Home » সম্পাদকের বাছাই (page 45)

সম্পাদকের বাছাই

মাথাপিছু আয় আর জিডিপি বৃদ্ধির সরকারি প্যাচগোচ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সরকারি হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় হবে এক হাজার ৪৬৬ ডলার-যা বিগত বছরের তুলনায় ১৫০ ডলার বেশি। তা ছাড়া এই অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশেরও বেশি হবে বলেও বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলনে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বলা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রাক্কলনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই অর্থ বছরে প্রথমবারের মতো জিডিপি সাত শতাংশ হয়েছে । প্রশ্ন হলো, জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বাড়লেই কি দেশের সব মানুষ ভালোভাবে খেতে, পড়তে পারছে। ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তাসহ আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত জীবন-যাপন ও মানসম্পন্ন বাসস্থানের সুযোগ কি পাচ্ছে? মোটেই না। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের বৈষম্যের দিকে তাকালেই দেখা যাবে যে, একদিকে বহু মানুষ দিনে ১৫০ থেকে টাকা আয় করে অথবা কখনো সারাদিন উপোস করে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, কোন মানুষের দিনে এক লাখ টাকা আয় করে সংসার চালাচ্ছে। এভাবে কোন দেশের মাথাপিছু আয়ের প্রকট বৈষম্য রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে না, পেছনে পড়ে রয়েছে। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, এ ধরনের বৈষম্য রেখে দেশের মাথাপিছু আয়ের হিসাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হলেও সাধারন মানুষের কোনো লাভ নেই। একজনের আয় যদি হয় ১০০ টাকা এবং আরেকজনের হয় ২ টাকা, তাহলে গড় করলে দেখা যাবে দুই জনের গড় আয় ৫১ টাকা। তাহলে দুজনের প্রকৃত আয় কি সমান হলো? এ প্ররিপ্রেক্ষিতে যদি ধরে নেয়া হয়, যার বার্ষিক আয় ৪ থেকে ৫ লাখ ডলার এবং একজন দিনমজুরের আয় যদি হয় চার-পাঁচশ ডলার। তবে বলতে হবে দিনমজুরের আয়ের সাথে কোটিপতির আয় যুক্ত হয়ে হয়েছে ১৪৬৬ ডলার। আবার কোটিপতির আয় বছরে যে হারে বৃদ্ধি পায়, দিনমজুরের বৃদ্ধি তার থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে থাকে। কাজেই মাথাপিছু গড় আয়ের হিসাবে প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে না। এর মধ্যে বেকার তরুণ শ্রেণীও রয়েছে। তাহলে কি বেকারের আয়ও ১৪৬৬ ডলার? সরকারের তরফ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, গড় আয় বৃদ্ধির যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, তা সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ইঙ্গিত সরকার দিতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী বছর হয়তো এই আয় আরও বাড়বে। প্রশ্ন আসতে পারে, সরকার যেভাবে আয় ও জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব দিচ্ছে এবং অর্থনীতির যে গতি দেখাচ্ছে, আসলে কি এ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?

মাথাপিছু আয় পুরো সত্যটি তুলে ধরে না। কারণ এটি একটি গড় হিসাব। হাতি এবং পিঁপড়ার ওজনের গড় হিসাব করলে যে  গড়ের হিসাব পাওয়া ছাড়া আর কি? বাংলাদেশে দারিদ্র্য  হ্রাস পেলেও ধনবৈষম্য, আয়বৈষম্য প্রকট। সরকারি গিনি কোফিশিয়েন্টের হিসাবে সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ ধনাঢ্যদের ধনসম্পদ ও আয়ের পরিমাণ লুক্কায়িত থেকে যায়। জিডিপি শুধুমাত্র ‘খারাপগুলো’ যেমন- স্বাস্থ্যগত সমস্যা, দুর্ঘটনা, পরিবারের ভাঙ্গন, অপরাধ এবং দূষণ এগুলোর দায় অন্তর্ভুক্ত করে তাই নয়,  বরং এটা ‘ভালোগুলোকেও’ বাদ দেয়, যেমন- বাচ্চা মানুষ করার মত বিনা-বেতনের কাজ, সংসার চালানো, বন্ধু এবং প্রতিবেশীকে সাহায্য করা, দাতব্যসেবা ও স্থানীয় সামাজিক রাজনীতির মত কর্মকান্ড।

এসবই বাজারের বাইরে ঘটা কর্মকান্ড। কিন্তু এগুলোই আমাদের অর্থনীতির মূল মূল অংশ। আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের যেসব দিকগুলোর মূল্য পরিমাপ সবচেয়ে বেশি, যথারীতি এড়িয়ে গিয়ে জিডিপি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সামাজিক এবং পরিবেশগত মুল্যকে হিসাবের মধ্যে ধরে না। উদাহরণ হিসেবে, যা সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ফলে প্রভাব রাখে সেই জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলা যায়; অর্থনীতিবিদ নিকোলাস স্টার্নস এটাকে আখ্যা দিয়েছেন, ‘বাজার ব্যবস্থায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং সীমাহীন ব্যর্থতা।’ বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল সুফলভোগী ধনীরা। ধনীরা দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়াচ্ছে, ফলে আয় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। আর দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠি কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে। চলতি (২০১৪-১৫) অর্থবছরে দেশের উচ্চবিত্তদের একটি হিসাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানেও দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের বেশির ভাগের মালিক মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ। তাদের বার্ষিক আয় ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার উপর। এসব ব্যক্তির সম্পদ আছে কোটি টাকার বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকারও বেশী অর্থ-বিত্তের মালিক। হিসাবটি করা হয়েছে আয়কর জমার বিবরণী থেকে। ধারণা করা যায় -এতে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কেউ সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। সবাই রেখে ঢেকে তারপর সম্পদ বিবরণী জমা দেয়। অনেকে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা থেকে সম্পদ কম করে দেখায়। তারপরও দেশের অধিকাংশ সম্পদ ধনী শ্রেণীর হাতেই। প্রকৃত অর্থে সম্পদের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল সুবিধাভোগী। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে সব সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করছে ধনী শ্রেণী। কারণ সরকারের সুবিধা ভোগ করার মতো সব ধরনের ক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এটাই তাদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে একটি শ্রেণী দ্রুত অর্থ তৈরি করেছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। দারিদ্রের সম্পদ লুটে ধনী হয়েছে অনেকে। ফলে সমাজে ব্যাপক আয়-বৈষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু এ সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ অতি ধনীরা তথ্য দেয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে উচ্চবিত্তরা ও ধনীরা বেশি লাভবান হচ্ছে।

টমাস পিকেটি’র ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইটিতে বলেছেন, রাষ্ট্র যদি অত্যন্ত কঠোরভাবে আয় ও সম্পদ পুনর্বণ্টনকারীর ভূমিকা পালন না করে, তাহলে উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বাড়তে বাড়তে দ্রুত বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যাবে। সাইমন কুজনেৎস যে একপর্যায়ে উন্নত দেশগুলোতে বৈষম্য আর বাড়বে না বলে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, সেই ‘ট্রিকল ডাউন তত্ত্বকে’ পুরোপুরি বাতিল করেছেন পিকেটি। পিকেটি মনে করেন, প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থা, সম্পত্তি কর ব্যবস্থা ও বিশ্বব্যাপী পুঁজির ওপর ‘গ্লোবাল ট্যাক্স বসানোর মাধ্যমে এই আসন্ন মহাবিপদ ঠেকানোর প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের সরকার কি সেদিকে নজর দেবেন?

