Home » সম্পাদকের বাছাই (page 8)

সম্পাদকের বাছাই

বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে গণতন্ত্র : বাড়ছে বৈষম্য দমনপীড়ন, কমছে স্বাধীনতা

আসিফ হাসান ::

ক্ষমতার জন্য স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন ও লোকরঞ্জক ক্ষুধার প্রয়োগ অর্থাৎ দমনপীড়ন আরো কঠোর করার জন্য স্বৈরশাসকেরা সব হাতিয়ারই ব্যবহার করছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকারও ক্রমবর্ধমান হারে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর সামাজিক বিভাজন অনেক অনেক আগে যতটুকু ছিল, তার চেয়েও গভীর হয়েছে। জার্মানভিত্তিক গবেষনা সংস্থা  বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’ এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ এবং কোন কোন দেশ বিশেষভাবে এসবে আক্রান্ত, তা-ই তুলে ধরেছে।

গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও শাসনকাজের মান গত ১২ বছরে বৈশ্বিক গড়ে সর্বনিম্ন স্থানে নেমে গেছে। জার্মানীর গবেষনা সংস্থা বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’-এর প্রধান তথ্য হিসেবে এটিই ওঠে এসেছে। ২০০৬ সাল থেকে সংস্থাটি  ১২৯টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তাদের সিদ্ধান্ত হলো : অধিকতর উন্নত গণতান্ত্রিক কয়েকটি দেশসহ ৪০টি সরকার গত দুই বছরে আইনের শাসন খর্ব করেছে, ৫০টি দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ দেখা গেছে। অনেক দেশের শাসকই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি অথর্বতার পরিচয় দিয়ে গরিব ও প্রান্তিক লোকজনের ওপরই পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছে। অনেক সরকার ক্রমবর্ধমান সামাজিক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারেনি কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি এসব উত্তেজনায় ইন্ধনও দিয়েছে।

বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এই তালিকায় থাকা অনেক সরকারের নিম্নমানের বা বাজে দক্ষতার প্রধান কারণ হলো- তারা সংলাপ ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক সংঘাতে সাড়া দিতে আগ্রহী নয় কিংবা সক্ষম নয়। সূচক অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ৫৮টি দেশের চেপে থাকা সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। নির্বাচিত হওয়ামাত্র অনেক শাসকই নিজেদের রাজনেতিক ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করেছে। এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক লোকরঞ্জকদের মধ্যে রয়েছে হাঙ্গেরি ও তুরস্ক। অথচ এসব দেশের সরকার তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের আর্ট ডি গস গবেষণার তথ্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, অনেক শাসকই দমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নেতৃত্বে তাদের অবস্থান পোক্ত করেছে। অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানো ও সংলাপে না বসার পরিণতি হয় খারাপ।’

বাড়ছে বৈষম্য, কমছে স্বাধীনতা :

গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের দিকে উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা হলো অসন্তোষজনক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭২টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশে ব্যাপক দারিদ্র্য ও উচ্চ মাত্রার সামাজিক বৈষম্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২টি দেশে- এদের মধ্যে রয়েছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভেনেজুয়েলা- আর এইসব দেশগুলোর গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাত্রার অবনতি ঘটেছে। একই মেয়াদে দেশগুলোর মাঝারি থেকে ভালো মানের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশে নেমে গেছে।

আগের চেয়ে অনেক বেশি লোক কেবল কম বৈষম্যের মধ্যেই দিন গুজরান করছে না, তারা আরো বেশি দমনমূলক পরিবেশেও বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ৩শ ৩০ কোটি লোক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে রয়েছে (৪শ ২০ কোাটি  লোক রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনে)। সমীক্ষা শুরুর পর থেকে এত বেশি লোক কোনোকালেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে থাকতে দেখা যায়নি। যে ১২৯টি দেশে সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে বিটিআই ৫৮টিকে স্বৈরতান্ত্রিক  এবং ৭১টিকে গণতান্ত্রিক  হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই – এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যার বিষয় হলো নাগরিক অধিকার খর্ব ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পর্যন্ত আইনের শাসনের অবনতির বিষয়টি। ব্রাজিল, পোল্যান্ড ও তুরস্কের মতো সাবেক গণতান্ত্রিক বাতিঘর বিবেচিত দেশগুলোই এখন রূপান্তরশীল সূচকে পড়েছে সবচেয়ে বেশি করে।

আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে কেবল বারকিনা ফাসো ও শ্রীলঙ্কাই গণতন্ত্রের পথে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হাসিল করেছে। বিপরীতে মোজাম্বিক, তুরস্ক ও ইয়েমেনসহ মোট ১৩টি দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এসব দেশের পাঁচটি এখন আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদÐও পূরণ করতে পারছে না। এই পাঁচটি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা। স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর অধীনে বছরের পর বছর ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারসাম্য বজায় রাখার যে ব্যবস্থা নির্বাচন, সেটির মানে ঘাটতির কারণেই অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে।

স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে গণতান্ত্রিক শাসন অনেক ভালো :

এসব ঘটনা অনেক দেশের নাগরিকের জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ দুর্নীতি, সামাজিক বর্জন ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা স্বৈরতান্ত্রিক সময়ে অনেক বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। বিটিআইয়ের মতে, ১২টি গণতান্ত্রিক দেশ সফলভাবে দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয়েছে, আর স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে পেরেছে মাত্র একটি। মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ সমান সুযোগ যথাযথভাবে অর্জন করতে পেরেছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে এই সফলতা পেয়েছে ১১টি। ২৭টি গণতান্ত্রিক ও মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা ভালোভাবে সক্রিয় রাখতে পেরেছে। বিটিআই সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে গণতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই অধিকতর স্থিতিশীল ও কার্যকরব্যবস্থা নয়।

অবশ্য চীনের ক্ষেত্রে সত্যি যে – গত ১০ বছরেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশটি সবচেয়ে বিকশিত হয়েছে – অনেকের ধারণা স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান উদাহরণ। অবশ্য যারা চীনের অর্থনৈতিক সফলতার অবদান এর রাজনৈতিকব্যবস্থার ওপর আরোপ করতে চান, তারা সার্বিকভাবে স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর বাজে অর্থনৈতিক ফলাফলের বিষয়টি বুঝতে অক্ষম। রাশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভেনেজুয়েলার মতো অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিকব্যবস্থায় বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্সের’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক – উভয়টির বিকাশই বছরের পর বছর স্থবির হয়ে আছে।

(প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২২ মার্চ, ২০১৮)

ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন : রাজি নয় বিদেশী দাতারা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

প্রত্যন্ত একটি দ্বীপে এক লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে সরিয়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পনায় দাতা ও সাহায্য সংস্থা এবং দেশগুলোকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। নতুন স্থানটিতে রোহিঙ্গারা সাইক্লোন, বন্যা ও মানব পাচারকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দাতা ও সাহায্য সংস্থা এবং দেশগুলো। বার্তাসংস্থা রয়টার্স এমন খবরই দিয়েছে।

