Home » সম্পাদকের বাছাই (page 22)

সম্পাদকের বাছাই

ট্রাম্পের অভিবাসননীতি : ঝুকি-শংকায় লক্ষ কোটি মানুষ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর বিশ্লেষন

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে যেসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, তা ফলতে শুরু করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেগুলো বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তিনি যে আদেশ জারি করেছেন, তা ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তিনি যেন কারেন-জাল দিয়ে সবাইকে আটকিয়ে বহিষ্কার করতে চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫ জানুয়ারি অভিবাসন ও সীমান্তনীতি নিয়ে যে দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন তাতে কোটি কোটি অভিবাসী ও আমেরিকান নাগরিক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

আদেশ দুটিতে অভিবাসন বাধ্যবাধকতা ব্যাপক পরিসরে কার্যকর করার কথা বলায় কোটি কোটি অবৈধ নাগরিক, এমনকি যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ নেই, তাদের ওপরও প্রযোজ্য হবে। আদেশ দুটিতে অভিবাসীদের তথাকথিত ‘আশ্রয় প্রদানকারী নগরী’ এবং রাজ্যগুলোকে শাস্তি প্রদান, অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে শাস্তিমূলক বহিষ্কার-প্রক্রিয়া অবলম্বন এবং আটক রাখার মেয়াদ আরো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে ইচ্ছুকদের প্রবেশে বাধাদানের জন্য কড়াকড়িভাবে সীমান্তনীতি কার্যকর করতে বলা হয়েছে। এছাড়া লিন্ডন বি. জনসনের আমল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু আইন মেনে চলছিল, সেটা লঙ্ঘন করে অভিবাসীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউএস প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক অ্যালিসন পার্কার বলেছেন, ‘এক বড় ধাক্কা দিয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতি তুচ্ছ- কিংবা কোনো ধরনের- অপরাধমূলক কাজ না করা কোটি কোটি মানুষকে মারাত্মক বিপদে ফেলে দিতে পারেন, মার্কিন নাগরিক পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেয়া হতে পারে। এই আদেশ অতিরিক্ত অন্তর্ভূক্তিমূলক ধর-পাকড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে- যা যুক্তরাষ্ট্র ও শংকিত, আতংকিতও সন্ত্রস্ত্র সম্প্রদায়গুলোর সাথে দীর্ঘ দিন ধরে সম্পর্ক রক্ষাকারী মানুষজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

‘অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ আনা যেতে পারে, এমন কর্ম সম্পাদানকারী’ যে কাউকে দূর করার অগ্রাধিকার প্রদানের ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি ব্যাপক মানবাধিকার উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ট্রাম্পের নীতির ফলে আইনসম্মত অধিবাসীসহ দোষী সাব্যস্ত নয় এবং যাদের সর্বোচ্চ অপরাধ তারা কেবল অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করেছে- এমন লাখ লাখ মানুষকে ঢালাওভাবে ঝুঁকিতে ফেলে দেবে। বাস্তবে এটা অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রে বেআইনিভাবে প্রবেশকারী এক কোটি ১০ লাখ মানুষের অর্ধেকের বেশিসহ অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশকারী যে কাউকে বহিস্কার করার সুযোগ এনে দেবে।

ট্রাম্পের আদেশে ঢালাওভাবে ও নির্যাতনমূলক মার্কিন অভিবাসন আটকব্যবস্থার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো, ফেডারেল সংস্থাগুলোর আটক করার সামর্থ্য দ্রুত বৃদ্ধি এবং বহিষ্কার-প্রক্রিয়ার ফলাফল ঝুলে আছে- এমন প্রায় সব নাগরিকের আটক করার কথা বলা হয়েছে। অভিবাসন আটক-প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের ফলে মানুষজন কেমন বিপজ্জনকভাবে আটক থাকে এবং তা তাদের ন্যায্য বহিষ্কার শুনানির অধিকারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে- সে ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে নথিপত্র আছে।

আরেকটি নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প এমন সীমান্ত আইন কার্যকর করার কথা বলেছেন, যা মানুষজনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকারকে ঝুঁকিগ্রস্ত করবে। এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশকারী মানুষদের বহিষ্কার এবং অপরাধমূলক কাজের বিচার-প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পরিচিত কার্যক্রমের প্রয়োগ বাড়িয়ে দেবে। ওই আইনের ফলে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষা কামনাকারী আশ্রয়প্রার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছে, যাদের অনেকের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, এবং সেইসাথে নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে আসা শিশুসহ বিভিন্ন মানুষের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প আরো ঘোষণা করেছেন, অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব দিতে স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর সাথেও সমঝোতায় পৌঁছাবে তার প্রশাসন। যেসব নগরী ও রাজ্য ফেডারেল অভিবাসন আইন কার্যকর সীমিত করার জন্য ‘আশ্রয় দানকারী’ নীতি প্রণয়ন করেছে, তিনি তাদেরকে ফেডারেল তহবিল স্থগিত করার নীতিও গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।

এ ধরনের ব্যবস্থার ফলে সমাজগুলোকে অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলবে বলে ট্রাম্পের দাবিটিকে ভ্রান্ত এবং সেইসাথে বিপজ্জনক হিসেবে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ক্রমবর্ধমান অভিবাসনের ফলে অপরাধ বাড়ে বলে যে কথাটি বলা হয়ে থাকে, বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, তা স্রেফ মিথ, তাতে কোনো সত্যতা নেই।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন আইন প্রয়োগে স্থানীয় পুলিশকে সম্পৃক্ত করার ফলে অনেক দেশে অভিবাসীরা ধর্ষণের মতো সহিংস অপরাধের মতো ঘটনার শিকারও হন। অনেকে এ কারণে পুলিশের কাছে এসব অপরাধের কথা বলতেও ভয় পান। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ অভিবাসীদের মর্যাদা-নির্বিশেষে অপরাধের ব্যাপারে রিপোর্ট করার জন্য সমাজের সদস্যদের উৎসাহিত  করার নীতির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে এই বিশ্বাসে যে, প্রত্যেকের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করার এটাই সর্বোত্তম উপায়। তবে ট্রাম্প যার সমালোচনা করেছেন। অপরাধের সাথে অভিবাসনকে গুলিয়ে ফেলার নীতি ও রাজনৈতিক বাগাড়ম্বড়তা বিদ্বেষপূর্ণ সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে ইন্ধন বাড়ানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি করে।

পার্কার বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকানদের ‘‘প্রথম” করার জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি! কিন্তু বাস্তবে এসব পদক্ষেপ পরিবারগুলোকে একত্রে রাখা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখার মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কংগ্রেস এবং আদালত এবং সেইসাথে জনসাধারণের উচিত এসব পদক্ষেপ প্রতিরোধ করা এবং সবার অধিকারের জন্য দাঁড়ানো।

সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ

আনু মুহাম্মদ ::

সুন্দরবন নিয়ে সরকারের স্ববিরোধী ভূমিকা বরাবরই প্রকট। প্রধানমন্ত্রী একদিকে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে সুন্দরবন বাঁচানোর কথা বলেন, অন্যদিকে তাঁর সরকার দেশি বিদেশি মুনাফাখোরদের স্বার্থে সুন্দরবনধ্বংসী নানা তৎপরতায় সক্রিয় থাকে। সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্য আমরা সরকারের কাছে বার বার দাবী জানিয়েছি ক্ষতিকর সব পরিবহণ এবং প্রকল্প বন্ধ করতে। কিন্তু সরকার সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকে তার সুরক্ষার পরিবর্তে নিকটবর্তী নৌ-পথে বৃহৎ নৌ-পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে, বিশাল কয়লা পরিবহণের উপর নির্ভরশীল একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ করছে, নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ভূমি দস্যুদেরকে জমি দখলের সুযোগ করে দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে সরকারি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের আরও বনজমি দখলের তৎপরতা এখন জোরদার। বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইডের তহবিলেও তৈরি হচ্ছে নানা প্রকল্প।

সরকারের এসব  ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউনেস্কো এবং রামসার সুন্দরবন ঘিরে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মুনাফামুখি তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নরওয়ে সুন্দরবন ধ্বংসের এই প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে ভারতের এনটিপিসিতে অর্থযোগান বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থ যোগান না দেবার ঘোষণা দিয়েছে। দেশে সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যাহত আছে।

কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেছেন, ‘সুন্দরবন নিয়ে আন্দোলনকারিরা কেবলমাত্র ভারতের কারণেই এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।’ খুবই ভুল কথা। আমরা বার বার বলেছি, যেসব প্রকল্প সুন্দরবনের জন্য ধ্বংসকারি তা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এমনকি যদি বাংলাদেশের কোন কোম্পানিরও হয় আমরা তার প্রবল বিরোধী। তিনি আরও বলেছেন ‘আন্দোলনকারিরা মানুষকে রক্ষা না করে কেবল পশু-পাখি  রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছে।’ যে কোন সুস্থ মানুষই জানেন যে, সুন্দরবন শুধু যে অমূল্য অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ তাই নয়, এটি রক্ষার সাথে কোটি কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা  জড়িত। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করে। সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশই অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, এবং অসাধারণ জীববৈচিত্রের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে- সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প। বিভিন্ন প্রকাশনা, গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা  কেনো এই কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছেন।  এটাও দেখানো হয়েছে যে, ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজদেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এই প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে।

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র  মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২৫ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়না। ভারতীয় কোম্পানী বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৯-১৪ কিমির মধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাফার জোন বিবেচনা করলে এই দূরত্ব ৪ কিমি। অথচ ভারতেরই ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২’ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে এবং ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইড লাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল,  জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা অনুমোদন করা হয় না। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন, ১৯৮৭‘ অনুসারেও কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিমি এর মধ্যে কোন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় না। এজন্য গত কয়েকবছরে ভারতের কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়–তে তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের যতো কাছে পরিবেশ ধ্বংস কারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেখানকার আইন অনুযায়ী তা তারা করতে পারতো না!

এই ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পে সুপারক্রিটিকাল টেকনলজি ব্যবহার করা হবে, সেজন্য সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের প্রশ্ন- প্রথমত, এই প্রযুক্তিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ ক্ষতি কম হয় ঠিক, কিন্তু তাতে সুন্দরবনের ধ্বংসের সামগ্রিক  ক্ষতি কীভাবে কমবে? দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তি যদি সুন্দরবন ধ্বংস ঠেকানোর মতো এতো নিশ্চিত প্রযুক্তি হয়, তাহলে ভারতীয় কোম্পানি কেনো ভারতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সকল ক্ষতি দূরীভূত করে না? কেনো গত তিন বছরে তাদের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল হয়? তৃতীয়ত, একদিকে বলা হচ্ছে, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব বিষাক্ত ফ্লাই এ্যাশ সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহৃত হবে। আর সারাদেশে সকল সিমেন্ট কারখানা বিজ্ঞাপন দেয়- তাদের সিমেন্টে ফ্লাই এ্যাশ ব্যবহার করা হয় না। এই ধরনের প্রতারণা কেনো?

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সরকারি ‘উন্নয়ন’ নীতির কারণে সুন্দরবনের ‘ইকলজিকালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া’ বলে স্বীকৃত অঞ্চলেও শতাধিক বনগ্রাসী-ভূমিগ্রাসী বাণিজ্যিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটক অবিশ্বাস্য উদ্যোগ নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে ৮টি টাওয়ার বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বিষাক্ত পণ্যবাহী জাহাজ পরিবহণ এখনও অব্যাহত আছে। গত ১৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদীতে আবারো একটি ১ হাজার টন কয়লাবাহী জাহাজ ডুবে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর আগে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তেল, কয়লাসহ বিষাক্ত পণ্যবাহী ৩টি জাহাজ  পশুর এবং শ্যালা নদীতে ডুবেছিল। এর পরিণতিতে দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বিপর্যয় সম্পর্কে হুশিয়ারি দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। এইসব জাহাজ ডুবির পর, প্রতিটি ক্ষেত্রে, সরকারের ভূমিকা ছিল ন্যাক্কারজনক। এবারের ডুবে যাওয়া কয়লাবাহী জাহাজে কয়লার পরিমাণ ছিলো আগেরগুলির তুলনায় দ্বিগুণ। সরকারের ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বন বাঁচানোর জন্য সাধারণ ধর্মঘট বা হরতালের পূর্ব দৃষ্টান্ত আছে কিনা জানিনা তবে ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কমিটি আহুত হরতাল করে এই ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষই তৈরি করছে। সেখানে পুলিশের বর্বর নিযাতন ও হামলা হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রতিরোধের চেতনাকে টলানো যায়নি। কারণ এই আন্দোলনের সৈনিকদের কাছে এই সহজ সত্যটি এখন খুব স্পষ্ট যে, সুন্দরবনের যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি সুন্দরবন রক্ষার লড়াইয়ে বিজয়ী হবারও কোনো বিকল্প নেই। তাই ৮ ঘন্টা ধরে পুলিশের লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, জলকামানের অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করে, নিজের শরীরে জখম নিয়ে তারা জায়গা ধরে রেখেছে, বাংলাদেশ ধরে রেখেছে। এগুলোতে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ঠিকই কিন্তু অপ্রতিরোধ্য চেতনা বহুগুণ হয়ে আরও অসংখ্য মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। শুধু শাহবাগ নয় ঢাকার হরতালে বিভিন্ন মিছিলে ও দেশের নানাস্থানে সভা সমাবেশে হামলা-হুমকি-ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়েছে। একদিকে ভয় দেখিয়ে ভাড়া করে রামপালপন্থী মানববন্ধন সাজিয়ে তা প্রচার করা হয়েছে, অন্যদিকে খুলনায় সুন্দরবন রক্ষার সমাবেশে পুলিশ হামলা করেছে, বন্দুক তুলে শাসিয়েছে। কিন্তু সবজায়গাতেই শ্লোগান আরও জোরদার হয়েছে ‘রামপাল চুক্তি ছুঁড়ে ফেল,  বাংলাদেশ রক্ষা কর’। কেননা সুন্দরবন বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ।

এরশাদ থেকে নুর হোসেন : গডফাদাররা কখনই ধরা পরেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. খুলনার সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদারের নাম মনে আছে তো! ঘাটের কুলি থেকে সিটি কাউন্সিলর, দোর্দন্ড প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ এরশাদ শিকদার। অবশেষে ক্ষমতাধররা রুষ্ট হলে আইন তার নাগাল পেয়ে যায়; বিচারে তার ফাঁসি হয়েছিল। কারা এরশাদ শিকদারকে সৃষ্টি করেছিল এবং তার গডফাদারই কে বা কারা, আইন তার নাগাল পায়নি। বলা হয়, আইনের হাত অনেক লম্বা, কিন্তু আইনের শাসনহীনতার এই দেশে ক্ষমতাসীনরা আইনকে শাসন করেন কিংবা নিয়ন্ত্রন করে থাকেন। এ কারনেই অপরাধ সংঘটনের নেপথ্য ব্যক্তিরা থাকেন নিরাপদ, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সম্প্রতি নারায়নগঞ্জে সাত খুনের মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেনের সাথে এরশাদ শিকদারের প্রোফাইল চমৎকারভাবে মিলে যায়। ট্রাকের হেলপার থেকে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, জাতীয় পার্টির নেতা। পরবর্তীতে বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে। দল পাল্টানোর সাথে সাথে তার গডফাদারও পাল্টে গেছে। সকলে জানে, তার সবশেষ গডফাদার কে?  নুর হোসেনের ভাষায়, “তিনি আমার বাপ লাগেন”।

সামরিক শাসন বা কথিত গণতান্ত্রিক শাসনে এই রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায়, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে এখন শত শত এরশাদ শিকদার বা নুর হোসেনরা সদম্ভ বিচরনরত। একদা অজ্ঞাত-অখ্যাত, লেখাপড়াবিহীন এসব মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক। নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির হাত ধরে ইউপি, উপজেলা, জেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রীও হয়ে যাচ্ছেন। এদের প্রত্যেকের এক বা একাধিক গডফাদার থাকে – যারা ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা অত্যন্ত প্রভাবশালী আমলাও হতে পারেন। এই সন্ত্রাসী ও টাউট শ্রেনী দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির নেয়ামক হয়ে উঠেছে।

দুই. এই দেশের সাধারন মানুষ কত অল্পেই না সন্তুষ্ট! একটি মামলার বিচারেই তারা অনেক খুশি। এর অন্যতম কারন হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার বিপরীতে এটি পরম প্রাপ্তি। আরো বড় মেসেজ, অপরাধী যেই হোক, শাস্তি হতে পারে। আরো বড় প্রাপ্তি, র‌্যাবের মত দায়মুক্ত একটি এলিট ফোর্সের ১৬ সদস্যর মৃত্যুদন্ড। এককালের রক্ষীবাহিনীর মত এই বাহিনীর জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা সংঘটনে অভিযোগের আঙুল তাদের দিকে। এরকম একটি বাহিনীর সদস্যদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক মহলগুলিও সচকিত। দেশের পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াগুলির রিপোর্ট, সম্পাদকীয়, টক শো-সব জায়গায় দাবি করা হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম।

