Home » সম্পাদকের বাছাই (page 12)

সম্পাদকের বাছাই

বাজেট : পাপমুক্ত করে অসীম পূন্যলাভের পদক্ষেপ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এই জনগন ঝাঁকের কৈয়ের মত ভোট দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে; বুক বেঁধে ভবিষ্যতের আশায়। এখন  বর্তমান বলেও কিছু নেই বলেই মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ভোট দেয়ার সুযোগই মেলেনি। এক অভূতপূর্ব এবং প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচনে জনগনের কোন স্থান ছিল না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ছিলেন ১৫৩ জন। এদেরই একজন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। সুতরাং নির্বাচকমন্ডলীর কাছে তার বা তাদের কোন জবাবদিহিতা থাকার কথা নয় এবং নেইও।

কোন জবাবদিহিতা না থাকায় চলতি বছরের বাজেটে এজন্যই চেপে বসেছে বিশাল করের বোঝা। জনগনের পকেট কেটে অথবা কষ্টে-সৃষ্টে জমানো টাকাও ট্যাক্স-ভ্যাটের নামে কেড়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবারে জনগনকে টাকা গুনতে হবে নানাভাবে। সে বিভিন্ন ধরনের কর পরিশোধ করবে। বছরে তিন-চারবার বেড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করবে। পনের শতাংশ ভ্যাট সৃষ্ট দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি তার চোখের জল আর নাকের জল এক করে ছাড়বে।

প্রশ্নটি জরুরী, জনগন আর সরকার কী আলাদা হয়ে গেছে? লুটেরা পুঁজিপতি, কতিপয় সরকারী কর্মকর্তা (কর্মচারী নয়), কর্পোরেট আর সরকারী দলের স্বার্থ কি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে? বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সুযোগ-সুবিধার কথা একেবারেই বিবেচনায় আসছে না? অর্থমন্ত্রী তার কথ্যমতে জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম’ বাজেট দিয়েছেন, নাকি জনগনের ওপর ‘শ্রেষ্ঠতম বালা-মসিবত’ নাজিল করলেন? বাজেট পাশ হওয়ার আগেই সেটি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

এই ‘শ্রেষ্ঠতম’ বাজেট ঘোষণার পর সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলেছে, বাজেট দলিলের জায়গায় জায়গায় অসত্য তথ্য দিয়ে বাজেট অঙ্কের হিসাব মিলানো হয়েছে। তাদের মতে, ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার হিসেব অঙ্ক জানা কোন শিশুও বিশ্বাস করবে না। সিপিডি’র বক্তব্য সত্য ধরে নিলে কি এই দাঁড়ায়, অর্থমন্ত্রী কী লুটেরা পুঁজির আরো স্ফীতি ঘটাতে এবং কতিপয় জনগনের পকেট খালি করে কতিপয় ব্যক্তির হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করার সুযোগ সৃষ্টি করলেন।

অর্থশাস্ত্রে আবাগারী শুল্ক শব্দটি বাংলায় ‘অপরাধ বা পাপ কর – sin tax’ বলেই গন্য করা হয়। এই কর মূলত: আবাগারী শুল্ক হিসেবে পরিচিত। দেশে উৎপাদিত তামাক, এ্যালকোহলবা মদ জাতীয় পন্য ও লাইসেন্স প্রাপ্ত মদ, খাঁজা, আফিম ব্যবসার ওপর আবাগারী শুল্ক প্রযোজ্য। সমাজের জন্য ক্ষতিকর নেশা বা পরিবেশ দুষণকারী দ্রব্য ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে এই ‘পাপ’ কর আরোপ এবং ফি-বছর পর্যালোচনা করা হয়।

তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম’ বাজেটে ব্যাংকে লাখ টাকার আমানতকারীকেই ‘সম্পদশালী’ আখ্যা দিয়ে ‘পাপ’ করের বোঝা চাপালেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, লাখপতি মানে সম্পদশালী এবং ব্যাংকে আমানত করা ‘পাপ’, সেজন্য তাদের আবাগারী শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। জনগন অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে পারে বাজেটে তাদের ‘পাপমুক্ত’ করা ও অসীম পূন্যলাভের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য, কৃতজ্ঞতা জানাতে পারে অর্থমন্ত্রীর নিয়োগদাতা প্রধানমন্ত্রীকেও।

এই ‘পাপ’ আসলে কার? রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “এ আমার, এ তোমার পাপ”। তাহলে সেই পাপের ভার সাধারন জনগন নেবে কেন? এর উত্তর কি প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রীর কাছে আছে? তারা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনকে আলাদা করে দিয়েছেন। এজন্য ফি-বছর বাড়াচ্ছেন বিদ্যুৎতের দাম, গ্যাসের দাম। এমনকি বছরে দুবার করে। আট বছর ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দামের নিম্নগামীতা কোন সুফলই এই জনগন পেলো না!

প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, “জনগনের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে”। অর্থমন্ত্রীর কথায়, জনগন লাখপতি। সুতরাং তাদের সিনট্যাক্স বা পাপ কর দিতে হবে। পনের শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য বাড়িয়ে তুলবেন, টাকার অবমূল্যায়ন ঘটাবেন এবং জনগনের পকেটের সমুদয় অর্থ নিয়ে যাবেন দেশের কথিত উন্নয়নে!

এই উন্নয়ন ‘ভিকটিম’ তারাই হবেন যাদের হাতে দেশের সত্যিকার উন্নয়ন ঘটছে। কৃষক উৎপাদন করবে, তার কন্যা গার্মেন্টসে কাজ করে পোশাক রপ্তানী বাড়াবে, কৃষক পুত্র মধ্যপ্রাচ্যে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পুষ্ট করবে। এই প্রান্তিক পরিবারগুলি অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে ব্যাংকে অর্থ আমানত করলে তাকে আবাগারী দিতে হবে অর্থমন্ত্রীর শ্রেষ্ঠতম উচ্চাভিলাষের বলি হয়ে!

