Home » সম্পাদকের বাছাই (page 31)

সম্পাদকের বাছাই

ভারত-রাশিয়া দীর্ঘ বন্ধুত্বে ফাটল : নতুন মিত্র পাকিস্তান!

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

সেই ১৯৫০-এর দশকের প্রথম ভাগ। স্নায়ুযুদ্ধের টালমাটাল সময়। মাত্র কয়েক বছর হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে। তীব্র বৈরী দেশ দুটির প্রতি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কমতি নেই। পাকিস্তান ও ভারতও এ নিয়ে ভাবছে। সব হিসাব মিলিয়ে যখন প্রায় সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, ভারত যাচ্ছে মার্কিন বলয়ে, কাজেই পাকিস্তান সোভিয়েতের দিকে। কিন্তু হঠাৎ কী থেকে কী যেন হয়ে গেল। ভারত চলে গেল সোভিয়েত বলয়ে। পরিণতিতে পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে।

ওই দিন যা হয়নি, সেটাই কী আজ হতে চলেছে? কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে শুরু হয়েছে রাশিয়া-পাকিস্তান যৌথ সামরিক মহড়া। ভারত প্রচন্ড আপত্তি জানিয়েছিল। দুই নৌকায় পা দেওয়া নিয়ে রাশিয়াকে হুঁশিয়ারও করে দিয়েছিল। অর্থাৎ শিথিল হতে থাকা রুশ-ভারত সম্পর্ক আরো ঢিলে হবে, এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবুও রাশিয়ার সৈন্যরা যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়ে পাকিস্তানে গেছে।

রাশিয়া-পাকিস্তান এই মহড়ার নাম দিয়েছে ‘ফ্রেন্ডশিপ ২০১৬’। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর এই মহড়া হচ্ছে বলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখার প্রধান লে. জেনারেল আসিম সেলিম বাজওয়া জানিয়েছেন। দিল্লিতে রুশ দূতাবাস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতেও মহড়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। তবে ভারতকে সান্তনা দিতে গিয়ে বলেছে, গিলগিট-বাল্টিস্তানের মতো সমস্যাসঙ্কুল বা স্পর্শকাতর কোনো স্থানে নয়, বরং রাট্টোর সামরিক স্কুলে এই মহড়া হবে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাথে সামরিক সহযোগিতা জোরদার ও বিকাশ করার লক্ষ্যে এই মহড়া হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হবে অবৈধ সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে নির্মূল করা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বেও রাশিয়া এখনো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা মিত্র এবং অন্যতম অস্ত্র যোগানদাতা। তাহলে কেন পাকিস্তান-রাশিয়া মহড়া? কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানে বলেন, ‘ভারতের যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি রাশিয়াকে পাকিস্তানের সাথে প্রথমবারের মতো সামরিক মহড়া আয়োজন করতে উৎসাহিত করেছে।’

পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে ২০১৪ সালে। ইসলামাবাদের ওপর থেকে দীর্ঘকালীন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় মস্কো। আর এর মাধ্যমে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটি দ্রুতগতিতে বদলে যেতে থাকে। এবারের মহড়ার আগে রাশিয়া-পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকটি স্থাপিত হয় ২০১৫ সালে ইসলামাবাদের কাছে মস্কোর এমআই-৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিক্রির সিদ্ধান্তে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি রাশিয়া লক্ষ্য করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের সফর বিনিময়, যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক পুনবির্ন্যাসের আলোকে নয়া দিল্লির প্রাচ্যনীতি গ্রহণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক সহযোগিতা রাশিয়ার জন্য সুখকর হওয়ার কথা ছিল না।

ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রসীমানা। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অবস্থানকে সমর্থন করে ভারত। আর এ ব্যাপারে রাশিয়া সমর্থন করে চীনকে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সেনাদের পাকিস্তানে গিয়ে যৌথ মহড়ায় অংশ নেওয়া বিরাট ঘটনা। বিশেষ করে কাশ্মিরের এক সেনা ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ১৮ সেনাকে হত্যা করার প্রেক্ষাপটে। ভারত চাইছিল, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করতে। কিন্তু রাশিয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকাতে ভারত আরেক দফা পরাজিত হলো বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানে আরও জানান, ভারত এখনো পাকিস্তানের সাথে নিজের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ‘পাকিস্তানের সাথে দিল্লি এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাসও করেনি। এখন পর্যন্ত সে গলাবাজিই করেছে, কাজের কাজ কিছুই করেনি।’ (টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে)

চীন : পরাশক্তির বিবর্তন-৪৯ : সংস্কারের বেইজিং মডেলের বৈশিষ্ট্য

আনু মুহাম্মদ ::

চীন কীভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলো এবং এতোবছর তা ধরে রাখতে পারলো, কীভাবে এতো দ্রুত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হলো, কীভাবে এতোবড় দেশে বাজার অর্থনীতিমুখি সংস্কার কোনো বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করলো না তা অর্থশাস্ত্র এবং অর্থনীতি বিষয়ক সব গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠেছে। বিশ্বের মহাজন শক্তিগুলো এভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চায় যে, ওয়াশিংটন ঐকমত্য বা নয়া উদারতাবাদ বা বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ নির্দেশিত পথে অর্থনীতির উদারীকরণ বা ব্যক্তিপুঁজির অবাধ বিকাশই এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি সম্ভব করেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই মডেল তো বিশ্বের বহুদেশেই অনুসরণ করা হয়েছে, সে সব দেশে এ রকম ফলাফল দেখা যায়নি। আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার বহুদেশ, বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান সর্বত্রই বাজারমুখি সংস্কারের ফলাফলে অনেক উঠানামা আছে। বহুদেশ হোঁচট খেয়েছে, বহুরকম সংকটে হাবুডুবু খেয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে তা দেখা গেলো না কেন? মোটাদাগে সংস্কারের দুই ধারার তুলনামূলক চিত্র নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতি বিশ্লেষক কাভালজিৎ সিং গবেষণা করেছেন। চীনের সংস্কারের মৌলিক ভিন্নতার কারণে কাভালজিৎ ‘ওয়াশিংটন ঐকমত্য’ থেকে আলাদা করে একে ‘বেইজিং ঐকমত্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এবিষয়ে তাঁর নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত আমি গ্রহণ যোগ্য মনে করি।[i]

প্রথমত, ১৯৭৮ সালে যখন চীন অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করে ততোদিনে তার অনেক শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিলো। এর আগেই দারিদ্র ব্যাপকভাবে দূরীভূত হয়েছিলো। শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সামাজিক সূচকগুলোতে এর আগেই উচ্চমাত্রার সাফল্য ছিলো। এসব সাফল্য নষ্ট করে নয়, বরং এগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই সংস্কার কর্মসূচি নেয়া হয়েছিলো।

দ্বিতীয়ত, অন্য বহু দেশে যেমন ভারত, পাকিস্তান বা ব্রাজিলে এসব সংস্কার শুরু হয়েছে একেকটি অর্থকরী সংকটের মধ্যে (ঋণ, মুদ্রামান, লেনদেনের হিসাব ইত্যাদি), সংকট থেকে বের হবার উপায় হিসেবে। কিন্তু চীন কোনো অর্থকরী সংকটের চাপের কারণে সংস্কার শুরু করেনি, করেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তায় উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে, বিশ্বশক্তি হবার আকাঙ্খায়। এরকম নিজস্ব পরিকল্পনা ও কর্তৃত্ব অন্যদেশগুলোর সংস্কারের বেলায় দেখা যায়নি। এখানে তাই অন্যদেশগুলোর বিশ্বব্যাংক আইএমএফের কোনো ভূমিকা বা কর্তৃত্ব ছিলো না। সে কারণে করণীয়, গতি, অগ্রাধিকারে কোনো অসামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।

তৃতীয়ত, চীন ধাপে ধাপে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। প্রথমে কৃষি, পরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শেষে শিল্প। এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিখাতের প্রসার ঘটানো হলেও অর্থকরী খাতের ওপর প্রধানত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে। যে কারণে ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থকরী খাতে ধ্বস নামলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ফটকাবাজারি দ্বারা চীন কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক সংস্কার বা ব্যক্তিখাতের প্রসার কর্মসূচি পুরো চীনের ক্ষেত্রে নেয়া হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে চীন। যেমন, উপকূলীয় ও পূর্ব চীন এলাকায় বিনিয়োগ, কর ব্যবস্থার সংস্কার সীমিত রাখা হয়েছে শুধু কিছু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

