Home » সময়ের বিশ্লেষণ

সময়ের বিশ্লেষণ

সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহত হতে পারেন!

আমীর খসরু ::

সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাককে পুলিশ বুধবার আটক করে ‘ভিন্ন এক পদ্ধতিতে’। দোহার থানার ওসির সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া ভাষ্য মোতাবেক – প্রার্থী  আবু  আশফাকের নিরাপত্তার জন্যই তাকে আটক করে পুলিশ কাস্টোডিতে নেয়া হয়।

১৯৭০-এর প্রথমদিকের ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কালে একটি ঘটনা বোধ করি অনেকেরই মনে নেই অথবা জানা নেই । সেই সময়ে ভিয়েতনামে ঘটে যাওয়া দুনিয়া কাঁপানো একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান সাংবাদিক পিটার আর্নেট তখন এ্যসোসিয়েটেড প্রেস বা এপির ভিয়েতনাম বিষয়ক সংবাদদাতা। পিটার আর্নেটের ওই সময়কালের একটি প্রতিবেদন ছিল এই রকম- যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তখন ভিয়েতনামের একটি গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। ঘটনাটির খবর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌছালে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন গ্রামটি ধ্বংস করো হলো? জবাবে সেই ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা জবাব দিয়েছিলেন- “We had to destroy the village in order to save it.”  অর্থাৎ ‘গ্রামটিকে রক্ষার  জন্যই ওই গ্রামটিকে আমাদের ধ্বংস করে দিতে হয়েছে।’ সাম্প্রতিক যেসব ঘটনাবলী ঘটছে তাতে কর্মকর্তাদের ভাষ্য শুনে ওই ঘটনা বারংবার মনে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতিপক্ষের উপরে হামলা, ভাংচুর, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটে চলেছে। ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিবের গাড়িবহরে হামলা ও ভাংচুর, নোয়াখালীতে যুবলীগ নেতা নিহত হওয়াসহ সংবাদ মাধ্যমের হিসাব মোতাবেক আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর প্রথমদিনেই কমপক্ষে ১৮টি স্থানে সহিংস রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে। বুধবার সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে ১৭ জেলায়। এতে হামলা-ভাংচুর, সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩২ জন। বৃহস্পতিবারও ২৩ জেলার বিভিন্নস্থানে হামলা, সংঘর্ষ, বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশের বিশাল এক এলাকা এখন নির্বাচনী সহিংসতার কবলে।  আর এটি করা হচ্ছে, মূলত ক্ষমতাসীন দল ও  আইন শৃংখলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাধ্যমে।

শুক্রবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরেও হামলা হয়েছে। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বের হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠের ‘স্থিতিস্থাবকতা বা ভারসাম্য’ বিনষ্ট করা হচ্ছে – যার ফল স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহভাবে নেতিবাচক হতে বাধ্য। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সব ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না, আসতে দেয়াও হয় না। কাজেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা যে কতো বিশাল এবং ভীতিকর তার সামান্য হলেও কিছুটা আচ করা যাচ্ছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খবর দিচ্ছে-বুধবার আর বৃহস্পতিবার- দুইদিনেই বিএনপির প্রার্থীসহ দুইশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আলো স্পষ্ট করেই বলেছে, বিএনপিকে চাপে রাখতেই গ্রেফতার, হামলা, বাধার ঘটনা ঘটছে। আসলে কোন দল বা জোট প্রার্থীকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ না বিএনপি প্রার্থীদের বাধা দেয়া হচ্ছে সেটি বড় ও মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচনের জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তির যে আকাঙ্খাটুকু জনমনে ছিল তা যে কোথাও বিদ্যমান নেই; বরং এর উল্টো পরিস্থিতি বিরাজমান – তা চোখে আঙুল দিয়ে আর দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, এতোসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কোনো কার্যকর ভূমিকাই দৃশ্যমান নয়। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা যে এরকমটি হবে, সাধারণ মানুষ ইতোপূর্বেই তার আলামত  টের পাচ্ছিলেন বা আচ করতে পারছিলেন। এ কারণে আমজনতা নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকায় অবাক তো হয়ইনি, বিস্ময়ের কোনো বিষয়ও নয় ওই ভূমিকা। এটা সবারই ধারণা ছিল যে, এমনটাই হবে। সাধারণ মানুষ এমনটাও ধারণা করেছিল যে, প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের সম্ভাব্য ভূমিকা কি হতে পারে? তবে কিছুটা কৌতূহল জেগেছে এই কারণে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এত্তোসব সহিংস ঘটনাবলীতে শুধুমাত্র ‘বিব্রত ও মর্মাহত হয়েছেন’। এর মধ্যদিয়ে একটি বিষয় প্রমাণিত হলো যে, সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহতবোধ করতে পারেন। এটুকু এখনো অবশিষ্ট আছে। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।

তবে সিইসি’’র এমন বক্তব্য তার এবং পুরো নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব আর ব্যর্থতাই প্রমান করে। এমন অসহায়ত্ব থাকলে জনমনে আস্থাহীনতা ও ভীতির সৃষ্টি হয়। ওই বক্তব্য সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্য হচ্ছে- ‘‘নির্বচন কমিশন একটি এ্যকশন ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠান। কোনো ঘটনায় তার বিব্রত হওয়া বা মর্মাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কমিশন চাইলে যেকোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে পারে।”

কিন্তু সাথে সাথে এ বিষয়টিও যেকোনো কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দলের অর্ন্তদ্বন্দ্বে ঢাকার আদাবরে ২ জনের নিহত হওয়াসহ ওই সময় যেসব ঘটনাবলী ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশন কঠোর হলে এখনকার ঘটনাবলী হয়তো এড়ানো যেতো। সিইসি ওই সময় এও বলেছিলেন, পুলিশ প্রশাসন অন্যায্য কিছু করছে না।

এদিকে, প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই এমন সহিংস রক্তারক্তির ঘটনাবলীর পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময়ে প্রার্থীরা বৈধ অস্ত্র বহন করতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কেন চুপচাপ? বিগত নির্বাচনগুলোতে বৈধ অস্ত্রও সংশ্লিষ্ট থানায় বা  আইনী হেফাজতে রাখার বিধান ছিল। এবারই তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।

