Home » সম্পাদকের বাছাই (page 6)

সম্পাদকের বাছাই

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-৪ : ব্যয় এখনো চূড়ান্ত নয়, পরামর্শকও রাশিয়ার

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ব্যয় বলা হচ্ছে এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ১৩২০ কোটি মার্কিন ডলার)। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় চারটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। কিন্তু এটাই রূপপুর প্রকল্পের সব ব্যয় নয়। এই প্রকল্পের জন্য আরো অনেক ব্যয়ের হিসাব নিকাশ বাকি আছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুস্কাল (অন্তত ৬০ বছর) জুড়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ, স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়া, যে কোনো সময় রাশিয়ার কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া, পরামর্শক নিয়োগসহ এখনও রাশিয়ার সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন বাকি আছে। এর প্রতিটি চুক্তির সঙ্গেই আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। তবে সেই অর্থের পরিমান কত তা চুক্তিগুলো না হওয়া পর্যন্ত বলা সম্ভব নয় বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পে মালামাল সরবরাহের জন্য নতুন কিছু রেল লাইন স্থাপন, নদীপথ খনন এবং সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য উন্নত মানের সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ আনুসঙ্গিক অনেক কাজের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সব মিলে এখন পর্যন্ত যে হিসাব সংশ্লিষ্টরা করেছেন তাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্রয় হতে পারে ১৮০০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে রাশিয়ারই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রুশ সরকারের পক্ষে সে দেশের যে কোম্পানিগুলো রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাদের কাজ যথাযথ হচ্ছে কি না, প্রকল্পের যে সব ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি সেগুলো নির্ধারণে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে কথা বলা, রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চুক্তি অনুযায়ী সব যন্ত্রপাতি ও আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র দিচ্ছে কি না, এ সবই দেখবে এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হল—রাশিয়ার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজকর্ম তদারক করে রাশিয়ারই একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে বা করতে পারেব।

ব্যয়: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে মোট ব্যয় কত হওয়া উচিৎ এবং কত হচ্ছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মোট ২৪০০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সই করা চুক্তিতে ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ১২৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যয়কে বলা হচ্ছে ‘ফার্ম অ্যান্ড ফিক্সড’। অর্থাৎ এই ব্যয় আর বাড়বে না।

তবে এর বাইরে সমীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে ৫৫০ মিলিয়ন (৫৫ কোটি) ডলার ব্যয় করা হয়েছে। ফলে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩২০ কোটি ডলার। তাতে প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে ব্যয় দাঁড়ায় এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ১৩২০ কোটি ডলারের ৯০ শতাংশ (১১৮৮ কোটি ডলার) রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ঋণ হিসেবে। ঋণের সুদ হবে লন্ডন আন্ত:ব্যাংক লেনদেনের সুদের হার (লাইবর) ও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশের যোগফল। অর্থাৎ লাইবর যখন  এক শতাংশ হবে তখন এই সুদের হার হবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাধারণত: লাইবর ১ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করে। এই ঋণ পরিশোধের জন্য ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। তার পরবর্তী ১৮ বছরে সম্পূর্ণ ঋণ সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলার।

রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় ১৩২০ কোটি ডলার ব্যয় ধরেও যদি প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় (ইন্সটলেশন কস্ট) হিসাব করা হয়, তাহলে রূপপুর কেন্দ্রের জন্য তা দাঁড়ায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডলার। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় আমাদের এই অঞ্চলে রাশিয়ার তৈরি যে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে সেগুলোর। এ রকম একটি হচ্ছে ভারতের তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের ১ ও ২ নম্বর ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। এই দুটি ইউনিটে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য স্থাপন ব্যয় হয়েছে ১৩০০ ডলার।

এরপর ওই একই কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য স্থাপন ব্যয় পড়ছে তিন হাজার ডলার। ১৩০০ থেকে বেড়ে যে তিন হাজার ডলার হয়েছে তার একাধিক কারণ আছে। যেমন, গত ১০/১২ বছরে নির্মাণ সামগ্রির দাম বেড়েছে। ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বাড়ানো হয়েছে। সে জন্যই এই ব্যয় বৃদ্ধি।

কুদনকুলমের সঙ্গে রূপপুরের পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। কুদনকুলমের রিঅ্যাক্টর ভিভিইআর-১০০০ মডেলের। আর রূপপুরের রিঅ্যাক্টার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের। শুধু এই কারণে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের স্থাপন ব্যয় আড়াই হাজার ডলার বেশি হওয়া অস্বাভাবিক বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পরামর্শক রাশিয়ার: রূপপুর প্রকল্পের শুরু থেকেই পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের বাইরে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা ছিল। বলা হচ্ছিল, আমরা অনেক ছোটখাট সাধারণ প্রকল্পের জন্যও পরামর্শক নিয়োগ করি। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত একটি বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের জন্য, দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ব্যয়ের প্রকল্পের জন্য কোনো পরামর্শক নিয়োগ করছি না কেন।

তা ছাড়া, পরমাণু প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের জানাশোনাও যখন খুব কম, তখন পরামর্শক নিয়োগ করা খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তখন সরকার এ কথা কানে তোলেনি। তবে এখন, প্রকল্পের মূল নির্মাণপর্বে এসে পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘রোসটেকনাদজর টিএসও জেএসসি ভিবিও সেফটি’ নামের একটি রুশ কোম্পানিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে পাঠিয়েছে। এই কোম্পানির পরামর্শক সেবা নেওয়ার জন্য ১২ কোটি (১২০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি হবে।

কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্রের সব কিছুই করবে রাশিয়া, বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি এমনই। সে ক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ ছিল একটা স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ করা যারা আমাদেরকে আমাদের কাজে সাহায্য করবে এবং আমাদের স্বার্থ সুরক্ষা করবে। কিন্তু তা না করে আমরা নিয়োগ করেছি এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে যেটি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিরই একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাঁদের আনুগত্য কোথায় থাকবে, আমাদের প্রতি নাকি তার ‘প্যারেন্টস কোম্পানি’র প্রতি? যদি প্যারেন্টস কোম্পানির প্রতি তার আনুগত্য থাকে সে কি আমাদের সঠিক পরামর্শ দেবে? নাকি সেই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে যেটুকু দেওয়া যায় সেটুকু দেবে?

