Home » সম্পাদকের বাছাই (page 9)

সম্পাদকের বাছাই

দলবাজ সাংবাদিকদের কর্মকান্ডে সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে

আমীর খসরু ::

প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের তত্ত্বীয় ধারণার উদ্ভাবক দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিল জীবনভর প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের জয়গান গাইলেও, তিনি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্ধিহান ছিলেন যে, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থাও শেষ পর্যন্ত কতিপয়ের শাসনে পরিণত হয় কি না। গণতন্ত্র ও নির্বাচনের মধ্যে সংযোগ সম্পর্কে নানাজন নানাকথা বহুবার বলেছেন; এ কারণে এ বিষয়টি নিয়ে অযথা সময় নষ্ট না করলেও, দু’একটি কথা বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ যে সব দেশে গণতন্ত্রের চরম ঘাটতি বহুকাল ধরে আছে, সেসব দেশের মানুষের মনোজগতে শাসকদের পক্ষ থেকে সুকৌশলে এ ধারনাটি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, কোন মতে, যেনতেন পন্থায় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামই হচ্ছে গণতন্ত্র। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের রাস্তায় ওঠার প্রথম ধাপ মাত্র, কোনক্রমেই একমাত্র ধাপ নয়। গণতন্ত্র চর্চার মুশকিলটি হচ্ছে এখানেই যে, বিদ্যমান শাসক শ্রেণীর মনোজগতে আসলে গণতন্ত্র নেই; কাজেই বাস্তবে রাষ্ট্রে ও সমাজে গণতন্ত্র চর্চা হবে- এটা সম্ভব নয়, সংগত কারণেই।

গণতন্ত্র যখন একেবারে তলানিতে বা পাল্লার নেতিবাচক দিকে যায়, ঝুলটা যখন বিপরীত হয়, তখন নির্বাচন নামক কর্মকান্ডেরও রকমফের দেখা দেয়। একথাটি বলতেই হবে যে, এ দেশে কখনোই সহি বা সঠিক নির্বাচন হয়েছে তা হলফ করে কেউ বলতে পারবেন না। দেশের ইতিহাসের প্রথম অর্থাৎ ১৯৭৩’র নির্বাচন অনুষ্ঠানের কৌশলের সাথে এর বছর ছয়েক পরের হ্যাঁ না ভোটের কৌশলকে যেমন মেলানো যাবে না- তেমনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকেও নয়।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের বিষয়টি যদি গণতন্ত্রের অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, স্থানীয় সরকারও এখন আর নির্বাচনের নামে ইতোমধ্যে যেসব রাজনৈতিক বিকৃতি ও বৈকল্য ঘটে গেছে তা থেকে কোনক্রমেই বাইরে নয়। এ কারণে ‘সর্বগ্রাসী ক্ষুধা’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেও বহুকাল ধরে রেহাই দিচ্ছে না। এসব নির্বাচনকে গ্রাস করার নানা ধরন-ধারন পাল্টাচ্ছে। যেকারণে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে অন্য সব নির্বাচনের সাথে মেলানো যাবে না। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দাবী করছেন, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন তাদের দল আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। বাস্তবে কি তাই? আসলে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ও প্রশাসনে যারা ছিলেন তারা। আর বিপর্যয় হয়েছে নির্বাচন কমিশনের। জনগণ বরাবরের মতো নিরব সাক্ষী হয়েছিলেন।

আর আরেকদফা সিমাহীন একটি ক্ষতি হয়ে গেছে সাংবাদিকদের ও  গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতায়। সাংবাদিকদের সম্পর্কে জনমনে ধারণা গত কিছুকাল ধরে এমনিতেই ভালো নয়। একাংশ, অন্য অংশ বলে যে বিভাজন আগেই হয়ে রয়েছে তা আরো বিকট-প্রকট হয়েছে; পাল্লা দিয়ে তারা এখন দলীয় লেজুরবৃত্তিতে মগ্ন রয়েছে। আর এতে যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে, তা কখনই সামাল দেয়া সম্ভব নয়, এ এক অপূরণীয় অনিবার্য বিপদ, কিছু সংখ্যক ‘আপদে’র কারণে। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অথবা গাজীপুরে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তথাকথিত সাংবাদিক নেতারা বক্তৃতাবাজি করে, মিছিল করে, দলীয় প্রার্থীর জন্য ভোট ভিক্ষা চায়- নিজ পেশার বদলে দলবাজিকে প্রাধান্য দেয়; যেসব সাংবাদিক সামান্য অর্থের কাছে নতজানু হয়, অতিসামান্য চাপেই মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়ে- তখন আর সবাই যা বলে বলুক, দলবাজ কথিত এইসব সাংবাদিকদের এই কর্মকান্ডে সাংবাদিক পরিচয় দিতে আমার অন্তত লজ্জা লাগে, ঘৃনাবোধ করি।

কাজেই খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল কি হয়েছে- তা নিয়ে আমার মতো অনেকেরই আসলে উদ্বিগ্ন নন। আমরা সবাই উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, ইহজনমে হয়তো আর মন্দের ভালো একটি নির্বাচনও আর দেখে যেতে পারবো না।

আনুষ্ঠানিক হিসেবেই দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৭০ হাজার

এক বছরেই কোটিপতি বেড়েছে সাড়ে ৬ হাজার :: বাড়ছে সীমাহীন বৈষম্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত অর্থবছরে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৬৮ হাজার ৮৯১ জন। এর আগের বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৪১৮ জন। এক বছরেই কোটিপতি বেড়েছে ৬ হাজার ৪৭৩ জন। ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন পাঁচজন। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৪০-৫০ হাজার মানুষের কাছে ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশে আয়-বৈষম্য বেড়েছে। ধনী-গরিবের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট ফারাক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাপ্ত হিসাবের ভিত্তিতে যে প্রতিবেদন তৈরি করে, সেটাই কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। এটা শুধু কাগজে-কলমে এবং ব্যাংকে গচ্ছিত আর্থিক স্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অন্যান্য দিক ও সম্পদের বিবেচনায় এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন ব্যাংক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শুরুর ১০-১৫ বছর কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ধীরগতিতে। ১৯৯০ সালের পর থেকে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে দ্রুত গতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি অ্যাকাউন্টধারী ছিল মাত্র পাঁচজন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ জনে। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৯৮ জন। আলোচ্য সময়ে আমানতের পরিমাণ ছিল সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। এরপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩ জনে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৪ জন।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২ জনে। এরপর অক্টোবর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছিল ৮ হাজার ৮৮৭ জনে। অর্থাৎ এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার জনে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরে অর্থাৎ ২০০৭-০৮ সালে বেড়েছিল ৫ হাজার ১১৪। এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের মার্চে দেশে ব্যক্তিপর্যায়ে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ছিল ১২ হাজার ৯১৭টি। ২০১৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৮৭টিতে। সে হিসাবে এ ৬ বছরে দেশে ব্যক্তিপর্যায়েই কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পায় প্রায় ২৭ হাজার ৭৭০টি। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২১৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০৯ সালের মার্চে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে ব্যাংকে কোটি টাকার ঊর্ধ্বে অ্যাকাউন্ট ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬টি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৭২৭টিতে। সে হিসাবে ৬ বছরে দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মিলে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩৫ হাজার। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৮ শতাংশ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে সব থেকে বেশি; প্রায় ৫৬ হাজার জন। এর মধ্যে আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩০ হাজার ৪৭৭ জন এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে ২৩ হাজার ৭৪৫ জন। এর কারণ হিসাবে তারা মনে করেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও গ্রাহক কারসাজি করে বেশকিছু বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করে। এরই প্রভাবে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে। এদিকে অতি ধনীদের সম্পদ নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাইট ফ্রাংক চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৬ : দ্য গ্লোবাল পারসপেক্টিভ অন প্রাইম প্রপার্টি অ্যান্ড ওয়েলথ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোটিপতি রয়েছেন প্রায় ১১ হাজার, যাদের নীট সম্পদ ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার (১০ লাখ ডলার) বেশি। এছাড়া হাজার কোটি টাকার নীট সম্পদের মালিক রয়েছেন ১৫ জন। তবে স্বীকৃত কোনো বিলিওনিয়ার বাংলাদেশে নেই।

একদিকে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (সিপিডি) বলছে, গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে সমাজের সবচেয়ে নিচের দিকের পাঁচ শতাংশের আয় মোট আয়ের দশমিক ২৩ শতাংশ। যেখানে ২০১০ সালে ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ। অপর গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। গত ৫ বছর ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে। কিন্তু এর সুফল সাধারণ জনগণের নাগালের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য দূরদর্শী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালা নেয়া হয়নি। এতে বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণের হার কমেছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের মোট জাতীয় আয়ে ২ শতাংশ অবদান ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে তা কমে ১ দশমিক ০১ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্য দিকে ২০১০ সালে দেশের ১০ শতাংশ ধনী লোকের মোট জাতীয় আয়ে অবদান ছিল ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে গরিব আরও গরিব হচ্ছে, বিপরীতে ধনীদের সম্পদ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কর্মসংস্থানহীন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতির ভাষায় এটির অর্থ- সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়নি।

দেশে কোটিপতির অ্যাকাউন্ট বাড়ার অর্থ আমাদের সম্পদ ক্রমেই কিছুসংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভ‚ত হয়ে পড়ছে। এতে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে। উন্নয়ন যা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই শহরকেন্দ্রিক। এ কারণে মুষ্টিমেয় কিছু লোক উন্নয়নের সুফল ভোগ করছেন। এতে নিচের দিকের মানুষ বরাবরই উন্নয়নবঞ্চিত থাকছেন। কোটিপতি আমানতকারী বাড়ার অর্থ হলো, টাকাওয়ালাদের কাছে ব্যাংকিং খাত জিম্মি হয়ে পড়ছে। এটা হয়েছে, কল্যাণ অর্থনীতির নীতি থেকে সরকারের সরে যাওয়ার কারণে। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকে অনুসরণ করছে। এই নীতিতে মূলত জোরজুলম করে, যেনতেন ও দুর্নীতি-লুটপাট করে অর্থ বানানো হয়। এখন বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে।

রূপপুরের এপিঠ ওপিঠ-১ : ডাক্তার রোগী তত্ত্ব ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

অরুন কর্মকার ::

‘রূপপুর আজ পরচিতি নাম/ বিশ্বের দরবারে পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ/ বাঙালিও আজ পারে/’

এটি একটি ছড়ার অংশবশিষে। ছড়াটির রচয়তিা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী প্রকৌশলী ইয়াফেস ওসমান। ছড়াকার হিসেবে তিনি যথেষ্ট প্রসদ্ধি। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে তিনি শুধু ছড়া লেখেননি। অনেক ‘স্মরণীয়’ উক্তিও করেছেনে। তার একটি হচ্ছে- আমরা (বাংলাদেশে)  রোগী। আর রাশিয়া হচ্ছে ডাক্তার। রোগী ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। এখন ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন দেবে রোগী সে অনুযায়ীই চলবে।

এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেনে যে, পারমাণবকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থাপনের বিষয়ে বিন্দু বির্সগও আমরা জানি না। আর রাশিয়া হচ্ছে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তাই আমরা রাশিয়ার শরণাপন্ন হয়েছি। এখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সব কিছুই (এ টু জেড) রাশিয়ার পরার্মশমত, রাশিয়ার লোকোবল দিয়ে, রাশিয়িার প্রযুক্তি ব্যবহার করে, রাশিয়ার দেওয়া ঋণের অর্থে এবং রাশিয়ার পরিচালনায় বাস্তবায়তি হবে। তাই এই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তা করার কিছু নেই।

শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন মহলে যখন প্রকল্পটির প্রযুক্তি, জনবল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যয়, নিরাপত্তা প্রভৃতি নিয়ে কথার্বাতা শুরু হয়, তারই এক পর্যায়ে তিনি ওই উক্তটি করেন। তারপর অনেক পথ হাঁটা হয়েছে। প্রস্তুতির পর্যায় থেকে পায়ে পায়ে প্রকল্পটি পৌঁছে গেছে বাস্তবায়নের পর্যায়ে। প্রকল্পটিকে এই পর্যায়ে পৌছাতে মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানকে নিশ্চয়ই অনেক কাজ করতে হয়েছে। ধরে নেওয়া যায় যে তিনি একজন রোগী হিসেবে, একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরার্মশে নিশ্চিন্তেই সে সব করেছেন এবং প্রকল্প নিয়ে নিশ্চিন্তেই আছনে।

তবে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত থাকার লোক বিরল। কারণ এই প্রযুক্তি বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি। তাছাড়া, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধুমাত্র প্রযুক্তির বিষয় নয়। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে পারমানবি তেজস্ক্রিয় র্বজ্য ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার দায় (নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি), আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সর্বোপরি ব্যবসা। এই প্রকল্পে ক্রেতা-বিক্রেতা আছে, যথাক্রমে বাংলাদেশ ও রাশিয়া। রাশিয়া সব কিছু করে দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয়সহ সব দায় বাংলাদেশের। এটাই আন্তর্জাতিক আইন।

তাই বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। থাকা সঙ্গতও নয়। এমনকি যুক্তির খাতিরে ডাক্তার- রোগী তত্ত¡ মেনে নিলেও রোগীকে কিছু জিনিস বুঝতে হয়। যেমন ডাক্তার যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন, ফার্মেসী থেকে সে অনুযায়ীই ওষুধগুলে দেওয়া হচ্ছে কি না। ডাক্তার যে কোম্পানির ওষুধ লিখিছেনে ফার্মেসী থেকে কি সেটাই  দেয়া হচ্ছে, না কি অন্য কোম্পানীর নিম্নমানের ওষুধ গছানো হচ্ছে। ওষুধগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করেছে কি না এ বিষয়গুলো না বুঝলে  রোগীর সমস্যা হবেই।

এখন প্রশ্ন হল, রোগী হিসেবে বাংলাদেশ রাশিয়ার দেওয়া প্রেসক্রিপশন ঠিকঠাকভাবে বুঝে ওষুধ ব্যবহার করতে সর্মথ কি না। ভারতের তামিলনাড়– রাজ্যের কুদনকুলমে একটি পারমাণবকি বিদ্যুৎকেন্দ্রে করেছে রাশিয়ার। ওই কেন্দ্রেরে একটি ইউনিটের নির্মাণকাজ যখন শেষ পর্যায়ে তখন ভারতের পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বিজ্ঞানীরা ইউনিটটির যন্ত্রপাতিসহ সব কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন। তাতে বড় ধরনের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে।

ভারতের বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় উদ্ঘাটিত হয় যে, ইউনিটটির কয়েকটি র্স্পশকাতর স্থানে যে মানের ইস্পাত ব্যবহার করার কথা ছিল, তার চেয়ে নিম্নমানের ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে। চারটি পাম্পে ত্রুটিপূর্ণ বাল্ব ব্যবহার করা হয়েছে। এই রকম আরও কিছু ত্রু টি উৎঘাটন করার পর রাশিয়া তা পরির্বতন করে দিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি মালামাল কেনার দায়িত্বে রাশিয়ার যে র্কমর্কতা ছিলেন, তাঁকে চাকরিচ্যুত করেছে।

এখানে বিষয়টি দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের। তাই প্রশ্ন হলো- ভারতরে মতোও জনবল আমাদের আছে কি না- যারা রাশিয়ার দেওয়া সব কিছু যথাযথভাবে বুঝে নিতে সক্ষম। এক কথায় জবাব হল, নেই। একদিকে জনবল নেই, তার ওপর আমরা রোগী হিসেবে ডাক্তারের পরার্মশ মত চলার জন্য মনস্থরি করে রেখেছি। এই অবস্থায় আমরা কোথায় যাব তা আসলেই যথেষ্ট ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পরমাণু প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল। র্দীঘ ৩০ বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে র্কমজীবন শেষে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেনে। তিনি বলেছেন, একটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তিনটি জিনিস সমানভাবে গুরুত্বর্পূণ। এর প্রথমটিই হলো জনবল। র্অথাৎ প্রস্তুতি ও নির্মাণ পর্যায়ের কাজর্কম তদারক করার মত জনবল আপনার আছে কি না। যদি না থাকে, আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। অন্যপথও একটা আছে, সেটা হল বিখ্যাৎ কোনো পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে পরার্মশক নিয়োগ করা। বাংলাদেশে এর কোনোটাই না করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণ শুরু করেছে।

জনবল : পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জনবল মানে শুধু ‘রিঅ্যাক্টর অপারেটর’ নয়। অনেকে বলেন যে, আমরা তো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবল তৈরি করছি। কিন্তু এটাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জনবল নয়। জনবলের কয়েকটি গ্রুপ আছে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে করবো, তখন সরকারকে উপদেশ দেওয়ার মত জনবল থাকতে হবে- যারা সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে, ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষি করবে। সেই জনবল কি আমাদের ছিল বা আছে?

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বিশেষায়িত জনবল থাকতে হবে। যারা এই সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁদের মধ্যে এমন জনবল থাকতে হবে, যাদের পরমাণু প্রযুক্তি সর্ম্পকে জ্ঞান সরবরাহকারীদের সমপর্যায়ের। যদি তেমন জনবল না থাকে, তাহলে সরবরাহকারীরা যা বলবে তাই শুনতে হবে (রোগী হিসেবে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করার মত)। এ রকম ক্ষেত্রে অনেক খেসারত দেওয়ার আশংকা থাকে।

সমীক্ষা থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতির মান, নির্মাণকাজ প্রভৃতি সরবরাহকারীদের সব কাজ তত্ত¡াবধান করার জন্য জনবল থাকতে হবে। প্রযুক্তি নির্বাচনের জন্যও জনবল থাকা দরকার। এর কোনো কিছু ছাড়াই বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু করেছে।

প্রযুক্তি : রূপপুর প্রকল্পে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে তা ‘থ্রি প্লাস প্রজন্মের প্রযুক্তি’ হিসেবে পরিচিত। এটিই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। তাই সবচেয়ে নিরাপদ বলেও ধারণা করা হয়। রূপপুরে এই প্রযুক্তির ‘ভিভিইআর-১২০০’ নামের যে রিঅ্যাক্টর (পরমাণু চুল্লি) বসানো হবে, এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র রাশিয়ায় তেমন একটি রিঅ্যাক্টর চালু হয়েছে, সেখানকার নেভোভরোনেঝ বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

এই রিঅ্যাক্টরের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ১. একটি শক্তিশালী আবরণের (কনটেইনার ডোম) মধ্যে রিঅ্যাক্টর ভবনটি আবৃত থাকে, যাকে কোনো দুর্ঘটনা হলেও ওই আবরণের বাইরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে পারে না। শুরু থেকেই আমেরিকার তৈরি রিঅ্যাক্টের এই ব্যবস্থা ছিল। রাশিয়ার রিঅ্যাক্টের ছিল না। এখন করা হয়েছে। ২. রিআ্যাক্টেরর নীচে ‘কেরো ক্যাচার’ নামে একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে দুর্ঘটনাজনতি কারণে রিঅ্যাক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হলে, এমনকি গেলে গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই গলিত ধাতব ওই কোর ক্যাচারের মধ্যে চলে যাবে এবং সেখান থেকেও কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারবে না।

এই প্রযুক্তি আগের চেয়ে অনেক উন্নত। যে আবরণের কথা বলা হল তার ভেতরের প্রেসার এমন মাত্রায় সীমিত রাখা হয় – যা বাইরের পরিবেশের চেয়ে সব সময় কম থাকে। ফলে আবরণ ফেটে  গেলেও বাইরের বাতাসের চাপে ভেতরের বাতাস বাইরে আসতে পারে না। এই প্রযুক্তি নিয়ে গুরুতর কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি দেশের অভিজ্ঞ মহলে নেই। বরং শুরুতে সরকার যখন অপেক্ষাকৃত পুরানো প্রযুক্তির, তৃতীয় প্রজন্মের ‘ভিভিইআর-১০০০’ মডেলের রিঅ্যাক্ট নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন তাঁদের দাবি কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার র্সবাধুনিক প্রযুক্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রচলতি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে পারমাণবিক বিদু্যুৎকেন্দ্রেরে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বন্ধ করে দিলেই সেখানে তাপ উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্রের তা হয় না। বন্ধ করার পরও র্দীঘদিন ধরে তাপ উৎপন্ন হতে থাকে ‘বি কজ অফ ডিকে হিট’। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার পরও রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা চালু রাখতে হয়।

জাপানের ফুকুশিমায় দুর্ঘটনার কারণ ছিল এই ডিকে হিট। কেননা সেখানে ছয়টি রিঅ্যাক্টরই বন্ধ হয়ে গেলেও সুনামির কারণে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায়। এরপর সেখানকার স্পেন্ট ফুয়েল পিটে রক্ষতি স্পেন্ট ফুয়েল অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরে যায়। রূপপুরে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে ঠান্ডা করার দুই ধরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি প্রাকৃতিক, অন্যটি যান্ত্রিক।

মোহাম্মদ আলী : যুদ্ধ আগ্রাসন বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক

