Home » সময়ের বিশ্লেষণ (page 2)

সময়ের বিশ্লেষণ

নির্বাচন : আবার ফিরে আসুক জনআস্থা ও শংকাহীন পরিবেশ

আমীর খসরু ::

গণতান্ত্রিক শাসন যে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ প্যাকেজ- তা জনগণের মনোজগত থেকে মুছে ফেলতে পারাটাই হচ্ছে  বিদ্যমান গণতন্ত্রের বড় সংকট। অনেক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণীর শাসকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টাটি অব্যহত ছিল যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাৎ নির্বাচনের অপরনাম গণতন্ত্র – এমন ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা। গণতন্ত্রকে সামগ্রিক বিবেচনা, পরিমন্ডল ও এর ব্যপ্তি থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারাটাই যেমন ওই শাসককূলের জন্য সাফল্যের বিষয়, তেমনি এটাই অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় ও জারী রাখা এবং শাসন ব্যবস্থায় জনঅংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা দূরে রাখার লক্ষ্যে ‘‘অগণতান্ত্রিক শাসন’’ একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম একট ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এর বিপরীতে ওই নির্বাচনকেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলে প্রতিষ্টিত করার যে প্রচেষ্টাটি শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়েছে। আর এখান থেকেই সামগ্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটের মধ্যে পড়ে। শুধুমাত্র ওই শাসন ব্যবস্থাই যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রও সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র এক কথা নয়, এটা হতেও পারে না। কিন্তু কতিপয় শাসক ও ক্ষমতাসীনদের সাফল্য হচ্ছে – ধীরে ধীরে এর বিপরীত কাছটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে পারা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের এক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি স্তর বা ধাপ হিসেবে গণ্য হতে হবে রাষ্ট্র এবং সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রায় বিদ্যমান গণতন্ত্র রয়েছে এমন রাষ্ট্রে কতৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র -এমন ধারণাটি এখন মোটামুটিভাবে জনমনেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর ফলে জনগণকে যেমন ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে বিতাড়ন করা যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব যে জনগণের বুঝ-ব্যবস্থার বিষয় বা এতে তাদের অংশগ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, তা মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে এমন ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে যে, জনগণ ভোট দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত প্রদান তাদের কর্ম নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মূল সংকট- যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।

নির্বাচনকেন্দ্রীক এই ধারণাটি এখন শুধুমাত্র আর দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রার গণতন্ত্রের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন দেশে কতৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যেও এটি সংক্রামিত হতে শুরু করেছে।

কাজেই গণতন্ত্রের এই পুরো অব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে জনগণকে বাদ দেয়া হচ্ছে,  শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অধিকার বিলুপ্ত হতে বসেছে এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তির’ পর্যায়ে নেই। আর এ কারণেই রাষ্ট্র এখন কতিপয়ের এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিও বিলুপ্তির পথে। এটি গণতন্ত্র তো বটেই, খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি সীমাহীন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের একটি বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান দুজন ব্যক্তি অর্থাৎ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিনকে স্মরণ করা যায়।

অমর্ত্য সেন ‘দ্য আউডিয়া অফ জাস্টিস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গনতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ সামির আমিন ‘প্রতিরোধের বিশ্বময়তা’ (ফরাসী ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থন’।

কাজেই গণতন্ত্র, শাসক, ক্ষমতাসীনদের মনের মধ্যে ও মনোজগতে সার্বক্ষণিক বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকতে হবে।

দুই.

বাংলাদেশেও আগামী জানুয়ারি নাগাদ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে এবং দেশে বিদেশে নানা মহলে। যদিও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদৌ সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে বিভিন্ন সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করেছে এবং জনগণকে ক্রমাগত ওই নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকেও দূরে সরিয়ে নেয়ার ও রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ গত কয়েক বছরের নির্বাচনগুলোর পরে জনমনে নির্বাচন সম্পর্কেই একদিকে যেমন শংকা, ভীতির সৃষ্টির হয়েছে, তেমনি নির্বাচন সম্পর্কে একটি অনাগ্রহের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি অনেকেরই বিশ্বাস যে, নির্বাচনে জনগণের অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ থাকতেই হবে- এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের এখন আর প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এবারের নির্বাচনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একই ঘটনার একইভাবে দ্বিতীয়বার আর ঘটে না।

তিন.

আগামী যে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনের একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাত্র মাস তিনেক আগে যেমন পরিস্থিতি, পরিবেশ ও প্রস্তুতি প্রত্যাশিত – তা নানা কারণে অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। বিরোধী দলগুলো থেকে বারবার বলা হচ্ছে- নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নেই। বিএনপি দাবি করছে, গেলো কিছু দিনেই নতুন করে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজারের বেশি মামলায় ৮৫ হাজার জনের নাম দেয়া হয়েছে। অজ্ঞাতনামা রয়েছে তিন লাখের বেশি। এসব মামলাকে গায়েবী বলছেন সংবাদমাধ্যমসহ অনেক বিশিষ্টজনরা। আগের মামলা তো রয়েছেই। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রীক একটি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের সমান সুযোগও অনুপস্থিত বলেই কার্যত দেখা যাচ্ছে। এর  সবকিছু মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশী-বিদেশীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি শংকা, সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এরই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অদ্ভূত এক জোটসঙ্গী এরশাদের কণ্ঠেও। গত শনিবার ঢাকায় এক জনসভায় খোদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না।’

শুধু যে রাজনৈতিক দল, দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন তা নয়, ঠিক একই সাথে জনগণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাশীল হতে চায়। এখন সরকারেরই দায়িত্ব হবে- হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থাকে পুনরায় যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রাটি আবার শুরু হোক-এমনটি প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অন্যায্য হবে না।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন : তাহলে প্রবল হবে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তা

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধুমাত্র শাসকদলই করে তা নয়, বিরোধী দল যখন পোলারাইজেশনের রাজনীতি করে- তখন সত্যিকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবার সমান সুযোগ বিনষ্ট হয়, সেটাও প্রকৃতার্থে অবাধ নিরপেক্ষ হয়না।  অবাধ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু ধরনের মত ও পথ তৈরী হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ন্যায্য ও নির্ভেজালভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত প্রতিফলন ঘটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, জন্ম নিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হচ্ছে, ভোটের আগেই জয়লাভ নিশ্চিত ও ফলাফল অদৃশ্যভাবে নির্ধারণ করে রাখা। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুক্ষ্ম, স্থুল বহু ধরণের উপাদানে সমৃদ্ধ হতে পারে; কেন্দ্র ও বুথ দখল, জাল ভোট দেয়া, বুথ বা কেন্দ্রে আসতে বাধা দেয়া নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের কয়েকটি পদ্ধতির উদাহরন । আধুনিক গণতন্ত্রের এই যুগে ক্ষমতাশালীদের কেউ কেউ ও কোন কোন রাজনৈতিক  দল এ পদ্ধতি অনুসরন করে । ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দল সুক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করে এবং কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলে, নির্বাচনকালে গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনসহ সকল এ্যক্টর কোনভাবেই যেনো শাসকদলের নির্বাচনী নকশা বাস্তবায়নে শক্ত বাধা তৈরী না করে; বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন শুধু স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের অগ্রসর দেশেও ঘটছে। কিন্তু এসব অগ্রসর প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহ অধ:পতিত ভূমিকা পালন করেছেনা, কর্পোরেট বিনিয়োগ ও আনুকল্যে ওই নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ক্ল্যাসিক ‘কেইসে’ পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের শাসকদলের নক্সার এবং পদ্ধতির উত্তোরোত্তর বিকাশ ঘটছে। এই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেটা আমরা তুলে ধরবো।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের রাজনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের লক্ষ্য হচ্ছে- পূর্ব নির্ধারিত জয় ও ক্ষমতাকে রক্ষা করা। এটাকে কোনভাবে আমজনতার ভোটের উপর ছেড়ে না দেয়া। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে শুধু নিজের জয় নয়, জয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদন্ধীকে দমন ও অবরুদ্ধ করা। এমনকি তার রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা। এর সাথে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর কর্তৃত্ববাদী অহং। এই কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক অহংয়ের কারণে স্বাধীনতা উত্তর প্রথমদিকে ডাকসু নির্বাচনে পরাজয় ও প্রয়াত আলীম রাজী, মেজর (অব:) জলিল সহ কয়েকজনের বিজয় মেনে নেবার গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায়নি। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ধারাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করা হয়।