স্বতন্ত্র পরামর্শক থাকলে তাঁরা রাশিয়ানদের বলতো-এই যে তোমরা ১২৬৫ কোটি ডলার দাম নির্ধারণ করেছ এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমাদের রাশান কনসালট্যান্ট কি আমাদের সে কথা বলবে যে তোমরা বেশি টাকা দিচ্ছ? এই জিনিসগুলো হলো ‘ম্যাটার অফ এথিকস’ (নৈতিকতার বিষয়)। এই এথিকস কি অমান্য করবে? যদি না করে, তাহলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে কী ধরণের পরামর্শ সেবা পেতে পারি সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

 

 

পাকিস্তান : নেপথ্য শক্তির ঝুলন্ত পার্লামেন্ট

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, পাকিস্তান থেকে ফিরে

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয়বারেও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। ২৫ জুলাই হবে পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনের ঠিক এক মাস বাকি থাকতে বাংলাদেশ সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সাথে করাচি পৌঁছে অবাক। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন- কিছুই নেই। বাংলাদেশে নির্বাচনের সম্ভাবনা আঁচ পেলেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রপাগান্ডায় অতীষ্ট হওয়ার যোগাড় দেখে অভ্যস্ত। তার ওপর এখন বিশ্বকাপ মওসুম। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা পতাকায় মোড়া পুরো দেশ। কিন্তু করাচিতে কিছুই নেই। ওই দিন সন্ধ্যায় একটি উর্দু দৈনিকে যাওয়ার পথে গলির মুখে একটি পোস্টার দেখে স্থানীয় এক লোককে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, এটি নওয়াজ শরিফের এক প্রার্থীর। পরের দিনও করাচি ছিলাম, ঘোরাফেরা একেবারে কম হয়নি। কিন্তু আর কিছুই চোখে পড়েনি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও না। পরে ৩ ও ৪ জুলাই ঢাকা ফেরার পথে করাচিতে যাত্রাবিরতি করেছি। এবার কয়েকটি পোস্টার দেখা গেল। কিন্তু আহামরি কিছু নয়। করাচি হলো পিপিপি ঘাঁটি। কিন্তু রাজপথ অন্তত কাঁপানোর জন্য কিছু করতে দেখা যায়নি।

তবে টেলিভিশন ছিল সরব। নির্বাচনের খবরই প্রায় পুরো সময় প্রচারিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা উপস্থিত আছেন পর্দায়, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও প্রচার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসা করলে তারাও জবাব দিচ্ছেন সাবলীলভাবে।

তবে সরকার গঠন করবে কোন দল তা নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে। বছর খানেক আগে মনে হচ্ছিল, নওয়াজ শরিফ অবলীলায় জিতে যাবেন। কিন্তু পর্দার অন্তরাল থেকে ঘুঁটি চালে তিনি পর্যুদস্ত। গত সপ্তাহে আরেক মামলায় তাকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী যুদ্ধের বদলে তাকে জেলের ঘানি টানতে হবে।

নওয়াজ শরিফ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, অন্তত নির্বাচন পর্যন্ত যাতে দুর্নীতির মামলার রায় আটকে রাখা যায়; কিন্তু হয়নি। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো লন্ডনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় মামলায় তাকে সাজাই দিয়েছে। তার মেয়ে মরিয়মকে দেওয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদন্ড । নওয়াজ শরিফকে আগেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদচ্যুত করেছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তখনই তাকে সব ধরনের সরকারি বা রাজনৈতিক পদে থাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এবার তার কারাদন্ড  হলো।

এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেশ বিপাকেই পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও বেশ বড় ধরনের ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। তার স্ত্রী কুলসুম ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি লন্ডনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশে ফিরে তাকে কারাগারেই যেতে হয়েছে; মেয়ে মরিয়মকেও যেতে হয়েছে কারাগারে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ‘জিহাদ’ শুরু করেছে, তার প্রথম বড় ধরনের শিকার হলেন নওয়াজ শরিফ। পানামা গেট নামের যে মামলায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তাতে তিনি বরখাস্ত হবেন, তা কেউ ভাবতে পারেনি। বরং দ্বিতীয় মেয়াদে যখন জয়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনার মুখে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছিল।

পাকিস্তানের রাজনীতির জন্য এটি বড় ধরনের একটি ঘটনা। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে দলীয় প্রধানকে এমন জটিলতায় ফেলা মানে ওই দলের সম্ভাবনা বেশ কমে যাওয়া। নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগের (এন) বেলাতেও তা-ই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি পদচ্যুত হয়েছেন, কারাদন্ডের শাস্তি পেয়েছেন বলেই নয়, আরেকটি কারণেও দলটির অবস্থা নাজুক। যেই মাত্র তিনি বরখাস্ত হয়েছেন, সাথে সাথে তার দলের অনেক সদস্য অন্য দলে যোগ দিয়েছেন। বড় অংশ যোগ দিয়েছেন ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফে (পিটিআই)।

এই মুহূর্তে ইমরান খানই এগিয়ে আছেন। যে দুর্নীতির মামলায় নওয়াজ সাজা পেয়েছেন, সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্যই তার সেরা অস্ত্র। অনেকেই মনে করছে, এবার তার কাছে এসেছে সুবর্ণ সুযোগ। ১৯৯২ সালে যেমন সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, এবারো তিনি চমক দেখাবেন। তিনিই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশে কি জনপ্রিয়তা কিংবা দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় আসা যায়? সম্প্রতি পাকিস্তান সফরকালে কিছু অন্য ভাষ্যও পাওয়া গেছে। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনার কথাই বিশ্লেষকদের মন্তব্যে ওঠে এসেছে।

পাকিস্তানের সুপরিচিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল জোর দিয়েই বললেন, নওয়াজ শরিফ বা ইমরান খান- কারো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। সে ক্ষেত্রে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি। আর ওই সরকার গঠন করতে পারেন নওয়াজ শরিফ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা চৌধুরী নিসার কিংবা সদ্য বিদায়ী বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী মির আবদুল কুদ্দুস বিজেনজো।