মোহাম্মদ আলী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন। ৩ জুন, ২০১৬ তিনি মৃত্যুবরন করেন। তাঁর প্রতি  বুধবার-এর অসীম শ্রদ্ধা।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’- এটাই তাকে বোঝানোর জন্য সবচেয়ে সহজ বাক্য। তার অনতিক্রম্য ৫৬-৫ রের্কড তাকে মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা পারফরমার প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। সামর্থের সর্বোচ্চ অবস্থায় তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি। লড়াইয়ে তার নজিরবিহীন দক্ষতা আর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস তাকে সত্যিকার অর্থেই ‘সর্ব যুগে সবার সেরা’ করেছে। মুষ্টিযুদ্ধের রিঙে ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য করে এবং মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে’ তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বিদের পর্যুদস্ত করতেন। তিন তিনবার হেভিয়েট শিরোপা জয় করে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানবে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে সনি লিস্টনকে হারিয়ে নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমিই বিশ্বের সম্রাট।’ তার সেদিনের সাম্রাজ্য কেবল হেভিওয়েট রিঙেই সীমিত ছিল। সেই রিঙও তিনি ডিঙিয়েছেন। তিনি কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই নয়, কিংবা সার্বিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, সর্বকালের সেরা মানুষদের একজনে পরিণত হয়েছেন। রিঙের ভেতরে ও বাইরে তিনি যে কৃতিত্ব স্থাপন করেছেন, তা তার আগে বা তার পরও দেখা যায়নি। হয়তো কোনো দিনই দেখা যাবে না। এমনকি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থায় থাকার সময়ও মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা, তার অনন্য মহাত্ম ফুটে ওঠতো। একজন শোম্যান, একজন প্রতিবাদী- বিদ্রোহী, একজন মানবাধিকার কর্মী, একজন সত্যিকার অর্থে ভালো মানুষ, একজন কবি- সব গুণেই তাকে অভিহিত করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, যুগ-নির্বিশেষে তিনি বিস্ময়কর ব্যক্তি, মহামানব। বস্তুত তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষে। এমনকি পৃথিবীর অনেক স্থান- যেখানে মুষ্টিযুদ্ধের কোনোই জনপ্রিয়তা নেই, সেখানেও তিনি মুকুটহীন সম্রাট। এক জন মুষ্টিযোদ্ধার নামও যদি কেউ জানে, তবে তিনি হলেন মোহাম্মদ আলী।

সেরা ফর্মের সময়ে তিনি ছিলেন এককথায় অপ্রতিরোধ্য। তবে তার লড়াই দেখতে যারা আসতো, তিনি তাদের পয়সা উসুল করিয়ে দিতেন। বহুদূর পৌঁছতে পারার সক্ষমতা, রহস্যময় সময় জ্ঞান, অসাধারণ পূর্বাভাস এবং চমৎকার আত্মরক্ষা কৌশল নিয়ে গড়ে উঠেছিল তার দুর্দান্ত দক্ষতা। তার ঘুষি মারার ক্ষমতাসহ যে সামান্য কিছু ঘাটতি ছিল, তা পুষিয়ে দিয়েছিল গতিময় ফুটওয়ার্ক এবং রিংকে ব্যবহারের সক্ষমতা।

তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, ‘আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ আর এই দাবি প্রমাণও করেছেন তিনি ভালোভাবে। আর তাকে ঘিরে থাকা কিংবদন্তিগুলো কেন হয়েছে, তার পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। তার মনমুগ্ধকর দৈহিক গড়ন এবং তারকা গুণাবলী তাকে পরিণত করেছিল, ‘সুন্দরতম’ হিসেবে। আর তার চাতুর্যপূর্ণ কথাবার্তা তাকে পরিণত করে ‘অনন্য’। তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তিনি তার জীবনীকার টমাস হাউসারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কখনো কি এমন কোনো যোদ্ধা ছিল যে কবিতা লিখতো, রাউন্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করতো, সবাইকে হারাতো, মানুষকে হাসাতো, মানুষকে কাঁদাতো এবং আমার মতো এতো লম্বা ও এতো সুন্দর ছিল? পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনা থেকে কখনো আমার মতো কোনো যোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেনি।’ তিনি একবার তার এক প্রতিদ্বন্দ্বিকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমাকে হারানোর স্বপ্ন দেখে থাকো, তবে ঘুম থেকে উঠে ক্ষমা চাও।’ আর একবার তিনি মোহাম্মদ আলী নামক মুষ্টিযোদ্ধাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য যথার্থই নির্মম হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে শিরোপার দাবিদার আরনি টারেল বলেছিলেন, তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বির নতুন নামের স্বীকৃতি দেবেন না। আলী সেবার ইচ্ছে করেই লড়াইকে ১৫ রাউন্ড পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর বারবার অসহায় টারেলকে ঘুষিতে ঘুষিতে কাঁপিয়ে দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘বল, আমার নাম কী? বল আমার নাম কী?’

ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ মাত্রায় ফিট। আর তাই যেকোনো কঠিন আঘাতও সহ্য করে এগিয়ে যেতে পারতেন। অবশ্য এই সহ্য করার গুণের জন্য তাকে পরবর্তীকালে মূল্যটা দিতে হয়েছে বেশ চড়া। পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে তিনি অতীতের ছায়া হিসেবেই বেঁচে ছিলেন অনেক দিন। একসময়ের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটি মধ্য বয়সের পর ঠিকমতো হাতটিও নাড়াতে পারতেন না, কথাও ঠিকমতো বলতে পারতেন না। কিন্তু অসহায় অবস্থাতেও নানা কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন।

মুষ্টিযুদ্ধে তার শ্রেষ্ঠত্বের একটি নমুনা হলো তিনি ফলাফল কী হবে,তা চিন্তা না করেই জয়ের অদম্য ইচ্ছা নিয়ে লড়েছেন। তিনি জন্মেছিলেন লড়াই করার জন্য এবং জয়ের জন্য। তিনি যদি একটি আঘাত হজম করতেন, তবে দুটি কিংবা তিনটি আঘাত ফিরিয়ে দিতেন। আর এটাই এই মুষ্টিযোদ্ধার একটি বড় বৈশিষ্ট্য। তার স্টাইল ছিল প্রথাসিদ্ধ নিয়মনীতির বেশ বাইরে। প্রচলিত নিয়মে তিনি তার হাত দুটি দিয়ে মুখকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে দুপাশে রাখতেন। প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য তিনি অসাধারণ রিফ্লেক্স এবং রিচ (৮০ ইঞ্চি) ব্যবহার করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিকে ক্লান্ত করে পর্যুদস্থ করার কৌশলের দিকে তিনি বেশি মনোযোগী থাকতেন।

মোহাম্মাদ আলী নামে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে। ক্যাসিয়াস (সিনিয়র) এবং ওডেসার প্রথম ছেলে ছিলেন তিনি। তার পিতা ছিলেন পেইন্টার। মোহম্মদ আলী ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তার ছোট ভাই রুডলফও মুসলমান হলেন। তার নাম হয় রহমান আলী। আলীর মেয়ে লায়লা আলী পরবর্তীকালে মুষ্টিযুদ্ধে সুনাম অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে আলী চারবার বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১৪ আগস্ট আল বিয়ে করেন সনজি রোইকে। দুটি সন্তান হওয়ার পর ১৯৬৬ সালে এই বিয়ে ভেঙে যায়। তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী খালিদা ‘বেলিন্দা’ আলীকে বিয়ে করেন ১৯৬৭ সালের ১৭ আগস্ট। চারটি সন্তান হওয়ার পর তারা আলাদা হয়ে যান। ১৯৭৭ সালের ১৯ আগস্ট বিয়ে করেন ভেরোনিকা পোর্সে আলীকে। ১৯৮৬ সালে এই বিয়েও ভেঙে যায়। তার চতুর্থ ও শেষ স্ত্রী লনি উইলিয়ামস। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরের এই বিয়েটি টিকে থাকে। তারা আসাদ নামের এক ছেলেকে দত্তক নেন। আলীর সন্তানরা হলেন : রাশিদা, জামিলা, মরিয়ম, মিয়া, খালিয়াহ, হানা, লায়লা, মোহাম্মদ জুনিয়র ও আসাদ।

তার মুষ্টিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে একটি চমৎকার কাহিনী বলা হয়ে থাকে। দুই ভাইয়ের শিক্ষা জীবন শুরু হয় একইসাথে। দুভাই আমেরিকার ডুভাল জেনারেল হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। আলীর বয়স তখন ছিল ১২ বছর আর ভাইয়ের বয়স ১০ বছর। এ সময় তাদের বাবা ৬০ ডলার দিয়ে একটা সুন্দর বাইসাইকেল কিনে দেন। দু’ভাই সাইকেলে চড়ে খুব ফুর্তি করে বেড়াতেন। দু’ভাই পালাক্রমে সাইকেল চালাতেন। ১৯৫৪ সালের ঘটনা। সেপ্টেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায় দু’ভাই সাইকেলে করে এক প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলেন। সাইকেলটি রেখেছিলেন বাইরে। কিছুক্ষণ পরে এসে দেখেন, তাদের প্রিয় সাইকেলটি চুরি হয়ে গেছে। দু’ভাই তাতে বেশ দুঃখ পেয়েছিলেন। চোরকে পেটানোর বাসনায় মার্টিন (একইসাথে তিনি ছিলেন মুষ্টিযোদ্ধা প্রশিক্ষক) নামের এক পুলিশ অফিসারের কথাতেই আলী মুষ্টিযুদ্ধ শেখায় মনোযোগী হলেন। জন্ম হলো নতুন একজনের। পরবর্তী ২৭ বছর রিং মাতিয়ে রাখলেন তিনি।

১২ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় জিমে মুষ্টিযুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৬০ সালের অলিম্পিক্সের  জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ১০৮টি বাউট জেতেন, ৬ বার কেন্টাকি গোল্ডেন গে¬াভস চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দু’বার জাতীয় ‘এএইউ’ শিরোপাও জয় করেন।

রোম অলিম্পিকে তিনি লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক জয় করেন। অ্যামেচার ক্যারিয়ারে এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ সাফল্য। কয়েকদিন পরই তিনি পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মাত্র ৮টি লড়াই এ জেতার পর তিনি ঠিক কত রাউন্ডে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেবেন, এমন ভবিষ্যদ্ববাণী করে রিঙে নামতে শুরু করলেন। ১৯৬০ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম পেশাদার লড়াইয়ে আলী তার প্রতিদ্বন্দ্বি পুলিশ অফিসার টানি হানসাকারকে পরাজিত করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সময়কালে আলী ১৯টি লড়াইয়ে নেমে ১৫টি নকআউটসহ সবগুলোতেই জয়ী হন। এদের মধ্যে আর্চি মুর, ল্যামার ক্লার্কের মতো দুর্ধর্ষ মুষ্টিযোদ্ধাও ছিল। এদের হারিয়েই তিনি হেভিওয়েট শিরোপার দাবিদার হন।

এর মাঝেই দেশে বর্ণবাদের বিষাক্ত বাস্পে তার হৃদয়-মন পুড়ে গেছে। অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ী এই মুষ্টিযোদ্ধাকে একটি শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খাবার দিতে অস্বীকার করে । তিনি ওহিয়ো নদীতে তার পদক ছুঁড়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানান (যদিও অনেকে এটাকে সত্য বলে মনে করেন না; তারা মনে করেন পদকটি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন; ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাকে নতুন আরেকটি পদক প্রদান করে)। পরবর্তীকালের অনেক বড় বড় প্রতিবাদের এটিই ছিল প্রথম।

১৯৬৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব এক অবাক করা ঘটনা দেখলো। এদিন দানবীয় শক্তির অধিকারী সনি লিস্টনকে হারিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপা জয় করেন। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল এটি। বলা যায়, জীবনের অন্যতম জুয়া তিনি এখানেই খেলেছেন। পরবর্তীকালে তিনি যে আরো অনেকবার অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়বেন, তার ভবিষদ্বাণী যেন ছিল এতে। অথচ তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ২২ বছর ৩৯ দিন। একদিকে তার বয়স কম। সেই সাথে মাত্র কিছুদিন আগে হেনরি কুপারের সাথে লড়তে গিয়ে চোয়াল ভেঙে ফেলেছিলেন। লিস্টনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আলী জিতবেন, এটা খুব কম লোকই ভাবতে পেরেছিল। লড়াইয়ের আগে আলী তাকে ‘কুৎসিত বুড়ো ভাল্লুক’ হিসেবে খ্যাপাতেন। আর বারবার করে বলতে থাকলেন, তাকে ৬ষ্ট রাউন্ডে নক আউট করবেন। এমনকি তিনি তার বাসার সামনে গিয়েও হৈচৈ করেছেন।