দায়িত্ব গ্রহনের দু’বছর পূর্তিতে আমরা প্রধান বিচারপতির এমত বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারি যে, ‘অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না’। তার সোজা-সাপ্টা কথায় জানতে পারি, সুপ্রীম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে নারায়নগঞ্জে সাত হত্যা মামলার দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। মনে পড়ছে, অভিযুক্ত তিন সামরিক অফিসারকে গ্রেফতার করতে কালক্ষেপন ছিল লক্ষ্যণীয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন গ্রেফতারে বাধ্য হয়েছিল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি অতিরিক্ত এর্টনী জেনারেল শক্ত সওয়াল কেন করতে পারলেন না, সেজন্য তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। এই রিটে ড. কামাল হোসেন কেন ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়িয়ে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের নির্দেশনা আনলেন, সেজন্য সরকার প্রধান সে সেময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।

এজন্যই আম-জনতা একধরনের বৈপরীত্য অনুভব করেন। মানুষ প্রধান অপরাধের দায়মুক্তিতে বিশ্বাস করে না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এমপি, যিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং স্বৈরাচারী হিসেবে গণ আন্দোলনে পতিত, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামী। এরশাদের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে কেন? রায় দেয়ার তারিখ নির্ধারনের পরেও বিচারক বদল হয় কেন? একটি হত্যা মামলায় এতবার বিচারক বদলের পরেও জনসাধারন কি আশ্বস্ত থাকবে, অপরাধী যত বড় হোক দায়মুক্তি পাবে না?

আমি অপটিমিষ্টিক মানুষ হলেও এতটা নই, হয়তো এ কারনে যে, অসংখ্য খুন, গুম, ধর্ষণের ঘটনায় বিচার ঝুলে আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে অনন্তকাল ধরে। হিমাগারে চলে গেছে অনেক মামলার ভাগ্য। শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, দায়মুক্তি, তদন্ত অনুসন্ধানে পক্ষপাত বা গাফিলতি এবং আইনের ফাঁক-ফোঁকড়ের সুবিধে নিয়ে কত যে খুনি-অপরাধী পার পেয়ে গেছে কিংবা যাচ্ছে, তার হিসেব কে রাখে! এমনকি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত খুনিরা সরকারের পরামর্শ বা সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্ত হয়ে গেছে।

তিন. নারায়নগঞ্জের সাতখুন মামলার বিচারে স্পষ্ট যারা এই অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রমানিত হয়েছে আদালত তাদের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। অপরাধ সংঘটনে সহযোগিরাও নানা মেয়াদে দন্ডাদেশ পেয়েছে। স্বস্তি পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এই মামলার প্রধান আসামী নুর হোসেন, যিনি কিছুকাল আগের প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ ও কোটিপতি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সভাপতি ও সিটি কাউন্সিলর, তার শাস্তি নিশ্চিত হওযায় ইমেজ ফিরিয়ে আনতে এটি ভালভাবে ব্যবহার করা যাবে। তারা আরও সন্তুষ্ট এটা ভেবে যে, এই মামলার পুলিশী তদন্তকালে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে না আসাও নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন।

কাশিমপুর জেলের কনডেম সেলে বসে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নুর হোসেন এখন নিশ্চয়ই স্লো-মোশন মুভির মত অতীত দেখতে পাচ্ছেন। তবে এখনও ক্ষীণ আশা নিশ্চয়ই করছেন, হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্টের আপিল-রিভিউ আর সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা পর্যন্ত তো থাকছেই! হয়তো তার আফসোস হচ্ছে গডফাদারকে নিয়ে। তদন্তকালে গডফাদারের মুখোশ খুলে দেবার সুযোগ যে তাকে দেয়া হয়নি। ভারত থেকে ফেরত আনার পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনও মনে করেনি পুলিশ। জানে সে, এরকম সব সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এজন্য একটি প্রশ্ন  ঘুরে-ফিরে আসতেই থাকবে- সাত খুনের মাষ্টারমাইন্ড নুর হোসেন, নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ?  আইন কি তার  নাগাল পেয়েছে?

পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে জানতে বা মনে করতে পারি, সাত খুনের ঘটনার দুইদিন পর ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে এমপি শামীম ওসমানকে ফোন করেন নুর হোসেন। সেই ফোনের রেকর্ড রয়েছে পুলিশের হাতে। তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে পত্রিকা জানায়, শামীম ওসমানকে ফোন করেছিল নুর হোসেন।

শামীম বলেছিলেন, ‘খবরটা পৌছাই দিছিলাম, পাইছিলা’? নুরঃ ‘পাইছি ভাই’। শামীমঃ ‘তুমি অতো চিন্তা কোরনা’। নুর হোসেন কান্নাজড়িত কন্ঠে, ‘ভাই আমি লেখাপড়া করি নাই। আমার অনেক ভুল আছে। আপনি আমার বাপ লাগেন, আপনারে আমি অনেক ভালবাসি, ভাই। আপনি আমারে একটু যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন’। শামীমঃ ‘এখন আর কোন সমস্যা হবে না’। ‘গৌর দা’ বলে এক লোকের সাথে নুর হোসেনকে দেখা করতে বলেন। কথোপকথনের এই পর্যায় শামীম ওসমান জানতে চান, কোন সিল (সম্ভবত: ভিসা) আছে কিনা? উত্তরে নুর হোসেন বলেন, ‘আছে, আছে, সিল আছে, কিন্তু যামু ক্যামনে? যেভাবে বলল এ্যালার্ট (রেড এ্যালার্ট)’। শামীম বলেন, তুমি আগাইতে থাকো। নুরঃ ‘ভাই তাহলে একটু খবর নেন, আমি আবার ফোন দেই’। এই পর্যায়ে শামীম ওসমান বলেন,‘তুমি কোন অপরাধ  করো নাই। আমি জানি, ঘটনা অন্য কেউ ঘটাইয়া এক ঢিলে দুই পাখি মারতেছে’।

মামলার সাথে সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলাপচারিতার ফোন রেকর্ড সাতখুন মামলার অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারতো। রহস্যময় কারনে তদন্তকারীরা এই সূত্রকে কোন গুরুত্বই দেননি। এরকম বক্তব্যের রেকর্ড পাওয়ার পরেও পুলিশের গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টি এখন রহস্যই থেকে যাবে। এমনকি নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করার বিষয়টিও। এ বিষয়ে নারায়নগঞ্জের তৎকালীন এসপি মিডিয়াকে বলেছিলেন, নুর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই!

চার. সাত খুনের ঘটনা ‘অর্গানাইজড ক্রাইমের’ মডেল ধরলে কতগুলি প্রশ্ন সামনে চলে আসবে। তদন্ত বা অনুসন্ধান পর্যায়ে সে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। অপহরণ এবং খুন হয়েছিলেন সাতজন। টার্গেট ছিল একজন-কাউন্সিলর নজরুল। হত্যা করিয়েছে নুর হোসেন। নজরুল-নুর হোসেন, দু’জনই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাদের গডফাদার একই ব্যক্তি। কথিত ছয় কোটি টাকা ও র‌্যাবের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টিও কি পরিকল্পনার অংশ? এর সাথে পূর্বাপর বিষয়গুলো সামনে না আনার কারন কি এটাই ছিল যে, বেরিয়ে পড়বে মূল হোতার নাম-পরিচয়?

এই অপহরণ, হত্যার পেছনে সিদ্ধিরগঞ্জ-নারায়নগঞ্জের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ধারাবাহিক ইতিহাস এবং সন্ত্রাসের নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনায় আনা হয়নি। কারন সাত অপহরণ ও হত্যাকান্ডের ঘটনা গডফাদার ও তার পরিবারকে নতুন জীবন দান করেছে। নজরুল-নুর হোসেনের মত পথের কাঁটা বিদেয় করে দিয়ে গডফাদার ধুঁয়ে-মুছে জুনিয়র ক্যাডারদের মাধ্যমে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং ঘটনা পরিকল্পিত বা কাকতালীয় যাই হোক, একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২০১৪ সালের আগষ্টে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বিশেষ একজন ব্যক্তি বলেছিলেন, নারায়নগঞ্জ কখনও অপরাধমুক্ত হবে না। কারন এখানে ফি-বছর শত শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয় করা হয়। সরকার পাল্টালে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রনও পাল্টায়।  যেমন এখানকার বর্তমান গডফাদার ২০০১ সালে দলবলসহ দুবাই পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসেছেন ২০০৯ সালের গোড়ায়। ওই সময়ে চারদলীয় জোটের নেতা ছিলেন গডফাদার। তার মতে, গডফাদারদের জন্য হুমকি হয়ে উঠলেই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়। সাতখুনেরও আয়োজন করা হয় ক্রমাগত হুমকি হয়ে ওঠা নজরুল, নুর হোসেনকে সরিয়ে দিতে। এর সাথে র‌্যাবকে যুক্ত করা হয় টাকার লোভ দেখিয়ে।

