আনু মুহাম্মদ ::

যা মানুষকে কঠিন বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করছে, যে ক্ষতিপূরণ করা কখনোই সম্ভব নয়, যে ক্ষতি বহন করা মানুষের পক্ষে দু:সাধ্য সেই ক্ষতি নিয়েও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের হাসিঠাট্টা মিশ্রিত ‘কোনো ক্ষতি হয়নি’ ‘কিংবা হবে না’ শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত। তাঁরা তাঁদের দিক থেকে যে খুব অসত্য বলছেন তাও নয়, কেননা ক্ষতি তো তাদের হয়ইনি, হবেও না কোনোদিন। তাঁরা মানুষ ও জনপদের অপরিসীম ক্ষতি করেন, লাভবান হন এবং তারপর চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রথমে একটি বাঁধের কথা বলি। গত শতকের ৬০ দশকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর ওপর যখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ চলছিলো তখনই এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞও দীর্ঘমেয়াদে এই বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েই উচ্চকন্ঠ ছিলেন। কিন্তু এর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তা চালু হয়। এই বাঁধের কারণে এতো বছরে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে, বাংলাদেশের প্রধান একটি নদীর পানি প্রবাহ ভয়াবহ মাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তার ফলে এরসাথে সংযুক্ত আরও ছোটবড় নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল বহুমাত্রিক বিপর্যয়, শুধু যে এসব নদীর অববাহিকায় জীবন, জীবিকা, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই নয় প্রতিবেশগত ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়ে জীবনমান স্বাস্থ্য প্রাণবৈচিত্রও বিপদাপন্ন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য বের করা কঠিন। এই ফারাক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে নেমে আসা আরও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, আরও পরিকল্পনাধীন আছে। এর ওপর ‘নদী সংযোগ পরিকল্পনা’ নামে যে ভয়াবহ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত তা পুরা অঞ্চলে নদী ও নদীনির্ভর জীবন ও অর্থনীতির ওপর মরণ আঘাত দিতে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ওপর সম্পর্কিত সকল দেশের মানুষের অধিকার অস্বীকার করেই ভারত একের পর এক এসব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নিচ্ছে। আন্তজার্তিক পানি কনভেনশন অনুযায়ী এসব তৎপরতা অবৈধ, এবং বাংলাদেশের সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য ভারত দায় নিতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এর সুরাহা করবে কি, তার নিজের উন্নয়ন মডেলেই যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল ও দূষণ দিয়ে নদীর বাকি অস্তিত্বের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

নদীর ওপর যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণের সুবিধাভোগী বিশ্ব জোড়া নির্মাণ কোম্পানি, কনসালট্যান্ট, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের জোট গত শতকের শেষ কয়েক দশকে বিশ্বের বহুদেশে বন্যানিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সবুজ বিপ্লবের  নামে নদী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এসব কর্মসূচি নিয়েছে। এর বিরূপ ফলাফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ভাটার দেশগুলো যে বড় বিপর্যয়ের সামনে পতিত হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত বিশ্ব জোড়া। উজানের দেশগুলোতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সে কারণে জোরজবরদস্তি করে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশের মতামত ও অধিকারের তোয়াক্কা না করে যে বাঁধ চালু করেছে, শুকনো মৌসুমে পানি আটকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে ভেবেছে এতে ভাটির দেশের ক্ষতি হলে কি- ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, ঘটনা তা ঘটেনি। বরং ভারতের দিকে নতুন নতুন সমস্যা ক্রমে জমে এখন ভয়াল আকার ধারণ করেছে। এর শিকার হচ্ছে অনেক এলাকা, বিহার তার অন্যতম, এই বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিহারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এই বছরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলতে। এই দাবি বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের। কিন্তু ভারত পন্থী ও ভারত বিরোধিতার নামে পরিচালিত রাজনীতির দুষ্টচক্রের কারণে বাংলাদেশে এনিয়ে সুস্থ আলোচনা হয়না কখনো। কিন্তু সর্বসাধারণের মনের মধ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ আছে। বরাবর ভারত এটি উপেক্ষা করতে চেয়েছে ‘এগুলো নিছক ভারত বিদ্বেষী রাজনীতি’ এই আওয়াজ দিয়ে।

