Home » সম্পাদকের বাছাই (page 21)

সম্পাদকের বাছাই

মিয়ানমারে আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের আশংকা?

ল্যারি জ্যাগান

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

অনেক বিশ্লেষক এবং বিদেশী ব্যবসায়ী আশংকা করছেন, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেবে। ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরের বাইরে প্রখ্যাত মুসলিম আইনজীবী কো নিকে হত্যার ঘটনাটি আরো সহিংসতার আশংকায় থাকা আন্তর্জাতিক আদিবাসীদের প্রতি একটি বড় ধরনের বার্তা পাঠালো।

এটা ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জন্য এটা একটা বড় ধরনের ধাক্কা এবং দলের মধ্যে বিভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং নিশ্চিতভাবেই সরকারি প্রশাসন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া এই ঘটনা আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা সামনে নিয়ে এলো।

এই ঘটনাটি দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার সম্পর্কে বিশেষ করে স্টেট কাউন্সিলর আঙ সান সু কি এবং সেনা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন আঙ হলাইঙ-এর মধ্যকার টানাপোড়েনও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু হওয়ায়, তা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বেসামরিক সরকারকে কয়েক ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে।

এনএলডির আইন উপদেষ্টা এবং সেই সাথে সু কির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা কো নিকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাটি দেশজুড়ে মর্মপীড়াদায়ক একটি বার্তা বইয়ে দিয়েছে। রেঙ্গুন বিমানবন্দরের মতো একেবারে প্রকাশ্য স্থানে উচ্চপদস্থ লোককে হত্যা করার ঘটনা; অর্থাৎ সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এই ব্যবস্থা।

আসল হত্যাকারীকে আটক করা হলেও ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, সে আসলে ভাড়াটে লোক, টাকার বিনিময়ে তিনি কাজটি করেছেন। তাকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার উদ্দেশ্য এবং কে তাকে হত্যা করতে পাঠিয়েছিল, সে সম্পর্কে অতি সামান্য তথ্যই জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া ও ভুল তথ্যে তদন্ত কাজের ব্যর্থতাই প্রকাশ করেছে।

এখনো কিছুই পরিষ্কার নয়, এমনকি বিমানবন্দরে হত্যাকারীর সাথে আরো লোকজনের থাকার অভিযোগের সুরাহা হয়নি। এখন পর্যন্ত পুলিশ মাত্র দুজনকে গ্রেফতার করতে পেরেছে- একজন খোদ হত্যাকারী; অপরজন সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে কোনো না কোনোভাবে তিনিও হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন।

সন্দেহের আঙুল সামরিক বাহিনীর দিকেই ওঠে। কারণ নিহত আইনজীবীকে দেখা হতো অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার এবং একেবারে নতুন সংবিধান রচনার দাবি জানানো এনএলডি কট্টরপন্থী হিসেবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সংবিধানটি কার্যত লিখেছিলেন সাবেক সামরিক স্বৈরাচার সিনিয়র জেনারেল থান শু – সেটা ২০০৮ সালে ভুয়া গণভোটে বিপুলভাবে পাস হয়েছিল। সংবিধান পরিবর্তনের দাবিটি বিশেষ ঘটনা। কারণ আগের সংবিধানকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে নতুন একটি গ্রহণ করাটা সামরিক বাহিনীর জন্য সুখকর বিষয় নয়, বিশেষ করে তারা বর্তমান সংবিধানকে যখন পূতপবিত্র বিবেচনা করে।

তবে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কো নিকে অবিশ্বাস করলেও এবং তারা এমনকি তাকে ঘৃণা করলেও, এই হত্যাকান্ড থেকে তারা কোনোভাবেই লাভবান হবে না। বরং বিপরীতটাই হবে। এটা তাদের সুনামের জন্য আরো হানিকর হবে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাবৃত্তি সম্পর্কে ক্ষুব্ধ আঙুল তোলা হবে। কারণ বিষয় দুটি মন্ত্রিসভার সামরিক বাহিনী থেকে আসা মন্ত্রীদের হাতে, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে জেনারেল কেউ সু।

এই হত্যাকান্ড জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং সেইসাথে ভঙ্গুর পরিস্থিতিও বিপর্যয়কর অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে মনে করে শীর্ষ সামরিক ক্রমপরম্পরাও উদ্বিগ্ন। আরাকানের ঘটনায় অন্তত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হলেও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও হারানোর অনেক কিছু আছে, সেনাপ্রধান নির্বিকারভাবে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হতে চাচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি দফতর, সরকারি সভা এবং প্রধান বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী কূটনীতিকরাও নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। অনেকে, বিশেষ করে জাপানি, এমনকি দেশটিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সফর বাতিল করে দিচ্ছেন, কূটনৈতিক দলের সদস্যদের পুরোপুরি ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

তবে দুই সপ্তাহ পর এখন মনে হতে যাচ্ছে, এটা ছিল একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। প্রেসিডেন্টের অফিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘এটা ছিল স্পষ্টভাবেই সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি সংকেত।’ একটি লাল-রেখা টেনে দেওয়া হলো, অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের দিকে হেঁটো না। প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে সরকার এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়। রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগতভাবে এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে সহিংসতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

তবে কো নি-র হত্যাকান্ড এনএলডি সরকার এবং সামরিক বাহিনী- উভয়ের মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে তাগিদ সৃষ্টি করবে। এনএলডির জন্য ইস্যু হলো সংবিধান সংস্কার। তাদের মৃত আইন উপদেষ্টা সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করতে দলের মধ্যে জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি এমনকি ফেডারেল সংবিধান প্রশ্নে চলমান শান্তিপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমঝোতার আগেই সেটা করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। তবে অন্য আরো অনেকে রয়েছেন। বিশেষ করে দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, দলের সবচেয়ে সিনিয়র পৃষ্ঠপোষক টিন ওও। তিনি কিন্তু সেনাবাহিনী টসে এমন কোনো কাজ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এনএলডির মধ্যে এই বিভক্তি বেড়েছে কো নির হত্যাকান্ডে। এখন কট্টরপন্থীরা জোর দিয়ে বলছে, পার্টি যদি গণতন্ত্রে যাত্রা জোরদারকরণ এবং যেকোনো ধরনের পিছু হটা প্রতিরোধ করতে চায়, তবে যত দ্রুত সম্ভব সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া আর কোনো বিকল্প তাদের কাছে নেই।

সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান থেকে ভবিষ্যত নিয়ে আচ্ছন্ন রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানে তাদের যে ক্ষমতার নিশ্চতা দেওয়া হয়েছে, সেটা কমানোর যেকোনো পদক্ষেপ তারা হালকাভাবে নেবে না। সত্যি সত্যিই সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা দৃঢ় অভিমত পোষণ করেন, দেশের পতন রুখতে তাদেরকে এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতেই হবে। তারা নিশ্চিত, আঙ সান সু কির সরকার ব্যর্থ হচ্ছে, তারা কখন দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, সেটা কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের পরিকল্পনাও তৈরি করে রাখা হয়েছে। কমান্ডার-ইন-চিফ যদি মনে করেন, দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বিপদের মুখে রয়েছে, তবে সংবিধানের আওতায় ‘প্রশাসনিক ক্ষমতা’ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা রয়েছে। তবে সেটা হওয়ার জন্য বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা কিংবা গৃহযুদ্ধ তীব্র হতে হবে। সামরিক বাহিনীর হাতে অনেক বিকল্প রয়েছে, তারা সেগুলো বিবেচনা করছে।

এসবের মধ্যে রয়েছে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং কোনো সিনিয়র সৈনিককে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা। ওই সিনিয়র সৈনিক হতে পারেন কমান্ডার-ইন-চিফ নিজে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে অনুকূল বিকল্প হচ্ছে আঙ সান সু কিকে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত সেনাপ্রধানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে, সাময়িক সময়ের জন্যও হতে পারে, রাজি করানো। ১৯৫৮ সালে এমনটা হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী উ নু সামরিক প্রধান জেনারেল নে উইনকে অনুরোধ করেছিলেন দেশ পরিচালনা করতে।