আলী তার কথা রেখেছিলেন। ৬ষ্ট রাউন্ডে এমন মার দিলেন, লিস্টন আর এলেন না পরের রাউন্ডে খেলতে। অবিশ্বাস্যভাবে জিতে গেলেন আলী। আলী রিঙে নেচে নেচে ঘোষণা করতে লাগলেন, ‘আমিই বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন।’ তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি, আমি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি।’ সত্যিই তিনি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কাঁপন এখনো থামেনি।

দুদিন পর বিশ্ব অবাক হয়ে আরেকটি সংবাদ শুনলো। লিস্টনকে হারানোর চেয়েও এটি ছিল চাঞ্চল্যকর। খবরটি হলো তিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছেন এবং নতুন নাম  নিয়েছেন মোহাম্মদ আলী। নতুন এক কিংবদন্তির জন্ম হলো। আলী তার ক্যাসিয়াস ক্লে নামকে অভিহিত করলেন, ‘দাসত্ব নাম’ হিসেবে। বিশ্বক্রীড়াঙ্গনে একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা হলো এভাবেই। প্রথমে তিনি এলিজা মোহাম্মদ ও ম্যালকম এক্সের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশন অব ইসলামের’ সাথে জড়িয়ে ছিলেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি তাদের সংশ্রব ত্যাগ করেন।

যারা মনে করেছিল, আলীর লিস্টনকে হারানো স্রেফ একটি দুর্ঘটনা, তাদের জবাব দিতে বেশি দেরি হলো না। পরের বছরের (২৫ মে, ১৯৬৫) ফিরতি লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ডের প্রথম মিনিটেই আলী তার দানবীয় প্রতিদ্বন্দ্বি লিস্টনকে নকআউট করে দিলেন। তার শ্রেষ্ঠত্বের নিরঙ্কুশ স্বীকৃতি মিললো। আগের ম্যাচটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল না বা পাতানো ছিল না, তাও প্রমাণিত হলো।

এরপর আলী তার শিরোপা রক্ষার জন্য আরো ৮টি লড়াই এ অবতীর্ণ হলেন (নভেম্বর, ১৯৬৫ থেকে মার্চ, ১৯৬৭ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত)- ফ্লয়েড প্যাটারসন, জর্জ শুভালো, হেনরি কুপার, ব্রায়ান লন্ডন, কার্ল মিল্ডেনবার্গার, ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস, আরনি টারেল এবং জোরা ফোলের বিরুদ্ধে। এতো অল্প সময়ে অন্য কোন মুষ্টিযোদ্ধাকে এতো বেশি লড়াইতে অবতীর্ণ হতে দেখা যায়নি।

তার থেকে কেউ শিরোপা নিতে পারেনি। বরং রিঙের বাইরেই তার প্রতিদ্বন্দ্বি সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৮ এপ্রিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় আলীর শিরোপা কেড়ে নেওয়া হলো। পরবর্তী সাড়ে তিন বছর তার লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত রাখা হলো। অথচ এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ ফর্মে থাকার সময়। ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সে তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময়টি রিঙে নয়, কারাগারেই কাটিয়েছেন।

বিশ্ব মুষ্টিযোদ্ধা সংস্থা মার্কিন সরকারের ইচ্ছানুযায়ী একটি মিনি টুর্নামেন্টের আয়োজন করলো। আর তার মাধ্যমে জো ফ্রেজিয়ারকে হেভিওয়েট শিরোপা দিয়ে দেওয়া হলো। শিরোপা রক্ষার জন্য আলীকে সুযোগ দেওয়া হলো না। অর্থাৎ আলী তার শিরোপা কোনো রিঙে হারাননি। বরং হারিয়েছেন নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে।

কারাগার থেকে মুক্তির পর ১৯৭০ সালে জেরি কোয়ারির বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে আলী তার প্রত্যাবর্তনের কথা জানিয়ে দিলেন। কিন্তু তদান্তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জো ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলায় সুবিধা করতে পারলেন না তিনি। ‘দি ফাইট অব দি সেঞ্চুরি’ নামে খ্যাত মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ১৯৭১ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ১৫ রাউন্ডের সেই লড়াইয়ে অল্প পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে গেলেন। এই লড়াইয়ের আগে পর্যন্ত দুজনই ছিলেন অপরাজিত। তাই এনিয়ে বেশ আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আলী হাল ছাড়ার পাত্র নন। অবশ্য ফিরতি লড়াইয়ে নামার সুযোগ পেলেন না। তত দিনে জর্জ ফোরম্যান হেভিওয়েট শিরোপা জিতে নিয়েছে। তবে পরবর্তীকালে দু’বার ফ্রেজিয়ারকে হারিয়ে সেই পরাজয়ের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। ফ্রেজিয়ারের কাছে পরাজয়ের পর আলী কেন নরটনের কাছেও হেরে গিয়েছিলেন। আলী শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছিলেন জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে।

জায়ারের (পরবর্তী নাম কঙ্গো) কিনসাসায় নক আউট করেন জর্জ ফোরম্যানকে। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। আলী-ফোরম্যান লড়াইটি মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা লড়াইগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে। এটির নাম দেওয়া হয় ‘রাম্বল ইন দি জাঙ্গল।’ আলীর বয়স তখন ৩২ বছর। বয়সের ভারে তার সেই ফুটওয়ার্ক আর হাতের কৌশল অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ফোরম্যান তার সর্বোচ্চ ফর্মে। মাত্র ২৬ বছরের তাগড়া যুবক ফোরম্যান ৪০টি লড়াইয়ে অপরাজিত। এই লড়াইয়ে ফোরম্যান সহজেই জয়ী হবে বলে মনে করছিল অনেকেই। তাছাড়া এর আগে মাত্র একজন দ্বিতীয়বার হারানো শিরোপা ফিরে পেয়েছিলেন। তাই ফোরম্যানের দিকেই পাল্লা ভারী ছিল। তবে আলীর অতি উৎসাহী মনোবল তার সমর্থকদের উজ্জীবিত করে তুললো। টান টান উত্তেজনার সৃষ্টি হলো।

আলী সেই লড়াইয়ে ‘দি রোপ-এ ডোপ’ কৌশল উদ্ভাবন করেন। আলী বুঝতে পেরেছিলেন আফ্রিকার তাপমাত্রার জন্য তিনি তার সেই নৃত্য অব্যাহত রাখতে পারবেন না। তাই তিনি ফোরম্যানকে ক্লান্ত করতে তাকে ঘুষি মারতে উদ্বুদ্ধ করেন। আলী ফোরম্যানের মারাত্মক ঘুষিগুলো হজম করেন অবলীলায়। ইতিপূর্বে আর কোনো মুষ্টিযোদ্ধাই আলীকে এতো বেশি আঘাত করতে পারেনি। কিন্তু দেখা গেল, আঘাত হজম করে আলী যতটা না কাহিল হয়েছেন, আঘাত করে করে ফোরম্যান তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। ৬ষ্ট রাউন্ডে ফোরম্যানের ঘুষির শক্তি কমে এলো। ৭ম রাউন্ডে আরো কম। ৮ম রাউন্ড শেষ হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে আলী তার চূড়ান্ড আঘাতটি হানেন। নিউট্রাল কর্নারে ফাঁদে ফেলে আলী অরক্ষিত ফোরম্যানকে ডান হাতে ঘুষি দিতে শুরু করেন। সম্ভবত তিনটি লেগেছিল। নিজ কর্নারে ফিরে আসার আগে ফোরম্যানের চোয়ালে ডান হাত সোজা চালিয়ে দেন । প্রতিরোধের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেন ফোরম্যান। রেফারি ১০ গোনার আগে পুরোপুরি উঠতে পারেননি ফোরম্যান। প্রায় এক দশক আগে জয় করা বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপাটি এভাবেই পুনরুদ্ধার করেন আলী। আলী আবার সম্রাট হলেন। এই লড়াইয়ের ধকল কাটাতে অনেক বছর লেগেছিল ফোরম্যানের। এমনকি পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য তাকে মুষ্টিযুদ্ধ থেকে অবসর নিতে হয়েছিল।

এই লড়ায়ের এক বছর পর আলী ফ্রেজিয়ারের মোকাবেলা করেন। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত হয় লড়াইটি। নাম দেওয়া হয় ‘থ্রিলা ইন ম্যানিলা।’ অনেকের মতে, এটা মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লড়াই। আর তার মাধ্যমেই সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবার তাকে ১৪ রাউন্ড লড়তে হয়েছিল। সেই সাথে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় জয়ের পতাকা উড়ালেন। অর্থাৎ পুরো বিশ্ব জয় করলেন তিনি। তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ এমন জয় পাননি।

টানা ১০বার শিরোপা অক্ষুন্ন রাখার পর ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শিরোপা খোয়ান তার থেকে ১২ বছরের ছোট অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন লিয়ন স্পিনসকের কাছে। এটাও ছিল আকস্মিক একটি ঘটনা। আলী যখন সর্বজয়ী, তখন অখ্যাত এই অখ্যাত যোদ্ধার কাছে হেরে গেলেন। তবে ৮ মাস পর ফিরতি ম্যাচে তিনি স্পিঙ্ককে হারিয়ে তৃতীয় বারের মতো শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন। এই প্রথম কেউ তৃতীয়বার হেভিওয়েট শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হলো। আলীর সেই লড়াইটি দেখতে সারা বিশ্ব টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। তখন তার বয়স ৩৬ বছর। এই জয়ের পরপরই তিনি অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। তবে দু’বছর পর (লাস ভেগাসে ১৯৮০ সালের ২ অক্টোবর) তিনি আবার ফিরে  আসেন ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপার পুনরুদ্ধারের জন্য। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর আলী পুরোপুরি ফ্যামিলিম্যানে পরিণত হয়েছিলেন। হোমস ছিল তারই ছাত্র। তারুণ্যে আলীকেই আদর্শ মেনে মুষ্টিযুদ্ধে এসেছিলেন হোমস। তিনি চাচ্ছিলেন না আলীর ক্ষয়িঞ্চু শক্তিকে সবার সামনে মেলে ধরতে। তাই তিনি একটু অস্বস্তি নিয়েই গুরুকে মোকাবেলা করতে নামেন। আলী হয়তো ভেবেছিলেন, অলৌকিক কোনো ঘটনায় তিনি হয়তো জিতে যেতেও পারেন। কিন্তু তা হয়নি। আলী হেরে যান করুণভাবে। ১১ রাউন্ডে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন আলী। তিনি সেদিন তার সেই জৌলুষ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে আলী এই বলে তৃপ্তি পেতে পারেন, তিনি নক আউট হননি। রিঙে তার শেষ দৃশ্যপট মঞ্চস্থ হয় আরো ১৪ মাস পর ১৯৮১ সালের ১১ ডিসেম্বর। এবারের প্রতিপক্ষ ছিলেন জ্যামাইকার ট্রেভর বারবিক। বাহামায় অনুষ্ঠিত লড়াইয়ে এবারো হেরে যান। ৪০ বছর বয়সে শেষবারের মতো রিং থেকে বিদায় নেন। এই দুটি পরাজয় তার বিশালত্বে তেমন প্রভাবই সৃষ্টি করতে পারেনি। হয়তো চাঁদের কলংকের মতো একটু দাগ কেটে গেছে।