অচিরেই এই আবাগারী কর আমানতকারীদের জন্য হয়ে উঠবে ‘নিপীড়ন কর’। পৃথিবীর কোন দেশে এরকম করের কথা শোনা যায়নি। এই দেশের জনগন ব্যবহার করেন সেভিংস একাউন্ট। এখানে সঞ্চয় ছাড়া তার বেতনসহ নানা লেন-দেনের টাকা জমা ও উত্তোলন হয়। তাহলে বছরের বার লাখ তাকে এই আবাগারী বা পাপ কর দিতে হবে। পলিসি রিসার্চ ইনষ্টিউটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এটিকে অবিহিত করেছেন, “দিনে-দুপুরে ডাকাতি” বলে।

জনগনের পকেট কাটা বা জনচাঁদাবাজি এবং প্রবৃদ্ধির হিসাব মিলিয়ে দিতে ‘অবাস্তব তথ্য’ ব্যবহার যদি সাফল্য হয়, তো অর্থমন্ত্রী সফল! জনগনের ওপর করারোপে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়ে বাজেট প্রণয়নে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে পিঠ চাপড়াচ্ছেন! তাহলে কী ব্যাংক সেক্টরে ঋণের নামে লুটপাট, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি, হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণসহ পাচারকৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি কি সরকার এভাবে পুষিয়ে নিতে চায়?

ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে লুটতরাজ এবং খেলাপী ঋণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাতকে অকার্যকর করে দিলেও অর্থমন্ত্রী মোটেও চিন্তিত নন। এমনকি অর্থপাচার নিয়েও তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নন। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের যেসব কাহিনী শুনি তা সঠিক নয়। এইগুলি রঙ-চঙ দিয়ে বলা হয়। তবে অর্থপাচার যে একেবারে হয় না, তা নয়। যে ধরনের অর্থপাচারের কথা বলা হয়, বাস্তবে ততটা হয় না। অর্থপ্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চুরি অহরহ হবে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে’।

ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা ছাড়াই এবং অর্থপাচারকারীদের চিহ্নিত না করে বাজেটে নতুন করে ২ হাজার কোটি টাকা সরকারী ব্যাংকগুলিকে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে, এই অর্থের জোগান দিতে ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকার ওপর কর বসানো হয়েছে?  নাকি আরো খেলাপী ঋণকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে তোলার জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর অর্থমন্ত্রীকে দিতে হবে। কারণ ক্রমাগত ধ্বস নামা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগনের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়।

এমনিতেই সাধারন গ্রাহকদের ওপর ব্যাংকগুলোর জুলুম চলছে। নানা অজুহাতে টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। লেজার ফি, কার্ড ফি, চেক বইয়ের ফি সহ নানা ছুতোয় ব্যাংকগুলি ফি-বছর গ্রাহকদের টাকা কেটে নিচ্ছে। অথচ পৃথিবীর কোন দেশে এগুলোর জন্য আলাদা মাশুল দিতে হয় না। কারণ ব্যাংকগুলি গ্রাহকের আমানত বিনিয়োগ করে লাভবান হন। এজন্য নানাধরণের প্রণোদনার মাধ্যমে তারা জনগনকে আকৃষ্ট করে থাকে।

সেজন্যই প্রশ্ন উঠতেই থাকবে এই বাজেটের কেন্দ্রে কারা, উপকারভোগী কারা হবে? এটি কি শুধুই স্বপ্নযাত্রা না এর কোন দিকদর্শন আছে? উত্তর অর্থমন্ত্রীই ভাল দিতে পারবেন। কারণ প্রতিবার বাজেট ঘাটতি এবং এডিপি’র বাস্তবায়ন প্রমান করে যে, বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সরকারের নেই। না থাকলেও এই বাজেট প্রণয়নের সুবিধাভোগী যে জনগন নয়, বিশেষ একটি শ্রেনী, সেটি অনুধাবন করতে পন্ডিত হওয়ার দরকার হয় না।

সরকার বড় ব্যবসায়ী ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করেছে। এই নীতি প্রমান করে, বড় ধনী এবং বৃহৎ শিল্প উন্নয়নে সরকার যতটা আগ্রহী, মধ্য ও নিম্নবিত্তদের ক্ষেত্রে সরকারের বিবেচনা ততটাই কম। এটি একটি অনির্বাচিত সরকারের নীতি হতে পারে! তাহলে কি সেই অভিযোগই বর্তমান সরকার প্রমান করতে চায় যে, তারা আসলে জনগনের ভোটে নির্বাচিত নয় এবং জনস্বার্থ থোড়াই পরোয়া করে।

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে মজার কথাটি বলেছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তার মতে, রমজান এলে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের জন্য জিনিষপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। কি অদ্ভুত কথা! সরকারে কারা আছে? দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনের দায় তো সরকারের।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন : বাংলাদেশ ক্রিকেটের অব্যাহত উত্থান

টিম উইগমোর ::

অনুবাদ : আসিফ হাসান ::

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৫ সালে অ্যাডেলেড ওভালে। ওই দিনটির পর বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আর অস্বীকার করার জো রইল না। রুবেল হোসেনের দুটি ফুল, স্ট্রেইট ও সুইং ডেলিভারি বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে ছিটকে দিয়ে বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলে।

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি মাঠেই ছিলেন। বাংলাদেশের পুরো ট্যুরেই তিনি ছিলেন। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি গুছানো, টুর্নামেন্ট আয়োজন, বিপণন ইত্যাদি নানা কাজে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন তিনি। তিনি জানান, ‘ওই খেলাটা দেখতে পারা ছিল বিশেষ এক ঘটনা। বিদেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারানো মানে বিরাট কিছু।’

ববি এখন বোর্ড পরিচালক। জন্মগ্রহণ করেছেন রাজধানী ঢাকায় ১৯৫৯ সালে। তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ। দুই বছর বয়সে তিনি প্রথম টেস্ট ম্যাচ দেখেছিলেন। ঢাকায় ম্যাচটি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যে। তবে টেস্ট ম্যাচ আয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানের বঞ্চিত করার নীতি আড়াল করতে পারেনি। জনসংখ্যায় পূর্ব পাকিস্তান অর্ধেক হলেও সরকারি ব্যয়ের মাত্র এক তৃতীয়াংশ লাভ করতো। ববি বলেন, ব্রিটিশদের দুই শ’ বছরের উপনিবেশ শাসনের পর চলে পাকিস্তানিদের ২৫ বছরের নৃশংস ও দমনমূলক শাসন।