তবে এই মুহূর্তে বল এনএলডির কোর্টে। আগামী ছয় মাসে যা কিছু ঘটতে যাচ্ছে, সেটাই দেশটির তথা দেশটিতে গণতন্ত্র জোরদার হবে না কি সামরিক শাসন ফিরে আসবে- তা নির্ধারণ করবে। কো নির হত্যাকান্ডটি অন্তত অনিশ্চয়তার নতুন যুগের সূচনা করেছে।

 লেখক : ইয়াঙ্গুনভিত্তিক সাংবাদিক এবং মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এশিয়া অঞ্চলের ওপর লেখালেখি করছেন। প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এশিয়াবিষয়ক সম্পাদক।

 

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৫৬ : বাণিজ্যিক নির্মাণ খাত: উত্থান ও বৈশ্বিক বাজার

আনু মুহাম্মদ ::

নতুন পর্যায়ে চীনের চোখ ধাঁধানো ‘উন্নয়ন’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্যিক আবাসনসহ এর নির্মাণ খাতের বিকাশ। লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা চীনের জিডিপির শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ এই খাত এবং সম্পর্কিত নির্মাণ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক তৎপরতা থেকে আসে। এই নির্মাণ কাজে চীন যে দক্ষতা ও ক্ষিপ্রগতির স্বাক্ষর রেখেছে তা সারা দুনিয়ার জন্যই বিস্ময়কর। অনেক প্রযুক্তিগত নতুন উদ্ভাবনও ঘটেছে এর মধ্য দিয়েই।

আবাসিকখাতসহ পুরো নির্মাণ খাতের বিকাশের সাথে যুক্ত রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি নির্মাণকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। চীনের নব্য ধনিক শ্রেণীর বড় সমাবেশ এসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেই ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ এদের বিকাশকে নিরাপদ ও ত্বরান্বিত করেছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণের বড় ক্ষেত্র এই নির্মাণ খাত। ২০১৬ সালের প্রথম দিকের হিসাব অনুযায়ী চীনের বৃহত্তম পাঁচটি ব্যাংক তার শতকরা ২৮ ভাগ ঋণই দিয়েছে আবাসিক নির্মাণ খাতে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ঋণ প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও এই খাতে চাহিদার তুলনায় অতিউৎপাদনের কারণে ঋণখেলাপীর হারও আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। [i]

বড় শহরগুলোতে বিশেষত সাংহাই, শেনজেন এবং নানজিং-এ ভবন সম্পত্তির দাম শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশি বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে চীনের নির্মাণ ব্যবসায়ী সবচাইতে ধনী ব্যক্তিও একে চীনের ইতিহাসে সবচাইতে বড় সমস্যা বা ‘বুদবুদ’ বলে স্বীকার করেন। বিদেশি ব্যাংক, স্থানীয় দালাল, র্রাষ্ট্রীয় বিশ্লেষক সকলেরই এ বিষয়ে একমত। এমনিতে সমগ্র অর্থনীতির মধ্যে অন্য যেকোন খাতের তুলনায় এই খাতের প্রবৃদ্ধি হার বেশি। আবাসিক নির্মাণে অতিউৎপাদন সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে সহজ ঋণের সম্প্রসারণ ঘটানো হয়। এর মধ্যে দিয়ে সাময়িকভাবে হলেও বিক্রি আবার বাড়ে।

চীনের অর্থনীতিতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে, এখন উৎপাদনের চাইতে ভোগ, শিল্পের চাইতে পরিষেবার অবদান বেশি বেড়েছে।[ii]

আগেই বলেছি, চীনের ১০ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্মাণ ও সম্পর্কিত তৎপরতা থেকেই আসে। নির্মাণ খাতে চীনের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও পুঁজির পুঞ্জিভবন এই খাতকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চীনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও বিশেষ তাগিদ সৃষ্টি করেছে। এই সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে চীনের ব্যয়বহুল প্রকল্প এবং ব্যাংকঋণেরও সম্পসারণ ঘটছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো নির্মাণে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এর একটি বহিপ্রকাশ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

এক হিসেবে দেখা গেছে, শুধুমাত্র ২০১৪ সালে চীনের বিভিন্ন কোম্পানি আফ্রিকায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নির্মাণ চুক্তি করেছে। আফ্রিকায় এখন চীনের চালু নির্মাণ প্রকল্পের সংখ্যা ৩ সহস্রাধিক। আফ্রিকায় নির্মাণ খাতে ফ্রান্স, ইটালী ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে বাজার মূল্যে যতো নির্মাণকাজ করছে, চীন করছে তার চাইতে বেশি। পুরো বিশ্বের মোট নির্মাণ প্রকল্পের এক চতুর্থাংশ এখন চীন একাই সম্পাদন করে। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচিতে চীন যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিচ্ছে তাতে তার এই প্রভাব আরও বাড়বে।[iii]

বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবন্দর থেকে বিশ্ব অলিম্পিকে নির্মাণ শৈলী এবং উচ্চ ব্যয় পুরো বিশ্বের জন্যই এক চমকে যাবার ব্যাপার ছিলো। একমাত্র বেইজিং অলিম্পিকেই চীন ব্যয় করেছে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

চীনে এখন বিশ্বের সবচাইতে বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আছে, যার পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। চীনের বহু নির্মাণ কোম্পানি ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাবার কারণেই দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রান্তে বিনিয়োগ করছে, চুক্তি করছে। নির্মাণ কাজে নতুন নতুন প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে চীনা কোম্পানি এখন কার্যত অপ্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে উঠছে। সাধারণ ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার না করে তারা খুব দ্রুত বহুতল ভবন নির্মাণ শেষ করছে। পূর্ব নির্মিত উপাদান সংযোজনের মাধ্যমে ৬ দিনে ১৫ তলা ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা এর একটি দৃষ্টান্ত। এই দৃষ্টান্তের পর বহু প্রতিষ্ঠান চীনে বিভিন্ন নির্মাণ উপাদান তৈরির কারখানা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং তার রফতানির বাজারও তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কাতার, ইরান, সুদান, এঙ্গোলাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডেও এর বাজারের উজ্জল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

নির্মাণ খাতের এই উর্ধ্বমুখি গতির প্রভাব জ্বালানী ও পানির চাহিদার উপরও চাপ ফেলেছে। এই চাপ কমাতে গিয়ে পরিবেশ অনুকূল নির্মাণ প্রযুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্র ইদানিং মনোযোগ দিচ্ছে। এছাড়া বড় বড় শহরগুলোতে নির্মাণকাজে ব্যাপক প্রসারের পর এখন সরকারিভাবে গ্রামাঞ্চলে নির্মাণকাজে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।[iv]  কিন্তু গ্রামাঞ্চলে নির্মাণ পুঁজি বিনিয়োগের যোগানের তুলনায় বাণিজ্যিক ভবনের নতুন চাহিদা কম। এক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে চাহিদা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় সরকার নিজেই জমি ও ভবন ক্রয় করছে বৃহৎ আকারে, এজন্য তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের উপর। এর ফলে নির্মাণখাতে পুঁজি বিনিয়োগ যতো বাড়ছে ততো স্থানীয় সরকারের ঋণগ্রস্ততা বাড়ছে।


[i]http://www.forbes.com/sites/sarahsu/2016/07/06/chinas-real-estate-sector-is-overstocked/#9d8727132873

[ii]https://www.bloomberg.com/news/articles/2016-07-16/china-s-economy-gets-boost-from-property-construction-sectors

[iii]http://thediplomat.com/2015/12/africa-and-chinas-construction-market/

[iv]https://www.spireresearch.com/spire-journal/yr2011/q1/2011-q1-china-construction-industry/

 

নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়- ট্রাম্পের মুসলিম নিষিদ্ধকরণ : কাপুরুষোচিত ও বিপজ্জনক

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

প্রথমত, সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের পুনঃবসতিস্থাপন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতকরণ এবং মুসলিম প্রধান সাতটি দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের নিষ্ঠুরতার বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। এই নিষেধাজ্ঞার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওইসব পরিবার ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্ভোগে পতিত হয়, যারা নিজেদের দেশে হত্যাযজ্ঞ এবং স্বৈরতন্ত্র থেকে রক্ষা পেতে অনন্য আশাবাদী  হয়ে এই দেশে পৌঁছেছে বলে বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ ছিল।

এই গোঁড়ামিপূর্ণ, কাপুরুষোচিত, আত্ম-পরাজয়মূলক নীতির প্রথম শিকার হয়েছিল হাস্যকর ‘প্রকেটটিং দি নেশন ফ্রম ফরেন টেরোরিস্ট এনট্রি ইনটু দি ইউনাইটেড স্টেটস’ শিরোনামের নির্বাহী আদেশটি কার্যকর করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, আমেরিকান বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়া লোকজন। ওই ব্রুকলিনের ফেডারেল বিচারপতি জরুরিভিত্তিতে স্থগিতাদেশ দিয়ে রায় দেন, বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়া লোকজনকে তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে নির্বাহী আদেশটির অন্য সব বিষয়ের ভবিষ্যতই অমীমাংসিত থেকে গেছে।

এটাকে অবশ্যই ওইসব উদ্বাস্তুর জন্য ভাগ্যের নির্মম খেলা হিসেবে অনুভব করতে হবে, যাদেরকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির দেয়ালে বছরের পর বছর ধরে কঠিন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার শিকার হতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞা ভিসা পেয়ে আমেরিকায় জীবনযাপন করতে আসা লাখ লাখ অভিবাসীর জীবন ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্ত করবে। নিষেধাজ্ঞাটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন নগরীতে গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউজ নীতিটির প্রয়োগসীমা সামান্য কমিয়ে এনে বৈধ স্থায়ী অধিবাসীদের রেহাই দেয়।

দম বন্ধ করা এবং কর্কশ ভাষায় ঘোষণা করা নির্দেশটি ‘হলুকাস্ট রিমেমব্রান্স ডে’-এ ইস্যু করাটা আমেরিকার নিজের মূল্যবোধের প্রতি গভীরতম শিক্ষার প্রতি প্রেসিডেন্টের নির্মমতা ও উদাসীনতাই প্রতিফলিত করেছে।

আদেশটির পেছনে কোনো ধরনের যৌক্তিকতা নেই। এতে যুক্তি হিসেবে ১১ সেপ্টেম্বর হামলার কথা বলা হয়েছে, অথচ ছিনতাইকারীদের সবাই যেসব দেশের নাগরিক সেই সব দেশ এবং সেই সাথে, কাকতালীয়ভাবে সম্ভবত নয়, যেসব দেশের সাথে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা আছে- সে সব দেশকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নথিটিতে কোনো ধর্মের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। কিন্তু তবুও মুসলমানদের বাদ দিয়ে অন্যান্য ধর্মের লোকজনকে গ্রহণ করার সরকারি কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দেওয়াটা সুস্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক কাজ।

নির্দেশটির ভাষা যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে তা হলো- মি. ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময় আবেগ সৃষ্টিকারী ‘বিদেশী-ভীতি’ ও ‘ইসলাম-ভীতি’ তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদেও বহাল থাকবে। বিষয়টা ছিল অ-আমেরিকান, কিন্তু এখন সেটাই আমেরিকান নীতি। ‘যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, এই দেশে যারা প্রবেশ করে, তারা এর প্রতি এবং এর প্রতিষ্ঠার নীতিমালার প্রতি বৈরী মনোভাব ধারণ করতে পারবে না,’ বলে যে নির্দেশটি জারি করা হয়েছে, তা দিয়ে এই বিভ্রান্তিপূর্ণ ধারণা প্রচার করা হয়েছে যে, সব মুসলিমকেই হুমকি বিবেচনা করা হবে। (এতে নারীদের প্রতি সহিংস কর্মকান্ড পরিচালনাকারী লোকজন এবং বর্ণ, জেন্ডার ও যৌনতা-সংক্রান্ত আইনভঙ্গের কারণে শাস্তি পাওয়া লোকজনকে রেহাই দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। যৌন হয়রানির কথা গর্বভরে প্রচারকারী এক প্রেসিডেন্ট এবং সমকামীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকারী নীতি সমর্থনকারী একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজেদের ওই মানদন্ডের জন্য ভীত হতে পারেন।)

এই নতুন নীতির ভ্রষ্ঠতার কারণেই আদালত, কংগ্রেস এবং মি. ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীল  সদস্যদের উচিত অবিলম্বে এটি বাতিল করার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা।  তবে তা করার জন্য এর চেয়েও আরো যে বড় কারন রয়েছে : এটা চরম বিপজ্জনক। চরমপন্থী গ্রুপগুলো এই ধারণাটি জোর গলায় নির্দেশটি প্রচার করে বেড়াবে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যভাবে, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামকেই টার্গেট করে, এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা একটি ভীতিপূর্ণ, বেপরোয়া, যুধ্যমান আমেরিকার চেয়ে বড় কিছু চায় না। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা যদি কিছু করে, সেটা হবে উত্তেজিত ও অনভিজ্ঞ প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আরো বেশি প্রতিক্রিয়া উস্কে দিতে, আমেরিকায় আঘাত হানতে আরো জোর প্রচেষ্টা চালানো।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান মিত্ররা যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করবে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা যেখানে তাদের ধর্মকে নিন্দা করছে, সেখানে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করবে এবং তার প্রতি কেন শ্রদ্ধাশীল হবে? আমেরিকার সামরিক অভিযান সমর্থনকারী আফগান ও ইরাকিরা তাদের দেশে বোমা ফেলার ব্যাপারে যথেষ্ট সাহসী হলেও, তাদের সবচেয়ে দুর্বল স্বদেশবাসীদের এবং সম্ভবত তাদেরও আশ্রয় দিতে অত্যন্ত ভীত সরকারের জন্য বিপুল ঝুঁকি নেওয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা- তা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই পারে। কংগ্রেসের যেসব নীরব রিপাবলিকান রয়েছেন কিংবা কৌশলে নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন দিচ্ছে, তাদের বোঝা উচিত, ইতিহাস তাদেরকে ভীরু হিসেবে স্মরণ করবে।

এই নীতি স্থগিত করার ব্যাপারে  মি. ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের চেয়ে ভালো অবস্থায় সম্ভবত আর কেউ নেই। নির্বাচনের সময় প্রস্তাবিত মুসলিম নিষেধাজ্ঞার বিপদ সম্পর্কে মি. ম্যাটিসের যথার্থ ধারণা থাকায় তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার মিত্ররা যৌক্তিকভাবেই ভাববে, ‘আমরা সত্যিই যুক্তির প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি’ কিনা। তিনি আরো বলেছেন, ‘এ ধরনের বিষয় এই মুহূর্তে আমাদের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হচ্ছে, এবং আন্তর্জাতিকব্যবস্থায় এটা খুবই খারাপ বার্তা পাঠাচ্ছে।’

আমেরিকার নিরাপত্তার প্রতি তার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নিয়ে প্রশংসাকারী সবাই এখন তার নীরবতা উদ্বিগ্ন। এই হাস্যকর ঘটনায় যে তাদের সুনাম কোনোভাবেই বাড়বে না, সেটা মি. ম্যাটিস এবং সরকারের অন্য সিনিয়র কর্মকর্তারা ভালোভাবেই জানেন। বরং তা করা হলে সেটা তাদের পেশাগত সুনাম শেষ করার চেয়েও বড় কিছু হবে। এটা তাদেরকে আমেরিকান মূল্যবোধ পরিত্যাগ এবং তাদের দেশের অন্য নাগরিকদের বিপদগ্রস্ত করার ভুল পথে ঠেলে দেবে।

