Home » সম্পাদকের বাছাই (page 7)

সম্পাদকের বাছাই

নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকার-১ : ‘ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি অশুভ ও অলুক্ষণে ঘটনা’

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। মানব ইতিহাসে যাদের উদ্ধৃতি সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত হয়েছে, তাদের অন্যতম এই চমস্কি। তাকে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনকও বলা হয়ে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তার সোচ্চার ভূমিকা তাকে লাইমলাইটে এনে দিয়েছিল। তার ১৯৬৭ সালের যুদ্ধবিরোধী রচনা ‘দি রেসপনসিবিলিটি অব ইন্টিলেকচুয়ালস’ ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এখনো তার রচনাটি ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত। তবে এর জন্য তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার কারণে তাকে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার বরণ করতে হয়, এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কুখ্যাত ‘শত্রু  তালিকায়’ও তার নাম ছিল।

তার ভূমিকার কারণে পূর্ব তিমুরসহ অনেক দেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছিল, অনেক স্থানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি এখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, নব্যউদারবাদ, সমসাময়িক পুঁজিবাদ, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন ইত্যাদি বিষয়ে সোচ্চার। ২০১১ সালে তিনি সিডনি পিস প্রাইজে ভূষিত হন।

তিনি বই লিখেছেন শতাধিক। এসবের মধ্যে রয়েছে আমেরিকান পাওয়া অ্যান্ড দি নিউ ম্যান্ডারিন্স, ফর রিজন্স অব স্টেট, ম্যানুফেকচারিক কনসেন্ট : দি পলিটিক্যাল ইকোনমিস অব দি মাস মিডিয়া, দি অ্যাবুইস অব পাওয়ার অ্যান্ড দি অ্যাসাল্ট অন ডেমোক্র্যাসি

বর্তমানে চমস্কি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইনস্টিটিউট প্রসেফর এমেরিটাস ও ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার লরেট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৮৯ বছর বয়সেও চমস্কি ক্লান্তিহীন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, ন্যায়বিচার ও শান্তি কামনায় আগ্রহী।

সম্প্রতি তিনি জিপসন জন ও জিথেশ পিএমকে একটি বিশেষ সাক্ষাতকার দিয়েছেন। এতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল, ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি প্রদান, মার্কিন শক্তির পতন, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, ল্যাতিন আমেরিকান বাম, পোপ ফ্রান্সিস, ইসলামফোবিয়া, সিরিয়া যুদ্ধ, ইরানের সাথে পরমাণু যুদ্ধ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বের হয়ে যাওয়া, বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। এখানে তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো। ফ্রন্টলাইন ইন্ডিয়া থেকে বিশেষ সাক্ষাতকারটির বাংলা অনুবাদ করেছেন-হাসান শরীফ

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল :

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের শেষ নির্বাচনের সময় আপনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল নিয়ে বিশ্বের চরমভাবে আতঙ্কিত হওয়া উচিত।’ এখন তিনি হোয়াইট হাউস দখল করে আছেন। তার নীতি ও ঘোষণাগুলো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব ও করপোরেট এজেন্ডার সমন্বিত রূপেরই প্রতিনিধিত্ব করে। অনেকে তাকে হোয়াইট হাউসের ‘দানব’ পর্যন্ত বলে থাকে। তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বিশ্বের জন্যও কোন বিপদ নিয়ে আসছেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পূর্বসূরীদের থেকে তার ‘পার্থক্য’ কোথায়?

নোয়াম চমস্কি : এককভাবে সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো-সত্যিকারের অস্তিত্বগত সঙ্কট বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান। এই মারাত্মক হুমকিটি মোকাবিলা করতে অবশিষ্ট বিশ্ব অন্তত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপ পর্যাপ্ত না হলেও অন্তত কিছু তো করেছে। একই কথা প্রযোজ্য কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের কিছু এলাকার ক্ষেত্রেও। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে রিপাবলিকান এস্টাবলিশমেন্টের সার্বিক সমর্থনে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ শক্তিশালী ফেডারেল সরকার কেবল এসব প্রয়াস থেকে প্রত্যাহারই করেনি, সেইসাথে ধ্বংস প্রতিযোগিতা বেগবান করতে সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হয়েছে। এটি স্তম্ভিত করার মতো ঘটনা। বিধ্বংস শক্তি এখন অনেক দূরে ছুটে চলেছে।

প্রশ্ন : ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ট্রাম্পের ঘোষণাটির ফলে মনে হচ্ছে শান্তিপ্রক্রিয়া ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প এর মাধ্যমে কোন বার্তা দিতে চাচ্ছেন? এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রচেষ্টায় এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বড় ধরনের আঘাত না হলেও ‘শান্তিপ্রক্রিয়া’ তেমনভাবে সক্রিয় ছিল না। আমার মনে হয়, অনেকটা ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘাঁটি ও তহবিল দাতাদের অনেকেই পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ সম্প্রসারণের আবেগময়ী সমর্থক।

প্রশ্ন : আগে আপনি লিখেছিলেন, বিশ্বব্যাপী মার্কিন শক্তির পতন ঘটছে। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কাঠামোগত কোন ধরনের পরিবর্তন ঘটছে? আমরা কি বহু মেরুর বিশ্বের দিকে যাচ্ছি?

নোয়াম চমস্কি : আমেরিকার জাতীয় শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে (ঐতিহাসিকভাবে নজিরবিহীন) সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছে। তার ক্ষয় শুরু হয়- যাকে বলা হয়ে থাকে- ‘চীনকে হারানো’র মাধ্যমে। এটি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। অন্যান্য শিল্প সমাজ যুদ্ধকালীন বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়ায় এবং উপনিবেশমুক্তকরণ যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় বিশ্বসমাজ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল তিনটি মেরুতে পরিণত হয়। এর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উত্তর আমেরিকা, দ্বিতীয়টি জার্মানভিত্তিক ইউরোপ এবং তৃতীয়টি ছিল জাপানভিত্তিক উত্তর-পূর্ব এশিয়া। চীনের উত্থানের ফলে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বে ক্ষয় আরো বাড়ে। বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে চীনে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে মারাত্মক কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে চীন এখনো গরিব দেশ। আবার সামরিক খাতসহ কয়েকটি বিষয়ে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব বহাল রয়ে গেছে। আবার এই কথাও মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে জাতীয় হিসাব এখন আগের চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে বৈশ্বিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা ২০ ভাগেরও কম হলেও, মার্কিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিমে।বর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। জোর দিয়ে বলা যায়, এগুলো একটি জটিল চিত্রের কেবল অবয়বটুকুই প্রকাশ করছে।

ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব :

প্রশ্ন :বিশ্বের  প্রায় সব অংশে আমরা ডানপন্থী শক্তির আতঙ্কজনক বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে টি পার্টি মুভমেন্ট, ভারতে সংঘ পরিবার, ফ্রান্সে লে পেনের ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট এবং বিভিন্ন দেশে নানা ইসলামি দল শক্তি বাড়াচ্ছে। মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ অধ্যাপক সামির আমিন এই শক্তি বৃদ্ধিকে ‘সমসাময়িক পুঁজিবাদে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আপনি কি ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব নিয়ে এই শঙ্কার সাথে একমত?

নোয়াম চমস্কি : রাজনৈতিক আলোচনার বেশির ভাগ পরিভাষার মতো ‘ফ্যাসিবাদ’ও যথাযথ পরিভাষা নয়। ফ্যাসিবাদী সরকার ও সংস্থাগুলোর তৎপরতার কারণে সহজাতভাবে এটি এখন একেবারে অসহ্যকর একটি সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে। অনেক অনেক আগে পরিভাষাটি আরো যুৎসই প্রায়োগিক অর্থ প্রকাশ করত। উদাহরণ হিসেবে ভেবলেনবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ রবার্ট ব্রাডির কথা বলা যায়। তিনি ১৯৩০-এর দশকজুড়ে ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলোর আলোকে পরিভাষাটি দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজগুলোর অবস্থা বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিভাষাটি যতটা না কার্যকর, তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী।

বর্তমান সময়ে ডানপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি অশুভ ও অলুক্ষণে ঘটনা। এমনকি ওই পরিভাষাটি যদি ব্যবহার করা না হয়, তবুও। বিষয়টিকে শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাম্প্রতিক নির্বাচনে নব্য-উদারবাদী সময়ে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পতনের আলোকে বিশ্লেষণ করা উচিত।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রে [বার্নি] স্যান্ডার্সের আন্দোলন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু বিপুল তহবিলপুষ্ট প্রচারণা ও ব্যাপক মিডিয়া সমর্থনে এক বিলিয়নিয়ারের জয়ের ঘটনাটি নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল স্যান্ডার্সের প্রচার-তৎপরতা। তিনি ভোট কেনাবেচার দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ভেঙে দিয়েছেন।

বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ টমাস ফারগুসন। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তি শক্তির অনেক উপাদানের একটি তহবিল সংগ্রহ নির্বাচনে জয়ের একটি শক্তিশালী নির্ধারক। স্যান্ডার্সের ব্যক্তিগত সম্পদ বা করপোরট সম্পদ থেকে কোনো তহবিল সংগ্রহ করেননি, তার কোনো মিডিয়া সমর্থন ছিল না। তিনি সম্ভবত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন লাভ করতে এবং এমনকি নির্বাচনেও জয়ী হতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি দলের ব্যবস্থাপকদের কল-কাঠি নাড়ায়। তবে তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