এ ধরনের বৈষম্য ক্রিকেটেও প্রকটভাবে দেখা যেতে থাকে। নির্বাচকদের সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। পূর্ব পাকিস্তানি দলগুলো মাঝে মধ্যে পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে খেলতে পারতো। মূল কারণ ছিল তহবিলের অভাব। পাকিস্তান দলের জন্য মাত্র একজন পূর্ব পাকিস্তানি খেলোয়াড়কে বাছাই করা হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ঢাকায় কমনওয়েলথ একাদশের বিরুদ্ধে ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনে ফুঁসছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া শেখ মুজিবরের নির্দেশে প্রতিবাদ জানাতে ছাত্ররা স্টেডিয়ামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

নতুন স্বাধীন দেশটিতে নৃশংস যুদ্ধের ক্ষত ও মানবিক সঙ্কটে পড়ে। ক্রিকেটও তাতে আক্রান্ত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ব্যয়বহুল খেলা হিসেবে ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়া ছিল অসম্ভব, এমনটাই ববি জানান। ১৯৭২ সালে প্রিমিয়ার লিগ স্থগিত করা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনের ক্রিকেট সামগ্রী দানের পর তা আবার চালু হয়েছিল। একটি নতুন ব্যাটের দাম ছিল একজন সরকারি কর্মকর্তার গড় মাসিক বেতনের সমান। জাতীয় দল অনুশীলন করার সময় বোর্ড পানি পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারতো না।

স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক আবদুল কারদার বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদায় উন্নীত করার সুপারিশ করেছিলেন। তার পরামর্শ অগ্রাহ্য করা হয়। বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালের প্রথম বিশ্বকাপে খেলার আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

সাসেক্সের খেলোয়াড় এবং সাংবাদিক রবিন মার্লার বাংলাদেশ ক্রিকেটে দুরাবস্থা তুলে ধরেছিলেন। তার প্রতিবেদনগুলো এমসিসিকে ১৯৭৬-৭৭ সময়কালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সফরে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ববি বলেন, বিশ্ব দরবারে এটাই ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার মতে, এটাই বাংলাদেশের প্রধান খেলা হিসেবে ফুটবলকে হটিয়ে ক্রিকেটের স্থান অধিকার করতে সহায়ক হয়।

বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এটা ছিল পাঁচটি ব্যর্থ প্রয়াসের প্রথমটি। কোয়ালিফায়ার পর্বে ডেনমার্ক ও মালয়েশিয়ার কাছে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। একবার সুযোগ হারানো মানে ছিল আরো চার বছর অপচয়।

কিন্তু তারপরও ক্রিকেটের সাথে বাংলাদেশের মনের টান কমেনি। ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ এশিয়া কাপে খেলতে থাকে। ওয়াসিম আকরামের মতো ক্রিকেটারের ঘরোয়া লিগে খেলা ছিল গৌরবের বিষয়। অনেক পরে আইসিসি এদিকে নজর ফেরায়। ১৯৯৮ সালে তহবিল বাড়ানোর জন্য আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ প্রথম আসরের আয়োজন করে। তার আগ দিয়ে প্রবল বন্যা হয়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ববি বলেন, চ্যালেঞ্জ ছিল পর্বতপ্রমাণ। কিন্তু বাঙালিদের সহনক্ষমতাও কম ছিল না।

এক বছর পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেয়। তারা স্কটল্যান্ডকে এবং তারপর দুর্দান্তভাবে পাকিস্তানকে পরাজিত করে। এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা উচ্চকিত করে। বাংলাদেশে আইসিসি পরিদর্শক দলের কার্যক্রমে সহায়তা করেন ববি। তিনিই বোর্ডের উপস্থাপনায় সাহায্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, বিশ্বায়নের প্রথম স্থান হতে পারে বাংলাদেশ। কারণ জনগণ, সরকার, মিডিয়া ও স্পন্সরদের সমর্থন আছে আমাদের।’

বিড ছিল সফল। পারফরমেন্সের চেয়ে সম্ভাবনা এবং রাজনীতিই ছিল নেপথ্য শক্তি। বিশেষ করে আমাদের চেয়ে কেনিয়া দল ছিল অনেক ভালো। তাদের পাশ কাটিয়েই বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা লাভ করে।

ওই সময় বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। কিন্তু সেই প্রত্যাশাও পূরণের কাছাকাছিও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৭২টি ম্যাচে খেলে হেরে যায় ৭১টিতে। ববি ওই প্রসঙ্গে বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। ১৯৯৯ সালে একাধিক দিনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তিটি ‘অপরিণত’ ছিল না। বাংলাদেশের সামনে উন্নতি করার একটিই রাস্তা ছিল, সেটা হলো শক্তিশালী দলগুলোর বিরদ্ধে খেলা।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ মাঝে মধ্যেই তাদের মূল্য বোঝাতে শুরু করে। ২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরাস্ত করা, ২০১০ সালে ওডিআই সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে ৪-০-এ বিধ্বস্ত করা ছিল কিছু উদাহরণ। অবশ্য তখনো আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা বহাল ছিল। ১৪ জন ক্রিকেটার ২০০৭ সালের বিদ্রোহী ভারতীয় ক্রিকেট লিগে যোগ দেয়, দুর্নীতির দায়ে প্রতিভাবান মোহাম্মদ আশরাফুলকে নিষিদ্ধ করা হয়।

অ্যাডিলেড নতুন দলের জন্ম দেয়। দেশের মাটিতে টানা ছয়টি ওডিআই সিরিজে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ করে নেয়। এখন তাদের র‌্যাংকিং ছয়। গত অক্টোবরে বাংলাদেশ হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। জিম্বাবুয়েকে বাদ দিলে এটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ টেস্ট দলকে হারানো। তারপর মার্চে শ্রীলঙ্কার সাথে সিরিজ ১-১-এ ড্র করে।

এটাকে শুরু বিবেচনা করা উচিত। টেস্ট দেশগুলোর জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু ভারত ও পাকিস্তানের পেছনে। ক্রিকেটের জন্য অতৃপ্ত নেশা এবং খেলা ও খেলার বাইরের উন্নত অবকাঠামো লাভের সুবাদে বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে ক্রিকেটের পরবর্তী প্রধান শক্তি।