কক্সবাজারের জনাকীর্ণ উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ উদ্বাস্তু বাস করছেন। তারা আসন্ন বর্ষা মওসুমে বন্যা, ভূমিধস ও নানা রোগের হুমকির মুখে রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিকল্প স্থান হিসেবে কয়েক মাস ধরে গড়ে তুলছে ভাসান চরকে। তবে চরটির অবস্থা দেখার জন্য সাহায্য সংস্থাগুলোকে অনুমতি দেয়নি সরকার। তবে ৪ এপ্রিল ব্রিফিংয়ের সময় তাদেরকে চরটি নিরাপদ- এমনটি বোঝাতে ব্যর্থ হন কর্মকর্তারা।

মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ‘স্ট্র্যাটেজিক এক্সিকিউটিভ গ্রুপের’ (এসইজি) নেতৃত্বে কক্সবাজার ক্যাম্পগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা ইন্টার-সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি) ওই পরিকল্পনার ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের বক্তব্যে আইএসসিজি জানায়, দ্বীপটিতে বসবাস করার উপযোগী পরিবেশ নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। তারা জানায়, সরকার পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ায় তাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে দ্বীপটি অনুমোদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী বিদ্রোহীদের দমনের নামে শুদ্ধি অভিযান শুরু করার পর থেকে প্রায় সাত লাখ উদ্বাস্তু বাংলাদশে প্রবেশ করে। মিয়ানমারের সৈন্যরা বেসামরিক লোকজনকে টার্গেট করেছে বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা ওই দেশের সরকার অস্বীকার করে আসছে।

সাহায্য সংস্থাগুলো উদ্বাস্তুদের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউএনএইচসিআর গত মার্চে এক বিবৃতিতে জানায়, দুই লাখ তিন হাজার লোক বন্যা ও ভূমিধসের শঙ্কায় রয়েছে। বৃহত্তম ক্যাম্পটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানায়, জায়গা খুবই দুর্লভ। বিদ্যমান ক্যাম্পটির আশপাশে উপযুক্ত কোনো স্থান পাওয়া যায়নি।

মেঘনা নদীর মোহনায় পলি জমে জমে ভাসান চরের (অর্থাৎ ভাসমান দ্বীপ) উদয় হয়েছে। সরকার এটিকে স্থায়ী ভূখন্ড ও উদ্বাস্তুদের সাময়িক আশ্রয়স্থল হিসেবে তৈরি করার জন্য ২৮০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘোষণা করেছে।

সরকারি স্লাইড প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে ১২০টি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বন্যা মোকাবিলার জন্য ১৩ কিলোমিটার বাধও নির্মাণ করা হবে।

গত এপ্রিলে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডা মিশনে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বলা হয়, মে মাসের মধ্যে কাজের বড় অংশ সমাপ্ত হবে, জুনে এক লাখ উদ্বাস্তুকে সেখানে নেওয়া যাবে।

কিন্তু জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইসিআরের একটি নিজস্ব প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য ঝুঁকি ছাড়াও সাইক্লোন ও বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়ে গেছে। তাছাড়া অরক্ষিত লোকজনকে একটি এলাকায় আবদ্ধ করে রাখা হলে তারা মানব পাচারকারী ও চরমপন্থীদের খপ্পরে পড়ে যেতে পারে।

দাতাদের সামনে উপস্থাপিত স্লাইডে দেখা যায়, সরকার উদ্বাস্তু ও নিরাপত্তা কর্মীদের থাকার ব্যবস্থার পাশাপাশি সাহায্য সংস্থাগুলোর জন্যও স্থাপনা নির্মাণ করছে।

ভাসান চর প্রকল্পকে সমর্থন করার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএমের মুখপাত্র ফিওনা ম্যাকগ্রেগর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি একটি ইমেইলে বলেন, আমরা এখন কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছি, পরিস্থিতি আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছি।

বিশ্বকাপের রাজনীতি আর অর্থনীতি

আসিফ হাসান ::

খেলা কেবল খেলাই নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি। ক্রীড়া প্রতিযোগিতাটি যত বড় হবে, তাকে ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মারপ্যাচ ততো বেশি থাকে। রাশিয়ায় যে বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে, সেটিও এর বাইরে নয়। মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য বিশ্ব যখন বিভিন্ন ইস্যুতে রাশিয়াকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে; আবার রাশিয়া যখন তার হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে- ওই সন্ধিক্ষণেই ওই দেশটিতেই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় একক বৃহত্তম ক্রীড়ানুষ্ঠানটি। অলিম্পিক গেমসে এর চেয়ে বেশি দেশ অংশ নেয়, কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়, তা অন্য কোনো ইভেন্টে দেখা যায় না।বিশ্বকাপে শিরোপার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে যেমন ৩২টি দলকে বিপুল প্রয়াস চালাতে দেখা যায়, তেমন এই আসর আয়োজন করার দাবিদার হতেও কম কাঠখড় পোড়াতে হয় না। বরং বিশ্ব-রাজনীতির কলকাঠিগুলো তীব্র বেগে নড়াচড়া করতে থাকে আয়োজক দেশ হওয়ার লড়াইয়ে। নানা সমীকরণ কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সবচেয়ে জনপ্রিয় আসরটির আয়োজক হওয়ার দৌড়ে জয়ী হওয়া সম্ভব হয়।বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে এটিও কম সম্মানের ব্যাপার নয়। এখানে লড়াইটি কম জমজমাট নয়।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক হতে চেয়েছিল রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্ধী অনেক দেশই। খোদ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়াও ছিল। কিন্তু তারা বাদ পড়েছে কিংবা রুশ সমীকরণের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কিন্তু রাশিয়া একদফা জিতে আছে।  রাশিয়া যে আবার সোভিয়েত আমলের  প্রভাব সৃষ্টি করতে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে, বিশ্বকাপ আয়োজনের কৃতিত্ব লাভ তারই একটি আলামত। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপে তারা যে এখনো মার্কিন প্রভাবিত বিশ্বের সাথে লড়াই করতে পারে, সেটিই তারা দেখিয়েছে এই আসর আয়োজনের মাধ্যমে। আর ভ্লাদিমির পুতিন এর মাধ্যমে দেশে ও সেইসাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে ও তার দেশকে তুলে ধরার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন।

কয়েক মাস ধরেই পুরো বিশ্বের নজর রাশিয়ার দিকে। আর বিশ্বকাপ চলাকালে রাশিয়াই থাকছে বিশ্বের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের প্রধান খবর। দুনিয়াজুড়ে এই মাতামাতির প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন আছে, তেমনি আছে পরোক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব। একে পুঁজি করে অনেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাশিয়া তাই হিসাব কষেই এই পথে নেমেছিল।

অনেক সময়ই দেখা গেছে, নিজেরা না পারলেও প্রতিদ্বন্দ্ধী কোনো দেশ যাতে এই সম্মান লাভ করতে না পারে, সেই চেষ্টা দেখা যায়। রাশিয়ার ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। রাশিয়ায় যাতে বিশ্বকাপ না হতে পারে, সেই চেষ্টা একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত ছিল। কিন্তু রাশিয়া শেষ পর্যন্ত তার অবস্থানে টিকে থাকতে পেরেছে। যে দেশটিকে বয়কট করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইন করেছে, এমনকি তৃতীয় দেশ বড় ধরনের ব্যবসা করলে তাদেরও অবরোধের মুখে পড়তে হবে বলে হুমকি দিচ্ছে, সেই দেশের দিকেই সবার নজর পড়াটা কম কৃতিত্বের বিষয় নয়।

