Home » সম্পাদকের বাছাই (page 40)

সম্পাদকের বাছাই

নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতার শেষ দশা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এই নির্বাচন কমিশন স্থায়ী উদাহরণ হয়ে ঢুকে যাচ্ছে ইতিহাসে। বিচারপতি মসউদ, বিচারপতি রউফ, বিচারপতি আজিজ কমিশনের উদাহরণ ছাড়িয়ে যেতে বসেছে বর্তমান কমিশন। তারা এখন ইউপি নির্বাচন সম্ভবত: নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী নিহতের সবশেষ সংখ্যা ১১৪ জন। বাকি আছে আরো দু’ধাপ। দেশবাসীর প্রশ্ন আর কত লাশ দেখতে চায় এই নির্বাচন কমিশন? এই হত্যাকান্ডের নৈতিক দায় কার? সরকার না নির্বাচন কমিশনের? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তৃণমূলের এই নির্বাচনের অতীত ইতিহাস যতই সংঘাত-সংঘর্ষের হোক না কেন-নির্বাচন কমিশনসহ স্থানীয় প্রশাসন একটি নূন্যতম মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। এবারে সেটিও গোল্লায় গেছে।

একটি জাতীয় দৈনিকের খবর- খেই হারিয়ে ফেলেছে ইসি। খবরে বলা হয়, ইউপি নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে কমিশন খেই হারিয়ে ফেলেছে। প্রার্থী-সমর্থক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, ভোট গ্রহন কর্মকর্তা-কাউকেই কমিশন নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারছে না। যে কারণে আগের চার ধাপের তুলনায় গত ২৮ মে পঞ্চম দফা নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। দৈনিকটি নির্বাচনে নিয়োজিত কমিশনের মাঠ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বরাতে রিপোর্টটি ছেপেছে।

তাহলে, এই খেই হারানো নির্বাচন কমিশন বাকি দু’ধাপের নির্বাচন কি এভাবেই সম্পন্ন করবে? আগামি নির্বাচনে আরো কত আদম সন্তানের লাশ পড়বে? যাদের জন্য নির্বাচন সেই মানুষই খুন হয়ে গেলে নির্বাচন দিয়ে কি হবে? এত হত্যাকান্ডের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভাবছেন, প্রার্থীদের মনোজগতের পরিবর্তন না হলে সহিংসতা কমবে না। তিনি দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন এভাবে, নির্বাচনে সহিংসতা বেড়েছে, তবে জাল ভোট ও অনিয়ম কমেছে। এর মধ্য দিয়ে স্বয়ং সিইসি কবুল করে নিচ্ছেন যে, এর আগের ধাপগুলোর নির্বাচন ছিল জাল ভোট আর অনিয়মের।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অসীম ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্বের প্রমান মেলে সিইসি কাজী রকিব উদ্দিনের উপর্যুক্ত ভাষ্যে! সেজন্য কমিশনকে প্রশ্নগুলি করা উচিত এবং তার জবাবও তাদের কাছে থাকতে হবে। কেন তারা শুরুতেই প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রনে নেননি? কেন তারা প্রথম ধাপের সহিংসতার পরে নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে বলতে পারেননি, যখনই উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে তখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান কমিশনের কিছু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি থাকলেও মোটামুটি সুষ্ঠ নির্বাচন হওয়ায় আশাবাদ জেগেছিল তারা পারবেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন থেকে আজ অবধি অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচন দেখে প্রশ্ন জাগছে ২০১৩ সালে তারা নিরপেক্ষতার ভান করেছিলেন কি কারো বিশেষ নির্দেশে? এরপরে প্রয়োজনের সময় তারা খোলস ছেড়ে আবির্ভূত হলেন স্বমহিমায়, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হলো। তারা এটি কেন, কার স্বার্থে করলেন?

কমিশন বোধকরি ভুলতে বসেছে, সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারের নয়, প্রজাতন্ত্রের অংশ। রাষ্ট্রের মূলনীতি রক্ষায় জন্য তারা সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু দায়বদ্ধতা গিয়ে ঠেকছে সরকারের কাছে। ইউপি নির্বাচন ২০১৬ এর পাঁচ ধাপে অনিয়ম আর প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতার যে নজির স্থাপিত হোল তা অব্যাহত থাকলে বলতেই হবে যে, আমরা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের শেষ সীমানায় উপস্থিত হয়েছি। দ্বিধা না রেখেই বলা যায়, প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের এই আওয়াজ এবার তৃণমূলকে আঘাত করেছে বিপুলতর বেগে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অতীতে কোনদিন মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা শোনা যায়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের ঘটনা আকছার ঘটেছে। দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে এবার মনোনয়ন বাণিজ্য বি¯তৃত হয়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। নৌকা মার্কা পেলে বিজয় মোটামুটি হাতের নাগালে- এই নিশ্চিন্ততা থেকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতে লাখ লাখ টাকা খরচ করেছে প্রার্থীরা। বাণিজ্যের ফাঁক গলে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বদলে নৌকা মার্কা পেয়েছে অনেক এলাকায় জামায়াত ও জঙ্গী গোষ্ঠীর নেতারা।

মনোনয়ন বাণিজ্য ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার বড় কারণ। অনেক পরীক্ষিত নেতা-কর্মী বাণিজ্যের কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাধিক্য থাকায় সহিংসতা ও খুনের শিকার বেশি হয়েছেন তাদের নেতা-কর্মীরা। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রনহীনতা এবং অর্থের বিনিময় যোগ্যতার মাপকাঠি হওয়া তৃণমূলে ক্ষমতাসীনদের বেসামাল করে দিলেও এখন সেটি দৃশ্যমান হবে না। ক্ষমতার রাজনীতির এটিই নিয়তি।

পতনের শেষ সীমানা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সংগ্রামরত বিএনপির জন্য মনোনয়ন বাণিজ্য হয়ে উঠেছে সবচেয়ে আত্মঘাতী। এ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে দলটির শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্ব। ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত দলটির তৃণমূলে প্রার্থী মনোনয়নে বাণিজ্য তাদেরকে আবার বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিয়েছে- আবার ক্ষমতায় গেলে কি হবে! একে তো দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা, অন্যদিকে জাতীয় সম্মেলনের দু’মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়নি।

বিএনপির ত্যাগী কমীদের অনেকের হতাশা আরো বাড়বে এ কারণে যে ক্ষমতার বাইরে মামলা-হামলা ও দলীয় কোন্দলে অতলে তলিয়ে যাবার উপক্রম একটি দলের কতিপয় নেতারা কি করে মনোনয়ন বাণিজ্যে মেতে ওঠে? কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা জনস্বার্থের পক্ষে সরকার বিরোধী আন্দোলনে এই দল কি কোন ভূমিকা রাখতে সক্ষম? কর্মীরা তাকিয়ে আছেন একক নেত্রী খালেদা জিয়ার পানে, কি পদক্ষেপ তিনি নেন?

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের ভাষায়, “আমরা কঠিন সময় পার হচ্ছি, অত্যন্ত দুরূহ সময় অতিক্রম করছি। এই সময় যদি আমরা সঠিকভাবে না চলি, এই সময় যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না থাকি, এই সময় যদি আমরা নিজেদের মধ্যে অযথা দলাদলি, কোন্দল সৃষ্টি করি, তাহলে সত্যিকার অর্থে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব”।

আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানেন, বিএনপি ধ্বংসস্তুুপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত। সেই সময়ে দলকে ব্যবহার করে বাণিজ্যের পরিনাম কি হতে পারে তাও তার জানা আছে। অর্ধশতাধিক ফৌজদারী মামলায় ভারাক্রান্ত, ভারপ্রাপ্ত থেকে সদ্য পূর্ণ মহাসচিব হিসেবে এও তিনি জানেন, তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিনাম কি? তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, কাউন্সিলের দু’মাস পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এটি চেয়ারপার্সনের একক কতৃত্ব, কারণ কাউন্সিলই ক্ষমতা তার হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ক্ষোভ বাড়ছে, কমিটি গঠনে তারা সম্পৃক্ত নন।

ক্ষমতায় থাকলে কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না। যেমনটি আওয়ামী লীগের অন্তর্কলহ, প্রতিটি জেলা-উপজেলার কোন্দলে দলটি কতটা আক্রান্ত সেটি বেরিয়ে পড়বে কখনও বিরোধী দলে গেলে। নয় নয় করে নয় বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপির ক্ষেত্রে এখন দগদগে ক্ষতের মত দেখা দিয়েছে দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন বাণিজ্য ও দল গোছানোর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। এজন্যই মির্জা ফখরুল আশংকা করছেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার, যা ত্বরান্বিত করছে বিএনপি নেতৃত্বের অরাজনৈতিক ও ব্যবসাদার অংশটি।