এ সব বিষয়গুলি নারায়নগঞ্জে তো বটেই, সারাদেশেও ওপেন সিক্রেট। ক্ষমতাসীন দল ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব বিষয় আমলে নিয়েছেন, এরকম দৃশ্যমানতা কোথাও নেই। সাতটি মানুষ খুন ও লাশ গুমের চেষ্টার ন্যায়বিচার হয়েছে। কিন্তু অপরাধের শেকড়শুদ্ধ উৎপাটনে তদন্ত ও অনুসন্ধান পর্যায়ে কোন আগ্রহ না থাকায় নারায়নগঞ্জের অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রকটি আড়ালেই থেকে গেছে। ফলে ন্যায়বিচারের যে প্রসারমানতা আরো বিস্তৃত হতে পারতো সেটি সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে গেল।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস গুম-খুন আর অবরোধের ছবি – ‘আবলুকা’

ফ্লোরা সরকার ::

একটা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা যত বেশি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হতে থাকে, রাষ্ট্র তত নির্বিঘ্নে শাসন ও শোষণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। রাজনীতির কাজ শুধু নিজেদের সঙ্গে নিজেদের মোকাবিলা করা নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবিলা করা। তাতে করে রাষ্ট্র থেকে শোষণের বদলে সুশাসন পাওয়া যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভেতর পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে বিচ্ছিন্নতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এবং এসব বিচ্ছিন্নতা যখন যারযার মতামতকে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতে থাকে, তখন সেটা একধরনের ‘মৌলবাদী’ রাজনীতির রূপ পরিগ্রহ করে। এই ধরণের মৌলবাদিতা এক ধরণের বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত রোগের উদ্ভব ঘটায়- যা নিরাময় অযোগ্য হয়ে পড়ে। এসব রোগ যত বেশি বাড়তে এবং ছড়াতে থাকে, রাষ্ট্র সেই সুযোগে তত বেশি শোষণ করার সুযোগ পেতে থাকে। রাষ্ট্রের শোষণ যত বাড়তে থাকে এই রোগের প্রকোপ তত বাড়তে থাকে। গত আলোচনায় আমরা দেখেছি এমিন আলপার পরিচালিত “বিয়ন্ড দ্য হিল” ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নির্ভর এক ছবি, যেখানে দেখেছি নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস আর সন্দেহ কীভাবে অজানা শত্রুর উদ্ভব ঘটায়, তার পরবর্তী ছবি “আবলুকা” বা “ফ্রেনিজ’’  আমাদের তার থেকেও আরও ভয়াবহ চিত্র দেখায়, যা নাগরিকদের ভেতর ও  উপরে বর্ণিত বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত রোগের উদ্ভব এবং বিস্তার ঘটায়। আজ আমরা এই ছবিটা নিয়ে আলোচনা করবো এবং বলাই বাহুল্য ২০১৫ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি স্পেশাল জুরি বিভাগে পুরষ্কৃত হয়।

মূল তুর্কি ভাষায় “আবলুকা” অর্থ অবরোধ। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক গোলযোগগুলো এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ মানুষ দেখতে পাচ্ছেনা। অনেকটা কাফকার “দ্য ক্যাসেল” উপন্যাসের সেই দূর্গের মতো, যেখানে কোনো এক অনির্ণেয় শক্তি, গল্পের নায়ক কে লক্ষ্য করে তাচ্ছিল্যের সাথে, কখনো মুচকি হেসে প্রশ্রয়ও দেয় তারপর তাকে মর্মান্তিক ভাবে আঘাত করে। যে পথ ধরেই গল্পের নায়ক যাত্রা করুক না কেনো, তাকে আবার সিসিফাসের মতো ঘুরে আসতে হয় আরম্ভে। সারাটা উপন্যাস আমাদের এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রাখে,  আবলুকা ছবির দ্বিতীয় অংশ ঠিক এভাবেই আমাদের শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় রাখে। আবলুকা ছবিটা তখন শুধু একটা দেশের ভেতরকার অবরোধ অবস্থা দেখিনা, তার সাথে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও অনেক দেশের অবরোধ দেখতে পাই, যে অবরোধ থেকে মানুষ অর্থাৎ সেসব দেশের নাগরিকেরা বের হয়ে আসতে পারছেনা।

ছবির মূল চরিত্র কাদের  (মোহাম্মদ ওজগুর) প্রায় বিশ বছর জেল খাটার পর, আরও দুই বছর বাকি থাকলেও প্যারলে মুক্তি পায়। ছবির শুরুতে জেল থেকে মুক্তি পাবার দৃশ্য আমরা দেখি। প্যারলে তাকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়। কাদেরকে যে শর্তযুক্ত কাজটা দেয়া হয়, তা হলো শহরের আবর্জনা কুড়িয়ে তোলা। কিন্তু তার প্রকৃত কাজ হলো সরকারের হয়ে গোয়েন্দাগিরি বা নজরদারির কাজ করা। আবর্জনার ভেতর কোনো রাসায়নিক বস্তু পাওয়া যায় কিনা- যা বোমা তৈরি কাজে লাগে- সেসব তথ্যসহ তার আশেপাশে থাকা সন্দেহজনক মানুষগুলোর খবর সরকারকে জানাবার দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। যে কারণে তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে, প্রশিক্ষন শেষে, সে যখন বাসে করে তার ছোট ভাই আহমেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, পথের মাঝে চেকপোস্টে গাড়ি থামিয়ে বাসের যাত্রিদের আইডি কার্ডসহ সবকিছু তদন্ত করা দেখে কাদের বেশ অবাক হয়। কেননা, বিশ বছর আগে জেলে যাবার আগে সে শহরের এরকম চিত্র দেখে নাই। এটা যেন নতুন কোনো এক শহরে সে ঢুকছে, যে শহর সে কখনো দেখে নাই। যেখানে জায়গায় জায়গায় চেকিং হয়। আর চেকিং মানেই সন্দেহ, অবিশ্বাস, ভয় ইত্যাদি।

দুই ভাইয়ের মধ্যে দেখা না হবার এই দীর্ঘ বিরতি এবং সেই বিরতির পর প্রথম মিলনের দৃশ্যটা আমাদের অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। কেননা, কাদের যতটা উত্তেজনা নিয়ে তার ভাইয়ের কাছে ছুটে যায়, যে ভাইয়ের বয়স এখন তিরিশের কাছাকছি, এতোদিন পর বড় ভাইকে দেখে আহমেদের ভেতর সেই উত্তেজনা আমরা দেখিনা। বরং এক ধরণের শীতলতা তার ভেতর দেখা যায়। রাতের খাবারের পর, দুই ভাইয়ের কথোপকথন আরও স্পষ্ট করে দেয়। কাদের যতটা আগ্রহ নিয়ে আহমেদকে উপদেশবানী শোনায়, আহমেদের ভেতর আগ্রহ দূরে থাক, খাওয়ার পরপরই উঠতে পারলে যেন সে বেঁচে যায়। দুই ভাই কাছাকাছি দুইবাড়িতে থাকে। কাদের থাকে আহমেদের বন্ধু আলী এবং তার বউ মেরালের বাড়ির উপর তলায়। আহমেদ থাকে কাছেই অন্য বাড়িতে। আহমেদের এই অনীহা কাদের বেশ ভালোভাবেই অনুভব করে এবং এক রাতে ভাইকে বলে, “এটা ভেবোনা যে তোমার কথা আমি ভাবতাম না। জেলে থাকতে প্রায়ই তোমার কথা আমার মনে পড়তো।…. মনে রেখো, আমরা দুজন ছাড়া, আমাদের কিন্তু আর কেউ নেই”। সংলাপটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে দুই ভাইয়ের কোনো শৈশব স্মৃতি নেই, যেসব স্মৃতি ভাইদের বন্ধন আরও দৃঢ় করে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝেও সেই বন্ধন থাকা চাই, যে বন্ধন নাগরিকদের বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে দৃঢ় করে। কিন্তু ছবিতে আমরা দেখি, দুই ভাইয়ের এই দীর্ঘদিনের দুরত্ব তাদের ভেতর এতোটাই দূরত্ব তৈরি করে ফেলে যে, কাছাকাছি আসা দূরে থাক বরং সন্দেহের পর্যায়ে নিয়ে যায়। যে কোনো দেশে রাজনৈতিক মতাদর্শিক দূরত্ব এভাবেই পারস্পরিক সন্দেহের বীজ বপন করে চলে। কাদের সন্দেহ করতে থাকে আলীর বউ মেরালের সঙ্গে আহমেদের কোনো অবৈধ সম্পর্ক হয়তো গড়ে উঠেছে কিনা। মাঝে মাঝে একারনেই কাদের দোতলার কাঠের মেঝেতে কান পেতে তাদের ফিসফাস শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, কাদের মনে করে আলী এবং মেরাল হয়তো কোনো সন্ত্রাসী কাজে নিয়োজিত আছে। সেই কাজের সাথে তাই ভাইও সম্পৃক্ত থাকতে পারে।