চৈত্র সংক্রান্তি ও নারীর জ্ঞানের চর্চা

ফরিদা আখতার ::

বাংলা সনের বছর শেষ হয় চৈত্র মাসের ৩০ তারিখে। এই দিনটাই চৈত্র স্ংক্রান্তি হিসেবে গ্রামের মানুষ পালন করে খুব নিষ্ঠার সাথে। কোন ঘটা করে নয়, কিন্তু তারা নিয়মটা ঠিকই মেনে চলেন। নিয়মটাও তেমন শক্ত কিছু নয়। সোজা কথা হচ্ছে এই দিনে তারা কমপক্ষে চৌদ্দ রকম শাক বাড়ীর আলানে-পালানে, ক্ষেতের জমি থেকে তুলে এনে রান্না করেন। কিছু শাক মিশ্র আকারে রান্না হয় আর কিছু শাক আলাদাভাবে রান্না, কিংবা ভর্তা বা ভাজি করে খেতে হয়। সাধারণভাবে এই শাকগুলো হচ্ছে হেলেঞ্চা, ঢেকি, সেঞ্চি, নটে শাক (কোথাও ন্যাটাপ্যাটাও বলে) থান কুনি, বথুয়া, তেলাকুচা, গিমা, দন্ডকলস, নুনিয়া,কচু শাক,গুরগুরিয়া শাক,মরুক,ঢেঁকি শাক, নুনিয়া শাক, হাগড়া,আম খুইড়ে শাক,খুড়ে কাটা,থানকুনি পাতা,নুন খুরিয়া,কানাই,পাট, রসুন,পিপল, খাড়কোন সহ আরো অনেক শাক রয়েছে। নারী জানে কোন শাক পুষ্টির দিক থেকে ভাল, কোনটা কি ওষুধি গুন আছে; কোনটা শুধু পাতা তুলতে হবে, কোনটার আগাটা কাটতে হবে।

এদিন কোন রকম মাছ বা মাংস রান্না হয় না, শুধু ডাল জাতীয় বাড়তি কিছু থাকতে পারে। এই চৌদ্দ রকম শাকের মধ্যে অন্তত একটি দুটি তিতা স্বাদের, নোনতা, পানসা এবং টক স্বাদের থাকতে হবে। টক স্বাদের শাক পাওয়া না গেলে কাঁচা আম তো আছেই, ডাল দিয়ে কাঁচা আম রান্না হয়। পানসা স্বাদের কিছু না থাকলে সজনা বা নাজনা সরিষা দিয়ে খেতে খুব স্বাদ।

এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে চৈত্র সংক্রান্তি শুধুই শাক রান্নার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নারীদের জ্ঞানের দৌড় বুঝি শুধু রান্না ঘর পর্যন্ত। একদিন রান্না করে খেলেই ফুরিয়ে গেল। এর অর্থ নারীর জীবনে অনেক গভীর অর্থ বহন করে এবং সমাজের জন্যেও তার এই ভুমিকা খুব তাৎপর্যপুর্ণ। গ্রামের নারীরা বাজার থেকে কিনে আনা আবাদী শাক রান্না করবেন না। যেমন পুঁই শাক, লাল শাক, পালং শাকের মতো বাণিজ্যিক ও আবাদী শাক দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি হবে না। তার মানে শুধু শাক রান্নার মধ্য দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি পালন হয় না। চৈত্র মাসের এই খর তাপে যে শাক মাঠে, রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে, আবাদী জমিতে অনাবাদি হিসেবে বা সাথী ফসল হিসেবে পাওয়া যাবে শুধু সেই শাক তুলে রান্না করাই হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তির আয়োজন। তাই মনে করার কোন কারণ নেই যে একই রকমের শাক বাংলাদেশের সব জেলায়, বা গ্রামে একইভাবে পাওয়া যাবে। নির্দিষ্ট এলাকার ফসলের ধরণ, এলাকার আবহাওয়া, কৃষির অবস্থা অনেক কিছুই এর সাথে জড়িত। তা চৌদ্দ রকম শাক চৌদ্দ জায়গায় ভিন্ন হতেও পারে। একটি বিষয়ে কোন আপোষ নেই , সেতা হচ্ছে  এই শাকগুলো অনাবাদী, এগুলো চাষ করা শাক নয়। এই শাকগুলোকে কুড়িয়ে পাওয়া শাক, বা কুড়ানো শাক বলা হয়। অর্থাৎ প্রকৃতিতে যা পাওয়া যায় তাই তারা নেবেন। প্রকৃতি রক্ষার প্রতি তাদের জবাবদিহিতার এটা একটা ধরণ।

শাকের সাথে গ্রামের নারীদের মধ্যে এক আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনও তৈরি হয়। গৃহস্থ পরিবারের নারীদের পক্ষে মাঠে গিয়ে শাক তোলা সম্ভব নয়। তার সামাজিক অবস্থান তাকে এই কাজ থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু তাই বলে তিনি চৌদ্দ রকমের শাক দিয়ে চৈত্র সংক্রন্তি করবেন না এমন হতে পারে না। তাই মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বাড়ির নারীরা তাদের বাড়ির কাছ্রে  গরিব পরিবারের নারীদের সাথে আবাদী ও অনাবাদী ফসলের বিনিময় করেন। গরিব নারী যখন অনাবাদী শাক কুড়িয়ে আনেন, তখন গৃহস্থ পরিবার তাকে বেগুন, তিতা করলা, চিচিংগা, বা মিষ্টি কুমড়া দিয়ে দেন। এই বিনিময় কোন টাকার অংকে হয় না, বা কে কতো দিল তার ওজন নিক্তিতে মাপা হয় না। কার কোনটা পছন্দ বা কার কোনটা দরকার সেই মাপজোকটাই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

গ্রামের কৃষকদের আবাদী জমি থাকে, এবং তাদের আবাদী ফসল এই জমির পরিমানের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু আবাদী জমিতে যখন সাথী ফসল হিসেবে বথুয়া, দন্ড কলস, জমির আইলে হেলেঞ্চা, হেঞ্চি, থানকুনি পাওয়া গেলে সেটা যে কোন নারী জমির মালিকের অনুমতি ছাড়াই তুলতে পারেন। এই শাক তো মালিক লাগায় নি, এটা নিজ থেকেই জন্মেছে। তাই এই শাক তোলার অধিকার গ্রামের অন্য সকল মানুষের আছে, বিশেষ করে নারীদের আছে। তবে যে নারী এই শাক তোলেন তারাও এটা মেনে চলেন যে আবাদী ফসলের কোন প্রকার ক্ষতি তারা করেন না। এমনকি অনাবাদী শাক তুলতে গিয়ে কখনো গাছ সহ উপড়ে ফেলেন না। শুধু যে অংশটুকু রান্নার জন্যে দরকার সে অংশটুকু তারা অতি যত্নের সাথে তোলেন। এবং সেটা তারা খুব ভালভাবেই করতে পারেন। তাদের হাতের মাপ, আঙ্গুলের ব্যবহার সব কিছুই তারা চ্ছোট বেলা থেকে মায়ের সাথে শাক তুলতে তুলতেই শিখে ফেলেন। যে সাথী ফসল আবাদী ফসলের জন্যে বাড়তি হয়ে যায়, এবং আধুনিক কৃষির ভাষায় যাকে ‘আগাছা’ বলা হয়, সেগুলো তারা পুরোটাই তুলে ফেলেন। যেমন বথুয়া ও দণ্ডকলস। এগুলোর সুবিধা হচ্ছে এই গাছগুলো শুধু মানুষের জন্যে নয় গরু ছাগলের জন্যেও খুব ভাল খাদ্য। বথুয়া গরুর দুধ বাড়ায়। কাজেই প্রকৃতিতে যা আছে তা শুধু মানুষের জন্যে নয়, সব প্রাণীর জন্যে। নারীর জন্যে তা খুব গুরুত্বপুর্ণ।