পঞ্চমত, রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে যেভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোরকম আইনী ব্যবস্থা না রেখেই   ফালতু দামে বিতরণ করা হয়েছে- যার ফলে মাফিয়া পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটেছে; চীনে সেরকম ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের হাতেই রাখা হয়েছে।

ষষ্ঠত, বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ অনেক বেড়েছে চীনে। কিন্তু অন্য অন্য দেশের মতো তা বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য বাড়াতে পারে নি। প্রথম দিকে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হয়েছে শুধুমাত্র বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে, হংকং ও তাইওয়ানে প্রবাসী চীনাদের থেকে। এই এলাকার বাইরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর বহুরকম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছে।

কিন্তু অনেকরকম সতর্কতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সাফল্য সত্ত্বেও পুঁজিমুখি সংস্কারের অপরিহার্য অভিঘাত ঠিকই দেখা গেছে। গ্রাম শহর ও শ্রেণীগত বৈষম্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি, সম্পদ কেন্দ্রীভবন, পরিবেশ দূষণ তার অন্যতম।

__________________________________________________________

[i] Kavaljit Singh: “From Beijing Consensus to Washington Consensus: China’s Journey to Liberalization and Globalization”, 2008.

 

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(তৃতীয় পর্ব)

 

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষণের প্রয়োজন নেই আহমদ ছফা’র। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির বক্তা অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

একথা অনস্বীকার্য যে আমাদের দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল ইংরেজি ও ইউরোপীয় সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসার ফলেই। ইংরেজরা চেয়েছিল এই দেশের কিছু লোককে ইংরেজি শিক্ষাদান করে তাদের কেরানি ও নিচু প্রশাসনিক পদে নিয়োগ করতে-তাতে প্রশাসনিক খরচ কম হবে। মোগল আমলে টোল-মাদ্রাসার বাইরে কোন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। মুদ্রণ শিল্পও ছিল না। সংবাদপত্র এসেছে ইংরেজ শাসনের পরই। এইভাবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইংরেজ শাসন এ দেশের সমাজজীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছিল সেকথা ইংরেজ শাসনের ঘোর সমালোচক ও তৎকালীন পরাধীন ভারতের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু কার্ল মার্কস পর্যন্ত স্বীকার করেছেন। (কার্ল মার্কস, ‘ভারতে বৃটিশ শাসন’)। পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শ আসার ফলশ্রুতিতে বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীতে। সৃষ্টি হয়েছিল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর যার প্রায় পুরোটাই ছিল বর্ণহিন্দু। তাঁদের অনেকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছিলেন এবং হিন্দুসমাজ সংস্কারে মনোযোগী হয়েছিলেন। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, নারীমুক্তি ইত্যাদি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তখনও পুঁজিবাদ আর বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেনি। সে সময় জমিদার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুৎসুদ্দিগিরি করা একটা সংকীর্ণ ধনিকশ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। তারাও ছিল বর্ণহিন্দু।

হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল, শিক্ষায় ও বিত্তে। এই যে জাগরণ হয়েছিল, যাকে অনেক সময় রেনেসাঁস বলা হয় (যদিও এই শব্দ নিয়ে বিতর্ক আছে) তা সীমাবদ্ধ ছিল বর্ণহিন্দুদের এক সংকীর্ণ অংশের মধ্যে। এর বাইরে ছিল ব্যাপক মুসলমান জনগোষ্ঠী এবং হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কৃষক ও মেহনতি জনগণ এবং তারাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাছাড়া যে সকল মহাপুরুষ উনবিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যে ও সমাজ সংস্কারে ঐতিহাসিক ও মহৎ অবদান রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে কিন্তু নানা ধরনের স্ববিরোধিতা দেখা যায়।

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ প্রথম আধুনিক ভারতীয় ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। কিন্তু তিনি সামন্তবাদী জমিদারী ব্যবস্থা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক ছিলেন। ফরাশি বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন দরকার বলে মনে করতেন। সবদিক দিয়ে সবচেয়ে র‌্যাডিকাল বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ছিলেন ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী ও ডিরোজিওর শিষ্যরা। তাঁরা সরাসরি না বললেও স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন নাস্তিক এবং অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক। তাঁরা নারী পুরুষের সমতার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ডিরোজিওর র‌্যাডিক্যাল ভাবধারা পরবর্তীতে খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। বরং রামমোহন-বিদ্যাসাগরের আপোসপন্থী লিবারেল ধারার পথেই শিক্ষিত হিন্দু সমাজ অগ্রসর হয়েছিল। অবশ্য বিদ্যাসাগর ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক, সম্ভবত নাস্তিকও। পরাধীনতার গ্লানি তাঁকে পীড়িত করত, কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করেননি, জমিদারী ব্যবস্থা সম্পর্কেও নিরব ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক শিক্ষার প্রসারের জন্য আগ্রহী ও তৎপর ছিলেন। একথা সকলেই জানেন যে রাজা রামমোহন রায়ের একান্ত প্রচেষ্টার ফলে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছিল (১৮২৯ সালে) আর হিন্দুসমাজে বিধবা বিবাহ আইন সিদ্ধ হয়েছিল (১৮৫৬ সালে) বিদ্যাসাগরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে। আমার বিবেচনায় বিদ্যাসাগর ছিলেন এই মাটির মহত্তম পুরুষ।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত পৈত্রিক জমিদারি ও পৈত্রিক ধর্ম পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ভালভাবে পরিস্ফুট। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এলেন আরেক প্রতিভাবান সাহিত্যিক যার সামাজিক ভূমিকাও ছিল বিরাট। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে তিনি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। কিছুটা সাম্যের ধারণাও। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠলেন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের প্রধান প্রবক্তা। তিনি হয়ে উঠলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমর্থক, ইংরেজ শাসনের ভক্ত এবং মুসলিম বিদ্বেষী। বিরাট সাহিত্য-প্রতিভার অধিকারী বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তাবাদের আবেগ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আনন্দমঠে’র অন্তর্ভূক্ত গান থেকে নেয়া ‘বন্দে মাতরম’ শব্দদ্বয় বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের মন্ত্রধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এই উপন্যাসেই তিনি দেখাচ্ছেন, ইংরেজরা এসেছে জনগণকে রক্ষা করতে। তাঁর জাতীয়তাবাদের শত্রু কিন্তু ইংরেজ নয়, বরং প্রতিবেশী মুসলমানরা শত্রু বলে চিহ্নিত হয়েছিল। এইভাবে রামমোহন-বিদ্যাসাগর যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও উদার মানবতাবাদী ধারার সৃষ্টি করছিলেন তা হিন্দু পুনর্জাগরণবাদে পরিণত হয়েছিল।

অবশ্য হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিলেন। যেমন হিন্দু পেট্রিয়টের সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তিনি জমিদারের বিরুদ্ধে কৃষকপ্রজার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পাবনার প্রজাবিদ্রোহের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র যখন কৃষকের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, তখন হরিশচন্দ্র বিদ্রোহী কৃষকের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। এমনকি ১৮৫৭ সালের  মহাবিদ্রোহের সময় তিনি কৌশলের সঙ্গে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। নীলকুঠির অত্যাচারের বিরুদ্ধে নাটক লিখেছেন দীনবন্ধু মিত্র। ধর্মনিরপেক্ষ ধারণা তুলে ধরেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আর্যদর্শনের সম্পাদক যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ প্রমুখ হিন্দু বুদ্ধিজীবী। শ্রমজীবীর পক্ষে গান রচনা করেছেন এবং বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। এইরকম আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে মুসলমান সমাজের চিন্তাচেতনা কোন স্তরে ছিল? হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল গরিব ও কৃষক। উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিতরা যখন হিন্দু পুনর্জাগরণবাদ অথবা মুসলিম জাতীয়তাবাদ নিয়ে মাতামাতি করছেন, অথবা বিপরীতে উভয় সম্প্রদায়ের উদার অংশ যখন হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য সচেষ্ট তখন গরিব শ্রমজীবী হিন্দু-মুসলমান আপনা থেকেই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন এবং মিলিতভাবে লড়াই করেছেন ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে, জমিদারদের বিরুদ্ধেও। তবে এই শ্রমজীবীরা ছিলেন অক্ষরজ্ঞান থেকে বঞ্চিত। অভিজাত মুসলমান শ্রেণী প্রথমে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। শাসন-ক্ষমতা হারানোর ক্ষোভে এই তার প্রতিক্রিয়া। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উচ্চবিত্ত ও বর্ণহিন্দুরা ছিল রাজভক্ত, কিন্তু তাদের একটি অংশ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। অন্যদিকে মুসলমানরা ছিল ইংরেজ বিরোধী, তবে চিন্তাচেতনায় পশ্চাৎপদ। উভয় সমাজের মধ্যে এই যে অদ্ভূত ধরনের বৈপরীত্য তা ছিল ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