এই অবক্ষয় ‘৯০ এর যে অলিখিত দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্ট্রি হয়েছে। এখানে দু’দলই সমানতালে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের  উপাদানগুলিকে বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। আজকের শাসকদলই শুধু নয়, দ্বিদলীয় ব্যবস্থার অন্য দলটিও সেই অবক্ষয়ের জন্য সমান দায়ী। নির্বাচনকালীণ কেয়ারটেকার সরকারকে ম্যানিপুলেট করতে গিয়েই ওই দলটি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। তারপরের ইতিহাস সকলের জানা- বিএনপিকে তাদের নিয়ন্ত্রন মুক্ত নির্বাচনে ক্ষমতায় হারতে হয়েছিল এবং নির্বাচনের ফলাফলকেও মেনে নিতে হয়েছিল। তারপর ২০১৪ নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে সংঘাত ও দ্বন্ধের নতুন অধ্যায় তৈরী হল। রাস্তার আন্দোলন ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বিএনপি নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, আর শাসকদল রাষ্ট্রশক্তিতে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের কর্তত্ব প্রতিষ্ট্রায় সফল হয়। এ সফলতা একদিকে যেমন আওয়ামীলিগকে কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত করে, অন্যদিকে, বিএনপিকে পরিণত করে দিশাহীন লক্ষ্যভ্রষ্ট দলে ।

এখন প্রশ্ন শাসকদল  আওয়ামী লীগের এই আপাত সফলতার রাজনৈতিক ফ্যাক্টর গুলি কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারত ফ্যাক্টরকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এটা ইতিহাসের আয়রণি, দু’তিন দশক আগেও ভারত বিরোধীতাই ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা আরোহণের মুখ্য উপায়। এখন ভারতের আস্থা ও সহযোগিতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে পড়েছে। কেন এমন হলো? বাংলাদেশের ক্ষমতা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেকটা নির্বাক ভূমিকা পালন করেছে কার্যত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত কারনে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার জন্যে। এছাড়া ভারতের আরো শক্তি অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ভারতের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমান শাসকদল এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সুবিধা ব্যবহার করতে দক্ষতা দেখিয়েছে। আভ্যন্তরীণভাবে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা শক্তিশালী শাসক হিসেবে সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। যুদ্ধপরাধীদের বিচার এর মধ্যে অন্যতম। দ্বিতীয়ত: পরপর দু’টার্ম ক্ষমতায় থাকার কারনে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। কিন্তু সংকটকালে আওয়ামীলীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কতোটা আনুগত্য বজায় রাখবে, সহায়ক ভূমিকা নেবে তাতে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি ভোটের বাক্সে তারা আওয়ামীলীগ প্রদত্ত সুবিধার কতটা প্রতিদান দেবে তাতেও সংশয় রয়েছে। হামজা আলাভী নামে একজন মার্ক্সবাদী বিশ্লেষক বাংলাদেশকে পাকিস্তান রাষ্ট্রক্ষমতার উত্তর ঔপনেবেশিক আখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ঔপনেবেশিক লিগ্যাসি থেকে বের হতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের হাতে নাগরিকদের নিপীড়নের যন্ত্র। গত দশ বছর আওয়ামীলীগ ঔপনেবেশিক লিগ্যাসিকে শক্তিশালী করে রাষ্ট্রশক্তিতে নাগরিকের বিরূদ্ধে আরো নিপীড়নমুলক করেছে। এর পটভূমিতে ২০১৯ সনের ৪ঠা জানুয়ারীর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোথায় আছি? কিন্তু সন্দেহ নেই এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল ও বিচিত্র উপাদানে সমৃদ্ধ। বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ বা ২০১৯ এর মধ্যে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান এর দিকে এগুচ্ছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন কালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি ঘোষণা করেছে তারা খালেদা জিয়া ব্যতীত নির্বাচন করবে না। আওয়ামীলীগ মনে করেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নেবে। অগোছালো বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে, তাকে কিছু কিছু সিট ছেড়ে দিয়ে বিএনপিকে বিরোধী দলে আসনে বসিয়ে আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার সরকার গঠন করতে চায়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও শাসকদল একটা যেনো  -তেনো নির্বাচন করে ফেলতে পারবে বলেই তাদের ধারনা। কাজেই বিএনপি’র এ উভয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আপাতত: ম্যাজিক সমাধান নেই। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাঝে ভোটের বাক্সের নীরব বিপ্লব কি সম্ভব হবে? এ প্রশ্নের মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। এরপর ২০১৮ আগষ্ট হয়ে পড়ল ঘটনা বহুল। এই ঘটনাগুলি এক. ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে  ঐক্যফ্রন্ট, দুই. ২১ শে আগষ্টের হত্যাকান্ডের রায়, তারেক জিয়ার যাবজ্জ্বীবন কারাদন্ড, তিন. নির্বাচন কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদারের ভিন্নমত ও বিরোধ। এই তিনটি ঘটনার কোনটিই আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কোন গুণগত পরিবর্তন  আনতে পারেনি। কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রণ্টের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রতিযোগিতায় নির্বাচন নিয়ন্ত্রনের আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জের একটা জানালা খুলে যেতে পারে। তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন বিএনপি নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব ও নিষ্ঠুরতাকে সামনে এনেছে। মাহবুব তালুকদারের বিরোধীতা এই নির্বাচন কমিশনের নৈতিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের অর্থনীতি : বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের একটি অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হারাবার পর নেতৃবৃন্দ সহজ শিকার হন অর্থনৈতিক দূর্নীতির মামলায়। কাজেই নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে এ ধরনের হয়রানির আশংকা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক সুবিধা বন্টন করে যার প্রতিদান তারা ভোটের বাক্সে পেতে চায়। সুবিধা বন্টন শুধু ভোটারদেরকে নয়, যারা ভোটকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের কাছেও পৌছানো হয়, তার পরেও নির্বাচনে বিনিয়োগের ক্ষমতা সবসময় শাসকদলের অনেক অনেকগুনে বেশী থাকে। বর্তমান শাসকদলের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অর্থনৈতিক সুশাসনের ঘাটতি থেকে উৎসারিত হয়েছে বললে, তা বেশী বলা হবে না। বিদ্যুৎ রেন্টাল, নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মানসহ সকল সরকারী ব্যয়ই গুণগতভাবে প্রশ্ন সাপেক্ষ। কাজেই নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন একমাত্র সমাধান বলে সব শাসকদলই মনে করে।

অনিশ্চিত রাজনৈতিক সুশাসন : অবাধ, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর রাজনৈতিক সুশাসনের সুচনা হতে পারে। আর বিকাশ ঘটতে পারে রাজনৈতিক সুশাসনই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুশাসনের । মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুশাসন নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথকেই সুগম করে। কিন্তু সামনের নির্বাচনটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবার সম্ভাবনা যেমন এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, তেমনি আস্থা তৈরী করতে পারেনি সবার মনেও। কাজেই রাজনৈতিক সুশাসনের অনিশ্চয়তা থাকবে কি থাকবেনা –তা বলার সময় এখনও আসেনি।

 

‘রাষ্ট্র আমাদেরও’- এই বোধ পুন:প্রতিষ্ঠার স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন

সি আর আবরার ::

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের কিশোরেরা দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় রচনা করেছে। বাংলাদেশের পরিবহন খাতের সব নোংরামি সমাধান করার তাদের অধিকারের বিষয়টি ঘোষণা করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার লোক প্রাণ হারায়, লাখ লাখ লোক আহত হয়। তাদের অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। এসব ঘটে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন করার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নাগরিক সমাজ দশকের পর দশক করে আহ্বান জানাতে থাকলেও তা  এই খাতের সংশ্লিষ্টদের কানে ঢোকেনি। রাজনীতিবিদ, ভাড়ায় খাটা স্বঘোষিত ইউনিয়নকর্মী ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি লোকজনের সমন্বয়ে কায়েমি স্বার্থেন্বেষী মহল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক পুলিশ) বজ্রমুষ্টি প্রতিষ্ঠা করেছে, আইন-শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ ভন্ডুল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দায়মুক্তি ভোগ করে এই মহলটি আদালতের আদেশ বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ও রুখে দিতেও সফল হয়।