ববি বলেন, ক্রিকেট কেবল কিছু ম্যাচে জয়ের ব্যাপার নয়। এর চেয়ে অনেক বড় বিষয়। ক্রিকেট বাংলাদেশকে ইতিবাচক পরিচিতি দিয়েছে, পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ক্রিকেট একটি পুরো প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর সাহস দিয়েছে।

তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ ওডিআই জাতিতে পরিণত হবে। কথাটা বলেই তিনি সাথে সাথে সংশোধন করে নেন : ‘না, শীর্ষ তিনে।’

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি : বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ভারতের সামরিক ব্যয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। আর তার জের ধরে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেড়েছে অস্ত্র খাতে ব্যয়। ২০১৫ সালের তুলনায় ০.৪ ভাগ বেড়ে ২০১৬ সালে সামরিক খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৮৬ বিলিয়ন ডলার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এ তথ্য জানিয়েছে। ২০১০ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে, আর পশ্চিম ইউরোপেও বেড়েছে  টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। বিশ্বে ২০১১ সালের পর এবারই প্রথম টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সামরিক ব্যয় বাড়ল। তবে কষ্টের মধ্যেও সুখের বিষয় হলো- সেটা ওই বছরের ১৬৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেনি।

সামরিক ব্যয়ের ধারায় অঞ্চল ভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। এশিয়া, ওশেনিয়া, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় বেড়েছে। বিপরীতে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা এবং উপ-সাহারীয় এলাকায় কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ১ নম্বরেই :

এখনো যুক্তরাষ্ট্রেই সর্বোচ্চ পরিমাণে সামরিক ব্যয় হয়ে থাকে। ২০১৫ সালের তুলনায় দেশটিতে সামরিক ব্যয় ১.৭ ভাগ বেড়ে ৬১১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের দেশ চীনে ২০১৫ সালের তুলনায় ৫.৪ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৫ বিলিয়ন ডলার। বৃদ্ধির হারটি গত বছরের চেয়ে অনেক কম। রাশিয়ার ব্যয় ৫.৯ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার। দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম ব্যয়কারী। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ছিল তৃতীয় স্থানে। এখন সে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ সত্ত্বেও তাদের ব্যয় ৩০ ভাগ কমে হয়েছে ৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের সামরিক ব্যয় ৮.৫ ভাগ বেড়ে ৫৫.৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তারা এখন পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়ের দেশ।

মার্কিন সামরিক ব্যয় বাড়াটি আশঙ্কাজনক। ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক ব্যয় কমানোর ধারা থেকে তারা আবার সরে এসেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমে গিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক বাজেটে সংযম দেখা গেলেও সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ছে।

ভয়ে বাড়ছে ইউরোপের ব্যয় :

পশ্চিম ইউরোপে সামরিক ব্যয় বেড়েছে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। আগের বছরের চেয়ে তা ২.৬ ভাগ বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধি হয়েছে মূলত তিনটি দেশে। ইতালিতে লক্ষ্যণীয় ১১ ভাগ বেড়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে আক্রমণের শঙ্কায় সার্বিকভাবে মধ্য ইউরোপে ২.৪ ভাগ ব্যয় বেড়ে গেছে।

তেল রফতানিকারক দেশগুলোর কমেছে:

তেলের দাম কমে যাওয়ার যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, মূলত সে কারণেই অনেক তেল রফতানিকারক দেশ অস্ত্র আমদানিতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবের কথা বলা যায়। তাদের ব্যয় কমেছে ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে সবচেয়ে বেশি কমেছে ভেনেজুয়েলায়। তারা কমিয়েছে ৫৬ ভাগ। এছাড়া দক্ষিণ সুদান ৫৪ ভাগ, আজারবাইজান ৩৬ ভাগ, ইরাক ৩৬ ভাগ, সৌদি আরব ৩০ ভাগ কমিয়েছে। এছাড়া অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, ওমান ও পেরুও সামরিক খাতে ব্যয় বেশ কমিয়েছে। তবে আলজেরিয়া, ইরান, কুয়েত, নরওয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বেশ বাড়িয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য :

১. বিশ্বে সামরিক খাতের ব্যয় বৈশ্বিক জিডিপির ২.২ ভাগ। জিডিপির হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় করে থাকে। ২০১৬ সালে জিডিপির ৬.০ ভাগ ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। সর্বনিম্ন আমেরিকায়। সেখানে জিডিপির ১.৩ ভাগ খরচ হয়েছে এই খাতে।

২. ২০১৬ সালে আফ্রিকায় ব্যয় কমেছে ১.৩ ভাগ। টানা ১১ বছর বাড়ার পর এবারই এখানে ব্যয় কমল। মূলত তেলের আয় কমায় এমনটা ঘটেছে।

৩. এশিয়া ও ওশেনিয়ায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৪.৬ ভাগ। দক্ষিণ চীন সাগরে আঞ্চলিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মূলত এই ব্যয় বেড়েছে।

৪. ইকুয়েডর, মেক্সিকো, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় তেল রাজস্ব কমায় মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক ব্যয় কমেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্রাজিলে সামরিক ব্যয় কমেছে।

ট্রাম্পের সৌদি সফর : বিশাল অংকের অস্ত্র বিক্রয় আর ইরানকে হুমকিই উদ্দেশ্য

আমাদের বুধবার বিশ্লেষন ::

প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নেওয়ার পুরস্কার হাতে হাতে পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  সৌদি বাদশাহ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র  ক্রয়ের চুক্তি করেছেন। নগদ প্রাপ্তির পাশাপাশি দুই দেশের অভিন্ন শত্রু  ইরানকেও বার্তা দিয়ে দেওয়া হলো এই চুক্তির মাধমে। এছাড়া ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও নানা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির পুন:নির্বাচিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প আর বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের উপস্থিতিতে চুক্তিটি সই হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। পূর্বসূরি বারাক ওবামার আমলে ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা নাখোশ হয়েছিল। ইসরাইলও তীব্র বিরোধী ছিল ইরানের সাথে চুক্তির।

ট্রাম্প ওই পথে হাঁটছেন না। তিনি কেবল সৌদি আরবের সাথেই চুক্তি করেননি, সৌদি রাজধানীতে মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের একটি সম্মেলনেও ভাষণ দেন।

