Home » সময়ের বিশ্লেষণ (page 4)

সময়ের বিশ্লেষণ

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন : বাংলাদেশ ক্রিকেটের অব্যাহত উত্থান

টিম উইগমোর ::

অনুবাদ : আসিফ হাসান ::

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৫ সালে অ্যাডেলেড ওভালে। ওই দিনটির পর বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আর অস্বীকার করার জো রইল না। রুবেল হোসেনের দুটি ফুল, স্ট্রেইট ও সুইং ডেলিভারি বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে ছিটকে দিয়ে বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলে।

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি মাঠেই ছিলেন। বাংলাদেশের পুরো ট্যুরেই তিনি ছিলেন। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি গুছানো, টুর্নামেন্ট আয়োজন, বিপণন ইত্যাদি নানা কাজে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন তিনি। তিনি জানান, ‘ওই খেলাটা দেখতে পারা ছিল বিশেষ এক ঘটনা। বিদেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে হারানো মানে বিরাট কিছু।’

ববি এখন বোর্ড পরিচালক। জন্মগ্রহণ করেছেন রাজধানী ঢাকায় ১৯৫৯ সালে। তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ। দুই বছর বয়সে তিনি প্রথম টেস্ট ম্যাচ দেখেছিলেন। ঢাকায় ম্যাচটি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যে। তবে টেস্ট ম্যাচ আয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানের বঞ্চিত করার নীতি আড়াল করতে পারেনি। জনসংখ্যায় পূর্ব পাকিস্তান অর্ধেক হলেও সরকারি ব্যয়ের মাত্র এক তৃতীয়াংশ লাভ করতো। ববি বলেন, ব্রিটিশদের দুই শ’ বছরের উপনিবেশ শাসনের পর চলে পাকিস্তানিদের ২৫ বছরের নৃশংস ও দমনমূলক শাসন।

এ ধরনের বৈষম্য ক্রিকেটেও প্রকটভাবে দেখা যেতে থাকে। নির্বাচকদের সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। পূর্ব পাকিস্তানি দলগুলো মাঝে মধ্যে পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে খেলতে পারতো। মূল কারণ ছিল তহবিলের অভাব। পাকিস্তান দলের জন্য মাত্র একজন পূর্ব পাকিস্তানি খেলোয়াড়কে বাছাই করা হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ঢাকায় কমনওয়েলথ একাদশের বিরুদ্ধে ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনে ফুঁসছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া শেখ মুজিবরের নির্দেশে প্রতিবাদ জানাতে ছাত্ররা স্টেডিয়ামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

নতুন স্বাধীন দেশটিতে নৃশংস যুদ্ধের ক্ষত ও মানবিক সঙ্কটে পড়ে। ক্রিকেটও তাতে আক্রান্ত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ব্যয়বহুল খেলা হিসেবে ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়া ছিল অসম্ভব, এমনটাই ববি জানান। ১৯৭২ সালে প্রিমিয়ার লিগ স্থগিত করা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনের ক্রিকেট সামগ্রী দানের পর তা আবার চালু হয়েছিল। একটি নতুন ব্যাটের দাম ছিল একজন সরকারি কর্মকর্তার গড় মাসিক বেতনের সমান। জাতীয় দল অনুশীলন করার সময় বোর্ড পানি পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারতো না।

স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক আবদুল কারদার বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদায় উন্নীত করার সুপারিশ করেছিলেন। তার পরামর্শ অগ্রাহ্য করা হয়। বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালের প্রথম বিশ্বকাপে খেলার আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

সাসেক্সের খেলোয়াড় এবং সাংবাদিক রবিন মার্লার বাংলাদেশ ক্রিকেটে দুরাবস্থা তুলে ধরেছিলেন। তার প্রতিবেদনগুলো এমসিসিকে ১৯৭৬-৭৭ সময়কালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সফরে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ববি বলেন, বিশ্ব দরবারে এটাই ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার মতে, এটাই বাংলাদেশের প্রধান খেলা হিসেবে ফুটবলকে হটিয়ে ক্রিকেটের স্থান অধিকার করতে সহায়ক হয়।

বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এটা ছিল পাঁচটি ব্যর্থ প্রয়াসের প্রথমটি। কোয়ালিফায়ার পর্বে ডেনমার্ক ও মালয়েশিয়ার কাছে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। একবার সুযোগ হারানো মানে ছিল আরো চার বছর অপচয়।

কিন্তু তারপরও ক্রিকেটের সাথে বাংলাদেশের মনের টান কমেনি। ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ এশিয়া কাপে খেলতে থাকে। ওয়াসিম আকরামের মতো ক্রিকেটারের ঘরোয়া লিগে খেলা ছিল গৌরবের বিষয়। অনেক পরে আইসিসি এদিকে নজর ফেরায়। ১৯৯৮ সালে তহবিল বাড়ানোর জন্য আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ প্রথম আসরের আয়োজন করে। তার আগ দিয়ে প্রবল বন্যা হয়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ববি বলেন, চ্যালেঞ্জ ছিল পর্বতপ্রমাণ। কিন্তু বাঙালিদের সহনক্ষমতাও কম ছিল না।

এক বছর পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেয়। তারা স্কটল্যান্ডকে এবং তারপর দুর্দান্তভাবে পাকিস্তানকে পরাজিত করে। এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা উচ্চকিত করে। বাংলাদেশে আইসিসি পরিদর্শক দলের কার্যক্রমে সহায়তা করেন ববি। তিনিই বোর্ডের উপস্থাপনায় সাহায্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, বিশ্বায়নের প্রথম স্থান হতে পারে বাংলাদেশ। কারণ জনগণ, সরকার, মিডিয়া ও স্পন্সরদের সমর্থন আছে আমাদের।’

বিড ছিল সফল। পারফরমেন্সের চেয়ে সম্ভাবনা এবং রাজনীতিই ছিল নেপথ্য শক্তি। বিশেষ করে আমাদের চেয়ে কেনিয়া দল ছিল অনেক ভালো। তাদের পাশ কাটিয়েই বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা লাভ করে।

ওই সময় বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। কিন্তু সেই প্রত্যাশাও পূরণের কাছাকাছিও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৭২টি ম্যাচে খেলে হেরে যায় ৭১টিতে। ববি ওই প্রসঙ্গে বলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। ১৯৯৯ সালে একাধিক দিনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তিটি ‘অপরিণত’ ছিল না। বাংলাদেশের সামনে উন্নতি করার একটিই রাস্তা ছিল, সেটা হলো শক্তিশালী দলগুলোর বিরদ্ধে খেলা।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ মাঝে মধ্যেই তাদের মূল্য বোঝাতে শুরু করে। ২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরাস্ত করা, ২০১০ সালে ওডিআই সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে ৪-০-এ বিধ্বস্ত করা ছিল কিছু উদাহরণ। অবশ্য তখনো আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা বহাল ছিল। ১৪ জন ক্রিকেটার ২০০৭ সালের বিদ্রোহী ভারতীয় ক্রিকেট লিগে যোগ দেয়, দুর্নীতির দায়ে প্রতিভাবান মোহাম্মদ আশরাফুলকে নিষিদ্ধ করা হয়।