ফারাক্কার জন্য ক্ষতি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার প্রমাণ সুন্দরবন। সুন্দরবন যেসব নদী ও শাখানদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল সেই নদীগুলো আবার গঙ্গা-পদ্মার পানি প্রবাহের সাথে সংযুক্ত। ফারাক্কা কাজ শুরুর পর থেকে নদীগুলোর রুগ্নতাপ্রাপ্তিতে তাই সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সুন্দরবনে বিপরীত থেকে সমুদ্রের নোনাপানির প্রবাহ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে যায়। এক গবেষণার ফলাফলে তাই দেখা যায়, ‘গঙ্গা নদীর মিঠা পানি গড়াই হয়ে পশুর নদ ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হয়। ফারাক্কা বাঁধের পর পানি প্রবাহ কমে গেছে।.. মিঠা পানির প্রবাহ কম থাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে বনের মধ্যে। এ কারণে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারছে না। ..বাঁধ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘনমিটার পলিযুক্ত মিঠা পানি গ্রহণ করেছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘনমিটার পানি প্রবাহ প্রয়োজন। কম পানি প্রবাহ থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি বনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরীগাছের বেঁচে থাকা কঠিন।’ (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি সুন্দরবনকে অনেকদিক থেকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশের জন্য শুধু নয় ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী প্রবাহ এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা বা দায়বদ্ধতা যদি দুদেশের সরকারের থাকতো তাহলেও ফারাক্কা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও নতুন চিন্তা দেখা যেতো। কিন্তু তা না থাকার ফলে দশকের পর দশক ফারাক্কা প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি করে গেছে। সুন্দরবনকে এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা না করে, একই দৃষ্টিভঙ্গীর দাপটে, বরং এর ওপর মরণ কামড় দেবার প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, সেটি হলো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর প্রধান উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ভারতের এনটিপিসি, এই কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারতের একটি কোম্পানি, এর জন্য ঋণ যোগান দেবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক (এরজন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ সরকার) এবং সব লক্ষণ বলছে কয়লাযোগান দেবে ভারতের কয়লা কোম্পানি। তারমানে কাগজেপত্রে ৫০:৫০ মালিকানা ও মুনাফা দেখানো হলেও বিনিয়োগ, নানাকিছু বিক্রি, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সবকিছুতেই ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির লাভ। বিপরীতে বাংলাদেশের শুধুই ক্ষতি, সুন্দরবন হারানোর মতো অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি, বহুলক্ষ মানুষের জীবনজীবিকার ক্ষতি, কয়েককোটি মানুষের জীবন নিরাপত্তার ঝুঁকি, তারপরও ঘাড়ে ঋণ আর আর্থিক বোঝা। কিন্তু ক্ষতি কি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? না। প্রকৃতি অবিচ্ছিন্ন, সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে তার সর্বনাশ আসা ঠেকানো যায় না। সেজন্য সুন্দরবন বাংলাদেশ অংশে বিপর্যস্ত হলে ভারতের অংশের সুন্দরবনও তার থেকে বাঁচবে না। তাই কলকাতায় সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের বিরুদ্ধে এক সমাবেশে সংহতি জানাতে এসেছিলেন সেই এলাকার কয়েকজন অধিবাসী। তাঁদের একজন আমাকে বললেন, ‘আমরা ঐ এলাকায় ৫০ লক্ষ মানুষ বসবাস করি। সুন্দরবনের ক্ষতি হলে আমাদের সর্বনাশ। তাই আমরাও এই লড়াই-এ আছি।’

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সবসময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে বহুবিধ কারণে। এগুলো মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, কেননা ভারতের শাসকগোষ্ঠী একের পর এক বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক কিংবা ক্ষতিকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফারাক্কা এর একটি, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী সংযোগ পরিকল্পনা, অবিরাম সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের সীমান্ত, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ঋণ দিয়ে বেশি দামে জিনিষপত্র কিনতে বাধ্য করা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, তারপরও মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে।

পুরনো উন্নয়ন মডেলে নদীসহ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্বকেই মানুষের ক্ষমতা আর উন্নয়নের প্রদর্শনী ভাবা হতো, এখন তার পরিণাম যতো স্পষ্ট হচ্ছে ততোই ভুল সংশোধনের পথ খুঁজছে মানুষ। এমনকি বাঁধ ভেঙে হলেও নদীকে স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, প্রকৃতির সাথে সমন্বয় করে উন্নয়ন চিন্তা ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশকেও সেই পথই ধরতে হবে। ততোদিন অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না, সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা যাবেনা। ফলে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ চিরস্থায়ী শত্রুতার বোধে পরিণত হবে। বন্ধুত্ব নাম দিয়ে তৈরি কোম্পানি হবে শত্রুতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যম।

আমরা চাই না এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। ‘কোনো ক্ষতি হয়নি, কোনো ক্ষতি হবে না’ প্রলাপ দিয়ে সত্য আড়াল করা যাবে না। সেজন্য আমরা চাই দুইদেশের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের স্বার্থেই বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার দ্রুত এই প্রকল্প থেকে সরে আসবেন। আমরা এখনও আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুইদেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, বন্ধুত্ব হবে প্রকৃতই পরস্পরের বিকাশমুখি। দুইদেশের সজাগ মানুষ জনপন্থী উন্নয়নের ধারার জন্য যৌথ চিন্তা ও লড়াই শক্তিশালী করলে নিশ্চয়ই দুইদেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধুত্বেরভিত শক্তিশালী হবে।

