Home » সময়ের বিশ্লেষণ (page 3)

সময়ের বিশ্লেষণ

শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দেখছি না

গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ::

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে গত চার দশক ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে উন্নয়নের নামে। ’৬০-এর দিকে প্রথম উন্নয়ন দশকের মূল লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি (growth);; দ্বিতীয় দশকে লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমতা (growth with equity); তারপরের দশকে এলো বিকেন্দ্রীকরণ (decentralization); গণচেতনা (mass awareness) এগুলো; তারপর এখন উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন (participatory development), পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন উৎসাহে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মদদপুষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। বাংলাদেশও এই রকম কৌশলের বাইরে থাকেনি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম বিভিন্ন উন্নয়ন (sustainable  development), নারী উন্নয়ন এগুলো। এই সমস্ত কৌশলই এসেছে দাতা দেশসমূহের প্রচেষ্টার ফলেও গণদারিদ্র্য দূর হয়নি বরং অনেক দেশে বেড়েই চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য দারিদ্র্য একটি বিশাল সমস্যা। বস্তুত আপেক্ষিক দারিদ্র  ক্রমেই চরম আকার ধারণ করছে এবং এটা সামাজিক একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক স্থিতিশীলতাও সঙ্গীন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো ‘টার্গেট গ্রæপ’ ভিত্তিক প্রকল্প দারিদ্র্য কিছুটা লাঘব করলেও সার্বিকভাবে দারিদ্র্য তেমন কমেনি। বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ পল্লী অঞ্চলে। অতএব দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং পল্লী উন্নয়ন এই দুটির যোগসূত্র রয়েছে। তবে এটা লক্ষ্য করা যায় যে, ‘উন্নয়ন’ শব্দটির অস্পষ্ট ব্যবহারের ফলে অনেক সময় মূল সমস্যা দারিদ্র্য আড়ালে থেকে যায়।

উন্নয়নকে সুশাসন ও গণতন্ত্র থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উদাহরণ দেয়া হয়, গণতন্ত্র ছাড়াও বিশ্বের কিছু দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন টেকসই ও সমতাভিত্তিক নয়। সেখানে শুধু বস্তুনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ভোগবাদের প্রসার হয়েছে। মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতা এগুলোর প্রাধান্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ওই পথে চলুক, আমরা সেটি চাই না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলাদেশের জন্য আন্দোলনটা বহু আগে থেকে শুরু হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান। বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনের যে ভিত্তি ছিল, সেটা ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ এবং এখানকার লোকজনকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা থেকে মুক্ত করা। অর্থনীতি মুক্তি অর্জন করার জন্য দরকার ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। বিভিন্ন দোলাচল, অনিশ্চয়তা ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। আমাদের দেশে আসলে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নটা শুরু হয়েছে ১৯৯০ থেকে। প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার শুরু হলো এবং ১৯৯০-র পর ধারাবাহিকভাবে ভালোভাবেই অর্জনটা ছিল। তার পর আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, গার্মেন্ট এবং অন্যান্য সেক্টরে উত্তরোত্তর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এই কন্ট্রিবিউশনটা বিশেষ কোনো একটা সরকারের সময়ে হয়নি। ধারাবাহিকভাবে সব সরকারের সময় হয়েছে। তাই এখানে কৃতিত্ব কিন্তু সবার। একক কোনো সরকার এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে না। আবার ব্যর্থতার ব্যাপারেও এককভাবে কাউকে দোষ দিতে পারবে না।

এদিকে আমি যাচ্ছি না। আমি এখন আমাদের যে মূল চ্যালেঞ্জগুলো এবং সেখানে আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, রাজনৈতিক চিন্তাধারার কিছু কথা বলব। মানে রাজনৈতিক যে বিশ্লেষণ বা অর্থনীতির যে বিশ্লেষণ, সে বিষয়ে আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলব। প্রথমত, চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের অর্থনীতির দিক দিয়ে, যেগুলো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। প্রথম হলো আমরা যে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, সেটা এখন কিছুটা মন্থর, আবার বিনিয়োগও মন্থর হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দেখছি যে সরকারের যে নীতিগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা বা নীতিগুলো যে খুব সুষ্ঠু নীতি হয়েছে সেটাও নয়। আবার নীতিগুলো বাস্তবায়ন যারা করবে, আমলা এবং সরকারের যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে তাদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবহুল। সব শেষে সার্বিকভাবে যে উন্নয়নগুলো হয়েছে, বিশেষ করে সূচকের দিকটি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে গড় হিসেবে। কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা। যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল কিন্তু বহুলাংশে সাধারণ মানুষ পায় না। কারণ এখন আমরা দেখছি যে, দিন দিন কিন্তু ধনী-দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্তের ফারাক বাড়ছে; বঞ্চিতের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আপেক্ষিকভাবে কেউ বলতে পারে যে, আগে তো কেউ শার্ট পরত না, প্যান্ট পরতে পারত না, মোবাইল সবার কাছে আছে। সেটা হলো আপেক্ষিকভাবে। একজন রিকশাঅলার মোবাইল আছে, কিন্তু যে ৮ থেকে ১০ বছর আগে রিকশায় চড়তে পারত না, তারা এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাই ফারাকটা কী। একই ধরনের লোক একই কর্মদক্ষতা কিন্তু সে চলে যাচ্ছে কোথায়। বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে, এমনকি দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই এই অসম উন্নয়নটা অ্যাক্সেপ্টেবল নয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ব্যাপার। এ জন্য আমরা দেখছি যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা না থাকলেও অশ্চিয়তা আছে। কী হবে, না হবে। কী ধরনের সরকার হবে। আর এখন যে রাজনৈতিক অবস্থাটা আছে বা যে কোনো সময় রাজনৈতিক যে গভর্নমেন্ট আসে, সেখানে আমরা কিন্তু গুড গভর্নেন্স দেখতে পাচ্ছি না। সুশাসনের অভাব আছে। সুশাসনের অভাব মানে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই। কেউ যদি অন্যায় করে তার কোনো শাস্তি হয় না। সব থেকে মারাত্মক হলো রুল অব ল’ নেই। আইন আছে কিন্তু এটার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। রাজনীতির মেজর জিনিসটা যে খালি ভোট দিলে হয়ে গেল তা নয়। সুশাসন ছাড়া কিন্তু কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অনেকে বলে, কোনো কোনো দেশে তো মার্শাল ল’ ছিল। কোনো কোনো দেশে তো ডিক্টেটর ছিল। উন্নয়ন হয়েছে। গণতন্ত্র ছাড়া। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেখানে ১০ থেকে ২০ বছর পর দেখা গেছে, বেশিরভাগ লোকই দরিদ্র। তাই ওই পথে যাওয়া যাবে না। তার পর রেগুলেটরি বডি যেগুলো আছে, যেমন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। মানুষের বিবেচনায় তো কাজ করে না, যেভাবে গ্যাস-পেট্রলের দাম বাড়ে। বিটিআরসি নানারকমের নীতি দিচ্ছে। এগুলোর কোনো কনটিনিউটি থাকে না। সরকার চেঞ্জ হলে অন্য সরকার এসে পুরো সিস্টেমই পরিবর্তন করে দেয়। যদিও অনেক ভালো নীতি অনেক সময় নেয়। মোটামুটি যদি ধারাবাহিক থাকে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন ভারতেও কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক নীতিগুলো একেবারে চেঞ্জ হয়ে যায় না। মোদি এসে তো বলেননি যে, আমরা ইন্ডাস্ট্রি করব না। আমরা এক্সপোর্ট করব না। আমরা ম্যান পাওয়ার বাড়ব না। আমরা আইটি সেক্টরে কাজ করব না। তিনি বলছেন, আমি করব অন্যভাবে। লোকজন কিছু চেঞ্জ হবে। সেটা অন্য কথা। এটা আমেরিকায়ও করে। কিন্তু আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে এগুলো হয় না।

আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো একেবারেই হয়নি। লোকাল গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বলে কিছুই নেই। ঢাকা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ঢাকা থেকে করার ফলে যেটা হয়, আমাদের প্রত্যেকটি অঞ্চলের লোকজন কীভাবে বেঁচে থাকে, তাদের চাহিদা আমলে নেওয়া হয় না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ তাদের ভূমিকা নগণ্য। এখন আবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের বেতন দেবে তাদের আয় থেকে।

সরকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বেতন দিয়ে দিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। আর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের বেতন দেবেন না। এটা কোনো কথা হলো নাকি? ওদের কি ট্যাক্স পাওয়ার আছে? ওদের কি অথরিটি দেওয়া হয়েছে? গরিব মানুষদের ওপর আর কত ট্যাক্স চাপাবে? ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে, এক্সপোর্ট বাড়লে ট্যাক্স বাড়ে। ওদের কি এক্সপোর্টের ওপর ট্যাক্স ধার্য করার ক্ষমতা আছে? বা আয়ের ওপর ট্যাক্স বসানোর ক্ষমতা আছে? তাই সার্বিকভাবে আমি বলব, আমাদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, তা হলো গতানুগতিক। মার্কেট ইকোনমির ওপর, বাজারের ওপর ডিপেন্ড করে আমরা চলব এবং বাজার সবকিছু নির্দিষ্ট করবে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ঠিক করবে। সেভাবে যাবে। আর অর্থনীতিবিদরাও তখন চিন্তা-ভাবনা করছে যে, ঠিক আছে, বাজারের মধ্যে থেকেই আমরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বিবেচনা করব। তার মানে কিছু কিছু জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে একটু মলম দিলাম। কিন্তু পুরো শরীরে যখন নানা সিস্টেমেটিক ডিজিজ হয়। আমার যদি ইমিউন সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। আমার ব্লাড যদি দূষিত হয়। আমার নাকের মধ্যে ওষুধ দিলে, চোখের মধ্যে ওষুধ দিলে কী লাভ হবে। কোনো লাভ হবে না। এখন আমাদের তো হয়েছে সিস্টেমেটিক ডিজিজ। এক জায়গায় তো নয়। এটা সর্বগ্রাসী। পুরো সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই সিস্টেম মানে রাজনৈতিক সিস্টেম। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজারগুলো এবং লোকাল লেভেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো। স্কুলগুলো এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলোকেও প্রভাবিত করে পলিটিক্যাল মোটিভেশন।

ব্যাংকিং সেক্টর দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। বর্তমানে এ সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব নীতিমালা ও আইন-কানুন আছে, কোম্পানি আইন আছে, আন্তর্জাতিক নর্মস আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব নীতিমালা ও আইন আছে, তা আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এগুলো সঠিকভাবে পরিপালন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এর ফলে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট এবং নিচের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে কোথাও সুশাসন অনুসৃদ হচ্ছে না। সর্বত্রই মারাত্মক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এখন মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। পরিচালনা বোর্ড ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেবে। তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে সে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই শোনা যায় বা অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালনা বোর্ড ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে। এখন দেখা যায়, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই যেন বেশি উৎসাহী। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে তাদের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পরিচালনা বোর্ডের দ্বারা প্রায়ই নির্দেশিত হয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যে সবসময় দক্ষ হয়, তা নয়। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রæটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব নানা কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি দেখা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পরস্পর দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং এবং সুপারভিশনও খুব দুর্বল। যারা পরিচালনা বোর্ডে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ইন্টারেস্ট থাকে। তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন। নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদান বা চাকরি প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমনটি ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যারা নিয়োগ লাভ করেন, তাদের নিযুক্তি অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের ওপর। কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং পারফরম্যান্সের ওপর তার টিকে থাকা-না থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে, তার পক্ষে এমডি হিসেবে টিকে থাকায় কোনো সমস্যা হয় না। এজন্য দেখবেন কোনো কোনো ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত উচ্চ। এদের বেতন-ভাতা অনেক বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা পরিচালকদের কথাবার্তা শোনেন; তাদের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করেন। এতে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হলো কিনা, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিচালনা বোর্ড তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করতে চায়। পরিচালনা বোর্ডে অনেকেই থাকেন, যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি ব্যাংকের কাজে ব্যবহার করতে চান তাহলেই সমস্যা দেখা দেয়। ব্যবস্থাপনার মধ্যেও আবার অনেক লোক আছেন, যারা দক্ষ নন বা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি অদক্ষ বা দুর্বল হন, তাহলে তার প্রভাব সর্বত্রই পড়ে। এতে নিচের দিকের কর্মীরা নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অনিয়ম উপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই টপ ম্যানেজমেন্ট যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত করেন, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়বেই। কিন্তু আমাদের এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও সমস্যা রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে।

এখন আমাদের সময় এসেছে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার। সরকার গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, গতিশীলতা এনে সুষম ও টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে, এটাই এখন বিশেষ প্রয়োজন। সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ করপোরেশন সার্বিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। কিছু কিছু জায়গায় পাবলিক সেক্টরগুলো, করপোরেশনগুলোর মূল্য আছে। যেমন আমি উদাহরণ দিই বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ খাতে যখন আমাদের ক্রাইসিস হলো, তখন ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জের মতো একটা ৫০০, ৬০০ মেগাওয়াটা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করা যেত সরকারি উদ্যোগে এবং নিয়ন্ত্রণে। এটা করলে ইন্ডিভিজুয়াল কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট- যেটা দেখেছি বেসরকারি খাতে সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল কম হতো, জনগণ স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ পেত এবং সরকারি খাত থেকে ভর্তুকির খরচ কমে যেত। পাওয়ার সেক্টরে পাবলিক সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট থাকা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই থাকে। ইনডিপেন্ডেন্ট কিছু কিছু ছোট জায়গায় যেখানে গভর্নমেন্ট একেবারে পৌঁছাতে পারবে না, সেখানে পাওয়ার প্ল্যান্ট কিছু হতে পারে। তবে একেবারে ঢালাওভাবে সব প্রাইভেট সেক্টর করবে না।

মার্কেটিংয়ের বেলায় অ্যাগ্রিকালচার মার্কেটিংয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিন্তু মার্কেট একেবারে ছেড়ে দেওয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কমলা উৎপাদন করে। বিরাট একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ওরা ওটার কন্ট্রোলে থাকে উৎপাদকের স্বার্থ দেখার জন্য। এটা বাজারের হাতে ছেড়ে দেয় না। তার পর কানাডায় হুইট (গম) বোর্ড আছে। কানাডার ফার্মাররা যে গম উৎপাদন করে, তাদের স্বার্থে এটা কাজ করে এবং ভোক্তাদের স্বার্থও দেখে। আর এখানে কৃষকদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে ফটকাবাজ বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারীদের হাতে। গভর্নমেন্টের তো এখানে কতগুলো রুলস, কতগুলো ফ্যাসিলিটিস থাকবে। এখানে কিন্তু পাবলিক সেক্টর রুল আছে। এখানে পাবলিক সেক্টরের প্রয়োজন। অনেকে বলে, রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক সব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর পক্ষপাতী নই। বরং রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যদি সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসে, তবে প্রতিযোগিতামূলক আবহ সৃষ্টি হবে ব্যাংকিং খাতে। আসলে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী যদি একেবারে নাই থাকে, তখন দেখা যাবে কী অবস্থা। অন্যরা ইচ্ছামতো কাজ করবে। অতএব রাষ্ট্রয়ত্ত সব ব্যাংক ছেড়ে দিলে কিন্তু চলবে না। একটা, দুইটা, তিনটা কিন্তু রাখতে হবে। যেমন সোনালী ব্যাংক প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের বেতন দেয়। এখন প্রাইভেট ব্যাংকে দিলে কী করবে। টিচারদের বেতনও হয়তো পৌঁছাবে না সময়মতো। সরকারের টাকাটা নিয়ে রেখে দেবে। আরেকজনকে ধার দেবে। তার পর সরকার ট্রেজারি ফি জমা দিল কিন্তু এক মাস, দুই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকাটা পাঠালই না। তবে অবশ্য কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও স্বচ্ছ এবং জোরদার করা। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে এগুলোকে মুক্ত করতে হবে।

