Home » সম্পাদকের বাছাই (page 47)

সম্পাদকের বাছাই

স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা

হায়দার আকবর খান রনো ::

এই নিবন্ধের শিরোনামে স্বাধীনতা সংগ্রাম কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ বললে ’৭১ সালের নয় মাসের সময়কালের মধ্যে আলোচ্য প্রসঙ্গটি সীমাবদ্ধ থাকে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, আরো আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক চেতনা থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তরণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উস্মেষ, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ডাক এবং সর্বশেষ পর্যায়ে মহান সশস্ত্র যুদ্ধ – সব কয়টি পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কথাটি গ্রহণ করলে। ’৪৭ থেকে ’৭১-এর প্রতিটি পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের অবদান বিশাল এবং সেটাই স্বাভাবিক। শ্রেণী শোষণ থেকে আরম্ভ করে সব ধরনের শোষণ, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, কমিউনিস্টরাই সর্বকালে সর্বদেশে লড়াই করে এসেছে। বুর্জোয়া নেতৃত্বও নানা ধরনের সামাজিক অবিচার, লিঙ্গ বৈষম্য ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু শ্রেণী স্বার্থের কারণে তারা প্রায়শ দৃঢ়তার সঙ্গে লড়তে পারে না, মাঝপথে আপোষ করে।

অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসও তাই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এসেছিল ভারতের বুর্জোয়ার সঙ্গে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের আপোষের মাধ্যমে দেশটিকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত করে, পাকিস্তান নামক এক আজব ধর্মভিত্তিক দেশ তৈরি করে। ভারতের ইতিহাসবিদগণের অধিকাংশই ভারতের স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসকে। মহাত্মার নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের বিরাট গুরুত্বকে অস্বীকার করবো না। কিন্তু এর পাশাপাশি আরো দুটি স্রোত ছিল যাকে অস্বীকার করা হবে ইতিহাসকে খন্ডিতভাবে দেখা। একটি ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবল স্রোত, ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে সূর্যসেন ও পরে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র যুদ্ধ যার অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি স্রোত ছিল শ্রমিক-কৃষকের লড়াই যার নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা।

একইভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল অবদানকে উপেক্ষা করার একটি প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অথবা মিডিয়ার প্রচারের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বামপন্থীদের অবদানকে হয় অস্বীকার করেন অথবা যতোটা সম্ভব ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। একথা অস্বীকার করা যাবে না, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদের বিশাল জাগরণ ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিস্ময়কর বিজয় এবং ছয় দফার প্রতি তার অনমনীয় অঙ্গীকার এবং ১৯৭১-এর মার্চের ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চের ভাষণ সব কিছুই জাতিকে দ্রুত স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবের মতো অতো বিশাল মাপের নেতৃত্বও আর আসেনি। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ’৭১-এর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সবটাই আওয়ামী লীগের একক কৃতিত্ব বলে যে দাবি তা ইতিহাস বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে শেখ মুজিবের বিপরীতে জিয়াউর রহমানকে দাঁড় করানোর যে প্রবণতা তা নেহায়েতই হাস্যকর। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তার যেটুকু ভূমিকা ছিল সেটুকু স্বীকার করতে আমাদের কার্পণ্য থাকা উচিত নয়। শেখ মুজিবের নাম করে তিনি যে রেডিও ভাষণ দিয়েছিলেন (২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল, চট্টগ্রাম), তা সেই সময় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু একজন  মেজর ডাক দিলেন আর সবাই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল গোড়া থেকেই। এখানে বামপন্থী বলতে আমি কমিউনিস্ট পার্টি এবং মওলানা ভাসানীকে বোঝাচ্ছি। মওলানা ভাসানী একদা মুসিলম লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান-পরবর্তীকালে ভাসানীর যে উত্তরণ ঘটেছিল তাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের সমর্থক ও প্রচারক এবং কমিউনিস্টদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তাই পাকিস্তান আমলে ভাসানীই ছিলেন সব বামপন্থীর নেতা। ষাটের দশকে কমিউনিস্ট শিবিরে বিভক্তি ও বহুধা বিভক্তি এসেছিল। কমিউনিস্টদের কোনো কোনো অংশের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্কের অবনতিও হয়েছিল। আবার কমিউনিস্টদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্বও উপস্থিত করেছিল। এই সব কারণে বুর্জোয়া ইতিহাসবিদ ও বুর্জোয়া লেখক এবং মিডিয়ার পক্ষে সহজ হয়েছিল বামপন্থীদের সম্বন্ধে একটি নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরে ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করা। এই প্রবন্ধের খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বামপন্থীদের ভূমিকা কিছুটা হলেও তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

দুই.

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যে পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল এবং যে পাকিস্তানের পক্ষে এই বাংলার মুসলমান জনগণ রায় প্রদান করেছিল ১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে ভোটদান মারফত, সেই পাকিস্তান সম্পর্কে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দ্রুতই মোহ ভাঙ্গতে শুরু করে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে অনেকটা কলোনির মতো ভাবতে শুরু করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও লুণ্ঠন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন- এগুলো সব শ্রেণীর মানুষের অভিজ্ঞতায় আসতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও সংগঠিত হতে থাকে। পাকিস্তান আমলের প্রথম পর্বেই গড়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলন। বাঙালির ভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়া এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে মতলব এটেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা একেবারে আপনাআপনি হয়নি। ভাষা আন্দোলনের পেছনেও ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টি। সামনের কাতারে থেকে যারা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে তাদের অধিকাংশ বামপন্থী শিবিরের সঙ্গেই ছিলেন।

স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গটি প্রায় প্রথম থেকেই উত্থাপিত হয়েছিল। সেক্ষেত্রে এককভাবে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৪৮ সালেই মওলানা ভাসানী প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদে প্রদেশের জন্য অধিকতর ক্ষমতার দাবি উত্থাপন করে বলেন, ‘ব্রিটিশের শাসন মানি নাই, এবারও কেন্দ্রের হুকুমদারী মানবো না।’ ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল সেই দলের সেই সময়ের কর্মসূচিতেও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছিল। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগেই দলটির নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণেরও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উত্তরণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই রকম একটার পর একটা পথ অতিক্রম করেই চব্বিশ বছরের মাথায় এসে জনগণ প্রস্তুত হয়েছিল সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে- যে পাকিস্তানের জন্য একদা এই দেশের জনগণই ভোট দিয়েছিল।

১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রায় একই সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দলে যোগদান করেন। তার আগে তিনি করাচিতে বসবাস করছিলেন। সেখানে তিনি জিন্নাহ মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি বিবৃতির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে দাবি করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোন নেতৃত্ব ও কোন শ্রেণীর কি ধরনের ভূমিকা ছিল তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই সব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন ও ২১ দফা দাবি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, যদিও সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা ফজলুল হকের বিরোধিতার কারণে যুক্তফ্রন্টে কমিউনিস্ট পার্টিকে নেয়া হয়নি। ২১ দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্ব সহকারে এসেছিল।

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে সমঝোতা করে মাত্র ১৩ জন সংসদ সদস্য নিয়েও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি বোল পাল্টালেন এবং আওয়ামী লীগের এতদিনকার মেনিফেস্টোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। একটি হলো বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে। আরেকটি হলো স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে। সোহরাওয়ার্দী সাম্রাজ্যবাদী সামরিক চুক্তি যথা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সিয়াটো-সেন্টোর সমর্থনে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের দালালি করেছিলেন। মওলানা ভাসানী নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ভাসানী ও বামপন্থীরা ছিলেন বরাবরই দৃঢ়ভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। বাঙালি বুর্জোয়া নেতৃত্ব কখনোই এতো দৃঢ়তার সঙ্গে ও এতো স্পষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিতে পারেনি।