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষনের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই । তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির  বক্তা  অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, কবি ও লেখক আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বক্তৃতামালায় বক্তৃতা করার জন্য আমাকে যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেজন্য আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এর আয়োজকদের প্রতি প্রকাশ করছি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এই স্মারক বক্তৃতামালার সঙ্গে যাঁর নাম জড়িত রয়েছে তিনি একজন মহৎ ব্যক্তি। কি চিন্তায়, কি লেখায় তিনি অত্যন্ত বড় মাপের মানুষ। উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী রচনা-বৈচিত্রে ভরপুর তাঁর রচনাসম্ভার। ফাউস্টের প্রথম খন্ডের যে অনুবাদ তিনি করেছেন আমার বিবেচনায় তা বাংলা ভাষায় অনূদিত (আমার পড়া ও জানামতে) অন্যান্য রচনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সঙ্গে যে ভূমিকাটি লিখেছেন তা অসাধারণ পান্ডিত্যপূর্ণ ও সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। তিনি ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ নামে যে অসাধারণ রচনাটি নির্মাণ করেছেন তা বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। আমি জানি না বিশ্বসাহিত্যে এরকম রচনা আছে কিনা, কারণ বিশ্বসাহিত্যের সব তো আমার পড়া নেই।

একথা বলতে আমায় ভালো লাগছে এবং গর্ববোধ হচ্ছে যে তাঁর জীবনকালে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেটা স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে। তিনি প্রায়শ নতুন কিছু লিখলে আমাকে জানাতেন, কখনও কখনও কোন কবিতা বা গদ্যলেখা পড়ে শোনাতেন। এসব কথা স্মরণ করে আমি সত্যিই আনন্দ ও গর্ববোধ করছি। আজকের বক্তৃতার শুরুতেই এই অসামান্য পুরুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

আহমদ ছফার গোটা সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করার যোগ্যতা আমার নাই। তিনি বিভিন্ন রচনার মধ্য দিয়ে যে সামাজিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তার তাৎপর্য বিশাল। কিন্তু এক বক্তৃতায় তাঁর সামগ্রিক চিন্তা নিয়ে আলোচনাও সম্ভব নয়। আমি আমার আজকের আলোচনার সূত্রপাত করার প্রয়োজনে তাঁর একটি মাত্র প্রবন্ধ বেছে নিচ্ছি। আজকের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় একটি বিষয় নিয়েই আমি বক্তব্য রাখব বলে ভেবে এসেছি। আমাদের দেশে হঠাৎ করে যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও ইসলামী জঙ্গীবাদ বা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার উৎস সন্ধানে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করব। এর উৎসের দুইটি দিক আছে-একটি আন্তর্জাতিক, অন্যটি জাতীয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমার আজকের বক্তৃতায় আমি সেই দিকটি আনছি না। কারণ তাহলে আলোচনা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়বে। মৌলবাদের অভ্যন্তরীণ উৎস কোথায় এবং আদৌ কোন উৎস আছে কিনা সেই আলোচনার মধ্যেই আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব। সেই প্রসঙ্গেই আমি শুরু করতে চাই আহমদ ছফার ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক এক অসাধারণ রচনা সামনে রেখে। (আহমদ ছফা, বাঙালী মুসলমানের মন (ঢাকা: খান ব্রাদার্স)।

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের এক রচনা থেকে জানতে পারলাম যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বিংশ শতাব্দীর বাংলা ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ দশটি চিন্তার বইয়ের মধ্যে আহমদ ছফার ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ পুস্তিকাটির নাম উল্লেখ করেছেন। সলিমুল্লাহ খান লিখেছেন, ‘জনধন্য বাংলা মুলুকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে দ্বিমত করার মানুষ কখনো টান পড়বে বলে মনে হয় না। … এই মহান অধ্যাপকের সঙ্গে একমত পোষণ করি।’ (সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী)।

আমিও এই রচনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা বলে মনে করি। লেখক বাঙ্গালি মুসলমানের সামাজিক বিকাশ ও তার দুর্বলতার দিক তুলে ধরেছেন। কিন্তু প্রথমেই বলে রাখি, এই রচনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য মেনে নিয়েও ছফার সকল বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। তিনি একটা দিক তুলে ধরেছেন এবং তা যথার্থ। আজকে আমাদের সমাজে যে ধর্মীয় মৌলবাদের উৎপাত এবং ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সৃষ্টি-তা সংখ্যায় যত সামান্যই হোক-তার কারণ অনুসন্ধান করতে হলে ছফার রচনা নিশ্চিতভাবে প্রাসঙ্গিক, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমার বিবেচনায় আহমদ ছফার বিশ্লেষণ বেশ একপেশে।

তিনি যথার্থই বলেছেন, বাঙ্গালি মুসলমান তারাই যাদের পূর্বপুরুষ নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। লক্ষণ সেনের সময় কিভাবে দলে দলে নিম্নবর্ণের হিন্দু (যারা আবার শ্রমজীবী এবং গরিবও বটে) মুসলমান হল তার এক অনবদ্য চিত্র অঙ্কন করেছেন শওকত আলী, তাঁর বিখ্যাত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বাঙ্গালি মুসলমানের মনকে কতটা আচ্ছন্ন করতে  পারে-অথবা পারে না, তা বুঝতে হলে এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা দরকার। আহমদ ছফা আরও যথার্থ বলেছেন, ‘মূলত বাঙ্গালি মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হল, এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। … একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল।’ (আহমদ ছফা, ঐ।)

