Home » সম্পাদকের বাছাই (page 18)

সম্পাদকের বাছাই

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার এক দীর্ঘ যুদ্ধ

অধ্যাপক জয়তী ঘোষ ::

গত কয়েক দশকে ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ যেভাবে সাম্প্রদায়িকরণের শিকার হয়েছে, তাতে করে উদ্বিগ্ন এবং একইসাথে ক্ষুব্ধ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে বদ্ধমূল সংস্কার আর গুজবে ভর করে স্বাভাবিক জীবনধারাটা বারবার অস্বাভাবিক দিকে বাঁক নিয়েছে। স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় ধরনের বৈষম্যই রয়েছে। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে দুর্বলদের ‘অন্য’ বা ভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস। এতে করে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত কঠোর হচ্ছে। উদার ও ভিন্নমতালম্বীদের কণ্ঠস্বরের জন্য জায়গা ও অবস্থা অব্যাহতভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া রয়েছে, জীবনধারা এবং সব ধর্মীয় গ্রুপের লোকজনের কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে সরে যেতে বাধ্য করার পরিকল্পিত প্রয়াস।

তবে সবচেযে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহিংসতার সদা-উপস্থিত হুমকি। যেকোনো সময় তা দাঙ্গা, ধর্মীয় উত্তেজনা আকারে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যক্তির ওপরও হামলা হতে পরে। আর তা ঘটতে পারে ‘উস্কানিতে’ কিংবা বিনা উস্কানিতেই। এর বিধ্বংসী শক্তি ভয়াবহ। কেবল জীবনহানিই নয়, সেইসাথে জীবিতদের মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষতিও হয় মারাত্মক পর্যায়ের। তাছাড়া জীবিকায় দেখা দেয় অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও ঘটে। সমৃদ্ধ একটি পরিবার রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এসবের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো- ভয় আর সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি। পারস্পরিক আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সব পন্থায় ‘স্বাভাবিক’ কার্যক্রম চালানো হয়ে পড়ে অসম্ভব।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নৃশংসতা এখন সুপরিচিত ও পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের সহিংসতা সৃষ্টিকারী সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছে সবচেয়ে কম। অথচ ভবিষ্যতের দাঙ্গা এবং আরো সহিংসতার শঙ্কা বজায় রাখতে এর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আর তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। আর এই বিষয়টির দিকেই আলোকপাত করেছেন আইনজীবি ওয়ারিশা ফারাসাত এবং আইনকর্মী প্রীতা ঝা। তাদের পর্যালোচনা তারা তুলে ধরেছেন তাদের Splintered Justice: Living the Horror of Mass Communal Violence in Bhagalpur and Gujarat  (Three Essays Collective, New Delhi, 2016) বইতে। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তদন্ত করেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে লড়াই করেছেন। দায়মুক্তির সংস্কৃতি কিভাবে ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে তারা তা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন।

লেখকেরা আবেগবর্জিতভাবে কাজটি করেছেন। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে বিহারে এবং ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা নিয়ে তারা নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। উভয় দাঙ্গাতেই টার্গেট ছিলেন মুসলিমরা। দাঙ্গা চলেছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। এতে বিপুলসংখ্যক বয়স্ক ও শিশু নিহত হয়। এছাড়া ধর্ষণ এবং অঙ্গহানির মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটতে থাকে। অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি প্রদান করা হলে আক্রান্তরা অন্তত বিচার পাওয়ার স্বস্তি অনুভব করতো। কিন্তু দেখা গেছে, বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভয়াবহভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে।

আবার তা কিন্তু একটি রাজনৈতিক প্রবণতা কিংবা একটি রাজ্য সরকারে সীমাবদ্ধ নয়। গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিষয়টি সবার জানা। কিন্তু বিহারের ভাগলপুরে তো বিজেপি ছিল না। সেখানে লালু প্রাসাদ, তার স্ত্রী রাবরি দেবী এবং পরে নীতিশ কুমার সরকারে ছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।

লেখকরা দেখতে পেয়েছেন, পুলিশের ভূমিকা স্পষ্টভাবেই দলীয় আনুগত্যভিত্তিক। আক্রান্তরা সহায়তাদের জন্য ব্যাকুল আবেদন জানাতে থাকলেও পুলিশ নির্মমভাবে উদাসীন থাকে। এমনকি জিডি করা এবং সেটা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার কাজটিতেও তারা অযথা বিলম্ব করে থাকে। তদন্ত যথাযথভাবে হয় না। শক্তিমানদের এড়িয়েই তদন্ত শেষ করার প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যায়। সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে জীবিতদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে পুলিশই কেবল জটিলতা সৃষ্টি করে তা নয়। আদালতও বিষয়গুলো যথাযথভাবে যত্নশীল থাকে না। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তরা আদালত থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা বলতে গেলে পায়ই না। আইনের সামগ্রিক-প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের তদাররিক যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যায়। আবার বিচার-প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে যে, মনে হবে, কোনো দিনই এটা শেষ হবার নয়। আক্রান্তরা একপর্যায়ে জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। ভাগলপুরের দাঙ্গা হয়েছে ২৮ বছর আগে, আর গুজরাটেরটা ১৫ বছর আগে; অথচ এখন পর্যন্ত বিচার শেষ হয়নি।