একই ধারণা পোষণ করেন করাচিভিত্তিক উর্দু দৈনিক র্ফাজের এডিটর ইন চিফ মুখতার আকিলও। স্বতন্ত্র সদস্য হয়েও যেভাবে মির আবদুল কুদ্দুস বেজেনজো বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি সম্ভবত ওই ঘটনাকে পুরো পাকিস্তানের জন্য টেস্ট কেস হিসেবে দেখছেন।

উল্লেখ্য, নওয়াজের পতনের সাথে সাথেই চৌধুরী নিসার দল ত্যাগ করেছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে দেশটির রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের প্রবল ধারণা। একই কথা প্রযোজ্য বেজেনজোর ব্যাপারেও।

তৃতীয় পক্ষ যে ক্ষমতায় আসছে, তা করাচি, ইসলামাবাদ ও লাহোরে বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তবে তারা তা করেছেন পরিচয় না করার শর্তে। তাদের অভিমত, ইমরান খান প্রচার-প্রপাগান্ডায় যতই এগিয়ে থাকুন না কেন, তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না। নওয়াজ শরিফের পক্ষেও সম্ভব হবে না পুরো পাকিস্তান থেকে সমর্থন জোগার করা। ফলে নির্বাচনের পর নিসার বা বেজেনজোদের কেউ দল গঠন করে সরকার চালাতে পারেন। আর তাদের সহায়তায় আসতে পারে পর্দার অন্তরালে থাকা কোনো গ্রুপ।

তবে নওয়াজের দল কিংবা ইমরান খানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাপারে আশাবাদী লোকের সংখ্যাও কম নয়। লাহোর যাওয়ার পথে ইসলামাবাদ বাস স্টেশনে কথা হলো দুবাই প্রবাসী তানভির তাহিরের সাথে। তিনি জোরালোভাবে বলছেন, ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি অবশ্য স্বীকার করলেন, পাঞ্জাব হলো শরিফদের ঘাঁটি। এখানে তাদের হারানো কঠিন। তবে এখান থেকে ইমরান যদি ৫০ ভাগ আসনও পান, তবে তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। অন্য কোনো প্রদেশে শরিফরা ভোট পাবেন না। শরিফদের দুর্নীতির কথা তিনিও জোরেসোরে জানালেন। তার মতে, এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন কেবল ইমরান খান। তিনি জানান, তাদের মতো লোকজন বিদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান, সেই অর্থ নওয়াজদের মতো লোকজন বিদেশে পাচার করে দেন।

কিন্তু সেই পাঞ্জাবই অন্য সবার দুশ্চিন্তার বিষয় আর শরিফদের জন্য স্বস্তির কারণ। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা ৩৪২। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন হয় ১৭২টি। এক পাঞ্জাবেই আছে ১৭৪টি আসন। বাকিগুলোর মধ্যে সিন্ধুতে ৭৫, খাইবার পাকতুন খাওয়ায় ৪৮টি, বেলুচিস্তানে ২০টি, ফাটায় ১২টি, কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ৩টি।

শরিফের দল যদি পাঞ্জাবে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে তবে অন্যান্য প্রদেশ থেকে সামান্য কিছু সমর্থন নিয়ে তারা শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। যে শক্তিটি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে, তারা তাদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে।

লাহোরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফয়সালও এই বক্তব্য সমর্থন করলেন। তার মতে, সহানুভূতির ভোট শরিফদের পক্ষেই যাবে। নওয়াজ শরিফের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, তিনি একটি প্রভাবশালী মহলের শিকার হয়ে অপদস্থ হচ্ছেন। এটিই পরিণামে তাকে ফিরিয়ে আনব। আর পক্ষত্যাগ পাকিস্তানের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। সবসময়ই হয়। তবে পক্ষত্যাগীরা ব্যতিক্রম ছাড়া ভালো করতে পারেন না। আবার যে দলে তারা যোগ দেন, তাতেও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

ইসলামাবাদে সামা টিভির ব্যুরো চিফ খালিদ আজিম চৌধুরীও মনে করেন, নওয়াজ শরিফের দল আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অন্যরা যতই লাফালাফি করুক, শেষ পর্যন্ত পারবে না। অবশ্য চূড়ান্ত রায়ের জন্য ২৫ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে অনেক হিসাবই পাল্টে যেতে পারে।

হতাশার কাছে হার মানা খুব সহজ কাজ: নোয়াম চমস্কি

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। ভারতের ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় অংশ এখানে প্রকাশিত হলো।

প্রশ্ন : আপনি আর অ্যাডওয়ার্ড এস. হারম্যান ১৯৮৮ সালে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে আপনারা জোরালোভাবে প্রমাণ করেছেন যে, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। অবশ্য আপনার প্রকাশনার পর মিডিয়া জগতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে খবর ও তথ্যে ঐতিহ্যবাহী একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই কমে গেছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো ‘স্বাধীনতার’ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। মিডিয়ার দৃশ্যপটে পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

নোয়াম চমস্কি : বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। এতে দেখানো হয়, কিভাবে গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন শ্রেণির জন্য সম্মতি নির্মাণ করে। আমরা ২০০২ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করি। ততদিনে ইন্টারনেট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু আমরা পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে করিনি। আমরা সম্প্রতি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি, তবে তেমন কোনো পরিবর্তনের গরজ অনুভব করিনি। অবশ্যই অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মিডিয়ার কর্মসম্পাদন দক্ষতায় প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রাতিষ্ঠানিক উপাদানগুলোতে মনে হচ্ছে- বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মূলধারার মিডিয়া তাদের সব সুবিধা ও ত্রুটি সত্ত্বেও এখনো খবর ও তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে বহাল রয়েছে।

