Home » সম্পাদকের বাছাই (page 46)

সম্পাদকের বাছাই

বাঁশখালী হত্যাযজ্ঞ: উন্নয়ন নামে দখল, প্রতারণা আর জবরদস্তির নমুনা

আনু মুহাম্মদ ::

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা গন্ডামারা বড়ঘোনায় ৭ হাজারেরও বেশি বসতবাড়ি, কৃষিজমি, লবণ চাষের জমি ও চিংড়ি ঘের সমৃদ্ধ অঞ্চলে সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমতি দিয়েছে সরকার ঘনিষ্ঠ দেশের দ্রুত বিকাশমান ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপকে। এর সাথে যুক্ত আছে চীনা কোম্পানি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এস আলম গ্রুপ সেপকো ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন নামে একটি চীনা কোম্পানির সাথে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকার এস আলম গ্রুপের দুটো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে ১২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতি কিলোওয়াট ৬.৬১ টাকা দরে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর জন্য ৬০০ একর জমি দেখানো হয়। বিনিয়োগের শতকরা ৭৫ ভাগ চীনা কোম্পানি বহন করবে বলে জানানো হয়।

এসব চুক্তি সম্পাদিত হলেও কোন পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষার কথা শোনা যায়নি।পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষা ছাড়া এরকম কোনো প্রকল্প কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা, এই সমীক্ষা থেকেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব কোনো প্রকল্প আসলে কতটা ক্ষতি করবে, আর কতটা লাভজনক হবে, আদৌ তা গ্রহণযোগ্য কিনা। বস্তুত, প্রথম থেকেই অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, জোরজবরদস্তি, ত্রাস দিয়ে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু। ৭ হাজারের বেশি বসতবাড়ি ছাড়াও এলাকায় আছে ৭০টি মসজিদ, মক্তব, কবরস্থান, শ্মশান, ১টি কারিগরী শিক্ষা বোর্ড, ২০টি ছোটবড় আশ্রয় কেন্দ্র, ১টি উচ্চবিদ্যালয়, ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি আলিয়া মাদ্রাসা, ৫টি কওমী মাদ্রাসা, ৫টি বাজার, ১টি সরকারি হাসপাতাল। এগুলি থাকার পরও স্থানীয় প্রশাসন মাত্র ১৫০টি বসতবাড়ি দেখিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্যগন্ডামারা বড়ঘোনায় ভূমি এস আলম গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করতে প্রতিবেদন প্রেরণ করে। জমি ক্রয় নিয়েও নানা অনিয়ম, ভয়ভীতির অভিযোগ অনেকদিনের। অনেকেই জমির যথাযথ দাম পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

তাই প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, জমি ক্রয় ও অধিগ্রহণসহ নানা অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে এলাকার মানুষ প্রতিবাদ করে আসছিলেন গত বেশ কিছুদিন ধরে। সন্ত্রাসী ও দালালদের দাপটে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন মানুষ। এর আগেও হামলা হুমকির ঘটনা ঘটেছে। এলাকার মানুষ ঘনজনবসতিপূর্ণ এলাকা বাদ দিয়ে স্থান নির্বাচন, দালালদের বাদ দিয়ে জমির দাম সুষ্ঠুভাবে পরিশোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামতও দিয়েছিলেন। গত ২৩ মার্চ এএসপি, ইউএনও এবং ওসির উপস্থিতিতে গন্ডামারা ইউনিয়নের বাজারে শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বাঁশখালীর জনবহুল এলাকা বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ প্রকল্প করবার দাবি জানান। কিন্তু গত ২ এপ্রিল এস আলম গ্রুপের লোকজন আবারো এলাকায় গিয়ে হাজির হলে গ্রামবাসী তাদের বাধা দেন। এর সূত্র ধরে মামলা হয়, ৩ এপ্রিল ৭জন এলাকাবাসীকে গ্রেফতার করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ৪ এপ্রিল এর প্রতিবাদে ‘বসত-ভিটা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে সমাবেশ আহবান করা হয়। সমাবেশ বানচাল করবার জন্য পাল্টা সমাবেশ ডাকে কোম্পানি পক্ষের লোকজন। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। বিক্ষুব্ধ জনগণ সমাবেশ করতে গেলে প্রথমে পুলিশ পরে ৩০/৪০টি মোটরসাইকেলে সন্ত্রাসীরা এসে নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এতে অনেকে গুলিবিদ্ধ হন, আহতদের হাসপাতালে নিতেও বাধা দেয়া হয়। এইদিনই একজন নারীসহ কমপক্ষে ৫জন নিহত হয়েছেন। আশংকা, এই সংখ্যা আরও বাড়বে। স্থানীয় লোকজনের মতে, এই সংখ্যা ৯ জন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই হত্যাকান্ডের দায় সরকার ও এস আলম গ্রুপের।

প্রশ্ন হলো, ‘উন্নয়ন’ যদি সত্যিকারের উন্নয়নই হয় তাহলে পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষা না করে জবরদস্তি কেনো? তা নিয়ে মানুষের কথা শুনতে অসুবিধা কী? মানুষের প্রতিবাদে সরকারের ভয় কোথায়? খবর প্রকাশে এতো বাধা কেনো? খোলাখুলি কথা বলতে অসুবিধা কী? না, কেউ কথা বলতে পারবে না, কোনো সভা সমাবেশ করা চলবে না। সন্ত্রাসী আর পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী লাগানো হবে জনগণের বিরুদ্ধে। এটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। কারণ সরকার ঠিকই জানে এগুলো উন্নয়নের মুখোশ পরানো ধ্বংস, দখল আর লুন্ঠনের প্রকল্প। একই চেহারা আমরা দেখেছি ফুলবাড়ীতে; এখন দেখছি রামপাল, রূপপুর, মাতারবাড়ীতেও।

পাশাপাশি নানাকিছু দিয়ে বা ধমক দিয়ে মিডিয়া থেকে গায়েব করা হয় জনগণের প্রতিবাদ, যুক্তি, তথ্য। বাঁশখালীতে বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিবাদ চললেও এতোদিন তাই কোনো খবরই আসেনি সংবাদপত্রে, টিভিতে। বস্তুত জোরজবরদস্তি, প্রতারণা, ভয়ভীতি, দুর্নীতির ওপর ভর করে ‘উন্নয়ন’ নামের দখল, লুন্ঠন ও ধ্বংসের তৎপরতা চললে তা নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হবেই। যথাযথ স্বচ্ছতা, জনসম্মতি এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত না হলে জনগণ কোনো প্রকল্পই গ্রহণ করবে না।ভয়ভীতি কতোদিন মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে পারবে?