সাধারণ মানুষের এ ধরনের অসহায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের শেষদিকে একটি বাসের চাপায় দুই কলেজছাত্র নিহত হলে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ছাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির, তিনি জাহাজ চলাচল মন্ত্রীও, অনুভূতিশূন্য ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য বিক্ষোভকারীদের বিচার পাওয়া ও সমস্যার সুরাহার ব্যাপারে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে গিয়ে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়। অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য শহর ও নগরীতে দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে শত শত, হাজারে হাজারে রাস্তায় নেমে এসে বিচার ও রাস্তায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাতে থাকে। তারা নিবন্ধিত ও চলাচলযোগ্য যানবাহন কেবলমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই যাতে চালাতে পারে, এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনটির বাস্তবায়নের দাবি জানাতে থাকে।

ট্রাফিক পুলিশের অদক্ষতা ও দুর্নীতি এবং পরিবহন সিন্ডিকেট ও তাদের গডফাদারদের সাথে তাদের যোগসাজসে হতাশ হয়ে ছাত্ররা ঢাকা নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধু হয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ছাত্ররা, মূলত কিশোর, স্কুলের পোশাক পরে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে, রোদ-বৃষ্টিতে প্রচন্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়েও সফলভাবে এমন এক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে যা অতীতে কোনো সময়ই এই মেট্রোপলিটান নগরী দেখতে পায়নি।

নিবন্ধিত ও চলাচল উপযোগী গাড়ি কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে চালানো নিশ্চিত করার কাজটি করে  তরুণ তুর্কিরা। তারা গাড়ির যাত্রীদের সিট বেল্ট বাঁধতে পরামর্শ দিয়েছে, মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরতে, পথচারীদের ফুটপাথ, জেব্রা ক্রসিং, ফুট ব্রিজ ব্যবহার করতে অনুরোধ করেছে। মোড়ে রিকশাগুলো যাতে এলোমেলোভাবে না চলে, তাতেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো প্রধান প্রধান রাস্তায় এক লেনের খালি রাখা হয় জরুরি যানবাহন চলাচলের জন্য।

স্ব-নিয়োজিত কিশোর আইনপ্রয়োগকারীরা ভদ্র, তবে দৃঢ়। যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই এক সিনিয়র মন্ত্রীকে তার পথ পরিবর্তন করে সঠিক পথে চলতে বলে। যথাযথ নিবন্ধন কাগজপত্র সাথে না থাকায় আরেক মন্ত্রীকে তারা গাড়িটি ছেড়ে দিতে বলে। আইন সমুন্নত রাখার চেতনায় যথাযথ নথিপত্র না রাখায় তারা ডিআইজি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও নৌবাহিনীর গাড়ি থামিয়ে দেয়।

তবে গাড়িচালকেরা যখন তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস কাগজপত্র প্রদর্শন করতে চায়নি, তখন কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি ভাংচুর করেছে। কোনো কোনো মোড়ে বিক্ষোভকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যান চলাচলে বিরূপ প্রভাব পড়ে, পথচারীদের বেশ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও ছাত্র বিক্ষোভকারীরা মোটামুটিভাবে নগরবাসীর কাছ থেকে উষ্ণ সাড়া পায়। সামাজিক মাধ্যমে তাদের প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। জনসাধারণ তাদেরকে আশ^স্ত করে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কিছু সমস্যা ও জটিলতা তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। অনেকে তো এমনও বলে, যানজটের প্রচন্ড কষ্ট এবং তাদের স্বার্থের সাথে বলতে গেলে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন মিছিল-সমাবেশের কারণে তাদের যে ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তার তুলনায় এই সাময়িক দুর্ভোগ অনেক ভালো।

কিশোরদের বিক্ষোভ কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাদের জন্য মায়েরা স্নাকস ও বোতলের পানি নিয়ে আসে। এক ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শিশু বিক্ষোভকারীদের খিচুরি খাওয়াচ্ছেন। এটি কিশোরদের প্রতি সমর্থনের গভীরতা প্রকাশ করে। বিক্ষোভের চতুর্থ দিনে অভিভাবক, মা-বাবাসহ সাধারণ মানুষ র‌্যালিতে যোগ দেয়। যথেষ্ট হয়েছে আর নয়- এই ছিল তাদের কথা। তারা সবাই সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করার দাবি জানায়। বিক্ষোভকারীদের ন্যায়সঙ্গত বক্তব্য সেলিব্রেটিদেরও উদ্দীপ্ত করে। ছাত্রদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পীরাও এগিয়ে আসে। তারা একসাথে জাতীয় কবির উদ্দীপনাময় রণসঙ্গীত ‘চল চল চল’ গায়।

অনেক দিক থেকেই এই বিক্ষোভ অনন্য। কিশোরেরা আবেদনময়ী শ্লোগান, কবিতা ও গান রচনা করে, গায়। এটি আইনের শাসনে প্রতি কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং আইন কিভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে, তারই একটি প্রদর্শনী। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কর্মসূচি নয় এটি, বরং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যে কত জরুরি, তার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যবস্থা। এটি রাজনৈতি ক্ষমতা দাবি করার ব্যাপার নয়, বরং এর মাধ্যমে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিক্ষোভকারীরা প্রমাণ করেছে, দায়িত্ব পালনের সদেচ্ছা ও দায়বদ্ধতা থাকলে রাষ্ট্রীয় অর্থপুষ্ট পেশাদার বাহিনীগুলো দশকের পর দশক ধরে যে কাজ করতে পারছে না, তা-ও করা সম্ভব।

ছাত্ররা সরকারের কাছে তাদের ৯ দফা দাবি পেশ করে। ছাত্রদের ব্যাপক তৎপরতা ও জনগণের কাছ থেকে প্রবল সমর্থন পাওয়ায় সরকার এসব দাবির কিছু অবশ্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এসব দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে মন্ত্রীদের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরও তা রক্ষা করা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ায় তারা রাজপথ ছেড়ে দিতে অনীহা প্রকাশ করে। কোটা আন্দোলনের প্রতি প্রধানমন্ত্ররি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ধীরে চলো কৌশল এখনো তাদের মনে গেঁথে রয়েছে।

একইভাবে নতুন পরিবহন আইনের প্রতিশ্রুতির প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে অতি সামান্য। অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই তারা মনে করছে, নতুন আইনের ব্যাপারে কথার ফানুশ নয়, বরং প্রয়োজন বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া ও সিনিয়র মন্ত্রীদের আন্দোলনটিকে বিএনপি-জামায়াতের ছলাকলা হিসেবে অভিহিত করার ফলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে আরো সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক দিনে প্রাণঘাতী অস্ত্র হাতে মুখোশধারী লোকদের, তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও শ্রমিক শাখার কর্মী বলে অভিযোগ রয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ পলকা বিশ্বাস আরো কিছুটা ক্ষয়ে দিয়েছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই বৈধ ও জনপ্রিয় নাগরিক আন্দোলন একটি খোলা প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাবে। এই ইস্যুর ন্যায়সঙ্গত, যৌক্তিক ও আশু সমাধানের দায়িত্ব পুরোপুরি সরকারের কাঁধে। এই ঘটনার প্রধান উস্কানিদাতা মন্ত্রীর পদ থেকে কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির পদ থেকে শাজাহান খানের অপসারণ উত্তপ্ত পরিবেশ অনেকাংশেই প্রশমিত করতো। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার সত্যিকার ব্যবস্থা ও  ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নই সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করবে। ছাত্রদের ওপর যেকোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শন, বিদ্রুপ করা ও শক্তিপ্রয়োগ করা হলে (কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এ ধরনের পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে) পরিস্থিতির আরো ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।

বিক্ষোভকারীদের দখলে থাকা রাস্তায় একটি পোস্টারে লেখা ছিল : ‘রাষ্ট্রের মেরামত কাজ চলছে : সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ আমরা আশা করতে পারি, কর্তৃপক্ষ তাদের আহ্বানে কর্ণপাত করবে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সত্যি সত্যিই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

(সি আর আবরারঅধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

শিশু-কিশোররাই ফিরিয়ে এনেছে সাহস-দ্রোহ আর জীবনের জয়গান

শাহাদত হোসেন বাচ্চু:

রাজধানীসহ সারাদেশ এখন শিশু-কিশোরারণ্য। কিছু প্লাকার্ড চোখে পড়ছে। অসামান্য, অনবদ্য। “উই ওয়ান্ট সেইফ বাংলাদেশ…উই ওয়ান্ট জাস্টিস”- দাবি নিয়ে শিশু-কিশোররা রাস্তায়। এ দাবি আপামর জনগনের; কিন্তু তারা সাহস হারিয়ে ফেলেছে, দ্রোহ অবশিষ্ট নেই। রাস্তায় নেমে আমাদের শিশুরা সেই সাহস-দ্রোহ ফিরিয়ে এনেছে। জীবন থেমে নেই। জীবনের জয়গান ফিরিয়ে আনতে সারা বাংলাদেশ এখন রাস্তায়। প্রতিপক্ষ পুলিশ এবং পরিবহন শ্রমিকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। মন্ত্রী, বিচারপতি, সরকারী কর্তাদের ড্রাইভারদের লাইসেন্স নেই ! শিশুরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে  দিচ্ছে, এক অরাজক বাংলাদেশে কতটা অনিরাপদ আমরা !