‘স্বৈরাচার’কে ভালবাসা দিবস

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

জয়নাল, জাফর, দিপালীদের কথা মনে আছে? অপার সম্ভাবনাময় টগবগে সেইসব তরুন, সামরিক স্বৈরাচারের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন। দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি; এখন যেটি ‘ভালবাসা দিবস’। মনে আছে রাউফুন বসুনিয়া, সেলিম, দেলোয়ার, নুর হোসেনদের কথা? সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলায় যাদের গুলি করে, ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এদের অনেকের মরদেহ গ্রামের কৃষক বাবা মায়ের কাছে পৌছোয়নি।

মাত্র আড়াই দশকে সব চাপা পড়ে গেছে। সব রক্তদান, নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনা বিস্মৃত হয়ে গেছে। কারন, যার নির্দেশে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল, যেসব ছাত্রনেতা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিলেন, তাদের দল এবং হত্যাকারীর দল এখন ক্ষমতার সহভাগী। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার সহভাগী করার পাপ যেমন বিএনপির জন্য অমোচনীয়, তেমনি প্রাক্তন সামরিক স্বৈরাচারকে পুনর্বাসন ও ক্ষমতার সহভাগী করার ঐতিহাসিক দায়ও নিতে হবে আওয়ামী লীগকে।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী স্মারক দিবস। তখন সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ। তার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ছাত্রদের। মাত্র দু’বছর আগে প্রতিরোধহীন ক্ষমতা দখল করা সেনাপ্রধান এরশাদের বিরুদ্ধে সেটিই ছিল প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ। হাজারো শিক্ষার্থীর মিছিলে গুলি চালায় স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী। মিছিল রক্তাক্ত হয় সেদিন ও পরের দিন যারা শহীদ হয়েছিলেন- তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা গিয়েছিল মাত্র।

রক্তাক্ত ঐ দিনগুলিতে কতজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন? সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। জানা যায়নি কখনও। অনেকের মরদেহ ইচ্ছাকৃত মাটিচাপা পড়েছে। স্বজনরা জানতে পারেনি কখনও। স্বৈরাচারী শাসকের নির্দেশে হত্যার পরে লাশ ‘গায়েব’ করে ফেলেছিল পুলিশ। নাম না জানা এসব শিক্ষার্থীদের শেষ ঠিকানা কোথায় হয়েছে – তা আজ অবধি অচিহ্নিত থেকে গেছে; হয়তো চিরদিনের জন্যই!

১৪ ফেব্রুয়ারি এখন ভালবাসা দিবস। ভালবাসা প্রকাশের একটি স্মারক দিন হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাড়িয়েছে পশ্চিমা জগতের সীমানা। জায়গা করে নিয়েছে এদেশেও। পশ্চিমা ঢেউ, তথ্য প্রযুক্তি আর বাজার অর্থনীতির লোলুপতা এই দিনের ক্রেজ ক্রমশ: বাড়িয়ে দিচ্ছে। কর্পোরেট বাণিজ্যের অংশ হিসেবে মিডিয়াও ফি-বছর দিনটি নিয়ে হচ্ছে মাতোয়ারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এর জয়-জয়াকার। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অনুষ্ঠান, সংবাদ, টক-শো সব হয়ে উঠেছে এই দিবসের ক্রীড়নক।

এর আড়ালেই চাপা পড়ে আছে এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরব-গাঁথা এবং অবশ্যই নিষ্ঠুর ট্রাজেডি। চাপা পড়ে আছে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দ্রোহ আর বিদ্রোহ। এরশাদের নিয়োগকৃত মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অদম্য গল্প অচিহ্নিত লাশের মত মাটিচাপা পড়ে গেছে। ভালবাসা দিবসের বিকিকিনির আড়ালে রক্তস্নাত আত্মত্যাগ কখন হারিয়ে গেছে বাঙালীর স্মৃতিভ্রষ্টতা, আবেগ আর ভাবালুতায়। রঙভরা বর্তমান প্রভাবিত করছে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও নীতিভ্রষ্টতায় এখন প্রায় সকলেই মোহাবিষ্ট।

ভালবাসা দিবসের মত নানা দিবস পালিত হয় বিশ্বে। ৩৬৫ দিনে জাতিসংঘের উদ্যেগে পালিত দিবসের সংখ্যা ১৩২টি। অধিকাংশ দিবস তৈরীর নেপথ্যে থাকে কর্পোরেট বাণিজ্যিক স্বার্থ। এর মধ্যে অন্যতম ভালবাসা দিবস। একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার মধ্য দিয়ে এদেশে ভালবাসা দিবস আমদানী করেন। এটি কি তিনি পরিকল্পিতভাবে করেছিলেন? তখনকার দিনে পত্রিকাটির প্রভাব বিবেচনায় তিনি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবেও দিনটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। তিনি তা করেননি। তিনি যা করেছেন, তা সকলকে বিশেষ করে তরুনদের দারুনভাবে প্রভাবিত করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে কর্পোরেট বাণিজ্য। এখন ভালবাসা দিবস আর বাণিজ্য মিলে-মিশে একাকার।

আমাদের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতি অঙ্গনের মহারথীগন-তারা কি কখনও বলেছেন ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সাফল্যের পরিনতিতে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন প্রধান জাতীয় নেতা। এরশাদের পতনের পর তারা পালাক্রমে দেশের কর্ণধার হয়েছেন। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া যতটুকু সফল ছিলেন দ্বিতীয়বার এসে বেশি পরিমানে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে গোপনে-প্রকাশ্যে আপোষের চেষ্টা করেছেন এরশাদের সাথে। পিতার খুনী হিসেবে অভিযুক্তের সাথে তারেক রহমান করেছেন আপোষ-রফার সভা।

শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচার বিরোধী মতাদর্শ দুরে সরিয়ে দেন। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে তারা এরশাদকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। ১৯৯৬-র প্রথম মেয়াদে এরশাদকে ক্ষমতার সঙ্গী করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে মহাজোট গড়েছেন এবং ক্ষমতার অংশীদার করেছেন। তৃতীয় মেয়াদে এরশাদকে পুরস্কৃত করেছেন ‘বিশেষ দূত’ হিসেবে। এর ফল হিসেবে হত্যা মামলায় অভিযুক্তের গাড়ি জাতীয় পতাকা শোভিত হয়েছে।

রাজনীতির পঙ্কিলতায় আড়াই দশক পেরিয়ে পতিত স্বৈরাচার ইতিমধ্যে মূল রাজনীতির প্রয়োজনীয় চরিত্রে পরিনত। দলে-বলে হয়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। এই কারনে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস জনমন থেকে মুছে গেছে। উজ্জল হয়ে উঠেছে ‘ভালবাসা দিবস’। সামরিক স্বৈরাচার পতনের পর কথিত গণতান্ত্রিক শাসকরাও তাকেই অনুসরনীয় রেখেছেন। সরকার ও সরকারী বাহিনী এবং দলীয় ক্যাডারদের আক্রমনাত্মক আচরন বহাল থাকায় মানুষ অতীত রক্তাক্ত দিনগুলিকে বর্তমানের যন্ত্রনায় স্মরণে রাখছে না।

ক্ষমতার লোভ দ্বারা পরিচালিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বৈরাচার প্রতিরোধ বা পতন দিবস কোনটিকেই আর ধারন করে না এবং তাদেও পক্ষে তা সম্ভবও নয়। এরশাদ সাক্ষাতকার দিয়ে নুর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বললেও প্রতিবাদ করে না দুই দল। একই সময়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের বিচ্যুতি ছিল সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। তারা ভুলে যেতে থাকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ ও পতন দিবস। জয়নাল, দিপালী, নুর হোসেন ও ডা: মিলনদের তারা ভুলে যায়। আবার এরশাদ যে সরকারের ‘বিশেষ’জ দূত সেখানে মেনন ও ইনু দু’জনেই মন্ত্রী। রাজনৈতিক সুবিধা-আপোষের এরচেয়ে বড় উদাহরন আর কি হতে পারে!

