Home » সম্পাদকের বাছাই (page 33)

সম্পাদকের বাছাই

রামপাল প্রকল্প নিয়ে সরকার এতো অনমনীয় কেন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. গুরুভার একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। বাংলাদেশের উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ নাকি শাসকরা? প্রশ্নটি এ কারণে যে, দেশের উন্নয়ন দর্শনটি আসলে কি? পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ফ্লাইওভার নির্মান- তাহলে মেগাসাইজের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাহবা পেতেই পারে। কিন্তু বড় হিসেব হচ্ছে, এই উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ আছে, নাকি আছে লুটপাট? সেজন্যই কি ক্ষমতায় থাকাকালে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষা, শব্দ উচ্চারন বদলে যায় উন্নয়ন চিৎকারে।

ষাটের দশকে সামরিক একনায়ক আইয়ুব খান উন্নয়ন করেছিলেন, তৎকালে পাকিস্তানের উভয় অংশে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু খোদ পশ্চিম পাকিস্তানেই এই উন্নয়নের বিরুদ্ধে ঝড় উঠেছিল। এমন উন্নয়ন স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে এদেশ দেখেছে। ঢাকা কথিত তিলোত্তমা হয়েছে। রাস্তঘাট, ব্রীজ-কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়নের বন্যা বয়ে গেছে। তারপরেও এরশাদের পতন ঘটেছে গণআন্দোলনে। কারণ ঐসব স্বৈরশাসকদের কথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ ছিল না, ছিল একটি দালাল গোষ্ঠী ও অবারিত লুটপাট।

আশির দশকে লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে স্বৈরশাসকরা রাজনৈতিক বৈধতার সংকট কাটিয়ে উঠতে মেগা সাইজের সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসব উন্নয়ন দায় বা লায়াবিলিটিজে পরিনত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং মডেলের উন্নয়ন প্রচার করে যারা এদেশকে সমকক্ষ করার কথা বলছেন, তারা আপাত তৃপ্তি পেতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ঐসব দেশে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট থাকলেও উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। আছে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন।

এই ধরনের উন্নয়ন দর্শন বা উন্নয়নে একটি অন্তর্নিহিত অসৎ লক্ষ্য থাকে। সেটি হচ্ছে, একটি লুটেরা পুঁজিপতি শ্রেনী সৃষ্টি করা। এ ধরনের পুঁজি শক্তিমানকে আরো শক্তিশালী করে তোলে এবং দালাল-দলদাস শ্রেনীকেও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মূল কারণ হচ্ছে, ক্ষমতা বলয়কে সংহত রাখা। এই পুঁজির মালিকরা এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, তারা দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কোন প্রকার আয়-বাণিজ্য না করেও জনগনের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারে। কারণ ক্ষমতা বলয়ের বাইরের জনগোষ্ঠি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে ধুঁকতে থাকে।

উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ না থাকলে ঐ উন্নয়ন জনস্বার্থ নিশ্চিত করে না। করে না বলেই পৃথিরীর দেশে দেশে শাসকদের উচ্চাভিলাষী অনেক পরিকল্পনা জনগন প্রত্যাখ্যান করছে এবং করেছে। ২০০৬ সালের ২৬ আগষ্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ি এরকম উদাহরন সৃষ্টি করেছিল। সে সময়ে এশিয়া এনার্জির সাথে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সম্পাদিত উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের মত গণবিরোধী, অশুভ চুক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল ফুলবাড়ির সবস্তরের মানুষ।

ফুলবাড়ি আন্দোলন অচিরেই গণবিদ্রোহে রূপ নিয়েছিল। এশিয়া এনার্জির পক্ষে বিএনপি সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে হতাহত হয়েছিল অনেক মানুষ। এখানেই শেষ ছিল না, তারা সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সাধারন মানুষের ওপর। এই দুস্কর্মে সরকার সাথী পেয়েছিল স্থানীয় সংসদ সদস্যকে, যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। তারপরেও গণমানুষের রুখে দাঁড়ানোর কারণে সরকার বাধ্য হয়েছিল চুক্তি বাতিল করতে। সেজন্যই রক্তাক্ত ফুলবাড়ি আন্দোলন দেশের সম্পদ রক্ষায় হয়ে উঠেছে স্মারক দিবস।

রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে ভারতের সাথে একটি অসম চুক্তি এবং সুন্দরবন ধংসের আশঙ্কা থেকে চলতি বছর ফুলবাড়ি হত্যা দিবস হয়ে উঠেছে আরো প্রাসঙ্গিক। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হচ্ছে। তৈরী হচ্ছে গণআন্দোলনের ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিকভাবেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফুলবাড়ির ক্ষেত্রে গণআন্দোলন ও বিশেষজ্ঞ মতামত সে সময়ের সরকার আমলে নিতে চায়নি। বর্তমান সরকারও রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে কোন দোহাই মানছে না।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ির কয়লা আহরনের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও বিপদের আশঙ্কার মত রামপাল প্রকল্পের শুরুতেই সুন্দরবন ধংসের আশঙ্কা দানা বেঁধেছে। এক্ষেত্রে সকল সুপারিশ ও বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। কারন সব উন্নয়ন প্রকল্প মানেই যে জনস্বার্থ সংরক্ষণ, সেরকম কোন ধারনাই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। বরং অভিযোগটি প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে যে, সুন্দরবন ধংসের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে বর্তমান সরকার।

দুই. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরপর দুই মেয়াদ ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে নিশ্চিত করেছেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের কোন ক্ষতি করবে না। তার অবস্থানের কথা সাফ জানিয়ে দিয়ে বলেছেন, সরকার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করবেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনকে সরকার প্রধান দেখছেন, দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা, বিনিয়োগকে থামানোর চেষ্টা হিসেবে। গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই তিনি সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

অন্তর্নিহিত কারন কি অন্যত্র? রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির গুরুত্ব কি শুধুমাত্র ১৩৪০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ? অনেকে ধারণা করছেন যে, এর পেছনে কাজ করছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুটিও। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে প্রভাব বলয় বিস্তারে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিযোগিতা, সেখানে প্রকল্প এলাকাটি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হতে পারে আন্তর্জাতিক শক্তিমানদের জন্য একটি কৌশলগত এলাকা। এজন্যই আন্দোলন, প্রতিবাদ, সমীক্ষা, সুপারিশ- সবকিছুই উপেক্ষিত হতে চলেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে সরকার ছাড় দিতে রাজি নয়।

চলতি বছরের ১২ থেকে ১৪ মার্চ সুন্দরবনের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ এর যৌথ নিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুন্দরবন মৈত্রী’ নামে তিনদিন ধরে চলা এই মহড়ার ঘোষণায় বলা হয়েছিল, সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করা, পুরো এলাকায় উভয়পক্ষ থেকে টহল বৃদ্ধি, বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্র রুটে সন্দেহভাজন নৌযানে হানা দেয়া। মহড়ার দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় পক্ষ হাড়িয়াভাঙ্গা ও রায়মঙ্গল নদীতে নৌযানে হানা দেয়ার মহড়াও অনুষ্ঠিত করে।

রামপাল প্রকল্পে ভারতের সহায়তা এবং এই জয়েন্ট ভেঞ্চার কি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থে? সুন্দরবনের মত বিশ্বঐতিহ্য ও প্রতিবেশগত সংবেদনশীল অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে সহযোগিতার বিষয়টি অনেক আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের সাথেও যুক্ত বলে ধারণা করা হয়। এখানে সহযোগিতা ছাড়াও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান ও উন্নয়নে ভারতের ১৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিপোর্টগুলি ছিল চোখে পড়ার মত।

বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের অন্যতম ছিল পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর। এখানে বিনিয়োগ দৌড়ে আছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড। এর আগে সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মানে সম্ভাব্যতা যাচাই ও ৯৯% তহবিল দেয়ার চীনা প্রস্তাব থেকে সরকার সরে আসে। এরপরে পায়রা বন্দর এবং জাপানী বিনিয়োগে মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যাপারে সরকার গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে পায়রা বন্দর উদ্বোধন করা হয়েছে।

তিন. এই বিদ্যুতকেন্দ্রটির আরেকটি হিসেব- ব্যবসায়িক লাভালাভ। এটি ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে আমদানীকৃত কয়লা আসবে সুন্দরবনের নদীপথে। এতে খরচ কম, লাভ বেশি এবং তা অবশ্যই ভারতের ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে, বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে এখানে ভারতীয় বিনিয়োগের মস্ত ক্ষেত্র তৈরী হবে। কারণ মংলায় রয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, যেটি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত লোভনীয়। সুতরাং বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মান সম্পন্ন হলে ঐসব বিনিয়োগের জন্য এনে দেবে মহার্ঘ সুবিধা।

ইতিমধ্যে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন ঘোষিত এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে শিল্প, কলকারখানা স্থাপনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। মংলা, রামপাল, শরনখোলা ও মোড়েলগঞ্জে ভারী শিল্প স্থাপনে জমি কেনার হিড়িক পড়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রতাপশালী নেতা, দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা কিনে নিয়েছেন সংলগ্ন এলাকার প্রায় ১০ হাজার একর জমি। ১৫০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকার মধ্যে ঢালাওভাবে শিল্প স্থাপনে ছাড়পত্র দেয়া প্রসঙ্গে পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর বক্তব্য চমৎকৃত করে দেয়ার মত। তার মতে, ‘‘দেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার, আবার শিল্পও দরকার। আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি’’।