 

যখন শাসকের আর কোন প্রতিপক্ষের প্রয়োজন নেই

“Those who cast the votes decide nothing. Those who count the votes decide everything.”—- Joseph Stalin

আমীর খসরু ::

প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পদ্ধতিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম জনগণের জন্য এই কারণে যে, তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য অন্তত একটি সুযোগ পেয়ে থাকেন একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে। আর এই নির্বাচন হচ্ছে যাদের গণতন্ত্র নেই তাদের জন্য গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং যাদের গণতন্ত্র আছে তাদের ক্ষেত্রে ওই ব্যবস্থাটি আরও শক্ত-পোক্ত করার জন্য। গণতন্ত্র নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন তারা এখন বলছেন, গণতন্ত্রের পুরনো সংজ্ঞায় বিষয়টিকে দেখলে আর চলবে না। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতার অধিকতর বিকেন্দ্রায়ন। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে যাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি চলে না যায় তা নিশ্চিত করা। নির্বাচন হচ্ছে এই কারণে গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ মাত্র। তবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনে নির্বাচনই সব কিছু এবং শেষ কথা- এমনটা যারা বিশ্বাস করেন তারা ভুল সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন প্রাপ্যগুলোকে বুঝিয়ে দিয়ে অন্যান্য যে সব অধিকারগুলো আছে যেমন বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ নানামুখী অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনুদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণী সব সময়ই নির্বাচনই হচ্ছে সব কিছু এমন একটা ধারণাকে স্বতঃসিদ্ধ করার প্রবল চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এটা ঠিক, নির্বাচনী গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে কতিপয়ের বা গোষ্ঠীর শাসনে রূপান্তরিত হতে বাধ্য।

কিন্তু এর উল্টোটা হচ্ছে, স্বৈরতান্ত্রিক এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং জনগণকে ভোলানোর জন্য উন্নয়নের শ্লোগান উঠে প্রবলভাবে। এই ধরনের শাসকেরা এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এবং তাদের মনোজগতে এই বিষয়টি প্রবল যে, উন্নয়নের কথা বললে জনগণ আর গণতন্ত্রের কথা এবং গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ নির্বাচনের কথা বলবে না। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থাটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হলে ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব। আর এখানেই একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের আপত্তি। আপত্তি এই কারণে- তারা পালাবদল চায় না, বরং তারা তাদের ক্ষমতার জন্য জনগণের গণতান্ত্রিক আকাংখার বদল চায়। এরও কারণ হচ্ছে, নানা দোষ-ত্রুটি  সত্ত্বেও নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সচল-সজীব ও প্রাণবন্ত থাকলে জনগণের অধিকার কিঞ্চিৎ হলেও যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাশ্রয়ী পক্ষকে সামান্য হলেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়। এখানেই স্বৈরশাসকদের আপত্তি। তবে এ কথা বার বার বলা হচ্ছে যে, গণতন্ত্রই যে সর্বোচ্চ পন্থা তা নয়, তবে এর চাইতে ভালো পদ্ধতি আবিষ্কার এখনও পর্যন্ত হয়নি।

এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, গণতন্ত্রের সাথে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন যাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বলা যায়- সে বিষয়টিও জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোতে এর নাগরিকগণও কম ক্ষমতা ভোগ করেন। অর্থাৎ তাদের অধিকারগুলো থেকে সহজে বঞ্চিত করা যায়। আবার অর্থনৈতিক দিক থেকে সক্ষম বা উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকরা উচ্চ মাত্রায় অধিকার ভোগ করে। আমাদের মতো দেশে কতিপয়ের শাসন ও স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঘটে অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের কারণে, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার জন্য।

এতো সবের পরেও আমাদের মতো দেশে নির্বাচনই হচ্ছে জনগণের একমাত্র ভরসা- যা থেকে এই জনগণ বার বার বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হওয়ার আগে জনগণের সম্মিলিত লড়াই, সংগ্রাম ছিল শক্ত-পোক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম সিঁড়ি বা ধাপটি অর্থাৎ নির্বাচনী ব্যবস্থাটি প্রথম দিন থেকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ, শাসকদের মনোজগতে তখনো অতীত বাসা বেধে আছে অর্থাৎ মনেপ্রাণে তারা গণতান্ত্রিক ছিলেন না। গণতন্ত্রের প্রতি যে অসীম ভালোবাস এবং শ্রদ্ধা থাকতে হয় সে শিক্ষাটিই হয়তো তারা পাননি।

এদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার ইতিহাসের দিকে যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরেই ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা অনিয়ম হয়েছে- যা ছিল অবিশ্বাস্য। এরপরে দীর্ঘ সামরিক শাসনে আমরা দেখেছি জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এরশাদ জমানার ১৯৮৬, ১৯৮৮-এর নির্বাচন কেমন হয়েছিল তাও সবার জানা। ১৯৯০-এর পরবর্তী সময়কালের নির্বাচনগুলোতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যেও শুনতে হয়েছে সূক্ষ-স্থূল কারচুপি, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা কথা। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়কালের নির্বাচনগুলো যে কোনো অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে অতি স্বল্পস্থায়ী একটি সংসদের জন্য যে নির্বাচনটি বিএনপি সরকার করেছিল তা ছিল এর ব্যাতিক্রম।

কিন্তু বাংলাদেশের অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে রীতিটি গড়ে উঠছিল তার বিদায় সূচিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে। বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই অন্যান্য কোনো দেশে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। একদলীয়, ভোটারবিহীন এমন নির্বাচন ইতিহাসে নজিরবিহীন। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্তর্ধান ও বিলুপ্তি ঘটানো হলো ওই দিনটিতে। এরপরে উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌর নির্বাচন এবং সবশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবই একই বৈশিষ্ট্যের, অভিন্ন চরিত্রের। কোনো হেরফের এখন তাদের তৈরি নির্বাচনী পদ্ধতির ক্ষেত্রে আর হচ্ছে না। এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনের অর্থই হচ্ছে- বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হওয়া, হুমকি, দখল, হামলা, আগুন, ভাংচুর, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যা, খুন এবং নির্বাচনের সময়ে ও আগে-পরে নানাবিধ মামলা। বর্তমান সরকার পুরো বৃত্তই সম্পন্ন করে ফেলেছে।

আগেই বলা হয়েছে গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা হচ্ছে- ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি এই কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রবিহীন শাসনামলের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এই সময়কালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনগুলোও মারাত্মক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ এবং নানা দোষে দুষ্ট। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনামলে যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং এক কথায় ভোট বলতে আর তখন কিছুই হয়নি।

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নানা কারণে নজিরেরও বেশি সৃষ্টি করেছে। এই নির্বাচনের প্রথম দুই দফায় ভোটের নামে কি হয়েছে তা সবারই জানা। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কমপক্ষে ৮৩ জন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৩শ’র মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দুইশটিতে প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী থাকতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। আর খুন-জখম এখনো অব্যাহত আছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হচ্ছে- এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের নৌকা প্রতীক পেলে তিনিই বিজয়ী। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ ক্ষমতাসীনদের এমন মনোভাব ও ইচ্ছার ইঙ্গিত পেয়ে গেছে। আর কাজও হচ্ছে সে মতো। তাহলে কি এটা ধরে নেয়া যায়, এই কারণেই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে?

