Home » সময়ের বিশ্লেষণ (page 5)

সময়ের বিশ্লেষণ

ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন

সি আর আবরার ::

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুবার স্থগিত হওয়া ভারত সফর ৭ থেকে ১০ এপ্রিল হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে আস্থা রাখলে অনুমান করা যেতে পারে, বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা পানিচুক্তিটি এই সফরে চূড়ান্ত হচ্ছে না। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সইয়ের জন্য দুই ডজনেরও বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও নথি চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার চুক্তি। এটা হবে ‘বৃহত্তর কানেকটিভিটির অংশবিশেষ- যার আওতায় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত মালামাল পরিবহনের ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট করতে পারবে।’

বাংলাদেশ ও ভারত- উভয় দেশের নীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে ধারণা রয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার জোরালো প্রয়াসের অংশ হিসেবে ভারতের উদ্বেগ নিরসনে অন্য যেকোনো প্রতিবেশীর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক বেশি সাড়া দিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ- বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে- প্রশমিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক প্রয়াস ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। একইভাবে মূল ভূখন্ড এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে আরো ভালো কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠার জন্য নদী ও স্থল রুটগুলো খুলে দেওয়াটা ছিল ভারতের সম্প্রসারিত জাতীয় স্বার্থের জন্যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

এ ধরনের বড় বড় ছাড় সত্ত্বেও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি প্রধান উদ্বেগও দূর করেনি। সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে অতি সামান্য অগ্রগতি হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ের চেয়ে অনেক নিচে রয়েছে। যদিও ২০১৫ সালের বহুল প্রশংসিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি বর্তমান ভারতীয় নেতৃত্বের শুভেচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ চার দশক আগেই ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে দেশের সংবিধান সংশোধন করার মাধ্যমে চুক্তিটি সাথে সাথেই বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিল। এটাও স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, শুষ্ক মওসুমে পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তির আগে ফারাক্কা বাধের কার্যক্রম শুরু হবে না- ১৯৭৪ সালে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে এমন  সমঝোতা হয়েছিল ফারাক্কা বাধ নিয়ে। বাধটির ফিডার ক্যানেলগুলো পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ মাত্র ১০ দিনের জন্য অনুমতি দিলেও, ভারত বাধটি চালু করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা অব্যাহত রাখে।

সম্প্রতি চীন থেকে বাংলাদেশের দুটি সাবমেরিন কেনার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফরটিকে নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রার সৃষ্টি করে। সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দল নিয়ে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর; বহু বিষয়াদি-সংশ্লিষ্ট  দীর্ঘ মেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি আদায়ে সাউথ ব্লকের প্রবল আগ্রহের মধ্যে ভারতের আঙিনায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে দিল্লি যে কতটা উদ্বিগ্ন তা-ই  এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের নৌ বাহিনী সংশ্লিষ্ট ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়টি দিল্লির প্রভাবশালী কোনো কোনো মহলে বড়ভাইসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ভারতীয় রাজ্যসভার ‘ইন্ডিয়াস ওয়ার্ল্ড’ নামের টিভি শোয়ে রাষ্ট্রদূত কানওয়াল শিবাল বলেছেন, প্রতিবেশী গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে পা রাখার জায়গা লাভের চীনা কৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে ভারত এবং ভারত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছে, ‘শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ এটা দিচ্ছে।’ তিনি এমন অযাচিত পরামর্শও দেন যে, চীনের বদলে রাশিয়ার কাছ থেকেও বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনতে পারতো, ‘কারণ তা ভারতের জন্য কম সমস্যার সৃষ্টি করতো।’ তার বক্তব্যের বোঝা যাচ্ছে, কোন সূত্র থেকে সাবমেরিন কিনবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাংলাদেশের উচিত ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

টকশোতে উপস্থিতি বিজ্ঞ ব্যক্তিরা আশ্চর্য হয়ে গেছেন, বাংলাদেশ যখন ‘তার সব সমুদ্রসীমা বিষয়ক সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে’ তখন কেন দেশটি সাবমেরিন কেনার উদ্যোগ নিল? ফলে এই প্রশ্নটি মনে উদয় হতেই পারে, ভারত যদি তার নিজস্ব সীমানা সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলে, তখন কি তার নিজস্ব বিমানবাহী রণতরী এবং সাবমেরিনগুলো বিক্রি করে দেবে?

