Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 40)

Author Archives: আমাদের বুধবার

সাঁড়াশি অভিযানের ভিন্ন দিক : বার্তা সংস্থা এপি’র বিশ্লেষণ

ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার প্রথম ছয় দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের কারাগারগুলো ১১,৬০০ নতুন বন্দি দিয়ে ভরে ফেলাটা আইন প্রয়োগকারী শক্তির বিস্ময়কর প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সমস্যা হলো, যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের দুই শতাংশেরও কম সন্দেহভাজন চরমপন্থী এবং তাদের একজনও উচ্চপর্যায়ের কেউ বিবেচিত হওয়ার মতো নয়। বাকিরা? অভিযুক্তদের বেশির ভাগই চুরি, সিঁধেল চুরি বা টুকটাক মাদক পাচারের মতো ছোট-খাটো অপরাধী। প্রধান বিরোধী দলটির মুখপাত্রের মতে, আটককৃতদের অন্তত দুই হাজার তাদের দলের লোক, বাকিরা তাদের প্রধান মিত্রের দলভুক্ত।

বিশ্লেষক, মানবাধিকার গ্রুপ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেক্যুলার সরকারের বিরোধীরা এখন অভিযানটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এটা কি সত্যিই বিভিন্ন সংখ্যালঘুর ওপর মুসলিম চরমপন্থীদের একের পর প্রাণঘাতী হামলা বন্ধ করার উদ্যোগ, নাকি এসব হত্যাকান্ড থেকে দেশে ও বিদেশে যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা?

ওয়াশিংটন ডিসির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিসা কার্টিস বলেন, চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান দরকার ছিল। কিন্তু হাজার হাজার বন্দির মধ্যে জঙ্গি মাত্র ১৭৭ জন বলে পুলিশের দেওয়া তথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্যোগটি হামলা বন্ধের আন্তরিক চেষ্টার চেয়ে বরং রাজনৈতিক বিরোধীদের চাপে রাখার একটি হাতিয়ার বলেই বেশি মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে সত্যিকার অর্থে সেক্যুলার সরকারের সমর্থক এবং ইসলামি শাসন কামনাকারীদের মধ্যকার ব্যবধান বেড়ে যেতে পারে, এমনকি জঙ্গিরা উৎসাহিত পর্যন্ত হতে পারে। কার্টিস বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ইসলামি চরমপন্থীদের জন্য আরো বেশি সদস্য সংগ্রহ ও প্রভাব বাড়ানোর দরজা খুলে দিচ্ছে এবং চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা আরো কঠিন করে তুলবে।

সাঁড়াশি অভিযান নিয়ে সমালোচনার জবাবে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে ডজন দুয়েক নাস্তিক লেখক, প্রকাশক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট এবং বিদেশী সাহায্যকর্মীকে হত্যার, এসব মৃত্যুর বেশ কয়েকটা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে, এর জন্য দায়ী সন্দেহভাজন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়াস নতুন করে নজর কাড়বে।

তথাকথিত ‘চাপাতি হামলা’ দেশটির সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বিপদাশঙ্কার সৃষ্টি করেছে, কয়েকটি সরকার ঝুঁকির মুখে থাকাদের আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বেশির ভাগ হত্যাকান্ডেই তরুণদের একটি গ্রুপ তাদের টার্গেটকে মাংস কাটার ছুরি ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদার সাথে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলো বেশির ভাগ হামলার দায় স্বীকার করলেও সরকার বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জিহাদী গ্রুপটির উপস্থিতি অস্বীকার করে আসছে।

পক্ষান্তরে হাসিনার সরকার স্থানীয় সন্ত্রাসী ও ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোকে- বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার মিত্র জামায়াতে ইসলামী- দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য সহিংসতায় ইন্ধন দিচ্ছে বলে অভিযুক্ত করছে। এই উভয় দলই সব ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে গুলি ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করার পর প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এই অভিযানের ঘোষণা দেন। হামলার শিকার ছিলেন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আগ্রহী। সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের দৃষ্টিতে তাদেরই একজন বিবেচিত ব্যক্তিটির ওপর এই হামলায় তাদের অনেকে হতবিহ্বল হয়ে যায়।

পুলিশ অবশ্য এখন বলছে, অভিযানটি কখনোই কেবল চরমপন্থীদের জন্যই কেবল নির্ধারিত ছিল না, বরং মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায় জড়িতদের আটকের লক্ষ্যেও করা হয়েছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জঙ্গিবিরোধী প্রয়াস জোরদার করার পাশাপাশি অপরাধ করার যথাযথ প্রমাণ ছাড়া নির্বিচারে গ্রেফতার অবিলম্বে বন্ধ করা এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত বলে জানিয়েছে। গ্রুপটির এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস ‘জঙ্গি হামলায় ‘যথাযথ তদন্তের কঠোর পরিশ্রম’ না করে ‘প্রথাগত সন্দেহভাজনদের’ আটক করার পুরনো অভ্যাস অনুসরণ’ করার ‘মন্থর ও আত্মপ্রসাদপূর্ণ’ কাজ করার জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করেছেন।

আটকদের বেশির ভাগই শুক্রবার পর্যন্ত আটক ছিলেন, আর তাদের পরিবার ও বন্ধুরা জামিন প্রদান কিংবা অন্যান্য পন্থায় তাদের প্রিয়জনের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য থানা, আদালত ও কারাগারে ভিড় করছিলেন। স্থানীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, অন্যান্য পন্থার মধ্যে পুলিশকে উৎকোচ প্রদানও ছিল।

পুলিশ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রকাশ পেয়েছে, তাদের মধ্যে দুই সন্দেহভাজন রয়েছে, অক্টোবরে এক প্রকাশকের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনায় তাদের খোঁজা হচ্ছিল। একই দিনে পৃথক ঘটনায় অন্য প্রকাশককে হত্যার জন্য খোঁজা অন্য সন্দেহভাজনদের আটকে এটা সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এখনো বেশির ভাগ সন্দেহভাজন পলাতক রয়েছে। এসব হামলার জন্য কারা জড়িত তা কর্তৃপক্ষ জানে বলে দৃঢ়তার সাথে বলা সত্ত্বেও কেন তদন্ত এত কঠিন হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্যএশিয়া ব্যুরো চলতি সপ্তাহে ইসলামি চরমপন্থীদের নির্মূলে বাংলাদেশকে সহায়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি তদন্তে স্বচ্ছতা রাখা এবং ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী নিরপেক্ষ বিচার ও অন্যান্য সুরক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের’ পরামর্শ দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রশমিত করার জন্যই সম্ভবত এই অভিযান চালানো হয়েছে।

