Home » সম্পাদকের বাছাই (page 44)

সম্পাদকের বাছাই

রানাপ্লাজা হত্যাযজ্ঞ : এতোদিনেও কী আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়েছে?

রিনা চন্দ্রন, ওয়েবসাইট অবলম্বনে

রানা প্লাজা ট্রাজেডির তিন বছর হয়ে গেল। প্রায় ১১০০ কারখানা শ্রমিকের মারা যায় এ দুর্ঘটনায়। এখন শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ নজরদারিতে রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়ায় উন্নতির গতি শ্লথ।

বৈশ্বিক ফ্যাশন রিটেইলার্সরা বলছেন, এ ট্রাজেডির ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমিকদের  সুরক্ষা ও ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন। সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা আনতে আইনও পাশ হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেসের ‘সেন্টার ফর বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর সহ-পরিচালক সারাহ লাবোউইটয। তিনি বলেন, ‘প্রায় ২০০টি ব্রান্ড একসঙ্গে কাজ করছে। অবশ্যই স্বচ্ছতা আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক বিপনী ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার ইস্যুর দিকে নজর বেড়েছে।’

কিন্তু লাবোউইটয বলেন, ‘আগ্নি-নিরাপত্তা, ভবন নিরাপত্তা, শ্রমিক সুরক্ষা – ইত্যাদি ইস্যুতে যথেষ্ট বাস্তবিক আলোচনা হয়নি, অর্থায়নও হয়নি। তাই যথেষ্ট পরিবর্তনও আসেনি।’ তিনি রানা প্লাজা ট্রাজেডির পরে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।

শিল্পখাতের ইতিহাসে রানা প্লাজা বিপর্যয় ছিল সবচেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার একটি। ৮ তলা ভবন ধ্বসে পড়ে মারা যায় ১১৩৫ জন মানুষ। এ ভবনে ছিল ৫টি গার্মেন্ট কারখানা। কারখানাগুলোয় নির্মিত পোশাক যেত বৈশ্বিক ব্রান্ডগুলোর শো-রুমে। এ দুর্ঘটনার ফলে বিশ্বের তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ে। দাবি উঠে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের। বাংলাদেশ থেকে যারা পোশাক কিনছে, সেসব কো¤পানির ওপরও চাপ বাড়ে।

পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাক প্রবেশের ওপর কর নেই। এছাড়া শ্রমিকদেরও বেতন খুব কম। ফলে এটি অচিরেই দাঁড়িয়ে যায় এমন এক শিল্পে, যেখান থেকে বার্ষিক আয় হয় ২৫০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের ষাট শতাংশ পোশাকই রপ্তানি হয় ইউরোপে। আমেরিকায় যায় ২৩ শতাংশ। কানাডায় ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি ৬৮ ডলার। অথচ, চীনে এ মজুরি ২৮০ ডলার। তবে এরপরও চীনই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।

বৃটেনের স্বল্পমূল্যের খুচরা পোশাক বিক্রেতা কোম্পানি প্রাইমার্ক। রানা প্লাজায় তাদেরও কিছু পোশাক তৈরি হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, শ্রমিকদের নায্য মজুরি ও তাদের ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব কোম্পানিগুলো স্বীকৃতি দিয়েছিল আগেই। কিন্তু ভবন নিরাপত্তা নিয়ে রানা প্লাজা ট্রাজেডির আগে কেউ ভাবেনি। এক সাক্ষাৎকারে প্রাইমার্কের এথিকাল ট্রেডিং টিমের প্রধান পল লিস্টার বলেন, ‘এটা নায্য হবে যদি বলি যে, ভবনের গাঠনিক শক্তিমত্তাকে আগে ঝুঁকি হিসেবে কোম্পানিগুলো বিবেচনা করেনি। ‘আপনি ভবনের ভেতরে তাকাবেন। কিন্তু মেঝের ওপরে বা নিচে তাকাবেন না, তা হতে পারেনা। কিন্তু আপনি যথাযথ সার্টিফিকেটও দেখতে পাবেন। তবে রানা প্লাজার সার্টিফিকেটগুলো পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। আমি মনে করি না যে, এ শিল্পসংশ্লিষ্টরা ভেবেছিল একদিন এ ভবনগুলো ধ্বসে পড়বে।’

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধ্বসের পর, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ভবনের মালিক ভবনটি নির্মানের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমতি নেননি। এছাড়া অবৈধভাবে উপরে তিন তলা বানানো হয়েছিল। এ বিপর্যয়ের ঘটনায় ৪০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ২৪ জন অভিযুক্ত পলাতক।

বিপর্যয়ের পর বৈশ্বিক পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুইটি আন্তর্জাতিক জোট সৃষ্টি হয়। উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের হাজার হাজার গার্মেন্ট কারখানায় ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তা উন্নয়ন যাচাই ও অর্থায়নে সাহায্য করা। বেশিরভাগ ইউরোপিয়ান খুচরা পোশাক বিক্রেতা কো¤পানি রয়েছে ‘অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ’-এ। এ জোট প্রায় ১৬০০টি কারখানা পর্যবেক্ষন করে। এসব কারখানার কয়েকটি ব্যবহার করে এইচঅ্যান্ডএম, মার্ক্স অ্যান্ড স্পেন্সার ও প্রাইমার্কের মতো প্রতিষ্ঠান।  বেশিরভাগ কারখানার জন্য গাঠনিক, বৈদ্যুতিক ও অগ্নি-নিরাপত্তা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ জোটের পরিদর্শকরা।

কিন্তু প্রায় তিন বছর হতে চলল। প্রায় ৭০ শতাংশ পরিকল্পনাই ধার্য করা সময়ের চেয়ে পিছিয়ে গেছে। জোটের ওয়েবসাইটেই এ তথ্য দেয়া আছে। উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা) আবার তৈরি করেছে আরেকটি জোট। নাম হলো ‘দ্য অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’। লাবোউইটয বলেন, মানদ- তৈরি ও রক্ষা করা কঠিন কাজ। তার মতে, ‘বিপণী ব্যবস্থাপনায় অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রভাবক কাজ করে। একটি বৈশ্বিক পরিদর্শন কাঠামো কঠিন কাজ।’