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে যে বিশাল এবং সীমাহীন ক্ষতিটি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তাহলো- তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ‘ক্ষমতার উগ্রতা, দম্ভ ও শক্তিমত্তা প্রদর্শন’ ছড়িয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের অবনতিশীল অভ্যন্তরীণ শৃংখলা আরও ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হবে, তারও আলামত দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হবে, যার ফলশ্রুতিতে হানাহানি আরও বাড়বে। অর্থাৎ একদলীয় শাসনের বিষয়টি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও পড়বে।

নির্বাচন ব্যবস্থার বিদায়ের মধ্যদিয়ে তিনটি বিষয় স্পষ্ট যে, এক, রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে তা আরও ব্যাপকতর বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। যে শূন্যতা ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে পুরো ব্যবস্থার ভারসাম্যে, তাতে শূন্যতা আরও বাড়বে। দুই, এই বিপর্যয়কর শূন্যতার মধ্যদিয়ে বিদ্যমান পুরো ব্যবস্থাটি টাল-মাটাল হয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। আর এ থেকে বের হওয়া কতোটা সম্ভব তা বলা মুশকিল। তিন, এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচাইতে বেশি। তাদের জনবিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে, ব্যাপক মাত্রায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ে কেন এই ভয়ংকর খেলা? এর জবাব হচ্ছে, এ সবই করা হচ্ছে জনমনে অধিকতর ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কারণ ক্ষমতাসীনরা চায়, জনগণের মধ্যে যাতে কোনো দিনই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের আকাংখাটি আর বিদ্যমান না থাকে। আর তেমন এক ভীতিকর, ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই সব আয়োজন। আগেই বলেছি, যেকোনো শাসকের জন্য জনবিচ্ছিন্নতাই হচ্ছে তার প্রধানতম শত্রু । কারণ যেকোনো শাসক সীমাহীন শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেলে, তার আর প্রতিপক্ষের প্রয়োজন হয় না।

ধর্ষণ যুদ্ধাপরাধ : আন্তর্জাতিক আদালতের রায়

আসিফ হাসান ::

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) সম্প্রতি ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র এবং ওই কর্মকান্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করে রায় দিয়েছে। ২০০২ সালে দি হেগে আদালতটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এ ধরনের রায় দিল। আদালতটি এছাড়াও প্রথমবারের মতো ‘নেতৃত্বের দায়-দায়িত্বের’ (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) জন্যও কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। আদালত ‘মুভমেন্ট ফর দি লিবারেশন অব দি কঙ্গোর’ প্রধান এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাঁ-পিয়েরে বেম্বার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও লুটতরাজসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেয়। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও কত বছরের জেল দেওয়া হয়েছে, তা এখনো জানানো হয়নি।

এর মানে হচ্ছে, কোনো কমান্ডার নিজে ধর্ষণ, খুন বা লুটপাট করার মতো অপরাধে সম্পৃক্ত না থাকলেও তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের তা করার অনুমতি দিলে তিনি দোষ্য সাব্যস্ত হবেন। বেম্বার অপরাধমূলক কাজ ঘটেছিল ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে। ওই সময় তার প্রায় ১৫ শ’ সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী মিলিশিয়া বাহিনী সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের (সিএআর) সীমান্তজুড়ে শত শত লোককে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আফ্রিকারসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের বেশির ভাগই এই রায়কে সমর্থন করলেও আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং বেশির ভাগ আফ্রিকান সরকার এখন পর্যন্ত অভিমত প্রকাশে বেশ সংযত রয়েছে। আফ্রিকার প্রায় সব সরকার এবং সাধারণ মানুষ, অনেক আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা -এই আদালত আফ্রিকার-বৈরী। তাদের এমনটা মনে হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আদালত এখন পর্যন্ত তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের সবাই আফ্রিকান।  বেম্বাকে ২০০৮ সালে বেলজিয়ামে গ্রেফতার করে হেগে পাঠানো হয়। ২০১০ সালে সেখানেই তার বিচারকাজ শুরু হয়।

তবে আইসিসি অবশ্য নিজেকে আফ্রিকান-বিরোধী হিসেবে পাশ্চাত্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা এবং সিনিয়র আইন কর্মকর্তা জাঁ-জ্যাকস বাডিবাঙ্গা যথাক্রমে গাম্বিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। বিচারকেরা ছিলেন ব্রাজিল, কেনিয়া ও জাপানের এবং সবাই নারী।

ক্ষতিগ্রস্তদের আইনজীবী ম্যারি-এডিথ ডুমিজাম-লসন অবশ্য এই বিচারে খুশি। বেম্বা ও তার অনুসারীদের বিচারে ৫,২০০-এর বেশি লোক সাক্ষী দিয়েছিল। ম্যারি-এডিথ বলেন, বেশির ভাগ ধর্ষণ ও লুটতরাজ হয়েছিল প্রকাশ্যে, সম্মিলিতভাবে। এটা করা হয়েছিল, শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে।

রিজার্ভ চুরির অজানা কাহিনী

 

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা বাংলাদেশ সরকার জানতে পারে অনেক পরে। কিন্তু এর আগের ঘটনা অনেকের কাছে অজানা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বিষয়ে একটি চিত্র তুলে ধরে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এর আয়োজন চলে ২০১৫ সালের মে মাস থেকে। এই মাসে ফিলিপাইনের রিজাল কর্মাশিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের একটি শাখায় সন্দেহভাজন চারজনের নামে চারটি আলাদা ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এর প্রায় আট মাস পর আসল ঘটনার সূত্রপাত।

অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং এর জন্য ব্যাংকটির গভর্নর ও দুই ডেপুটি গভর্নরের অপসারণের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। আর ‘ব্যাপক মাত্রায় অযোগ্য’ আখ্যা লাভের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তার উল্লেখ অবান্তর। এরই মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি’ হিসেবে অভিধা পাওয়া ঘটনাটি এমন এক গোলকধাঁধা সামনে হাজির করেছে, যার উৎসানুসন্ধানের চেষ্টা করছেন ব্যাংকার, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

গত ৫ ফেব্রুয়ারির পর ব্যাংক, ক্যাসিনো, কম্পিউটার আর কোটি ডলারের সমন্বয়ে এমন এক নাটকীয়তায় ঘটনাগুলো উন্মোচিত হয়েছে, যা হলিউডি সিনেমা থেকে কোনো অংশে কম নয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তাবেষ্টিত লেনদেন ঘরের প্রিন্টারটি নষ্ট অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে কর্মকর্তারা আগের দিনের লেনদেনের তালিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হন। পরদিন কর্মকর্তারা ব্যর্থ হন সুইফট সিস্টেমে ঢুকতে, যেখানে বারবার এ বার্তা দেয়া হচ্ছিল যে, ‘একটি ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা পরিবর্তিত হয়েছে।’ এর পর ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল রোববার, যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির দিন। আর বাংলাদেশের জন্য সপ্তাহের শুরুর দিন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি গড়িয়ে যায় সোমবার পর্যন্ত। পুরো ঘটনাটিতে সময়ের ব্যবহার ছিল সুক্ষতা ও নৌপুন্যে ভরপুর। কারণ চীনা নববর্ষ উদযাপনের জন্য সোমবার ছিল ফিলিপাইনের সরকারি ছুটির দিন। আর এ সময়ের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও শ্রীলংকার এনজিওতে টাকা স্থানান্তর করা হয় মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। সেতু, বিদ্যুকেন্দ্র ও ঢাকা মেট্রোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের নামে এ অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ লেনদেনটি করেছে, কারণ তাদের তা করতে বলা হয়েছে। এভাবেই সুইফটের মতো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিগুলো কাজ করে থাকে। আর যেহেতু ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোয়  গেছে, সেহেতু দেশটির কর্তৃপক্ষ হারিয়ে যাওয়া ওই অর্থ শনাক্ত করতে পারেনি, আইনী জটিলতার জন্যে। কারণ ফিলিপাইনে ক্যাসিনোর ওপর অর্থ পাচাররোধী (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং) আইন প্রযোজ্য নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে ব্যাংকের (আরসিবিসি) শাখা থেকে ওই অর্থের সিংহভাগ উত্তোলন করা হয়েছে সেখানকার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ছিল নষ্ট।