এটি হলো নব্য-উদারবাদী যুগে মধ্যপন্থী প্রতিষ্ঠান ও তাদের নীতির প্রতি জনপ্রিয় বৈরিতার আরেকটি প্রকাশ। বিষয়টি অন্যান্য স্থানেও দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে জেরিমি করবিনের ব্রিটিশ লেবার পার্টির দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা যায়। যা ঘটছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য আগেকার আমল সম্পর্কে গ্রামসির পর্যবেক্ষণের কথা এখানে বলা যায় : ‘যখন পুরনোটি মরে যাচ্ছে; নতুনটি জন্ম নিতে পারছেনা- এই অন্তর্বর্তী অবস্থায় নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।’ তবে আমরা এর সাথে যোগ করে বলতে পারি, আশার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

প্রশ্ন : ভারতে হিন্দু ডানপন্থী শক্তির ভিন্নমতালম্বী কণ্ঠস্বরগুলোকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মোদি সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

নোয়াম চমস্কি : আমি এসব খবরের কিছু কিছু পড়েছি। এতে যা বোঝা যায়, তাতে নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে পরিস্থিতি জঘন্য। এতে মনে হচ্ছে, মোদি সরকার এসব অপরাধ সহ্য করে নিচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতে বর্তমান সরকার সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করা হলে জাতীয়তাবিরোধী অভিযোগ উত্থাপন ঘটতে পারে। লেখক অরুন্ধতী রায়, মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট ড. বিনায়ক সেন (২০১০) এবং আরো সাম্প্রতিক সময়ে জওহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন সরকার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছে। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদবিরোধীর মধ্যকার সীমারেখা আপনি কোথায় স্থান দেবেন?

জবাব : এটি আমার কাছে কোনো ইস্যু মনে হয় না। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা নিয়ে কেউ যে চিন্তাই করুক না কেন, মুক্ত সমাজে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ সুরক্ষিত ও সুস্পষ্ট থাকতে হবে।

জাতীয়তাবিরোধী তৎপরতার’ অভিযোগ চরমভাবে ভয়াবহ।

(অসমাপ্ত)

উদার গণতন্ত্রের তিন সঙ্কট

গনেশ সীতারামন

গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : আসিফ হাসান

গত কয়েক বছর ধরেই আমি ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের ২০০৫ সালে কেনিয়ন কলেজে দেওয়া উদ্বোধনী বক্তৃতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ওয়ালেস দুটি মাছের সাঁতার কাটার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন। পাশ দিয়ে আরেকটি বড় মাছ সাঁতরে যাওয়ার সময় বলল, ‘সুপ্রভাত বাছারা, পানি কেমন?’ বড় মাছটা দূরে চলে যাওয়ার পর একটি অপরটিকে বলল, ‘আজব কথা, পানি আবার কেমন হবে?’

কোন জিনিসটা ট্রাম্পের আর বেক্সিটের ভোটারদের নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে অনেক আলোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে পড়ছে দেখে উদ্বেগেরও সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক লোক টুইটার-ঝড় থেকে টুইটার-ঝড়ে দৌড়ঝাঁপ করতে থাকায় পানিতে কী হচ্ছে- অর্থাৎ বৈশ্বিক  গণতন্ত্রের সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার মূল কারণের প্রতি নজর পড়ছে তুলনামূলকভাবে কম।

ইয়াসচা মনকের অনন্য গ্রন্থ ‘দ্য পিপল ভার্সেস ডেমোক্র্যাসি’তে উদার গণতন্ত্র কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টির স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, বোধগম্য ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ওই পরিবেশ নস্যাতই কেনো বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রের বর্তমান সঙ্কটের উৎস তা জানিয়েছেন। উদার গণতন্ত্র যে পানিতে সাঁতার কাটে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অচিন্তনীয় বলে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন।

মনক দেখিয়েছেন, উদার গণতন্ত্রের সফলতা ও স্থিতিশীলতা সমাজজীবন-সম্পর্কিত তিনটি ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রথমত, নাগরিকেরা তুলনামূলকভাবে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিল। কারণ, সম্প্রচার করা খবর, সংবাদপত্র, রেডিও ইত্যাদি সবই ছিল এককেন্দ্রিক অনেক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে দ্বাররক্ষকেরা খবর ও তথ্যকে মূলধারার মধ্যে থাকা নিশ্চিত করত। এর অর্থ হলো, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ও অভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অভিন্ন কথাবার্তা বলত।

দ্বিতীয় ধারণাটি ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও তুলনামূলক অর্থনৈতিক সাম্যতা। বিশ^ ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ই মূলত কোনোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল না। কেবল শিল্প বিপ্লব সূচনায় প্রবৃদ্ধি আকাশচুম্বি হওয়ার পরই লোকজন উচ্চতর জীবনযাত্রার আকক্সক্ষা প্রকাশ করতে পেরেছিল। আর সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশকের মধ্যে প্রবৃদ্ধির সাথে নিম্ন পর্যায়ের অর্থনৈতিক বৈষম্যের অর্থ ছিল এই যে, উচ্ছসিত জোয়ারে সত্যিকার অর্থেই সব নৌকাকেই উপরে ওঠেছিল।

আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।

আর চূড়ান্ত ধারণা ছিল সামাজিক সমরূপতা। মনক যুক্তি দিচ্ছেন, বিশ্ব জুড়ে স্থিতিশীল উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে চোখে পড়ার মতো তুলনামূলক সমরূপ জনসংখ্যা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপে গণতন্ত্রের উত্থান ও বহুভাষিক অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্প্রাজ্যের মতো সাম্রাজ্যগুলোর ভাঙন ছিল ওতপ্রোতভাবে জাতীয়তাবাদের সাথে সম্পর্কিত।

মনক বলছেন, গত প্রজন্মে এবং বিশেষ করে গত বছর ১৫ সময়কালে ওই তিনটি ধারণাই মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়েছে। সামাজিক মিডিয়া যেকোনো ব্যক্তিকে সম্প্রচারকারীতে পরিণত করেছে, লোকজন যে খবর, তথ্য ও মতামত শুনতে চায়, তাদেরকে কেবল তা-ই শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে এটি চরমপন্থী ও প্রান্তিক আদর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ সম্প্রসারিত করেছে। এক প্রজন্ম ধরে গড়পড়তা শ্রমিকের প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে রয়েছে, লোকজন আশঙ্কা করছে যে তাদের সন্তানের প্রজন্ম আর্থিকভাবে স্থবির হয়ে পড়বে। পরিশেষে বলা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে অভিবাসন বাড়তে থাকায় বিশেষভাবে যেসব এলাকায় দ্রুত বৈচিত্র্য বাড়ছে, সেসব স্থানে চরমপন্থা ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

মনকের মতে, এর পরিণতিতে উদার গণতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। আমরা ‘অনুদার গণতন্ত্রের’ উত্থান দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ সরকারগুলো জাতির ‘সত্যিকারের’ লোকজনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও ব্যক্তিগত অধিকার বা সাংবিধানিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করছে সামান্যই। অনেকে এসব আন্দোলনকে লোকরঞ্জক হিসেবে অভিহিত করছে। একইসাথে অন্যরা মনকের ভাষায় ‘অগণতান্ত্রিক উদারবাদের’ সাথে দহরম-মহরম করছে। এই ধরনের সরকারব্যবস্থায় অধিকার সংরক্ষিত থাকলেও তা হয় গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার মূল্যে। এটি অনেকটা এলিট টেকনোক্র্যাটদের পরিচালিত সরকারের মতো, সাধারণ মানুষের ওপর এদের আস্থা আছে সামান্যই।

আরো ঝামেলাপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুটি ব্যবস্থা একে অপরের শক্তি বাড়াচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের লেকচারার মনক এ নিয়ে খুব বেশি কথা না বললেও এই সময়ের জন্য এখানেই বিরাম নেওয়া ভালো। লোকরঞ্জকবাদীদের শক্তি সংগ্রহের সময়টিতে তাদের প্রতিপক্ষরা সম্ভবত অগণতান্ত্রিক উদারবাদের গুণাগুণ দেখছে। অগণতান্ত্রিক উদারবাদ শক্তিসঞ্চয় করলে অনেক সাধারণ মানুষের মনে খাচাবদ্ধ হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, সরকারি নীতি সাধারণ মানুষের দাবির প্রতি সাড়া দেয় না। ফলে তাদের মনে এলিটদের উৎখাত করার বাসনা জাগে। এমন অনিবার্য পরিস্থিতিতে যার পরাজয় অবধারিত হয়ে যায় তা হলো উদার গণতন্ত্র।