ভ্রষ্ট রাজনীতিক, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ছাত্রনেতারা এখন সব ভুলে মগ্ন অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জনে। তারা ভালবাসা দিবস পালনে শরীক হয়েছেন। এখনকার ছাত্রনেতারা ক্ষমতার লোভ বা ভয়ে আপন অস্তিত্ব ভুলে গেছেন। কথিত বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতিক কর্মী প্রায় সকলেই দলদাস ভূমিকায়। ফলে তরুন প্রজন্মকে কে মনে করিয়ে দেবে ভালবাসা দিবস পালনের পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধী দিবসও পালন করা জরুরী।

এরশাদের বিরুদ্ধে নয় বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন, সেই ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন গতায়ু ইতিহাস। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ ও আত্মাহুতির দিন ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। জাতির ইতিহাসে এটি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। এরশাদ পতনের পর বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বের সাথে দিনটি পালন করতো। কিন্তু এখন গণতন্ত্র, স্বৈরাচার, বাম-ডান সব মিলে-মিশে একাকার। আর এজন্যই ১৪ ফেব্রুয়ারি এখন শুধুই ভালবাসার!  স্বৈরাচারকে ভালবাসার?

খুন-জখম : এখন শুধুই নিজেরা বনাম নিজেরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাংবাদিক হত্যায় কে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর কে রাণার আপ, সে কূটতর্কে না গিয়ে বলা হোক- সাংবাদিকরা হত্যা- নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, সাংবাদিকদের মধ্যেকার অনৈক্য, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দলদাস ভূমিকা এবং পেশাগত মানের নিম্নগামিতা, সর্বোপরি আইনের শাসনহীনতায়। অস্বীকার করি কি করে, এই দেশে এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক, সম্পাদকের বিরুদ্ধে সম্পাদক, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম। হালের স্বরাষ্টমন্ত্রীর আবিস্কার ‘ধাক্কা-ধাক্কি’ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূল বিষয় হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাংবাদিকদের নির্যাতন করে না, মাঝে-মধ্যে ‘ধাক্কা’ লেগে যায়।  সেজন্যই তাদের ভাবনায়- কথায় সাংবাদিক হত্যায় কেউ চ্যাম্পিয়ন আর কেউ রানার আপ।

প্রতিপক্ষবিহীন ক্ষমতাসীন দল, ছাত্র-যুব-শ্রমিক সংগঠন। গজিয়ে উঠেছে অজস্র ভূঁইফোড় সংগঠন। শহরে-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে জায়গা পেলেই দখল করে কোন না কোন লীগের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে সকল জনপদ। প্রতিপক্ষ না থাকায় মাঠ পর্যায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘাত-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের হাতে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে মাতৃগর্ভের শিশু, মারা পড়ছে সাংবাদিক, পথচারীসহ নিরীহ মানুষ। সংঘর্ষের মূূলে থাকছে নির্বাচনী বিরোধ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল, ভাগাভাগি ইত্যাদি।

গণমাধ্যম জানাচ্ছে, মাত্র তিনদিনে পাঁচ জেলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। জেলাগুলি হচ্ছে- খুলনা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নড়াইল ও শেরপুর। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে সাংবাদিক, খবর শুনে মারা গেছে তার নানী। নড়াইলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খুন হয়েছেন নির্বাচনকালীন বিরোধের জেরে। শেরপুরে কলেজ অধ্যক্ষ ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং ঈশ্বরদীতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের চার কর্মী গুলিবিদ্ধ ও অস্ত্রের আঘাতে জখম হয়েছেন। খুলনার ফুলতলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে যুবলীগ নেতা।

চাঁদপুরের হাইমচরের উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছাত্রদের দিয়ে পদ্মা সেতু বানিয়ে তাদের পিঠের ওপর দিয়ে জুতা পায়ে হেঁটে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বহিস্কার করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেয়া হবে। বলেননি- কি আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করি, মধ্যযুগীয় সামন্ত প্রভুদের মত আচরন করা লোকদের জন্য দল ও আইন শীগগিরই ব্যবস্থা নেবে। তবে মাত্র তিনদিনের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, দলের নেতা-কর্মীরা এখন কতটা বেপরোয়া!

গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষে খুন হয় ৩ জন, জখম হয় ২২জন। আগের দিন মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। বছর শুরুর আগের রাতে খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি কাউন্সিলরকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মারা যান পুজোর ফুল নিতে আসা এক নারী। নগরীর কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসা এ সংঘর্ষের মূল কারণ বলে গণমাধ্যমগুলির অনুসন্ধানে উঠে আসছে।

গত বছর জুলাইয়ে খুলনা ও কুমিল্লায় অভ্যন্তরীন কোন্দলে ছাত্রলীগের তিন নেতা-কর্মী খুন হন। পরের সাড়ে তিনমাস তারা সংঘর্ষবিহীন কাটালেও নভেম্বরের দিকে আবার গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ১৯ নভেম্বর ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্চিত হন। পরদিন নিজ বাসায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

২০১৭ সাল শুরু হওয়ার দিনে গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনামগুলিই ছিল ‘বাসায় ঢুকে সংসদ সদস্যকে হত্যা’; ‘খুলনায় আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার চেষ্টা, গুলিতে গৃহবধু নিহত’; এরকমই আতঙ্ক ছড়ানো সব খবর নিয়ে স্বাগত জানাতে হয়েছে নতুন বছরকে। স্বাভাবিকভাবেই উৎকন্ঠিত মানুষ। দিনে-দুপুরে, রাত-বিরেতে নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে ‘ট্রিগারহ্যাপী’ হয়ে উঠছে। মারছে নিরীহদের, নিজেদের তো বটেই।

লক্ষ্য করুন, পর পর দু’দিনের জাতীয় সংবাদপত্রগুলির শিরোনাম, ‘ক্ষমতাসীন দলের সংঘর্ষ: হানাহানি ও খুন-জখমের ঘটনা’; ‘আবার হানাহানিতে আ. লীগ গুলিবিদ্ধ সাংবাদিকের মৃত্যু’; ‘ঘরের আগুনে পুড়ছে আওয়ামী লীগ’; ‘ক্ষমতাসীন দল বেপরোয়া’; ‘শাসক দলে কেন এতো খুনোখুনি’; এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন সূত্র, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের বরাতে দেয়া বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ক্ষমতায় দেশজুড়ে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী। দলের অনেক মন্ত্রী, এমপি, জেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও দলীয় পদধারী নেতারা মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসকদের মত আচরন করছেন।

এসব ভাষ্য- বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে পারছে না ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অপরাধ দমন বা কমে না আসার কারন হচ্ছে, খুন বা সংঘর্ষের সাথে যারা যুক্ত, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, তারা আইন ও বিচারের আওতায় আসছে না। ফলে ক্ষমতাসীন দলের যে কোন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বদ্ধমূল ধারনা তারা যা খুশি তাই করে পার পেয়ে যেতে পারি। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, তাদের দলীয় সংঘর্ষের বলি হচ্ছে নিরীহ সাধারনরা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির মধ্যে ১৩ টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ১ জন, আহত হয়েছে ১৯০ জন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ৮৮ টি। খুন হয়েছে ৮৩ জন, আহত ১০৫২ জন। ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ, যুবলীগ বনাম যুবলীগ, ছাত্রলীগ বনাম ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ৩৫ টি। নিহত ৪, আহত ২০৬ জন।

আগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলকে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রস্তুত করার ঘোষণার পর যেন বেড়ে চলেছে অভ্যন্তরীন কোন্দল, হানাহানি ও সংঘর্ষ। ২০১৬ সালে ছয় দফায় অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় খুন হয়েছিলেন ১১৬ জন, যার মধ্যে ৭১ জন আওয়ামী নেতা-কর্মী।  তার আগের দু’বছর ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ক্ষমতাসীন এই দলের অভ্যন্তরীন সংঘর্ষে খুন হয়েছে ৬৭ জন নেতা-কর্মী।

এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন দল। দৃশ্যত: তারা আইনের উর্ধে অবস্থান করছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে রক্ত ঝরাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নেয়ার বদলে দর্শক বনে যাচ্ছে। এর কারনও ওপেন সিক্রেট। পুলিশের সামনে আগ্নেয়াস্র বহনের ছবি প্রকাশিত হলেও ভাষ্য আসে: পুলিশ খবর নিচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রটি কি বৈধ নাকি অবৈধ! মানে দাঁড়াচ্ছে প্রচলিত আইন ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

সবকিছুর প্রতি ক্ষমতাসীনদের সীমাহীন অবজ্ঞা। বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি ক্ষমতাসীনদের অবজ্ঞা ক্ষমতায় থাকতে না হয় জনগন দেখতে অভ্যস্ত। যারা সরকারের সমালোচনা করেন, মার্কিন লেখক এইচ এল মেনকেনের ভাষায়- চিন্তাশীল মানুষই সরকারের সবচেয়ে বড় শত্রু । এদের প্রতি এবং জনগনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বিষয়েও সকলে অভ্যস্ততা অর্জন করেছেন। কিন্তু আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা মনে করিয়ে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন হলেই তারা জবাবদিহিতার উর্ধে চলে যান। অন্য দিকে একটি দল নিজের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না, সেজন্য কি নিরীহ জনসাধারন প্রাণ দিতেই থাকবে?

ময়মনসিংেহের গফরগাওয়ের বাদল মিয়া (৫৮) একজন রেলকর্মী, মারা গেলেন রেলে কাটা পড়ে। এরকম মৃত্যু বাংলাদেশে গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে আকছার ঘটে থাকে। যে দেশে স্বাভাবিক মৃত্যু গ্যারান্টি প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে বাদল মিয়াদের মৃত্যু কি বিশেষ কোন অর্থ বয়ে আনে! কিন্তু এই বাদল মিয়ার মৃত্যু অর্থহীন নয়, কোন বিচারেই নয়। এক মা ও তার শিশু সন্তানকে রেলে কাটা পড়া থেকে বাঁচাতে নিজেই রেলে কাটা পড়লেন। এই মহত্তম মৃত্যু আমাদের ফিরিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চেতনার কাছে। যারা আমাদের বর্তমানের জন্য তাদের ভবিষ্যত উৎসর্গ করেছিলেন। অথবা মনে করিয়ে দেয়, গ্রীক পূরাণের প্রমিথিউসকে, আগুন আবিষ্কার করতে গিয়ে যিনি পুড়ে মরে, মানুষকে আগুন জ্বালানো শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।

ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্তর্গত সঙ্কট

পুলাপ্রে বালাকৃষ্ণান ::

ভারতের অর্থনীতি প্রায়ই মনোযোগ আকর্ষণ করলেও, প্রধানত খাদ্য সঙ্কট এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিভ্রাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, দেশটির গণতন্ত্রের কার্যকারিতা আলোচনার মধ্যে পড়ে না। এটা আত্মতৃপ্তির বিষয়টি প্রতিফলিত করে।

মজার ব্যাপার হলো, দেশটির যে দিকেই তাকানো হোক না কেন, অবহেলা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সমাজের ভেতর ও বাইরে- উভয় ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এর ফলে পাশ্চাত্য বিশ্বের শাসকেরা যখন মুক্তবাজার কাঠামোর আপাত শ্রেয়তর রীতিনীতি থেকে বিচ্যুতির জন্য ভারতকে তিরস্কার করেন, তখন ভারতের জাতীয়তাবাদী এলিটরা পাশ্চাত্য আধিপত্যের মধ্যে সমস্যাটি শনাক্ত করেন। উভয় পক্ষই ভারতের গণতন্ত্রের মধ্যেই ব্যর্থতার বীজ নিহিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে গুরুত্ব হারান। তারা বুঝতে চান না, সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতের একমাত্রিক গণতন্ত্র মোটামুটিভাবে একই অবস্থায় রয়ে গেছে।  এই মাত্রাটি হলো- জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠকে দুর্বল সামর্থ্যরে মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর স্বাধীনতাহীনতা : সামর্থ্য হলো ব্যক্তিদের- তাদের দৃষ্টিতে মূল্যবান বিবেচিত পন্থায় জীবন যাপন করতে পারা। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এটাকেই সত্যিকারের স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন;  এবং এ কারণে সব উন্নয়ন প্রয়াসে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আইডিয়াটা মৌলিক এই দৃষ্টিতে যে, এটা উন্নয়নের সংকীর্ণ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংজ্ঞার বাইরে নিয়ে যায়। নিজেদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে না পারাটা পরাধীনতা- আমাদের জনসাধারণের বিপুল অংশ যতক্ষণ এমন অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ আমাদের সংবিধানে আমরা যতই ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ঢুকাই না কেন,  রাজ্য বা বাজার যতই আমরা পাই না কেন, তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

ভারতের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের ভিশন যা-ই হোক না কেন, ভারতীয় গণতন্ত্র তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বরং বাস্তবতা হলো, তা আরো খারাপ হয়েছে। অতীতের বছরগুলোতে সে তার নিষ্ক্রিয় চরিত্রে প্রান্তিকতার দিকে সহিংসতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। পাশ্চাত্যে ভারতীয়রা বর্ণবাদী মর্যাদাহানির শিকার হওয়ার খবর আমাদের বসার ঘরে প্রবেশ করলে, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণী দ্রুত আহত হয়।

ভারত থেকে এই দৃশ্য একটা পুরো শতক পরে এসেছে। আর দলিত তরুণরা কেবল মৃত গরুর চামড়ার অধিকারী হতো। ভারতীয় সমাজ ঐতিহাসিকভাবে তাদেরকে এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল। তাদেরকে এই কাজের মধ্যে আটকে রেখে তাদের মর্যাদাই কেবল প্রত্যাখ্যান করা হয়নি, সেইসাথে তাদের জীবিকাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। যেকোনো সভ্য সমাজে এই অপরাধের অপরাধীরা কেবল আদালতের লম্বা হাতের কাছে ধরাই পড়তো না, প্রকাশ্যে লজ্জিতও হতো।

গুজরাট নিঃসন্দেহে দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্র একটি স্থান। এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে, উত্তর ভারতজুড়ে এটা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল এবং দক্ষিণ ভারতও তা থেকে মুক্ত ছিল না; তামিল নাড়– বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এটাও ঠিক, দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সাম্প্রতিক সময়ের সৃষ্ট বিষয় নয়। ভারতে তাদের নির্যাতন সঙ্ঘবদ্ধ এবং অনেক গভীরে নিহিত। মধ্য বর্ণের নেতাদের মাধ্যমে অ-কংগ্রেসীয় শাসন দীর্ঘ দিন ধরে রয়েছে তামিল নাড়–, বিহার ও উত্তর প্রদেশে। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এসব রাজ্যে অনেকবারই দলিতদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দেখা গেছে। ক্ষমতায় থাকার সময় মধ্য বর্ণভিত্তিক দলগুলো সমাজ পিরামিডের শীর্ষের প্রতি তাদের আক্রমণ নিচের দিকে থাকাদের দমনে চালিত করে।