এক. লিখতে বসে ভয় হচ্ছে। ভয় পেয়েছেন কর্তারাও। শিক্ষামন্ত্রী স্কুল বন্ধ করে দিয়ে ভয়-তড়াস ঠেকাতে চাইছেন। শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। পিটিয়ে, কাঁদানে গ্যাস-রাবার বুলেট ছুঁড়েও ঘরে ফেরানো যাচ্ছে না অদম্যদের। তারা বিচার চায়। নিরাপদ সড়ক চায়। সরকার বিচার দিতে পারে না, নিরাপত্তা দিতে পারে না। বদলে পিটিয়ে, জখম করে বিচারপ্রার্থীদের দমাতে চায়। আর দাবি মেনে নেয়ার প্রহসন করে !

ভয় হচ্ছে! কতরকম ভয়ে এখানে মানুষ মরছে। প্রকৃতির হাতে মরছে। শক্তির হাতে মরছে। গুম হয়ে, ‘বন্দুকযুদ্ধে মরছে’। অস্বাভাবিকতার হাতে মরছে। দায়িত্ব জ্ঞানহীনতায় মরছে। দেখার কেউ নেই বলে মরছে। চলছে মৃত্যুর মিছিল। আরো মরছে সুশাসনের অভাবে। কি বলবো, “এই মৃত্যুর উপত্যকা আমার দেশ নয়”-বল্লেই কি দেশ বদল হয়ে যাবে? কিংবা আমাদের সন্তানেরা ফিরে পাবে এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড”র মত দেশ?

কোন বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের নীতি-কুশলীরা ভাবছেন? এই দেশ নিয়ে তারা গর্ব করেন উন্নয়নে ভাসিয়ে দেয়ার। স্বপ্ন দেখান মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার। কৌশল নির্ধারন করেন, পরিকল্পনাও গ্রহন করেন। কিন্তু তারা জানেন না এর বাইরেও একটি সমাজ অবয়ব পাচ্ছে। মূলধারার কুশীলবরা সে খবর কতটুকু রাখেন, জানি না। এজন্যই শিশু শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দেখে তারা চমকে উঠছেন। কারণ নব্বইয়ের পরে এই বাংলাদেশকে তারা ভুলেই গিয়েছিলেন।

দুই. রাষ্ট্র-সরকারের সবস্তরে একধরনের ‘অপরাধীকরণ’ (Criminalization)  দৃশ্যমান। আইনের শাসন এবং বিচারহীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অসহনশীলতা এবং বৈষম্য এক দেশকে অনেক দেশে রূপান্তরিত করছে। এর বিপরীতে জন অসন্তোষ এবং মানুষের অধিকারগুলিকে কর্তৃত্ব ও শক্তি দিয়ে দলিত করা হচ্ছে। সরকারের ভেতরের সরকার এই পন্থাকে উস্কে দিচ্ছে, মদত দিচ্ছে আবার চরমপন্থায় দমনও করছে। বিচারহীনতার বিপরীতে ‘অপরাধী মনোজমিন’ স্থায়িত্ব লাভ করছে।

‘অপরাধী মনোজমিন’র একটি বড় উদাহরন পরিবহন সেক্টর। এখানে একটি মাফিয়া চক্র বাংলাদেশে সবকালে সক্রিয়। তারা সর্বকালে সরকারের অংশ হয়ে ভেতরের সরকার। এখানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বেসরকারী খাতে পরিবহন কোম্পানীগুলির মালিক। আবার তারাই শ্রমিক নেতা। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং মশিউর রহমান রাঙ্গা পরিবহন শ্রমিকদের দুই শীর্ষ নেতা। এরা চাইলে সারাদেশে জনদুর্ভোগ নামিয়ে আনতে পারে। নামিয়ে আনতে পারে ভয়াবহ নৈরাজ্য।

যাত্রীসেবায় সরকার কোন আইনী উদ্যোগ নিতে গেলেই ভেতরকার সরকার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য যাত্রীদের পক্ষে প্রণীত কোন আইনই জনগনের পক্ষে যায়না। পরিবহন মালিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষ এবং মন্ত্রী-আমলা সবাই একাট্টা হয়ে যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে, পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির হয়, পরিমান বছরে হাজার কোটি টাকা। এজন্য এই সেক্টর সবসময় ক্ষমতাসীনদের দখলে  ধারাবাহিক নৈরােজ্যর কবলে থাকে। সঙ্কটে পড়লে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অংশ হয়ে পড়ে।

পরিবহন সেক্টরে মালিকদের লাভালাভই প্রধান বিষয়। শ্রমিকদের কাজটি অমানবিক এবং অমর্যাদার। জীবনমানের উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কখনও। সেজন্য তারাও পথে পথে নানা সুযোগ নেয় বাড়তি আয়ের আশায়। শ্রমিকদের পেশাগত জীবনে বেতন-মর্যাদা প্রদানে এই সেক্টরে কোন সিষ্টেম গড়ে তোলেনি। মালিকদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর জীবন-জীবিকা নির্ভর। ফলে একটি প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে এই সেক্টরে আকৃষ্ট করা যায়নি, কাজে লাগানোও হয়নি।

অন্যদিকে সরকার পক্ষ, যখন যারাই ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিকদের ব্যবহার করেছেন। সরকার থেকে কোন দায়িত্বশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অথরিটি তৈরী হলেও তারাও ‘মাফিয়া চক্র’ ভাঙ্গতে পারেণি। ফল হয়েছে, ব্যক্তি খাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলাকে সঙ্গী করে। শ্রমিকদের নিয়ে কিছু রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা ‘মাফিয়াতন্ত্র’ গড়ে তুলে সর্বকালে সরকারের অংশ হয়েছে।

তিন. সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুঘর্টনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেল তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিক বার্তা ৩ মে ’১৮)।

তাঁর কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় পরের দিনই। দেরী করেননি মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলোঃ ৫ মে ’১৮)।

প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি চূড়ান্ত সত্য! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কী মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হচ্ছে সম্ভামনাময় আগামীর। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

চার. আপনি কি এমন কোন দেশ খুঁজে পাবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের দায়ে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্মঘট, অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে কোন সংগঠন? হ্যা পারে, বাংলাদেশে। মন্ত্রী শাহজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা’র নেতৃত্বে শ্রমিকরা আদালতের বিপক্ষে জনজীবনে নৈরাজ্য নামিয়ে আনতে পারে! আর নির্বিকার পুলিশ পরিবহন শ্রমিকদের বিপক্ষে কোন এ্যাকশনে যায় না। কিন্তু এই পুলিশই নির্বিচার লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ে, পিপার স্প্রে করে, জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনস্বার্থ নিয়ে যেকোন সমাবেশ-আন্দোলনে। শিশু-কিশোররাও বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পায় না।

সরকারের নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশানের কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা। বিষ্ময়ের বিষয় হচ্ছে এই দুই মন্ত্রী সরকারী বাসভবনে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে যে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আদালত বা সরকার কোন ব্যবস্থা তো দুরের কথা , প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখাননি।

গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

National Committee to Protect Shipping, Roads & Railways  নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপরোয়া গাড়ি চালনা।  ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