‘অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধী ও অপরাধীদের গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমরা আরো বেশি পেশাদারী দৃষ্টিভঙ্গি দেখার প্রত্যাশা করতে পারি,’ বলেছেন, জোনাহ ব্ল্যাঙ্ক। তিনি ওয়াশিংটন ডিসির র‌্যান্ড কোরের রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক  বিশেষজ্ঞ।

সাবেক এক পুলিশপ্রধান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঢাকা দেওয়ার জন্য এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তথা ২০০৭ থেকে তিন বছর পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশ দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখাতে চায়, তারা হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং হামলা মোকাবেলায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছে। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এসব অভিযান চালানো হয় কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই। এতে করে বিপুলসংখ্যক নিরীহ মানুষ আটক ও হয়রানির শিকার হয়।’

বিএনপি নেতারা বলছেন, নিরাপত্তাজনিত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিচালিত এসব হামলার জন্য সরকার দায়ী। তারা আরো অভিযোগ করেছে, সরকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা প্রতিরোধ করার জন্য তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর অভিযান চালাচ্ছেন।

২০১৪ সালে সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকার কথা বলে বিরোধী দলের বয়কট করা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার সহজেই জয়ী হয়েছিল।

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৬)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খাতেই যুদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক শোষণের অবসানের পরে শ্রেণীশোষণের অবসান যে মানুষ চাইবে সেটা তো ছিল খুবই স্বাভাবিক। জনমুক্তির এই স্বপ্নের কথা তাজউদ্দীন জানতেন, যে জন্য ঐ যুদ্ধসময়ে তাঁর প্রথম ভাষণেই যুদ্ধটিকে গণযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া যে শোষণমুক্তি সম্ভব নয়, এ বিষয়ে তাঁর অস্পষ্টতা ছিল না। স্বাধীনতার পরে ঢাকার সচিবালয় প্রাঙ্গণে সরকারী কর্মচারীদেরকে উদ্দেশ্য করে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে এই কথাটি ছিল যে, ‘শহীদের রক্তে উর্বর মাটিতে উৎপন্ন ফসল ভোগ করবে চাষী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কোনো শোষক, জালেম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাদেশকে শোষণ করতে পারবে না।

সরকারী কর্মচারীদের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর যে কথাটি বলার ছিল তা হলো, তাঁরা যেন এই সত্যটাকে ভুলে না যান যে, বিপ্লব সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন হবে ‘সাম্যবাদী অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কায়েম করা।’ প্রথমদিকে ওই তিন লক্ষ্যের বাস্তবায়নই ছিল রাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রেস-কোর্সে দেয়া বক্তৃতাতে শেখ মুজিবও গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলেছিলেন।

রাষ্ট্রীয় মূলনীতির তালিকায় জাতীয়তাবাদের সংযোজন ঘটে পরে, সংবিধান রচনার সময়ে। সংযোজনটি তাৎপর্যহীন নয়। ধারণা করা সম্ভব যে, অন্য তিনটি নীতির বাস্তবায়ন যেহেতু সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাস্তববাদিতায় তাই এই উপলব্ধিটি ধরা পড়েছিল যে জাতীয়তাবাদী অর্জনটা জনগণের কাছে তুলে ধরলে আপাত জনসন্তুষ্টির কারণ ঘটবে। জাতীয়তাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করার দরুন অবশ্য সমস্যাও তৈরী হয়েছে। একটি শুরুতেই দেখা দিয়েছিল, সেটি হলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের অস্তিত্বের অস্বীকৃতি; পরে ঘটলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী তত্ত্বের উদ্ভব। ধারাবাহিকতাটি লক্ষ্য করবার মতো।

সবকিছু মিলিয়ে এটা নিশ্চিত যে, রাষ্ট্র জনগণের ঈপ্সিত মুক্তির দিকে এগোয়নি, বরঞ্চ উন্নতির পুরাতন ধারণার অবরোধের ভেতরই আটকে থেকেছে। এগুতে না-পারাটা পিছিয়ে যাওয়ারই প্রমাণ। আর ওই পিছিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটেছে, যার মধ্যে প্রধান দুটি হচ্ছে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর এবং পরে তাজউদ্দীনের হত্যাকান্ড। এমনটি যে ঘটবে তা ছিল দুঃস্বপ্নেরও অতীত।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড তাজউদ্দীনকে শোকে অভিভূত ও বিমূঢ় করে। তিনি জানতেন যে তাঁর জন্যও বিপদ আসবে। বিপদ আসতে যে বিলম্ব ঘটেছিল তাও নয়। শোনা যায় ঘাতকেরা তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানাতে চেয়েছিল এবং সে-জন্য এক প্রকার মানসিক চাপও প্রয়োগ করতে থাকে। বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর বন্ধু ডা. করিম অবহিত ছিলেন। ব্যর্থ ও নিরাশ হয়ে তাজউদ্দীনকে ঘাতকেরা জেলখানায় নিয়ে যায়। সেটাই ছিল তাঁর শেষ যাত্রা। যে-আশংকা তাঁর মনে ছায়াপাত করেছিল, সেটি অত্যন্ত ভয়াবহরূপে সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে গেল।

ডা. করিম লিখেছেন, ‘মুজিবমন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত তাজউদ্দীনকে আমি বহুবার বলেছি, দেশ ছেড়ে চলে যেতে, কিন্তু তাজউদ্দীন রাজি হয়নি। বলেছি অন্তত ভারতে যাও, সে-কথাতেও কান দেয়নি। বলত দেশের পরিবর্তন হবে, কৃষক শ্রমিক ক্ষমতা পাবে, আর সেই যুদ্ধে আমি না থাকলে কেমন হয়?’ (চলবে)

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কতো অর্থ খরচ হয়?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

যুক্তরাষ্ট্রে চার বছর পর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। আর প্রতিবারই আগেরবারের চেয়ে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ২০১২ সালে হয়েছিল ২,৬২১,৪১৫,৭৯২ ডলার, ২০০৮ সালে ২,৭৯৯,৭২৮,১৪৬ ডলার, ২০০৪ সালে ১,৯১০,২৩০,৮৬২ ডলার। এই সূত্র ধরে অনুমান করা যাবে কি, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ব্যয় হবে কত?