এ সাইবার চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দায়িত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করা। লেনদেনের পুরো চক্রটিতে হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ কেউ জড়িত। অথবা একটি ম্যালওয়্যার, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা বিষয়ে চরম অবহেলা কিংবা হতে পারে গোটা নিরাপত্তা কাঠামোরই ত্রুটি। দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ব্যাংকিং খাতের লেনদেনের জন্য স্বয়ংক্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের নিরাপত্তা-বিষয়ক প্রশ্নটি। এ ঘটনা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রশ্ন হাজির করেছে, যা মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যের নিরাপত্তার মূলনীতির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর অনুমোদনের জন্য সুইফটের ওপর নির্ভর করে। আলোচ্য ঘটনায় স্বত্বভোগী অ্যাকাউন্টগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলের মাধ্যমে সুইফটই অনুমোদন দিয়েছে। যদিও সুইফট বার্তা পাঠানোর কোড চুরির তত্ত্বটি পুরো নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।

ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোয় গেছে। আর এটি বিস্ময়ের কিছু নয় যে, ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনের অধীন নয়। এ আইনী অস্ত্রের অনুপস্থিতিই হচ্ছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। এটি তদন্তকে অনেক জটিল করে তুলেছে। কারণ ক্যাসিনোগুলো তদন্তে অংশ নিতে বা সহায়তা করতে বাধ্য নয়। নীতিগতভাবে তদন্ত সেখানেই বন্ধ হয়ে যাবে, যেখান থেকে ওই অর্থ আর্থিক খাত থেকে বেরিয়ে গেছে, আর তা হারিয়ে যাবে অবৈধ অর্থ পাচার নেটওয়ার্কের অন্ধকারে।

১২টি সংস্থার তদন্তে কোনো ক্লু বের হয়নি। উদঘাটন হয়নি কোনো রহস্যও। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা তদন্ত এখনও সন্দেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তদন্তে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি তদন্ত সংস্থা, ফিলিপাইন সরকার, ফিলিপাইনের জড়িত ব্যাংক আরসিবিসি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার সন্দেহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরটিজিএস প্রকল্পকে ঘিরে। গোয়েন্দাদের ধারণা, অক্টোবরে এ সিস্টেমে কাজ করতে গিয়ে সুইফট শাখার তথ্য খোয়া গেছে। সেই তথ্য কাজে লাগিয়েছে অপরাধীরা। প্রথম দিকে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানাকে নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও পরে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি পরামর্শক হিসেবে দুই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ। এদিকে, নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর আইটি বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহাকে ফেরত পাওয়া গেছে। চুরির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর এ সম্পর্কে বক্তব্য রাখায় রহস্যজনকভাবে তিনি নিখোঁজ হন। এ ঘটনার পর তার পরিবার থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ তাও নেয়নি। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন গভর্নর ফজলে কবির।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি তিন সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গত ১৫ মার্চ গঠন করা হলেও ৮ দিন পর কমিটি গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছেন। এর আগে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। এই কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অর্ন্তবর্তীকালীন রিপোর্ট এবং ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে বলা হলেও এখনো তদন্ত কাজে কোন অগ্রগতি নেই বললেই চলে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। জানা গেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মার্কিন ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হবে কিনা সে প্রশ্নে আইনজীবীদের সাথে সলা-পরামর্শ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনাকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের চরম গাফিলতি বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চুরি যাওয়া অর্থ ফেরাতে আইনী লড়াইয়ের ভিত্তি গড়ে তোলা হচ্ছে।

ব্লুমবার্গের এক  প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আলোচিত এই অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের প্রায় আটশ কোটি টাকা নিউইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব টাকা ফেডারেল ব্যাংক থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায়। তবে হ্যাকারদের বানান ভুলের কারণে একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরও  প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার লেনদেন বানচাল হয়ে গেছে। জেরুজালেম-ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি সাইবারআর্কের একজন উর্ধ্বতন পরিচালক আন্দ্রে ডালকিন এক ইমেইলে ব্লুমবার্গকে বলেছে, ‘বানান ভুলের ওপর নির্ভরতা কোনো নিরাপত্তা নীতি হতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অ্যাকাউন্টের গতিবিধি যদি পর্যবেক্ষণ করত, তারা দ্রুতই অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত করতে পারত। আর এসব সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্তের জন্য তাদের তৃতীয় পক্ষের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরও করতে হতো না।’ টাকা খোয়া যাওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নিউইয়র্কের ফেডারেল ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের জন্য ফেডারেল ব্যাংকের বিরুদ্ধে এনেছেন অনিয়মের অভিযোগ। এ বিষয়ে আইনি লড়াইয়ের কথাও বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই পরিস্থিতিকে যোগ্যতার সঙ্গে সামাল দিতে পারেনি বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

ব্লুমবার্গের  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এমন একটি ব্যাংক ডাকাতি ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও তৎপর হওয়া  প্রয়োজন ছিল। এমন ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যেসব অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশের  প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশীক রিজার্ভের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে, তাদের জন্য এই ঘটনাটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অর্জুনা মাহেন্দ্রন সিঙ্গাপুরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এই ঘটনার পর নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে খতিয়ে দেখছে। ফেডারেল ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মেসেজিং সিস্টেমকেও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মূল চালিকাশক্তি হলো জনবল। তারা অলস হয়ে পড়ে এবং তারা বাজে অভ্যাস গড়ে তোলে।’

একই ধরনের আরও ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের ‘গভীর উদ্বেগ’ থাকা দরকার বলে মন্তব্য করেছে সিঙ্গাপুরের ডিলয়িট্টে টুশে থমাতসু কনসালট্যান্টের পার্টনার ভিক্টর কিয়ং। তিনি বলেছেন, ‘এটা ভয়াবহ। নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই যদি এমন ভুল থাকে, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোও হয়তো খুব বেশি সুরক্ষিত নয়।’ ক্যানবেরা-ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (এএসপিআই)  প্রকাশিত ২০১৫ সালের ‘সাইবার ম্যাচিউরিটি’ র্যাংকিংয়ে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো নিজেদের  প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে সুসঙ্গত সাইবার নীতিমালা চালু করেছে। তবে থাইল্যান্ড বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর  প্রতিরক্ষা আরও উন্নত হওয়া  প্রয়োজন বলে জানিয়েছে এএসপিআই। এই রাংকিং-এ বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে তাদের পরবর্তী রাংকিং-এ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এএসপিআইয়ের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক টোবিয়াস ফিকিন বলেছে, এটা কৌত‚হলোদ্দীপক যে বাংলাদেশ সরকার তাদের নিজেদের ব্যাংকের থেকে মনোযোগ সরাতে ফেডারেল ব্যাংকের দিকে আঙুল তুলেছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনার এক তদন্তকারীকে উদ্বৃত করে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনফরমেশন সিস্টেম কর্মীদের অগোচরেই জানুয়ারি মাসে ব্যাংকের সিস্টেমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ম্যালওয়্যার বা ক্ষতিকর সফটওয়্যার কোড। এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার নেই জানিয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখে হ্যাকাররা হানা দেয় ব্যাংকের সিস্টেমে। এএসপিআইয়ের টোবিয়াস ফিকিন বলেছে, ‘আমরা জানি না কীভাবে ওই ম্যালওয়্যার সিস্টেমে  প্রবেশ করানো হয়েছিল। তবে ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতি ও ব্যাংকের কর্মীদের ব্যাংকে আসা-যাওয়ার সব তথ্যই জানা ছিল হ্যাকারদের। সাইবার সিকিউরিটির  প্রসঙ্গে সবসময়ই সব থেকে দুর্বল স্থানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।’