মনকের বইটির সবচেয়ে বড় একটি শক্তি হলো এই যে তিনি সহজ, একক ব্যাখ্যার ওপর অবস্থান করেছেন। এর ফলে সমাধান পাওয়া গেছে সহজেই। উদার গণতন্ত্রকে তার শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য মনক তিনটি নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম বণ্টন দূর করা ও প্রযুক্তিগত এবং বিশ্বায়ণের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডাই হবে সবচেয়ে বড় সমাধান। ন্যূনতম কার্যকর সমাধান- সম্ভবত এটিই সবচেয়ে কঠিন- হবে এমন এজেন্ডা তৈরি যা ‘নাগরিক বিশ্বাস,’ তথ্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা, নাগরিক সৌজন্যতাবিষয়ক আমাদের অনুভূতি ফিরিয়ে আনবে। এই বিষয়ে আরো নজর দেওয়া উচিত। কারণ যে প্রান্তিক সমাজে খুব কম লোকই বাস্তবতা অনুসরণ করে এবং যেখানে নাগরিক শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে, সেখানে নীতিগত পরিবর্তন সাধন কিভাবে সম্ভব তা অস্পষ্ট।

অবশ্য সবচেয়ে আগ্রহ সৃষ্টিকারী পরামর্শ সম্ভবত নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদের কল্পনা করা। মনক একে অভিহিত করেছেন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ।’ প্রান্তিকতাপূর্ণ জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রতি সাড়া দেওয়ার বদলে স্বপ্নিল বহুজাতিকতার এগিয়ে যেতে হবে। মনক বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন ‘পরিশীলিত জাতীয়তাবাদের’। তিনি সমন্বিত সমাজের একটি স্বপ্নদর্শনও প্রস্তাব করেছেন। এখানে জাতীয়তাবাদ লোকজনকে বিভক্ত না করে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

যারা গড্ডালিকা প্রবাহ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করে, তাদের কাজে এই এজেন্ডার তিনটি অংশই অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক সংস্কার সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী লোকজন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। নাগরিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার অর্থ হলে সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গোত্রবাদ ভেঙে ফেলা। অন্তর্ভুক্তমূলক জাতীয়তাবাদ ডান ও বাম উভয় ধরনের বাগাড়ম্বড়তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।

মধ্যবিত্তের উপরে অর্থমন্ত্রীর কেনো এতো গোস্বা?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল খুব একটা নেই। বাজেট কখন উত্থাপিত হয়, কখন পাস হয়, সাধারণ নাগরিকরা তা নিয়ে ভাবেন না; অনেক সময় খোঁজখবরও রাখেন না। তবে সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা হচ্ছে কোন কোন জিনিষের দাম সরকার বাড়ালো, কিংবা কতো টাকার আর্থিক চপ বেেস পড়লো । এছাড়া তখনই চিন্তাটা দেখা দেয় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আবার একশ্রেণির ব্যবসায়ী জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার আগেই বাজারে সংকেত দেওয়া শুরু করে বাজেট আসন, দাম  বাড়বে! ওসব ব্যবসায়ী বাজেট পাসের আগেই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনার পর বাজেট ভাবনাকে আর অগ্রাহ্য করেনা।

সাধারণত মধ্যবিত্ত হিসেবে একটি দেশের জনগোষ্ঠীর সেই অংশকে বিবেচনা করা হয়, যারা সীমিত আয়ের জীবনযাপন করেন। বাংলাদেশে পেশা বিচার করলে এদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, গবেষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, ছোট ঠিকাদার, গ্রামীণ উদ্যোক্তা এবং মাঝারি কৃষকেরা পড়েন।

বাজেটের বিশাল আকারের ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ বাজেটের মূল লক্ষ্যবস্তু যেহেতু প্রবৃদ্ধি সেহেতু এর আকার ওই টার্গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। প্রবৃদ্ধি ভিন্ন এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি পুরোনো কথা। নতুন কথা হলো, প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয় এবং প্রবৃদ্ধি নিজে গিয়ে সব মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটবে না বা  তাদের জন্য উন্নয়ন আসবে না। সেজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত সমতাভিত্তিক উন্নয়ন ও  বণ্টনমূলক ব্যবস্থা।

বাজেটে সাধারণ জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে- স্থানীয় মধ্যবিত্ত যেসব পণ্যের চিহ্নিত গ্রাহক বাজেট বক্তৃতায় সেগুলোর ওপর বাড়তি করারোপের উল্লে¬খ করেছেন অর্থমন্ত্রী। নানা সেবাকেও ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে সরকারের। বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেই এমন উদ্যোগ। এটি অসহায় বাস্তবতা যে, চ‚ড়ান্ত বিচারে সিংহভাগ ভ্যাট মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকেই গুনতে হবে। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে এবার। তেমন কোনো প্রস্তাব আসেনি। তার মানে আয়করের প্রধান টার্গেটও ওই মধ্যবিত্তই এবং এক্ষেত্রে আহরণ সুবিধাই প্রধান বিবেচ্য বলে প্রতীয়মান। অথচ প্রয়োজন ছিল আয়করের ক্ষেত্রে আয়ের উচ্চস্তরে জোরটা বেশি দেওয়ার । মধ্যবিত্তকে কর বেশি দিতে হয়, এ নিয়ে কারও আক্ষেপ থাকা উচিত নয়। কেননা গুটিকয়েক দেশ বাদ দিলে সাধারণভাবে মধ্যবিত্তরাই সর্বজনীন বৃহত্তম করদাতা (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর) গোষ্ঠী এবং অর্থনীতির মেরুদন্ড ।

প্রস্তাবিত বাজেটে সিটি করপোরেশন এলাকার কারও যদি আট হাজার বর্গফুট বা এর বেশি আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাহলে ওই বাড়িওয়ালার আয়করের ওপর সারচার্জ বসবে। এই সারচাজের্র পরিমাণ ওই বাড়িওয়ালার আয়ের ১০ শতাংশ বা কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। বাড়িওয়ালা স্বাভাবিকভাবেই নিজের খরচ কমাতে ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন।

মধ্যবিত্তদের যাতায়াতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনতে শুরু করেছিল রাইড শেয়ারিং উবার, পাঠাওয়ের মতো গাড়ি ও মোটরসাইকেল। উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিংয়ের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বসিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমনকি এসব রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ওপর ৩ থেকে ৪ শতাংশ উৎসে করও বসানো হয়েছে। এতে এসবের সেবা নেওয়ার খরচ বাড়বে।

কর বসেছে পোশাকেও। দেশি ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ কিনতে এখন থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে। আগে ভ্যাট ছিল ৪ শতাংশ, এখন হয়েছে ৫ শতাংশ। খরচের কথা চিন্তা করে দেশি ব্র্যান্ডের পোশাক বাদ দিলেও রক্ষা নেই। বড় দোকান থেকে জামাকাপড় কিনলেও ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে, যা আগে ছিল না।

বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন সব মধ্যবিত্তেরই থাকে। কিন্তু এই বাজেটের পর ছোট ফ্ল্যাট কিনতে গেলে খরচ বাড়বে। ১১০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাটে ভ্যাট দেড় থেকে দুই শতাংশ আরোপ করা হয়েছে। এতে ৫০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে অন্তত ২৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হবে। আবার নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, রিকন্ডিশন্ড গাড়িতেই ভরসা মধ্যবিত্তের। বাজেটে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয়ন সুবিধাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতে গাড়ির দাম বাড়বে। অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শিগগিরই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাবেন। আবার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগও কমানো হয়েছে।

নৈরাজ্যের ব্যাংকিংখাতের উল্টো নীতিতে চলছে সরকার। পরিবারের পরিচালক সংখ্যা ও মেয়াদ আগেই বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ কোন সুবিধা পাবে না। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারাও কোনো সুবিধা পাবেন না। এই ছাড়ের কারণে বৃহৎ করদাতাদের কাছ থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য বন্ধ না করে, ব্যাংক ব্যবসায়ীদের চাপে করপোরেট কর হার কমানোর সিদ্ধান্ত অনিয়মকে আরো উস্কে দেবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এখন সবচেয়ে দুর্বলতম দিক চলতি হিসাব ঘাটতি। বৈদেশিক বিনিময়ের লেনদেন কাঠামো। বর্তমানে মেগাপ্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যাপক আমদানি করা হচ্ছে। তাছাড়া আমদানির মাধ্যমে বাইরে অর্থ পাচারও হচ্ছে। এসব যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে টাকার মূল্যমানের উপর চাপ সৃষ্টি হবে।

চলতি হিসাবের ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বাজেটে কিছু বলা হয়নি। আমদানি ব্যয় গড়ে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ার ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ডলারের বিনিময় মূল্য স্থিতিশীল না থাকলে বাণিজ্য ভারসাম্য নষ্ট হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং অর্থ পাচারের আশঙ্কাও থেকে যায়।

যুগে যুগে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় উন্নয়নে মধ্যবিত্তের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের দেশও এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। কেননা এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ সুষ্ঠু চিন্তার ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মধ্যবিত্তের একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রের মৌল-কাঠামো অর্থনীতি কার্যত রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামাজিক উন্নয়নের সূচক বৃদ্ধি করে। তখন মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও যে তিনটি ভিত্তি ছিল অর্থাৎ মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার- তা এখনো পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি যে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি নিরন্তর জীবন-সংগ্রাম করে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল- সেটাও আজ এক ধরনের সংকটে নিপতিত।  একই সঙ্গে সমাজের স্থিতি ও পরিশুদ্ধ সামাজিক সংস্কার যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে হয়, নানা আর্থিক টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আজ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ সামাজিক ঐতিহ্যসম্পন্ন একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বজনরা হচ্ছে অবহেলিত, উপেক্ষিত। রাষ্ট্রে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে আর্থিক শৃংখলা না থাকায় প্রাত্যহিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কতিপয় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। এতে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।  ফলে এই কোঠারিভুক্ত স্বার্থান্বেষী সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তারা খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে মধ্যবিত্তসহ সাধারন মানুষ।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ- ৩ :: প্রকল্পে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহন !

অরুন কর্মকার ::

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে কিছু সহায়তা নিচ্ছে। এর একটা বড় অংশ জাতীয় পরমাণু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি। পাশাপাশি রূপপুর প্রকল্পের জন্যও জনবল প্রশিক্ষণসহ কিছু সহায়তার বিষয় আছে। এর বাইরে রাশিয়াও রূপপুর প্রকল্পের মৌলিক কাজে রাশিয়াকে যুক্ত করেছে। ফলে ভারতের অংশগ্রহণ হয়ে উঠছে সার্বিক।

এ ধরণের একটি পরিকল্পনা ভারতের ছিল। রাশিয়ার ছিল আগ্রহ। গত ১ মার্চ (২০১৮) মস্কোতে বাংলাদেশ, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) সই হয়েছে তা এই দুয়েরই ফল। এর মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার সহযোগিতার সম্পর্ক যেমন নুতন মাত্রা পেল তেমনি ভূ-রাজনীতির মঞ্চে ও আন্তর্জাতিক পরমাণু ক্লাবে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হলো। এর মাধ্যমে ভারত চীনকেও বাগে রাখতে রাশিয়াকে পাশে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে এই সমঝোতার অংশ হয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে বা করতে চাচ্ছে সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি।

ওই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ভারত শুধু যে তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং প্রকল্পের জন্য পরামর্শ সেবা দিয়ে সহায়তা করবে তা নয়। প্রকল্পের স্বার্থে ভারতীয় কোম্পানিগুলো প্রকল্পের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন, এমনকি ভারতে উৎপাদিত কিছু সামগ্রী (ম্যাটেরিয়াল) এবং কিছু কিছু যন্ত্রপাতিও (নন-ক্রিটিক্যাল ক্যাটাগরি) সরবরাহ করবে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর রোসাতোমের উপ মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) নিকোলাই স্পাস্কি এক বিবৃতিতে এ সব কথা বলেছেন। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ এবং ভারতের কিছু কিছু গণমাধ্যম এই খবর প্রকাশ করেছে। ওই সমঝোতা স্মারকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে সই করেন মস্কোতে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সাইফুল হক, মস্কোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত পংকজ শরণ এবং রোসাতোম তথা রাশিয়ার পক্ষে নিকোলাই স্পাস্কি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) কাজ করেছেন এধরনের কয়েকজন পেশাজীবী  বলেছেন, ভারত পৃথিবীর পরমাণু বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ (এনএসজি)-এর সদস্য নয়। এই গ্রুপের সদস্য ছাড়া কোনো দেশ পরমাণু চুল্লি (রিঅ্যাক্টর) নির্মাণে সরাসরি অংশ নিতে পারে না।

অন্যদিকে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) অনুযায়ী, প্রকল্পের পূর্ণ (এ টু জেড) বাস্তবায়নের দায়িত্ব রোসাতোম তথা রাশিয়ার। অর্থাৎ এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতির নকশা প্রণয়ন, উৎপাদন, সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ তাঁদেরই করার কথা। তাই এ সব কাজে অন্য কোনো দেশ বা তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করা বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ কিনা এনিয়ে আইনগত প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া, তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা সামগ্রীর মান ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী নিশ্চিত হবে কিনা, এ সব সামগ্রির দাম ওই চুক্তিতে ধরা দামের সমান হবে কিনা- এ সব প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে।

তবে ত্রিদেশীয় সমঝোতা স্মারক হওয়ায় বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সাধারণ চুক্তির বরখেলাপ হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী, কোম্পানি ও চুক্তি আইনে অভিজ্ঞ তানজীব-উল আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, ক্রেতার (বাংলাদেশ) যদি কোনো আপত্তি না থাকে, প্রকল্পের ক্রেতা যদি তৃতীয় পক্ষের অংশগ্রহণ মেনে নেয়, সে ক্ষেত্রে চুক্তির বরখেলাপ বা আইনের ব্যত্যয় হবে না।

আর তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা জিনিসপত্রের মান ও দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী, যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৩০ বছর কর্মকাল শেষে অবসর নেওয়া মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের ‘এ টু জেড’ করার কথা রাশিয়ার। ভারতের সরবরাহ করা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতির কারণে, তা যতই মাইনর হোক না কেন, যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয় তার দায় কে নেবে? বাংলাদেশ, রাশিয়া নাকি ভারত?’

মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও এর কিছু সামগ্রি তৈরিতে ভারত অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রয়োজন হলে আমরা আলাদাভাবে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে সে সব বিষয়ে সহায়তা নিতে পারি। জনবল প্রশিক্ষনসহ কিছু কিছু বিষয়ে তা নেওয়াও হবে বলে দুই দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সমঝোতা হয়ে আছে। এর বাইরে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কোনো চুক্তির আওতায় আমরা ভারতের সহায়তা নেব কেন? তাহলে তো রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের চুক্তি সংশোধন করে নেওয়া উচিৎ।’

রূপপুর প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে বলেন রোসাতোমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেক্সি লিখাচেভ। গত বছর জুন মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে রূপপুর সংক্রান্ত এক আলোচনায় লিখাচেভ বলেন, ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনের সময় ভারতের পক্ষ থেকে তাঁদের দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের ধারণাটি উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেনি।

এরপর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আইএইএর সাধারণ সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণকারী উর্ধতন কর্মকর্তারা রূপপুর প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ সামগ্রি (ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস) সরবরাহের প্রস্তাব দেন। ‘রোসাতোম নিউজলেটার বাংলাদেশ’-এর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের সংখ্যায় (ইস্যু ০০৮) এই খবর প্রকাশিতও হয়েছে।

ওই সময় ভারতের ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর এক খবরে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কিভাবে একটি অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে রাশিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে ভারত। বিদেশের মাটিতে রূপপুরই হবে ভারতের প্রথম কোনো পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশগ্রহন।

২০১৪ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যেকার ‘স্ট্রাটেজিক ভিশন ফর স্ট্রেনদেনিং কো-অপারেশন ইন পিসফুল ইউসেজ অফ অ্যাটমিক এনার্জি’-তে বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো দেশে রাশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে সেখানে ভারতের নির্মাণ সামগ্রি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সেবা প্রদান করা যায় কিনা দুই দেশ তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখবে। গত ১ মর্চের এমওইউ এই স্ট্রাটেজি (কৌশল) বাস্তবায়নের মাধ্যম হতে যাচ্ছে।

গত বছর (২০১৭) এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও উন্নয়নে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে তার আওতায় ভারতের কাছ থেকে রূপপুর প্রকল্পের জন্য পরামর্শক সেবা নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য জনবল প্রশিক্ষণে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশী পেশাজীবীরা তামিলনাড়ুর কুদনকুলম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরুও করেছেন।

এ ছাড়া, রূপপুর প্রকল্পের জন্য সরকার ভারতের ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ (জিসিএনইপি)’-এর কাছ থেকে পরামর্শক সেবাও নিতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে জিসিএনইপির সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি সই হওয়ার কথা। এগুলো সবই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে রাশিয়া রূপপুর প্রকল্পে তাঁদের কাজের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করার জন্য ১ মার্চের এমওইউ করেছে যার অংশ হয়েছে বাংলাদেশ।

রূপপুর প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ‘ইউরেশিয়ারিভিউ ডট কম’ নামের একটি ইন্টারনেটভিত্তিক পত্রিকায় বলা হয়েছে, ভারতের জন্য এই সমঝোতা স্মারক অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, রূপপুর প্রকল্পে অংশগ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারমাণবিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ভারত এক্সপোজার পাবে। রুশ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে প্রকল্পের সকল পর্যায়ের নির্মাণকাজে অংশ নিতে পারবে যা ভবিষ্যতে ভারতকে রুশ প্রকৌশলী ও বাংলাদেশের পেশাজীবীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য সম্পর্কে জানা এবং সে সব তথ্য ব্যবহারের সামর্থ্য অর্জিত হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে। এই অভিজ্ঞতা তাঁরা অন্য দেশেও কাজে লাগাতে পারবে। মোট কথা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘নলেজ পার্টনার’ হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হবে।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অঙ্গনে ভারত একটি দায়িত্ব সম্পন্ন দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানকার অভিজ্ঞতা নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের সদস্যপদ পেতে সহায়ক হবে। সব জেনে-বুঝেই ভারত সুপরিকল্পিতভাবে রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার সঙ্গী হয়েছে।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত বছর অক্টোবরে প্রকল্পটির মূল নির্মাণপর্ব (ফাস্ট কংক্রিট পোরিং) শুরু হয়েছে। প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট বিশিষ্ট এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটে। রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক (থ্রি প্লাস জেনারেশন) ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির চুল্লি এই কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ১২৬৮ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে বাংলাদেশ-রাশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সাধারণ চুক্তিতে। এই ব্যয়ের ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। তবে এর বাইরেও, এই প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের জন্য আরও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা।

শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দেখছি না

গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ::

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে গত চার দশক ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে উন্নয়নের নামে। ’৬০-এর দিকে প্রথম উন্নয়ন দশকের মূল লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি (growth);; দ্বিতীয় দশকে লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমতা (growth with equity); তারপরের দশকে এলো বিকেন্দ্রীকরণ (decentralization); গণচেতনা (mass awareness) এগুলো; তারপর এখন উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন (participatory development), পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন উৎসাহে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মদদপুষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। বাংলাদেশও এই রকম কৌশলের বাইরে থাকেনি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম বিভিন্ন উন্নয়ন (sustainable  development), নারী উন্নয়ন এগুলো। এই সমস্ত কৌশলই এসেছে দাতা দেশসমূহের প্রচেষ্টার ফলেও গণদারিদ্র্য দূর হয়নি বরং অনেক দেশে বেড়েই চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য দারিদ্র্য একটি বিশাল সমস্যা। বস্তুত আপেক্ষিক দারিদ্র  ক্রমেই চরম আকার ধারণ করছে এবং এটা সামাজিক একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক স্থিতিশীলতাও সঙ্গীন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো ‘টার্গেট গ্রæপ’ ভিত্তিক প্রকল্প দারিদ্র্য কিছুটা লাঘব করলেও সার্বিকভাবে দারিদ্র্য তেমন কমেনি। বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ পল্লী অঞ্চলে। অতএব দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং পল্লী উন্নয়ন এই দুটির যোগসূত্র রয়েছে। তবে এটা লক্ষ্য করা যায় যে, ‘উন্নয়ন’ শব্দটির অস্পষ্ট ব্যবহারের ফলে অনেক সময় মূল সমস্যা দারিদ্র্য আড়ালে থেকে যায়।

উন্নয়নকে সুশাসন ও গণতন্ত্র থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উদাহরণ দেয়া হয়, গণতন্ত্র ছাড়াও বিশ্বের কিছু দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন টেকসই ও সমতাভিত্তিক নয়। সেখানে শুধু বস্তুনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ভোগবাদের প্রসার হয়েছে। মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতা এগুলোর প্রাধান্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ওই পথে চলুক, আমরা সেটি চাই না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলাদেশের জন্য আন্দোলনটা বহু আগে থেকে শুরু হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান। বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনের যে ভিত্তি ছিল, সেটা ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ এবং এখানকার লোকজনকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা থেকে মুক্ত করা। অর্থনীতি মুক্তি অর্জন করার জন্য দরকার ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। বিভিন্ন দোলাচল, অনিশ্চয়তা ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। আমাদের দেশে আসলে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নটা শুরু হয়েছে ১৯৯০ থেকে। প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার শুরু হলো এবং ১৯৯০-র পর ধারাবাহিকভাবে ভালোভাবেই অর্জনটা ছিল। তার পর আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, গার্মেন্ট এবং অন্যান্য সেক্টরে উত্তরোত্তর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এই কন্ট্রিবিউশনটা বিশেষ কোনো একটা সরকারের সময়ে হয়নি। ধারাবাহিকভাবে সব সরকারের সময় হয়েছে। তাই এখানে কৃতিত্ব কিন্তু সবার। একক কোনো সরকার এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে না। আবার ব্যর্থতার ব্যাপারেও এককভাবে কাউকে দোষ দিতে পারবে না।

এদিকে আমি যাচ্ছি না। আমি এখন আমাদের যে মূল চ্যালেঞ্জগুলো এবং সেখানে আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, রাজনৈতিক চিন্তাধারার কিছু কথা বলব। মানে রাজনৈতিক যে বিশ্লেষণ বা অর্থনীতির যে বিশ্লেষণ, সে বিষয়ে আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলব। প্রথমত, চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের অর্থনীতির দিক দিয়ে, যেগুলো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। প্রথম হলো আমরা যে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, সেটা এখন কিছুটা মন্থর, আবার বিনিয়োগও মন্থর হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দেখছি যে সরকারের যে নীতিগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা বা নীতিগুলো যে খুব সুষ্ঠু নীতি হয়েছে সেটাও নয়। আবার নীতিগুলো বাস্তবায়ন যারা করবে, আমলা এবং সরকারের যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে তাদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবহুল। সব শেষে সার্বিকভাবে যে উন্নয়নগুলো হয়েছে, বিশেষ করে সূচকের দিকটি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে গড় হিসেবে। কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা। যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল কিন্তু বহুলাংশে সাধারণ মানুষ পায় না। কারণ এখন আমরা দেখছি যে, দিন দিন কিন্তু ধনী-দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্তের ফারাক বাড়ছে; বঞ্চিতের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আপেক্ষিকভাবে কেউ বলতে পারে যে, আগে তো কেউ শার্ট পরত না, প্যান্ট পরতে পারত না, মোবাইল সবার কাছে আছে। সেটা হলো আপেক্ষিকভাবে। একজন রিকশাঅলার মোবাইল আছে, কিন্তু যে ৮ থেকে ১০ বছর আগে রিকশায় চড়তে পারত না, তারা এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাই ফারাকটা কী। একই ধরনের লোক একই কর্মদক্ষতা কিন্তু সে চলে যাচ্ছে কোথায়। বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে, এমনকি দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই এই অসম উন্নয়নটা অ্যাক্সেপ্টেবল নয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ব্যাপার। এ জন্য আমরা দেখছি যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা না থাকলেও অশ্চিয়তা আছে। কী হবে, না হবে। কী ধরনের সরকার হবে। আর এখন যে রাজনৈতিক অবস্থাটা আছে বা যে কোনো সময় রাজনৈতিক যে গভর্নমেন্ট আসে, সেখানে আমরা কিন্তু গুড গভর্নেন্স দেখতে পাচ্ছি না। সুশাসনের অভাব আছে। সুশাসনের অভাব মানে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই। কেউ যদি অন্যায় করে তার কোনো শাস্তি হয় না। সব থেকে মারাত্মক হলো রুল অব ল’ নেই। আইন আছে কিন্তু এটার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। রাজনীতির মেজর জিনিসটা যে খালি ভোট দিলে হয়ে গেল তা নয়। সুশাসন ছাড়া কিন্তু কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অনেকে বলে, কোনো কোনো দেশে তো মার্শাল ল’ ছিল। কোনো কোনো দেশে তো ডিক্টেটর ছিল। উন্নয়ন হয়েছে। গণতন্ত্র ছাড়া। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেখানে ১০ থেকে ২০ বছর পর দেখা গেছে, বেশিরভাগ লোকই দরিদ্র। তাই ওই পথে যাওয়া যাবে না। তার পর রেগুলেটরি বডি যেগুলো আছে, যেমন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। মানুষের বিবেচনায় তো কাজ করে না, যেভাবে গ্যাস-পেট্রলের দাম বাড়ে। বিটিআরসি নানারকমের নীতি দিচ্ছে। এগুলোর কোনো কনটিনিউটি থাকে না। সরকার চেঞ্জ হলে অন্য সরকার এসে পুরো সিস্টেমই পরিবর্তন করে দেয়। যদিও অনেক ভালো নীতি অনেক সময় নেয়। মোটামুটি যদি ধারাবাহিক থাকে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন ভারতেও কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক নীতিগুলো একেবারে চেঞ্জ হয়ে যায় না। মোদি এসে তো বলেননি যে, আমরা ইন্ডাস্ট্রি করব না। আমরা এক্সপোর্ট করব না। আমরা ম্যান পাওয়ার বাড়ব না। আমরা আইটি সেক্টরে কাজ করব না। তিনি বলছেন, আমি করব অন্যভাবে। লোকজন কিছু চেঞ্জ হবে। সেটা অন্য কথা। এটা আমেরিকায়ও করে। কিন্তু আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে এগুলো হয় না।

আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো একেবারেই হয়নি। লোকাল গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বলে কিছুই নেই। ঢাকা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ঢাকা থেকে করার ফলে যেটা হয়, আমাদের প্রত্যেকটি অঞ্চলের লোকজন কীভাবে বেঁচে থাকে, তাদের চাহিদা আমলে নেওয়া হয় না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ তাদের ভূমিকা নগণ্য। এখন আবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের বেতন দেবে তাদের আয় থেকে।

সরকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বেতন দিয়ে দিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। আর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের বেতন দেবেন না। এটা কোনো কথা হলো নাকি? ওদের কি ট্যাক্স পাওয়ার আছে? ওদের কি অথরিটি দেওয়া হয়েছে? গরিব মানুষদের ওপর আর কত ট্যাক্স চাপাবে? ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে, এক্সপোর্ট বাড়লে ট্যাক্স বাড়ে। ওদের কি এক্সপোর্টের ওপর ট্যাক্স ধার্য করার ক্ষমতা আছে? বা আয়ের ওপর ট্যাক্স বসানোর ক্ষমতা আছে? তাই সার্বিকভাবে আমি বলব, আমাদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, তা হলো গতানুগতিক। মার্কেট ইকোনমির ওপর, বাজারের ওপর ডিপেন্ড করে আমরা চলব এবং বাজার সবকিছু নির্দিষ্ট করবে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ঠিক করবে। সেভাবে যাবে। আর অর্থনীতিবিদরাও তখন চিন্তা-ভাবনা করছে যে, ঠিক আছে, বাজারের মধ্যে থেকেই আমরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বিবেচনা করব। তার মানে কিছু কিছু জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে একটু মলম দিলাম। কিন্তু পুরো শরীরে যখন নানা সিস্টেমেটিক ডিজিজ হয়। আমার যদি ইমিউন সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। আমার ব্লাড যদি দূষিত হয়। আমার নাকের মধ্যে ওষুধ দিলে, চোখের মধ্যে ওষুধ দিলে কী লাভ হবে। কোনো লাভ হবে না। এখন আমাদের তো হয়েছে সিস্টেমেটিক ডিজিজ। এক জায়গায় তো নয়। এটা সর্বগ্রাসী। পুরো সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই সিস্টেম মানে রাজনৈতিক সিস্টেম। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজারগুলো এবং লোকাল লেভেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো। স্কুলগুলো এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলোকেও প্রভাবিত করে পলিটিক্যাল মোটিভেশন।

ব্যাংকিং সেক্টর দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। বর্তমানে এ সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব নীতিমালা ও আইন-কানুন আছে, কোম্পানি আইন আছে, আন্তর্জাতিক নর্মস আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব নীতিমালা ও আইন আছে, তা আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এগুলো সঠিকভাবে পরিপালন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এর ফলে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট এবং নিচের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে কোথাও সুশাসন অনুসৃদ হচ্ছে না। সর্বত্রই মারাত্মক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এখন মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। পরিচালনা বোর্ড ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেবে। তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে সে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই শোনা যায় বা অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালনা বোর্ড ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে। এখন দেখা যায়, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই যেন বেশি উৎসাহী। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে তাদের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পরিচালনা বোর্ডের দ্বারা প্রায়ই নির্দেশিত হয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যে সবসময় দক্ষ হয়, তা নয়। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রæটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব নানা কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি দেখা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পরস্পর দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং এবং সুপারভিশনও খুব দুর্বল। যারা পরিচালনা বোর্ডে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ইন্টারেস্ট থাকে। তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন। নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদান বা চাকরি প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমনটি ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যারা নিয়োগ লাভ করেন, তাদের নিযুক্তি অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের ওপর। কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং পারফরম্যান্সের ওপর তার টিকে থাকা-না থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে, তার পক্ষে এমডি হিসেবে টিকে থাকায় কোনো সমস্যা হয় না। এজন্য দেখবেন কোনো কোনো ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত উচ্চ। এদের বেতন-ভাতা অনেক বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা পরিচালকদের কথাবার্তা শোনেন; তাদের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করেন। এতে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হলো কিনা, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিচালনা বোর্ড তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করতে চায়। পরিচালনা বোর্ডে অনেকেই থাকেন, যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি ব্যাংকের কাজে ব্যবহার করতে চান তাহলেই সমস্যা দেখা দেয়। ব্যবস্থাপনার মধ্যেও আবার অনেক লোক আছেন, যারা দক্ষ নন বা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি অদক্ষ বা দুর্বল হন, তাহলে তার প্রভাব সর্বত্রই পড়ে। এতে নিচের দিকের কর্মীরা নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অনিয়ম উপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই টপ ম্যানেজমেন্ট যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত করেন, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়বেই। কিন্তু আমাদের এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও সমস্যা রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে।

এখন আমাদের সময় এসেছে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার। সরকার গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, গতিশীলতা এনে সুষম ও টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে, এটাই এখন বিশেষ প্রয়োজন। সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ করপোরেশন সার্বিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। কিছু কিছু জায়গায় পাবলিক সেক্টরগুলো, করপোরেশনগুলোর মূল্য আছে। যেমন আমি উদাহরণ দিই বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ খাতে যখন আমাদের ক্রাইসিস হলো, তখন ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জের মতো একটা ৫০০, ৬০০ মেগাওয়াটা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করা যেত সরকারি উদ্যোগে এবং নিয়ন্ত্রণে। এটা করলে ইন্ডিভিজুয়াল কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট- যেটা দেখেছি বেসরকারি খাতে সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল কম হতো, জনগণ স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ পেত এবং সরকারি খাত থেকে ভর্তুকির খরচ কমে যেত। পাওয়ার সেক্টরে পাবলিক সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট থাকা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই থাকে। ইনডিপেন্ডেন্ট কিছু কিছু ছোট জায়গায় যেখানে গভর্নমেন্ট একেবারে পৌঁছাতে পারবে না, সেখানে পাওয়ার প্ল্যান্ট কিছু হতে পারে। তবে একেবারে ঢালাওভাবে সব প্রাইভেট সেক্টর করবে না।

মার্কেটিংয়ের বেলায় অ্যাগ্রিকালচার মার্কেটিংয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিন্তু মার্কেট একেবারে ছেড়ে দেওয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কমলা উৎপাদন করে। বিরাট একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ওরা ওটার কন্ট্রোলে থাকে উৎপাদকের স্বার্থ দেখার জন্য। এটা বাজারের হাতে ছেড়ে দেয় না। তার পর কানাডায় হুইট (গম) বোর্ড আছে। কানাডার ফার্মাররা যে গম উৎপাদন করে, তাদের স্বার্থে এটা কাজ করে এবং ভোক্তাদের স্বার্থও দেখে। আর এখানে কৃষকদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে ফটকাবাজ বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারীদের হাতে। গভর্নমেন্টের তো এখানে কতগুলো রুলস, কতগুলো ফ্যাসিলিটিস থাকবে। এখানে কিন্তু পাবলিক সেক্টর রুল আছে। এখানে পাবলিক সেক্টরের প্রয়োজন। অনেকে বলে, রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক সব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর পক্ষপাতী নই। বরং রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যদি সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসে, তবে প্রতিযোগিতামূলক আবহ সৃষ্টি হবে ব্যাংকিং খাতে। আসলে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী যদি একেবারে নাই থাকে, তখন দেখা যাবে কী অবস্থা। অন্যরা ইচ্ছামতো কাজ করবে। অতএব রাষ্ট্রয়ত্ত সব ব্যাংক ছেড়ে দিলে কিন্তু চলবে না। একটা, দুইটা, তিনটা কিন্তু রাখতে হবে। যেমন সোনালী ব্যাংক প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের বেতন দেয়। এখন প্রাইভেট ব্যাংকে দিলে কী করবে। টিচারদের বেতনও হয়তো পৌঁছাবে না সময়মতো। সরকারের টাকাটা নিয়ে রেখে দেবে। আরেকজনকে ধার দেবে। তার পর সরকার ট্রেজারি ফি জমা দিল কিন্তু এক মাস, দুই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকাটা পাঠালই না। তবে অবশ্য কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও স্বচ্ছ এবং জোরদার করা। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে এগুলোকে মুক্ত করতে হবে।

কয়েক বছর আগে ফরাসি অর্থনীতিবিদ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তার নাম জ্যাঁ তি হল। তার মূল বিষয়বস্তু হলো, কী করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মার্কেটকে লোকজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না। তবে নিয়ন্ত্রণ খুব সোজা কাজ নয়। আদেশ-নির্দেশে কাজ হবে না। মেকানিজম তৈরি করতে হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। কেউ যদি এটা না মানে তাহলে তার তখন কী পরিণতি হবে। ফাইন হবে। ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন এখনো এটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই সেই চিন্তাটা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমাদের অর্থনীতিবিদরাও সে চিন্তা করছেন। জ্যাঁ তি হল অন্য লেখকের সঙ্গে আর একটি বই লিখেছেন। ‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস’। ব্যাংকগুলো যা ইচ্ছা তাই করবে, লোকজনকে বিপদে ফেলে আমানত নিয়ে ইনভেস্ট করবে। এটার রেগুলেট করা। কেয়ারফুললি করতে হবে। রেগুলেটকারীরা নিয়ন্ত্রণকারী যেন না হয়। বিশেষ করে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল। যথাযথভাবে এটাকে দেখতে হবে।

গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে ফুড সিকিউরিটি। গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে সুশাসন। তার  মধ্যে সবাই থাকবে। প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করবে। একটা কথা আছে, বাংলাদেশে এখন সুশাসনের অভাব। ইনভেস্টমেন্টের আবহ নেই। পরিবেশ নেই। অবকাঠামোর বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রবলেম আছে। আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছি না। যত তাড়াতাড়ি আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম, সেটা পারছি না। একেবারেই যে স্থির হয়ে আছি সেটা নয়। রানওয়েতে কিছুক্ষণ চলার পর প্লেন টেক অফ করে। আমরা কিন্তু টেক অফ স্টেজে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, আসলে এখনো আমরা রানওয়েতেই আছি। তার মানে চলার গতি কম ও রানওয়েটা দীর্ঘ হচ্ছে। এখনো আমরা টেক অফ করে ওপরে উঠতে পারছি না। টেক অফ হলে আলটিমেটলি গ্রোথ রেটে আমরা ছয়, সাত, আট করে ওপরে উঠে যেতাম। সেটা হলে আমাদের দ্রুত একটা উন্নতি দেখতে পারতাম।