সব সরকারী দল মনে করে, ক্ষমতায় থাকার মাঝেই গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও নিজেদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর বিরোধী দলে থাকলে ক্ষমতায় যাওয়াই হয়ে ওঠে একমাত্র লক্ষ্য, সেটি যে কোন প্রকারেই হোক। এইক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অভূতপূর্ব মিল রয়েছে। এজন্য দু’টি দলই ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকার প্রয়োজনে জোট বাধতে পারে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের সাথে বা স্বৈরাচার এরশাদ ও ধর্মান্ধ যে কোন গোষ্ঠির সাথে।

প্রয়াত জেনারেল জিয়া সামরিক শাসনের আওতায় রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করার কথা বলেছিলেন। মানি ইজ নো প্রবলেম বলে তিনি দেশকে কথিত উন্নয়ন জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার পূর্বসূরী পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানও একই কাজ করেছিলেন এবং ঘটা করে উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুখে জিয়ার বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে তোলার জন্য জিয়ার পথই অনুসরন করেন।

অন্যদিকে ক্ষমতা যাওয়া বা টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এরশাদীয় কৌশল অনুসরন করতে গিয়ে বারবার কথিত স্বৈরাচারের দ্বারস্থ হয়েছেন। দলের ভেতর তো নয়ই, শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার কোথাওই তারা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। ব্যক্তি, পরিবার, আত্মীয়তা প্রধান্য পেয়েছে সব স্তরে। সেদিক থেকে এরশাদ সফল। তার অনৈতিক রাজনীতির দুষণ প্রধান রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রান্ত করেছে পরম স্বার্থকতায়।

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটের বড় একটি কারণ হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে তোলা। যখনই প্রতিষ্ঠানগুলি কম-বেশি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, তখনই অনেক ইতিবাচক অর্জন হয়েছে। মোটামুটি সুষ্ঠ,নিরপেক্ষ নির্বাচন পাওয়া গেছে। প্রশাসনও একটি নির্দিষ্ট মানে পেশাদারিত্ব দেখাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকতে অবাধ নির্বাচনকে ভয় পায়। ব্যালটের মধ্য দিয়ে জনগনের মতামত প্রকাশ তাদের জন্য সুখকর নয়। সেজন্যই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে দলদাস করে রাখতে চায়। এর নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত নির্বাচন ব্যবস্থা, সুশাসন ও গণতন্ত্র চর্চা। এই প্রভাবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর শিকার জনগন।

 

 

মোদির দুই বছর : সার্বিক অসহিষ্ণুতার উত্থান

এ জি নুরানি

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

দুই বছর আগে এই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সময়ের পরিক্রমায় অনিবার্যভাবেই ঔজ্জ্বল্য কমে যাবে তা ধরে নেওয়ার পরও  বলা যায়, ভারতে তার ভাবমূর্তি এখন কম আকষর্ণীয় ও আগের চেয়ে অনুজ্জ্বল। বিশেষ করে তাকে ‘কাজের লোক’ হিসেবে অভিহিতকারী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য এটা বিশেষভাবে সত্য।

ব্যাংকগুলো টালমাটাল অবস্থায় পড়ে গেছে; ঋণ-পরিশোধ – যা তারা কখনো দিত না, নামকা-ওয়াস্তে জবাবদিহিতার মাধ্যমে। রফতানি, শিল্প উৎপাদন ও কৃষি প্রবৃদ্ধিতে যে পতন হয়েছে তারাও নিজেদের কাহিনী বলছে; ঠিক যেভাবে কৃষকদের আত্মহত্যা বৃদ্ধির কথাও বলছেন তারা নিজেরাই। ক্ষমতাসীন বিজেপি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। মোদি ‘কংগ্রেস-মুক্ত দেশ’ অভিযান শুরু করে এতে বিরোধীদলের সহযোগিতা আশা করছেন। অরুনাচল প্রদেশ ও উত্তরখন্ড নামের দুটি রাজ্যে বিজেপি এর মধ্যেই সবচেয়ে ভয়াবহভাবে এর শিকার হয়েছে।  গত বছর দিল্লি ও বিহারের নির্বাচনে বিজেপি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম,কেরালা, তামিল নাড়– এবং কেন্দ্র শাসিত এলাকা পাদুচেরির (সাবেক ফরাসি উপনিবেশ পন্ডিচেরি) নির্বাচনে মিশ্র ফলাফল হয়েছে। তবে আসামে তারা ভালোই করেছে।

নির্বাচনী প্রচারকালের ভীতিকর বৈশিষ্ট্য ছিল নরেন্দ্র মোদির অভ্যাসগত সস্তা গলাবাজি, যা কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য বেমানান।

তামিল নাড়–তে তিনি ইতালির সাথে দুর্নীতি-সংশ্লিষ্ট ‘আগস্তাওয়েস্টল্যান্ড’ হেলিকপ্টার চুক্তির কথা বলার সময় সোনিয়া গান্ধীর ইতালিয়ান কানেকশনের কথা বলেছেন, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউপিএ সরকার অপরাধী এবং কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এর জন্য দায়ী। একই কায়দায় তিনি সংবাদপত্র, এনজিও, স্বায়াত্তশাসিত সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করেছেন। ঠিক একই সময় মোদি দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যাতে ইঙ্গিত দেয়, তিনি পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করতে চান। একজন তার গুজরাট আমল থেকেই তার আস্থায় রয়েছেন। তিনি হলেন অমিত শাহ, তাকে বিজেপির সভাপতি নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে জায়গামতোই বসানো হয়েছে। এল কে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, যশোবন্ত সিনহাদের মতো বর্ষীয়ানদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছেন।

অন্য পরিবর্তনটি ছিল মৌলিক প্রকৃতির। প্রধানমন্ত্রীর অফিসটিকে পরিণত করা হয়েছে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে। এর প্রধান একজন আমলার কাছ থেকে মন্ত্রীদের প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হয়।

শপথ গ্রহণের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ভারত সরকারের প্রায় ৫০ জন সচিবের সাথে সাক্ষাত করেন মোদি। তার বার্তা ছিল : কোনো বিষয়ে তাদের সাথে মন্ত্রীদের ‘সংঘাত’ সৃষ্টি হলে তারা ‘সমাধানের’ জন্য বিষয়টিকে সাথে সাথে মোদির নজরে আনবেন। এটা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়িয়ে দেয়; মন্ত্রীদের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও মনোবল কমিয়ে দেয়; মন্ত্রীদের প্রতি সংশ্লিষ্ট বেসামরিক কর্মকর্তাদের শ্রদ্ধা হ্রাস করে; এবং সংসদীয়-ব্যবস্থার জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।

বৈদেশিক ব্যাপারে মোদির কর্ম-সম্পাদন দক্ষতা বা এর অভাব প্রবলভাবে ফুটে ওঠেছে বিভিন্ন দেশে বিরামহীন সফরের মাধ্যমে এই দিকে নজর আকর্ষণ করার মাধ্যমে। বহুল আলোচিত কাঠমান্ডু সফরের মাধ্যমে তিনি নেপালের সাথে সম্পর্ক ভালোভাবে সূচনা করেছিলেন। পাঁচ মাসের অবরোধ নেপালকে চীনের সমর্থন কামনা করার পথে চালিত করে। ৯ মে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভারতির। তিনি এর মাত্র কয়েক দিন আগে সফরটি বাতিল করেন, তিন দিন আগে ভারতে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত দিপ কুমার উপাধ্যায়কে ডেকে নেওয়া হয়। শ্রীলঙ্কা আবার চীনের সাথে সুযোগ সুবিধা চাওয়া শুরু করেছে, যেসব বিষয়ে ভারত আপত্তি উত্থাপন করেছিল।

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের দোলাচল সমর্থকদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও হতবুদ্ধি করে দিচ্ছে। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে রাইউইন্দে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাসায় আকস্মিক সফরের পরপরই এমন বিপর্যয় ঘটে, যা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে প্রায়ই দেখা যায়।

চীনের সাথে সম্পর্ক এখন মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়ের চেয়েও খারাপ। সীমান্ত বিতর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ত্রু টিপূর্ণ। একইভাবে চীনে তার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘সম্প্রসারণবাদী’ হিসেবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রত্যাশাগত সংঘাত এবং এই সংঘাত পরে সৌহার্দ্যকে আক্রান্ত করতে পারে।

মাত্র একটি দিকেই নীতি পুরোপুরি পরিষ্কার দেখা যায়। সেটা হলো হিন্দুৎভা বা হিন্দুত্ববাদীতা। গত দুই বছরে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা বাড়তে দেখা গেছে; গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে; ঘর ওয়াপিসি (হিন্দুতে ধর্মান্তর) প্রকল্প ও ভিন্নমতকে চেপে ধরাটা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। অসহিষ্ণুতার পরিবেশে বেড়েছে।