আহমদ ছফা মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত যে দুইটি গণ-সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে তিতুমীরের নেতৃত্বাধীন ওয়াহাবি আন্দোলন ও দুদুমিয়ার নেতৃত্বাধীন ফরায়জি আন্দোলন। এই আন্দোলন ব্রিটিশ রাজ ও জমিদার বিরোধী ছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুইটি জনপ্রিয় আন্দোলন ছিল মহৎ। কিন্তু একই সঙ্গে এই আন্দোলন দুইটির মধ্যে যে ধর্মীয় রং ছিল এবং তা যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারেনি সেটাও ভুললে চলবে না। এক কথায় বলা যায়, উনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষিত হিন্দুরা ছিলেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজভক্ত, কিন্তু বহুবিধ সামাজিক বিষয়ে তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। অন্যদিকে অভিজাত ও কিছুটা শিক্ষিত (আরবি-ফার্সি ভাষায় শিক্ষিত) মুসলমানরা ছিল ব্রিটিশ বিরোধী কিন্তু সামন্ত ধ্যান-ধারণা দ্বারা আচ্ছন্ন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিত্রটি বদলে গেল। হিন্দু শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়ে উঠলো বৃটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী। অন্যদিকে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ-প্রীতি তৈরি হয়েছিল। মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ এবং বাংলায় নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী। মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজের প্রতি আনুগত্যের মনোভাব তৈরির জন্য তাঁরা সচেষ্ট হয়েছিলেন।

 

 

 

আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা কতোটুকু

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন কি সমাগত এবং সেটি কি ২০১৭ সালের শেষার্ধে অনুষ্ঠিত হবে? এরকম একটি সম্ভাবনাময় আলোচনা যখন বাতাসে ভাসমান অবস্থায়, ঠিক তখনই নিউইয়র্ক সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোন মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়। যদিও সরকারের নীতি-নির্ধারকরা আকছার বলে আসছেন, ২০১৯-এর আগে কোন নির্বাচন নয়। এমনকি সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধরকরাও ওরকমটিই বলে আসছেন।

কিন্ত সরকার মুখে যাই বলুক একটি আগাম নির্বাচনের বিষয় তাদের ভেতরে ভেতরে আলোচিত হচ্ছে এরকম আভাস একাধিকবার পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা যতগুলি জনসভা করেছেন, সেখানেই তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরে নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাইছেন। যদি মেয়াদ শেষেই নির্বাচন হয়, তাহলে স্বয়ং দলীয় প্রধান এখনই কেন এত গুরুত্ব সহকারে ভোট চাইছেন? নাকি এটি রুটিন প্রচারের অংশ?

২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় বলা হয়েছিল এটি ‘নিয়ম রক্ষার’। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে পরবর্তীকালে আন্দোলনের মাঠ ত্যাগ করায়, বলা যায় নাশকতা পরিত্যাগ করে ‘ক্ষ্যামা’ দিলে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন বা এধরণের যে কোন আলোচনা থেকে সরে আসে। কারণ আলোচনায় বসিয়ে বা আন্দোলনের পথে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করার সকল অবস্থানই দলটি হারিয়ে ফেলতে থাকে বিএনপি নেতৃত্বের অযোগ্যতার কারণে। বিএনপির সীমাহীন ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের কূটকৌশল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এবং সক্ষমতায় রাজনীতির গতিপথ সরকারের হাতেই ন্যস্ত হয়ে যায়।

২০১৪ সালের নির্বাচনকে নানাভাবে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা স্বত্ত্বেও ক্ষমতাসীনরা খুব ভালভাবেই জানে যে, সেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে  এখন পর্যন্ত গ্রহনীয় হয়নি এবং একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের ওপর তাগাদা রয়েছে। তবে হাতেগোনা দু’একটি দেশের সমর্থণ সরকারকে এ বিষয়ে অনেকটা নির্ভার রেখেছে। একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারেরও আগ্রহ রয়েছে এবং সেজন্য একটি সুবিধেজনক সময় তারা বের করতে চাইছে, যার ওপর তাদের থাকবে একক নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে, আগামী বছর নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেখার বিষয় হচ্ছে, এটি কি হবে একটি অনুগত কমিশন, নাকি সত্যিকারের স্বাধীন এবং শক্তিশালী কমিশন?

তবে, সরকার না চাইলে ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। হিসেব মত ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। মেয়াদ শেষের আগেই নির্বাচন প্রস্তুতির মধ্যে ক্ষমতাহীনদের কিছু লক্ষ্যভেদী কৌশল রয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের পরে আগামী নির্বাচন কৌশল অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠবে। সম্মেলনে নতুন আঙ্গিকে ঘোষণাপত্র পেশ করা হলে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দলীয় কৌশল ও দিক-নির্দেশনাগুলি অনুধাবন করা যাবে।

গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ সদস্যদের এলাকায় গিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পরবর্তী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের সম্ভাব্য তালিকা তৈরীর জন্য মাঠ পর্যায়ে খোঁজ-খবর করতে একাধিক সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বহুকাল আগে থেকে সরকারী প্রার্থী দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরন করা হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি আসনে অন্তত: পাঁচ জনের একটি তালিকা তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদেশী একটি জরিপ প্রতিষ্ঠানকে মাঠের অবস্থা জরিপ করে প্রতিবেদন তৈরীর দায়িত্বও দেয়া হয়েছে।

নির্বাচন ঘোষিত হলে এড়িয়ে যাবার কোন উপায় বিএনপির নেই। দলটির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহনের কোন বিকল্প নেই। তাদের বহুল কথিত “আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন বা সরকারকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য করা’’-র কোন অবস্থায় ও অবস্থানে তারা নেই, অন্তত: ২০১৪-এর অভিজ্ঞতায়। ২০১৩-১৫ সালে আন্দোলন ও নাশকতা এবং এর পরিনাম বিএনপিকে বুঝিয়ে দিয়েছে রাজনীতির মূলধারায় টিকতে হলে নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। তাছাড়া এই মূহুর্তে বিএনপি সামান্য দর কষাকষির অবস্থানেও নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, খালেদা জিয়া, তারেক ও তাদের অনুগত কয়েক নেতাকে ছাড়াই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা,  তারেকসহ অনুগতদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলির বিচার ২০১৭ সালের মধ্যে নিস্পন্ন হতে যাচ্ছে। মামলাগুলোয় সাজা হলে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিষয়টি পুরোপুরি আইনী জটিলতা ও আইনী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এরকম পরিস্থিতির সবরকম সুবিধে নেয়ার জন্য সরকার তৈরী আছে এবং এজন্যই আগামী নির্বাচনটি হবে তাদের অধীনে মেয়াদ শেষে বা সুবিধেজনক কোন সময়ে।