রাজনীতির চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগণের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটোই পাশাপাশি চলতে হবে। আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন, আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন- তাহলে কিন্তু স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমাদের অঙ্গীকার হবে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এতে দিনে দিনে কেবল সমস্যার পাহাড় জমছে, কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয়, আইনের শাসন আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলা যায়। সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকগুলোর অর্জন ভালো। আমরা প্রবৃদ্ধির ৬-এর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে গেছি। এটি ইতিবাচক। সার্বিক উন্নতি সন্তোষজনক। এ জন্য বাংলাদেশ একটা মডেল। দুর্বল দিকটা হল, অর্জনের এ ফলগুলো সমাজের নিচের স্তরে অপেক্ষাকৃত খুব কম পৌঁছেছে। ধরুন ধনাঢ্য শ্রেণী, যারা আগে একটা গাড়িতে চড়ত, তারা এখন একাধিক গাড়িতে চড়ছে। গরিব লোক আগে স্যান্ডেল পরত না, তারা স্যান্ডেল পরছে এবং কিছু মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এর বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। যেটা ভালো নিদর্শন নয়। উন্নয়নটা সমতাভিত্তিক হচ্ছে না। সমতাভিত্তিক উন্নয়ন না হলে তা টেকসই হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি এ দুটিই চেয়েছিলাম। সেটি পূরণ হচ্ছে কি? এখন আমরা শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সুষম বণ্টন দেখছি না।

(লেখক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বর্তমানে  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ।)

 

বহুমাত্রিক বিচ্ছিন্নতা : রাষ্ট্রে মানুষে বিরোধ চরমে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

বিচ্ছিন্নতা মঙ্গলময় নয়। অনিশ্চিত ভয়ের জগৎ, বড় বিপদের। গনতান্ত্রিক রাজনীতি এবং বহুত্ববাদী সমাজ রাষ্ট্র এজন্যই যে, মানুষে মানুষে মেলবন্ধ তৈরী করে ন্যায্য রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে। কিন্ত রাষ্ট্রের শাসকদের মূল লক্ষ্যই হয় ক্ষমতা এবং অধিকতর ক্ষমতা, আর  শাসকরাই বিচ্ছিন্নতা উস্কে দেয়। কারণ জনগণ বিচ্ছিন্ন থাকলে কর্তৃত্ববাদ জারি রাখা সহজ হয়। এটাই বিপদের মূল কথা। এটা শুধু রাষ্ট্রের  নয়, সমাজ ও ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে, সংযোগ কমছে। রাষ্ট্রের সাথে প্রতিষ্ঠানের, প্রতিষ্ঠানের সাথে মানুষের, সমাজের সাথে ব্যক্তির, এমনকি পরিবারের ভেতরেও বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। গণতান্ত্রিক সমাজ ভাঙছে, কর্তৃত্ববাদ, একনায়কতান্ত্রিকতা স্থান করে নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমুহের নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে মাফিয়া ডনদের হাতে। একটি ‘ঠিকাদারী’ সমাজ তৈরী হয়েছে-বিচ্ছিন্নতার ষোলকলা পূর্ণ করে।

ছোট-বড় নগরীর দিকে তাকান! খাল-বিল-জলাধার ভরাট ও দখলের মচ্ছব চলছে। মানুষ ক্রমাগত বিপদাপন্ন হচ্ছে। রাষ্ট্র-সমাজে মুক্তচর্চার জায়গাগুলি বদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে। চর্চা চলছে অন্ধত্বের-চরম ভাবাপন্নতায়। মানুষের মধ্যে বাড়ছে অসহনশীলতা। রাষ্ট্র-সরকার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে গণতন্ত্র-সুশাসন থেকে। কর্তৃত্ববাদের নিয়ন্ত্রণে বেড়ে ওঠা  বিচ্ছিন্নতায় অসহনশীলতার মাঝে সমাজ ক্রমশ: সহনশীলতা সম্প্রীতির জায়গা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে।

প্রযুক্তির বিকাশে ডিজিটালাইজেশনের ছাপ সর্বত্র। সংযুক্ত হবার পথ অনেক। বিকাশের সাথে সাথে বিকৃতিও ভর করছে। সংযোগের পথগুলি খুলে গেলেও ‘ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড’ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত করছে ‘ছোট মন’ নিয়ে, সমস্যার মূল সেখানেই। ‘ছোট মন’ নিয়ে বড় জাতি হয়ে ওঠা যায় না। বড় জাতি হয়ে উঠতে হলে সকল জনগনের জন্য বিস্তৃত ক্ষেত্র নির্মান করা প্রয়োজন। বড় এবং বহুমাত্রিকতায় ফিরে যাওয় এখন এই দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে।

গত কয়েক দশকে আলো ফেললেই অন্ধকার যাত্রার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। গণতন্ত্রের নামে নানা বিধি-নিষেধ আর নিয়ম বেধে প্রতিষ্ঠানগুলিতে জনগনের সুযোগ ও অভিগম্যতা সীমিত করা হয়েছে। সর্বত্র ‘সংরক্ষণের নামে বহুজনের অবাধ সুযোগকে প্রতিহত করে জনগণকে ‘প্রান্তিক’ করে দেয়া হয়েছে। প্রভাব পড়েছে অবকাঠামোগুলিতে। মানুষ বিচ্ছিন্ন বোধ করছে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে। সরকারের মদতে দখল এবং সংরক্ষণ চেষ্টার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতা উস্কে ফল হয়েছে দু’রকম; এক. বহুজনের সুযোগ ও অভিগম্যতাকে প্রতিহত করায় সুযোগ তৈরী হয়েছে কতিপয়ের। দুই. এই কতিপয়ের হাতে পূঞ্জীভূত  রাষ্ট্রের সকল সম্পদ, ক্ষমতার অনুষঙ্গ হিসেবে তৈরী হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা, অন্তিমে হত্যা-গুম- রক্তপাত। এই ‘কতিপয়’রা হচ্ছেন, ক্ষমতাসীন অথবা ক্ষমতা কাঠামোয় যুক্ত সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, কথিত সুশীল সমাজ ইত্যাদি; এবং যথানিয়মে জনগন এদের থেকে যোজন যোজন দুরত্বে।

বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই বিপদজনক, অন্তত: জনগনের জন্য তো বটেই। কারন বিচ্ছিন্নতা সমাবেশহীন, জনমানবহীন ধূ-ধূ মরুপ্রান্তর। তাতে উৎসাহী হয়ে ওঠে অপরাধীরা। মানুষ যত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে, ততই প্রতিষ্ঠানগুলিতে জাঁকিয়ে বসে অপরাধীরা। ক্ষমতাবানরা অবৈধ দখলে নিয়ে নেয় জনগনের প্রতিষ্ঠানসমূহ। গণতত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতা না থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় অপরাধীদের ভাগারে।

ব্যক্তির সাথে সমাজের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। আধুনিকতার নামে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে পরিবারগুলি ভাঙছে-বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে; এমনকি স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যেও। প্রাইভেসির নামে মানুষ ক্ষুদ্র হতে হতে খোপের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া সুযোগবঞ্চিত শিশু-কিশোর ঢুকে পড়ছে ফেসবুক-ট্যুইটার-ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতে। বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কল্পজগতের আত্মহননে সাড়া দিচ্ছে।

বিচ্ছিন্নতা শুধু বিভাজন তৈরী করে না, ভয়ঙ্কর বিক্ষুব্ধতার জন্ম দেয়, পাল্টে দেয় মনোজমিন। গণতন্ত্রের জন্য খুব বড় বিপদের নাম বিচ্ছিন্নতা। মানুষকে বহু ধারার চিন্তা- ভাবনা, মত প্রকাশ- সব কিছু থেকে সরিয়ে দেয়। ভয়-আতঙ্কের অদৃশ্য জগৎ সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়।  যার সবচেয়ে বড় দৃশ্যমানতা হচ্ছে, উগ্রবাদী সহিংসতা, যা কেবল মৃত্যুময় অন্ধকার এক জগত। তাতেও কি স্বস্তি মিলছে! এভাবেই হনন ও আত্মহনন হয়ে দাঁড়াচ্ছে অমোঘ নিয়তি।

সংযোগ খুবই জরুরী। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, পরিবার থেকে সমাজে, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানে-সংযোগ খুবই প্রয়োজন। সংযোগ গড়তে হলে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার এবং নির্বিঘ্ন, গ্রহনযোগ্য ভোটের বিধান থাকতে হবে। সংযোগহীনতা অপরাধ এবং দুর্বত্তায়নের পথ করে দেয়। অপরাধী, সন্ত্রাসীদের জন্য বড় স্পেস তৈরী করে দেয়। অপরাধী মনোজমিন রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠান, পরিবার-সব জায়গা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে কতিপয় মানুষ হয়ে ওঠে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ও সর্বেসর্বা।

