Home » Author Archives: আমাদের বুধবার (page 50)

Author Archives: আমাদের বুধবার

ধর্ষণ যুদ্ধাপরাধ : আন্তর্জাতিক আদালতের রায়

আসিফ হাসান ::

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সম্প্রতি ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র এবং ওই কর্মকান্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করে রায় দিয়েছে। ২০০২ সালে দি হেগে আদালতটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এ ধরনের রায় দিল। আদালতটি এছাড়াও প্রথমবারের মতো ‘নেতৃত্বের দায়-দায়িত্বের’ (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) জন্যও কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। আদালত ‘মুভমেন্ট ফর দি লিবারেশন অব দি কঙ্গোর’ প্রধান এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ-পিয়েরে বেম্বার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও লুটতরাজসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেয়। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও কত বছরের জেল দেওয়া হয়েছে, তা এখনো জানানো হয়নি।

এর মানে হচ্ছে, কোনো কমান্ডার নিজে ধর্ষণ, খুন বা লুটপাট করার মতো অপরাধে সম্পৃক্ত না থাকলেও তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের তা করার অনুমতি দিলে তিনি দোষ্য সাব্যস্ত হবেন। বেম্বার অপরাধমূলক কাজ ঘটেছিল ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে। ওই সময় তার প্রায় ১৫ শ’ সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী মিলিশিয়া বাহিনী সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের (সিএআর) সীমান্তজুড়ে শত শত লোককে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আফ্রিকারসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের বেশির ভাগই এই রায়কে সমর্থন করলেও আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং বেশির ভাগ আফ্রিকান সরকার এখন পর্যন্ত অভিমত প্রকাশে বেশ সংযত রয়েছে। আফ্রিকার প্রায় সব সরকার এবং সাধারণ মানুষ, অনেক আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা -এই আদালত আফ্রিকার-বৈরী। তাদের এমনটা মনে হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আদালত এখন পর্যন্ত তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের সবাই আফ্রিকান।  বেম্বাকে ২০০৮ সালে বেলজিয়ামে গ্রেফতার করে হেগে পাঠানো হয়। ২০১০ সালে সেখানেই তার বিচারকাজ শুরু হয়।

তবে আইসিসি অবশ্য নিজেকে আফ্রিকান-বিরোধী হিসেবে পাশ্চাত্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা এবং সিনিয়র আইন কর্মকর্তা জাঁ-জ্যাকস বাডিবাঙ্গা যথাক্রমে গাম্বিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। বিচারকেরা ছিলেন ব্রাজিল, কেনিয়া ও জাপানের এবং সবাই নারী।

ক্ষতিগ্রস্তদের আইনজীবী ম্যারি-এডিথ ডুমিজাম-লসন অবশ্য এই বিচারে খুশি। বেম্বা ও তার অনুসারীদের বিচারে ৫,২০০-এর বেশি লোক সাক্ষী দিয়েছিল। ম্যারি-এডিথ বলেন, বেশির ভাগ ধর্ষণ ও লুটতরাজ হয়েছিল প্রকাশ্যে, সম্মিলিতভাবে। এটা করা হয়েছিল, শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে।

রিজার্ভ চুরির অজানা কাহিনী

 

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা বাংলাদেশ সরকার জানতে পারে অনেক পরে। কিন্তু এর আগের ঘটনা অনেকের কাছে অজানা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বিষয়ে একটি চিত্র তুলে ধরে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এর আয়োজন চলে ২০১৫ সালের মে মাস থেকে। এই মাসে ফিলিপাইনের রিজাল কর্মাশিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের একটি শাখায় সন্দেহভাজন চারজনের নামে চারটি আলাদা ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এর প্রায় আট মাস পর আসল ঘটনার সূত্রপাত।

অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং এর জন্য ব্যাংকটির গভর্নর ও দুই ডেপুটি গভর্নরের অপসারণের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। আর ‘ব্যাপক মাত্রায় অযোগ্য’ আখ্যা লাভের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তার উল্লেখ অবান্তর। এরই মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি’ হিসেবে অভিধা পাওয়া ঘটনাটি এমন এক গোলকধাঁধা সামনে হাজির করেছে, যার উৎসানুসন্ধানের চেষ্টা করছেন ব্যাংকার, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

গত ৫ ফেব্রুয়ারির পর ব্যাংক, ক্যাসিনো, কম্পিউটার আর কোটি ডলারের সমন্বয়ে এমন এক নাটকীয়তায় ঘটনাগুলো উন্মোচিত হয়েছে, যা হলিউডি সিনেমা থেকে কোনো অংশে কম নয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তাবেষ্টিত লেনদেন ঘরের প্রিন্টারটি নষ্ট অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে কর্মকর্তারা আগের দিনের লেনদেনের তালিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হন। পরদিন কর্মকর্তারা ব্যর্থ হন সুইফট সিস্টেমে ঢুকতে, যেখানে বারবার এ বার্তা দেয়া হচ্ছিল যে, ‘একটি ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা পরিবর্তিত হয়েছে।’ এর পর ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল রোববার, যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির দিন। আর বাংলাদেশের জন্য সপ্তাহের শুরুর দিন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি গড়িয়ে যায় সোমবার পর্যন্ত। পুরো ঘটনাটিতে সময়ের ব্যবহার ছিল সুক্ষতা ও নৌপুন্যে ভরপুর। কারণ চীনা নববর্ষ উদযাপনের জন্য সোমবার ছিল ফিলিপাইনের সরকারি ছুটির দিন। আর এ সময়ের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও শ্রীলংকার এনজিওতে টাকা স্থানান্তর করা হয় মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। সেতু, বিদ্যুকেন্দ্র ও ঢাকা মেট্রোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের নামে এ অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ লেনদেনটি করেছে, কারণ তাদের তা করতে বলা হয়েছে। এভাবেই সুইফটের মতো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিগুলো কাজ করে থাকে। আর যেহেতু ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোয়  গেছে, সেহেতু দেশটির কর্তৃপক্ষ হারিয়ে যাওয়া ওই অর্থ শনাক্ত করতে পারেনি, আইনী জটিলতার জন্যে। কারণ ফিলিপাইনে ক্যাসিনোর ওপর অর্থ পাচাররোধী (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং) আইন প্রযোজ্য নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে ব্যাংকের (আরসিবিসি) শাখা থেকে ওই অর্থের সিংহভাগ উত্তোলন করা হয়েছে সেখানকার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ছিল নষ্ট।

এ সাইবার চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দায়িত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করা। লেনদেনের পুরো চক্রটিতে হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ কেউ জড়িত। অথবা একটি ম্যালওয়্যার, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা বিষয়ে চরম অবহেলা কিংবা হতে পারে গোটা নিরাপত্তা কাঠামোরই ত্রুটি। দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ব্যাংকিং খাতের লেনদেনের জন্য স্বয়ংক্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের নিরাপত্তা-বিষয়ক প্রশ্নটি। এ ঘটনা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রশ্ন হাজির করেছে, যা মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যের নিরাপত্তার মূলনীতির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর অনুমোদনের জন্য সুইফটের ওপর নির্ভর করে। আলোচ্য ঘটনায় স্বত্বভোগী অ্যাকাউন্টগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলের মাধ্যমে সুইফটই অনুমোদন দিয়েছে। যদিও সুইফট বার্তা পাঠানোর কোড চুরির তত্ত্বটি পুরো নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।

ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোয় গেছে। আর এটি বিস্ময়ের কিছু নয় যে, ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনের অধীন নয়। এ আইনী অস্ত্রের অনুপস্থিতিই হচ্ছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। এটি তদন্তকে অনেক জটিল করে তুলেছে। কারণ ক্যাসিনোগুলো তদন্তে অংশ নিতে বা সহায়তা করতে বাধ্য নয়। নীতিগতভাবে তদন্ত সেখানেই বন্ধ হয়ে যাবে, যেখান থেকে ওই অর্থ আর্থিক খাত থেকে বেরিয়ে গেছে, আর তা হারিয়ে যাবে অবৈধ অর্থ পাচার নেটওয়ার্কের অন্ধকারে।