দাঙ্গায় অনেকে তাদের পরিবার সদস্যদের হারিয়েছেন, অনেকে সম্পত্তি, জীবিকা খুইয়েছেন। কিন্তু একদিকে ন্যায়বিচার তারা পাননি, ক্ষতিপূরণের মুখও তারা এত দিনে দেখতে পাননি। ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের প্রক্রিয়াটাও বেশ জটিল। এখানেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, এই বইটিতে ভারতের বিচারব্যবস্থাকে এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, দাঙ্গা দমনে কার্যকর পন্থা নিতে হলে এ দিকটির দিকেই বেশি নজর দিতে হবে বলে বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সদস্যসহ যে কারো জন্যই এটা বড় ভুল হতে পারে, যদি তারা ধরে নেয়, তারা এতে আক্রান্ত যেহেতু হবে না, তা-ই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই তাদের। নাগরিকদের একটি ছোট অংশের বেলায়ও যদি নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তবে তা স্পষ্টভাবেই তার অকার্যকারিতার প্রমাণ। আর সেটা একসময় অনিবার্যভাবে আমাদের সবাইকেই আক্রান্ত করবে। ওয়ারিশা ফারাসাত ও প্রীতা ঝা এই বিষয়টিই নজরে এনেছেন। আমাদের এখন যা করতে হবে তা হলো- তাদের পরিশ্রম বৃথা না যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান। সেটা শুরু করতে হবে বিচার বিভাগকে সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে।

(ফ্রন্টলাইন থেকে)

আবার স্বাধীনতার দাবি স্কটল্যান্ডের

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

আবার স্বাধীনতার দাবিতে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্কটল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিকোলা স্টারজিয়ন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের সরে যাওয়ার আগেই তিনি গণভোট আয়োজনের কথা বলেছেন। গতবার সামান্য ব্যবধানে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা আটকে গিয়েছিল। কিন্তু এবার বিপুল ব্যবধানে স্কটল্যান্ড স্বাধীনতা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অবশ্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এই প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখন এর সময় নয়।’ তিনি বেক্সিটের আগে গণভোট আয়োজন করতে চান না বলে জানিয়েছেন। আবার বেক্সিটের আনুষ্ঠানিকতা ২০১৯ সালের আগে শেষ হবে না। অর্থাৎ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চান বিষয়টি ঝুলিয়ে দিতে।

কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মে জানিয়েছেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যেসব প্রয়োজনীয় তথ্যের দরকার, তাদের কাছে এখন নেই।

স্কটল্যান্ডে ২০১৪ সালে স্বাধীনতার জন্য প্রথম গণভোট হয়েছিল। ৪৫-৫৫ শতাংশ ব্যবধানে স্কটিশরা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তবে এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। তখন ব্রিটেন ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) । ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তখন ব্রিটেনকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সহায়তা করার জন্য স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ফলে যারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকতে চায়, তারাও স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। এখন ব্রিটেন নিজেই ইইউ থেকে সরে গেছে। ফলে যারা আগে স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল, তারা এখন পক্ষে ভোট দিতে পারে। স্কটরা কিন্তু ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার পক্ষে। বেক্সিটের সময় ৬২ ভাগ স্কট এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গণভোট না-আয়োজনের জন্য যে যুক্তি দিয়েছেন, সেটাও ধোবে টেকে না। এর একটি উদাহরণ হলো, বেক্সিট গণভোটের সময় ব্রিটিশরা কি পর্যাপ্ত তথ্য জানতো? ভোটের দিন দেখা গেছে, ব্রিটিশরা গুগলে প্রশ্ন করে চলেছে : ‘বেক্সিট আসলে কী?’ এবং ‘ইইউ ত্যাগ করা বলতে কী বোঝায়?’ এতেই বোঝা যায়, ব্রিটিশদের কাছে তথ্য ছিল না।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এখানেই না থেমে স্কটল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও তুলেছেন যে, ‘স্কটল্যান্ড অনিশ্চয়তা আর বিভক্তির পথে রয়েছে।’

তবে স্কটিশ প্রধানমন্ত্রীও ছেড়ে দেননি। তিনি বলেছেন, তিনি ঠিক এখনই গণভোট আয়োজন করতে বলেননি। তবে সেটা হতে পারে বেক্সিট সম্পন্ন হওয়ার আগেই।  তিনি বেশ জোর দিয়েই বলেছেন, এমনটা হওয়া উচিত ‘বিকল্প পথ বাছাই করার সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই।’ তিনি বলেন, ভোট আয়োজনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো, মে’র টোরিরা ফলাফল কী হতে পারে তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে স্কটিশ জনগণের ইচ্ছাকে বাধা দিচ্ছেন।

তিনি আরেকটি ইঙ্গিত দিয়েছেন তার স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির এক সদস্যের টুইটের জবাবে : কল্পনা করুন তো, ব্রাসেলস যদি যুক্তরাজ্যকে গণভোট আয়োজন করতে না দিত, তবে কী হতো। আর এটাই হলো স্কটল্যান্ডের দুই ইউনিয়নের মধ্যকার পার্থক্য।