এটাও আবার ২০০৯ সালে কায়রোতে ওবামার ভাষণেরই জবাব বলে মনে হচ্ছে। ওবামা যেমন ওই ভাষণের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন। ট্রাম্পও সেই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন আরো বড় পরিসরে। ইরাক যুদ্ধের ফলে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল, ওবামা সেটা সংশোধন করার উদ্যোগী হয়েছিলেন। আর ট্রাম্প গত বছর নিজের বলা ‘আমি মনে করি ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে’ উক্তিটি কিছুটা মোলায়েম করে নিলেন। তিনি রিয়াদ ভাষণে চরমপন্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলেন। তার মতে, এটা ‘ভিন্ন বিশ্বাসগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ নয়,’ বরং ‘ভালো ও মন্দের’ মধ্যে লড়াই। মুসলিম নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প আরো বললেন, ‘আমরা এখানে বক্তৃতা ঝাড়তে আসিনি, কী করা উচিত, সেটা বলতেও আমরা এখানে আসিনি।’

তিনি তার শ্রোতাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কী করতে হবে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তাদের শত্রু দের ধ্বংস করার জন্য আমেরিকান শক্তির জন্য অপেক্ষা করে থাকলে চলবে না। সুন্দর ভবিষ্যত তখনই কেবল সম্ভব, যদি আপনারা নিজেরাই সন্ত্রাসী আর চরমপন্থীদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন।’ তিনি পাঁচবার বলেন, ‘তাদেরকে তাড়িয়ে দিন।’

আর এরপর তিনি সেদি আরবের কাছে ১১০ বিলিয়ন ডলারের ‘সুন্দর’ অস্ত্র বিক্রির কথা ঘোষণা করেন। এছাড়া তিনি রিয়াদে গ্লোবাল সেন্টার ফর কম্বেটিং এক্সট্রিমিস্ট আইডলজি এবং টেররিস্ট ফিন্যান্সিং টার্গেটিং সেন্টারের উদ্বোধন করেন।

ইরানকে তিনি সরাসরি অভিযুক্ত করেন আঞ্চলিক বেশির ভাগ সমস্যা সৃষ্টির জন্য। তিনি বলেন, ‘লেবানন থেকে ইরাক, ইয়েমেন পর্যন্ত সবজায়গায় সন্ত্রাসী, মিলিশিয়া এবং অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপগুলোকে তহবিল, অস্ত্র আর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটি করছে ইরান।’

তবে জিহাদিদের বেশির ভাগই যে সুন্নি এবং সৌদি আরবেরও যে মানবাধিকার রেকর্ড ভালো নয়, সে তথ্য বেমালুম চেয়ে গেছেন ট্রাম্প।

ইরানের বিরুদ্ধে এই বিষোদগারের ফলে ওবামার আমলে গ্রহীত নীতি পুরোপুরি বদলে গেল বলেই মনে হচ্ছে। সৌদি আচরণেও সেটা বোঝা যাচ্ছে। ইরানের সাথে চুক্তির পর ২০১৬ সালে ওবামা সৌদি আরব গেলে তাকে শীতল সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ট্রাম্পকে গ্রহণ করা হয় বেশ উষ্ণভাবে।

তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প হঠাৎ করে ইরানের সাথে করা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসবেন না। তিনি হস্তক্ষেপ করার নীতিও গ্রহণ করবেন না। তাছাড়া সৌদি আরবের সাথে যে সামরিক চুক্তিটি হলো, সেটার অনেক কিছু আগের প্রশাসন আমলেই হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে আসছে।

এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যে ঝাঁঝালো বক্তব্য ট্রাম্প রেখেছেন, তা সত্য নয় বলে মনে করেন বিখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় এক কলামে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের বক্তৃতা ভন্ডামি আর তাচ্ছিল্যে ভরপুর। ফিস্ক লিখেছেন, ট্রাম্প ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ইন্ধন’ দেওয়ার জন্য আইএস-এর বদলে ইরানকে দায়ী করেছেন। তার এই মন্তব্যের ফলে উদার সংস্কারবাদী নেতা হাসান রুহানিকে পুনঃনির্বাচিত ইরানি জনগণ ‘হতাশ’ই হয়েছে।

ফিস্ক বলেন, তিনি ‘চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদী’ পরিভাষাটি পরিহার করে তার জায়গায় ‘ইসলামি চরমপন্থী’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। দুটির মধ্যে প্রচ্ছন্ন পার্থক্য রয়েছে। ইংরেজিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে তিনি যা বুঝিয়েছেন তা হলো সন্ত্রাসীরা মুসলিম।

তারপর ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমাদের বন্ধুরা কখনো আমাদের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করবে না এবং আমাদের শত্রু রা কখনো আমাদের সংকল্প নিয়ে সংশয়ে থাকবে না’ তা দিয়ে তিনি কি বন্ধু বলতে সৌদিদেরই ধরে নিয়েছেন? নাকি ‘ইসলামি বিশ্বকে’? ইসলামি বিশ্ব বোঝানো হলে তাতে ইরান, সিরিয়া ও ইয়েমেন, এমনকি লিবিয়ার মিলিশিয়ারাও থাকবে। ফিস্ক প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প যাদের শত্রু  বলতে কি আইএস-কে বুঝিয়েছেন? নাকি রাশিয়াকে? নাকি সিরিয়া? নাকি ইরান? নাকি তিনি সুন্নি মুসলিমদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে শিয়া মুসলিমদেরকে শত্রু  গণ্য করছেন?

খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশি : ক্ষমতাসীনদের আসল উদ্দেশ্য কী ?