পরিদর্শনের শ্লথ গতির ফলে প্রাইমার্ক নিজেরাই নিজেদের গাঠনিক সার্ভেয়ার নিয়োগ দিয়েছে। এ সার্ভেয়াররা বাংলাদেশের ১০০টি কারখানা ও পাকিস্তানে ৬০টির মতো কারখানা নজরদারিতে রাখবে। এসব কারখানা থেকেই প্রাইমার্কের পোশাক তৈরি হয়। এ তথ্য দিলেন পল লিস্টার। তার ভাষায়, ‘এসব দেশে এ ধরণের উঁচু কারখানা আছে। কিছু কারখানা নির্মানই করা উচিৎ ছিল না। কিন্তু দুর্নীতির মাধ্যমে সেগুলো নির্মিত হয়েছে। তাই ঝুঁকিটা আরও বড়।

বাংলাদেশ কী রাষ্টীয় অর্থ পাচার ও চুরির স্বর্গ

এম. জাকির হোসেন খান ::

‘টাকা বেড়েছে, তাই পাচার বেড়েছে। নতুন করে বাড়েনি। এটাও দেশের উন্নয়নের একটি চিত্র”। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে অর্থ পাচারের সম্পর্ক বিষয়ক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ নতুন তত্ত্ব কতখানি বাস্তবতা বা অর্থনীতির তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ ২০১১ সালের পর ১০ জুন অর্থমন্ত্রী বাড়তি টাকার উৎস যে অবৈধ তা উল্লেখ করতে গিয়ে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমান জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর আগে স্লাইডার, বুয়েন এবং ক্লডিও ২০০৭ সালে বাংলাদেশের কালো অর্থনীতির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ এবং হাসান ২০১০ সালে  ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এর পরিমাণ ৩৮.১% থেকে ৩৯.২% বলে উল্লেখ করেন। আর কালো টাকার উপস্থিতি সরাসরি স্বীকার না করলেও  ভোটারবিহীন সংসদের নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেটের ওপর বক্তব্যে বলেছিলেন, “দেশে কালো টাকা বলে কোনো টাকা নেই। যে টাকাকে কালো টাকা বলা হচ্ছে তা বিদেশে পাচার করে সাদা করা হয়”। আর  রাজস্ব সংস্কার কমিশন রিপোর্ট ২০০৩-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘‘কালো অর্থ পাচারের গন্তব্যস্থল বা নিরাপদ স্বর্গ হলো বিদেশী ব্যাংকগুলো যার মাধ্যমে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হয়” (পৃ.১৮৫)।

বিশ্বব্যাপী সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাঁচার সম্পর্কিত গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ২০০৩-২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাচার হয়, যা থেকে সরকার কমপক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। এর আগে ২০১৪ এর ২০ জুন তারিখে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩” প্রতিবেদনের বরাতে ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত থাকার সংবাদ প্রকাশ করে। ২০০৮ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কমলেও আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের আমানত বাড়ছে। ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে অর্থ পাচার বাড়লেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও ২০১২ সাল থেকে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়।

আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ পাচারকৃত অর্থের পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ হতে পারে; কারণ বেনামে বা অন্য কোন দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নামে গচ্ছিত অর্থ বা মূল্যবান গহনা ও দূর্লভ সামগ্রীর মূল্য অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাক্কলনের পরিমাণ খুবই কম। আর এসব অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ আর্থিক খাতে জালিয়াতির সাথে জড়িত তার প্রমাণ হলো শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানি জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও শুধু সরকার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্তদের কেউই বিচারের আওতায় আসছে না বলে মনে করেন ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। ব্যাংকিং খাতে অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেন, ‘‘নিজেদের দলীয় লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না”। উল্লেখ্য, দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করলেও এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর নন-পারফর্মিং লোনের হার ১১ শতাংশ, উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার কোনোভাবেই ৪ শতাংশের বেশি নয়। এর প্রধান কারণ ক্ষমতাবানরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে লাপাত্তা।

আর্থিক খাতে জালিয়াতির এ ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সংযোজন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকার ওপর রিজার্ভ চুরির মতো অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে যা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ভয়াবহ পরিস্থিতিকেই নির্দেশ করে। পৃথিবীর কোনো দেশে রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির এরকম ভয়াবহতম ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী রেকর্ড নেই, সেক্ষেত্রেও রেকর্ড সৃষ্টি করল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট গঠনের পরও অবৈধভাবে কিভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচার হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। পৃথিবী জুড়ে তুমুলভাবে ঝড় তোলা পানামা পেপারসে’র মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচারের যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে প্রকাশ পেলো, তার মাধ্যমে জানা গেলো- কিভাবে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানরা অবৈধ পথে উপার্জিত বিত্ত বৈভব উন্নত দেশগুলোতে পাচার করছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ২০জন বাংলাদেশি বড় ব্যবসায়ী নিজ নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ‘‘কর স্বর্গ’’ বলে পরিচিত- যেমন জার্সি দ্বীপ এবং বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপসমূহে -অর্থ পাচার করার খবর নিউ এজ পত্রিকায় ২০১৩ সালেই প্রকাশ করা হয়। শুধু তাই নয়, আমেরিকা, দুবাই, ব্যাংকক এবং সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে, মালয়েশিয়া এবং ভারতে নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ‘সেকেন্ড হোম’ বা ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে  প্রকৃত কি পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত হিসাব রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বার্থে জানা জরুরি। উল্লেখ্য, ২০১৩ এর  শেষ দিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য সেকেন্ড হোম প্রকল্পে আবেদন করেছিলেন ৬৪৮ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি, যাদের অধিকাংশই সুবিধাভোগী রাজনীতিক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও আমলা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক অন্তত ৫০টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব টাকা লেনদেন হয়। আর সুইস ব্যাংক হলো এসবের প্রধান সিন্ডিকেট। যে টাকার কথা বলা হচ্ছে তা নগদ টাকা। এছাড়া বাড়ি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসার মাধ্যমে আরো অন্তত তিন লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার বেশি অর্থ পাঠানো যায় না। চিকিৎসা বা শিক্ষা ব্যয়ের জন্য বিদেশে টাকা পাঠাতে গেলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আরেকটি চক্র বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দিয়ে দেশে টাকায় দায় শোধ করা হয়; তেমনি বিদেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছেনা, যেগুলো কোন না কোন বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো দুদক, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলো? বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের পর অন্য  কোনো কেলেঙ্কারির ধারাবাহিকতায় চাপা পড়ে যায়, আর ধরা পড়লেও প্রভাব খাটিয়ে অর্থ বাজেয়াপ্তের মতো ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে, কর কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে বাংলাদেশ থেকে সহজে মূলধন পাচার হয়ে যাচ্ছে আরো কম করহার ও কম আইনি জটিলতার দেশে। ২০০০ সালে প্রণীত বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশ যদি অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে এমন দেশের (যেমন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি) পর্যায়ে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে নিয়ে আসতে পারতো, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অতিরিক্ত আরো ২.১৪% বৃদ্ধি পেয়ে  ৬% থেকে ৮.১৪% হতো”। অর্থাৎ মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০১০-১১ অর্থ বছরে অর্থাৎ ৫ বছর আগেই ১০৪০ ডলারে পৌছতো। উল্লেখ্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ০-১০০ পয়েন্ট স্কেলে ২৫ পয়েন্ট পেয়ে ২০১৩ সালের তুলনায় তালিকার উচ্চক্রম অনুযাযী বাংলাদেশের ৯ ধাপ অবনতি হওয়ায় এটা সুনির্দিষ্টভাবে সমাজে অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং তা পাঁচারের ঘটনাতেই নির্দেশ করে।