রাশিয়া অবশ্য কেবল রাজনীতিতেই লাভ খুঁজছে না, অর্থনীতিতেও এর মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বকাপ আয়োজন করতে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ লাগে। নতুন নতুন স্টেডিয়াম বানাতে হয়, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে দেদারসে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু তারপরও আয়োজক দেশ অর্থনৈতিকভাবে বিপুল লাভবান হয়। সংগঠকরা আশা করছেন, বিশ্বকাপের মাধ্যমে রুশ অর্থনীতিতে ৩১ বিলিয়ন ডলারের প্রভাব ফেলবে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে দেশটির জিডিপি ১.৬২ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ১.৯২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই রুশ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ আয়োজনে মোট ব্যয় হচ্ছে ১১ বিলিয়ন ডলার (৬৮৩ বিলিয়ন রুবল)। এতে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার চাকরি সৃষ্টি হয়েছে।

জাঁকজমক আয়োজন করে লাভবান হওয়ার ইতিহাস রাশিয়ার সাম্প্রতিক অতীতেও আছে। এই ২০১৪ সালের সোচিতে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিক গেমসে রাশিয়া ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে চমক দেখিয়েছিল। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শীতকালীন গেমসে পরিণত হয়েছিল।

বিপুল ব্যয়ের পরিণামে সোচি এখন সারা বছর পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ওঠে এসেছে। বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে এর চেয়েও বেশি লাভবান হবে বলে অনেকে মনে করছে।

তবে চূড়ান্ত লাভ-লোকসানের হিসাব মেলে অনেক পরে। সেই হিসাব মেলানোর কাজটির জন্য আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

 

শওকত আলী : ‘প্রদোষ’কালের পান্থজন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তরুণ শওকত আলী ঘুরেছেন অবিশ্রাম। বনে-বাদাড়ে, পথ-প্রান্তর, গ্রামীন অস্পৃশ্য জনপদ-বাদ যায়নি কোনকিছুই। লেখার প্লট খুঁজতে কলেজ শিক্ষকতার পাশাপাশি তার বেলা কেটেছে ওভাবেই। রাঢ় বঙ্গ, উত্তরের জনপদ, শহর আর গ্রামীন জীবনের নানান উপাখ্যান ধারণ করতে এই ঘোরাঘুরি স্বার্থক হয়ে ওঠে, যখন সুনিপুন দক্ষতায় শিল্পীর তুলির মত আঁচড় কাটেন মূর্ত বাস্তবতায়।

তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শোনা যাক- জায়গাটা ঠাকুরগাঁও জেলার বীরগঞ্জ। তেভাগা আন্দোলনের এলাকা। উত্তরাঞ্চলে শীত থাকে চোত মাস পর্যন্ত। বুড়ো সাঁওতাল, সবাই কান্ত মোড়ল বলে ডাকে, ‘৪৮’র কৃষক আন্দোলনে পুলিশের সাথে লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পা কাটা গিয়েছিল। বিকেলের মরে আসা রোদে মাঠে শুয়ে থাকে।

কান্ত’র পাশে বসে গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, শুয়ে থাকো কেন? ‘শুয়ে থাকতে হামার ভাল্লাগে’- নির্লিপ্ত জবাব কান্ত’র। কিরকম ভাল লাগে-শুধালাম। বল্লে, ‘আমি গান শুনতে পাই’। তারপর যে কথাটি বল্লে, বাংলা ভাষার কোন কবি এখনও বলেনি, ওরকম কবিত্বময় কথা। কান্ত জানালে, “মাটির তলার গান শুনতে পাই। বীজ ফেলা হচ্ছে, বীজ থেকে অঙ্কুর বেরুচ্ছে। একটা করে পাতা ফুঁটছে আর গান হচ্ছে। হামি সে গান প্রাণ ভরে শুনি”।

এটি আসলে কবিতা নয় বা কবিতার বিষয়ও নয়। অমন কবিতা কেউ লেখেনি কখনও। এটি পুরোটাই জীবনের গাণ।

সুনির্দিষ্টভাবেই এটি সুরিয়ালিজম বা স্বপ্ন-বাস্তবতার বিষয়। রিয়ালিজম’র বিস্তুৃতকরনটাই হচ্ছে, স্যুরয়ালিজম। যেখানে স্বপ্ন-বাস্তবতা, কল্পনা-মিথ পাশাপাশি থাকবে। আর যিনি লিখবেন, তার থাকবে সুনিপুন খনন দক্ষতা। প্রাক ও পরবর্তী ষাট দশক আমাদের সাহিত্য অবলোকন করতে শুরু করে সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন-বাস্তবতা। ইউরোপে যার সূচনা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই। এই সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন বাস্তবতার খনন ও কথন দক্ষতা শওকত আলীকে আমাদের কথা সাহিত্যে করে তুলেছে মহত্তম।

শওকত আলী নিজেও জানাচ্ছেন, ‘আর্লি সিক্সটিতে যারা লেখালেখি শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে এটি পাওয়া যাবে’। তবে তার মতে, এই ধারায় ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) সবচেয়ে সফল। আশির দশকের শেষে দৈনিক কোলকাতায় শারদীয় সংখ্যায় শওকত আলী লিখেছিলেন, ‘তাবিজ’ নামের উপন্যাস।

এই উপন্যাসে শওকত আলী দেখিয়েছিলেন, মানবমুক্তির বিরুদ্ধে ধর্মাশ্রিত মিথ্গুলি কিভাবে কাজ করে। কিন্তু কোলকাতার কাগজ এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন; ‘তাবিজের নকশা’, ‘গরু’ এবং ‘জবাই’ শব্দগুলো বাদ দিয়েছিল। ফলে ১৯৯২ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পুনর্বার এটি অবিকৃতভাবে প্রকাশিত হয়।

শওকত আলী নিজেই বলেছিলেন, “ওরা (কোলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকরা) ধর্মাশ্রিত মিথ্ আর মানবমুক্তির বিরোধটি বোঝেনি বলেই বিপ্লব হয়নি। বামপন্থা বিষয়টিই আধুনিকতা এবং প্রগতির ব্যাপার। মানুষের মুক্তির সংগ্রাম সব দেশে, সবসময় হয়েছে, রাশিয়া বা চীনে হয়েছে। ঠিক সেভাবে আমাদের দেশে হবে তা কিন্তু নয়”।

এখানকার ব্যর্থতা সম্পর্কে শওকত আলী জানাচ্ছেন, “… কিন্তু যারা বামপন্থার রাজনীতি করেছেন, কমিউনিষ্ট পার্টি করেছেন, তাদের প্রবলেম হয়েছে তারা ভদ্রলোকের ছেলে। কোলকাতার ঔপনিবেশিক কালচারের মধ্যে তারা লেখাপড়া শিখেছেন। আধুনিকতা বলতে ঐটাই বোঝায়। গ্রামের লোক মূর্খ-চাষা। চাষা শব্দটি হয়েছে গালি, ‘দুর ব্যাটা তুই একটা চাষা…’।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথক শওকম আলীর প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত বামধারার “নতুন দিনের কথা” কাগজে। সেটি ছিল পঞ্চাশ দশকের মধ্যভাগ। এর পরে দীর্ঘ বিরতি। ‘৬২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস “পিঙ্গল আকাশ” এবং ৬৮ সালে প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ “উম্মুল ভালবাসা”।