যারা উদ্যোগ নেয়, কেবল তাদের জন্যই ইন্টারনেট বিপুল মাত্রার উৎসে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে। গবেষণার জন্য এটি বেশ সহায়ক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিস্তৃত তথ্য ও অভিমত জানার সুযোগের ফলে ব্যাপক জ্ঞানার্জন ও উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারে- এমন ইঙ্গিত সামান্যই পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে তা থেকে সুবিধা গ্রহণও প্রয়োজনীয় বিষয়। তাছাড়া প্রায়ই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক বিস্তৃত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বদলে যা শুনতে আগ্রহী তাতেই সীমাবদ্ধ থাকার কৃত্রিম স্বস্তিদায়ক এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করাও সহজ মনে হয়।

প্রশ্ন : বেশ কয়েকটি ল্যাতিন আমেরিকান দেশে বাম শক্তিগুলো নির্বাচনী পরাজয় ও নানা ধরনের বিপর্যয়ে পড়েছে। ল্যাতিন আমেরিকায় বাম আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই এমনটা ঘটেছে? ল্যাতিন আমেরিকায় বামদের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে অনেক স্থায়ী অর্জনও আছে এবং আগের চেয়ে তা অনেক ভালোও। ইতিহাস অগ্রগতি ও প্রত্যাগতি লিপিবদ্ধ রাখে। তবে সাধারণ অগ্রগতি রয়েছে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত পরিভাষাটি ধার করে বলতে পারি যে. ন্যায়বিচারের পথে চলতে ইতিহাসের বাঁক নির্মাণ করতে পারি আমরা। হতাশার কাছে হার মানা ও সবচেয়ে খারাপটি ঘটানোকে নিশ্চিত করতে সহায়তা করা খুব সহজ কাজ। বিচক্ষণতা ও সাহসের পথ হলো প্রাপ্য বিপুল সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে তাদের সাথে যোগ দেওয়া যারা আরো উন্নত দুনিয়া নির্মাণের জন্য কাজ করছে।

প্রশ্ন : পূর্বসূরিদের বিপরীতে গিয়ে পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বে প্রভাব ফেলছে এমন নানা আর্থ-সামাজিক ইস্যু নিয়ে অত্যন্ত প্রগতিমূলক অবস্থান গ্রহণ করে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। আমরা জানি যে. আপনি প্রকাশ্যে ঘোষিত নাস্তিক। পোপতন্ত্রের সাথে আপনার আদর্শগত পার্থক্য যাই হোক না কেন, পোপ ফ্রান্সিস সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? আপনি কি আশা করেন, তার ব্যক্তিগত অবস্থান ক্যাথলিক চার্চের গোঁড়ামিতে পরিবর্তন আনবে?

নোয়াম চমস্কি  : অতীত নিয়ে আমি তেমন একমত নই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পোপ ত্রয়োদশ জনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশংসনীয় রেকর্ড ছিল। পোপ ফ্রান্সিসও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রশংসনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ফলে আমি মনে করি, চার্চের ওপর তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি আশাবাদী।

(অসমাপ্ত)

বাংলাদেশে আসছেন জিকো

বুধবার প্রতিবেদন ::

জিকো। পুরো নাম আর্থার আনতুনেস কোইম্ব্রা। তবে সাদা পেলে নামেই তিনি ফুটবল ফ্যানদের কাছে পরিচিত। ব্রাজিল ও বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন তিনি। সেই তিনিই বাংলাদেশে আসছেন। আর তার বাংলাদেশ সফরের আয়োজন করছে ঢাকাস্থ ব্রাজিল দূতাবাস।  আগামী মাসে  তিনি আসতে পারেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ৬৫ বছর বয়স্ক এই ফুটবলারের বাংলাদেশে আগমন হবে আমাদের ফুটবলের জন্য বিরাট এক ঘটনা। অ্যাটাকিং এই মিডফিল্ডার তার দুর্দান্ত টেকনিক্যাল দক্ষতা, ভিশন আর গোলের নেশার জন্য এখনো ফুটবল ফ্যানদের মধ্যে স্বপ্ন-পুরুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকের ও ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন ওই সময়ের সেরা খেলোয়াড়। বিশেষ করে ফ্রি কিকে তার দক্ষতা কিংবদন্তিসম খ্যাতি রয়েছে। বলকে তিনি সব দিকেই বাঁক খাওয়াতে পারতেন। তবে দুর্ভাগ্য তিনি বিশ্বকাপ জয় করতে পারেননি। প্রায় সবার ধারণা ছিল ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ব্রাজিলই জিতবে। জিকো ছাড়াও যে দলে ফ্যালকাও, সক্রেটিস, এদার, সেরেজো ও জুনিয়র রয়েছে, ওই দল কি বিশ্বকাপ জয় না করে পারে? কিন্তু পারেনি। দ্বিতীয় রাউন্ডেই তারা বিদায় নিয়েছিলেন পাওলো রসির ইতালির কাছে ২-৩ গোলে হেরে। বিশ্বকাপ জয় করতে না পারা সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় প্রায়ই জিকোর নাম দেখা যায়।

জিকো কেবল খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, কোচ হিসেবেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। সেই জিকো আসছেন বাংলাদেশে।

এবারের বিশ্বকাপ নানা কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখানকার লোকজন বরাবরই প্রধানত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক। বিশ্বকাপের মওসুমে বিভিন্ন দেশের, প্রধানত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের, পতাকা বাংলাদেশ ছাডা আর এভাবে কোথায় ওড়ে না । যেসব দেশে বিশ্বকাপ হয়, ওইসব দেশেও নয়।

এবারের বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে আর্জেন্টিনা ও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ব্রাজিল বাদ পড়ায় ফ্যানরা হতাশ হয়ে পড়েন। তবে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জোয়াও তাবাজেরা অলিভেইরা ডি জুনিয়র মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্রাজিল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উচ্ছাস ও মাতামাতি বেশ উপভোগ করেছেন। ব্রাজিলের প্রতি এখানকার মানুষের সমর্থন তার কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। এটিই তাকে ব্রাজিলের ফুটবলকে বাংলাদেশের আরো কাছে আনতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এবারের বিশ^কাপে সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ন্যায্য দাবি নিয়ে আক্রান্ত তরুণেরা

আনু মুহাম্মদ ::