২০১২ সালের নির্বাচনে ওবামা আর রমনির মোট ব্যয় ছিল ২.৬ বিলিয়ন ডলার। হাফিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের নির্বাচনে ওবামা ও রমনি প্রতি রেজিস্ট্রার্ড ভোটার পিছু ব্যয় করেছিলেন ১১.৭৫ ডলার করে। বেশির ভাগ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের নির্বাচনে মোট ব্যয় হবে অন্তত ৩ বিলিয়ন ডলার। অনেকের মতে, এটা ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কেউ কেউ তো বলেন, তা হবে ১০ বিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার খেলা। প্রচলিত কথা রয়েছে : যে প্রার্থী যত বেশি ব্যয় করবেন, তার জয়ের সম্ভাবনা তত বেশি থাকে। এ কারণেই সব প্রার্থী অর্থ সংগ্রহে ব্যাপক মনোযোগী হয়ে থাকেন। অবশ্য টাকাতেই সব হয়, এই ধারণায় অবিশ্বাস করার লোকও যথেষ্ট আছে। এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় টিভি বিজ্ঞাপনে। ডিজিটাল যুগে এসে খরচেরও খাত বেড়ে গেছে। ২০১৬ সালে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ব্যয় হতে পারে ১ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী নির্বাচনে ব্যয় হবে কত? ৩.৩ বিলিয়ন ডলার!

প্রার্থীদের  শ্লোগান টিভির মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয় বলে অনেকে ধারণা করেন। বিজ্ঞাপন যুদ্ধে লিন্ডন জনসনের ‘ডেইজি’, রোন্যাল্ড রিগ্যানের ‘মর্নিং ইন আমেরিকা’, জর্জ বুশের ‘উইলি হর্টন’, বারাক ওবামার ‘ইয়েস, উই ক্যান’ তাদের জয়ের পেছনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল বলে বলা হয়ে থাকে।

প্রার্থীরা তাদের বেশির ভাগ অর্থ সংগ্রহ করেন দান থেকে। প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্টের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত দান খাত থেকে সংগ্রহ হয়েছিল ৪৯৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছিল ২২৯ মিলিয়ন ডলার, রিপাবলিকানরা ২৬৫ মিলিয়ন ডলার।

এবারের নির্বাচনে কার কত ব্যয় হচ্ছে, তা অনুমান করা একটা সুবিধাজনক পথ রয়েছে। তা হলো শীর্ষস্থানীয় প্রার্থীরা কে কত এর মধ্যেই খরচ করে ফেলেছেন জানা, যদিও এখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প বা হিলারি ক্লিনটনের কেউ দলীয় মনোনয়নপত্র পাননি। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রার্থীরা গত নভেম্বরের মধ্যেই ৫১৮.৪ মিলিয়ন ডলার তুলে ফেলেছিলেন। খরচ করেছিলেন ১৫৩.৬ মিলিয়ন ডলার। তারা আরো অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মূল নির্বাচনের সময় তো আরো প্রচুর অর্থের দরকার হবে। তখন হিসাবটা হবে মিলিয়নে নয়, বিলিয়নে!

এবার দেখা যাক, অর্থ সংগ্রহের দিক থেকে কোন প্রার্থীর অবস্থা কেমন (এটা অবশ্য গত নভেম্বরের হিসাব)।

হিলারি ক্লিনটন : হিলারির তহবিল সংগ্রহের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। সাবেক এই ফার্স্ট লেডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুলেছেন ৭৭.৫ মিলিয়ন ডলার, ব্যয় করেছেন ৪৪.৫ মিলিয়ন ডলার।

হিলারি কিন্তু জেব বুশের কাছাকাছিও যেতে পারেননি। অনেক আগেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো জেব সংগ্রহ করেছিলেন ১৩৩.৩ মিলিয়ন ডলার।

ডোনাল্ড ট্রাম্প : ট্রাম্প প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি নিজের টাকায় নির্বাচন করবেন। এবারের প্রার্থীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে ধনী। তবে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের মালিক তার সব অর্থ দিয়েও যে হাতি পোষা যাবে না, অল্প সময়ের মধ্যেই তা নিশ্চিত হয়ে যায়। এর সূত্র ধরে তিনি অর্থ সংগ্রহেও মনোযোগ দেন। পরিণতিতে নির্বাচন-প্রক্রিয়া শুরুর কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ৫.৮ মিলিয়ন ডলার (এর মধ্যে ট্রাম্পের নিজের অর্থের পরিমাণ ছিল ১.৮ মিলিয়ন ডলার) যোগার করে ফেলেন। আর এই সময়ের মধ্যে খরচ করেন ৫.৬ মিলিয়ন ডলার।

বেন কারসন : ট্রাম্প প্রচারের সব আলো কেড়ে না নিলে হয়তো বেন কারসন আরো ভালো করতেন। সাবেক এই নিউরোসার্জন উঠিয়েছিলেন ৩১.৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্য থেকে ব্যয় করেছেন ২০.১ মিলিয়ন ডলার।

বার্নি স্যান্ডার্স : অনেকের কাছেই বার্নি স্যান্ডার্স স্বপ্নের প্রার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন। অতি-ধনীদের লোভী হাতগুলোর রাশ টেনে ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সব নাগরিক বিনা মূল্যে না হলেও যেন অল্প মূল্যে শিক্ষার অধিকার পায়, সে নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।  ভারমন্টের এই সিনেটর সংগ্রহ করেছিলেন ৪১.৫ মিলিয়ন ডলার। ব্যয় করেছেন ১৪.৩ মিলিয়ন ডলার। তবে তিনি বিশেষ গোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তা না হলে তিনি আরো অনেক বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারতেন। (ওয়েব সাইট অবলম্বনে)