বিএনপির অপর চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, নির্বাচন হবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। মুখে বিএনপি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলছে বটে, কিন্তু দাবি আদায়ে তাদের কোন অঙ্গীকার বা সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। এটি বিএনপিও যেমন বোঝে, সরকারও তেমনি জানে। ফলে নির্বাচন হলে তাদের অংশ নিতে হবে। অংশ নিয়ে তাদের বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করতে হবে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকার ন্যূনতম নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম নয়। গত ইউপি নির্বাচন এর বড় উদাহরন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মত্ত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা কিছুটা অতীতকেন্দ্রীক নীতিগত ও আদর্শিক দ্বন্দ, তবে প্রায় সবটাই ক্ষমতার। রাজনৈতিক খেলায় গত আট বছর বিএনপি প্রায় পর্যদুস্ত ও বিপর্যস্ত। আর এই খেলায় ক্ষমতাসীনদের সফল করতে বিএনপির আত্মঘাতী প্রবণতা অনেকটা সহযোগিতা করেছে। সামরিক ছাউনিতে জন্ম নেয়া দলটি আশির দশকে মধ্যপন্থায় সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হলেও গত দু”দশকে তৈরী হয়েছে চরম ডানপন্থার ঝোঁক। এরপরেও দলটি সম্বিত ফিরে পায়নি। দল গোছানোর প্রচেষ্টায় গত কাউন্সিলের কথিত পুণর্গঠন এর সবচেয়ে বড় প্রমান।

এই আত্মঘাতী রাজনীতি সরকারের জন্য সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। নমুনা হচ্ছে, সারাদেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সাড়ে বাইশ হাজারেরও বেশি। খালেদা জিয়াসহ ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সাড়ে চার হাজার। এর অনেকগুলি মামলাই বিচার প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যায়ে। এর পরিনতিই বলে দেবে, এসব মামলায় খালেদা, তারেকসহ নেতাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। আইনী প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলার বদলে তারেক আপাতত: প্রবাসেই থাকছেন-এটি নিশ্চিত।

সরকারের উৎসাহ ও সাম্প্রতিক প্রবণতায় মনে হচ্ছে, এ মূহুর্তে খালেদা ও তারেকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পেতে উদগ্রীব। এক্ষেত্রে বিএনপির অভিযোগ, দলের দুই শীর্ষ নেতাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের আচরন ও পদক্ষেপ এই অভিযোগকে উস্কে দেয় এবং বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়ে একটি নির্বাচন আয়োজনের আভাস মেলে। এরকম সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে নির্বাচন হলে পুনরায় ক্ষমতাসীন হতে সরকারের আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই।

একটি জাতীয় নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অব্যাহত চাপ ও আগ্রহ এবং তাদের লবি’র স্বক্রিয়তা সরকারকে কিছুকাল আগেও সমঝে চলতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জঙ্গী তৎপরতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের আপাত: সাফল্য দেখিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চাপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা সরকারকে স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতামত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া জঙ্গীবাদ দমন সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকায় এসে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক  রাজনীতির ট্রেন্ড দেখে মনে হচ্ছে, সরকার রাজনীতিতে বিএনপিকে কিছুটা স্পেস দিলেও মামলা, গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

টিভি টক শো’গুলিতে সরকারপক্ষীয় বুদ্ধিজীবিরা যাই বলুন না কেন, সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির রিপোর্ট সরকারের জন্য মোটেই স্বস্তিকর নয়। সবকিছু উপেক্ষা করে, চাপ কাটিয়ে ২০১৮ সালের নির্বাচন এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্যাশন। ক্ষমতাসীনদের বড় স্বপ্ন ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী উদযাপনে। এটি নিশ্চিত করতে সরকার নির্বাচনে জিততে যে কোন কৌশল গ্রহন করতে পারে-এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

নির্বাচনে জেতার সামগ্রিক ক্ষেত্র তৈরী করার জন্য সরকারের কিছু পদক্ষেপ আগামীতে আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে। গ্রামীন জনপদে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিগুলিকে দেয়া হচ্ছে অলিখিত নির্দেশ। একনেক সভায় পাশ করা হচ্ছে মেগা সাইজের সব প্রকল্প এবং এসব অবকাঠামোর উদ্বোধন ও সুপারসনিক গতিতে এগুলো বাস্তবায়নে সরকার আগ্রহী। এসব প্রকল্প নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়গুলো দেখেও না দেখার ভান করছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প নির্বাচনের আগেই সরকার শেষ করতে চায় এবং আগামী নির্বাচনে এই সেতুর বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম নির্বাচনী ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মূলত: গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়াকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন কাজকে দৃশ্যমান করে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনী বৈতরনী পাড় হতে চায়। এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বিএনপিকে সামাল দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের পাশাপাশি ভাঙ্গন আনার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

বিএনপির মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বহুভাবে। একটি হচ্ছে, ভিন্নমাত্রার চাপ, অন্যটি হচ্ছে, নানারকমের প্রলোভন দেখিয়ে, মামলা-হামলার মাধ্যমে কাবু করে। এ লাইনে কিছুটা সাফল্য অর্জন করা গেলেও মূলধারার বিএনপির গায়ে এখনও খুব একটা আঁচড় কাটা যায়নি। বহিস্কৃত বিএনপি নেতা ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত তৃণমূল বিএনপির কার্যক্রমে সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকছে। ২০ দলীয় জোট থেকে নামসর্বস্ব দলগুলোকে বের করে নিয়ে আলাদা একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বিএনপির একটি অভিযোগের বাস্তবতা রয়েছে যে, সরকার হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে, যাতে বিএনপি আবারও নির্বাচনে অংশ না নিতে পারে।

দশম সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জনগন নির্ভর ছিলেন না। তার আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি নির্বাচনে ভরাডুবির পর সংসদ নির্বাচনে কি ঘটতে পারে সে মেসেজ তো তারা আগাম পেয়ে গিয়েছিলেন। ফলে প্রশাসন ও বাহিনী নির্ভর ঐ নির্বাচন অনুষ্ঠান জানিয়ে দিয়েছিল সরকার কতটা নির্ভরশীল প্রশাসনযন্ত্রের ওপর। এই নির্ভরতা অনিবার্যভাবে ক্ষমতাসীনদের যে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য তেমন কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিও তাদের নেই। বিপরীতে বিএনপির অবস্থা আরো শোচনীয় এবং তারা রাজনীতির মূলধারায় ফিরতে ক্রমাগত যুজতে হচ্ছে নিজেদের ও ক্ষমতাসীনদের সাথে।

টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ভিত এখন অত্যন্ত সূদৃঢ়। রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন তাদের হাতে। এই দলকে ঘিরে বিশাল একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠি দাঁড়িয়ে গেছে। অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক এই গোষ্ঠি। এদের সুফল প্রাপ্তি অব্যাহত ও নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ক্ষমতার সবুজ মাঠের দিকে। সেজন্যই আগামী জাতীয় নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তারা।

মেয়াদ পূর্ণ হবার আগে বেশ কয়েকবার গুজব সৃষ্টি হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোন ঝুঁকি নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। এজন্য তারা অপেক্ষা করে আছে খালেদা জিয়া, তারেকসহ বিএনপির প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার ফলাফলের ওপর। ঐ সকল মামলার বিএনপির প্রধান নেতৃত্ব দন্ডিত হলে নির্বাচনে যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, নয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত সার্চ কমিটির বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, তারা ‘আজিজ’ মার্কা নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন না। সম্ভবত: তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এবারেও ‘কাজী রকিব উদ্দীন’ মার্কা কমিশনই গঠিত হবে, কিম্বা তার চেয়েও বেশি…!

২০১৫ সালেই যুদ্ধ-ব্যয় ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার, কিন্তু শান্তিতে?