পরিস্থিতিটি বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় স্বাধীনতা-বিষয়ক মার্কিন কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভালোভাবেই দেখা গেছে। ‘২০১৫ সালে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অবনতি ঘটেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন বেড়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে খ্রিস্টান, মুসলিম ও শিখরা প্রধানত হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে ভীতি, হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছে বিপুলভাবে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা এসব গ্রুপকে নীরবে সমর্থন দিয়েছে এবং উত্তেজনা আরো বাড়াতে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত ভাষা ব্যবহার করেছেন।’

‘এসব বিষয়, এবং সেইসাথে পুলিশের পক্ষপাতিত্ব এবং বিচারিক কার্যক্রমের অপর্যাপ্ততার কারণে পার পেয়ে যাওয়ার ব্যাপক সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো ক্রমবর্ধমান হারে অনিরাপদ অনুভব করছে, ধর্মীয় উদ্দীপনাপ্রসূত অপরাধের কোনো প্রতিবিধান হচ্ছে না।’ মোদি এসব ঘটনায় অর্থপূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন।

(লেখক মুম্বাইভিত্তিক প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, লেখক ও আইনবিদ)

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন (পর্ব ১৪)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী::

তাজউদ্দীনের অনুপস্থিতিতে চার যুব নেতা মুজিবকে কী কী বুঝিয়েছিলেন সে-সম্পর্কে একটি ধারণাও বইটিতে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেছেন তাজউদ্দীন ক্ষমতালোভী, সে জন্যই তিনি কারো সঙ্গে পরামর্শ না-করেই নিজেই নিজেকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করে দিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অমান্য করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যুবনেতাদেরকে তাঁদের কর্তব্য পালনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করবেন কী, তাজউদ্দীন নেতাদেরকে বিভক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তাজউদ্দীনের উচ্চাভিলাষ খুব বেশী, এবং তিনি চেষ্টা করবেন মুজিবকে প্রেসিডেন্টের পদে বসিয়ে সব ক্ষমতা নিজে কুক্ষিগত করতে। কাজেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়া দরকার। তাজউদ্দীন নেতাকে-প্রদত্ত তাঁদের এসব বক্তব্য ও পরামর্শের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতেন না। তবে নিশ্চয়ই তিনি অনুমান করেছিলেন যে যুবনেতারা যা বলেছে সে-সব কথা নেতার অপছন্দ হয়নি। নেতা হয়তো সেগুলোই শুনতে পাবেন বলে আশা করেছিলেন। ব্যাপারটা এক পাক্ষিক ছিল না, ছিল উভয়পাক্ষিক। তবু তাজউদ্দীন আশা করছিলেন যে, মুজিব হয়তো শিগগিরই তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন। সেটা যখন ঘটলো না তখন তাঁর একজন হিতাকাঙ্খীকে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আমি যদি মারা যেতাম তাহলে সেটাই বরঞ্চ ভালো ছিল।’

এস. এ করিম মুজিবের সঙ্গে জিন্নাহর একটি তুলনামূলক চিত্র দিয়েছেন। তিনি দেখাচ্ছেন এঁরা দু’জনেই ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু দু’জনার মধ্যে পার্থক্য ছিল এখানে যে-জিন্নাহ সব ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখতে চাননি, মুজিব যেটা চেয়েছিলেন; ফলে ভীতিজনক দায়িত্বের এক বোঝা বহন করতে গিয়ে তিনি সংকটে পড়েছিলেন এবং দেখতে পাচ্ছিলেন যে, সব কাজেই তাঁর ব্যক্তিগত মনোযোগের দরকার পড়ছে।

কিন্তু কেবল যে অন্যদের কুমন্ত্রণাই মুজিব এবং তাঁর প্রধান অনুসারীর ভেতর ব্যবধান সৃষ্টির একমাত্র কারণ তা বোধ হয় নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরও পার্থক্য ছিল। প্রাথমিক ভাবে চারটি ব্যাপারে তা প্রকাশ পেয়েছিল। ১. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার; ২. মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া তৈরী’র প্রস্তাব; ৩. বিশ্বব্যাংকের সাহায্য গ্রহণ; এবং ৪. বাকশাল গঠন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট আগ্রহ থাকা সত্তে¡ও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানী হানাদারদের বিচার করাটা সহজ হবে না, তাই আপাতত তাদের দেশীয় দোসরদেরকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁর চিন্তাধারাটি অনুসরণ করা দুঃসাধ্য নয়। তিনি ভাবছিলেন যে অতবড় অপরাধ করে কারো পক্ষেই পার পেয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রতিহিংসাপরায়ণতা নয়, ন্যায় বিচারের স্বার্থেই তাই দালালদের বিচার করাটা জরুরি। ওই রকম ভয়ংকর মাত্রায় অপরাধে যারা অভিযুক্ত তাদের যদি শাস্তি না হয় তাহলে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি দেশবাসীর আস্থাটাই দুর্বল হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত এটাও হয়তো তাঁর ধারণার মধ্যে ছিল যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শত্রু রা যদি চিহ্নিত না হয় তাহলে তারা পুনর্বাসিত হয়ে যাবে এবং শত্রু  খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রের চোখ বামপন্থীদের ওপরই গিয়ে পড়বে। মূলত তাঁর আগ্রহেই ‘বাংলাদেশ দালাল আদেশ ১৯৭২’ প্রবর্তিত হয়েছিল। তাই ১৯৭৩ সালে যখন তাঁর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন, তাজউদ্দীন তখন হতাশ হয়েছিলেন। তাঁর মনে আশংকা তৈরী হয়েছিল যে এর ফলে হানাদারদের অনুচরেরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ১৯৭৪ সাল থেকেই তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলতে শুরু করেছিলেন, ‘তুমি বিধবা হতে চলেছ। মুজিব ভাই বাঁচবেন না, আমরাও কেউ বাঁচব না। দেশ চলে যাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে।’

মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের উদ্যোগটিও ছিল তাজউদ্দীনের নিজের চিন্তা-প্রসূত। এ সম্পর্কে একটি সরকারী ঘোষণাও প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল যে, অর্থনীতির পুনর্গঠন ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার দুরূহ কর্তব্য সম্পাদনের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এ বাহিনীটি গঠিত হবে। কিন্তু ওই ঘোষণাটি কার্যকর করা হয়নি, তার বিপরীতে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল, যার অধিকাংশ সদস্যই এসেছিলেন মুজিববাহিনীর ধারাপ্রবাহ থেকে। পরবর্তীতে দেখা গেছে যে মুজিববাহিনীর মতোই রক্ষী বাহিনীরও প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বামপন্থীদেরকে নির্মূল করা। এতে করে আল বদর রাজাকারদের সুবিধা হয়েছে, তারা দম ফেলবার এবং ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসিত ও সুসংগঠিত হবার সুযোগ পেয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেয়ার ব্যাপারে তাজউদ্দীন একেবারেই উৎসাহী ছিলেন না। প্রথমদিকে তিনি এমন ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ আমেরিকার কাছ থেকে কোনো প্রকার সাহায্য নেবে না। বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে তাঁর অনাগ্রহের একাধিক কারণ ছিল বলে আমরা ধারণা করতে পারি। প্রথমত বিশ্ব ব্যাংক মানেই আমেরিকা; ১৯৭২ সালে ওই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রবার্ট ম্যাকনামারা, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসাবে ভিয়েতনামের যুদ্ধের স্থপতিদের যিনি ছিলেন পুরোধা; তাজউদ্দীনের পক্ষে তাই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা ম্যাকনামারা অনুরাগী হবার কারণ ছিল না। অনাগ্রহের মূলে সম্ভবত অন্য দুটি কারণও ছিল। একটি হলো একাত্তরের যুদ্ধে আমেরিকার শত্রু তা। অপরটি বাংলাদেশ কারো তাবেদার হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, তাজউদ্দীনের এই ঘোষিত নীতি; যাকে স্বপ্নও বলা চলে। (চলবে)

দিগম্বর থেকে কান ধরে ওঠ-বস্, এরপরে কী

শাহাদত হেসেন বাচ্চু::

ময়মনসিংহের মমিনুন্নেসা কলেজের শিক্ষক ফরিদ উদ্দিনকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে দিগম্বর করে ঘোরানো হয়েছিল। সেটি ২০১৪ সালের অক্টোবরের ঘটনা। খবরের কাগজে এটি প্রকাশিত হযেছিল তবে তা নিয়ে কেউই প্রতিবাদী হয়ে ওঠার সাহস পাননি! এক সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ উদ্দিন এখন কোথায় আছেন জানিনা, সংসদ সদস্যও সদ্য প্রয়াত, দিগম্বর করে ঘোরানোর বিষয়টিও চাপা পড়ে গেছে অজস্র ঘটনার আড়ালে।