অন্যদিকে, আহমেদ যে কাজ করে সেটা হলো, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কুকুরগুলো মেরে ফেলার কাজ। কাজটা তার একেবারেই ভালো লাগেনা কিন্তু বেঁচে থাকার তাগিদে তাকে করতে হয়। এই কাজে তার অনিচ্ছার চুড়ান্ত প্রকাশ একটা দৃশ্যের মাত্র একটা শটে পরিচালক আমাদের দেখিয়ে দেন। যে বন্দুক দিয়ে দিনের বেলায় সে কুকুর মারতে যায়, একদিন রাতে সেই বন্দুক দিয়ে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ট্রিগারে টিপ দেয়ার মুহূর্তে কাদের এবং আলী এসে পড়ায় তা আর সম্ভব হয়না। তবে নিজের হাতে আহত করা একটা কুকুরকে সে বাড়িতে নিয়ে আসে। যে কুকুরের পরিচর্যার মধ্যে দিয়ে সে যেন এক ধরণের প্রায়শ্চিত্ত পালন করে- যা একদিক থেকে আনন্দের এবং অন্য দিক থেকে তার একাকিত্ব কাটানোর কৌশলও বটে। আহমেদ একাই থাকে, কেননা, তার বউ এবং বাচ্চা তাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগেই।  এই কুকুর মারার বিষয়টা পরিচালক অত্যন্ত কৌশলে অন্যকিছুর ইঙ্গিত আমাদের দিয়ে দেন; হতে পারে সেটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্মূলের কাজ অথব খুন-গুমের কাহিনী। রাষ্ট্র এভাবেই তার অপছন্দের মানুষগুলোকে গুম করে দেয়।

ছবির গতি যত এগিয়ে যায়, শহরে পুলিশ টহলের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এবং বাড়তে বাড়তে সেটা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে দুই ভাই দুইভাবে নিজেদের আড়াল করতে থাকে। একদিকে, আহমেদ মনে করতে থাকে তার বাড়িতে কুকুর আছে জানতে পারলে কর্তৃপক্ষ তাকে মেরে ফেলতে পারে, তাই ঘরের ভেতরেই সে আরেকটা ঘর বানায়, যাতে কুকুরের শব্দ বাইরে না পৌঁছায়। অন্যদিকে, কাদের নিরাপত্তাহীনতার উপর রিপোর্টের পর রিপোর্ট টাইপ করতে থাকে কর্তৃপক্ষকে দেয়ার জন্য, যেসব রিপোর্ট কোনো মূল্যই পায়না তার বসের কাছে। সারা দেশের অশান্ত চিত্র মেটাফরিক্যালি আরও চমৎকার করে পরিচালক দেখান। পুরো ছবি জুড়ে টিভির খবরে শুধু সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আমরা দেখি। এমনকি রাতের রাস্তাগুলোও যেন একেকটা ধ্বংসস্তুপ, এখানে সেখানে শুধু আগুন জ্বলতে দেখা যায়, বোমা ফাটতে শোনা যায়। দীর্ঘ বেলের শব্দ, ঘন ঘন ট্যাং আওয়াজের যাতায়াত, গাড়ির শব্দে দালান কেঁপে কেঁপে ওঠা, তীব্র আলো ইত্যাদি সব মিলিয়ে এমন এক আবহ ছবির গতির সাথে বাড়তে থাকে যে, শুধু চরিত্রগুলোই না, দর্শকের ভেতরেও এক ধরণের শ্বাসরোধকের মতো অবস্থা হয়, যে অবরোধ অবস্থা থেকে সবাই পরিত্রান পেতে চায়। যদিও সেই পরিত্রান শেষ পর্যন্ত দুই ভাইয়ের মৃত্যু দিয়ে (রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষই তাদের মেরে ফেলে) শেষ হয়। ছবিটি তাই দেখতে দেখতে দর্শক নিজেদের কথা ভাবতে থাকে এবং ছবিটি আর তুর্কি কোনো ছবি হয়ে থাকেনা, সেটা হয়ে দাঁড়ায় বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের ছবি।

 

অভ্যন্তরীন প্রতিরোধের মুখে ট্রাম্প : বিশ্বজুরে উদ্বেগ

সি রাজা মোহন ::

আমেরিকান জাতীয়তাবাদের প্রতি জোরালো আবেদন জানিয়ে এবং ‘আমেরিকা প্রথম’ ধ্বনি দিয়ে আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন, উম্মুক্ত সীমান্ত এবং বিপুল আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আমেরিকার দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান প্রতিশ্রুতির অবসানের ঘোষণা দিলেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা গুটিয়ে নেয়ায় এবং বিশ্বে তার ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করার প্রেক্ষাপটে ভারতকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার অনেক নেতিবাচক পরিণতি সীমিত করতে হবে। একই সাথে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ওয়াশিংটনের সাথে কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সুযোগগুলো ভারতকে অবশ্যই লুফে নিতে হবে।

আমেরিকার সংরক্ষণবাদের দিকে ঝুঁকে পড়াটা নিশ্চিত করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা অবশ্যই আমাদের চাকরিগুলো ফিরিয়ে আনবো। আমরা অবশ্যই আমাদের সীমান্তগুলো ফিরিয়ে আনবো।’ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ নিয়ে নাটকীয় অবস্থান প্রকাশ করে ট্রাম্প আবারো জোর দিয়ে বলেছেন, পৃথিবী-পৃষ্ঠ থেকে ‘চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসকে’ মুছে ফেলার জন্য রাশিয়া এবং অন্যান্য সভ্য দেশের সাথে তিনি কাজ করবেন।

ট্রাম্পের কাছ থেকে আসা এসবের থিমের কোনোটিই অবাক করা কিছু নয়। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকালে ট্রাম্প এসব ইস্যুর কথা বারবার বলেছেন। ট্রাম্পের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ওয়াশিংটনে প্রবল ও স্থায়ী বিরোধের মুখে অনেকেই আশা করেছিলেন, ট্রাম্প তার অবস্থান পরিশীলিত ও সংশোধন করবেন। কিন্তু পেছনে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নেয়া আমেরিকার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিক্রমণ পরিবর্তন করার উচ্চাভিলাষী ধারা গঠনে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।

আমেরিকার ব্যাপারে ট্রাম্পের নতুন ভিশন ভারতে রাজনৈতিক এবং সেই সাথে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন করে গুরুতর চিন্তাভাবনা করার অবকাশ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় এলিটরা অন্য জাতিগুলোকে দমন করার জন্য বিশ্বায়নকে ব্যবহার করা কিংবা গণতন্ত্রের মতো রাজনৈতিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে হস্তক্ষেপ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছিল। তাদেরকে এখন এই দু’টির কোনোটিই না থাকা ট্রাম্পের সাথে কাজ করতে হবে।

ট্রাম্প তীব্রভাবে বিশ্বায়ন এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আমেরিকার দীর্ঘদিনের লালিত নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা বিদেশি শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি, অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়েছি, অথচ আমাদের সামরিক বাহিনীর দু:খজনক শূন্য হওয়াকে অনুমোদন করেছি। আমরা অন্য জাতির সীমান্তকে রক্ষা করেছি, কিন্তু আমাদের নিজেদের সীমান্তকে রক্ষা করতে অস্বীকার করেছি।’

তার এই নতুন ভিশন বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের শাসকদের মেরুদন্ডে  শীতল অনুভূতি প্রবাহিত হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, এখন থেকে ‘বাণিজ্য, কর, অভিবাসন, পররাষ্ট্র ইত্যাদি প্রশ্নে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে আমেরিকান শ্রমিকদের কল্যাণের দিকটি লক্ষ রেখে। আমাদের সীমান্তকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে, অন্যান্য দেশ যাতে আমাদের পণ্য বানিয়ে লুটপাট করতে না পারে, আমাদের কোম্পানি চুরি করতে না পারে, আমাদের চাকরি ধ্বংস করতে না পারে।’

ট্রাম্প নতুন আমেরিকার জন্য দু’টি সরল নিয়মকে চিহ্নিত করেছেন: ‘আমেরিকান ক্রয় করো, আমেরিকান ভাড়া করো।’