অ্যাডিলেড নতুন দলের জন্ম দেয়। দেশের মাটিতে টানা ছয়টি ওডিআই সিরিজে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ করে নেয়। এখন তাদের র‌্যাংকিং ছয়। গত অক্টোবরে বাংলাদেশ হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। জিম্বাবুয়েকে বাদ দিলে এটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ টেস্ট দলকে হারানো। তারপর মার্চে শ্রীলঙ্কার সাথে সিরিজ ১-১-এ ড্র করে।

এটাকে শুরু বিবেচনা করা উচিত। টেস্ট দেশগুলোর জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু ভারত ও পাকিস্তানের পেছনে। ক্রিকেটের জন্য অতৃপ্ত নেশা এবং খেলা ও খেলার বাইরের উন্নত অবকাঠামো লাভের সুবাদে বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে ক্রিকেটের পরবর্তী প্রধান শক্তি।

ববি বলেন, ক্রিকেট কেবল কিছু ম্যাচে জয়ের ব্যাপার নয়। এর চেয়ে অনেক বড় বিষয়। ক্রিকেট বাংলাদেশকে ইতিবাচক পরিচিতি দিয়েছে, পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ক্রিকেট একটি পুরো প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর সাহস দিয়েছে।

তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচ ওডিআই জাতিতে পরিণত হবে। কথাটা বলেই তিনি সাথে সাথে সংশোধন করে নেন : ‘না, শীর্ষ তিনে।’

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি : বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ভারতের সামরিক ব্যয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। আর তার জের ধরে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেড়েছে অস্ত্র খাতে ব্যয়। ২০১৫ সালের তুলনায় ০.৪ ভাগ বেড়ে ২০১৬ সালে সামরিক খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৮৬ বিলিয়ন ডলার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এ তথ্য জানিয়েছে। ২০১০ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে, আর পশ্চিম ইউরোপেও বেড়েছে  টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। বিশ্বে ২০১১ সালের পর এবারই প্রথম টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সামরিক ব্যয় বাড়ল। তবে কষ্টের মধ্যেও সুখের বিষয় হলো- সেটা ওই বছরের ১৬৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেনি।

সামরিক ব্যয়ের ধারায় অঞ্চল ভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যায়। এশিয়া, ওশেনিয়া, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় বেড়েছে। বিপরীতে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকা এবং উপ-সাহারীয় এলাকায় কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ১ নম্বরেই :

এখনো যুক্তরাষ্ট্রেই সর্বোচ্চ পরিমাণে সামরিক ব্যয় হয়ে থাকে। ২০১৫ সালের তুলনায় দেশটিতে সামরিক ব্যয় ১.৭ ভাগ বেড়ে ৬১১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের দেশ চীনে ২০১৫ সালের তুলনায় ৫.৪ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৫ বিলিয়ন ডলার। বৃদ্ধির হারটি গত বছরের চেয়ে অনেক কম। রাশিয়ার ব্যয় ৫.৯ ভাগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার। দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম ব্যয়কারী। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ছিল তৃতীয় স্থানে। এখন সে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ সত্ত্বেও তাদের ব্যয় ৩০ ভাগ কমে হয়েছে ৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের সামরিক ব্যয় ৮.৫ ভাগ বেড়ে ৫৫.৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তারা এখন পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়ের দেশ।

মার্কিন সামরিক ব্যয় বাড়াটি আশঙ্কাজনক। ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক ব্যয় কমানোর ধারা থেকে তারা আবার সরে এসেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমে গিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রে সার্বিক বাজেটে সংযম দেখা গেলেও সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ছে।

ভয়ে বাড়ছে ইউরোপের ব্যয় :

পশ্চিম ইউরোপে সামরিক ব্যয় বেড়েছে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো। আগের বছরের চেয়ে তা ২.৬ ভাগ বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধি হয়েছে মূলত তিনটি দেশে। ইতালিতে লক্ষ্যণীয় ১১ ভাগ বেড়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে আক্রমণের শঙ্কায় সার্বিকভাবে মধ্য ইউরোপে ২.৪ ভাগ ব্যয় বেড়ে গেছে।

তেল রফতানিকারক দেশগুলোর কমেছে:

তেলের দাম কমে যাওয়ার যে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, মূলত সে কারণেই অনেক তেল রফতানিকারক দেশ অস্ত্র আমদানিতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবের কথা বলা যায়। তাদের ব্যয় কমেছে ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে সবচেয়ে বেশি কমেছে ভেনেজুয়েলায়। তারা কমিয়েছে ৫৬ ভাগ। এছাড়া দক্ষিণ সুদান ৫৪ ভাগ, আজারবাইজান ৩৬ ভাগ, ইরাক ৩৬ ভাগ, সৌদি আরব ৩০ ভাগ কমিয়েছে। এছাড়া অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, ওমান ও পেরুও সামরিক খাতে ব্যয় বেশ কমিয়েছে। তবে আলজেরিয়া, ইরান, কুয়েত, নরওয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বেশ বাড়িয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য :

১. বিশ্বে সামরিক খাতের ব্যয় বৈশ্বিক জিডিপির ২.২ ভাগ। জিডিপির হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যেই সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় করে থাকে। ২০১৬ সালে জিডিপির ৬.০ ভাগ ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। সর্বনিম্ন আমেরিকায়। সেখানে জিডিপির ১.৩ ভাগ খরচ হয়েছে এই খাতে।

২. ২০১৬ সালে আফ্রিকায় ব্যয় কমেছে ১.৩ ভাগ। টানা ১১ বছর বাড়ার পর এবারই এখানে ব্যয় কমল। মূলত তেলের আয় কমায় এমনটা ঘটেছে।

৩. এশিয়া ও ওশেনিয়ায় সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৪.৬ ভাগ। দক্ষিণ চীন সাগরে আঞ্চলিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মূলত এই ব্যয় বেড়েছে।

৪. ইকুয়েডর, মেক্সিকো, পেরু ও ভেনেজুয়েলায় তেল রাজস্ব কমায় মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক ব্যয় কমেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্রাজিলে সামরিক ব্যয় কমেছে।

খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশি : ক্ষমতাসীনদের আসল উদ্দেশ্য কী ?