সাবেক কূটনীতিক এবং বর্তমানের শিক্ষাবিদ বিনা সিক্রি আরো এক ধাপ এগিয়ে ঊদ্ধত্যপূর্ণ দাবি করেছেন, গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে ‘শেখ হাসিনার আমলে চীনপন্থী আমলাদের অব্যাহত শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে!’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।’ বাংলাদেশের এই স্বঘোষিত মঙ্গলকামীর এ ধরনের তথ্যের সূত্র জানতে খুবই ইচ্ছা জাগে। হাই কমিশনার সিক্রি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল চীন এবং দেশটি ‘তার বাবাকে’ সমর্থন করেনি। বাংলাদেশী ও ভারতীয়দের মধ্যে জনগণ পর্যায়ের যোগাযোগের সাফাই গাওয়ার সময় এই অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক তার সব কূটনৈতিক প্রশিক্ষন ও শিষ্টাচার পাশে সরিয়ে রেখে বলেছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সব মন্ত্রীকে ‌‌”নানাপন্থায় বশ মানিয়ে রাখা হতে পারে। তিনি শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, চীনের গভীর গভীর পকেট আছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার সফরের পরিকল্পনা করার প্রেক্ষাপটে তার তদারকিতে নিয়োজিতদের উচিত নয়া দিল্লিতে বিরাজমান মনোভাব সম্পর্কে যথাযথ অবগত থাকা। বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একতরফা লেনদেন নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটাই সময় হাতে থাকা শেষ কয়েকটি দরকষাকষির বস্তুকে ধরে রাখা এবং নয়া দিল্লি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত বিনিময় চুক্তি না করা পর্যন্ত ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট ও পরিবহণ চুক্তিতে অগ্রসর না হওয়া।

(লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

দিল্লির প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রস্তাবে আগ্রহী নয় ঢাকা

আমীর খসরু ::

কয়েক দফা স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে এপ্রিলে ভারত সফর করতে সম্মত হয়েছেন। এই সফরটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা জল্পনা ভাসছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, গঙ্গা ব্যারেজ এগুলোই খুব বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, এগুলো স্রেফ হিমবাহের শৃঙ্গ। পানির নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালেই থেকে গিয়েছিল। আর সেটা হলো বাংলাদেশকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে  চাইছে ভারত।

দিল্লি চাচ্ছে, ২৫ বছর মেয়াদি একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। কিন্তু ঢাকা ভারতের সাথে ওই ধরনের কাঠামোগত চুক্তিতে থাকতে চাইছে না; তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় থাকুক তা কামনা করে। বেশ শিথিল, কম আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের কথা ভাবছে বাংলাদেশ, এমনকি কোনো সময়-সীমা নির্ধারনের কাঠামোও রাখতে চাইছে না।

গত ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময়ই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কর বাংলাদেশের সাথে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আইডিয়াটি প্রকাশ করেছিলেন। এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস. জয়শঙ্করের সফরের সময় এ নিয়ে আরো আলোচনা হয়। জয়শঙ্কর অবশ্য বলেছিলেন, বৈঠকটিতে ‘কানেকটিভিটি ও উন্নয়ন উদ্যোগের’ প্রতি নজর দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা  হয়েছে। তবে আসল কারণটি হতে পারে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি।

বাংলাদেশের এক শীর্ষ কূটনীতিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেছিলেন, ’ভারত চায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপকভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। আমরা চাই আরো ধীরে ধীরে ধাপে ধারে গ্রহণ করা পদক্ষেপ। সমঝোতা স্মারক হবে শুরুর জন্য ভালো বিষয়’। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘ভারতের সাথে আমরা বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চাই। আমাদের দুই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ক উন্নত হচ্ছে, আমরা একসাথে সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলা করছি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সময় এখনো আসেনি।’ ভারতের প্রস্তাবিত চুক্তিতে দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি ও সরবরাহ এবং পারস্পরিক ধারণায় থাকা হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযানের কথা বলা হয়েছে।

দ্য হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত চাচ্ছে বাংলাদেশের কাছে ৫০ কোটি ডলারের ঋনে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-ও একই তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ভারত ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চাইছে বাংলাদেশকে।  বাংলাদেশ হয়তো এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে; তবে তা হবে ভিন্নভাবে অর্থাৎ উপকূল রক্ষা বাহিনীর জন্য টহল বিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষার জন্য রাডার কেনার কাজে ব্যবহার করবে।