ঘটনাটি উল্লেখিত হয়েছে এ কারণে যে, সম্প্রতি আরেকজন সংসদ সদস্য নারায়নগঞ্জের দোর্দন্ড-প্রতাপশালী সেলিম ওসমান কথিত ধর্ম অবমাননার ছুতোয় শ্যামল কুমার ভক্ত নামের একজন প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করিয়েছেন। সেখানে সরকারী কর্মকর্তারাসহ অনেক মানী ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। কান ধরে ওঠ-বস করানোর সময় মাঠ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ বলে উল্লাসধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। মিডিয়ার কল্যাণে এর পূর্বাপর সকল ঘটনা এখন দেশবাসীর জানা। অচিরেই আরও কোন ঘটনার আবর্তে স্বাভাবিক নিয়মে এটিও চাপা পড়ে যাবে এবং নতুন ঘটনা নিয়ে মেতে উঠবেন সকলে।

সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।  তার নেতা হচ্ছেন এক সময়ের রাষ্ট্রপতি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত আলহাজ্ব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সেলিম ওসমানদের পরিবারের অভিভাবক হচ্ছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। ২০১৪ সালের জুন মাসে জাতীয় সংসদে মৃত্যুভীতির কথা বলেছিলেন এই পরিবারের আরেকজন- ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রীর সহানুভূতি ও তাদের পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পেয়েছিলেন।

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেছিলেন, “… কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু কোন পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় বা ধ্বংস করার প্রচেষ্টা, সে বিষয়ে জাতিকে সজাগ থাকতে হবে, … যারা বারবার আঘাতের লক্ষ্যে পরিনত হন। ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য কিছু হলেও বড় করে দেখা হয়। অনেকে বড় বড় অপরাধ করে, কিন্তু তা কেউ দেখে না…”।

দলÑমত নির্বিশেষে ১৫ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী বিশেষ পরিবার, বিশেষ মানুষের পক্ষ নিতে পারেন এটি বিশ্বাস করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী যাকে “ক্ষেত্র বিশেষে সামান্য কিছু” বলেছিলেন, তা যে কত ভয়ঙ্কর সেটি জানেন নারায়নগঞ্জের মেয়র আইভি রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য কবরী, আকরাম হোসেন প্রমুখ। এরা সবাই সক্রিয় আওয়ামী লীগার। আরও জানেন, তিনি রাফিউর রাব্বি ও তার স্ত্রী। যাদের কিশোর সন্তান ত্বকীকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরে খুন করা হয়েছে। অসংখ্য সাধারন মানুষও জানেন, জিজ্ঞাসা করে দেখুন, জানা যাবে।

এই ধারাবাহিকতাই চলছে, যার সবশেষ শিকার শিক্ষক শ্যামল ভক্ত। স্কুল শিক্ষকদের এতদিন লাঠিপেটা করে, পিপার -স্প্রে দিয়ে শাসন করা হয়েছে। এখন ‘মাননীয় সংসদ সদস্য’ স্কুল শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করাচ্ছেন, নাকি বাংলাদেশ কান ধরে ওঠ-বস করছে! ঘটনা এখানেই থেমে নেই। শিক্ষক নির্যাতনের পরে তাকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মাঠে নামানো হয়েছে হেফাজতসহ ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে। তাদের মাধ্যমে দাবি তোলা হয়েছে ধর্ম অবমাননাকারী শিক্ষকের ফাঁসি। এমনিতেই দেশের প্রচলিত আইন ও শাসনব্যবস্থা প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ। এতসবের মধ্য দিয়ে যে সত্যটি মুখ ব্যাদান করে আছে তা হচ্ছে, দেশের অনেক জায়গায় ধর্মীয় উস্কানীর সাথে এখন সাঙ্গ-পাঙ্গরাই জড়িত।

ঢালাওভাবে বলার অবকাশ নেই, তারপরেও অনেক সংসদ সদস্য তাদের এলাকায় প্রাচীন সামন্ত প্রভু হয়ে উঠেছেন। তারা যেন অনেকটা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, সরকারের ভেতরে সরকার। সেলিম ওসমান, শামীম ওসমান, মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন, আমানুর রহমান রানা, আব্দুর রহমান বদি বা এদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বাংলাদেশে একেকটি রূপক মাত্র। আগের কথা বাদ দিলে গত দু’দশকে দেশে এরকম হাজারও মানুষ তৈরী হয়েছে নষ্ট-ভ্রষ্ট রাজনীতির যাত্রায়। এরা জাতিকে দিগম্বর করছে, কান ধরে ওঠ-বস করাচ্ছে, সামন্ত্র প্রভুর আদলে মানুষের ওপর নির্যাতনের খাঁড়া নামিয়ে আনছে। শিশুকেও গুলি করতে দ্বিধা করছে না।

আইন কখনও-সখনও এদের নাগাল পেলেও বিচার নাগাল পায় না। একটি হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী টাঙ্গাইলের সংসদ সদস্য আমানুর রহমান রানাকে পুলিশ খুঁজেই পায়নি। অবশেষে দীর্ঘকাল পরে আমানুরের বাসায় একটি মাল ক্রোকের মহড়া দেখেছে সবাই। ২০১৪ সালে বিহারীদের উচ্ছেদ করতে মিরপুরে বিহারী ক্যাম্পে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনা চাপা পড়ে গেছে। ঐ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দূর্ঘটনা নামক পরিকল্পিত খুনের শিকার হয়েছে। অভিযোগঃ এ ঘটনায় সংসদ সদস্য জড়িত বলে মামলা এগোয়নি। খুলনায় বিথার হত্যাকান্ডের চার্জশীটভুক্ত আসামী  সংসদ সদস্যকে অধিকতর তদন্ত করে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সংসদ সদস্য শাওনের গাড়িতে তার পিস্তলের গুলিতে নিহত দলীয় কর্মী ইব্রাহিম হত্যা মামলায় চার্জশীট থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

অন্যায়, অপরাধ, এমনকি খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেবার জন্য রাষ্ট্র এখানে একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু করেছে। এই দায়মুক্তির বিষয়টি অতীতেও ছিল, কিন্তু এমন ঢালাওভাবে অতীতে প্রয়োগ হয়েছে বলে জানা যায় না। দলীয় কর্মীকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এজাহারভুক্ত আসামী হলেও দু’জন সংসদ সদস্যকে দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে সংসদ সদস্যর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও এজাহার বা তদন্তে তার নাম আসেনি। ওপর মহলের চাপ ও একপেশে তদন্তের ফোঁকর দিয়ে নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও গডফাদাররা পার পেয়ে যাচ্ছেন।

সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি দন্ড মওকুফ করে দিচ্ছেন। অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ২২ জন আসামী দন্ড রদ করে দিয়েছেন রাষ্টপতি। এই ধারায় সবশেষ ফঁসির দন্ড মওকুফ করা হয়েছে প্রথমবার নাকচ হয়ে যাওয়া ফরিদপুরের যুবলীগ নেতা আসলাম ফকিরের। তার জন্য ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তত ছিল এবং অনেকটা চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের মত তার মৃত্যুদন্ড মওকুফের খবর আসে।

হত্যা মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ড বহাল থাকা আসামীদের দন্ড রদ করায় সকল অন্যায়- অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি উৎসাহিত হচ্ছে এবং দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত অপরাধীরা অনেকটা সুরক্ষিত এবং অভয়ারণ্য মনে করছে দেশটিকে। এই অন্যায্যতা-অন্যায় প্রতিহত করার জন্য দেশে রাজনৈতিক শক্তি অবশিষ্ট না থাকায় জনগন সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে।