তিনি যে বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে উচ্চশ্রেণী ও নিম্নশ্রেণী দুইটি সুস্পষ্ট বিভাজন দেখতে পেয়েছেন সেটাও সত্য। আমিও মনে করি তথাকথিত অভিজাত বাঙ্গালি মুসলমান এবং কৃষক বা শ্রমজীবী বাঙ্গালি মুসলমানকে আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। আমি আজকের আলোচনায় দেখানোর চেষ্টা করব, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক বা শ্রমজীবী মুসলমান, যাদের পূর্বপুরুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল, তাদের মানসিক গড়ন অসাম্প্রদায়িক, উদারপন্থী ও মানবিক। তাদের সাধারণত ‘আতরাফ’ বলা হয়। অন্যদিকে ‘আশরাফ’ বলে পরিচিত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের মধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীলতার চিহ্ন অধিক পরিমাণে লক্ষণীয়। আশরাফরা মোগল আমলে ছিল শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তারা উচ্চবিত্ত এবং সম্ভ্রান্ত বলে পরিচিত। তারা একদা আরব, তুরস্ক, ইরান, মধ্য এশিয়া থেকে এদেশে এসেছিল। তবে পশ্চিম থেকে আসা সুফি মতবাদী ধর্ম-প্রচারকরা চরিত্রগতভাবে ভিন্ন ছিলেন। আশরাফ বলে পরিচিত তথাকথিত সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা এক সময় ঘরে ফার্সি বলতেন। পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে বলতেন উর্দু।

আশরাফ-আতরাফ বিভাজনটি বেশ পুরানো। তা মোগল আমল থেকে চলে আসছে। মুকুন্দরামের ‘কবিকঙ্কনচন্ডী’ মঙ্গলকাব্যে বিবৃত নগরবাসী বহিরাগত মুসলমান ও গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ধর্মান্তরিত মুসলমানের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক ও সামাজিক পার্থক্যটির নিপুণ বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী নবাব আবদুল লতিফের মতো যাঁরা সাধারণ পরিবার থেকে এসেও অভিজাত শ্রেণীতে উত্তরণের আকাঙ্খা পোষণ করতেন তাঁরাও বাংলাভাষাকে তাচ্ছিল্য করেছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও উর্দুকে আভিজাত্যের লক্ষণ মনে করা হত। সেই আভিজাত্যের গর্ব ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল যারা তারা কিন্তু মুসলমান কৃষক এবং সদ্যগঠিত মুসলমান মধ্যবিত্ত। তারাই ভাষা আন্দোলন করেছিলেন (ছাত্ররা ছিলেন কৃষকের সন্তান), একথা ভুললে চলবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটির সমালোচনা করেছেন সম্পূর্ণ ভুল জায়গা থেকে। তিনি মনে করেছেন, বাঙ্গালি মুসলমানকে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে আসা বললে বুঝি ছোট করা হল।          (এবনে গোলাম সামাদ, ‘বাঙালী মুসলমানের মন’, সমকাল, ১৮ বর্ষ ৪ সংখ্যা, (বৈশাখ ১৩৮৩), পুনর্মুদ্রণ: আহমদ ছফা বিদ্যালয়, ১ বর্ষ ২ সংখ্যা (অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪)। তাই তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আসলে নিম্নবর্ণ বা শ্রমজীবী হওয়ার মধ্যে সামান্যতম অসম্মানের কিছুই নেই। যাই হোক এই প্রসঙ্গ আপাতত বাদ। তবে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে আহমদ ছফার একপেশে বিশ্লেষণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘শুরু থেকেই বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনভাবে সম্পর্কিত ছিল না বলেই তার মনের ধরণ-ধারণটি অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতো থেকে গেছে। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাই তার জাগতিক অগ্রগতির উৎস। বাঙ্গালি মুসলমান চিন্তাই করতে শেখেনি। তার কারণ, এখনো সে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করার অধিকার পায়নি।’ (‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’, উত্তর ভূমিকা, পৃ. ১৬।) যদি চিন্তাই না করতে পারে তাহলে ভাষা আন্দোলন করল কিভাবে? আহমদ ছফা নিজেই লিখেছেন, ‘বাঙ্গালি মুসলমানের উল্লেখ করার মতো কোন কীর্তি ছিল না। কিন্তু বাঙ্গালি মুসলমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি বাঙ্গালি জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। এটাই তার সবচেয়ে বড় কীর্তি।’ (ঐ, পৃ. ১৬।) কথাটা কি স্ববিরোধী হয়ে গেল না?