পাঁচ. এক বিশৃঙ্খল, অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে প্রতিনিয়ত সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুর হারকে বাড়াচ্ছে। পৃথিবীতে সড়ক, নৌ, রেলপথ ও আকাশ পথে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। বাংলাদেশে এরকম কোন দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ আছে বলে জানা নেই। থাকলে অনেকদিন আগেই চরম বিশৃঙ্খল এবং মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত হয়ে সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারতো। তাহলে এই অযাচিত মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে হ্রাস পেত।

সড়ক নিরাপত্তায় আরেকটি আইনের খসড়া প্রণীত হয়েছে। তাদের নিয়েই যারা কিনা, পরিবহন সেক্টরের ‘মাফিয়াচক্র’। এই আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের প্রায় কাউকে যুক্ত করা হয়নি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, এটিও আরেকটি প্রহসন হবে। প্রমান হচ্ছে, সড়কমন্ত্রী জানিয়েছেন দেশে ৩৬ লাখ গণপরিবহনের মধ্যে ১৮ লাখই অবৈধ। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করলে, ১৮ লাখ অবৈধ যানবাহনের মালিক, ড্রাইভার ও অন্যান্যদের আটক করতে হবে। ধরেই নেয়া যায়, বরাবরের মত আন্দোলন-বিক্ষোভ সামাল দিতে সরকার কিছু চটকদার বক্তব্য দিচ্ছে, দাবি মানার ভান করছে থাকবে। অন্তিমে জনগনের সাথে প্রহসন অব্যাহত থাকবে কারন তারা কতিপয়ের, সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়!

ন্যায্য দাবি নিয়ে আক্রান্ত তরুণেরা

আনু মুহাম্মদ ::

কোটা সংস্কারের আন্দোলন তৈরি হয়েছে কাজের খোঁজে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। কাজ না করে চাঁদাবাজি বা অপরাধ করে জীবিকা অর্জনের পথে তারা যেতে চায় না। তারা মেধা ও যোগ্যতায় নিজেদের তৈরি করতে পারবে, তার ভিত্তিতে কাজ পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে এটাই তাদের দাবি। সরকার পক্ষ বারবার এই দাবিকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করেছে, অপপ্রচারের পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে। এই দাবি জানাতে গিয়ে তারা যখন সরকারের ভয়ংকর রোষের শিকার হয়, যখন পুলিশ- ছাত্রলীগের আঘাতে জর্জরিত হয় ন্যায্য দাবি জানানো সাধারণ শিক্ষার্থীরা, তখন সেই আঘাত প্রতিটি নাগরিকের ওপরই এসে পড়ে। স্পষ্ট হয় শিক্ষা ও জনস্বার্থের প্রতি সরকারের বৈরী  ভূমিকা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বেকারত্বের হার বেশ কম, শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকেও কম। সর্বশেষ ‘শ্রমশক্তি জরীপ ২০১৬-১৭’ অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ, গত বছরের তুলনায় বেকারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ লাখ। প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা অনেক বেশি। কাজ পেতে আগ্রহী কেউ সপ্তাহে একঘন্টা কাজ করলেই যদি কর্মরত বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বলতে হবে বাংলাদেশ এখন পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরে আছে! কারণ বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কর্মসন্ধানী সবাই কিছু না কিছু উপার্জনমুখি বা উপার্জন বিকল্প কাজ করে। সাধারণত কর্মসময় ১৫ বছর বয়স থেকে ৬৫ বছর ধরা হলেও বাংলাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কাজ শুরু হয় ৫-৭ বছর থেকেই, আর তা অব্যাহত থাকে (যদি বেঁচে থাকতে পারেন) ৬৫ বছরের পরেও। এদেশে যারা নিজেদের শৈশবকে শৈশব হিসেবে পার করতে পেরেছেন তারা বিশেষ সুবিধাভোগী।

বেকারত্বের সংকীর্ণ সংজ্ঞা দিয়ে কর্মসংস্থান মাপা খুবই বিভ্রান্তিকর। কর্মঘন্টা, ধরন, আয়, নিশ্চয়তা এগুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। প্রবাসে প্রায় এক কোটি মানুষ কাজ করেন। তারপরও দেশে কাজের পরিমাণগত ও গুণগত অবস্থা ভালো নয়। কৃষিখাতের অনুপাত কমেছে, কর্মসংস্থানেও। কিন্তু শিল্প কারখানা খাতের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে পরিসেবা খাত। সেখানে স্থায়ী নিরাপদ কাজের সুযোগ খুবই কম। তাই অপ্রতিষ্ঠানিক কাজ, স্বকর্মসংস্থানেই বেশির ভাগ মানুষের নির্ভরতা। সরকারি সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরীপ অনুযায়ী দেশে কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এসব ক্ষেত্রে কাজের কোনো স্থিরতা নেই, আয় তুলনামূলক ভাবে অনেক কম, নিরাপত্তাও কম। স্নাতক  পর্যায়ের শিক্ষা নিয়েও অনেককে এ ধরনের কাজই খুঁজতে হচ্ছে। দোকান, মোবাইল, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, টিউশনি, কোচিং সেন্টার, অনলাইন বিভিন্ন সার্ভিস, কুরিয়ার, পরিবহণ, বিক্রয় প্রতিনিধি সহ এজেন্ট হিসেবে কাজ এগুলোই এখন শিক্ষিত তরুণদের কাজের এলাকা। ব্যাংক, এনজিও, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বিশেষ আগ্রহের জায়গা। সবচাইতে গুরুত্ব পাচ্ছে এখন বিসিএস ক্যাডার।

সচিব, যুগ্মসচিবসহ উচ্চ পদগুলোতে সংখ্যার তুলনায় নিয়োগ বেশি হলেও প্রয়োজনীয় নিয়োগে সরকারের অনীহা প্রবল। সর্বজন (পাবলিক) স্কুল কলেজে বহু হাজার পদ এখনও খালি। সরকারের বাজেট ক্রমশ বেড়ে যায়, অভূতপূর্ব উচ্চ ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেয় সরকার, কিন্তু প্রয়োজনীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে বলে টাকার অভাব। এসব পদপূরণ যে শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিরোধ করবার জন্যই যে দরকার সে বোধটুকু সরকারের মধ্যে দেখা যায় না। সরকার একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ করতে গেলে বলে অর্থ নেই। বছরের পর বছর কলেজগুলোতে পদ শূণ্য, শিক্ষক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ না করেই পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। বহু প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকের অভাবে ঠিকমতো ক্লাশ হয় না।

অন্যদিকে প্রায় ক্ষেত্রেই মেধা বা যোগ্যতার সাথে কাজ পাবার সম্পর্ক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে চাকুরির কথা উঠলেই ‘কতো টাকা’ লাগবে এই প্রশ্ন নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।  অদ্ভূত নৈরাজ্যে বা বাজারী সমাজের মধ্যে পড়েছি আমরা। নিয়োগের সময় মেধা বা যোগ্যতার চাইতে কে কত টাকা দিতে পারবে সেই প্রশ্ন ওঠে। চাকুরি এখন কিনতে হয়। যে টাকায় কেনা, তার চাইতে বেশি টাকা তোলার চেষ্টা তাই অনিবার্য। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের এসব জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখতে হয় নিয়মিত। এদেশে যোগ্যতা অর্জন কঠিন, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া আরও কঠিন।

বিসিএস ক্যাডারের বিষয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ তরুণদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে আগের যেকোন সময়ের চাইতে বেশি। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক কলেজ শিক্ষার্থীদের এখন প্রধান ব্যস্ততা। স্নাতক উত্তীর্ণ হবার অনেক আগে থেকে এই বিষয়ে পড়াশোনাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ স্থায়ী নিরাপদ কর্মসংস্থানের আর কোনো ক্ষেত্র নেই।কিন্তু এতো ভরসা যার উপর সেখানে কোটার প্রতিবন্ধকতা দিনে দিনে ক্ষোভ বৃদ্ধি করেছে শিক্ষার্থীদের।

খুবই স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কোটা নিয়ে আলোচনা কারণ শতকরা ৫৬ ভাগের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য (এখন নাতি নাতনি যোগ হয়েছে)। এ বিষয়ে তাই কথাবার্তা খুব না হলেও ক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়েছে। এবারই তার বহি প্রকাশ ঘটেছে বেশি। স্পর্শকাতর হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানের কথা বিবেচনা করেই এ বিষয়ে কথা বলা উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো থেকেই আলোচনা হওয়া দরকার বেশি। এই আন্দোলনের প্রথম দিকে, ২০১৩ সালেই কেউ কেউ বলেছেন। বাবা মা উভয়েই মুক্তিযোদ্ধা, এরকম একজন সন্তান তানিম আহমেদ তখনই এতোটা কোটা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। বলেছেন, কোটার সুবিধা দেয়া হয় অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য। মুক্তিযোদ্ধারা অনগ্রসর নয়। https://opinion.bdnews24.com/2013/07/13/freedom-fighters-quota-a-son-explains-his-burden/