রাজনীতির সংযোগ হচ্ছে আম-জনতা। রাজনৈতিক দলগুলো সংযোগ করতে মানুষের কাছে যায়। এই সংযোগের মূল হচ্ছে দলীয় আদর্শ ও কর্মসূচি। সেগুলি নিয়েই জনগনের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করে। ভোটপ্রাপ্তির মাধ্যমে দলটি বুঝিয়ে দেয়, জনগন তার আদর্শ-কর্মসূচির সাথে কতটা যুক্ত কিংবা কতটা বিচ্ছিন্ন। এই সুযোগে বাইরের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় রাষ্ট্রের রাজনীতি, বানিজ্য এবং তথ্য প্রবাহ পর্যন্ত। সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই সুযোগ করে দেয় শক্তিধর দেশগুলিকে।

বিচ্ছিন্নতা বড় বিপদ। গণতন্ত্র, সুশাসন এবং অধিকারের ক্ষেত্রে। জনগনের ইচ্ছার সাথে, অপ্রাপ্তির সাথে শাসনের কর্মকান্ড বিপরীত হলে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। শাসক এতটাই অসহনশীল হয়ে পড়ে যে, জনগনের যে কোন দাবি হামলা-মামলা অথবা অস্ত্রের ভাষায় দমন করে। জনগন ও সরকারের মাঝে সৃষ্ট যোজনব্যাপী দুরত্ব অবদমিত জনরোষে পরিনত হয়।

এই রোষ এবং ইচ্ছা প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ হলে জনগন, বিশেষ তরুণ যুব জনগোষ্ঠি ধ্বসাংত্মক পথ বেছে নেয়। আর সেটিই হচ্ছে চরমপন্থার পথ। বিচ্ছিন্নতা তাকে নিয়ে চরমপন্থার সহিংসতা বা কোন মতাদর্শিক সহিংসতার পথে। বিচ্ছিন্নতার নেতিবাচক পরিনতি এদেশের মানুষ দেখেছে হলি অর্টিজানের নৃশংস হত্যাকান্ডে; শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে বোমা হামলায়।

একদিকে বিচ্ছিন্নতার ব্যাপ্তি ঘটছে, বিভাজন বাড়ছে। কতোটা, সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসহিষ্ণু গা হিম করা সব মন্তব্য দেখলে তরুণ-যুবদের মনোজমিন আঁচ করা যায়। গনতন্ত্র ভাঙ্গা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদ জায়গা নিচ্ছে, আবার উন্নয়ন দিয়ে সব মানুষকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করছি। এই স্ববিরোধিতা কাজে আসছে না। মানুষের আয় বাড়ছে, তারচেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে বৈষম্য। দারিদ্য কমার কথা বলা হচ্ছে, কিন্ত সব সম্পদ কুক্ষীগত হচ্ছে মুষ্টিমেয়’র হাতে।

সেজন্যই বিচ্ছিন্নতা পরিহার করা এখন খুব বড় কাজ। সরকার, ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলসমূহের সাথে জনগনের নিয়মিত সংযোগ গড়ে বিভাজন কমিয়ে আনা খুব দরকার। বিচ্ছিন্নতার বিভেদ এই দেশ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সংযোগ মানুষকে উদার করে, পরার্থপর করে তোলে। বিচ্ছিন্নতা ডেকে আনে মৃত্যু, সংযোগ ফিরিয়ে আনে স্বস্তি-শান্তির সুবাসিত জীবন।

বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এই দেশ অবধারিতভাবেই এগোচ্ছে নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার দিকে। মানুষ নি:সঙ্গ হয়ে পড়ছে, অপরাধের মনোজমিন জায়গা পাচ্ছে, নিষ্ঠুরতার আবেগকে ন্যায্যতা বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিপদের মূল জায়গা এটি। রাষ্ট্র-সমাজ, ব্যক্তি সব ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। এখান থেকে ফিরে আসতে হলে বিচ্ছিন্নতার চাষাবাদ বন্ধ করে সংযোগের নয়া আবাদ গড়ে তোলা জরুরী।

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্দ্বতত্ত্ব !

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির দ্বন্ধ কি? অনেকগুলো সরল উত্তর আছে। এক বাক্যে বলা যায়, আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপি’র দ্বন্ধ। অনেকে আর একটু স্থূল করে বলতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কারারূদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। কৈশোর উত্তর রাজনীতির যে শিক্ষা পেয়েছিলাম, সেখানে মুলদ্বন্ধ হচ্ছে, যে দ্বন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরী হয়। আর গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধের অধীন। অর্থাৎ গৌণ দ্বন্ধ রাজনীতির পরিবর্তন ধারায় কখনো মূল ঘটক নয়। তবে অনেক সময় গৌণ দ্বন্ধ মূল দ্বন্ধ রূপে নিয়ে পরিবর্তনের লাইম লাইটে আসে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধ কতকটা আদর্শের কারণে, কতকটা ক্ষমতার কারণে সে প্রশ্ন বিশ্বব্যাপী। তবে আদর্শকে আর একটু প্রায়োগিকভাবে রাজনৈতিক মত ও পথ বলতে পারি। রাজনৈতিক মত ও পথ এর কারণে একই আদর্শের অনুসারীদের মাঝেও দ্বন্ধের সূচনা হতে পারে। এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন- একই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে প্রথম যে দ্বন্ধ থাকে সেটা অবৈরী অর্থাৎ শক্রতা মূলক হয়না, পরে সেটা বৈরী বা শক্রতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ক্ষমতার কারণে রাজনৈতিক দ্বন্ধ ও প্রতিযোগিতা অন্ততঃ আধুুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতায় হিসেবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক ক্ষমতার চুড়ান্ত রূপ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার বহুমাত্রিক, যে কোন সংগঠনের পদ অর্জন রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে। কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্ব›দ্ব শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের ভোট, নিরস্ত্র বা সশস্ত্র অভ্যুথানের মধ্যে সীমিত নয়। আমাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর প্রবেশ ঘটে। রাজনৈতিক দ্বন্ধের হিংসা ও অহিংসা শুধু আদর্শগত কারণে নয়- লক্ষ্য অর্জনের কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অহিংসা রাজনীতিতে বিশ্বাসীরা ও হিংসাআশ্রিত কর্মপ্রণালীর সাথে যুক্ত হতে পারে। এ পর্যন্ত আমি যা বলছি তা বাংলাদেশের রাজনীতির মূল দ্বন্ধ ও গৌণ দ্ব›দ্ব নিয়ে আলোচনার ভনিতা মাত্র। আমরা যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্ধকে প্রধাণ দ্বন্ধ হিসেবে মেনে নেই, তবে এ দ্বন্ধের গতি প্রকৃতি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা। অন্য দিকে এ মূল দ্বন্ধের আশে পাশে যেসব গৌণ দ্বন্ধ নিয়ে আলোকপাত করা। এ গৌণ দ্বন্ধ এর মধ্য থেকে কোন একটি সামনে এসে মূল দ্বন্ধে পরিণত হতে পারে।

রাজনৈতিক দ্বন্ধের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুপাক্ষিক। যদিও বাহ্যিকভাবে মূলদ্বন্ধ ঘিরে এ দুই পক্ষ থাকে- তবে এই দু পক্ষের কাঠামোর বাইরে; ভিতরে-বাইরে আরো অনেকগুলো পক্ষ থাকে। এর সাথে আরো একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজনৈতিক মূল দ্বন্ধে নিরব ভোটারদের ভূমিকা কি? বা নাগরিকরা কিভাবে দ্বন্ধকে প্রভাবিত করেন বা নিজেরা প্রভাবিত হোন। বাংলাদেশে ১৯৯১ এর পর আওয়ামী লীগ বিএনপির দ্বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভিত্তিতে দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে। এই মুল দ্বন্ধের সরল বৈশিষ্ট্যের ভিতরে অনেক জটিল উপাদান রয়েছে। মূল দ্বন্ধের জটিল উপাদানগুলি দু’পক্ষের অভ্যন্তর থেকে আসে। দুই পক্ষের প্রান্ত অর্থাৎ ঢাকার বাইরে থেকে তৈরী জটিল উপাদান শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয় দুই ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যেমন- প্রধানমন্ত্রী ও তার পছন্দের বলয়, অন্যদিকে খালেদা জিয়া ও তার পছন্দের বলয়, এটাই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের বিশেষ দিক। বাইরের বিষয়গুলি কোনটি গৌণ নয়, যেমন বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের সমর্থনের মাত্রা; দ্বিতীয়তঃ ভারতের বাইরেও অন্য বিদেশী শক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। তৃতীয়তঃ সশস্ত্র বাহিনীর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সংবেদনশীলতা ও সাড়া দেবার প্রবণতা। চতুর্থতঃ রাজনৈতিক মেরুকরণের ধারা। পঞ্চমতঃ সরকারের ক্রাইসিস ম্যানেজম্যাণ্ট কৌশলের সফলতা।

উপরোক্ত পাচটি ধারা থেকে আসা রাজনৈতিক পরিবর্তনকামী উপাদানগুলি চিহ্নিত করতে পারলে, বর্তমান  রাজনৈতিক মূলদ্বন্ধের পরিনতির আভাস পাওয়া যেতে পারে।