ইউরোপের ইতিহাসে বুর্জোয়া বিপ্লবের আগেই যে সকল অতি বড়মাপের লেখক, শিল্পী, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবীর সাক্ষাৎ আমরা পাই তাঁদের অধিকাংশই ব্যক্তি হিশাবে ও শ্রেণী হিশাবে-উভয় দিক দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেছে নিপীড়িত শ্রেণী-শ্রমিক শ্রেণী। তাদের দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশ এসেছিলেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী থেকে, কিন্তু তাঁরাও রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন। অতএব ক্ষমতার আবহাওয়ার মধ্যে না থাকলে চিন্তার জন্ম হয় না বা প্রসার ঘটে না, এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। অধিকাংশ বাঙ্গালি মুসলমান, যারা শ্রমজীবী ও নিপীড়িত, তারা চিন্তা করতে পারেন না, তারা ইতিহাস রচনা করতে পারেন না, এমন ধারণাও সঠিক নয়। ইতিহাসও সে কথা বলে না। (চলবে)

যুদ্ধের নামে অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে : চলচ্চিত্র ‘ওয়ার ডগস্’

ফ্লোরা সরকার ::

‘উলফ অফ দ্য ওয়ালস্ট্রিট’ যেমন পুঁজিবাদ বিরোধী ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ তেমনি যুদ্ধ বিরোধী এক ছবি।  টড ফিলিপ পরিচালিত সাম্প্রতিক ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ মুক্তি পেতে না পেতেই আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। টড ফিলিপ ১৯৯৩ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ২২ এবং তখনও যিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সিনেমার ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নরত, সেই সময়ে পাঙ্ক সিঙ্গার নামে খ্যাত জিজি অ্যালিনকে নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে  সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নির্মাণ করেছেন ‘ওল্ড স্কুল’, ‘স্টারস্কি অ্যান্ড হাচ’ এর মতো কমেডি এবং ইতোমধ্যেই কমেডি নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তার কোনো ছবি এখন মুক্তি পেলে দর্শক বেশ আগ্রহ সহকারেই তার ছবি দেখতে যান। তার উপর ‘ওয়ার ডগস্’ নির্মিত হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে বুশ প্রশাসনের কাছে  দুজন অস্ত্র সরবরহকারীর কর্মকান্ডকে ঘিরে।  ছবির দুই প্রধান চরিত্রের (ইফরাইম ডিভরোলি ও ডেভিড পাকোজ) বাস্তব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে ছবিটি। যারা ২০০৭ এ এই অস্ত্র বিক্রি বাবদ তারা ৩০০ কোটি ডলার উপার্জন করে। যাদেরকে পেন্টাগন খুব কৌশলে নিয়োজিত করেছিলো।

ছবির এক ধারাভাষ্যে জানানো হয় যে, যুদ্ধ একটি বেশ বড় ধরণের লাভজনক ব্যবসা। ছবির হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় একেক জন সেনা নিয়োগে খরচ পড়ে ১৭,৫০০ ডলার এবং ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে কম করে হলেও দুই লাখ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিলো। গ্রীষ্মপ্রধান সেসব দেশের সেনাবাহিনীকে এয়াকন্ডিশনার সরবরাহ করতে হয়েছে তার জন্যেই প্রতি বছর আমেরিকাসহ যুদ্ধে লিপ্ত সরকারগুলোর খরচ করেছে সাড়ে ৪শ কোটি ডলার। ছবির ভিডিও ফুটেজে বুশ প্রশাসনের নানা কর্মতৎপরতা দেখানো হয় এবং কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে একটা অর্থনীতি। যারা এর ভিন্ন কিছু বলে, তারা বড় ধরণের একটা স্টুপিড’।

দুটো চরিত্র ইফরাইম এবং ডেভিডকে নিয়ে ছবির গতি এগিয়ে যায়। অস্ত্র ব্যবসার মধ্যে দিয়ে তাদের দিন বেশ এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু এর মাঝে বাঁধ সাজে ডেভিডের অন্তঃসত্তা বান্ধবী লিজকে নিয়ে। কারণ লিজ খুব কড়াভাবেই ইরাক যুদ্ধবিরোধী একজন নারী। ফলে ডেভিডকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় লিজের কাছে। সে জানায় কিছু চাদর বিক্রির কনট্রাক্ট নিয়েছে সে, সরকারের সঙ্গে। যদিও ছবির নায়ক ডেভিডকে, ছবির শুরুতেই দেখা যায়, সে-ও একজন যুদ্ধবিরোধী মানুষ, কিন্তু তাকে অস্ত্র বানিজ্যে জড়িয়ে পরিচালক যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, ডেভিড মূলত যুদ্ধ বিরোধী হলেও, অর্থ বিরোধী নয়। আসলে, ছবিটি ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে, বুশ প্রশাসনের সেই সময়কে নির্দেশ করে- যে সময়ে, ইরাক-আফগানিস্তানে যুদ্ধের সুযোগে অনেকে ভূঁইফোড় ধনী হবার চেষ্টায় অস্ত্র ব্যবসায় নিজেদের নিয়োজিত করেছিলো।