লায়লা হাসিন আমার ছাত্রী, এখন বিভাগে সহকর্মী। মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে লায়লা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, কখনও বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কোনো সুবিধা নিতে চাইনি। বাবা আমাকে যোগ্য করে তুলেছেন, নিজের যোগ্যতার বলেই এ পর্যন্ত এসেছি। আমার সন্তানদের  আমি কোনো করুণার বস্তুতে পরিণত করতে চাই না। ওরা নিজেদের যোগ্যতা বলেই নিজেরা যতদূর যেতে পারে যাবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার, একজন শহীদের, নির্যাতিত মানুষদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে অবদান তাতে তাঁদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের ঋণ পরিশোধযোগ্য নয়। কিন্তু সেই মানুষদের তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ। শহীদদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই খন্ডিত। এগুলোর জন্যও সরকারের সাথে যেরকম যোগাযোগ ও চুক্তির ক্ষমতা লাগে, সেটা কজন মুক্তিযোদ্ধার আছে? কটি শহীদ পরিবার সে পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে? তারফলে গ্রামে প্রামে, শহরে বন্দরে এমন অনেক পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ ত্যাগ করে, সর্বোচ্চ লড়াই করেও পরে নিগৃহীত, বঞ্চিত হয়েছেন। শহরের সুবিধাভোগী পরিবারের কেউ কেউ এই পরিচয় নিয়ে নানাভাবে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারলেও শ্রমিক, ক্ষেতমজুরসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।  সরকার যদি সমস্যাজর্জরিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যথাযথভাবে যোগ্য করে তুলতে  ভূমিকা পালন করতো তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সম্মানজনক হতো।

মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে এখনও বির্তক এবং প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। এতো বছরেরও মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, যুদ্ধাপরাধী তালিকা সম্পূর্ণ হয়নি। আর তার কারণে সরকার বদলের সাথে সাথে তালিকার পরিবর্তন ঘটে। এক সরকারের অধীনেও বদলাতে থাকে। এখনও মাঝে মধ্যে পত্রিকায় খবর আসে রাজাকারের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়, ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে উচ্চ পদে আসীন। ক্ষমতাবানদের স্পর্শ থাকলে যে রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় তার প্রমাণ আমরা বহু পেয়েছি।

কোটা পরিচয় নিয়ে বর্তমানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানেরা তাই বড় যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। করুণা নয়, সম্মান তাঁদের প্রাপ্য। সরকার যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অনুপাত শতকরা ৩০ ভাগ করেছে, সন্তানের পর এখন নাতি পুতি পর্যন্ত কোটা সম্প্রসারিত করেছে এটা কি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসার জন্য, তাদের প্রতি দায়বোধের জন্য? বাস্তব পরিস্থিতি তা বলে না। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায় যে, সরকার এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাবানদের বেশি বেশি কোটা রাখার আগ্রহ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা নিজেরা নিজেদের পছন্দমতো লোকজনকে চাকুরি দিতে পারে, সুবিধামতো নিয়োগ বাণিজ্য করতে পারে। সেজন্য ভুয়া সার্টিফিকেট এর জোয়ারে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর তাদের সন্তাননেরাও ভেসে যাচ্ছে। অলিখিত প্রবল একটি কোটা এখন অন্যসব কোটা পরিচালনা করছে সেটা হল ‘সরকারি দলের কোটা’। কোটা সংস্কারের পাশাপাশি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ- ‘সরকারি দলের কোটা’ বা দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের উৎস দূর করা।

নোয়াম চমস্কির সাক্ষাতকার-১ : ‘ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি অশুভ ও অলুক্ষণে ঘটনা’

আধুনিক সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম নোয়াম চমস্কি ছয় দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন। চমস্কির সাহসিকতা, দৃঢ়প্রত্যয় ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের ফলেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জালিয়াতি, সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের গোমর ফাঁস হয়েছে। মানব ইতিহাসে যাদের উদ্ধৃতি সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত হয়েছে, তাদের অন্যতম এই চমস্কি। তাকে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনকও বলা হয়ে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তার সোচ্চার ভূমিকা তাকে লাইমলাইটে এনে দিয়েছিল। তার ১৯৬৭ সালের যুদ্ধবিরোধী রচনা ‘দি রেসপনসিবিলিটি অব ইন্টিলেকচুয়ালস’ ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এখনো তার রচনাটি ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত। তবে এর জন্য তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার কারণে তাকে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার বরণ করতে হয়, এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কুখ্যাত ‘শত্রু  তালিকায়’ও তার নাম ছিল।

তার ভূমিকার কারণে পূর্ব তিমুরসহ অনেক দেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছিল, অনেক স্থানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি এখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, নব্যউদারবাদ, সমসাময়িক পুঁজিবাদ, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন ইত্যাদি বিষয়ে সোচ্চার। ২০১১ সালে তিনি সিডনি পিস প্রাইজে ভূষিত হন।

তিনি বই লিখেছেন শতাধিক। এসবের মধ্যে রয়েছে আমেরিকান পাওয়া অ্যান্ড দি নিউ ম্যান্ডারিন্স, ফর রিজন্স অব স্টেট, ম্যানুফেকচারিক কনসেন্ট : দি পলিটিক্যাল ইকোনমিস অব দি মাস মিডিয়া, দি অ্যাবুইস অব পাওয়ার অ্যান্ড দি অ্যাসাল্ট অন ডেমোক্র্যাসি

বর্তমানে চমস্কি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইনস্টিটিউট প্রসেফর এমেরিটাস ও ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার লরেট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৮৯ বছর বয়সেও চমস্কি ক্লান্তিহীন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, ন্যায়বিচার ও শান্তি কামনায় আগ্রহী।

সম্প্রতি তিনি জিপসন জন ও জিথেশ পিএমকে একটি বিশেষ সাক্ষাতকার দিয়েছেন। এতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল, ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি প্রদান, মার্কিন শক্তির পতন, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, ল্যাতিন আমেরিকান বাম, পোপ ফ্রান্সিস, ইসলামফোবিয়া, সিরিয়া যুদ্ধ, ইরানের সাথে পরমাণু যুদ্ধ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বের হয়ে যাওয়া, বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব-কর্তব্য ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। এখানে তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো। ফ্রন্টলাইন ইন্ডিয়া থেকে বিশেষ সাক্ষাতকারটির বাংলা অনুবাদ করেছেন-হাসান শরীফ

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল :

প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের শেষ নির্বাচনের সময় আপনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমল নিয়ে বিশ্বের চরমভাবে আতঙ্কিত হওয়া উচিত।’ এখন তিনি হোয়াইট হাউস দখল করে আছেন। তার নীতি ও ঘোষণাগুলো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব ও করপোরেট এজেন্ডার সমন্বিত রূপেরই প্রতিনিধিত্ব করে। অনেকে তাকে হোয়াইট হাউসের ‘দানব’ পর্যন্ত বলে থাকে। তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বিশ্বের জন্যও কোন বিপদ নিয়ে আসছেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পূর্বসূরীদের থেকে তার ‘পার্থক্য’ কোথায়?

নোয়াম চমস্কি : এককভাবে সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো-সত্যিকারের অস্তিত্বগত সঙ্কট বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান। এই মারাত্মক হুমকিটি মোকাবিলা করতে অবশিষ্ট বিশ্ব অন্তত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপ পর্যাপ্ত না হলেও অন্তত কিছু তো করেছে। একই কথা প্রযোজ্য কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরের কিছু এলাকার ক্ষেত্রেও। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে রিপাবলিকান এস্টাবলিশমেন্টের সার্বিক সমর্থনে বিশ্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ শক্তিশালী ফেডারেল সরকার কেবল এসব প্রয়াস থেকে প্রত্যাহারই করেনি, সেইসাথে ধ্বংস প্রতিযোগিতা বেগবান করতে সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হয়েছে। এটি স্তম্ভিত করার মতো ঘটনা। বিধ্বংস শক্তি এখন অনেক দূরে ছুটে চলেছে।

প্রশ্ন : ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ট্রাম্পের ঘোষণাটির ফলে মনে হচ্ছে শান্তিপ্রক্রিয়া ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প এর মাধ্যমে কোন বার্তা দিতে চাচ্ছেন? এ ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী? ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রচেষ্টায় এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে?