দুঃখজনক হচ্ছে আধুনিক কৃষি এসে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করে এই মূল্যবান শাকগুলোকে আগাছা নাম দিয়ে রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহার করে ধ্বংস করে দিয়েছে। আগাছানাশক ব্যবহারের কারণে আবাদী ফসল ছাড়া বাকী সব সবুজ চারা, লতাপাতা মরে যায়। আবার আবাদী ফসলে পোকা লাগে বলে কীটনাশক ব্যবহার করলে জমির আইলে বা রাস্তার ধারে যদিও বা কোন শাক পাওয়া যায় নারীরা সেই শাক বিষাক্ত বলে তুলে ঘরে আনবেন না। গরুকেও খাওয়াবেন না। আবাদী ফসলে ফলনের কথা বলে কীটনাশক ব্যবহারের হিশাব পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা এবং পুরুষরাই তা করে থাকে। কিন্তু নারীরা দেখেন প্রানের বৈচিত্র, শুধু আবাদী এককাট্টা ফসলের পরিমান বাড়ালেই নারীরা সন্তুষ্ট নন, তারা চান আবাদী ও অনাবাদী ফসল ও শাক সব্জির ব্যবহার। সত্যি কথা বলতে কি গ্রামের গরিব নারীদের সারা বছরের মুল খাদ্যের ৪০% আসে অনাবাদী উৎস থেকে। এমন কি মাছও তারা নদী, ডোবা, বা পুকুর থেকে তারা গোসল করতে গিয়েও সংগ্রহ করে আনেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আধুনিক কৃষি নারী ও গরিব বিরোধী কৃষি ব্যবস্থা। চৈত্র সংক্রান্তি এলে টের পাওয়া যায় শাক পাওয়া সহজ কিনা। যদি পাওয়া না যায়, এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেটা ঘটে, তার অর্থ হচ্ছে প্রকৃতিতে এমন অ-ঘটন ঘটে গেছে যেখানে নারী তার জ্ঞানের ব্যবহার করতে পারছে না।

চৈত্র সংক্রান্তি শাক খাওয়ার যে বৈচিত্র তা হঠাৎ করে বৈশাখে ইলিশ-পান্তার মতো করে কারো মাথায় উদ্ভটভাবে আসার কারণে হুজুগের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে ইলিশের যে ক্ষতি তারা করছে তা ক্ষমার অযোগ্য। শাক তোলার ব্যাপার সারা বছরই হয়। যেমন বর্ষা কালের পানিতে ভাসা শাকগুলোর মজাই আলাদা, যেমন কলমি, শাপলা ইত্যাদী। কিন্তু চৈত্র মাসটা এমন এক কঠিন সময় যখন চৈতালী ফসল প্রায় উঠে গেছে, পাট ও আউশ ধান বোনার সময়। এই সময় কখনো বৃষ্টি হয়, তবে খরার ভাবটাই বেশী। নারী জানেন গরম বেশী হলে টক জাতীয় খাবার শরীরের জন্যে উপকারি। গিমা শাক সারা বছর পাওয়া যায় না। গিমা শাক রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে, কাজেই তারা বাচ্চাদের ছোট বেলা থেকে গল্প বলে বলে তিতা খাওয়াবার অভ্যাস করেন। তবে গিমার তিতা আর তিতা করলার তিতা এক নাও হতে পারে এমন সুক্ষ্ম পার্থক্য একমাত্র নারীরাই বোঝেন।

চৈত্র সংক্রান্তি ভুলে গিয়ে পয়লা বৈশাখ দিয়ে নতুন বছর বরণ করার মধ্যে জ্ঞানের চর্চা নেই। আছে শুধু বাণিজ্য। চৈত্র সংক্রান্তি পালনের মধ্য দিয়ে আসুন নারীর জ্ঞানের সাথে পরিচিত হই। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার বড় বড় সেমিনারের চেয়ে বেশী উপকার হবে। তাই বলি যুগ যুগ চলুক নারীর জ্ঞানের চর্চা।

ওলামা লীগের ফতোয়া আর পহেলা বৈশাখে সরকারী নিষেধাজ্ঞা

আমীর খসরু ::

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই এবং বর্তমানে আরও তীব্রভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে যে, তারাই দেশের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক শক্তি ও ধর্ম নিরপেক্ষতার ধারক-বাহক। এই প্রচার-প্রচারণার ভিত্তি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আর তারা এ কথাও বলছে যে, তারাই রক্ষা করে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকত্ব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাকি বিপন্ন হবে; সাথে সাথে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হবে ও ধর্ম নিরপেক্ষতা হবে বাধাগ্রস্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন পক্ষ ১৯৭২-এ মূল সংবিধানে ফিরে যাবার কথা বলে এমন কিছু বিষয় বহাল রেখেছে-যা আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতারা ধর্ম নিরপেক্ষতাকে শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হিসেবেই স্থান দেননি, তাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে এ বিষয়টি ছিল অতিমাত্রায় সক্রিয়। ১৯৭২-এর সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য ক, সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, খ, রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, গ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, ঘ, কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে

কিন্তু এতোকাল পরে এসে আওয়ামী লীগ সংবিধান প্রণীত সেই মৌল চেতনার পরিপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এটা শুধুমাত্র যে রাজনৈতিক অবস্থান বা পথ পরিবর্তন তাই নয়, সামগ্রিকভাবেই তাদের মধ্যে এই বিষয়গুলো ক্রিয়াশীল রয়েছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনী লাভালাভের জন্যে ২০০৬-এ খেলাফত মজলিসের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল-যাতে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এ কথাটি মনে রাখতে হবে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক অতীতে বার বার সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের সাথে ক্ষমতাসীন মহলের যুক্ত থাকা এবং মদদদানের অভিযোগ করা হয়। তারা কয়েকজন মন্ত্রীসহ প্রভাবশালীদের নামও প্রকাশ্যে এবং সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছিলেন ও তালিকাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে যে কোনো কাজ হয়নি- তা দাবি করছেন ওই সংগঠনের নেতারাই।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে দীর্ঘকাল ধরে। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন এই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ওলামা লীগ আবার ফতোয়া দিয়েছে এই বলে যে, পহেলা বৈশাখ পালন হারাম। তারা ওই ফতোয়া দেয়ার জন্য মানববন্ধনও করেছে। মানববন্ধনে শুধু পহেলা বৈশাখ পালনকে হারামই বলা হয়নি, বেশ কয়েকটি দাবি-দাওয়াও তাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। এমন দাবি-দাওয়া যে নতুন তা নয়। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর নেতা, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, তারা ওলামা লীগের বক্তব্যের সাথে একমত নন এবং ওই বক্তব্য তারা গ্রহণ করেন না। কিন্তু এই ব্যাখ্যাই যথেষ্ট বলে মনে হয় না। কারণ এর আগেও ওলামা লীগ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ব্যাপারেও কয়েক দফায় নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। ওলামা লীগ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে একজন হিন্দুকে প্রধান বিচারপতি রাখা যায় না। তখনো সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি দল থেকেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে-তারও কোনো নজীর খুজে পাওয়া যায় না।