বিশ্ব ইতিহাসে সাড়া জাগানো আরো অনেক মুষ্টিযোদ্ধাই আছে। কিন্তু তবুও আলী একটি ব্যতিক্রম নাম। তিনি নিছক পেশিশক্তির জোরেই জয়ী হননি। রিঙে তিনি যে কৌশলের পরিচয় দিতেন, সেখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত। তিনি আগে নিজে আঘাত না হেনে, প্রতিপক্ষকেই উস্কানি দিতেন আঘাত করার। নানা উত্তেজনাকর কথা বলে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতেন। তার পায়ের কারুকাজ আর ঘুরে  ফিরে প্রতিপক্ষকে ঘুষিগুলোকে এড়িয়ে যেতেন। ‘প্রজাপতির মতো নৃত্য আর মৌমাছির মতো হুল ফুটাতেন’ তারপর। খুব সহজেই লড়াই শেষ করতে দিতেন না। এ কারণেই যারা খেলা দেখতে আসতো, তারা উপভোগ করতে পারতো। মুষ্টিযুদ্ধ যে শুধু দানবীয় একটি খেলা নয়, এটিও একটি শিল্প, তিনিই প্রথম এবং শেষবারের মতো সবাইকে বুঝিয়ে দেন।

আলী মানেই প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে নতুনত্বকে আহবান করার একটি নাম। ইসলাম ধর্মগ্রহণ করাটা তার জন্য খুব একটা সহজ ঘটনা ছিল না। আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্ট ধর্মের জয়জয়কার। বর্ণবাদ সুগভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে তিনি খ্রিস্টধর্মকে ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণকে অভিহিত করলেন, ‘মূলে’ ফিরে যাওয়া হিসেবে। তিনি তার পূর্বের পরিচয়কে দাসত্বের দাসখত হিসেবেও অবহিত করলেন। তার এই ঘোষণায় অনেক দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেল। শুধু শ্বেতাঙ্গরাই তার শত্রু তে পরিণত হয়নি, তার স্বগোত্রের তথা কালো খ্রিস্টানরাও তার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলো। তবে তিনি সাহস হারালেন না। নতুন দুয়ার নিজেই খুললেন।

তার আফ্রিকা সফর ছিল একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা। এই প্রথম আমেরিকার কোনো ক্রীড়াবিদ আফ্রিকা নামে কোনো মহাদেশের কথা সরাসরি স্বীকার করলেন। সারা বিশ্বে যখন আধিপত্যবাদের শিকল ছেঁড়ার আন্দোলন চলছে, তখন তাদের মাঝে তার উপস্থিতি ছিল একটি বিরাট ঘটনা। আমেরিকার মিডিয়া তার এই সফরকে ঢেকে রাখতে চেষ্টার ক্রুটি করেনি। উপনিবেশিক যাঁতাকল থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আফ্রিকান দেশগুলোতে তার আগমন ছিল একটি অভূতপূর্ব বিষয়। তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অথচ তাদের মতো কালো একজনকে নিজেদের মধ্যে পেল। অধিকন্তু তিনি আফ্রিকায় তার পূর্বপুরুষের অস্তিত্বের কথাও জানালেন।  তিনি ঘোষণা করলেন, ‘মুষ্টিযুদ্ধ রক্তপিপাসু কিছু লোকের সন্তুষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। আমি আর ক্যাসিয়াস ক্লে নই। কেন্টাকির এক নিগ্রো হিসেবে আমি বিশ্বের, কৃষ্ণাঙ্গ বিশ্বের। পাকিস্তান, আলজেরিয়া, ইথিওপিয়ায় সব সময় আমার বাড়ি আছে। টাকার চেয়ে এটা অনেক বেশি।’ ঘানায় প্রেসিডেন্ট এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা কোয়ামে এনক্রুমা তাকে বরণ করে নেন। এটাই ছিল কোনো রাষ্ট্রনেতার সাথে তার প্রথম কোলাকুলি। মার্কিন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের আলীর সাথে হ্যান্ডশেক করতে আরো এক দশক সময়  লেগেছিল।

আলী আসলে রিঙের বাইরেই সবচেয়ে বড় লড়াইটিতে লড়েছেন। যে দেশে তিনি থাকেন, সে দেশের প্রভুদের বিরুদ্ধেই তিনি আন্দোলন করেছেন।

১৯৬৬ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করা সামান্য কোনো ঘটনা ছিল না। ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করার জন্য তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হলো। তিনি ঘোষণা করেন, “তারা কেন আমাকে ইউনিফর্ম পড়ে বাড়ি থেকে এক হাজার মাইল দূরে যেতে বলবে এবং বাদামি লোকদের উপর বোমা ও বুলেট ফেলতে বলবে যখন লুইসভিলে তথাকথিত নিগ্রো মানুষদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করা হচ্ছে? ভিয়েতকঙের সাথে আমার কোনো বিবাদ নেই। কোনো ভিয়েতমানি আমাকে কখনো ‘নিগার’ বলে ডাকেনি।” তিনি অস্বীকার করলেন সরাসরি। এমনকি তিনি যদি সেদিন চুপচাপ থাকতেন, তবুও তার উপর এতো চাপ আসতো না। কিন্তু আলী তা করলেন না। আলীকে প্রথমে নিজ দেশে নিষিদ্ধ করা হলো। তিনি টরন্টো, ফ্রাংকফোর্ট, লন্ডনে (দুবার) শিরোপা রক্ষা করলেন। এতে তার লাভই হলো। তার ফ্যানের সংখ্যা বহির্বিশ্বে বাড়তেই থাকলো। কিন্তু দেশে তিনি এমন সমস্যায় পড়লেন, যা তার আগে কোনো ক্রীড়াবিদ পড়েননি। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র আমেরিকান হিসেবে তার অবস্থান পরাশক্তিটির জন্য ছিল এক মহা অস্বস্তিকর ব্যাপার। এক কৃষ্ণাঙ্গ  আর মুসলমান তরুণ বিশ্বের অন্যতম পরক্রমশালী, শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্টান দেশটির সমালোচনা করবে, আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তা কোনোমতেই সহ্য করা যায় না। তাই সামরিক বাহিনী তাকে যুদ্ধে পাঠাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলো। আইনজীবীরা তাকে কারারুদ্ধ করার ফন্দি আঁটলো। মিডিয়া তাকে তরুণ আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে কদর্য উদাহরণ হিসেবে চিত্রিত করলো। তাকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে আনার জন্য অনেক কিছুই করা হলো। অবশ্য ফাঁকে ফাঁকে লোভনীয় নানা প্রস্তাব দিয়ে তাকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টাও কম করা হয়নি। এমনকি সামরিক বাহিনী থেকে এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, আলী যদি শুধু নাম লেখান, তবেই যথেষ্ট। তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন, প্রদর্শনী লড়াইয়ে নামতে পারবেন। এমনকি চাইলে পেশাদার লড়াইয়ে নামতে পারবেন। কিংবা অসুস্থতার ভান করে দুই কূলই রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু আলীর সেই এককথা, ‘যুদ্ধ করা আমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়। আমার বিবেক সায় দিলে আমি সহজেই রণাঙ্গনে যেতে পারতাম।’ তিনি বললেন, ‘তারা যখন লুইসভিলের তথাকথিত নিগ্রোদের সাথে কুকুরের মতো আচরণ করছে, তখন কেন তারা আমাকে ভিয়েতনামের বাদামি মানুষের বিরুদ্ধে বোমা আর বুলেট বর্ষণ করতে বলছে? আমি আমার বিশ্বাস আর অবস্থানে অটল থেকে কিছুই হারাবো না। আমি চার শ’ বছরও কারাগারে থাকতে পারি।’

তার এই প্রত্যয়ে তার নিজের ভবিষ্যতই ফ্যাকাসে বলে মনে হলো। তিনি শিরোপা হারালেন, কারারুদ্ধ হলেন, কোটি কোটি ডলার থেকে বঞ্চিত হলেন। মনে হলো, আলী একটি বিস্মৃত নাম। কিন্তু তা তো হবার নয়। পরে আলীর কথাই ঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন যে ভুল ছিল, তা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আর তিনি ফিরেছেন রাজসিকভাবে। এটা যে কতবড় জয়, তা এককথায় কি প্রকাশ করা যায়?

অন্যদিকে ফ্রেজিয়ার ও ফোরম্যানের বিরুদ্ধে তার জয় কেবল মুষ্টিযুদ্ধেই সীমিত থাকেনি। এসব লড়াইকে স্রেফ মুষ্টিযুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করা হলে ভুল হবে। চামড়ায় কালো হলেও এই দু’জন ছিলেন আসলে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সরকারের, খ্রিস্টান ধর্মের প্রতিনিধি (এখানে তা একটি বিশ্বাসের নাম নয়, এটা আগ্রাসী সংস্কৃতির প্রতিভূ বিবেচনা করেছেন অনেকে। আর আলীর ইসলাম ছিল সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা সংস্কৃতি)। ভিয়েতনামে আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানানোর কারণে আলীর শিরোপা কেড়ে নিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফ্রেজিয়ারকে। তাকে তখন মার্কিন সরকারের অনুকূলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। অধিকন্তু তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে পদকজয়ী দুই অ্যাথলেটিক-টমি স্মিথ ও জন কার্লোস কালো দাস্তানা পরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তখন মুষ্টিযুদ্ধে স্বর্ণজয়ী ফোরম্যান এফবিআইয়ের পরামর্শক্রমে মার্কিন পতাকা দুলিয়েছেন। তাই এ দুজনের বিরুদ্ধে তার জয় ছিল প্রচলিত ও পরাক্রমশালী শক্তি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই বিজয়। কিনসাসায় ফোরম্যানের বিরুদ্ধে লড়ার আগে মোহাম্মদ আলী টিভি ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘আমি আল্লাহর জন্য এবং আমার জনগণের জন্য লড়ছি। আমি টাকার জন্য বা খ্যাতির জন্য লড়ছি না। আমি আমার জন্য লড়াই করছি না। আমি কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের উন্নতির জন্য, যেসব কৃষ্ণাঙ্গের ভবিষ্যত নেই, যেসব কৃষ্ণাঙ্গ মদ আর মাদকাসক্তিতে ডুবে রয়েছে, তাদের জন্য লড়ছি। আমি আল্লাহর হয়ে কাজ করছি।’

এটিও সহজ কোনো ঘোষণা ছিল না। তিন আরো বলেন, ‘এই ফোরম্যান খ্রিস্টানত্ব, আমেরিকা এবং সেই পতাকার প্রতিনিধিত্ব করছে, আমি তাকে ছেড়ে দেব না। সে কুকুরের মাংসের প্রতিনিধিত্ব করছে।’