স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে মওলানা ভাসানী ও তার কমিউনিস্ট বন্ধুরা বরাবরের মতোই দৃঢ় ছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী বললেন, পাকিস্তানের সংবিধানে নাকি ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হয়েছে। জনগণকে বোকা বানানোর এবং জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে দেয়ার এটা ছিল অনৈতিক কৌশল। সেই সময় বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী যে ঐতিহাসিক ‘আসসালাম ওয়ালাইকুম’ উচ্চারণ করেছিলেন সেটাই ছিল প্রথম প্রকাশ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার হুমকি। যদি ঐতিহাসিকভাবে বিচার করতে হয় তাহলে দেখবো যে এটাই ছিল প্রথম স্বাধীনতার ডাক। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য সময় তখনো প্রস্তুত ছিল না। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ব্যাখ্যা করে খুবই র‌্যাডিক্যাল ছয় দফা পেশ করেছিলেন তখন তা সারাদেশে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিল। অথচ ১৯৫৬ সালে দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিনের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান উপরোক্ত দুটি প্রশ্নেই সোহরাওয়ার্দীর সমর্থনে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে ভাসানীকে ত্যাগ করতে হলো নিজের হাতে গড়া দল এবং তিনি গঠন করলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা সংক্ষেপে ন্যাপ।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ছয় দফা দেয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে দৃঢ় ছিল না। অন্যদিকে ভাসানী ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবিতে ছিল অবিচল। ষাটের দশকে আন্তর্জাতিকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হলে, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু কমিউনিস্টদের সব অংশ পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন।

১৯৬৬ সালে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল। সুখেন্দু দস্তিদার-মহম্মদ তোয়াহা-আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন মার্কসবাদী লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে (১৯৬৭) গৃহীত কর্মসূচিতে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার’ শ্লোগান তোলা হয়েছিল। এই প্রথম কোনো একটি পার্টি তার লিখিত দলিলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ষাটের দশকে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেখানে বলা ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে একই সঙ্গে বিপ্লব হবে না। তার মানে প্রকারান্তরে কমিউনিস্টদের উভয় অংশেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বতন্ত্রভাবে বিপ্লবের কথা ভেবেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীন হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, এমন ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন বামপন্থীরাই। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি তুলে ধরার পর আওয়ামী লীগের তরুণ অংশের মধ্যে একটা নতুন অবস্থা তৈরি হয়েছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

’৬৮-’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উল্লম্ফন ঘটেছিল। কিন্তু তখনো প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক আসেনি। অবশ্য সেই সময় কমিউনিস্টদের বিভিন্ন অংশ এবং তাদের ছাত্র সংগঠনসমূহ স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার শ্লোগান তুলেছিলেন। সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন বাংলার স্বাধীনতাকে মূল কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের একাংশের নেতৃত্বে পল্টনের জনসভা থেকে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’র কর্মসূচি প্রকাশ্যে উত্থাপন করা হয়েছিল। এটাই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। এর জন্য উক্ত সভায় বক্তৃতা করার অপরাধে সামরিক আদালত কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননকে সাত বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করেছিল, তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করে। একইভাবে মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ এক বছর কারাদন্ডের সাজা লাভ করেছিলেন (অনুপস্থিতিতে)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্র এই ভাবেই প্রস্তুত হয়েছিল এবং সেখানে যে বামপন্থীদের বিশাল ভূমিকা ছিল তা ভুলে গেলে অথবা তাকে ছোট করে উপস্থিত করলে তা হবে ইতিহাসকে অস্বীকার করা। আজকাল ইতিহাস বিকৃতির কথা উঠছে নানাভাবে। বড় বড় বুর্জোয়া দল নিজের মতো করে ইতিহাস লিখতে চায়। তার মধ্যে সত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ আছে। বুর্জোয়া দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে ইতিহাসবিকৃতির অভিযোগ তোলে। কিন্তু সব বুর্জোয়া দলই বামপন্থীদের ভূমিকাকে অস্বীকার বা ছোট করে দেখানোর ক্ষেত্রে ঐকমত্যে রয়েছে।

তিন.

১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো পরিপূর্ণভাবে লেখা হয়নি। এ কথা ঠিক, এ যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের হাতে। ইতিপূর্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র বিজয়ের কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়টি তখনি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। তারাই গঠন করেছিল প্রবাসী সরকার। আর শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানে আটক থাকলেও যুদ্ধরত মানুষের জন্য তিনিই ছিলেন সব অনুপ্রেরণার উৎস।

কিন্তু এতদসত্তে¡ও এ সুমহান যুদ্ধকে আওয়ামী লীগের একক অবদান বলে চিত্রিত করার যে প্রয়াস দেখা যায়, তা সর্বৈব ভ্রান্ত! এই মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেকগুলো স্রোত ছিল। বামপন্থীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব হাজির করেছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এই দুই কারণে বামপন্থীদের বিশাল অবদান কিছুটা খাটো হয়ে গিয়েছিল। বুর্জোয়া লেখকরাও এ কথাকে সামনে এনে বামপন্থীদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার সুযোগ পেয়েছেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যে নানাবিধ স্রোত  ছিল তার সবটার খবর প্রবাসী সরকার জানতো না এবং সরকারি মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেও সবটা ছিল না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছোট ছোট সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। মার্চের শেষ সমপ্তাহেই প্রথমে থানার রাইফেল নিয়ে এবং পরে পশ্চাৎপসরণরত বাঙালি সৈনিক ও ইপিআর সদস্যদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করে শিবপুরে গঠিত হয়েছিল মুক্তিফৌজ। তখনো প্রবাসী সরকার গঠিত হয়নি। কিন্তু সে জন্য নরসিংদী জেলার শিবপুরের মুক্তিকামী তরুণরা অপেক্ষা করেননি। মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শিবপুরের এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল অসম সাহসী এক মহান যুদ্ধ, যার পরিচালনায় ছিলেন বামপন্থীরা। এ রকম বামপন্থীরা এবং অন্যরাও বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন যা এখনো পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করে ইতিহাস রূপে তুলে ধরা হয়নি।

১৯৭১ সালের ১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটায় যুদ্ধরত কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দল এবং গণসংগঠনসমূহ মিলিত হয়ে গঠন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি। এ সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণাপত্র তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকার করেই সমন্বয় কমিটি সরকারকে সহযোগিতাও যেমন করবে, তেমনি স্বতন্ত্রভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এ সমন্বয় কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দল ছিল ন্যাপ (ভাসানী) ও ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ যার নেতৃত্বে সারাদেশে ১৪টি সশস্ত্র ঘাটি এলাকা ছিল। প্রধান ঘাটি ছিল নরসিংদী জেলার শিবপুরে। সীমান্ত থেকে বহু দূরে ও রাজধানীর নিকটস্থ এ শিবপুরে অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছে এবং অনেক শহীদ হয়েছেন। এ অঞ্চলের বামপন্থী বিপ্লবীরাই ডিসেম্বরে নরসিংদীতে অবস্থিত পাকিস্তানের মিলিটারি ক্যাম্প দখল করেছিলেন। শিবপুরের যুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এই যুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বই রচনা করেছেন হায়দার আনোয়ার খান জুনো – ‘একাত্তরের রণাঙ্গন-শিবপুর।’ এ বইটিকে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরা যেতে পারে এবং বামপন্থীদের অধীনস্থ ঘাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসনিক সামাজিক ব্যবস্থা কেমন ছিল তার একটা ধারণাও পাওয়া যেতে পারে।