১৯৪৭ এর বিভাগোত্তর কালে বাংলা সাহিত্যের মূল কেন্দ্রটি ছিল কোলকাতার দখলে। সোমেন চন্দ্র, রনেশ দাস গুপ্ত, কিরণ শঙ্কর সেনগুপ্ত, অন্যদিকে মুসলিম সাহিত্য বা শিখাগোষ্ঠি পূর্ববঙ্গের হলেও তাদের দৃষ্টি সেই কোলকাতার দিকে। দেশ বিভাগের পর পরই পরিষ্কার হয়ে গেল, পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকাকেই নতুন করে শুরু করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে অগ্রযাত্রাটি।

ঢাকা কেন্দ্রিকতায় তখনকার পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে ভাষা ও অবয়ব নির্মাণ করেছিলেন যে ক’জন কথাশিল্পী, তাদের মধ্যে শওকত আলী ছিলেন পুরোথা। অর্থাৎ বিভাগোত্তরকালের ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যের ক্ষীণধারাটি এভাবেই পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। কিন্তু সে সময়ে শওকত আলীদের মত প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী লেখক-সাহিত্যিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সদ্য প্রসূত পাকিস্তানী “জজবা’র প্রতি অনেক লেখকদের উম্মাদনা। সে সময় কথিত জাতির পিতা জিন্নাহ্, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং আরবের বিজয়গাঁথা নিয়ে একরকম উম্মাদনা শুরু হয়েছিল।

এর মূল কারণ ছিল, কোলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যে এদের অভিগম্যতা কম থাকায় নব্য পাকিস্তানে অনেকটা রুদ্ধ আবেগ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে শাসকদের গুনগান এবং ধর্মীয় মিথ্গুলি নিয়ে লেখালেখি। সম্ভবত: এ কারনেই এসব লেখালেখি শুরুতেই পাক-শাসকগোষ্ঠির নজরে আসে, যার মধ্য দিয়ে একধরনের সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধি উস্কে দেয়ার প্রবণতা তৈরী হয়েছিল।

এরকম চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের অবয়বটি নির্মিত হয়েছিল। প্রগতি ও মানবিকতার সংমিশ্রনে এই দুরুহ কাজটি যাদের হাত দিয়ে এগোচ্ছিল- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শওকত আলী, আহসান হাবীব নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ঐ ধারার। উত্তরকালে এটিকে শক্তিশালী করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং হাসান আজিজুল হকের মত কালোর্ত্তীণ কথা সাহিত্যিকরা।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে লেখক-সাহিত্যিকদের নবচেতনার উন্মেষ ঘটে। ক্রমশ:“পাকিস্তানী জজবা’র উচ্ছাস কেটে যেতে থাকে। ফলে উল্লেখযোগ্য অংশটি প্রগতিশীল ধারায় সামনে এগোতে থাকেন। যদিও আমাদের তৎকালীন সাহিত্য ভাষা আন্দোলনকে শুধুমাত্র ‘ভাষাকেন্দ্রিকতা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছে, অল্প-বিস্তর ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। এটি যে ছিল বাঙালী জাতির স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের সূচনা, সেই বিশ্লেষণটি সেকালের লেখালেখিতে কমই উঠে এসেছে।

ষাট দশকের ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য কলা-কৈবল্যবাদের নামে কথিত সৌন্দর্যবাদীতা এবং বামধারার যান্ত্রিকতার মধ্যে পড়ে খাবি খাচ্ছিলো। এমনকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও শুরু করেছিলেন এই নিরীক্ষা দিয়ে। পরে অবশ্য “খোয়াবনামা” ও “চিলেকোঠার সেপাই” -এর মত অবিস্মরণীয় উপন্যাস তাকে তথাকথিত কলা-কৈবল্যবাদের চর্চা থেকে ছিটকে দেয়। বাংলা সাহিত্যের জন্য এটি বড় সৌভাগ্য।

শওকত আলী কলা-কৈবল্যবাদ অথবা বামধারার যান্ত্রিকতার ঐ ধারায় সমর্পিত হননি। ফলে তাকে  “সেকেলে” গোছের তকমা এঁটে দেয়া হয়। কিন্তু তাতে কি! তিনি লিখেছেন, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির ওপর ভর করে। বামপন্থী সাহিত্যিক হলেও তার লেখাকে কখনও বামধারার অনেকের মত জঞ্জাল হতে দেননি, সৃষ্টি করেছিলেন মানবিকতা বোধসম্পন্ন সাহিত্য।

তার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ “প্রদোষে প্রাকৃতজন”-এ তিনি দেখিয়েছেন, দুঃখের সুদীর্ঘ এবং কঠোর অন্ধকার অতিক্রম করে প্রাকৃতজন ঝকমকে এক প্রত্যুষ অবগাহন করার প্রতীক্ষা করছে। বসন্ত দাসের বয়ানে,“যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতজন এভাবেই প্রতিরোধ করে লাঞ্চিত হয়, নিহত হয়, ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু তথাপি ঐ একই সঙ্গে সে প্রতিরোধ করতে ভোলেনা। হয়তো বিচ্ছিন্ন, হয়তো একাকী এবং শস্ত্রবিহীন; তথাপি তার দিক থেকে প্রতিরোধ থেকেই যায় !”

এই উপন্যাসে তার মূল মেসেজটি ছিল: যে রাজশক্তি প্রজাদলনে অভ্যস্ত, প্রজার কল্যাণ করে না, সে রাজশক্তি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়। সামান্য বহি:আক্রমনে ধ্বসে যায়। সেজন্যই তুর্কী খিলজী’র আক্রমনে নদীয়ার সেন রাজবংশ পালিয়ে যায়। আর এরই মাঝে সাধারন মানুষের প্রতিরোধ- সংগ্রামকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে কালজয়ী উপন্যাস “প্রদোষে প্রাকৃতজন” ।

আবার গ্রামীন লোক বিশ্বাসের ওপর আরেকটি অনবদ্য কাজ “মাদার ডাঙ্গার খেল্”। কোন ঘটনাই অলৌকিক নয়, প্রত্যেকটির পেছনেই থাকে কার্যকারন বা অন্তর্গত সত্য। সেটি না বুঝলে তৈরী হয় রহস্য, মিথ্ এবং ছড়ায় নানান ডালপালা। চাল-চুলোহীন হাটে হাটে ফেরি করে বেড়ানো ফুলমতী বেওয়ার ছেলে রাজ মোহাম্মদ বা রাজু পন্তিতের হঠাৎ ধনী হয়ে যাওয়ার গল্প এটি। এই নিয়েই সৃষ্ট রহস্য এবং উন্মোচনের গল্প “মাদার ডাঙ্গার খেল্”।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি “বিচিত্রা’য় প্রকাশিত ট্রিলজি ‘পূর্বদিন পূর্বরাত্রি’, ‘কুলায় কালস্রোত’ এবং ‘দক্ষিণায়নের দিন’ ধারন করে আছে ‘৬৯’র গণ অভ্যূত্থানের বিশাল ক্যানভাস। সেইসাথে সেজান এবং রাখিব ‘সুরিয়ালিষ্টিক’ভালবাসার অনবদ্য গল্পটি। এই ত্রয়ী উপন্যাসের সাথে সময় ও প্রেক্ষাপটের সাদৃশ্য রয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর সাথে। বাংলা সাহিত্যের খুব বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে এ সকল উপন্যাস।