মন্ত্রীকে স্মরণ করানোর প্রয়োজন পড়ে না, কারণ রাষ্ট্রীয় গেজেট তিনি নিশ্চয়ই পড়েন। রাষ্ট্রপতির পক্ষে উপসচিব স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে, “প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট ও পরিবর্তন হবে এমন কোন কাজ করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দুষনকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না”। প্রসঙ্গত: এর আগে বন বিভাগ সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা বনের বর্ধিত অংশ বা প্রভাবিত প্রতিবেশ ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে বসে আছে।

চার. ২০১২ সালে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের প্রস্তুতি ও পরবর্তীকালে বিএনপি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের দু’চারটি বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, পাছে ভারত অসন্তুষ্ট হয়। গেল কিছুদিন ধরে বিএনপি হঠাৎ করে সরব হয়ে উঠেছে। এখন তারা মনে করছে, এটি দেশবিরোধী প্রকল্প এবং বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবন ধংস হয়ে যাবে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানকে দেশবিরোধী ও গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, সুন্দরবনকে ধংসের চক্রান্ত সফল হতে দেয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আবুল মকসুদ যথার্থই বলেছেন, “বিএনপি তাদের রাজনৈতিক কারণে প্রকল্পের যেটুকু বিরোধিতা করছে, তা একেবারে দায়সারা এবং একধরনের চাতুর্য’’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আকমল হোসেন বলেছেন, “ ফুলবাড়ির ঘটনায় বিরোধীদলও ভাল কিছু কথা বলেছিল, এখনকার বিরোধীদলও সেই সীমাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এসবের মূল্য নেই। এশিয়া এনার্জি, এনপিটিসি-দুটোই বিদেশী কোম্পানী। তখনকার বিএনপি সরকার এশিয়া এনার্জিকে বিশেষ ক্ষমতা ও সহায়তা দিয়েছে। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে শুধু এনপিটিসি নয়, ভারতকে একের পর এক সুবিধে দিয়ে চলেছে।

বাম ঘরানার বিভিন্ন সংগঠন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সুশীল সমাজ যখন রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে জনসমর্থন তৈরী করছেন, আন্দোলন সংগঠিত করছেন, আন্দোলনকে তীব্র করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ও আন্দোলনের সমর্থন দান মূলধারার আন্দোলনকারীদের সমস্যা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে অতীতে জামায়াতের ডাকা হরতালে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি-কারণ জামায়াত-বিএনপি জোটসঙ্গী। এর ফলে সুবিধে হয়েছে সরকার পক্ষের। এটা নিয়ে এখন নানা ব্লেম গেম খেলা হবে।

গ্যাসের দাম : করপোরেটদের স্বার্থরক্ষা, কোপানলে সাধারণ মানুষ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

গ্যাসের দাম বাড়ানোর সকল আয়োজন সম্পন্ন। যে কোন সময়ে মূল্যবৃদ্ধির খাঁড়া নেমে আসতে পারে নিরীহ গেরস্ত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর। বাংলাদেশ সরকারের একটি এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আছে। সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম বাড়াতে চাইলে এই কমিশনের কাজ হচ্ছে নাম-কা-ওয়াস্তে একটি গণ শুনানীর আয়োজন করা। শুনানীতে মতামত যাই থাকুক, সরকারের এজেন্ডা কমিশন বাস্তবায়ন করে থাকে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কারণ অর্থমন্ত্রী আরো এক ধাপ এগিয়ে, তিনি বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিতে চান।

গ্যাস খাতের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলি বিইআরসি’র কাছে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ আগষ্ট পর্যন্ত চলেছে গণশুনানী। অংশ নিয়েছেন, মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবক ও শেয়ারগ্রহীতারা, ভোক্তা অধিকার সংস্থা, জ্বালানী বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও সুশীলবৃন্দ। পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তির পরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কতটা যুক্তিহীন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যতই যুক্তিহীন হোক, বিইআরসি দাম বাড়াবেই। সুতরাং এক যাত্রায় এবারেও ফল ভিন্ন হয়নি।

অতীত-বর্তমান, সবসময় একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে সকল শাসকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনকে হিসেবে গোনেন না। এইজন্য তাদের পদক্ষেপ প্রায়শ: জনস্বার্থ বিরোধী হয়। এরা বাজার নিয়ন্ত্রন করে না, বদলে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দেয়। নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য বা নাগরিক অধিকার নিয়ে তামাশা করতে থাকে। সারা দুনিয়ায় তেলের দাম অর্ধেকে নেমে আসলেও অতীতে দেয়া ভর্তুকি আদায়ের নামে দাম না কমিয়ে জনগনের পকেট কাটতে থাকে। কোন সন্দেহ নেই, বাজার অর্থনীতির সরকার পরিচালিত হয় মুনাফার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সবরকম কৌশল প্রয়োগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির সামর্থ্য শূন্য করে দেয়া।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধানত: যে দুটি কারণ দেখানো হয়েছে তা হচ্ছে- এক. সরকারী নির্দেশনা; দুই. ভবিষ্যতে যে এলপিজি আসবে তার সাথে মূল্য সমন্বয়; সোজা কথায়, সরকারের প্রস্তাবে দাম বাড়ানোর সুযোগ না থাকায় দ্বিতীয়টি জুড়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে শুনানীকালে প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারী নির্দেশনার লিখিত কোন পত্র দেখাতে পারেনি। মৌখিক নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চমূল্যে এলপিজি আমদানী করার যুক্তিও ধোপে টেকেনি। কারণ এটি করলে উচ্চ মুনাফা যাবে ব্যবসায়ীদের পকেটে। এর ফলে বড় শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষতির সম্মুখীন না হলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারন মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।

১৪ দলীয় সরকারের শরীক ও মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন মনে করছেন, জঙ্গী ও সাম্প্রদায়িক সমস্যা মোকাবেলায় দেশব্যাপী কর্মসূচি চলাকালে হঠাৎ গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি এর প্রতিবাদ করে বলেছেন, জোটের অভ্যন্তরে কোন আলোচনা ছাড়াই আওয়ামী লীগ কেন এরকম একক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা পরিষ্কার নয়। দাম বাড়ানো হলে তার দল এর বিরুদ্ধে কর্মসূচি দেবে। প্রথম যখন মেননকে মন্ত্রী করা হয়, তার দলের সাথে আলোচনা না করায় তিনি মন্ত্রীত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন, নির্বাচনের পরে মন্ত্রী আছেন। নানা কারনে প্রভেদ করা দুঃসাধ্য যে, তিনি আওয়ামী লীগের, না শরীক দলের। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বা জনগুরুত্বম্পূর্ণ কোন কোন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ১৪ দলকে সাথে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে- রাশেদ খান মেনন কি সেটি বলতে পারবেন?

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী জানান দিয়েছেন যে, আর কোন গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না। পর্যায়ক্রমে সংযোগ বন্ধও করে দেয়া হবে। এই ধরনের বক্তব্য এবারেই প্রথম নয়। সরকারের বিভিন্ন মহল, খোদ প্রধানমন্ত্রীও আবাসিক গ্যাস সরবরাহ নিয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এবারে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মূল কোপানলে পড়েছেন আবাসিক ব্যবহারকারীরা। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ারও আশঙ্কাও তাদের ক্ষেত্রে।

দাম বাড়ানোর প্রাক্কালে আবাসিক সরবরাহ নিয়ে অসত্য বক্তব্যটি এরকম- ‘‘এত কম দামে পৃথিবীর কোথাও এমন সুবিধা পাওয়া যায় না’’। অথচ বাস্তব পরিস্তিতি হচ্ছে, পৃথিবীর সকল দেশে জাতীয় সম্পদের ওপর অধিকার জনগনের। এ থেকে সুবিধাভোগের অধিকারও তাদের। আবাসিক গ্যাস ব্যবহারের যে হিসেব দেয়া হয় সেই তথ্যও সঠিক নয়। নতুন সংযোগ না দেয়ার ছুতো তৈরী করতে বাড়িয়ে বলা হয়। আবার আবাসিক ব্যবহারের নামে গোপনে দেয়া হয় বাণিজ্যিক সংযোগ। এটিকে আলাদা করার উদ্যোগ বা আবাসিকে মিটার স্থাপনের বিষয়ে সরকার কখনই মনোযোগী নয়।

গাড়িতে সিএনজি দেয়া হয়েছে, খরচ কমেছে বিত্তবানদের। সিএনজির ব্যবসা ক্ষমতাসীনদের সাথে কোন না কোনভাবে সম্পর্কিত ও তাদের কুক্ষিগত। সেজন্য এ ক্ষেত্রটি অর্থমন্ত্রী বা সরকারের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অথচ রাজধানীতে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, যানজটসহ নানা সংকট সৃষ্টির অন্যতম কারন হচ্ছে- সিএনজি ব্যবসার সম্প্রসারণ। এইসব সামাল দিতে জনগনের অর্থ ব্যয় করে সরকার ফ্লাইওভার নির্মান করছে। এর ঠিকাদারী, পার্সেন্টেজ-সব ঢুকে যাচ্ছে চিহ্নিত কতিপয়ের পেটে। নগর পরিকল্পনাবিদরা গাড়ি নিয়ন্ত্রনে সিএনজি ব্যবহার বন্ধে সুপারিশ করেছেন বার বার। কিন্তু সরকারের দৃষ্টি রয়েছে পাইপলাইনের ওপর।