ক্যামিলা স্কিপা ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালটি ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুাকপূর্ন ও খারাপ একটি খারাপ বছর। ঐতিহাসিক প্রবণতা অনুযায়ী, বৈশ্বিক শান্তি আরো নাজুক অবস্থায় পড়েছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে ২০১৫ সালেই বৈশ্বিক যুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ভয়াবহ মাত্রায় সন্ত্রাস দেখা গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত বছরই সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত লোক দেখা গেছে।

এই সহিংসতার মূল্য বিপুল। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্রয় ক্ষমতা মানদন্ডে (পিপিপি) ২০১৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য দিনে ৫ ডলারের সমান, কিংবা বৈশ্বিক বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) আয়তনের ১১ গুণ।

সহিংসতার ক্ষতি আসলে হিসাব করা উচিত মানবীয় ও আবেগগত মানদন্ডে। অবশ্য অর্থনীতিতে ক্ষতির হিসাবটাও বিবেচনায় আনা দরকার। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের সময় সহিংসতা প্রতিরোধ ও সংযত করার ব্যয় এবং সেইসাথে এর পরিণতিও পরিমাপ করা দরকার। এই বিবেচনাটা খুবই দরকার। কারণ সহিংসতা সংযত রাখতে ব্যয় করাটা দরকারি হলেও এটা অর্থনৈতিকভাবে মূলত অনুৎপাদনশীল।

সহিংসতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধে এবং এর পরিণামে যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে, সেটা পরিমাপ করার একটি পদ্ধতি হলো ‘আইইপি’ পদ্ধতি। এতে কেবল সামরিক ব্যয়ই হিসাব করা হয় না, বরং সেইসাথে নিরাপত্তা ও পুলিশের পেছনে অভ্যন্তরীণ ব্যয় এবং সশস্ত্র সংঘাত, নরহত্যা, সহিংস অপরাধ এবং যৌন নিপীড়নে ক্ষয়ক্ষতিও বিবেচনায় আনা হয়।

১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় ও ক্ষতি বিশ্ব জিডিপির ১৩.৩ ভাগের সমান। এই টাকাটা এই দুনিয়ার সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে চাইলে প্রতিটি লোক পাবে ১,৮৭৬ ডলার করে।  এই হিসাব করাটা দুটি কারণে খুবই দরকার। প্রথমত, এই ব্যয়ের ৭০ ভাগের বেশি করে সরকার তার সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়; অর্থাৎ সরকারি ব্যয়ের বড় অংশটাই যাচ্ছে এই খাতে। বিশ্ব যদি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ হয়, তবে এই বিপুল সম্পদ অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ত, সহিংসতা ও সংঘাত অবসানের পরও যে ক্ষতিটা বিরাজ করতে থাকে, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ। তাতেও কিন্তু বিপুল খরচ হতে থাকে।

একটু নজর বুলালেই দেখা যাবে, সহিংসতা সৃষ্টি এবং সেটা থামানোর জন্য বিশ্ব অব্যাহতভাবে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় শান্তির পেছনে খরচ করছে অতি সামান্য। কেবল ২০১৫ সালেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কাজে ব্যয় হয়েছে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার; যা সশস্ত্র সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হওয়া ৭৪২ বিলিয়ন ডলারের মাত্র ১.১ ভাগ। দীর্ঘ মেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের দরকার ৬.৮ বিলিয়ন ডলার, যা সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতি হচ্ছে তার মাত্র ০.৯ ভাগ।

ভবিষ্যত যাতে শান্তিপূর্ণ হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিরক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ।

বর্তমানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমগুলোর লক্ষ্য মূলত সংঘাত সৃষ্টি হলে সেটা থামানোর চেষ্টা করা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে চাইলে প্রয়োজন সংঘাত যাতে সৃষ্টিই না হয়, সেটার ব্যবস্থা করাই সবার আগে জরুরী।

শান্তি প্রতিষ্ঠা মিশনের লক্ষ্য হবে- সহিংস সংঘাত প্রতিরোধে জাতীয় সামর্থ্য জোরদার করা, এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা- যেগুলো টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে।

কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতার পেছনে ব্যয় করছে বিপুল অর্থ, শান্তিতে খুবই সামান্য। অবশ্য, এ কারণেই শান্তির পেছনে ব্যয় বাড়ানোর অর্থনৈতিক যুক্তিও প্রবল হয়ে ওঠছে।

কোনো কোনো দেশে আরো শান্তির দাবি জোরদার হতে থাকলেও এবং তারা শান্তির চেষ্টা বাড়াতে থাকলেও সার্বিকভাবে বিশ্বজুড়ে সহিংসতা বাড়ছে। এতে করে দেশগুলোর মধ্যে আরো বেশি বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। কম শান্তিপূর্ণ দেশগুলো বেশি বেশি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে তারা আরো বেশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ছে।

(লেখক- পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পিস।)

কর দেয়না কোটিপতিরা : চাপে স্বল্প আয়ের মানুষ

সরকারি হিসাবেই দেশে সোয়া লাখ কোটিপতি

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কর ভারে নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত বা স্বল্প মানুষের আয়ের ওপর ব্যাপকমাত্রায় করারোপের কথা জানান দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৬ হাজার টাকা মাসিক আয় হলেই তাকে কর দিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অসম কর ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অনৈতিকভাবে উপার্জনের সুযোগ বন্ধ করার নির্দেশনার বিপরীত। উল্লেখ্য, গত জুন মাসেই ৩ লাখ টাকার বেশি আছে এমন ব্যাংক হিসাবগুলোকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন হিসাবের সংখ্যা সংখ্যা ৩১ লাখ ৮০ হাজার যার মধ্যে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান দুই’ই আছে। সঞ্চয়ী  হিসাবের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি, যার অধিকাংশ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প সংখ্যক উচ্চ মধ্যবিত্ত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দাড়ায়, আসলে যারা বৈধ এবং অবৈধভাবে কোটিপতি হয়েছে তারা কি ঠিকমতো কর দেয়? এনবিআর কি তাদেরকে করের আওতায় আনতে পেরেছে বা এমন কোন উদ্যোগ কী আছে?

ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে কিংবা চাকরিজীবিদের বেতনের ওপর উৎসে করারোপের মাধ্যমে এনবিআর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করছে। অর্থ বিল ২০১২ অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) আছে এমন আমানতকারীদের থেকে ১০ শতাংশহারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। যাদের টিআইএন নেই তাদের মুনাফায় ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে জানান, গত ৭ বছরে দেশে বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবধারীদের  সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ছিলো, ২০১৩ সালে ৯৮ হাজার ৫৯১টি, ২০১২ সালে ৯০ হাজার ৬৫৫টি এবং ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার ১৫০টি। কিন্তু ওই সংখ্যার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যার হিসাব সংখ্যা একশ’রও বেশি। তাই ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা রয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কোটিপতির সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি উদ্যোগে এক কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিলো ৩৭ হাজার ১৭৭টি এবং মোট জমার পরিমাণ ছিলো এক লাখ ৫৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪২টি। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব তিন হাজার ৬৮৭টি, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাব আছে এক হাজার ৮৯টি। আর ৫০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক ছিল ২৪৮টি। তবে বেসরকারি হিসাবে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত প্রায় আড়াই লাখ কোটিপতি রয়েছে বাংলাদেশে। অথচ ১৯৭৫ সালে কোটি টাকার বেশি অর্থ আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭টি।

বাস্তবে কোটিপতিদের উপার্জনের তুলনায় কর দাতার সংখ্যা রীতিমত হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১ কোটি টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন করদাতা। ২০১৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের কিছু বেশি, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন, ২০১১ করবর্ষে সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী চূড়ান্ত হিসাবে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে এমন করদাতার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩০৩ জন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, বাঁকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার হিসাব বা সংশ্লিষ্ট কোটিপতিরা কেন এখনো কর আওতার বাইরে? এসব কোটিপতির সম্পর্কে কোনো তথ্য কি এনবিআর এর কাছে নেই? একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন করদানে সক্ষম মানুষ প্রায় ৯৬ লাখ। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মাত্র ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯৪ জন করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। এর বিপরীতে আয়কর জমা পড়ে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। শুধু কোটিপতি নয় প্রজাতন্ত্রের বা সরকারি কাজে নিয়োজিত ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর  মধ্যে প্রায় তিন লাখ কর্মকর্তা বৈধভাবে করযোগ্য অর্থ উপার্জন করলেও আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৬৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার। অর্থাৎ আয়কর রিটার্ন জমা দেন না ৭৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ।

কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই এনবিআর-এর অভিযানের প্রেক্ষিতে ল্যান্ড রোভার, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তার পাশে আনাচে কানাচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোটি টাকার ওপরে (আমদানি শুল্কসহ) দাম এমন প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ি নিবন্ধিত আছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। এর বাইরেও অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে অন্তত ৩০০ গাড়ি। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ হাজার বিলাসবহুল গাড়ির যে নিবন্ধন আছে তার মধ্যে মার্সিডিজ বেঞ্জই প্রায় ২৫ হাজার। একেকটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ও লেক্সাস গাড়ি কিনতে খরচ পড়ে গড়ে চার কোটি টাকা, বিএমডব্লিউ ও ল্যান্ড রোভার কিনতে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। প্রশ্ন হলো- প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ির মালিকও যদি কর দেয় তাহলে কোটিপতি করদাতার সংখ্যা মাত্র ৬ হাজারের বেশি হয় কিভাবে? শুধু তাই নয়, রিহ্যাব সূত্র অনুযায়ী, ধানমন্ডি, গুলশান এবং বনানীতে ফ্ল্যাটের মূল্য প্রতি বর্গফুট গড়ে ১৫ থেকে ২২ হাজার টাকা। সে হিসাবে এসব এলাকায় একেকটি মধ্যম মানের ফ্লাটের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। কয়েক হাজার প্লাট মালিকের মধ্যে কতজন ঠিকমতো কর দেয়?