শিবপুর থেকে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। এছাড়া ভারতের কলকাতা ও আগরতলা থেকেও মুক্তাঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা হয়েছিল। সমন্বয় কমিটির যুদ্ধ কৌশল ছিল দ্বিবিধ। এক. দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাটি গড়ে যুদ্ধ করা। সেক্ষেত্রে প্রধানত শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রই ছিল আমাদের অস্ত্র সংগ্রহের প্রধান উৎস। আমরা ভারত সরকারের কোনো রকম সাহায্য পাইনি। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে মুক্তিবাহিনীর মধ্যে আমাদের কর্মীদের ঢুকিয়ে দেয়া। কারণ মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুট করার ক্ষেত্রে বাম কমিউনিস্ট ন্যাপ কর্মীদের বাদ দেয়ার নির্দেশ ছিল। তবে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নুরুজ্জামান (তিনি নিজেও মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন), মেজর জলিল, মেজর মনজুর আহমেদ প্রমুখের যথেষ্ট সহযোগিতা আমরা পেয়েছিলাম। তারা বামপন্থীদের ঘাটি এলাকায় অস্ত্র সরবরাহ পর্যন্ত করেছিলেন। বামপন্থীদের পক্ষে সবচেয়ে আন্তরিক ছিলেন সেক্টর কমান্ডার কর্নেল নুরুজ্জামান।

বামপন্থীদের আরেক অংশ মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলিতভাবে বাহিনী গড়ে তুলেছিল, যা ছিল সরকারি মুক্তিফৌজ থেকে স্বতন্ত্র। ভারত সরকার তাদের স্বতন্ত্রভাবে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মৈত্রীর কারণে ভারত সরকার এটা করতে বাধ্য হয়েছিল। সিপিবির মনজুরুল আহসান খান এই বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন যার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপের সাতজন সদস্য বেতিয়ারার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

বামপন্থীদের অন্যান্য অংশের মধ্যে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন মুক্তিসেনারা বরিশাল ও ঢাকার কয়েকটি অঞ্চলে সাহসী যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ সম্পর্কে মূল্যায়নে ভ্রান্তি থাকলেও ইপিসিপি-এর বিভিন্ন অংশও বিচ্ছিন্নভাবে সাহসী যুদ্ধ করেছেন। যেমন নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকায় যথা চর জঙ্গলিয়া ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ঘাটি এলাকা তৈরি হয়েছিল মহম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে।  সশস্ত্র তৎপরতা রামগতি ও সুধারাম থানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

দেবেন শিকদার, আবুল বশারের নেতৃত্বাধীন বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির বিএম কলিমুল্লাহর নেতৃত্বে চাঁদপুরে এক বিশাল বাহিনী ও ঘাটি এলাকা গড়ে উঠেছিল।  ঢাকায় যুদ্ধরত ক্র্যাক প্লাটুনেও ছিলেন বামপন্থী ছাত্র কর্মীরা। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটির অধীনস্থ বরিশাল অঞ্চলের যুদ্ধ (অধ্যাপক আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন), কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম অঞ্চলের যুদ্ধ, বাগেরহাটে রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ও বিশাল গেরিলা বাহিনী এবং সাতক্ষীরার তালা থানায় কামেল বখতের নেতৃত্বাধীন গেরিলা সংগ্রাম বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। এ সংক্ষিপ্ত রচনায় সেই আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ হবে। এ জন্য এখনো যারা জীবিত আছেন, তারা লিখতে পারেন। এছাড়াও মিডিয়া ও গবেষকরাও এগিয়ে আসতে পারেন।

এ ছোট নিবন্ধটি লিখতে লিখতে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল কামেল বখতের বুদ্ধিদীপ্তি ও তারুণ্যে ভাস্বর চেহারাটি। তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার তালা অঞ্চলে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির সংগঠক। তালায় তার নেতৃত্বে বিশাল মুক্ত অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। নভেম্বরের কোনো এক সময় তিনি এসেছিলেন কলকাতায় আমার সঙ্গে দেখা করতে এবং তালার পরিস্থিতি সম্পর্কে রিপোর্ট করতে। ঠিক হয়েছিল আমিও যাব তালায়। দিন তারিখ ঠিক হয়েছিল। যাওয়ার পথ জানা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখের আগেই আরেকটি খবর এলো। কামেল বখত নিহত হয়েছেন। শোনা গেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো অংশ ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল বিশ্বাসঘাতকতা করে।

এ রকম আরও অনেকের কথাই মনে পড়ছে। সব নাম লেখা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও সব নামই সংরক্ষিত হওয়া দরকার। বেশি দেরি হলে শহীদদের নামও হারিয়ে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধে যার যা অবদান তা যেন আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখি। বামপন্থীদের ভূমিকাসহ সবার ভূমিকাকেই ইতিহাসের পাতায় স্থান দিতে হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অবিকৃত ইতিহাস তুলে ধরার কাজটিই হবে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সৎ রাজনীতিবিদদের কর্তব্য।

বন্ধ করুন সুন্দরবন বিনাশী কর্মকান্ড

ম. ইনামুল হক :

সুন্দরবনের শেলা নদীতে আবার জাহাজডুবি। গত ১৯ মার্চ দিবাগত রাতে সি হোর্স-১ নামের এই জাহাজটি ১২৩৫ টন কয়লা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নোয়াপাড়া যাবার পথে তলা ফেটে গেলে ডুবে যায়। এর ফলে নদীর পানি, এর মাছসহ জলজ প্রানী ও জীবসমূহের কি ক্ষতি হয়েছে এবং হবে তা’ হিসেব করা কঠিন। তবে সুন্দরবনের এই নৌ পথে এই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সুন্দরবনের চান্দপাই রেঞ্জের ভেতরে সাউদার্ণ স্টার-৭ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ তলা ফুটো হয়ে ডুবে গেলে ৩,৫৭,৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সুন্দরবনের নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক দূষণ। সুন্দরবন ২৬৯ প্রজাতির বিচিত্র পাখি, ডাঙ্গার প্রাণী, মাছ ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল এবং ৩৩৪ প্রজাতির বিশেষ গাছপালার বন। ১৮৭৫ সালে একে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে এর স্থলভূমি মোট ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে জলভূমি মোট ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭৭ সালে সমুদ্র তীরবর্তী মোট ৩২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি ‘বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সালে একে রামসার সাইটভুক্ত এবং ১৯৯৭ সালে একে ইউনেস্কোর World Heritage Sites এর তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই কোনরকম দুর্ঘটনা যা’ এই এলাকার জীব পরিবেশকে বিপর্যস্ত করতে পারে তা’ যে কোন সচেতন ও সংবেদনশীল ব্যক্তির কাছে উদ্বেগের বিষয়।

সুন্দরবন বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হওয়া সত্বেও এর অতি নিকটে রামপালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথভাবে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। এই প্রকল্প সুন্দরবনকে ধ্বংস করে, এলাকার জলপরিবেশ, জনগণের কৃষিজমি বিনাশ করে, এলাকার মানুষকে উদ্বাস্তু ও নিঃস্ব করে সম্পূর্ণ ভারতীয় স্বার্থে হচ্ছে। কেবল সরকারী উদ্যোগে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নয়, ওরিয়ন কোম্পানীর আরেকটি কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর নড়াইল ও সাতক্ষীরা এলাকায় যেসব শিল্প কল কারখানা আছে ও ক্রমশঃ গড়ে উঠছে, সেগুলির পরিচালন জনিত এবং নদীপথে জাহাজ চলাচল জনিত বর্জ্য সুন্দরবন ও তার আশেপাশের অনন্য জলপরিবেশকে নষ্ট করছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বলেছেন, ‘বাগেরহাটের রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবনের কিছু ক্ষতি হবে, কিন্তু পিছিয়ে আসা যাবে না।’ তা’হলে বাংলাদেশে সরকার রয়েছে কেন? জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবী করে যাঁরা ক্ষমতায় বসে রয়েছেন, তাঁরা কোন কথা বলছেন না কেন?