কোটা সংস্কারের আন্দোলন তৈরি হয়েছে কাজের খোঁজে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। কাজ না করে চাঁদাবাজি বা অপরাধ করে জীবিকা অর্জনের পথে তারা যেতে চায় না। তারা মেধা ও যোগ্যতায় নিজেদের তৈরি করতে পারবে, তার ভিত্তিতে কাজ পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে এটাই তাদের দাবি। সরকার পক্ষ বারবার এই দাবিকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করেছে, অপপ্রচারের পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে। এই দাবি জানাতে গিয়ে তারা যখন সরকারের ভয়ংকর রোষের শিকার হয়, যখন পুলিশ- ছাত্রলীগের আঘাতে জর্জরিত হয় ন্যায্য দাবি জানানো সাধারণ শিক্ষার্থীরা, তখন সেই আঘাত প্রতিটি নাগরিকের ওপরই এসে পড়ে। স্পষ্ট হয় শিক্ষা ও জনস্বার্থের প্রতি সরকারের বৈরী  ভূমিকা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বেকারত্বের হার বেশ কম, শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকেও কম। সর্বশেষ ‘শ্রমশক্তি জরীপ ২০১৬-১৭’ অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ, গত বছরের তুলনায় বেকারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ লাখ। প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা অনেক বেশি। কাজ পেতে আগ্রহী কেউ সপ্তাহে একঘন্টা কাজ করলেই যদি কর্মরত বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বলতে হবে বাংলাদেশ এখন পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরে আছে! কারণ বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কর্মসন্ধানী সবাই কিছু না কিছু উপার্জনমুখি বা উপার্জন বিকল্প কাজ করে। সাধারণত কর্মসময় ১৫ বছর বয়স থেকে ৬৫ বছর ধরা হলেও বাংলাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কাজ শুরু হয় ৫-৭ বছর থেকেই, আর তা অব্যাহত থাকে (যদি বেঁচে থাকতে পারেন) ৬৫ বছরের পরেও। এদেশে যারা নিজেদের শৈশবকে শৈশব হিসেবে পার করতে পেরেছেন তারা বিশেষ সুবিধাভোগী।

বেকারত্বের সংকীর্ণ সংজ্ঞা দিয়ে কর্মসংস্থান মাপা খুবই বিভ্রান্তিকর। কর্মঘন্টা, ধরন, আয়, নিশ্চয়তা এগুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। প্রবাসে প্রায় এক কোটি মানুষ কাজ করেন। তারপরও দেশে কাজের পরিমাণগত ও গুণগত অবস্থা ভালো নয়। কৃষিখাতের অনুপাত কমেছে, কর্মসংস্থানেও। কিন্তু শিল্প কারখানা খাতের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে পরিসেবা খাত। সেখানে স্থায়ী নিরাপদ কাজের সুযোগ খুবই কম। তাই অপ্রতিষ্ঠানিক কাজ, স্বকর্মসংস্থানেই বেশির ভাগ মানুষের নির্ভরতা। সরকারি সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরীপ অনুযায়ী দেশে কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এসব ক্ষেত্রে কাজের কোনো স্থিরতা নেই, আয় তুলনামূলক ভাবে অনেক কম, নিরাপত্তাও কম। স্নাতক  পর্যায়ের শিক্ষা নিয়েও অনেককে এ ধরনের কাজই খুঁজতে হচ্ছে। দোকান, মোবাইল, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, টিউশনি, কোচিং সেন্টার, অনলাইন বিভিন্ন সার্ভিস, কুরিয়ার, পরিবহণ, বিক্রয় প্রতিনিধি সহ এজেন্ট হিসেবে কাজ এগুলোই এখন শিক্ষিত তরুণদের কাজের এলাকা। ব্যাংক, এনজিও, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বিশেষ আগ্রহের জায়গা। সবচাইতে গুরুত্ব পাচ্ছে এখন বিসিএস ক্যাডার।

সচিব, যুগ্মসচিবসহ উচ্চ পদগুলোতে সংখ্যার তুলনায় নিয়োগ বেশি হলেও প্রয়োজনীয় নিয়োগে সরকারের অনীহা প্রবল। সর্বজন (পাবলিক) স্কুল কলেজে বহু হাজার পদ এখনও খালি। সরকারের বাজেট ক্রমশ বেড়ে যায়, অভূতপূর্ব উচ্চ ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেয় সরকার, কিন্তু প্রয়োজনীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে বলে টাকার অভাব। এসব পদপূরণ যে শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিরোধ করবার জন্যই যে দরকার সে বোধটুকু সরকারের মধ্যে দেখা যায় না। সরকার একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ করতে গেলে বলে অর্থ নেই। বছরের পর বছর কলেজগুলোতে পদ শূণ্য, শিক্ষক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ না করেই পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। বহু প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকের অভাবে ঠিকমতো ক্লাশ হয় না।

অন্যদিকে প্রায় ক্ষেত্রেই মেধা বা যোগ্যতার সাথে কাজ পাবার সম্পর্ক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে চাকুরির কথা উঠলেই ‘কতো টাকা’ লাগবে এই প্রশ্ন নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।  অদ্ভূত নৈরাজ্যে বা বাজারী সমাজের মধ্যে পড়েছি আমরা। নিয়োগের সময় মেধা বা যোগ্যতার চাইতে কে কত টাকা দিতে পারবে সেই প্রশ্ন ওঠে। চাকুরি এখন কিনতে হয়। যে টাকায় কেনা, তার চাইতে বেশি টাকা তোলার চেষ্টা তাই অনিবার্য। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের এসব জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখতে হয় নিয়মিত। এদেশে যোগ্যতা অর্জন কঠিন, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া আরও কঠিন।

বিসিএস ক্যাডারের বিষয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ তরুণদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে আগের যেকোন সময়ের চাইতে বেশি। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক কলেজ শিক্ষার্থীদের এখন প্রধান ব্যস্ততা। স্নাতক উত্তীর্ণ হবার অনেক আগে থেকে এই বিষয়ে পড়াশোনাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ স্থায়ী নিরাপদ কর্মসংস্থানের আর কোনো ক্ষেত্র নেই।কিন্তু এতো ভরসা যার উপর সেখানে কোটার প্রতিবন্ধকতা দিনে দিনে ক্ষোভ বৃদ্ধি করেছে শিক্ষার্থীদের।