সরকার এই খাতকে রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে জ্বালানী দরপতনের সুবিধা জনগন পাচ্ছে না। মুনাফা অর্জনের কৌশল হিসেবে কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে ট্যাক্স, ভ্যাট আদায়ের সরকার নতুন নতুন কৌশল বের করছে। এভাবে জ্বালানী খাত হয়ে উঠছে জনগনের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে শোষনের অন্যতম হাতিয়ার। বাজার চাহিদা অনুপাতে জ্বালানী সরবরাহ আছে কিনা এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার সাথে মিলিয়ে জ্বালানী নিরাপত্তার ভিত্ গড়ে ওঠে। কিন্তু এখানে জনগনের জ্বালানী ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি সরকার মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না।

সরকার করপোরেট স্বার্থরক্ষা করে। জনস্বার্থের কথা মুখে বললেও কোন সরকারই রক্ষা করে না। প্রমান হচ্ছে, বিদেশী কোম্পানীর কাছ থেকে গ্যাসক্ষেত্র ধংসের ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকার ব্যর্থ এবং এ নিয়ে বিশেষ কোন মাথাব্যাথাও নেই। বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে ন্যূনতম দামে গ্যাস বিক্রি করা হলেও আবাসিক গ্রহীতারা হয় সরকারের টার্গেট। ১৯৯৭ সালে মাগুরছড়া ও ২০০৫ সালে টেংরাটিলায় অক্সিডেন্টাল ও নাইকো’র অবহেলার কারণে বিপুল গ্যাসসম্পদ ধংস হয়।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ গবেষণায় দেখিয়েছেন, অক্সিডেন্টাল ও নাইকোর কাছ থেকে বাংলাদেশের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত ৪৫ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, নাইকো’র কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার আদায় করা সম্ভব। ন্যূনতম এক বিলিয়ন আদায় করার আইনী ভিত্তি তো এখনই রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে সরকার নীরব, বদলে সরব আবাসিকের গ্যাসের দাম বাড়ানো ও নতুন সংযোগ না দেয়ার ব্যাপারে।

জাতীয় স্বার্থের উল্টো চিত্রটি হচ্ছে, নাইকো’র পাওনা মিটিয়ে দিতে সরকারের অভ্যন্তরে গোপন ফাইল চালাচালির ঘটনা অতি সাম্প্রতিক। সরকারের উদাসীনতায়ই আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকো’র কাছে মামলায় হেরেছে বাংলাদেশ। যদিও নাইকো নিজ দেশে দন্ডিত এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়েছে। অক্সিডেন্টাল থেকে ইউনোকল শেয়ার নিয়ে বেচে দিয়েছে শেভরনের কাছে, পার পেয়ে সরকারের নীরব উদাসীনতায়, নাকি এর ভেতরেও রয়েছে ‘রহস্য’। শুধুমাত্র এদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করা গেলে সারাদেশে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিকে বিরোধিতা করতে গিয়ে বিএনপি সীমাবদ্ধ আছে বিবৃতির মধ্যে। এরকম জনঘনিষ্ঠ ইস্যুতে আন্দোলন করার বিশ্বাসযোগ্যতাও তার নেই। কারণ এ পাপ তো তারাও করেছে ক্ষমতায় থাকতে। তাছাড়া বিএনপি সবকিছুর মধ্যে নির্বাচন দেখছে, যেন নির্বাচন সকল সমস্যার সমাধান এনে দেবে। এক্ষেত্রে দু’দলের মধ্যে ফারাক শুধু ক্ষমতায় থাকা না থাকা নিয়ে। ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিও করপোরেট স্বার্থের ধারক-বাহক হিসেবে একই কাজ করতো। অন্যদিকে, ছোট-খাট কিছু দল, সিপিবি-বাসদ, বাম মোর্চাসহ কয়েকটি সংগঠন গ্যাসের এই অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করছে, আন্দোলন সংগঠিত করারর চেষ্টা করছে, হরতাল কর্মসুচির কথা বলছে, কিন্তু সরকার কোন কিছুরই পরোয়া করছে না।

জনগনের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা সবসময়ই প্রশ্নবোধক। এজন্যই যেকোন সময়েই বেড়ে যায় গ্যাস-বিদ্যুৎের দাম। নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য উর্ধগতির দিকে। চালসহ অন্যান্য জিনিসের দাম কেজি প্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। জীবনরক্ষাকারী ও নিত্য ব্যবহার্য সাধারন ওষুধগুলির প্রত্যেকটির দাম বাড়ছে। বাজারের ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন নেই। ‘ক্ষমতাধর’ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বাজার ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রন করছে। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুটিকে মিডিয়া সৃষ্ট বলে সান্তনা নিচ্ছেন।

সরকারের দায়িত্ব জনগনের জীবনমান উন্নয়ন। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের কাছে জনগনের বৃহদাংশ কখনই গুরুত্ব পায়নি। এখানে বেশিরভাগ মানুষের কাছে সেবা পাওয়া অধিকার নয়, সরকারের করুণা। এজন্যই বেশিরভাগ মানুষের জন্য গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি জ্বালানী অধিকার হিসেবে সরকারের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না। নানা ধরনের অসত্য তথ্য দিয়ে জাতীয় সম্পদের ওপর জনগনের ক্ষুদ্র অধিকার সংকুচিত ও দুর্লভ করে তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, জ্বালানী বিশেষজ্ঞ, সমাজতত্ত¡বিদরা যাই বলুন- ক্ষমতাসীনরা তা উড়িয়ে দিচ্ছেন অবলীলায়, করপোরেট স্বার্থরক্ষায়।

বিশ্বায়নের অর্থনীতি : অনাকাংখিত এবং আতংক সৃষ্টিকারী ঘটনার উত্থান

জয়তী ঘোষ ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

উন্নত দেশগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ যে দৃষ্টিতে দেখছে, তাতে রয়েছে বিস্ময় আর বিহ্বলতার মিশ্রণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন লাভ থেকে শুরু করে ইউরোপে প্রকট বর্ণবাদী অভিবাসন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনগুলোর উত্থান ও বিস্তৃতিতে পরিষ্কার যে, এসব দেশের রাজনৈতিক ধারা ও ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বদলে যাচ্ছে। একসময় যা ছিল অচিন্তনীয়, সেটা এখন বিষন্ন শঙ্কাযুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তারা কেন এমন পথে ছুটছে, তা বোঝার বেপরোয়া প্রয়াসও ক্রমাগত বাড়ছে। এটা বিশেষ বিষয়। কারণ উন্নত দেশগুলোতে যা ঘটছে, তা এখনো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বাকি বিশ্বের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত বিষয়, যদিও বৈশ্বিক শক্তির পরিবর্তনের সব আলোচনাই কয়েকটি বৃহৎ ‘উদীয়মান জাতির’ মধ্যে সীমিত।

এখন সুস্পষ্ট, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, কর্মজীবী মানুষের স্থবির প্রকৃত আয় এবং দৈনন্দিন জীবনের অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকা বস্তুগত ভঙ্গুরতা- সব মিলে ধনী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের প্রবল অনুভূতি সৃষ্টি করছে। এসব দেশের গরিবরা যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেয়ে অনেক ভালো আছে, কিন্তু তবুও তারা ক্রমাগত নিজেদের বিশ্বায়নের শিকার বিবেচনা করছে।

এই বিষয়টা বেশি বেশি স্বীকৃতি পেলেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবণতার পূর্ণ মাত্রাটি সম্ভবত অনেক কম পরিচিত। ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের একটি নতুন প্রতিবেদনে (‘পুওরার দ্যান দেয়ার প্যারেন্টস? ফ্ল্যাট অর ফলিং ইনকামস ইন অ্যাডভান্স ইকোনমিক্স’, জুলাই ২০১৬) বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, গত দশকে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের অনেক মানুষ বেশ খারাপ অবস্থায় ছিল।

প্রতিবেদনটিতে ২৫টি উন্নত দেশের আয় বণ্টন তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাড়ে তিন লাখ মানুষের কাছ থেকে অধিকতর তথ্য এবং ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষজনের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে তাদের আয়ের মূল্যায়ন সম্পর্কে উপলব্ধি যাচাই করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছিল।

মূল প্রবতণতা শনাক্তকরণের পরিভাষায় ফলাফলটি সম্ভবত বিস্ময়কর না হলেও ব্যাপক পরিবর্তন এবং আয়ে অবনতি সত্যিই ছিল হতবাক করা বিষয়। ২৫টি উন্নত দেশে ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ পরিবার (সংখ্যাটা প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ) ২০০৫ থেকে ২০১৪ সময়কালে কোনো রকম বা পড়তি আয়ের মুখে পড়েছে। বিপরীতে এর আগে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সময়কালে দুই ভাগেরও কম মানুষ (সংখ্যাটা এক কোটিরও কম) এমন অবস্থায় পড়েছিল।

কয়েকটি দেশে সমস্যাটি আরো প্রকট। ইতালিতে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৯৭ ভাগ মানুষই স্থবির বা আগের চেয়ে কম প্রকৃত আয়ের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই অনুপাত ৮১ ভাগ, যুক্তরাজ্যে ৭০ ভাগ। এতে বাজার আয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এটাও সত্য, সরকারি কর এবং হস্তান্তর নীতির ফলে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক আয় চূড়ান্ত বিবেচনায় বেড়েছে। সত্যিকার অর্থে, ২৫টি দেশে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ভাগ মানুষ মোটামুটি বা পড়তি আয়ের মুখে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কর ও হস্তান্তর প্রায় ৮১ ভাগ পরিবারের বাজার আয়ের পতন ঠেকিয়ে তাদের আয় বরং বাড়িয়ে দিয়েছে।