অর্থাৎ স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করার জন্য স্কটল্যান্ড তাদের আন্দোলন জোরদার করতে যাচ্ছে। স্কটল্যান্ডই যেহেতু ব্রিটিশ অর্থনীতির ‘রাজধানী’, তা-ই এটা হারানো মানে তাদের অবস্থার আরো অবনতি ঘটা। কাজেই কঠিন অবস্থা অপেক্ষা করছে ব্রিটেনের জন্য।

 

ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন

সি আর আবরার ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুবার স্থগিত হওয়া ভারত সফর ৭ থেকে ১০ এপ্রিল হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে আস্থা রাখলে অনুমান করা যেতে পারে, বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা পানিচুক্তিটি এই সফরে চূড়ান্ত হচ্ছে না। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সইয়ের জন্য দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও নথি চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার চুক্তি। এটা হবে ‘বৃহত্তর কানেকটিভিটির অংশবিশেষ- যার আওতায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত মালামাল পরিবহনের ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট করতে পারবে।’

বাংলাদেশ ও ভারত- উভয় দেশের নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে ধারণা রয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার জোরালো প্রয়াসের অংশ হিসেবে ভারতের উদ্বেগ নিরসনে অন্য যেকোনো প্রতিবেশীর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক বেশি সাড়া দিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ- বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে- প্রশমিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক প্রয়াস ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। একইভাবে মূল ভূখন্ড এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে আরো ভালো কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠার জন্য নদী ও স্থল রুটগুলো খুলে দেওয়াটা ছিল ভারতের সম্প্রসারিত জাতীয় স্বার্থের জন্যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

এ ধরনের বড় বড় ছাড় সত্ত্বেও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি প্রধান উদ্বেগও দূর করেনি। সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে অতি সামান্য অগ্রগতি হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ের চেয়ে অনেক নিচে রয়েছে। যদিও ২০১৫ সালের বহুল প্রশংসিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি বর্তমান ভারতীয় নেতৃত্বের শুভেচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ চার দশক আগেই ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে দেশের সংবিধান সংশোধন করার মাধ্যমে চুক্তিটি সাথে সাথেই বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিল। এটাও স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, শুষ্ক মওসুমে পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তির আগে ফারাক্কা বাধের কার্যক্রম শুরু হবে না- ১৯৭৪ সালে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে এমন  সমঝোতা হয়েছিল ফারাক্কা বাধ নিয়ে। বাধটির ফিডার ক্যানেলগুলো পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ মাত্র ১০ দিনের জন্য অনুমতি দিলেও, ভারত বাধটি চালু করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা অব্যাহত রাখে।

সম্প্রতি চীন থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন কেনার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফরটিকে নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে। সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দল নিয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর; বহু বিষয়াদি-সংশ্লিষ্ট  দীর্ঘ মেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি আদায়ে সাউথ ব্লকের প্রবল আগ্রহের মধ্যে ভারতের আঙিনায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে দিল্লি যে কতটা উদ্বিগ্ন তা-ই  এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের নৌ বাহিনী সংশ্লিষ্ট ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়টি দিল্লির প্রভাবশালী কোনো কোনো মহলে বড়ভাইসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ভারতীয় রাজ্যসভার ‘ইন্ডিয়াস ওয়ার্ল্ড’ নামের টিভি শোয়ে রাষ্ট্রদূত কানওয়াল শিবাল বলেছেন, প্রতিবেশী গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে পা রাখার জায়গা লাভের চীনা কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে ভারত এবং ভারত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছে, ‘শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ এটা দিচ্ছে।’ তিনি এমন অযাচিত পরামর্শও দেন যে, চীনের বদলে রাশিয়ার কাছ থেকেও বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনতে পারতো, ‘কারণ তা ভারতের জন্য কম সমস্যার সৃষ্টি করতো।’ তার বক্তব্যের বোঝা যাচ্ছে, কোন সূত্র থেকে সাবমেরিন কিনবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাংলাদেশের উচিত ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

টকশোতে উপস্থিতি বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আশ্চর্য হয়ে গেছেন, বাংলাদেশ যখন ‘তার সব সমুদ্রসীমা বিষয়ক সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে’ তখন কেন দেশটি সাবমেরিন কেনার উদ্যোগ নিল? ফলে এই প্রশ্নটি মনে উদয় হতেই পারে, ভারত যদি তার নিজস্ব সীমানা সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলে, তখন কি তার নিজস্ব বিমানবাহী রণতরী এবং সাবমেরিনগুলো বিক্রি করে দেবে?

সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানের শিক্ষাবিদ বিনা সিক্রি আরো এক ধাপ এগিয়ে ঊদ্ধত্যপূর্ণ দাবি করেছেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে ‘শেখ হাসিনার আমলে চীনপন্থী আমলাদের অব্যাহত শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে!’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।’ বাংলাদেশের এই স্বঘোষিত মঙ্গলকামীর এ ধরনের তথ্যের সূত্র জানতে খুবই ইচ্ছা জাগে। হাই কমিশনার সিক্রি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল চীন এবং দেশটি ‘তার বাবাকে’ সমর্থন করেনি। বাংলাদেশী ও ভারতীয়দের মধ্যে জনগণ পর্যায়ের যোগাযোগের সাফাই গাওয়ার সময় এই অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক তার সব কূটনৈতিক প্রশিক্ষন ও শিষ্টাচার পাশে সরিয়ে রেখে বলেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সব মন্ত্রীকে ‌‌”নানাপন্থায় বশ মানিয়ে রাখা হতে পারে। তিনি শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, চীনের গভীর গভীর পকেট আছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার সফরের পরিকল্পনা করার প্রেক্ষাপটে তার তদারকিতে নিয়োজিতদের উচিত নয়া দিল্লিতে বিরাজমান মনোভাব সম্পর্কে যথাযথ অবগত থাকা। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটাই সময় হাতে থাকা শেষ কয়েকটি দরকষাকষির বস্তুকে ধরে রাখা এবং নয়া দিল্লি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত বিনিময় চুক্তি না করা পর্যন্ত ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট ও পরিবহণ চুক্তিতে অগ্রসর না হওয়া।

(লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৮ : আফ্রিকায় চীনের সাম্রাজ্য কিংবা বিনিয়োগ

আনু মুহাম্মদ ::

আফ্রিকার বহুদেশের সঙ্গে চীনের আগের পর্বেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু তার ধরনে ভিন্নতা ছিলো, রাজনৈতিক-মতাদর্শিক বিষয় ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০ ও ৭০ দশকে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সাহায্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত আছে। এর মধ্যে ১৯৭০-৭৫ সময়কালে জাম্বিয়া ও তানজানিয়াকে যুক্ত করে ১৮৬০ কি.মি তাজারা রেলওয়ে নির্মাণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৫০ হাজার চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিক এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। ঋণ অনুদানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে চীন ছাড়িয়ে যায় ১৯৭৮ সালেই। সেসময় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রেও চীনের সহযোগিতামূলক কর্মসূচি শুরু হয়। চীন থেকে অনেক ডাক্তার আসেন। চীনের পরের পর্বেও এর ধারাবাহিকতা আছে, তবে এই পর্বে পুঁজি রফতানি হয়ে দাঁড়ায় মূল বিষয়।

বর্তমানে আফ্রিকার প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ১৯৮০ সালে চীন-আফ্রিকার বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিলো ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৯৯ সালে এটি ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। ১৯৯০ দশকে আফ্রিকায় চীনের বিনিয়োগে উচ্চলম্ফ ঘটে, দু অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যেরও ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে। এরপর তার বৃদ্ধি ঘটতে থাকে ক্রমবর্ধমান হারে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালে ‘চায়না-আাফ্রিকা কো-অপারেশন’ নামে এক যৌথ বাণিজ্য সংস্থা গঠিত হয়। ২০০৫ সালে মহাদেশের সাথে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলার, পরের বছরেই তা পৌঁছে যায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারে। এসময় পর্যন্ত চীন ছিলো দ্বিতীয় অবস্থানে, যুক্তরাষ্ট্র ছিলো প্রথম। এরপর দ্রুত চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে অনেক ব্যবধানে প্রথম স্থানে চলে যায়। ২০১০ সালে চীন-আফ্রিকার বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৪ বিলিয়ন ডলার, ২০১২ সালের মধ্যে তা ২০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। [1]

আফ্রিকায় এখন প্রায় ৮০০ চীনা কোম্পানি ব্যবসা করছে। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানি। অবকাঠামো, জ্বালানী, ব্যাংকিং-এ তাদের প্রধান বিনিয়োগ। সড়ক, যোগাযোগ বিশেষত রেলওয়ে নির্মাণকাজে চীনের বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাপক কর্মযজ্ঞ আফ্রিকার অর্থনীতির জন্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চীনের পণ্য বিশেষত প্রাথমিক পণ্য আমদানির পরিসরও বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় চীন থেকে কম সুদে ও সহজ শর্তে ঋণপ্রবাহের কারণে এই ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটে দ্রুত। এছাড়া ২০০০ সালের পর থেকে চীন ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করেছে- যা তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি করেছে।

২০১০ এর পর বাণিজ্যের দ্রুত বৃদ্ধিতে আফ্রিকা থেকে চীনে খনিজ দ্রব্য, তেল এবং কৃষি দ্রব্য আর চীন থেকে আফ্রিকায় শিল্পপণ্যের ক্রমবর্ধমান প্রবাহের ভূমিকা ছিলো মুখ্য। আফ্রিকায় চীনা বিনিয়োগের বড় অংশ জ্বালানী খাতে। নাইজেরিয়া ও এঙ্গোলায় এর হার সবচাইতে বেশি। বর্তমানে চীনের মোট তেল চাহিদার এক তৃতীয়াংশ আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এঙ্গোলা থেকে। কৃষি বা প্রাথমিক পণ্যেও চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ছে। সাম্প্রতিক হিসাবে দেখা যায়, বেনিন, বারকিনা ফেসো এবং মালি থেকে চীনের তুলার চাহিদার শতকরা ২০ ভাগ চাহিদা মেটে। আইভরিকোস্ট থেকে চীনে যায় কোকো, কেনিয়া থেকে বিশাল সরবরাহ আসে কফির, মাছের সরবরাহে নামিবিয়া এখনও সবার ওপরে। চীন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ইথিওপিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়া এবং এঙ্গোলায়।