আমীর খসরু ::

গত বেশ কিছুদিন ধরে দেশে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান রাখা হলেও, পরিস্থিতিটি যে ভিন্ন ছিল তা সবারই চোখে পড়েছে। জোর-জবরদস্তি, শক্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক শান্ত পরিস্থিতির বিপরীতে বিরোধী দল বিএনপিও কৌশল পরিবর্তন করেছে। গেলো কিছুদিন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রস্তুতি হিসেবে দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের কর্মকান্ড চালাচ্ছে। দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন এলাকার নেতাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা নিজেই শুনছেন এবং বোধকরি এর ভিত্তিতেই আগামী নির্বাচনের কর্মকৌশল তারা নির্ধারণ করবেন। এর বিপরীতে বিএনপিও নানা চেষ্টা-তদবির করছে, নানাবিধ সংকটে সংকটাপন্ন ও কোমড় ভাঙ্গা দলকে সোজা করে দাড় করানোর জন্য। এ লক্ষ্যে অন্যান্য বিষয়গুলো বাদেও অনেকটা হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিত হলেও ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে দলের প্রধান খালেদা জিয়া এ কথাটিই জানান দিয়েছেন যে, তারাও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে তার বড় ইঙ্গিতবাহী ঘটনা হচ্ছে- ভোটের রাজনীতির কারণে হেফাজতকে কাছে টানা। অপরাপর ইসলামী দলগুলোর সাথেও তাদের কথাবার্তা চলছে-এমনটা শোনা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বাম নামধারী কয়েকটি দলের উপরে আর নির্ভর করে ভোটের রাজনীতির অংক কষতে চাইছে না।

বিভিন্ন মহলে এমন একটা জোর ধারণার তৈরি হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে হোক বা তার কিছুটা আগেই হোক একটি সংসদ নির্বাচন ২০১৮-তেই অনুষ্ঠিত হবে এবং এই নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নেবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলটি যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে দিকে তারা আর যাবেন না, এটাও নিশ্চিত। সরকার চেষ্টা করলেও তারা যে ওই পথে যাবেন না এটাও মোটামুটি নির্ধারিত। বিভিন্ন সূত্রের খবর হচ্ছে, পশ্চিমী দুনিয়ার কূটনৈতিক তৎপরতাও তেমনটিই। তারা চান, সব দলের অংশগ্রহণে, গ্রহণযোগ্য, মোটামুটি অবাধ একটি নির্বাচন হোক। আর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশের আইনের শাসন, মোটামুটি সুশাসন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ মানবাধিকার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের ক্রমাবনশীল পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে-এমনটা তারা মনে করেন। বিশেষ করে তারা জঙ্গীবাদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অর্থাৎ আইএস-এর স্থানান্তরকরণ ও কৌশল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের অবস্থানকে তারা নিবিড় ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পশ্চিমী দুনিয়ার পক্ষ থেকে এ কথাটি ইতোপূর্বে বার বার সরকারকে বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি জঙ্গীবাদের উত্থান এবং সম্ভাবনাকে ব্যাপক মাত্রায় বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশে যে ঠিক তেমনটাই ঘটেছে- এ বিষয়টিও স্মরণে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সরকার জঙ্গীবাদ ইস্যুকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছে।

দেশে যখন একটি নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছিল-ঠিক তখনই বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশির খবরটি বিস্ময় ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হঠাৎ করে জোর জবরদস্তির শান্তি অবস্থার মধ্যে কেন বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হলো? বিষয়টি তো রাজস্ব বোর্ড বা কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের বিষয় নয়- বিষয়টি নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক। কাজেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন একটি কার্যক্রম ও কর্মকান্ড ক্ষমতাসীনদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অজ্ঞাতে ঘটতে পারে এমনটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর মধ্যদিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কি চাচ্ছে না যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক? এবং সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আরেকটি ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক? এ প্রশ্নটিও জনমনে দেখা দিয়েছে যে, সরকার কি দমন-পীড়ন চালিয়ে, মাঠ দখল করে, স্থানীয় সরকারগুলোর আদলে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চায়? এ প্রশ্নটিও উঠেছে যে, বিএনপি নির্বাচনমুখী হোক তা সরকার চায় কি না? উস্কানি দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে চলমান মামলা-মোকদ্দমাগুলো আরও জোরদার করে, তারা কি চান মাঠ খালি করতে?

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দ্বিতীয়বার একইভাবে ঘটে না। আর যদি ঘটানোর চেষ্টাও করা হয় তার ফলাফলও ভিন্ন হতে বাধ্য।

এখনও নিশ্চয়ই সময় আছে- জোর-জবরদস্তির কথিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নয়- সুস্থ, স্বাভাবিক, অবাধ, গণতান্ত্রিক পরিবেশই পারে প্রকৃত শান্তি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে গণতন্ত্রের পথকে সুগম করতে। আর এটাই হচ্ছে, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম।

উন্নয়ন না গণতন্ত্র-সে বিতর্ক এখন অতীতে পরিণত হয়েছে-বোধ করি ক্ষমতাসীনরা বিষয়টি এতোদিনে হলেও বুঝতে সক্ষম হয়েছেন।

ভারত বাংলাদেশে যা চায়

আনু মুহাম্মদ ::

ভারতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর ও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে অনেকরকম কথা হচ্ছে। এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে দেখা দরকার এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক কোথায় আছে, এই সফরে কি নতুন কিছু হবে নাকি আমরা বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতাই দেখতে পাবো সেটাই উপলব্ধির বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন পথ নির্ধারণে ভারতের সাথে যেসব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হচ্ছে তার অনেক কিছুই প্রকাশ্য আলোচনায় আসেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: (১) চট্টগ্রাম বন্দরে যাতে ভারত সরাসরি, ভিন্ন দেশ হবার কারণে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, প্রবেশ ও ব্যবহার করতে পারে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। (২) পারমাণবিক ব্যবস্থাপনায় ভারতের অংশীদারীত্ব নিশ্চিত করবার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। (৩) বঙ্গোপসাগরে ‘সমুদ্র অর্থনীতি’ বিকাশে ভারতের সাথে যৌথ ব্যবস্থাপনা। (৪) মোদী সরকারের ঘনিষ্ঠ আদানি ও রিলায়েন্স গ্রুপ বিদ্যুৎ খাতে একাধিক প্রকল্পের অনুমোদন পাচ্ছে। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহে বাধ্যবাধকতা এবং প্রায় তিনগুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ব্যবস্থা থাকছে তাতে। এসব চুক্তি হচ্ছে দায়মুক্তি আইন অনুযায়ী, কোনো স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই। এবং (৫) বাংলাদেশের উপগ্রহ ব্যবস্থাপনায় ভারত যুক্ত রাখার ব্যবস্থা।

গত বছরের ১৫ মে থেকে ‘ট্রানজিট’ নামে ভারতের পণ্যসামগ্রী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আবার ভারতেই নেবার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। ভারত থেকে রওনা হয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে আবার ভারতেই প্রবেশ, ট্রানজিটের এরকম দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে তুলনীয় একমাত্র দেশ পাওয়া যায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও লেসেথো। এরকম দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন হলেও এর আগে বাংলাদেশ অনেকবার ‘শুভেচ্ছাস্বরূপ’, ‘মানবিক’ কারণে’ ভারতীয় পণ্য পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে। তিতাস নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়েও ভারতের বিদ্যুৎ সরঞ্জাম নিতে দিয়েছে। এবারে শুরু হল শুল্ক বা মাশুলের মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞ কমিটি এর হার নির্ধারণ করেছিলো টনপ্রতি ১০৫৮ টাকা। ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহণ করলে প্রকৃতপক্ষে তার খরচ কমবে শতকরা ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ। এই খরচ কমিয়ে যে পরিমাণ লাভ হবে তাদের সেই তুলনায় টনপ্রতি ১০৫৮ টাকা অনেক কমই ছিলো। তবে সরকার তা গ্রহণ করেনি,  চূড়ান্তভাবে এই হার নির্ধারিত হয়েছে এর শতকরা ২০ ভাগেরও কম,  টনপ্রতি ১৯৮ টাকা। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান চেয়েছিলেন বিনা ফিতে এসব পণ্য যেতে দিতে, তাঁর ভাষায় এরকম মাশুল চাওয়া অসভ্যতা! তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও ছিলেন।