কর প্রদানে কোটিপতিদের এ অনীহা নতুন কিছু নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান এর মতে, এটা অপ্রত্যাশিত যে, এত কম সংখ্যক ব্যক্তি কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে, কোটিপতিদের কাছ থেকে কর আদায় করা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিয়ে কোটিপতিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ এনবিআরের গ্রহণ করা উচিত। এরপর তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে না। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কর রাজস্ব এবং জিডিপি অনুপাত ৩৩.৮ শতাংশ থেকে ৩৩.৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে এ হার ৮%-১২% হলে ও বাংলাদেশের কর রাজস্ব অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশে নিম্ন রাজস্ব আয়ের প্রধান কারণ ব্যাপক কর ফাঁকি। গোপন বা অনৈতিক উৎস হতে উপার্জনের অবারিত সুযোগ থাকায় রাজস্ব  আয়ের ঘাটতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কালো অর্থনীতির সুযোগ বাড়ছে এবং সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন নয়, করারোপ নীতি এবং কর ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সময়কালে মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় হয় মাত্র ১,৪৫৫ কোটি টাকা, যা এনবিআরের ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সংশোধিত সর্বমোট রাজস্ব করের মাত্র ১.১৬ শতাংশ। এ ব্যবস্থা চলমান থাকায় অবৈধ অর্থ উপার্জন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পাচ্ছে। আর কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অবৈধ অর্থ বিদেশে কর-স্বর্গ বলে পরিচিত দেশসমূহে পাঁচার করে তা আবার দেশে নিয়ে আসলেও এনবিআর বা দুদক এসব অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে পারেনি বা চায়নি। উল্টো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রুই-কাতলাদের নির্বিচারে সততার সনদ দিয়েছে দুদক। উল্লেখ্য, এনবিআর সুত্রে জানা যায়, করস্বর্গ বলে খ্যাত বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেমান আইল্যান্ড, মরিশাস, পানামা, মাল্টা, ফিলিপাইনসহ বিভিন্নস্থানে বাংলাদেশীদের অবৈধ অর্থ পাচার হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস বাজেট এবং পলিসি সেন্টার এর কূর্ট ওয়াইজ এবং নোয়াহ এর মতে, ‘করারোপে’র উল্লম্বন সমতা’র আওতায় নাগরিকের ওপর করারোপের ক্ষেত্রে কর প্রদানের সক্ষমতাকে বিবেচনা করার কথা এবং যার আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় ধনীরা তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রদানের কথা’। এ প্রেক্ষিতে কর ব্যবস্থাকে সুষম এবং দারিদ্র-বান্ধব করে তোলার প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনবিআর এর সমন্বয়ে কোটিপতিদের করের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে দেশের প্রচলিত কর আইন সংশোধন করা; পরোক্ষ কর পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান বৃদ্ধি করে কর নীতিমালা দরিদ্রবান্ধব ও কর কাঠামো অধিকতর প্রগতিশীল করা; অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাতকে মূল্য সংযোজন করের আওতামুক্ত রাখা; আয়-বৈষম্য এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে (ব্যক্তি এবং কর্পোরেট দেশীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ) আয়স্তর, আয়কর হার নির্ধারণ; ব্যক্তির টিআইএন, জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্টের নম্বর এবং কর প্রদান সংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা; একটি ন্যুনতম সীমার উর্দ্ধে সকল লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা প্রদান করা; সকল বৈধ টিআইএনধারীর নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা; এবং সর্বেপারি সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ অটোমেশন এবং কার্যকর ই-গভর্নেন্স নিশ্চিত করা; কর ন্যায়পালের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করতে এনবিআরকে আইনী ক্ষমতা দেয়া জরুরি।

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(দ্বিতীয় পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষনের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই । তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির  বক্তা  অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

দার্শনিক হেগেল ভারতবর্ষ সম্পর্কে বলেছিলেন যে ভারতবর্ষের কোন ইতিহাস নেই। একথা দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন যে, সমাজ নিশ্চল ছিল, সময়ের সঙ্গে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ‘এশীয় স্বৈরতন্ত্র’ সম্পর্কিত মার্কসের বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝতে না পারার কারণে অনেক ভারতীয় মার্কসবাদীও অনেকটা হেগেলের মতই অনুধাবনযোগ্য মনে করতেন। ভারতের বিখ্যাত মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ, গণিতজ্ঞ ও পন্ডিত দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী এই মতের কড়া সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে ভারতের সমাজের মধ্যেও তীব্র শ্রেণীসংগ্রাম ছিল। হয়তো তা ইউরোপের মতো নয়। কিন্তু সমাজ একেবারে নিশ্চল, অপরিবর্তনীয় ছিল এমনটা মনে করা হবে খুবই বড়  ভুল ও অনৈতিহাসিক। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়ার ভূমিকা’ (An Introduction to the Study of Indian History) গ্রন্থটির একেবারে প্রথম প্যারাতেই কোসাম্বী এই রকম ভুল ধারণা খন্ডন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের বৃত্তান্তে কিছু ঘটনা পরস্পর আছে, কোন ইতিহাস নেই’ (India has some episodes but no history)-এই সিদ্ধান্তকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। গোটা বইয়ে অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে শ্রমজীবী মানুষ শ্রেণীসংগ্রাম করেছে এবং ইতিহাস নির্মাণ করেছে। শুধু ইউরোপেই না, ভারতবর্ষেও। (D. D. Kosambi, An Introduction to the Study of Indian History (Bombay: Popular Prakashan, 1956).