১২টি সংস্থার তদন্তে কোনো ক্লু বের হয়নি। উদঘাটন হয়নি কোনো রহস্যও। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা তদন্ত এখনও সন্দেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তদন্তে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি তদন্ত সংস্থা, ফিলিপাইন সরকার, ফিলিপাইনের জড়িত ব্যাংক আরসিবিসি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার সন্দেহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরটিজিএস প্রকল্পকে ঘিরে। গোয়েন্দাদের ধারণা, অক্টোবরে এ সিস্টেমে কাজ করতে গিয়ে সুইফট শাখার তথ্য খোয়া গেছে। সেই তথ্য কাজে লাগিয়েছে অপরাধীরা। প্রথম দিকে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানাকে নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও পরে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি পরামর্শক হিসেবে দুই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ। এদিকে, নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর আইটি বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহাকে ফেরত পাওয়া গেছে। চুরির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর এ সম্পর্কে বক্তব্য রাখায় রহস্যজনকভাবে তিনি নিখোঁজ হন। এ ঘটনার পর তার পরিবার থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ তাও নেয়নি। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন গভর্নর ফজলে কবির।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি তিন সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গত ১৫ মার্চ গঠন করা হলেও ৮ দিন পর কমিটি গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছেন। এর আগে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। এই কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অর্ন্তবর্তীকালীন রিপোর্ট এবং ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে বলা হলেও এখনো তদন্ত কাজে কোন অগ্রগতি নেই বললেই চলে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। জানা গেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মার্কিন ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হবে কিনা সে প্রশ্নে আইনজীবীদের সাথে সলা-পরামর্শ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনাকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের চরম গাফিলতি বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চুরি যাওয়া অর্থ ফেরাতে আইনী লড়াইয়ের ভিত্তি গড়ে তোলা হচ্ছে।

ব্লুমবার্গের এক  প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আলোচিত এই অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের প্রায় আটশ কোটি টাকা নিউইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব টাকা ফেডারেল ব্যাংক থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায়। তবে হ্যাকারদের বানান ভুলের কারণে একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরও  প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার লেনদেন বানচাল হয়ে গেছে। জেরুজালেম-ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি সাইবারআর্কের একজন উর্ধ্বতন পরিচালক আন্দ্রে ডালকিন এক ইমেইলে ব্লুমবার্গকে বলেছে, ‘বানান ভুলের ওপর নির্ভরতা কোনো নিরাপত্তা নীতি হতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অ্যাকাউন্টের গতিবিধি যদি পর্যবেক্ষণ করত, তারা দ্রুতই অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত করতে পারত। আর এসব সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্তের জন্য তাদের তৃতীয় পক্ষের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরও করতে হতো না।’ টাকা খোয়া যাওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নিউইয়র্কের ফেডারেল ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের জন্য ফেডারেল ব্যাংকের বিরুদ্ধে এনেছেন অনিয়মের অভিযোগ। এ বিষয়ে আইনি লড়াইয়ের কথাও বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই পরিস্থিতিকে যোগ্যতার সঙ্গে সামাল দিতে পারেনি বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

ব্লুমবার্গের  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এমন একটি ব্যাংক ডাকাতি ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও তৎপর হওয়া  প্রয়োজন ছিল। এমন ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যেসব অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশের  প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশীক রিজার্ভের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে, তাদের জন্য এই ঘটনাটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অর্জুনা মাহেন্দ্রন সিঙ্গাপুরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এই ঘটনার পর নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে খতিয়ে দেখছে। ফেডারেল ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মেসেজিং সিস্টেমকেও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মূল চালিকাশক্তি হলো জনবল। তারা অলস হয়ে পড়ে এবং তারা বাজে অভ্যাস গড়ে তোলে।’

একই ধরনের আরও ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের ‘গভীর উদ্বেগ’ থাকা দরকার বলে মন্তব্য করেছে সিঙ্গাপুরের ডিলয়িট্টে টুশে থমাতসু কনসালট্যান্টের পার্টনার ভিক্টর কিয়ং। তিনি বলেছেন, ‘এটা ভয়াবহ। নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই যদি এমন ভুল থাকে, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোও হয়তো খুব বেশি সুরক্ষিত নয়।’ ক্যানবেরা-ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (এএসপিআই)  প্রকাশিত ২০১৫ সালের ‘সাইবার ম্যাচিউরিটি’ র্যাংকিংয়ে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো নিজেদের  প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে সুসঙ্গত সাইবার নীতিমালা চালু করেছে। তবে থাইল্যান্ড বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর  প্রতিরক্ষা আরও উন্নত হওয়া  প্রয়োজন বলে জানিয়েছে এএসপিআই। এই রাংকিং-এ বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে তাদের পরবর্তী রাংকিং-এ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এএসপিআইয়ের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক টোবিয়াস ফিকিন বলেছে, এটা কৌত‚হলোদ্দীপক যে বাংলাদেশ সরকার তাদের নিজেদের ব্যাংকের থেকে মনোযোগ সরাতে ফেডারেল ব্যাংকের দিকে আঙুল তুলেছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনার এক তদন্তকারীকে উদ্বৃত করে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনফরমেশন সিস্টেম কর্মীদের অগোচরেই জানুয়ারি মাসে ব্যাংকের সিস্টেমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ম্যালওয়্যার বা ক্ষতিকর সফটওয়্যার কোড। এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার নেই জানিয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখে হ্যাকাররা হানা দেয় ব্যাংকের সিস্টেমে। এএসপিআইয়ের টোবিয়াস ফিকিন বলেছে, ‘আমরা জানি না কীভাবে ওই ম্যালওয়্যার সিস্টেমে  প্রবেশ করানো হয়েছিল। তবে ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতি ও ব্যাংকের কর্মীদের ব্যাংকে আসা-যাওয়ার সব তথ্যই জানা ছিল হ্যাকারদের। সাইবার সিকিউরিটির  প্রসঙ্গে সবসময়ই সব থেকে দুর্বল স্থানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।’

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৭ : দেং জিয়াও পিং এর আবির্ভাব

আনু মুহাম্মদ ::

দেং জিয়াও পেং ( ২২ আগস্ট ১৯০৪- ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭) দীর্ঘসময় পার্টি বা সরকারের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত না থাকলেও মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর থেকে চীনের যাত্রাপথ নির্ধারণে তিনিই ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি। কৃষক পরিবারের সন্তান দেং ১৯২০-এর দশকে ফ্রান্সে কাজ করবার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পার করেন। এখানেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সাথে তাঁর পরিচয়। ১৯২৩ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। লংমার্চসহ পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেং নেতৃত্ব পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৫০ এর দশকে পার্টির মধ্যে মাওসেতুং এর অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন তিনি। ৬০ দশকের শুরুতে লিউশাও চী ও দেংজিয়াও পিং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি নেন যা উচ্চলম্ফকালীন নীতি থেকে ভিন্ন। এর বেশকিছু জনপ্রিয়তাও পেতে থাকে। তবে তাঁদের অর্থনৈতিক নীতিতে ক্রমেই মাও-এর রাজনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থানের সাথে পার্থক্য ধরা পড়তে থাকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে সেই কারণেই তাঁরা সমালোচনার মুখে পতিত হন এবং বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। দেংকে সেইসময় কয়েকবছর এক খামারে কাজ করতে হয়।

চৌ এন লাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে যখন সক্রিয়ভূমিকা থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন, তখন বেশ কয়বছর কোণঠাসা অবস্থায় থাকা দেং জিয়াও পিং আবারও সামনে আসেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালীন সময়ে সংশোধনবাদী হিসেবেই অভিহিত হলেও ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে দেং উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ক্রমে মাও সে তুং এর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হচ্ছেন এরকম ধারণা তৈরি হয় একের পর এক বিভিন্ন দায়িত্ব প্রাপ্তি এবং কার্যত অবস্থানের পদোন্নতিতে। ১৯৭৫ এর জানুয়ারিতে চৌ এন লাই যখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হন, তখন অবস্থানগত কারণেই দেং সরকার পরিচালনার কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করেন। তিনি কার্যত সরকার ও পার্টি পরিচালনা করতে থাকেন, তাছাড়াও খুবই কম সময়ের ব্যবধানে একাধারে সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ, কমিউনিস্ট পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় মিলিটারী কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো লাভ করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে  দেং-এর এই দ্রুত আরোহণ,  কার্যত পুনর্বাসন, পার্টির অনেকের জন্যই বিশেষত যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন তাঁদেরকে  বিস্মিত ও হতভম্ব করে। অনেক চীন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চৌ-এর পরামর্শেই মাও সে তুং দেংকে এসব পদে অধিষ্ঠিত করতে সম্মত হন, কেউ কেউ মনে করেন মাও দেংকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসেন লিন পিয়াও-এর অনুসারীদের ক্ষমতা চূর্ণ করবার উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে, ‘চার কুচক্রী’ নামে অভিহিত নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম নিয়ে মাও অসন্তুষ্ট  ছিলেন, এবং  তাঁর কাছে মনে হয়েছিলো দেং অর্থনীতির বিকাশধারার জন্য যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। তবে দেংকে আত্মসমালোচনা করবার আহবান জানানো হয়।

