Home » সম্পাদকের বাছাই (page 11)

সম্পাদকের বাছাই

কেনো উন্নয়ন, কাদের জন্য উন্নয়ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

অর্থনীতিবিদরা বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি। অর্থাৎ উন্নয়ন তাকেই বলা হয়- যা মানুষের কাজের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। যেমন পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সংযুক্ত জনপদগুলোর জনগণের কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে । যদি এ সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকে, তবে মানুষের কোনো সক্ষমতা বাড়বে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন আমলে সড়কবিহীন শত শত সেতু গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো শুধু অর্থ লোপাটের প্রতিমূর্তি। বিদ্যুৎবিহীন শত শত খাম্বার কথা ভাবুন। এসব তথাকথিত উন্নয়ন কার্যক্রম মানুষের কাজের ক্ষমতা এক বিন্দুও বাড়ায়নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাহত করেছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হতে হবে সঠিক জায়গায় ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী। অমর্ত্য সেন ভারতবর্ষ ও বাংলাকে দিক নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রগতি ও সর্বত্র সুষম উন্নয়নের জন্য মানবিক উন্নয়নই এ সময়ের অর্থনৈতিক প্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক উন্নয়ন বলতে মানবসম্পদ, শিক্ষা, চিকিৎসা, পারিবারিক সক্ষমতা অর্জনকে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। আর নাগরিকের এ  মৌল অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হলে রাষ্ট্র ও সরকারকেই এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতবর্ষ ও বাংলায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের মূলে রয়েছে দরিদ্র মানুষের মৌল অধিকার রক্ষায় সরকারের অপর্যাপ্ত ও লক্ষ্যভ্রষ্ট নীতি সহায়তা ও মন্থর উন্নয়ন কার্যক্রম। একইভাবে চতুর ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর ঠগবাজি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবসার উত্থান এবং তা মানবিক উন্নয়নে ব্যবহার না হওয়া। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো মৌল কার্যক্রমগুলো অতিমাত্রার বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় তা সর্বসাধারণের কাছে দুর্লভ ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অমর্ত্য সেন অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে মানবিক প্রগতির যোগসূত্র রয়েছে এমনটি স্বীকার করে নিয়েও জোড়ালোভাবে বলেছেন, বেসরকারি খাত দিয়ে কখনও মানবিক উন্নয়ন করা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলস্রোতে বেসরকারি খাত মুখ্য ভূমিকা রাখলেও মানবিক প্রগতির বিষয়টি কার্যত বেসরকারিখাতের নজরে অবহেলিতই থেকে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দরিদ্র মানুষের এসব অভাব পূরণে রাষ্ট্র কিংবা সরকার যদি তা উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা না রাখে কিংবা রাখলেও সেটি অপর্যাপ্তই থেকে যায়- তাহলে সমাজে বৈষম্য তৈরি করে।

অমর্ত্য সেন বলেন, বাণিজ্য বাড়লে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। অর্থনৈতিক উন্নতি হলে বেসরকারি খাত সম্প্রসারিত হয়। বেসরকারি খাত বড় হলে মানুষের আয় বাড়ে। এতে ওইসব মানুষের দারিদ্র্য দূর হয়। যখন মানুষে সম্পদ পায় তখন সে উৎসাহিত হয়। এতে তার বিনিয়োগ প্রবণতাও বাড়ে। এর দ্বারা সরকারের রাজস্বও বাড়ে। এভাবেই অর্থনৈতিক প্রগতি ঘটে থাকে। অমর্ত্য সেন বলেন, মানবিক উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর না থাকলে বাণিজ্যিক শিক্ষা, চিকিৎসা দিয়ে গণমানুষের চাহিদা পূরণ হয় না। এ ধরনের ব্যবস্থায় ধনীরা সেবা পেলেও, বঞ্চিত হয় গরিব মানুষ। কারণ বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এসব সেবার মূল্য বাড়ে এবং সেটি সাধারণের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার যতই মনোযোগী হোক না কেন, তা একটা সময় স্থির হয়ে যেতে পারে। মানবিক উন্নয়নের খাতগুলোতে উন্নয়নের দৃষ্টি রাখতে হবে। আর সেটি সরকারকেই করতে হবে। বিশেষ করে দেশের সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং নারী উন্নয়নসহ মানব উন্নয়নের সর্বদিক নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

ব্যক্তি, দেশ ও সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। সবার স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সবাই সমান অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। কেউ কেউ পিছিয়েও যায়। কে কি পরিমাণ আগোতে পারছে বা আদৌ পারছে কিনা, না পারলে কেন, এসব জানার দরকার পড়ে। দেশের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পদ্ধতি চালু হয়েছে। জাতীয় আয় বা জিডিপি মেপে কোনো দেশের অগ্রগতি বোঝার প্রচলিত পদ্ধতির ত্রু টি অনেক আগেই চোখে পড়ছে। চেষ্টা চলছে আরো ভালো পদ্ধতি বের করার যাতে একটি দেশের অগ্রগতি সঠিকভাবে বোঝা যায়। এ রকম প্রত্যেক চেষ্টার মূলে রয়েছে মানুষ অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও সুখ।

অমর্ত্য সেন বলেছেন- জনসাধারণের সক্ষমতার নামই উন্নয়ন। তিনি মনে করেন, ‘মানুষের, সক্ষমতা নির্ভর করে, তার সত্বাধিকারের ওপর, অর্থাৎ কি পরিমাণ দ্রব্য এবং সেবা সামগ্রীতে সে তার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তার ওপর। মাথাপিছু কতটা খাদ্য পাওয়া যাবে অথবা মাথাপিছু মোট জাতীয় উৎপাদন কতটা এ ধরনের সাদামাটা নির্দেশকসমূহের ওপর যদি নির্ভর করা হয়, তাহলে অনাহার, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার সামগ্রিক চেহারাটা উপলব্ধির পথে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। স্বত্বাধিকার নির্ধারণ ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থায় বিভিন্ন বৃত্তিভোগী কর্মগোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের অবস্থা, এ সবের সতর্ক বিশ্লেষণ আবশ্যক। তার মতে, উন্নয়ন আসলে মানুষের স্বাধীনতার চৌহদ্দি বাড়ানোর প্রক্রিয়া। মানুষ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কতদূল মেটাতে পারছে সে প্রশ্নটি উন্নয়নের সংজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নের কথিত জোয়ারে, সবকিছু দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী সমস্যাগুলির সঙ্গে যোগ দিচ্ছে নিত্য নতুন কৃত্রিম সমস্যা। উন্নয়নের নানা তত্ত্বে দেশ ভাসছে, চারিদিকে হৈ হৈ রই রই। অথচ প্রতিদিনই কমছে মানুষের স্বস্তি বোধ। সামাজিক সমস্যার রাষ্ট্রীয়করন এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করছে। ‘মাইন্ডসেট’ পরিবর্তনের হাজার এন্তেজাম তথাকথিত উন্নয়নের লক্ষ্য। কিন্তু যাদের উন্নয়নের জন্য এই যজ্ঞ তাদের অকথিত কথা কেউ শোনে না। উন্নয়ন সূচকের উর্ধগতি তত্ত্বেও দিনে দিনে গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নাগরিক ভোগান্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত কয়েকটি সূচক হচ্ছে জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কল্যাণ। কোন দেশের জাতীয় আয় বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যে কারণে মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করা হয়। সে হিসেবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপেক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার অধিক হলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায়। জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রকৃত মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি মানব উন্নয়ন সূচক। মানব উন্নয়ন সূচকে মানুষের শিক্ষা, আয়ুষ্কাল, ক্রয় ক্ষমতা প্রভৃতি বিবেচনা করা হয়। তবে এই সূচকে জাতীয়ভাবে তথ্য নেওয়া হয়। কিন্তু ধনী-গরীব বৈষম্য, আঞ্চলিক বা গ্রাম ও শহরের বৈষম্য আমলে নেওয়া হয় না। ফলে এই সূচকে গণমানুষের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় না।

নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটেছে, এটি আমাদের জন্য একটি সুখবর অবশ্যই, যদি সত্য হয়ে থাকে। জনগণের গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এতে সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা নানা স্বপ্নের জাল বুনতে পারি। তবে মনে রাখতে হবে, সেই স্বপ্ন পূরণে জাতীয় আয় বৃদ্ধি বা অর্থনীতির উচ্চ সূচকই যথেষ্ট নয়। দেখা দরকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এর সুফল কতটা পাচ্ছে। জাতিসংঘের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ পৃথিবীর শতকরা ৪০ ভাগ সম্পদের অধিকারী। আর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ শতাংশ বিত্ত-বৈভব ভোগ করছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ সম্পদ। এই যে ভয়াবহ বৈষম্য- এই জরিপে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থারও প্রতিফলন রয়েছে। এদেশে আয়-বৈষম্য, সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য, বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্য এত প্রকট যে তা সাদা চোখেই দেখা যায়, গবেষণার দরকার হয় না। তবুও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; গবেষণা হয়ও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, দেশে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি হলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এখনও প্রকট। ধনী পরিবারের একজন সদস্য যে সুবিধা পান, তার ছিটেফোঁটাও পান না দরিদ্র পরিবারের কেউ। জরিপে আরও বলা হয়েছে, আঞ্চলিক অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। অর্থাৎ বৈষম্য বড় সমস্যা, এটাই মূলকথা। দেশের গড় আয় বেড়েছে; কিন্তু আয় বৈষম্যের কারণে সমাজে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ, যে খাতগুলোর মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি ঘটছে, তার বেশিরভাগ রয়েছে মূলত ধনী বা অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের অধিকারে। দরিদ্রদের নিজেদের সম্পদের পরিমাণ সামান্য। তাই আয় বৃদ্ধি ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল তারা পাচ্ছেন না। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় বৈষম্য। যেসব নীতি ও ব্যবস্থার ফলে সমাজে বৈষম্য কমে আসতে পারে, তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা।

চালের দাম : পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

দেশের নিম্ন আয়েরর মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য ‘মোটা চালে’র দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে  ৪৮ থেকে ৫০  টাকায়। শুধু মোটা চালই নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত যে কোন বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। দেশে মোটা চালের দাম বাড়তে বাড়তে কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় উঠেছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে এখন মোটা চালের দাম বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এতে প্রায় দুই কোটি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে ও পড়ছে  যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, চালের দাম এত বেশি বাড়ল কেন? খাদ্যব্যবস্থা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, দূরদৃষ্টির অভাব, খাদ্য নিয়ে সরকারের উদাসিনতাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখানো; জনগণকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানো’র প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির পেছনে যে দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে- তা বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখার পথে প্রতিবন্ধক হয়েছে। যখন চাল আমদানি করার প্রয়োজন ছিল না, তখন চাল আমদানি করা হয়েছে; একসময় দেশের বাজারে চালের দর এতটা কমে গিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা পরের মৌসুমে চাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। আর এ বছর হাওর-অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ফসলহানি হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সৃষ্টির পরও সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগেছে। অথচ তখনও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মাথায়  চাল আমদানির চিন্তাটুকুও  ঢুকেনি। বরং প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করা হয়। পরে ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রতিক্রিয়া দেখে, অনেক সমালোচনার পর ওই ১৮ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু তখনই আমদানির চিন্তা করলে আমদানি ব্যয় কম হতো, ওই চালের দামও কম হতো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে-এই বিলম্ব কি ইচ্ছাকৃত?

এতা গেলো একটি দিক। তবে যে জটিল বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল- তা হলো, সরকারি গুদামে চালের মওজুদ এখন মাত্র ১ লাখ ৮১ হাজার টন (১৮ জুনের হিসাব)। গত ১০ বছরের মধ্যে এটা সর্বনিম্ন মওজুদ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি গুদামে কমপক্ষে ৬ লাখ টন চাল মওজুদ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মওজুদ এর চেয়ে কমে গেলে চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেবেই, আর চালের দাম বাড়বেই। এবার মূলত সেটাই হচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের হয় কোন নিয়ন্থন নেই অথবা এটাও ইচ্ছাকৃত; কিংবা ক্ষমতাবানদের হাতে সাধারন মানুষ জিম্মি।

সরকার এখন অভ্যন্তরীন ধান-চালও সংগ্রহ করতেও পারছে না। কারণ, বাজারে চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা হলেও সরকার-নির্ধারিত ৩৪ টাকা দরে কেউ সরকারকে চাল দেবে না, এটাই স্বাভাবিক। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, বাজারে বর্তমানে কী পরিমাণ চাল আছে, এ সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছেও নেই অথবা তা জনগনের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছেনা। অথচ খাদ্য মওজুদ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটা নিয়মিত মনিটর করা ও হিসাব রাখা। কারণ, এর পরিণতিতে এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবয়বে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় দেশের অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশ আসতো কৃষি খাত থেকে। সেখানে বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে কৃষির জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান চলে এসেছে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। এবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির যে হিসাব করেছে- তাতে কৃষি খাতে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেখানো হয়েছে। সব চেয়ে বিষ্ময়কর হলো, এতে খাদ্য শস্য খাতে বাড়তি উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বোরো মৌসুম থেকে । বাকি ৪০ ভাগ আউশ ও আমন থেকে আসে। আউশের উৎপাদন ৭ শতাংশের মতো কম হয়েছে। আমণের উৎপাদন আগের বছরের একই পর্যায়ে রয়েছে। বোরোর উৎপাদনে এবার দুর্যোগ ও হাওরের বিপত্তির কারণে ৬/৭ লাখ টন কম উৎপাদন হবে বলে বলা হচ্ছে। এ হিসাবে কোনভাবেই খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়ার কথা নয়। একই কারণে কৃষিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাস্তবসম্মত নয়।