তিনি তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলেই তাকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে সবাই। যে আলীকে একদিন যে শ্বেতাঙ্গ রেস্তোঁরায় খেতে দেওয়া হয়নি, সেখানে তিনি হয়েছিলেন পরম আকাংখিত ব্যক্তি। যে দেশ তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল, সেই আমেরিকাতেই আলী সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছেন। যে পদকটি তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন একদিন, সেটি আবার নতুন করে তাকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাদা কালো, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নাম হলো আলী। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিক গেমসের মশাল প্রজ্জ্বলনের সম্মানটি তাকেই দেওয়া হয়। আলী যখন মশালটি প্রজ্জ্বলন করেন, তখন অনেককেই আবেগে কেঁদে ফেলেন। তবে অনেকেই বলে থাকে, পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার পর আলী যখন করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন, তখনই সাদা আমেরিকা তাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে।

চলৎশক্তি হারিয়ে ফেললেও সবাই তাকে কাছে পেতে চায়। আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, পোপ, দালাইলামা সবাই তাকে আগ্রহভরে গ্রহণ করে। তৃতীয় বিশ্বে তিনি ক্রমাগত ছুটে চলেছেন নানা মিশনে। এমনকি ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকজন মার্কিন পণবন্দিকে মুক্তির জন্য তিনি আলোচনা জন্য সাদ্দাম হোসেনের কাছে যান।

আলীর মুষ্টিযুদ্ধ জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটিকে ধরা যেতে পারে, মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অলিম্পিক স্বর্ণলাভ এবং হেভিওয়েট শিরোপা বিজয়। তারপরের ধাপটি হলো এক মানবতাবাদী নেতার আত্মপ্রকাশ। এই পর্যায়ে তিনি আফ্রিকা জয় করেছেন, মূলে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন তথা সর্বগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন। তারপর তৃতীয় পর্যায়ে তিনি হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করেছেন, এক নতুন যোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আর সব শেষে তিনি বিশ্ব নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া শান্তি, সামাজিক দায়িত্ব, সম্মান এবং ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য তিনি কেন্টাকির লুইসভিলে নির্মাণ করেছেন মোহাম্মদ আলী সেন্টার। প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত এই কেন্দ্রটি ২০০৫ সালে উদ্বোধন করা হয়।

আলী শেষ জীবনে বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেখানেই যান, বাঁধভাঙা সংবর্ধনা পেয়েছেন। এতোকিছুর পরও তীক্ষ্ন রসবোধ হারিয়ে ফেলেননি। মুষ্টিযুদ্ধে তার গড়া রেকর্ড অক্ষুন্ন থাকেনি। কিন্তু মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, উজ্জ্বল তারকা হিসেবে তিনি বিশ্বের যে উচ্চতায় উঠতে পেরেছেন, তা তার আগে  কেউ পারেনি, হয়তো পরেও কেউ পারবে না।  তিনি যে প্রত্যয় নিয়ে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছিলেন, তাতে এই সম্মান কেবল তারই প্রাপ্য।

মোহাম্মদ আলীর ফ্যাক্টফাইল :

পুরো নাম : মোহাম্মদ আলী

জন্ম নাম : কেসিয়াস মার্সেলাস ক্লে, জুনিয়র

ডাক নাম: দি গ্রেটেস্ট, লুইসভিল লিপ।

জন্ম : ১৭ জানুয়ারি, ১৯৪২; লুইসভিল, কেন্টাকি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

মৃত্যু : ৩ জুন, ২০১৬; ফিনিক্স এরিয়া হাসপাতাল, অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র।

শিরোপার বিভাগ : হেভিওয়েট।

অলিম্পিক গেমস স্বর্ণপদক লাভ : লাইট হেভিওয়েট, ১৯৬০, রোম।

মোট লড়াই : ৬১টি; জয় ৫৬, নক-আউটে জয় ৩৭, পরাজয় ৫, ড্র ০।

বিশ্ব হেভিওয়েট শিরোপার লড়াই : ২৫টি (সবগুলোই হেভিওয়েট) জয় ২২, পরাজয় ৩।

মোহাম্মদ আলীর হেভিওয়েট শিরোপার লড়াইগুলো

২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৪ : সনি লিস্টন; মিয়ামি, জয় (প্রতিপক্ষের পরাজয় স্বীকার, ৬ষ্ট রাউন্ড)।

২৫ মে, ১৯৬৫ : সনি লিস্টন, লুইস্টন; মেইন, জয় (প্রতিপক্ষ নক আউট, ১ম রাউন্ড)।

২২ নভেম্বর, ১৯৬৫ : ফ্লয়েড পিটারসন; লাস ভেগাস, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১২তম রাউন্ড)।

২৯ মার্চ, ১৯৬৬ : জর্জ চুভালো; টরেন্টো, জয় (পয়েন্টে)।

২১ মে, ১৯৬৬ : হেনরি কুপার; লন্ডন, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ৬ষ্ট রাউন্ড)।

৬ আগস্ট, ১৯৬৬ : ব্রায়ান লন্ডন; লন্ডন, জয় (নক আউট, ৩য় রাউন্ড)।

১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৬ : কার্ল মিল্ডেনবারজার; ফ্রাংকফুর্ট, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১২তম রাউন্ড)।

১৪ নভেম্বর, ১৯৬৬ : ক্লিভল্যান্ড উইলিয়ামস; হিউস্টন, জয় (পয়েন্টে)।

৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৭ : আরনি টেরেল; হিউস্টন, জয় (পয়েন্টে)।

২২ মার্চ, ১৯৬৭ : জোরা ফলি; নিউ ইয়র্ক, জয় (নক আউট, ৭ম রাউন্ড)।

৮ মার্চ, ১৯৭১: জো ফ্রেজিয়ার; নিউ ইয়র্ক, পরাজয় (পয়েন্টে)।

৩০ অক্টোবর, ১৯৭৪: জর্জ ফোরম্যান; কিনসাসা, জায়ার, জয় (নক আউট, ৮ম রাউন্ড)।

২৪ মার্চ, ১৯৭৫ : চুক ওয়েপনার; ক্লিভল্যান্ড, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১৫তম রাউন্ড)।

১৬ মে, ১৯৭৫ : রন লাইলি; লাস ভেগাস, জয় (লড়াই থামিয়ে দেওয়া, ১১শ রাউন্ড)।

১ জুলাই, ১৯৭৫ : জো বাগনার; কুয়ালালামপুর, জয় (পয়েন্টে)।

১ অক্টোবর, ১৯৭৫ : জো ফ্রেজিয়ার; ম্যানিলা, জয় (প্রতিপক্ষের পরাজয় স্বীকার, ১৪তম রাউন্ড)।

২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ : জিন পিয়েরি কুপম্যান; স্যান জুয়ান, জয় (নক আউট, ৫ম রাউন্ড)।

৩০ এপ্রিল, ১৯৭৬ : জিমি ইয়ং; ল্যান্ডওভার, ম্যারিল্যান্ড, জয় (পয়েন্টে)।

২৪ মে ১৯৭৬ : রিচার্ড ডান; মিউনিখ, জয় (নক আউট, ৫ম রাউন্ড)।

২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৬ : কেন নরটন; নিউ ইয়র্ক, জয় (পয়েন্টে)।

১৬ মে, ১৯৭৭ : আলফ্রেডো ইভানজেলিস্টা; ল্যান্ডওভার, জয়, (পয়েন্টে)।

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ : আরনি শ্যাভার্স; নিউ ইয়র্ক, জয় (পয়েন্টে)।

১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮ : লিওন স্পিনসক; লাস ভেগাস, পরাজয় (পয়েন্টে)।

১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ : লিওন স্পিনসক; নিউ অরলিন্স, জয় (পয়েন্টে)।

২ অক্টোবর, ১৯৮০ : ল্যারি হোমস; লাস ভেগাস, পরাজয় (লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানো, ১০ম রাউন্ড)।

 

 

সিদ্দিকুরের চোখ, ইউএনও’র হাতকড়া, অতি-উৎসাহী প্রশাসন আর ওবায়দুল্লাহরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সিদ্দিকুর এখন জেনে গেছেন, তার চোখে হয়তো আর আলো নাও ফিরতে পারে। তাকে সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত: এইটুকু করুণা করা হয়েছে যে, তার চোখের চিকিৎসায় ভারতের চেন্নাই পাঠানো হবে। পুলিশ কমিশনার তার চোখে টিয়ার সেল লাগার ঘটনায় ইতিমধ্যেই ‘রহস্যময়তা’ খুঁজে পেয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত করে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ঐ তদন্ত রিপোর্টে সন্তুষ্ট না হলে তিনি আবার তদন্ত করাবেন।

পুলিশি নির্মমতা বা রহস্যময়তার শিকার হয়ে এই ছাত্রটি যখন চোখের আলো হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় রয়েছেন, ঠিক সে সময়ে খুলনায় ‘ছিনতাইকারী’ অভিযোগে এক যুবকের চোখ তুলে নিয়েছে পুলিশ। এইসব ভয়াবহ ঘটনা স্বাভাবিকভাবে যেমনটা হয়ঠিক তেমনি চাপা পড়তে যাবার সময় একজন ‘‘ভাগ্যবান’’ ইউএনও’র প্রতি অন্যায় আচরনের প্রতিবাদে সকল মহলের তৎপরতা সত্যিই চেখে পড়ার মতো। তাকে নিয়ে এখন সকল মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। সে তোলপাড় পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও, অবশ্য প্রশাসনের কর্মকর্তা হবার সুবাদে সংগত কারনও যে নেই তা নয়।

সদ্য কৈশোর পেরোনো এজন তরুণ সিদ্দিকুর কী জানেন, আমাদের এই রাষ্ট্র-সরকার-সমাজ সাড়ে চার দশক ধরে কিছু খুবই সামান্য ব্যত্যয় ছাড়া এক অস্বাভাবিক পথে হাঁটছে? অর্ধসত্য- সত্য-মিথ্যের মিশেল দিয়ে যে কোন বিষয়কে ধামাচাপা দেয়ার ক্ষেত্রে এখন কোন দ্বিধা নেই, রাখ-ঢাক নেই। ধারাবাহিক পলিসি অব ডিনায়েল (প্রত্যাখান বা না বলার নীতি) ও অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং জনমানুষের মনোজমিনে জায়গা করে নিচ্ছে। এই রোগ একদিকে গণতন্ত্রের (?) প্রাতিষ্ঠানিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে, তেমনি শাসকশ্রেনীর বিভিন্ন অঙ্গকে লাগামহীন ও বেপরোয়া করে তুলছে।

দুই. ১৯৯৫ সালে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছিল। অমন বদলি আকছার হয়েই থাকে। কিন্তু ঐ বদলিটিকে কেন্ত্র করে পরবর্তীকালে অনেক ঘটন-অঘটন সৃষ্টি হয়েছিল। এটি ছিল প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র অফিশিয়ালদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের- ফলশ্রুতি। ড. কামাল সিদ্দিকী সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্যসচিব। আরেক সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ‘জেলা গেজেটিয়ার’ পদে বদলি আদেশের ফাইলটি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাক্ষরের জন্য তিনি উপস্থাপন করেন।