ভারতকে কেবল আরো সংরক্ষণবাদী আমেরিকার জন্যই প্রস্তুতি নিলে চলবে না, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা, রক্তপাত ঝরানো ও সম্পদ লুণ্ঠনের পরিকল্পনা না করার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে হবে। ‘আমরা আর আমাদের জীবন ধারা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেব না, বরং একে একটি উদাহরণ হিসেবে উজ্জ্বল হতে দেব।’

নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং তারপর থেকে ট্রাম্প ন্যাটোর মতো আমেরিকার পুরনো জোটগুলোকে ছুঁড়ে ফেলেছেন। ক্ষমতা নেবার রাতে তিনি বলেছেন, ‘আমরা পুরনো মিত্রদের শক্তি বাড়াবো, নতুন নতুন জোট গড়বো, চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সভ্য দুনিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করবো। এসবের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবো।’ এটা নজিরবিহীন একটি প্রক্রিয়া। এতে বিশ্বজুড়ে বন্ধু ও অংশীদারদের প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ট্রাম্প এখানে নিজেকে ‘মুক্ত বিশ্বের’ কিংবা ‘পাশ্চাত্যের’ নেতা হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেননি। এর বদলে তিনি ‘সভ্য দুনিয়াকে’ ঐক্যবদ্ধ করার কথা বলেছেন, যাতে সুস্পষ্টভাবে রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ট্রাম্প সব সময় জোর দিয়ে বলে আসছেন, আইএসআইএস এবং অন্যান্য চরমপন্থী গ্রুপের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া হতে পারে অংশীদার।

আট বছর ধরে ওবামা ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ’ পরিভাষাটি ব্যবহার করছেন না। তিনি পছন্দ করছিলেন ‘সহিংস চরমপন্থী’ পরিভাষাটি। পরিভাষাগত এই একটি পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি এবং তা দমন করার জন্য অংশীদারদের প্রকৃতির ব্যাপারে ট্রাম্পের আমেরিকার ভাবনায় নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনাটি ফুটিয়ে তুলেছে।

যেকোনো মানদন্ডেই  ট্রাম্পের দেয়া ভাষণ যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বে এর ভূমিকা নিয়ে আমেরিকান এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান বিশ্বাসের সাহসী ও দ্ব্যর্থহীন প্রকাশ ঘটিয়েছে। বিশ্বায়নের ব্যয়, উন্মুক্ত সীমান্ত এবং হস্তক্ষেপমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার প্রশ্ন উত্থাপনে বিপুলসংখ্যক ভোটারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে।

ক্ষীণ সম্ভাবনাও আছে যে, ট্রাম্প হয়তো আমেরিকার আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা নতুন করে গড়ে নিতে পারবেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নতুন করে সংগঠিত করতে পারবেন। অবাধ বাণিজ্য সীমিতকরণ, আমেরিকার অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং আরো সংযত পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হাসিল প্রশ্নে দ্বিদলীয় জোট গঠনের অবকাশ নিশ্চিতভাবেই তার আছে।

তবে নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের ভিশন এস্টাবলিশমেন্টের কাছ থেকে ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়বে। কিন্তু তারপর আমেরিকার জনগণের জন্য ফলপ্রসূ কাজ করার জন্য এস্টাবলিশমেন্টের সাথে লড়াই করার জন্য নিজেকে একজন বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। এর ফলে আগামী চার বছরে আমেরিকার ভবিষ্যৎ অভিমুখের জন্য প্রচন্ড রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ তৈরি হবে।

বহিরাগতদের জন্য ট্রাম্পের আমেরিকাকে বোঝার জন্য সম্ভবত একটিমাত্র পথনির্দেশনা রয়েছে: ভবিষ্যতের জন্য অতীত ভালো গাইড নয়।

(লেখক : পরিচালক, কার্নেগি ভারত এবং দি ইন্ডয়িান এক্সপ্রেস পত্রিকার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সম্পাদক)

কেন সংলাপ মধ্যস্থতা আলোচনা ব্যর্থ হয়

আমীর খসরু ::

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার পারস্পরিক সংলাপ ও আলাপ-আলোচনা, এমনকি মধ্যস্থতার ইতিহাস কোনোক্রমেই সুখকর নয়। এ কারণে সব সময়ই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা কিংবা সংলাপের কথা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বহুবার উচ্চারিত এবং কয়েকবার অনুষ্ঠিত হলেও, কোনোটিতেই সংকটের কোনোই সমাধান আসেনি। এর পেছনে নানা যুক্তি খুজে দেখা যেতে পারে এবং অনেকে নানা যুক্তি খুজেও থাকেন। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এ পর্যন্ত প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল কখনোই কার্যকর, স্থিতিশীল এবং সচল-সজীব গণতন্ত্রের স্বপক্ষে কোনো ইতিবাচক কাজ করেনি। এ বিষয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথা রয়েছে এমনটাও মনে হয়নি। গণতন্ত্রকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি এখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এ কথাটি বলতেই হবে যে, গণতন্ত্র হচ্ছে, সর্বজনের সামগ্রিক অধিকার প্রাপ্তির লক্ষ্যে একটি সম্পূর্ন প্যাকেজ; কোনোক্রমেই আংশিক নয়। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন হচ্ছে একটি পথ এবং পন্থা মাত্র। এই পথ বা পন্থাটি সুচারুরূপে সম্পাদনের পরেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অপরাপর শর্তগুলো অর্থাৎ বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের অবাধ অধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন নিশ্চিত করাসহ এ জাতীয় বিষয়গুলো সত্যিকার অর্থেই কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপটি অর্থাৎ ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং সাথে সাথে তাদের প্রজ্ঞা, মেধার ভিত্তিতে, জনগণের কথা মাথায় রেখে শাসন কাজ পরিচালনা  করেনি কখনোই। এ কারণে দুর্বল কাঠামোর গণতন্ত্র এদেশে ক্রমশই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। সাধারণ মানুষও এতোদিনে এ কথাটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, রাষ্ট্র তাদের জন্য সহায়ক ও সহযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান নয়। এ কারণে রাষ্ট্রের সাথে জনগণের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়ছেই।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির উদ্ভব ও এটি কিভাবে কার্যকর ভাবে চলবে- এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে যে সব রাজনীতি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক যুগের পর যুগ নিরন্তর কাজ করে গেছেন, তাদের ভাষ্য মোতাবেক, রাষ্ট্র জনগণের সাথে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’র ফসল। সামাজিক চুক্তিটি হচ্ছে- জনগণ তার সব অধিকার রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করবে; আর রাষ্ট্র জনগণের ওই সব অধিকার নিশ্চিত করাসহ সামগ্রিক কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হবে। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবে।

এ বিষয়টি স্পষ্ট, জনগণকে জোরজবরদস্তি করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময়ান্তে নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র। শুধুমাত্র নির্বাচনকেন্দ্রীক ব্যবস্থা যে কোনোক্রমেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়, এ কথাটি শাসকরা কোনোভাবেই মনোজগতে স্থায়ীভাবে ঠাই দেননি। আর অধিকতর দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই ভোটাধিকারও এখন বিলুপ্তির পথে। এর নানা আলামত গত বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষ প্রত্যক্ষ করছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম আর লড়াই-এর পেছনে অন্যান্য অনেক কারণ রয়েছে সত্যি, তবে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র সব সময় ক্রিয়াশীল ও জারি থাকবে- জনমনের এই প্রত্যাশাটি ছিল সবচেয়ে বড়মাত্রায়, ব্যাপকভাবে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম চলেছে, তাও গড়ে উঠেছিল দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামরিক শাসন থেকে উত্তরণ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ-অব্দি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বদলে এর উল্টো কাজগুলোই করেছে শাসকবর্গ। স্বাধীনতার পরপরই জরুরি অবস্থা জারি, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ নানা কালা-কানুন সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এরপরে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এসব অব্যাহত রেখেছে নিজ নিজ স্বার্থে। ওই যে উল্টো যাত্রা শাসকবর্গ শুরু করে দিয়েছিল- তা আজও বিদ্যমান।

এ কথাটি বারবার বলা হচ্ছে যে, আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘকাল সামরিক শাসন প্রত্যক্ষ করেছে, বাংলাদেশসহ এমন অতিদুর্বল গণতন্ত্রসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোতে পারস্পরিক সমঝোতা খুবই জরুরি। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পরে বেসামরিক শাসকদের নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় অনিবার্য কারণেই। সামরিক শাসন কি ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে, তার একটি চমৎকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে আর্জেন্টিনার আদালত। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পরে ১৯৮০’র দশকের মধ্যসময়ে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়-হত্যা, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ নানা অপকর্মের জন্যে। ওই সময়ে আর্জেন্টিনার আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল তাতে বলা হয়েছে, ‘সামরিক শাসন শুধুমাত্র রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই চরম ক্ষতির কারণ হয়েছে তা নয়; ওই শাসন মানুষের মূল্যবোধ, দীর্ঘকালের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনাচরণের উপরেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে’। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন- (Argentina:The Military Juntas And Human Rights; report of the trial of the former junta members, 1985. Amnesty International Publications, UK-1987)