আমীর খসরু ::

গত বেশ কিছুদিন ধরে দেশে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান রাখা হলেও, পরিস্থিতিটি যে ভিন্ন ছিল তা সবারই চোখে পড়েছে। জোর-জবরদস্তি, শক্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক শান্ত পরিস্থিতির বিপরীতে বিরোধী দল বিএনপিও কৌশল পরিবর্তন করেছে। গেলো কিছুদিন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রস্তুতি হিসেবে দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের কর্মকান্ড চালাচ্ছে। দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন এলাকার নেতাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা নিজেই শুনছেন এবং বোধকরি এর ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচনের কর্মকৌশল তারা নির্ধারণ করবেন। এর বিপরীতে বিএনপিও নানা চেষ্টা-তদবির করছে, নানাবিধ সংকটে সংকটাপন্ন ও কোমড় ভাঙ্গা দলকে সোজা করে দাড় করানোর জন্য। এ লক্ষ্যে অন্যান্য বিষয়গুলো বাদেও অনেকটা হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিত হলেও ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে দলের প্রধান খালেদা জিয়া এ কথাটিই জানান দিয়েছেন যে, তারাও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে তার বড় ইঙ্গিতবাহী ঘটনা হচ্ছে- ভোটের রাজনীতির কারণে হেফাজতকে কাছে টানা। অপরাপর ইসলামী দলগুলোর সাথেও তাদের কথাবার্তা চলছে-এমনটা শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বাম নামধারী কয়েকটি দলের উপরে আর নির্ভর করে ভোটের রাজনীতির অংক কষতে চাইছে না।

বিভিন্ন মহলে এমন একটা জোর ধারণার তৈরি হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে হোক বা তার কিছুটা আগেই হোক একটি সংসদ নির্বাচন ২০১৮-তেই অনুষ্ঠিত হবে এবং এই নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নেবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলটি যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে দিকে তারা আর যাবেন না, এটাও নিশ্চিত। সরকার চেষ্টা করলেও তারা যে ওই পথে যাবেন না এটাও মোটামুটি নির্ধারিত। বিভিন্ন সূত্রের খবর হচ্ছে, পশ্চিমী দুনিয়ার কূটনৈতিক তৎপরতাও তেমনটিই। তারা চান, সব দলের অংশগ্রহণে, গ্রহণযোগ্য, মোটামুটি অবাধ একটি নির্বাচন হোক। আর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশের আইনের শাসন, মোটামুটি সুশাসন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ মানবাধিকার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের ক্রমাবনশীল পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে-এমনটা তারা মনে করেন। বিশেষ করে তারা জঙ্গীবাদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অর্থাৎ আইএস-এর স্থানান্তরকরণ ও কৌশল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের অবস্থানকে তারা নিবিড় ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পশ্চিমী দুনিয়ার পক্ষ থেকে এ কথাটি ইতোপূর্বে বার বার সরকারকে বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি জঙ্গীবাদের উত্থান এবং সম্ভাবনাকে ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে যে ঠিক তেমনটাই ঘটেছে- এ বিষয়টিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সরকার জঙ্গীবাদ ইস্যুকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছে।

দেশে যখন একটি নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছিল-ঠিক তখনই বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশির খবরটি বিস্ময় ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ করে জোর জবরদস্তির শান্তি অবস্থার মধ্যে কেন বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হলো? বিষয়টি তো রাজস্ব বোর্ড বা কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের বিষয় নয়- বিষয়টি নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক। কাজেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন একটি কার্যক্রম ও কর্মকান্ড ক্ষমতাসীনদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অজ্ঞাতে ঘটতে পারে এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর মধ্যদিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কি চাচ্ছে না যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক? এবং সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আরেকটি ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক? এ প্রশ্নটিও জনমনে দেখা দিয়েছে যে, সরকার কি দমন-পীড়ন চালিয়ে, মাঠ দখল করে, স্থানীয় সরকারগুলোর আদলে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চায়? এ প্রশ্নটিও উঠেছে যে, বিএনপি নির্বাচনমুখী হোক তা সরকার চায় কি না? উস্কানি দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে চলমান মামলা-মোকদ্দমাগুলো আরও জোরদার করে, তারা কি চান মাঠ খালি করতে?

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দ্বিতীয়বার একইভাবে ঘটে না। আর যদি ঘটানোর চেষ্টাও করা হয় তার ফলাফলও ভিন্ন হতে বাধ্য।

এখনও নিশ্চয়ই সময় আছে- জোর-জবরদস্তির কথিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নয়- সুস্থ, স্বাভাবিক, অবাধ, গণতান্ত্রিক পরিবেশই পারে প্রকৃত শান্তি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে গণতন্ত্রের পথকে সুগম করতে। আর এটাই হচ্ছে, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম।

উন্নয়ন না গণতন্ত্র-সে বিতর্ক এখন অতীতে পরিণত হয়েছে-বোধ করি ক্ষমতাসীনরা বিষয়টি এতোদিনে হলেও বুঝতে সক্ষম হয়েছেন।

সামনে রোজা : প্রতি সরকারের সময়ের ব্যতিক্রমহীন একই অভিজ্ঞতা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

সামনে রমযান মাস। এ মাসটিকে ঘিরে মুসলিম পরিবারগুলোর নানা প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। এসব প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কেনাকাটা। এ মাসকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ীও রীতিমতো তৎপর হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে দেশের খোলা বাজারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনাসহ দেশের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দামের উর্ধ্বগতি। এমনিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুর্দশা। এ সময়ে পাইকারি বাজার কয়েকজন পুঁজিপতি আর মহাজনের হাতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে; যারা দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির সংকেত দেয়, নিয়ন্ত্রণ করে, এমনকি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার মানসে পণ্য গুদামজাত করে রাখে। রমযান হলেও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার উল্টোরূপ দেয়। রমযান আসলে দ্রব্যমূল্যর উর্ধ্বগতি এটা যেন একটি ঐতিহ্য হয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে ক্রেতা সাধারণ রমযান এলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশংকায় উৎকন্ঠিত থাকেন। রমযানের দিনে যে সব পণ্যের বেশী প্রয়োজন পড়ে সে জাতীয় দ্রব্যের মূল্য এখন বাড়তির দিকে। বিশ্বের সব দেশে উৎসব এলে পণ্য সামগ্রীর দাম কমে কিন্তু বাংলাদেশে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়।