চাল নিয়ে রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। চাল আর রাজনীতি খুব বেশি দূরের কিছু নয়। এদেশে সবসময়ই চালের দামকে স্পর্শকাতর ইস্যু মনে করা হয়। ভোটের রাজনীতিতেও চাল গুরুত্বপূর্ণ। ‘১০ টাকা কেজি চাল’ নিয়ে বহু বাতচিত হয়েছে। এমন ওয়াদা করা হয়েছিল, নাকি হয়নি তা নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। তবে চালের বর্তমান উচ্চমূল্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষেরা। পেটতো আর রাজনীতি বোঝে না। উচ্চমূল্যে চাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারন মানুষ। ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে সংসারের বাজেট। এমনকি পত্রিকায় এও খবর বেরিয়েছে, চালের উচ্চ মূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ৪-৫ সদস্যের ছোট একটি পরিবারে কেবল চালের পেছনেই খরচ বেড়েছে কমপক্ষে পাঁচশ’ টাকা।

উদ্বেগ চালের দাম বৃদ্ধি নিয়েই

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

পাহাড়ে লাশের মিছিলের সাথে খবর একটাই! চালের দাম বাড়ছে। বাড়ছে তো বাড়ছেই। তিনবেলা মোটা ভাত খাওয়া সাড়ে পনের কোটি বাঙালীর মাথায় হাত, কোথায় গিয়ে থামবে চালের দাম? এই দেশের মানদন্ডে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসেবে ‘সুষম খাদ্য’ বলতে যাই থাকুক, এখন মোটা চালের ভাতই চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ার কারণে জনপদের মানুষ ক্রমশ: আতঙ্ক গ্রস্ত হয়ে পড়ছে নিকট ভবিষ্যত ভাবনায়।

সরকারের গুদামে চালের মজুত নেমে এসেছে ২ লাখ টনের নিচে। বেসরকারী মজুত ১০ লাখ টন কম। দুই খাতেই চালের মজুত আশঙ্কাজনক। ২০১৭ সাল শুরু করেছিল ব্যবসায়ীরা ১০ লাখ টন মজুত কম নিয়ে। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, উচুঁমাত্রার শুল্কের কারণে আমদানী করে পোষাচ্ছে না। এদিকে, সব ধরনের চালের দাম মাত্র একমাসে বেড়েছে কম-বেশি ৮ শতাংশ এবং চলতি বছরে বেড়েছে সবশুদ্ধ ৪৮ শতাংশ।

মাত্র ক’দিন আগেও শুনতে শুনতে কানে আসছিল – প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপি, দলীয় নেতা-পাতি নেতাসহ সুবিধাভোগীরা ও দলদাসদের- সকলের মুখে উন্নয়ন সাফল্যের উপচানো গল্প। বলা হচ্ছিলো, কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়; বাংলাদেশ বিশ্বের উদাহরন হয়ে উঠেছে। সরকারের সকলে একযোগে কোরাস গেয়েছেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বিপুল কৃষি উৎপাদন-এই দেশ চাল রপ্তানীকারক দেশে পরিনত হয়ে গেছে।

সরকারের বিশ্বস্ত অর্থনীতিবিদদের একজন কাজী খলীকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, “খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে যা ভুল হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পুর্ণ- এ আত্মতুষ্টিতে ভুগে দেশে চালের ঘাটতি ও মজুতের বিষয়টি ভুলে গেছি”। খলীকুজ্জামানের কথা সত্য হলে দাঁড়াচ্ছে যে, সরকারের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ছিল না এবং ঘাটতি ও মজুত সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। এটি হলে সরকারকে অবশ্যই দায় নিতে হবে এবং শুরু হতে পারে খাদ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে।

খাদ্যমন্ত্রী অবশ্য ফতোয়া দিয়েছিলেন, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে চালের দাম বেড়ে গেছে। তবে এখন তারা  চুপ মেরে গেছেন। তার অসত্য ও আজব তথ্য শুনতে শুনতে জনগন আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝে গেছে। তার কথা সত্য ধরে নিলে, বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী হিসেবে সে বা তার সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন? অথচ দেশের কে না জানে, চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলি ক্ষমতাসীন রাজনীতির সাথে জড়িত। সুতরাং তাদের অনৈতিক মুনাফার দায়ও সরকারের।

একটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এদেশে মজুত রাখার বিরুদ্ধে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। ২০১১ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয় কন্ট্রোল অব এসেনসিয়াল ফুড কমোডিটি এ্যাক্ট সংশোধন ও হালনাগাদ করে। ঐ আইনের আওতায় পণ্য মজুতের হিসেব পাক্ষিকভাবে দেয়া হয়েছিল প্রথম দুই বছর। ২০১৪ সাল থেকে এই হিসেব আর পাওয়া যায় না। ফলে বেসরকারী পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুত গড়ে উঠছে নির্বিঘ্নে এবং মজুতদাররা যখন যেমন খুশি বাড়াচ্ছে চালসহ নানা পণ্যমূল্য।

সরকার এতকাল জানিয়ে এসেছে, ধান-চাল উৎপাদন ও মজুতের পরিমানের দিক থেকে দেশ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করেছে। এই নিরাপত্তা কতটা ‘ফানুস’ ছিল এবং বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা এখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে। বছরটি শুরুই হয়েছিল যেখানে ১০ লাখ টন ঘাটতি নিয়ে, সেটি পূরণের বদলে মনে হচ্ছে, সরকার লাফিয়ে লাফিয়ে চালের দাম বৃদ্ধি উপভোগ করছে এবং মন্ত্রী এই বাড়ার পেছনে বিএনপিপন্থীদের কারসাজির ভূত দেখতে পাচ্ছেন!