খানিকটা গুরুত্বহীন জেলা গেজেটিয়ার পদে সাধারনত অতিরিক্ত সচিবদের দেয়া হয়। স্বাক্ষরের আগে প্রধানমন্ত্রী তার মুখ্যসচিবের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সব ঠিক আছে কিনা এবং কোন সমস্যা হবে কিনা? মুখ্যসচিব তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, না, কোন সমস্যা নেই। এভাবে, সে সময়ের ‘‘জাদরেল’’ সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীর অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার হয়েছিলেন এবং তাকে কেন্দ্র করে যা যা ঘটেছিল, তা ইতিহাস। ঘটনার অভিন্ন বর্ণনা শুনেছিলাম সে সময়ের দু’জন কর্মকর্তার কাছে, যাদের একজন এখন প্রয়াত।

পরবর্তী ঘটনা অনেকের জানা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কিভাবে সরকারের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে পরবর্তীতে ‘জনতার মঞ্চ’গঠন করেছিলেন, সচিবালয়ে বিদ্রোহ ঘটেছিল এবং এসব ঘটনা সরকার পতনে কি ভূমিকা রেখেছিল- সেগুলি পরের সরকারগুলোর কাছে উদাহরন হয়ে আছে। নির্মোহভাবে বলা যায়, এর মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনের বারোটা বেজেছিল, রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে আমলাতন্ত্র  একেবারেই ‘পার্টিজান’ হয়ে যায়; যার মন্দ-ভাল ফল গত দেড়যুগ ধরে দেশের মানুষ ভোগ করছে।

ম.খা. আলমগীর জাদরেল সিএসপি, একাত্তরের ময়মনসিংহের এডিসি, লাইমলাইটে আসেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ এর একজন বাস্তবায়নকারী, খাল-কাটাখ্যাত এবং সিভিল-মিলিটারী সরকারের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে। প্রয়াত: জিয়ার প্রতি অনুরক্ত এই আমলা মূলত: ১৯৯৫ সালের ওই ঘটনার পর বিসিএস প্রশাসন সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগের গুডবুকে চলে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তার প্রাপ্তিযোগ এবং পুন:পুন নির্যাতনের শিকার হওয়া, সকলেরই জানা আছে।

তিন. তারিক সালমান সিভিল ব্যুরোক্রেসির জুনিয়র সদস্য। সৎ, নিষ্ঠাবান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে ধারনা পাওয়া যাচ্ছে। আগৈলঝড়া ও বরগুনা সদরে ইউএনও হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তার কৃত অনেক বিষয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে। তিনি বরিশালের সেরনিয়াবাত পরিবারের আর্শীবাদপুষ্ট ক্ষমতাসীন দলের কথিত হাইব্রিড ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি শক্ত অবস্থান বজায় রেখে চলেছিলেন। যেটি পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের, গ্রেফতার ও হাজতবাসকে ত্বরান্বিত করে।

কর্মকালে তিনি তার জেলা প্রশাসকদ্বয়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, এমনকি বিভাগীয় কমিশনারেরও। একথা সকলেই জানেন, ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে এসময়কালের প্রায় সব জেলার জেলা প্রশাসকগন, বিভাগীয় কমিশনারবৃন্দ ও উপজেলা নির্বাহী আফিসারগন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের প্রতি কতটা অনুগত এবং ‘পার্টিজান’। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা রয়েছে । তারিক সালমান এর বাইরে ছিলেন বলে ধারনা তৈরী হয়েছে।

তার বিষয়ে ঘটনাক্রম এরকম; আগৈলঝড়ার ইউএনও থাকাকালীন একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারী শিশুর আঁকা শেখ মুজিবের ছবি তিনি স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রনপত্রে ‘লোগো’ হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি ‘বিকৃত’ ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে- এমত অভিযোগে জেলা প্রশাসক তাকে শোকজ করেন। ইউএনও উত্তর দেন, যা জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অত:পর দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বা আনা হয় একজন সাবেক বিএনপি নেতা, বর্তমান বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজুকে।

তিনি ইউনিও’র বিরুদ্ধে সিএমএম আদালতে মামলা ঠুকে দেন। বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে ‘হৃৎকম্পন’ হচ্ছিলো এবং যারপরনাই ব্যথিত হয়েছেন-অভিযোগে ওবায়দুল্লাহ আদালতকে জানান। সমন পেয়ে ইউএনও আদালতে হাজির হলে জামিনযোগ্য মামলায় তিনি জামিন পান নাই, সংক্ষিপ্ত হাজতবাসের দুই ঘন্টা পরে নাটকীয়ভাবে জামিন পান। শুরু হয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দল ও বিচার প্রশাসনের অনেক কুৎসিত তথ্য প্রকাশিত হতে থাকে।

পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সিভিল প্রশাসন ইউএনও’র ঘটনায় বিষ্ময় ও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ত্বরিৎ হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী ইউএনও’র প্রতি এই আচরনে যুগপৎ  বিষ্মিত ক্ষুব্দতা প্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীন দলও সচকিত হয়ে ওঠে। ‘এস্কেপ গোট’ হিসেবে ওবায়দুল্লাহ দল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত হন। বরিশাল ও বরগুনার জেলা প্রশাসকদ্বয়কে প্রত্যাহার করা হয় এবং সিএমএম আলী হোসেনের বদলির সুপারিশ সুর্প্রীম কোর্টে পাঠানো হয়।

বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে যে হৃৎকম্পন হচ্ছিলো তা কতটা বন্ধ হয়েছে জানা না গেলেও সাময়িক বহিষ্কৃত ওবায়দুল্লাহ ইউএনও’র বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিয়েছে। বরিশাল আওয়ামী লীগ ওবায়দুল্লাহ’র বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছে, যদিও এর কোন মূল্য নেই। উল্টোটা হলেও তারা স্বাগত জানাতো। কারণ, বিশেষ একটি পরিবারের ‘ফ্রাঙ্কেনষ্টাইল’ ওবায়দুল্লাহ ও বরিশাল আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত হয় কাদের মাধ্যমে-ক্ষমতাসীনদের কেন্দ্রের তা অজানা নেই।

চার. ক্রমশ: অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র-সমাজে ইউএনও তারিক সালমানের ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্বরিৎ প্রতিক্রিয়া সিভিল প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু অন্যান্য বিভাগ ও জনগনকে কতটা আশ্বস্ত করলো, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে? কারণ, একজন ইউএনও যখন ব্যাংক ম্যানেজারকে প্রকাশ্যে চড়-থাপ্পড় মারছেন, সংসদ সদস্য শিক্ষককে কান-ধরে ওঠবস করাচ্ছে; একজন কলেজ শিক্ষক ফরিদউদ্দিনকে দিগম্বর করে রাজপথে ঘোরানো হচ্ছে এবং সহকারী কমিশনার শিক্ষককে লাঞ্চিত করছে কিংবা পুলিশ শিক্ষকদেরকে পেটাচ্ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাবীতে মিছিলে নির্বিচারে ‘‘ব্যবস্থা’’ নেয়া হচ্ছে -এরকম ছবি বা খবর মিডিয়ায় অসংখ্যবার প্রকাশিত হলেও সকলে বেশ নির্লিপ্ত থাকছেন। পাঠক, এগুলো সামান্য কয়েকটি ঘটনা মাত্র, অনেকেই এর চেয়েও ঢেড় বেশী ঘটনার খবর রাখেন, তা সত্য বলে মানি।

অসহিষ্ণু সরকার, সংসদ সদস্যবৃন্দ, প্রশাসনযন্ত্র তথ্য প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারাকে ভালভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন। অতি বিতর্কিত এই আইনটি সরিয়ে দেয়ার কথা উঠছে, তবে দ্বিমতও আছে কর্তাদের। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯ ধারা মূলত: ৫৭ ধারার প্রায় অবিকৃত প্রতিস্থাপন। এসব আইনের চর্চায় সরকার হয়তো সুখ-স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে, কিন্তু জনগনের সুখ-স্বস্তি কেড়ে নিয়ে ক্রমশ: নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।

অতি সম্প্রতি শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে প্রশাসনের বিরোধ বা সখ্যতার প্রেক্ষাপটে প্রাক-নির্বাচনী বছরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম এবং নিকট ভবিষ্যতে এর প্রভাব তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য।

নির্বাচন-পূর্ব অর্থ পাচার : সহজেই ৩টি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) গত মে মাসে ‘ইল্লিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৫-১৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থ পাচারের  যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে। এবারের প্রতিবেদনে রয়েছে ২০০৫-২০১৪ সাল সময় পর্যন্ত তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থ পাচারে ভারতের পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার (প্রায় ৭২,৮৭২ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে ২০১৪ সালে- যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও পানিসম্পদ খাতের মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান। এছাড়া, ২০০৫-২০১৪ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৭৫৮৫ কোটি ডলার বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে (৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার)- যা ছিল সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের বছর পর্যন্ত। অর্থ পাচারে দেশগুলোর তালিকায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯টি দেশের মধ্যে ছিল ২৬তম। আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপনসহ নানা পদ্ধতির মাধ্যমেই এই অর্থের বড় অংশ পাচার করা হয়েছে। অথচ কেবল অর্থ পাচার ঠেকাতে পারলেই মূসক খাতের আয় নিয়ে আদৌ কোনো দুশ্চিন্তা করতে হতো না এনবিআরকে। পাচার হওয়া এ অর্থ দিয়েই বাংলাদেশে ৩টি পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব হতো। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬-তে দেখা যায়; ২০১৫ সালে সেদেশে বাংলাদেশীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা বেড়েছে ১৯ শতাংশ। বর্তমানে যেখানে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর আগেই বলা হয়েছে যে, মে মাসের শুরুতে ওয়াশিংটন ভিত্তিক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয় ১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

আমাদের দেশটি বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে;নানা স্বপ্নও দেখানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মতে, অচিরেই দেশটি মধ্যম আয়ের দেশের বলয়ে ঢুকে যাবে। ফলে অর্থপাচারের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের আমলে না নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এর আগেও অনেকবার বিষয়টি সামনে এসেছে, কিন্তু সরকার তথা সংশ্লিষ্টরা অর্থপাচার রোধে খুব যে একটা তৎপরতা দেখিয়েছে, তেমনটি মনে করা যায় না। এর প্রমাণ তো প্রতিবেদনের বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্য অর্থপাচারের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও, সংশ্লিষ্টদের রয়েছে অনিবার্য নির্লিপ্ততা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠা অমূলক নয় যে, দেশ থেকে অর্থপাচারের মতো ভয়াবহ ঘটনা আদৌ রোধ করা যাবে কি না?