ছোলা, মটর, খেসারি, পিয়াজ, তেল, চিনি, বেসন, মাংস, মাছ, মুরগি বিভিন্ন মসলা, শাক সব্জি সহ প্রভৃতি দ্রব্যের দাম কম বেশী বেড়েছে। রমযানের ইফতারিতে ছোলা ও পিয়াজ এবং কাঁচা মরিচ, অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হওয়ায় চাহিদার প্রেক্ষিতে বিক্রেতারাও বাড়িয়ে দিয়েছে ছোলাসহ অন্যান্য দ্রব্যের দাম। এক মাস ব্যবধানে মোটা স্বর্ণা চাল কেজি প্রতি ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা দরে, পারিজা চাল ৪৪-৪৫ টাকা, মিনিকেট (ভালো মানের) ৫৬-৫৭ টাকা, মিনিকেট (সাধারণ) ৫৩-৫৪ টাকা, বিআর২৮ ৪৮-৫০ টাকা, সাধারণ মানের নাজিরশাইল ৬ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা ও উন্নত মানের নাজিরশাইল ৫৬ টাকা। এছাড়া পাইজাম চাল কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৪৮-৫০ টাকা, বাসমতি ৫৬ টাকা, কাটারিভোগ ৭৬-৭৮ টাকা, হাস্কি নাজির চাল ৪১ টাকা এবং পোলাও চাল ১০০ (পুরাতন), নতুন ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মুদি পণ্যের দাম ঊর্দ্ধমুখী। বাজারে ছোলা ও ডালের দাম এক ধাপ বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া ছোলা এখন বাজারে ৯৫-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মুগ ডালের দাম গত সপ্তাহে কেজিতে ১০ টাকা বাড়ার পর এখন বাজারে আরও ৫ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা দরে; ভারতীয় মুগ ডাল ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাসকলাই ১৩৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫ টাকা ও ভারতীয় মসুর ডাল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে চিনির দাম কেজিতে প্রায় ৫-৮ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া চিনি এখন বিক্রি হচ্ছে ৭২-৭৩ টাকা দরে। গত কয়েক সপ্তাহের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন। দেশি রসুন এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। এছাড়া ভারতীয় রসুন কেজিতে ২৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত সপ্তাহের বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে প্রায় সব ধরনের ভোজ্য তেল। এখন বাজারে ৫ লিটারের বোতল ব্র্যান্ড ভেদে ৫০০ থেকে ৫১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি লিটার ভোজ্য তেল ১০০ থেকে ১০৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লবণ কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকায়; দারুচিনি ১০ টাকা বেড়ে ৩৬০ টাকা; জিরা ৪৫০ টাকা; শুকনা মরিচ ২০০ টাকা; লবঙ্গ ১৫০০ টাকা; এলাচ ১৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বিদ্যমান অবস্থায় সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে রোজার মাসে সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রমযানকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক মন্দাভাব, আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত নানা জটিলতা বিভিন্ন প্রেক্ষিতে চালের দাম বেড়েছে, যা কিনা ক্রেতাদের উপর হঠাৎ চাপ প্রয়োগ করছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব রকম চালের দাম বেড়েছে। রমযান মাসে দাম আরো বাড়তে পারে বলে ক্রেতারা আশংকা প্রকাশ করছেন। অন্যসব জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়িয়ে চালের দামটা কম থাকলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি মেলে। কারন চালের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মানুষকে আঘাত করে। এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এক বৈঠকে রমযান মাসে দ্রব্য মূল্য স্থিতিশীল রাখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, রমযানের জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। কথাটি কতটুকু কার্যকর হবে তা রমযানের শুরুতে বোঝা যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্যের সরবরাহ প্রচুর রয়েছে। চলতি মাসে দ্রব্যসামগ্রীর দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে ক্রেতারা রীতিমত হতাশ হয়ে পড়ছেন। এমনিতে অর্থনৈতিক মন্দাভাব তার উপর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শুরু হচ্ছে রমযান, সব মিলিয়ে এক উৎকন্ঠা কাজ করছে। ক্রেতারা মনে করছেন, রমযান মাসে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এজন্য এখনই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কর্তৃপক্ষও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাজার পুরোপুরি পুঁজির লগ্নিকারকদের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ যাদের আমরা ব্যবসায়ী বলে থাকি। আবার এই ব্যবসায়ীরাই কিন্তু শাসক শ্রেণীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজেই তাদের স্বার্থে আঘাত হানার শক্তি-সাহস কারো থাকতে পারে তেমন আশা সুদূর পরাহত। আমাদের গণমাধ্যমগুলো বাজারের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রতি রোজার শুরু থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে। এতে জনগণের কোনো সুফল ঘটে বলে মনে হয় না। নয়তো প্রতি রোজার মাসে অভিন্ন দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হবে কেন? মানুষের ক্রয় ক্ষমতার অধীনে থাকবে খাদ্য-পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। রোজাকে উপলক্ষ্য করে লাগামহীন খাদ্য-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে এযাবৎকালের একটি সরকারের শাসনামলেও কোন ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা আমাদের দেখা হয়নি। অভিজ্ঞতাগুলো এক এবং অভিন্ন। রোজা এলে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি যেন অবধারিত। জনগণও এ বিষয়ে পরিস্থিতির অসহায় শিকরে পরিণত হয়েছেন। রোজায় খাদ্য-পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে এটা অনিবার্যভাবেই আমাদের মনোজগতে স্থায়ী আসন লাভ করেছে। সে কারণে কেউ টুঁ শব্দ করে না। রোজার মাসে মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফাকে অনিবার্য বলেই বিবেচনা করে থাকি।

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার যদি কিছু করতে চায় তবে তাকে বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটা করতে হলে সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে- যেন বাজারে আরো ব্যবসায়ী আসতে পারে, ফলে সেখানে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। অথবা হতে পারে সেটা টিসিবিকে শক্তিশালী করা। সরকারের হাতে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এটা ছাড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। বাজারও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কিন্তু সরকার যা করেন তা হচ্ছে, মাঝে মাঝে ব্যবসায়ীদের ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, কখনো হুমকি ধামকি দেন, কখনো সবক দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে এটা কোনো পদ্ধতি নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ একটা ব্যবস্থাপনার বিষয়, একটা সিস্টেমের বিষয়, সরকারকে এই সিস্টেমে হাত দিতে হবে।

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ডাল, ছোলা, তেল, চিনি যা যা প্রয়োজন আগে থেকে আমদানি করে মজুদ করে রাখতে হবে। মজুদ করার ব্যবস্থা না থাকলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ২/১ মাস আগে তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আবার শুধু রমজানের সময় নয়, পণ্যদ্রব্যের মূল্য অন্য সময়েও বাড়ে। কাজেই টিসিবির হাতে প্রয়োজনীয় মজুদ সব সময় থাকতে হবে এবং তাকে বাজারে উপস্থিত থাকতে হবে। টিসিবি যতদিন দুর্বল থাকবে ততদিন বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অতি মুনাফা খোর ব্যাবসায়ীদের হাতে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলতেই থাকবে।

 

চীন যুক্তরাষ্ট্রের কতো বড় শত্রু ?