চীন: পরাশক্তির বিবর্তন-৩৭ : দেং জিয়াও পিং এর আবির্ভাব

আনু মুহাম্মদ ::

দেং জিয়াও পেং ( ২২ আগস্ট ১৯০৪- ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭) দীর্ঘসময় পার্টি বা সরকারের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত না থাকলেও মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর থেকে চীনের যাত্রাপথ নির্ধারণে তিনিই ছিলেন মুখ্য ব্যক্তি। কৃষক পরিবারের সন্তান দেং ১৯২০-এর দশকে ফ্রান্সে কাজ করবার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পার করেন। এখানেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সাথে তাঁর পরিচয়। ১৯২৩ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। লংমার্চসহ পার্টির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেং নেতৃত্ব পর্যায়ে উঠে আসেন। ১৯৫০ এর দশকে পার্টির মধ্যে মাওসেতুং এর অন্যতম প্রধান সমর্থক ছিলেন তিনি। ৬০ দশকের শুরুতে লিউশাও চী ও দেংজিয়াও পিং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি নেন যা উচ্চলম্ফকালীন নীতি থেকে ভিন্ন। এর বেশকিছু জনপ্রিয়তাও পেতে থাকে। তবে তাঁদের অর্থনৈতিক নীতিতে ক্রমেই মাও-এর রাজনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থানের সাথে পার্থক্য ধরা পড়তে থাকে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে সেই কারণেই তাঁরা সমালোচনার মুখে পতিত হন এবং বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কৃত হন। দেংকে সেইসময় কয়েকবছর এক খামারে কাজ করতে হয়।

চৌ এন লাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে যখন সক্রিয়ভূমিকা থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন, তখন বেশ কয়বছর কোণঠাসা অবস্থায় থাকা দেং জিয়াও পিং আবারও সামনে আসেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলাকালীন সময়ে সংশোধনবাদী হিসেবেই অভিহিত হলেও ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে দেং উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ক্রমে মাও সে তুং এর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হচ্ছেন এরকম ধারণা তৈরি হয় একের পর এক বিভিন্ন দায়িত্ব প্রাপ্তি এবং কার্যত অবস্থানের পদোন্নতিতে। ১৯৭৫ এর জানুয়ারিতে চৌ এন লাই যখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হন, তখন অবস্থানগত কারণেই দেং সরকার পরিচালনার কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করেন। তিনি কার্যত সরকার ও পার্টি পরিচালনা করতে থাকেন, তাছাড়াও খুবই কম সময়ের ব্যবধানে একাধারে সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ, কমিউনিস্ট পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় মিলিটারী কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান পদগুলো লাভ করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে  দেং-এর এই দ্রুত আরোহণ,  কার্যত পুনর্বাসন, পার্টির অনেকের জন্যই বিশেষত যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন তাঁদেরকে  বিস্মিত ও হতভম্ব করে। অনেক চীন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চৌ-এর পরামর্শেই মাও সে তুং দেংকে এসব পদে অধিষ্ঠিত করতে সম্মত হন, কেউ কেউ মনে করেন মাও দেংকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসেন লিন পিয়াও-এর অনুসারীদের ক্ষমতা চূর্ণ করবার উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে, ‘চার কুচক্রী’ নামে অভিহিত নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম নিয়ে মাও অসন্তুষ্ট  ছিলেন, এবং  তাঁর কাছে মনে হয়েছিলো দেং অর্থনীতির বিকাশধারার জন্য যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। তবে দেংকে আত্মসমালোচনা করবার আহবান জানানো হয়।

১৯৭৬ সালের ৮ জানুয়ারি চৌ এন  লাই  ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ জানুয়ারি দেং চৌ এর বিদায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। পার্টির প্রবীণ নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত থাকলেও মাওসেতুং উপস্থিত ছিলেন না। চৌ এন লাই এর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী  পদ শূন্য হয়। এই পদের জন্য বিবদমান দুই পক্ষ তখন প্রার্থী, একদিকে ‘চার কুচক্রী’ বলে কথিত বাম লাইনের ব্যক্তিবর্গ, অন্যদিকে ডান লাইনের অনুসারী বলে কথিত দেংজিয়াও পিং। মাও এদের কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে এই পদে নিযুক্ত করেন অপেক্ষাকৃত অপরিচিত হুয়া গুয়ো ফেংকে। পার্টির মধ্যে দেংজিয়াও পিং বিরোধী প্রচার সেসময় আবারও জোরদার হয়। ধারণা করা হয়, এর পেছনেও মাও এর সমর্থন ছিলো। ১৯৭৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পার্টির ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দেংকে অপসারণ করে পররাষ্ট্র দফতরে নিয়োগ দেয়া হয়। ৩ মার্চ মাও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে বক্তব্য রাখেন এবং দেং-এর ভূমিকার সমালোচনা করেন।

প্রকৃতপক্ষে মাও এর মৃত্যুর পরই শুরু হয় দেং আমল। যার ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান চীন।

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন – (পর্ব-৭)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী::

গণ্ডি পার হবার প্রস্তুতিটা চলছিল। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনীতির অনুশীলন, সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা সব দিক দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এই যুবক। দেখা যাচ্ছে ভলিবল, বাডমিন্টন, টেনিস সব কিছুই খেলছেন তিনি। অংশ নিচ্ছেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়, বক্তৃতা দিচ্ছেন জনসভাতে; সভাপতিত্ব করছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যাতায়াত করছেন পাঠাগারে; আর ম্যানিফেস্টো, বিবৃতি, প্রস্তাব, কার্যবিবরণী – এসব লেখা, টাইপ করা, ছাপিয়ে আনা, বিতরণ করার ব্যাপারে তিনি থাকছেন সবার আগে। তাঁর অতিশয় আপনজন ডা. করিমের সঙ্গে এক পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটেছে, করিম চলে গেছেন কমিউনিস্টদের সঙ্গে, তাজউদ্দীন যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে, তবে ১৯৬২-তে আইউব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় দুজনেই কারাবন্দী হয়েছেন এবং সৌভাগ্যক্রমে দুজনের থাকার ব্যবস্থাও হয়েছে একই সেলে। করিম জেলে ছিলেন পাঁচ মাস, আরও অনেকেই তখন জেলে; তাঁদের সাহচর্যে করিমের বন্দী জীবন নিরানন্দে নয়, বেশ আনন্দেই কেটেছে। তাস খেলা ছিল নিত্যদিনের বিনোদন। করিম দেখতেন তাজউদ্দীন একা একা দাবা খেলছেন, কারণ সঙ্গীদের মাঝে কেউই দাবা খেলতে জানত না। করিমের ভাষায়, ‘‘সে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে একা একা কেমন করে দাবা খেলত এটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। প্রতিযোগিতা ছাড়া খেলা জমে? নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা এ কেমন? তাজউদ্দীনের মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার একটা প্রচেষ্টা হয়তো ছিল।’’