ভারতের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা ঋণচুক্তি প্রথম ঋণচুক্তির তুলনায় আরও কঠিন শর্তে স্বাক্ষর করা হয়েছে। এই পর্বে ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার। উল্লেখ্য যে, এর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতি দেড় মাসে দেশে প্রেরণ করেন। এই ঋণের টাকায় ভারত থেকে ৫০০ ট্রাক ও ৫০০ বাস কেনা, ট্রানজিট রুটে অবকাঠামো উন্নয়নসহ ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এই চুক্তির আওতায় বিভিন্ন নির্মাণ ও পণ্য ক্রয়ের শতকরা ৬৫ থেকে ৭৫ ভাগ কিনতে হবে ভারত থেকে। বিভিন্ন প্রকল্প পরামর্শকদের শতকরা ৭৫ ভাগ আসবেন ভারত থেকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ভারতীয়  ব্যক্তিদের কর ও ভ্যাট শোধ করবে বাংলাদেশ। বস্তুত বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণে ভারতের ট্রানজিট রুটই এখন সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের অন্য মহাসড়ক ও সড়কগুলোর দুর্দশা অব্যাহত আছে।

বলাবাহুল্য যে, ঋণ চুক্তির এই মডেল বহু পুরনো। ‘বিদেশি সাহায্য’ নামে এই ধরনের  ঋণ দিয়েই বিশ্বের পশ্চিমা দেশগুলো প্রান্তিক দেশগুলোতে নিজেদের পণ্য বাজার তৈরি করেছে, নাগরিকদের কর্মসংস্থান করেছে, বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিনিয়োগের পথ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবির মতো সংস্থাগুলো এই ঋণের ফাঁদে ফেলেই বহুজাতিক পুঁজির পথ প্রশস্ত করেছে। ভারতের বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সেরকম পরাশক্তির ভাব নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে এখন। চীন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী কখনো একই পথে ঐক্যবদ্ধ। সম্প্রতি নেপাল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের শক্তি প্রদর্শনের নমুনা দেখেছে, তাকে মোকাবিলাও করেছে। বাংলাদেশে কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতেই আসছে প্রতিরক্ষা সমঝোতা বা চুক্তি।

খেয়াল করলে আমরা দেখবো, ভারতের জনগণও সেদেশের বিদ্যমান উন্নয়ন পথের শিকার। বৃহৎ পুঁজির আত্মসম্প্রসারণের তাগিদ পূরণে ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতার একটি বড় ক্ষেত্র এখন ভ‚মি। কৃষকের জমি কিংবা সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে এখনো টিকে থাকা জমি উন্নয়নের নামে ব্যক্তিমালিকানায় অর্থাৎ বৃহৎ কর্পোরেট গ্রুপের হাতে তুলে নেবার জন্য আইন সংস্কার থেকে বল প্রয়োগ-সবই চলছে। ভারতে ২০০৫ সালে গৃহীত সেজ (স্পেশিয়াল ইকোনমিক জোন) অ্যাক্টের মাধ্যমে বৃহদায়তন কৃষিজমি খুব কম দামে বৃহৎ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেবার আইনি ব্যবস্থা হয়। কর, শুল্ক ও বিধিমালা যতটা সম্ভব ছাড় দিয়ে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভারতে ‘জনস্বার্থে’ ভূমি অধিগ্রহণের নামে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর হাতে জমি তুলে দেওয়ার নীতি ও কর্মসূচি বিষয়ে গবেষণা করে সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল লেভিন দেখিয়েছেন, “রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীর জমির দালালে পরিণত হয়েছে”। কৃষকসহ গ্রামীণ মানুষদের উচ্ছেদ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিলাসবহুল হোটেল, গলফ মাঠ, ক্যাসিনো, বহুতল আবাসিক ভবন, সুপারমার্কেট তৈরির মহাযজ্ঞ চলছে। গ্রামীণ বেকারত্ব বাড়ছে, তবে গ্রামীণ ধনীদের জমির মূল্যবৃদ্ধিতে লাভ হচ্ছে, গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশও অনুরূপ পথে অগ্রসর হচ্ছে, এখানে ভারতের ব্যবসায়ীরাও যুক্ত আছেন।

কৃষি, বন, নদী, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক-এডিবি সমর্থিত বিভিন্ন প্রকল্প ভারতের জনগণের সম্পদ বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের আয়োজন করেছে। এসব প্রকল্প ভারতের মানুষকে ছাপিয়ে এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ সব সময়ই একটি মরণফাঁদ, আর এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে গজলডোবাসহ আরো অনেক বাঁধ এবং আরো ভয়ংকর আন্ত নদী সংযোগ প্রকল্প। বাংলাদেশ অংশে তিস্তাসহ অনেক নদী এখন মরণাপন্ন। ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দেবার চীনা পরিকল্পনা ভারত ও বাংলাদেশ দু’দেশের জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে। সুন্দরবন ধ্বংস করে হলেও ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এনটিপিসি তার বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বন, নদী, জমি দখল এখন এই অঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান ভাষা।

ভারতের এনটিপিসি পরিচালিত সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকার আবার অনেকরকম ছাড়ও দিচ্ছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী কোম্পানি ১৫ বছরের জন্য আয়কর মওকুফ পাবে, এখানে কর্মরত বিদেশি ব্যক্তিবর্গের আয়কর দিতে হবে না কমপক্ষে তিন বছর, বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর কর প্রযোজ্য হবে না, প্রকল্প নির্মাণে নির্বাচিত ভারতীয় হেভি ইলেকট্রিক কোম্পানির যন্ত্রপাতি আমদানিতেও কোনো শুল্ক দিতে হবে না।

ইতিমধ্যে সুন্দরবন প্রান্তের সমুদ্র এলাকায় ভারত বাংলাদেশের যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটা হয়েছে গত বছরের মার্চ মাসে যখন সুন্দরবনবিধ্বংসী রামপাল যৌথ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো সেইসময়। একই এলাকায় ভারতের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একবার বলেছিলেন, ‘জলে স্থলে অন্তরীক্ষে ভারত বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী থাকবে।’ এটি নিছক কথার কথা নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি-রাজনীতির গতিমুখ নির্ধারণে ভারতের ভূমিকা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির গতি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারক। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও হয়ে থাকলেও বাংলাদেশে ভারতের পণ্য আমদানি, নিয়োগ ও বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম প্রবাসী আয়ের উৎস। বাংলাদেশ থেকে ভারতের নাগরিকেরা বছরে এখন প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা দেশে প্রেরণ করে থাকেন। ট্রানজিটের মধ্য দিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অর্থনৈতিক  মানচিত্র পরিবর্তিত হবার পথে।