‘দুর্নীতি সেখানেই বিস্তার লাভ করে যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বচ্ছতা এবং প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনীতি অনুপস্থিত থাকে; স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং কার্যকর আইন-শৃংখলা বাহিনী রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রধান নিয়ামক (কওফম্যান, ২০১০)।

‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)’ এর আওতায় ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’ এগমন্ট গ্রুপের আওতায় বিভিন্ন দেশকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। উল্লেখ্য, ভারত সরকার কালো টাকা তদন্তে বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করে এবং পানামা পেপার্সে ভারতীয়দের নাম আসায় তদন্ত করার জন্য একটি টিম করেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনা প্রথমে শুধু চেপেই রাখা হয়নি তার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংকের ওপর চাপানোর চেষ্টা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনের সিনেটে উন্মুক্ত শুনানির ব্যাবস্থার মাধ্যমে এসব পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে দিতে তৎপর থাকলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংসদ বা সংসদ সদস্যরা  নির্বিকার। এমনকি এ চুরির ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি বাস্তবে কতখানি সফল হবে এবং দোষীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাতে পারবে তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। শেয়ার বাজার কেলেংকারি নিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিত খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলেও কোনো বিচার হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার চাইলে তথ্য বিনিময় এবং পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনার দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতি নির্ধারণে সুইস সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে পারে।

একথা মনে রাখা প্রয়োজন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬.৪ এর আওতায় রাষ্ট্রসমূহ ঐক্যমতে উপনীত হয় যে, ২০৩০ এর মধ্যে তারা সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরিকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ফেরত আনার কাজও শক্তিশালী করবে; একইসাথে সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ রোধ করবে। এর পাশাপাশি জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে সাক্ষর করায় বাংলাদেশ সকল প্রকার দুর্নীর্তির মাধ্যমে অর্জিত কালো অর্থের উৎস বন্ধ এবং সুইস ব্যাংক সহ ‘‘কর-স্বর্গ” বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত সকল অবৈধ অর্থ উদ্ধারে সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইন মন্ত্রণালয়/এটর্নি জেনারেলের অফিসের সমন্বয়ে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

 

পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কেনো রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, দি ইকোনমিস্ট থেকে

পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক এলিটরা সবসময়েই দুবাইয়ে পাড়ি দিয়ে আসছেন। তবে গত মাসে এমিরেটসের যে নিয়মিত ফ্লাইটটি করাচি ত্যাগ করেছিল, তাতে লক্ষণীয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ, সামনের সুসজ্জিত আসনে তিনি বসেছিলেন। ২০১৩ সালে স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর সরকার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ বেশ কয়েকটি মামলা করায় তিন বছর ধরে তার ওপর ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা ছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার খুব সম্ভবত অসুস্থতার কারণে বিদেশ যেতে দিতে সম্মত হয়। ১৯৯৯ সালে মোশাররফের অভ্যুত্থানের শিকার হওয়া ওই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পরিশেষে ‘এক্সিট কন্ট্রোল লিস্ট’ থেকে সাবেক সেনাপ্রধানের নামটি বাদ দেওয়াটা ছিল পাকিস্তানের পরাক্রমশালী সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ব্যর্থতার লজ্জাজনক স্বীকৃতি।

সাবেক এক সামরিক শাসকের সৃষ্ট হলেও তার দ্বিতীয় সরকার উৎখাত হয়ে সাত বছর সৌদি আরব ও লন্ডনে প্রবাস জীবন অতিবাহিত করতে হওয়ায় নওয়াজ শরিফের মনে দৃঢ়প্রত্যয় জন্মেছিল যে, জেনারেলদের অবশ্যই ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।

২০১৩ সালের মে মাসে তৃতীয় বারের জন্য নওয়াজ শরিফ যখন ক্ষমতায় এলেন, অনেকের ধারণা জন্মেছিল, এবার তিনি হয়তো সফল হবেন। তিনি নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন। মোশাররফের আমল এবং সাবেক আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন সেনাবহিনীর অফিসার প্রশিক্ষণ একাডেমীর অনতিদূরেই বহুদিন ধরে লুকিয়ে থাকার খবর প্রকাশসহ অন্যান্য বিপর্যয়ের কারণে সেনাবাহিনীর অবস্থা তখনো বেশ কলঙ্কিত। একটি বিশেষ আদালতে মোশাররফের বিচারের সিদ্ধান্তকে একটা বড় পদক্ষেপই বলতে হবে। তবে এই বিচারের আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের অভ্যুত্থানের কারণে নয়, এটা ২০০৭ সালে স্বল্প সময়ের একটি জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণে। বড় কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি বাদ দিলেও সাবেক এক সেনাপ্রধানের জন্য আদালতে হাজির হওয়াটা হতে পারত বেসামরিক ক্ষমতার একটি ঐতিহাসিক প্রকাশ।

নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সমস্যাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে মোশাররফকে আদালতে দাঁড় করার প্রয়াস ব্যাহত করার চেষ্টা চালিয়ে যায় সেনাবাহিনী, যদিও অবশেষে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আদালতে হাজিরা দেন। এর পরপরই মোটা দাগে সরকারপন্থী টিভি চ্যানেল বলে পরিচিত জিও টিভি এবং সেনাবাহিনীর মধ্যকার এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ক্ষমতাশীন দল। টিভি চ্যানেলটি প্রকাশ্যে তাদের শীর্ষ এক সাংবাদিককে গুপ্তহত্যা চেষ্টার জন্য সামরিক বাহিনীর স্পাই মাস্টারকে অভিযুক্ত করে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ২০১৩ সালের নভেম্বরে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ। তিনি মোশাররফ আমলে কেবল নিস্কলুষই থাকেননি, সেইসাথে পাকিস্তানে হামলা চালানো জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে ধীরে ধীরে জনগণের শ্রদ্ধার আসন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে অনেকটাই টলিয়ে দিয়েছেন। ২০১৪ সালে রাজধানী ইসলামাবাদের রাজপথে বিরোধী গ্রুপগুলোর ডাকা গণবিক্ষোভকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করে নওয়াজ শরিফের সরকারকে রক্ষা কৃতিত্বও লাভ করেন তিনি।

সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া সরকার চালাতে পারবেন না-এই উপলব্ধিতেই প্রধানমন্ত্রী শরিফ আরেক শরিফের (যদিও তারা আত্মীয় নন) সঙ্গে যৌথ শাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছেন। যদিও দুই শরিফ নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং প্রায়ই বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে একসঙ্গে হাজির হচ্ছেন, কিন্তু তবুও তাদের মধ্যকার অব্যাহত দ্বন্দ্ব অনিবার্য। গত মাসে লাহোরের একটি পার্কে তালেবানের বোমা হামলায় ৭২ জন নিহত হওয়ার পর তাদের সম্পর্কে নতুন রূপ নেয়। জেনারেল রাহিল শরিফ সুযোগটি লুফে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নিজ এলাকা পাঞ্জাব প্রদেশের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী এখনো এটা প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

 

 

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৮ :: মাও-এর মৃত্যু ও চার কুচক্রীর পতন

আনু মুহাম্মদ :

চৌ এন লাইয়ের মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই মাও সেতুং (নতুনভাবে যার উচ্চারণ মাও জে দং) মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। এর কয়েক মাস আগে থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন পার্টি ও চীনা নেতৃত্ব নিয়ে কঠিন সংঘাতে অনিশ্চয়তা চারিদিকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পার্টিতে যে বিভাজন ও লড়াই শুরু হয়েছিলো তা স্তিমিত হলেও তার সমাপ্তি তখনও ঘটেনি। পার্টির মধ্যে কঠিন সংগ্রামের ওঠানামার মধ্যেই দেংজিয়াও পিং পার্টি নেতৃত্বে ফিরে আসেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তিনি আক্রান্ত ছিলেন, আক্রান্ত ছিলেন চৌ এন লাইও। আগেই বলেছি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে যারা মূল কর্তৃত্বে ছিলেন তাঁদের প্রধান লিনপিয়াও ১৯৭০ সালেই চক্রান্তকারী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং নিহত হন। এরপর অনেককিছুই পরিবর্তিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অভিহিত হতে থাকে ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ নামে। অনেকসময় তারাই হয়ে দাঁড়ায় প্রধান শত্রু । চীনের অভ্যন্তরেও নীতি ও কর্মসূচিতে অগ্রাধিকারে পরিবর্তন দেখা যায়।

চৌ এন লাইএর মৃত্যুর পর মাও যাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন করেন সেই হুয়ো গুয়ো ফেং তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ছিলেন এবং দেং জিয়াও পিং এর অনুসারী ছিলেন না। কিন্তু তাঁকে সামনে রেখেই দেং নিজেদের প্রভাব বলয় শক্ত করতে সক্ষম হন। তার ফলে খুব গুছিয়ে বিরোধীদের দমন অভিযান চালানো সম্ভব হয়, এবং মাও এর মৃত্যুর ২৭ দিনের মাথায় ৬ অক্টোবর‘চার কুচক্রী’ বলে অভিহিত করে গ্রেফতার করা হয় দেং বিরোধী নেতৃবৃন্দকে। এঁরা হলেন জিয়াং কিং (১৯১৩-১৯৯১), ঝাং চুনকিয়াও (১৯১৭-২০০৫), সাহিত্য সমালোচক ইয়াও ওয়েনইউয়ান (১৯৩১-), এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওয়ান হং ওয়েন (১৯৩৫-১৯৯২)। গ্রেফতার করবার পর তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে অনেক মানুষের দুর্ভোগ, অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি, বিশৃঙ্খলা এবং হতাহতের জন্য তাঁদের দায়ী করে বিচারের সম্মুখিন করা হয়। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থনে জিয়াং ছিলেন সবচাইতে সরব ও প্রতিবাদী। তিনি নিজেই নিজের পক্ষে যুক্তি তথ্য উপস্থাপন করেন। তাঁদের মূল বক্তব্য ছিলো তাঁরা মাওয়ের নির্দেশেই সবকাজ করেছেন। কিন্তু বিচারে জিয়াং ও ঝাংকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে পরে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়, অন্য দুজনকেও দীর্ঘ মেয়াদের কারাদন্ড দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, জিয়াং কিং ছিলেন মাও সে তুং এর স্ত্রী। এই সময়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয, সাংহাই সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়। বিচারের বিবরণী আর প্রকাশ করা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করতে থাকে যে, মাও সে তুং তাঁর শেষবছরে জিয়াং কিং এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেকারণে এরা মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করে। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত পার্টির দলিলে বলা হয়েছে, ‘‘অক্টোবর ৬, ১৯৭৬: পার্টি ও জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির পলিট ব্যুরো, এর নিউক্লিয়াস হুও কুয়ো ফেং, ইয়ে জিয়ানইং ও লি জিয়াননিয়ান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং তদন্তের জন্য জিয়াং কিং, ঝাং চুনকিয়াও, ইয়াও ওয়েনইউয়ান, এবং ওয়ান হং ওয়েনকে আটক করেন। এর মধ্য দিয়ে জিয়াং কিং প্রতিবিপ্লবী চক্রের পতন ঘটে। এই পদক্ষেপ সারাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে উষ্ণ সমর্থন পায়। সর্বত্র এই ঐতিহাসিক বিজয়কে অভিনন্দন জানাবার জন্য জনসমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ যা দশ বছর ধরে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিলো তার সমাপ্তি ঘটলো।’’ [i]