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার গল্প বলা হলেও খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্য এখন ফুটে উঠেছে দগদগে ঘায়ের মত। অন্যদিকে কৃষি বাজারে অব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকের ভাগ্যের কোন উন্নয়ন নেই। সরকার কৃষকদের ব্যাংক হিসেব দিয়েছে। ব্যাংক ঋণ নিতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ঋণ নিয়ে কৃষক উৎপাদনে গেছেন। কিন্তু ঘরে ফিরেছেন নিঃস্ব হয়ে। কেউ জেলে থাকছেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সার্টিফিকেট মামলা মাথায় নিয়ে। এভাবে কথিত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা কৃষককে কারাবাস বা পলাতক করছে।

অধিকাংশ কৃষক মনে করেন, চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন চলে যাওয়ায় তারা বিপুল পরিশ্রম করেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এজন্য ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। আটকে যাচ্ছেন আরো নতুন দেনার জালে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সরকার যেখানে ক’দিন আগেও চাল রপ্তানী করার কথা বলেছে, সেখানে এখন বিপুল পরিমান চাল আমদানীর কথা উঠবে কেন? ফি-বছর এই আমদানীর কারণেই কৃষক ফসলের দাম পায়নি, আটকা পড়ে গেছে ঋণ-মামলা জালে।

প্রতি বছরই বিপুল পরিমান চাল আমদানী করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ টন চাল আমদানীর জন্য বাজেটে ৭৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ চাল রপ্তানীর যুগের অবস্থা এটি এবং অর্থবছরের ছয়মাস পেরোতেই বরাদ্দের দ্বিগুনেরও বেশি চাল আমদানী করা হয়। ওই ছয় মাসের আমদানী আগের বছরের মোট ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনেরও বেশি। সে সময়ে সরকার মাত্র ৫০ হাজার টন রপ্তানীর ঘোষণা দিয়ে আমদানী করে ৮ গুন বেশি।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখাতে গিয়ে সরকার বিপুল আমদানীর এই হিসেব স্বীকার করেনি। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয় ব্যাপক চাল আমদানী। পরিমান ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার টন। মন্ত্রীরা সে সময়ে বলেছিলেন, এসব চাল গো-খাদ্য হিসেবে আমদানী করা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় চালের হিন্দি লেখা মোড়ক ও উৎপাদন তারিখ সরকারের মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তারপরেও তারা দাবি করেছে, সুগন্ধী চাল ও গো-খাদ্যের বাইরে কোন চাল আমদানী করা হয়নি।

ভেতরে ভেতরে এই সরকার কতটা সিন্ডিকেটবান্ধব তার একটি নমুনা হচ্ছে ২০১৪ সালে ২৮ নভেম্বর প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট।  রিপোর্টের বলা হয়, জুলাই ২০১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানীকৃত চালের পরিমান কম-বেশি ৮৭ হাজার টন। দেশে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মৌসুমে এই চাল আমদানী করা চলছিল। ফলে কৃষক ফসলের মূল্য নিশ্চিত করতে পারেননি। এভাবেই কথিত কৃষকবান্ধব সরকার চাল আমদানী ও সিন্ডিকেটকে সবসময় সহায়তা দিয়ে এসেছে এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়েছে।

সরকারী ভাষ্যে উৎপাদন ও উন্নয়ন-দুটোই বাড়ছে। তবে খাতগুলি বিচার করলে দেখা যাবে, উৎপাদকরা আছেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে। আর কথিত উন্নয়ন কতিপয় মানুষের সুবিধা এনে দিয়ে একটি লুটেরা ধনিক শ্রেনী গড়ে তুলছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই কথিত উন্নয়ন বৃত্তের বাইরে। দেশের অর্থনীতির প্রধান তিন ভিত্তি কৃষি, গার্মেন্টস শিল্প ও রেমিট্যান্স। এই তিন খাতের মানুষেরাই সবসময়  মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন, মজুত, রপ্তানী-সবকিছু এখন নগ্ন সত্য হয়ে হাজির হয়েছে। হাওড়ে বন্যায় মৌসুমী বোরো ফসল মার খাওয়া, ধানক্ষেতে ব্লাষ্ট রোগের আক্রমন, অতিবৃষ্টি আর বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের কারসাজি- দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এক লহমায় ধ্বসিয়ে দিয়েছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে? ফি-বছর লাগাতার মিথ্যাচারের নিট রেজাল্ট হচ্ছে, মোটা চালের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে মোটা ভাত, ধ্বসে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা !

হেফাজতের উপর আ’লীগের এতো নির্ভরতা কেনো

হায়দার আকবর খান রনো ::

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ইদানীংকালের গভীর সখ্যতায় আমি খুব একটা বিস্মিত হইনি। কারণ আওয়ামী লীগ কোন আদর্শবাদী দল নয়। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাবার জন্য, রাজনীতির সুবিধার জন্য, ভোটের সময় প্রতারণা করার জন্য তারা যখন যেটা প্রয়োজন মনে করবে, তখন তাই-ই করবে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের শত্রু পক্ষ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করেছে, মন্ত্রীসভা গঠন করেছে। অথচ তারাই আবার জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গর্ব করে, যিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের প্রধান এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম থেকে রেডিও মারফত। আবার জিয়াউর রহমান নিজেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়েছিলেন; দলে টেনে নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ-জামায়াতসহ এ সকল দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছিলেন, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে  সরাসরি সা¤্রাজ্যবাদ নির্ভর পুজিবাদী পথে দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেয়ার প্রয়োজনে সংবিধানে বিসমিল্লাহ শব্দ যুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা জিয়া একেবারে পাল্টে দিলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে।

পাল্টানোর কাজটি শুরু হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই। সমাজতন্ত্র শব্দটি সংবিধানে রাখা হলেও এটাও ছিল জনগণকে ধোকা দেয়ার কৌশল মাত্র। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই শুরু হয়েছিল বেপরোয়া গনবিরোধী কাজকর্ম। সমাজতন্ত্রের ধারেকাছেও যায়নি সেদিনের সরকার। পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে কিছুটা আপোস করার প্রবণতা তখনই দেখা দিয়েছিল। লাহোরে শেখ মুজিবের ইসলামী  সম্মেলনে যোগদান, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৪ সালে দিল্লী সম্মেলনে পাক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি তার স্বাক্ষ্য বহন করে। দিল্লী সম্মেলনে আমাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাঙ্গালী জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়।’ এইভাবে যুদ্ধাপরাধী পাকসেনাদের মুক্তি দেয়া হয়েছিল, যদিও কথা ছিল পাকিস্তানের সরকার প্রয়োজনে তাদের বিচার করবে। ওই সম্মেলনে ‘‘ফরগেট এ্যন্ড ফরগিভ’’ কথাটি যৌথ ঘোষণায় লেখা হয়েছিল।

পাকিস্তানের অনুসারীরা আরও ভালোভাবে ফিরে এলো জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে। কিন্তু আওয়ামী লীগও কম যায়নি। ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে একত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আওয়ামী লীগ নিজেই বাতিল করে দিল। আর পরবর্তীতে সেই জামায়াতই হলো বিএনপির মিত্র। আদর্শ বলে কিছু নেই। এই আদর্শহীনতার রাজনীতি দেশকে সর্বনাশের পথে নিয়ে গেছে।