দায়মুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে অনেকগুলি মাইলফলক স্থাপন করেছে। সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের যেসব সাবেক- বর্তমান মন্ত্রী-এমপিদের যে অস্বাভাবিক সম্পদ বিবরনী দাখিল হয়েছিল, তারা এখন দুদকের বিবেচনায় দায়মুক্ত। সম্প্রতি টেকনাফের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির বিপুল সম্পদ দায়মুক্ত হয়েছে। গত ১৮ জুন ২০১৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার সূত্র ধরে প্রথম আলো পরিবেশিত প্রধান খবরের শিরোনামে বলা হয়েছিল, “মানব পাচার, ইয়াবা, রোহিঙ্গা বৈধকরণ তিন তালিকাতেই এক নম্বর সংসদ সদস্য বদি’’। এরকম একজন ব্যক্তির নাগাল পাচ্ছে না রাষ্ট্র-আইন-বিচার আর দুদক তাকে দিচ্ছে বিশাল সম্পদ অর্জণের দায়মুক্তি।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের যে শক্ত প্রতিদ্বন্ধীতার মুখে পড়ার কথা ছিল সেটি হয়নি। তাদের কৃতকর্মের জবাবদিহিতা ব্যালটে দিতে হয়নি। একক ও প্রায় প্রতিদ্বন্ধীতাবিহীন নির্বাচনে সেটি তিরোহিত হয়। ফলে নির্বাচিতদের একটি বড় অংশই সবচেয়ে বেপরোয়া ও জবাবদিহিতাহীন মানুষ। কোন সমালোচনা বা বিরুদ্ধাচারণ কিংবা ইতিবাচক পরামর্শও তারা সহ্য করছেন না। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় আইন প্রণেতা হিসেবে তারা শুধুমাত্র ব্যক্তির কাছে দায়বদ্ধ, জনগনের কাছে নন। এজন্যই এলাকায় একেকটি মিনি সাম্রাজ্য তারা কায়েম করেছেন, যার দন্ডমুন্ডের কর্তা তিনি।

পরিবারতন্ত্র, পরিবার, পরিবারের মান-মর্যাদা এগুলি সামন্ত সমাজের প্রতীক এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি পরিত্যাজ্য। কিন্তু বাংলাদেশ হাঁটছে পেছন যাত্রায়। এজন্য এখানে ব্যক্তি, পরিবার কৌলিন্য মুখ্য হয়ে উঠছে। এর মূল্য দিতে হচ্ছে জনগনকে। ইতিহাসের বড় শিক্ষাটি মনে রাখছেন না কেউ যে জনগনের সম্মিলিত ইচ্ছার কাছে ব্যক্তি ইচ্ছা মুখ্য হতে পারে না। জনগনের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটাতে রাজনৈতিক শক্তি কি দাঁড়াবে বাংলাদেশে? প্রয়াত লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ এক যুগ পরেও কতটা প্রাসঙ্গিক সেটি বোঝার জন্য তাকে উদ্বৃত করা হচ্ছে। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় সে সময়ে তিনি লিখেছিলেন; “সকাল থেকে মধ্যরাত, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত এখানে নিরন্তর গর্বিত মিথ্যাচার ও আরও মিথ্যাচারের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়। রাষ্ট্র অবিরল শেখায় যে মিথ্যাচারই সত্যাচার, দুর্নীতিই সুনীতি, অত্যাচারই জনগনকে সুখী করার পদ্ধতি, প্রতারণাই সুসমাচার, অনধিকারই অধিকার, বর্বরতাই সংস্কৃতি, অন্ধকারই আলোর অধিক, দাম্ভিকতাই বিনয়, সন্ত্রাসই শান্তি, মৌলবাদই মুক্তি, মুর্খ অসৎ অমার্জিত ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র তান্ডব আর নিষ্পেসনই গণতন্ত্র” (সূত্র: আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, হুমায়ুন আজাদ, পৃঃ ১৪-১৫  )।

অকাল প্রয়াত লেখক এটি যখন লিখেছিলেন তারচেয়ে কি বদলেছে কোনকিছু? এখন আমরা শুধু হুমায়ুন আজাদের আত্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি কথিত দিন বদলের বাংলাদেশে!

 

 

শুধু পশ্চিমবঙ্গের দিকে নয় আসামের দিকেও তাকান

আমীর খসরু ::

ভারতের চারটি রাজ্যের সদ্য সমাপ্ত বিধান সভা নির্বাচনের ফলাফলের গুরুত্ব দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিশেষ করে বিজেপি’র জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫’র শেষের দিকে বিহার এবং দিল্লীতে বিজেপি’র পরাজয়ের পরে ‘মোদী জোয়ার’-এ ভাটা পড়েছে বলে ভারতীয় বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন। এমনটাও বলা হচ্ছিল যে, এই দুটো রাজ্যে বিজেপি’র পরাজয়ের অর্থ অসহিষ্ণুতার পরাজয় এবং ভারতের বিজয়। যাহোক, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য চারটি রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেশী ভারতের দুটো রাজ্য অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনী ফলাফল গুরুত্বের দাবি রাখে।

তবে বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস দ্বিতীয় দফায় জয়লাভ করেছে বিপুলভাবে এবং মমতা ব্যানার্জী শপথ নেবেন দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। এ সপ্তাহেই তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।

মমতা ব্যানার্জীর বিজয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা বেশ উৎফুল্ল এবং আনন্দিত। ত্বড়িৎগতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইচ মাহমুদ আলী এক বার্তায় মমতা ব্যানার্জীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই অভিনন্দন বার্তাটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দ্বিতীয় দফার বিজয়ে মমতার উদ্যোগে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অধিকতর উন্নয়ন হবে। তবে ক্ষমতাসীনদের মনে এই আশাবাদের জন্ম নিয়েছে যে, তিস্তা চুক্তি মমতার দ্বিতীয় দফায় সম্পন্ন হবে। কিন্তু বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিদের মমতার বিজয়ে উৎফুল্ল এবং আনন্দিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সমস্যাবলী সমাধানে প্রথম দফায় মমতার কর্মকান্ডগুলো একটু স্মরণে রাখা প্রয়োজন। তিস্তার পানিবন্টন নিয়ে তার ভূমিকা কী ছিল তা সবারই জানা। ভারতে কংগ্রেস সরকারের সময়ে অর্থাৎ ২০১১-এর সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর ঢাকা সফরকালে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি হয়েই যাচ্ছে-এমন উচ্চ আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। কিন্তু মমতা তখন আসেনইনি, বরং তিস্তা চুক্তির খসড়ায়ও তিনি আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি না আসায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ কথাটি বলতে শুরু করলো যে, মমতার কারণেই তিস্তা চুক্তি হয়নি এবং হচ্ছে না। এরপর তিস্তা প্রশ্নে মমতাকে রাজি করানোর জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এটা মনে করা হচ্ছিল যে, মমতা রাজি হলেই তিস্তা চুক্তি হবে। কিন্তু এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, মমতা ব্যানার্জী যা কিছু করবেন তা ভারতের জন্য, নিজেদের স্বার্থেই। এখানে মমতা ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একই ভূমিকা নেবে এটাই নিশ্চিত; এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলেই তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির ভবিষ্যত কী তা সহজেই অনুমেয়। মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশনীতি শুধুমাত্র তিস্তা চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমনটা নয়। ফারাক্কা বাধের একটি স্লুইসগেইট /ভেঙ্গে যাবার কারণে বাংলাদেশ যখন কিছুটা পানি পেয়েছে, তখন এর বিপক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন মমতা। ফারাক্কা বাধ দিয়ে বাংলাদেশে কেন পানি যাচ্ছে তা নিয়ে ২০১২ সালের মার্চে মমতা ব্যানার্জী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন এবং সাক্ষাতও করেছিলেন। এ চিঠি এবং সাক্ষাতে বাংলাদেশ যাতে পানি না পায় সে লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে ফারাক্কার বাধ মেরামতের কাজ শুরু করার জন্য তিনি জোর অনুরোধও জানিয়েছিলেন। এছাড়াও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মমতার ভূমিকা কী তার অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব। কাজেই দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে এমনটা যারা বিশ্বাস করেন তাদের পুনরায় বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

বাংলাদেশের বরং বেশি মাত্রায় দৃষ্টিনিবদ্ধ করতে হবে আসামের বিধান সভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে। আসামে বিজেপি’র তেমন কোনো অস্তিত্ব ছিল না ইতোপূর্বেকার নির্বাচনগুলোতে। এবারে সেই বিজেপিই ১২৬টি আসনের মধ্যে একাই পেয়েছে ৬০টি এবং জোটগতভাবে পেয়েছে ৮৬টি। আসাম নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, বিজেপি’র প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ-সহ বাঘাবাঘা সব নেতারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন। নির্বাচনের আগে তারা সেখানে বসবাসকারী মুসলমানদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই চিহ্নিত করে এটিকেই প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে গ্রহণ এবং শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসামে বেশ কিছু নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়ে মুসলমানদের ভোটাধিকার থাকবেনাসহ এ জাতীয় নানা বক্তব্য দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং স্পষ্টভাষায় বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত সিল করে দেয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ঠেকানো হবে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেয়া হবে বলেও তিনিসহ পুরো বিজেপি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাদের সবার মুখে ছিল একই কথা।