আসিফ হাসান ::

দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিং তার সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে- তা গোপন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সেখানে যে আরেকটি পরাশক্তি আছে এবং সে তার আধিপত্যকে আরো প্রবল করে যাচ্ছে, সেটা আমরা বুঝতেই পারছি না। একেবারে শক্ত ‘ফাঁস’ দিতে ইতোমধ্যেই চীনের চারপাশে ৪শ’ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক চলচ্চিত্রকার জন পিলজার নতুন একটি ডকুমেন্টারি নির্মান করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে নতুন, বৃহত্তম বাণিজ্যিক চীনকে শত্রু  হিসেবে গণ্য করার ধারণাটিই তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন এই ডকুমেন্টারিতে। তিনি বেইজিংয়ের একেবারে দোরগোড়ায় যুদ্ধপ্রস্তুতির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।

মার্শাল আইল্যান্ডস, জাপান, কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছর ধরে ছবি সংগ্রহ করে তিনি এই অঞ্চলে আমেরিকার গোপন ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তার এই ডুকেমেন্টারি প্রচলিত ধারণা আমূল পাল্টে দেবে।

তিনি দেখিয়েছেন, অতি গোপন ‘প্রজেক্ট ৪.১’-এর আওতায় মার্শাল আইল্যান্ডসের লোকজনকে কিভাবে পরমাণু গিনি পিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

পিলজার জাপান ও কোরিয়াও সফর করেছেন। তিনি লোকজনের সাথে কথা বলেছেন, দেখেছেন তারা কিভাবে মার্কিন সম্প্রসারণ প্রতিরোধ করছে। তিনি জাপানের দ্বীপ ওকিনাওয়াও গিয়েছিলেন। সেখানে ৩২টি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিটিকে চ্যালেঞ্জকারী লোকজনের সাথেও তিনি কথা বলেছেন। পিলজার বলেন, বর্তমানে একটি অদ্ভূত ও বিপজ্জনক পরিবেশ বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাওয়া দেশ চীনের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে প্ররোচনা, হুমকি, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং বিভ্রান্তির ফলে এমন এক অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে, সেটাই ভুল বুঝাবুঝি কিংবা ভুলক্রমে বা দুর্ঘটনাক্রমে সত্যিকার যুদ্ধের শঙ্কা সৃষ্টি করছে।

চীনকে নিয়ে সত্যিই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু আছে কিনা সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, চীনকে শক্তভাবে ‘ফাঁস’ দিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির আশপাশে ৪শটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ঘাঁটির কয়েকটি একেবারে চীনের দোড়গোড়ায়; সেগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, রণতরী, পরমাণু বোমারু বিমান রয়েছে। চীনা পানিসীমার ঠিক বাইরে নিয়মিত মার্কিন রণতরীগুলো টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে প্রায় এক হাজারটি বিদেশী ঘাঁটি আছে, সেখানে চীনের রয়েছে মাত্র একটি। এবং সেটাও এত ছোট যে, কোনোভাবেই ক্যালিফোর্নিয়ার ওপর হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না।

তিনি অবশ্য এটাও স্বীকার করেন, দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপগুলোতে এয়ারস্ট্রিপ বানিয়ে বেইজিংও উত্তেজনায় ইন্ধন দিচ্ছে। তবে চীনকে টার্গেট করে যুক্তরাষ্ট্রও যে নতুন নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে, সেকথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।

তিনি আরেকটি তথ্য দিয়েছেন। তা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, বারাক ওবামাই দক্ষিণ চীন সাগরের আঞ্চলিক বিতর্ককে পরমাণু শক্তিদের মধ্যকার দ্বন্ধের প্রধান বিষয়ে পরিণত করেছেন। পিলজার বলেন, ২০১১ সালে ক্যানবেরায় গিয়ে ওবামা ‘এশিয়া ভরকেন্দ্র’ ঘোষণা দেন। এই মতবাদের ওপর ভর করেই তিনি চীনকে টার্গেট করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এশিয়া ও প্যাসিফিকে থাকা মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর অবস্থানগুলো জোরদার করতে থাকেন।

পিলজার বলেন, ট্রাম্প আসলে কার্টুন-চরিত্রের মতো এবং কিছুটা অনিশ্চত ধরনের মানুষ। সেটা বাদ দিলে মনে হবে, ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে নীতি অনুসরণ করে আসছিল, তিনি সেটাই বজায় রাখছেন। তার মতে, এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগে থাকার অনেক কারণ রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, একদিকে রয়েছে চীন। এই দেশটি অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার; অন্যদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশটি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘস্থায়ী মিত্র। অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক, সব দিক দিয়েই সে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রতি যে অবস্থান গ্রহণ করেছে অস্ট্রেলিয়া, তাতে করে তার যুক্তরাষ্ট্রর আনুগত্য প্রকাশটাই ফুটে ওঠেছে। আর এটাই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন যুদ্ধে সেও পড়ে গেছে। অথচ অস্ট্রেলিয়া সত্যিকারের স্বাধীন দেশ হিসেবে অবস্থান করলে তার কোনো শত্রু ই থাকতো না।

পিলজার চীনের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থানের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বেশ ভালোভাবে। গরিব, অন্ধকার নগরীগুলো কিভাবে আধুনিক হয়ে আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সেটা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তিনি চীনাদের আশাবাদ দেখেও মুগ্ধ হয়েছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তার আধিপত্য বিস্তারে জোর দিয়েছে, তাতে অনেককে ভীতও দেখাচ্ছে।

তিনি বলেন, এক স্ট্র্যাটেজিস্ট বলেছেন, ‘আমরা [পাশ্চাত্যে] নিজেদের শত্রু  হতে চাই না। তবে আমাদের অব্যাহতভাবে যদি শত্রু  হিসেবেই প্রচার করা হতে থাকে, তবে আমাদের সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

আর সে কারণেই চীন দ্রুত তার সামরিক বাহিনীর আকার ও শক্তি বাড়াচ্ছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহল সেটাকেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করছে।

(বিদেশী মিডিয়া থেকে)