আফ্রিকায় চীনের উপস্থিতি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের অব্যাহত সম্প্রসারণ পশ্চিমা বিশ্বের, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্র দেশগুলোতে যে বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি করছে তা বোঝা কঠিন নয়। তার বহি:প্রকাশও ঘটছে বিভিন্নভাবে। অন্যদিকে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সাথে সাথে সেখানকার সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও দ্বন্দ্ব সংঘাত তৈরি হচ্ছে। অনেক স্থানে জনবিক্ষোভও তৈরি হচ্ছে। তারপরও বিভিন্ন জরীপ থেকে দেখা যায়- চীনের বিনিয়োগ-বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রতিই চীনের মানুষের সমর্থনসূচক মনোভাব এখনও বেশি। ২০১৬ সালে ‘আফ্রোব্যারোমিটার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আফ্রিকার ৩৬টি দেশের ওপর একটি জরীপ পরিচালনা করে এই বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের প্রাপ্ত ফলাফলের প্রধান সিদ্ধান্ত হলো ‘আফ্রিকার সাধারণ মানুষেরা চীনের ভূমিকাতে খুশি।’ এর মাত্রা, বা সন্তুষ্ট মানুষদের শতকরা হার, দেশ থেকে দেশে ভিন্ন। যেমন মালিতে শতকরা ৯২, নাইজারে শতকরা ৮৪ এবং লাইবেরিয়াতে শতকরা ৮১ ভাগ মানুষ চীনকে স্বাগত জানায়।[2]

আবার একই জরীপে দেখা যায়, ৩৬টি দেশের মধ্যে ১০টি দেশে চীনের উন্নয়ন মডেলের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন আছে।  এর মধ্যে প্রথম তিনটি দেশ হলো ক্যামেরুন, সুদান ও মোজাম্বিক। যেসব দেশে জরীপে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ মানুষ মার্কিন মডেলকে চীনা মডেলের চাইতে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন সে দেশগুলো হলো- লাইবেরিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মরক্কো।

——————————————————————————

[1]আফ্রিকায় চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্কে আরও তথ্য ও বিশ্লেষণের জন্য দেখুন:  https://www.brookings.edu/wp-content/uploads/2016/07/Chinas-Engagement-with-Africa-David-Dollar-July-2016.pdf

 2 http://edition.cnn.com/2016/11/03/africa/what-africans-really-think-of-china/

‘ট্রাম্প কেন মিথ্যা বলেন’ – বার্নি স্যান্ডার্স যা বললেন

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

‘‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ভয়ঙ্কর মিথ্যাবাদী; লোকটি আমেরিকাকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে’’ -এমন তীব্রভাবেই আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে আক্রমণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করার জন্য সাবেক মনোনয়ন-প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স।

দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ভারমন্টের এই স্বতন্ত্র সিনেটর মিডিয়া, বিচার বিভাগ এবং আমেরিকান জনজীবনের অন্যান্য স্তম্ভের প্রতি ট্রাম্পের সবচেয়ে বিতর্কিত সমালোচনার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘‘এগুলো গণতন্ত্রের ওপর সচেতন আক্রমণ’’। তিনি বলেন, ট্রাম্প সবসময় মিথ্যা বলেন। আমি মনে করি, তার মিথ্যা বলাটা ঘটনাক্রমে নয়; এর পেছনে কারণ রয়েছে। তিনি আমেরিকান গণতন্ত্রের ভিত্তিটিই ধ্বংস করার জন্যই মিথ্যা বলেন।

রিয়েল এস্টেট বিজনেসম্যান, রিয়ালিটি টিভি স্টার থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পদটিতে উত্তরণের ৫০ দিবসের প্রেক্ষাপটে স্যান্ডার্স এই মন্তব্য করলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই হোয়াইট হাউজের নতুন ‘‘প্রভু’’ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ অবদান- স্বাস্থ্য-পরিচর্যানীতি; সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলোতে পর্যটক, উদ্বাস্তু এবং বৈধতাহীন অভিবাসীদের প্রবেশ ব্যবস্থা বাতিল করেছেন। এছাড়া বাণিজ্য ও পরিবেশগত সুরক্ষা চুক্তিগুলোও উড়িয়ে দিয়েছেন।

ওয়াশিংটন ডিসিতে নিজের সিনেট অফিসে গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলার সময় স্যান্ডার্স বলেন, বিলিয়নিয়ারদের কর অবকাশ এবং মধ্যবিত্তদের প্রতি ভয়াবহ প্রভাব সৃষ্টিকারী ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তবে প্রেসিডেন্ট যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখাচ্ছেন, তার ব্যাপারেই স্যান্ডার্স সবচেয়ে বেশি ক্রোধ প্রকাশ করেন।

তার মতে, নিজেকে জাতির একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করার সচেতন কৌশল হিসেবেই ট্রাম্প মূলধারার মিডিয়া থেকে শুরু করে বিচারক এবং এমনকি খোদ নির্বাচনী-প্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ গণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অন্যায় সমালোচনা করছেন। তিনি একটি বার্তাই দিতে চাইছেন, ‘আমেরিকায় আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে আমেরিকার জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, আমিই আমেরিকায় একমাত্র লোক, যে সত্য কথা বলে, আমিই আমেরিকায় একমাত্র লোক, যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার অধিকার রাখে’।