ভারতীয় মিডিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স্টপোস্টের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাই ভারতকে ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে উৎসাহিত করছে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে চীনই বাংলাদেশের বৃহত্তর অস্ত্র সরবরাহকারী। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে আসা অস্ত্রের ৮০ ভাগই সরবরাহ করেছে চীন।

এই ২০১৬ সালের নভেম্বরেও চীনের কাছ থেকে ঢাকা দুটি সাবমেরিন কিনেছে। এই ঘটনায় নয়া-দিল্লির অনেকের চোখ কপালে ঠেকেছে। তখন থেকেই ভারত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে বাংলাদেশকে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক কর্মকর্তাই ভারতীয় সামরিক সরঞ্জাম কিনকে আগ্রহী নয়। কারণ ভারত নিজেই অন্যান্য দেশের কাছ থেকে অস্ত্র আমদানি করে থাকে। তারা নেপাল ও মিয়ানমারে সরবরাহ করা ভারতীয় অস্ত্রের নিম্নমানের কথাও উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা চীন ও ভারতের সাথে তার দেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা অব্যাহত রাখতে চাইছেন। গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের ঢাকা সফরের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীন ও বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই করে।

চীনের ‘মুক্তার মালা’ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাদেশ। ভারত মহাসাগরে প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশে সামরিক স্থাপনার কৌশলগত স্থাপন হলো- এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

অবশ্য ২০১৫ সালে শেখ হাসিনার সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় তা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্বাস বেড়েছে। আবার চীনকে হতাশ করে হাসিনা সরকার চারটি প্রকল্পের অন্যতম সোনাদিয়া বন্দর পরিকল্পনাও বাতিল করে দেয়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইন্দ্রানি বাগচির মতে, সিদ্ধান্ত ছিল কৌশলগত এবং ভারতকে বিবেচনায় রেখেই তা করা হয়েছিল।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার সফর দুবার পিছিয়েছে, একবার ডিসেম্বরে, আরেকবার ফেব্রুয়ারিতে । দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কারণ হিসেবে উভয় প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব-নির্ধারিত কর্মসূচির কথা উল্লেখ করলেও পানিবণ্টন চুক্তিসহ বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে অচলাবস্থাই সফর স্থগিত হওয়ার মূল কারণ বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বাংলাদেশ পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান শামসুল আরেফিনের মতে, ‘বাংলাদেশ এখনো কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের জন্য নদীর পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘হাসিনার প্রয়োজন পানিবণ্টনের মতো কিছু চুক্তি নিয়ে ভারত থেকে ফিরতে। তিনি ভারতীয় বিদ্রোহীদের বিদায় করার মতো ভারতের নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটিবিষয়ক সব উদ্বেগ দূর করেছেন, ভারতের গোলযোগপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট দিয়েছেন। এখন ভারতের প্রতিদান দেওয়ার সময়।’ আরেফিন বলেন, নদীর পানিবণ্টনের মতো ইস্যুতে সমাধান পেতে ব্যর্থতা নিশ্চিতভাবেই পল্লীর ভোটাদের ওপর প্রভাব ফেলবে।

একটি ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশ সম্ভবত একই স্থানে রয়েছে। সেটা হলো সন্ত্রাসবাদ। শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা  জঙ্গীবাদ ও  সন্ত্রাসের উত্থান দেখেছে। বাংলাদেশে ঝামেলা সৃষ্টিতে ইন্ধন দেওয়ার জন্য ঢাকা দায়ী করেছে ইসলামাবাদকে। ফলে ঢাকা যখন ২০১৬ সালের ইসলামাবাদের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়, তখন তাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না।

এছাড়া ১৯ সেপ্টেম্বর কাশ্মিরের উরি হামলার পরপরই পাকিস্তানকে নিন্দা করে। দ্য ইকোনমিক টাইমস জানায়, সন্ত্রাস দমনে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ সভাও করেছে।

অবশ্য এপ্রিলে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার মধ্যকার বৈঠকের ফলাফলই সব জল্পনা-কল্পনার সমাধান দিতে পারবে।

(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট ও ফার্স্টপোস্ট অবলম্বনে)

 