নোয়াম চমস্কি : দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বড় ধরনের আঘাত না হলেও ‘শান্তিপ্রক্রিয়া’ তেমনভাবে সক্রিয় ছিল না। আমার মনে হয়, অনেকটা ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘাঁটি ও তহবিল দাতাদের অনেকেই পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ সম্প্রসারণের আবেগময়ী সমর্থক।

প্রশ্ন : আগে আপনি লিখেছিলেন, বিশ্বব্যাপী মার্কিন শক্তির পতন ঘটছে। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কাঠামোগত কোন ধরনের পরিবর্তন ঘটছে? আমরা কি বহু মেরুর বিশ্বের দিকে যাচ্ছি?

নোয়াম চমস্কি : আমেরিকার জাতীয় শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে (ঐতিহাসিকভাবে নজিরবিহীন) সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছে। তার ক্ষয় শুরু হয়- যাকে বলা হয়ে থাকে- ‘চীনকে হারানো’র মাধ্যমে। এটি বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। অন্যান্য শিল্প সমাজ যুদ্ধকালীন বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়ায় এবং উপনিবেশমুক্তকরণ যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করায় বিশ্বসমাজ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল তিনটি মেরুতে পরিণত হয়। এর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উত্তর আমেরিকা, দ্বিতীয়টি জার্মানভিত্তিক ইউরোপ এবং তৃতীয়টি ছিল জাপানভিত্তিক উত্তর-পূর্ব এশিয়া। চীনের উত্থানের ফলে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বে ক্ষয় আরো বাড়ে। বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে চীনে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তবে মারাত্মক কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে চীন এখনো গরিব দেশ। আবার সামরিক খাতসহ কয়েকটি বিষয়ে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব বহাল রয়ে গেছে। আবার এই কথাও মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে জাতীয় হিসাব এখন আগের চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে বৈশ্বিক অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা ২০ ভাগেরও কম হলেও, মার্কিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিমে।বর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। জোর দিয়ে বলা যায়, এগুলো একটি জটিল চিত্রের কেবল অবয়বটুকুই প্রকাশ করছে।

ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব :

প্রশ্ন :বিশ্বের  প্রায় সব অংশে আমরা ডানপন্থী শক্তির আতঙ্কজনক বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে টি পার্টি মুভমেন্ট, ভারতে সংঘ পরিবার, ফ্রান্সে লে পেনের ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট এবং বিভিন্ন দেশে নানা ইসলামি দল শক্তি বাড়াচ্ছে। মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ অধ্যাপক সামির আমিন এই শক্তি বৃদ্ধিকে ‘সমসাময়িক পুঁজিবাদে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আপনি কি ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব নিয়ে এই শঙ্কার সাথে একমত?

নোয়াম চমস্কি : রাজনৈতিক আলোচনার বেশির ভাগ পরিভাষার মতো ‘ফ্যাসিবাদ’ও যথাযথ পরিভাষা নয়। ফ্যাসিবাদী সরকার ও সংস্থাগুলোর তৎপরতার কারণে সহজাতভাবে এটি এখন একেবারে অসহ্যকর একটি সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে। অনেক অনেক আগে পরিভাষাটি আরো যুৎসই প্রায়োগিক অর্থ প্রকাশ করত। উদাহরণ হিসেবে ভেবলেনবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ রবার্ট ব্রাডির কথা বলা যায়। তিনি ১৯৩০-এর দশকজুড়ে ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলোর আলোকে পরিভাষাটি দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজগুলোর অবস্থা বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিভাষাটি যতটা না কার্যকর, তার চেয়ে বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী।

বর্তমান সময়ে ডানপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি অশুভ ও অলুক্ষণে ঘটনা। এমনকি ওই পরিভাষাটি যদি ব্যবহার করা না হয়, তবুও। বিষয়টিকে শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সাম্প্রতিক নির্বাচনে নব্য-উদারবাদী সময়ে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পতনের আলোকে বিশ্লেষণ করা উচিত।

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রে [বার্নি] স্যান্ডার্সের আন্দোলন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু বিপুল তহবিলপুষ্ট প্রচারণা ও ব্যাপক মিডিয়া সমর্থনে এক বিলিয়নিয়ারের জয়ের ঘটনাটি নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল স্যান্ডার্সের প্রচার-তৎপরতা। তিনি ভোট কেনাবেচার দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ভেঙে দিয়েছেন।

বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ টমাস ফারগুসন। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যক্তি শক্তির অনেক উপাদানের একটি তহবিল সংগ্রহ নির্বাচনে জয়ের একটি শক্তিশালী নির্ধারক। স্যান্ডার্সের ব্যক্তিগত সম্পদ বা করপোরট সম্পদ থেকে কোনো তহবিল সংগ্রহ করেননি, তার কোনো মিডিয়া সমর্থন ছিল না। তিনি সম্ভবত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন লাভ করতে এবং এমনকি নির্বাচনেও জয়ী হতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি দলের ব্যবস্থাপকদের কল-কাঠি নাড়ায়। তবে তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

এটি হলো নব্য-উদারবাদী যুগে মধ্যপন্থী প্রতিষ্ঠান ও তাদের নীতির প্রতি জনপ্রিয় বৈরিতার আরেকটি প্রকাশ। বিষয়টি অন্যান্য স্থানেও দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে জেরিমি করবিনের ব্রিটিশ লেবার পার্টির দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা যায়। যা ঘটছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য আগেকার আমল সম্পর্কে গ্রামসির পর্যবেক্ষণের কথা এখানে বলা যায় : ‘যখন পুরনোটি মরে যাচ্ছে; নতুনটি জন্ম নিতে পারছেনা- এই অন্তর্বর্তী অবস্থায় নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।’ তবে আমরা এর সাথে যোগ করে বলতে পারি, আশার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।

প্রশ্ন : ভারতে হিন্দু ডানপন্থী শক্তির ভিন্নমতালম্বী কণ্ঠস্বরগুলোকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মোদি সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

নোয়াম চমস্কি : আমি এসব খবরের কিছু কিছু পড়েছি। এতে যা বোঝা যায়, তাতে নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে পরিস্থিতি জঘন্য। এতে মনে হচ্ছে, মোদি সরকার এসব অপরাধ সহ্য করে নিচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতে বর্তমান সরকার সম্পর্কে একই ধরনের মন্তব্য করা হলে জাতীয়তাবিরোধী অভিযোগ উত্থাপন ঘটতে পারে। লেখক অরুন্ধতী রায়, মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট ড. বিনায়ক সেন (২০১০) এবং আরো সাম্প্রতিক সময়ে জওহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন সরকার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছে। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদবিরোধীর মধ্যকার সীমারেখা আপনি কোথায় স্থান দেবেন?

জবাব : এটি আমার কাছে কোনো ইস্যু মনে হয় না। জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা নিয়ে কেউ যে চিন্তাই করুক না কেন, মুক্ত সমাজে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ সুরক্ষিত ও সুস্পষ্ট থাকতে হবে।

জাতীয়তাবিরোধী তৎপরতার’ অভিযোগ চরমভাবে ভয়াবহ।

(অসমাপ্ত)

উদার গণতন্ত্রের তিন সঙ্কট

গনেশ সীতারামন

গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : আসিফ হাসান

গত কয়েক বছর ধরেই আমি ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের ২০০৫ সালে কেনিয়ন কলেজে দেওয়া উদ্বোধনী বক্তৃতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ওয়ালেস দুটি মাছের সাঁতার কাটার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন। পাশ দিয়ে আরেকটি বড় মাছ সাঁতরে যাওয়ার সময় বলল, ‘সুপ্রভাত বাছারা, পানি কেমন?’ বড় মাছটা দূরে চলে যাওয়ার পর একটি অপরটিকে বলল, ‘আজব কথা, পানি আবার কেমন হবে?’