এ কারণেই সামরিক শাসনোত্তর বেসামরিক শাসকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি ওই ক্ষতির হাত থেকে স্থায়ী মুক্তির লক্ষ্যে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৫৮ সালে দীর্ঘকাল সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রত্যক্ষকারী ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ার বেসামরিক শাসক দলগুলো এ লক্ষ্যে পৃথক পৃথকভাবে দুইদেশে দুটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেছিল। ভেনিজুয়েলার Punto-Fijo- নামের চুক্তিতে বলা হয়- প্রেসিডেন্ট যিনিই নির্বাচিত হবেন তিনি হবেন জাতীয় নেতা, কোনো দলের নেতা নন; ১৯৫৮ সালের নির্বাচনের পরে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে; আর পার্লামেন্টসহ সব পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং সব রাজনৈতিক দলগুলোই অরাজনৈতিক, বাধ্যগত ও বেসামরিক শাসকদের অনুগত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলায় সর্বাত্মক সহায়তা করবে। একইভাবে কলম্বিয়ায়ও প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল প্রায় একই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে বেসামরিক শাসনকে দীর্ঘমেয়াদী করার লক্ষ্যে ঐক্যমত্যে পৌছেছিল।

বাংলাদেশের সাথে এর তুলনা করলে দেখা যাবে, এ দেশটিতে এমন কোনো চিন্তা-ভাবনা কখনোই করা হয়নি এবং এখনও করা হচ্ছেনা; ভবিষ্যতে হবে এমন আলামতও দেখা যাচ্ছেনা। ১৯৯০ সালে এরশাদের সামরিক শাসনের পরে তৎকালীন তিনজোট একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ওই রূপরেখা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ কখনোই নেয়া হয়নি। অথচ বিরাট একটি সুযোগ এসেছিল গণতন্ত্রকে সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদী করার জন্যে। ১৯৯১ থেকে শুরু হওয়া বেসামরিক শাসন সম্পর্কে জনমনে উচ্চাশার জন্ম নিলেও, কালক্রমে তা হতাশায় রূপ নিয়েছে। প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল ঝগড়া-ফ্যাসাদের পাশাপাশি গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে পাল্লা দিয়ে কাজ করেছে ও করছে ।

বর্তমান সময়ের ‘গণতন্ত্রে’র হাল-হকিকত সম্পর্কে এদেশের প্রতিটি মানুষ অবহিত এবং তারা উপলব্ধি করতে পারছেন সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। ভোটাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সর্বজনের ন্যায্য অধিকারগুলো কোন পর্যায়ে রয়েছে- তা তাদের ভালোভাবেই জানা আছে। কাজেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

বর্তমান সময়ে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরেক দফা জটিলতার মধ্যে পড়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ফেব্রুয়ারীতে শেষ হয়ে যাবে-এমন প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন, দলনিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে। রাষ্ট্রপতি ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পৃথক পৃথকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনা করেছেন। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপ-আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘আলোচনা বা সংলাপ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য কমাতে পারে। এ জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে’।

কিন্তু ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির ওই বক্তব্যের পরেও বলা হয়েছে- ‘আলাপ-আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই, রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন’। এখানেই হচ্ছে জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু। সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-… বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।

কিন্তু ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও  ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।

আর এ কারণেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নেবেন। রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনার যে তাগিদ দিয়েছেন, তা ক্ষমতাসীন পক্ষ কার্যত: নাকচ করে দিয়েছে। কাজেই রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যে আলোচনা করেছেন তার ভবিষ্যৎ কি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলাপ-আলোচনা, সংলাপ ও মধ্যস্থতার ইতিহাস কোনোক্রমেই ইতিবাচক নয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে ১৯৯০’র শেষ দিকে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কমনওয়েলথ-এর বিশেষ দূত হিসেবে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন ঢাকায় এসেছিলেন। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির সাথে তিনি দফায় দফায় আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো ইতিবাচক ফল লাভ হয়নি। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকা সফর করেছিলেন অস্কার ফার্ন্দানেজ তারানকো। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার পরেও তার মিশন ব্যর্থ হয়েছিল। ওই সময়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সংকট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিব নিজে টেলিফোনে আলাপ এবং চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রধান দুই নেত্রীর কাছে। ২০০৬ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং বিএনপি’র তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়ার মধ্যে সংলাপও ব্যর্থ হয়েছিল।

‘গণতন্ত্র হচ্ছে-আলোচনা ভিত্তিক শাসন’- দার্শনিক ও রাজনীতিবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট মিলের এই বিখ্যাত পর্যবেক্ষন বোধকরি বাংলাদেশে অচল। কাজেই যতোক্ষণ পর্যন্ত না গণতন্ত্র বিষয়টি ক্ষমতাসীনসহ শাসকবর্গের মনোজগতে স্থায়ীভাবে ঠাই পাবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সংলাপ, মধ্যস্থতা কিংবা আলাপ-আলোচনা ব্যর্থ হতেই থাকবে।

 

আইনের শাসন না আইনকে শাসন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

”The foundation for our financial centre were the rule of law, an independent judiciary and a stable, competent and honest government that persuaded sound macro economic policies with budget surpluses almost every year. This led to strong and stable Singapore dollar” (source: From Third World To First: The Singapore Story 1966-2000; Author: Lee Xuan Eu, pages 91-92).

একজন স্বৈরশাসক, যিনি তার দেশকে মাত্র সাড়ে তিন দশকে শনৈ শনৈ উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন, উন্নয়নের মডেল প্রতিষ্ঠা করেছেন বিশ্বে, সে বিষয়ে ওপরের প্যারার সংক্ষিপ্ত বয়ান তার তাঁর রচিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ থেকে উদ্বৃত করা হয়েছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ তার দেশকে অর্থনৈতিক মানে যে জায়গায় নিয়ে গেছেন, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। দেশের প্রতিটি স্তরে তার সরকার সুশাসন নিশ্চিত করেছিল।

শাসক হিসেবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি কতটা আপোষহীন ছিলেন, যে কোন কৌতুহলী পাঠক সেটি বর্ণনা পাবেন একই গ্রন্থের Keeping the Government clean অধ্যায়ে। এখানে তিনি জানাচ্ছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন যুদ্ধের কথা। তার নীতি ছিল বড় দুর্নীতিবাজদের প্রতি ক্ষমাহীন থাকলে ছোটগুলো জায়গা পাবে না। দুর্নীতি দমনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Corrupt Practice Investigation Bureau (CPIB) এই প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কতটা শক্তিশালী, সেটির বর্ণনা দিচ্ছেন এই অধ্যায়ে।

তাঁর মন্ত্রীসভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য তে চেং ওয়ান ছিলেন জাতীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। ১৯৮৬ সালে এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগে বলা হয়, প্রচলিত আইন ভেঙ্গে মন্ত্রী একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে চার লাখ সিঙ্গাপুর ডলার ঘুষ নিয়েছেন। তে চেং ওয়ান যথারীতি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং সিপিআইবি’র তদন্ত কর্মকর্তার কাজে বাধা দেন। কেবিনেট সচিব প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউকে জানান মন্ত্রী ওয়ান তাঁর সাক্ষাত চান। লি তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত মন্ত্রীকে তিনি সাক্ষাত দেবেন না।

তদন্ত চলাকালে সপ্তাহখানেকের মধ্যে মন্ত্রী ওয়ান আত্মহত্যা করেন ও প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নোটে লেখেন, “আমি গত দুই সপ্তাহ ধরে খুবই বিষন্ন বোধ করছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক এ ঘটনার দায় আমি স্বীকার করছি। সম্পুর্ন দায়ভার মাথা পেতে নিচ্ছি। প্রাচ্যদেশীয় একজন ভদ্রলোক হিসেবে মনে করছি, পাপের প্রায়শ্চিত করার এটি সবচেয়ে উত্তম উপায়” । ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। দুর্নীতি ও আত্মহত্যা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারনায় আত্মঘাতী ওয়ান এর পরিবার চিরতরে সিঙ্গাপুর ত্যাগ করেন। ঘটনাটির পর্যবেক্ষনে লি কুয়ান লেখেন, আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরী করেছি, যেখানে জনমত সরকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিকে বিপদজনক হিসেবে গণ্য করে। এজন্যই অভিযুক্ত মন্ত্রী অসম্মান ও সামাজিক ঘৃনার চাইতে মৃত্যুকেই শ্রেয়তর জ্ঞান করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এসবের মধ্য দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম ছিলেন যে, দল-গোষ্ঠি বা ব্যক্তির প্রতি পক্ষপাত করে শাসন চালিত হয় না। সেখানকার শাসন আইনের প্রতি অন্ধ। আইনানুগ ও ন্যায়ানুগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেই তারা উন্নততর রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন ও এই উন্নয়ন কেন্দ্রে অবশ্যই মানুষ ছিল এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহনও ছিল। অপরাধ করে বংশ পরিচয়, পারিবারিক কিংবা দলীয় পরিচয় দিয়ে সিঙ্গাপুরে আজও নিস্তার পাওয়ার কোন উপায় নেই।