তবে বাংলাদেশের অনেক বিশ্লেষক এখন বলতে চাইছেন, এসব বক্তব্য নির্বাচনী বোল-চাল বা ইলেকশন রেটরিক্স। কিন্তু এই বিশ্লেষকদের সাথে পরিপূর্ণ একমত হওয়া বাস্তব পরিস্থিতিতেই যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয় না। আসামের বিধান সভা নির্বাচনে জয়লাভের পরে বিজেপি’র নতুন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সানোয়াল তার সরকারের অগ্রাধিকারগুলো কি হবে তার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে- আগামী দু’বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করে দেয়া হবে। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের ব্যাপারে তার সরকার কঠোর হবে এমন কথাও রয়েছে ওই অগ্রাধিকারের তালিকায়। আর এ লক্ষ্যে আসামের নাগরিকদের জন্য তথ্য ভান্ডার গড়ে তোলার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। কাজেই বিজেপি’র অনুপ্রবেশ ইস্যুটি নিছক নির্বাচনী রেটরিক্স বলে মেনে নেয়া কতোটা যুক্তিযুক্ত তা বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

আসামে বিজেপি’র উত্থান শুধুমাত্র অনুপ্রবেশকারী হঠাও বা সীমান্ত সিল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত হবেনা। কারন, আসামে বিজেপি’র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যে আরও বিস্তার লাভ করবে তা নিশ্চিত। আসাম বিজেপি কেন্দ্রীয় বিজেপি’র মতোই অসহিষ্ণুতার রাজনীতির পথেই এগিয়ে যাবে বলেই ধারণা করা যায়। আর বিজেপি শুধুমাত্র আসামের মধ্যেই তাদের সীমাবদ্ধ রাখবে তা নয়, ক্রমান্বয়ে ত্রিপুরাসহ সাত রাজ্যের অন্যান্যগুলোর দিকেও তারা হাত বাড়াবে। এটা মনে রাখতে হবে, আসামে সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণু রাজনীতির বিস্তার এবং উত্থানের নানাবিধ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের উপরও পড়বে। বাংলাদেশের বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই রাজনীতিতে যারা বিশ্বাসী তারা এমন একটি পরিস্থিতির সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে-এটাই স্বাভাবিক।

কাজেই শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের দিকে না তাকিয়ে থেকে আসামের দিকেও দৃষ্টিনিবদ্ধ করা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশ কী আদৌ চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পাবে?

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশের রাজকোষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার খোয়া যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ১৫ মে প্রাথমিক তদন্ত  প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সুইফট দায়ী। কারণ, সুইফট আরটিজিএফের সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার ফলে এটি ঘটেছে। সুইফট নিজেই তাদের সার্ভার ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার ব্যবস্থা করেছিল। এতে এই অর্থ চুরি হয়ে গেছে।  দুটি দেশের হ্যাকাররা রিজার্ভ চুরির জন্য বিশেষ একটি ম্যালওয়্যার তৈরি করে। এর মাধ্যমে এই অর্থ চুরি করা সম্ভব হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করেনি। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অসতর্কতা, অসাবধানতা, অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতা ছিল’’। এর আগে একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা এবং সিআইডি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেমের সঙ্গে সুইফট ম্যাসেজিং সিস্টেমকে যুক্ত করতে গিয়ে সুইফটের টেকনিশিয়ানরা নিরাপত্তায় কিছু ফাঁকফোকড় তৈরি করে গিয়েছিল’। এর আগে গত ১১ মে সুইফট’র পক্ষ থেকে প্রদত্ত বার্তায় দাবি করা হয়েছে, ‘‘এ অভিযোগ ভিত্তিহীন, মিথ্যা, বেঠিক এবং বিভ্রান্তিকর; অন্যান্য সুইফট ব্যাবহারকারীর মতো বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফট নেটওয়ার্ক সিস্টেম এবং এর সাথে যুক্ত পদ্ধতি এবং এর নিরাপত্তা বিধান ব্যবস্থা দায়ী, কোনোভাবেই সুইফট কর্তৃপক্ষ নয়’’। জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে একটি আর্থিক সম্মেলনে সুইফট’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘‘শেষ পর্যন্ত আমাদের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। আমাদের দৃষ্টিতে এটি গ্রাহকের প্রতারণা। আমার মনে হয় না এটাই প্রথম এমন একটি ঘটনা এবং এটাই শেষ’’। প্রশ্ন হলো, এ পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করা হলেও আসলে এ রাজকোষ চুরির জন্য কে বা কারা দায়ী? এভাবেই কি শেয়ার বাজার কেলেংকারিসহ অন্যান্য ব্যাংক কেলেংকারির মতো এটিও চাপা পড়ে যাবে?

রয়টার্স’র প্রতিবেদনে তদন্ত কাজে বাংলাদেশ নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ সূত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়, ‘‘ম্যালাওয়ার ভাইরাসের মাধ্যমে ৩টি হ্যাকার গ্রুপ আবারো সিস্টেমে আক্রমণ করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেটওয়ার্কে এখনো কিছুটা ঝুঁকি আছে। ব্যাংক গভর্নর এবং  বোর্ডকে এটা বুঝতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নেটওয়ার্ক এখনো নিরাপদ নয়, এখনো হ্যাকারদের আক্রমণের সম্ভাবনা আছে’’। ফেডারেল ব্যাংক ও ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সুইফট ম্যাসেজিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকে। উল্লেখ্য, রাজকোষ চুরির ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক এক মাসের বেশি চাপা দিয়ে রাখে এবং ফিলিপাইনের পত্রিকায় প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় হয়।

ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনা প্রকাশের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কেন নানামুখী তথ্য দিচ্ছে বা চরম গোপনীয়তা বজায় রাখছে তা স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা চুরি হয়েছে? গত ১৩ মে জানা যায়, বাংলাদেশের ৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কয়েক লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে। এভাবেই দেশি-বিদেশি বর্গীদের কবলে পড়েছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তদন্ত কাজে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থার সূত্রে রয়টার্সের ১৩ মে প্রতিবেদনে বলা হয়, হ্যাকারদের বাইরে ব্যাংকের ভেতরে সুইফট নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত দুটি গ্রুপ এ হ্যাকিংয়ের সাথে জড়িত এবং এর মধ্যে একটি একটি ‘জাতীয়-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (“nation-state actor”) -যা ধ্বংসাত্মক হিসাবে পরিচিত নয়, তবে তথ্য চুরির সাথে সরাসরি জড়িত। শুধু তাই নয়, ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ খোয়া যাওয়ার ঘটনার দায় নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে যায় লাগাতার। গত ১১ মে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, মার্কিন সংস্থা ‘এফবিআই’ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত একজন ব্যাংক কর্মী জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পেয়েছে। এফবিআই দাবি করেছে, সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণে ইঙ্গিত রয়েছে, আরও কয়েকজন বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার-ব্যবস্থায় ঢুকতে হ্যাকারদের সহযোগিতা করে থাকতে পারে।

এদিকে, বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কম্পিউটারে ঢুকে হ্যাকাররা গত ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার চুরির  চেষ্টা করেছিল। অর্থের একটি বড় চালান ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যায়। আর এটা সম্ভব হয়, কারণ ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবরে আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) নামে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের বিশেষ সফটওয়্যার বসানোর সময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে সাইবার ও আইটি নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত ফায়ারওয়াল সফটওয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তার অনুমোদন না নিয়েই কম্পিউটার নেটওয়ার্ক থেকে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, এ ফায়ারওয়াল উঠানোর আগে ২০১৫ সালের মে মাসেই ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাকাতি শাখার ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়- যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ জমা হয় এবং এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, সবগুলো অ্যাকাউন্টই ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, রিজার্ভ লুটের ৩ মাস আগে আরটিজিএস স্থাপনে নিরাপত্তা ফায়ারওয়াল নেটওয়ার্ক হতে মুছে দেওয়া এবং ১০ মাস আগে ২০১৫ সালের মে মাসে ব্যাংকে ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা কি একই সূত্রে গাঁথা? এটা কি হ্যাকিং এর নামে রিজার্ভ আত্মসাতের পথ উন্মুক্ত করার জন্যই করা হয়েছিলো? অভিযোগ সত্যি হলে কারা, কি উদ্দেশ্যে সেই সফটওয়ারটা মুছে দিয়েছিলো?