একইসাথে শ্রমবাজারে হস্তক্ষেপ করার সরকারি নীতিও পরিস্থিতি ভিন্ন করেছে। সুইডেনে সরকার চাকরি সুরক্ষিত রাখার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তার ফলে আয়ের পতন ঘটেছে মাত্র ২০ ভাগ। তবে বেশির ভাগ দেশে সরকারি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আয় তেমন বাড়াতে পারেনি। বেশির ভাগ দেশে শ্রমবাজারের ধারাটা শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।

তরুণ ও নিরাপত্তাহীনতা : এসব পরিবর্তন বিস্তৃত পরিসরে হলেও এগুলোর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত শ্রমজীবীরা, এবং তাদের মধ্যে যারা তরুণ এবং নারী, বিশেষ করে সিঙ্গেল মায়েরা। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম তাদের মা-বাবার চেয়ে গরিব হওয়ার সত্যিকারের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা আগের প্রজন্মের চেয়ে ইতোমধ্যেই অনেক বেশি নিরাপত্তাহীনতায় বাস করতে শুরু করেছে।

বস্তুগত বাস্তবতায় আরো ভালোভাবে মানুষজনের উপলব্ধি তুলে ধরে। ২০১৫ সালে ব্রিটিশ, ফরাসি ও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে চালানো এক জরিপে দেখা যায়, এদের প্রায় ৪০ ভাগ মনে করে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই প্রজন্ম মনে করে, পরবর্তী প্রজন্মেও এই অবস্থার উন্নতি হবে না। তারা বাণিজ্য ও অভিবাসন- উভয়টাকেই মারাত্মক নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকে। এই গ্রুপের অর্ধেকের বেশি এই মন্তব্যের সাথে একমত : ‘বিদেশী পণ্য ও পরিসেবার ঢল দেশের চাকরির সুযোগ শেষ করে দেয়।’ আরেকটা বড় অংশ মনে করে, বৈধ অভিবাসন তাদের সমাজের সংস্কৃতি ও বন্ধন নষ্ট করে দেয়। জরিপে আরেকটা বিষয়ও জানা গেছে, যারা মনে করে তাদের আয় বাড়েনি এবং ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী নয়, তারাই ফ্রান্সের ফ্রন্ট ন্যাশনাল এবং ব্রিটেনের বেক্সিট ধরনের আন্দোলনের প্রতি বেশি সমর্থন দিয়ে থাকে।

শ্রমিকদের আয় কেন কমছে? সাধারণভাবে মনে করা হয়ে থাকে, বিশ্বায়ন এবং পযুক্তিগত পরিবর্তন। নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবের ফলে স্বল্প দক্ষতার এবং মাঝারি মানের কর্মীরাই কাজ তুলে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি নীতি না বদলায়, তবে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো কোনো সমীক্ষায় আগামী দশকে পারিবারিক আয় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কমে যাওয়ার পূর্বাবাস দেওয়া হয়েছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে অনাকাংখিত এবং এমনকি আতংক সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ঘটনা এখন বেশ ভালোভাবেই দেখা যেতে শুরু করেছে। চলমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমূল পরিবর্তন আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উপলব্ধি সৃষ্টি হতে আর কত সময় লাগবে?

(লেখক : ভারতের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল  নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক)

জঙ্গীবাদ দমন : সরকারের আসল টার্গেট কে

হায়দার আকবর খান রনো ::

ধর্মীয় মৌলবাদের সশস্ত্র রূপ যাকে এখন জঙ্গীবাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়, তা যে খুবই বিপজ্জনক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জঙ্গীবাদ কথাটায় আমার বিশেষ আপত্তি আছে। কারণ জঙ্গী যা হচ্ছে ইংরেজী মিলিট্যান্ট শব্দের বঙ্গানুবাদ তা আমরা এতকাল ভালো অর্থে ব্যবহার করে এসেছি। যেমন জঙ্গী শ্রমিক আন্দোলন। জঙ্গী মানে কিন্তু সশস্ত্র নয়। জঙ্গী আন্দোলন বলতে শক্তিশালী বা স্প্রিটেট আন্দোলনকে বোঝানো হয়। দ্বিতীয়ত, জঙ্গীবাদ বললে কোন একটি মতবাদকে বোঝানো হয়। কি সেই মতবাদ যা ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে স্বতন্ত্র। মতবাদকেই যদি চিহ্নিত করতে হয়, তবে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বলা অধিক সঙ্গত। ফ্যাসিবাদের মধ্যেই সন্ত্রাসবাদী উপাদান সব সময় থাকে। সেই বিচারে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ বললেও চলে। যাহোক, এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক। ইসলামী সন্ত্রাসবাদ শব্দটাই পরবর্তী অংশে ব্যবহার করা হবে।

যেকথা বলছিলাম, ইসলামের নামে মানুষ হত্যা ভয়াবহ রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কয়েক বছর আগে জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদ অনেকগুলো হত্যাকান্ড করেছিল। বিচারক হত্যা, আদালতে বোমাবাজি, পহেলা বৈশাখের সঙ্গীতানুষ্ঠানে, উদীচীর অনুষ্ঠানে, সিপিবি’র সভায় বোমাবাজি ও মানুষ হত্যা, সিনেমা হলে বোমাবাজি ইত্যাদি হত্যাকান্ড তারা করেছিল। শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাই ইত্যাদি কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে বিচারে তাদের ফাসি হয়। সেটা হয়েছিল বিএনপির শাসনামলে। তাহলে এটা প্রমাণিত যে, বিএনপি এই ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের সমর্থন করে না। কিন্তু দলটির এমনই পোড়া কপাল যে, ইদানীং যে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তার অপবাদ খানিকটা হলেও বিএনপিকে নিতে হচ্ছে। বিএনপি যখন ‘জঙ্গীবাদে’র (অর্থাৎ ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের) বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়, তখন কেউই তাতে সাড়া দেয় না। শাসক দল বরং সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে তার ঘাড়েও দোষ চাপিয়ে দেয়। সেই সুযোগটা বিএনপি নিজেই করে দিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে ঘর করার জন্য তাকে এই খেসারত দিতে হচ্ছে।

তাছাড়া বিএনপি দলটি চলনে-বলনে ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে যে অবস্থানে পৌছেছে তাতে বামপন্থী দল, এমনকি মধ্যপন্থী উদার বুর্জোয়া দলও বিশ্বাস তাকে করে না। ২০১৩ সালে যখন গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হলো, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাকে নাস্তিক বলে গালি দিয়েছিলেন। একই সময় তিনি হেফাজত ইসলামকে দিয়ে ‘ইসলামী বিপ্লব’ ও সরকার পতনের আকাংখা পোষন করেছিলেন। হেফাজত চরমভাবে নারী বিদ্বেষী এবং হাড়ে হাড়ে প্রতিক্রিয়াশীল (যার প্রধান নেতা আহমদ শফি মেয়েদের ক্লাস ফোরের বেশি পড়ার বিরুদ্ধে)। এমন দলের সঙ্গে সক্ষতা বিএনপির একদা মধ্যপন্থী দলের পরিচিতি মুছে দিয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগও এখন হেফাজতকে নিয়ে খেলছে। কিন্তু সেটা সেভাবে চোখে পড়ে না। হেফাজতকে চাপের মধ্যে রেখে শাসক দল তাদেরকে বশ্যতা স্বীকার করাতে বাধ্য করেছে। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে হিন্দু শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কানধরে উঠবস করিয়েছিলেন শাসক দলের বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ওসমান পরিবারের সদস্য ও বর্তমানের জনপ্রতিনিধিত্বহীন সংসদের সদস্য সেলিম ওসমান। আমরা দেখেছি, হেফাজতে ইসলাম সেলিম ওসমানের পক্ষে এবং হিন্দু শিক্ষকের বিরুদ্ধে জনসভা করেছিল।

গত বছর নতুন করে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ তৎপর হয়ে উঠেছিল। গত বছর অভিজিৎ, আশিকুর বাবু, অনন্ত, নিলাদ্রী, দীপন- লেখক, ব্লগার, প্রকাশক এক এক করে হত্যা হচ্ছিলেন, তখন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কোনো গুরুত্ব দেননি। বলেছিলেন, ওসব নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। শাসক দলের নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ বরং নিহত দীপনের পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, অধ্যাপক পিতা নাকি পুত্রের হত্যাকারীদের মতাদর্শের লোক।

শাসক দলের লোকদের কথাবার্তার কোনো লাগাম নেই। আর ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা না করে তারা এই সুযোগে বিরোধী পক্ষ বিশেষ করে বিএনপিকে ঘায়েল করতেই উৎসাহী। সে জন্য গত বছর অধ্যাপক ও লেখক অনুপম সেন, জাফর ইকবাল, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যাদের অনেকে বরং আওয়ামী শিবিরের প্রতি তুলনামূলক দুর্বল বলে পরিচিত, তারাই ‘ব্লেম গেম’-এর অভিযোগ তুলেছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। অধ্যাপক জাফর ইকবাল একথাও বলেছিলেন, ‘শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, সরকার কোন এক ধরনের দুর্বোধ্য রাজনৈতিক সমীকরণ সমাধান করার জন্য নিজেরাই এ ঘটনাগুলো ঘটিয়ে যাচ্ছে কিংবা ঘটতে দিচ্ছে।’

সম্প্রতি নতুন করে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে। বিদেশী নাগরিক, শিয়া সম্প্রদায়, হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান যাজক, বাউল সঙ্গীত প্রেমিক, সমাজ সেবক ও চিকিৎসক, সঙ্গীত প্রেমিক অধ্যাপক খুন হয়েছেন ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের হাতে। তখনো আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বিকার ছিলেন। তাদের একই কথা ভাঙা রেকর্ডের মতো উচ্চারিত হতো। ওসব বিএনপি-জামায়াতের কাজ।

বিএনপি যতোদিন জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, ততোদিন এই অপবাদ তাকে সহ্য করতেই হবে। এর মাঝে হঠাৎ করে বিএনপির থিংক ট্যাংক  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ  জানালেন যে, বিএনপি শিগগিরই জামায়াতকে পরিত্যাগ করবে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ এলো। এতোটা জামায়াতপ্রীতি থাকলে কে সাড়া দেবে বিএনপির ডাকে?

