Home » সম্পাদকের বাছাই (page 32)

সম্পাদকের বাছাই

দুইদেশের বন্ধুত্বের কাঁটা : রামপাল থেকে ফারাক্কা

আনু মুহাম্মদ ::

যা মানুষকে কঠিন বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করছে, যে ক্ষতিপূরণ করা কখনোই সম্ভব নয়, যে ক্ষতি বহন করা মানুষের পক্ষে দু:সাধ্য সেই ক্ষতি নিয়েও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের হাসিঠাট্টা মিশ্রিত ‘কোনো ক্ষতি হয়নি’ ‘কিংবা হবে না’ শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত। তাঁরা তাঁদের দিক থেকে যে খুব অসত্য বলছেন তাও নয়, কেননা ক্ষতি তো তাদের হয়ইনি, হবেও না কোনোদিন। তাঁরা মানুষ ও জনপদের অপরিসীম ক্ষতি করেন, লাভবান হন এবং তারপর চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রথমে একটি বাঁধের কথা বলি। গত শতকের ৬০ দশকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর ওপর যখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ চলছিলো তখনই এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞও দীর্ঘমেয়াদে এই বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েই উচ্চকন্ঠ ছিলেন। কিন্তু এর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তা চালু হয়। এই বাঁধের কারণে এতো বছরে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে, বাংলাদেশের প্রধান একটি নদীর পানি প্রবাহ ভয়াবহ মাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তার ফলে এরসাথে সংযুক্ত আরও ছোটবড় নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল বহুমাত্রিক বিপর্যয়, শুধু যে এসব নদীর অববাহিকায় জীবন, জীবিকা, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই নয় প্রতিবেশগত ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়ে জীবনমান স্বাস্থ্য প্রাণবৈচিত্রও বিপদাপন্ন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য বের করা কঠিন। এই ফারাক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে নেমে আসা আরও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, আরও পরিকল্পনাধীন আছে। এর ওপর ‘নদী সংযোগ পরিকল্পনা’ নামে যে ভয়াবহ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত তা পুরা অঞ্চলে নদী ও নদীনির্ভর জীবন ও অর্থনীতির ওপর মরণ আঘাত দিতে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ওপর সম্পর্কিত সকল দেশের মানুষের অধিকার অস্বীকার করেই ভারত একের পর এক এসব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নিচ্ছে। আন্তজার্তিক পানি কনভেনশন অনুযায়ী এসব তৎপরতা অবৈধ, এবং বাংলাদেশের সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য ভারত দায় নিতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এর সুরাহা করবে কি, তার নিজের উন্নয়ন মডেলেই যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল ও দূষণ দিয়ে নদীর বাকি অস্তিত্বের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

নদীর ওপর যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণের সুবিধাভোগী বিশ্ব জোড়া নির্মাণ কোম্পানি, কনসালট্যান্ট, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের জোট গত শতকের শেষ কয়েক দশকে বিশ্বের বহুদেশে বন্যানিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সবুজ বিপ্লবের  নামে নদী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এসব কর্মসূচি নিয়েছে। এর বিরূপ ফলাফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ভাটার দেশগুলো যে বড় বিপর্যয়ের সামনে পতিত হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত বিশ্ব জোড়া। উজানের দেশগুলোতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সে কারণে জোরজবরদস্তি করে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশের মতামত ও অধিকারের তোয়াক্কা না করে যে বাঁধ চালু করেছে, শুকনো মৌসুমে পানি আটকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে ভেবেছে এতে ভাটির দেশের ক্ষতি হলে কি- ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, ঘটনা তা ঘটেনি। বরং ভারতের দিকে নতুন নতুন সমস্যা ক্রমে জমে এখন ভয়াল আকার ধারণ করেছে। এর শিকার হচ্ছে অনেক এলাকা, বিহার তার অন্যতম, এই বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিহারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এই বছরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলতে। এই দাবি বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের। কিন্তু ভারত পন্থী ও ভারত বিরোধিতার নামে পরিচালিত রাজনীতির দুষ্টচক্রের কারণে বাংলাদেশে এনিয়ে সুস্থ আলোচনা হয়না কখনো। কিন্তু সর্বসাধারণের মনের মধ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ আছে। বরাবর ভারত এটি উপেক্ষা করতে চেয়েছে ‘এগুলো নিছক ভারত বিদ্বেষী রাজনীতি’ এই আওয়াজ দিয়ে।

ফারাক্কার জন্য ক্ষতি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার প্রমাণ সুন্দরবন। সুন্দরবন যেসব নদী ও শাখানদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল সেই নদীগুলো আবার গঙ্গা-পদ্মার পানি প্রবাহের সাথে সংযুক্ত। ফারাক্কা কাজ শুরুর পর থেকে নদীগুলোর রুগ্নতাপ্রাপ্তিতে তাই সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সুন্দরবনে বিপরীত থেকে সমুদ্রের নোনাপানির প্রবাহ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে যায়। এক গবেষণার ফলাফলে তাই দেখা যায়, ‘গঙ্গা নদীর মিঠা পানি গড়াই হয়ে পশুর নদ ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হয়। ফারাক্কা বাঁধের পর পানি প্রবাহ কমে গেছে।.. মিঠা পানির প্রবাহ কম থাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে বনের মধ্যে। এ কারণে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারছে না। ..বাঁধ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘনমিটার পলিযুক্ত মিঠা পানি গ্রহণ করেছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘনমিটার পানি প্রবাহ প্রয়োজন। কম পানি প্রবাহ থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি বনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরীগাছের বেঁচে থাকা কঠিন।’ (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি সুন্দরবনকে অনেকদিক থেকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশের জন্য শুধু নয় ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী প্রবাহ এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা বা দায়বদ্ধতা যদি দুদেশের সরকারের থাকতো তাহলেও ফারাক্কা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও নতুন চিন্তা দেখা যেতো। কিন্তু তা না থাকার ফলে দশকের পর দশক ফারাক্কা প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি করে গেছে। সুন্দরবনকে এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা না করে, একই দৃষ্টিভঙ্গীর দাপটে, বরং এর ওপর মরণ কামড় দেবার প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, সেটি হলো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর প্রধান উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ভারতের এনটিপিসি, এই কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারতের একটি কোম্পানি, এর জন্য ঋণ যোগান দেবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক (এরজন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ সরকার) এবং সব লক্ষণ বলছে কয়লাযোগান দেবে ভারতের কয়লা কোম্পানি। তারমানে কাগজেপত্রে ৫০:৫০ মালিকানা ও মুনাফা দেখানো হলেও বিনিয়োগ, নানাকিছু বিক্রি, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সবকিছুতেই ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির লাভ। বিপরীতে বাংলাদেশের শুধুই ক্ষতি, সুন্দরবন হারানোর মতো অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি, বহুলক্ষ মানুষের জীবনজীবিকার ক্ষতি, কয়েককোটি মানুষের জীবন নিরাপত্তার ঝুঁকি, তারপরও ঘাড়ে ঋণ আর আর্থিক বোঝা। কিন্তু ক্ষতি কি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? না। প্রকৃতি অবিচ্ছিন্ন, সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে তার সর্বনাশ আসা ঠেকানো যায় না। সেজন্য সুন্দরবন বাংলাদেশ অংশে বিপর্যস্ত হলে ভারতের অংশের সুন্দরবনও তার থেকে বাঁচবে না। তাই কলকাতায় সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের বিরুদ্ধে এক সমাবেশে সংহতি জানাতে এসেছিলেন সেই এলাকার কয়েকজন অধিবাসী। তাঁদের একজন আমাকে বললেন, ‘আমরা ঐ এলাকায় ৫০ লক্ষ মানুষ বসবাস করি। সুন্দরবনের ক্ষতি হলে আমাদের সর্বনাশ। তাই আমরাও এই লড়াই-এ আছি।’