শুধু তাই নয়, সুইফটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুসারে, সুইফট সিস্টেম পরিচালনায় কোনো তথ্য প্রযুক্তি কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়ার শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক আইটি বিভাগের দুই জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়। এমনকি শর্ত লংঘন করে সুইফট নেটওয়ার্কের কম্পিউটারের সঙ্গে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক স্থাপন করে। এবং কেন এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কম্পিউটারের সংযোগ দেওয়া হলো তার উত্তর জানা যায়নি। সুইফট সার্ভার যে কম্পিউটারে রক্ষিত থাকে সে কম্পিউটারকে অন্য কোন সিস্টেম বা লোকাল নেটওয়ার্কে সংযোগ না দেওয়ার শর্ত থাকলেও সুইফট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ও সে কম্পিউটারে আরটিজিএস সিস্টেম কার নির্দেশে এবং কারা সংযোগ করলো? উল্লেখ্য, আন্তঃব্যাংক লেনদেনে (দেশে-বিদেশে) দ্রুত বড় অঙ্কের তহবিল  স্থানান্তরের নামে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক ও বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) সিস্টেম বসানো হয়। সব ধরনের শর্ত উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কম্পিউটার দিয়েই সুইফট ও আরটিজিএসের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অর্থ লেনদেন করতো বাংলাদেশ ব্যাংক। আরটিজিএস বসানোর সময়ে নিরাপত্তা ফায়ার ওয়াল সরানোর কোনো দিকনির্দেশনা না থাকলেও কেন ঐসব কর্মকর্তারা তা তড়িঘড়ি ফেলে দিতে অতি উৎসাহী ছিলেন? এভাবে সিস্টেম দুর্বল করে পরিকল্পিতভাবে চক্রটি রিজার্ভের অর্থ হাতিয়ে নেয় এবং সুইফটের সঙ্গে অরক্ষিত আরটিজিএস সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে সুইফট পদ্ধতিতে দুর্বলতা দেখানোর উদ্দেশ্যেই কি এটা করা হয়েছিলো?

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে যে, দীর্ঘ দিন ধরে সুইফট সিস্টেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক লেনদেন করে আসলেও এতদিন এ সিস্টেমের মাধ্যমে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে আরটিজিএস সংযোগ দেয়ার পরপরই রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি কেন ঘটলো? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, আরটিজিএস সফটওয়্যারটি দ্রুত বসাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা অতি-উৎসাহী ছিলেন। আরটিজিএস বসানোর কার্যক্রমটি আইটি-কমিউনিকেশন বিভাগের হওয়ায় তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন একজন ডিজি’র (ডেপুটি গভর্ণর)’র অধীনে ছিল এবং আরটিজিএস বসানোর সকল কার্যক্রম তিনি তদারকি করছিলেন বলে দাবি করা হয়। কিন্তু আরটিজিএস সফটওয়্যার চুড়ান্তভাবে বসানোর জন্য ওই ডিজির দেশের বাইরে ছুটিতে থাকাকালীন সময়কে কেন বেছে নেওয়া হয়? কেন তার অবর্তমানে এভাবে দ্রুত আরটিজিএস বসানোর ক্ষেত্রে উর্দ্ধতন অনেক কর্মকর্তার বিরোধিতা সত্ত্বেও অন্য একজন ডেপুটি গভর্ণরকে দিয়ে  স্বাক্ষর করানো হয় নথিতে? বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে একজন নির্বাহী পরিচালক ও সিএমএ স্মল সিস্টেম এবি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সিএমএ’র স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশের মেসার্স স্পেক্ট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর। প্রশ্ন হচ্ছে, চলমান দেশি বিদেশি সব তদন্তের আওতায় তাদেরকে যথাযথভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে কি?

বাংলাদেশ ব্যাংক এক কোটি ৯৯ লাখ মার্কিন ডলার শ্রীলংকা থেকে ফেরত আনার দাবি করলেও আরো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন থেকে উদ্ধার করা যায়নি এখনো। যদিও ফিলিপাইন সরকার ব্যবসায়ী কিম অংয়ের কাছ থেকে কিছু ডলার উদ্ধার করতে পেরেছে বলে দাবি করেছে, তবে মূল কুশীলবদের এখনো বের করতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বলছে, অচিরেই এই টাকা ফেরত আসবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির শুনানিতে ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে যে অর্থ ফেরত দেয়া হয়েছে এবং অর্থ ফেরত দেয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার পরিমাণ ১ কোটি ডলারের মতো। বাকি আরও কিছু অর্থের সন্ধানের কথা তারা বলছেন, কিন্তু তার কোনো হদিস করা যায়নি। ফিলিপাইনের ইনকোয়ারার পত্রিকা বলছে, প্রায় চার কোটি ডলারের কোনো হদিস বা সন্ধান ওই দেশের সরকার পায়নি। বাংলাদেশের যে দাবি অর্থাৎ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তারও কোনো ভিত্তি নেই। ইতোমধ্যেই ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, আইনগত জটিলতার কারণে কতোদিন সময় লাগবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পুরো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফেরত পাওয়া যাবে এমন কথা ফিলিপাইনের সরকারও বলছে না, বরং এক্ষেত্রে একটি বড় আশংকার কথাই তাদের দিক থেকে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া ক্যাসিনো আইন আলাদা হওয়ায় ওই ব্যবসায়ীর ফেরত দেয়া অর্থ আদৌ বাংলাদেশ পাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়।  অর্থ চুরির তদন্ত করছে ফিলিপাইনের সিনেট ব্লু -রিবন কমিটি ও অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি)।

ফিলিপাইনের পত্রিকাগুলো দাবি করছে, দ্বিতীয় দফায় আরো ৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার – যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬,৯৬০ কোটি টাকা চুরি করে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। ফেডারেল রিজার্ভের সন্দেহ হওয়ায় তা আটকে দেয়া হয় এবং ফেডারেল রিজার্ভ সে অর্থ ফিরিয়ে নেয়। আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে মুখ খোলেনি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ ছাড়ে ফেডারেল রিজার্ভে সর্বমোট ৩৫টি আদেশ পাঠানোর দাবি করলেও তা যে অসত্য তার প্রমাণ পায় তদন্ত দল। তারা  কম্পিউটারের তথ্য থেকে জানতে পারে, আসলে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার পাঠানোর মোট ৭০টি আদেশ পাঠানো হয়েছিলো। সে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে না থাকায় ফেডারেল রিজার্ভে তা যায়নি। আর এ কারণেই লেনদেনে সন্দেহ হয় ফেডারেল রিজার্ভের, তাই প্রথম দিকের আদেশগুলো কার্যকর করলেও পরের আদেশের বিষয়ে কনফার্মেশন চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন সাড়া না পেয়ে অর্থ ছাড় আটকে দেয় ফেডারেল রিজার্ভ। প্রশ্ন হলো- অসংখ্য প্রশ্নের জবাব মিলছেনা বা কোন জবাবই নেই কেনো? এদিকে, সবশেষ তথ্য দিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থাসমূহ। রয়টার্স এক খবরে বলেছে, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে তিন মাসেরও বেশি সময়। এ অর্থের সিংহভাগ যাঁরা ফিলিপাইনের একটি ব্যাংক হয়ে ক্যাসিনোয় পাচার করেছিলেন, তাঁদের সবাই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদন্তে দেশটির ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকেও (এনবিআই) যুক্ত করা হয়নি পুরোমাত্রায়। সিনেটে যে শুনানি শুরু হয়েছিল, গত সপ্তাহে তাও শেষ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। ঝিমিয়ে পড়েছে ফিলিপাইনের তদন্তও।

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে ভারতেই তীব্র প্রতিবাদ-ক্ষতিপূরণ মামলা

ভারতের আদালতে ১৩ হাজার কোটি রুপির মামলা

অলোক গুপ্ত, থার্ডপোল.নেট ও ওয়েবসাইট অবলম্বনে

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটানো হলে যে কী ভয়াবহ মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে, সেটা প্রমাণ করার জন্য ভারতের অন্যতম নদী বিশেষজ্ঞ দিনেশ মিশ্র দেশটির দুটি বিশাল ব্যারেজের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিলেন। কোশি ব্যারেজ শেষ হয় ১৯৬২ সালে; এর উদ্দেশ্য ছিল কোশি নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু নদীর গতিপথ বারবার পরিবর্তন করার জন্যে অবকাঠামো নির্মানের কারনে বন্যায় ভাসিয়ে দেয় বলে একে বলা হয় ‘বিহারের দুঃখ’। অন্যদিকে, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য নির্মিত ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করা হয় ১৯৭৫ সালে। উভয় ব্যারেজই উদ্দেশ্যসাধনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই প্রবল বন্যা বইয়ে চলেছে কোশি নদীতে। আর কোলকাতা বন্দরে ভরে যাচ্ছে পলিতে। কেবল এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশের নদীগুলোর পানিশূন্যতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য ফারাক্কা ব্যারেজকেই দায়ী করা হয়ে থাকে।