প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে এবং রফতানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে আমদানি রফতানি করছেন। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিষয়টি যেহেতু বারবার আলোচনায় উঠে আসছে, তাহলে তা প্রতিরোধে কেন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। পণ্যের আমদানি-রফতানির জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলই ব্যবহার করতে হয়। অর্থপাচারের এই দায় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করতে পারে না।

অন্যদিকে, ‘সেকেন্ড হোম’ এর কথাটিও বহুল আলোচিত। এমনও দৃষ্টান্ত রয়েছে, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী মোটা অংকের বিনিয়োগ করে শিল্পপতিরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে নিচ্ছেন। বাংলাদেশীদের মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের সুবিধা নেওয়া, কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি, বেশকিছু ব্যবসায়ীর সিঙ্গাপুর, হংকং-এ অফিস বানানোর তথ্য সত্য বলেই এখন ধরে নেয়া যায়।

২০১৫ সালে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশিদের জন্য সরকারের ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পে বাংলাদেশ ৩য় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ; যেখানে ৩ সহস্রাধিক বাংলাদেশি প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নগদ ৫ লাখ রিঙ্গিত (১ কোটি ২৫ লাখ টাকা) দেশটিতে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত যে কোন দেশে নাগরিকদের বিদেশে টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে, যেখানে গত ১০ বছরে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে কোনো অনুমোদন দেয়নি। এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মালয়েশিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করা হয়েছে।  এছাড়াও যেসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত রয়েছে, সেই সব দেশের আবাসিক ভবন, জমি ক্রয়, হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। এদের মধ্যে অনেকে অফশোর ব্যাংকিং, বিদেশী কনসালটেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন।

বিশ্বজুড়ে আলোড়নকারী টাকা পাচারের কেলেঙ্কারি ফাঁস করা ‘পানামা পেপার্স’ এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২৭টি ব্যাংক হিসাবের কথা প্রকাশিত হয়েছে।

গত ১০ বছরের অর্থপাচারের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব বছর দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেশি ছিল, সেসব বছরে অর্থপাচার বেড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তার সময় ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আগের ৯ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে। ওই বছরটিতে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর আগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অনেক বেড়ে যায়। বছরটিতে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর আগের অন্যান্য বছরের মধ্যে ২০০৪ সালে ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪১০ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ থেকে দিন দিন অর্থপাচারের পরিমাণ বেড়ে চলেছে।

এটাও জানা যায়, দেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হলেও এর বিপরীতে মামলা হচ্ছে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকার, যা মোট পাচারকৃত অর্থের ৩ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৭ শতাংশ বা ৪৩ হাজার কোটি টাকার কোনো রেকর্ড থাকছে না। এ অর্থ হিসাবের মধ্যে আসছে না। পাচার হওয়া অর্থের একটা বড় অংশ জমা আছে সুইস ব্যাংকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে যখন বাংলাদেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ ঘটছে না, তখনো পাচার হচ্ছে অর্থ। অথচ এই অর্থ যদি পাচার না হয়ে বিনিয়োগে আসত তাহলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতো, উৎপাদন ও রফতানি বাড়তো, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। সব মিলে অর্থনীতি ও উন্নয়নে বড় রকমের অগ্রগতি হতো।

সাধারণত দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত অর্থসহ অবৈধভাবে প্রাপ্ত অর্থ পাচার হয়ে যায়। এটা ঠিক, দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের নিরাপত্তার অভাব আছে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশেরও অভাব আছে। অর্থপাচার হওয়ার এ দু’টিই বড় কারণ। এর আগে অপ্রদর্শিত অর্থ বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও খুব বেশি সাড়া পাওয়া যায়নি। দুদক ও বিভিন্ন সংস্থার ভয়ে অনেকেই অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহ ও উৎসাহ দেখাননি। দুর্নীতি বা অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন কোনো দেশেই সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও দেখা গেছে অনেক দেশ এ অর্থ অবাধে ও বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে এবং তাতে ওইসব দেশ লাভবান হয়েছে।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) পরিচালিত ২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যিক লেনদেনের গড়ে ১০ শতাংশের বেশি অর্থ পাচার হয়। ২০১৪ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ৪০-৮০ শতাংশ কালোটাকা। জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) এর তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। পাচারকৃত এ অর্থ দেশের মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এর দুই-তৃতীয়াংশ।

বিলাত ফেরত সহায়ক সরকার

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

প্রায় দশককাল পরে বিএনপি ‘নির্বাচন যাত্রা’ শুরু হয়েছে। নির্বাচনমুখী একটি দল যদি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায় না করতে পারে, তাহলে তার অবস্থান হয়ে দাঁড়ায় ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’- বিএনপি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরন। নানা পন্থায় সরকারের অদম্য ও সীমাহীন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের সৌভাগ্য যে, ভাঙনের মুখোমুখি হয়নি দলটি অথবা উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মীরা দলছুট হয়নি। মামলা-হামলা-নির্যাতন সয়েও নিষ্ক্রিয় হয়েছেন; কিন্তু দল ছাড়েননি, আনুগত্যও পরিবর্তণ করেননি।

তবে এ বিষয়টি কখনই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হিসেবের মধ্যে ছিল না যে, ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনে এরশাদের অধীনে ঘোষিত নির্বাচন বয়কট এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এক নয়; সময়-কাল- পাত্র ভিন্ন। ২০১৪ সালে বিএনপি আন্দোলনমুখী ছিল না; নেতৃত্বও মাঠে ছিল না; জামায়াত-শিবির নির্ভর আন্দোলন নাশকতার চোরাগলিতে হারিয়ে গেছে। যদিও আতঙ্কিত সরকার বলেছিল, ‘সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার এই নির্বাচন, আলোচনার ভিত্তিতে সহসাই একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে’।

ঐ নির্বাচনের পরে বিএনপি নেতৃত্ব আন্দোলনে ইতি-টেনে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে জনগনকে সংগঠিত করে কোন আন্দোলন তারা আর করতে সক্ষম ছিলেন না- যাতে সরকারকে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করা যায়। ফলে ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেয়ে যায় পুরোপুরিভাবে। নৈতিকভাবে দুর্বল সরকার হয়ে অনিবার্যভাবে হয়ে ওঠে হিংস্র, ক্ষিপ্র ও কর্তৃত্ববাদী। এই আশঙ্কাটি নিয়েই ২০১৪ সালের গোড়াতেই ‘‘আমাদের বুধবার’’-এ বলা হয়েছিল যে, এই সরকার কোন বিরুদ্ধ মত-পথ সহ্য করবে না।

ধারনা করা হয়, ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনের অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলেই দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারতো। নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতাসীনরা বিএনপির অংশগ্রহনে নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তাদের বার্তা দিয়েই দিয়েছিল। ফলে একটি যেন-তেন প্রকারের নির্বাচনেও ভোট দেয়ার সুযোগ দিলে কি ঘটবে- এটি তাদের জানাই ছিল। সেজন্য বিএনপিকে বাইরে রেখে একক নির্বাচনের পথ-নকশা হয়েছিল- আর বিএনপি সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিল, লন্ডন থেকে উসকানী পাঠিয়ে দেয়া হলো।

অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু আলাপচারিতায় দেশের একজন খ্যাতনামা গবেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। তার মতে, ঐ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিএনপি অংশগ্রহনের ঘোষণা দিলে গোটা ছকই পাল্টে যেত এবং ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারতো। তিনি আরো মনে করেন, মঞ্চ প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বিএনপির অপরিনামদর্শী নেতৃত্ব সে বিষয়টি অনুধাবনে সক্ষম ছিল না। যার ফলে নির্বাচনী রাজনীতির মূল¯্রােত থেকে তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুরে সরে যেতে হয়েছে।

দুই. নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ বা ‘পথ-নকশা’ ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলটি সন্তোষ ব্যক্ত করে রোডম্যাপ অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তবে বিএনপির মহাসচিবের মতে, “যার কোন রোডই নাই, তার ম্যাপ আসবে কোত্থেকে”। তিনি অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, সিনিয়র নেতাদের সাথে আলোচনা করে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাবেন। তার মতে, বিএনপি এখন সহায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহনের কথা ভাবছে না।

কিন্তু এবিষয়টি নিশ্চিত যে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনীমুখী এই দলটির সামনে কি অন্য কোন বিকল্প আছে? ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে অনেক ধরনের মেরুকরণ ঘটে গেছে, বহু কিছুণেযা হয়েছে দখলে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধ্বজাধারী আওয়ামী লীগ ধর্মকে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিএনপির চেয়েও পারঙ্গমতা অর্জন করেছে, সেটিও দৃশ্যমান। কিন্তু ভোটের বাজারে তাদের এই তৎপরতা কতটা সুফল এনে দেবে  খোদ ক্ষমতাসীন দলই সে ব্যাপারে ভালো বলতে পারবে। তবে তারা ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন পাবার আশা ছাড়েনি।

বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের আওয়াজ তুলেছে মাত্র। দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে লন্ডনে রওয়ানা হয়ে গেছেন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। সেখানে তার পুত্র ও দলের দ্বিতীয় প্রধান তারেক জিয়ার সাথে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই হবে বিএনপির আগামী কর্মসূচি। লন্ডন থেকে ফিরে এসে খালেদা জিয়া সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ করবেন। এর আগে নির্বাচনকে মাথায় রেখে ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করা হয়েছে অনেকটাই ‘মিশন’বিহীন পরিস্থতিতে।

তবে গুরুত্বপূর্ন একটি ম্যাসেজ নির্বচন কমিশনের পক্ষ তেকে দেয়া হয়েছে; আর তা হলো-নির্বাচনকালীন সময়ের বিষয়গুলো তাদের এখতিয়ার; এর আগের লেভেল-প্লেইং ফিল্ড গঠন তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এটিও মনে রাখতে হবে যে, বিএনপিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে হবে  নির্বাচনকালে। এটি যে সহজ নয় তা দলটির জানা আছে। এই দেশে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য তিন ধরনের শক্তির দরকার হয়। ক) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা; খ) জনগনের শক্তি; গ) আন্তর্জাতিক সমর্থন- বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের। দশককাল ধরে বিএনপির ক্ষেত্রে এই শক্তিগুলোর সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্ষমতাও নেই। বিএনপির ভোট আছে বটে কিন্তু জনগনের শক্তিকে সংগঠিত করার সক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে তারেক জিয়া এখনও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অতিবড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন’।

দলের ভঙ্গুর দশা, দলের মধ্যে দল ও অনৈক্য এবং সুবিধাবাদীদের চক্রান্ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে বিএনপির। এ সকল বিপত্তিও যে  কোন সময় বিপদের কারণ হতে পারে। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার মামলাগুলি আদালতে সহসাই নিস্পন্ন হবে যাচ্ছে-এমন আলামত সুস্পষ্ট। মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হলে আইনী মোকাবেলাসহ আগামী নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বিএনপিকে। আর এর সাফল্যেই নির্ভর করবে কি ধরনের লক্ষ্যভেদী কৌশল তারা নির্ধারন করতে সক্ষম!

বিএনপির কিছু শুভাকাংখী অবশ্য অবগতিতে রয়েছেন যে, খুব সহজেই ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনের পরিনতির শিক্ষণ মাথায় রেখেই এগোচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেককেই এই নির্বাচনের বাইরে রাখার তৎপরতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যত দিন যাবে, এই তৎপরতা বহুমাত্রিকতা পাবে। এসব কিছুকে বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনমুখী বিএনপির স্মৃতিতে রয়েছে ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা,পরিস্থিতি আর হাঁ-হুতাশ আছে, তবে দুঃখজনকভাবে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন নেই।