এখানেই শেষ নয়, ২০১৫ সালের আগস্টে ওলামা লীগ সমাবেশ করে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছিল। এসব দাবি-দাওয়াগুলোর কয়েকটি ছিল এ রকম : নাস্তিক ব্লগার কর্তৃক বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইট, স্যোসাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ নাস্তিক্যবাদী লেখা বন্ধে ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন প্রণয়ন করা, ঈদের দিন হিন্দুদের রথযাত্রা করে মুসলমানদের ঈদের দিন ম্লান করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে, বিদেশী স্বার্থ রক্ষাকারী দেশদ্রোহী সিএইচটি কমিশনসহ বিদেশী দালালদের নিষিদ্ধ করতে হবে, ইসলাম বিরোধী রচনা পাঠ্যক্রম থেকে বাদ বিতর্কিত শিক্ষানীতি বাতিল করতে হবে, বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে কট্টর ইসলাম বিরোধী হিন্দু নাস্তিক লেখকদের লেখাকে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রদান করা হয়েছেউদাহরণস্বরূপ ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্প, কবিতা প্রবন্ধসমূহের মধ্যে মুসলমান লেখকদের তুলনায় বিধর্মী হিন্দু লেখকদের লেখাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছেযেমন ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত গল্প কবিতার সংখ্যা ১৯৩টিএর মধ্যে হিন্দু নাস্তিকদের লেখার সংখ্যা হলো ১৩৭টিযা সর্বনিম্ন শতকরা ৫৭ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ প্রাধান্য পেয়েছেএটা বন্ধ করতে হবে, মেয়েদের বিয়ের  কোনো বয়স নির্ধারণ করা যাবে না, সুন্নতি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কুফরী আইন বাতিল করতে হবে, প্রশাসনে হিন্দুতোষণ বন্ধ করা ইত্যাদিপাঠ্যক্রম সম্পর্কে ওলামা লীগের ওই সমাবেশে বলা হয়, ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি যাদের কোন আস্থা বা বিশ্বাস নেই বরং ইসলাম ধর্ম বিদ্বেষী এমন সব বামপন্থী ব্যক্তি; জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটির চেয়ারম্যান কবীর চৌধুরী, কো-চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, সদস্য ড. জাফর ইকবাল, অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সূত্র ধরদের দিয়ে বর্তমান শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করা হয়েছেঅথচ এসব কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী ব্যক্তিদের প্রণীত শিক্ষানীতি মুসলমানদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়তারা মূলত এদেশের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মন-মগজ থেকে দ্বীন ইসলাম উঠিয়ে দিয়ে নাস্তিক্যবাদী মন-মনন গড়তে শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করেছেএদেশকে নাস্তিক্যবাদী দেশ বানাতে এই ইসলাম বিরোধী শিক্ষানীতি তৈরী করা হয়েছে’প্রশাসন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘চাকরীর ক্ষেত্রে ৯৮ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের নিয়োগ আনুপাতিকহারে করতে হবেহিন্দুদেরকে মুসলমানদের চেয়ে বেশি নিয়োগ দিয়ে বৈষম্য করা যাবে নাপ্রশাসনকে হিন্দুকরণ চলবে নাকারণ ২০১৩ সালের অক্টোবরে পুলিশের এসআই পদে নিয়োগে ১৫২০ জনের মধ্যে হিন্দু নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩৩৪ জন যা মোটের ২১.৯৭ শতাংশ২০১১ সালে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইতে নিয়োগের ৯৩ জনের মধ্যে হিন্দু নিয়োগ করা হয়েছে ২৩ জনযা মোটের ২৪.৭৩ শতাংশসম্প্রতি ৬ষ্ঠ ব্যাচে সহকারি জজ পদে নিয়োগ দেয়া ১২৪ জনকেএর মধ্যে ২২ জনই হিন্দুশতকরা হিসেবে ১৭ শতাংশএসব বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মুসলমান দেশে মুসলমানদের প্রতি ব্যাপক বৈষম্যের দাবিই দৃঢ় হচ্ছে

সে সময়ও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে কারো জানা নেই। এমনকি ওলামা লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে নেয়া হয়েছে এমনটাও শোনা যায়নি। আওয়ামী লীগেরই কেন্দ্রীয় অফিসেই ওলামা লীগের অফিস। তাহলে এবারে ওলামা লীগের বক্তব্যের সাথে আওয়ামী লীগ একমত নয় বলে হানিফ যে বক্তব্যে দিয়েছেন তা কতোটুকু কার্যকরি হবে? এ কথা পরিষ্কার যে, ওলামা লীগ যে ভাষায় কথা বলছে তা অন্যান্য অনেক সাম্প্রদায়িক দলের বক্তব্যকেও হার মানায়।

ওলামা লীগের বিষয়টি যে শুধু ওলামা লীগের নিজস্ব সংকট তা মনে করার কোনো কারণ নেই। নেই এই কারণে যে, যদি থাকতো তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হতো।

ওলামা লীগ পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছে। অন্যদিকে, এবারের পহেলা বৈশাখে বিকাল ৫টার মধ্যে বাইরের সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবেসহ যেসব নির্দেশাবলীর মাধ্যমে পুলিশ যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তাতেও কিছু প্রশ্ন ইতোমধ্যে উত্থাপিত হয়েছে। পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞা কি শুধুমাত্র নগন্য সংখ্যক যৌন সন্ত্রাসীর কারণে অথবা জঙ্গীবাদী-উগ্রবাদী কর্মকান্ডের আশংকায়? প্রথম বিষয়টি আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, গত বছরের পহেলা বৈশাখে যে হাতেগোনা কয়েকজন যৌন সন্ত্রাসীর তান্ডব প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী, এই এক বছরে তাদের ক্ষেত্রে কি আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? কেন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি? তাহলে কি নগন্য সংখ্যক যৌন সন্ত্রাসীর কাছে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা অসহায় অথবা অন্য কিছু? সামান্য কয়েকজন যৌন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারার দায় সরকার ও তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি অর্থাৎ জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদীদের আশংকায়ই যদি এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তাহলেও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সরকারের পক্ষ থেকে উগ্রবাদ-জঙ্গীবাদ মোকাবেলা করা গেছে এবং তারা সব সময় তৎপর রয়েছে-এ সব কি শুধুই কথার কথা? এই নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সমাজে ভীতির সংস্কৃতি আরও বিস্তার লাভ করবে। আর ওলামা লীগের বক্তব্যও জনমনে শংকার সৃষ্টি করবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওলামা লীগের বক্তব্য এবং পহেলা বৈশাখে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে কি এটা প্রমাণিত হয় না যে, বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে? অসীম সাহসী মানুষকে ক্রমশই পিছু হটতে বাধ্য করা হচ্ছে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা অতীব জরুরী। কারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং সবার সুরক্ষা প্রদান রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।

পানামা পেপার্স : সামাজিক প্রতিবাদের উত্থান

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

বিশ্বজুড়ে এখন একটাই আলোচনা- পানামা পেপার্স। বিশ্বের ৯৯ ভাগ মানুষ যে আশঙ্কা এত দিন করে আসছিল, সেটাই অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছে এই পানামা পেপার্স। এখন যা হওয়া উচিত, বিশ্বের ওপর ছড়ি ঘোরানোর কাজে নিয়োজিত বাকি ১ ভাগের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায় করে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো।

তবে এটাও অনেকের কাছে চমক সৃষ্টিকারী কোনো খবর নয়। বিপুল ফাঁসের মানে হলো সমাজ পরিবর্তনের সম্ভাবনা- এটাই হলো পানামা পেপার্সের আসল তাৎপর্য।

পানামা পেপার্স আসন্ন ফাঁসকরণ যুগের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই অ্যাক্টিভিস্ট তত্ত্বটি সবচেয়ে প্রচন্ডভাবে প্রচার করেছে উইকিলিকস। এতে বলা হয়, সত্য, তথ্য উদঘাটন সামাজিক প্রতিবাদের একটি কার্যকর মাধ্যম। অবশ্য নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এটা কোনো নতুন আইডিয়া নয়। বাইবেলে আছে : ‘তুমি সত্যকে জানবে, সত্য তোমাকে মুক্ত করবে।’ (জন ৮:৩২)। তবে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, চেলসি ম্যানিং এবং অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো বৈশ্বিক হুইসেল- ব্লেয়ারের উত্থানে ফাঁসকরণ এখন ক্রমবর্ধমান হারে সমসাময়িক অ্যাক্টিভিজমের সবচেয়ে পরিচিত কৌশলে পরিণত হয়েছে।