জামায়াতকে নিয়েও আওয়ামী লীগ খেলতে চেয়েছিল; পারেনি। জামায়াত শেষ পর্যন্ত বিএনপির বন্ধু হয়েছিল। অনুরূপভাবে হেফাজতকে নিয়ে খেলতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। সেই হেফাজত এখন আওয়ামী লীগের মিত্র। বস্তুত: জামায়াত আর হেফাজতের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ দ্বারা পরিচালিত ধর্মীয় মৌলবাদী দল বা সংস্থা। পক্ষ পরিবর্তন বা পাশার দান পাল্টে যাওয়া রাজনীতির সাধারণ বৈশিষ্টে পরিণত হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াত-প্রধান গোলাম আজমের কাছে গিয়েছিলেন তার সমর্থন ও দোয়া চাইতে। এতে আওয়ামী লীগের কিছু আসে যায়নি। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াত-হেফাজতের মতোই আরেকটি ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী দল খেলাফতে মজলিসের সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল। চুক্তির ধারাগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনার বিরোধী নারী বিদ্বেষী, ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল। শুধুমাত্র যেনতেনভাবে নির্বাচনে জেতার জন্য অমন দলের সঙ্গে অমন চুক্তি করতে সামান্যতম বাধেনি আওয়ামী লীগের। যখনই সেই নির্বাচন আর হলো না, তখনি আওয়ামী লীগ সেই চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে দিল। কী অদ্ভুত এই আচরণ। এমন আদর্শহীনতার নিদর্শন রাজনীতিতে বিরল।

২০১৩ সালে ৫ মার্চ গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা হিসাবে হেফাজত মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করেছিল। যে খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিকদের মঞ্চ বলে গাল দিয়েছিলেন, সেই তিনিই হেফাজতের সমাবেশকে উৎসাহিত করলেন।

হেফাজতে বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব করবে বলে ধারণা দিয়েছিল। তারা তুলকালাম কান্ড করেছিল। বড় বড় গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করেছিল। সিপিবি অফিস ও বায়তুল মোকাররমের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করেছিল। সরকারের পতন হতে পারে এই সম্ভাবনায় খালেদা জিয়া সর্বাত্মক সহযোগিতা করলেন। কিন্তু সরকারের পতন হলো না। বরং গভীর রাতের পুলিশি এ্যকশনে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজত এখন সরকারের মিত্র। গোপন সমঝোতা হয়েছে। হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য লেখকের গল্প, প্রবন্ধ বাতিল হয়ে যায়, হিন্দুয়ায়িত্বের অথবা নাস্তিকতার অভিযোগে। ভাস্কর্যের সৌন্দর্য তারা বোঝেন না। ভাস্কর্য মানেই নাকি মূর্তি পূজা। তাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে সরকার হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য স্থানান্তরিত করে। যে সকল শুভবুদ্ধির মানুষ এর প্রতিবাদ করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের সমালোচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন যেন প্রতিযোগিতা করে মৌলবাদী ভাবাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। বিএনপি ধরেছে জামায়াতকে। আওয়ামী লীগ ধরেছে হেফাজতকে। ক্রমাগত দুটি বড় দলের মধ্যে পার্থক্য যেন আর থাকছে না।

খুব একটা পার্থক্য আগেও ছিল না। অর্থনৈতিক নীতির দিক দিয়ে দুই দল লুটেরা-ধনীক শ্রেণীর স্বার্থের পাহারাদার। দুই দলই পাশ্চত্যের সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল। দুই দল মিলেই বলা যায়, এ যাবতকালের সকল সরকারই ছিল নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা, পুঁজিবাদের স্বার্থের প্রতিনিধি। এই দলকে যদি রাজনীতির ভাষায় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বলা হয়, তবে এটাও বলতে হবে যে, তারা জাতীয় স্বার্থকে কেউই রক্ষা করেনি। তবু তারা নাকি জাতীয়তাবাদী!

উভয় দলের কেউই গণতান্ত্রিক আরচণ করেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনই তো ছিল একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচন। তার পরবর্তীকালে যতোগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোকে নির্বাচন না বলাই সঙ্গত। আগের রাতে সিলমারা, পুলিশ দিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মারা ইত্যাদি ছিল সাধারণ দৃশ্য। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ নির্বাচন বলে আর কিছু নেই। তার উপর গুপ্ত ও প্রকাশ্য হত্যা, গুম ইত্যাদি স্বৈরতান্ত্রিক ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তিনিও গণতান্ত্রিক আচরণ করেননি। ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে নিরীহ মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল পুলিশের ক্যাম্প বা থানায়। সবচেয়ে খারাপ কাজ যেটা খালেদা জিয়া করেছিলেন তাহলো ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময় যারা মানুষ হত্যা করেছিল বা নির্যাতন করেছিল, তাদেরকে তিনি পার্লামেন্টে আইন করে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই আজ যখন খালেদা জিয়া বা বিএনপি গণতন্ত্রের কথা বলে, তখন তা বড় বেমানান ঠেকে।

আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, এহেন দুইটি দলই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যাদের কোন আদর্শ নেই, যারা পুজিবাদের ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক, হাড়ে হাড়ে দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী। এবং এখন তারা দুজনেই মৌলবাদের সঙ্গে আপোষ করে দেশকে পেছনের দিকে দিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি জঙ্গী মৌলবাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা মানুষ খুন করছে। এই সন্ত্রাসী মৌলবাদ বিপজ্জনক। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একে মোকাবেলা করা ও দমন করা এক দিক দিয়ে সহজ। কিন্তু ভাবাদর্শগতভাবে যে মৌলবাদের বিস্তার ঘটেছে, তা অধিকতর বিপজ্জনক। আর এই ভাবাদর্শের ক্ষেত্রেই দুটি বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে শাসক দল যেভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, তার পরিণাম বড় ভয়াবহ। ’৭১ সালে যে বিজয় আমরা অর্জন করেছিলাম, যে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছিলাম, সবই এখন হারিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে।

কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না। এই দুই বড় দলের বাইরে বিকল্প তৈরি করতে হবে। বাম ও উদার গণতন্ত্রীদের সমন্বয়ে তেমন বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতে হবে। জামায়াত-হেফাজত প্রমুখ মৌলবাদী দলের ভাবাদর্শকে মতাদর্শগতভাবে রাজনৈতিকভাবে সাংস্কৃতিকভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে পরাজিত করতে হবে। এবং সেটা সম্ভব। কারণ বাংলার লোক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কখনই মৌলবাদের অনুকূলে ছিল না।

কিন্তু সচেতন সংগঠিত মানুষ তাকে পুনরায় পাল্টাতে পারে। সে বিশ্বাস ও আস্থা আমার আছে।