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সবসময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে বহুবিধ কারণে। এগুলো মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, কেননা ভারতের শাসকগোষ্ঠী একের পর এক বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক কিংবা ক্ষতিকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফারাক্কা এর একটি, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী সংযোগ পরিকল্পনা, অবিরাম সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের সীমান্ত, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ঋণ দিয়ে বেশি দামে জিনিষপত্র কিনতে বাধ্য করা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, তারপরও মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে।

পুরনো উন্নয়ন মডেলে নদীসহ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্বকেই মানুষের ক্ষমতা আর উন্নয়নের প্রদর্শনী ভাবা হতো, এখন তার পরিণাম যতো স্পষ্ট হচ্ছে ততোই ভুল সংশোধনের পথ খুঁজছে মানুষ। এমনকি বাঁধ ভেঙে হলেও নদীকে স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, প্রকৃতির সাথে সমন্বয় করে উন্নয়ন চিন্তা ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশকেও সেই পথই ধরতে হবে। ততোদিন অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না, সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা যাবেনা। ফলে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ চিরস্থায়ী শত্রুতার বোধে পরিণত হবে। বন্ধুত্ব নাম দিয়ে তৈরি কোম্পানি হবে শত্রুতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যম।

আমরা চাই না এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। ‘কোনো ক্ষতি হয়নি, কোনো ক্ষতি হবে না’ প্রলাপ দিয়ে সত্য আড়াল করা যাবে না। সেজন্য আমরা চাই দুইদেশের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের স্বার্থেই বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার দ্রুত এই প্রকল্প থেকে সরে আসবেন। আমরা এখনও আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুইদেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, বন্ধুত্ব হবে প্রকৃতই পরস্পরের বিকাশমুখি। দুইদেশের সজাগ মানুষ জনপন্থী উন্নয়নের ধারার জন্য যৌথ চিন্তা ও লড়াই শক্তিশালী করলে নিশ্চয়ই দুইদেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধুত্বেরভিত শক্তিশালী হবে।

বাঙ্গালি মুসলমানের ঐতিহ্য ও আজকের প্রেক্ষাপট-(প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো ::

কোন বিশেষনের প্রয়োজন নেই আহমদ  ছফা’র । তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০০১ সালের ২৮ জুলাই । তাঁর স্মরণে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা যে স্মৃতিবক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, সে বক্তৃতাটির  বক্তা  অর্থাৎ লেখকের অনুমতিক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, কবি ও লেখক আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বক্তৃতামালায় বক্তৃতা করার জন্য আমাকে যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সেজন্য আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এর আয়োজকদের প্রতি প্রকাশ করছি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এই স্মারক বক্তৃতামালার সঙ্গে যাঁর নাম জড়িত রয়েছে তিনি একজন মহৎ ব্যক্তি। কি চিন্তায়, কি লেখায় তিনি অত্যন্ত বড় মাপের মানুষ। উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী রচনা-বৈচিত্রে ভরপুর তাঁর রচনাসম্ভার। ফাউস্টের প্রথম খন্ডের যে অনুবাদ তিনি করেছেন আমার বিবেচনায় তা বাংলা ভাষায় অনূদিত (আমার পড়া ও জানামতে) অন্যান্য রচনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সঙ্গে যে ভূমিকাটি লিখেছেন তা অসাধারণ পান্ডিত্যপূর্ণ ও সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। তিনি ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ নামে যে অসাধারণ রচনাটি নির্মাণ করেছেন তা বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। আমি জানি না বিশ্বসাহিত্যে এরকম রচনা আছে কিনা, কারণ বিশ্বসাহিত্যের সব তো আমার পড়া নেই।

একথা বলতে আমায় ভালো লাগছে এবং গর্ববোধ হচ্ছে যে তাঁর জীবনকালে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেটা স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে। তিনি প্রায়শ নতুন কিছু লিখলে আমাকে জানাতেন, কখনও কখনও কোন কবিতা বা গদ্যলেখা পড়ে শোনাতেন। এসব কথা স্মরণ করে আমি সত্যিই আনন্দ ও গর্ববোধ করছি। আজকের বক্তৃতার শুরুতেই এই অসামান্য পুরুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

আহমদ ছফার গোটা সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করার যোগ্যতা আমার নাই। তিনি বিভিন্ন রচনার মধ্য দিয়ে যে সামাজিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তার তাৎপর্য বিশাল। কিন্তু এক বক্তৃতায় তাঁর সামগ্রিক চিন্তা নিয়ে আলোচনাও সম্ভব নয়। আমি আমার আজকের আলোচনার সূত্রপাত করার প্রয়োজনে তাঁর একটি মাত্র প্রবন্ধ বেছে নিচ্ছি। আজকের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় একটি বিষয় নিয়েই আমি বক্তব্য রাখব বলে ভেবে এসেছি। আমাদের দেশে হঠাৎ করে যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও ইসলামী জঙ্গীবাদ বা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার উৎস সন্ধানে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করব। এর উৎসের দুইটি দিক আছে-একটি আন্তর্জাতিক, অন্যটি জাতীয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমার আজকের বক্তৃতায় আমি সেই দিকটি আনছি না। কারণ তাহলে আলোচনা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়বে। মৌলবাদের অভ্যন্তরীণ উৎস কোথায় এবং আদৌ কোন উৎস আছে কিনা সেই আলোচনার মধ্যেই আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখব। সেই প্রসঙ্গেই আমি শুরু করতে চাই আহমদ ছফার ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ শীর্ষক এক অসাধারণ রচনা সামনে রেখে। (আহমদ ছফা, বাঙালী মুসলমানের মন (ঢাকা: খান ব্রাদার্স)।

অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের এক রচনা থেকে জানতে পারলাম যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বিংশ শতাব্দীর বাংলা ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ দশটি চিন্তার বইয়ের মধ্যে আহমদ ছফার ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ পুস্তিকাটির নাম উল্লেখ করেছেন। সলিমুল্লাহ খান লিখেছেন, ‘জনধন্য বাংলা মুলুকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে দ্বিমত করার মানুষ কখনো টান পড়বে বলে মনে হয় না। … এই মহান অধ্যাপকের সঙ্গে একমত পোষণ করি।’ (সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী)।

আমিও এই রচনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা বলে মনে করি। লেখক বাঙ্গালি মুসলমানের সামাজিক বিকাশ ও তার দুর্বলতার দিক তুলে ধরেছেন। কিন্তু প্রথমেই বলে রাখি, এই রচনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য মেনে নিয়েও ছফার সকল বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। তিনি একটা দিক তুলে ধরেছেন এবং তা যথার্থ। আজকে আমাদের সমাজে যে ধর্মীয় মৌলবাদের উৎপাত এবং ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সৃষ্টি-তা সংখ্যায় যত সামান্যই হোক-তার কারণ অনুসন্ধান করতে হলে ছফার রচনা নিশ্চিতভাবে প্রাসঙ্গিক, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমার বিবেচনায় আহমদ ছফার বিশ্লেষণ বেশ একপেশে।