গঙ্গার পানির অভাবে ও বিরূপ প্রভাব যে শুধু বাংলাদেশের ক্ষতি করছে তা নয়। এর ভয়াবহ ক্ষতির কথা তুলে ধরছেন খোদ ভারতের মানুষও। আর এ নিয়ে রিট পিটিশন হয়েছে সেদেশের পরিবেশ আদালত অর্থাৎ ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে ৯ জন ভারতীয় নাগরিকের জনস্বার্থে করা এই রিট পিটিশনে মোট ৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবছর ১৩ হাজার ১০১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এডবিøউএআই-এর কাছে ৩৭৮ কোটি।  কেপিটি’র কাছে ২১৬ কোটি। সেচ বিভাগের কাছে ৪ হাজার ৯৫৭ কোটি। ৩ হাজার ২২৬ কোটি রুপি  ফারাক্কা ব্যারেজ প্রকল্পের কাছে। টিএইচডিসি’র কাছে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি। ইউজেভিএনএল’র কাছে ৭১৯.৪ কোটি রুপি প্রতিবছর। জেভিপিএল’র কাছে ৩৫৬.২ কোটি। এএইচপিসিএল’র কাছে ১ হাজার ৩৮১ কোটি রুপি। এ মাসেই গ্রিন ট্রাইব্যুনালে এই মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

গঙ্গার উপরে ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিবাদে এবার ভারতের বিহার রাজ্যে চলছে তীব্র প্রতিবাদ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চাভিলাষী পানিপথ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গঙ্গায় ছোট ছোট ১৫টি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উত্থাপনা করার প্রেক্ষাপটেই বিহারের মন্ত্রীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। ভারতীয় পার্লামেন্টে ‘ন্যাশনাল ওয়াটার ওয়ে অ্যাক্ট’ পাস করার অল্প কয়েক দিন আগে বিহারের মন্ত্রীরা প্রতিবাদ জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রাজ্য বিধানসভায় বিহারের পানিসম্পদ মন্ত্রী রাজিব রঞ্জন সিং বলেন, ‘এই পরিকল্পনা কেবল পরিবেশগত রীতিনীতির প্রতিই অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়নি, সেই সাথে রাজ্যে আরো বড় বন্যার হুমকিও সৃষ্টি করছে। পানিপথের জন্য এ ধরনের অনেক ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণের ফলে গঙ্গায় ব্যাপক পলি জমা হবে। এতে করে রাজ্যে নদীটির তীরজুড়ে থাকা অন্তত ৩৬টি শহরে বন্যার সৃষ্টি হবে।’

নৌপথ প্রকল্প : ভারতের অব্যবহৃত নদীগুলোকে পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করার জন্য বিলটিতে ১১১টি নদীকে জাতীয় নৌপথের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। প্রায় ১৪,৫০০ কিলোমিটার নাব্য নৌপথ নির্মাণ করার জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৭০হাজার কোটি রুপি (১০ বিলিয়ন ডলার)।

ভারতের সড়ক পরিবহন, মহাসড়ক ও জাহাজ চলাচলবিষয়ক মন্ত্রী নিতিন গাড়করি পার্লামেন্টকে অবহিত করেন, ভারতে নৌপথের মাধ্যমে বাণিজ্য হয় মাত্র ৩.৫ ভাগ। অথচ চীনে ৪৭ ভাগ, ইউরোপে ৪০ ভাগ, জাপানে ৪৪ ভাগ, কোরিয়া ও বাংলাদেশে ৩৫ ভাগ বাণিজ্য হয় নৌপথে। পরিবেশগত উদ্বেগের সাথে সুর মিলিয়ে গাড়করি বলেন, সড়ক পরিবহন অনেক বেশি দূষণ সৃষ্টিকারী, এতে প্রতি বছর ৫০ হাজার দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় প্রায় দেড় লাখ লোক নিহত হয়। অথচ পরিবেশবান্ধব জাহাজ চলাচল খাতের (বাজেট ৮০ বিলিয়ন রুপি, ১.২ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় সড়ক পরিবহনে বাজেট প্রায় ছয় গুণ বেশি (৫৫০ বিলিয়ন রুপি, ৮.৩ ডলার)।

প্রকল্পটিতে ছয়টি জাতীয় নৌপথের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘতমটি হবে ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-১। এটা হবে গঙ্গায় হালদিয়া থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত ১,৬২০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এটা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত হবে। ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ থেকে ৬ হবে ব্রহ্মপুত্র, ওয়েস্ট কোস্ট ক্যানেল, গোড়াবারি, কৃষ্ণা, ব্রহ্মমনি ও বরাক নদী দিয়ে।

ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে ১-এর জন্য এর মধ্যেই ৪২ বিলিয়ন কোটি রুপির প্রকল্প চূড়ান্ত হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক এর অর্থায়ন করবে। এটা পুরো বিহার রাজ্য দিয়ে উত্তরপ্রদেশের বারানসি থেকে পশ্চিমবঙ্গের হালদিয়া পর্যন্ত পানিপথ রচনা করবে। পুরো বিহার সম্পৃক্ত থাকাতেই রাজ্যটির রাজনীতিবিদেরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেছেন।

ভয় ও শংকা: এই ১,৬০০ কিলোমিটারের এই নদীপথের প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মিত হবে। রঞ্জন বলেন, এই প্রকল্পের ফলে যে বিপুল পলি জমা হবে, তা নিয়ে কী করা হবে, সে ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা নেই। পলি জমে নদীর তলা উঁচু হবে, ফলে বন্যার সৃষ্টি হবে।

বিহার রাজ্যের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যটির ৭৪ ভাগ এলাকাই বন্যাপ্রবণ। রাজ্যের ৩৮টি জেলার ২৮টিই প্রায় প্রতিবছর বন্যায় আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ১৫টিতে প্রতি বছরই বর্ষায় বন্যাকবলিত হয় বলে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে বিহার সরকারের তীব্র প্রতিবাদকে দেখা হচ্ছে বিরোধী দলীয় শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার বিরোধ হিসেবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিকল্পনা নিয়ে ভীত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে রাজ্য সরকারের।

বিহারের স্টেট এনভায়ারমেন্ট ইমপ্যাক্ট এ্যসেসমেন্ট অথরিটির সদস্য নুপুর বোস বিহারের গঙ্গার পানিবিজ্ঞান ইউরোপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘নদীটির বিশাল অংশই রয়েছে ভূকম্প জোনে, এখানে ১৫টি ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণ হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’ তিনি আরো বলেন, প্রকল্পটির যথাযথ পরিবেশ মূল্যায়ন দরকার। তিনি দাবি করেন, নৌপথ প্রকল্পটির ব্যারেজ ও ড্যামের নক্সা প্রায় পুরোপুরি ফারাক্কা ব্যারেজের মতো। তিনি বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজ ইলিশ মাছকে নির্মূল করে দিয়েছে। আর নৌপথ গঙ্গার ডলফিনের আবাসকে শেষ করে দেবে।

তার এই কথা প্রকল্পটির সম্ভাবনা শেষ করে দেওয়ার জন্য নয়। গাড়করির মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, নৌপথ প্রকল্পটি ভারতের পরিবহন খাতে বৈপ¬বিক পরিবতন আনবে। তবে বাস্তবায়নের আগে এই বিশাল প্রকল্প নিয়ে আরো চিন্তাভাবনা করা দরকার।

বিপর্যয়কর প্রকৌশল : দিনেশ মিশ্র উল্লেখ করেন, ১৯৫২ সালে বিহারে মাত্র ৬০ কিলোমিটার বাঁধ ছিল। বর্তমানে তা ৩,৭০০ কিলোমিটারের বেশি। এসব ব্যারেজ ও বাঁধের অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণই বন্যার অন্যতম কারণ। ২০০৮ সালে একটি বাঁধে ফাটল ধরায় বিহারে ৩৫ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। কোশি নদীর তীরবর্তী সাতটি জেলার লোকদের উদ্ধারের জন্য প্রায় প্রতি বছরে বর্ষা মওসুমে ত্রাণ ক্যাম্প খুলতে হয়।

ফারাক্কা ব্যারেজের কথা উল্লেখ করে নুপুর বোস বলেন, কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত রেখে চলাচল উপযোগী করে রাখতে হুগলি নদীতে ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত করা দরকার। তার মতে, ‘ব্যারেজটি উদ্দেশ্যসাধনে ব্যর্থ হয়েছে, এটা এখন প্রকৌশলগত ব্যর্থতার সমাধিতে পরিণত হয়েছে।

২০১২ সালে একদল আইনপ্রণেতা ফারাক্কা ব্যারেজ ধ্বংস করার দাবি জানিয়েছিলেন। নুপুর বোস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘গঙ্গায় ১৫টি ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে কী ঘটবে, তা আমরা কল্পনা করতে পারি।’

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো পরিকল্পনা কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না বিহারের মন্ত্রীরা। জাতীয় পার্লামেন্টে পাস হওয়ার কোনো বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো সহজ নয়। আবার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যে বিপদ ঘনিয়ে আসবে, সেটাও ভয়াবহ। এ প্রেক্ষাপটে রাজিব রঞ্জন বলেন, ‘আমরা বিপর্যয়কর প্রকল্পটি রুখতে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করব।’