শিক্ষার সর্বগ্রাসী সংকট : মেধাহীন প্রজন্ম সৃষ্টির কূটকৌশল

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ‘মানব-সম্পদ উন্নয়ন’। প্রশ্নপত্র ফাঁস আর ‘গায়েবী’ নির্দেশে পরীক্ষা পাশের হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মানব-সম্পদ ‘ধুঁকছে’;  মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিপর্যস্ত শিক্ষকদের দলাদলিতে। স্কুল শিক্ষকদের পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, পিপার-স্প্রে দিয়ে শাসন করা হয়। একজন সংসদ সদস্য শিক্ষকদের উদোম করে রাস্তা প্রদক্ষিণ করিয়েছেন, প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠ-বস করিয়েছেন আরেক সংসদ সদস্য।  এর ফলে শিক্ষকরা উদোম বা কান ধরে ওঠ-বস করেছেন, না গোটা জাতি করেছে- এ নিয়ে ভাবার সময় নেই। আর শিক্ষক নেতাদের মুখে তো কুলুপ!

প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে কানেই তোলেননি। ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নীতি পাল্টেছেন। সবশেষে বলেছেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো পুরোপুরি সম্ভব নয়। এর আগে বলেছিলেন, “কিছুসংখ্যক ‘কুলাঙ্গার’ শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছে। কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস সামলাবো”? তারপরে বলেছিলেন, “আমাদের ভাল শিক্ষক নেই”। এইসব কথামালা একটি বিষয়কেই ইঙ্গিত করে- হয় প্রশ্ন ফাঁসকারীরা সরকারের চেয়ে শক্তিশালী, অথবা সরকারের প্রভাবশালীরা প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত।

ভুলে ভরা বিকৃত পাঠ্যবই পৌঁছাচ্ছে আর মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে পাশের হার বাড়াচ্ছে। শিক্ষায় শনৈ: শনৈ: উন্নতির গল্প শুনছে মানুষ। এর মধ্য দিয়ে কি মনোজগত তৈরী হচ্ছে শিক্ষার্থীদের? সারাদেশে কিশোর অপরাধ বাড়ার কারন কি এই ভুল-বিকৃত শিক্ষার মনোজমিন। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে যে মৌলিক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে- সেই তুলনায় সময়মত বই পৌঁছানো কি সত্যিই সাফল্য? কি ফলাও করেই না এই সাফল্য প্রচার করা হয়!

সত্যটা কি উপলব্দিতে আছে? দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার-আত্মসাত হলেও ক্ষতি পোষানো যায়! চাইলে চলমান হত্যাকান্ড থামিয়ে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়নও করা সম্ভব; ধ্বসে যাওয়া নির্বাচন ব্যবস্থা মেরামত সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরিও বন্ধ করা যায়। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্তর্গত ক্ষতি-ধ্বস কি ইচ্ছে করলেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব? এর জন্য কত সময় লাগবে, কত মূল্য দিতে হবে জানা নেই। অন্তত: একটি প্রজন্ম তো বটেই।

প্রশ্ন ফাঁস, নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশের মত অশিক্ষা নিয়ে যারা পাশ করে বের হচ্ছে, আগামী এক-দেড় দশক পরে তারাই নেতৃত্বে থাকবে। এই শিক্ষা ও মেধা নিয়ে তারা কেমন নেতৃত্ব দেবেন? মেধাবী-যোগ্য মানুষ কি পাওয়া যাবে? ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নের সুযোগে যারা ডাক্তার হয়ে বেরিয়ে আসবেন, তারা কি চিকিৎসা সেবা দেবে? ভয়াবহতা-ধ্বস কতটা ঘটেছে, আপাত: আমোদে মত্ত আমরা কি তা অনুমান করতে পারছি!

এটি স্বীকৃত সত্য যে, দেশে মানুষকে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষিত করা গেলে মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটে। শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে বড় উদাহরন। সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ায় উন্নয়ন তার আপন গতি পেয়েছে। রাস্তা-ফ্লাইওভার, সেতু নির্মান উন্নয়ন নয়, উন্নয়ন সহায়ক কাজ। প্রযুক্তি তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন শিক্ষা-মেধা দিয়ে সেগুলি তৈরী করে মানুষ ব্যবহার করে উপকৃত হয়। এখানে অমূল্য একটি প্রশ্ন হচ্ছে- এই ব্যবস্থার কি শিক্ষা-মেধা কোনটি নিশ্চিত করছে, কি নিশ্চিত করবে?