সুন্দরবনে গত ১৯ মার্চ জাহাজডুবির পর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, এরপর থেকে শেলা নদীতে আর কোন কার্গো জাহাজ চলবে না। তাঁর এই কথাটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয় সে জন্যে এর উত্তর দিয়ে মংলা নদী থেকে ঘাসিয়াখালী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার কাটা যে গুরুতত্বপূর্ণ নৌ রুটটি আছে এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর থেকে চালু করা খালটি ব্যবহার করলে সুন্দরবনকে এড়িয়ে যাতায়াতের দৈর্ঘ কমে যায় এবং আর্থিক ও সময়ের দিক থেকে প্রভুত সাশ্রয় হয়। বরিশালের গাবখানের সাথে মিলে মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ভারত বাংলাদেশের নৌ প্রটোকল অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক রুটও বটে। এই পথ দিয়েই ভারত নদীপথে আসামে পণ্য আনা নেয়া করে। মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ৪০ বছর ড্রেজিং ছাড়াই চলেছে। এই রুটটি ২০০১ সাল থেকেই নাব্যতা হারাতে থাকে। ২০০৯/১০ সালে বিআইডাব্লিউটিসির রকেট স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পণ্যবাহী জাহাজগুলি জোয়ার ভাটা হিসাব করে চলাচল করলেও ২০১১ সালে রুটটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথটি চালু করা হয়। এরপর থেকে মংলা ও খুলনা এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজগুলিকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথে ১৫০ কিলোমিটার পথ বেশী পাড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে।

হিমালয় থেকে আসা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশে রয়েছে মৌসুমী বায়ু প্রভাবিত ছয়টি ঋতুর বিশেষ প্রকৃতি। কিন্তু উন্নয়নের নামে বাংলার এই প্রকৃতি আজ শেষ, খাল বিল নদী নালা, গরু ছাগল মাছ পাখী শেষ, এমনকি গাছপালা ফল শস্যও শেষ। সারা বিশ্বে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এলাকাগুলিই সবচেয়ে মূল্যবান, যার মধ্যে সুন্দরবন একটি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে এই সুন্দরবনের ক্ষতি করবে তা’ আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি। আমরা বলেছি, কেন্দ্রটি মারাত্মক বায়ুদূষণ করবে, মিঠা ও লোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট হবে, জাহাজ চলাচলের কারণে বর্জ্য ও শব্দদূষণ হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি; ফলে সুন্দরীসহ সুন্দরবনের গাছপালা ধ্বংস হবে, বাঘ ও অন্যান্য স্থলজ প্রাণীরা বাসস্থান হারাবে, মাছেরা লোপাট হবে, পাখীরা থাকবে না। বাংলাদেশে সুন্দরবন প্রকৃতির শেষ নিদর্শন। সুন্দরবন শেষ হলে বাংলাদেশ শেষ হবে। আমরা তাই সুন্দরবনকে শেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চাই না।

মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি বন্ধ হবার পর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীর নৌপথটি চালু করায় স্থানীয় জলজ ও বন পরিবেশের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে বলে পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়ে আসছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও এই পথটি বন্ধ করার কথা বারবার বলা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। গত ১৯ মার্চ জাহাজ ডুবির পর শেলা নদী দিয়ে কার্গো জাহাজ বন্ধ করার সরকারী সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকে সেটাই দেখবার বিষয়। (প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকচেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইন্সটিটিউট)

ক্রিকেট আধিপত্যবাদ : প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকেই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :

এশিয়া কাপ হলো, টি-২০ বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব হলো। এর আগে আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক আসর হলো। তাসকিন আহমেদ এগুলোতে দোর্দন্ড প্রতাপে খেললেন। তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেন না। এমনকি যে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাচের সুবাদে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো, সেখানেও কিন্তু তার একটি বলও ‘নো’ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাসকিন আর আরাফাত সানির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দেওয়া হলো। তাদের বোলিং ভঙ্গি সন্দেহজনক। তারপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা। আর সেখানে যথারীতি ব্যর্থ। তাদের ওপর নেমে এলো নিষেধাজ্ঞার খড়গ।

এই নিষেধাজ্ঞা কেবল তাদের ওপরই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উদীয়মান শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকেই চেপে ধরা। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটাকে সূচনাতেই শেষ করে দেওয়া।

বাংলাদেশকে হতদমিত করলে ভারতের কী লাভ? সবচেয়ে বড় লাভ তাদের ক্রিকেটীয় বর্ণবাদ সমুন্নত থাকবে। ক্রিকেটের শুরুতে কিন্তু এমন মানসিকতা ছিল। ব্রিটিশ প্রভূরা ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে রাজি ছিল না। লর্ডদের এই বিনোদনকে তারা ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে উপনিবেশভুক্ত কয়েকটি দেশে মাত্র এই খেলাটি প্রচলিত হয়। অলিম্পিকের মতো আসরে ক্রিকেট নেই। ফুটবল যেখানে সবাই খেলতে পারে, ক্রিকেটে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানা তথাকথিত নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে অন্যদের ক্রিকেট থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। চাইলেও তারা ক্রিকেট খেলতে পারবে না। শুরুতে এই কাজটি করেছে ইংল্যান্ড। তারপর অস্ট্রেলিয়া। এখন করছে ভারত।

জগমোহন ডালমিয়া যখন আইসিসির সভাপতি ছিলেন, তখন কিন্তু অন্য রকম পরিস্থিতি ছিল। তিনি চাইছিলেন জোটবদ্ধ এশিয়াকে নিয়ে অ-এশিয়ানদের প্রতিরোধ করতে। তিনি তার এই কাজে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছিলেন। ওই প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পর জোটবদ্ধ থাকার প্রয়োজন আর অনুভব করেনি ভারত। এর মধ্য অবশ্য আরো দুটি ঘটনা ঘটে গেছে। ডালমিয়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং ভারতে কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের আবির্ভাব। এসব খেলোয়াড় ভারতকে ভালো দলে পরিণত করেছে। একইসাথে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে এন শ্রীনিবাসনের মতো একনায়কদের। এই বর্ণবাদী চরিত্রগুলো ন্যূনতম প্রতিরোধের সব সম্ভাবনা শুরুতেই শেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর। আইসিসি এখন এদের দখলেই। শ্রীনিবাসন সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তার তুলনায় বেশ নমনীয়, ডালমিয়ার কাছাকাছি। কিন্তু অন্যরা তো রয়ে গেছে। তার ফল হলো তাসকিনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

নিজেদের মাতব্বরি অব্যাহত রাখার জন্য ভারত-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইসিসিকে কুক্ষিগত করেছে। তাদের কেউ বলে তিন মাতবর, কেউ তিন জমিদার, কেউ তিন মোড়ল। তারাই এখন অঘোষিত। ভারত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এখন ভারতের সব আবদার মেনে নিচ্ছে। এর জের ধরে কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এই তিন দেশের বাইরের ক্রিকেটারদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা।

ধারাভাষ্যকার শামীম আশরাফ চৌধুরী একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন। ওই তিন দেশের কোনো ক্রিকেটার এখন পর্যন্ত অবৈধ ঘোষিত হননি। গত আইসিসি বিশ্বকাপের আগে সুনীল নারায়ন, সাইদ আজমল, মোহাম্মদ হাফিজের মতো বেশ কয়েকজন বোলারদের হঠাৎ করে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা কি বিশ্বকাপে মাতব্বরদের পথ পরিষ্কার করার আগাম কার্যক্রম ছিল? তখনই অনেকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন।

ভারত এখন যে কাজটি করছে, এই কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড তা-ই করত। মুত্তিয়া মুরালিধরনের ব্যাপারটাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। এখন উভয় দেশই মুরালিধরনের ব্যাপারে উচ্ছ¡সিত, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু এই লঙ্কান বোলার যখন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তখন শেন ওয়ার্নের চেয়েও সফল ছিলেন, তখন তার বোলিং ভঙ্গি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলে তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তবে শ্রীলঙ্কা হাল ছাড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে মুরালির পাশে ছিল। মুরালির সৌভাগ্য তিনি বোর্ডের পাশাপাশি অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো একজন অধিনায়ক পেয়েছিলেন। হাফিজ, আজমলরা পাননি। তাসকিনরা কি পারবেন?