হয় তো নয়, অবশ্যই ছিল। রাজনীতির এই কর্মী সব সময়েই চেষ্টা করতেন কীভাবে নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন। কারাবন্দী অবস্থায় এই দুই বন্ধুর ভেতর রাজনীতির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উভয়েরই আগ্রহ কৃষকের মুক্তির প্রশ্নে। করিম বলেছিলেন, ঋণসালিসী বোর্ডের মাধ্যমে ফজলুল হক কৃষককে ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। শুনে তাজউদ্দীন মন্তব্য করেছেন,

মুক্তি না ছাই করে গেছেন। কৃষকের মুখে দুধের বদলে চুষনি ঢুকিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত তাদের অধিকার আদায়ে, আপাতত সান্তনা দিয়ে কৃষকের বারটা বাজিয়েছেন।

এমন উক্তিতে করিম চমকে উঠেছেন, বুঝতে পেরেছেন যে তাজউদ্দীন অন্যদের তুলনায় গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত। তাঁর লক্ষ্য সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তন। ডা. করিমের সময় সময় মনে হতো যে তাজউদ্দীন তাঁদের সমবয়স্ক নন, অগ্রজ।

মওলানা ভাসানীর প্রতি আকর্ষণ সত্তেও তাজউদ্দীন প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেননি। স্মরণীয় যে তাজউদ্দীন ছাত্র রাজনীতিতে নয়, উৎসাহী ছিলেন জাতীয় রাজনীতিতে, যদিও ফজলুল হক মুসলিম হলে যে-নির্বাচন হতো তাতে প্রার্থী না হলেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন, এবং একবার আক্ষরিক অর্থেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে একটানা সাতদিন গোসল না-করে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন, রাজনীতিসচেতনতার তাড়নাতে। ভাসানীর দলে যোগ না-দেয়ার একটি কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম’ পরিচয়। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধুরা সবাই তখন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় কারণ, সে-সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে নেতৃস্থানীয় যাঁরা ছিলেন তাঁদের কারো কারো আচরণে ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ প্রকাশ পাচ্ছিল বলে তাঁর অনুভব।

পিওপলস ফ্রিডম লীগ এগোয় নি, এরপরে ডেমোক্রেটিক ইউথ লীগ গঠনের একটি উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু কমরুদ্দিন আহমদ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান নি, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল যে উদ্যোক্তারা প্রো-কমিউনিস্ট। পরবর্তীতে, ১৯৫১ সালে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। সংগঠনটি গঠনের সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে একটি যুব সম্মেলনের ভেতর থেকে। সরকারী বাধার কারণে এই সম্মেলন ঢাকায় হতে পারেনি; উদ্যোক্তারা তখন নদীর অপর পাড়ে জিঞ্জিরায় চলে যান, কিন্তু সেখানেও পুলিশী হস্তক্ষেপ ঘটে। তখন তাঁরা বুড়িগঙ্গায় চারটি নৌকায় বসে সম্মেলন করেন। কাকতালীয় অবশ্যই, তবু মিলটা বোধ করি তাৎপর্যহীন নয় যে চীনে কমিউনিস্টদের কার্যক্রমের শুরুর দিকে সাংহাই নগরীতে গোপন বৈঠক করবার সময় পুলিশ তাঁদের আস্তানাটি ঘিরে ফেলতে যাচ্ছে টের পেয়ে মাও সে তুঙ-ও তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে বের হয়ে গিয়ে নৌকাতে বৈঠকের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তাঁরা অবশ্য এর পরে আর শহরে ফেরেননি, যুবলীগের সদস্যদের পক্ষে না-ফিরে উপায় ছিল না।

যুবলীগে অলি আহাদ, তোয়াহা, তাজউদ্দীন-সবাই ছিলেন। বায়ান্নর আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক দল হিসাবে গড়ে ওঠে নি। না-ওঠার একাধিক কারণ ছিল। সংগঠন ও কর্মীদের সবাই ছিলেন তরুণ, সফল নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন কেউ ছিলেন না, তদুপরি তাঁদের ভেতর মতাদর্শিক ঐক্যের বন্ধনটা যে দৃঢ় ছিল তাও নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ দৃশ্যমাণ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ, তিনি লিখেছেন,

১৯৫১ সালে কারামুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করিবার নিমিত্ত সমগ্র দেশব্যাপী অবিরাম কর্মীসভা, জনসভা ইত্যাদি করিয়া যাইতেছিলেনমুসলিম লীগ মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করিয়া আবার কোথাও  গুন্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মসূচি পালনে সর্বপ্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে থাকেকিন্তু জনতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অবিচল আস্থা স্থাপন করিয়া ক্রমশঃ আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে কাতারবন্দী হইতে শুরু করে

অবশেষে ১৯৫৩ সালে তাজউদ্দীন আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। একই সময়ে অলি আহাদও যোগ দিয়েছেন। তাজউদ্দীন ওই বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর তিনি যুক্ত ফ্রন্টের মনোনয়ন পেয়ে ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন। কয়েক মাস পরে ৯২-ক ধারা জারি হলে গ্রেফতার হন; বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৮-তে সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাঁকে জেলে যেতে হয়; এবং পরের বছর মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তাজউদ্দীনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য; তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরের বছর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযানে অংশ নেন। ১৯৬৬-তে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের যে-সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফার ঘোষণা দেন তাতে তাজউদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। ৬-দফার রচনায় অনেকেই যুক্ত ছিলেন; তবে এর চূড়ান্ত রূপটি তাজউদ্দীনই দেন। ওই বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এরপরে তিনি গ্রেফতার হন, মুক্তি পান ১৯৬৯-এ, এবং রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিলে অংশ নেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যা। তাজউদ্দীন আহমদের তখনকার ভূমিকা আমাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।

প্রশ্ন থাকে কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। (চলবে)

 

সুন্দরবন : কেন আত্মবিনাশী সব আয়োজন

এম. জাকির হোসেন খান ::

একটাই সুন্দরবন, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশী। এ-বনভূমির দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে, বাকীটুকু ভারতে। বাংলাদেশ অংশে মানুষের আগ্রাসনে সুন্দরবন ক্রমাগত সংকুচিত হলেও শত শত বছর ধরে বাংলাদেশ সহ এ অঞ্চলের মানুষ, প্রাণী এবং প্রকৃতিকে ঘূর্ণিঝড় সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মায়ের মতো রক্ষা করছে। জীববৈচিত্রের এক বিপুল সম্ভার সুন্দরবন ৪৫৩টি প্রজাতির প্রাণীসহ নানা বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল এবং একইসাথে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে সুরক্ষা প্রদানকারী রয়েল বেঙ্গল টাইগার’র সংখ্যা একসময় ৪০০-৪৫০টি হলেও চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বর্তমানে তা ১০০-এর কাছাকাছি সংখ্যায় দাড়িয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় সুন্দরবনের অংশ বিশেষকে ১৯৯২ সালের ২১ মে ‘রামসার এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। তাছাড়া ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এলাকা হিসেবে সুন্দরবনের বেশ কিছুটা অংশ ইউনেস্কো’র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