আমরা কি তাহলে পুরো ব্যবস্থাই ধ্বংস করে দিলাম? ৯৫ শতাংশ মানুষের সন্তান যে শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ তার কথাই বলা হচ্ছে – ৫ শতাংশের সন্তানরা ইংরেজী মাধ্যমে পড়ালেখা করে। ‘ও’ লেভেল পাশ করে উন্নত দেশের নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়, সেটির আরও উন্নতি হচ্ছে। এই যে বৈষম্য তা থাকবে না- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো ছিল সেটিই। সুতরাং ৯৫ শতাংশের ব্যবস্থা ধ্বসিয়ে দিয়ে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হবে?

দুই.এক দলদাস শিক্ষকের কথা বলি। এমত শিক্ষক এখন ছড়ানো-ছিটানো সর্বত্র। শিক্ষার ধ্বস, অবনমন ও নজিরবিহীন অনাচারের বিরুদ্ধে এরা কথা বলেন না কখনও। এরকম এক দলদাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রফেসর আব্দুল আজিজ ২০১৪ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীতে ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় যা বলেছিলেন তা মনে করিয়ে দেব। ঐ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী  আসাদুজ্জামান নুর।

“ছাত্রলীগের সব নেতা-কর্মীদের চাকরী দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হক্ষে, কোন কর্মী যেন বেকার না থাকে। ছাত্রলীগ নেতাদের রেজাল্টের প্রয়োজন নেই। তাদের গায়ের ক্ষতচিহ্নই তাদের বড় যোগ্যতা…। বর্তমান সরকারের আমলে কেবল ছাত্রলীগ কর্মীদের চাকরী দিতে সরকারকে আহবান জানাই”। প্রফেসর আজিজের এই মৌলিক প্রস্তাবনার প্রতিধ্বনি ছিল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের কথায়। তিনিও বলেছিলেন, ছাত্রলীগ কর্মীদের শুধু লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেই হবে, বাকিটুকু তারা দেখবেন।

জাতির সবচেয়ে উজ্বল সময়ে ন্যায্য রাষ্ট্র চিন্তায় শিক্ষকরা ভূমিকা রেখেছিলেন। চিন্তায়, মননে  ছিলেন নির্মোহ, নির্লোভ, পক্ষপাতহীন। তারা জাতিকে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু দলদাস শিক্ষকরা তাদের উত্তরাধিকার নন। এই শ্রেনীটি সবসময় সব ক্ষমতাসীনদের সাথেই আছেন। ক্রমাগত মূল্যবোধ-হ্রাসপ্রাপ্ত গত চার দশকে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা হয়ে পড়েছে নতজানু। শিক্ষক-শিক্ষকতার এই অবনমন সবকিছুতেই গা সহা সমাজকে আর আলোড়িত করে না, আন্দোলিতও করে না।

শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার ধ্বস নিয়ে প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীর গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ১০ শতাংশের বেশি ভর্তি পরীক্ষায় টিকছে না- গণমাধ্যমে এমত সমালোচনার পর শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মত। খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন বললেন, “আমাদের ছেলে-মেয়েরা বেশি সংখ্যায় পাশ করবে তাও অনেকে চায় না”। ব্যাস, শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ভোল পাল্টে ফেললেন, গলা মেলামেল প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সাথে। তারা বিবেচনা করেননি, এই দলদাস ভূমিকা শিক্ষার সর্বনাশের পাশাপাশি তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে!

তিন. শিক্ষার সংকট কোথায়? এ আলোচনায় পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থার অধ:পতন ঘটেছে। কিছুকাল আগেও নকল ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা; এখন সেখানে সব ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। স্কুলকেন্দ্রিক পড়াশুনার বদলে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট শিক্ষক নির্ভর হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন মিলছে। শিক্ষার্থীদের অনুশীলন যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা পদ্ধতি এখন কার্যত: অকার্যকর। এরসাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার হার বাড়ানোর উচ্চাভিলাষ।

শিক্ষাবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, “শিক্ষার প্রধান সমস্যা তিনটি। প্রথমত: বাণিজ্যিকীকরণ। শিক্ষা পণ্যে পরিনত হয়েছে। পূঁজিবাদী সমাজে মুনাফাই যেহেতু লক্ষ্য, তাই পণ্যে ভেজাল হওয়া খুবই স্বাভাবিক। শিক্ষা নামক পণ্যটিতেও ওই ভেজালটা ঢুকে গেছে। দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রের গুরুত্বহীনতা; রাষ্ট্র যে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয় না, শিক্ষাই যে জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি, এটি রাষ্ট্র আমলে নেয় না। তৃতীয়ত: তিনধারার শিক্ষা; এটা রাষ্ট্র বাড়াচ্ছে। এরকম তিন ধারার শিক্ষা যত বাড়বে বৈষম্য তত বাড়বে”।

জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম বিষয় ছিল শিক্ষার হার বৃদ্ধি। এই লক্ষ্যপূরণে মরিয়া সরকার পাশের হার বাড়াতে, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নম্বর বাড়িয়ে, মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। জেনুইন নম্বর দিতে গিয়ে অনেক শিক্ষক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এই সর্বগ্রাসী সরকারী চাহিদা মেটাতে মেধা মূল্যায়নে পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি কাজে আসছে না। প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষা পদ্ধতির সংকট, খাতা মূল্যায়নে সরকারী নির্দেশনা কেবল নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা এখন সমস্যাজর্জর। সরকারী, বেসরকারী, মাদ্রাসা ও ইংরেজী  মাধ্যমে শিক্ষা কাঠামো এই বহুমুখী সংকটকে সর্বগ্রাসী করে তুলছে।

চার. শিক্ষার বিদ্যমান স্তরে প্রাথমিক শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সবদেশেই প্রাথমিক শিক্ষা গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশেও তাই ছিল। এখন পয়তাাল্লিশ বয়সী এই দেশে ভাঙাচোরা প্রাথমিক স্কুল এখন দালানে পরিনত। ভাঙা ঘরে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক ছিলেন, স্কুল ছিল শিশুর দ্বিতীয় বাড়ি। শিক্ষক ছিলেন মা- বাবার পরের অভিভাবক। বঞ্চনা-কষ্টকে মেনে নিয়ে তারা শিশুকে একাডেমিক ও নৈতিক শিক্ষা দিতেন। কারো মধ্যে মেধার খোঁজ পেলে পরিচর্যা করতেন বিশেষভাবে।

ইট সিমেন্টের দালানে এখন “অন্যকিছু করতে না পারা” মেধাহীনরা প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত। যিনি এইচএসসি পাশ করেছেন টেনেটুনে। চাকরি নিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য বা কোন ক্ষমতাধরকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে। এলাকায় তিনি ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হন। চাষ-বাস বা ব্যবসা করেন। মাঝে মধ্যে স্কুলে যান আড্ডার মেজাজে।

শিক্ষার এই সংকট মূলত: সমাজের দৈন্য চেহারা এবং পাশাপাশি এটি সংঘবদ্ধ অপরাধী সমাজ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। অগণতান্ত্রিক ও চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিক বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসছে সমাজের সব স্তরে। মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে এবং জড়িয়ে পড়ছে দখলদারিত্ব আর অনৈতিক প্রতিযোগিতায়। উগ্রপন্থা, সহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটছে।

এই অবস্থা প্রমান করছে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মানবিক, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চেতনার নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে না। সংস্কৃতি বিনির্মানেও শিক্ষাব্যবস্থা অক্ষম। সামাজিক বৈষম্য দুর করা ও নানামতের প্রয়োজনীয়তা বোঝার বদলে শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

এর মূল কারন নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের উপরিকাঠামোয়। রাষ্ট্র যেমন গণতান্ত্রিক চেহারা বিসর্জন দিচ্ছে, কঠোর কর্তৃত্ববাদীতায় ঢেকে দিচ্ছে সবকিছু, শিক্ষাঙ্গনেও পড়েছে এর কড়ালগ্রাস। এই কঠোর, কর্তৃত্ববাদী শাসনে সরকার হয়ে উঠেছে আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অদৃশ্য শক্তি নির্ভর। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আজকের অবস্থায় নিয়ে আসা এবং শিক্ষাঙ্গণে গণতন্ত্র চর্চা, প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি নিপুন কৌশলে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে- শুধুমাত্র ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার বাসনায়।

এজন্যই প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, “সমাধানের প্রশ্নে গেলে বলব, সংস্কারের সময় শেষ হয়ে গেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কারের আর কোন সুযোগ নেই। এখন সমাজের আমুল রূপান্তর দরকার। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের এখন আমুল পরিবর্তন ছাড়া যে কিছু সঠিক হবে না এই সত্যটি মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে”।

উন্নয়নের সহিংসতা

আনু মুহাম্মদ ::