কাজটা খুবই কঠিন। গত আইসিসি বিশ্বকাপের সময় ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে বাংলাদেশকে অন্যায়ভাবে হারিয়ে দেওয়ার পর ওই সময়ে সংগঠনটির সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল (পরিকল্পনামন্ত্রী) অভিযোগ করে মন্তব্য করেছিলেন- ‘আইসিসি এখন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলেরই নামান্তর’। তিনি সংগঠনটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেই এমন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পেছনে ডালমিয়ার অবদান ছিল। তবে সাধারণভাবে ভারতের বড় অংশই চাচ্ছিল না, বাংলাদেশ তাদের সমান মর্যাদার হোক। বর্তমানে তাদের ওই মানসিকতা আরো জোরদার হয়েছে। এর একটি প্রমাণ হলো, এত বছর পরও বাংলাদেশকে টেস্ট খেলার জন্য ভারতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ কি হাল ছেড়ে দেবে? না। হাল যে ছেড়ে দেবে না, সেটা বাংলাদেশ এর মধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে। তাসকিন নেই, সানি নেই, অসুস্থতার কারণে তামিম ইকবাল নেই, কিন্তু তবুও তারা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করেছে। অল্পের জন্য ম্যাচটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ লড়াই করার যে মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটাই তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সেই বাঘ কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বাংলাদেশও করবে না। নিজেরা তো এগিয়ে যাবে, সেইসাথে বঞ্চিত অন্য দেশগুলোকে নিয়ে আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

বিএনপি’র কাউন্সিল : এসব কী শুধুই কথার কথা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু :

ক্ষমতা হারানোর সাত বছর পরে এবারের কাউন্সিলে বিএনপি প্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে তাঁর দিব্যদর্শন ঘটেছে। নাকি তিনি আর দশ কথার মত অনেকগুলি নীতি নির্ধারনী বিষয়ে বক্তব্য দিলেন, যার মর্মার্থ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ শোনার অপেক্ষায় রইলাম। তাঁর ভাষণ লিখিয়েদের ধন্যবাদ, অনেকগুলি মৌলিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের অবতারনা করা হয়েছে, নব্বইয়ের শীত মৌসুমে এরশাদ পতনের পর জোটগত ও দলগতভাবে যেগুলি বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে খালেদা বা হাসিনা সরকার বিকাশমান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দেশকে নিয়ে গেছেন উল্টো যাত্রায়।

কাউন্সিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরনে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে”।

এই বক্তব্য খালেদা জিয়ার! এটি অবিশ্বাস্য! এটি শুনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই বক্তব্য তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস বা ধারন করেন? যার দলে গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এক হাজার একটা প্রশ্ন আছে তিনি বলছেন, ক্ষমতায় গেলে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র যদ্দুর জেনেছি দলে চেয়ারপার্সন নিরঙ্কুশ, এবারের কাউন্সিলেও সেটি প্রমানিত। কাউন্সিল তাঁকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেভাবে চান সেভাবেই কমিটি গঠিত হবে।

দলে এরকম অবিসংবাদিত ক্ষমতার অধিকারী কোন ব্যক্তি সরকারের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতায় আসীন হলে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আজকের সামগ্রিক সংকটের মূলে রয়েছে ব্যক্তির হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পূঞ্জিভূত হওয়া। গত সাত বছরে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিষয়ে প্রতিদ্বদ্বীকে ইঙ্গিত করে যদি খালেদা জিয়ার এই দিব্যদর্শন ঘটে থাকে, তাহলে প্রথমেই দলের অভ্যন্তরে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য এনে সততার পরীক্ষা দিতে হবে। প্রমান করতে হবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিনি আসলেই বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য চান এবং ক্ষমতায় গেলে তিনি এভাবেই সেটি করতে চান।

কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের পুণঃনির্বাচন প্রমান করেছে তাদের প্রতিপাদ্য “মুক্ত করবই গণতন্ত্র” কতটা অসাড়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জয়-জয়কারের এই দেশে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলে প্রতিদ্ব›দ্বীতাহীন, ক্ষমতায় থাকলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ আর নতুন কিছু নয়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নিয়ে তাদের হা-হুতাশ এবং সমালোচনার নৈতিক অধিকার এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে। অপর  অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা এতে খুশি, তিনি বলেছেন, “নাটকটা ভালই করেছে”।

গোটা কাউন্সিলের দৃশ্যমান একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। ছয় বছর পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। দলের পূর্ণ মহাসচিব হবেন। প্রয়াত: মান্নান ভূঁইয়ার পরে সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ হিসেবে ফখরুল এই পদে বসবেন। সেটি ঝুলে থাকল চেয়ারপার্সনের ইচ্ছায়-অনিচ্ছার ওপর। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত এক বা দ্বিতীয় নেতৃত্বের দলে সাধারন সম্পাদক কিংবা মহাসচিবের পদ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি কমবেশি সকলের জানা। তারপরেও ষাট দশকে তাজউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারনে যধেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়াও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন।

এটি মধ্যপন্থী দল থেকে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া বিএনপির চলমান বিপর্যয় কাটাতে পুরানো নেতৃত্বকেই বহাল রাখা হয়েছে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতামত্ত বিএনপি কখনই ভাবেনি ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সে সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র হাওয়া ভবন এবং এর আর্শীবাদপুষ্টরা কাউকেই মানুষ মনে করতে রাজী ছিলেন না। ক্ষমতা হারিয়ে তারেক রহমানের লন্ডন চলে যাবার পরে বিএনপির দোর্দন্ড প্রতাপশালী নেতারা মামলা, জেল ও সরকারের রোষানল থেকে রক্ষা পাবার ক্রমশ: নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে উটপাখির মত বালুতে মুখ গুঁজে লুকিয়ে পড়েন।

বহু ধারা এবং মত-পথের সমন্বয়ে গঠিত দলটিতে এখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব সুস্পষ্ট। সাবেক বামরা অনেকটা কোনঠাসা ছিলেন। তবে মির্জা ফখরুল মহাসচিব  হলে এই ধারাটি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ডানদের দৌরাত্মে এই দল সামগ্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে, প্রতিরোধ বা ক্ষমতাসীনদের পুন:নির্বাচনে বাধ্য না করতে পারায়। এটি আরো ত্বরান্বিত হয়, ২০১৫ সালের শুরুতে হরতাল-অবরোধের নামে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করায়। সরকার দেশে-বিদেশে এই সুযোগে বিএনপিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় এবং যৎকিঞ্চিৎ সাফল্য লাভ করে।