তিনি যথার্থই বলেছেন, বাঙ্গালি মুসলমান তারাই যাদের পূর্বপুরুষ নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। লক্ষণ সেনের সময় কিভাবে দলে দলে নিম্নবর্ণের হিন্দু (যারা আবার শ্রমজীবী এবং গরিবও বটে) মুসলমান হল তার এক অনবদ্য চিত্র অঙ্কন করেছেন শওকত আলী, তাঁর বিখ্যাত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বাঙ্গালি মুসলমানের মনকে কতটা আচ্ছন্ন করতে  পারে-অথবা পারে না, তা বুঝতে হলে এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা দরকার। আহমদ ছফা আরও যথার্থ বলেছেন, ‘মূলত বাঙ্গালি মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হল, এদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। … একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল।’ (আহমদ ছফা, ঐ।)

তিনি যে বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে উচ্চশ্রেণী ও নিম্নশ্রেণী দুইটি সুস্পষ্ট বিভাজন দেখতে পেয়েছেন সেটাও সত্য। আমিও মনে করি তথাকথিত অভিজাত বাঙ্গালি মুসলমান এবং কৃষক বা শ্রমজীবী বাঙ্গালি মুসলমানকে আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। আমি আজকের আলোচনায় দেখানোর চেষ্টা করব, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক বা শ্রমজীবী মুসলমান, যাদের পূর্বপুরুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল, তাদের মানসিক গড়ন অসাম্প্রদায়িক, উদারপন্থী ও মানবিক। তাদের সাধারণত ‘আতরাফ’ বলা হয়। অন্যদিকে ‘আশরাফ’ বলে পরিচিত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের মধ্যেই প্রতিক্রিয়াশীলতার চিহ্ন অধিক পরিমাণে লক্ষণীয়। আশরাফরা মোগল আমলে ছিল শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তারা উচ্চবিত্ত এবং সম্ভ্রান্ত বলে পরিচিত। তারা একদা আরব, তুরস্ক, ইরান, মধ্য এশিয়া থেকে এদেশে এসেছিল। তবে পশ্চিম থেকে আসা সুফি মতবাদী ধর্ম-প্রচারকরা চরিত্রগতভাবে ভিন্ন ছিলেন। আশরাফ বলে পরিচিত তথাকথিত সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা এক সময় ঘরে ফার্সি বলতেন। পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে বলতেন উর্দু।

আশরাফ-আতরাফ বিভাজনটি বেশ পুরানো। তা মোগল আমল থেকে চলে আসছে। মুকুন্দরামের ‘কবিকঙ্কনচন্ডী’ মঙ্গলকাব্যে বিবৃত নগরবাসী বহিরাগত মুসলমান ও গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ধর্মান্তরিত মুসলমানের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক ও সামাজিক পার্থক্যটির নিপুণ বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী নবাব আবদুল লতিফের মতো যাঁরা সাধারণ পরিবার থেকে এসেও অভিজাত শ্রেণীতে উত্তরণের আকাঙ্খা পোষণ করতেন তাঁরাও বাংলাভাষাকে তাচ্ছিল্য করেছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও উর্দুকে আভিজাত্যের লক্ষণ মনে করা হত। সেই আভিজাত্যের গর্ব ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল যারা তারা কিন্তু মুসলমান কৃষক এবং সদ্যগঠিত মুসলমান মধ্যবিত্ত। তারাই ভাষা আন্দোলন করেছিলেন (ছাত্ররা ছিলেন কৃষকের সন্তান), একথা ভুললে চলবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবনে গোলাম সামাদ ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটির সমালোচনা করেছেন সম্পূর্ণ ভুল জায়গা থেকে। তিনি মনে করেছেন, বাঙ্গালি মুসলমানকে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে আসা বললে বুঝি ছোট করা হল।          (এবনে গোলাম সামাদ, ‘বাঙালী মুসলমানের মন’, সমকাল, ১৮ বর্ষ ৪ সংখ্যা, (বৈশাখ ১৩৮৩), পুনর্মুদ্রণ: আহমদ ছফা বিদ্যালয়, ১ বর্ষ ২ সংখ্যা (অক্টোবর-নবেম্বর ২০১৪)। তাই তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আসলে নিম্নবর্ণ বা শ্রমজীবী হওয়ার মধ্যে সামান্যতম অসম্মানের কিছুই নেই। যাই হোক এই প্রসঙ্গ আপাতত বাদ। তবে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে আহমদ ছফার একপেশে বিশ্লেষণের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘শুরু থেকেই বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনভাবে সম্পর্কিত ছিল না বলেই তার মনের ধরণ-ধারণটি অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতো থেকে গেছে। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাই তার জাগতিক অগ্রগতির উৎস। বাঙ্গালি মুসলমান চিন্তাই করতে শেখেনি। তার কারণ, এখনো সে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করার অধিকার পায়নি।’ (‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’, উত্তর ভূমিকা, পৃ. ১৬।) যদি চিন্তাই না করতে পারে তাহলে ভাষা আন্দোলন করল কিভাবে? আহমদ ছফা নিজেই লিখেছেন, ‘বাঙ্গালি মুসলমানের উল্লেখ করার মতো কোন কীর্তি ছিল না। কিন্তু বাঙ্গালি মুসলমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি বাঙ্গালি জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। এটাই তার সবচেয়ে বড় কীর্তি।’ (ঐ, পৃ. ১৬।) কথাটা কি স্ববিরোধী হয়ে গেল না?

ইউরোপের ইতিহাসে বুর্জোয়া বিপ্লবের আগেই যে সকল অতি বড়মাপের লেখক, শিল্পী, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবীর সাক্ষাৎ আমরা পাই তাঁদের অধিকাংশই ব্যক্তি হিশাবে ও শ্রেণী হিশাবে-উভয় দিক দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেছে নিপীড়িত শ্রেণী-শ্রমিক শ্রেণী। তাদের দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশ এসেছিলেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী থেকে, কিন্তু তাঁরাও রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন। অতএব ক্ষমতার আবহাওয়ার মধ্যে না থাকলে চিন্তার জন্ম হয় না বা প্রসার ঘটে না, এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। অধিকাংশ বাঙ্গালি মুসলমান, যারা শ্রমজীবী ও নিপীড়িত, তারা চিন্তা করতে পারেন না, তারা ইতিহাস রচনা করতে পারেন না, এমন ধারণাও সঠিক নয়। ইতিহাসও সে কথা বলে না। (চলবে)

যুদ্ধের নামে অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে : চলচ্চিত্র ‘ওয়ার ডগস্’

ফ্লোরা সরকার ::