সিঙ্গাপুর নিয়ে এত কথা বলার কারন হচ্ছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান শাসকরা উন্নয়নের বয়ান করতে গিয়ে আকছার সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার সাথে তুলনা করতে ভালবাসেন এবং ঐ মানে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখান দেশবাসীকে। এজন্য তারা ওই দুই দেশের স্বৈরশাসনের উদাহরনের পুণরাবৃত্তি করে থাকেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরের মানে পৌঁছতে কিভাবে আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন সে বিষয়টি উহ্য রাখছেন। কারন শাসকরা ইতিমধ্যেই আইনকে শাসনের মাধ্যমে আইনের শাসন বদলে দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতির একের পর এক উদাহরন তৈরী করছেন।

যে কোন একটি উপায় অবলম্বন করে নির্বাচনে জয়ী হয়ে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রে এরকম উন্নয়নের বোল-চাল দেয়ায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে- আইনের শাসনের চাইতে আইনকে শাসনের পদ্ধতিগত পথটিকে নির্দেশ করা হচ্ছে। এজন্যই তারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পার্টিজান হিসেবে রূপান্তরিত করেছেন। সত্য-মিথ্যের মিশেলে মিথ তৈরী করে সেটিকেই সত্য হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছেন। এই অর্ধসত্যের স্থায়ীত্বশীলতা দিতেও আইন করা হয়েছে, যাতে ইতিহাসের রুঢ় সত্যের মুখোমুখী হতে না হয়।

এই দেশে আইনের শাসন নিয়ে, বিচারহীনতা নিয়ে এন্তার কথা হয়। বলা হয়, আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আইনের শাসন। এখন দেশে আইনের অভাব নেই। সাদা-কালো, নিবর্তণমূলক, অধিকার হরণকারী-অজস্র আইনের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তবে ব্যক্তি বিশেষ, গোষ্ঠি বা দল-মতের প্রতি প্রায়োগিক ক্ষেত্র একেকরকম। অন্তিম হিসেবে, আইনের প্রয়োজনে জনগন, জনগনের প্রয়োজনে আইন নয়। নিত্য-নতুন এইসব আইনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য শাসকদের সুরক্ষা ও দায়মুক্তি এবং জনমনে ভয়-আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাখা।

রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলিকে লক্ষ্য ও সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়াতে না দিলে তার দলীয় মেরুকরণ ঘটে। প্রতিষ্ঠানগুলি সংবিধান ও আইনের প্রতি নিবিষ্ট না থেকে ক্ষমতাসীন দল বা ক্ষমতাবানদের প্রতি পক্ষপাত শুরু করে। ফলে ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা দল সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে। এজন্যই আইন প্রয়োগে সৃষ্ট বৈষম্যের মূল ভুক্তভোগী জনগন বিচারহীনতায় ধুঁকতে থাকে এবং এর মধ্য দিয়ে যে প্রবণতাটি স্থায়ী হতে শুরু করে, তা হচ্ছে আইনকে কর্তৃত্ব ও শাসনের মধ্যে নিয়ে আসা এবং যথেচ্ছ ব্যবহার করা।

শুধু সরকার সমর্থক নয়, যারা আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলিয়ান তারাও আইনের সুবিধাগুলোকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছেন। বহুকাল ধরে চলে আসা এ কালচার এখন আরো ব্যাপকতর। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোট ছাড়া নির্বাচিত ১৫৩ জন এবং প্রায় ভোটারবিহীন ১৪৭ জন সরকার গঠন করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শক্তি প্রয়োগের নীতিতে চলছেন। যে কারনে আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ এবং গুম-খুনের মাধ্যমে বিচারকাজ সম্পন্ন করে ফেলায় উৎসাহ যোগানো হচ্ছে।

ক্ষমতা কাঠামোর সমর্থক বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, সাংবাদিক সবার পক্ষ থেকে এরকম ইঙ্গিত আসছে যে, উন্নয়ন চাইলে, উন্নয়নের সকল সূচকে অর্জন চাইলে, প্রবৃদ্ধির হার উর্ধ্বগামী চাইলে- এরকম কর্তৃত্ববাদ মেনে নেয়া ভাল। এজন্যই শক্তি প্রয়োগের নীতিকে মান্য করার আদর্শিক পরামর্শ রাখ-ঢাক ছাড়াই দেয়া হচ্ছে। মনোভঙ্গিটি এরকম যে, সিঙ্গাপুরের স্বৈরশাসকের মত একাধিক্রমে চালাচ্ছেন বলে দেশ কথিত উন্নয়ন বন্যায় ভাসছে। সুতরাং উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়ানোর জন্য গণতন্ত্র সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত তো করাই উচিত!

আপাতত: দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন চেহারায় একধরনের জৌলুষ, চাকচিক্য রয়েছে। শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জে এই চেহারার মালিন্য কম, কিন্তু খোলসটা সরে গেলেই ক্ষমতার রাজনীতি ও উন্নয়ন চেহারায় আসল রূপটি ফুটে উঠছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি, টক শো’র শব্দগুলো ঘাঁটলে বোঝা যাবে দিনকে দিন কোথায় নামছে এই দেশ। হালে বিএনপি সুর খানিকটা নরম করলেও চড়াও ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি এতটাই নরম যে, একটি মিছিল করতে হলেও পুলিশের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। নাশকতার অভিযোগে অনুমতি না দিলে কিচ্ছুটি যেন করার নেই। আইনের শাসন এভাবেই দলঘনিষ্ট হয়ে পড়েছে।

উন্নয়ন মিথ প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্র-সমাজে দলীয় কর্তৃত্বপরায়নতা মূলধারায় নিয়ে আসা হয়েছে। গণতান্ত্রিক আবহ দুরে থাক, যে কোন নির্বাচনে জয়ের বিষয়টি একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতহীন  করতে সব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল ট্রেন্ড হচ্ছে, নির্বাচনে জয়ের জন্য ভোটের খুব একটা প্রয়োজন নেই। ভোটে জিততে শুধু প্রয়োজন ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন। সবশেষ অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচন এর একটি প্রমান যে, সংবিধানের মূল স্পিরিট উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে ক্ষমতাবানরা এখন আর ভোট নির্ভর নন।

এই কাঠামোর অনুপস্থিতি যে দায়মুক্তির অপশাসনের সংস্কৃতিকে বেগবান করছে, তা জনগনের সামাজিক কণ্ঠস্বরকে ক্ষীণ করে দিয়েছে। ফলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন নেমে আসার পরেও সামাজিক প্রতিবাদের শক্তিশালী ধারাটি ছিল অনুপস্থিত। রাষ্ট্র-সমাজের যে পক্ষটি ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত, সেই কথিত বিবেকবানরাও সাম্প্রদায়িকতা সংঘাত ও বিপর্যয়ে উচ্চকিত নন। এর ফলে ধামাচাপা দেয়ার অপসংস্কৃতি উৎসাহিত হয়েছে, যেমনটি ঘটেছে অতীত অনেক অপরাধের ক্ষেত্রে। দেশের নির্বাচন কাঠামোয় এই পরিবর্তন শুধু পদ্ধতিকে বিপন্ন করেনি, সুশাসনের সকল সম্ভাবনাকে তিরোহিত করেছে।

পরিস্থিতি সংখ্যালঘু জনগনের তো বটেই, সংখ্যাগুরুদেরও সাংবিধানিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনুৎসাহিত করছে। গেল বছরের শেষার্ধে গোবিন্দগঞ্জ থেকে নাসিরনগরে যা ঘটেছে, তা সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক সুশাসনেরও পরিপন্থী। এই বৈপরীত্য ঠেলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে সুরক্ষা দিতে হলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রকে ন্যায্যতার পথে হাটাতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে- শাসনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের কাছে এর গুরুত্ব হারিয়ে গেছে। এজন্য গণতন্ত্র চর্চার অন্তত: একটি উপায় পাঁচ বছর পরে গণ-মতামত প্রকাশের সুযোগও সীমিত করে দেয়া হয়েছে।