যে ধারায় ও পর্যায়ে হামলা, গ্রেফতার, সহিংসতা চলছে এবং চালানো হচ্ছে এবং প্রশাসনের যে ভূমিকা তাতে সাধারণ মানুষের মন ও মনোজগতে বিদ্যমান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শংকা এতোটুকুও তো কমেইনি, বরং দিনে দিনে বাড়ছেই। এ কারণেই সর্বত্র একটি প্রশ্নই এখন উচ্চারিত হচ্ছে- ‘আমরা আমাদের ভোটটি শেষ পর্যন্ত ‘সহি-সালামতে’ দিতে পারবো তো?’ এই ভীতি, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, শংকা দূর করতে না পারার ব্যর্থতা পুরোটাই নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, সিইসি যতোই বিব্রত ও মর্মাহত হবেন, জনমনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সংশয় -সন্দেহ ততোই বাড়তেই থাকবে। আসলে পুরো পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং কর্মকান্ডে সাধারণ ভোটাররাই সত্যিকার অর্থে বিব্রত, মর্মাহত।

৭১ এর শক্তি

আনু মুহাম্মদ ::

‘‘আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়’’

নির্বাচনের হট্টগোলের মধ্যেও বিজয় দিবসের ডাক আসে, প্রশ্ন আসে, আনন্দ বেদনার সাথে আসে ক্ষোভ। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে দানবীয় অপশক্তির ভয়ংকর থাবার মধ্যে, নির্যাতন ও প্রতিরোধের যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এইদেশের মানুষ গেছেন, তা যারা দেখেননি তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন। সেই অভিজ্ঞতা এই জনপদের সেইসময়ের ও পরবর্তী সকল প্রজন্মের জন্য অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের ভয়ংকর কারাগার থেকে মুক্ত হবার আনন্দ নিয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে এসেছিল নতুন করে শ্বাস নেবার দিন। বেদনার পাহাড় বুকে নিয়েও মানুষের তখন অনেক স্বপ্ন।

কিন্তু এরপর থেকে একে একে দুমড়ে মুচড়ে যায় তার অনেককিছু। সবকিছু দখলে চলে যেতে থাকে ক্ষুদ্র এক গোষ্ঠীর হাতে, তৈরি হয় লুটেরা কোটিপতি, স্বৈরশাসন আসে নানা রূপে। যুদ্ধাপরাধীদের দল আসে, ব্যবসা হয়, ক্ষমতা হয়, গাড়ি হয়,- তাতে উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। সাম্রাজ্যবাদ নতুন করে খুঁটি বসায়। তাই সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীপুরুষের ওপর শোষণ নির্যাতন চলতে থাকে। অসম্পূর্ণ বিজয়ের পর একেকটা পরাজয় জমতে থাকে।

এই বিজয় দিবসে আমাদের সামনে ত্বকী, সাগর-রুনী, তনু, মিতুর লাশ, রামুর বিধ্বস্ত জনপদ, ভাঙাচোরা বুদ্ধের শরীর, গোবিন্দগঞ্জের গুলিবিদ্ধ আগুনে পোড়া মানুষের হাহাকার, নাসিরনগর সাঁথিয়াসহ বহু অঞ্চলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত মুখ, পার্বত্য চট্টগ্রামে উজাড় পাহাড় আর সহিংসতায় বিপন্ন মানুষ ও প্রকৃতি। আমাদের সামনে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত – গুম হয়ে যাওয়া হাজার মানুষ। আসে শত হাজার নিহত শ্রমিকের মুখ। নিপীড়িত কিশোর ও তরুণেরা। জীবন্ত কবরে সহস্রাধিক, কয়লা হয়ে যাওয়া শতাধিক শ্রমিকের শরীর। সড়কে লঞ্চে হাজার হাজার মানুষ। কোনোভাবেই দুর্ঘটনা নয়, লোভের খুন। আমাদের চোখের সামনে বিশ্বজিতের বিস্ময়, চিৎকার আর রক্তাক্ত দেহের ছায়া। পুলিশের সামনে দলবদ্ধ হয়ে একজন নিরীহ অচেনা তরুণকে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা। নদী দূষণ ও দখল, পাহাড় বন উজাড় আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন বর্তমান সময়ের উন্নয়ন যাত্রার প্রধান চিহ্ন। সমুদ্রের ব্লক নিয়ে আত্মঘাতী তৎপরতা চলছে। বিশেষজ্ঞ মত, জনমত অগ্রাহ্য করে সুন্দরবন বিনাশীবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা বাণিজ্যিক বনগ্রাসী ভূমিগ্রাসী তৎপরতাও চলতে পারছে। চলতে পারছে দেশবিনাশী রূপপুর প্রকল্পের কাজ।

গত ৪৭ বছরে দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বেড়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন এখনও মানুষের হয়নি। এখন অর্থনীতি ধরে রেখেছেন দেশের গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক আর কৃষকেরা। দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকেরা জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেশে বছরে আনেন প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। এই প্রবাহ না থাকলে লুটেরাদের দাপটে অনেক আগেই ধ্বস নামতো অর্থনীতিতে। আতংকের সমাজ, দখলদার অর্থনীতি, জমিদারী রাজনীতি এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান পরিচয়। এর জন্য তো মানুষ অসম্ভব সাহস ও ঝুঁকি নিয়ে জীবন দিয়ে বাংলাদেশ আনেনি। অথচ এর মধ্যেই এখন আমরা ‘আছি’। দুর্নীতি দখলদারিত্ব, নানা অগণতান্ত্রিক আইনী বেআইনী তৎপরতা, সন্ত্রাস-টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি বিস্তারের সুবিধাভোগী খুবই নগণ্য কিন্তু তারাই ক্ষমতাবান।

যাদের ২৪ ঘন্টা রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিপালিত নানা বাহিনীর পাহারায় কাটে তারা ছাড়া বাকি কারও তাই আতংক আর কাটে না। নিজের ও স্বজনের জীবন নিয়ে, পথের নিরাপত্তা নিয়ে, জিনিষপত্রের দাম, জীবিকা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠা দিনরাত। উদ্বেগ উৎকন্ঠা নির্বাচন নিয়েও। সবচাইতে বড় ভয়, দিনের পর দিন সবকিছুতে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা এখন এমনই যে, মানুষের জন্য মানুষের শোক, আতংক কিংবা উদ্বেগ নিয়েও একটু স্থির হয়ে বসা যায় না। নতুন আরেক আঘাত পুরনো শোক বা আতংককে ছাড়িয়ে যায়। টিভি বা সংবাদপত্রেরও ঠাঁই নাই সবগুলোকে জায়গা দেবার, কিংবা লেগে থাকার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুইদল বা জোটের সংঘাত কখনোই জমিদারী লড়াই এর চরিত্র থেকে বের হতে পারেনি। যে অংশ ক্ষমতায় থাকে তাদের ইচ্ছা হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেবার। তাই একপর্যায়ে বিরোধ চরমে ওঠে। আফ্রিকার দেশগুলোর মতো এদেশে গোত্র বা এথনিক সংঘাতের অবস্থা নাই। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপি লড়াই যেনো তার স্থানই পূরণ করতে যাচ্ছে, রাজনৈতিক বৈরীতা ও সংঘাত নিয়েছে ট্রাইবাল বৈরীতা ও সংঘাতের রূপ। আসলে দলের ব্যানার দেখে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে ব্যানারের পেছনে দাঁড়ানো লুটেরা, দখলদার ও কমিশনভোগীদের। দলের ব্যানার আসলে ব্যবহৃত হয় তাদের মুখ ঢাকার জন্য। মানুষ দল দিয়ে বিচার করে, দলের উপর ভরসা করে, দলের উপর বিরক্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, ক্ষোভে-দুঃখে চিৎকার করে। দল আসে যায়, আসে যাবে। কিন্তু কমিশনভোগী, দখলদার, লুটেরাদের কোন পরিবর্তন হয় না। তাদের শক্তি ও অবস্থান আরও জোরদার হয়।