‘উলফ অফ দ্য ওয়ালস্ট্রিট’ যেমন পুঁজিবাদ বিরোধী ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ তেমনি যুদ্ধ বিরোধী এক ছবি।  টড ফিলিপ পরিচালিত সাম্প্রতিক ছবি, ‘ওয়ার ডগস্’ মুক্তি পেতে না পেতেই আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। টড ফিলিপ ১৯৯৩ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ২২ এবং তখনও যিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সিনেমার ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নরত, সেই সময়ে পাঙ্ক সিঙ্গার নামে খ্যাত জিজি অ্যালিনকে নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে  সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। নির্মাণ করেছেন ‘ওল্ড স্কুল’, ‘স্টারস্কি অ্যান্ড হাচ’ এর মতো কমেডি এবং ইতোমধ্যেই কমেডি নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তার কোনো ছবি এখন মুক্তি পেলে দর্শক বেশ আগ্রহ সহকারেই তার ছবি দেখতে যান। তার উপর ‘ওয়ার ডগস্’ নির্মিত হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে বুশ প্রশাসনের কাছে  দুজন অস্ত্র সরবরহকারীর কর্মকান্ডকে ঘিরে।  ছবির দুই প্রধান চরিত্রের (ইফরাইম ডিভরোলি ও ডেভিড পাকোজ) বাস্তব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে ছবিটি। যারা ২০০৭ এ এই অস্ত্র বিক্রি বাবদ তারা ৩০০ কোটি ডলার উপার্জন করে। যাদেরকে পেন্টাগন খুব কৌশলে নিয়োজিত করেছিলো।

ছবির এক ধারাভাষ্যে জানানো হয় যে, যুদ্ধ একটি বেশ বড় ধরণের লাভজনক ব্যবসা। ছবির হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় একেক জন সেনা নিয়োগে খরচ পড়ে ১৭,৫০০ ডলার এবং ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে কম করে হলেও দুই লাখ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিলো। গ্রীষ্মপ্রধান সেসব দেশের সেনাবাহিনীকে এয়াকন্ডিশনার সরবরাহ করতে হয়েছে তার জন্যেই প্রতি বছর আমেরিকাসহ যুদ্ধে লিপ্ত সরকারগুলোর খরচ করেছে সাড়ে ৪শ কোটি ডলার। ছবির ভিডিও ফুটেজে বুশ প্রশাসনের নানা কর্মতৎপরতা দেখানো হয় এবং কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে একটা অর্থনীতি। যারা এর ভিন্ন কিছু বলে, তারা বড় ধরণের একটা স্টুপিড’।

দুটো চরিত্র ইফরাইম এবং ডেভিডকে নিয়ে ছবির গতি এগিয়ে যায়। অস্ত্র ব্যবসার মধ্যে দিয়ে তাদের দিন বেশ এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু এর মাঝে বাঁধ সাজে ডেভিডের অন্তঃসত্তা বান্ধবী লিজকে নিয়ে। কারণ লিজ খুব কড়াভাবেই ইরাক যুদ্ধবিরোধী একজন নারী। ফলে ডেভিডকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় লিজের কাছে। সে জানায় কিছু চাদর বিক্রির কনট্রাক্ট নিয়েছে সে, সরকারের সঙ্গে। যদিও ছবির নায়ক ডেভিডকে, ছবির শুরুতেই দেখা যায়, সে-ও একজন যুদ্ধবিরোধী মানুষ, কিন্তু তাকে অস্ত্র বানিজ্যে জড়িয়ে পরিচালক যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, ডেভিড মূলত যুদ্ধ বিরোধী হলেও, অর্থ বিরোধী নয়। আসলে, ছবিটি ২০০৭-২০০৮ সালের দিকে, বুশ প্রশাসনের সেই সময়কে নির্দেশ করে- যে সময়ে, ইরাক-আফগানিস্তানে যুদ্ধের সুযোগে অনেকে ভূঁইফোড় ধনী হবার চেষ্টায় অস্ত্র ব্যবসায় নিজেদের নিয়োজিত করেছিলো।

স্যাটায়ার ধারায় নির্মিত হলেও, ছবির পরিচালক অনেক সত্য প্রকাশ করে দেন ছবির গল্পের মধ্যে দিয়ে। আরো একটা বিষয় হলো, ছবিতে ইফরাইম আর ডেভিড, অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে শুধু যে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলে তা নয়, দুজন ট্যাক্সও ফাঁকি দিয়ে চলে। বিশেষ করে, ডেভিড তার বান্ধবীকে খুশি রাখার জন্য যতটা বিলাসী হওয়া যায় তার জন্যে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে চলে। যাইহোক ছবিতে, যত বিনোদনের মাধ্যমেই তাদের কাহিনী দেখানো হোক না কেনো, বাস্তবে, ট্যাক্স ফাঁকিসহ নানা কারণে ইফরাইমের চার বছরের জেল হয় এবং ডেভিডকে সাত মাসের জন্য গৃহবন্দী হতে হয়। ছবিতে সেসব দেখানোর প্রয়োজন পড়েনি। কারণ, পরিচালক টড ফিলিপের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, যুদ্ধের প্রকৃত কারণটা দেখানো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর, ‘যুদ্ধ’ নামক বিষয়টি নতুন ভাবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব যুদ্ধ এখন, শুধু যুদ্ধের জন্য যুদ্ধ হিসেবে সংগঠিত হচ্ছেনা, এসব যুদ্ধের পেছনে ‘অস্ত্র বানিজ্য’ নামে ভয়ানক এক বানিজ্যের খেলা শুরু হয়েছে। যে বানিজ্য পুঁজিবাদের অগ্রগামী ভয়ংকর এক অধ্যায়।

করপোরেটদের স্বার্থরক্ষা, বিপাকে সাধারণ মানুষ : বিশ্বায়নের সমাপ্তি!

জয়তী ঘোষ

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় নেতৃত্বে সূচিত বিশ্বায়নের যুগটি নিশ্চিত পরিসমাপ্তির দিকে যেতে থাকা নিয়ে উত্তর গোলার্ধের অর্থবিষয়ক মিডিয়ার মধ্যে মারাত্মক ভয় ঢুকে গেছে। বলা হচ্ছে, বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র এবং ল্যাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ১১টি দেশের স্বাক্ষর করা (তবে অনুস্বাক্ষর করা হয়নি)  ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (টিপিপি), যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার আলোচনায় থাকা ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টে (টিটিআইপি)।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উভয় চুক্তির আন্তরিক সমর্থক। তার ঘোষিত লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সম্প্রসারণ ও সুরক্ষিত রাখা। ২০১৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে নাইকির এক কারখানায় শ্রমিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিখ্যাত বক্তৃতায় ওবামা বলেছিলেন : ‘আমেরিকা যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিধি-বিধান লেখে,  আমাদেরকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আজ আমাদের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক শক্তিধর অবস্থানে আছে, তখনই এটা করতে হবে। … আমাদেরকে আমাদের শর্তাবলী এর ওপর চাপিয়ে দিতে হবে। আমরা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের বিধিবিধান না লিখতে পারলে কী হবে অনুমান করুন তো? চীন করবে!’