খুবই স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কোটা নিয়ে আলোচনা কারণ শতকরা ৫৬ ভাগের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য (এখন নাতি নাতনি যোগ হয়েছে)। এ বিষয়ে তাই কথাবার্তা খুব না হলেও ক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়েছে। এবারই তার বহি প্রকাশ ঘটেছে বেশি। স্পর্শকাতর হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানের কথা বিবেচনা করেই এ বিষয়ে কথা বলা উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো থেকেই আলোচনা হওয়া দরকার বেশি। এই আন্দোলনের প্রথম দিকে, ২০১৩ সালেই কেউ কেউ বলেছেন। বাবা মা উভয়েই মুক্তিযোদ্ধা, এরকম একজন সন্তান তানিম আহমেদ তখনই এতোটা কোটা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। বলেছেন, কোটার সুবিধা দেয়া হয় অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য। মুক্তিযোদ্ধারা অনগ্রসর নয়। https://opinion.bdnews24.com/2013/07/13/freedom-fighters-quota-a-son-explains-his-burden/

লায়লা হাসিন আমার ছাত্রী, এখন বিভাগে সহকর্মী। মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে লায়লা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, কখনও বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কোনো সুবিধা নিতে চাইনি। বাবা আমাকে যোগ্য করে তুলেছেন, নিজের যোগ্যতার বলেই এ পর্যন্ত এসেছি। আমার সন্তানদের  আমি কোনো করুণার বস্তুতে পরিণত করতে চাই না। ওরা নিজেদের যোগ্যতা বলেই নিজেরা যতদূর যেতে পারে যাবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার, একজন শহীদের, নির্যাতিত মানুষদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে অবদান তাতে তাঁদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের ঋণ পরিশোধযোগ্য নয়। কিন্তু সেই মানুষদের তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ। শহীদদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই খন্ডিত। এগুলোর জন্যও সরকারের সাথে যেরকম যোগাযোগ ও চুক্তির ক্ষমতা লাগে, সেটা কজন মুক্তিযোদ্ধার আছে? কটি শহীদ পরিবার সে পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে? তারফলে গ্রামে প্রামে, শহরে বন্দরে এমন অনেক পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ ত্যাগ করে, সর্বোচ্চ লড়াই করেও পরে নিগৃহীত, বঞ্চিত হয়েছেন। শহরের সুবিধাভোগী পরিবারের কেউ কেউ এই পরিচয় নিয়ে নানাভাবে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারলেও শ্রমিক, ক্ষেতমজুরসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।  সরকার যদি সমস্যাজর্জরিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যথাযথভাবে যোগ্য করে তুলতে  ভূমিকা পালন করতো তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সম্মানজনক হতো।

মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে এখনও বির্তক এবং প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। এতো বছরেরও মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, যুদ্ধাপরাধী তালিকা সম্পূর্ণ হয়নি। আর তার কারণে সরকার বদলের সাথে সাথে তালিকার পরিবর্তন ঘটে। এক সরকারের অধীনেও বদলাতে থাকে। এখনও মাঝে মধ্যে পত্রিকায় খবর আসে রাজাকারের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়, ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে উচ্চ পদে আসীন। ক্ষমতাবানদের স্পর্শ থাকলে যে রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় তার প্রমাণ আমরা বহু পেয়েছি।

কোটা পরিচয় নিয়ে বর্তমানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানেরা তাই বড় যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। করুণা নয়, সম্মান তাঁদের প্রাপ্য। সরকার যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অনুপাত শতকরা ৩০ ভাগ করেছে, সন্তানের পর এখন নাতি পুতি পর্যন্ত কোটা সম্প্রসারিত করেছে এটা কি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসার জন্য, তাদের প্রতি দায়বোধের জন্য? বাস্তব পরিস্থিতি তা বলে না। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায় যে, সরকার এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাবানদের বেশি বেশি কোটা রাখার আগ্রহ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা নিজেরা নিজেদের পছন্দমতো লোকজনকে চাকুরি দিতে পারে, সুবিধামতো নিয়োগ বাণিজ্য করতে পারে। সেজন্য ভুয়া সার্টিফিকেট এর জোয়ারে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর তাদের সন্তাননেরাও ভেসে যাচ্ছে। অলিখিত প্রবল একটি কোটা এখন অন্যসব কোটা পরিচালনা করছে সেটা হল ‘সরকারি দলের কোটা’। কোটা সংস্কারের পাশাপাশি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ- ‘সরকারি দলের কোটা’ বা দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের উৎস দূর করা।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির ও ভিতর ব্যাপারটা প্রথমেই পরিষ্কার করে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির বলতে, যা কিছু প্রকাশিত, ঘোষিত এবং প্রতিটি পক্ষই নিজের বক্তব্য মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভিতরের ব্যাপারটা অতটা প্রকাশিত নয়, কেউ বললেও প্রত্যাখান করছেন বা নিরব থাকছেন। আমরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যা কিছু গণমাধ্যমে পাচ্ছি সেটা বেশিরভাগ বাইরের রূপ। দ্বন্দ্বের বাইরের রূপটা মিথ্যা বা অসত্য বলছি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেতরের বিষয়টা প্রকাশিত ও জানা না গেলে দ্বন্দ্বটা পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবেনা। ভিতরের সত্য ঘিরে সব যুগে রহস্য থাকে। আমরা যাকে রাজনৈতিক গসিপ বলি তা দ্বন্দ্বের ভিতরের উপাদান ঘিরে। কিন্তু এটাও ঠিক চলতি রাজনৈতিক ধারায় ও ভিতরের সত্য জানার ও উদঘাটনের প্রচেষ্টা আছে। স্ট্রিং অপারেশন সেরকম একটি প্রচেষ্টা। স্ট্রিং অপারেশন এর মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যমে ও শাসকদলের মধ্যে অর্থের বিনিময় সহযোগিতার করার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রিং অপারেশন বাইরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার – রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতরে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হচ্ছে; সময় ও ইতিহাস ভিতরে সত্যটা তুলে ধরে। ভিতরের সত্য অনুসন্ধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দর্শণ গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরের বিষয় বলতে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ক্ষেত্রে নয়া উদারনৈতিক, রক্ষণশীল, কর্তৃত্ববাদী দর্শনের পার্থক্যের কারণে ভিতরের বিষয় ব্যাখা বিশে¬ষণে পার্থক্য হয়। বলা হয়ে থাকে কোন চোখ থেকে দেখছি। এ চোখ তৈরী হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তি ও শ্রেণী স্বার্থে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়, দেখার চোখ এক হয়না। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনীতির বাইরের ও ভেতরের বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বাইরের বিষয়গুলো অর্থাৎ নিবার্চন ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; এর ভিতরের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা ও রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন আনার বহুমুখী কৌশল।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহিরের দিকটায় রূপান্তর হয়েছে- এখন জোরেশোরে উন্নয়নের নামে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর শুরু ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন থেকে। এ নির্বাচনকে প্রতি-নির্বাচনই (Counter Election)  বলবো। নির্বাচনকে নির্বাচন দিয়ে ধ্বংস  না করা হলেও এর ক্ষয় করা হয়েছে। ১৫৪ জন সাংসদ প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন; এধরনের একটি নির্বাচনের বৈধতা অর্জন দেশে বিদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শাসকদলে। কিন্তু শাসকদল গিনেস বুক রেকর্ড তৈরী করে এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সব প্রশ্নকে নিঃশেষ করতে সফল হয়েছেন।