স্যাটায়ার ধারায় নির্মিত হলেও, ছবির পরিচালক অনেক সত্য প্রকাশ করে দেন ছবির গল্পের মধ্যে দিয়ে। আরো একটা বিষয় হলো, ছবিতে ইফরাইম আর ডেভিড, অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে শুধু যে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলে তা নয়, দুজন ট্যাক্সও ফাঁকি দিয়ে চলে। বিশেষ করে, ডেভিড তার বান্ধবীকে খুশি রাখার জন্য যতটা বিলাসী হওয়া যায় তার জন্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে চলে। যাইহোক ছবিতে, যত বিনোদনের মাধ্যমেই তাদের কাহিনী দেখানো হোক না কেনো, বাস্তবে, ট্যাক্স ফাঁকিসহ নানা কারণে ইফরাইমের চার বছরের জেল হয় এবং ডেভিডকে সাত মাসের জন্য গৃহবন্দী হতে হয়। ছবিতে সেসব দেখানোর প্রয়োজন পড়েনি। কারণ, পরিচালক টড ফিলিপের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, যুদ্ধের প্রকৃত কারণটা দেখানো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর, ‘যুদ্ধ’ নামক বিষয়টি নতুন ভাবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব যুদ্ধ এখন, শুধু যুদ্ধের জন্য যুদ্ধ হিসেবে সংগঠিত হচ্ছেনা, এসব যুদ্ধের পেছনে ‘অস্ত্র বানিজ্য’ নামে ভয়ানক এক বানিজ্যের খেলা শুরু হয়েছে। যে বানিজ্য পুঁজিবাদের অগ্রগামী ভয়ংকর এক অধ্যায়।

করপোরেটদের স্বার্থরক্ষা, বিপাকে সাধারণ মানুষ : বিশ্বায়নের সমাপ্তি!

জয়তী ঘোষ

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় নেতৃত্বে সূচিত বিশ্বায়নের যুগটি নিশ্চিত পরিসমাপ্তির দিকে যেতে থাকা নিয়ে উত্তর গোলার্ধের অর্থবিষয়ক মিডিয়ার মধ্যে মারাত্মক ভয় ঢুকে গেছে। বলা হচ্ছে, বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র এবং ল্যাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ১১টি দেশের স্বাক্ষর করা (তবে অনুস্বাক্ষর করা হয়নি)  ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (টিপিপি), যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার আলোচনায় থাকা ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টে (টিটিআইপি)।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উভয় চুক্তির আন্তরিক সমর্থক। তার ঘোষিত লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সম্প্রসারণ ও সুরক্ষিত রাখা। ২০১৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে নাইকির এক কারখানায় শ্রমিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিখ্যাত বক্তৃতায় ওবামা বলেছিলেন : ‘আমেরিকা যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিধি-বিধান লেখে,  আমাদেরকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আজ আমাদের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক শক্তিধর অবস্থানে আছে, তখনই এটা করতে হবে। … আমাদেরকে আমাদের শর্তাবলী এর ওপর চাপিয়ে দিতে হবে। আমরা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের বিধিবিধান না লিখতে পারলে কী হবে অনুমান করুন তো? চীন করবে!’

তার সময় ঘনিয়ে আসছে। তিনি কি পারবেন কংগ্রেসে টিপিপি পাস করাতে? সম্ভবত পারবেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন (ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটন) উভয়েই প্রকাশ্যে টিপিপির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। হিলারি একসময় ‘টিপিপিকে বাণিজ্যচুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে এর প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। এখন তিনি ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। এই পরিবর্তন এসেছে বার্নি স্যান্ডার্সের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে বামপন্থীদের আকস্মিক আবির্ভাবের প্রেক্ষাপটে।

টিপিপির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য দেওয়া রয়েছে ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ-এর ওয়েবসাইটে : ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিধিবিধান রচনা- যে বিধিব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্যের রফতানি বাড়াতে সহায়ক হবে, আমেরিকান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, উচ্চ বেতনের আমেরিকান চাকরি সমর্থন করবে, এবং আমেকিরান মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে শক্তিশালী করবে।’ এমনটা ঘটার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করার কারণ হলো, চুক্তিতে থাকা ১৮ হাজার আইটেমের ওপর কর কমানোর ফলে বাণিজ্যের আকার ও মূল্য ব্যাপকভাবে বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টা দিন দিন আরো কম মানুষ এটা গ্রহণ করছে। দেশজুড়ে শ্রমিকেরা চুক্তিটিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তাদের মতে, এর ফলে কম বেতনের চাকরিগুলো চলে যাবে দক্ষিণ গোলার্ধে। ফলে তাদের অবস্থা হবে আরো করুণ। এমনকি টিপিপির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একমাত্র সমীক্ষাটিতে, যেটা চালিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশন, দেখা গেছে চুক্তিটি হলে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বড়জোর এক শতাংশ রফতানি বাড়বে। অন্য একটি সমীক্ষায় আরো কম আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই চুক্তিটি হলে অংশগ্রহণকারী সব দেশেরই রফতানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে তুলনামূলকভাবে খুবই কম এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর কারণ হলো, চুক্তিটির কারণে এই দেশ দুটিতে চাকরি কমবে, বৈষম্য বাড়বে। জাতীয় অর্থনীতিতে মজুরির হার সব সদস্য দেশেই কমে যাবে।