কয়েক বছর আগে ফরাসি অর্থনীতিবিদ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তার নাম জ্যাঁ তি হল। তার মূল বিষয়বস্তু হলো, কী করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মার্কেটকে লোকজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না। তবে নিয়ন্ত্রণ খুব সোজা কাজ নয়। আদেশ-নির্দেশে কাজ হবে না। মেকানিজম তৈরি করতে হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। কেউ যদি এটা না মানে তাহলে তার তখন কী পরিণতি হবে। ফাইন হবে। ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন এখনো এটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই সেই চিন্তাটা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমাদের অর্থনীতিবিদরাও সে চিন্তা করছেন। জ্যাঁ তি হল অন্য লেখকের সঙ্গে আর একটি বই লিখেছেন। ‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস’। ব্যাংকগুলো যা ইচ্ছা তাই করবে, লোকজনকে বিপদে ফেলে আমানত নিয়ে ইনভেস্ট করবে। এটার রেগুলেট করা। কেয়ারফুললি করতে হবে। রেগুলেটকারীরা নিয়ন্ত্রণকারী যেন না হয়। বিশেষ করে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল। যথাযথভাবে এটাকে দেখতে হবে।

গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে ফুড সিকিউরিটি। গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে সুশাসন। তার  মধ্যে সবাই থাকবে। প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করবে। একটা কথা আছে, বাংলাদেশে এখন সুশাসনের অভাব। ইনভেস্টমেন্টের আবহ নেই। পরিবেশ নেই। অবকাঠামোর বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রবলেম আছে। আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছি না। যত তাড়াতাড়ি আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম, সেটা পারছি না। একেবারেই যে স্থির হয়ে আছি সেটা নয়। রানওয়েতে কিছুক্ষণ চলার পর প্লেন টেক অফ করে। আমরা কিন্তু টেক অফ স্টেজে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, আসলে এখনো আমরা রানওয়েতেই আছি। তার মানে চলার গতি কম ও রানওয়েটা দীর্ঘ হচ্ছে। এখনো আমরা টেক অফ করে ওপরে উঠতে পারছি না। টেক অফ হলে আলটিমেটলি গ্রোথ রেটে আমরা ছয়, সাত, আট করে ওপরে উঠে যেতাম। সেটা হলে আমাদের দ্রুত একটা উন্নতি দেখতে পারতাম।

রাজনীতির চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগণের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটোই পাশাপাশি চলতে হবে। আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন, আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন- তাহলে কিন্তু স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমাদের অঙ্গীকার হবে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এতে দিনে দিনে কেবল সমস্যার পাহাড় জমছে, কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয়, আইনের শাসন আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলা যায়। সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকগুলোর অর্জন ভালো। আমরা প্রবৃদ্ধির ৬-এর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে গেছি। এটি ইতিবাচক। সার্বিক উন্নতি সন্তোষজনক। এ জন্য বাংলাদেশ একটা মডেল। দুর্বল দিকটা হল, অর্জনের এ ফলগুলো সমাজের নিচের স্তরে অপেক্ষাকৃত খুব কম পৌঁছেছে। ধরুন ধনাঢ্য শ্রেণী, যারা আগে একটা গাড়িতে চড়ত, তারা এখন একাধিক গাড়িতে চড়ছে। গরিব লোক আগে স্যান্ডেল পরত না, তারা স্যান্ডেল পরছে এবং কিছু মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এর বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। যেটা ভালো নিদর্শন নয়। উন্নয়নটা সমতাভিত্তিক হচ্ছে না। সমতাভিত্তিক উন্নয়ন না হলে তা টেকসই হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি এ দুটিই চেয়েছিলাম। সেটি পূরণ হচ্ছে কি? এখন আমরা শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সুষম বণ্টন দেখছি না।

(লেখক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বর্তমানে  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ।)

 

বিশ্বজুড়ে চাপের মুখে গণতন্ত্র : বাড়ছে বৈষম্য দমনপীড়ন, কমছে স্বাধীনতা

আসিফ হাসান ::

ক্ষমতার জন্য স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন ও লোকরঞ্জক ক্ষুধার প্রয়োগ অর্থাৎ দমনপীড়ন আরো কঠোর করার জন্য স্বৈরশাসকেরা সব হাতিয়ারই ব্যবহার করছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকারও ক্রমবর্ধমান হারে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আর সামাজিক বিভাজন অনেক অনেক আগে যতটুকু ছিল, তার চেয়েও গভীর হয়েছে। জার্মানভিত্তিক গবেষনা সংস্থা  বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’ এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ এবং কোন কোন দেশ বিশেষভাবে এসবে আক্রান্ত, তা-ই তুলে ধরেছে।

গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি ও শাসনকাজের মান গত ১২ বছরে বৈশ্বিক গড়ে সর্বনিম্ন স্থানে নেমে গেছে। জার্মানীর গবেষনা সংস্থা বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের (বিটিআই) ‘দি কারেন্ট ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স’-এর প্রধান তথ্য হিসেবে এটিই ওঠে এসেছে। ২০০৬ সাল থেকে সংস্থাটি  ১২৯টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তাদের সিদ্ধান্ত হলো : অধিকতর উন্নত গণতান্ত্রিক কয়েকটি দেশসহ ৪০টি সরকার গত দুই বছরে আইনের শাসন খর্ব করেছে, ৫০টি দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ দেখা গেছে। অনেক দেশের শাসকই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি অথর্বতার পরিচয় দিয়ে গরিব ও প্রান্তিক লোকজনের ওপরই পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছে। অনেক সরকার ক্রমবর্ধমান সামাজিক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতে যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারেনি কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি এসব উত্তেজনায় ইন্ধনও দিয়েছে।

বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এই তালিকায় থাকা অনেক সরকারের নিম্নমানের বা বাজে দক্ষতার প্রধান কারণ হলো- তারা সংলাপ ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক সংঘাতে সাড়া দিতে আগ্রহী নয় কিংবা সক্ষম নয়। সূচক অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ৫৮টি দেশের চেপে থাকা সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। নির্বাচিত হওয়ামাত্র অনেক শাসকই নিজেদের রাজনেতিক ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করেছে। এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক লোকরঞ্জকদের মধ্যে রয়েছে হাঙ্গেরি ও তুরস্ক। অথচ এসব দেশের সরকার তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল। বার্টেলসম্যান স্টেফটাঙের আর্ট ডি গস গবেষণার তথ্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, অনেক শাসকই দমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে নেতৃত্বে তাদের অবস্থান পোক্ত করেছে। অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদে কঠোর হাতে শাসনকাজ চালানো ও সংলাপে না বসার পরিণতি হয় খারাপ।’

বাড়ছে বৈষম্য, কমছে স্বাধীনতা :

গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের দিকে উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা হলো অসন্তোষজনক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭২টি উন্নয়নশীল ও রূপান্তরশীল দেশে ব্যাপক দারিদ্র্য ও উচ্চ মাত্রার সামাজিক বৈষম্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২টি দেশে- এদের মধ্যে রয়েছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভেনেজুয়েলা- আর এইসব দেশগুলোর গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাত্রার অবনতি ঘটেছে। একই মেয়াদে দেশগুলোর মাঝারি থেকে ভালো মানের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশে নেমে গেছে।

আগের চেয়ে অনেক বেশি লোক কেবল কম বৈষম্যের মধ্যেই দিন গুজরান করছে না, তারা আরো বেশি দমনমূলক পরিবেশেও বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান সময়ে ৩শ ৩০ কোটি লোক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে রয়েছে (৪শ ২০ কোাটি  লোক রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনে)। সমীক্ষা শুরুর পর থেকে এত বেশি লোক কোনোকালেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে থাকতে দেখা যায়নি। যে ১২৯টি দেশে সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে বিটিআই ৫৮টিকে স্বৈরতান্ত্রিক  এবং ৭১টিকে গণতান্ত্রিক  হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই – এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যার বিষয় হলো নাগরিক অধিকার খর্ব ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পর্যন্ত আইনের শাসনের অবনতির বিষয়টি। ব্রাজিল, পোল্যান্ড ও তুরস্কের মতো সাবেক গণতান্ত্রিক বাতিঘর বিবেচিত দেশগুলোই এখন রূপান্তরশীল সূচকে পড়েছে সবচেয়ে বেশি করে।

আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে কেবল বারকিনা ফাসো ও শ্রীলঙ্কাই গণতন্ত্রের পথে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হাসিল করেছে। বিপরীতে মোজাম্বিক, তুরস্ক ও ইয়েমেনসহ মোট ১৩টি দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। এসব দেশের পাঁচটি এখন আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদÐও পূরণ করতে পারছে না। এই পাঁচটি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা। স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর অধীনে বছরের পর বছর ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারসাম্য বজায় রাখার যে ব্যবস্থা নির্বাচন, সেটির মানে ঘাটতির কারণেই অনেক ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে।

স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে গণতান্ত্রিক শাসন অনেক ভালো :

এসব ঘটনা অনেক দেশের নাগরিকের জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ দুর্নীতি, সামাজিক বর্জন ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা স্বৈরতান্ত্রিক সময়ে অনেক বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। বিটিআইয়ের মতে, ১২টি গণতান্ত্রিক দেশ সফলভাবে দুর্নীতি দমন করতে সক্ষম হয়েছে, আর স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে পেরেছে মাত্র একটি। মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ সমান সুযোগ যথাযথভাবে অর্জন করতে পেরেছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে এই সফলতা পেয়েছে ১১টি। ২৭টি গণতান্ত্রিক ও মাত্র দুটি স্বৈরতান্ত্রিক দেশ বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা ভালোভাবে সক্রিয় রাখতে পেরেছে। বিটিআই সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে গণতন্ত্রবিরোধী ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই অধিকতর স্থিতিশীল ও কার্যকরব্যবস্থা নয়।

অবশ্য চীনের ক্ষেত্রে সত্যি যে – গত ১০ বছরেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশটি সবচেয়ে বিকশিত হয়েছে – অনেকের ধারণা স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান উদাহরণ। অবশ্য যারা চীনের অর্থনৈতিক সফলতার অবদান এর রাজনৈতিকব্যবস্থার ওপর আরোপ করতে চান, তারা সার্বিকভাবে স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর বাজে অর্থনৈতিক ফলাফলের বিষয়টি বুঝতে অক্ষম। রাশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভেনেজুয়েলার মতো অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিকব্যবস্থায় বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্সের’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক – উভয়টির বিকাশই বছরের পর বছর স্থবির হয়ে আছে।

(প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল ২২ মার্চ, ২০১৮)

দলবাজ সাংবাদিকদের কর্মকান্ডে সাংবাদিক পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে

আমীর খসরু ::

প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের তত্ত্বীয় ধারণার উদ্ভাবক দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিল জীবনভর প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের জয়গান গাইলেও, তিনি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্ধিহান ছিলেন যে, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থাও শেষ পর্যন্ত কতিপয়ের শাসনে পরিণত হয় কি না। গণতন্ত্র ও নির্বাচনের মধ্যে সংযোগ সম্পর্কে নানাজন নানাকথা বহুবার বলেছেন; এ কারণে এ বিষয়টি নিয়ে অযথা সময় নষ্ট না করলেও, দু’একটি কথা বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ যে সব দেশে গণতন্ত্রের চরম ঘাটতি বহুকাল ধরে আছে, সেসব দেশের মানুষের মনোজগতে শাসকদের পক্ষ থেকে সুকৌশলে এ ধারনাটি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, কোন মতে, যেনতেন পন্থায় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের নামই হচ্ছে গণতন্ত্র। কিন্তু বাস্তব বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের রাস্তায় ওঠার প্রথম ধাপ মাত্র, কোনক্রমেই একমাত্র ধাপ নয়। গণতন্ত্র চর্চার মুশকিলটি হচ্ছে এখানেই যে, বিদ্যমান শাসক শ্রেণীর মনোজগতে আসলে গণতন্ত্র নেই; কাজেই বাস্তবে রাষ্ট্রে ও সমাজে গণতন্ত্র চর্চা হবে- এটা সম্ভব নয়, সংগত কারণেই।

গণতন্ত্র যখন একেবারে তলানিতে বা পাল্লার নেতিবাচক দিকে যায়, ঝুলটা যখন বিপরীত হয়, তখন নির্বাচন নামক কর্মকান্ডেরও রকমফের দেখা দেয়। একথাটি বলতেই হবে যে, এ দেশে কখনোই সহি বা সঠিক নির্বাচন হয়েছে তা হলফ করে কেউ বলতে পারবেন না। দেশের ইতিহাসের প্রথম অর্থাৎ ১৯৭৩’র নির্বাচন অনুষ্ঠানের কৌশলের সাথে এর বছর ছয়েক পরের হ্যাঁ না ভোটের কৌশলকে যেমন মেলানো যাবে না- তেমনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকেও নয়।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের বিষয়টি যদি গণতন্ত্রের অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, স্থানীয় সরকারও এখন আর নির্বাচনের নামে ইতোমধ্যে যেসব রাজনৈতিক বিকৃতি ও বৈকল্য ঘটে গেছে তা থেকে কোনক্রমেই বাইরে নয়। এ কারণে ‘সর্বগ্রাসী ক্ষুধা’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেও বহুকাল ধরে রেহাই দিচ্ছে না। এসব নির্বাচনকে গ্রাস করার নানা ধরন-ধারন পাল্টাচ্ছে। যেকারণে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে অন্য সব নির্বাচনের সাথে মেলানো যাবে না। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দাবী করছেন, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন তাদের দল আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। বাস্তবে কি তাই? আসলে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ও প্রশাসনে যারা ছিলেন তারা। আর বিপর্যয় হয়েছে নির্বাচন কমিশনের। জনগণ বরাবরের মতো নিরব সাক্ষী হয়েছিলেন।

আর আরেকদফা সিমাহীন একটি ক্ষতি হয়ে গেছে সাংবাদিকদের ও  গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতায়। সাংবাদিকদের সম্পর্কে জনমনে ধারণা গত কিছুকাল ধরে এমনিতেই ভালো নয়। একাংশ, অন্য অংশ বলে যে বিভাজন আগেই হয়ে রয়েছে তা আরো বিকট-প্রকট হয়েছে; পাল্লা দিয়ে তারা এখন দলীয় লেজুরবৃত্তিতে মগ্ন রয়েছে। আর এতে যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে, তা কখনই সামাল দেয়া সম্ভব নয়, এ এক অপূরণীয় অনিবার্য বিপদ, কিছু সংখ্যক ‘আপদে’র কারণে। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অথবা গাজীপুরে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তথাকথিত সাংবাদিক নেতারা বক্তৃতাবাজি করে, মিছিল করে, দলীয় প্রার্থীর জন্য ভোট ভিক্ষা চায়- নিজ পেশার বদলে দলবাজিকে প্রাধান্য দেয়; যেসব সাংবাদিক সামান্য অর্থের কাছে নতজানু হয়, অতিসামান্য চাপেই মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়ে- তখন আর সবাই যা বলে বলুক, দলবাজ কথিত এইসব সাংবাদিকদের এই কর্মকান্ডে সাংবাদিক পরিচয় দিতে আমার অন্তত লজ্জা লাগে, ঘৃনাবোধ করি।

কাজেই খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল কি হয়েছে- তা নিয়ে আমার মতো অনেকেরই আসলে উদ্বিগ্ন নন। আমরা সবাই উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, ইহজনমে হয়তো আর মন্দের ভালো একটি নির্বাচনও আর দেখে যেতে পারবো না।