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৪৪ : মার্কিন-সোভিয়েত বলয়ের ভেতরে ও বাইরে

আনু মুহাম্মদ ::

চীন সম্পর্কে হেনরী কিসিঞ্জারের বিশাল স্মৃতিকথায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে চীনের আগ্রহের নানাদিক প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরেও, মাও সে তুং এর সময় থেকেই চীন যে নিজের অবস্থান থেকে বিশ্বে একটি ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য একইসঙ্গে নানামুখি কৌশলগত সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছে তারও কিছু চিত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন চিঠিপত্র, চীন-মার্কিন নেতৃবৃন্দের আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক সংলাপ ইত্যাদি থেকে পরিষ্কার হয় যে, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র প্রশ্নতুলে ৭০ দশকের প্রথম থেকেই চীন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছিলো। চীন সীমান্তে সোভিয়েত সৈন্য সমাবেশ, কম্বোডিয়ায় ভিয়েতনামের আক্রমণ, ভিয়েতনামকে সোভিয়েত সমর্থন, চীন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইত্যাদি ঘটনায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোই চীনের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়। এর পুরো সুযোগই গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য সমাবেশের বিরুদ্ধে মুজাহিদীনদের দিয়ে মার্কিনী যুদ্ধ একভাবে সমর্থন পায় চীনের। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার চীনেরও অন্যতম দাবি ছিলো।

মার্কিন-চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। সম্পর্ক স্থাপনের দশবছর পর ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রেগ্যানকে দেয়া চীন সম্পর্কিত এক নোটে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে, নিজস্ব স্বার্থেই চীনকেতৃতীয় বিশ্বে আরও বৃহৎ ভূমিকা পালনের জন্য আমাদের উৎসাহিত করা দরকার। তারা যতো সফল হবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ততোই কম সফল হবে।.. ১৯৭২ সালে আমরা পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম সোভিয়েত আগ্রাসন বিষয়ে আমাদের অভিন্ন উদ্বেগের কারণে। ১৯৭২-এর তুলনায় সেই বিপদ এখন আরও অনেক বেশি হলেও যা ভবিষ্যতে আমাদের আরও ঘনিষ্ঠ করবে তা দুইদেশের অর্থনৈতিক পরস্পর নির্ভরশীলতা।’

চীন ঠিকই মার্কিন-সোভিয়েত বলয়ের বাইরে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করবার চেষ্টা করছিলো। ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের কাছে দেয়া নথিতে স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, চীন এমনভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সম্পর্ক তৈরি করছে যাতে একইসঙ্গে ‘একদিকে সোভিয়েত সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক আয়োজনের প্রতি তার সমর্থন থাকছে, অন্যদিকে বিশ্বে উত্তেজনা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করে দুই পরাশক্তির বিরোধকে আক্রমণ করছে। এরফলে চীনের পক্ষে সমান্তরাল দুটো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন, অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্ব ব্লকের প্রতিনিধি হয়ে ওঠা।’

চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বা চীনের ভূমিকার ওপর অতিমাত্রায নির্ভরশীলতার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে মতভেদ ছিলো। প্রেসিডেন্ট রেগ্যানের পররাষ্ট্র সচিব জর্জ শুলজ এর ভাষ্যে এর প্রতিফলন আছে। তিনি বলেছেন, ‘সোভিয়েত হুমকি মোকাবিলায় চীনের অপরিহার্যতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের ফলে দরকষাকষিতে চীন অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। এই সম্পর্ক অবশ্যই হতে হবে সুনির্দিষ্টভাবে পরস্পরের স্বার্থে। এই কূটনীতিতে চীন তার জাতীয় স্বার্থে ভূমিকা পালন করবে। …অভিন্ন স্বার্থেই আমাদের চীনা নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে জাপানের সাথে জোট আরও জোরদার করতে হবে।’

অন্যদিকে ১৯৮০ দশকের প্রথম দিক থেকেই চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবার চেষ্টা শুরু করে। সম্পর্কের যে মাত্রায় অবনতি হয়েছিলো এবং যেভাবে সোভিয়েত বিরোধিতা বা সোভিয়েত আক্রমণের হুমকি সামনে রেখে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছিলো তাতে এই মোড় পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়ায়নি।  ১৯৮৫ সালে সিআইএ রিপোর্টে দুই পরাশক্তির সাথে চীনের নিজস্ব উপায়ে সম্পর্ক নাড়াচাড়া করবার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। হেনরী কিসিঞ্জার তাঁর স্মৃতিকথায় এই নোট সম্পর্কে জানাচ্ছেন। এই নোটে বলা হয়েছে, ‘উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন সভা, আন্ত:পার্টি যোগাযোগের মাধ্যমে চীন যেভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে তা চীন-সোভিয়েত সংঘাত শুরুর পর থেকে আর কখনও দেখা যায়নি। নোটে আরও বলা হয়েছে যে, চীনা নেতারা আবারও সোভিয়েত নেতাদের কমরেড সম্বোধন করা শুরু করেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নকে আবারও সামাজতান্ত্রিক হিসেবে অভিহিত করছেন। চীন ও সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েও কার্যকর আলোচনা করছেন। এই বছরেই মস্কোতে চীনা উপপ্রধানমন্ত্রীর সপ্তাহব্যাপী সফরকালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।’ (পৃ. ৩৯২-৯৩)

কিন্তু ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়নের বহুমুখি সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভাবনীয় বিজয় তখন আসন্ন।

ভ্যাটের থাবায় সাধারণ মানুষ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অধিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবারের বাজেটে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি ও হার অনেক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। মোবাইল ফোন সেবার ওপর করহার বাড়ানো হয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখা হলেও পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কেক, বিস্কুট, সিআর কয়েলসহ বিভিন্ন পণ্যের নির্ধারিত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ‘বাড়তি’ কর আরোপ প্রস্তাব কার্যকর হলে পণ্য ও সেবার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ভোক্তাকে তখন বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে, সেবা পেতে হবে। এতে তাদের ওপর ব্যাপক চাপ আসবে।