জনগন এখন শুধুই সংখ্যা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. একেকটি ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। তখনই শুধু আমাদের গণমাধ্যম হৈ চৈ শুরু করে। রিপোর্ট, সরেজমিন, ষ্টোরি-কোনকিছুই বাদ রাখে না। দিক-বিদিক লম্ফ-ঝম্ফ শুরু হয় সরকারের লোকজনের। তারপর আবার যা তাই। সুন-শান, গভীর নিস্তব্ধতায় সব বিষয় চাপা পড়ে যায়। সরকার-প্রশাসন ওই পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তদন্ত কমিটি করে। তদন্ত রিপোর্ট হয় বটে, কেউ জানতে পারে না, কোন সুপারিশ বাস্তবায়নও হয় না। আবার ঘটনা ঘটলে তবেই বিষয়গুলি আলোচনায় আসে।

পাহাড়ে এখন লাশের মিছিল। ক্ষমতাবানরা নিয়মিত পাহাড় কেটে পাহাড়ী জেলাগুলিকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিনত করেছে। ঘূর্নিঝড় ‘মোরা’র পর থেকেই আশঙ্কা ছিল আগাম বৃষ্টির- অতি বৃষ্টির। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। প্রবল বৃষ্টিতে ধ্বসে পড়া পাহাড়ের নিচে এখন শুধু লাশের সারি। এসব বিষয়ে প্রায় নিশ্চুপ গণমাধ্যমগুলো ঘটনা ঘটে যাবার পরে সরব হয়েছে। খবর দিচ্ছে লাশের সংখ্যার। আর দৌড়াচ্ছে মাইক নিয়ে এর-ওর কাছে, খবর সংগ্রহের ধান্ধায়! আর কত লাশের খবর!

গণমাধ্যম এবং কথিত সুশীল সমাজ-এখন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গণমাধ্যম কতটা সত্যানুসন্ধানী, সে নিয়ে অনেক প্রশ্ন তৈরী হয়ে আছে। কথিত সুশীল সমাজ যেমন দলদাস এবং দলকানা, গণমাধ্যমও সেরকম। কর্পোরেটসহ নানা পক্ষের স্বার্থের ধারক হয়ে উঠেছে; জনগণের পক্ষে আসলেই আছে কতোটা?। এর ফলে সরকার, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমগুলি প্যারালাল ভূমিকায় চলে আসছে অভিন্ন স্বার্থরক্ষায়।

২০০৭ সালে পাহাড় ধ্বসের পরে গঠিত তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল, সুপারিশ করেছিল সেগুলি কেন সরকার বাস্তবায়ন করছে না- এ বিষয়ে গত বছরগুলিতে গণমাধ্যমগুলি একটিও কার্যকর রিপোর্ট করেছে কিনা জানা নেই। অথচ গণমাধ্যমগুলি লাগতার চাপের মধ্যে রাখলে সরকার বাধ্য হতো সুপারিশ বাস্তবায়নে। সবাই যেন ভুলেই গিয়েছিল, ফি-বছর পাহাড় ধ্বসের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আর ধ্বস নামলেই মরবে মানুষ, যারা সরকারের ভাষায় ‘ইল্লিগ্যাল’!

কেন ২০০৭ সালের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি-এর অদ্ভুত উত্তর দিয়েছেন বণ ও পরিবেশমন্ত্রী। তার মতে, যারা সুপারিশ করেছিলেন, তারা মূল্যায়ন করেননি যে কোন কোন সুপারিশ বাস্তবায়ন সরকারের পক্ষে সম্ভব। মানলাম মন্ত্রীর কথা । কিন্তু পাহাড় কাটা বন্ধ হয় না কেন? প্রশাসনের গতানুগতিক উত্তর, প্রভাবশালীদের কারণে তারা বন্ধ করতে পারে না। তাহলে তো কথাই নেই। পাহাড়ও কাটা বন্ধ হবে না- ‘ইল্লিগ্যাল’ নামধারী মানুষগুলোর লাশের মিছিলও বন্ধ হবে না।

দুই. জনগনের নাভিশ্বাস উঠতে খুব সময় বাকি নেই। শাসকরা সবশেষ মরণকামড় বসিয়েছে। এখন আর কোন কিছুই আড়াল নেই। অর্থমন্ত্রীর নয়া ভ্যাট আইন এবং পাপ কর (আবাগরী শুল্ক) জনগনকে একেবারেই কোনঠাসা করে ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে! চালের দাম ইতিমধ্যে হু হু করে বাড়ছে। ছুতো দেয়া হচ্ছে হাওড়াঞ্চলে বন্যার কারণে ফসলহানির। আর রোজার আগেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। ফলে নিশ্চিত হচ্ছে পনের কোটির নাভিশ্বাস!

এই সরকারের বাজারের ওপর কোন নিয়ন্ত্রন নেই। নাকি নিয়ন্ত্রণের কোন ইচ্ছে আছে? বাজার মনিটরিংয়ের নামে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নামে জনগনের সাথে রসিকতা করে। আর ‘ব্যবসা-বান্ধব’ দাবি করে বাজারের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাবানদের সিন্ডিকেটের ওপর ছেড়ে দেয় জনগণের টাকা লুটে নিতে!

মোটা চালের কেজি ৪৫-৪৮ টাকা। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের হিসেব মতে, গত এক বছরে মোটা চালের দর বেড়েছে ৪২ শতাংশ। বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেয়ার পরিণতি! ১০ টাকা কেজি দরে চাল, প্রতি পরিবারের একজনের চাকুরি – এরকম রূপকথাসুলভ প্রতিশ্রুতি দেয়ার শিকার একেবারেই সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষগুলি!

সরকারী গুদামে মওজুদ কমেছে চাল সংগ্রহ অভিযান একেবারেই ব্যর্থ। চালের বাজারের নিয়ন্ত্রক ব্যবসায়ীরা বুঝে গেছেন, বাজারে হস্তক্ষেপ করার মত মওজুদ সরকারের কাছে নেই। ফলে তারা অবলীলায় দাম বাড়িয়ে যাচ্ছেন। চাল ব্যবসায়ীদের মওজুদ সম্পর্কে খাদ্যমন্ত্রী অন্ধকারে। কোন পর্যায়ে ধারণা নেই, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে মওজুদের পরিমান কত? সুতরাং কৃত্রিম সংকট তৈরীর সহজ কাজটি করে দাম বাড়াচ্ছে প্রতিদিন।

বিশ্ব বাজারে চালের দাম বাড়ছে ঠিক; বিশেষ করে বাংলাদেশ যে সব দেশ থেকে আমদানী করে। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমদানী ব্যয় বাড়তো না-এমন বত্তব্য বিশ্লেষকদের। চাল আমদানীর শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও কবে সে চাল বাজারে ঢুকবে সে বিষয়টি অনিশ্চিত। চাল নিয়ে সত্যি সত্যি কি বিপাকে পড়তে যাচ্ছে দেশ? আর কে না জানে, এজন্য দায়ী কারা। কারণ চালের মজুদ নিম্নগামী হওয়ার সাথে সরকার তৎপর হলে আজকের পরিস্থিতি হতো না। এর দায় নিতে হবে না কাউকে!