১৯৭৬ সালের ৮ জানুয়ারি চৌ এন  লাই  ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ জানুয়ারি দেং চৌ এর বিদায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। পার্টির প্রবীণ নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত থাকলেও মাওসেতুং উপস্থিত ছিলেন না। চৌ এন লাই এর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী  পদ শূন্য হয়। এই পদের জন্য বিবদমান দুই পক্ষ তখন প্রার্থী, একদিকে ‘চার কুচক্রী’ বলে কথিত বাম লাইনের ব্যক্তিবর্গ, অন্যদিকে ডান লাইনের অনুসারী বলে কথিত দেংজিয়াও পিং। মাও এদের কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে এই পদে নিযুক্ত করেন অপেক্ষাকৃত অপরিচিত হুয়া গুয়ো ফেংকে। পার্টির মধ্যে দেংজিয়াও পিং বিরোধী প্রচার সেসময় আবারও জোরদার হয়। ধারণা করা হয়, এর পেছনেও মাও এর সমর্থন ছিলো। ১৯৭৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পার্টির ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দেংকে অপসারণ করে পররাষ্ট্র দফতরে নিয়োগ দেয়া হয়। ৩ মার্চ মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে বক্তব্য রাখেন এবং দেং-এর ভূমিকার সমালোচনা করেন।

প্রকৃতপক্ষে মাও এর মৃত্যুর পরই শুরু হয় দেং আমল। যার ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান চীন।

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (পর্ব-৭)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী::

গণ্ডি পার হবার প্রস্তুতিটা চলছিল। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনীতির অনুশীলন, সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা সব দিক দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এই যুবক। দেখা যাচ্ছে ভলিবল, বাডমিন্টন, টেনিস সব কিছুই খেলছেন তিনি। অংশ নিচ্ছেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়, বক্তৃতা দিচ্ছেন জনসভাতে; সভাপতিত্ব করছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যাতায়াত করছেন পাঠাগারে; আর ম্যানিফেস্টো, বিবৃতি, প্রস্তাব, কার্যবিবরণী – এসব লেখা, টাইপ করা, ছাপিয়ে আনা, বিতরণ করার ব্যাপারে তিনি থাকছেন সবার আগে। তাঁর অতিশয় আপনজন ডা. করিমের সঙ্গে এক পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটেছে, করিম চলে গেছেন কমিউনিস্টদের সঙ্গে, তাজউদ্দীন যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে, তবে ১৯৬২-তে আইউব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় দুজনেই কারাবন্দী হয়েছেন এবং সৌভাগ্যক্রমে দুজনের থাকার ব্যবস্থাও হয়েছে একই সেলে। করিম জেলে ছিলেন পাঁচ মাস, আরও অনেকেই তখন জেলে; তাঁদের সাহচর্যে করিমের বন্দী জীবন নিরানন্দে নয়, বেশ আনন্দেই কেটেছে। তাস খেলা ছিল নিত্যদিনের বিনোদন। করিম দেখতেন তাজউদ্দীন একা একা দাবা খেলছেন, কারণ সঙ্গীদের মাঝে কেউই দাবা খেলতে জানত না। করিমের ভাষায়, ‘‘সে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে একা একা কেমন করে দাবা খেলত এটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। প্রতিযোগিতা ছাড়া খেলা জমে? নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা এ কেমন? তাজউদ্দীনের মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার একটা প্রচেষ্টা হয়তো ছিল।’’

হয় তো নয়, অবশ্যই ছিল। রাজনীতির এই কর্মী সব সময়েই চেষ্টা করতেন কীভাবে নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন। কারাবন্দী অবস্থায় এই দুই বন্ধুর ভেতর রাজনীতির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উভয়েরই আগ্রহ কৃষকের মুক্তির প্রশ্নে। করিম বলেছিলেন, ঋণসালিসী বোর্ডের মাধ্যমে ফজলুল হক কৃষককে ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। শুনে তাজউদ্দীন মন্তব্য করেছেন,

মুক্তি না ছাই করে গেছেন। কৃষকের মুখে দুধের বদলে চুষনি ঢুকিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত তাদের অধিকার আদায়ে, আপাতত সান্তনা দিয়ে কৃষকের বারটা বাজিয়েছেন।

এমন উক্তিতে করিম চমকে উঠেছেন, বুঝতে পেরেছেন যে তাজউদ্দীন অন্যদের তুলনায় গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত। তাঁর লক্ষ্য সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তন। ডা. করিমের সময় সময় মনে হতো যে তাজউদ্দীন তাঁদের সমবয়স্ক নন, অগ্রজ।

মওলানা ভাসানীর প্রতি আকর্ষণ সত্তেও তাজউদ্দীন প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেননি। স্মরণীয় যে তাজউদ্দীন ছাত্র রাজনীতিতে নয়, উৎসাহী ছিলেন জাতীয় রাজনীতিতে, যদিও ফজলুল হক মুসলিম হলে যে-নির্বাচন হতো তাতে প্রার্থী না হলেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন, এবং একবার আক্ষরিক অর্থেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে একটানা সাতদিন গোসল না-করে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন, রাজনীতিসচেতনতার তাড়নাতে। ভাসানীর দলে যোগ না-দেয়ার একটি কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম’ পরিচয়। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধুরা সবাই তখন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় কারণ, সে-সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে নেতৃস্থানীয় যাঁরা ছিলেন তাঁদের কারো কারো আচরণে ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ প্রকাশ পাচ্ছিল বলে তাঁর অনুভব।

পিওপলস ফ্রিডম লীগ এগোয় নি, এরপরে ডেমোক্রেটিক ইউথ লীগ গঠনের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কমরুদ্দিন আহমদ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান নি, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে উদ্যোক্তারা প্রো-কমিউনিস্ট। পরবর্তীতে, ১৯৫১ সালে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। সংগঠনটি গঠনের সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে একটি যুব সম্মেলনের ভেতর থেকে। সরকারী বাধার কারণে এই সম্মেলন ঢাকায় হতে পারেনি; উদ্যোক্তারা তখন নদীর অপর পাড়ে জিঞ্জিরায় চলে যান, কিন্তু সেখানেও পুলিশী হস্তক্ষেপ ঘটে। তখন তাঁরা বুড়িগঙ্গায় চারটি নৌকায় বসে সম্মেলন করেন। কাকতালীয় অবশ্যই, তবু মিলটা বোধ করি তাৎপর্যহীন নয় যে চীনে কমিউনিস্টদের কার্যক্রমের শুরুর দিকে সাংহাই নগরীতে গোপন বৈঠক করবার সময় পুলিশ তাঁদের আস্তানাটি ঘিরে ফেলতে যাচ্ছে টের পেয়ে মাও সে তুঙ-ও তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বের হয়ে গিয়ে নৌকাতে বৈঠকের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁরা অবশ্য এর পরে আর শহরে ফেরেননি, যুবলীগের সদস্যদের পক্ষে না-ফিরে উপায় ছিল না।

যুবলীগে অলি আহাদ, তোয়াহা, তাজউদ্দীন-সবাই ছিলেন। বায়ান্নর আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক দল হিসাবে গড়ে ওঠে নি। না-ওঠার একাধিক কারণ ছিল। সংগঠন ও কর্মীদের সবাই ছিলেন তরুণ, সফল নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন কেউ ছিলেন না, তদুপরি তাঁদের ভেতর মতাদর্শিক ঐক্যের বন্ধনটা যে দৃঢ় ছিল তাও নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ দৃশ্যমাণ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ, তিনি লিখেছেন,

১৯৫১ সালে কারামুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করিবার নিমিত্ত সমগ্র দেশব্যাপী অবিরাম কর্মীসভা, জনসভা ইত্যাদি করিয়া যাইতেছিলেনমুসলিম লীগ মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করিয়া আবার কোথাও  গুন্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মসূচি পালনে সর্বপ্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে থাকেকিন্তু জনতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অবিচল আস্থা স্থাপন করিয়া ক্রমশঃ আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে কাতারবন্দী হইতে শুরু করে