এই ফাঁসের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলে গরিব মানুষদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। একদিকে শাসকশ্রেণী গোপনে অর্থপাচার করছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক মন্দা একটা মিথ্যা প্রচারণা। ধনীরা কর না দিয়ে অর্থ পাচার করার কারণেই এর সৃষ্টি।

কত অর্থ পাচার হচ্ছে? দি ট্যাক্স জাস্টিজ নেটওয়ার্ক নামের একটি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের মোট সম্পদের ৮ থেকে ১৩ ভাগ তথা ২১ থেকে ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার ট্যাক্স হেভেনগুলোতে পাচার করা হয়েছে।

পানামা পেপার্স ফাঁসকরণের কার্যকারিতা পরীক্ষার অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে। পানামা পেপার্স যৌক্তিকভাবে একটি নিখুঁত ফাঁস। প্রথমত, আকারটি সমীহ সৃষ্টিকারী : বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা ৪০ বছরের রেকর্ড, সোয়া কোটি ফাইল এবং ২.৬ টেরাবাইট ডাটা। এটা একটা পূর্ণাঙ্গ ফাঁস, এর সামনে মানব ইতিহাসে আগের সব ফাঁসের ঘটনা নিতান্তই নগণ্য। দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য শত শত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের গোপনে এক বছরের কাজের নজিরবিহীন ঘটনার ফসল এটি। এটা ফাঁসকরণের বৈশ্বিক পেশাকরণ।

তাহলে কি সত্যিই পানামা পেপার্স ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন ঘটাবে?

এই ফাঁস রাজপথে বিক্ষোভের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। পার্লামেন্টে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীর উপস্থিতিতে ইতোমধ্যেই আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডার ডেবিও গুন্লাগসন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন পানামা পেপার্সে তার ও তার স্ত্রীর নাম থাকার জের ধরে। মনে রাখা দরকার, এই দফার পানামা পেপার্সে ১৪৩ জন রাজনীতিবিদের নাম আছে। এদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট, সৌদি আরবের বাদশাহ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের ছয় সদস্য, চীনা পলিটব্যুরোর সাথে সম্পর্কিত আটটি পরিবার এবং বেশ কয়েকজন ব্রাজিলিয়ান। অনেক দেশেই ব্যাপক বিক্ষোভ হতে পারে বলে ধারণা করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

পানামা পেপার্সের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কয়েকটি সরকারের ওপর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। আগামী দিনে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা তাদের বৈধতা হারাতে পারেন। টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয়তে রানা ফুরোহারের মতে, ‘পানামা পেপার্স পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।’

তবে সঙ্কট ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পুঁজিবাদের প্রকৃতির মধ্যেই সঙ্কটের অপরিহার্য বসবাস। সঙ্কটের রেশ ধরে গুটিকতেক রাজনীতিবিদ খসে পড়তে পারেন, কিন্তু তাতে সঙ্কটের সুরাহা হয় না। কারণ আমাদের বিশ্বটি ১% ভন্ডের দুঃশাসনে নিপীড়িত হচ্ছে।

তবে বিশাল ফাঁস এবং বিরাট বিক্ষোভের ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন হওয়ার বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়ার আগে আমাদের আরো ভালোমতো চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। উইকিলিকস ও অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের বিপুল তথ্য ফাঁস একটু ঢেউ তুলে কি আবার আগের মতোই হয়ে যায়নি। ২০১১ সালে ৮২টি দেশে আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভের পরও কি ধনী ও ক্ষমতাধরেরা বহাল তবিয়তে রয়ে যায়নি?

তবে অতীতে কিছু হয়নি বলে সব আশা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং আশায় বুক বেঁধে এবার ভিন্নভাবে বিক্ষোভে নামতে হবে। পানামা পেপার্সের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়টি হলো, এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিটি দেশের লোকজন একই বৈশ্বিক শত্রুর মুখে রয়েছে। আপনি যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, রাশিয়া বা পাকিস্তানে- কোথায় আছেন তা কোনো ব্যাপার নয়। নিরেট সত্য হলো, অতি ধনীরা তাদের ক্ষমতা অটুট রাখতে সম্পদকে ব্যবহার করে, তবে একই সঙ্গে তারা করও ফাঁকি দেয়।

পানামা পেপার্সের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, বিশ্ব আজ ভুল লোকের খপ্পরে পড়েছে। ৯৯% মাত্র একভাবেই গভীরতর সমস্যাটির সমাধান করতে পারে। সেটা হলো এমন এক সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করা যাতে, বিভিন্ন দেশে তারাই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে বিশ্বকে পরিচালনা করতে পারে। পানামা পেপার্স সফল হবে, যদি এটা ওই উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনে একটি ধাপেও অগ্রগতি হাসিল হয়।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)

নির্বাচনী ব্যবস্থার সংকট কী দীর্ঘস্থায়ী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কী গভীর সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? সাধারণ অর্থে জনকর্তৃত্বের অনুপস্থিতি অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে সবক্ষেত্রে। কিন্ত বাংলাদেশে তো শাসকদের কর্তৃত্বের অনুপস্থিতি নেই, শাসন ব্যবস্থা বড় বেশী সরল-রৈখিক, একক ও কর্তৃত্ববাদী। সুতরাং এই ধরণের ব্যবস্থা অস্থিরতার কারণ হতে পারে কীনা, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এরকম শাসনের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষ আইনকে শাসন করা হয়, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উস্কে দেয় । এই পরিস্থিতির সংকট সবক্ষেত্রে যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তা  প্রবল হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাসীনদের অনেকেই আইনের আওতার বাইরে সুবিধে ভোগ করে থাকে।

দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার হবে নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার কর্তৃত্ববাদী হবে, এটি আমাদের বুধবার-এ প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পরই এবং এটি এখন বাস্তবতা। নৈতিকভাবে দুর্বল এই সরকার স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠছে প্রতিশোধপরায়ন ও ক্ষিপ্র। একটি একক নির্বাচনে এবং প্রায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচিত ক্ষমতাসীনদের এই পর্যায়ে জনগনের কাছে দায়বদ্ধতা বলে কিছু আছে কীনা, থাকলে কী আছে, প্রতিষ্ঠানগুলিসহ মিডিয়ার চেহারায় সেটি দৃশ্যমান। দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার বাসনা তৈরী হচ্ছে। সেই কারনেই অসহিষ্ণুতা ক্রমশ: সুস্থ সমালোচনাকে রুদ্ধ করতে চাইছে।

রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকলে নাগরিকদের মিত্র থাকতে পারে না। দুর্বল নাগরিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। রাষ্ট্রের গুনাগুনের পরীক্ষা অন্য কোথাও তেমন দিতে হয় না, যেমনটা হয় ব্যক্তি নাগরিকের জীবনে। কাদের সুবিধা হচ্ছে, কাদের জন্য ঘনিয়ে আসছে বিপদ, তা দেখেই বোঝা যায়- রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকল কিনা! রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সাথে সাথে ব্যক্তির ভাগ্যের পরিবর্তন, কিছু মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি অন্যদের দুর্ভোগ-এর রহস্য নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতিকদের কার্যকলাপের ভেতরেই। ব্যক্তি এখানে শক্তিহীন, এমনকি যাদের ভাগ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ফলে- তারাও কি শক্তিশালী?