যেহেতু এরপর পার্টির কর্তৃত্ব দেং গ্রুপ পুরোপুরি করায়ত্ত করতে সক্ষম হয় সেহেতু উপরের বর্ণনা তাদের দিক থেকে খুবই স্বাভাবিক। একই কারণে চীন থেকে আর কখনোই এই পরিস্থিতি নিয়ে অন্য কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে এ নিয়ে চীনের বাইরে মাওবাদী ও বিপ্লব সমর্থকঅন্যদের লেখালেখি আছে। জিয়াং কি দের পক্ষে এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য রেমন্ড লোট্টার বই। তিনি বিভিন্ন দলিলপত্র দিয়ে বলতে চেয়েছেন কথিত চার কুচক্রী আসলে মাও সেতুংএর আদর্শেই কাজ করেছেন। তাঁরা যদি চার কুচক্রী হন তাহলে মাও হচ্ছেন পঞ্চম। [ii] ঠিক এই অবস্থান না হলেও চার্লস বেটেলহেইম ও উইলিয়াম হিনটন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু লেখা লিখেছেন।

দেংবিরোধী মূল শক্তির পতনের পর হুয়া গুয়ো ফেং, মার্শাল ইয়ে জিয়াইং এবং দেংজিয়াও পিং নেতৃত্বের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালে গঠিত পলিটব্যুরোতে তাঁরাসহ চারজন মার্শাল, সাতজন জেনারেল সহ সামরিক ব্যক্তিদের অবস্থান পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতাচক্রের সাথে সামরিক শক্তির যোগসূত্র নির্দেশ করে।

[i]CPC: History of the Chinese Communist Party, A chronology of Events (1919-1990), Beijing 1991. p. 377.

[ii]Raymond Lotta:And Mao Makes Five: Mao Tsetung’s Last Great Battle, June 1978, Banner Press, LLC

 

কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্ষমতাবানদের দাপট ও দুর্বলের অসহায়ত্ব

হায়দার আকবর খান রনো ::

১৯৯০ পরবর্তীকালে আজকের সরকারের মতো এতো শক্তিশালী সরকার আর আসেনি। আবার একই সঙ্গে এতো গণবিচ্ছিন্ন সরকারও এই সময়কালে কখনো ছিল না। গণবিচ্ছিন্ন তবু শক্তিশালী ? হ্যা, তাই। শক্তিশালী কারণ বিরোধী পক্ষও দুর্বল। প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি আজ একেবারে পর্যুদস্ত। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা-হামলার কারণে দাড়াতেই পারছে না দলটি। হয়তো জনসমর্থন আছে, কিন্তু সেই সমর্থনটা হচ্ছে নেগেটিভ। সরকার বিরোধী ভোটাররা জমায়েত হতে চায় বিএনপির পেছনে। কিন্তু সেই জনসমর্থনকে ইতিবাচক আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করার যোগ্যতা নেই বিএনপির। কারণ বিএনপি কোন আদর্শবাদী দল নয়। এই দলও ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা গণবিরোধী ভূমিকাই পালন করে এসেছে। তাছাড়া এখনো মুখে গণতন্ত্রের শ্লোগান তুললেও, জনগণের অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে তারা একটি কর্মসূচি পালন করেনি। শ্রমিকের মজুরি, মধ্যবিত্তের শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য দাবি অথবা দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোন কর্মসূচি তাদের কর্মকৌশল, চিন্তা, ধারণা বা উপলব্ধির মধ্যেও নেই।

অন্যান্য উদারপন্থী বুর্জোয়া দল বলেও তেমন কিছু নেই। বামশক্তিও দুর্বল। এই অবস্থাটা সুযোগ করে দিয়েছে সরকারকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গণবিচ্ছিন্নতা শাসক দলকে বাধ্য করেছে নির্ভর করতে পুলিশ প্রশাসনের উপর এবং দলীয় মাস্তানদের উপর। পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসন তাই এক ধরনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করছে। পাশাপাশি দলীয় মাস্তান এবং শাসক দলের নিচের পর্যায়ের নেতারাও অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে- লুটপাটের স্বাধীনতা, দুর্নীতির স্বাধীনতা, ক্ষমতার দাপট দেখানোর স্বাধীনতা। শাসক দলের উপরতলার নেতৃত্বকে যেন অসহায় বোধ করেন। দলের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে অরাজকতার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, শাসক দল ও প্রশাসনের ভয়ংকর ক্ষমতার দাপট এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চোখের সামনে দুর্নীতি ও লুটপাট হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পায় না কেউ। কারণ বিচার বহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, নিখোজ হওয়া, গুম, খুন ইত্যাদির সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। অবস্থা এতোটাই খারাপ যে গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। খুব সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক আলোচনায় তনু হত্যা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রশাসন চায় না, বিচার বিভাগ ঠিক মতো চলুক’। (প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৬)।