অবশেষে ১৯৫৩ সালে তাজউদ্দীন আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। একই সময়ে অলি আহাদও যোগ দিয়েছেন। তাজউদ্দীন ওই বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর তিনি যুক্ত ফ্রন্টের মনোনয়ন পেয়ে ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন। কয়েক মাস পরে ৯২-ক ধারা জারি হলে গ্রেফতার হন; বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৮-তে সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাঁকে জেলে যেতে হয়; এবং পরের বছর মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তাজউদ্দীনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য; তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরের বছর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযানে অংশ নেন। ১৯৬৬-তে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের যে-সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফার ঘোষণা দেন তাতে তাজউদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। ৬-দফার রচনায় অনেকেই যুক্ত ছিলেন; তবে এর চূড়ান্ত রূপটি তাজউদ্দীনই দেন। ওই বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এরপরে তিনি গ্রেফতার হন, মুক্তি পান ১৯৬৯-এ, এবং রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিলে অংশ নেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যা। তাজউদ্দীন আহমদের তখনকার ভূমিকা আমাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।

প্রশ্ন থাকে কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। (চলবে)

 

সুন্দরবন : কেন আত্মবিনাশী সব আয়োজন

এম. জাকির হোসেন খান ::

একটাই সুন্দরবন, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশী। এ-বনভূমির দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে, বাকীটুকু ভারতে। বাংলাদেশ অংশে মানুষের আগ্রাসনে সুন্দরবন ক্রমাগত সংকুচিত হলেও শত শত বছর ধরে বাংলাদেশ সহ এ অঞ্চলের মানুষ, প্রাণী এবং প্রকৃতিকে ঘূর্ণিঝড় সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মায়ের মতো রক্ষা করছে। জীববৈচিত্রের এক বিপুল সম্ভার সুন্দরবন ৪৫৩টি প্রজাতির প্রাণীসহ নানা বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল এবং একইসাথে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে সুরক্ষা প্রদানকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগার’র সংখ্যা একসময় ৪০০-৪৫০টি হলেও চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বর্তমানে তা ১০০-এর কাছাকাছি সংখ্যায় দাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনের অংশ বিশেষকে ১৯৯২ সালের ২১ মে ‘রামসার এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। তাছাড়া ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এলাকা হিসেবে সুন্দরবনের বেশ কিছুটা অংশ ইউনেস্কো’র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

সুন্দরবন রক্ষায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারও যৌথ উদ্যোগে ২০১২-এর ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারত এক সমঝেতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অথচ চুক্তির বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত, একপেশে, অস্বচ্ছ এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে সুন্দরবনের কাছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার সব উদ্যোগ সম্পন্ন। সুন্দরবন-সংলগ্ন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ১৬০ কোটি ডলারের কাজ পায়। অথচ ২০১৫ এর ১৩ মার্চ ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল তথ্য বিকৃতি ও জালিয়াতি এবং প্রতারণার দায়ে কর্ণাটক রাজ্যে এনটিপিসি’র প্রস্তাবিত একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত করে দেয়।

২০১৬’র ফেব্রুয়ারিতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও সুন্দরবনের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিবেচনা করে ইতিমধ্যে রামসার কর্তৃপক্ষ, ইউনেস্কো এবং আই.ইউ.সি.এন ২০১২ সাল থেকে সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। উদ্বেগ আমলে তো নেয়া হয়ই-নি, এমনকি রামসার কনভেনশন সচিবালয় এবং ইউনেস্কো একাধিকবার সরকারের কাছে ইআইএ প্রতিবেদন চাইলেও সরকার তা দিতে অপারগতা জানায়। এ প্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ ২০১৬ ইউনেস্কো কার্যালয় থেকে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০১৫ এর ১২ ডিসেম্বর যে প্যারিস চুক্তিতে বিশ্ববাসী ঐকমত্য হয়, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যাপক ভিত্তিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বিশ্বের প্রধান চারটি কার্বন নিঃসরনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং ভারত সহ শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করে। অথচ সুন্দরবনের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এবং ওরিয়ন গ্রুপ বেসরকারিভাবে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে শুধুমাত্র সুন্দরবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না, আখেরে কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকির অন্যতম শিকার বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনের অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত অবদানের মূল্য লাভ-ক্ষতির হিসেবে ধরা হয়নি। ১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের আইলা পর্যন্ত সময়ে ৪৭৮টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছাস এবং ঘূর্ণিঝড় তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৭৯৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে ৩২৯টি প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে এবং স্বাধীনতার পর ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছাস হয়েছে। সুন্দরবন না থাকলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার হিসাব নীতি নির্ধারকরা করেনি অর্থাৎ তাগিদ অনুভব করতেও দেয়া হয়নি।

পরিবেশ আইন ১৯৯৫ এর ধারা ৫-এর অধীনে সরকারি প্রজ্ঞাপনমুলে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন বা ‘লাল চিহ্নিত এলাকা’ এলাকা ঘোষণা করায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৭ এর ৭(৪) ধারা মতে সুন্দরবন এলাকায় কোন শিল্প স্থাপনে পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) সাপেক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘লোকেশন ছাড়পত্র’ এবং ‘পরিবেশ ছাড়পত্র’ নেয়ার বাধ্যতা রয়েছে। কিন্তু পূর্ণ ইআইএ ছাড়াই পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১১ এর ২৩ মে এ প্রকল্পকে শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিক ছাড়পত্র দেয়া হয়।  অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১২-এ বলেছিল যে, ওই অধিদফতর সুন্দরবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্র্যের উপরে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ক্ষতির ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীও সম্প্রতি স্বীকার করেন। অথচ ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর ৫৯টি শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে ফরমায়েসি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা- ‘ইআইএ’ অনুমোদন করে প্রকল্প কাজ শুরু করতে চাচ্ছে। কি কারণে বা কার চাপে পরিবেশ অধিদপ্তর তার এ অবস্থান পরিবর্তন করলো তার জবাব এখন পর্যন্ত মেলেনি। এসব শর্ত প্রতিপালিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ এসব অনেক শর্তই পরে আর মানা হবেনা। উল্লেখ্য, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক এক পত্রে উল্লেখ করেন যে, ‘সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে’। উল্লেখিত পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার আহবান জানান। অথচ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে সুন্দরবনের আইনগত অভিভাবক বন বিভাগের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে বিতর্কিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা ইআইএ’র ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলা রামপালের সরকারি- বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যে শর্তে প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়েছিলো পরিবেশ অধিদপ্তর সে শর্ত ভঙ্গ করা হলেও, পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই থেকে সালফার-ডাই-অক্সাইড ছড়ানোর কারণে বন্য-গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে। ইআইএ অনুযায়ী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭.২০ লক্ষ টন কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহণের ফলে সুন্দরবন ও এই বনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর কী ক্ষতি হবে সমীক্ষায় বলা হয়নি। বায়ূ দূষনের ক্ষতিকারক উপাদানগুলি মেঘমালার মাধ্যমে ছাড়াবে। রাতে জাহাজ চলাচল এবং মালামালা খালাসের ফলে সৃষ্ট শব্দ ও আলোর দূষণে সুন্দরবনে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে তাও ইআইএ প্রতিবেদনে বিবেচনায় রাখা হয়নি। নাব্যতা হ্রাস পাওয়া পশুর নদীর সংকট বাড়বে। কয়লা পরিবহনের সময় জাহাজ ডুবি হয়ে প্রতিবেশ এবং পানি দূষণ যে নিয়মিত ঘটবে তা সর্বশেষ শ্যালা নদীতে লঞ্চ ডুবিতে আবারো স্পষ্ট হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য একেকটি কার্গোতে ৮-১০ হাজার টন কয়লা পরিবহণ করা হবে-যা ডুবলে দূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

ইআইএ সম্পাদনের আগেই মাটি ভরাট করাসহ অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু; এমনকি ইআইএ সম্পাদনে কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ, শুনানি ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। আর প্রকল্পের ইআইএ চূড়ান্ত করার সময় নিয়ম রক্ষার জন্য যে গণশুনানি করা হয় যেখানে বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরলেও সেগুলো অগ্রাহ্য করে ইআইএ চূড়ান্ত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে নির্মোহভাবে ইআইএ সম্পাদনের নিয়ম থাকলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান সিআইজিআইএস কর্তৃক সম্পাদনের ফলে স্বার্থের সংঘাত থাকায় এটি নিরপেক্ষতার মানদন্ড অর্জন করতে পারে নি।