তার সময় ঘনিয়ে আসছে। তিনি কি পারবেন কংগ্রেসে টিপিপি পাস করাতে? সম্ভবত পারবেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন (ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটন) উভয়েই প্রকাশ্যে টিপিপির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। হিলারি একসময় ‘টিপিপিকে বাণিজ্যচুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে এর প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। এখন তিনি ওই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। এই পরিবর্তন এসেছে বার্নি স্যান্ডার্সের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে বামপন্থীদের আকস্মিক আবির্ভাবের প্রেক্ষাপটে।

টিপিপির ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য দেওয়া রয়েছে ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ-এর ওয়েবসাইটে : ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিধিবিধান রচনা- যে বিধিব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্যের রফতানি বাড়াতে সহায়ক হবে, আমেরিকান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, উচ্চ বেতনের আমেরিকান চাকরি সমর্থন করবে, এবং আমেকিরান মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে শক্তিশালী করবে।’ এমনটা ঘটার ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করার কারণ হলো, চুক্তিতে থাকা ১৮ হাজার আইটেমের ওপর কর কমানোর ফলে বাণিজ্যের আকার ও মূল্য ব্যাপকভাবে বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টা দিন দিন আরো কম মানুষ এটা গ্রহণ করছে। দেশজুড়ে শ্রমিকেরা চুক্তিটিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তাদের মতে, এর ফলে কম বেতনের চাকরিগুলো চলে যাবে দক্ষিণ গোলার্ধে। ফলে তাদের অবস্থা হবে আরো করুণ। এমনকি টিপিপির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একমাত্র সমীক্ষাটিতে, যেটা চালিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশন, দেখা গেছে চুক্তিটি হলে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বড়জোর এক শতাংশ রফতানি বাড়বে। অন্য একটি সমীক্ষায় আরো কম আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই চুক্তিটি হলে অংশগ্রহণকারী সব দেশেরই রফতানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে তুলনামূলকভাবে খুবই কম এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর কারণ হলো, চুক্তিটির কারণে এই দেশ দুটিতে চাকরি কমবে, বৈষম্য বাড়বে। জাতীয় অর্থনীতিতে মজুরির হার সব সদস্য দেশেই কমে যাবে।

অবশ্য টিপিপি ও টিটিআইপি সত্যিকার অর্থে বাণিজ্য উদারিকরণ চুক্তি নয়। ফলে বাণিজ্যে এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সীমিত। বরং বাণিজ্য চুক্তিটি ঘিরে এমন কিছু রয়েছে, সেগুলোই আসল ব্যাপার। সেগুলোই সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক ও বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে।

তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক : মেধা সত্ত্বের ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা সীমিতকরণ এবং বিনিয়োগকারী-সংশ্লিষ্ট বিতর্কের মীমাংসার ব্যবস্থা। এগুলো করপোরেশনের পাশাপাশি শ্রমিক ও নাগরিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু কমিয়ে দেবে সরকারি নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা। এমনকি এ ধরনের করপোরেশনের মুনাফা কমিয়ে আনার শক্তিও সরকারের হ্রাস পাবে।

বুদ্ধিবৃত্তিক মেধা সত্ত্বের ব্যবস্থাটিই সবচেয়ে মারাত্মক। ওষুধের ক্ষেত্রে এর যে বিরূপ প্রভাব কী হবে তা বলা যাক। এর ফলে নতুন ওষুধ কোম্পানির আবির্ভাবের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কেবল জরুরি ক্ষেত্রেই নতুন কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়ার অবকাশ থাকবে। এমনকি সব ওষুধ আমদানিও করা যাবে না। আবার বিদ্যমান ওষুধগুলোর সামান্য কিছু পরিবর্তন করে বাজারজাত করার সুযোগও থাকবে না। বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ, এইডসের মতো রোগের ক্ষেত্রে একচেটিয়া বাজারের সৃষ্টি হবে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে, সব দেশে এসব ওষুধ পাওয়ায় যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, দাম আকাশচুম্বি হওয়ায় ওষুধ চলে যাবে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আসবে কড়াকড়ি। কেবল প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই টিকে থাকতে পারবে।

এসব ব্যবস্থা উদ্বেগের বিষয়। কারণ এর ফলে সরকারের ওপর পর্যন্ত খবরদারির সুযোগ পেয়ে যাবে করপোরেশনগুলো। কোনো দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় পর্যন্ত বাতিল করে দিতে পারবে দূরের কোনো দেশের ট্রাইব্যুনাল। করপোরেশনগুলোর প্রতিষ্ঠিত আদালত গোপন প্রমাণ নিয়ে গোপন ও রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে শুনানির আয়োজন করতে পারবে। করপোরেশনগুলোর মুনাফার অধিকারের কাছে নাগরিকদের অধিকার কোনোই মূল্য পাবে না।

টিপিপি ও টিটিআইপি’র এসব বৈশিষ্ট্য জনসাধারণের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লে সেগুলো প্রতিরোধের কর্মসূচি ঘোষিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে। তবে তারা যতটুকু জেনেছে, তাতেই বাণিজ্য উদারিকরণের নামে একটি বিরূপ ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বাণিজ্য উদারিকরণ আসলে করপোরেশনের স্বার্থে, শ্রমিকদের জন্য নয়, বিশেষ করে ইতিহাসের যে যুগে চাকরি নিশ্চিতকরণই সবার জন্য সবচেয়ে বেশি দামি বিষয় হয়ে পড়েছে। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়নের এসব বৈশিষ্ট্য যদি হুমকির মুখে পড়ে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণ এবং এই চুক্তিতে সই করতে ইচ্ছুক তার বাণিজ্য অংশীদারদের জনসাধারণের জন্য হবে সম্ভবত কল্যাণকরই।

খেলাপি ঋণ : তিন মাসের ব্যবধানেই ৪ হাজার কোটি টাকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। অব্যবস্থাপনা ও  ঋণের কারণে প্রতি মাসেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের বিশাল অংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত। এতে ব্যাংকিং শৃংখলা আরও ভেঙে পড়তে পারে। তারা আরও বলছেন, কিছু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই দুর্নীতি এবং অনিয়মের সাথে যুক্ত। এদের যোগসাজশে ঋণ দেয়া হয়। যার কারণে ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে খেলাপিতে রূপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে জুন পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা; যা মোট ঋণ বিতরণের ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ। গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই। জুন প্রান্তিকে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ২৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ স্বাভাবিকভাবে সামান্য কিছুমাত্রায় বিশ্বের সর্বত্র দেখা যায়। কারণ ব্যাংকিং একটি ব্যবসা। অন্য যে কোনো ব্যবসার মতো ব্যাংকিং ব্যবসাতেও সামান্য ক্ষতি হতে পারে। উন্নত বিশ্বের হিসাব মতে একটি ব্যাংকে শতকরা ১ ভাগ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ হতে পারে। এর পরিমাণ কখনও বেড়ে গিয়ে ২ শতাংশ হলে ব্যাংক সতর্কতা অবলম্বন করে। উল্লেখ্য, ব্যাংক ঋণের ওপরে যে মুনাফা ধার্য করে, তারই একটি অংশ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের ক্ষতি পোষাতে ব্যয় হয়ে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলদেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে খেলাপি ঋণের অংক রীতিমতো ভয়াবহ। সব ব্যাংক মিলে ঋণ শ্রেণীবিন্যাসিত করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। উপরন্তু, আরও ৪০ হাজার কোটি টাকার অধিক শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে; অর্থাৎ প্রদর্শিত হিসাব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এ দুটি হিসাব যোগ করলে বর্তমানে ১ লাখ কোটি টাকা শ্রেণীবিন্যাসিত হয়েছে। এর সোজাসাপ্টা অর্থ দাঁড়ায়, ব্যাংকগুলো জনগণের গচ্ছিত আমানত থেকে ১ লাখ কোটি টাকা নষ্ট করেছে। এটি জনগণের আমানতের খেয়ানত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এ সমস্যাটিকে পর্যালোচনার সুবিধার্থে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। এক. সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক এবং তা জনগণের উদ্বেগের কারণ। দুই. বেসরকারি ব্যাংকগুলো- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ সরকারি ব্যাংকের চেয়ে কম হলেও এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে।  রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংকটের প্রধান কারণ সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও অনিয়ম। এর বিপরীতে বেসরকারি ব্যাংকের সংকটের জন্য দায়ী প্রধানত আগ্রাসী ব্যাংকিং এবং সেই সঙ্গে ৭-৮টি ব্যাংকের অসাধু মালিক পক্ষের কারসাজি। সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, চেয়ারম্যান এবং পর্ষদ সদস্য নিয়োগদান করে থাকে সরকার। সরকারি ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্টের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা তথা সার্বিক গভর্ন্যান্স। ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্ট দুর্নীতিপরায়ণ ও অনিয়মবাজ হলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ধীরে ধীরে দুর্নীতিবাজ হয়ে পড়ে এবং পুরো প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বেসিক ব্যাংক। বেসিক ব্যাংক এ দেশের অন্যতম ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই ব্যাংকের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ সাধারণত দেড় শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতো। কিন্তু এই ব্যাংকটিতে সরকার যখন আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করল, তখন   তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করলে অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংকারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগদান করা হলো । এ দুটি নিয়োগই সরকার প্রদত্ত। এখন এই ব্যাংকটির শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সরকার এই দুটি নিয়োগ পরিহার করতে পারলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না বলেই ধারণা।