ভারতের বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের পণ্যের বাজার, কর্মসংস্থান এবং অধিক মুনাফার বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে নিশ্চিত করবার ব্যবস্থা দরকার। দরকার বাংলাদেশের কৌশলগত সকল ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ, দেখা যাচ্ছে সেপথেই সাজানো হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন পথ। নিরাপত্তার নামে উন্নয়নের নামে বাংলাদেশ তাই দ্রুত পরিণত হচ্ছে ভারতের বৃহৎ পুঁজির অগ্রযাত্রার অধীনস্ত প্রান্তে। ‘ট্রানজিট’ যাত্রা এই পথে এক বড় ধাপ। এরসাথেই সম্পর্কিত তথাকথিত ‘প্রতিরক্ষা’ চুক্তি।

কানেক্টিভিটির কথা বললেও বাংলাদেশকে তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ডিসকানেক্ট করে রেখেছে ভারত। শুধু তা-ই নয়, ‘কানেক্টিভিটির’ এই কালে অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলোর অবাধ পানি প্রবাহকেও ডিসকানেক্ট করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি মানবিকতা বা দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক আইনস্বীকৃত অধিকার, যা থেকে দশকের পর দশক বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে ভারত। সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বনাশ করতে উদ্যত হয়েছে দুইদেশের সরকার। কাঁটাতারের পেছনে বড় যুক্তি, বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাসী-জঙ্গির ‘অবাধ চলাচল’ ঠেকানো। প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্যও তাই। বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের থেকে ভারতকে নিরাপদ করাই যদি কাঁটাতার বা প্রতিরক্ষা চুক্তির উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেই সন্ত্রাসের ভ‚মি দেশের মধ্য দিয়ে ভারতের পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচল কিভাবে নিরাপদ হবে? কে নিশ্চয়তা দেবে?

এই কাঁটাতার রেখে, নদী আটকে রেখে, সুন্দরবন ধ্বংস করে বন্ধুত্ব আর কানেক্টিভিটি কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। কিংবা এই ‘বন্ধুত্ব’ আর অধস্তনতার তফাত কী, সে প্রশ্নেরও ফয়সালা হয়নি। নতুন সমঝোতা আর চুক্তি এই কাঠামোর বাইরে যাবে এরকম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ভারতের বৃহৎ পুঁজির উন্নয়ন যাত্রায়, তার চাহিদা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভূমিকা আরও নিশ্চিত করবার অয়োজনই দেখা যাচ্ছে।

এখন তিস্তা নদীটিই হরণ…..

প্রকৌশলী ম ইনামুল হক ::

বাংলাদেশের তিস্তা নদী হরণ হয়ে গেছে- বিগত ২০১২ সাল থেকে। কথা ছিলো ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা নদীর পানির একটা ভাগাভাগি হবে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিগত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১১ তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে একটি চুক্তি হবার কথা ছিলো। ওইদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশে আসেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় না আসার কথা বলে চুক্তি হয়নি। ভারত এখন তিস্তা নদীর তলানি প্রবাহের কোন ভাগই বাংলাদেশকে দিতে চায় না, এবং ২০১২ সাল থেকে দিচ্ছেও না। এখন গজলডোবা ব্যারেজের ভাটিতে বালির তলা থেকে বের হওয়া কিছু পানি বাংলাদেশে আসে। ভারত লিংক খালের মাধ্যমে তিস্তার সমূদয় প্রবাহ মহানন্দা পেরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে- যা’র অনেকটা বিহারে চলে যাচ্ছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলছেন, ‘তিস্তায় তো জল নেই!’ মমতা ব্যানার্জী প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রকে কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু কল্যাণ রুদ্র যে রিপোর্ট দিয়েছেন মমতা তা’ প্রকাশ হতে দেননি।

উল্লেখ্য, তিস্তা নদীর পানি বন্টন বিষয়ে ১৯৫২ সাল থেকে আলোচনা শুরু হলেও ষাটের দশকে গঙ্গা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি চলে আসায় তা’ পিছিয়ে যায়। ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির পর আবার বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু ১৯৮২ সালে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সবকিছুই ক্রমশঃ যেন হারিয়ে যায়। চুক্তির অভাবে ১৯৮০ এর দশকের শেষে ও ১৯৯০ দশকের গোড়ায় ভারত গঙ্গা নদীতে পানি ছাড়াই প্রায় বন্ধ করে দেয়। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানি বন্টনের দ্বিতীয় চুক্তি স্বাক্ষর হবার পর তিস্তা নদীসহ ধরলা, দুধকুমার, মনু, খোয়াই, গোমতী এবং ফেনী নদীর পানি বন্টনের বিষয়ও উঠে আসে। তিস্তা নদীতে ঐতিহাসিকভাবে বর্ষাকালে গড়ে ২ লাখ ৮০হাজার কিউসেক এবং শীতে গড়ে ৬,০০০ কিউসেক পানি প্রবাহ হতো। বাংলাদেশ তিস্তা নদীর উপর একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু করেছে। বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলায় ৬.৩২ লক্ষ হেক্টর এলাকায় সেচ প্রদানের জন্য এর ১০হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহরের ক্ষমতা আছে। তবে ভারতও তিস্তার উপর গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ করে লিংক খালের মাধ্যমে পানি সরিয়ে ওই দেশের উত্তরবঙ্গে ছ’টি জেলায় প্রায় ৯.২২ লক্ষ হেক্টর এলাকায় সেচ কাজ হাতে নিয়েছে। এছাড়া ভারত সিকিমে তিস্তার উপনদীগুলিতে ড্যাম বসিয়ে অনেকগুলি জলাধার করেছে, যার কারণে বাংলাদেশে তিস্তার পানি তলানিত আটকা পড়ছে। তিস্তার পানি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে; কিন্তু সিকিমের কথা আশ্চর্যজনকভাবে আসছে না।

উল্লেখ্য, মার্চ- ২০১০-এ দিল্লীতে যৌথ নদী কমিশনের ৩৭তম বৈঠকে বাংলাদেশের পানি মন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেন গজলডোবা পয়েন্টে ৫০-৫০ পানি পাওয়ার দাবী তোলেন (ডেইলী স্টার, ১৮.০৩.২০১০)। তিনি ওইসময় না চাইতেই তিস্তা নদীতে ৩,৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিস্তা নদীর পানি নিয়ে ১০ জানুয়ারী ২০১১ বাংলাদেশ ও ভারতের পানি সম্পদ সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়। ১০ জানুয়ারী ২০১১ সচিব পর্যায়ের বৈঠক সম্পর্কে জানা যায়, বাংলাদেশ তিস্তার পানিতে ন্যূনতম ৮,০০০ কিউসেক এবং ভারত ২১,০০০ কিউসেক চাহিদা দাবী করেছে। এই তথ্য এই কারণে উদ্বেগের ছিলো যে, চাহিদা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের উপর অধিকতর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের সচিব শেখ ওয়াহিদুজ্জামান এবং ভারতের সচিব ধ্রুব বিজয় সিং একটি ১৫ বছরব্যাপী খসড়া পানি বন্টন ফ্রেমওয়ার্কের কথা বলেন। এই বৈঠককে দেশী এবং বিদেশী পত্র পত্রিকা ও মিডিয়াতে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি বলে প্রচার করা হয়। তবে কি হারে তিস্তা নদীর পানি বন্টন হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন ঘোষণা দেয়া হয়নি।

৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ বাংলাদেশের ও ভারতের পত্র পত্রিকায় তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হয় তা’ছিলো অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। ঢাকার সমকাল কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, তিস্তা নদীর ৪৬০ কিউসেক পানি আলাদা রেখে বাকীটা ৪৮-৫২ শতাংশ হারে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভাগ করে ১৫ বছরের চুক্তি হতে যাচ্ছে। আমরা এতকাল শুনছিলাম, নদীর জন্যে ২০% প্রবাহ থাকবে এবং তারপর বাকী ৮০% প্রবাহ দু’দেশের মধ্যে ভাগ হবে। আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্ট যদি সত্যি হয়, তা’হলে নদীর মোট প্রবাহ হবে ২৩০০ কিউসেক (১০০%)। নদীর জন্যে ৪৬০ কিউসেক বাদ দিলে থাকে ১৮৪০ কিউসেক। বাংলাদেশের ভাগে ৪৮% পড়লে হয় মাত্র ৯০০ কিউসেক। ঐ একই দিন দি ডেইলী স্টার যৌথ নদী কমিশনে বাংলাদেশ ডেলিগেশনের এক সদস্যের বরাত দিয়ে জানায়, নদীতে ২০% পানি রেখে বাকীটা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫২-৪৮% হারে বন্টন করা হবে। কিন্তু একই সাথে দি ডেইলী স্টার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মশিউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, ’আসলে তিস্তার পানি কি পরিমাণ প্রবাহিত হচ্ছে তাইই নির্ণয় হয়নি। বিশেষজ্ঞরা আগামী ১৭ বছর ধরে তা’ পরিমাপ করবেন, তারপর চুক্তি সই হবে।’

যৌথ নদী কমিশনের ৩৭তম বৈঠকের পর আর কোন বৈঠক হয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪-এর ১১ মে  বাংলাদেশ সচিবালয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বলেন, তিস্তা পানি বন্টন চুক্তির সবকিছু চূড়ান্ত ছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা’ স্বাক্ষরিত হয়নি। তিনি আরও বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে খুবই আন্তরিক ছিল; ভারতের সাথে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি বিষয়ে সরকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে  (প্রথম আলো ১২ মে, ২০১৪)। প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, ভারতের মোদি সরকারের বেলাতেও বাংলাদেশের এই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে ধারনা করা যায়। কিন্তু বিগত সেপ্টেম্বর ২০১১ তিস্তা নিয়ে যে চুক্তিটি সই হতে যাচ্ছিল সেই চুক্তির বিষয়গুলি নিয়ে নানা রহস্য সৃষ্টি হয়ে আছে।  মমতা ব্যানার্জি ঐ চুক্তিকে ‘লোকদেখানো’ বলেছিলেন, এবং চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে সম্মত হননি। তারপর ঐ চুক্তিটির ব্যাপারে মিডিয়ায় কয়েকটি ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছে, কোনটি যে সঠিক নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আমাদের উদ্বেগ এই কারণে যে, ২০১১ সালের পর শীতকালে গজলডোবা ব্যারেজের ভাটিতে কোন পানিই আর ছাড়া হচ্ছে না; বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার পথে কেবলমাত্র বালির তলা থেকে কিছু প্রবাহ বেরিয়ে আসছে ও আশে পাশের কিছু ছোট ছোট উপনদীর প্রবাহ তাতে যোগ দিচ্ছে।

ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫ বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী ফিরে যান। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, তাঁর এই সফর বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের আমন্ত্রণক্রমে হয়েছিল। মমতা ঐ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ৪০ সদস্যের একটি টীম নিয়ে ঢাকা আসেন। ২১ ফেব্রুয়ারী ঐতিহাসিক শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে তাঁর এই সফরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, বিধানসভার সদস্য, লেখক, গায়ক, নায়ক-নায়িকা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। মমতা ব্যানার্জি ২০ ফেব্রুয়ারী সোনারগাঁও হোটেলে ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এক ‘বৈঠকী বাংলা’ বা মতবিনিময় সভা করেন। এই সভায় তিনি তিস্তা পানি বন্টন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করতে বলেন। স্থলসীমান্ত চুক্তির সমস্যা দূর করতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারী তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন। মমতা শেখ হাসিনার কাছে ইলিশ মাছ রফতানীর বাধা তুলে দিতে বললে, শেখ হাসিনা বলেন, তিস্তার পানি পেলে ইলিশ মাছও যাবে।

তিস্তার পানি এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তরবঙ্গের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক গতিতে নেমে যাচ্ছে। গভীর নলকূপগুলিতে সেচের পানি তুলতে অনেক বেশী শক্তি ব্যয় হচ্ছে, অনেক নলকূপে পানি উঠছে না। তিস্তা সেচ প্রকল্প পানি পাচ্ছে না। যার ফলে প্রকল্পের বিস্তর এলাকায় সেচ নেই। এসবের ক্ষতি এবং জনজীবন ও প্রকৃতিতে ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে করলে বছরে কুড়ি থেকে চল্লিশ হাজার কোটি টাকার মত হবে। ভারত সবসময় বলছে, সে এমন কাজ করবে না – যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর সফরকালে বাংলাদেশের এই ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে অবিলম্বে  তিস্তার পানি উভয় দেশের জনগণের নায্যতার সাথে ব্যবহারের চুক্তি করতে হবে।

(প্রকৌশলী ম ইনামুল হক – বিশিষ্ট পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং চেয়ারম্যান, ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার এ্যন্ড এ্যনভায়ারমেন্ট)

ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি কী আসলেই প্রয়োজনীয়?

আবদুল হান্নান ::

দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে অভিন্ন হুমকির উপলব্ধি থেকেই সবসময় সামরিক সন্ধি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়ে থাকে। পঞ্চাশের দশকের স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যোগ দিয়েছিল সেন্টো ও সিয়াটো সামরিক জোটে। চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান কমিউনিস্ট প্রভাব প্রতিহত ও সংযত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ডের মতো পাশ্চাত্যের এবং থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইরান ও তুরস্কের মতো এশিয়ান দেশ সেন্টো ও সিয়াটোতে একত্রিত হয়েছিল। এর বিপরীতে রাশিয়ার ছিল ওয়ারশ সামরিক চুক্তি। ন্যাটো নামে পরিচিত পাশ্চাত্যের সামরিক জোটকে সংযত রাখার লক্ষ্যে রাশিয়ার কাছাকাছি থাকা নির্ভরশীল পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশগুলো ছিল ওয়ারশ-র সদস্য। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ন ভারত মহাসাগরে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব সংযত ও হটানোর লক্ষ্যে ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আমেরিকান সামরিক বিমান ও রণতরীগুলোর জ্বালানি সংগ্রহ এবং মেরামতি সুবিধা দেওয়াই এই চুক্তির লক্ষ্য। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে সম্ভাব্য চীন-আমেরিকান হস্তক্ষেপ বন্ধ করার লক্ষ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তিতেও সই করেছিল ভারত। পরে একই ধরনের চুক্তি ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োগ করা হয়। সন্ত্রাসবাদ, বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবিলার জন্য ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৯টি ইসলামি দেশকে নিয়ে গঠিত হয় ইসলামি সামরিক জোট।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ কোনো মহল থেকে তেমন হুমকির মুখে আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের সত্যিকারের বা কল্পিত কোনো শত্রু নেই। ফলে ফলে যৌক্তিকভাবেই বলা যায়, কোনো দেশের সাথে কোনো সামরিক চুক্তিরও দরকার নেই আমাদের। জাতির পিতার বিবৃত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ হলো ‘কারো সাথে শত্রু তা নয়, সবার সাথে মিত্রতা’। আমরা জোট নিরপেক্ষ দেশ। ছোট দেশ হিসেবে বড় শক্তিগুলোর তাদের প্রভাব বলয় বিস্তার করার ধারণায় সামরিক জোট গঠেেন আমরা উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশের জনগণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বতিা  থেকে দূরে থাকতে চায়। এ কারণেই চীন, রাশিয়া, ভারত এবং এমনকি মিয়ানমারের সাথেও রয়েছে কৌশলগত অংশীদারিত্ব।