এই নতুন প্রশাসনের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো- সত্যের সাথে ট্রাম্পের ভঙ্গুর সম্পর্ক। স্যান্ডার্স বলেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া এক বিচারককে ‘তথাকথিত বিচারক’ হিসেবে ট্রাম্পের অভিহিত করাতে তিনি অবাক হয়েছেন। ট্রাম্প কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই বলেছেন, ট্রাম্প টাওয়ারে ওবামা আঁড়ি পেতেছিলেন। ট্রাম্প এ কথাও বলেছিলেন, নভেম্বরের নির্বাচনে ৫০ লাখ লোক অবৈধভাবে ভোট দিয়েছে।

স্যান্ডার্স মনে করেন, বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই ট্রাম্প মিথ্যা বলছেন। স্যান্ডার্স যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩তম প্রেসিডেন্টের সাথে ৪৫তম প্রেসিডেন্টের তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘জর্জ বুশ ছিলেন খুবই সংরক্ষণবাদী প্রেসিডেন্ট। আমি একেবারে প্রথম দিন থেকে তার বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু জর্জ বুশ মূলধারার আমেরিকান রাজনৈতিক মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে কাজ করেননি।’

মিডিয়া সবসময় ট্রাম্পের দিকে জোরালোভাবে থাকায় এবং তার টুইটার বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও স্বঘোষিত গণতান্ত্রিক সমাজবাদী স্যান্ডার্স যে দেশজুড়ে নতুন প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে নীরবে আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, সেদিকে তেমন কারো নজর পড়েনি। মূলত: ডেমোক্র্যাটিক দলের মনোনয়ন পাওয়ার সময় যে তরুণরা তার প্রতি সাড়া দিয়েছিল, তারাই তার পেছনে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।

স্যান্ডার্স বলেন, প্রতিরোধ এখন পূর্ণ গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে ‘আওয়ার রেভ্যুলিউশন,’ ‘ওমেন্স মার্চ’ ইত্যাদি সংগঠন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে ফিরে এসেছে। তিনি জানান, ট্রাম্পের স্বৈরতান্ত্রিক ধারাটি রোখার একমাত্র উপায় হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিরোধ আন্দোলন সৃষ্টি করা।

তিনি তার সাফল্যের একটি উদাহরণ হিসেবে বলেন, সম্প্রতি একটি সপ্তাহেই ১৩০টি কংগ্রেস জেলায় ১৫০টি সমাবেশ হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ কংগ্রেস সদস্যদের সাথে বৈঠক করার দাবি জানাচ্ছেন- যাতে তারা ‘অ্যাফোরডেবল কেয়ার অ্যাক্টের’ বিরোধিতা করতে পারে।

স্যান্ডার্স তার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য কংগ্রেসে বিশেষ করে রিপাবলিকান সহকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ করার জন্য প্রতিরোধ আন্দোলনে নামার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

তিনি আশা করছেন, আগামী দিনে রক্ষণশীল অনেক রিপাবলিকান সদস্যও তার সাথে কাজ করবেন।

স্যান্ডার্স মার্কিন নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাশিয়া বেশ সফলতার সাথে কাজটি করেছে বটে ; তবে তা অগ্রহণযোগ্য।

উগ্র-জাতীয়তাবাদী উত্থানের দ্বারপ্রান্তে ইউরোপ!

আসিফ হাসান ::

বেক্সিট ছিল প্রথম অভ্যুত্থান। তারপর দ্বিতীয়টি। সেটা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া;  এবার তৃতীয়টি। সেটা হবে ইউরোপে। সেটা কী? উগ্রপন্থীদের ইউরোপের দেশে দেশে ক্ষমতা গ্রহণ। এমনটাই ধারণা ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ম্যারিঁ লে পেনের। তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন ও ব্রিটিশ ভোটারদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ‘জেগে ওঠার’ ডাকও দিয়েছেন।

সম্প্রতি ইউরোপের উগ্রপন্থী নেতৃস্থানীয়রা সমবেত হয়েছিলেন জার্মানিতে। বর্তমান জমানায় এসে এ ধরনের সমাবেশ নজিরবিহীন। সেখানেই লে পেন হুংকার দেন, ‘বেক্সিট ইউরোপজুড়ে অপ্রতিরোধ্য প্লাবন সৃষ্টি করেছে। বেক্সিটের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ছিল ‘দ্বিতীয় অভ্যুত্থান।’

উপস্থিত কয়েক শ’ ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ প্রশ্নে তার অবস্থান স্পষ্ট। জনগণের জন্য ক্ষতিকর কোনো ব্যবস্থা তিনি সমর্থন করেন না।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৬ সাল ছিল অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বের জাগরণের বছর। আমি নিশ্চিত, ২০১৭ সালে মহাদেশীয় ইউরোপ জেগে ওঠবে।’

জার্মানির মধ্যাঞ্চল কোবলেনজে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিল জার্মানির অলটারনেটিভ ফার ডচেসল্যান্ড (এএফডি) পার্টি। সভার শ্লোগান ছিল ‘ইউরোপের স্বাধীনতা।’

লে পেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের উদ্বাস্তুনীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তার মতে, এই নীতির কারণেই বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি বলেন, জার্মান জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশটিতে লাখ লাখ উদ্বাস্তু ঢুকিয়েছেন মেরকেল। সভায় ইউরোপের লোকরঞ্জক দলগুলো অংশ নেয়। বিশেষ করে লে পেনের ফ্রন্ট ন্যাশনাল, এএফডি, ইতালির নর্দার্ন লীগ, নেদারল্যান্ডসের ফ্রিডম পার্টি।