আমরা দেখছি, আর্যদের দখলে চলে যাবার পর এই ভূখন্ডের আদিবাসী অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষেরা বর্ণাশ্রমের শিকার হতে বাধ্য হয়েছিল। সেটি ছিল বিরাট ঐতিহাসিক পরাজয়। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এ দেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিতম উৎস।’          (ঐ, পৃষ্ঠা ৩৪।) এর সঙ্গে দ্বিমত করার কিছুই নাই। হিন্দু সমাজে এখনও জাতপাত প্রথা বিষফোড়ার মতো টিকে আছে। সেই প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা এখন আলোচনা করছি না। আমাদের আলোচ্য বিষয় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং বর্তমানের ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গিবাদ। আহমদ ছফা আবার একই সঙ্গে লিখেছেন, ‘বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ঐ বিদেশী উন্নত শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন-ছড়াতে, খেলার বোলে তার অজস্র প্রকাশ ছড়ানো আছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ট আর্যশক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। (ঐ পৃষ্ঠা ৩৩) আহমদ ছফার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী। সেই ঐতিহ্য পরবর্তীতেও আমাদের পূর্বপুরুষরা বহন করে এসেছেন বংশানুক্রমিকভাবে। বৌদ্ধধর্ম ছিল আর্যশাসনের বিরুদ্ধে অর্থাৎ শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিত জনগণের প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের একটি রূপ। প্রাচীন যুগে রাজনৈতিক দল ছিল না। তখন বিদ্রোহ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের আবরণে আত্মপ্রকাশ করত। তা পশ্চিম এশিয়ায় যেমন খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বাংলায় পাল রাজবংশের উৎপত্তি ছিল জনগণের বিদ্রোহের ফলস্বরূপ। পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল ছিলেন জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত। পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও জনদরদী শাসক ছিলেন, এমনটা মনে করা সঠিক নয়। সেই প্রাচীন বা মধ্যযুগে রাজাবাদশা শাসক মাত্রই ছিলেন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী। পাল রাজাদের বিরুদ্ধে কৈবর্ত বিদ্রোহ আরেকবার প্রমাণ করে যে এই জনপদের সাধারণ শ্রমজীবী ও কৃষকরা ছিলেন সংগ্রামী মনোভাবাপন্ন। মার্কসবাদী রাজনীতিবিদ লেখক সত্যেন সেনের একটি উপন্যাস আছে কৈবর্ত বিদ্রোহ ভিত্তি করে। উপন্যাসের নামও ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’। (সত্যেন সেন, বিদ্রোহী কৈবর্ত) কৈবর্ত রাজারা (দিব্যক, রুদ্রক, ভীম) গৌড়ে কয়েক বছর রাজত্ব করেন। পরে পালরা মগধ থেকে এসে আবার গৌড় দখল করেছিলেন। ১১২০ সালে কর্ণাটক থেকে আসা সেনরা বাংলা দখল করেন এবং তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্ম পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জাতিভেদ প্রথা আবার চাপিয়ে দেয়া হল এবং বৌদ্ধদের নিশ্চিহ্ন করার ব্যবস্থা করা হল। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এবং বুদ্ধের বাণী যারা প্রচার করতেন তাঁরা আত্মগোপনে গেলেন। তাঁরা কিভাবে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ একটিভিটি চালাতেন, তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। ঠিক একইভাবে ইতিহাসের একটি পর্বে রোমান সাম্প্রাজ্যও খ্রিস্টধর্মের প্রচারকগণ আত্মগোপনে থেকে ধর্মমত প্রচার করতেন। এইসব ছিল শ্রেণী সংগ্রামের এক একটি রূপ। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতায় দেখা যায়, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু রাজারা কিভাবে বৌদ্ধ প্রচারক ও বুদ্ধভক্তদের হত্যা করত।

‘অজাতশত্রু করেছে রচনা

স্তুপে যে করিবে অর্ঘ্যরচনা

শূলের উপরে মরিবে সে জনা অথবা নির্বাসনে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘পূজারিনি’-কথা কাব্যগ্রন্থ, সঞ্চয়িতায় সংকলিত)

এটি উত্তর ভারতের ক্ষেত্রেও যেমন, তেমনি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য ছিল।

আহমদ ছফা বলেছেন, ‘বাঙ্গালি মুসলমান শুরু থেকেই তাদের আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে আসছিল।’ (ঐ পৃষ্ঠা ৩৪) কিন্তু আমরা ধর্মান্তরিত হবার ব্যাপারটিকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারি। এই জনগোষ্ঠী একবার বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল, পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসনামলে তো তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেনি। বরং ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সংগ্রামী মনোভাব দেখিয়ে আসছে। বাংলার সাধারণ মানুষ যে দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তা তাদের প্রতিবাদী মনেরই পরিচয় বহন করে। সেন রাজাদের নিষ্ঠুর দমনের কারণে প্রকাশ্যে বৌদ্ধধর্ম অবলুপ্ত হল। আর ঠিক সেই সময়ই এল ইসলাম ধর্ম ও বিজয়ী মুসলমান শাসকরা। এমনই পরিস্থিতিতে বাংলার নিম্নবর্ণের শ্রমজীবী মানুষের বিরাট অংশ দলে দলে মুসলমান হয়ে গেল। একদিকে হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথা, অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের তুলনামূলক উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও কিছুটা সামাজিক সাম্যের আদর্শ (এই সাম্য অর্থনৈতিক সাম্য নয়) এই মানুষদের আকৃষ্ট করেছিল। এই সকল ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলার মানুষ নতুন আদর্শকে, তুলনামূলক প্রগতিশীল আদর্শকে সহজেই গ্রহণ করতে পারে অর্থাৎ তারা চরিত্রগতভাবে রক্ষণশীল নয়। এই জনপদের মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা নেই, এমন অপবাদ মেনে নেয়া যায় না।

ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য বলেছেন, ইসলাম ধর্ম এই দেশে তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ইসলাম তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হলে, উত্তর ভারতে মুসলিম শাসনের রাজধানী দিল্লি আগ্রার আশেপাশের অঞ্চলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু হত না। (সুজিত আচার্য, বাংলায় ইসলাম ধর্মের আদিপর্ব) তবে একথা সত্য যে মুসলমানদের হাতে রাজদন্ড থাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার সহজ হয়েছিল। বাংলায় যারা ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন তারা ছিলেন সুফি মতবাদের অনুসারী, মানবতাবাদী ও উদারপন্থী। কট্টর মৌলবাদী ও শরিয়তপন্থীদের থেকে সুফি সাধকদের জীবনদর্শন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুফি ধর্ম-প্রচারকদের জীবন-প্রণালীও এই দেশের নিম্নবর্ণের খেটেখাওয়া মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই আশরাফদের তুলনায় আতরাফ বা নিচু জাতের মুসলমান, যারা আবার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা ছিলেন বরাবরই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। ধর্মীয় গোঁড়ামি তাদের কখনও স্পর্শ করেনি।

আমাদের এই জনপদে বহু প্রাচীনকালেই বেদবিরোধী একটি লোকায়ত দর্শন ছিল। বাংলায় বৌদ্ধধর্মের যে সংস্করণটি জনপ্রিয় হয়েছিল তা সহজিয়া ধর্ম নামে পরিচিত। সহজিয়া ধর্মের মধ্যে মানবিক দিক অনেক বেশি ছিল। সহজিয়া ধর্মের সাহিত্যে বৈদিক ধর্ম, পৌরাণিক পূজাপদ্ধতি, এমনকি বৌদ্ধধর্মের অনেক আচার-নিষ্ঠাকে কটাক্ষ করা হয়েছিল। ‘সহজিয়া’ মতবাদ কেবল বৌদ্ধধর্মের ব্যাপার ছিল না। ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগেই হিন্দু সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে তার প্রভাব ছিল। ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের সুফি মতবাদের সঙ্গে সহজিয়া মতবাদের অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিল মধ্যযুগের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। তাই তারা খুব সহজে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

সহজিয়া ঐতিহ্যের দুইটি ধারা-সগুণ ও নির্গুণ। মধ্যযুগে জন্মগ্রহণকারী (১৪৮৬ সালে) শ্রীচৈতন্য নিজে ব্রাহ্মণ হলেও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন এবং মানবতাবাদী ছিলেন। তাঁর অনেক মুসলমান শিষ্যও ছিল। বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্য এবং কবি চন্ডীদাস ছিলেন সগুণ ধারার শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। (চন্ডীদাস-‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’) অন্যদিকে নির্গুণ পথের পথিক বাউল সাধকরা ছিলেন অধিকতর মানবিক এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের পক্ষে। মধ্যযুগে বাংলাদেশে এবং উত্তর ভারতে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও গরিব মুসলমানদের মধ্যে অনেক প্রতিভাবান কবি ও সমাজ সংস্কারকের উদ্ভব ঘটেছিল যাঁরা ছিলেন প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের পক্ষে। তাঁরা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী। তাঁদের অনেকেই ছিলেন গরিব ও শ্রমজীবী-যথা কবীর (মুসলমান ও তাঁতি), শোন (নাপিত), রামদাস (মুচি), ধন (শূদ্র) প্রমুখ।

মধ্যযুগে বাংলায় পাচালি, যাত্রা, সঙ্গীত প্রভৃতি রচনা ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। কোন কোন রচনায় ধর্মের আবরণ বা রাজরাজড়ার কাহিনী থাকলেও (শেক্সপিয়ারের নাটকেও রাজারাজড়া ও ভূতপ্রেতের কাহিনী আছে) তা মানবতাবাদী গুণেও সমৃদ্ধ ছিল। এই যে জনপ্রিয় সাহিত্য গড়ে উঠেছিল তা অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতেও সাহায্য করেছিল। যে মানুষ এমন সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারে, তাদের ছোট করে দেখা হবে অনৈতিহাসিক।