অবশ্য টিপিপি ও টিটিআইপি সত্যিকার অর্থে বাণিজ্য উদারিকরণ চুক্তি নয়। ফলে বাণিজ্যে এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সীমিত। বরং বাণিজ্য চুক্তিটি ঘিরে এমন কিছু রয়েছে, সেগুলোই আসল ব্যাপার। সেগুলোই সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক ও বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে।

তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক : মেধা সত্ত্বের ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা সীমিতকরণ এবং বিনিয়োগকারী-সংশ্লিষ্ট বিতর্কের মীমাংসার ব্যবস্থা। এগুলো করপোরেশনের পাশাপাশি শ্রমিক ও নাগরিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু কমিয়ে দেবে সরকারি নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা। এমনকি এ ধরনের করপোরেশনের মুনাফা কমিয়ে আনার শক্তিও সরকারের হ্রাস পাবে।

বুদ্ধিবৃত্তিক মেধা সত্ত্বের ব্যবস্থাটিই সবচেয়ে মারাত্মক। ওষুধের ক্ষেত্রে এর যে বিরূপ প্রভাব কী হবে তা বলা যাক। এর ফলে নতুন ওষুধ কোম্পানির আবির্ভাবের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কেবল জরুরি ক্ষেত্রেই নতুন কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়ার অবকাশ থাকবে। এমনকি সব ওষুধ আমদানিও করা যাবে না। আবার বিদ্যমান ওষুধগুলোর সামান্য কিছু পরিবর্তন করে বাজারজাত করার সুযোগও থাকবে না। বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ, এইডসের মতো রোগের ক্ষেত্রে একচেটিয়া বাজারের সৃষ্টি হবে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে, সব দেশে এসব ওষুধ পাওয়ায় যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, দাম আকাশচুম্বি হওয়ায় ওষুধ চলে যাবে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আসবে কড়াকড়ি। কেবল প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই টিকে থাকতে পারবে।

এসব ব্যবস্থা উদ্বেগের বিষয়। কারণ এর ফলে সরকারের ওপর পর্যন্ত খবরদারির সুযোগ পেয়ে যাবে করপোরেশনগুলো। কোনো দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় পর্যন্ত বাতিল করে দিতে পারবে দূরের কোনো দেশের ট্রাইব্যুনাল। করপোরেশনগুলোর প্রতিষ্ঠিত আদালত গোপন প্রমাণ নিয়ে গোপন ও রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে শুনানির আয়োজন করতে পারবে। করপোরেশনগুলোর মুনাফার অধিকারের কাছে নাগরিকদের অধিকার কোনোই মূল্য পাবে না।

টিপিপি ও টিটিআইপি’র এসব বৈশিষ্ট্য জনসাধারণের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লে সেগুলো প্রতিরোধের কর্মসূচি ঘোষিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে। তবে তারা যতটুকু জেনেছে, তাতেই বাণিজ্য উদারিকরণের নামে একটি বিরূপ ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বাণিজ্য উদারিকরণ আসলে করপোরেশনের স্বার্থে, শ্রমিকদের জন্য নয়, বিশেষ করে ইতিহাসের যে যুগে চাকরি নিশ্চিতকরণই সবার জন্য সবচেয়ে বেশি দামি বিষয় হয়ে পড়েছে। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়নের এসব বৈশিষ্ট্য যদি হুমকির মুখে পড়ে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণ এবং এই চুক্তিতে সই করতে ইচ্ছুক তার বাণিজ্য অংশীদারদের জনসাধারণের জন্য হবে সম্ভবত কল্যাণকরই।