বর্তমানে ২২টি খাত সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে বিশেষভাবে ভ্যাটে ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে আটটি খাতের বিশেষ কর সুবিধা উঠিয়ে বিদ্যমানের চেয়ে বর্ধিত হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মোটরগাড়ির গ্যারেজের ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। বর্ধিত হার কার্যকর হলে গাড়ির মালিককে মেরামতের পেছনে আরও বেশি বিল দিতে হবে। জাহাজ নির্মাণে ডকইয়ার্ডে ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

এতে জাহাজ নির্মাণের ব্যয় আরও বাড়বে। কনস্ট্রাকশন ফার্মের ভ্যাটহার সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত ভ্যাটহার কার্যকর হলে নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়বে। বর্তমানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনে আড়াই শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। এতে করে পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা সেবার ওপর বর্তমানে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। এই হার দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে ইমিগ্রেশনের সেবার জন্য ভোক্তাকে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। কোনো অনুষ্ঠানে স্পনরশিপ সেবার জন্য এখন সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হয়। এ সেবার ওপর ভ্যাট দ্বিগুণ করায় স্পনরশিপ সেবার খরচ আরও বাড়বে।

বর্তমানে দেশীয় তৈরি বিস্কুট, কেক, বিভিন্ন ধরনের পেপার, পেপার প্রোডাক্ট, জিপি শিট, সিআই শিট, রঙিন শিটসহ বিভিন্ন ধরনের এমএস প্রোডাক্টের নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্য ২০ শতাংশ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত হার কার্যকর হলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে সিগারেট, জর্দা ও গুলে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে বিড়ির। এতে করে ওই সব পণ্য আগের চেয়ে আরও বেশি দামে কিনতে হবে। গরিবের ব্যবহৃত হাওয়াই চপ্পলের ভ্যাট সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হার্ডবোর্ড, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, সাধারণ জনগণের খাবার পাউরুটি, বনরুটি ইত্যাদি পণ্যের জন্য ভ্যাটে যে বিশেষ ছাড় আছে তা তুলে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে গরিবের ব্যবহৃত ওই সব পণ্যের দাম বাড়বে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অধিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবারের বাজেটে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি ও হার অনেক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। মোবাইল ফোন সেবার ওপর করহার বাড়ানো হয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখা হলেও পরিমাণ বিদ্যমানের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ওপর ব্যাপক হারে কর আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কেক, বিস্কুট, সিআর কয়েলসহ বিভিন্ন পণ্যের নির্ধারিত ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ‘বাড়তি’ কর আরোপ প্রস্তাব কার্যকর হলে পণ্য ও সেবার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ভোক্তাকে তখন বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে, সেবা পেতে হবে। এতে করে তাদের ওপর ব্যাপক চাপ আসবে। বর্তমানে ২২টি খাত সংকুচিত মূল্যভিত্তিতে বিশেষভাবে ভ্যাটে ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে আটটি খাতের বিশেষ কর সুবিধা উঠিয়ে বিদ্যমানের চেয়ে বর্ধিত হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মোটরগাড়ির গ্যারেজের ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। বর্ধিত হার কার্যকর হলে গাড়ির মালিককে মেরামতের পেছনে আরও বেশি বিল দিতে হবে। জাহাজ নির্মাণে ডকইয়ার্ডে ভ্যাটহার সাড়ে ৭ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে করে জাহাজ নির্মাণের ব্যয় আরও বাড়বে। কনস্ট্রাকশন ফার্মের ভ্যাটহার সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত ভ্যাটহার কার্যকর হলে নির্মাণ খাতের ব্যয় বাড়বে। বর্তমানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনে আড়াই শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়। এতে করে পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা সেবার ওপর বর্তমানে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। এই হার দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফলে ইমিগ্রেশনের সেবার জন্য ভোক্তাকে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। কোনো অনুষ্ঠানে সম্পরশিপ সেবার জন্য এখন সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হয়। এ সেবার ওপর ভ্যাট দ্বিগুণ করায় স্পনরশিপ সেবার খরচ আরও বাড়বে। বর্তমানে দেশীয় তৈরি বিস্কুট, কেক, বিভিন্ন ধরনের পেপার, পেপার প্রোডাক্ট, জিপি শিট, সিআই শিট, রঙিন শিটসহ বিভিন্ন ধরনের এমএস প্রোডাক্টের নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্য ২০ শতাংশ আছে। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। বর্ধিত হার কার্যকর হলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে সিগারেট, জর্দা ও গুলে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে বিড়ির। এতে করে ওই সব পণ্য আগের চেয়ে আরও বেশি দামে কিনতে হবে। গরিবের ব্যবহৃত হাওয়াই চপ্পলের ভ্যাট সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হার্ডবোর্ড, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, সাধারণ জনগণের খাবার পাউরুটি, বনরুটি ইত্যাদি পণ্যের জন্য ভ্যাটে যে বিশেষ ছাড় আছে তা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে সাধারন মানুষের ব্যবহৃত ওই সব পণ্যের দাম বাড়বে।

সারাদেশের ছোট ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বছরে নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট পরিশোধ করেন। নতুন বাজেটে এটি শতভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ছোট ব্যবসায়ীরা বছরে ১৪ হাজার টাকা এককালীন ভ্যাট দেন। নতুন বাজেটে এটি বাড়িয়ে ২৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকার ছোট ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বছরে ১০ হাজার টাকা ভ্যাট দেন। তাদের দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। জেলা শহরের জন্য এখন আছে ৭ হাজার ২০০ টাকা। তাদের দিতে হবে ১৪ হাজার টাকা। তৃণমূল পর্যায়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় ভ্যাট আছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। তাদের দিতে হবে ৭ হাজার টাকা। যোগাযোগ করা হলে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এএসএম কিরন বলেন, প্যাকেজ ভ্যাট দ্বিগুণের প্রস্তাব কার্যকর হলে ব্যবসার খরচ বাড়বে। এতে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর।

ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি করদাতাদের দাবি ছিল করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করা এবং তা ছিল যৌক্তিক দাবি। কারণ নিম্ন-আয়ের মানুষের ওপরই করের আঘাত সরাসরি পড়ে। বাড়ি ভাড়ার খরচ ছাড়াও চারজনের একটি পরিবারে মাসে ২৫ হাজার টাকায় চলা অনেক কষ্টকর। তাই ন্যূনতম করমুক্ত সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা হওয়া উচিত ছিল, সেখানে সরকার করমুক্ত সীমা তো বৃদ্ধি করেনি উপরন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যমান বিনিয়োগসীমা (৩০ ভাগ থেকে কমিয়ে ২০ ভাগ করা হয়েছে) সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে যারা কর দিচ্ছেন, তাদের একই আয়ে গতবারের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে করে ব্যয়যোগ্য আয় কমে যাবে। এমনিতেই আমাদের দেশে করহার বেশি, তার ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো কতখানি যৌক্তিক হয়েছে, তা নিশ্চয়ই মন্ত্রী তা বিবেচনায় আনবেন। এ নতুন কর কাঠামোয় আরেকটি যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে, তা হলো মানুষের সঞ্চয় কমে যাবে। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবেই হোক, মানুষ আয়কর ভার কিছুটা কমানোর জন্য হলেও সঞ্চয় করত। আমাদের দেশে এমনিতেই সঞ্চয় প্রবণতা কম। তার ওপর যদি সরকার এমনভাবে নিরুৎসাহিত করে তবে তা ভবিষ্যতে ভালো ফল বয়ে আনবে না। এ প্রবণতা ভবিষ্যতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের অভাব তৈরি করতে পারে।

আগামী রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে ১২০ টাকা মূল্য পর্যন্ত প্লাস্টিক ও রাবারের চপ্পল, জুতা-স্যান্ডেলের ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি বাতিল করা হয়েছে। এতে বড় বড় শপিং মলে যাওয়ার সক্ষমতা যাদের নেই, সেসব মানুষকে ফুটপাতের ছোট্ট দোকান থেকে এসব পণ্য কিনতে হবে বেশি দামে। শুধু জুতা-স্যান্ডেল নয়, আরো অনেক পণ্যে শুল্ক কর-ভ্যাট বসায় নিম্ন-আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়তি ভ্যাটের আঘাত আসবে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের জীবনেও।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এখন পাড়া-মহল্লায়। জেলা পর্যায়েও কিন্ডারগার্টেন ছড়িয়ে পড়েছে। এসব স্কুলে বেতন বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করে দিলেন অর্থমন্ত্রী। এসব স্কুলের বেশির ভাগ পাঠ্যবই ও ব্যবহার্য সামগ্রী আমদানি করা হয়। নতুন বাজেট প্রস্তাবে শিশুদের ছবি ও অঙ্কনের বিদেশি বই আমদানির শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

আমাদের দেশে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যয় ক্ষেত্রবিশেষে এত বেশি যে অনেক সময়ই অর্থ সংকুলানে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। আসছে অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় আরো বাড়তে পারে। হাসপাতালের কিছু যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ধরা হয়েছে। এছাড়া ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম রেকর্ডিং পেপারের ওপর রাজস্ব আরোপ করা হয়েছে। মেডিটেশন সেবায়ও বাড়তি কর দিতে হবে।

বিদেশ ভ্রমণে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে অনেকে টিকিট কেনেন। এর জন্য যাত্রীর কাছ থেকে টিকিটের মূল্যের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হয়। আসছে অর্থবছরে  ট্রাভেল এজেন্সির ওপর নতুন কর বসানো হয়েছে। এতে বিদেশ যাত্রীদের বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। গাড়ি মেরামত, হোটেল ভাড়া, আইপিএস, ইউপিএসে এ রাজস্বের থাবা বসায় ভোক্তাকেই বাড়তি খরচ বহন করতে হবে। রড তৈরির কাঁচামাল বিলেট আমদানিতে শুল্ক বসছে। এতে নির্মাণ খাতের এ জরুরি পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হলো।

দেশীয় মোটরসাইকেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ছাড়া অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানিতে হ্রাসকৃত শুল্ক হারে রেয়াতি সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত দেশেই উন্নতমানের মোটরসাইকেল তৈরির পথ উন্মুক্ত করবে। তবে এ খাতে সিকেডি মোটরসাইকেলের আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক হার আশংকাজনক হারে হ্রাস করে ৪৫ শতাংশ থেকে শর্তসাপেক্ষে আগামী দু’বছরের জন্য ২০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোটরসাইকেল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভ্যাট অব্যাহতি প্রযোজ্য ছিল, যা উঠিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়। দেশ এখন মোটরসাইকেল শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ শিল্পকে সংরক্ষণ সুবিধা না দিয়ে উল্টো আমদানির পথ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ফলে আমদানিকৃত ও সংযোজনকৃত মোটরসাইকেলের বাজারমূল্য কমবে। আর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় মার খাবে।

ইসলামী ব্যাংক-এর আলোচনাসভা ও ইফতার মাহফিল

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর উদ্যোগে ‘রোযা ও তাকওয়ার আলোকে মানবিক ব্যাংকিং’ শীর্ষক আলোচনা ও ইফতার মাহফিল ১৪ জুন মঙ্গলবার হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুস্তাফা আনোয়ার-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। আলোচনা উপস্থাপন করেন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান এম আযীযুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবদুর রশীদ ও  মাসজিদ আত-তাকওয়া, ধানমন্ডির খতিব আল্লামা সাইয়্যেদ জুলফিকার জহুর। বিচারপতি, কূটনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সিনিয়র ব্যাংকার, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, উলামাসহ ব্যাংকের ডাইরেক্টর ও উর্দ্ধতন নির্বাহীবৃন্দ এতে উপস্থিত ছিলেন।

ইঞ্জিনিয়ার মুস্তাফা আনোয়ার সভাপতির ভাষণে বলেন, বহুমুখী আর্থিক সেবা, প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা ও গরিব জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন এ ব্যাংকের লক্ষ্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটি দরদী ও মানবিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে এ ব্যাংক। তিনি বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বৃহৎ শিল্পে অর্থায়নের পাশপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও নারীর ক্ষমতায়নেও কাজ করছে এ ব্যাংক।