নির্বাচন-পূর্ব অর্থ পাচার : সহজেই ৩টি পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) গত মে মাসে ‘ইল্লিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৫-১৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অর্থ পাচারের  যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে। এবারের প্রতিবেদনে রয়েছে ২০০৫-২০১৪ সাল সময় পর্যন্ত তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থ পাচারে ভারতের পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার (প্রায় ৭২,৮৭২ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে ২০১৪ সালে- যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও পানিসম্পদ খাতের মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান। এছাড়া, ২০০৫-২০১৪ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ৭৫৮৫ কোটি ডলার বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে (৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার)- যা ছিল সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের বছর পর্যন্ত। অর্থ পাচারে দেশগুলোর তালিকায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯টি দেশের মধ্যে ছিল ২৬তম। আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপনসহ নানা পদ্ধতির মাধ্যমেই এই অর্থের বড় অংশ পাচার করা হয়েছে। অথচ কেবল অর্থ পাচার ঠেকাতে পারলেই মূসক খাতের আয় নিয়ে আদৌ কোনো দুশ্চিন্তা করতে হতো না এনবিআরকে। পাচার হওয়া এ অর্থ দিয়েই বাংলাদেশে ৩টি পদ্মা সেতু তৈরি করা সম্ভব হতো। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৬-তে দেখা যায়; ২০১৫ সালে সেদেশে বাংলাদেশীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা বেড়েছে ১৯ শতাংশ। বর্তমানে যেখানে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর আগেই বলা হয়েছে যে, মে মাসের শুরুতে ওয়াশিংটন ভিত্তিক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয় ১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

আমাদের দেশটি বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে;নানা স্বপ্নও দেখানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মতে, অচিরেই দেশটি মধ্যম আয়ের দেশের বলয়ে ঢুকে যাবে। ফলে অর্থপাচারের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের আমলে না নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এর আগেও অনেকবার বিষয়টি সামনে এসেছে, কিন্তু সরকার তথা সংশ্লিষ্টরা অর্থপাচার রোধে খুব যে একটা তৎপরতা দেখিয়েছে, তেমনটি মনে করা যায় না। এর প্রমাণ তো প্রতিবেদনের বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্য অর্থপাচারের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও, সংশ্লিষ্টদের রয়েছে অনিবার্য নির্লিপ্ততা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠা অমূলক নয় যে, দেশ থেকে অর্থপাচারের মতো ভয়াবহ ঘটনা আদৌ রোধ করা যাবে কি না?

প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে এবং রফতানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে আমদানি রফতানি করছেন। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিষয়টি যেহেতু বারবার আলোচনায় উঠে আসছে, তাহলে তা প্রতিরোধে কেন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা। পণ্যের আমদানি-রফতানির জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলই ব্যবহার করতে হয়। অর্থপাচারের এই দায় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা অস্বীকার করতে পারে না।

অন্যদিকে, ‘সেকেন্ড হোম’ এর কথাটিও বহুল আলোচিত। এমনও দৃষ্টান্ত রয়েছে, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী মোটা অংকের বিনিয়োগ করে শিল্পপতিরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে নিচ্ছেন। বাংলাদেশীদের মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের সুবিধা নেওয়া, কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি, বেশকিছু ব্যবসায়ীর সিঙ্গাপুর, হংকং-এ অফিস বানানোর তথ্য সত্য বলেই এখন ধরে নেয়া যায়।

২০১৫ সালে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশিদের জন্য সরকারের ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পে বাংলাদেশ ৩য় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ; যেখানে ৩ সহস্রাধিক বাংলাদেশি প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নগদ ৫ লাখ রিঙ্গিত (১ কোটি ২৫ লাখ টাকা) দেশটিতে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত যে কোন দেশে নাগরিকদের বিদেশে টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে, যেখানে গত ১০ বছরে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে কোনো অনুমোদন দেয়নি। এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মালয়েশিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করা হয়েছে।  এছাড়াও যেসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত রয়েছে, সেই সব দেশের আবাসিক ভবন, জমি ক্রয়, হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। এদের মধ্যে অনেকে অফশোর ব্যাংকিং, বিদেশী কনসালটেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন।

বিশ্বজুড়ে আলোড়নকারী টাকা পাচারের কেলেঙ্কারি ফাঁস করা ‘পানামা পেপার্স’ এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২৭টি ব্যাংক হিসাবের কথা প্রকাশিত হয়েছে।

গত ১০ বছরের অর্থপাচারের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব বছর দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেশি ছিল, সেসব বছরে অর্থপাচার বেড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তার সময় ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আগের ৯ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে। ওই বছরটিতে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর আগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অনেক বেড়ে যায়। বছরটিতে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর আগের অন্যান্য বছরের মধ্যে ২০০৪ সালে ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪১০ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ থেকে দিন দিন অর্থপাচারের পরিমাণ বেড়ে চলেছে।

এটাও জানা যায়, দেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হলেও এর বিপরীতে মামলা হচ্ছে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকার, যা মোট পাচারকৃত অর্থের ৩ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৭ শতাংশ বা ৪৩ হাজার কোটি টাকার কোনো রেকর্ড থাকছে না। এ অর্থ হিসাবের মধ্যে আসছে না। পাচার হওয়া অর্থের একটা বড় অংশ জমা আছে সুইস ব্যাংকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে যখন বাংলাদেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ ঘটছে না, তখনো পাচার হচ্ছে অর্থ। অথচ এই অর্থ যদি পাচার না হয়ে বিনিয়োগে আসত তাহলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতো, উৎপাদন ও রফতানি বাড়তো, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। সব মিলে অর্থনীতি ও উন্নয়নে বড় রকমের অগ্রগতি হতো।

সাধারণত দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে অর্জিত অর্থসহ অবৈধভাবে প্রাপ্ত অর্থ পাচার হয়ে যায়। এটা ঠিক, দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের নিরাপত্তার অভাব আছে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশেরও অভাব আছে। অর্থপাচার হওয়ার এ দু’টিই বড় কারণ। এর আগে অপ্রদর্শিত অর্থ বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও খুব বেশি সাড়া পাওয়া যায়নি। দুদক ও বিভিন্ন সংস্থার ভয়ে অনেকেই অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহ ও উৎসাহ দেখাননি। দুর্নীতি বা অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন কোনো দেশেই সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও দেখা গেছে অনেক দেশ এ অর্থ অবাধে ও বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে এবং তাতে ওইসব দেশ লাভবান হয়েছে।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) পরিচালিত ২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যিক লেনদেনের গড়ে ১০ শতাংশের বেশি অর্থ পাচার হয়। ২০১৪ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ৪০-৮০ শতাংশ কালোটাকা। জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) এর তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। পাচারকৃত এ অর্থ দেশের মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এর দুই-তৃতীয়াংশ।

কেনো উন্নয়ন, কাদের জন্য উন্নয়ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

অর্থনীতিবিদরা বলেন, উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি। অর্থাৎ উন্নয়ন তাকেই বলা হয়- যা মানুষের কাজের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। যেমন পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সংযুক্ত জনপদগুলোর জনগণের কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে । যদি এ সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকে, তবে মানুষের কোনো সক্ষমতা বাড়বে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন আমলে সড়কবিহীন শত শত সেতু গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো শুধু অর্থ লোপাটের প্রতিমূর্তি। বিদ্যুৎবিহীন শত শত খাম্বার কথা ভাবুন। এসব তথাকথিত উন্নয়ন কার্যক্রম মানুষের কাজের ক্ষমতা এক বিন্দুও বাড়ায়নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাহত করেছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হতে হবে সঠিক জায়গায় ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী। অমর্ত্য সেন ভারতবর্ষ ও বাংলাকে দিক নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রগতি ও সর্বত্র সুষম উন্নয়নের জন্য মানবিক উন্নয়নই এ সময়ের অর্থনৈতিক প্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিক উন্নয়ন বলতে মানবসম্পদ, শিক্ষা, চিকিৎসা, পারিবারিক সক্ষমতা অর্জনকে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। আর নাগরিকের এ  মৌল অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হলে রাষ্ট্র ও সরকারকেই এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতবর্ষ ও বাংলায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের মূলে রয়েছে দরিদ্র মানুষের মৌল অধিকার রক্ষায় সরকারের অপর্যাপ্ত ও লক্ষ্যভ্রষ্ট নীতি সহায়তা ও মন্থর উন্নয়ন কার্যক্রম। একইভাবে চতুর ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর ঠগবাজি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবসার উত্থান এবং তা মানবিক উন্নয়নে ব্যবহার না হওয়া। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো মৌল কার্যক্রমগুলো অতিমাত্রার বাণিজ্যিক হয়ে পড়ায় তা সর্বসাধারণের কাছে দুর্লভ ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। অমর্ত্য সেন অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে মানবিক প্রগতির যোগসূত্র রয়েছে এমনটি স্বীকার করে নিয়েও জোড়ালোভাবে বলেছেন, বেসরকারি খাত দিয়ে কখনও মানবিক উন্নয়ন করা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলস্রোতে বেসরকারি খাত মুখ্য ভূমিকা রাখলেও মানবিক প্রগতির বিষয়টি কার্যত বেসরকারিখাতের নজরে অবহেলিতই থেকে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দরিদ্র মানুষের এসব অভাব পূরণে রাষ্ট্র কিংবা সরকার যদি তা উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা না রাখে কিংবা রাখলেও সেটি অপর্যাপ্তই থেকে যায়- তাহলে সমাজে বৈষম্য তৈরি করে।