শুধু তাই নয়, প্রকল্প প্রণয়ণ এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের অস্বচ্ছতা স্পষ্ট, এমনকি যৌথ অংশিদারিত্ব বা ঋণ চুক্তি জনগণের জ্ঞাতার্থে প্রচার করা হয়নি। প্রকল্প বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে করা একাধিক রিট আবেদনের নিষ্পত্তি না করেই ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়; আবার ভূমি অধিগ্রহণের আগেই স্থানীয় জনগণের সম্পত্তি এবং চিংড়ি ঘের ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা দখল করে নেয়। কারন, ইআইএ প্রতিবেদনে সুন্দরবনের সকল এলাকা বিবেচনায় নেয়া হয়নি, যেমন রামপাল প্রকল্প এলাকা থেকে সুন্দরবন (ডাংগামারী) এলাকার দূরত্ব ৯.৬ কিলোমিটার যা বাফার জোনের ভেতর।

উল্লেখ্য, ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান এ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীব বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোন ধরণের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। এ প্রেক্ষিতে ভারতের মধ্যপ্রদেশে জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষি জমির উপর এনটিপিসি’র কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রিয় গ্রীণ প্যানেল এনটিপিসি’র ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। সুতরাং, সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা যৌক্তিক হয় কিভাবে?

রামপালে প্রকল্প পরিচালনাসহ অন্যান্য কাজে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯,১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে, যেটিকে নদীর মোট পানি প্রবাহের ১% এরও কম দেখানো হলেও তথ্যদাতাদের মতে, পানি প্রবাহের যে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে তা ২০০৫ সালের। তথ্যদাতাদের মতে পরিশোধন করা হলেও পানির তাপমাত্রা, পানি নির্গমনের গতি, দ্রবীভূত নানা উপাদান পশুর নদী, সমগ্র সুন্দরবন তথা বঙ্গোপসাগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ২০১০ সালে সরকার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন পশুর নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৪০ হেক্টর, ৫৬০ হেক্টর ও ১৭০ হেক্টর নদী ও খালের জলাভূমি জলজ প্রাণী বিশেষত ‘বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন’ সংরক্ষণের স্বার্থে ‘‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য” ঘোষণা করেছে।

ইআইএ প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকায় কোন কোন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে তার কোনো তালিকা দেওয়া হয়নি। প্রকল্পের ফলে এসব উদ্ভিদ ও প্রাণী কোন ক্ষতির সম্মুখীন হবে কি না, তাও উল্লেখ করা হয়নি। ইআইএ প্রতিবেদনে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উঠে আসেনি। ইআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-বছরের এই ৪ মাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হবে (ইআইএ, পৃষ্ঠা-২৭৫)। এখন বলা হচ্ছে, বছরে কখনো সুন্দরবনের দিকে বাতাস প্রবাহিত হবে না। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি নানা কারণেই এই চারমাস ছাড়াও বছরের অন্য সময়েও বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানিদূষণ, শব্দদূষণ, ছাইয়ের দূষণ সারা বছর ধরেই ঘটবে যার সঙ্গে বাতাসের দিকের কোনো সম্পর্ক নেই।

ইআইএ প্রতিবেদনে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে প্রতারণা করা হয়েছে। সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দুষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়- যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক না কেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চললে শব্দ দূষণ হবে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে, ফলে সুন্দরনের পশুর নদী দূষণের ঝুকি থাকবেই, সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে দিনে-রাতে কয়লার জাহাজ চলাচলের ফলে শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, আলো দূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।

উভয় ইআইএ প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে মাটি কাটা, মালামাল পরিবহণ, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। বরং উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে মাটি পানি বাতাস দূষিত হয়ে সুন্দরবন ও তার চারপাশের নদী, খাল ও জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জেলে, কৃষক, বাওয়ালী, মউয়ালসহ কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে মামলায় আসামী করাসহ বিভিন্ন প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি প্রদান ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে ইতোমধ্যেই এবং ভূমি অধিগ্রহণের ফলে অধিক সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতিও হয়েছে। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের গাছ কাটা, বনের জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বন্যপ্রাণী শিকার কিংবা বিষ দিয়ে মাছ মারার মতো ক্ষতিকর কর্মকান্ড সাধারণ জনগণ নয় ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট জলদস্যু ও প্রভাবশালীরা জড়িত।

শুধু তাই নয়, তহবিল পাওয়ার আগেই প্রকল্প কার্যক্রম শুরু হলেও ইউনেস্কো’র উদ্বেগ প্রকাশ করায় ২০১৪’র ডিসেম্বরে নরওয়ের দুটি পেনশন ফান্ড রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্রে বিনিয়োগে সাড়ে ৫ কোটি ডলার প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়,  সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় ফ্রান্সের বৃহৎ তিন ব্যাংক বিএনপি পারিবাস, সোষিতে জেনারেলি ও ক্রেডিট এগ্রিকোলও অর্থায়নে অসম্মতি জানালেও সরকার ভারতীয় কোম্পানিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে কি কারণে নিযুক্ত করেছে তা বোধগম্য নয়। বিএনপি পারিবাস ২০১৫ এর ডিসেম্বরে মন্তব্য করে, ‘’The analysis shows that serious deficiencies in project design, planning, and implementation and due diligence obligations render the project non-compliant with the minimum social and environmental standards established by the Equator Principles, as well as the International Finance Corporation’s Performance Standards”.

ইআইএ প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকাকে গ্রাম হিসাবে দেখানো হয়েছে প্রকল্পের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার (এসএএইচআর) প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রকল্প স্থান পরিদর্শন এবং ইআইএ পর্যালোচনা করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘এ-প্রকল্পের ‘ইআইএ’ নানা দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে এ-‘ইআইএ’ করা হয়নি।

ভারতের সাথে নৌসহ সব ধরনের ট্রানজিট চুক্তির পর পরই শুধু কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপনে দেশি বিদেশি কোম্পানি যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে’। অথচ সুন্দরবন সুরক্ষায় ভারত সরকার কি করছে তা জানতে সে দেশের জাতীয় পরিবেশ আদালত স্বঃপ্রণোদিত আদেশে বলেছে, “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কেমন, নদী বা খাঁড়িতে দুষিত ডিজেল ব্যবহার হয় কি-না, সেখানে বেআইনী ইট-ভাটা চলছে কি-না, বন এলাকায় অবৈধ হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করা হয়েছে কি-না, ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানানো হোক। একই সাথে আদালত সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে অবশ্যই স্যাটেলাইট ছবি থাকতে হবে”। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও এ ধরনের স্বঃপ্রণোদিত উদ্যোগ নিয়ে প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনকে রক্ষায়ও উদ্যোগী হবেন।

জনপ্রতি মাত্র ৮ওয়াট বিদ্যুত যা একটি এনার্জি সেভিং বাল্ব জ্বালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়,  সেজন্য দেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ সুন্দরবন ধ্বংস অর্থাৎ দেশের স্বার্থ বিসর্জন কখনোই মেনে নেওয়া যায়না, যাবে না।

স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা

হায়দার আকবর খান রনো ::

এই নিবন্ধের শিরোনামে স্বাধীনতা সংগ্রাম কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ বললে ’৭১ সালের নয় মাসের সময়কালের মধ্যে আলোচ্য প্রসঙ্গটি সীমাবদ্ধ থাকে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, আরো আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক চেতনা থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তরণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উস্মেষ, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ডাক এবং সর্বশেষ পর্যায়ে মহান সশস্ত্র যুদ্ধ – সব কয়টি পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কথাটি গ্রহণ করলে। ’৪৭ থেকে ’৭১-এর প্রতিটি পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের অবদান বিশাল এবং সেটাই স্বাভাবিক। শ্রেণী শোষণ থেকে আরম্ভ করে সব ধরনের শোষণ, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, কমিউনিস্টরাই সর্বকালে সর্বদেশে লড়াই করে এসেছে। বুর্জোয়া নেতৃত্বও নানা ধরনের সামাজিক অবিচার, লিঙ্গ বৈষম্য ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু শ্রেণী স্বার্থের কারণে তারা প্রায়শ দৃঢ়তার সঙ্গে লড়তে পারে না, মাঝপথে আপোষ করে।

অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসও তাই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এসেছিল ভারতের বুর্জোয়ার সঙ্গে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের আপোষের মাধ্যমে দেশটিকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত করে, পাকিস্তান নামক এক আজব ধর্মভিত্তিক দেশ তৈরি করে। ভারতের ইতিহাসবিদগণের অধিকাংশই ভারতের স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসকে। মহাত্মার নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের বিরাট গুরুত্বকে অস্বীকার করবো না। কিন্তু এর পাশাপাশি আরো দুটি স্রোত ছিল যাকে অস্বীকার করা হবে ইতিহাসকে খন্ডিতভাবে দেখা। একটি ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবল স্রোত, ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে সূর্যসেন ও পরে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র যুদ্ধ যার অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি স্রোত ছিল শ্রমিক-কৃষকের লড়াই যার নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা।

একইভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল অবদানকে উপেক্ষা করার একটি প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অথবা মিডিয়ার প্রচারের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বামপন্থীদের অবদানকে হয় অস্বীকার করেন অথবা যতোটা সম্ভব ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। একথা অস্বীকার করা যাবে না, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদের বিশাল জাগরণ ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিস্ময়কর বিজয় এবং ছয় দফার প্রতি তার অনমনীয় অঙ্গীকার এবং ১৯৭১-এর মার্চের ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চের ভাষণ সব কিছুই জাতিকে দ্রুত স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবের মতো অতো বিশাল মাপের নেতৃত্বও আর আসেনি। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ’৭১-এর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সবটাই আওয়ামী লীগের একক কৃতিত্ব বলে যে দাবি তা ইতিহাস বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে শেখ মুজিবের বিপরীতে জিয়াউর রহমানকে দাঁড় করানোর যে প্রবণতা তা নেহায়েতই হাস্যকর। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তার যেটুকু ভূমিকা ছিল সেটুকু স্বীকার করতে আমাদের কার্পণ্য থাকা উচিত নয়। শেখ মুজিবের নাম করে তিনি যে রেডিও ভাষণ দিয়েছিলেন (২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল, চট্টগ্রাম), তা সেই সময় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু একজন  মেজর ডাক দিলেন আর সবাই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল গোড়া থেকেই। এখানে বামপন্থী বলতে আমি কমিউনিস্ট পার্টি এবং মওলানা ভাসানীকে বোঝাচ্ছি। মওলানা ভাসানী একদা মুসিলম লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান-পরবর্তীকালে ভাসানীর যে উত্তরণ ঘটেছিল তাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের সমর্থক ও প্রচারক এবং কমিউনিস্টদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তাই পাকিস্তান আমলে ভাসানীই ছিলেন সব বামপন্থীর নেতা। ষাটের দশকে কমিউনিস্ট শিবিরে বিভক্তি ও বহুধা বিভক্তি এসেছিল। কমিউনিস্টদের কোনো কোনো অংশের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্কের অবনতিও হয়েছিল। আবার কমিউনিস্টদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্বও উপস্থিত করেছিল। এই সব কারণে বুর্জোয়া ইতিহাসবিদ ও বুর্জোয়া লেখক এবং মিডিয়ার পক্ষে সহজ হয়েছিল বামপন্থীদের সম্বন্ধে একটি নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরে ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করা। এই প্রবন্ধের খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বামপন্থীদের ভূমিকা কিছুটা হলেও তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

দুই.

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যে পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল এবং যে পাকিস্তানের পক্ষে এই বাংলার মুসলমান জনগণ রায় প্রদান করেছিল ১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে ভোটদান মারফত, সেই পাকিস্তান সম্পর্কে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দ্রুতই মোহ ভাঙ্গতে শুরু করে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে অনেকটা কলোনির মতো ভাবতে শুরু করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও লুণ্ঠন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন- এগুলো সব শ্রেণীর মানুষের অভিজ্ঞতায় আসতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও সংগঠিত হতে থাকে। পাকিস্তান আমলের প্রথম পর্বেই গড়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলন। বাঙালির ভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়া এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে মতলব এটেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা একেবারে আপনাআপনি হয়নি। ভাষা আন্দোলনের পেছনেও ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টি। সামনের কাতারে থেকে যারা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে তাদের অধিকাংশ বামপন্থী শিবিরের সঙ্গেই ছিলেন।

স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গটি প্রায় প্রথম থেকেই উত্থাপিত হয়েছিল। সেক্ষেত্রে এককভাবে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৪৮ সালেই মওলানা ভাসানী প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদে প্রদেশের জন্য অধিকতর ক্ষমতার দাবি উত্থাপন করে বলেন, ‘ব্রিটিশের শাসন মানি নাই, এবারও কেন্দ্রের হুকুমদারী মানবো না।’ ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল সেই দলের সেই সময়ের কর্মসূচিতেও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছিল। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগেই দলটির নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণেরও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উত্তরণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই রকম একটার পর একটা পথ অতিক্রম করেই চব্বিশ বছরের মাথায় এসে জনগণ প্রস্তুত হয়েছিল সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে- যে পাকিস্তানের জন্য একদা এই দেশের জনগণই ভোট দিয়েছিল।

১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রায় একই সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দলে যোগদান করেন। তার আগে তিনি করাচিতে বসবাস করছিলেন। সেখানে তিনি জিন্নাহ মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি বিবৃতির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে দাবি করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোন নেতৃত্ব ও কোন শ্রেণীর কি ধরনের ভূমিকা ছিল তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই সব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন ও ২১ দফা দাবি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, যদিও সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা ফজলুল হকের বিরোধিতার কারণে যুক্তফ্রন্টে কমিউনিস্ট পার্টিকে নেয়া হয়নি। ২১ দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্ব সহকারে এসেছিল।

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে সমঝোতা করে মাত্র ১৩ জন সংসদ সদস্য নিয়েও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি বোল পাল্টালেন এবং আওয়ামী লীগের এতদিনকার মেনিফেস্টোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। একটি হলো বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে। আরেকটি হলো স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে। সোহরাওয়ার্দী সাম্রাজ্যবাদী সামরিক চুক্তি যথা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সিয়াটো-সেন্টোর সমর্থনে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের দালালি করেছিলেন। মওলানা ভাসানী নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ভাসানী ও বামপন্থীরা ছিলেন বরাবরই দৃঢ়ভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। বাঙালি বুর্জোয়া নেতৃত্ব কখনোই এতো দৃঢ়তার সঙ্গে ও এতো স্পষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিতে পারেনি।

স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে মওলানা ভাসানী ও তার কমিউনিস্ট বন্ধুরা বরাবরের মতোই দৃঢ় ছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী বললেন, পাকিস্তানের সংবিধানে নাকি ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হয়েছে। জনগণকে বোকা বানানোর এবং জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে দেয়ার এটা ছিল অনৈতিক কৌশল। সেই সময় বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী যে ঐতিহাসিক ‘আসসালাম ওয়ালাইকুম’ উচ্চারণ করেছিলেন সেটাই ছিল প্রথম প্রকাশ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার হুমকি। যদি ঐতিহাসিকভাবে বিচার করতে হয় তাহলে দেখবো যে এটাই ছিল প্রথম স্বাধীনতার ডাক। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য সময় তখনো প্রস্তুত ছিল না। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ব্যাখ্যা করে খুবই র‌্যাডিক্যাল ছয় দফা পেশ করেছিলেন তখন তা সারাদেশে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিল। অথচ ১৯৫৬ সালে দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিনের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান উপরোক্ত দুটি প্রশ্নেই সোহরাওয়ার্দীর সমর্থনে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে ভাসানীকে ত্যাগ করতে হলো নিজের হাতে গড়া দল এবং তিনি গঠন করলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা সংক্ষেপে ন্যাপ।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ছয় দফা দেয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে দৃঢ় ছিল না। অন্যদিকে ভাসানী ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবিতে ছিল অবিচল। ষাটের দশকে আন্তর্জাতিকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হলে, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু কমিউনিস্টদের সব অংশ পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন।

১৯৬৬ সালে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল। সুখেন্দু দস্তিদার-মহম্মদ তোয়াহা-আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন মার্কসবাদী লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে (১৯৬৭) গৃহীত কর্মসূচিতে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার’ শ্লোগান তোলা হয়েছিল। এই প্রথম কোনো একটি পার্টি তার লিখিত দলিলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ষাটের দশকে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেখানে বলা ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে একই সঙ্গে বিপ্লব হবে না। তার মানে প্রকারান্তরে কমিউনিস্টদের উভয় অংশেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বতন্ত্রভাবে বিপ্লবের কথা ভেবেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীন হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, এমন ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন বামপন্থীরাই। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি তুলে ধরার পর আওয়ামী লীগের তরুণ অংশের মধ্যে একটা নতুন অবস্থা তৈরি হয়েছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