সিন্ডিকেটগুলির হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দেবার পাশাপাশি খোলা বাজারে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির নামে লুটপাটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। ১০ টাকা কেজির চাল যাদের প্রাপ্য তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না বলেই নানা অভিযোগ।

তিন. নতুন ভ্যাট আইনকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের ছক কমপ্লিট। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ভয়াল খাঁড়া নেমে আসতে যাচ্ছে জনগনের মাথায়। ভ্যাট থাবায় বাড়ছে বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম। মূল্যস্ফীতির যে চাপ বাড়তে যাচ্ছে তার গোটা দখলটাই তাদের এভাবে সকলকে বলি হতে হচ্ছে উচ্চকাঙ্খার মূল্য হিসেবে।

এবারের বাজেট সাদা চোখে দেখলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোন জবাবদিহিতা না থাকায় কোনই তোয়াক্কা নেই। বেপরোয়া রাজস্ব সংগ্রহের এই বাজেট কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সে নিয়ে কোন সংশয়কে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। নিকট অতীতের কোন বাজেটে বরাদ্দ এডিপি’র ষাট শতাংশ অর্জিত হয়নি। এবারে কতগুলি মেগা সাইজের প্রকল্প ফোকাস করা হয়েছে- যা দেখে মনে অনেক ধরনের প্রশ্নই মনের মধ্যে উঠতে পারে।

তবে বলতেই হচ্ছে, এখন জনগনের কোন মূল্যই নেই; এ কারনে তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাংখা, প্রত্যাশাও মূল্যহীন। এখন তারা শুধুই সংখ্যা; নির্বাচনেও তাদের কোন দাম নেই; প্রয়োজনও নেই।

ক্রিকেট যখন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক

আসিফ হাসান ::

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল আমার দাদা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমার বাবা, আর এখন ভারতের বিরুদ্ধে লড়ছি আমি- আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগে সামাজিক মাধ্যমে এমন ধরনের একটি মন্তব্য ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের প্রসঙ্গ আসার কারণ, ওই দুই দল সেমিফাইনালে খেলেছে। ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে পাকিস্তানের মুখোমুখি হতে হবে- এমন আশাবাদকে সামনে রেখে ওই বক্তব্যটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।

ভারতের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের আগে দিয়ে আরো কিছু ফটোশপ কারুকাজ, ভিডিও আপলোড হয়। সবগুলোতেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হুঙ্কারে ভারতের নাজেহাল অবস্থা ফুটে ওঠে। বহু ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হচ্ছে; তারপরেও ফেসবুক-পাগল তরুণ প্রজন্ম খেলা শুরু করে দিয়েছে। এই লড়াইয়ে তারা হারতে নারাজ। ভারত যত বড় প্রতিপক্ষই হোক না কেন, বাংলাদেশই জয়ী হবেই- এটাই তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-শ্লোগান।

ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটির ফলাফল যা-ই হোক না কেন, বর্তমান ক্রিকেট বাংলাদেশে নতুন মাত্রার সৃষ্টি করেছে। এটা আর শুধু খেলা নয়। আমাদের জাতিসত্তার একটি পরিচিতিফলকে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ হলে সেটা নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আগে এখানকার মানুষ কাকে সমর্থন করতো? পাকিস্তান বা ভারতকে। যারা ‘পাকু’ বা ‘ভাকু’ গালি শুনতে রাজি ছিলেন না, তারা শ্রীলঙ্কাকে সমর্থন করতেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের সাথে সাথে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত শক্তিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। একসময় ব্রাজিলের মানুষ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যেমন গণতান্ত্রিক ও উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল, ফুটবলই তাদের দৈনন্দিন যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ দেখাতো, ক্রিকেট সম্ভবত তার চেয়ে আরো বড় করে বাংলাদেশের মুক্তির দিশা দিতে এগিয়ে এসেছে। এ দেশের মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকেই জাতীয়তাবাদের স্বপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারনবাদ, উপনিবেশিকতার  বিরোধী। সেটাই এখন ফুটে ওঠেছে ক্রিকেটের মাধ্যমে। ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে তরুনদের মাঝে জাতীয়তাবাদের ভিত শক্ত-পোক্ত, কোন দলীয় পক্ষ নয়- সবাই এখানে এক পক্ষ। আমরা অন্য কারো নই, আমরা বাংলাদেশী। আমরা এগিয়ে যাবোই।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ শক্তি হলো ভারত। একসময় খুব সহজেই বাংলাদেশকে হারাত ভারত। ছবিটা বদলে যায় ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সেবার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে ‘টিম ইন্ডিয়া’কে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল, বাংলাদেশের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল সৌরভ-শচিনদের। তারপর ২০১১ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে হেরে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৫-র বিশ্বকাপে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কোয়ার্টার ফাইনালে ফের মুখোমুখি হয় ভারত-বাংলাদেশ। ম্যাচের আগেই জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানো হয় ‘জিতেগা ভাই জিতেগা, ইন্ডিয়া জিতেগা’। এ হেন বিজ্ঞাপন মেনে নিতে পারেননি তদানীন্তন বাংলাদেশের আইসিসি প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা কামাল। তিনি নিজে আইসিসি-র সিইও ডেভিড রিচার্ডসনকে ডেকে এই বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে বলেন। তার পরও তা বন্ধ হয়নি। মাঠের ভিতরেও ছড়ায় উত্তাপ। রুবেল হোসেনের বলে ক্যাচ তুলেও আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বেঁচে যান রোহিত শর্মা। রিপ্লেতে দেখা যায়, বলটি কোমরের নিচেই ছিল। বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মাহমুদুল্লার ক্যাচ নিয়েছিলেন শিখর ধাওয়ান। তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। ওই সময় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ছিলেন এন শ্রীনিবাসন। তার একগুঁয়েমি, বড়-র মানসিকতা বাংলাদেশে বিরূপ চেতনাকে প্রবল করে তোলে। আইসিসি প্রেসিডেন্ট  এবং মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) পর্যন্ত শ্রীনিবাসনের হীন লালসার বিরোধিতা করেন প্রকাশ্যে।