সগুণ ধারার তুলনায় নির্গুণ সহজিয়া ধারার প্রবক্তাগণ অর্থাৎ বাউলরা ইসলাম ধর্মের সুফি মতবাদের প্রতি অধিক সহিষ্ণু ছিলেন। অন্যদিকে শরিয়তপন্থী কট্টর মোল্লাতন্ত্র হিন্দুধর্মকে যেভাবে শত্রুতার মনোভাব নিয়ে দেখেছে, সুফি সাধকদের মনোভাবের সঙ্গে তার দুস্তর তফাৎ ছিল। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলায় ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে সুফি মতবাদের সাধকদের হাত দিয়ে। তাই অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রথম থেকেই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিরাজ করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ মিলবে বাউল সাধকদের মধ্যে (তাঁদের সঙ্গীতেও)। মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন বাউল গানের সংকলন প্রকাশ করেছিলেন ১৯২৭ সালে ‘হারামণি’ নামক গ্রন্থে। সেই সংকলনের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন, তারা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। … কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্ত মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে সেই সাধনা দেখি-এ জিনিস হিন্দু-মুসলমানের উভয়েরই, একত্র হয়েছে, অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়নি, এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে। কোরান-পুরাণ ঝগড়া বাধেনি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদ-বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা স্কুল কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কি রকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু ও মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তার পরিচয় পাওয়া যায়। (মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন, হারামনি)এই জনপদের গরিব শ্রমজীবী, যারা ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং যাদের অধিকাংশ ইতিহাসের এক কালপর্বে দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তারা ঐতিহ্যগতভাবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। এইটুকু বললেই যথেষ্ট বলা হল না। তারা ইতিহাসে সক্রিয় ভূমিকাও পালন করেছেন, সমৃদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতি যেমন নির্মাণ করেছেন, তেমনি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে এবং পরে। কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেটা ছিল এদেশে ইসলামের অভ্যুদয়ের আগের ঘটনা। কিন্তু পরেও আমরা হিন্দু মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম দেখব, মিলিত সাহিত্য-সংস্কৃতি নির্মাণও দেখব।

মধ্যযুগে যে সকল বাঙ্গালি কবির সাক্ষাৎ আমরা পাই তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুকুন্দরাম, দৌলত কাজী, আলাউল, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ প্রমুখ। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন তাঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মেরই কবিরা ছিলেন। তাঁরা ছিলেন গরিব। তাঁদের কবিতায় শোষিত মানুষের ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। তবে পরবর্তীতে উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য মুসলমানের অবদান হিন্দুর তুলনায় কম হল কেন? এই প্রশ্নটি আহমদ ছফা উত্থাপন করেছেন। সেই প্রসঙ্গে আমরা একটু পরেই আসছি।

আমরা আরও দেখব নিম্নবর্ণের হিন্দু ও ধর্মান্তরিত মুসলমান অর্থাৎ গরিব শ্রমজীবী মানুষ অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বারবার সংগ্রাম করেছে, বিদ্রোহ করেছে। দুই একটি উদাহরণ দেয়া থাক। সুলতান আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে স্থানীয় কোতোয়ালের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হাজি মোল্লা নামক জনৈক কোষাগার রক্ষীর নেতৃত্বে স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। যশোরের জমিদার কেদার রায়ের রাজত্বকালে নোওয়াপাড়ার কৃষক জনগণ বিদ্রোহ করেছিল। দেখা যাবে, অত্যাচারী শাসক ও জমিদারদের মধ্যে যেমন হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের লোক ছিল তেমনি বিদ্রোহী জনগণের মধ্যেও দুই ধর্মেরই মানুষ ছিল।

আসা যাক ব্রিটিশ যুগে। ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তিতুমীরের ওয়াহাবি আন্দোলন ও দুদুমিয়ার নেতৃত্বাধীন ফরায়েজি আন্দোলন ছাড়া অন্য কোন গণ আন্দোলনে বাঙ্গালি মুসলমানের অংশগ্রহণ দেখতে পেলেন না আহমদ ছফা। (ঐ পৃ. ৩৬) কিন্তু ইংরেজ শাসকের ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশে যে অসংখ্য সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বী বিদ্রোহীরা ছিলেন। ফকির সন্যাসী বিদ্রোহ কৃষক বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৮৫৭) ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যুদ্ধ। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যে নীলবিদ্রোহ ও প্রজাবিদ্রোহ হয়েছিল, সেখানেও হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম আমরা দেখব।

তবে একথা ঠিক যে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন বিকাশ লাভ করেছিল তাতে সাধারণভাবে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কম ছিল। সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে স্বদেশী আন্দোলনের একটি বড় দুর্বলতা তা রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে দেখিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনেও কয়েকজন মুসলমান বুদ্ধিজীবীর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে যাঁরা আন্দোলনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। যেমন ব্যারিস্টার আবদুল রসুল (তিনি চরমপন্থী বলেও পরিচিত), লিয়াকত হোসেন (তিনিও চরমপন্থী বলে পরিচিত), মৌলবী আবুল কাশেম, আবদুল হালিম গজনভী প্রমুখ।

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ (সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী) আন্দোলনে অবশ্য বাঙ্গালি মুসলমানের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। তার কারণ এই সকল গোপন দলের নেতারা মুসলমানদের দলে নিতে চাননি। তবে বিপ্লবী সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রতি যে স্থানীয় মুসলমান কৃষকদের সহানুভূতি ছিল একথা আমাকে বলছিলেন সূর্যসেনের এক কিশোর শিষ্য (পরবর্তীতে কমিউনিস্ট নেতা) প্রয়াত শরবিন্দু দস্তিদার। নেতাজী সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সকলেই ছিলেন, অফিসার হিশাবে, সেনাপতি হিশাবে এবং সাধারণ সৈন্য হিশাবেও।

১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক নৌ বিদ্রোহ ছিল হিন্দু-মুসলমান নাবিকদের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ। আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের বিচার শুরু করে হলে কলকাতায় রশীদ আলী দিবসকে কেন্দ্র করে যে গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল সেখানে বাঙ্গালি হিন্দু ও বাঙ্গালি মুসলমান কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করেছেন। সেই লড়াই যে ভিত্তি করে মানিক বন্দোপাধ্যায় ‘চিহ্ন’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানে সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী যে চরিত্রগুলি দেখি তার মধ্যে হিন্দুও আছে, মুসলমানও আছে। ১৯৪৬ সালে যে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন গ্রাম বাংলাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের কৃষকরা ছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ। তিনি নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙ্গালি মুসলিম পরিবার থেকেই এসেছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির আদি গঠনপর্বে বাংলাদেশে যে সামান্য কয়জন উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে কমরেড আবদুল হালিম ও কমরেড আবদুর রাজ্জাক খানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাঙ্গালি মুসলমানের সংগ্রামী ঐতিহ্য তুলে ধরার মানে এই নয় যে, এই জনগোষ্ঠীর দুর্বলতাকে আড়াল করতে চাই। আহমদ ছফা দুর্বলতার দিকটাই তুলে ধরেছেন অত্যন্ত তীক্ষ্ম ভাষায়। সেই দিকটার প্রতি এবার আমি দৃষ্টিপাত করার চেষ্টা করব। আহমদ ছফা যথার্থই বলেছেন যে বাংলা সাহিত্যে নজরুল ও জসিম উদ্দিন-মাত্র দুইজন মুসলমান কবির নাম করা যায় যাঁরা ‘কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।’ ছফা আরও লিখেছেন, ‘এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দুসমাজ, মুসলমান সমাজ নয়।’ (আহমদ ছফা, ঐ, পৃষ্ঠা ৩৭) সত্যি তো আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্বের (এবং এখনও) দিকপাল কারা? ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম। মুসলমানের সংখ্যা এত কম কেন? আমরা এখন সেই আলোচনায় প্রবেশ করব।