‘উন্নয়ন’ শব্দটি সকলের জন্য একই অর্থ বহন করে না। উন্নয়ন কি সকলের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে নাকি বহুজনের জীবন ও প্রকৃতির বিনিময়ে কতিপয়কে দানব বানাবে, তা নির্ভর করে উন্নয়নের গতিপথ কারা নির্ধারণ করছে তার ওপর। পুঁজির শাসনের মধ্যে যখন আমরা বাস করি, তখন যে কোনো উপায়ে পুঁজির সংবর্ধনকেই ‘উন্নয়ন’ নাম দিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হয়। তার পরিণতি যা-ই হোক না কেন, প্রচারণায় তৈরি করা একটা আচ্ছন্নতার কারণে উন্নয়নের সাথে ধ্বংস বা বিপন্নতার পার্থক্য ধরতে সমাজ অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়।

বর্তমান সমাজে ‘উন্নয়ন’ নামে কতিপয়ের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভবন প্রক্রিয়াটি অন্তর্গতভাবেই সহিংস। পাওলো ফ্রেইরির ভাষায়, ‘Every relationship of domination, of exploitation,of oppression,is by definition violent, whether or not the violence is expressed by drastic means. In such a relationship, dominator and dominated alike are reduced to things – the former dehumanized by an  excess of power and later by lack of it.’ (The Practice of Freedom,1973) । অর্থাৎ এ রকম সমাজে প্রতিটি আধিপত্যের সম্পর্ক, প্রতিটি শোষণ ও নিপীড়নের সম্পর্ক নিজে থেকেই সহিংস; তাতে সহিংসতা খোলাখুলি ভয়াবহ চেহারায় দেখা যাক বা না যাক। এ রকম সম্পর্কের মধ্যে আধিপত্যকারী এবং আধিপত্যের শিকার-দুই পক্ষই বস্তুতে পরিণত হয়। প্রথম দল ক্ষমতার আতিশয্যে অমানুষ হয়, দ্বিতীয় দল মানুষের জীবন থেকে ছিটকে পড়ে ক্ষমতার অভাবে।

২. বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় মাথাপিছু এক হাজার ডলার অতিক্রম করায় বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আসলে সঠিকভাবে পরিমাপ করলে বাংলাদেশের জিডিপি এবং মাথাপিছু আয় আরো বেশি হবে। কারণ বাংলাদেশে হিসাব বহির্ভূত আয়ের অনুপাত হিসাবকৃত জিডিপির শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি। এর একটি বড় অংশ চোরাই অর্থনীতি, যা তৈরি হয় ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, কমিশন, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প সম্পদ লুণ্ঠন, মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, নিপীড়নমূলক যৌন বাণিজ্য ইত্যাদি অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিমাপ করার অনেকগুলো সমস্যা আছে। একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে। কেননা জিডিপি বৃদ্ধি এমন সব উপায়ে হতে পারে যাতে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপন্ন হয়। সে জন্য জিডিপির গুণগত দিকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তাছাড়া মাথাপিছু আয় একটি গড় হিসাব। এ থেকে সমাজে আয় বিতরণের বা বৈষম্যের কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। সে জন্য যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয় বাড়লেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় অনেক নিম্ন পর্যায়ে থাকতে পারে, যেমন বাংলাদেশে আছে।

সে জন্যে মাথাপিছু আয় বেশি হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের সমান, অর্থাৎ তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এছাড়া আছে ভারত, পাকিস্তান, সেনেগাল, জিবুতি, সুদান। নাইজেরিয়া একই গ্রুপে হলেও তাদের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরো খারাপ।

৩. তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব এবং সেতু, সড়ক, ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন ইত্যাদির তালিকার পাশাপাশি কত নদী-খাল-জলাশয় নর্দমায় পরিণত হলো, এর কত ভাগ দখল হয়ে গেল, কত নদী মরে গেল, কত পাহাড় ব্যক্তি দখলে গেল, কত পাহাড় সমতল বানিয়ে ভবন হলো, কত বন উজাড় হলো, বাতাস কত দূষিত হলো, ভূগর্ভের পানি কত নিচে নামল, নদীর পানি কত দূষিত হলো, বায়ু কত বিষাক্ত হলো, ফল সবজি মাছ মাংস কত বিষমুক্ত হলো, শিক্ষা চিকিৎসার ব্যয় কত বাড়ল, দেশ কত ঋণগ্রস্ত হলো, কত হাজার লাখ কোটি টাকা লুট ও পাচার হলো, কত জমি দখল হলো, খুন গুম হলো কত মানুষ, নিরাপত্তাহীনতা কত বাড়ল, ভর্তি নিয়োগ বাণিজ্য কত বাড়ল, ঘুষ দুর্নীতি কমিশন কত বাড়ল, নারী নির্যাতন খুন ধর্ষণ পাচার কত বাড়ল, প্রতিষ্ঠান কত বিপর্যস্ত হলো-এই তালিকাও রাখতে হবে। তাহলে উন্নয়নের চরিত্র বোঝা যাবে; এটি আদৌ টেকসই কিনা, এর সুফলভোগী কারা, এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সমৃদ্ধি না বিপন্নতা তৈরি হচ্ছে তা বোঝা সম্ভব হবে।