অমর্ত্য সেন বলেন, বাণিজ্য বাড়লে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। অর্থনৈতিক উন্নতি হলে বেসরকারি খাত সম্প্রসারিত হয়। বেসরকারি খাত বড় হলে মানুষের আয় বাড়ে। এতে ওইসব মানুষের দারিদ্র্য দূর হয়। যখন মানুষে সম্পদ পায় তখন সে উৎসাহিত হয়। এতে তার বিনিয়োগ প্রবণতাও বাড়ে। এর দ্বারা সরকারের রাজস্বও বাড়ে। এভাবেই অর্থনৈতিক প্রগতি ঘটে থাকে। অমর্ত্য সেন বলেন, মানবিক উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর না থাকলে বাণিজ্যিক শিক্ষা, চিকিৎসা দিয়ে গণমানুষের চাহিদা পূরণ হয় না। এ ধরনের ব্যবস্থায় ধনীরা সেবা পেলেও, বঞ্চিত হয় গরিব মানুষ। কারণ বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এসব সেবার মূল্য বাড়ে এবং সেটি সাধারণের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার যতই মনোযোগী হোক না কেন, তা একটা সময় স্থির হয়ে যেতে পারে। মানবিক উন্নয়নের খাতগুলোতে উন্নয়নের দৃষ্টি রাখতে হবে। আর সেটি সরকারকেই করতে হবে। বিশেষ করে দেশের সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং নারী উন্নয়নসহ মানব উন্নয়নের সর্বদিক নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

ব্যক্তি, দেশ ও সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। সবার স্বপ্ন এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সবাই সমান অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। কেউ কেউ পিছিয়েও যায়। কে কি পরিমাণ আগোতে পারছে বা আদৌ পারছে কিনা, না পারলে কেন, এসব জানার দরকার পড়ে। দেশের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পদ্ধতি চালু হয়েছে। জাতীয় আয় বা জিডিপি মেপে কোনো দেশের অগ্রগতি বোঝার প্রচলিত পদ্ধতির ত্রু টি অনেক আগেই চোখে পড়ছে। চেষ্টা চলছে আরো ভালো পদ্ধতি বের করার যাতে একটি দেশের অগ্রগতি সঠিকভাবে বোঝা যায়। এ রকম প্রত্যেক চেষ্টার মূলে রয়েছে মানুষ অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও সুখ।

অমর্ত্য সেন বলেছেন- জনসাধারণের সক্ষমতার নামই উন্নয়ন। তিনি মনে করেন, ‘মানুষের, সক্ষমতা নির্ভর করে, তার সত্বাধিকারের ওপর, অর্থাৎ কি পরিমাণ দ্রব্য এবং সেবা সামগ্রীতে সে তার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তার ওপর। মাথাপিছু কতটা খাদ্য পাওয়া যাবে অথবা মাথাপিছু মোট জাতীয় উৎপাদন কতটা এ ধরনের সাদামাটা নির্দেশকসমূহের ওপর যদি নির্ভর করা হয়, তাহলে অনাহার, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার সামগ্রিক চেহারাটা উপলব্ধির পথে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। স্বত্বাধিকার নির্ধারণ ব্যবস্থা, সেই ব্যবস্থায় বিভিন্ন বৃত্তিভোগী কর্মগোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের অবস্থা, এ সবের সতর্ক বিশ্লেষণ আবশ্যক। তার মতে, উন্নয়ন আসলে মানুষের স্বাধীনতার চৌহদ্দি বাড়ানোর প্রক্রিয়া। মানুষ তার নিজের চাওয়া-পাওয়া কতদূল মেটাতে পারছে সে প্রশ্নটি উন্নয়নের সংজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নের কথিত জোয়ারে, সবকিছু দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী সমস্যাগুলির সঙ্গে যোগ দিচ্ছে নিত্য নতুন কৃত্রিম সমস্যা। উন্নয়নের নানা তত্ত্বে দেশ ভাসছে, চারিদিকে হৈ হৈ রই রই। অথচ প্রতিদিনই কমছে মানুষের স্বস্তি বোধ। সামাজিক সমস্যার রাষ্ট্রীয়করন এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করছে। ‘মাইন্ডসেট’ পরিবর্তনের হাজার এন্তেজাম তথাকথিত উন্নয়নের লক্ষ্য। কিন্তু যাদের উন্নয়নের জন্য এই যজ্ঞ তাদের অকথিত কথা কেউ শোনে না। উন্নয়ন সূচকের উর্ধগতি তত্ত্বেও দিনে দিনে গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নাগরিক ভোগান্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত কয়েকটি সূচক হচ্ছে জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কল্যাণ। কোন দেশের জাতীয় আয় বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যে কারণে মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করা হয়। সে হিসেবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপেক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার অধিক হলেই তাকে উন্নয়ন বলা যায়। জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রকৃত মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি মানব উন্নয়ন সূচক। মানব উন্নয়ন সূচকে মানুষের শিক্ষা, আয়ুষ্কাল, ক্রয় ক্ষমতা প্রভৃতি বিবেচনা করা হয়। তবে এই সূচকে জাতীয়ভাবে তথ্য নেওয়া হয়। কিন্তু ধনী-গরীব বৈষম্য, আঞ্চলিক বা গ্রাম ও শহরের বৈষম্য আমলে নেওয়া হয় না। ফলে এই সূচকে গণমানুষের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় না।

নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশের নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটেছে, এটি আমাদের জন্য একটি সুখবর অবশ্যই, যদি সত্য হয়ে থাকে। জনগণের গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এতে সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা নানা স্বপ্নের জাল বুনতে পারি। তবে মনে রাখতে হবে, সেই স্বপ্ন পূরণে জাতীয় আয় বৃদ্ধি বা অর্থনীতির উচ্চ সূচকই যথেষ্ট নয়। দেখা দরকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এর সুফল কতটা পাচ্ছে। জাতিসংঘের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মাত্র ১ শতাংশ মানুষ পৃথিবীর শতকরা ৪০ ভাগ সম্পদের অধিকারী। আর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ শতাংশ বিত্ত-বৈভব ভোগ করছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ সম্পদ। এই যে ভয়াবহ বৈষম্য- এই জরিপে বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থারও প্রতিফলন রয়েছে। এদেশে আয়-বৈষম্য, সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য, বিভিন্ন সেবাপ্রাপ্তিতে বৈষম্য এত প্রকট যে তা সাদা চোখেই দেখা যায়, গবেষণার দরকার হয় না। তবুও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; গবেষণা হয়ও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা জরিপে বলা হয়েছে, দেশে নারী ও শিশুদের উন্নয়নে অনেক অগ্রগতি হলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এখনও প্রকট। ধনী পরিবারের একজন সদস্য যে সুবিধা পান, তার ছিটেফোঁটাও পান না দরিদ্র পরিবারের কেউ। জরিপে আরও বলা হয়েছে, আঞ্চলিক অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। অর্থাৎ বৈষম্য বড় সমস্যা, এটাই মূলকথা। দেশের গড় আয় বেড়েছে; কিন্তু আয় বৈষম্যের কারণে সমাজে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ, যে খাতগুলোর মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি ঘটছে, তার বেশিরভাগ রয়েছে মূলত ধনী বা অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের অধিকারে। দরিদ্রদের নিজেদের সম্পদের পরিমাণ সামান্য। তাই আয় বৃদ্ধি ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল তারা পাচ্ছেন না। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় বৈষম্য। যেসব নীতি ও ব্যবস্থার ফলে সমাজে বৈষম্য কমে আসতে পারে, তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা।