শাসকদল এমন একটা অবস্থা তৈরী করলেন, নির্বাচন কিভাবে হয়েছে সেটা বড় কথা নয়- দেশ কিভাবে চলছে দেখুন, দূর্বল নয়, শক্তিশালী’র শাসন। শক্তিশালী শাসক ও শাসন আপনাকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পৌঁছে দেবে- এভাবে কারো ধারণা থেকে নয়, শাসকদের অন্তর্গত দর্শণ থেকে বেরিয়ে আসে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে সকলে যে যার কাজ করতে পারবেন, তবে কেউই সীমা লংঘন করতে পারবেন না, সীমা লংঘন করলেই শাস্তি ও বিতাড়ন। সীমার মধ্যে থাকলে শান্তি ও পুরষ্কার। মিলিয়ে দেখুন প্রধান বিচারপতি যতদিন সীমার মধ্যে ছিলেন, পুরষ্কার পেয়েছেন, যখনই সীমা লংঘন করেছেন তখনই ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। খালেদা জিয়া যখন আন্দোলন পরিহার করে ব্যক্তিগত দলীয় জীবন যাপন করেছেন, তখন বড় কোন শাস্তি ছিলনা, কিন্তু খালেদা জিয়া উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের হুমকি হতে পারেন, তখনই ভিন্ন পরিস্থিতি। তাদের মনোবাসনা, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে ‘‘তাদের নির্বাচন’’ উন্নয়নের অন্তরায় না হয়। কাজেই ৫ই জানুয়ারী-২০১৪ এর মতো অতোটা নয়, ২০১৮/১৯ এর পোষাক পড়িয়ে ভদ্র নির্বাচন করা, যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করবে, সাংসদ নির্বাচিত হবেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বর্তমান শাসক দল ও সরকার গঠন করবেন তারা-এটাই ভাবনা। বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরের চেহারাটা এরকমই দাড়িয়েছে।

ভিতরটা বোঝার মত তথ্য উপাত্ত কম। দ্বন্দ্বের ভিতরটা পরিষ্কার নয়, বিরোধী দলের কাছে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে  খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন না আন্দোলন? এর মধ্যে আন্দোলনের কোন ঈঙ্গিত নাই, দানা বাঁধেনি আন্দোলনের বিষয়; আন্দোলনের খতম। এখানে প্রশ্ন দাড়িয়েছে নির্বাচন হবে, না নির্বাচন বয়কট। শ্লোগান কী হবে- খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন হবে না।

দ্বন্দ্বের ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে, কিভাবে শাসকদলে বৈরিতা করছে, করবে? নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় শক্তির সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে সরকারী কর্মচারীদের আগাম পুরস্কৃত করা হচ্ছে, গত দু’আমলে একদল উপকারভোগী তৈরী হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সফল যাত্রা শুরু হবে কি? রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এখন বর্তমান বাইরের ও ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। আপাতত: সকল অনুগত, সকল নিয়ন্ত্রিত নাগরিক কিন্তু সকলের চিন্তা, মনন প্রক্রিয়া, রাগ হিংসা নিয়ন্ত্রন পরিধির বাইরে থেকে যায়, এখানেই ভয়। এই ভীতি  শুধু যে শাসকদলের তাই নয়, জনগণেরও। কারণ চাপা রাগ-হিংসা বিষ্ফোরণ খুবই বিপজ্জনক হয় সকলের জন্যই।

 

 

শিষ্টাচার মিথ্যাচার অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু:

এক. মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিনে সাড়ে ছয়টা মিথ্যা কথা বলেন! অবাক হচ্ছেন তো? তথ্যটি ওয়াশিংটন পোষ্টের একটি জরীপের। তাদের হিসেব অনুযায়ী ক্ষমতারোহনের ৪৬৬ দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৩ হাজার ১টি মিথ্যা বলেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনের গড় ৬ দশমিক ৪। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১’শ দিনে তার মিথ্যা বলার হার ৪ দশমিক ৯। কিন্তু গত এপ্রিল-মে মাসে এই হার বেড়েছে দ্বিগুন। অর্থাৎ দিনে ৯টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনের পোষ্টের পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, অনেক মিথ্যা আছে যা তিনি বারবার বলছেন। এরকম ১১৩ টি মিথ্যা রয়েছে – যা ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন। উপসংহারে বলা হয়, শাসনকাল যত পুরানো হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের মিথ্যা বলা তত বাড়ছে। সিএনএন ভাষ্যকার ক্রিস সিলিজার জানাচ্ছেন, ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলেন এমন কোন প্রেসিডেন্ট আমেরিকায় আগে কখনও ছিলেন না। জর্জ বুশ বা বারাক ওবামা দিনে কতবার মিথ্যা বলেছেন তার হিসেব কেউ রাখেনি। কারন ট্রাম্পের মত তারা কেউ মিথ্যা বলতে এবং সেই মিথ্যা বারবার আওড়াতে অভ্যস্ত ছিলেন না।