অন্যদিকে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারকেও আন্তরিক মনে হয় না। তারা এই সুযোগে বিএনপিকে ঘায়েল করতে যতোটা আগ্রহী, ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে ততোটা তৎপর নন। বিএনপি না হয় জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ। কিন্তু সরকার কেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছে না?

ধর্মীয় মৌলবাদকে দমন করার জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ, গোয়েন্দা তৎপরতা, পুলিশি এ্যকশন যেমন দরকার, তেমনি দরকার মতাদর্শগত সংগ্রাম। মতাদর্শের ক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যেই অনেক আপোষ করে বসে আছে। সংবিধানে ‘ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম’ রেখে এবং গোপনে হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতা করে মৌলবাদকে মোকাবেলা করা যায় না।

সরকার ‘জঙ্গীবাদ’ বিরোধী পুলিশি এ্যকশনে নেমেছে; দরকারও আছে। হয়তো কিছু সাফল্যও আছে। কিন্তু এই সুযোগে যে গ্রেফতার বাণিজ্য শুরু হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে অস্বাভাবিক রকম।

দুর্ভাগ্য দেশবাসীর, জাতীয় দুর্যোগের সময়ও বড় বড় দলগুলো ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করে দাড়াতে পারে না। ভারতে এই রকম ক্ষেত্রে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সকল দল এক সঙ্গে বৈঠক করে, কখনো কখনো একসঙ্গে দাড়ায়ও। আমাদের দেশে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাও গড়ে ওঠেনি। কপালে হয়তো আরও দুঃখ আছে।

হ্যাঙ হওয়া বিএনপির রিষ্টার্ট প্রচেষ্টা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

দীর্ঘদিন ধরে হ্যাঙ হয়ে থাকা দলকে রিষ্টার্ট দিতে গিয়ে একক নেত্রী খালেদা জিয়া কি বিএনপিকে আবারও হ্যাঙ করে দিচ্ছেন? এই প্রশ্ন এখন তার দলের ভেতরে- বাইরে মোটামুটি প্রকাশ্য। দলের বেশকিছু নেতা ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন অনেকে, তালিকায় নাম আগামীতে হয়তো আরো ভারী হবে। বিএনপির মত একটি নির্বাচনমুখী ও ক্ষমতাভিলাষী দল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ও নির্বাচনের বাইরে থাকায় অভ্যন্তরে সৃষ্ট সংকট অতিক্রম করতে পারছে না। অতীতেও এ ধরণের সংকট দেখা দিয়েছে, তবে এবারের প্রেক্ষাপট অনেকটা ভিন্ন। পরিস্থিতি যাই হোক, জাতীয়-নির্বাহী-স্থায়ী, সব মিলিয়ে ঢাউস একটি কমিটির মালিক এখন খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রকাশ্যে বলে থাকেন, “অত্যন্ত ভাইব্র্যান্ট ও ডায়ানমিক কমিটি হয়েছে। আশাকরি এই কমিটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে”। প্রশ্ন হচ্ছে, পোড় খাওয়া সলিড রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল নিজেও তার এ কথা কি বিশ্বাস করেন? কিম্বা তার মতে, এই কমিটি দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন গণতন্ত্র, কার গণতন্ত্র। জিয়া পরিবারের গণতন্ত্র, নাকি বর্তমানে জিয়া পরিবারসহ বিএনপির প্রয়াত: ও বর্তমান নেতাদের পরিবারের জন্য সবকিছুকে অবাধ করে দেয়ার গণতন্ত্র?

একসময়ে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-চলচ্চিত্রে চৌধুরী পরিবার, সৈয়দ পরিবার নামের সামন্ত ভগ্নাবশেষ প্রত্যক্ষ করা গেছে, একবিংশ শতকের বাংলাদেশে সেরকম কিছু পরিবারের দখলে বাংলাদেশের রাজনীতি। যারা জমিদারতন্ত্র বা ভূস্বামীদের কায়দায় রাজনীতিতে জাঁকিয়ে বসে আছেন, গণতন্ত্রের কথা বলে দল অথবা জাতিকে শাসন করছেন প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক কায়দায়।

গণতন্ত্রের সাথে সামন্ততন্ত্র, জমিদারতন্ত্র, পরিবারতন্ত্রের ধ্যান-ধারণা একক সিদ্ধান্ত, কর্তৃত্ববাদীতা কখনই যায় না। তারপরেও গণতন্ত্রের নামে এই চর্চা দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলে রয়েছে সর্বগ্রাসী আকারে। সেজন্যই দলের তৃণমূল থেকে যে কোন কমিটি, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই বা মনোনয়ন, সর্বোপরি যেকোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় একক কর্তৃত্বে। আর ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই, প্রশ্ন বা বিতর্ক ছাড়াই একক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়। ক্ষমতার বাইরে অবশ্য চুপে-চাপে কখনও ক্ষোভ-বিরক্তি প্রকাশিত হয়, আবার কুইনাইন গেলার মত গিলেও ফেলা হয় পদ-পদবী রক্ষায়।

সুতরাং বিএনপি পাঁচ শতাধিক সদস্য বিশিষ্ট ঢাউস কমিটি ভাইব্র্যান্ট বা ডায়নামিক এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকারী- যাই বলা হোক, এ নিয়ে দলের মধ্যেই রয়েছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। অনেকে ইতিমধ্যেই মিডিয়ায় প্রকাশ্য হয়েছেন এবং মনোভাব প্রকাশ করতে কসুর করছেন না। সম্মেলনের চারমাস পরে খালেদা জিয়ার একক কর্তৃত্বে মনোনীত ও ঘোষিত পূর্নাঙ্গ কমিটিতে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী স্থায়ী কমিটি এখনও অপূর্ণাঙ্গ। কমিটি তৈরীতে বেগম জিয়ার আশপাশের কয়েকজন হালে গজিয়ে ওঠা নেতা এবং বিশ্বাস, রায় ও আহমেদদের প্রভাব আছে- এটিও বিএনপির একটি বড় আলোচিত ইস্যু। এছাড়া এই কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভাসহ বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে অর্থ কেলেংকারির কথাও চালু আছে।

ফল দাঁড়িয়েছে নতুন কমিটিতে নেতাদের সিনিয়ারিটির ক্রম রক্ষা হয়নি। আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগী নেতা-কর্মীরা ছিটকে পড়েছেন। বদলে জায়গা হয়েছে এর আগে কোন কমিটিতে ছিলেন না, এমন নেতা-কর্মীদের। কেন্দ্রীয় অনেক নেতার ভাই, স্ত্রী-সন্তান-পুত্রবধুগন কমিটিতে পদ পেয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে খালেদা জিয়া সবচেয়ে সহানুভূতিশীল থেকেছেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের সন্তানদের প্রতি। এটি কি ঐসব নেতাদের প্রতি তার দায়বদ্ধতা বা ঋন পরিশোধ? এটিকে মিডিয়ায় অগণতান্ত্রিক হিসেবে দাবি করেছেন নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, সমস্ত ক্রম ভেঙ্গে যখন তারেকের জন্য সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ সৃষ্টি হয়েছিল, সেখান থেকে একলাফে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়, তখন কেউ টুঁ শব্দ করেননি।

দলের স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার খুব বিকল্প ছিল না। কয়েকজন সিনিয়র নেতা মারা গেছেন, জড়াক্রান্ত কয়েকজন। সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও জালিয়াতির মামলাসহ দুর্নীতির অনেকগুলো মামলা বিচারাধীন রয়েছে। খোদ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কমবেশি এক কুড়ি মামলা বিচারাধীন। গলা ফাটিয়ে বা চিৎকার করে যতই তারা এ মামলাগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত বা জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার চক্রান্তই বলুন, সেটি তাদেরকে আদালতেই প্রমান করতে হবে।

বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গীবাদের উত্থানের পেছনে বিএনপি নেতৃত্বের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে সকলেই জানেন। আবার তাদের আমলেই বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার ও বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয়। এতকিছুর পরেও বিএনপি নেতৃত্বের একটি অংশের এখনও জঙ্গীবাদের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ নিয়ে অভিযোগ বিষয়টি দলের নেতৃত্ব স্বচ্ছতার সাথে মোকাবেলা করতে পারছে না। সাম্প্রতিককালে জঙ্গী হামলার ভয়াবহতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিএনপি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিল। ক্ষমতাসীনরা জামায়াতের সাথে জোট ও জঙ্গীবাদ সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে এ আহবান নাকচ করে দেয়।

এরকম একটি সময়ে কমিটি নিয়ে বিএনপির ভেতরকার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ক্ষোভ-অসন্তোষ এবং জোট অভ্যন্তরে টানাপোড়েন দলটিকে নতুন সংকটের মুখোমুখি করেছে। জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগ হিসেবে যে সব দলকে টানার চেষ্টা করা হয়েছিল, তাদের নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জোটের কয়েকটি নামসর্বস্ব দল। কমিটি নিয়ে অসন্তোষ, জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক, জামায়াত নিয়ে দলে উপদেষ্টা ও বুদ্ধিজীবিদের প্রশ্ন এবং পরামর্শ- নতুন করে চাপে ফেলে দিয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বকে।