’৬৮-’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উল্লম্ফন ঘটেছিল। কিন্তু তখনো প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক আসেনি। অবশ্য সেই সময় কমিউনিস্টদের বিভিন্ন অংশ এবং তাদের ছাত্র সংগঠনসমূহ স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার শ্লোগান তুলেছিলেন। সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন বাংলার স্বাধীনতাকে মূল কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের একাংশের নেতৃত্বে পল্টনের জনসভা থেকে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’র কর্মসূচি প্রকাশ্যে উত্থাপন করা হয়েছিল। এটাই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। এর জন্য উক্ত সভায় বক্তৃতা করার অপরাধে সামরিক আদালত কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননকে সাত বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করেছিল, তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করে। একইভাবে মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ এক বছর কারাদন্ডের সাজা লাভ করেছিলেন (অনুপস্থিতিতে)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্র এই ভাবেই প্রস্তুত হয়েছিল এবং সেখানে যে বামপন্থীদের বিশাল ভূমিকা ছিল তা ভুলে গেলে অথবা তাকে ছোট করে উপস্থিত করলে তা হবে ইতিহাসকে অস্বীকার করা। আজকাল ইতিহাস বিকৃতির কথা উঠছে নানাভাবে। বড় বড় বুর্জোয়া দল নিজের মতো করে ইতিহাস লিখতে চায়। তার মধ্যে সত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ আছে। বুর্জোয়া দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে ইতিহাসবিকৃতির অভিযোগ তোলে। কিন্তু সব বুর্জোয়া দলই বামপন্থীদের ভূমিকাকে অস্বীকার বা ছোট করে দেখানোর ক্ষেত্রে ঐকমত্যে রয়েছে।

তিন.

১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো পরিপূর্ণভাবে লেখা হয়নি। এ কথা ঠিক, এ যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের হাতে। ইতিপূর্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র বিজয়ের কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়টি তখনি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। তারাই গঠন করেছিল প্রবাসী সরকার। আর শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানে আটক থাকলেও যুদ্ধরত মানুষের জন্য তিনিই ছিলেন সব অনুপ্রেরণার উৎস।

কিন্তু এতদসত্তে¡ও এ সুমহান যুদ্ধকে আওয়ামী লীগের একক অবদান বলে চিত্রিত করার যে প্রয়াস দেখা যায়, তা সর্বৈব ভ্রান্ত! এই মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেকগুলো স্রোত ছিল। বামপন্থীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব হাজির করেছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এই দুই কারণে বামপন্থীদের বিশাল অবদান কিছুটা খাটো হয়ে গিয়েছিল। বুর্জোয়া লেখকরাও এ কথাকে সামনে এনে বামপন্থীদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার সুযোগ পেয়েছেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যে নানাবিধ স্রোত  ছিল তার সবটার খবর প্রবাসী সরকার জানতো না এবং সরকারি মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেও সবটা ছিল না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছোট ছোট সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। মার্চের শেষ সমপ্তাহেই প্রথমে থানার রাইফেল নিয়ে এবং পরে পশ্চাৎপসরণরত বাঙালি সৈনিক ও ইপিআর সদস্যদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করে শিবপুরে গঠিত হয়েছিল মুক্তিফৌজ। তখনো প্রবাসী সরকার গঠিত হয়নি। কিন্তু সে জন্য নরসিংদী জেলার শিবপুরের মুক্তিকামী তরুণরা অপেক্ষা করেননি। মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শিবপুরের এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল অসম সাহসী এক মহান যুদ্ধ, যার পরিচালনায় ছিলেন বামপন্থীরা। এ রকম বামপন্থীরা এবং অন্যরাও বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন যা এখনো পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করে ইতিহাস রূপে তুলে ধরা হয়নি।

১৯৭১ সালের ১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটায় যুদ্ধরত কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দল এবং গণসংগঠনসমূহ মিলিত হয়ে গঠন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি। এ সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণাপত্র তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকার করেই সমন্বয় কমিটি সরকারকে সহযোগিতাও যেমন করবে, তেমনি স্বতন্ত্রভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এ সমন্বয় কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দল ছিল ন্যাপ (ভাসানী) ও ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ যার নেতৃত্বে সারাদেশে ১৪টি সশস্ত্র ঘাটি এলাকা ছিল। প্রধান ঘাটি ছিল নরসিংদী জেলার শিবপুরে। সীমান্ত থেকে বহু দূরে ও রাজধানীর নিকটস্থ এ শিবপুরে অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছে এবং অনেক শহীদ হয়েছেন। এ অঞ্চলের বামপন্থী বিপ্লবীরাই ডিসেম্বরে নরসিংদীতে অবস্থিত পাকিস্তানের মিলিটারি ক্যাম্প দখল করেছিলেন। শিবপুরের যুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এই যুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বই রচনা করেছেন হায়দার আনোয়ার খান জুনো – ‘একাত্তরের রণাঙ্গন-শিবপুর।’ এ বইটিকে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরা যেতে পারে এবং বামপন্থীদের অধীনস্থ ঘাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসনিক সামাজিক ব্যবস্থা কেমন ছিল তার একটা ধারণাও পাওয়া যেতে পারে।

শিবপুর থেকে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। এছাড়া ভারতের কলকাতা ও আগরতলা থেকেও মুক্তাঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা হয়েছিল। সমন্বয় কমিটির যুদ্ধ কৌশল ছিল দ্বিবিধ। এক. দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাটি গড়ে যুদ্ধ করা। সেক্ষেত্রে প্রধানত শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রই ছিল আমাদের অস্ত্র সংগ্রহের প্রধান উৎস। আমরা ভারত সরকারের কোনো রকম সাহায্য পাইনি। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে মুক্তিবাহিনীর মধ্যে আমাদের কর্মীদের ঢুকিয়ে দেয়া। কারণ মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুট করার ক্ষেত্রে বাম কমিউনিস্ট ন্যাপ কর্মীদের বাদ দেয়ার নির্দেশ ছিল। তবে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নুরুজ্জামান (তিনি নিজেও মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন), মেজর জলিল, মেজর মনজুর আহমেদ প্রমুখের যথেষ্ট সহযোগিতা আমরা পেয়েছিলাম। তারা বামপন্থীদের ঘাটি এলাকায় অস্ত্র সরবরাহ পর্যন্ত করেছিলেন। বামপন্থীদের পক্ষে সবচেয়ে আন্তরিক ছিলেন সেক্টর কমান্ডার কর্নেল নুরুজ্জামান।

বামপন্থীদের আরেক অংশ মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলিতভাবে বাহিনী গড়ে তুলেছিল, যা ছিল সরকারি মুক্তিফৌজ থেকে স্বতন্ত্র। ভারত সরকার তাদের স্বতন্ত্রভাবে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মৈত্রীর কারণে ভারত সরকার এটা করতে বাধ্য হয়েছিল। সিপিবির মনজুরুল আহসান খান এই বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন যার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপের সাতজন সদস্য বেতিয়ারার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

বামপন্থীদের অন্যান্য অংশের মধ্যে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন মুক্তিসেনারা বরিশাল ও ঢাকার কয়েকটি অঞ্চলে সাহসী যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ সম্পর্কে মূল্যায়নে ভ্রান্তি থাকলেও ইপিসিপি-এর বিভিন্ন অংশও বিচ্ছিন্নভাবে সাহসী যুদ্ধ করেছেন। যেমন নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকায় যথা চর জঙ্গলিয়া ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ঘাটি এলাকা তৈরি হয়েছিল মহম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে।  সশস্ত্র তৎপরতা রামগতি ও সুধারাম থানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