তবে তনু হত্যার ক্ষেত্রে দেখলাম মানুষ ভয়ভীতি কাটিয়ে বিদ্রোহে ফেটে পড়েছে। তনু হত্যার বিষয়টি খুবই রহস্যজনক। আরও রহস্যজনক পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা। নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাওয়া গেল সোহাগী জাহান তনুর লাশ। কিভাবে এমন জায়গায় লাশ এলো। তাকে কি সেখানেই হত্যা করা হয়েছিল, যেখানে বাইরের লোকের যাতায়াত খুব সহজ ব্যাপার নয়। প্রথম প্রদর্শনে পুলিশ সুপার অনুমান করেছিলেন যে, তাকে ধষর্ণের পর হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ময়না তদন্তে, যার রিপোর্ট বের হয়েছিল দুই সপ্তাহ পর, সেখানে কিছুই বের হলো না। এমনকি হত্যা না আত্মহত্যা তাও নির্দিষ্ট করে বলা যায়নি। প্রবল প্রতিবাদের মুখে দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত হল। তার রিপোর্টও এখনো বের হয়নি। প্রথম দিকে তনুর মা ও নিকট আত্মীয় ছাড়া আর কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। প্রথমে নেয়া হয় মাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিন্তু কখন? মধ্যরাতে ঘর থেকে মাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশের এই আচরণ রহস্যজনক। মিডিয়ায় বলা শুরু হলো, কাউকে রক্ষা করার জন্য নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘জজ মিয়ার নাটক সাজানো হলে তা মানা যাবে না’। এই মর্মে তিনি একটি চিঠিও দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।

ড. মিজানুর রহমান প্রায়ই বেশ সাহসের সঙ্গে সত্য কথা বলে থাকেন। গত বছর আগস্ট মাসে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না’। কথাটা পুরোপুরি সত্য। তার মানে যারা ক্ষমতাবান, তারা বড় বড় অপরাধ করলেও পার পেয়ে যান। আর যারা দুর্বল তারা অত্যাচারের শিকার হন। তনুর বাবা নি¤œবিত্ত কর্মচারী মাত্র। তাই তার জন্য বিচারের দরজা বন্ধ। হত্যাকারী অথবা ধর্ষণকারী যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে আইন তাকে স্পর্শ করবে না। এই যে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, তা সমগ্র সমাজকে কলুষিত করেছে, গণতন্ত্রকে করেছে নির্বাসিত, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যা হচ্ছে সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

দুই একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গাইবান্ধার সংসদ সদস্য হাসতে হাসতে একটি বারো বছরের ছেলের পায়ে গুলি করে ছেলেটিকে পঙ্গু করেছিল। তারপরও তিনি জামিন পেয়ে বহাল তবিয়তে এবং দাপটের সঙ্গে সংসদ সদস্যও রয়ে গেছেন। দলও কোনো এ্যাকশন নেয়নি।

এক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যিনি ২০১৫ সালে অফিসে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক সম্বন্ধে বলেছিলেন যে, বাড়ি মেরামতের জন্য বাল আনা হয়েছে এবং এই ভাবে রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার করেছিলেন, সেই মন্ত্রী মায়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলা সত্তে¡ও তিনি মন্ত্রীত্বের গদিতে আরামেই বসে আছেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ দুই মন্ত্রীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দন্ডাদেশ দিয়েছেন। দন্ডপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা কিন্তু এখনো মন্ত্রী আছেন। সংবিধানে শাস্তি প্রাপ্ত মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার সুস্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও নৈতিকতার কারণে তাদের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। হায়! নৈতিকতা বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। এখানে চলছে দুর্নীতির রাজত্ব, ক্ষমতার দাপট ও ক্ষমতাহীনের অসহায়ত্ব।

দুর্নীতির এক এক করে রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। বড় বড় আর্থিক কেলেংকারির খবর আসে একটার পর একটা। রিজার্ভ চুরি, শেয়ারবাজার কেলেংকারি, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি- কোনোটারই বিচার হয়নি। শাস্তি পায়নি কেউ। একটা হিসেব বলে গত সাত বছরে আত্মসাৎ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের জন্য এটা কম টাকা নিশ্চয়ই নয়।

একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও অথনৈতিক নৈরাজ্য, অন্যদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কিন্তু কোথায় সেই প্রতিরোধ শক্তি?

শেষ ভরসা জনগণ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম। তনু হত্যার বিচার পায়নি তার গরিব বাবা-মা। কিন্তু ক্ষুব্ধ স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সারাদেশ জুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে, তারা কোনো দলের নয়। তারা সাধারণ ছাত্র, সাধারণ বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত জনগণেরই প্রতিনিধি। শেষ ভরসা এই নতুন প্রজন্মের উপরই রইল।

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন-(পর্ব ৯)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

তাঁর ইংরেজী ভাষার চর্চা নিজের ভেতরকার বুর্জোয়া বিকাশেরই অংশ। কিন্তু বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই যে, তিনি মোটেই উৎপাটিত নন, সৃষ্টিশীল ও গভীর ভাবে প্রোথিত। দেখতে পাচ্ছি গ্রামে গিয়ে তিনি মুর্শিদী ও জারি গান শুনছেন। বিলে নেমে অন্যদের সঙ্গে মাছ ধরছেন। কর্মরত মানুষজনের সাথে আত্মীয়ের মতো আলাপ করছেন।

যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাজউদ্দীন যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন। পরিস্থিতিটা অবশ্যই উত্তেজানপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাজউদ্দীনের ভেতর তার কোনো ছাপ নেই। ডায়েরী পড়ে জানা যাচ্ছে যে, তাঁর নির্বাচনী সভায় মুসলিম লীগের লোকরা আক্রমণ করছে, সভা পন্ড হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি অস্থিরতা প্রদর্শন করছেন না। বিচলিত না হয়ে সাইকেলে করে জনসংযোগ করে চলেছেন। মার্চ মাসের ১০ তারিখে ভোট গ্রহণ হয়েছে, ১৩ তারিখের ডায়েরীর পাতায় বি:দ্র: দিয়ে নোট রাখছেন যে, ওই দিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ ক্লাস শুরু করলেন। তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লাশ করছেন। ১৮ তারিখ একটি বিশেষ দিন; সেদিন ভোট গণনা হয়েছে। তাজউদ্দীন জিতেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠিক তিনগুণ নয়, তার চেয়েও বেশী ভোটে পরাজিত করে দিয়েছেন। ঢাকায় তাঁকে নিয়ে মিছিল বের হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের কারণে তিনি যে আবেগে আপ্লুত এমন কোনো লক্ষণ নেই তাঁর ডায়েরীতে। কয়েকদিন পর তাঁকে দেখতে পাই তিনি এই জন্য খুশি হয়েছেন যে তাঁর এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। লিখেছেন ‘‘এই মৌসুমের জন্য এটি শুভ লক্ষণ। এই বৃষ্টি বোরো ধান ও আউষ চাষের জন্য খুব ভালো হবে। জমি বেশ ভিজেছে। কড়া রোদ আর অনাবৃষ্টিতে সারা দেশ কুঁকড়ে উঠেছিল। জলবসন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল।’’ ২৯ এপ্রিলের দিনলিপিতে দেখছি চালের দাম নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন; পঞ্চাশ সালে যে মন্বন্তর হয়েছিল তার কথা তাঁর স্মৃতিতে। বলছেন, ‘‘কিছুদিন ধরে শহরে ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু হওয়ায় তা শহরের মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ আগের মতোই ভুক্তভোগী।’’

নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এখন কি কি সুযোগ সুবিধা নেয়া যায় তা নিয়ে কোনো সুচিন্তা ডায়েরীর কোথাও নেই। যে কারণে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন ঠিক সে কারণেই তাঁর রাজনীতি ভিন্ন চরিত্র গ্রহণ করেছে। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদের মাঝে যে সম্পর্কটি স্থাপিত সেটি তাঁদের উভয়ের জন্য তো বটেই, আমাদের সমষ্টিগত ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনিবার্য ছিল যে তাঁরা এক সাথে কাজ করবেন, এবং কাজের সময়ে ও ভেতর দিয়ে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবেন। দু’জনের মধ্যে বয়সের দূরত্ব ছিল পাঁচ বছরের, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব এস. এ করিম তাঁর লেখা শেখ মুজিব, ট্রায়াম্প এ্যান্ড ট্রাজেডি  বইতে এই ব্যবধানের কথা বলতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মুজিব ছিলেন অতুলনীয় বক্তা, এবং সাধারণ মানুষের মনের ভাব ও ইচ্ছাকে সরল ভাষায় তুলে ধরে তাদের আস্থা ও ভালোবাসা জয় করে নেবার ব্যাপারে তাঁর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি তাঁর দলকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীনের ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং সুশৃঙ্খল মন; তিনি যে খুব ভালো বক্তা ছিলেন তা নয়, কিন্তু আলাপ-আলোচনার বেলায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর কর্তব্যবোধ ছিল দৃঢ় দুর্দান্ত।

দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল। ডা. করিম ছিলেন উভয়েরই বন্ধু; ১৯৬২ সালে তাঁরা এক সঙ্গে জেলে ছিলেন; তখন তিনি দেখেছেন যে পূর্ববঙ্গকে যে স্বাধীন করতে হবে-এ বিষয়ে শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের ভেতর ঐকমত্য ছিল, কিন্তু কোন পথে এগুতে হবে তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হতো। ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মনকষাকষির ঘটনা যে ঘটতো না তাও নয়। একদিনের কথা তাঁর বিশেষভাবে মনে আছে। সেদিন তাঁরা সবাই মিলে ভলিবল খেলছিলেন। একদিকের দলপতি শেখ মুজিব, অন্যদিকের দলপতি তাজউদ্দীন। হঠাৎ একটি পয়েন্ট নিয়ে দু’দলের ভেতর বচসা বেধে যায়; রেফারি ছিলেন মানিক মিয়া, তিনি রায় দিলেন পয়েন্ট কেউ পাবে না। খেলা নতুন করে শুরু হলো। মুজিবের দল জিতল, করিম লিখছেন, ‘‘মুজিব বললেন, ‘দেখলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। তাজউদ্দীন টিপ্পনী কেটে বললো, ‘হ্যাঁ যে-দিকে বাতাস সে-দিকে নড়ে’।’’ তাজউদ্দীন ওই মন্তব্যে দু’জনের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় এবং কয়েকদিন কথাবার্তা বন্ধ থাকে। করিমের ধারণা শেখ মুজিব মনে করেছিলেন যে, তাজউদ্দীন ধর্মকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত যে তাজউদ্দীন তা করেননি।

১৯৬২-তে আন্দোলন ছিল না; নেতারা সবাই বন্দী ছিলেন; স্রোতহীনতার ওই সময়ে ভুল বোঝাবুঝিটা অস্বাভাবিক ছিল না; কিন্তু ১৯৬৪-তে যখন রাজনৈতিক তৎপরতার একটি প্রবাহ তৈরি হলো তখন দেখি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন এক হয়ে গেছেন; মুজিব আছেন সামনে, নেতা তিনিই; কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন যে, তাজউদ্দীন আছেন সঙ্গেই, পরিপূরক হিসেবে। ছয় দফার ঘোষনা দেয়ার পর জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবকে বিতর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মুজিব সে-চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ভুট্টো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকায় এলে তাজউদ্দীন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, বিতর্কের আনুষ্ঠানিকতা ঠিক করার জন্য। তাঁর সাথে কথা বলে ভুট্টো বুঝেছেন বিতর্কের জন্য এপক্ষ থেকে যে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে তাতে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না। তর্কযুদ্ধে না নেমে ভুট্টো সদলবলে প্রস্থান করেন।

সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাটি শেখ মুজিবেরই; কিন্তু তার পেছনেও তাজউদ্দীন ছিলেন; কোন কোন পয়েন্টে বলতে হবে তা তিনিই সাজিয়ে দিয়েছেন; এবং মঞ্চে বসে সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন কোনোটি যেন অঘোষিত না থাকে। এরপরে শুরু হয় অসহযোগ, তখন বাংলাদেশের সরকার চলতো আওয়ামী লীগের নির্দেশে। পঁয়ত্রিশটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলো তাজউদ্দীনের হাতেই রচিত। দেশের কাছে মুজিব তখন অদ্বিতীয়, আর তাজউদ্দীন অদ্বিতীয় মুজিবের কাছে।