প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই বিগত ৫-৭ বছর যাবৎ নিয়োজিত চেয়ারম্যান, কিছু পর্ষদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষেরই অনেকে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায়ী ছিলেন বলে  ধারণা। এ কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অনবরত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণের আমানত নষ্ট হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রসারের একটি কারণ হল দুর্নীতিবাজদের ও অনিয়মকারীদের আইনি দায়মুক্তি। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টের বিধানমতে ব্যাংকের কোনো পরিচালক বা চেয়ারম্যান অথবা সম্পূর্ণ বোর্ডের দ্বারা জনগণের আমানতের ক্ষতি হচ্ছে- এমন ধারণা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব ব্যক্তিকে অপসারণ করতে পারে, এমনকি পর্ষদও ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু ওই আইনেই যোগ করা হয়েছে যে, চেয়ারম্যান, পর্ষদ সদস্য বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অপসারণ করতে পারবে না। এ কারণেই সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকবৃন্দ কোনো রকমের দায়বদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৫৬ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আর বাকি ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে ৫০ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি ঋণ। অন্যদিকে, শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ হিসাব করলে দাঁড়ায় মোট খেলাপি ঋণের ৬৪ শতাংশ। বাকি ৪৬ ব্যাংকে খেলাপি রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ না করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ও বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ শতাংশের দিক দিয়ে কমলেও পরিমাণের দিক দিয়ে বেড়েছে।

২০১৪ সালের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আলোচ্য সময়ে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। দেখা গেছে, ২০১৫ সালে কৃষি খাতে ২৮০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ঋণ বিপরীতে খাতটিতে ৪০ দশমিক শূণ্য ৬ বিলিয়ন ঋণ খেলাপি হয়েছে। বাণিজ্যিক ঋণে ১ হাজার ২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৮৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ। শিল্প ঋণে ৭৫৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৭৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতে নেয়া ৭৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৪টি খাত উল্লেখ করে খাতভিত্তিক ঋণের চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হওয়া মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে ৫ খাতে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৬৩ শতাংশ রয়েছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে বৃহৎ শিল্পে। শীর্ষ পাঁচটি খাতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বিবিধ খাতে রয়েছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, আমদানি অর্থায়নে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেবা খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং কৃষি খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ। আবাসন, রফতানিসহ বিভিন্ন ১৭টি খাতে রয়েছে ১৫দশমিক ৭০ শতাংশ।

ফারাক্কা থেকে রামপাল

আনু মুহাম্মদ ::

গত শতকের ৬০ দশকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর ওপর যখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ চলছিলো তখনই এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞও দীর্ঘমেয়াদে এই বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েই উচ্চকন্ঠ ছিলেন। কিন্তু এর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তা চালু হয়। এই বাঁধের কারণে এতো বছরে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে, বাংলাদেশের প্রধান একটি নদীর পানি প্রবাহ ভয়াবহ মাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তার ফলে এরসাথে সংযুক্ত আরও ছোটবড় নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল বহুমাত্রিক বিপর্যয়, শুধু যে এসব নদীর অববাহিকায় জীবন, জীবিকা, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই নয়, প্রতিবেশগত ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়ে জীবনমান স্বাস্থ্য প্রাণবৈচিত্রও বিপদাপন্ন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য বের করা কঠিন। এই ফারাক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে নেমে আসা আরও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, আরও পরিকল্পনাধীন আছে। এর ওপর ‘নদী সংযোগ পরিকল্পনা’  নামে যে ভয়াবহ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত- তা পুরা অঞ্চলে নদী ও নদী-নির্ভর জীবন ও অর্থনীতির ওপর মরণ আঘাত দিতে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ওপর সম্পর্কিত সকল দেশের মানুষের অধিকার অস্বীকার করে ভারত একের পর এক এসব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নিচ্ছে। আন্তজার্তিক পানি কনভেনশন অনুযায়ী এসব তৎপরতা অবৈধ, এবং বাংলাদেশের সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য ভারত দায় নিতে বাধ্য।

নদীর ওপর যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণের সুবিধাভোগী বিশ্বজোড়া নির্মাণ কোম্পানি, কনসালট্যান্ট, প্রকৌশলী, কিছু ব্যবসায়ীদের জোট গত শতকের শেষ কয়েক দশকে বিশ্বের বহুদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সবুজ বিপ্লবের  নামে নদীপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এসব কর্মসূচি নিয়েছে। এর বিরূপ ফলাফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ভাটার দেশগুলো যে বড় বিপর্যয়ের সামনে পতিত হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত বিশ্বজোড়া। উজানের দেশগুলোতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সেকারণে জোরজবরদস্তি করে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশের মতামত ও অধিকারের তোয়াক্কা না করে বাঁধ চালু করেছে, শুকনো মৌসুমে পানি আটকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে ভেবেছে এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হলে কি, ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, ঘটনা তা ঘটেনি। বরং ভারতের দিকে নতুন নতুন সমস্যা ক্রমে জমে এখন ভয়াল আকার ধারণ করেছে। এর শিকার হচ্ছে অনেক এলাকা, বিহার তার অন্যতম, এই বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিহারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এই বছরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলতে। এই দাবি বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের। কিন্তু ভারত পন্থী ও ভারত বিরোধিতার নামে পরিচালিত রাজনীতির কারণে বাংলাদেশে এনিয়ে সুস্থ আলোচনা হয়না কখনো। কিন্তু সর্বসাধারণের মনের মধ্যেই এবিষয়ে ক্ষোভ আছে। বরাবর ভারত এটি উপেক্ষা করতে চেয়েছে ‘এগুলো নিছক ভারত বিদ্বেষী রাজনীতি’ এই আওয়াজ দিয়ে।