সুন্দরবন রক্ষায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারও যৌথ উদ্যোগে ২০১২-এর ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও ভারত এক সমঝেতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অথচ চুক্তির বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত, একপেশে, অস্বচ্ছ এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে সুন্দরবনের কাছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার সব উদ্যোগ সম্পন্ন। সুন্দরবন-সংলগ্ন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ১৬০ কোটি ডলারের কাজ পায়। অথচ ২০১৫ এর ১৩ মার্চ ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল তথ্য বিকৃতি ও জালিয়াতি এবং প্রতারণার দায়ে কর্ণাটক রাজ্যে এনটিপিসি’র প্রস্তাবিত একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ ছাড়পত্র স্থগিত করে দেয়।

২০১৬’র ফেব্রুয়ারিতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও সুন্দরবনের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিবেচনা করে ইতিমধ্যে রামসার কর্তৃপক্ষ, ইউনেস্কো এবং আই.ইউ.সি.এন ২০১২ সাল থেকে সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। উদ্বেগ আমলে তো নেয়া হয়ই-নি, এমনকি রামসার কনভেনশন সচিবালয় এবং ইউনেস্কো একাধিকবার সরকারের কাছে ইআইএ প্রতিবেদন চাইলেও সরকার তা দিতে অপারগতা জানায়। এ প্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ ২০১৬ ইউনেস্কো কার্যালয় থেকে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০১৫ এর ১২ ডিসেম্বর যে প্যারিস চুক্তিতে বিশ্ববাসী ঐকমত্য হয়, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যাপক ভিত্তিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বিশ্বের প্রধান চারটি কার্বন নিঃসরনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং ভারত সহ শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করে। অথচ সুন্দরবনের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এবং ওরিয়ন গ্রুপ বেসরকারিভাবে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে শুধুমাত্র সুন্দরবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না, আখেরে কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকির অন্যতম শিকার বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনের অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত অবদানের মূল্য লাভ-ক্ষতির হিসেবে ধরা হয়নি। ১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের আইলা পর্যন্ত সময়ে ৪৭৮টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছাস এবং ঘূর্ণিঝড় তোমেন, গোর্কি, সিডর, নার্গিস বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৭৯৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে ৩২৯টি প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে এবং স্বাধীনতার পর ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছাস হয়েছে। সুন্দরবন না থাকলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কত ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতো এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার হিসাব নীতি নির্ধারকরা করেনি অর্থাৎ তাগিদ অনুভব করতেও দেয়া হয়নি।

পরিবেশ আইন ১৯৯৫ এর ধারা ৫-এর অধীনে সরকারি প্রজ্ঞাপনমুলে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর চতুর্দিকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন বা ‘লাল চিহ্নিত এলাকা’ এলাকা ঘোষণা করায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৭ এর ৭(৪) ধারা মতে সুন্দরবন এলাকায় কোন শিল্প স্থাপনে পূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) সাপেক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘লোকেশন ছাড়পত্র’ এবং ‘পরিবেশ ছাড়পত্র’ নেয়ার বাধ্যতা রয়েছে। কিন্তু পূর্ণ ইআইএ ছাড়াই পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১১ এর ২৩ মে এ প্রকল্পকে শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিক ছাড়পত্র দেয়া হয়।  অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১২-এ বলেছিল যে, ওই অধিদফতর সুন্দরবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ জীব বৈচিত্র্যের উপরে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ক্ষতির ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীও সম্প্রতি স্বীকার করেন। অথচ ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর ৫৯টি শর্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে ফরমায়েসি পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা- ‘ইআইএ’ অনুমোদন করে প্রকল্প কাজ শুরু করতে চাচ্ছে। কি কারণে বা কার চাপে পরিবেশ অধিদপ্তর তার এ অবস্থান পরিবর্তন করলো তার জবাব এখন পর্যন্ত মেলেনি। এসব শর্ত প্রতিপালিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ এসব অনেক শর্তই পরে আর মানা হবেনা। উল্লেখ্য, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক এক পত্রে উল্লেখ করেন যে, ‘সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে’। উল্লেখিত পত্রে প্রধান বন সংরক্ষক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুন:বিবেচনার আহবান জানান। অথচ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে সুন্দরবনের আইনগত অভিভাবক বন বিভাগের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে বিতর্কিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা ইআইএ’র ভিত্তিতে এগিয়ে চলছে সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলা রামপালের সরকারি- বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যে শর্তে প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়েছিলো পরিবেশ অধিদপ্তর সে শর্ত ভঙ্গ করা হলেও, পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই থেকে সালফার-ডাই-অক্সাইড ছড়ানোর কারণে বন্য-গাছপালা ধীরে ধীরে মারা যাবে। ইআইএ অনুযায়ী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭.২০ লক্ষ টন কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহণের ফলে সুন্দরবন ও এই বনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর কী ক্ষতি হবে সমীক্ষায় বলা হয়নি। বায়ূ দূষনের ক্ষতিকারক উপাদানগুলি মেঘমালার মাধ্যমে ছাড়াবে। রাতে জাহাজ চলাচল এবং মালামালা খালাসের ফলে সৃষ্ট শব্দ ও আলোর দূষণে সুন্দরবনে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে তাও ইআইএ প্রতিবেদনে বিবেচনায় রাখা হয়নি। নাব্যতা হ্রাস পাওয়া পশুর নদীর সংকট বাড়বে। কয়লা পরিবহনের সময় জাহাজ ডুবি হয়ে প্রতিবেশ এবং পানি দূষণ যে নিয়মিত ঘটবে তা সর্বশেষ শ্যালা নদীতে লঞ্চ ডুবিতে আবারো স্পষ্ট হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য একেকটি কার্গোতে ৮-১০ হাজার টন কয়লা পরিবহণ করা হবে-যা ডুবলে দূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

ইআইএ সম্পাদনের আগেই মাটি ভরাট করাসহ অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু; এমনকি ইআইএ সম্পাদনে কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ, শুনানি ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। আর প্রকল্পের ইআইএ চূড়ান্ত করার সময় নিয়ম রক্ষার জন্য যে গণশুনানি করা হয় যেখানে বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরলেও সেগুলো অগ্রাহ্য করে ইআইএ চূড়ান্ত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে নির্মোহভাবে ইআইএ সম্পাদনের নিয়ম থাকলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান সিআইজিআইএস কর্তৃক সম্পাদনের ফলে স্বার্থের সংঘাত থাকায় এটি নিরপেক্ষতার মানদন্ড অর্জন করতে পারে নি।