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ইসলামী ব্যাংক তাকওয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। শুধু মুনাফা অর্জন নয় বরং সার্বজনীন আর্থিক কল্যাণ বাড়ানো ও অকল্যাণ দূর করা এ ব্যাংকের লক্ষ্য। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার জন্ম। তিনি বলেন, অর্থনীতি ও আর্থিক কারবারে শোষণ, বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা দূর করতে তাকওয়ার গুণসম্পন্ন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। ব্যাংকিং নীতি ও পদ্ধতি তাকওয়াভিত্তিক হলে মানুষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে কল্যাণ লাভ করবে। এর ফলে গড়ে উঠবে মানবিক ব্যাংকিং ও একটি দরদী সমাজ।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, রোযা মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণকর বানায়। মানুষের জৈবিক ও আত্মিক সত্তাকে পরিশুদ্ধ করে। রোযার মাসে মানবজাতির জন্য দয়া ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয়। ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা, সহানুভূতি, ধৈর্য ও সংযম বৃদ্ধি পায়। রোযা ব্যক্তির আচরণ সংশোধন করে জীবনকে পরিশীলিত ও পরিমার্জিত করে। আত্মার শুদ্ধতা ও নৈতিকতা বাড়ায়। প্রয়োজনহীন চাহিদা ও লোভ দমন করে মানুষকে দায়িত্বশীল বানায়। ফলে সমাজে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।- সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

গণগ্রেফতার : জঙ্গী আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার সাধারন মানুষ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক.

বোধ করি একেই বলে গোদের ওপর বিষফোঁড়া! জঙ্গী বিরোধী ও গুপ্তহত্যাকারীদের ধরতে যখন সাঁড়াশি অভিযান চলছে, সে সময়ে ভারতীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রেস স্ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) পরিবেশিত একটি খবর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপ চেয়েছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক এ্যডভোকেট রানা দাসগুপ্ত। যদিও তিনি অস্বীকার করেছেন পিটিআই-এর সাথে সাক্ষাতকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাননি। সরকারের পক্ষ থেকে তথ্যমন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, তারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম এবং এজন্য ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।

ঘটনাপ্রবাহ অনেক আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। পিটিআই-এর এই খবর এবং সৃষ্ট বিতর্কের পরিনতি কি? প্রতিবেশি হিসেবে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব প্রায়ই জনস্বার্থের বিপরীতে এবং ক্ষমতার প্রশ্নে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় আশাংকার বিষয় হচ্ছে, গোটা ভারতে এখন জাতীয়তাবাদের চরমপন্থার উদ্ভব ঘটতে চলেছে। সামরিক নীতি, রাজনীতির চিত্র সেটিকেই ইঙ্গিত করছে। উদ্বিগ্নতা বাড়াচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীন নীতি। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের অদ্ভুত মিশেলের এই নীতি সবসময় আগ্রাসী এবং প্রতিবেশির জন্য বিপদের কারণ- ইতিহাসে এর অজস্র প্রমান রয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে জার্মানীতে উগ্র জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্মের মিশেল কি বিপর্যয়ই না ডেকে এনেছিল পৃথিবীর জন্য!

দুই.

গুপ্তহত্যা বা টার্গেট কিলিং-এর মিছিলটি আর লম্বা হবে না- প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বিশ্বাস করলেও আশ্বস্ত হওয়া যাচ্ছে না। কারণ এই বক্তব্যের দু’দিন পরেই দেশব্যাপী পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মুখেই পাবনায় একটি মন্দিরের সেবাইত খুন হলেন। অভিযান শুরুর প্রাক্কালে আরো একটি খুনের ঘটনায় মনে হতে পারে, গুপ্তহত্যাকারীরা এর মধ্য দিয়ে কি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানালো। চিরুনি অভিযান থেকে সাঁড়াশি অভিযান- শুনতে মন্দ নয়! কিন্ত গত কয়েক দিনে এর গতি- প্রকৃতি দেখে এটিকে বিশেষ অভিযান মনে হচ্ছেনা, বরং রুটিন বলে মনে হচ্ছে।

গত ৯ জুন বুধবার দুপুরে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যার ঘটনায় দুটি রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। স্পষ্টতই ইঙ্গিতটি ছিল জামায়াত- বিএনপির দিকে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যে-ই  যা মনে করুক, হেড অব দ্য গভার্ণমেন্ট হিসেবে সব তথ্য তার কাছে আছে। এটি শুনে জাতি বিশ্বাস করেছে এবং আশ্বস্ত হয়েছে যে, সরকার প্রধানের কাছে সংঘটিত গুপ্তহত্যা ও গুপ্তহত্যাকারীদের সকল তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। এর প্রতিফলন হিসেবে জঙ্গী নেটওয়ার্কগুলি সমূলে উৎপাটিত হবে এবং নিকট ভবিষ্যতে এই সমতল ভূমিতে জঙ্গীরা সংগঠিত হওয়া সুযোগ পাবে না।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গত ১৪ জুন মঙ্গলবার পর্যন্ত গ্রেফতার ১১ হাজার ৬৪৭ জনের মধ্যে মাত্র ১৪৫ জন সন্দেহভাজন জঙ্গী। অংকের হিসেবে যা ১ শতাংশের কম অর্থাৎ দশমিক ৮০ শতাংশ! গড়ে ১শ জনকে গ্রেফতার করার পরে এক বা তার চেয়েও সন্দেভাজন জঙ্গী পাওয়া যাচ্ছে। বাকি গ্রেফতারকৃতরা নিয়মিত মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী, চোর- ছ্যাচর ইত্যাদি। একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট জানাচ্ছে, ঐ পর্যন্ত অর্ধ সহস্রাধিক বিএনপি-জামায়াত কর্মী গ্রেফতার হয়েছে। যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের মতে এই সংখ্যা বিএনপির ২৭ জন ও জামায়াতের ১৪৬ জন।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোন নেতা-কর্মী রয়েছেন এমন তথ্য জানা যায়নি। ক্ষমতাসীন এই দলের ওয়ারেন্টভুক্ত আসামীদেরও ছাড় দেয়া হচ্ছে। জঙ্গীবিরোধী এই অভিযান ঢালাও গ্রেফতারের কারণে প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর সাথে শুরু হয়েছে ব্যক্তিগত শত্রুতা হাসিল ও গ্রেফতার বাণিজ্য। এই ঢালাও গ্রেফতারের মধ্যে সত্যি-সত্যিই জঙ্গী-গুপ্তহত্যাকারীরা গ্রেফতার হয়ে থাকলে তা অবশ্যই স্বস্তিদায়ক হবে এবং জঙ্গী সংগঠনগুলো কঠোর বার্তা পেয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে নির্দিষ্ট তালিকা ও তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে চিহ্নিত জঙ্গী ও সন্দেহভাজন গুপ্তহত্যাকারীদের ধরে বিচারে সোপর্দ করা হবে।

গণভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “যদি আপনারা মনে করেণ আমরা শুধু রাজনৈতিক কারণে বলছি, তাতে জঙ্গীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, তাহলে সেই পার পাওয়া জঙ্গীরা কারা? তাদের পরিচয়, নাম-ঠিকানা পেয়ে থাকলে আমাদের জানান। জঙ্গী জঙ্গীই, সে যে দলেরই হোক না কেন তারা রেহাই পাবে না”। প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সকলেই বিশ্বাস করতে চায় এবং এই অভিযানকে জঙ্গীবিনাশী হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু অভিযানের গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে এটির পেছনে পরিকল্পনা এবং পরিচালনাগত ত্রুটি রয়েছে অথবা এর কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।

সাঁড়াশি অভিযান শুরুতেই আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ১৪৫ জঙ্গী গ্রেফতার করতে গিয়ে সাড়ে ১১ হাজার সন্দেহভাজন ও নিয়মিত মামলার আসামী এতদিন পুলিশের চোখ এড়িয়ে ছিল কিভাবে? অন্যদিকে নির্দেশ পাওয়া মাত্র এতগুলি মানুষ গ্রেফতার হলো যারা বিভিন্ন অপরাধে সন্দেহভাজন? এসব ঘটনায় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ইতিমধ্যেই ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। আবার হত্যা মামলার আসামী, শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী ও মানব পাচারকারী এবং রোহিঙ্গাদের সাথে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় লিপ্ত সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গ্রেফতার হচ্ছে না কেন? তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় “অপরাধী যে দলেরই হোক”-শুধুই কি কথার কথা?

তিন.

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের বিস্তার রাজনীতি আশ্রয়ী এবং অবশ্যই সেটি ক্ষমতায় টিকে থাকা বা না থাকার রাজনীতি। রাজনীতিকে পক্ষে রাখতে বা শত্রু শিবিরকে বিপদে ফেলতে ধর্মীয় জঙ্গীবাদ নিয়ে খেলা করার নীতি এখন রাজনীতিকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। গত দু’দশক ধরে এই দেশে জঙ্গীবাদ ক্রমশ: মূলধারার রাজনৈতিক অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছে। এর বিষাক্ত প্রভাবে আন্তর্জাতিক শক্তিমানরা “ইসলামিক ষ্টেট (আইএস)” তকমা চাপাতে চেয়েছে এবং সরকারকে বারবার রিপিট করতে হচ্ছে আইএস নেই, আইএস নেই…। কিন্তু দেড় দশকের সামরিক শাসন এবং আড়াই দশকের কথিত গনতান্ত্রিক শাসনের সময় বেড়ে ওঠা জঙ্গীবাদের বিষাক্ত ক্ষত কাঁপিয়ে দিয়েছে রাজনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি ও মনন। তৈরী করেছে হত্যা-খুন ও ভয়ের নতুন সংস্কৃতি।

জঙ্গীবাদ প্রবণতা বা ভয় যত বাড়ছে সমাজ ততটাই ক্রিমিনালাইজড হয়ে পড়ছে। কর্তৃত্ববাদ সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতির কারনে হয়রানি, গ্রেফতার ও রিমান্ড বাড়ছে। একইসাথে এসব নিয়ে বাণিজ্য চলছে দেদারসে। মোটকথা অপরাধের বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে। পাশাপাশি নিরাপরাধ মানুষ যেমন জঙ্গীদের শিকার হচ্ছে, আবার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাতে নিপীড়ন-নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। অসংখ্য পরিবারের সুস্থিতি নষ্ট হয়ে গেছে চিরকালের জন্য। এর ফলে সৃষ্ট সামাজিক বৈষম্যের কারণে ঘৃণা ও প্রতিশোধপরায়নতা সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদকে উস্কে দিচ্ছে।

সংখ্যাগত তথ্য ছাড়াও বলে দেয়া যাচ্ছে, ২০১৫-১৬ সাল জুড়ে দেশে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মসজিদ বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে বোমা হামলা, সংখ্যালঘুদের হত্যা এমনকি নৌবাহিনীর সংরক্ষিত এলাকায় হামলা হয়েছে। ২০১৫ সালের শুরুতে লেখক অভিজিত রায়কে খুনের মধ্য দিয়ে লেখক-ব্লগার হত্যা ধারাবাহিকতা পেয়েছে। খ্যাতিমান লেখক হুমাযুন আজাদকে হত্যার মধ্য দিয়ে এটি শুরু হয়েছিল। এসব হত্যার প্রকৃত মোটিভ এবং খুনীদের চিহ্নিত করাতো দুরে থাক, মামলাগুলির তদন্তই ঝিমিয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্র ও মূলধারার রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতা, সুশাসন অন্তর্হিতকরণ এবং বিভাজন -বিদ্বেষ ছড়িয়েছে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে এখানে জঙ্গীবাদের প্রাথমিক স্তর সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে ভয় ছড়িয়ে দেবার জন্য হত্যা, হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ থেকে বাঁচতে হলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি সবার আগে চলে আসবে। এই সক্ষমতা কর্তৃত্ববাদের কবলে পড়ে দলদাসে পরিনত হয়েছে। জঙ্গী হামলা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় আঘাত হেনেছে। একের পর এক আক্রমন, হত্যার প্রধান কুশীলবদের চিহ্নিত না করে চলমান সাঁড়াশি অভিযান কতটা কার্যকরী হবে সে প্রশ্ন থেকেই গেল!