আমরা দেখেছি, তার সময়কালের সাহিত্যিকদের মধ্যে সাধারন মানুষের জীবনাচার, দ্ব›দ্ব-সংঘাত, বিকাশমান জীবনের নানান উত্থাণ-পতন এবং শ্রেনীদ্ব›েদ্বর বিষয়, সংস্কৃতি, প্রথা অনেকটাই উপেক্ষিত হচ্ছে অথবা ভাসা ভাসাভাবে এসেছে। আমাদের লিখিয়েরা খুব উপরিকাঠামো থেকে দেখেছেন সাধারনের জীবন। খননের মধ্যে যাননি, কিংবা জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার তীব্র ঝাঁজ এবং বেঁচে থাকার কঠোরতার বিষয়গুলো উঠে আসেনি কারো লেখায়।

এখানেই শওকত আলীর ব্যতিক্রম। চরিত্রগুলি তিনি আবিস্কার করতেন। যেমনটি ঘটেছে, কান্ত মোড়লের ক্ষেত্রে। কান্ত মাটিতে কান পেতে থাকে। মাটির গান শোনে। বুঝতে পারে মাটির অভ্যন্তরে কিভাবে জীবনের উন্মেষ ঘটছে এবং এই হচ্ছে চরিত্র। বাস্তবতা হোক, স্বপ্ন-বাস্তবতা, অর্ধ বাস্তবতা, যাই হোক- এই একেকটি জীবন্ত চরিত্র। এর মাঝে শওকত আলীর তত্ত¡টা হচ্ছে, মানুষের সংগ্রামের। মানুষের মুক্তির সংগ্রামের যে কাহিনী, সেটিই জেগে ওঠে মাটির গানের মধ্যে। মুক্তির বিষয়টি থাকে মানুষের মাঝে গান হয়ে, ছবি হয়ে, স্বপ্ন হয়ে। সেখান থেকেই মানুষ মূলত: উদ্দীপনা পায়।

এটিই বাস্তবতা। কিন্তু স্বপ্ন-কল্পনার মাঝের অবস্থানটা প্রত্যক্ষ বাস্তবতা নয়। শওকত আলী মনে করছেন, এটিই সুরিয়ালিজম। রিয়ালিটি ও কল্পনার এই যে একত্র সমাবেশই মানুষকে আর সব থেকে আলাদা করে তোলে। এর সাথে লড়াই-সংগ্রামের মিথ্গুলি যুক্ত হয়ে বাঁচার লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা তৈরী করে। সেজন্যই তার লেখায় ব্রাত্যজন, অন্তজ বা সাধারনরা কখনও পরাজিত হয়না।

এজন্যই তিনি শওকত আলী। আমাদের সাহিত্যের ‘প্রদোষ’ কালের মানুষ। প্রগতিশীল বামপন্থী হয়েও গতানুগতিক নন। বড় লেখকরা কখনই নির্দিষ্ট ধারায় আটকে যান না। সেজন্যই তার প্রতিটি কাজ তাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তিনি মার্কসীয় সাহিত্য রচনা করেননি, যা করেছেন তা মানুষের জন্য। শিল্পের জন্য শিল্প নয়, মানুষের জন্য শিল্প। এ ব্যাপারে তার নিজেরই মত ছিল, মানুষের জন্য রচিত সকল সৎ সাহিত্যই হচ্ছে সত্যিকাবের মার্কসীয় ধারার সাহিত্য।

এই ধারায় সবচেয়ে সুনিপুন কারিগর ছিলেন শওকত আলী। সুরিয়ালিজম আর মিথ্’র সমাবেশীকরন দেখতে পাই ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ। সেজন্যই এটি বিশ্ব সাহিত্যতুল্য। আর সেখানেই তিনি প্রায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তার তুলনা করা যায় সমকালীন বাংলা সাহিত্যের আর দু’জনের সাথে। একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অপরজন হাসান আজিজুল হক। এই তিনজনের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শওকত আলী চলে গেছেন; আছেন হাসান আজিজুল হক।

এদের মাঝখানে প্রাক ষাট পর্বটি শওকত আলীর। সেকাল থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যের এই ধারায় তাদের হাত ধরেই কাজগুলি এগিয়েছে। তার ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’, হাসান আজিজুল হকের, ‘বিধবাদের কথা’ সুরিয়ালিষ্টিক স্বপ্ন-বাস্তবতার মহত্তম উদাহরন। আর এখানেই শওকত আলী আমাদের সমকালীন বাংলা সাহিত্যে ‘প্রদোষকালের পান্থজন’।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

১.‘সাপ্তাহিক’ পত্রিকায় প্রকাশিত শওকত আলীর সাক্ষাৎকার;

২. ৩০ জানুয়ারি ২০১৮ ‘প্রথম আলো‘য় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ;

মাদক যুদ্ধ : ক্রসফায়ারেই কী সমাধান ?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ম্যানিলা সিটির কার্টিলো রামিরেজের মর্ত্যে উচ্চারিত শেষ শব্দটি ছিল “দৌড়াও”। এই চিৎকারই তার স্ত্রীর ভিক্টোরিয়ার প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু কোন সুযোগই পায়নি রামিরেজ। মুখোশধারী ছয় মোটরসাইকেল আরোহীর গুলি তাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। আলোকোচ্ছটায় বর্ণিল ম্যানিলায় তখন ১১ ডিসেম্বর ২০১৭’র রাত। ঠিক এক সপ্তাহ পরে তার একমাত্র কন্যা স্বামীসহ নিহত হয় ক্রসফায়ারে। এই খন্ডচিত্রটি ফিলিপাইনে চলতে থাকা ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর।

‘চরমপন্থী ’ প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতার্তের ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হওয়া “ওয়ার অন ড্রাগস” বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এরকম ভয়াবহ চিত্র এখন সারা ফিলিপাইনের নিত্যদিনের ঘটনা। সস্ত্রীক চাল কিনতে বাজারে যাওয়া রামিরেজ মাদক কারবারী ছিলেন কিনা তা প্রমানের আগেই পরিবারশুদ্ধ তাকে হত্যা করা হয়। ম্যানিলার দরিদ্র অধ্যূষিত এলাকাগুলিকে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-র  মূল্য দিতে হচ্ছে এভাবেই, জীবন দিয়ে।

অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচার-সবই করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মারছে শত শত মানুষ। এর মধ্যে দুতার্তের প্রতিপক্ষরা রয়েছে, এমনকি মিন্দানাও শহরের মেয়র পর্যন্ত রয়েছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোষ্ট -এর ২০ জানুয়ারি’১৮ এবং ২০১৭-র ১৬ নভেম্বর সংখ্যার বিশেষ রিপোর্টের ভাষ্যে বলা হয়, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দুতার্তে সৃষ্টি করছেন ‘একটি এতিম জেনারেশন’- যা আগামীতে ফিলিপাইনে চরমপন্থা উস্কে দিতে পারে, কারণ হত্যাকান্ড শুরু হলে তার বিস্তৃতিই কেবল ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ চলছে অনেকটা ফিলিপিনো ষ্টাইলে। ‘আমরা জঙ্গীবাদ রুখে দিয়েছি। এখন আমরা দেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে চলেছি’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র এই বক্তব্য জানান দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকার অবশেষে জঙ্গীবাদ দমনের মত কঠোর অবস্থানে। তার পরিনাম আমরা দেখছি, কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে ইতিমধ্যে নিহতের সংখ্যা শ’ ছুঁতে চলেছে। অভিযান কতদিন অব্যাহত থাকবে সেটি পরিস্কার নয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্যমতে, অভিযোগ এবং প্রমান থাকলে সংসদ সদস্য বদি’রও রেহাই মিলবে না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায় এক্ষেত্রেও অভিযোগ, তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার সর্বগ্রাসী। টাকার অংকে তো বটেই, সংখ্যায়, পরিমানে মাদক এখন মহামারী। কিশোর-তরুণদের বড় অংশ মাদকের কবলে। এর কারবার এতটাই অনিয়ন্ত্রিত এবং সর্বগ্রাসী যে, সরকারকে বন্দুকযুদ্ধে এর সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। এতে যারা নিহত হচ্ছেন তারা মূলত: ‘ক্যারিয়ার’ বা ‘পুশার’ এবং ‘এ্যডিক্ট’। কমন ব্যাক-গ্রাউন্ড হচ্ছে, কম-বেশি হতদরিদ্র পরিবারের কিশোররা চুরি-চোট্টামি, ছিঁচকে চুরি-ছিনতাই থেকে একসময় ভিড়ে গেছে মাদক কারবারে, কাজ করছে ড্রাগ চেইনের ‘লিংক’ হিসেবে। যে চেইনের শীর্ষে অমিত ক্ষমতাধররা।

বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্ত পথে বাংলাদেশে মাদক ঢুকছে কিভাবে? সরবরাহ উৎসপথে আটকে যাচ্ছে না কেন? এর মূল কারন হচ্ছে, চোরাচালানের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আর এই কালো অর্থনীতি গ্রাস করছে সরকারের দায়িত্ববানদের। ঠেকানো যাদের দায়িত্ব, তারাই মাদক সরবরাহ নিশ্চিত করছেন। কারন তারা এই কারবারের অংশীজন। এইজন্যই সারাদেশ জুড়ে মাদকের বিস্তার।

বহুল উচ্চারিত মাদক ইয়াবা থেকে আয়কৃত টাকার পরিমান কেমন? ভিমরি খাওয়ার মত তথ্য আছে। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের হিসেব মতে,  মিয়ানমার থেকে বছরে বাংলাদেশে ৮০ কোটি পিস যার মাথাপিছু বরাদ্দ ৫ পিস। এর বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ৬’শ কোটি বেশি নয়। মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা বিতাড়নেই বাংলাদেশকে বিপদে ফেলেনি, ইয়াবা সরবরাহ করেও বিপদে ফেলেছে। এর সাথে জড়িত  উভয় দেশের অসৎ রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্য  ও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী (বিজিপি)।

কিছু সূত্র ধরিয়ে দেয়া যাক। বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নায়েক রাজ্জাককে মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশের সীমানা থেকে ২০১৬ সালে। তখন স্বরাষ্ট প্রতিমন্ত্রী, (এখন পূর্ণমন্ত্রী) বলেছিলেন, সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে এটি ঘটেছে। নয় দিনের মাথায় নায়েক রাজ্জাক ফেরত আসার পরে বিজিবি মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, এটি ভুল বোঝাবুঝির কারনে নয়। হাবিলদার লুৎফরের বদলে নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিজিপি মহাপরিচালকের ভাষ্যে সে সময় জানা গিয়েছিল, ২০১৪ সালের ২৭ মে বিজিপি’র গুলিতে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় নিহত হয়েছিলেন বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমান। ইয়াবা পাচারের  এই রুট থেকে প্রচুর ইয়াবা আটক করা হয়েছিল। একবছর পর নায়েক রাজ্জাক নাফনদীর এলাকা থেকে ১২ লাখ পিস ইয়াবা  আটক করেন। এইজন্যই তাকে অপহরন করা হয়। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, ইয়াবা চোরাচালানে কারা, কিভাবে যুক্ত এবং বিজিবি’র সৈনিকদের হত্যা, অপহরণের পেছনের মূল কারণও ইয়াবা ব্যবসা।

গত ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই রোহিঙ্গা সলিডারিটি নেতা হাফেজ সালাহ উল ইসলাম বৈঠক করছিলেন সৌদি নাগরিক আহমেদ সালেহ আল তান্দী’র সাথে টেকনাফের একটি বাড়িতে। বৈঠকটি হচ্ছিলো ২৬ কোটি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। বৈঠকরত অবস্থায় বাড়ির মালিক মাওলানা সৈয়দ করিমসহ সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরপরই ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেন গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেবার জন্য। পরে অবশ্য বিজিবি মহাপরিচালকের বরাতে প্রথম আলো’র খবর: আরএসও নেতা ও সৌদি নাগরিকের সাথে বৈঠকে বদির সংশ্লিষ্টতা নেই।

আরএসও নেতা হাফেজ এখন বাংলাদেশী ভোটার ও পাসপোর্টধারী। ২০১৩ সালেও সে গ্রেফতার হয়েছিল। সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন বলে কথিত এই হাফেজ ইয়াবা, অস্ত্র ব্যবসা এবং মানব পাচার ও জঙ্গী অর্থায়নে যুক্ত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী পাসপোর্টে মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে পাঠানোর নেপথ্যের ব্যক্তিও এই হাফেজ। এসব অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। তারপরেও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা এসব বিষয় জানেন না, এটি বিশ্বাস করা কঠিন।

অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের ক্ষমতাবানরা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি ‘অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট’। অভিযোগ রয়েছে, এটি নিয়ন্ত্রন করছেন একজন সংসদ সদস্য ও মিয়ানমারের কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা। আর এই চোরাচালান ঠেকাতে গিয়ে বলি হচ্ছেন বিজিবি’র সদস্যরাও। নিহত, অপহৃত হয়েও ঠেকাতে পারছেন না মাদকের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইয়াবা চোরাকারবার সিন্ডিকেটটির নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী এবং জড়িতদের একাধিক তালিকা তৈরী করেছিল বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা। ২০১৩-১৪ সালে করা তালিকার শীর্ষে ছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য। তার পাঁচ ভাইসহ তালিকায় ছিল টেকনাফ যুবলীগ নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অনেকেরই নাম। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্টমন্ত্রী মাদকবিরোধী সপ্তাহের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে সাথে নিয়ে। সে সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসার সাথে বদি’র সম্পৃক্ততা নেই”। সেই তিনি এখন বলছেন, ‘বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, প্রমান নেই’।

গত বছর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বসবাস, ভোটার তালিকায় অর্ন্তভূক্তি পাসপোর্টের ব্যবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গমনাগমন, স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহন-সব ব্যবস্থাই করছে ক্ষমতাবানরা¡। এ যেন সরকারের ভেতরে আরেক সরকার । এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে ক্ষমতাবলয়, হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অস্ত্র ব্যবসা এবং এর সাথে উগ্রবাদী তৎপরতা মিলে-মিশে একাকার।

সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশেও ড্রাগ বা মাদকের ব্যবসা চলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। বিশেষ করে মৌলবাদী এবং জঙ্গী দলগুলোর অর্থের অন্যতম উৎস মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। অবৈধ এই ব্যবসা চালু রাখতে জঙ্গী-মৌলবাদী এবং শাসকশ্রেনীর ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ ব্যক্তির সাথে গড়ে ওঠে অশুভ আঁতাত। দশকের পর দশক ধরে ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল শীর্ষে ছিল। বছর কয়েক হলো সেটি এখন ইয়াবার দখলে। এজন্য বদলে গেছে চোরাচালানের রুট এবং ধরণ। কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি বদলায়নি।

মাদক ব্যবসার গোড়াশুদ্ধ উপড়ে ফেলা এবং যেকোন মূল্যে সিন্ডিকেট ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা সেটি কেউ জানে না। মাদক কারবারের মূলস্রোত অক্ষুন্ন রেখে মাঠ পর্যায়ে সরবরাহকারীদের বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার কতটা সমাধান বয়ে আনবে ? কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে এডহকভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরেক দফা উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ কারবার বন্ধে এডহক ভিত্তিতে বন্দুকযুদ্ধের সূচনার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। গত শতকের সত্তর, আশি দশক এবং এর পরেও মেক্সিকো, কলম্বিয়া, বলিভিয়ায় এবং অধূনা ফিলিপাইনে পরিচালিত ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষ ও কমিউনিষ্ট নিধন। যা আসলে ওইসব দেশে মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে পারেনি ও করেওনি। যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচারে বাংলাদেশ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের আইনের সবশেষ সুযোগ দিয়ে বিচার নিশ্চিত করেছিল।

তাহলে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা কথিত আত্মরক্ষার্খে হত্যা হয়তো সাময়িক উপশম, কিন্ত দীর্ঘমেয়াদে?

‘মাদকের মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে’ : সুলতানা কামাল

এ্যডভোকেট সুলতানা কামাল, বিশিষ্ট মানবাধিকার সক্রিয়বাদী এবং দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দুর্নীতিবিরোধী নজরদারী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর চেয়ারপারসন এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে সুলতানা কামাল বিস্তারিত মূল্যয়ন করেছেন আমাদের বুধবারের সাথে এক সাক্ষাতকারে।

আমাদের বুধবার : মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে যুদ্ধ আইন-শৃংখলাবাহিনী চালাচ্ছে সেটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করেন?

সুলতানা কামাল : মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে কথা আইন-শৃংখলাবাহিনী থেকে বলা হচ্ছে, সেটি যদি সত্যি সত্যিই ওয়ার অন ড্রাগস হয়ে থাকে, তবে সে ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। মাদক যে কত ক্ষতিকর হতে পারে এবং একটি জাতিকে কীভাবে অবক্ষয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে, সে সম্পর্কে সবার কিছু না কিছু ধারণা রয়েছে। কাজেই এটি একটি জরুরি বিষয়। রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব এর সমাধান করার এবং যাতে করে সমাজে মাদক ঢুকে যেতে না পারে বা বিস্তৃতি লাভ করতে না পারে। হয়তো মাদককে একেবারে নিমূর্ল করা যাবে না, কিন্তু অবশ্যই এক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রিত অবস্থানে আমরা পৌঁছাতে পারি। কথা হচ্ছে সেই যুদ্ধটা কোন পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। আমি বলছি বলে না, মানবধিকারের কতগুলো শর্ত আছে। যে শর্তগুলো প্রতিটি রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। যেকোনো সভ্য রাষ্ট্র মানবধিকারের এ শর্তগুলোকে সম্মান করে। মানুষকে তার অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তার যে শাস্তি প্রাপ্য তার বাইরে কোনো কিছু প্রদান বা আদালতের যে শাস্তি প্রদান করার কথা, তারা ছাড়া অন্য কেউ শাস্তি দিতে পারেন না। এটি আমাদের সংবিধানের ৩১ থেকে ৩৫ ধারার মধ্যে সুষ্পষ্ট ভাষায় লিপিবদ্ধ আছে। আমরা সে জন্যই যে পদ্ধতিতে ‘তথাকথিত বন্দুক যুদ্ধে’র নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, আজ পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন এ হত্যাকান্ডের স্বীকার হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে কাহিনী একই। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদেরকে পুলিশ বা র‌্যাব ধরতে গেছে, তারা আক্রমণ করেছে, আইন-শৃংখলাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে তারা মৃত্যু বরণ করেছে। ঠিক অবধারিতভাবে যারা আক্রমণ করছে তারা পাল্টা আক্রমণে মৃত্যু বরণ করছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের কারো কারো পরিবার অভিযোগ করেছে তাদের কিছুদিন আগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি সাজিয়ে বন্দুকযুদ্ধে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

আমাদের বুধবার : এটি মানবধিকারের কতটা বিপক্ষে?

সুলতানা কামাল : এটি মানবধিকারের একেবারেই বিরুদ্ধে। মানবধিকারের মূল কথা হলো, প্রাণের অধিকার অ্যাবসিলিউট; এটি কেউ নিতে পারে না, হজম করতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রও এটি করতে পারে না। রাষ্ট্র যদি প্রাণের অধিকার হরণ করে, তবে সেটিও একটি অপরাধ। কিছু কিছু রাষ্ট্র শাস্তি হিসেবে  মৃত্যুদন্ড রেখে দিয়েছে, সেটি নিয়েও কথাবার্তা চলছে। যদি  মৃত্যুদন্ড বাংলাদেশে শাস্তি হিসেবে থেকে থাকে, তবে সেটিই শাস্তি। এ শাস্তিটি হবে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, সেই অপরাধের শাস্তি যদি  মৃত্যুদন্ড হয়, তখন  মৃত্যুদন্ড হবে। সেটিকে আমরা আইনবর্হিভূত হত্যা ঘটাতে পারি না। আমরা সেটি অপছন্দ করি। কিন্তু এখন যে ঘটনাটি ঘটছে সেটি আইনবর্হিভূত ও সংবিধান বর্হিভূত। এটি পুরোপুরো মানবধিকার বিরোধী।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী অভিযানে মূল হোতারা কী ধরা পড়ছে এবং তাদের কোন শাস্তি হচ্ছে বলে কী আপনি মনে করছেন?

সুলতানা কামাল : পত্রপত্রিকায় যে বিশ্লেষণ এসেছে এবং যারা অপরাধ-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তাদের কাছ থেকে যে মতামত এসেছে- তাতে এ শঙ্কাটাই প্রকাশ করা হচ্ছে যে, যেসব তালিকা এসেছে তাতে হয়তো যারা মাদক ব্যবসার হোতা তাদের নামও আছে, কিন্তু তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। বিচারের আওতায় না আনা গেলে, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে প্রশ্ন এবং জেরা করা প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গেলে, আসলেই একটি মানুষ যে  প্রমাণিত অপরাধী তা বোঝা যায় না। শঙ্কা যেটি প্রকাশ করা হচ্ছে তা হলো, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত মূল হোতারা চিহিৃত হচ্ছে না, তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। সাধারণ চোখে সবাই দেখছেন এরা আসলে মাদকের হোতা; কিন্তু মাদকের আসল হোতাদের যে নামগুলো সামনে  রয়েছে তাদেরকে ধরা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নাই বলে তাদের ধরা হচ্ছে না। এসবের কারণে যে কর্মকান্ড এখন পরিচালিত হচ্ছে তা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইনে মাদক বিরোধী যুদ্ধ চলছে বেশ কিছু সময় ধরে। ১২ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এতে সমাজের দরিদ্র্য ও নিম্নবর্গের  মানুষ নিহত হচ্ছে এবং পুরো বিষয়টিকে তারা বলছেন, এটি সমাজে এতিম ও বিধবা সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরেকটি দিক বলা হচ্ছে, ফিলিপাইনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য এ অভিযানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ অভিজ্ঞতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? 