শুধু তাই নয়, প্রকল্প প্রণয়ণ এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের অস্বচ্ছতা স্পষ্ট, এমনকি যৌথ অংশিদারিত্ব বা ঋণ চুক্তি জনগণের জ্ঞাতার্থে প্রচার করা হয়নি। প্রকল্প বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে করা একাধিক রিট আবেদনের নিষ্পত্তি না করেই ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়; আবার ভূমি অধিগ্রহণের আগেই স্থানীয় জনগণের সম্পত্তি এবং চিংড়ি ঘের ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা দখল করে নেয়। কারন, ইআইএ প্রতিবেদনে সুন্দরবনের সকল এলাকা বিবেচনায় নেয়া হয়নি, যেমন রামপাল প্রকল্প এলাকা থেকে সুন্দরবন (ডাংগামারী) এলাকার দূরত্ব ৯.৬ কিলোমিটার যা বাফার জোনের ভেতর।

উল্লেখ্য, ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান এ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীব বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোন ধরণের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। এ প্রেক্ষিতে ভারতের মধ্যপ্রদেশে জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষি জমির উপর এনটিপিসি’র কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রিয় গ্রীণ প্যানেল এনটিপিসি’র ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। সুতরাং, সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা যৌক্তিক হয় কিভাবে?

রামপালে প্রকল্প পরিচালনাসহ অন্যান্য কাজে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯,১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে, যেটিকে নদীর মোট পানি প্রবাহের ১% এরও কম দেখানো হলেও তথ্যদাতাদের মতে, পানি প্রবাহের যে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে তা ২০০৫ সালের। তথ্যদাতাদের মতে পরিশোধন করা হলেও পানির তাপমাত্রা, পানি নির্গমনের গতি, দ্রবীভূত নানা উপাদান পশুর নদী, সমগ্র সুন্দরবন তথা বঙ্গোপসাগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ২০১০ সালে সরকার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন পশুর নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৪০ হেক্টর, ৫৬০ হেক্টর ও ১৭০ হেক্টর নদী ও খালের জলাভূমি জলজ প্রাণী বিশেষত ‘বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন’ সংরক্ষণের স্বার্থে ‘‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য” ঘোষণা করেছে।

ইআইএ প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকায় কোন কোন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে তার কোনো তালিকা দেওয়া হয়নি। প্রকল্পের ফলে এসব উদ্ভিদ ও প্রাণী কোন ক্ষতির সম্মুখীন হবে কি না, তাও উল্লেখ করা হয়নি। ইআইএ প্রতিবেদনে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উঠে আসেনি। ইআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-বছরের এই ৪ মাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হবে (ইআইএ, পৃষ্ঠা-২৭৫)। এখন বলা হচ্ছে, বছরে কখনো সুন্দরবনের দিকে বাতাস প্রবাহিত হবে না। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি নানা কারণেই এই চারমাস ছাড়াও বছরের অন্য সময়েও বাতাস সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানিদূষণ, শব্দদূষণ, ছাইয়ের দূষণ সারা বছর ধরেই ঘটবে যার সঙ্গে বাতাসের দিকের কোনো সম্পর্ক নেই।

ইআইএ প্রতিবেদনে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে প্রতারণা করা হয়েছে। সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দুষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়- যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে টেকনোলজিই ব্যবহার করা হোক না কেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চললে শব্দ দূষণ হবে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতল রাখার জন্য পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ-বর্জন করতে হবে, ফলে সুন্দরনের পশুর নদী দূষণের ঝুকি থাকবেই, সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে দিনে-রাতে কয়লার জাহাজ চলাচলের ফলে শব্দ দূষণ, পানি দূষণ, আলো দূষণ ইত্যাদি ঘটবেই।

উভয় ইআইএ প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে মাটি কাটা, মালামাল পরিবহণ, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। বরং উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে মাটি পানি বাতাস দূষিত হয়ে সুন্দরবন ও তার চারপাশের নদী, খাল ও জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জেলে, কৃষক, বাওয়ালী, মউয়ালসহ কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে মামলায় আসামী করাসহ বিভিন্ন প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি প্রদান ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে ইতোমধ্যেই এবং ভূমি অধিগ্রহণের ফলে অধিক সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতিও হয়েছে। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের গাছ কাটা, বনের জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, বন্যপ্রাণী শিকার কিংবা বিষ দিয়ে মাছ মারার মতো ক্ষতিকর কর্মকান্ড সাধারণ জনগণ নয় ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট জলদস্যু ও প্রভাবশালীরা জড়িত।

শুধু তাই নয়, তহবিল পাওয়ার আগেই প্রকল্প কার্যক্রম শুরু হলেও ইউনেস্কো’র উদ্বেগ প্রকাশ করায় ২০১৪’র ডিসেম্বরে নরওয়ের দুটি পেনশন ফান্ড রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্রে বিনিয়োগে সাড়ে ৫ কোটি ডলার প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়,  সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় ফ্রান্সের বৃহৎ তিন ব্যাংক বিএনপি পারিবাস, সোষিতে জেনারেলি ও ক্রেডিট এগ্রিকোলও অর্থায়নে অসম্মতি জানালেও সরকার ভারতীয় কোম্পানিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে কি কারণে নিযুক্ত করেছে তা বোধগম্য নয়। বিএনপি পারিবাস ২০১৫ এর ডিসেম্বরে মন্তব্য করে, ‘’The analysis shows that serious deficiencies in project design, planning, and implementation and due diligence obligations render the project non-compliant with the minimum social and environmental standards established by the Equator Principles, as well as the International Finance Corporation’s Performance Standards”.

ইআইএ প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকাকে গ্রাম হিসাবে দেখানো হয়েছে প্রকল্পের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার (এসএএইচআর) প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রকল্প স্থান পরিদর্শন এবং ইআইএ পর্যালোচনা করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘এ-প্রকল্পের ‘ইআইএ’ নানা দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে এ-‘ইআইএ’ করা হয়নি।

ভারতের সাথে নৌসহ সব ধরনের ট্রানজিট চুক্তির পর পরই শুধু কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপনে দেশি বিদেশি কোম্পানি যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে’। অথচ সুন্দরবন সুরক্ষায় ভারত সরকার কি করছে তা জানতে সে দেশের জাতীয় পরিবেশ আদালত স্বঃপ্রণোদিত আদেশে বলেছে, “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হতে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যানগ্রোভের বর্তমান চেহারা কেমন, নদী বা খাঁড়িতে দুষিত ডিজেল ব্যবহার হয় কি-না, সেখানে বেআইনী ইট-ভাটা চলছে কি-না, বন এলাকায় অবৈধ হোটেল রেস্তোরা বন্ধ করা হয়েছে কি-না, ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের অবস্থান জানানো হোক। একই সাথে আদালত সরকারের বক্তব্যের সমর্থনে অবশ্যই স্যাটেলাইট ছবি থাকতে হবে”। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও এ ধরনের স্বঃপ্রণোদিত উদ্যোগ নিয়ে প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনকে রক্ষায়ও উদ্যোগী হবেন।

জনপ্রতি মাত্র ৮ওয়াট বিদ্যুত যা একটি এনার্জি সেভিং বাল্ব জ্বালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়,  সেজন্য দেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ সুন্দরবন ধ্বংস অর্থাৎ দেশের স্বার্থ বিসর্জন কখনোই মেনে নেওয়া যায়না, যাবে না।