প্রক্রিয়া যদি একই থাকে ক্ষুধা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেট তো ভরতে হবে। তাই এইভাবে চলতে চলতে মাঠ, গাছ, বন, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, নালা, খালবিল সব হজম হতে থাকে। ক আর খ এর  যখন যার সুযোগ আসে। কখনও প্রতিযোগিতা কখনও সহযোগিতা। কখনও ঐক্য কখনও সংঘাত। দখল, কমিশনের উপর দাঁড়ানো বিত্ত বৈভব শানশওকতে শহরের কিছু কিছু স্থান ঝলমল করতে থাকে। অনেকে স্মরণ করতে পারেন সেলিম আল দীনের ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’  নাটক। সবকিছুই ছিলো প্রধান চরিত্র মুনতাসিরের খাদ্য। তার ক্ষুধার কোন শেষ নাই। আমাদের দেশে একের পর এক শাসক গোষ্ঠী একজনের থেকে অন্যজন আরও বেশি ‘মুনতাসির’। ক্ষমতাবানরা যখন এভাবে নিজের অর্থনীতি তৈরি করেন তখন রাজনীতি কেন জমিদারী থেকে আলাদা হবে? আমাদেরই বা সদা আতংক ছাড়া আর কী পাবার আছে?

সেজন্য গুম, খুন, ক্রসফায়ার, উর্দিপরা বা উর্দিছাড়া লোকজনদের ডাকাতি চাঁদাবাজী, কৃত্রিম কিংবা উস্কে তোলা রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা, দখল, দুর্নীতি এই সবকিছু নিয়ে মানুষের অস্থিরতা, উদ্বেগ, অসুস্থতার কালে পর্দার আড়ালে আরও অনেককিছু হয়ে যেতে থাকে। সহিংসতা বা অস্থিরতায় শতকরা ১ ভাগের হাতে আরও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে কোনো বাধা নেই। পাহাড় নদী বন দখলকাজে কোন সমস্যা নেই। দেশের সমুদ্র, সম্পদ, অর্থনীতিতে দেশি বিদেশি লুটেরাদের আধিপত্য বৃদ্ধির আয়োজনে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।নির্বাচনের হট্টগোলের আড়ালেও এইসব অপকর্ম চলতে থাকে।

এই অবস্থায় তাহলে কী হবে বাংলাদেশের? দুই জমিদার বা দুই ডাইনাস্টির আড়ালে, চোরাই টাকার মালিক সন্ত্রাসী প্রতারক দখলদার ব্যাংক লুটেরা আর কমিশনভোগীদের হাতে, নিজেদের সর্বনাশ দেখতেই থাকবে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ? তাহলে কী আর কোন উপায় নেই? শক্তিশালী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের দরবারে এই বলয়ের বাইরে আলোচনারও সুযোগ কম। নিপীড়নের খড়গ সর্বত্র। ভিন্নস্বর ভিন্নসত্য ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মানুষের চিন্তার সুযোগও সংকুচিত হতে থাকে। ফলে জনগণের মধ্যে এক অসহায়ত্বের বোধ প্রায় স্থায়ীরূপ নেয়।

এসব দেখে বারবার প্রশ্ন আসে, তাহলে কি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অগণিত নারী পুরষের অসম্ভব সাহস ও লড়াই-এর অভিজ্ঞতা বৃথা? না। ১৯৭১ এর সেই সাহস এখনও আমাদের শক্তি। এই শক্তি নিয়েই যুদ্ধাপরাধী ও লুটেরাশক্তির, দখলদার ও জমিদারদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক প্রভাব অতিক্রম করে জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। নিষ্ক্রিয়, আচ্ছন্ন আর সন্ত্রস্ত জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বোধ বিকশিত হওয়া ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আচ্ছন্নতা আর ভয় থেকে মুক্ত হলে, নিজেদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হলে, জনগণ তার অন্তর্গত বিশাল শক্তিও অনুভব করতে সক্ষম হবে। তখন সম্ভব হবে পথের সন্ধান পাওয়া, সম্ভব হবে তার রাজনীতির বিকাশে স্বাধীন পথ গ্রহণ।

বারবার ৭১ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মানুষ, তা সে শারীরিকভাবে যতই দুর্বল অপুষ্ট হোক, জাগ্রত হলে যে কোনো দেশি বিদেশি দানবের মোকাবিলা করতে তারা সক্ষম। সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসন, নির্যাতন, দখলদারিত্ব, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিভিন্ন লড়াই-এ জনগণের শক্তির স্ফুরণ তারই বহিপ্রকাশ। তাই শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশের প্রতারণামূলক বাগাড়ম্বরের মধ্যে নয়, শোষণ বৈষম্য নিপীড়ন আধিপত্য বিরোধী সকল লড়াই-এর মধ্যেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত। আত্নসমর্পণ আর পরাজয়ের বিপরীতে তার অবস্থান। চোরাই টাকা, প্রতারণা, বাগাড়ম্বর আর রক্তচক্ষু দ্বারা পরিচালিত নির্বাচনের মধ্যে পথ হারালে চলবে না। কারণ মানুষ যখন নিজের ভেতরে মুক্ত হয়, তখনই তার মুক্তির পথ তৈরি হয়।

বৈষম্যই অকার্যকর করে গনতন্ত্র

জমো  সানদারাম ও আনিস চৌধুরী ::

আয় ও সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ – উভয় ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই বেড়েছে। বিশ শতকজুড়েই, বিশেষ করে দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত মোটা দাগে বৈষম্য ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে, এতো ব্যাপক বৈষম্য  মানব ইতিহাসে আর কোনো কালেই ছিল না।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- অনুযায়ী ১৯৮০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ দখল করে আছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক মাত্র ১২ ভাগ আয়ের অধিকারী। ইউরোপে শীর্ষে থাকা এক শতাংশ পেয়েছে ১৮ ভাগ, নিচের অর্ধেক পেয়েছে ১৪ ভাগ।