সমাজবাদী ক্যারিশমা : তাহলে আমরা কী করতে পারি? ক্ষমতার করিডোরের বাইরে থাকাদের দায়িত্ব হলো- ভারতীয় গণতন্ত্রের ধারা গড়ে দেওয়া। তাদের লক্ষ্য হতে হবে- দুর্বল সব গ্রæপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানব উন্নয়নের দিকে নতুন নজর নিবদ্ধ করা। এজন্য শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ার সাথে কোনোভাবেই সঙ্ঘাতময় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তেজদীপ্ত বাজারসহ শক্তিশালী অর্থনীতি স্বাধীনতা প্রকাশের একটি বিষয়। বেসরকারি উদ্যোগে বিধিনিষেধ সমাজের প্রান্তিকদের ক্ষমতায়নে কিছুই করতে পারে না। তাদের ক্ষমতায়ন আসতে পারে কেবল তাদের সামর্থ্য বিকাশে প্রত্যক্ষ সরকারি কার্যক্রমের মাধ্যমে।

বস্তুত, সমাজবাদের প্রতি সত্যিকারের প্রতিশ্রুতিই এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্রকে এমন নীতি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন- যেখানে ‘প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে, তার প্রয়োজন অনুযায়ী পাবে।’ কিন্তু এর বদলে ভারত রাষ্ট্রের সরকারি আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্র আবদ্ধ থেকেছে সরকারি খাতে ফলাফল হিসাব না করেই এবং ঐতিহাসিকভাবে অচ্ছ্যুৎ হয়ে থাকাদের জন্য পরিণতি না ভেবেই পণ্য উৎপাদনে। সামাজিক পরিমন্ডলে অর্থনীতি এবং অবাধ বাজারে হস্তক্ষেপের জন্য রাষ্ট্র গর্ব করেছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি সহায়ক এমন প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ায় কাজটি বাস্তবে রূপ নেয়নি। ঐতিহাসিকভাবে অচ্ছ্যুৎদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা আসলে পিছিয়ে থাকাদের সহায়তা না দেওয়ার নৈতিক অবস্থান গ্রহণের মতোই ব্যবস্থা।

নীতি পরিবর্তন : শেষ পর্যন্ত কর্ম অনুযায়ী ফল পাওয়া গেল। বর্তমান ভারতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দুর্বলভাবে শিক্ষিত ও খারাপ স্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষের বাস। ক্রয় ক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অথনীতি হওয়া সত্তে¡ও এটা একটা উন্নয়ন বিপর্যয়। বঞ্চিতের মাত্রাটি বোঝার জন্য যে কেউ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় ভারতীয় রেলওয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে, যেভাবে ‘গান্ধী করেছিলেন’, চড়ে দেখতে পারেন এবং কিভাবে এর সমাধানের নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে, সেটা অনুমান করে নিতে পারেন। ‘অর্থনৈতিক সংস্কারের’ নামে ভারতীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে সিকি শতাব্দী ব্যয় করা হয়েছে। এখন পরবর্তী একটা দশক মানব বঞ্চনার দিকে নজর দিলে তা হবে লাভজনক। ভারতের সবচেয়ে বঞ্চিত নারী ও দলিতদের সামর্থ্য বিকাশের জন্য প্রথমে পরিকল্পনা করে সেদিকে সম্পদ চালিত করতে হবে।

গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার জন্য ব্যক্তির ওপর নজর দেওয়ার চেয়েও আরো বড় কিছু করা প্রয়োজন। প্রত্যেকেই যাতে স্বতন্ত্র থেকেও সমান হতে পারে- সেটা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এখানে জনকল্যাণ সামনে আসতে হবে; অংশগ্রহণকারী সাম্যের ভিত্তিতে ভারতীয়রা যাতে মিলতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এই দেশের মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সংগ্রাম করতে থাকায় স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, সমাধিস্থলে ব্যাপকভিত্তিক সরকারি পরিষেবার মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে। মতবিনিময়ের ব্যাপক ব্যবস্থাই অভিন্ন মানবতা প্রকাশ করে; আমরা সত্যিকারের কী তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা করে দেয়।

ভারতের সরকারি নীতি নির্ধারণে জনসাধারণের অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে মতবিনিময়ের সুযোগ খুবই কম। অনেক দেশই এ ব্যাপারে অনেক কিছু করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘পুঁজিবাদী’ সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে সরকারি আবাসনে সব ‘বর্ণ’ তথা চীনা, ভারতীয় ও মালয়দের একসাথে থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই বৈশ্বিক ফোরামে সন্ত্রাসবাদের অগ্রহণযোগ্যতার কথা বলে থাকেন। এমনটা বলার অধিকার তিনি রাখেন। এখন গুজরাটে দলিতদের ওপর আক্রমণ, দেশজুড়ে নারীদের ধর্ষণ এবং উত্তর-প্রদেশে মুসলিমদের ভীতিপ্রদর্শন আমাদের মধ্যেই সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি থাকার বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এসবের অনেক কিছু তার দিল্লিতে আগমনের আগে থেকেই থাকলেও, তার পর থেকে ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলো সুরক্ষা পেয়ে ওই কাজ করতে উৎসাহিত হচ্ছে- এমনটা বিশ্বাস করার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।

এসব শক্তিকে সংযত করার অক্ষমতায় ভারতীয় গণতন্ত্রকে ক্রমাগত ম্লান হতে দেখা যায়। বার্নান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আমরা কখনো দিতে পারি না, যদি আমরা অন্যদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিতে পারি’। দলিতদের নির্যাতনে ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরকে একইরকম মানুষের মর্যাদা অন্তত দেওয়া হয়েছে। তারা কেবল সম্মিলিতভাবে মরা পশুর সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। তারা পানি সরবরাহ বিষাক্ত করেনি। (দ্য হিন্দু অবলম্বনে)

উগ্রজাতীয়তার কবলে হলিউড

ফ্লোরা সরকার ::

আমরা যখন ইতালীয় ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ অথবা ভারতের ‘হিরক রাজার দেশে’ অথবা  বাংলাদেশের ‘জীবন থেকে নেয়া’ দেখি তখন কি মনে হয় না, ছবিগুলোর ঘটনা, চরিত্র ইত্যাদির সঙ্গে যার যার নিজ নিজ দেশের সাথে কোথায় যেন মিলে যাচ্ছে? বাংলাদেশের একজন দর্শককে যেমন লাইফ ইজ বিউটিফুল বুঝতে অসুবিধা হয় না, ঠিক তেমনি ইতালীয় বা ভিন্ন ভাষার একজন দর্শকে হিরক রাজার দেশে বা জীবন থেকে নেয়া (ইংরেজি সাবটাইটলযুক্ত) বুঝে নিতেও কোনো অসুবিধা হয় না। ইরানের ‘দ্য ব্ল্যাকবোর্ড’ অথবা ‘দ্য সিক্রেট ব্যালট’ যখন দেখি এবং সেই ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক যখন সারা ছবি জুড়ে মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য হয়রান হয়ে ঘুরে বেড়ান অথবা ‘দ্য সিক্রেট ব্যালট’ ছবিতে দেশের নির্বাচন নিয়ে যে ঠাট্টা-মস্করা করা হয়, তা কি আমাদের মতো দেশের সঙ্গে মিলে যায় না? শুধু মিলেই যায় না, ছবিগুলো তখন আমরা আমাদেরই মনে করি। মনে হয়, আমাদের মনের কথা, আমাদের বাস্তবতা, অন্য ভাষায় দেখছি, শুনছি আর অনুভব করছি। এর নামই আন্তর্জাতিক ভাষা। সিনেমা থেকে শুরু করে সব শিল্পকর্মের ভাষা তাই আন্তর্জাতিক হয়ে থাকে। শিল্প-সাহিত্যের এই আন্তর্জাতিকতার কারণে অতীতেও যেমন শিল্পকর্ম হয়েছে, আজও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবে। সীমান্ত না মানা এসব কাজকে তাই কেউ দেশের সীমারেখা দিয়ে বেঁধে রাখতে পারেনা। কিন্তু এবারের অস্কার প্রতিযোগিতায় ‘এ সেপারেশন’ খ্যাত ইরানের চিত্রপরিচালক আজগার ফারহাদির ছবি ‘দ্য সেলসম্যান’ যখন মনোনীত হলো এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে গেলো, তখন শিল্পের এই আন্তর্জাতিকতার প্রশ্নটা আবার সামনে চলে আসলো। হলিউড শুধু সিনেমার বিশ্ববাজারের জন্য বিখ্যাত নয়, প্রতিবছর এখানকার একাডেমি থেকে বিদেশি ভাষার জন্য প্রতিযোগিতা বিভাগে যে এ্যওয়ার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়, সে কারণেও  হলিউড প্রশংসাযোগ্য। ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞা সেই প্রশংসার উপর যেন একটা আঘাত এনে দিলো। তবে আজগার ফারহাদির ঘটনাই প্রথম নয়, এর আগেও এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে।