হেফাজতের উপর আ’লীগের এতো নির্ভরতা কেনো

হায়দার আকবর খান রনো ::

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ইদানীংকালের গভীর সখ্যতায় আমি খুব একটা বিস্মিত হইনি। কারণ আওয়ামী লীগ কোন আদর্শবাদী দল নয়। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাবার জন্য, রাজনীতির সুবিধার জন্য, ভোটের সময় প্রতারণা করার জন্য তারা যখন যেটা প্রয়োজন মনে করবে, তখন তাই-ই করবে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের শত্রু পক্ষ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করেছে, মন্ত্রীসভা গঠন করেছে। অথচ তারাই আবার জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গর্ব করে, যিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের প্রধান এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম থেকে রেডিও মারফত। আবার জিয়াউর রহমান নিজেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়েছিলেন; দলে টেনে নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগ-জামায়াতসহ এ সকল দলকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছিলেন, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে  সরাসরি সা¤্রাজ্যবাদ নির্ভর পুজিবাদী পথে দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেয়ার প্রয়োজনে সংবিধানে বিসমিল্লাহ শব্দ যুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা জিয়া একেবারে পাল্টে দিলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে।

পাল্টানোর কাজটি শুরু হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই। সমাজতন্ত্র শব্দটি সংবিধানে রাখা হলেও এটাও ছিল জনগণকে ধোকা দেয়ার কৌশল মাত্র। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই শুরু হয়েছিল বেপরোয়া গনবিরোধী কাজকর্ম। সমাজতন্ত্রের ধারেকাছেও যায়নি সেদিনের সরকার। পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে কিছুটা আপোস করার প্রবণতা তখনই দেখা দিয়েছিল। লাহোরে শেখ মুজিবের ইসলামী  সম্মেলনে যোগদান, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৪ সালে দিল্লী সম্মেলনে পাক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি তার স্বাক্ষ্য বহন করে। দিল্লী সম্মেলনে আমাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাঙ্গালী জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়।’ এইভাবে যুদ্ধাপরাধী পাকসেনাদের মুক্তি দেয়া হয়েছিল, যদিও কথা ছিল পাকিস্তানের সরকার প্রয়োজনে তাদের বিচার করবে। ওই সম্মেলনে ‘‘ফরগেট এ্যন্ড ফরগিভ’’ কথাটি যৌথ ঘোষণায় লেখা হয়েছিল।

পাকিস্তানের অনুসারীরা আরও ভালোভাবে ফিরে এলো জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে। কিন্তু আওয়ামী লীগও কম যায়নি। ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে একত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আওয়ামী লীগ নিজেই বাতিল করে দিল। আর পরবর্তীতে সেই জামায়াতই হলো বিএনপির মিত্র। আদর্শ বলে কিছু নেই। এই আদর্শহীনতার রাজনীতি দেশকে সর্বনাশের পথে নিয়ে গেছে।

জামায়াতকে নিয়েও আওয়ামী লীগ খেলতে চেয়েছিল; পারেনি। জামায়াত শেষ পর্যন্ত বিএনপির বন্ধু হয়েছিল। অনুরূপভাবে হেফাজতকে নিয়ে খেলতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। সেই হেফাজত এখন আওয়ামী লীগের মিত্র। বস্তুত: জামায়াত আর হেফাজতের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ দ্বারা পরিচালিত ধর্মীয় মৌলবাদী দল বা সংস্থা। পক্ষ পরিবর্তন বা পাশার দান পাল্টে যাওয়া রাজনীতির সাধারণ বৈশিষ্টে পরিণত হয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াত-প্রধান গোলাম আজমের কাছে গিয়েছিলেন তার সমর্থন ও দোয়া চাইতে। এতে আওয়ামী লীগের কিছু আসে যায়নি। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াত-হেফাজতের মতোই আরেকটি ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী দল খেলাফতে মজলিসের সঙ্গে পাচ দফা চুক্তি করেছিল। চুক্তির ধারাগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনার বিরোধী নারী বিদ্বেষী, ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল। শুধুমাত্র যেনতেনভাবে নির্বাচনে জেতার জন্য অমন দলের সঙ্গে অমন চুক্তি করতে সামান্যতম বাধেনি আওয়ামী লীগের। যখনই সেই নির্বাচন আর হলো না, তখনি আওয়ামী লীগ সেই চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে দিল। কী অদ্ভুত এই আচরণ। এমন আদর্শহীনতার নিদর্শন রাজনীতিতে বিরল।

২০১৩ সালে ৫ মার্চ গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা হিসাবে হেফাজত মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করেছিল। যে খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিকদের মঞ্চ বলে গাল দিয়েছিলেন, সেই তিনিই হেফাজতের সমাবেশকে উৎসাহিত করলেন।

হেফাজতে বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব করবে বলে ধারণা দিয়েছিল। তারা তুলকালাম কান্ড করেছিল। বড় বড় গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করেছিল। সিপিবি অফিস ও বায়তুল মোকাররমের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করেছিল। সরকারের পতন হতে পারে এই সম্ভাবনায় খালেদা জিয়া সর্বাত্মক সহযোগিতা করলেন। কিন্তু সরকারের পতন হলো না। বরং গভীর রাতের পুলিশি এ্যকশনে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

এরপর পাশার দান পাল্টে গেল। হেফাজত এখন সরকারের মিত্র। গোপন সমঝোতা হয়েছে। হেফাজতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাঠপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য লেখকের গল্প, প্রবন্ধ বাতিল হয়ে যায়, হিন্দুয়ায়িত্বের অথবা নাস্তিকতার অভিযোগে। ভাস্কর্যের সৌন্দর্য তারা বোঝেন না। ভাস্কর্য মানেই নাকি মূর্তি পূজা। তাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে সরকার হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য স্থানান্তরিত করে। যে সকল শুভবুদ্ধির মানুষ এর প্রতিবাদ করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের সমালোচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন যেন প্রতিযোগিতা করে মৌলবাদী ভাবাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। বিএনপি ধরেছে জামায়াতকে। আওয়ামী লীগ ধরেছে হেফাজতকে। ক্রমাগত দুটি বড় দলের মধ্যে পার্থক্য যেন আর থাকছে না।

খুব একটা পার্থক্য আগেও ছিল না। অর্থনৈতিক নীতির দিক দিয়ে দুই দল লুটেরা-ধনীক শ্রেণীর স্বার্থের পাহারাদার। দুই দলই পাশ্চত্যের সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল। দুই দল মিলেই বলা যায়, এ যাবতকালের সকল সরকারই ছিল নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা, পুঁজিবাদের স্বার্থের প্রতিনিধি। এই দলকে যদি রাজনীতির ভাষায় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বলা হয়, তবে এটাও বলতে হবে যে, তারা জাতীয় স্বার্থকে কেউই রক্ষা করেনি। তবু তারা নাকি জাতীয়তাবাদী!