অক্সাফামের ‘রিওয়ার্ড ওয়ার্ক, নট ওয়েলথ’ জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৮২ ভাগ চলে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের হাতে। আর অপেক্ষাকৃত গরিব যারা অর্ধেকে রয়েছে তারা প্রায় ৩.৭ ভাগ মানুষ বলতে গেলে কিছুই পায়নি। ইতিহাসে ২০১৬ সালেই সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি দুদিনে একজন করে বিলিওনিয়ার সৃষ্টি হয় ওই বছরে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিলিওনিয়ারদের সম্পদ বাড়ে ৭৬২ বিলিয়ন ডলার।

‘বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৮’- প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, বৈষম্য বৃদ্ধি যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা ও সমাধান করা না হলে এটি নানা ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।

‘দি গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্র্যাসি ২০১৭ : এক্সপ্লোরিং ডেমোক্র্যাসিস রেসিলেন্স’ ধারণা করছে, বৈষম্য গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। বৈষম্যের ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি করছে, সামাজিক ব্যবস্থা বিঘ্নিত করছে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও সমর্থন ধসিয়ে দিচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান বৈষম্য অগ্রগতির পথে বাধা :

আলেক্সি ডি টকভিল বিশ্বাস করেন, যেসব গণতান্ত্রিক দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে, সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার কারণ সমাজে আয় ও সম্পদের মারাত্মক বিভেদের ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যদি পরিস্থিতি উন্নতিতে তেমন কিছু করা না হয় বা অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক সাম্যের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া সত্যিকারের রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কারণ ধনীরা অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব রাখে ও কবস্তার করে,  গরিবরা এই ধরনের সুযোগ পায় না।

আর অমর্ত্য সেনের মতে, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গরিবের ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ বা ‘সামর্থ্য’ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। যাদের হাতে বেশি ক্ষমতা থাকে, তারা কেবল ইতিবাচক পুনঃবণ্টনেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না, সেইসাথে তাদের নিজেদের অনুকূলে বিধিবিধান ও নীতি প্রণয়ন করে নেয়।

রবার্ট পুটনামের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আস্থার’ মতো নাগরিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

যোশেফ স্টিগলিসের মতে, বৈষম্য বাড়লে সামাজিক কাঠামো এবং সংযোগ শিথিল করে দেয়। সবক্ষেত্রে আস্থা হ্রাস, উদাসীনতা, নাগরিক অংশগ্রহণ প্রশ্নে আগ্রহের অভাব ও স্বভাব রুক্ষতা-কটুতা বাড়ায়। এর ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক তিক্ততা বাড়ায়, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়ও নি:শেষ করে, সমাজবিরোধী আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অর্থপূর্ণ গণতন্ত্রের প্রয়োজন সামাজিক বিষয়াদিতে, বিশেষ করে মধ্যবিত্তভুক্ত নাগরিকদের অংশগ্রহণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মেরুকরণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ফাঁপা করে তোলে, নাগরিক সম্পৃক্ততা হ্রাস করে।

লোকরঞ্জকতা বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ হুমকি সৃষ্টি করে বহুত্ববাদকে। আলেক্সি ডি টকভিলের  কাছে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য গণতন্ত্রের ‘সাম্য’ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেবে, এমনকি উচ্চ আয়ের সমাজেও তা হতে পারে। ‘ধনবাদী লোকরঞ্জকবাদ বা তথাকথিত জনপ্রিয়তাবাদ’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বশেষ পরিচিতি রাজনীতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে।

জনসমাবেশ আর মিডিয়া ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যাগুলোর জন্য ‘অন্যদের’ তথা অভিবাসী ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন লোকদের দায়ী করে। অর্থাৎ ধনিকশ্রেণি  সুযোগ-সুবিধা ও ‘বিভক্ত করে শাসন করার’ চলতি পদ্ধতির ‘অধিকার’ ব্যবহার করে ‘তাদের জনগণকে’ সন্তুষ্ট রাখতে সফল হয় প্রায়ই।

মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে তারা প্রায়ই ধনিকতন্ত্র শাসনকে আড়াল করে রাখে, এমনকি সবচেয়ে জঘন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে অনেক সময় সাফাইয়ের ব্যবস্থাও করে। যেমন নির্বাহী পদে থাকাদের ‘উচ্চ পারিতোষক’, টাইকুনদের উদারভাবে কর হ্রাস, বিনিয়োগ ইনসেনটিভ। আর এসবই করা হয় সামাজিক ব্যয় ও গণপরিষেবার ব্যয় ছাঁটাই করে।

বর্তমানের ‘বিজয়ী সবই নেবে’ বা “winner – take -all” এর মাধ্যমে  অর্থনীতিতে শীর্ষস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সফলভাবে লবি করে কর হার কম রাখতে সক্ষম হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দার সময় থেকে এক শতাংশের হাতেই সর্বোচ্চ মাত্রায় আয় পঞ্জিভূত হচ্ছে।  আর ১৯৮০ সাল থেকে তলানিতে থাকা অর্ধেক আমেরিকান মোট প্রবৃদ্ধির মাত্র ৩ ভাগ অর্জন করতে পারছে। আধুনিক সময়ে এত ব্যবধান আর কখনো দেখা যায়নি।

অর্থাৎ ২০১৩ সালের দিকে শীর্ষে থাকা ০.০১ ভাগ তথা ১৪ হাজার আমেরিকান পরিবার মার্কিন সম্পদের ২২.৩ ভাগের মালিক ছিল। আর নিচে থাকা ৯০ ভাগ তথা ১৩৩ মিলিয়ন পরিমার মাত্র ৪ ভাগের মালিকছিল। সবচেয়ে ধনী ১ ভাগ এক প্রজন্মের মধ্যে মার্কিন আয়ে তাদের অংশ তিনগুণ করতে সক্ষম হয়।

একদিকে আইনগত ও অন্যান্য সংস্কার, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সবই ক্ষমতা বা প্রভাববঞ্চিতদের ভয়াবহ বিপরীত অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বল্প-আয়ের আমেরিকান পরিবারগুলোর ৭০ ভাগের বেশি আগের বছরের তুলনায়  ফৌজদারি মামলায় বেশী জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের ৮০ ভাগের বেশি পরিবার আইনগত সুবিধাও তেমন পাচ্ছে না।

তাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট না হওয়ায় তাদের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়া ও বাদ পড়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অনেক আমেরিকান মোহমুক্তি ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তবে এই তারাই আবার ‘অন্য’ তথা আমদানি ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সুরক্ষার উগ্র দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতিতে অনেক বেশি সংবেদনশীলও হয়ে পড়ে।

নড়বড়ে গণতন্ত্র ও নির্বাচন : বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়ারা

আনু মুহাম্মদ ::

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর পৃথিবীর বহুদেশে একটি সাধারণ ব্যাপার হলেও বাংলাদেশে এখনও তা প্রায় অসম্ভব প্রত্যাশা। বছরে বছরে এর সম্ভাবনা বাড়ার বদলে অনিশ্চতাই বেড়েছে কেবল। এবারের নির্বাচন নিয়েও তাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই।

প্রকৃতপক্ষে নজরদারি, পরিবেশবিধ্বংসী প্রান্তস্থ পুঁজিবাদের বিকাশকালে জনগণের জীবন ও অধিকারের সীমা কেমন হতে পারে, উন্নয়নের নামে মুনাফা ও দখলদারিত্ব বিস্তার কী চেহারা নিতে পারে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ নির্বাচন তো বটেই, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও টাকা আর ক্ষমতার প্রভাব বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। নির্বাচনের প্রতি ক্ষমতাবানদের অনীহা ও ভয় প্রকাশিত হচ্ছে বহুভাবে। এমনকি সামরিক শাসন থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখাতেও শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বাচন-সন্ত্রস্ত চেহারা প্রকাশিত।

নির্বাচন বিষয়টি কী রকম পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তার একটি প্রমাণ নির্বাচনী ব্যয়ের বৈধ ও বাস্তব চেহারা। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুনে বড় দলের প্রার্থীরাসহ সবাই হাসে। সবাই জানে যে, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী তাদের বড় অংশ এই আগ্রহ প্রকাশ করতেই এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ করেছে। এর একশ’গুণ খরচও অনেকের কাছে অপ্রতুল মনে হতে পারে। বড় দলের প্রার্থীদের টাকার কোনো অভাব নেই। প্রথমে মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরির জন্য খরচ করতে হয় অনেক টাকা, মনোনয়নপত্র কেনার সময় সমর্থক এবং সহযোগীদের নিয়ে বহর তৈরিও কম ব্যয়বহুল নয়। মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা একটা বিরাট সাধনা ও ধরাধরি শুধু নয়, অনেক টাকারও বিষয়। সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীকে বড় অঙ্কের টাকা জমা দিয়েই মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হয়। তারপর শুরু হয় আসল খরচের পর্ব। কত টাকা খরচ হয়? কোটি তো বটেই, একক, দশক না শতক? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেই এখন কোটি টাকার কথা শোনা যায়। দশক-শতক তো সংসদ নির্বাচনে আসবেই। এই টাকার সঙ্গে আয়ের উৎস মেলাতে গেলে খুবই সমস্যা। এই অঙ্ক গোপন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সীমার তুলনায় শতগুণ বেশি থাকার পরও এসব বিষয়ে কমিশন ভদ্রলোকের মতো চুপ থাকে। প্রচলিত ভাষায় ‘কালো’ ভদ্রভাষায় ‘অপ্রদর্শিত’ এবং প্রকৃত অর্থে চোরাই টাকাই নির্বাচনের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই টাকা বহুগুণে ফেরত নিয়ে আসাই এই চোরাই কোটিপতিদের জীবনের প্রধান বাসনা। নির্বাচন ও নির্বাচনহীনতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার যে নড়বড়ে অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে, তার কারণগুলোর সারসংক্ষেপ করা যায় নিম্নরূপে:

প্রথমত, দুর্নীতি, লণ্ঠন, রাষ্ট্রীয় ও গণসম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে দ্রুত বিত্ত অর্জনের নানা সহজ পথ এর সুবিধাভোগীদের কখনও সুস্থির হতে দেয়নি। একটা উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, লুট, দুর্নীতি আর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যে কোটিপতি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে ও  উঠছে, তাদের বড় অবলম্বন বাজার প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা। সুতরাং রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা তা নিজের আয়ত্তে আনার জন্য গত কয়েক দশকে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো যা করেছে, তাতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এর ফাঁকেই বৃদ্ধি পেয়েছে একদিকে চোরাই কোটিপতি, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব; অন্যদিকে নানা ধর্মীয়-অধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক ব্যক্তির হাতে। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করা দলীয় সাংসদদের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগুলোর মধ্যেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যাবে না। দল ও সংসদে ”এক নেতা এক দল’ নীতি” কার্যকর থাকায় কোনো স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। তাই যেভাবে দল ও দেশ চলছে, তা কেবল জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। দলগুলো দৃশ্যত এক ব্যক্তিনির্ভর, কার্যত তা দলের কর্মীদের কাছেও গোপন বা দায়হীন সুবিধাভোগীদের স্বেচ্ছাচারিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত।

তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে প্রান্তস্থ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে বিশ্বসংস্থা ও করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য ক্রমেই বেড়েছে। এখন তার সঙ্গে প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছে ভারত রাষ্ট্র ও সে দেশে কেন্দ্রীভূত বৃহৎ পুঁজি। ১৯৯১ থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ গঠিত হলেও এই সময়কালে গৃহীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রণয়নেই সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। এই সময়কালে গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশের সব ক্ষেত্র কার্যত উন্মুক্ত করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে; তেল-গ্যাস চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকার দেশের খনিজ সম্পদ, যা জনগণের সাধারণ সম্পত্তি তা তুলে দিয়েছে বিভিন্ন বৃহৎ কোম্পানির কাছে; স্বাস্থ্যনীতি-শিল্পনীতি-কৃষিনীতি ইত্যাদি নীতির মধ্য দিয়ে এসব খাতকে অধিক বাণিজ্যিকীকরণ করেছে, নদী, ট্রানজিট, করিডোর, বন্দর, বিদ্যুৎসহ নানা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী চুক্তি করে বাংলাদেশকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির কোনোটিই সংসদ প্রক্রিয়ায় হয়নি। যেহেতু কাজের কোনো আলোচনার সুযোগ নেই, তাই তথাকথিত ‘নির্বাচিত’ সংসদ এখন কুৎসা, গালাগাল, নেতাবন্দনা আর বাগাড়ম্বরের ব্যয়বহুল মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  রাষ্ট্রের ভূমিকা কেবল অন্যত্র গৃহীত নীতি বাস্তবায়নের, তার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি। ‘ক্রসফায়ারে’র মতো পদ্ধতি এই তথাকথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই শুরু হয়েছে। দিন দিন নির্যাতন ও আতঙ্ক সৃষ্টিতে এসব বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চতুর্থত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। সামরিক-বেসামরিক, প্রেসিডেন্সিয়াল-সংসদীয়, একদলীয়-বহুদলীয়; কিন্তু সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির গতিমুখ নির্মাণে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আর তাতে বাংলাদেশ ক্রমে আরও বাজারিকৃত হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব কমিয়ে সবকিছুই বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় কেনাবেচার খাত যা ‘সেবা খাত’ নামে পরিচিত, তার বিকাশ ঘটেছে অনেক বেশি হারে, দুর্নীতি ও কমিশন নির্ভর প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক ঋণখেলাপির পরিমাণ রেকর্ড ভেঙে ভেঙে বাড়ছে, আট বছরে পুঁজি পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ও পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে বেড়েছে বৈষম্য; শহরগুলোতে দামি গাড়ি আর জৌলুসের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। বেড়েছে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব।