চরম মুহূর্তটি এসেছিল পঁচিশে মার্চের রাত্রে। পাকিস্তানী হানাদারেরা কী করবে টের পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু আন্দোলনের নেতারা কী করবেন সেটা ছিল অনিশ্চিত। এখন জানা যাচ্ছে যে, পরিকল্পনা ছিল আত্মগোপন করে স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া হবে এবং অনিবার্য যুদ্ধে মুজিব ও তাজউদ্দীন এক সঙ্গে থাকবেন। তদনুযায়ী তাজউদ্দীন গেলেন মুজিবের কাছে; গিয়ে শোনেন তিনি ঠিক করেছেন বাড়িতেই থাকবেন, তাজউদ্দীনদের সঙ্গে যাবেন না। দেশের ইতিহাস তখন তাকিয়ে ছিল সিদ্ধান্তের দিকে, সিদ্ধান্ত এলো না। তাজউদ্দীন একটি লিখিত বিবৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন শেখ মুজিবের স্বাক্ষরের জন্য, একটি টেপ রেকর্ডারও তাঁর সঙ্গে ছিল, নেতার কণ্ঠস্বরে দিকনির্দেশ রেকর্ড করবেন এই আশায়। স্বাক্ষর পেলেন না, কণ্ঠস্বরও পেলেন না। হানাদার বাহিনী যে হত্যাকান্ড শুরু করবে তার সব লক্ষণ তখন স্পষ্ট, খবরও আসছে নানা সূত্রে। মোকাবিলা করতে হলে নেতাকে চাই, শেখ মুজিব তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা, তাঁকে বাদ দিয়ে যুদ্ধ চলবে কি করে? তাছাড়া তাঁর অনুপস্থিতিতে কার পরে কে থাকবেন সেই ক্রমটি যেহেতু তিনি জানিয়ে দেননি, তাই নেতৃত্বের কেবল যে অভাব ঘটবে তা নয়, যাঁরা থাকবেন তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, কেউ কাউকে মানতে চাইবেন না, ফলে সংকটের সৃষ্টি হবে। এসব যুক্তি তাজউদ্দীন দিয়েছেন। কিন্তু নেতা অনড় ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে। (চলবে)

চীনকে মোকাবেলায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নয়া সামরিক চুক্তি

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র অতি সম্প্রতি উভয় দেশের সেনা, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো পারস্পরিক ব্যবহারের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছেছে। আর এর মূল উদ্দেশ্য ভারত মহাসাগরসহ পুরো অঞ্চলে চীনকে যৌথভাবে প্রতিরোধ ও মোকাবেলা করা। ওয়াশিংটন চার বছর ধরে ‘লজিস্টিকস সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট’ (‘কৌশলগত সমর্থন চুক্তি’) নামের ওই সমঝোতার জন্য নয়া দিল্লিকে রাজি করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। নিরপেক্ষ থাকার একটি ছদ্মবেশ বহাল রাখার জন্য দিল্লি এতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু নাচতে নেমে ঘোমটা রেখে লাভ কী? তা-ই নরেন্দ্র মোদি সরকার ওই সমঝোতায় রাজি হতে খুব একটা দেরি করেনি। ১২ এপ্রিল দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিল্লিতে বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে এশিয়ায় নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হলো। এর প্রতিক্রিয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং সেইসাথে ভয়াবহ মাত্রার। ভারতের বিরোধী দলগুলো এই সমঝোতার ব্যাপারে আপত্তি করলেও তাতে খুব একটা জোর ছিল বলে মনে হয়নি। এই সমঝোতার আলোকে দেশ দুটি একে অপরের স্থল, বিমান ও নৌ ঘাঁটিগুলো জ্বালানি ভরা, মেরামতি ও বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতে পারবে।

সমঝোতা হলেও এখনো চুক্তিতে সই হয়নি। তবে নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের সাথে আলোচনার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার বলেছেন, ‘সব জটিলতা নিরসনের জন্য আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি।’ আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তি চূড়ান্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমানশীল ভূমিকার কারণে মোদি প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার পথ ধরেছেন। এছাড়া ভারতের অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি হ্রাস করার জন্য মার্কিন প্রযুক্তিও আরো বেশি বেশি চাচ্ছেন মোদি। নরেন্দ্র মোদির এই চাওয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কামনার যথেষ্ট মিল রয়েছে। চীনকে মোকাবেলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী চায় ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এই লক্ষ্যেই এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরে গেলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি চাচ্ছেন, বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট আমলের শেষ সময়টাতে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরো জোরদার করতে।

এই চাওয়া-পাওয়ার রেশ ধরে দুই দেশের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি আরো কয়েকটি সামরিক চুক্তি দেখা যেতে পারে।

তবে দুই দেশ কিন্তু আগে থেকেই সামরিক খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছিল। ২০১২ সালের চুক্তিবলে দুই দেশ বিমানবাহী রণতরীর নক্সা প্রণয়নের কাজেও এগিয়ে যাচ্ছে।  ভারত আগে রুশ-নির্মিত রণতরী ব্যবহার করত। এখন তারা নিজেরাই এ ধরনের রণতরী বানাতে চাইছে। এছাড়া বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের কাজও চলছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।

চীনকে প্রতিরোধ করার কথা বলে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। ফিলিপাইনের সাথেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তি হচ্ছে। এর মাধ্যমে সেখানে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে ঠেকানোর জন্য ফিলিপাইনের ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। জাপান আরো আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। চলতি বছরেই পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের কাছাকাছি ফিলিপাইন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপান যৌথ নৌ মহড়া চালাবে।

অথচ এই সাগরের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সমঝোতাতেও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সমঝোতার বিষয়টি চীনের অগোচরে থাকেনি। চীন অবশ্য এখনো সরাসরি সমালোচনা করেনি। বরং ভারতকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার অনুরোধ করেছে।

চীনের প্রতিক্রিয়া : সমঝোতা স্বাক্ষরের পরদিন তথা ১৩ এপ্রিল নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কাং কিছুটা সংযতভাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত বেশ প্রভাবশালী দেশ। ভারত বরাবরই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। নিজের স্বার্থ অনুযায়ী তারা কূটনৈতিক অবস্থান নেবে।’

তবে এই ইস্যু নিয়ে নয়া দিল্লির সাথে বেইজিং কথা বলবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ১৮ এপ্রিল বেইজিং যাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে দুই দেশের কেউই এখন পর্যন্ত দুই দিনের এই সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।