গত কয়েকমাসে বাংলাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা এক গভীর সংকট ও অস্থিরতার ইঙ্গিঁত বহন করে। দেশে হত্যা গুম, অপহরন, ধর্ষন লুন্ঠনের বেশুমার ঘটনা ফিবছর ঘটে চলেছে। কিন্তু এর মাঝে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা এবং এ নিয়ে শাসক মহলের নিস্পৃহ আচরন চমকে দেয়ার মত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য, আদালতের প্রতিক্রিয়া, মন্ত্রীদ্বয়ের শর্তহীন ক্ষমা প্রার্থনা এবং অন্তিমে সংবিধান লংঘন করার অভিযোগে তাদের শাস্তির পরে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা না নেয়া বিস্ময়কর হলেও কর্তৃত্ববাদী শাসনে এটিই স্বাভাবিক।

এ অবস্থায় শাসন ক্ষেত্রে সংকট ও অস্থিরতা দেখা দিলে শাসকদের প্রতিক্রিয়া থাকেনা । কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় রাষ্ট্রের অঙ্গগুলি স্বাধীনভাবে কাজ না করায় অখন্ড স্বত্তা হিসেবে আইন-কানুনের অনুশীলন করেনা। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় এমত অস্থিরতা দেখা দিয়েছে কিনা, এটি সমাজ বিজ্ঞানীদের গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষনের বিষয়। তবে শাদা চোখে মনে হবে যে, কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বে বসবাসরত দেশের জনগনের জন্য এই পরিস্থিতি দিনকে দিন নৈরাজ্যিক হয়ে উঠছে এবং পরিনামে দেশ গভীর সংকটের মধ্যে ও অস্থির হয়ে পড়ছে।

এই অনিবার্যতায় বাংলাদেশে এখন নির্বাচন ব্যবস্থার সংকট ও অস্থিরতা নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনের মত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও একপেশে হতে চলেছে। দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে ইতিমধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ৭৭ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। অর্থ দাঁড়ায়, যে কোন প্রকারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের  প্রার্থীতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়েছে। গাদা গাদা অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন ছিল নির্লিপ্ত, নিস্ক্রিয়।

রাজনৈতিক দলের কথিত মনোনয়নের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য। দল যে প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেয় তা মেনে নেয়নি নিজ দলের প্রার্থীরা । ক্ষমতাসীন দলে বিদ্রোহের সংখ্যা বেশি, এখন এটি স্পষ্ট যে, দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছিলনা। ধমক, চাপ, বহিস্কার, মামলা ও গ্রেফতার- এসব পথে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করা তৃনমূলে গনতন্ত্র চর্চার বিষয়টি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

তৃনমূলের রাজনৈতিক দলগুলির এই প্রাতিষ্টানিক ব্যর্থতার ফাঁক গলে সহিংসতা, রক্তপাত, দূর্নীতি-অনাচার আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রার্থী মনোনয়নে তৃনমূলের মতামতের চাইতে আর্থিক লেনদেন ও নেতৃত্বের কোটারি স্বার্থের প্রভাব হয়ে উঠেছিল বড়, ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীর অবাধ্যতা না ঠেকাতে পেরে দলীয় নেতারা বহিস্কারের হুমকিসহ নেপথ্যে প্রভাব খাটিয়ে মামলা ও গ্রেফতার করে ক্ষোভ ঠেকাতে চেয়েছেন। নির্বাচনী মাঠ সমতল ছিলনা, প্রচার- প্রচারনা ছিলনা নির্বিঘ্ন। এরকম নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের বিজয় নিশ্চিত করতে পারে, পারেনা উৎসবের আমেজে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ।

সকল রাজনৈতিক দলের আমলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সব নির্বাচনে রকম-ফেরে প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়ে থাকে। কিন্তু জনরায় প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের বিপক্ষে যেতে দেখা গেছে এভারেই প্রথম প্রশাসনের সহযোগিতায় এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে যে, শুধুমাত্র পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে। নিস্ক্রিয়, নির্লিপ্ত ও অনুজ্জল নির্বাচন কমিশন শেষতক সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারসহ ৫ জন ওসিকে ডেকে ‘তিরস্কার’ করেছে, বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেখানকার নির্বাচন কমিশন ডিসি, এসপিসহ  ৩৮ জন কর্মকর্তাকে বদলী করেছে নিরপেক্ষ ভূমিকা না থাকার কারণে।

এ পযর্ন্ত দু’দফা ইউপি নির্বাচনে শিশুসহ কুড়িজন মানুষের প্রাণ করেছে। আহত হয়েছে অগনিত মানুষ । ২২ মার্চ মঠবাড়িয়া কলেজ কেন্দ্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া গুলিতে মারা গেছে ৫ জন। এটি প্রমান করে যে, আমাদের  আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কতটা  ‘ট্রিগারহ্যাপি’ হয়ে উঠেছে এবং মানুষের প্রান কতটা সস্তা হয়ে গেছে! এই ঘটনার পর ঐ বাহিনীর ডিজি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নয় ) সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্দেশে তারা গুলি করেছে। এখানেই শেষ নয়, এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ঘটনায় পরবর্তীতে ১৩০০ জন অজ্ঞাতনামার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরে প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব অব্যাহত রেখেছে। প্রশাসনের এই বিষয়গুলি নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রন তো দূরে থাকে, আমলে নিয়ে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। ফলে নির্বাচনকালে ও নির্বাচন পরবর্তীতে সংঘটিত সহিংসতায় কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জালভোট ও ব্যাপক প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। নিকট অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন ন্যুনতম মানসম্পন্ন যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাগুলি অর্জন করেছিল, ২০১৪ থেকে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনে তা আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

দুই দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে আরো অস্থির করে তুলেছে। ভোটবঞ্চিত জনগন ভয়ে ও ক্ষোভে আগ্রহ হারাচ্ছে তৃনমূল পর্যন্ত। এর মধ্য দিয়ে সহিংসতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র দাখিল তেকে ভোটের দিন পর্যন্ত এবং ভোট পরবর্তী প্রতিটি স্তরে সংঘটিত ক্ষমতাসীনদের দাপট তৃনমূলের সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে। এক দলের সঙ্গে অন্য দলের পাশাপাশি  নিজেদের দলের মধ্যে বিরোধ ও শত্রুতা বাড়ছে। আশংকা বাড়ছে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তৃতীয় দফার নির্বাচনে নিচেরা ছাড়া আর কী কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনের মাঠে পাওয়া যাবে?

দেশের শাসনব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় এমত অস্থির পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে, সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিকে অদৃশ্য দলীয় নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিযে এটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সরকার দলীয় পরিচয়ের সাথে প্রতিষ্ঠানগুলিকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও সাংবিধানিক দায়িত্ব না ভেবে অনেকটা সরকারী কর্মকর্তাদের মত আচরন করছেন। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা  হারাচ্ছে রাষ্ট্র, জনআস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে।

এবারের নির্বাচন তৃনমূলের রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সমূলে বিনষ্ট করে দিয়েছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় হাজার ইউনিয়নে এই অক্ষমতা সবরকম সামাজিক ভারসাম্য ধ্বংস করে দেবে। ফলে সমাজ জুড়ে আগত সংকট ও অস্থির পরিস্থিতি তৃনমূলকে বিপুল বেগে আঘাত করতে চলেছে। যার শিকার হবে প্রধানত: গ্রামীন জনগোষ্ঠি।  নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দল মিলে কি সেদিকেই যাত্রা করলো ?