পঞ্চমত, এসব কারণে জনগণের জীবন যত দুর্বিষহ হচ্ছে, তত রাষ্ট্র ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বেশি বেশি করে ধর্মকে আঁকড়ে ধরছে। ধর্মপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে প্রধান দুই ধারার সঙ্গে। তাদের অনেক এজেন্ডা প্রধান জোট দুটির দ্বারা এখন আত্মীকৃত হয়েছে। ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের নামেই শ্রেণি, ভাষা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বৈষম্য ও নিপীড়ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়েছে।

ষষ্ঠত, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও উপ-সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক কৌশলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত অবস্থান, বৃহৎ বাজার ও বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রাখার মতো সরকার ‘নির্বাচিত’ হলে তাদের সমস্যা নেই; কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার তারাও বিরোধী। দেশের নীতিনির্ধারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লুটেরাদের যে শৃঙ্খল, তা থেকে কী করে বের করা যাবে বিশাল সম্ভাবনার এই দেশকে? জনগণ তাদের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা তাহলে পাবেন কোত্থেকে? শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশের রাজনীতির মধ্যে যে তার সম্ভাবনা নেই, তা বলাই বাহুল্য। আর বিদ্যমান নীতিকাঠামো বজায় রেখে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর বিজয় তো দূরের কথা, লড়াই করার চেষ্টার চিন্তা করাই কঠিন। কোনো ব্যক্তি যদি পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে সেখানে যায়ও, তাহলে তার ভূমিকা কী হবে ‘নিধিরাম সর্দার’ সংসদে?

এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, যখন জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে দাঁড়াবে, যাতে চোরাই অর্থ, অস্ত্র বা গণবিরোধী আইন কোনো বাধা হিসেবে কার্যকর থাকতে পারবে না; একমাত্র তখনই নির্বাচন প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারবে। জনগণের এই সংগঠিত শক্তি এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। তার জন্য দরকার দেশের সর্বত্র মানুষের সে রকম শক্তি বা সংস্থা গড়ে তোলা। গত চার দশকে জনগণের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কিছু নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা না থাকা জনপন্থি আন্দোলন ও সংগঠনের দুর্বলতা নির্দেশ করেছে বারবার। আর তার সুযোগেই নড়বড়ে গণতন্ত্রের মধ্যে বাসা বেঁধেছে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের নানা গোষ্ঠী।

সমান সুযোগ প্রাপ্তির জন্য কাকুতি-মিনতি

আমীর খসরু ::

প্রথমেই বিষয়টি স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন যে, মনে-প্রাণে অগণতান্ত্রিক শাসককূল এবং তাদের নানা কিসিমের তাবেদাররা বহু চেষ্টার পরে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে এই ধারণাটিকে নিয়ম বা নিয়তি বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, আসলে নির্বাচনই হচ্ছে সামগ্রিক গণতন্ত্র। অর্থাৎ নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় কায়েম ও জারি হয়ে যাবে। সার্বিক ও সামগ্রিক গণতন্ত্রকে বিদায় জানিয়ে নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রহীন বা খুবই স্বল্পমাত্রার কথিত গণতান্ত্রিক শাসন- খোদ গণতন্ত্রের জন্য একটি বিশাল সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি রাষ্ট্রের মৌল কাঠামোটি নড়বড়ে করে ফেলেছে। আর এই নড়বড়ে পরিস্থিতির সুযোগে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কার্যত: অগণতান্ত্রিক শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান হচ্ছে দেশে দেশে। সংকটাপন্ন নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও আরও সংকটময় করে তুলেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রও এখন বিভিন্ন দেশে কার্যত অচল অবস্থার মুখোমুখি।

ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রই কাঠামোগত এবং প্রায়োগিক সংকটকে সঙ্গী করে, বাংলাদেশ আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝের অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল ওই নির্বাচনী গণতন্ত্রেরও চরম বিপন্ন ও বিপর্যস্তার কাল। এবারের নির্বাচন নিয়ে এখনো জনমনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টিকে থাকার যে প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে- তাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। কারণ এর ফলে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ-পরিস্থিতি বেশ বড় মাপে বদলে গেছে। একতরফা নির্বাচনের অথবা নির্বাচনে ভোটারের প্রয়োজন হয় না বলে এই জমিনে যেসব কলংকজনক ঘটনাবলী ঘটেছে ইতোপূর্বে-এটি তার বিপক্ষে এবং বলা যায়, জনগণ যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কামনা করে এটি তারই স্বপক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক হলেও আগামী নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বা রাখার চেষ্টা হচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে নিশ্চিত করার কোনো কারণ ঘটেনি। কারণ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে গেলে ক্ষমতাসীনদের ‘রুটিন ওয়ার্ক বা সরকার পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যতোটুকু না করলেই নয়’, ততোটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়; প্রশাসনের সব বিভাগকে চলতে হবে দলীয় নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক। কিন্তু বাস্তবে তা কি বিদ্যমান রয়েছে? বরং নির্বাচন কমিশনই এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি বা কমিশনও এপর্যন্ত এমত কোন নজীর সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেক রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচন কমিশনকে ‘পুরোপুরি নিরপেক্ষ’ নয় বলে আখ্যা দিচ্ছে।