খেলাপি ঋণ : তিন মাসের ব্যবধানেই ৪ হাজার কোটি টাকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। অব্যবস্থাপনা ও  ঋণের কারণে প্রতি মাসেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের বিশাল অংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত। এতে ব্যাংকিং শৃংখলা আরও ভেঙে পড়তে পারে। তারা আরও বলছেন, কিছু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই দুর্নীতি এবং অনিয়মের সাথে যুক্ত। এদের যোগসাজশে ঋণ দেয়া হয়। যার কারণে ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে খেলাপিতে রূপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে জুন পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা; যা মোট ঋণ বিতরণের ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ। গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই। জুন প্রান্তিকে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ২৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ স্বাভাবিকভাবে সামান্য কিছুমাত্রায় বিশ্বের সর্বত্র দেখা যায়। কারণ ব্যাংকিং একটি ব্যবসা। অন্য যে কোনো ব্যবসার মতো ব্যাংকিং ব্যবসাতেও সামান্য ক্ষতি হতে পারে। উন্নত বিশ্বের হিসাব মতে একটি ব্যাংকে শতকরা ১ ভাগ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ হতে পারে। এর পরিমাণ কখনও বেড়ে গিয়ে ২ শতাংশ হলে ব্যাংক সতর্কতা অবলম্বন করে। উল্লেখ্য, ব্যাংক ঋণের ওপরে যে মুনাফা ধার্য করে, তারই একটি অংশ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের ক্ষতি পোষাতে ব্যয় হয়ে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলদেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে খেলাপি ঋণের অংক রীতিমতো ভয়াবহ। সব ব্যাংক মিলে ঋণ শ্রেণীবিন্যাসিত করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। উপরন্তু, আরও ৪০ হাজার কোটি টাকার অধিক শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে; অর্থাৎ প্রদর্শিত হিসাব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এ দুটি হিসাব যোগ করলে বর্তমানে ১ লাখ কোটি টাকা শ্রেণীবিন্যাসিত হয়েছে। এর সোজাসাপ্টা অর্থ দাঁড়ায়, ব্যাংকগুলো জনগণের গচ্ছিত আমানত থেকে ১ লাখ কোটি টাকা নষ্ট করেছে। এটি জনগণের আমানতের খেয়ানত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এ সমস্যাটিকে পর্যালোচনার সুবিধার্থে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। এক. সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক এবং তা জনগণের উদ্বেগের কারণ। দুই. বেসরকারি ব্যাংকগুলো- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ সরকারি ব্যাংকের চেয়ে কম হলেও এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে।  রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংকটের প্রধান কারণ সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও অনিয়ম। এর বিপরীতে বেসরকারি ব্যাংকের সংকটের জন্য দায়ী প্রধানত আগ্রাসী ব্যাংকিং এবং সেই সঙ্গে ৭-৮টি ব্যাংকের অসাধু মালিক পক্ষের কারসাজি। সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, চেয়ারম্যান এবং পর্ষদ সদস্য নিয়োগদান করে থাকে সরকার। সরকারি ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্টের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা তথা সার্বিক গভর্ন্যান্স। ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্ট দুর্নীতিপরায়ণ ও অনিয়মবাজ হলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ধীরে ধীরে দুর্নীতিবাজ হয়ে পড়ে এবং পুরো প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বেসিক ব্যাংক। বেসিক ব্যাংক এ দেশের অন্যতম ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই ব্যাংকের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ সাধারণত দেড় শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতো। কিন্তু এই ব্যাংকটিতে সরকার যখন আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করল, তখন   তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করলে অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংকারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগদান করা হলো । এ দুটি নিয়োগই সরকার প্রদত্ত। এখন এই ব্যাংকটির শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সরকার এই দুটি নিয়োগ পরিহার করতে পারলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না বলেই ধারণা।

প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই বিগত ৫-৭ বছর যাবৎ নিয়োজিত চেয়ারম্যান, কিছু পর্ষদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষেরই অনেকে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায়ী ছিলেন বলে  ধারণা। এ কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অনবরত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণের আমানত নষ্ট হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রসারের একটি কারণ হল দুর্নীতিবাজদের ও অনিয়মকারীদের আইনি দায়মুক্তি। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টের বিধানমতে ব্যাংকের কোনো পরিচালক বা চেয়ারম্যান অথবা সম্পূর্ণ বোর্ডের দ্বারা জনগণের আমানতের ক্ষতি হচ্ছে- এমন ধারণা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব ব্যক্তিকে অপসারণ করতে পারে, এমনকি পর্ষদও ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু ওই আইনেই যোগ করা হয়েছে যে, চেয়ারম্যান, পর্ষদ সদস্য বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অপসারণ করতে পারবে না। এ কারণেই সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকবৃন্দ কোনো রকমের দায়বদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৫৬ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আর বাকি ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে ৫০ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি ঋণ। অন্যদিকে, শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ হিসাব করলে দাঁড়ায় মোট খেলাপি ঋণের ৬৪ শতাংশ। বাকি ৪৬ ব্যাংকে খেলাপি রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ না করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ও বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ শতাংশের দিক দিয়ে কমলেও পরিমাণের দিক দিয়ে বেড়েছে।

২০১৪ সালের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আলোচ্য সময়ে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। দেখা গেছে, ২০১৫ সালে কৃষি খাতে ২৮০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ঋণ বিপরীতে খাতটিতে ৪০ দশমিক শূণ্য ৬ বিলিয়ন ঋণ খেলাপি হয়েছে। বাণিজ্যিক ঋণে ১ হাজার ২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৮৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ। শিল্প ঋণে ৭৫৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৭৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতে নেয়া ৭৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৪টি খাত উল্লেখ করে খাতভিত্তিক ঋণের চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হওয়া মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে ৫ খাতে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৬৩ শতাংশ রয়েছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে বৃহৎ শিল্পে। শীর্ষ পাঁচটি খাতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বিবিধ খাতে রয়েছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, আমদানি অর্থায়নে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেবা খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং কৃষি খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ। আবাসন, রফতানিসহ বিভিন্ন ১৭টি খাতে রয়েছে ১৫দশমিক ৭০ শতাংশ।