দল হিসেবে বিএনপির এই বিপর্যয়, দুর্গতির কারণ তাদের শীর্ষ পর্যায়ে এখনও অনুদঘাটিত। এটি অনুদঘাটিতই থেকে যাবে কারণ, একটি একক নেতৃত্বের পরিচালিত দলে কখনই প্রশংসা ছাড়া ব্যর্থতার মূল্যায়ন হয় না। ফলে জনসমর্থনপুষ্ট এই দল কেন ব্যর্থ হল, কঠিন দুঃসময়ে পতিত হল-এসব বিশ্লে¬ষণ কখনই হবে না। আগেই বলেছি, বহু ধারা ও মত-পথের এই দলকে সমন্বিত রাখতে পারে একমাত্র ক্ষমতা। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে এই কাঠামোর একটি দলে যে যে দুর্গতি এবং দৈন্য হওয়ার কথা তার সবকিছুই এখন বিএনপির গোটা অবয়বে স্পষ্ট।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতের মত একটি অপরাধ প্রবণ দলের খপ্পরে পড়ার মত বৃহৎ ভুল, অক্ষমতা, অন্যায্যতা, অন্যায় সর্বোপরি রাজনৈতিক অপরিপক্কতার কারণে আজকের যে পরিস্থিতি-এর কোন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন নেতা-কর্মীদের সামনে বিএনপি উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলে এর সকল দায় তারা চাপাতে চেয়েছে এক/এগারো সেনা সমর্থিত সরকার ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। দল হিসেবে ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ সময়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সামগ্রিক ব্যর্থতা উঠে আসেনি।

অনুদঘাটিত, অনির্ণেয় এসব ভুল ও অক্ষমতার পূনরাবৃত্তি অব্যাহত রেখেছে দলটি। দেশের রাজনীতিতে, দলের অভ্যন্তরে-কোন ক্ষেত্রেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়নি গত সাত বছরে কেন তারা একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলো না। এর অনিবার্যতায় সংঘবদ্ধ, সৃজনশীল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় যেতে পারছে না দলটি। এই অচলাবস্থার মধ্যে বাধ্য-বাধকতার একটি কাউন্সিল করছে বিএনপি। যেন এই কাউন্সিল ছিল খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিনা প্রতিদ্ব›দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য! দলের এমন পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে আগামী গণতন্ত্রের সারথী হবে?

রাজনীতির একটি সন্ধিক্ষণে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন-পুলিশ সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের নামটি যারা টিকিয়ে রাখছেন, খালেদা জিয়া কাউন্সিলের আগে তাদের নিয়ে একদিনের জন্যও বসেননি। ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে তাদের বক্তব্য শোনেননি। মাঠ পর্যায়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রণোদনা যোগাতে পারেননি। বিএনপির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জ হবে, মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের দুরত্ব লাঘব।

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির একটি চটকদার শ্লোগান রয়েছে। চটকদার বলা হচ্ছে, কারণ দলটির অবয়বে কোথাও এই শ্লোগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অতীত-বর্তমানে যেসব দলগুলো ছিল তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। কাউন্সিলে বিএনপির শ্লোগান ছিল, “দুর্নীতি দু:শাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ”। সন্দেহ নেই, শ্লোগান হিসেবে এটি অসামান্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু যে দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দুঃশাসন নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই, তার কোন ব্যাখ্যা-মীমাংসা ছাড়া এরকম শ্লোগান চটক-চমক সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র চায় বিএনপি। এজন্য প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বিএনপিকে, দলে কি গণতন্ত্র চায় তারা? যে দলটির নেতৃত্বই উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, কন্যা-জায়া-জননী সেখানে এই শ্লোগানের অসাড়ত্ব বুঝতে পন্ডিত হওয়া লাগে না। এবারের কাউন্সিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথে যায়নি।  শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মাইকে ঘোষণা হবে, হাত উঁচিয়ে সমর্থন ব্যক্ত হবে। অথচ দলটির গঠনতন্ত্রের বিধানঃ জাতীয় কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হবেন।

ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানেই। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে যে বাক্যটি যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একচ্ছত্র করা হয়েছিল, বাহাত্তরের সংবিধানে সেই বাক্যের প্রেসিডেন্ট শব্দটি মুছে প্রধানমন্ত্রী বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগ কখনও স্বীকার করেনি। অপরপক্ষে বিএনপি পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিকতা দুর করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিভাবে আরো নিরঙ্কুশ করা যায়, সেই পথেই হেঁটেছে।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সামনে এই সুযোগটি এসেছিল যখন দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরছে। কিন্তু বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের ৫৫ অনু্েচ্ছদ, যেখানে মন্ত্রীসভাকে নিঃস্ব করে  প্রধানমন্ত্রীকে সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল, সেটি পুণরুজ্জীবিত করে ক্ষান্ত দেয়নি, দলত্যাগ সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদও তারা আরো কঠোর করে (পঞ্চদশ সংশোধনীতে যেটি বাদ পড়েছে), যাতে প্রধানমন্ত্রীর আসন টলে না যায়। সে সময়ে জরুরী অবস্থা জারীতে এবং সংসদ ডাকা ও বাতিল করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান ছিল না, সেটিও যুক্ত করা হয়।

আওয়ামী লীগও এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে অনুসরণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে সকল কর্তৃত্ব ও দলে তাঁর নিরঙ্কুশ প্রধান্য বজায় রেখেছে। সুতরাং বিএনপি নেতার বক্তব্য যে কথার কথা নয় সেটি প্রমান করতে অতি দ্রুত সংস্কার কমিটি করে সহসাই তার খসড়া জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। খালেদা জিয়া কাউন্সিলে শুধু হাসিনামুক্ত নির্বাচনের বিষয়টি স্পষ্ট করলেন, কিন্তু তিনি বা তাঁর দল নির্বাচনকালীন সরকার চায় (তারা অবশ্য এখন আর তত্তাবধায়ক সরকার বলছেন না, বলছেন নিরপেক্ষ সরকার), এর কোন পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অজতক জাতির সামনে হাজির করতে পারলেন না।

 