আসলে নির্বাচন কমিশন কতোটা শক্তিশালী, সক্ষমতা ও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারছে এবং ভবিষ্যতে পারবে তার উপরই সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্ভর করে। কিন্তু যেভাবে গ্রেফতার ও নানা ধরনের মামলা চলছে, ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে একপক্ষের নেতাকর্মীদের মনে এবং সরকার ও কর্তা ব্যক্তিদের ভাষা ও ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ দেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জনআস্থা তৈরি হয় না। এমন একটি আস্থাহীনতার পরিবেশ এখনো পর্যন্ত বজায় থাকলেও সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে, প্রত্যক্ষ করতে চায়, আস্থাশীল হতে ইচ্ছুক যে, সবার জন্য সমান সুযোগ অচিরেই তৈরি হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ বিদ্যমান থাকা গণতন্ত্রে প্রতিদিনের, নিত্যদিনের বিষয় হওয়াই  বাঞ্চনীয় ও প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কয়েকটা দিনের জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি ও প্রাপ্তির জন্য ভিক্ষা চাওয়া, কাকুতি-মিনতি করা- নির্বাচনী গণতন্ত্র তো অবশ্যই খোদ গণতন্ত্রের জন্যও একদিকে যেমন সংকটের তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি বিশাল দুর্ভাগ্যেরও বিষয়।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’। প্রখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল-এর বিখ্যাত বই ‘‘এ্যনিমেল  ফার্ম’’-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমার নিচের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে.- ‘সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষ সমান; তবে কোন কোন রাজনৈতিক দল ও পক্ষ একটু বেশিভাবেই সমান।’ কারণ দক্ষতা, যোগ্যতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গি, আর এর বিপরীতে যারা তাদের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়- দেখার চোখও আলাদা, মন-মস্তিক এবং মনোজগতও ভিন্ন। আর এখানেই অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে।

সংলাপের ফলাফল : ধারনার বাইরে কিছুই ঘটেনি

আমীর খসরু ::

রাজনীতি নিয়ে সামান্য চিন্তা-ভাবনা করেন, ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন এবং সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা যাদের আছে- তারা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীনদের সাথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে গঠিত জাতীয় ঐক্যফন্টের ‘সংলাপ’-এর ফলাফল নিয়ে বোধকরি অবাক হননি। সংলাপের পরে ড. কামাল হোসেন যেমনটি বলেছেন, ‘বিশেষ সমাধান পাইনি’ এবং মির্জা ফখরুলের ‘আমরা সন্তুষ্ট নই’ ধরনের মন্তব্যের বিষয়টি আঁচ করা গিয়েছিল আগেই। কারণ ড. কামাল হোসেনের চিঠির জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে রাজি হওয়ার বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার একটি কথাই আগাম জানান দিয়েছিল যে, ‘সংবিধান সম্মত’ সব বিষয় নিয়েই তারা আলোচনা করতে রাজি। আর এই ‘সংবিধান সম্মত’ কথাটি উল্লেখ করেই সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, তার একটি  ইঙ্গিত   তাদের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়। ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দিয়েছে তার প্রথম দফাতেই-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে।

এছাড়া অপরাপর যে দাবিগুলো যেমন- নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ অন্যান্য বিষয় কতটা মানা হবে- তা যে কেউই বুঝতে পারবেন। একটি বিষয় বিবেচনা করলেই সংলাপের পুর্বাপর সম্পর্কে সবকিছু পরিষ্কার হবে যে, ক্ষমতাসীন দল ‘সংবিধান’ বলতে বিদ্যমান সংবিধানকেই গণ্য করে। ইতিপূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলসহ যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে- তা তারা বিবেচনায় নেবেন না, এটাই তাদের দিক থেকে স্বাভাবিক।

তাহলে সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, সে বিষয়ে যাবার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়ায় প্রয়োজন যে, বিএনপি যদি আন্দোলন সংগ্রামে যথেষ্ট শক্তিশালী ও সক্ষম হতো, রাজপথে সরব থাকতো, ক্ষমতাসীনদের সমান্তরাল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো,  প্রথাপ্রতিষ্ঠানগুলো  কিছুটা হলেও পক্ষপাতমুক্ত  হতো এবং রাজনীনৈতিক পরিস্থিতির ওপরে নূন্যতম নিয়ন্ত্রন থাকতো  তাহলে ঐক্যফ্রন্টের নামে তারা সংলাপে যেতোও না, এমনকি সংলাপ চাইতও না। এসব বিষয়গুলো অনুপস্থিত বলেই সংলাপ চাওয়া হয়েছে সমান্তরাল মাঠ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে।

সংলাপের ফলাফল বিষয়ে আরো দুটো বিষয় উল্লেখ করা জরুরি বলে মনে হয়- ১) সংলাপ সরকারের তরফে ডাকা হয়নি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সংলাপের আবদার করেছে। ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যাতে বিশেষ গুরুত্ব না পায় এবং অন্যান্য দলের সাথে সংলাপের মতোই সমান বলে বিবেচনা করা হয়, সে লক্ষ্যে  এখন সবার সাথে সংলাপ চলবে বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২) নভেম্বরের প্রথমের যেকোনো দিন তফসিল ঘোষণা করার আগে এ ধরনের সংলাপ চালিয়ে যেতে পারলে সরকারই লাভবান হবে, এ কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা- সব পক্ষের সাথে সংলাপ হচ্ছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে এবং এই লক্ষ্যে তারা যে কতোটা আন্তরিক, দেশী-বিদেশী সবাইকে এটা বোঝানো সহজ হবে বলে ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই বলা হচ্ছিল সংলাপের কোনোই প্রয়োজন নেই।

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে সংলাপের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়েছে- এমন নজির নেই বললে চলে। নব্বই পরবর্তী বেসামরিক শাসনের সময়কালেও অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেস দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতা এবং সংলাপ প্রচেষ্টাসহ এইবার ধরে এ সময়কালে অন্তত ছয়বার সংলাপ ও মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতের সংলাপে সভা-সমাবেশের অধিকারের যে কথা বলা হয়েছে তা এই প্রথম বলা হলো এমনটি নয়। প্রধানমন্ত্রী এর আগেও প্রকাশ্যে এমন কথা বলেছেন। আর গ্রেফতার-মামলা সম্পর্কে তালিকা চাওয়া হয়েছে। এই তালিকার ভবিষ্যৎ কি হবে সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সঠিক হবে বলে মনে করি না।

তবে বাহবা দিতে হয় এবং সাধুবাদ জানাতে হয় সেই সব মতলববাজ সংবাদমাধ্যম ও কতিপয় কথিত বিশ্লেষককে যারা এই সংলাপকে ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে জনমনে উচ্ছাস, উচ্চাশা, সমস্যা সমাধানের আশার-আলো জাগ্রত করার প্রানান্তকর চেষ্টা ও বড় কিছু পাওয়া যেতে পারে বলে ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বরাবরের মতোই-তাদেরকে। অবশ্য তারা এখনো যে থেমে থাকবেন, তা নয়।