সময়- ২০১৩ সাল, স্থান- লস এঞ্জেলেস এয়ারপোর্ট; প্যালেস্টাইনের নির্মাতা এমাদ বার্নাট নির্মিত, অস্কার মনোনীত ছবি ‘ফাইভ ব্রোকেন ক্যামেরাস’ এর জন্য যখন তিনি তার স্ত্রী এবং আট বছরের ছেলেকে নিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছালেন, তখন তাকে আটকে রাখা হলো প্রায় দেড় ঘন্টা। শেষে বিখ্যাত প্রামান্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল মুরের সহায়তায় বার্নাট মুক্ত হলেন এবং আমেরিকা প্রবেশের অনুমতি পেলেন। এই বিষয়ে মাইকেল মুর পরে হিটফ্লিক্সকে জানান, ‘বার্নাট যখন সাহায্য চেয়ে আমাকে টেক্স করলো, আসলে তখন যেটা হয়েছিলো, সেটা হলো, এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস অফিসারদের মাথায়ই ঢুকছিলো না যে, একজন প্যালেস্টাইনি কি করে অস্কারে মনোনীত হয়।’ এই হলো আমেরিকার ইমিগ্রেশন অফিসারদের বুদ্ধির দৌঁরাত্ম। মুর কিছুটা কটাক্ষ করে পরে বলেন, ‘আসলে নিমন্ত্রনপত্রের লেখাটা বোধহয় ঠিক মতো লেখা হয়নি, লেখা হলে এরকম বিতাড়িত হবার ভয় এমাদ বার্নাটকে পেতে হতোনা।’ তবে এই বিষয়ে বার্নাটের খুব বেশি উদ্বেগ ছিলো না। বার্নাট বলেন, ‘বিষয়টা কিছুটা বিব্রতকর। কিন্তু প্যালেস্টাইনে প্রায় প্রতিদিন আমাদের এইরকম বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। ওয়েস্টবাংকে ৫শ’ ইসরাইলি চেকপোস্ট, রোডবলক সহ আরও নানারকমের বাঁধাবিঘ্ন অতিক্রম করে প্রতিদিন আমাদের চলাফেরা করতে হয়, এটা তো একটা ছোট্ট ঘটনা মাত্র।’

ঘটনা ছোট হলেও এসব ঘটনাই পরে বড় আকার ধারণ করে। যেমন এবারের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ব্যপ্তি। তবে  ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক ফারহাদি, অস্কারে মনোনীত হলেও নিজেই ঘোষণা দিলেন যে, আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য অস্কার অনুষ্ঠানে যাবেন না। ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র তারানেহ আলীদুস্তি ফারহাদির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনিও যাবেন না এবারের অনুষ্ঠানে। ফারহাদি আরও বলেছেন, তাকে যদি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে যাওয়াও হয়, তবু তিনি যাবেন না। কেন যাবেন না?  ভ্যারাইটিতে (২৯ জানুয়ারি, ২০১৭) সে কারণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ফারহাদি বলেছেন, ‘একটা দেশের নিরাপত্তার জন্য মিথ্যা অজুহাতে, অন্য দেশের নাগরিকদের উপর সেই দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে যে অপমানিত বা হীন করা হয়, শত্রু তা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়, এগুলো ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, আমি আশা করবো- আমার দেশসহ আরও যে ছয়টা দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, সেসব দেশ এবং আমেরিকার জনগণের মাঝে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করবেনা।…… এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বিষয়টা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ। আমার দেশেও এমন কট্টরপন্থী অনেক আছে। বিগত বেশ কযেক বছর ধরে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই ধারের দেশগুলোতেই, এসব কট্টরপন্থীরা, বিভিন্ন জাতি এবং সংস্কৃতির পার্থক্যের জায়গায় অবাস্তব এবং ভয়াবহ বিরোধী মত গড়ে তুলছে। বিরোধ সৃষ্টি করে শত্রুতা, শত্রু তা সৃষ্টি করে ভয়।  চরমপন্থা এবং মৌলবাদের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া এই ধরণের ভয় অত্যন্ত ফলপ্রসু ও কার্যকর একটা অস্ত্র।’ অর্থাৎ মানুষ তখন খুব সহজেই সবকিছু বিশ্বাস করে ফেলে। কে শত্রু , কে বন্ধু তার এক গোলকধাঁধাঁর ভেতর ঘুরপাক খায়।

তবে শিল্পীরা সব সময় সচেতন নাগরিক। শিল্পের কাজ মানুষের মাঝে সচেতনা সৃষ্টি করা এবং সেই সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়া। শিল্পের ইতিহাসে দেখা গেছে, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে শিল্পীরা প্রথমে এগিয়ে আসেন। কবি নাজিম হিকমতকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্যে পাবলো পিকাসো, পল রবিনসন, জ্যঁ পল সার্ত্রেসহ আরো অনেক দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিক ১৯৪৯ সালে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করে কীভাবে প্যারিসে প্রচার-প্রচারনা শুরু করেন এবং তাকে কারামুক্ত করেন। জাফার পানাহীর  ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটছে। জাফর পানাহীকে গৃহবন্দী করার পর থেকে তার নিজের দেশের শিল্পীসাহিত্যিকসহ আন্তর্জতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের সেলিব্রিটিদের নিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের বর্তমান নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপ গত ৮ জানুয়ারি গোল্ডেন গ্লোব অনুষ্ঠানে যে অসাধারণ বক্তৃতা দেন- তা এখন ইউটিউবে সবার হাতে হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মেরিল প্রথমেই হলিউডের কিছু বিখ্যাত শিল্পীদের নাম উল্লেখ করেন- যারা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে হলিউডকে সমৃদ্ধশালী করেছেন। এবং যাদের ছাড়া হলিউড একেবারেই অচল। এখন এসব শিল্পীকে যদি হঠাৎ করে দেশছাড়া করা হয় তাহলে হলিউডে ফুটবল খেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকবেনা। মেরিল রসিকতা করে বলেন, ফুটবল অবশ্য মার্শাল আর্ট তবে আর্ট (অর্থাৎ নির্ভেজাল শিল্প) নয় কিন্তু। তার ছোট্ট- নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় শুধু শ্লেষ ছাড়া আর কিছু ছিলোনা। একজন শিল্পী যখন সকল শিল্পীর হয়ে কথা বলেন, তখন তার উদারতার মাত্রা বুঝে নিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয়না। সেই সাথে ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও আন্তর্জাতিক একটা রূপ প্রস্ফুটিত হতে দেখা যায়। মেরিলের বক্তৃতা সেদিকেও একটা ইঙ্গিত দেয়। আমরা আশা করবো, শিল্পের যে আন্তর্জাতিক রূপের কথা আমরা জানি, হলিউড তা বজায় রাখতে সচেষ্ট হবে। আজগার ফারহাদি, এমাদ বার্নাটের মতো নির্মাতারা যেন বার বার হয়রানির শিকার না হন। যদি এভাবে নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকে তাহলে মেরিলের ভাষায় বলতে হয়  “অসম্মান শুধু অসম্মানকে ডেকে আনে, সন্ত্রাস ডেকে আনে আরেক সন্ত্রাসকে”।