ধর্মীয় উগ্রতা প্রশ্নে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, ইকোনমিস্ট থেকে–
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ফুলে ফেঁপে ওঠেছে। বিকাশমান বাণিজ্যিক যোগাযোগ, অভিন্ন কৌশলগত উদ্বেগ এবং সমৃদ্ধিশীল ভারতীয় বসতি বন্ধুত্বকে মজবুত করে তুলছে। তবে নিরেট বাস্তবতা হলো উভয় দেশে থাকা বিপুল, বৈচিত্র্য ও বিরোধের জায়গায় ভর্তি- যেগুলো পরিস্থিতি কঠিন করে তুলতে পারে। এসবে এমন একটি আছে যা উভয় দেশ, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সেটা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার সংজ্ঞা।
আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতার দূতদের সৌদি আরব, পাকিস্তান ও চীনের মতো অ-মুক্ত স্থানগুলো সফর করতে পারলেও তৃতীয়বারের মতো ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ মার্চ ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের (ইউএসসিআইআরএফ) একটি প্রতিনিধি দলের ভারত যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা ভিসা পায়নি। সংস্থাটির কমিশনার ও সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাটরিনা ল্যান্টস সুইট বলেছেন, ‘আমরা খুবই হতাশ, এটা সত্যিই সুযোগ হারানো।’
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটাকে দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসিতে ভারতীয় দূতাবাস বলেছে, ভারতে সাংবিধানিকভাবে নিশ্চয়তা দেওয়া অধিকার-পরিস্থিতি নিয়ে রায় প্রদান করতে ইচ্ছুক কোনো বিদেশী সংস্থাকে অনুমতির কোনো অবকাশ তারা দেখছে না। এর জবাবে ক্যাটরিনা ল্যান্টস বলেছেন, তাদের সফরের রায় প্রদানের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, বরং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে দেওয়া কমিশনের পরামর্শগুলো ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি নিম্নপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিদর্শকদের আমেরিকান মূল্যবোধ ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তারা বরং সব দেশের পালনীয় আন্তর্জাতিক যে মানদন্ডে ভারত স্বাক্ষর করেছে, সেটা কতটা পালিত হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখত। কমিশনের অন্যতম উদ্বেগ হলো ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ আইন প্রয়োগ। হিন্দুদের খ্রিস্টান বা ইসলামে ধর্মান্তর ঠেকাতেই মূলত আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নরম করে বলা যায়, ইউএসসিআইআরএফ ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে কিছুটা জটিল ইতিহাস রয়েছে। ২০০৫ সালে এই যুক্তিতে মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ২০০২ সালে সেখানে সংগঠিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য তিনিও দায়ী। তাকে ১৯৯৮ সালের আমেরিকার ধর্মীয়-স্বাধীনতা আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আইনের আওতাতেই ফেডারেল সরকারের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত, তবে স্বাধীন তদারকি সংস্থা হিসেবে ইউএসসিআইআরএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি কয়েক বছর পর্যন্ত কিছুটা সফলতার সাথে মোদির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। গুজরাট দাঙ্গা এবং এর তদন্ত নিয়ে মোদির অবস্থানকে মেনে না নেওয়ার বিষয় ছিল এটা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সংস্থাটি জানায়, গুজরাট প্রশ্নে ‘পুরোপুরি স্বচ্ছ’ না হওয়া পর্যন্ত মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত হবে না।
এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচ- বিতর্ক হয়। আমেরিকান কট্টর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অহিন্দু বংশোদ্ভূতরা দাবি করে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি অন্যান্য ধর্মের জন্য বিপর্যয়কর। তবে আমেরিকায় হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের মধ্যে বিজেপির বিপুল ও সোচ্চার অনুসারী রয়েছে। এমনকি মোদিকে সশরীরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে ভিডিও ক্লিপিংসের মাধ্যমে হলেও বক্তা হিসেবে তার উপস্থিতির দাবি তোলা হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রেও পাড়ি দিয়েছে।
মোদি ২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ থেকে বাদ দেওয়া অব্যাহত রাখার কোনো প্রশ্নটি টিকে থাকেনি। তিনি ও বারাক ওবামা কয়েক দফা উচ্চ পর্যায়ের সভা করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নে আমেরিকার নির্বাচকম-লীর অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি ভারত সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামাকে সব ধর্ম যাতে বিকশিত হতে পারে, তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অন্তত কিছু সুপরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেহমানের বক্তব্য তার মেজবান পছন্দ না করলেও আমেরিকার কিছু ভোটারকে তা সন্তুষ্ট করেছে।
গত মাসে আট আমেরিকান সিনেটর এবং ২৬ প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ভারতের খ্রিস্টান, মুসলমান ও শিখদের প্রতি আচরণ নিয়ে ‘বিশেষ উদ্বেগ’ প্রকাশ করে মোদিকে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা বলেন, ৫০টি গ্রাম পরিষদ অ-হিন্দু রীতিনীতিকে অপরাধমূলক কার্যক্রম ঘোষণা করায় ছত্তিশগড়ের খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা দুর্ভোগে রয়েছে; হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ গরু খাওয়া নিয়ে মুসলমানরা আইন হাতে তুলে নেওয়া লোকজনের সহিংসতার মুখে রয়েছে; আলাদা ধর্মের স্বীকৃতি না দেওয়ায় শিখরা হতাশ হয়ে পড়েছে। তবে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখছেন, এই বোধ থাকায় আমেরিকান আইন প্রণয়নকারীরা তাদের বক্তব্যকে বেশ সতর্কভাবে সংযত রেখেছেন। তারা ‘ধর্মের পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হবে বলে মোদির দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ‘তা বাস্তবায়ন করার জন্য’ তার প্রতি অনুরোধ জানান।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমেরিকার এসব আইন প্রণয়নকারীর মতে, মোদিকে চিঠি লিখে আসলে তারা তাদের ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছেন। তবে ওই বক্তৃতায় কর্ণপাত করার কোনো ইচ্ছা সম্ভবত ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নেই। চাপ প্রয়োগ করা হলে সম্ভবত তারা বলে দেবেন, দুনিয়া এখন বদলে গেছে, বৈশ্বিক বিষয়াদিতে আমেরিকার তুলনামূলক প্রাধান্য ১৯৯৮ সাল থেকে আর আগের মতো নেই।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু
২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায়” নির্বাচিত হওযার গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৪ সালে এসে সেটি রেকর্ড ছুঁয়েছিল। ৩’শ আসনে ১৫৪ টি, অর্ধেকেরও বেশি। এটি এখন সংক্রামিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন, একই বছর শেষে পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এবং এখন সেটি পরিপূর্ণতা পেতে যাচ্ছে আগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে।
যে সকল ভিত্তির ওপর ভর করে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে তার একটি বড় পরিমাপক হচ্ছে অবাধ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন। গণতান্ত্রিক বা যে কোন ব্যবস্থায় জনগনের মতামত প্রদানের সবচেয়ে স্বীকৃত মাধ্যম নির্বাচন। এটিকে গণরায় বলা যেতে পারে। উপমহাদেশের ইতিহাসে যে নির্বাচনটিকে সবচেয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহনমূলক বলে অভিহিত করা হয়, সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি সামরিক সরকারের অধীনে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেয়া গণরায়ের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এরকম কোন পরিবর্তন না ঘটালেও জনগনের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উৎসবে মেতে ওঠার নির্বাচন। কিন্তু দলীয় মার্কার এই নির্বাচনে উৎসব-উৎসাহ সাধারন ভোটারের অন্তত: নেই। নির্বাচনে প্রথম ধাপে ৭৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের ৬২টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬৪৭টির ১৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এটি সত্যিই অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দু’একটি সাধারন ব্যতিক্রম ছাড়া এরকম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।
একতরফা, একদলীয় কিংবা একক-কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে কোন কোন রাজনৈতিক দলের বয়কটের কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, এ অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে এটি শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের ঘোষিত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, জাতীয় পরিষদের ৭৮টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৭৫টি আসনের ১০০টি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন। অবশ্য ঐ নির্বাচনে নির্বাচিতরা কোনদিন পার্লামেন্টে বসার সুযোগ পায়নি। কারণ ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত ঘটনাবহুল নির্বাচনে ১১ জন, ১৯৭৯ সালে ১১ জন, ১৯৮৮ সালে ১৮ জন ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একক নির্বাচনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে বিএনপি বর্জন করলেও এবং ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন ছিলেন না। এক্ষেত্রে রেকর্ড করেছে ২০১৪ সালের নির্বাচন, এটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত ১২২ জনকে পাওয়া যেত।
সুতরাং বাংলাদেশ এ যাবতকাল মেনে নিয়েছিল যে, জাতীয় নির্বাচন যদি একতরফা, একদলীয় হয় তাহলে ক্ষমতাসীনদের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন থাকতে পারেন। সেখানে মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি অংশগ্রহন নাও থাকতে পারে। এমনকি ঐ নির্বাচনে গঠিত পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দল মিলে একাকার হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গত পৌরসভা নির্বাচন থেকে জনগন এটিও দেখতে শুরু করেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একতরফা, একক ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাহীন হতে চলেছে।
এই প্রথম রাজনৈতিক মনোনয়নের নির্বাচনে ১৭৪টি ইউনিয়নে দেশের একটি প্রধান দল বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। এদিক থেকে টেক্কা দিয়েছে বাগেরহাটের মোল্লারহাট ও চিতলমারী উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়ন। এখানে সব ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে কাউকে প্রার্থী হতে দেয়া হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মনোনয়ন পত্র দাখিলের সুযোগ পায়নি। কিভাবে বিপক্ষ প্রার্থীদের বিরত রাখা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত: এই আসনের সংসদ সদস্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিন।
নির্বাচন কমিশনের নিস্ক্রিয়তা ও নির্বিকারত্ব দেখার মত। হালে দু’একটি ক্ষেত্রে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেও হাজার হাজার ঘটনার মধ্যে তা কোন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। মাত্র কিছুকাল আগে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনেও একই দশা হয়েছিল। মনোনয়ন পত্র জমা দিতে না পারার অজস্র ঘটনা, একের পর এক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়াÑ কোন কিছুই আমলে নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। এখনই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই নির্বাচন কি আরো একটি প্রহসনে পরিনত হতে চলেছে?
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে একটি বড় খুঁটি হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। অবাধ নিরপেক্ষ, অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সেরকম অবকাঠামো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। যে সব দেশে নির্বাচন কমিশন দুর্বল নেতৃত্ব, অযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও দলীয় মনোভঙ্গির বাসনা পূরণের ক্ষেত্র হয়ে যায়, সেখানে জনআকাঙ্খা প্রতিফলনের উপায়গুলিও নি:শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় নির্বাচন যতটা না গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য, তার চেয়ে বেশি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে মহিমান্বিত করার জন্য। এজন্যই ২০১৪ থেকে গড়ে ওঠা নির্বাচনের সংস্কৃতি দেশকে ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলছে।
আগেই বলেছি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এই দেশে বরাবরই উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উৎসবের। এই নির্বাচনে ভোট দেয়া ও নিজের পছন্দমত প্রার্থী নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ থাকে মাত্রা ছাড়ানো। আশির দশকে সামরিক শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চর দখলের আকার ধারণ করলেও প্রতিদ্বন্দ্বীতা অন্তত: ছিল। ১৯৯১ সালের পরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরোক্ষ মনোনয়ন ও সমর্থনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনগুলিতে উৎসবের মেজাজ আবার ফিরে আসে। ভোটারদের উচ্ছাসিত অংশগ্রহনে নির্বাচন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতার।
এবারেই প্রথম সরাসরি রাজনৈতিক মনোনয়নে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দাপট এবং প্রশাসন-পুলিশের পক্ষপাত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিরোধী দলীয় প্রার্থী, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীরাও এলাকাছাড়া। ভোটাররা আতঙ্কিত, ভোট দেবার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং এটিও অনেকটা একক নির্বাচনের রূপ লাভ করতে যাচ্ছে।
এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, ক্ষমতাসীনরা ও নির্বাচন কমিশন মিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় যে নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন, সেটি কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হতে চলেছে? ২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোটারের অংশগ্রহন ছিল না। গত পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। আগত ইউপি নির্বাচনে ইতিমধ্যে ৭৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত। দুই উপজেলার একটি ইউনিয়নও বিরোধী দলীয় প্রার্থী নেই।
জনগনের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের দাবি করে, তাঁর আমলে সেই ভোটের অধিকার নির্বাচন কমিশন যাদুঘরে পাঠাতে চলেছে – সেটিই কি তাঁর এবং জনগনের অনিবার্য নিয়তি!