আর সংলাপ ও নৈশভোজের নিট ফলাফল হচ্ছে- দু পক্ষের এক পক্ষ এখন ‘আন্তরিকভাবে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে; সমস্যার কিছু কিছু সমাধানও হয়েছে’ এবং অপরপক্ষ ‘পাইনি, হতাশ হয়েছি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে’- জাতীয় কথাবার্তা বলে সংলাপকে যে যার মতো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিএনপিসহ যেসব বিরোধী নেতারা টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে থাকেন তারা নেত্রীর বক্তৃতা শুনেছেন সামনাসামনি বসে।

খুব সংক্ষেপে সংলাপের ফলাফল হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভেদ, বিদ্বেষ, অনৈক্য ও চরম বৈরিতার ইতিহাসে আরো একটি নজির সৃষ্টি করা হয়েছে – যা জন-আকাঙ্খার সম্পূর্ণ বিপক্ষে, বিপরীতে।

নির্বাচন : আবার ফিরে আসুক জনআস্থা ও শংকাহীন পরিবেশ

আমীর খসরু ::

গণতান্ত্রিক শাসন যে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ প্যাকেজ- তা জনগণের মনোজগত থেকে মুছে ফেলতে পারাটাই হচ্ছে  বিদ্যমান গণতন্ত্রের বড় সংকট। অনেক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণীর শাসকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টাটি অব্যহত ছিল যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাৎ নির্বাচনের অপরনাম গণতন্ত্র – এমন ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা। গণতন্ত্রকে সামগ্রিক বিবেচনা, পরিমন্ডল ও এর ব্যপ্তি থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারাটাই যেমন ওই শাসককূলের জন্য সাফল্যের বিষয়, তেমনি এটাই অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় ও জারী রাখা এবং শাসন ব্যবস্থায় জনঅংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা দূরে রাখার লক্ষ্যে ‘‘অগণতান্ত্রিক শাসন’’ একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম একট ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এর বিপরীতে ওই নির্বাচনকেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলে প্রতিষ্টিত করার যে প্রচেষ্টাটি শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়েছে। আর এখান থেকেই সামগ্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটের মধ্যে পড়ে। শুধুমাত্র ওই শাসন ব্যবস্থাই যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রও সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র এক কথা নয়, এটা হতেও পারে না। কিন্তু কতিপয় শাসক ও ক্ষমতাসীনদের সাফল্য হচ্ছে – ধীরে ধীরে এর বিপরীত কাছটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে পারা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের এক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি স্তর বা ধাপ হিসেবে গণ্য হতে হবে রাষ্ট্র এবং সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রায় বিদ্যমান গণতন্ত্র রয়েছে এমন রাষ্ট্রে কতৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র -এমন ধারণাটি এখন মোটামুটিভাবে জনমনেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর ফলে জনগণকে যেমন ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে বিতাড়ন করা যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব যে জনগণের বুঝ-ব্যবস্থার বিষয় বা এতে তাদের অংশগ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, তা মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে এমন ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে যে, জনগণ ভোট দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত প্রদান তাদের কর্ম নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মূল সংকট- যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।

নির্বাচনকেন্দ্রীক এই ধারণাটি এখন শুধুমাত্র আর দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রার গণতন্ত্রের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন দেশে কতৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যেও এটি সংক্রামিত হতে শুরু করেছে।

কাজেই গণতন্ত্রের এই পুরো অব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে জনগণকে বাদ দেয়া হচ্ছে,  শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অধিকার বিলুপ্ত হতে বসেছে এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তির’ পর্যায়ে নেই। আর এ কারণেই রাষ্ট্র এখন কতিপয়ের এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিও বিলুপ্তির পথে। এটি গণতন্ত্র তো বটেই, খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি সীমাহীন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের একটি বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান দুজন ব্যক্তি অর্থাৎ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিনকে স্মরণ করা যায়।

অমর্ত্য সেন ‘দ্য আউডিয়া অফ জাস্টিস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গনতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ সামির আমিন ‘প্রতিরোধের বিশ্বময়তা’ (ফরাসী ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থন’।

কাজেই গণতন্ত্র, শাসক, ক্ষমতাসীনদের মনের মধ্যে ও মনোজগতে সার্বক্ষণিক বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকতে হবে।

দুই.

বাংলাদেশেও আগামী জানুয়ারি নাগাদ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে এবং দেশে বিদেশে নানা মহলে। যদিও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদৌ সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে বিভিন্ন সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করেছে এবং জনগণকে ক্রমাগত ওই নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকেও দূরে সরিয়ে নেয়ার ও রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ গত কয়েক বছরের নির্বাচনগুলোর পরে জনমনে নির্বাচন সম্পর্কেই একদিকে যেমন শংকা, ভীতির সৃষ্টির হয়েছে, তেমনি নির্বাচন সম্পর্কে একটি অনাগ্রহের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি অনেকেরই বিশ্বাস যে, নির্বাচনে জনগণের অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ থাকতেই হবে- এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের এখন আর প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এবারের নির্বাচনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একই ঘটনার একইভাবে দ্বিতীয়বার আর ঘটে না।

তিন.

আগামী যে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনের একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাত্র মাস তিনেক আগে যেমন পরিস্থিতি, পরিবেশ ও প্রস্তুতি প্রত্যাশিত – তা নানা কারণে অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। বিরোধী দলগুলো থেকে বারবার বলা হচ্ছে- নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নেই। বিএনপি দাবি করছে, গেলো কিছু দিনেই নতুন করে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজারের বেশি মামলায় ৮৫ হাজার জনের নাম দেয়া হয়েছে। অজ্ঞাতনামা রয়েছে তিন লাখের বেশি। এসব মামলাকে গায়েবী বলছেন সংবাদমাধ্যমসহ অনেক বিশিষ্টজনরা। আগের মামলা তো রয়েছেই। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রীক একটি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের সমান সুযোগও অনুপস্থিত বলেই কার্যত দেখা যাচ্ছে। এর  সবকিছু মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশী-বিদেশীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি শংকা, সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এরই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অদ্ভূত এক জোটসঙ্গী এরশাদের কণ্ঠেও। গত শনিবার ঢাকায় এক জনসভায় খোদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না।’

শুধু যে রাজনৈতিক দল, দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন তা নয়, ঠিক একই সাথে জনগণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাশীল হতে চায়। এখন সরকারেরই দায়িত্ব হবে- হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থাকে পুনরায় যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রাটি আবার শুরু হোক-এমনটি প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অন্যায্য হবে না।