বিশ্বকাপের পরই বাংলাদেশ সফরে যায় ভারত। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল হেরে বসে ১-২-এ। প্রথম দু’টি ম্যাচ ‘কাটার মাস্টার’ মোস্তাফিজের সৌজন্যে জিতে নেয় বাংলাদেশ। এই সিরিজে মোস্তাফিজকে ধাক্কা মেরে ব্যাপক সমালোচিত হন ধোনি। ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুতেও ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচটি উত্তাপ ছড়িয়েছিল। জেতা ম্যাচ মুশফিকুর রহিমরা ছুড়ে দিয়ে চলে আসেন। ১ রানে ম্যাচ জেতে ভারত। এখানে জয় বা পরাজয় বড় কথা নয়। আমরা লড়াই করবো- এটাই শেষ কথা।

এখন আবার ভারতের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। আর সেটাকে কেন্দ্র করেই ছড়াচ্ছে নতুন উত্তাপ। এই উত্তাপ মনে হয় কখনো কমবে না।

সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি এবং জনগণের সীমাহীন ভীতি

আমীর খসরু ::

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকগণ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন এখন থেকে বহু শত বছর আগে থেকেই। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস, শার্ল লুই মঁতেস্ক্য, জ্যঁ জাঁ রুশো পর্যন্ত যারা রাষ্ট্রের প্রণালীবদ্ধ মতবাদ বিকশিত করেছেন তাদের ভাষ্য- রাষ্ট্র মানবমুক্তির সম্ভাব্য গ্যারান্টি। রুশো প্রথমবারের মতো ‘সামাজিক চুক্তির’ কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। আর এর অর্থ হচ্ছে- রাষ্ট্রের কাছে জনগণ তার অধিকার সমর্পণ করবে এবং রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত অধিকার রক্ষা ও জীবন যাপনের নিশ্চিতি বিধানে সচেষ্ট হবে। এর ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের বৈধতার আইনী অস্তিত্ব বিরাজমান। রাষ্ট্র জনকল্যাণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে- এটাই হচ্ছে তাদের কথা। আর এখানেই রাষ্ট্রের পক্ষে এর ম্যানেজার অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আদায়, আয়-ব্যয়সহ সব ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য থাকা উচিত, জনকল্যাণ এবং জনগণের উন্নয়ন। আর এ কারণেই সরকারের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় করে আসে। এর ব্যতয় যদি হয় তবে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের সকল কার্যক্রমই আইনের ব্যতয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়ে পড়ে।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন জিজ্ঞাসা এবং ঔৎসুক্য থাকায় বারণ আছে। এটাও ঠিক যে, পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পুরোপুরি অর্থাৎ শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে পারেনি। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা বা রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্ট- এর প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ড মিল থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতি বিজ্ঞানীই এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। কিন্তু যতো বেশি সম্ভব গণতন্ত্র নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যতো বেশি গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে, উন্নয়ন ততো বেশি জনকল্যাণমুখী হবে। বর্তমান জামানার প্রখ্যাত দার্শনিক, লেখক সামির আমীন তার সম্পাদিত ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি বইয়ে (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন-প্রতিরোধের বিশ্বময়তা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা, ২০০৪) বলেছেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে গণ-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন।

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি নেই- সে বিষয়টি আদৌ বিবেচনায় নেয়া হয় না; বরং এর উল্টোটাই ঘটে থাকে সব সময়। আর উল্টো কথা শুনতে শুনতে এখন জনগণ আগাম বুঝে গেছে ক্ষমতাসীনরা কি বলতে চাইবে, চায়, বা চাচ্ছে।

এখন দেশের উপরিতলার মানুষদের জন্য ব্যাপক আলোচনার বিষয়- ‘‘বাজেটে কি করিলে কি হইতো’ জাতীয় বিষয়াবলী। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখছে বাজেটকে ভিন্নভাবে। আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লো কিনা, প্রকৃত আয় কতোটা কমলো ইত্যাকার বিষয়াদিকেই তারা বাজেট হিসেবে মনে করেন। এটা শ্রেষ্ঠতম কিংবা পাপমুক্ত হয়ে পুণ্য লাভের জন্য হয়েছে কিনা সে বিবেচনার সময়টুকুও তাদের নেই।

এতোদিন মধ্যম ও ক্ষুদ্র আয়ের মানুষজন নিরাপত্তার খাতিরেই ব্যাংকে অল্প-স্বল্প অর্থ জমা রেখে নিজ নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ব্যয় করতেন। এখন সেখানেও সরকারের হানা। যারা অর্থাভাবে শপিং মলে যেতে পারেন না, তারা ছোটোখাটো দোকানে গিয়েও দেখেন ‘ভ্যাটের থাবা’।

এই মুহূর্তে র্যা ব-পুলিশ-আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর চেয়েও ভ্যাটভীতিই মানুষকে বেশি বিচলিত করছে। ঢালাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে এর প্রভাব প্রান্তিক মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত ও বিপন্ন করবে। প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা সিপিডি এ কারণেই বলেছে, এই বাজেট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। হয়তো অর্থমন্ত্রী এসব গবেষণালব্ধ কথাকেও কখন বলে বসবেন- রাবিশ!

তবে ভ্যাট, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা কর্তনসহ নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যই অর্থমন্ত্রী মুহিত বলার হিম্মত ও সাহস রাখেন এই বলে যে, জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি তিনি দিয়েছেন। এটা তার পক্ষেই মানায়। কারণ লোপাট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকাকে তিনি যেভাবে তুচ্ছজ্ঞান করে বক্তব্য দিয়েছেন- তাতে এমন কথা তিনি এবং তারা ছাড়া কে বা কারা বলতে পারে?

নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার জন্য অর্থমন্ত্রী মুহিতকেই শুধু বাহবা দিয়ে কোনো লাভ নেই; অধিকাংশ তার প্রাপ্যও নয়। অর্থমন্ত্রীকে যিনি মন্ত্রীসভায় রেখেছেন বাহবা এবং ধন্যবাদটা তারই বেশি প্রাপ্য।

কিন্তু এ কথাটি মনে রাখতে হবে, ভ্যাট বৃদ্ধি ও এর উপরে নির্ভরতা তখনই মানায়, যখন  মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তারা সক্ষম হন অর্থনৈতিকভাবে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন সারা জীবনই এই সক্ষমতার তত্ত্বের কথা বলেছেন। অবশ্য এসব তত্ত্ব জানলে বা শুনলে তো আর শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি অর্থমন্ত্রী মুহিত এবং তার সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব হতো না।

তবে আমজনতার একটিই কথা হচ্ছে-এটাই কি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের চুক্তি? এ কথাটি মনে রাখতেই হবে, জনমানুষ যখন ওই চুক্তির উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে (অবশ্য ইতোমধ্যে ফেলেছে) তখন আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিই জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আর সেটাই বিশাল এক দুর্ভাবনার বিষয়।