ফারাক্কার জন্য ক্ষতি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার প্রমাণ সুন্দরবন। সুন্দরবন যেসব নদী ও শাখানদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল সেই নদীগুলো আবার গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহের সাথে সংযুক্ত। ফারাক্কা কাজ শুরুর পর থেকে নদীগুলোর রুগ্নতাপ্রাপ্তিতে তাই সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সুন্দরবনে বিপরীত থেকে সমুদ্রের নোনাপানির প্রবাহ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে যায়। এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদপত্রের রিপোর্টে বলা হয়, ‘গঙ্গা নদীর মিঠা পানি গড়াই হয়ে পশুর নদ ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হয়। ফারাক্কা বাঁধের পর পানিপ্রবাহ কমে গেছে।… মিঠা পানির প্রবাহ কম থাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে বনের মধ্যে। এ কারণে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারছে না। …বাঁধ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘনমিটার পলিযুক্ত মিঠা পানি গ্রহণ করেছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘনমিটার পানিপ্রবাহ প্রয়োজন। কম পানিপ্রবাহ থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি বনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরীগাছের বেঁচে থাকা কঠিন।’ (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি সুন্দরবনকে অনেকদিক থেকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশের জন্য শুধু নয় ভারত বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা বা দায়বদ্ধতা যদি দুদেশের সরকারের থাকতো তাহলে ফারাক্কা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও নতুন চিন্তা দেখা যেতো। কিন্তু তা না থাকার ফলে দশকের পর দশক ফারাক্কা প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি করে গেছে। একই কারণে সুন্দরবনকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা না করে বরং এর ওপর মরণ কামড় দেবার মতো একটি প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, সেটি হলো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর প্রধান উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ভারতের এনটিপিসি, এই কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারতের একটি কোম্পানি, এর জন্য ঋণ যোগান দেবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক (এরজন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ সরকার) এবং সব লক্ষণ বলছে, কয়লাযোগান দেবে ভারতের কয়লা কোম্পানি। তারমানে কাগজেপত্রে ৫০.৫০ মালিকানা ও মুনাফা দেখানো হলেও বিনিয়োগ, নানাকিছু বিক্রি, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সবকিছুতেই ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির লাভ। বিপরীতে বাংলাদেশের শুধুই ক্ষতি, সুন্দরবন হারানোর মতো অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি, বহুলক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি, কয়েককোটি মানুষের জীবন নিরাপত্তার ঝুঁকি, তারপরও ঘাড়ে ঋণ আর আর্থিক বোঝা।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সবসময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে বহুবিধ কারণে। এগুলো মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, কেননা ভারতের শাসকগোষ্ঠী একের পর এক বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক কিংবা ক্ষতিকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফারাক্কা এর একটি, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী সংযোগ পরিকল্পনা, অবিরাম সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ঋণ দিয়ে বেশি দামে জিনিষপত্র কিনতে বাধ্য করা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ চিরস্থায়ী শত্রুতার বোধে পরিণত হবে। কেননা সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা যাবেনা। বন্ধুত্ব নাম দিয়ে তৈরি কোম্পানি হবে শত্রুতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যম।

আমরা চাই না এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। সেজন্য আমরা চাই- ভারতের সরকারকে এই প্রকল্প থেকে বিরত রাখতে, ভারতের সজাগ মানুষ সরব হবেন। আমরা এখনও আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুই দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে। দুইদেশের সজাগ মানুষ জনপন্থী উন্নয়নের ধারার জন্য যৌথ লড়াই শক্তিশালী করলেই কেবল দুইদেশের মানুষের বন্ধুত্ব বিকশিত হবে।

ফারাক্কা : এবার ভারতেই তীব্র প্রতিবাদ

ম. ইনামুল হক ::

গঙ্গা নদী রাজমহল পাহাড় ভেদ করে বাংলার সমতলে প্রবেশের পরেই ফারাক্কার কাছে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করা হয়েছে। গঙ্গা নদীর প্রবাহ রোধক মোট ১০৯টি গেটসম্পন্ন এই ব্যারেজের মুখে দক্ষিণপ্রান্তে একটি ডাইভারশন রেগুলেটর আছে যা দিয়ে ৪০ হাজার কিউসেক পানি একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে ভাগিরথীতে পাঠানো যায়। গঙ্গা নদী দিয়ে আগে যেখানে ন্যুনতম ৬০ থেকে ৭০ হাজার কিউসেক পানি বাংলাদেশের দিকে আসতো, এখন এই ব্যারেজের ফলে তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ও ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী ২৭ হাজার কিউসেক পানি আসার কথা। কারণ জানা যায় চুক্তিতে ঐ পরিমাণের কথা থাকলেও অনেক সময় তা ২০ হাজার কিউসেকের কম হয়ে যাচ্ছে। বলার কিছু নেই, কারণ ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ২৭,৬৩৩ কিউসেক পানি দেবার কথা থাকলেও তা দেবার গ্যারান্টি চুক্তিতে দেয়া হয়নি। বরং চুক্তিতে বলা হয়েছে, মূল গঙ্গায় পানি ৫০ হাজার কিউসেকের কম আসলে সমান সমান ভাগাভাগি হবে।

গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা ব্যারেজ চালু হবার সময় থেকে এর পানি ভাগাভাগি নিয়ে হতাশ করার মত ইতিহাস আছে। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৮ এপ্রিল ১৯৭৫ এর চুক্তি অনুযায়ী ভারত ১১ থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নেবার অধিকারী হয় ও বাংলাদেশকে ন্যুনতম ৪৪ হাজার কিউসেক পানি দেবার গ্যারান্টি দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে পালাবদলের পরে ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে ভারত ইচ্ছামত পানি সরিয়ে নিতে থাকে। এর প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ১৬ মে ১৯৭৭ ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ করেন। এরপর ওই বছর ৫ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যুনতম ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি দেয়ার অঙ্গীকার ছিলো। পাঁচ বছর মেয়াদের ওই চুক্তি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আর বহাল থাকেনি। এরশাদ আমলে দু’বার সমঝোতা হলেও ১৯৮৮ সালের পর ১৯৯৬ পর্যন্ত কোন কিছুই ছিলো না এবং ভারত গঙ্গা নদীর পানি প্রায় সবটাই প্রত্যাহার করে নিয়ে যায়।