নাগরিক সমাজের সংবাদপত্রের আলোচনায়, বিশেষ করে সাবেক বাংলাদেশী কূটনীতিকরা সামরিক সহযোগিতা, বিক্রি এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পারস্পরিক সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করার জন্য ভারতের সাথে ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ, যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে ভারতের সাথে পর্যাপ্ত সামরিক সহযোগিতা তো রয়েছেই। ফলে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হবে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক।

ভারতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার কারণে এ ধরনের সমঝোতার ব্যাপারে অধীর হয়ে ওঠেছে ভারত। ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে, গত দশকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের ৮০ ভাগ আমদানি হয়েছে চীনের কাছ থেকে। তারা উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের কাছে চীনের দুটি সাবমেরিন সরবরাহ করাটা ইঙ্গিত দিচ্ছে ‘ভারতের আঙিনায় চীনের পদচিহ্ন গভীর হয়ে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে ফেলেছে।’ এ কারণে ভারতীয় পদক্ষেপটি জোরদার হয়েছে। তারা আরো জানিয়েছেন, সাবমেরিন বিক্রির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে চমকে দিয়েছে, তারা আক্রমণকাজে ব্যবহারযোগ্য বলে বিবেচিত দুটি চীনা সাবমেরিন বাংলাদেশের কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকেরা সাবমেরিন বিক্রিকে ‘ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা কৌশল’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রবাল ঘোষ ভারতীয় আউটলুক পত্রিকাতে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘বিক্রিটির কৌশলগত গুরুত্ব কোনোভাবেই বোঝা যাচ্ছে না।’ তিনি ‘বাংলাদেশের চীন কার্ড খেলা থেকে বিরত রাখার’ পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছেন।

তারা আরো উল্লেখ করেছেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিঙের বাংলাদেশ সফরেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ওই সফরে চীন ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ওই সময় দুই দেশের সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অংশীদারিত্বেও উন্নীত করা হয়। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের চীনা ‘ওয়ান বেল্ট- ওয়ান রোড’ উদ্যোগে যোগদানও ভারতের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টির কারণ। এই সতর্ক ঘণ্টাই ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা সমঝোতা করতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব সুব্রামেনিয়াম জয়শঙ্করের ঢাকায় ছুটে আসতে উদ্দীপ্ত করেছে।

সব অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্যের আলোকেই প্রস্তাবিত চুক্তিটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারতীয় উদ্যোগ ও এ্যজেন্ডা। যে চুক্তি আমাদের স্বাধীন সামরিক বিকল্পগুলো ব্যাপকভাবে সীমিত ও বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলবে, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণ করার মাধ্যমে ভারত-চীন দ্বন্দ্বের অংশে পরিণত হওয়ার কোনো প্রয়োজন বাংলাদেশের নেই। প্রস্তাবিত চুক্তিটিতে গভীর অনিশ্চয়তা পরিপূর্ণ, সেইসাথে ভারতের সম্ভাব্য সংঘাতে আমাদের দেশকে বোকার মতো টেনে নেওয়ার ঝুঁকিও আছে এতে। বাংলাদেশকে না টেনেই নিজের শত্রু দের মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি আছে ভারতের। অধিকন্তু, ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্যের মান প্রশ্নাতীত নয় বলেই- ভারত হলো বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটি প্রশ্নে ভারতের অনেক ধরনের উদ্বেগের সুরাহা করেছে। গোলযোগপূর্ণ উত্তর পূর্বাংশের রাজ্যগুলোর ভারতীয় বিদ্রোহীদের জন্য বাংলাদেশের ভূমিতে স্থান হচ্ছে না; সড়ক, রেলওয়ে, নদীর মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য ও যাত্রীদের ট্রানজিট ও পরিবহন সুবিধা দিচ্ছে; এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরগুলোকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সাথে সংযোগ সাধন করেছে। ভারত যা কিছু চেয়েছে, বাংলাদেশ থালা ভরে সবই দিয়েছে। আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশকে আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে ব্যবহার করতে দিয়েছি পালাটানা বিদ্যুৎ কোম্পানিতে ত্রিপুরায় ভারী সরঞ্জাম পরিবহন করার জন্য; আমাদের ভূখন্ড ব্যবহার করার মাধ্যমে ত্রিপুরায় ১০ হাজার টন চালও পরিবহন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তু তার পরও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করতে নানা টালবাহানা দেখা যাচ্ছে।

ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতির বিপুল দান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমরা পাচ্ছি, কিন্তু কী আমরা দিচ্ছি।’ ভারতেরও উচিত নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করা, ‘আমরা বাংলাদেশের কাছ থেকে পেয়েছি, কিন্তু আমরা তাদেরকে কী দিয়েছি?’ কিছু দিতে না দিতে পারার ব্যর্থতা ভারতের এত বেশি যে, তাদের জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা চুক্তির আশা করাটা মাত্রাতিরিক্ত।

সরকারের শক্তি নির্ভর করে জনগণের সমর্থনের ওপর, বাইরের সহায়তার ওপর নয়। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের জন্য অত্যন্ত কৃতিত্বের বিষয় হলো, সে সফলভাবে সমান দূরে থাকা চারটি টান টান দড়ির ওপর দিয়ে সফলভাবে হাঁটছে; কোনো একটির দিকে না ঝুঁকেই আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ও ভারতের সাথে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র্রনীতি অনুসরণ করছে। প্রতিরক্ষা চুক্তিটি করা হলে আমাদের স্বাধীন অবস্থানের সাথে ঘোরতরভাবে আপস করা হবে।

বিষয়টির ওপর বাংলাদেশের বর্তমান জনসাধারণের যে ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তা হলো- এটা চরমভাবে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ। এটা করা হলে মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং ক্ষতিকারক পরিণাম সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের বিকাশমান অর্থনীতি এবং তাৎপর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্বৃত্তের কৃতিত্বের অধিকারী সরকার দৃঢ়ভাবে চালকের আসনে রয়েছে। জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক যে কোনো বহিরাগত চাপ এই সরকার রুখে দিতে পারবে। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের উন্নয়নের গতিতে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এ ধরনের একটি অসম ও অদ্ভূত চুক্তি প্রতিরোধ করতে পারবেন। বাংলাদেশ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তি জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এশিয়ায় ভারত ও চীন উভয়েই খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শক্তি। আমরা এমন কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারি না- যা ভারত-চীনের সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বতিাকে বাড়িয়ে দেবে।