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (৮ পর্ব)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ::

প্রশ্ন থাকে কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। তাঁর সহযাত্রী মোহাম্মদ তোয়াহা যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে, তাজউদ্দীন কেন দিলেন না? কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না-দেওয়ার অন্তত তিনটি কারণ আমরা দেখতে পাই। প্রথম কারণ সম্বন্ধে তিনি নিজেই বলেছেন, সেটি হলো আবুল হাশিমের প্রভাব। তাঁর ভাষায়, ‘‘আবুল হাশিম সাহেব যদি বেঙ্গল মুসলিম লীগের সেক্রেটারি না থাকতেন, আবুল হাশিম সাহেবের কাজ, ফিলসফি, মিশন যদি আমাদের সামনে না থাকতো, তাহলে আমরা সবাই কমিউনিস্ট হয়ে যেতাম।’’ দ্বিতীয় কারণ, কমিউনিস্ট পার্টি তখন দৃশ্যমাণ ছিল না। পার্টি নিষিদ্ধ হয় ১৯৫৪-তে, কিন্তু ১৯৪৭-এর পর থেকেই পার্টির সদস্যদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়েছে, নেতাদের সবাইকেই থাকতে হয়েছে হয় কারাগারে নয়তো আত্মগোপনে। একটি হিসাব বলছে, অবিভক্ত বঙ্গে পার্টির ৩০ হাজার সদস্যের মধ্যে শতকরা ৫ জন ছিলেন মুসলমান, বাকি সবাই হিন্দু; দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ হিন্দু সদস্যই পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন।

পার্টির অফিসে নিয়মিত হামলা হতো, সভা করলে মুসলিম লীগের গুন্ডারা ভাংচুর করতো। ঢাকার রথখোলার মোড়ে পার্টির একটি বইয়ের দোকান ছিল, একদিন পুলিশ এসে সমস্ত বই গাড়িতে করে নিয়ে যায়, যে লোকটি বই বিক্রি করছিল তাকেও গ্রেফতার করে। এক কথায় ওই পার্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না।

তৃতীয় কারণটিই অবশ্য প্রধান। সেটি হলো তাজউদ্দীন আহমদের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি। শুরু থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভেতরেই ছিলেন। জাতীয়তাবাদের মধ্যে দক্ষিণপন্থীদের সংখ্যাধিক্য ছিল এটা ঠিক, কিন্তু একটি বামপন্থী ধারাও ছিল; তাজউদ্দীনের অবস্থান ওই বামপন্থী ধারাতে। এই বামপন্থীরা ছিলেন একই সঙ্গে উপনিবেশবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী; কিন্তু সমাজতন্ত্রী নন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাজউদ্দীনরা দেখছিলেন ব্রিটিশ চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু সে জায়গায় অবাঙালী ধনীদের শাসন কায়েম হয়েছে। অন্যদিকে সামন্তবাদের অবসান মোটেই ঘটে নি। দরিদ্র কৃষক আগের মতোই জমিদার, জোতদার, মহাজন ও আমলাদের দ্বারা শোষিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতার কারণে মানুষের মনোজগত ছিল অত্যন্ত সঙ্কুচিত। যাতায়াত ব্যবস্থা অকিঞ্চিৎকর। প্রায় সব গ্রামেই মেয়েদের জন্য পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না। আমলা, রাজনীতির লোক ও ব্যবসায়ীরা কখনো একত্রে, কখনো বা নিজ নিজ পদ্ধতিতে অসহায় মানুষকে পীড়ন করতো। তাজউদ্দীন রাজনীতিতে এসেছিলেন, এবং ছিলেন রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন আনবার আকাংখা নিয়ে। পরিবর্তন আনার কাজে যুক্ত হবার যে পথটা তিনি খোলা দেখেছেন সেটি হলো ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হওয়া। বলাই বাহুল্য ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভ নয়, সমাজের প্রয়োজনে নিপীড়নকারী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ইচ্ছাই ছিল চালিকাশক্তি।

নিজের এলাকার মানুষের অভাব অভিযোগ তুলে ধরবেন, প্রতিকারের ব্যবস্থা করবেন এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্রে পরিবর্তন এনে তাকে গণতান্ত্রিক করে তুলতে সচেষ্ট হবেন, এই আশাকে তিনি লালন করতেন। তাজউদ্দীন যে নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এ খবর তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জানতো। তাঁর এলাকা থেকে সরকার দলীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আবদুল মান্নান। তাজউদ্দীনের দিনলিপিতে আভাস আছে তাঁকে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে রাখার জন্য মান্নান সাহেব বিভিন্ন কৌশলের কথা ভাবছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দেয়ার চিন্তা যে করা হয়নি তাও নয়।

তাজউদ্দীনের চেষ্টা ছিল রক্ষণশীলতার গন্ডিটা ডিঙ্গিয়ে বেরিয়ে যাবেন। একা যাওয়া সম্ভব নয়; অনেককে লাগবে; সে জন্য মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা যায় কিনা সে চেষ্টা করলেন। দেখলেন পারা যাচ্ছে না। ওদিকে নির্বাচন এগিয়ে আসছে; আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম লীগের একমাত্র প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাসানী, যাঁর প্রতি তিনি ইতোমধ্যে আস্থাবান হয়ে উঠেছেন। তাছাড়া এই দল যে তাদের নাম থেকে ‘মুসলিম’ পরিচয়পত্রটি অবলুপ্ত করবে এমন প্রতিশ্রুতিও দলের কার্যক্রমের ভেতরেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এবং সেটা কার্যকরও হয়েছে বৈকি, নির্বাচনের পরের বছরই আওয়ামী লীগ তার ‘মুসলিম’ত্বটি পরিত্যাগ করেছে।

তাজউদ্দীন আহমদ আত্মজীবনী লেখার সময় ও সুযোগ পান নি, রাজনীতি বিষয়ে বই লিখবেন এমন অবকাশও তাঁর ছিল না, তাঁর জীবন মাত্র পঞ্চাশ বছরের, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম ও দিনলিপি অনুসরণ করলে আমরা দেখবো যে তিনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য লড়ছিলেন। রাজনীতির পরিভাষায় এটিকে বলা যাবে বুর্জোয়া গণতন্ত্র। এর প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে যথার্থ সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য ছিল। ধারণা করি তিনি ভাবতেন যে, একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব দরকার ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য পথ আবিস্কার করার প্রয়োজনেই। দ্বিতীয়টিই লক্ষ্য, প্রথমটি উপায় বটে। তাছাড়া এটা তো সত্য যে, তখনকার বাস্তবতায় জাতিগত নিপীড়নের বিষয়টির মীমাংসা না ঘটালে শ্রেণীগত নিপীড়নের বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে সামনে আনা যাচ্ছিল না।