চলতি বছর ইউরোপের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডে উগ্র ডানপন্থীদের বিপুল জয় হতে পারে। তারা সত্যি সত্যি মনে করছে- বেক্সিট ও ট্রাম্প যখন বিজয় পেয়েছে, তখন তারাও জিতবে। গির্ট উইল্ডার্স, ফ্রাক পেত্রি ও মেরিঁ পেন- সবাই অভিন্নভাবে মনে করেন, জনগণ চায়- আরো নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত, বাজেট আর ব্রাসেলস নিয়ে আরো কড়াকড়ি।

এ দিকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, লোকরঞ্জক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ডাচ ফ্রিডম পার্টির (পিভিভি) প্রধান উইল্ডার্স প্রায় সব জরিপেই এগিয়ে আছেন। চলতি মাসের নির্বাচনে তার দল বেশ ভালো করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আর পেত্রির অভিবাসনবিরোধী আলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি (এএফডি) সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে মেরকেলকে ধরাশায়ী করতে পারেন। পেত্রি মনে করেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইউ) কোনোই ভবিষ্যত নেই। লে পেনও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সকে বের করে নিতে গণভোট তথা ফেক্সিট আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হলে জনগণকে চারটি সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন। এই চারটি হলো : ভূখন্ডগত সার্বভৌমত্ব, অর্থের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং আইন পরিষদীয় সার্বভৌমত্ব। এসবের মাধ্যমেই তৃতীয় অভ্যুত্থান এগিয়ে যাবে বলে এই উগ্রপন্থীদের সবাই মনে করছেন।

ট্রাম্প জমানায় টিকে থাকা : স্বৈরতান্ত্রিকতার সর্বব্যপী ভীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

যোশেফ স্টিগলিৎজ ::

অনুবাদ : আসিফ হাসান

মাত্র একটা মাস। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশ্চর্য গতিতে বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে ফেলেছেন; এমন মাত্রার আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন- যা যেকোনো সন্ত্রাসীকে গর্বিত করবে। ঘাবড়ে যাওয়া নাগরিক এবং ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সরকারি নেতারা যথাযথ ও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ট্রাম্প এখনো তার প্রস্তাবিত আইনের বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করেননি। ফলে সামনে যাওয়া নিয়ে যেকোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিতভাবেই সাময়িক ব্যবস্থা। কংগ্রেস এবং আদালতগুলোও তার নির্বাহী আদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি সাড়া দেয়নি। অনিশ্চয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া কিন্তু প্রত্যাখ্যানকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করা নয়।

বিপরীতে, এটি এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ট্রাম্প যা বলেন, টুইট করেন, সেগুলো অবশ্যই গুরত্বসহকারে নিতে হবে। নভেম্বরে নির্বাচনের পর প্রায় সার্বজনীন আশা ছিল, নির্বাচনী প্রচারকাজের সময়কার চরমপন্থা তিনি পরিত্যাগ করতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই এটা ছিল শুধুমাত্র এমন চিন্তা যে – অবাস্তবতার এই গুরু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ হিসেবে কথিত স্থানটির বিপুল দায়িত্বভার গ্রহণের পর ভিন্ন ব্যক্তি হিসেবেই তিনি আবির্ভূত হবেন।

প্রত্যেক নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই একই ধরনের কিছু ঘটে : আমরা নতুন যাকেই ভোট দেই না কেন, আমরা নিজেরা তাকে যেমনটি দেখতে চাই, তেমনভাবে আমাদের ভাবমূর্তি তাদের ওপর আরাপ করি। আবার বেশির ভাগ নির্বাচিত কর্মকর্তা সব মানুষের সবকিছুকে স্বাগত জানান, কিন্তু ট্রাম্প সংশয়ের কোনো অবকাশই রাখেননি যে, তিনি যা বলেছিলেন, সেগুলো করবেন : মুসলিম অভিবাসন নিষিদ্ধ করা, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর দেওয়া, নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (নাফটা) বাতিল করা, ২০১০ সালের ডোড-ফ্রাঙ্ক আর্থিক সংস্কার বাতিল করা, এবং আরো কিছু যা তার সমর্থকেরা পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মাঝে মাঝে আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্কের জালের ভিত্তিতে তৈরি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বিশেষ বিষয়াদি ও নীতিমালার সমালোচনা করেছি। তবে বিশ্বকে আরো ভালো কাজের উপযোগী করার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ও সম্পর্ককে সংস্কারের প্রয়াস এবং এগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করার এজেন্ডার মধ্যে একটি বড়রকমের পার্থক্য রয়েছে।

ট্রাম্প বিশ্বকে দেখেন ‘জিরো-সাম গেমের’ পরিভাষায়। বাস্তবে সুনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়ন একটি ‘পজেটিভ-সাম’ শক্তি : আমেরিকা লাভবান হবে যদি তার মিত্র ও বন্ধুরা- তা সে অস্ট্রেলিয়া, ইইউ বা মেক্সিকো যে-ই হোক না কেন- শক্তিশালী হয়। কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি হলো একে ‘নেগেটিভ-সাম গেমে’ পরিণত করা অর্থাৎ আমেরিকা হারবেই।