লেখক : সাবেক কূটনীতিক -(সৌজন্য-ডেইলী স্টার)

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার এক দীর্ঘ যুদ্ধ

অধ্যাপক জয়তী ঘোষ ::

গত কয়েক দশকে ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ যেভাবে সাম্প্রদায়িকরণের শিকার হয়েছে, তাতে করে উদ্বিগ্ন এবং একইসাথে ক্ষুব্ধ হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে বদ্ধমূল সংস্কার আর গুজবে ভর করে স্বাভাবিক জীবনধারাটা বারবার অস্বাভাবিক দিকে বাঁক নিয়েছে। স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয় ধরনের বৈষম্যই রয়েছে। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে দুর্বলদের ‘অন্য’ বা ভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস। এতে করে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত কঠোর হচ্ছে। উদার ও ভিন্নমতালম্বীদের কণ্ঠস্বরের জন্য জায়গা ও অবস্থা অব্যাহতভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া রয়েছে, জীবনধারা এবং সব ধর্মীয় গ্রুপের লোকজনের কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থেকে সরে যেতে বাধ্য করার পরিকল্পিত প্রয়াস।

তবে সবচেযে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহিংসতার সদা-উপস্থিত হুমকি। যেকোনো সময় তা দাঙ্গা, ধর্মীয় উত্তেজনা আকারে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যক্তির ওপরও হামলা হতে পরে। আর তা ঘটতে পারে ‘উস্কানিতে’ কিংবা বিনা উস্কানিতেই। এর বিধ্বংসী শক্তি ভয়াবহ। কেবল জীবনহানিই নয়, সেইসাথে জীবিতদের মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষতিও হয় মারাত্মক পর্যায়ের। তাছাড়া জীবিকায় দেখা দেয় অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও ঘটে। সমৃদ্ধ একটি পরিবার রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এসবের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো- ভয় আর সন্দেহের পরিবেশ সৃষ্টি। পারস্পরিক আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সব পন্থায় ‘স্বাভাবিক’ কার্যক্রম চালানো হয়ে পড়ে অসম্ভব।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নৃশংসতা এখন সুপরিচিত ও পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ। সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের সহিংসতা সৃষ্টিকারী সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে এ ব্যাপারে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছে সবচেয়ে কম। অথচ ভবিষ্যতের দাঙ্গা এবং আরো সহিংসতার শঙ্কা বজায় রাখতে এর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আর তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। আর এই বিষয়টির দিকেই আলোকপাত করেছেন আইনজীবি ওয়ারিশা ফারাসাত এবং আইনকর্মী প্রীতা ঝা। তাদের পর্যালোচনা তারা তুলে ধরেছেন তাদের Splintered Justice: Living the Horror of Mass Communal Violence in Bhagalpur and Gujarat  (Three Essays Collective, New Delhi, 2016) বইতে। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তদন্ত করেছেন, ন্যায়বিচারের জন্য আদালতে লড়াই করেছেন। দায়মুক্তির সংস্কৃতি কিভাবে ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে তারা তা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন।

লেখকেরা আবেগবর্জিতভাবে কাজটি করেছেন। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালে বিহারে এবং ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গা নিয়ে তারা নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। উভয় দাঙ্গাতেই টার্গেট ছিলেন মুসলিমরা। দাঙ্গা চলেছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। এতে বিপুলসংখ্যক বয়স্ক ও শিশু নিহত হয়। এছাড়া ধর্ষণ এবং অঙ্গহানির মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটতে থাকে। অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি প্রদান করা হলে আক্রান্তরা অন্তত বিচার পাওয়ার স্বস্তি অনুভব করতো। কিন্তু দেখা গেছে, বিচার নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভয়াবহভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে।

আবার তা কিন্তু একটি রাজনৈতিক প্রবণতা কিংবা একটি রাজ্য সরকারে সীমাবদ্ধ নয়। গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিষয়টি সবার জানা। কিন্তু বিহারের ভাগলপুরে তো বিজেপি ছিল না। সেখানে লালু প্রাসাদ, তার স্ত্রী রাবরি দেবী এবং পরে নীতিশ কুমার সরকারে ছিলেন। কিন্তু তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।

লেখকরা দেখতে পেয়েছেন, পুলিশের ভূমিকা স্পষ্টভাবেই দলীয় আনুগত্যভিত্তিক। আক্রান্তরা সহায়তাদের জন্য ব্যাকুল আবেদন জানাতে থাকলেও পুলিশ নির্মমভাবে উদাসীন থাকে। এমনকি জিডি করা এবং সেটা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার কাজটিতেও তারা অযথা বিলম্ব করে থাকে। তদন্ত যথাযথভাবে হয় না। শক্তিমানদের এড়িয়েই তদন্ত শেষ করার প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যায়। সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে জীবিতদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে পুলিশই কেবল জটিলতা সৃষ্টি করে তা নয়। আদালতও বিষয়গুলো যথাযথভাবে যত্নশীল থাকে না। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তরা আদালত থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা বলতে গেলে পায়ই না। আইনের সামগ্রিক-প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের তদাররিক যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যায়। আবার বিচার-প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকে যে, মনে হবে, কোনো দিনই এটা শেষ হবার নয়। আক্রান্তরা একপর্যায়ে জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। ভাগলপুরের দাঙ্গা হয়েছে ২৮ বছর আগে, আর গুজরাটেরটা ১৫ বছর আগে; অথচ এখন পর্যন্ত বিচার শেষ হয়নি।

দাঙ্গায় অনেকে তাদের পরিবার সদস্যদের হারিয়েছেন, অনেকে সম্পত্তি, জীবিকা খুইয়েছেন। কিন্তু একদিকে ন্যায়বিচার তারা পাননি, ক্ষতিপূরণের মুখও তারা এত দিনে দেখতে পাননি। ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের প্রক্রিয়াটাও বেশ জটিল। এখানেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, এই বইটিতে ভারতের বিচারব্যবস্থাকে এমন এক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, দাঙ্গা দমনে কার্যকর পন্থা নিতে হলে এ দিকটির দিকেই বেশি নজর দিতে হবে বলে বলা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সদস্যসহ যে কারো জন্যই এটা বড় ভুল হতে পারে, যদি তারা ধরে নেয়, তারা এতে আক্রান্ত যেহেতু হবে না, তা-ই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই তাদের। নাগরিকদের একটি ছোট অংশের বেলায়ও যদি নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তবে তা স্পষ্টভাবেই তার অকার্যকারিতার প্রমাণ। আর সেটা একসময় অনিবার্যভাবে আমাদের সবাইকেই আক্রান্ত করবে। ওয়ারিশা ফারাসাত ও প্রীতা ঝা এই বিষয়টিই নজরে এনেছেন। আমাদের এখন যা করতে হবে তা হলো- তাদের পরিশ্রম বৃথা না যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান। সেটা শুরু করতে হবে বিচার বিভাগকে সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে।

(ফ্রন্টলাইন থেকে)