গঙ্গা নদী তার উৎপত্তি স্থল থেকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া পর্যন্ত প্রায় ২৫৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। ভারত, চীন, নেপাল ও বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর অববাহিকা প্রায় ১০,৮৭,৩০০ বর্গ কিালোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৪০০ মিলিয়ন টন পলি এসে পড়ে। তবে গাঙ্গেয় বদ্বীপের মাটিতে চাষকৃত জমির ধুয়ে আসা কাদার পরিমাণ বেশী। গঙ্গা নদীর বন্যায় যে পানি আসে তা আমাদের খাল বিল পুকুর জলাশয় পূর্ণ করে, সাগরতট অঞ্চলের মিষ্টি পানির পরিবেশ রক্ষা করে এবং মহীসোপানে ইলিশ ও চিংড়ি মাছসহ অজস্র মূল্যবান প্রজাতির মাছের প্রজননে সাহায্য করে। তাই গঙ্গা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। এই নদীর অববাহিকায় সুদূর অতীত থেকে মানব সভ্যতা ও চাষবাস গড়ে ওঠায় চাষের জমি থেকে জৈব পদার্থ ধুয়ে এসে নদীর মাধ্যমে বাংলার বদ্বীপে জমা হয়েছে। এই পলি আমাদের ভূমির উর্বরতা বাড়ায়, সাগরে জমে নতুন ভূমি পরিবৃদ্ধি করে। জৈব পদার্থ মাটিকে উর্বর করেছে ও সাগরের মোহনায় জমে জৈব গ্যাসের আধার সৃষ্টিসহ মাছের খাবার তৈরীতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলছে।

সম্প্রতি ২০১৬ সালের বন্যায় বিহার, উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার গত ২৩ আগস্ট দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দেখা করেন ও বলেন, বিহারের ফি বছর বন্যার মূল কারণ ফারাক্কা ব্যারেজ। এই ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে এর উজানে পলি জমে জমে নদীর তলা উঁচু হয়ে গেছে, ফলে বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পেরে বন্যা বাড়ছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফারাক্কা ব্যারেজ তুলে দেবার দাবী জানান। ব্যাপারটি আসলেই সত্যি। এই ব্যারেজ নির্মাণের ফলে ভাগিরথীর মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি পেয়ে হুগলী নদী ও কলকাতা বন্দরের উপকার হচ্ছে বটে, কিন্তু এর উজানে বিহার বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা জাতিসংঘের পানি প্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহে বাধা দেবার ঘোর বিরোধী। এই কনভেনশন আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানি নায্যতার সাথে ব্যবহার করার ও ভাটির দেশের কোন ক্ষতি হোক এই রকম ব্যবহার করার ব্যাপারে নিষেধ করা আছে। ভারত অবশ্য সবসময় বলে আসছে সে এমন কাজ কোন কাজ করবে না যা বাংলাদেশের ক্ষতি করে। কিন্তু ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি ও গজলডোবা ব্যারেজের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি বিনা দ্বিধায় সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের জনজীবন ও অর্থনীতির অপূরনীয় ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ নদী নালার দেশ, বন্যার দেশ। গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজ তুলে দেবার দাবী আসার পর এক ধরনের প্রচারণা চলছে যে, এর ফলে বাংলাদেশে বন্যা বাড়বে। বন্যা বাংলাদেশে অভিশাপ নয় বরং আশীর্বাদ। বাংলার মানুষ বন্যার সাথে বসবাস করতে জানে। পাকিস্তান ও ভারতের বন্যায় শত শত মানুষ মরে, বাংলায় তেমন প্রাণহানি হয় না। তাছাড়া গঙ্গা নদীর বামতীরে গোদাগাড়ী থেকে রাজশাহী, পাকশী, পাবনা হয়ে যমুনার তীর পর্যন্ত বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ আছে। গঙ্গা নদীর বামতীরে বড়াল নদের উৎসমুখে একটি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী রেগুলেটর ও বাদাই নদীর ভাটিতে একটি নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণকারী রেগুলেটর আছে। গঙ্গা নদীর ডানতীরে মহিশকুন্ডি থেকে রায়টা, ভেড়ামারা, তালবাড়িয়া, কুষ্টিয়ার হয়ে গড়াই নদীর তীর ধরে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ আছে। গড়াই নদীর পূর্বপার থেকে শিলাইদহ, হাবাসপুর, পাংশা, রাজবাড়ী গোয়লন্দ হয়ে গঙ্গা নদীর ডানতীরে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ আছে। এভাবে নদীর ভেতরের চরাঞ্চল বাদে সবটাই বন্যামুক্ত থাকে। তাই বন্যাজনিত অকারণ ভয়ের আশংকা নয়, বরং ফারাক্কা ব্যারেজের উপকারিতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মধ্যে উঠে আসা দ্বন্দ্বের সুযোগে গঙ্গা নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহ অক্ষুন্ন রাখার জন্যে আমাদের সরকারের দাবী তোলা উচিত।

ভারত একটি বড় দেশ, বরং বলা যায় অনেকগুলি দেশের সমষ্টি। গঙ্গা নদীর অববাহিকায় চীন, নেপাল, বাংলাদেশসহ ভারতের যেসব রাজ্য আছে তাহলো, উত্তরখন্ড, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গ। এদের কোন কোনটি জনসংখ্যায় বাংলাদেশের চাইতেও বড়। এরা প্রায় সবাই গৃহস্থালী বা সেচের কাজে বা শহরাঞ্চলে পানি সরবরাহের কাজে গঙ্গার পানি ব্যবহার করে। তবে ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বাংলাদেশকে না দিয়ে কলকাতা বন্দর ও হুগলী নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করা গেলেও পশ্চিমবঙ্গে ভাগিরথী নদী তীরে ভাঙ্গণ বেড়েছে। ভাগিরথী নদী প্রাকৃতিক ভাবে গঙ্গার পানি না পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছিলো, এখন কৃত্রিমভাবে পানি প্রবেশ করানোয় এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিহারে গঙ্গার উপনদী গন্ডক, কোশী ও ফুলহার নদীর অববাহিকায় বিশাল নিম্নাঞ্চল আছে ও সেখানে প্রতিবছর বন্যা হয়। এখন ধারনা করা হচ্ছে, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে গঙ্গা নদীতে পলি পড়ে নদীর তলা উঁচু হয়েছে ও নদীর নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। এই কারণে বন্যার পানি দ্রুত সরতে পারছে না। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী এই কথা বলেই ফারাক্কা ব্যারেজ তুলে দেবার কথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গ এই ব্যারেজে রেখে গঙ্গার পানি বাংলাদেশকে না দিয়ে নিজেরা নিতে চায়।

ফারাক্কা ব্যারেজ ভারতের তৈরী; কাজেই এব্যাপারে যা করণীয় ভারতই করবে। তবে আমরা গঙ্গা নদীর প্রবাহ সারা বছর বিনা বাধায় চলতে দেবার দাবী জানাই। শুধুমাত্র গঙ্গা নদী নয়, ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন নদীসহ পৃথিবীর সকল আন্তর্জাতিক নদীগুলির প্রবাহ সারাবছরব্যাপী বিনা বাধায় চলতে দেয়া উচিত। নদী তীরবর্তী দেশগুলির মানুষরা ওই নদীর পানি ব্যবহার করবে নায্যতার সাথে। জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের পানি প্রবাহ কনভেনশনের ৭.১ ধারা অনুযায়ী- আন্তর্জাতিক নদীর পানি নায্যতার সাথে ব্যবহার বলতে বোঝায় এমনভাবে ব্যবহার, যাতে ভাটির দেশের মানুষের কোন ক্ষতি না হয়। ওই কনভেশনের ৭.২ ধারায় বরং একথাও বলা আছে যে, উজানের দেশের পানি ব্যবহারের ফলে ভাটির দেশের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যবস্থা নিতে হবে। আসলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা দিলে সাময়িকভাবে কেউ কেউ উপকার হলেও সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয় অনেক বেশী।