ওই দৃষ্টিভঙ্গি তার উদ্বোধনী ভাষণে স্পষ্ট ছিল। এতে তিনি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বুলির পুনরাবৃত্তি করেছেন, এর ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদী রূঢ়কণ্ঠে, তার কুৎসিততম রূপরেখার প্রতি তার দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আগের প্রশাসনগুলো মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নিতে তাদের দায়দায়িত্ব সবসময়ই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিল। তবে তারা সাধারণত যেসব নীতি অনুসরণ করতো, সেগুলো ছিল জাতীয় স্বার্থের আলোকিত উপলব্ধির পরিভাষার কাঠামোবদ্ধ। তারা বিশ্বাস করতো, আমেরিকানরা আরো সমৃদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলোর সাথে জোট গঠন থেকে উপকৃত হবে।

ট্রাম্প মেঘে যদি রুপালি রেখা থেকে থাকে, তবে তা হলো গোপন বা প্রকাশ্য ধর্মান্ধতা ও নারী-বিদ্বেষ সম্পর্কের আলোকে তৈরি এবং সহিষ্ণুতা ও সাম্যতার মতো মৌলিক মূল্যবোধের বিপরীতে সৃষ্ট সংহতির নতুন অনুভূতি। আর ট্রাম্প এবং তার দল সেটাই তৈরি করেছেন। আর গণতান্ত্রিক বিশ্বজুড়ে ট্রাম্প এবং তার মিত্রদের প্রত্যাখ্যান ও প্রতিবাদের মুখে এই সংহতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প দ্রুততার সাথে ব্যক্তি অধিকার পদদলিত করবেন, এমনটা ধারণা করে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন দেখিয়েছে, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন, সাম্য সুরক্ষা এবং ধর্মের ব্যাপারে সরকারি নিরপেক্ষতার মতো প্রধান সাংবিধানিক নীতিমালা রক্ষায় প্রস্তুত। আর গত মাসে আমেরিকানরা মিলিয়ন মিলিয়ন দান করে এসিএলইউ’র প্রতি তাদের সমর্থন প্রদর্শন করেছে।

একইভাবে দেশজুড়ে কোম্পনিগুলো এবং ক্রেতারা ট্রাম্পকে সমর্থনকারী সিইও এবং বোর্ড সদস্যদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে গ্রুপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট নেতৃবৃন্দ এবং বিনিয়োগকারীরা পরিণত হয়েছে ট্রাম্পের মদতদাতায়। ডাভোসের বার্ষিক বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের চলতি বছরের সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম এবং সেখানে তার গোঁড়ামি এবং সংরক্ষণবাদকে সযত্নে অনেকেই পাত্তা না দিয়ে, কর হ্রাস এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার অনেক গলাবাজি শুনেছেন।

এসবের চেয়েও উদ্বেগের বিষয় ছিল সাহসের অভাব : ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলেও অনেকেই এর  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ভয় পাচ্ছেন; আর অন্তত তারা শংকিত ও ভীত – যাদের কোম্পানির শেয়ার মূল্য কোনো টুইটের মাধ্যমে টার্গেট হয়ে যেতে পারে। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের ছাপই হলো সবদিক ছাপিয়ে থাকা ভীতি। আর আমরা আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে তা এখন দেখছি।

এর ফলে একসময় যে আইনের শাসন ছিল অনেক আমেরিকানের কাছে বিমূর্ত বিষয়, তা এখন পরিণত হয়েছে মূর্ত বিষয়ে। আইনের শাসনের আওতায় সরকার যদি আউটসোর্সিং এবং বিদেশকরণ ঠেকাতে চায়, তবে সে যথাযথ উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং অনাকাক্সিক্ষত আচরণ নিরুৎসাহিত করতে আইন প্রণয়ন করে। সে বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখায় না বা হুমকি দেয় না কিংবা নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে উদ্বাস্তুদের ভয়ঙ্করভাবে উপস্থাপন করে না।

নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টের মতো আমেরিকার শীর্ষ মিডিয়াগুলো এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের আমেরিকান মূল্যবোধ পরিত্যাগের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে সামগ্রিকভাবে আমেরিকান মূল্যবোধ হিসেবে সর্বজনীন বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্প বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে সবচেয়ে সিনিয়র সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সরিযে সেখানে  বসিয়েছেন অতিডানপন্থীদের- যাদের মিডিয়া অন্ধ উগ্রবাদী বলেই মনে করে। এছাড়াও উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মুখে নিজ কন্যার ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিচ্ছেন যে ব্যক্তি – এমন একজনের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে থাকাটা কোনক্রমেই স্বাভাবিক নয়।

কিন্তু নানা ঘটনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমাদের বাধা দেওয়ার ফলে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং এতে অসাড় হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। এবং এর ফলে আগামীর আরো বড় ভুল আসতে থাকার প্রেক্ষাপটে, অতীতের বড় বড় ভুল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই  সহজ। এই নতুন যুগের প্রধান চ্যালেঞ্জটি হলো- সতর্কতা বজায় রাখা এবং যেখানে ও যখনই প্রয়োজন, সেখানেই এবং তখনই প্রতিরোধ করা।

(লেখক : ২০০১ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী । কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)