উভয় দলের কেউই গণতান্ত্রিক আরচণ করেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনই তো ছিল একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচন। তার পরবর্তীকালে যতোগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোকে নির্বাচন না বলাই সঙ্গত। আগের রাতে সিলমারা, পুলিশ দিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মারা ইত্যাদি ছিল সাধারণ দৃশ্য। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ নির্বাচন বলে আর কিছু নেই। তার উপর গুপ্ত ও প্রকাশ্য হত্যা, গুম ইত্যাদি স্বৈরতান্ত্রিক ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তিনিও গণতান্ত্রিক আচরণ করেননি। ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে নিরীহ মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল পুলিশের ক্যাম্প বা থানায়। সবচেয়ে খারাপ কাজ যেটা খালেদা জিয়া করেছিলেন তাহলো ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময় যারা মানুষ হত্যা করেছিল বা নির্যাতন করেছিল, তাদেরকে তিনি পার্লামেন্টে আইন করে দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই আজ যখন খালেদা জিয়া বা বিএনপি গণতন্ত্রের কথা বলে, তখন তা বড় বেমানান ঠেকে।

আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, এহেন দুইটি দলই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যাদের কোন আদর্শ নেই, যারা পুজিবাদের ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক, হাড়ে হাড়ে দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী। এবং এখন তারা দুজনেই মৌলবাদের সঙ্গে আপোষ করে দেশকে পেছনের দিকে দিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি জঙ্গী মৌলবাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা মানুষ খুন করছে। এই সন্ত্রাসী মৌলবাদ বিপজ্জনক। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একে মোকাবেলা করা ও দমন করা এক দিক দিয়ে সহজ। কিন্তু ভাবাদর্শগতভাবে যে মৌলবাদের বিস্তার ঘটেছে, তা অধিকতর বিপজ্জনক। আর এই ভাবাদর্শের ক্ষেত্রেই দুটি বড় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে শাসক দল যেভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, তার পরিণাম বড় ভয়াবহ। ’৭১ সালে যে বিজয় আমরা অর্জন করেছিলাম, যে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে ছিলাম, সবই এখন হারিয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে।

কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না। এই দুই বড় দলের বাইরে বিকল্প তৈরি করতে হবে। বাম ও উদার গণতন্ত্রীদের সমন্বয়ে তেমন বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনার কথা ভাবতে হবে। জামায়াত-হেফাজত প্রমুখ মৌলবাদী দলের ভাবাদর্শকে মতাদর্শগতভাবে রাজনৈতিকভাবে সাংস্কৃতিকভাবে ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে পরাজিত করতে হবে। এবং সেটা সম্ভব। কারণ বাংলার লোক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কখনই মৌলবাদের অনুকূলে ছিল না।

কিন্তু সচেতন সংগঠিত মানুষ তাকে পুনরায় পাল্টাতে পারে। সে বিশ্বাস ও আস্থা আমার আছে।

সরকারের উদ্ভাবনী শক্তি এবং জনগণের সীমাহীন ভীতি

আমীর খসরু ::

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকগণ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন এখন থেকে বহু শত বছর আগে থেকেই। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, টমাস হবস, শার্ল লুই মঁতেস্ক্য, জ্যঁ জাঁ রুশো পর্যন্ত যারা রাষ্ট্রের প্রণালীবদ্ধ মতবাদ বিকশিত করেছেন তাদের ভাষ্য- রাষ্ট্র মানবমুক্তির সম্ভাব্য গ্যারান্টি। রুশো প্রথমবারের মতো ‘সামাজিক চুক্তির’ কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। আর এর অর্থ হচ্ছে- রাষ্ট্রের কাছে জনগণ তার অধিকার সমর্পণ করবে এবং রাষ্ট্র ব্যক্তির সমস্ত অধিকার রক্ষা ও জীবন যাপনের নিশ্চিতি বিধানে সচেষ্ট হবে। এর ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের বৈধতার আইনী অস্তিত্ব বিরাজমান। রাষ্ট্র জনকল্যাণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে- এটাই হচ্ছে তাদের কথা। আর এখানেই রাষ্ট্রের পক্ষে এর ম্যানেজার অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আদায়, আয়-ব্যয়সহ সব ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য থাকা উচিত, জনকল্যাণ এবং জনগণের উন্নয়ন। আর এ কারণেই সরকারের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় করে আসে। এর ব্যতয় যদি হয় তবে রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের সকল কার্যক্রমই আইনের ব্যতয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়ে পড়ে।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন জিজ্ঞাসা এবং ঔৎসুক্য থাকায় বারণ আছে। এটাও ঠিক যে, পৃথিবীর কোনো দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পুরোপুরি অর্থাৎ শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে পারেনি। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা বা রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্ট- এর প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ড মিল থেকে শুরু করে অনেক রাজনীতি বিজ্ঞানীই এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এখনো আছেন। কিন্তু যতো বেশি সম্ভব গণতন্ত্র নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যতো বেশি গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে, উন্নয়ন ততো বেশি জনকল্যাণমুখী হবে। বর্তমান জামানার প্রখ্যাত দার্শনিক, লেখক সামির আমীন তার সম্পাদিত ফরাসি ভাষায় লিখিত একটি বইয়ে (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন-প্রতিরোধের বিশ্বময়তা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা, ২০০৪) বলেছেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে গণ-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন।

কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি নেই- সে বিষয়টি আদৌ বিবেচনায় নেয়া হয় না; বরং এর উল্টোটাই ঘটে থাকে সব সময়। আর উল্টো কথা শুনতে শুনতে এখন জনগণ আগাম বুঝে গেছে ক্ষমতাসীনরা কি বলতে চাইবে, চায়, বা চাচ্ছে।

এখন দেশের উপরিতলার মানুষদের জন্য ব্যাপক আলোচনার বিষয়- ‘‘বাজেটে কি করিলে কি হইতো’ জাতীয় বিষয়াবলী। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখছে বাজেটকে ভিন্নভাবে। আবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লো কিনা, প্রকৃত আয় কতোটা কমলো ইত্যাকার বিষয়াদিকেই তারা বাজেট হিসেবে মনে করেন। এটা শ্রেষ্ঠতম কিংবা পাপমুক্ত হয়ে পুণ্য লাভের জন্য হয়েছে কিনা সে বিবেচনার সময়টুকুও তাদের নেই।

এতোদিন মধ্যম ও ক্ষুদ্র আয়ের মানুষজন নিরাপত্তার খাতিরেই ব্যাংকে অল্প-স্বল্প অর্থ জমা রেখে নিজ নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ব্যয় করতেন। এখন সেখানেও সরকারের হানা। যারা অর্থাভাবে শপিং মলে যেতে পারেন না, তারা ছোটোখাটো দোকানে গিয়েও দেখেন ‘ভ্যাটের থাবা’।

এই মুহূর্তে র্যা ব-পুলিশ-আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর চেয়েও ভ্যাটভীতিই মানুষকে বেশি বিচলিত করছে। ঢালাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কারণে এর প্রভাব প্রান্তিক মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত ও বিপন্ন করবে। প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা সিপিডি এ কারণেই বলেছে, এই বাজেট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উপরে চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণীত বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। হয়তো অর্থমন্ত্রী এসব গবেষণালব্ধ কথাকেও কখন বলে বসবেন- রাবিশ!

তবে ভ্যাট, ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা কর্তনসহ নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যই অর্থমন্ত্রী মুহিত বলার হিম্মত ও সাহস রাখেন এই বলে যে, জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি তিনি দিয়েছেন। এটা তার পক্ষেই মানায়। কারণ লোপাট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকাকে তিনি যেভাবে তুচ্ছজ্ঞান করে বক্তব্য দিয়েছেন- তাতে এমন কথা তিনি এবং তারা ছাড়া কে বা কারা বলতে পারে?

নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার জন্য অর্থমন্ত্রী মুহিতকেই শুধু বাহবা দিয়ে কোনো লাভ নেই; অধিকাংশ তার প্রাপ্যও নয়। অর্থমন্ত্রীকে যিনি মন্ত্রীসভায় রেখেছেন বাহবা এবং ধন্যবাদটা তারই বেশি প্রাপ্য।

কিন্তু এ কথাটি মনে রাখতে হবে, ভ্যাট বৃদ্ধি ও এর উপরে নির্ভরতা তখনই মানায়, যখন  মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তারা সক্ষম হন অর্থনৈতিকভাবে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন সারা জীবনই এই সক্ষমতার তত্ত্বের কথা বলেছেন। অবশ্য এসব তত্ত্ব জানলে বা শুনলে তো আর শ্রেষ্ঠতম বাজেটটি অর্থমন্ত্রী মুহিত এবং তার সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব হতো না।

তবে আমজনতার একটিই কথা হচ্ছে-এটাই কি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের চুক্তি? এ কথাটি মনে রাখতেই হবে, জনমানুষ যখন ওই চুক্তির উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে (অবশ্য ইতোমধ্যে ফেলেছে) তখন আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিই জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। আর সেটাই বিশাল এক দুর্ভাবনার বিষয়।