দেবেন শিকদার, আবুল বশারের নেতৃত্বাধীন বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির বিএম কলিমুল্লাহর নেতৃত্বে চাঁদপুরে এক বিশাল বাহিনী ও ঘাটি এলাকা গড়ে উঠেছিল।  ঢাকায় যুদ্ধরত ক্র্যাক প্লাটুনেও ছিলেন বামপন্থী ছাত্র কর্মীরা। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটির অধীনস্থ বরিশাল অঞ্চলের যুদ্ধ (অধ্যাপক আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন), কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম অঞ্চলের যুদ্ধ, বাগেরহাটে রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ও বিশাল গেরিলা বাহিনী এবং সাতক্ষীরার তালা থানায় কামেল বখতের নেতৃত্বাধীন গেরিলা সংগ্রাম বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। এ সংক্ষিপ্ত রচনায় সেই আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ হবে। এ জন্য এখনো যারা জীবিত আছেন, তারা লিখতে পারেন। এছাড়াও মিডিয়া ও গবেষকরাও এগিয়ে আসতে পারেন।

এ ছোট নিবন্ধটি লিখতে লিখতে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল কামেল বখতের বুদ্ধিদীপ্তি ও তারুণ্যে ভাস্বর চেহারাটি। তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার তালা অঞ্চলে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির সংগঠক। তালায় তার নেতৃত্বে বিশাল মুক্ত অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। নভেম্বরের কোনো এক সময় তিনি এসেছিলেন কলকাতায় আমার সঙ্গে দেখা করতে এবং তালার পরিস্থিতি সম্পর্কে রিপোর্ট করতে। ঠিক হয়েছিল আমিও যাব তালায়। দিন তারিখ ঠিক হয়েছিল। যাওয়ার পথ জানা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখের আগেই আরেকটি খবর এলো। কামেল বখত নিহত হয়েছেন। শোনা গেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো অংশ ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল বিশ্বাসঘাতকতা করে।

এ রকম আরও অনেকের কথাই মনে পড়ছে। সব নাম লেখা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও সব নামই সংরক্ষিত হওয়া দরকার। বেশি দেরি হলে শহীদদের নামও হারিয়ে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধে যার যা অবদান তা যেন আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখি। বামপন্থীদের ভূমিকাসহ সবার ভূমিকাকেই ইতিহাসের পাতায় স্থান দিতে হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অবিকৃত ইতিহাস তুলে ধরার কাজটিই হবে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সৎ রাজনীতিবিদদের কর্তব্য।

বন্ধ করুন সুন্দরবন বিনাশী কর্মকান্ড

ম. ইনামুল হক :

সুন্দরবনের শেলা নদীতে আবার জাহাজডুবি। গত ১৯ মার্চ দিবাগত রাতে সি হোর্স-১ নামের এই জাহাজটি ১২৩৫ টন কয়লা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নোয়াপাড়া যাবার পথে তলা ফেটে গেলে ডুবে যায়। এর ফলে নদীর পানি, এর মাছসহ জলজ প্রানী ও জীবসমূহের কি ক্ষতি হয়েছে এবং হবে তা’ হিসেব করা কঠিন। তবে সুন্দরবনের এই নৌ পথে এই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সুন্দরবনের চান্দপাই রেঞ্জের ভেতরে সাউদার্ণ স্টার-৭ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ তলা ফুটো হয়ে ডুবে গেলে ৩,৫৭,৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সুন্দরবনের নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক দূষণ। সুন্দরবন ২৬৯ প্রজাতির বিচিত্র পাখি, ডাঙ্গার প্রাণী, মাছ ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল এবং ৩৩৪ প্রজাতির বিশেষ গাছপালার বন। ১৮৭৫ সালে একে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে এর স্থলভূমি মোট ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে জলভূমি মোট ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭৭ সালে সমুদ্র তীরবর্তী মোট ৩২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি ‘বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সালে একে রামসার সাইটভুক্ত এবং ১৯৯৭ সালে একে ইউনেস্কোর World Heritage Sites এর তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই কোনরকম দুর্ঘটনা যা’ এই এলাকার জীব পরিবেশকে বিপর্যস্ত করতে পারে তা’ যে কোন সচেতন ও সংবেদনশীল ব্যক্তির কাছে উদ্বেগের বিষয়।

সুন্দরবন বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হওয়া সত্বেও এর অতি নিকটে রামপালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথভাবে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। এই প্রকল্প সুন্দরবনকে ধ্বংস করে, এলাকার জলপরিবেশ, জনগণের কৃষিজমি বিনাশ করে, এলাকার মানুষকে উদ্বাস্তু ও নিঃস্ব করে সম্পূর্ণ ভারতীয় স্বার্থে হচ্ছে। কেবল সরকারী উদ্যোগে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নয়, ওরিয়ন কোম্পানীর আরেকটি কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর নড়াইল ও সাতক্ষীরা এলাকায় যেসব শিল্প কল কারখানা আছে ও ক্রমশঃ গড়ে উঠছে, সেগুলির পরিচালন জনিত এবং নদীপথে জাহাজ চলাচল জনিত বর্জ্য সুন্দরবন ও তার আশেপাশের অনন্য জলপরিবেশকে নষ্ট করছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বলেছেন, ‘বাগেরহাটের রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবনের কিছু ক্ষতি হবে, কিন্তু পিছিয়ে আসা যাবে না।’ তা’হলে বাংলাদেশে সরকার রয়েছে কেন? জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবী করে যাঁরা ক্ষমতায় বসে রয়েছেন, তাঁরা কোন কথা বলছেন না কেন?

সুন্দরবনে গত ১৯ মার্চ জাহাজডুবির পর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, এরপর থেকে শেলা নদীতে আর কোন কার্গো জাহাজ চলবে না। তাঁর এই কথাটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয় সে জন্যে এর উত্তর দিয়ে মংলা নদী থেকে ঘাসিয়াখালী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার কাটা যে গুরুতত্বপূর্ণ নৌ রুটটি আছে এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর থেকে চালু করা খালটি ব্যবহার করলে সুন্দরবনকে এড়িয়ে যাতায়াতের দৈর্ঘ কমে যায় এবং আর্থিক ও সময়ের দিক থেকে প্রভুত সাশ্রয় হয়। বরিশালের গাবখানের সাথে মিলে মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ভারত বাংলাদেশের নৌ প্রটোকল অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক রুটও বটে। এই পথ দিয়েই ভারত নদীপথে আসামে পণ্য আনা নেয়া করে। মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ৪০ বছর ড্রেজিং ছাড়াই চলেছে। এই রুটটি ২০০১ সাল থেকেই নাব্যতা হারাতে থাকে। ২০০৯/১০ সালে বিআইডাব্লিউটিসির রকেট স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পণ্যবাহী জাহাজগুলি জোয়ার ভাটা হিসাব করে চলাচল করলেও ২০১১ সালে রুটটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথটি চালু করা হয়। এরপর থেকে মংলা ও খুলনা এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজগুলিকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথে ১৫০ কিলোমিটার পথ বেশী পাড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে।

হিমালয় থেকে আসা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশে রয়েছে মৌসুমী বায়ু প্রভাবিত ছয়টি ঋতুর বিশেষ প্রকৃতি। কিন্তু উন্নয়নের নামে বাংলার এই প্রকৃতি আজ শেষ, খাল বিল নদী নালা, গরু ছাগল মাছ পাখী শেষ, এমনকি গাছপালা ফল শস্যও শেষ। সারা বিশ্বে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এলাকাগুলিই সবচেয়ে মূল্যবান, যার মধ্যে সুন্দরবন একটি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে এই সুন্দরবনের ক্ষতি করবে তা’ আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি। আমরা বলেছি, কেন্দ্রটি মারাত্মক বায়ুদূষণ করবে, মিঠা ও লোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট হবে, জাহাজ চলাচলের কারণে বর্জ্য ও শব্দদূষণ হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি; ফলে সুন্দরীসহ সুন্দরবনের গাছপালা ধ্বংস হবে, বাঘ ও অন্যান্য স্থলজ প্রাণীরা বাসস্থান হারাবে, মাছেরা লোপাট হবে, পাখীরা থাকবে না। বাংলাদেশে সুন্দরবন প্রকৃতির শেষ নিদর্শন। সুন্দরবন শেষ হলে বাংলাদেশ শেষ হবে। আমরা তাই সুন্দরবনকে শেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চাই না।

মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি বন্ধ হবার পর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীর নৌপথটি চালু করায় স্থানীয় জলজ ও বন পরিবেশের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে বলে পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়ে আসছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও এই পথটি বন্ধ করার কথা বারবার বলা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। গত ১৯ মার্চ জাহাজ ডুবির পর শেলা নদী দিয়ে কার্গো জাহাজ বন্ধ করার সরকারী সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকে সেটাই দেখবার বিষয়। (প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকচেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইন্সটিটিউট)