এরকম পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে না, বিএনপির জাতীয় ঐক্যের ডাক নামক রাজনৈতিক কৌশল খুব ফলপ্রসু হবে। এই উদ্যোগ এখনই থমকে গেছে। জঙ্গীবাদ বিরোধী ঐক্য প্রক্রিয়ায় জামায়াতের থাকা না থাকা নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত সম্পর্কিত মন্তব্যের পর বিএনপির ভেতরে এবং মহাসচিবের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় আশাহত ‘দলের বুদ্ধিজীবি’ প্রফেসর এমাজ উদ্দিন আহমেদ ও ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী। শেষোক্তজন মিডিয়ায় বলেছেন, ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। বিএনপি এখন নিজেদের কমিটি নিয়েই ঝামেলায় আছেন।

জঙ্গীবাদ বিরোধী ঐক্য বা যে কোন বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে বিএনপিকে একটি বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থা তৈরী করতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে জননির্ভর এবং জনগনকেও নির্ভরতা দিতে হবে। বিএনপির আচরনে উপর্যুক্ত শর্তগুলি একেবারেই অনুপস্থিত। তাদের জোটে রয়েছে যুদ্ধাপরাধী দল। এ বিষয়টি ট্রাম্পকার্ড হিসেবে বার বার খেলছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি যেন নিয়তির মত সে খেলা মেনে নিয়েছে। জামায়াতকে কেন সরকার নিষিদ্ধ করছে না- এই ভরসায় আছে বিএনপি।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে প্রয়াত জিয়াউর রহমান যে বিএনপি গঠন করেছিলেন, সেখানে ডান-বাম-মধ্যম ও দলছুট রাজনীতিবিদদের একটি সম্মিলন ঘটেছিল। ১৯৮১ সালে তার ট্রাজিক মৃত্যু ও পরের বছর এরশাদের ক্ষমতা দখল দলটিকে অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। আশির দশকে খালেদা জিয়ার অনমনীয় নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মধ্যপন্থার একটি দল হিসেবে নব্বই দশকের শুরুতেই বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরেছিল। এতোদিনকার ক্ষমতার মধ্যে থেকে চলা বিএনপি এরশাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন এক বিএনপি হিসেবে রূপান্তরিত ও আবির্ভূত হয়। এ কারণে ’৯০ পরবর্তী বিএনপি’র ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ৯১-৯৬ সময়কালে বিএনপি ও তাদের সরকারের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। বেগম জিয়া এবং তার সরকারের অন্য সবাই আন্দোলন-সংগ্রামের কথা মনে রেখেই সরকার পরিচালনা করেছেন। এ কারণে ৯১-৯৬-এর বিএনপির সাথে আজকের বিএনপির বিস্তর এবং যোজন যোজন দূরত্ব।

কিন্তু ২০০১-০৬ সময়কালে খালেদা জিয়া, তার পুত্র ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে দলের ভেতরে যে দলটি গড়ে উঠেছিল, সেখানে তার কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না। অপাত্যস্নেহের কারণে তিনি কখনই বুঝতে সক্ষম হননি যে, তার অপরিনামদর্শী পুত্রের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কি পরিনতি হতে পারে। এজন্যই জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে তারা গত সাত বছরেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। এ সময়কালে কোন লক্ষ্যভেদী আন্দোলন তো দুরে থাকুক, খালেদা জিয়ার বহুল কথিত দল গুছিয়েই ওঠা হয়নি আর।

ক্ষমতার বাইরে প্রধান রাজনৈতিক দলের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত সুদৃঢ় ঐক্য, সমন্বয় ও কর্মসূচি সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। ক্ষমতাভিলাষী এই দলের ভেতরে-বাইরে গত সাত বছরে উল্লেখিত বিষয়গুলি খুঁজে পাওয়া যায়নি। দলের ক্ষমতার একটি কেন্দ্র লন্ডনে, একটি গুলশানে, অন্যটি রয়েছে বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার বৈঠকখানায়। কতগুলি অরাজনৈতিক মানুষ-সাবেক আমলা-কর্মচারী, দলের নীতি নির্ধারনে প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে এন্তার দুর্নীতির অভিযোগ। এই সুযোগটি নিয়েছে সরকার। গত সাত বছরে মামলা-হামলার জালে জড়িয়ে খেলছে ক্ষমতাসীনরা, বুঝে- না বুঝে সেই খেলায় সামিল রয়েছে বিএনপি।

দলের মহাসংকটকালে বিএনপির মধ্যে ঐক্য নেই। দলের মধ্যে দল, উপদল, আত্মীয়করণ, সর্বোপরি কোন কাঠামোয় গণতন্ত্র চর্চা না থাকায় এই দল কতটা কার্যকর হবে আগামীতে সেটি নিয়ে মন্তব্য করারও প্রয়োজন হবে না। বিএনপির অভ্যন্তরে ক্ষোভ-অসহিষ্ণুতা বাড়তে থাকলে খালেদা জিয়া যতই দলকে রিষ্টার্ট দেবার চেষ্টা করুণ, খুব বেশি পরিবর্তন আশা করা যায় না। নির্বাচনমুখী রাজনীতির ধারায় যেখানে বিশ্বাস হচ্ছে ঐক্যর সবচেয়ে বড় অনুঘটক, বলা চলে সেটিই বিএনপির ভেতরে-বাইরে প্রায় নেই। এ অবস্থায় জাতীয় ঐক্যের ডাকও ইতিমধ্যেই অসাড় হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন আমরা একটি অশুভ রাজনীতির বিকাশের কালপর্বে বাস করছি। উদার, উন্মুক্ততা নিয়ে খোলামেলা রাজনীতির বদলে দলগুলোর ভেতরে-বাইরে বিভেদ ও বিভাজনের দেয়াল তোলা রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। সাবধান না হওয়া গেলে, ব্যক্তি-পরিবার-গোষ্ঠির স্বার্থের উর্ধে না উঠতে পারলে, বিভাজন বাড়তেই থাকবে। এ কারণে রাজনীতির জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিদ্বেষ-প্রতিহিংসা। মাথাচাড়া দিচ্ছে অসহিষ্ণুতা উগ্রবাদ। এর বিপরীতে রাষ্ট্রাচার, সুবিবেচনা, দুরদর্শীতা- প্রায় হারাতে বসেছে।

চলতি বছর খালেদা জিয়া ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসে তার জন্মদিন পালন করেননি, কেক কাটেননি, কোন আনুষ্ঠানিকতা করেননি। এটিই রাজনীতির শিষ্টাচার, সুবিবেচনা ও দুরদর্শীতা। তার জন্মদিন ১৫ আগষ্ট কিনা এ নিয়ে যে সন্দেহ-বিতর্ক রয়েছে সেটিরও সমাপ্তি ঘটাতে পারেন তিনি। ১৯৯১ সালে ক্ষমতাসীন হবার পরে কার পরামর্শে এই দিনটিকে জন্মদিন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, জানা যায়নি। তবে তার বর্তমান পদক্ষেপে রাজনীতিতে একটি শুভ সূচনা ঘটলে সেটি হবে জনগনের পরম প্রাপ্তি।

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৪৮ : এককেন্দ্রিক বিশ্বে চীনের যাত্রা

আনু মুহাম্মদ ::

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র সাম্রাজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো, পুঁজিবাদের একক বৈশ্বিক ব্যবস্থার পথ নিশ্চিত হলো। একে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও বস্তুত এর মধ্য দিয়ে সারাবিশ্বের অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, বর্ণবাদী, নিপীড়ক, যুদ্ধবাজ শক্তিসমূহেরই মতাদর্শিক বিজয় সূচিত হলো, তাদের জন্য এতোদিনকার হুমকি দূর হলো। এর মধ্য দিয়ে শুধু যে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের পুনরুজ্জীবন ঘটলো তাই নয়, বৈষম্য নিপীড়নেরও আরও নানারূপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। নতুন উদ্যমে বিশ্বব্যাপী ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধবাজ ও গণবিরোধী সব ধরনের শক্তি।

অন্যদিকে এর মাধ্যমে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তিগুলোও দিশেহারা অবস্থায় পতিত হলো। পিকিংপন্থীরা আগেই ছিন্নভিন্ন হয়েছিলো। এবারই প্রথমবারের মতো মস্কোপন্থীদের বিপর্যয় ঘটলো ব্যাপকভাবে। এই ধারার অনেকেরই নতুন উপলব্ধি হলো, মার্কসবাদ ভুল, লেনিনবাদ ভুল, বিপ্লব একটা ভুল চিন্তা এবং সমাজতন্ত্র একটি অসম্ভব অবাস্তব প্রকল্প। ছিন্নভিন্ন সমাজতন্ত্রী ও বিপ্লবীদের অনেকেই বসে পড়লেন, অনেকে যোগ দিলেন শত্রু  শিবিরে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে একটা সমস্যার মুখোমুখি হলো যুদ্ধ অর্থনীতির সাথে অবিচ্ছেদ্য পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা এবং এর কেন্দ্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিপক্ষ বা শত্রু  না থাকলে  এই যুদ্ধ অর্থনীতির যৌক্তিকতা দাঁড় করানোর কোনো উপায় থাকে না। আর যুদ্ধ আর দখলের ব্যবস্থা ছাড়া পুঁজিবাদেরও টিকে থাকার পথ নেই। এই সংকট থেকে উদ্ধারের পথ সৃষ্টি হলো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন যুদ্ধ ফ্রন্ট বানানোর মধ্য দিয়ে। ১৯৯১ সালে ইরাক আক্রমণ দিয়ে এর শুরু, ২০০১ সালে ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ মন্ত্র দিয়ে পুরো পৃথিবীকেই যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করা হয়েছে। যুদ্ধ অর্থনীতিরও বিস্তার ঘটেছে আগের তুলনায় বেশি।