ট্রাম্প যা বলেছেন তার মধ্যে মিথ্যা আবিস্কৃত হচ্ছে এবং গণমাধ্যম তা জানিয়ে দিচ্ছে। কারন সে দেশে রয়েছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের দায়। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি প্রেসিডেন্টের মিথ্যাকেও সনাক্ত করার সক্ষমতা  পেয়েছে। গণতন্ত্র চর্চার ফল হিসেবে গণমাধ্যম সত্য সংবাদ পরিবেশনে কাউকে পরোয়া করছে না। বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের মধ্যে প্রতিষ্ঠানসমুহ দুর্বলতর হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। বিপরীতে কর্তৃত্ববাদ প্রধান হয়ে উঠেছে।

এখানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র যেহেতু সবসময় ব্যক্তিমুখীন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলিও ব্যক্তির মুখের দিকে চেয়ে  বলতে ও চলতে অভ্যস্থ। শক্তিমান নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ এবং জনস্বার্থের বদলে এখন ব্যক্তি ও দলকে সন্তষ্ট করার সাংবাদিকতা সবকিছু ছাপিয়ে উঠছে। ফলে শীর্ষ ব্যক্তিদের কথিত সত্যভাষণ জনমানুষকে খুশি করছে না ব্যথিত করছে-এই প্রশ্ন গণমাধ্যম তুলতে সক্ষম নয়। বরং তারা সামিল হয়েছেন, ক্ষমতার সাথে ইদুর-বেড়াল খেলায়। রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতা ও স্থিতিশীলতার অভাবই কী এইসব রাজনৈতিক-সামাজিক মনোবৈকল্যের কারন?

দুই. প্রাচীন কবিরা বলে গেছেন, “যে কহে বিস্তর, মিথ্যা কহে বিস্তর”। আবার চালু প্রবাদটি হচ্ছে, “কথায় কথা বাড়ে”। সেসব কথার কতটুকু সত্য-কতটুকু মিথ্যা তাও বিবেচনা ও প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের রাজনৈতিক নেতারা কথা বলতে ভালবাসেন। এমনকি সেসব কথা দল বা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও পরোয়া নেই। কথা বলতেই হবে। জনগনও কথা শুনতে ভালবাসে। শীর্ষে যারা থাকেন তাদের কথা মানুষ শোনে আগ্রহভরে। কারন কথামালার রাজনীতি এখানে জনপ্রিয়। নেতা কম কথা বলবেন এটি প্রত্যাশিত নয়। আর সরকার প্রধান বা দলপ্রধান হলে তো কথাই নেই!

রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক বিষয়ে মনোভাব বোঝা যায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য থেকে। প্রধানমন্ত্রী সবশেষ সংবাদ সম্মেলন করেছেন গত ২ মে ২০১৮ তারিখে। সেখানে তিনি কথা বলেছেন, সাম্প্রতিককালের বেশকিছু স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে, বেশ খোলামেলাভাবে। তিনি কথা বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, সড়ক দুর্ঘটনা, আগত জাতীয় নির্বাচন এবং স্বভাবতই প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার কারাদন্ড নিয়ে। বলেছেন আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা নিয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার বলেছেন,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেলো তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)।

তিন. প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি  চুড়ান্ত সত্য ! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কি রাজীবের হাত হারানো এবং অন্তিমে মৃত্যু কিংবা গৃহকর্মীর পা হারানোর মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হয়েছে রাজীবকে। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

দেরী করেননি নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেই ফেলেন “সড়ক পথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, আবার কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলো: ৫ মে ২০১৮)।

অতিসম্প্রতি ঢাকায় একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি চাপায় একজন নিহত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে সংসদ সদস্যের পুত্র গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সেটি অস্বীকার করতে গিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে ঐ সংসদ সদস্যের স্ত্রী, যিনি একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, যা বলেছেন তা প্রধানমন্ত্রীর কথারই প্রতিধ্বনি মাত্র। তিনি দাবি করেছেন, পথচারী সতর্ক না হলে ড্রাইভারের কি করার থাকতে পারে!

চার. গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

‘ন্যাশনাল কমিটি টু প্রোটেক্ট শিপিং, রোডস এ্যন্ড রেলওয়ে’ নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপোরোয়া গাড়ি চালনা। ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ক্রুটিপূর্ণ  যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

এবারের ঈদযাত্রায় ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় অপ্রতিরোধ্য গতি পেয়েছে দুর্ঘটনার মৃত্যু। শুধু সড়কে নয়, রেলপথ-নৌপথ, কল-কারখানা সর্বত্রই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায় না, কারন তারা সংগঠিত। এসব সংগঠনের সাথে ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ ব্যক্তিরা যুক্ত থাকে, সমর্থনও থাকে। কোন ব্যবস্থার সূচনা ঘটলেই ধর্মঘট, অবরোধসহ দেশকে তারা জিম্মি করে ফেলে।

সরকারপক্ষ, যখনই যারা ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক-ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে পরিবহন সেক্টর এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করছে। সরকার থেকে দায়িত্বশীল কোন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফল হয়েছে ব্যক্তিখাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা সঙ্গী করে। রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের নিয়ে মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তুলছে, মালিক হচ্ছে বিপুল অর্থ-বিত্তের।

এই বিশৃঙ্খল অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে সড়কে মানুষ মরছে। পৃথিবীতে দুর্ঘটনা বন্ধের কথা না ভাবা হলেও কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। কিন্তু এই দেশে সেটি তো দুরে থাক, বিশৃঙ্খল ও মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত করে একটি সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও কি আছে?