কোন জিনিসটা ট্রাম্পের আর বেক্সিটের ভোটারদের নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে অনেক আলোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে পড়ছে দেখে উদ্বেগেরও সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক লোক টুইটার-ঝড় থেকে টুইটার-ঝড়ে দৌড়ঝাঁপ করতে থাকায় পানিতে কী হচ্ছে- অর্থাৎ বৈশ্বিক  গণতন্ত্রের সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার মূল কারণের প্রতি নজর পড়ছে তুলনামূলকভাবে কম।

ইয়াসচা মনকের অনন্য গ্রন্থ ‘দ্য পিপল ভার্সেস ডেমোক্র্যাসি’তে উদার গণতন্ত্র কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টির স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, বোধগম্য ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ওই পরিবেশ নস্যাতই কেনো বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রের বর্তমান সঙ্কটের উৎস তা জানিয়েছেন। উদার গণতন্ত্র যে পানিতে সাঁতার কাটে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা অচিন্তনীয় বলে তিনি মতপ্রকাশ করেছেন।

মনক দেখিয়েছেন, উদার গণতন্ত্রের সফলতা ও স্থিতিশীলতা সমাজজীবন-সম্পর্কিত তিনটি ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রথমত, নাগরিকেরা তুলনামূলকভাবে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিল। কারণ, সম্প্রচার করা খবর, সংবাদপত্র, রেডিও ইত্যাদি সবই ছিল এককেন্দ্রিক অনেক ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে দ্বাররক্ষকেরা খবর ও তথ্যকে মূলধারার মধ্যে থাকা নিশ্চিত করত। এর অর্থ হলো, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ও অভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অভিন্ন কথাবার্তা বলত।

দ্বিতীয় ধারণাটি ছিল ব্যাপক-বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও তুলনামূলক অর্থনৈতিক সাম্যতা। বিশ^ ইতিহাসের বেশির ভাগ সময়ই মূলত কোনোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল না। কেবল শিল্প বিপ্লব সূচনায় প্রবৃদ্ধি আকাশচুম্বি হওয়ার পরই লোকজন উচ্চতর জীবনযাত্রার আকক্সক্ষা প্রকাশ করতে পেরেছিল। আর সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশকের মধ্যে প্রবৃদ্ধির সাথে নিম্ন পর্যায়ের অর্থনৈতিক বৈষম্যের অর্থ ছিল এই যে, উচ্ছসিত জোয়ারে সত্যিকার অর্থেই সব নৌকাকেই উপরে ওঠেছিল।

আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।

আর চূড়ান্ত ধারণা ছিল সামাজিক সমরূপতা। মনক যুক্তি দিচ্ছেন, বিশ্ব জুড়ে স্থিতিশীল উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে চোখে পড়ার মতো তুলনামূলক সমরূপ জনসংখ্যা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপে গণতন্ত্রের উত্থান ও বহুভাষিক অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্প্রাজ্যের মতো সাম্রাজ্যগুলোর ভাঙন ছিল ওতপ্রোতভাবে জাতীয়তাবাদের সাথে সম্পর্কিত।

মনক বলছেন, গত প্রজন্মে এবং বিশেষ করে গত বছর ১৫ সময়কালে ওই তিনটি ধারণাই মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়েছে। সামাজিক মিডিয়া যেকোনো ব্যক্তিকে সম্প্রচারকারীতে পরিণত করেছে, লোকজন যে খবর, তথ্য ও মতামত শুনতে চায়, তাদেরকে কেবল তা-ই শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে এটি চরমপন্থী ও প্রান্তিক আদর্শ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ সম্প্রসারিত করেছে। এক প্রজন্ম ধরে গড়পড়তা শ্রমিকের প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে রয়েছে, লোকজন আশঙ্কা করছে যে তাদের সন্তানের প্রজন্ম আর্থিকভাবে স্থবির হয়ে পড়বে। পরিশেষে বলা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে অভিবাসন বাড়তে থাকায় বিশেষভাবে যেসব এলাকায় দ্রুত বৈচিত্র্য বাড়ছে, সেসব স্থানে চরমপন্থা ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগ দ্রুত ছড়াচ্ছে।

মনকের মতে, এর পরিণতিতে উদার গণতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। আমরা ‘অনুদার গণতন্ত্রের’ উত্থান দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ সরকারগুলো জাতির ‘সত্যিকারের’ লোকজনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও ব্যক্তিগত অধিকার বা সাংবিধানিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করছে সামান্যই। অনেকে এসব আন্দোলনকে লোকরঞ্জক হিসেবে অভিহিত করছে। একইসাথে অন্যরা মনকের ভাষায় ‘অগণতান্ত্রিক উদারবাদের’ সাথে দহরম-মহরম করছে। এই ধরনের সরকারব্যবস্থায় অধিকার সংরক্ষিত থাকলেও তা হয় গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার মূল্যে। এটি অনেকটা এলিট টেকনোক্র্যাটদের পরিচালিত সরকারের মতো, সাধারণ মানুষের ওপর এদের আস্থা আছে সামান্যই।

আরো ঝামেলাপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুটি ব্যবস্থা একে অপরের শক্তি বাড়াচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের লেকচারার মনক এ নিয়ে খুব বেশি কথা না বললেও এই সময়ের জন্য এখানেই বিরাম নেওয়া ভালো। লোকরঞ্জকবাদীদের শক্তি সংগ্রহের সময়টিতে তাদের প্রতিপক্ষরা সম্ভবত অগণতান্ত্রিক উদারবাদের গুণাগুণ দেখছে। অগণতান্ত্রিক উদারবাদ শক্তিসঞ্চয় করলে অনেক সাধারণ মানুষের মনে খাচাবদ্ধ হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, সরকারি নীতি সাধারণ মানুষের দাবির প্রতি সাড়া দেয় না। ফলে তাদের মনে এলিটদের উৎখাত করার বাসনা জাগে। এমন অনিবার্য পরিস্থিতিতে যার পরাজয় অবধারিত হয়ে যায় তা হলো উদার গণতন্ত্র।

মনকের বইটির সবচেয়ে বড় একটি শক্তি হলো এই যে তিনি সহজ, একক ব্যাখ্যার ওপর অবস্থান করেছেন। এর ফলে সমাধান পাওয়া গেছে সহজেই। উদার গণতন্ত্রকে তার শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য মনক তিনটি নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম বণ্টন দূর করা ও প্রযুক্তিগত এবং বিশ্বায়ণের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা প্রশমিত করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডাই হবে সবচেয়ে বড় সমাধান। ন্যূনতম কার্যকর সমাধান- সম্ভবত এটিই সবচেয়ে কঠিন- হবে এমন এজেন্ডা তৈরি যা ‘নাগরিক বিশ্বাস,’ তথ্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা, নাগরিক সৌজন্যতাবিষয়ক আমাদের অনুভূতি ফিরিয়ে আনবে। এই বিষয়ে আরো নজর দেওয়া উচিত। কারণ যে প্রান্তিক সমাজে খুব কম লোকই বাস্তবতা অনুসরণ করে এবং যেখানে নাগরিক শক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে, সেখানে নীতিগত পরিবর্তন সাধন কিভাবে সম্ভব তা অস্পষ্ট।

অবশ্য সবচেয়ে আগ্রহ সৃষ্টিকারী পরামর্শ সম্ভবত নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদের কল্পনা করা। মনক একে অভিহিত করেছেন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ।’ প্রান্তিকতাপূর্ণ জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রতি সাড়া দেওয়ার বদলে স্বপ্নিল বহুজাতিকতার এগিয়ে যেতে হবে। মনক বলেছেন, আমাদের প্রয়োজন ‘পরিশীলিত জাতীয়তাবাদের’। তিনি সমন্বিত সমাজের একটি স্বপ্নদর্শনও প্রস্তাব করেছেন। এখানে জাতীয়তাবাদ লোকজনকে বিভক্ত না করে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

যারা গড্ডালিকা প্রবাহ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা পোষণ করে, তাদের কাজে এই এজেন্ডার তিনটি অংশই অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক সংস্কার সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী লোকজন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। নাগরিক বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার অর্থ হলে সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গোত্রবাদ ভেঙে ফেলা। অন্তর্ভুক্তমূলক জাতীয়তাবাদ ডান ও বাম উভয় ধরনের বাগাড়ম্বড়তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে আমরা এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পানিতে সাঁতার কাটছি, আর উদার গণতন্ত্র অবধারিত- এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছি না।