বিশ্ব ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনে চীন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে তার যাত্রাপথে কোনো পরিবর্তন আনেনি। এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে কোনো অবস্থানও গ্রহণ করেনি। বরং নানাভাবে এর সাথে সমন্বয় করতে চেষ্টা করেছে, পরিবর্তিত ব্যবস্থার সাথে মানানসই হিসেবেই নিজেকে সজ্জিত করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এই এককেন্দ্রিক শক্তির সাথে দরকষাকষির ক্ষমতা যে কমে গেছে তা চীন টের পেয়েছে প্রথম থেকেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবার জন্য চীনের আগ্রহ ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাববলয় থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য। আর চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করবার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রভাববলয় শক্তিশালী করবার জন্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে এই সমীকরণ অকার্যকর হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় অপ্রতিরোধ্য একক কেন্দ্র। এতে চীনের উদ্বিগ্ন হবার যথেষ্ট কারণ ছিলো। তিয়েন আন মেনের পর অবরোধ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কর্তৃত্ব বিস্তারের পথ বেছে নিয়েছিলো তা এরপর আরও শক্তিশালী হয়। চীনের তখন কূটনৈতিকভাবে এর ফয়সালা করাও দুরূহ ছিলো। সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য চীনা নেতৃত্ব কোনোভাবেই প্রস্তুত বা ইচ্ছুক ছিলো না। তখন একমাত্র পথ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ওপর নির্ভরশীল করে তোলার মতো অবস্থায় পৌঁছানো। সেভাবেই অগ্রসর হয়েছে চীন।

চীন যে অবরোধ তোলার জন্য ১৯৯০সাল থেকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে তার কিছু প্রামাণ্য বিবরণ দিয়েছেন হেনরী কিসিঞ্জার তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন সিনিয়র বুশ, তাঁর কাছে পাঠানো এক মৌখিক বার্তায় চীনা নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীনা জনগণ বিদেশি শক্তির আধিপত্য এবং হয়রানির মধ্যে কাটিয়েছে। আমরা চাই না সেই জখম আবার উন্মুক্ত হোক। পুরনো বন্ধু হিসেবে আশা করি আপনি চীনা জনগণের অনুভূতি বুঝতে পারবেন। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, যা প্রতিষ্ঠা করা খুব সহজ ছিলো না, তাকে চীন সবসময়ই গুরুত্ব দেয়, একই সঙ্গে আরও বেশি গুরুত্ব দেয় এর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মর্যাদাকে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আর বিলম্ব না করে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আরও জরুরী।..’

এর পর মার্কিন প্রশাসন অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও,বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে,অবরোধ শিথিল করে। ১৯৯২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ক্লিনটন তাঁর প্রচারাভিযানের সময় বুশ প্রশাসনের সমালোচনায় চীনের প্রতি নমনীয়তাকেও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন চীনও পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পথেই যাবে। সেই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে যা করা উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাই করতে হবে।’[1]

প্রকৃতপক্ষে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে চীনপন্থী এবং চীনবৈরী দুটো প্রবণতাই আছে। এর সাথে চীনে মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ।


[1]Henry Kissinger: On China, Penguin, 2011, pp 459-461

 

 

বর্তমানে যা ঘটছে, তা জনগণের সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চাদমুখিতার সময় : নোয়াম চমস্কি

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান দার্শনিক, সমাজচিন্তক, রাজনৈতিক সক্রিয়বাদী নোয়াম চমস্কি সম্প্রতি পুঁজিবাদী দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি নিয়ে জেমস রেসনিককে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন।  এতে তিনি তার বেড়ে ওঠা, অতি ধনীদের নানা সুযোগ লুটে আরো ধনী হওয়ার নীলনক্সা, গরিবদের আরো গরিব হওয়ার কাহিনী তুলে ধরেছেন। বিশ্বায়নের কথা বলে কিভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তিনি তা সাবলীলভাবে বর্ণনা করেছেন। তার ওই সাক্ষাতকারটি এখানে তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

প্রশ্ন : সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বের বদলে যাওয়াটা আপনি কিভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং কোন বিষয়টা (কিংবা কে) আপনার চিন্তা-ভাবনা পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?

চমস্কি : ভালো বা খারাপ যা-ই হোক না কেন, আমি জীবনজুড়ে প্রায় একই রকম থেকে গেছি। আমি যখন প্রাইমারি স্কুলের শিশু ছিলাম, তখনই ১০ বছর বয়সীর দৃষ্টিকোণ থেকে স্কুলের সংবাদপত্রে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং বিশ্বের জন্য হুমকি নিয়ে আর্টিক্যাল লিখেছি। তখন থেকেই চালিয়ে যাচ্ছি। তরুণ কিশোর বয়সে আমি সব ধরনের চরমপন্থী রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলাম, নৈরাজ্যবাদীদের লাইব্রেরি আর অফিসে আঠার মতো লেগে থাকতাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার গ্রিসে ব্রিটিশ আক্রমণ এবং পরমাণু বোমার তান্ডব ইত্যাদি ঘটনা নিয়ে প্রবল উদ্বেগ ছিল আমার মধ্যে।

লোকজনকে সংগ্রাম করতে দেখাকে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী বিবেচনা করতাম। বিশেষ করে যখন দেখতাম, দারিদ্র-পীড়িত মানুষের তাদের সীমিত সম্পদ নিয়ে সত্যিকারের কিছু অর্জনের জন্য লড়াই করছে। তাদের অনেকে সত্যি খুবই উদ্দীপনাময়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দক্ষিণ কলম্বিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার খুবই গরিব একটি গ্রামের মানুষ সংঘবদ্ধ হচ্ছে তাদের পানি সরবরাহ ও পরিবেশকে ধ্বংসকারী কানাডীয় স্বর্ণখনির কাজ বন্ধ করার চেষ্টায়; সেইসাথে আধা-সামরিক বাহিনী এবং সামরিক সহিংসতা ইত্যাদিও প্রতিরোধ করছে। বিশ্বজুড়ে দেখতে পাওয়া এ ধরনের ঘটনা খুবই উদ্দীপনাময়।

প্রশ্ন : আপনার নতুন ডকুমেন্টারি ‘রিকুইম ফর দি আমেরিকান ড্রিম’ (আমেরিকান স্বপ্নের জন্য প্রার্থনা)-এ আপনি উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করের হার কমানো এবং কম দক্ষতাপূর্ণ চাকরির আউটসোর্সিং বৈষম্য ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, এই উভয় বৈশিষ্ট্যই বিশ্বায়নের চাপের ফসল। তা-ই যদি হয়ে থাকে, তবে দ্রুত বিশ্বায়নের এই যুগটা সাধারণভাবে শ্রমিকদের জন্য খারাপ?

চমস্কি : তারা এটাকে বিশ্বায়ন হিসেবে অভিহিত করতে পারে; কিন্তু তা করা হবে একটা ভুল। বিশ্বায়ন সব ধরনের হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলছি, কেউ যদি মুক্ত বাজারে বিশ্বাস করে, তবে তাকে আন্তরিকভাবে অ্যাডাম স্মিথকে গ্রহণ করতে হবে। অ্যাডাম স্মিথ উল্লেখ করেছেন, মুক্ত বাজারের মৌলিক বিষয় হবে শ্রমিকের অবাধ প্রবাহ। আমাদের এটা নেই।

শ্রমিক চলাচলে আমাদের কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এর মানে কেবল এটা নয় যে, কর্মজীবী মানুষ কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারছে না, এর মানে এটাও সত্য যে আইনজীবী কিংবা সিইওদের মতো সুবিধাভোগী পেশাজীবীরা বিদেশ থেকে প্রতিযোগিতা প্রতিরোধ করার জন্য সংরক্ষণবাদী বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। বিদেশ থেকে অনেক আইনজীবী ও চিকিৎসক, তারা অত্যন্ত দক্ষ এবং অতি সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের পেশাজীবী মান পূরণ করতে পারে, আসতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পেশাজীবীরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে তাদের আসতে দিচ্ছে না।

বিশ্বায়ন এমনভাবে করা যেতে পারত- যাতে তা সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণকর হয় কিংবা একে এমনভাবে করা যেতে পারত- যাতে এটা উরুগুয়ে রাউন্ড, ডব্লিউটিও এগ্রিমেন্ট, নাফটা, বর্তমানের আটলান্টিক অ্যান্ড প্যাসিফিক এগ্রিমেন্টসহ (এগুলোর কোনোটিই এমনকি বাণিজ্য চুক্তিও নয়, বরং সুস্পষ্টভাবে বিনিয়োগকারীদের অধিকার বিষয়ক চুক্তি) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি কাজ করতে পারে। এগুলো বড় বড় ওষুধ কোম্পানি, মিডিয়া হাউস ইত্যাদির মতো প্রধান প্রধান করপোরেশনের জন্য খুবই উচ্চমাত্রার সুরক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকারের মাধ্যমে খুবই উচ্চমাত্রার প্রতিবন্ধকতা। এসব ব্যবস্থা করপোরেশনগুলোকে তাদের মুনাফা ক্ষতির মুখে পড়ার শংকা দেখা দিলে জনগণের কাছে নয়, সরকারের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এটা হলো বিশেষ ধরনের বিশ্বায়ন, যা প্রণয়নকারীদের স্বার্থে প্রণীত। প্রণয়নকারীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে ঘনিষ্ঠ থেকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করছে। অর্থাৎ তারা হলো বিশ্বায়নের সুফলভোগী।

প্রশ্ন : আপনি জিআই বিল অব রাইটসের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন, দেখিয়েছেন, ১৯৫০ সালে উচ্চশিক্ষা মোটামুটিভাবে বিনামূল্যে হওয়ায় কিভাবে তা ছিল জনগণের জন্য অনেক বেশি কল্যাণকর। নিউ ডিলের (মহামন্দার পর জনগণের দুর্ভোগ কমানোর জন্য প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেয়া পদক্ষেপ) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সার্বিক কল্যাণকর প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি সৃষ্টি হয় ১৯৮০-এর দশকে। এসব প্রতিষ্ঠান কিভাবে এবং কেন আক্রান্ত হলো?