সুলতানা কামাল : ফিলিপাইনে যে ঘটনা ঘটছে সেটি অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমনকি বিমানে তুলে নিয়ে ফেলে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। আমি আশা করব, সেরকম বর্বরতার মধ্যে আমরা যাব না। আমরা যে পর্যায়ে রয়েছি সেটি মানবধিকারের দৃষ্টি থেকে কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। আমরা বারবারই বলছি, সাংবিধানিক উপায়ে এ সমস্যারগুলোর সমাধান করা উচিত। ফিলিপাইন সরকারও জোর গলায় দাবি করতে পারে না যে, এসব কর্মকান্ডের মাধ্যমে তারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। আমরা লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতাও জানি, সেখানেও এ ধরনের অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যেগুলো এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের কার্যকর ফল দিয়েছে বলে আমরা শুনিনি। কাজেই আমি আশা করি, বাংলাদেশ এত দূর পর্যন্ত যাবে না। এতদিন তারা যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে সেটি তারা পুনর্বিবেচনা করবে। কিন্তু আমরা আশা করব, বাংলাদেশের যে সংবিধান রয়েছে, যে আইন-কানুন রয়েছে তার মধ্যে থেকেই আইন-শৃংখলাবাহিনী মাদক বিরোধী যুদ্ধ পরিচালনা করবে।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি ভূখন্ড দখল করার যুদ্ধ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম কিছুটা আবশ্যিক ভিত্তিতে। সেটি আবশ্যিক ভিত্তির মধ্যে একটি ছিল মানুষের মানবধিকার কখনো হরণ করা হবে না। মানুষকে কখনো অন্যায়ভাবে অবিচারের মধ্যে ফেলা হবে না। নির্যাতন করা হবে না। কাজেই সেসব ব্যাপারে রাষ্ট্রের একটা সাবধানতা অবলম্বন করার নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমাদের বুধবার : বাংলাদেশে ইতোপূর্বেও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড ঘটেছে। এটিকে কী তাহলে আবার নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ?

সুলতানা কামাল : যৌথবাহিনী থেকে শুরু করে অপারেশন ক্লিন হার্ট প্রতিটিতে আমরা মানুষের মৃত্যু দেখেছি। মানুষ হার্ট ফেল করে মারা যাচ্ছিল, আমরা ক্রয়ফায়ারের গল্প শুনেছি। আমরা এনকাউন্টার শুনেছি, শুট আউট শুনেছি। এখন বলা হচ্ছে বন্দুক যুদ্ধ। প্রতিটির ক্ষেত্রে কাহিনী একই। যারা এ কাজটি করছেন গণমাধ্যমের মাধ্যমে তাদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, তারা আমাদের যে কাহিনীগুলো বর্ণনা করছেন এবং জোর গলায় বলার চেষ্টা করছেন এটিই ঘটছে তারা যখন রাতে একা ঘুমাতে যান কিংবা আয়নায় নিজের মুখটা দেখেন তারা নিজেদেরও এ গল্পগুলো বিশ্বাস করাতে পারেন কিনা?

আমাদের বুধবার : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

‘যখনই বিচারবর্হিভূতভাবে কোনো কিছু ঘটে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতালম্বী দমনের জন্যই এক সময়ে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়’: আদিলুর রহমান খান

এ্যডভোকেট আদিলুর রহমান খান, মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর সেক্রেটারী। আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত মানবাধিকার সক্রিয়বাদী। বর্তমানে সরকার পরিচালিত ওয়ার অন ড্রাগস বা মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে তার মতামত দিয়েছেন আমাদের বুধবারের সাথে এক সাক্ষাৎকারে।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী অভিযান চলছে বাংলাদেশে। এ অভিযান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ণ কী?

আদিলুর রহমান খান : মাদক বিরোধী বর্তমান অভিযানের প্রয়োগিক দিকটি হলো, মাদক ব্যবসায়ী বা মাদক নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন তাদের লক্ষ্য করে বিচারবর্হিভূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তা আইনের পরিপন্থি ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থি। বিচারবর্হিভূতভাবে কাউকে হত্যা করা যায় না। এতে আইনের শাসন বজায় থাকে না। আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে, অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মধ্যে সোপর্দ করতে হবে। বিচারবর্হিভূতভাবে কাউকে হত্যা করা যাবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, সেটি বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড। আমরা মনে করি, এটি বন্ধ হওয়া উচিত।

আমাদের বুধবার : মাদক বিরোধী আইন-শৃংখলাবাহিনীর এ অভিযানে মূল হোতারা কী ধরা পড়ছে?

আদিলুর রহমান খান : এটি তো এরই মধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বা মূল হোতাদের ধরা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না। এমনকি আইন-শৃংখলাবাহিনীর যারা এর সঙ্গে যুক্ত তাদেরকেও শুধু কাজ থেকে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যাদেরকে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তারা সাধারণ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী। মূল হোতারা এর বাইরে থেকে যাচ্ছে। আমরা মূল হোতাদেরও বিচারবর্হিভূতভাবে হত্যার পক্ষে নই। আমরা চাই, সবাইকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার প্রক্রিয়ায় শাস্তি দেয়া হবে, যদি তারা সত্যিকারের অপরাধী হয়ে থাকে।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইন-লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে মাদক বিরোধী অভিযানের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে তাতে আপনার কি মনে হয় এর মাধ্যমে বাংলাদেশে মাদকের ব্যবসার রাশ টেনে ধরা যাবে? 

আদিলুর রহমান খান : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শুধু হত্যা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কখনোই ফলাফল আসে না। হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের এর দায় নিতে হয়। ফিলিপাইন বা লাতিন আমেরিকায় অনেককে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এ হত্যার মধ্য দিয়েও মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে পারেনি তারা। তাই সমাজের মধ্যে যখন একটি রোগ দেখা দেয় তখন সমাজকেই নির্ধারণ করতে হয় আইনী কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে তা সমাধানের জন্য। তা না করে আইনবর্হিভূতভাবে কোনো কিছু করা কখনো গ্রহণযোগ্য হয় না। পরবর্তীতে এর দায় নিতে হয়। এতে সমাজে আরো অস্থিরতা তৈরি হয়।

আমাদের বুধবার : ফিলিপাইনের মাদক বিরোধী অভিযান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দাবি করেছে বিভিন্ন মানবধিকার সংগঠনগুলো। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কি বলছে?

আদিলুর রহমান খান : আমাদের দেশে যেভাবে মানবধিকার লংঘন হয়ে থাকে, তাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এর পরে ভিকটিম হবেন না, সেটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, তাদের কর্মী বা তাদের সমর্থকদের ওপর এর প্রয়োগ ঘটবে। আমরা যারা মানবধিকার নিয়ে কাজ করি তারা এ আশঙ্কা সব সময়ই করে থাকি। যখনই বিচারবর্হিভূতভাবে কোনো কিছু ঘটে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতালম্বী দমনের জন্যই এক সময়ে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

আমাদের বুধবার :  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।