সব কিছু মিলিয়ে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রগতিশীল ধারার সঙ্গেই যুক্ত হবেন, কমিউনিস্ট পার্টিতে না গিয়ে। মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ব্যক্তি তাজউদ্দীন নিজেকে গণতান্ত্রিক মানুষ হিসাবে গড়ে তুলছিলেন। গণতান্ত্রিকতার জন্য অনেক উপাদান আবশ্যক; অপরিহার্য দুটির একটি হলো পরমতসহিষ্ণুতা ও জবাবদিহিতা। এ দুটি গুণের জন্য জাতীয়তাবাদীরা বিখ্যাত নন; তাঁদের ভেতর প্রবণতা থাকে একনায়কতন্ত্রের। জাতীয়তাবাদী তাজউদ্দীন কিন্তু সচেষ্ট ছিলেন গণতান্ত্রিক হবার জন্য। আমরা দেখি যে তিনি আলাপ আলোচনা ও বিতর্কে অত্যন্ত উৎসাহী। আর তিনি যে প্রত্যহ দিনান্তে সযত্নে দিনলিপি তৈরী করতেন ওই খানে দেখা যায় যে নিজেই নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, হিসাব নিচ্ছেন দিনটা কিভাবে কাটিয়েছেন। কোথায় অপচয় অবহেলা ঘটলো, সার্থকতার জায়গাটা কোনখানে। গণতান্ত্রিকতার আরেকটি শর্ত হচ্ছে সামন্তবাদী সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা। সেই চেষ্টা তাঁর মধ্যে নিরন্তর। দেখতে পাচ্ছি তিনি উপন্যাস পড়ছেন শরৎচন্দ্রের, নাটক পড়ছেন শেকস্্পীয়রের; খবর রাখছেন বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে সে সবের। একান্ন সালের মে মাসের একটি দিনের ডায়েরীতে ফজলুল হক হলের একটি অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এই প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করলো। খুরশিদী খানম দুটো গান গাইলেন। দম বন্ধ করা অনুষ্ঠানের মধ্যে এই এটি ছিল সফল একটি আয়োজন।’’ ইংরেজী বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কার্জন হলে ওথেলো নাটকের মঞ্চায়ন করছে; তাজউদ্দীন সেটি উপভোগ করছেন। লিটন হলে চিত্রকলার প্রদর্শনী হয়েছে, দর্শক হিসাবে সেখানে তিনি রয়েছেন। যুবলীগের উদ্যোগে বার লাইব্রেরী হলে তিনি রবীন্দ্র জয়ন্তীর আয়োজন করছেন। একান্ন সালের ডায়েরীতে লিখে রাখছেন এই সংবাদ যে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্রিমভাবে ইকবাল দিবস প্রতিপালিত হচ্ছে। এর বিপরীতে জনগণের বিরাট অংশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের জন্মদিন পালন করছে।

খবর পাওয়া গেছে এমন কি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নতুন লক্ষ্যে দিবস দুটিতে অংশগ্রহণ করেছেজনগণের স্বাভাবিক জাগরণ! (চলবে)

বাংলাদেশ কি আদৌ রিজার্ভের অর্থ ফেরত পাবে?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের একটি অংশ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে বলে বদ্ধমুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। ফিলিপাইনের যে ক্যাসিনো থেকে ওই টাকা হস্তান্তর হয়েছিল, তার পরিচালক কিম অং কিছু অংশ এর মধ্যেই ফিলিপিনো সিনেট অনুসন্ধান কমিটির কাছে ফেরত দিয়েছেন। আরো একটি অংশ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে আশা কতটা বাসস্তবায়িত হয় সে নিয়েই এখন সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ এর মধ্যেই আইনের ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে। আর সেই ফাঁদ থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ ওই টাকা ফেরত পাবে কি না তা নিয়ে গভীর সন্দেহেরও সৃষ্টি হয়েছে।

ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং প্রথম দফায় দিয়েছিলেন ৮৬ হাজার ডলার। এরপর দ্বিতীয় দফায় দিয়েছেন ৮৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এছাড়া মঙ্গলবার সিনেটের শুনানিকালে ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আরো ৯৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার ফেরত দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে করে বাংলাদেশের আশাবাদী হওয়ার ভালো সম্ভাবনাই ছিল। কিন্তু মঙ্গলবারই বড় ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ দিন সিনেট কমিটির চতুর্থ দফা শুনানি হয়। বাংলাদেশকে প্রাপ্ত অর্থ ফেরত দেয়া নিয়ে সিনেট কমিটিতে বিতর্কও শুরু হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে।

ফিলিপাইনের সংবাদপত্র ইনক্যুইয়ারে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং সাক্ষ্য দিতে আসেন। তখনই বলা হয়, বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিরাপদ হেফাজতে রাখার জন্য সিনেট কমিটিকে ওই টাকা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কমিটিকে জানান, এএমএলসি’র নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া ব্যাকে-আবাদ।

এই প্রশ্ন ওঠায় কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তেওফিস্তো গুইনগোনা ওং এবং তার আইনজীবী ইনোসেনসিও ফেরারের কাছে জানতে চান, তাদের হস্তান্তরিত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরে কোনো আপত্তি আছে কি না। এই প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান অং। তিনি মিনমিন করে কিছু বলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তার আইনজীবীর কাছে ছেড়ে দেন। আর আইনজীবী জানান, বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য নয়, ওই টাকা এএমএলসি’কে দেওয়া হয়েছে নিরাপদে রাখার জন্য।

আইনজীবী আইনের মারপ্যাঁচই কষেছেন। তিনি ফিলিপিনো আইনের দোহাই দিয়ে বলেন, কেউ দাবি করলেই তা পরিশোধ করা যায় না, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। তিনি জানান, বিশেষ তদন্ত কমিটির সম্মান রক্ষা করে তাদের অনুরোধেই ওই টাকা হেফাজতে রাখার জন্য তাদের কাছে তারা সমর্পণ করেছেন।

কিন্তু সিনেট কি এ ধরনের কোনো অনুরোধ করেছিল? এক সিনেটরই কিন্তু এই প্রশ্নটি করেছেন। টেমপোরে রালফ রেকটো জানান, কমিটি নিরাপদ হেফাজত করার জন্য অর্থ তাদের কাছে রাখার কোনো অনুরোধ তারা করেছিলেন কিনা তা তিনি মনে করতে পারছেন না। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটা রাজনৈতিক বিষয়েও পরিণত হয়ে গেছে।

সিনেটের সংখ্যালঘু গ্রুপের নেতা জুয়ান পঞ্চ এনরিল দৃশ্যত ওই টাকা বাংলাদেশে হস্তান্তর বিলম্বিত করার অবস্থানই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সম্মানিত চেয়ারম্যান, আমি মনে করি, আমরা বাংলাদেশকে এ কারণে সহায়তা করতে চেয়েছি, যাতে আমরাও যদি কখনো একই ধরনের সমস্যায় পড়ি, তবে যাতে সহায়তা পেতে পারি। এখন কথা ওঠছে, আমাদেরকে আমাদের আইন দেখতে হবে, যেভাবে তারা তাদের আইন বিবেচনা করবে। আর আমি মনে করি না যে, সিনেট কমিটি বা এমনকি খোদ সিনেট কোনো ব্যক্তিকে কারো কাছে কিছু সমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারে না, যতক্ষণ না এই প্রজাতন্ত্রের আদালত সেটা তাকে করতে বলে।’ এই বক্তব্যের পর গুইনগোনাও তার আগের অবস্থান থেকে দৃশ্যত সরে আসেন। তিনি নরম সুরে বলেন, কমিটি অংকে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করতে চায় না, কেবল তাকে সম্মত করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে এনরিল সন্তুষ্ট হননি। তিনি বলেছেন, কমিটি যদি কাউকে সম্মত করানোর চেষ্টা করে, তবে সেটা আসলে হয়ে যায় জরবদস্তি।

কাজেই অং যদি নিজ থেকে বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দিতে রাজি না হন, তবে ফিলিপাইনের সিনেট কমিটি তাকে বাধ্য করতে পারবে না, ওই পথে যাবেই না। বরং তাদেরকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আর আইনি-প্রক্রিয়া সব দেশেই কমবেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাছাড়া অং কিন্তু ইতোমধ্যেই সে দেশের বিরোধী দলের কিছু সমর্থন পেয়ে গেছেন। কাজেই অং এখন সহজে অর্থটা দিয়ে দেবেন, এমনটা মনে হচ্ছে না।

সবাই জানে, ওই টাকার মালিক বাংলাদেশ। কিন্তু এনরিল জানিয়েছেন, ওই টাকা এখন ফিলিপাইনের এখতিয়ারভুক্ত। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশের আইন মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশকে এই টাকা ফেরত দেওয়ার আগে সরকারকে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আমরা বিচারক হতে পারি না, আমরা কেবলই আইন প্রণয়ন করতে পারি।’

ফলে বেশ জটিলতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর অবশ্য বলেছেন, বেশির ভাগ অর্থই ফেরত পাওয়া যাবে।