চমস্কি : ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্রবৃদ্ধির হার ছিল উচ্চমাত্রার, কোনো আর্থিক সংকট ছিল না। কারণ নিউ ডিল বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল, তুলনামূলক সাম্যবাদী প্রবৃদ্ধি ছিল। ফলে একেবারে প্রতিটি প্রবৃদ্ধি মোটামুটিভাবে ছিল একই মাত্রায়। এ কারণেই একে বলা হয় স্বর্ণযুগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিক্সনের যুক্তরাষ্ট্র ডলারের স্বর্ণে রূপান্তর বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থার পতন ঘটলে ব্রেটন উডস পদ্ধতি ভেঙে পড়ে; পরিণতিতে সব ধরনের নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। এগুলোর একটি ছিল মূলধন প্রবাহের দ্রুত বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজারি হঠাৎ করে ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়া। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক পুঁজিবাদের জন্য তেমন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এটা। উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যে মুনাফার হার কমানোর জন্য এ নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। কারণ এটা পুঁজির মালিকদের বোঝায় যে, সত্যিকারের উৎপাদনের চেয়ে অর্থনৈতিক কৌশল খাটানোর পথে চলা অনেক বেশি মুনাফামূলক।

এর সাথে আসে আরো অনেক বিকল্প, যেগুলো একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার জের, যা উৎপাদনকে এমন এক স্থানে সরিয়ে নেয়া হয় যেখানে মজুরি অনেক কম, যেখানকার পরিবেশগত মান নিয়ে চিন্তা করার দরকার হয় না। ব্যবসা নীতিমালা বদলানোর চেষ্টা শুরু করেছে, তা নয়। তারা সেই ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকেও নীতি বদলানোর চেষ্টা করেছিল। ১৯৩০-এর দশকে শ্রমজীবী এবং সাধারণ মানুষের অর্জন দেখে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আঁতকে ওঠেছিল। ’৩০-এর দশকের ’বিজনেস প্রেসে’ পড়লে তা দেখতে পাবেন। তাতে তারা হুমকি নিয়ে কথা বলছে, যেটাকে তারা গণমানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থান হিসেবে অভিহিত করছে। তারা বলছিল, গণমানুষের শক্তি আমেরিকান উদ্যোক্তার চাহিদার জন্য হুমকি।

ব্যবসা-বাণিজ্য সবসময়ই শ্রেণী যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত। অনেক সময় তারা ভালো করে, অনেক সময় খারাপ করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পর থেকে শ্রমিক ও নিউ ডিলের বিরুদ্ধে প্রবল আক্রমণ হতে থাকে, সেইসাথে ১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি হয় এবং শ্রেণী যুদ্ধ বেড়ে যায়। আপনি কার্টারের আমলের শেষ দিকেই বিষয়টা লক্ষ করতে পারেন এবং রিগ্যান/থ্যাচারের আমলে বেশ প্রবলভাবে তা জাঁকিয়ে বসে। ওই সময় নব্যউদারবাদী নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তৃতীয় বিশ্বসহ দুর্বলতর সমাজগুলোতে তা বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী সমাজগুলোতে এটা একদিকে জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে তুলনামূলক স্থবিরতা চাপিয়ে দেয়, অন্যদিকে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ তাদের সম্পদ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে। অবশ্য এটা স্রেফ অব্যাহত শ্রেণী যুদ্ধেরই বিষয়, যা এখনো চলছে। জনগণের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না হলেই কেবল শ্রেণী যুদ্ধ সফল হতে পারে। জনপ্রিয় গণসংগঠনগুলো আক্রান্ত হয়, টুকরা টুকরা করে দেয়া হয় এবং শ্রম আন্দোলন মারাত্মক আক্রমণের মুখে পড়ে। ব্যক্তিগত সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার একটি বিষয় হলো এই যে, ভয়ংকর চক্রের সূচনা করে : ব্যক্তিগত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয় এবং তা তার সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতাও ধারণ করে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রবর্তন করে, যা ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়িয়ে দেয়। এভাবে বৃত্ত আবর্তিত হতে থাকে। এটা সহজাত বিধান কিংবা অর্থনৈতিক সূত্র নয়। এটা সমাজের দুষ্ট শ্রেণীর ক্ষমতা এবং সহজাত সামাজিক ও রাজনৈতিক-ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সংঘাতের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। বর্তমানে যা ঘটছে, তা জনগণের সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চাদমুখিতার সময়। অতীতেও এমনটা ঘটেছে এবং তা থেকে মুক্তিও সম্ভব। অনেকভাবেই তা হতে দেখতে পাবেন। এর একটি হলো গণতন্ত্রের পতন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ভালোভাবেই কমবেশি মধ্যপন্থী দলগুলোর বড় ধরনের পতন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প ও স্যান্ডার্সের মতো গণভিত্তিক শক্তির মারাত্মক আক্রমণের মুখে পড়েছে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলই। জনগণের প্রায় একই ধরনের স্বার্থ ও উদ্বেগ রয়েছে এবং এসব ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে সেটা হবে একটি বড় গণশক্তি। ইউরোপেও একই বিষয় দেখা যায়। সাম্প্রতিক অস্ট্রিয়ার নির্বাচনে দেশটি পরিচালনাকারী দুটি ঐতিহ্যমন্ডিত দল নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছে। বেছে নেয়ার বিষয় ছিল নব্য-ফ্যাসিবাদী পার্টি ও গ্রিন পার্টির একটিকে।

প্রশ্ন : আপনি মার্টিন গিলেন্সের সমীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে যে প্রায় ৭০ ভাগ লোক সরকারি নীতিতে কোনোভাবেই প্রভাব বিস্তার করে না। ক্ষমতাহীনদের মধ্যে থাকা এই বিচ্ছিন্নতা ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রাইমারির সময় কেমন প্রভাব ফেলেছে?

চমস্কি : খুবই সরাসরি। আর তা-ই ছিল ট্রাম্প ও স্যান্ডার্সের প্রতি সমর্থনের ভিত্তি। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়ার ফসল। ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া এবং ভোট দিতে বিরত থাকার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সাম্প্রতিক বছরে অনেক সমীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়েছে। কয়েক বছর আগে ওয়াল্টার ডিন বার্নহ্যাম যুক্তরাষ্ট্রের অ-ভোটারদের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমীক্ষা চালিয়ে দেখতে পেয়েছেন, তারা ইউরোপে যারা সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক ও শ্রমিকভিত্তিক দলগুলোকে ভোট দেয়, তাদের মতোই। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের দল না থাকায় তারা স্রেফ ভোট দেয় না। অনেক দিন ধরেই এমনটা ছিল। তবে এখন তা প্রকটভাবে ফুটে ওঠছে এ কারণে যে, জনগণের বিশাল অংশ নব্য-উদার কর্মসূচির ধারার কারণে সক্রিয় নয়। তারা হয় ১৯৩০-এর দশকের মতো জঙ্গি শ্রম আন্দোলনের মতো করে সংঘবদ্ধ হবে, কার্যকর হয়ে কিছু একটা করবে কিংবা ক্রুদ্ধ বা হতাশ, জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবাদী, ধ্বংসকরী ইত্যাদি কিছুতে পরিণত হবে।

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রে অব্যাহতভাবে নানা ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে গণতন্ত্রকে হুমকিগ্রস্ত করছে। আপনি কি এই প্রবণতা ইতিবাচকভাবে রুখে দেয়ার কোনো ধারার উত্থান দেখতে পাচ্ছেন? আশাবাদী হওয়ার মতো কি কিছু আছে?

চমস্কি : আমরা খুবই আশাবাদী হতে পারি। এ ধরনের কিছু আগেও হয়েছে। এবারের সমস্যা থেকেও উত্তরণ ঘটবে। ১৯২০-এর দশকটি ছিল অনেক দিক থেকে এমনই। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন। অনেক কিছুই বদলে গিয়েছিল। বর্তমানে অনেক শক্তিই আছে, এবং তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। স্যান্ডার্সের প্রতি বিপুল সমর্থন আশাব্যঞ্জক। এটা অনেক স্বপ্ন দেখায়, তবে তা নির্ভর করছে, কিভাবে তা বিকশিত হবে। একই কথা প্রযোজ্য ইংল্যান্ডের করবিন এবং স্পেনের পোডেমসের বেলায়। সমস্যাবলীর অনেক প্রতিক্রিয়া আছে, সেগুলো থেকে উত্তরণ সহজ নয়। তবে আমি মনে করি, সম্ভাবনার অনেক অবকাশ রয়েছে। (সাক্ষাতকারটি ই-ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)