ড. আতিউরের পদত্যাগেই যেন সব শেষ হয়ে না যায়!

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়া, ঘটনা সংঘটিত হওয়ার এক মাসেও অর্থমন্ত্রীসহ সরকারকে বিষয়টি না জানানো প্রভৃতি বিষয় সামনে রেখেই এবং অনেক জল্পনা-কল্পনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করলেন। নৈতিক অবস্থান থেকেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমকে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমকে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীও তার এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করেছে। অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এখানেই যেন সবকিছুর সমাপ্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে। সবাই চাইবে, সঠিক তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে উন্মোচন করা হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের লুকোচুরি জনমনে সন্দেহই তৈরি করবে। ঘটনাটি গভর্নরের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সঠিক তদন্তে নজর দিতে হবে এখন, এটি সবাই চায়। এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে এর বিকল্প নেই। অর্থ চুরির সঙ্গে কারা জড়িত, সেটি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থ উদ্ধারেও চালাতে হবে জোর তৎপরতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে রিজার্ভের মোট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় গেছে ২ কোটি ডলার। তার মধ্য থেকে ১ কোটি ৯৯ লাখ ডলার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাবে (অ্যাকাউন্টে) ফেরত এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকিং সচিব আসলাম আলম। তবে ফিলিপাইনে যাওয়া মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে হদিস মিলেছে মাত্র ৬৮ হাজার ডলারের। অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে জব্দ হওয়া ছয়টি ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। সেই হিসাবে ফিলিপাইনে চলে যাওয়া মোট অর্থের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ৩২ হাজার ডলারের এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হলো, কিভাবে এই অর্থ ফেরত আসবে, কতো তাড়াতাড়ি আনা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির বিষয়ে এখনো কুলকিনারা না হতেই অর্থ স্থানান্তর দিনক্ষণ নিয়ে দু’রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে এ চুরি হয়েছে ৪ ফেব্রুয়ারি বা ৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ দেশি বিদেশি তদন্ত সংস্থা প্রাথমিক তদন্তে ২৪ জানুয়ারি এ লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে। তথ্যের এ গরমিলে প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
চুরির দিনক্ষণের গরমিলের তথ্যে দু’দিনের ছুটির ফাঁদের যে কথা বলা হচ্ছে -তা সঠিক নয় বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ছুটি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। কিন্তু কাজটি যদি ২৪ জানুয়ারি (রোববার) হয়ে থাকে তাহলে ছুটির ফাঁদে পড়ার কোনো অবকাশ নেই।
ফিলিপাইনের পত্রিকা এনকোয়ারার ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই এই অর্থ চুরি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম এবং সুইফট কোড কন্ট্রোলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩০টি পেমেন্ট অ্যাডভাইজ পাঠায় ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের জন্য। আর এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এর মধ্যে ৫টি অ্যাডভাইজ অনার করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আর এই পাঁচটি অ্যাডভাইজে মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন উদ্ধারের দাবি করলেও এখনো ৮১ মিলিয়ন রয়েছে হ্যাকারদের হাতে।
এছাড়া গত ৯ মার্চ ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার জানায়, আরও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এই অর্থ দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। অবশ্য ঘটনাটি গত মাসের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকাউটেন্স অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ দু’টি বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত। ওই দুই বিভাগ দেখাশোনায় মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকও রয়েছেন। সার্বক্ষণিক এ কাজ করার জন্য তাদের বাড়তি সুবিধাও দেয়া হয়। তাহলে ছুটির দিনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে তা অবান্তর।
ঘটনা তদন্তে সরকার অবশেষে একটি কমিটি গঠন করেছে। দেখার বিষয়, সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকতার সাথে সত্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ খোয়া যাওয়ার বিষয়টিরও সুরাহা নিয়ে সংশয় তৈরি হয় বৈকি। এবারের ঘটনার উপরই নির্ভর করছে সংশয় কাটানোর, তাতে সন্দেহ নেই। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতে কি ধরনের পরিবর্তন আনেন, সেদিকে নজর থাকবে সবার। এ কথা সত্য, সরকার যথেষ্ট ব্যবস্থা না নিলে কোনো গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না।