৪. পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি, সহিংসতার শুরু হয়েছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প দিয়ে। মানুষকে কিছু না জানিয়ে, মানুষ ও প্রকৃতির কথা না ভেবে, বিদেশী ঋণ নিয়ে কাজ শুরু হলো। এক রাতে এই প্রকল্পের ‘শুভ উদ্বোধনে’ গ্রাম শহর ডুবে গেল, লাখো মানুষ ভেসে গেল। এভাবেই বৈরিতা আর সহিংসতার বীজ বপন ঘটল। এটা পাকিস্তান আমলের ঘটনা। বাংলাদেশ একটুও বদলায়নি, তার ওপর ভর করেই এগিয়েছে। সরকার পরিবর্তনেও ধারার পরিবর্তন ঘটেনি। চার দশক ধরে সহিংসতা, সামরিকীকরণ, জবরদস্তি, নির্যাতন, দখল, জাতিগত অস্তিত্বের অস্বীকৃতি ও অবমাননা-এ সবই পার্বত্য চট্টগ্রামের দিনের পর দিনের কাহিনী। কত লাখ কোটি টাকা এর কারণেই অপচয় হলো, তার হিসাব নেই।

৫. ভবদহ এলাকার দরিদ্র, জলাবদ্ধতা-জর্জরিত কয়েক হাজার নারী-পুরুষ তাদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাতে এসেছিল; বিনিময়ে পুলিশ এই দুর্বল মানুষদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। বছরের পর বছর এই জলাবদ্ধতা কেন তা একটু জানতে চেষ্টা করলেই পরিস্কার হবে এটা প্রাকৃতিক কারণে হয়নি, হয়েছে  ‘উন্নয়ন’ নামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের কারণে। দেশের বহু নদী মারা গেছে এসব প্রকল্পের কারণে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা আরেকটি ফলাফল। বহু মানুষ যে নদী ভাঙন ও জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে শহরে উদ্বাস্তু, তারও বড় কারণ এই সব প্রকল্প। সরকার পরিবর্তনে এর ধারাবাহিকতার কোনো পরিবর্তন হয় না; কারণ এর সুবিধাভোগী অভিন্ন। এসব প্রকল্পে লাভবান হয় দেশ-বিদেশের কতিপয় গোষ্ঠী। তার মধ্যে বহু ‘বিশেষজ্ঞ’ও আছে, যারা এগুলোর কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু ভোগান্তি বহন করতে হয় মানুষকে, প্রতিবাদ করলেও যাদের আঘাত পেতে হয়। উন্নয়ন নামের এসব প্রকল্পের যথেষ্ট বিরোধিতা হয়নি বলেই দেশে নদী পাহাড় জমি জলাশয় এবং শেষ বিচারে অসংখ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।

৬. টাম্পাকো নামের কারখানা মুহূর্তে শ্মশানে পরিণত হয়েছে। দুনিয়া ভেঙে পড়ার এই আর্তি, এই হাহাকার, এই পোড়া মানুষের ভার কে বহন করবে? ৩৫ জন শ্রমিকসহ মোট ৩৯ জন পুড়ে মরলো আবারও। নিমতলী, তাজরীন, রানা….একই মডেল। যারা বেঁচে কাতরাচ্ছে, তাদের জীবন হবে দুর্বিষহ। প্রতিটি লাশের পরিবারের জন্য সরকার দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে খালাস। জনগণের টাকা দিয়ে সরকারের এই ‘মহানুভবতা’ কেন? মালিক কই? পুলিশ এখন মালিককে খুঁজে পাচ্ছে না। এমপি সাহেবের কারখানায় এই মৃতের সারি তো কোনো দুর্ঘটনা নয়-হত্যাকান্ড। জানা ছিল সমস্যা, সাপ্লাই ঠিক রাখার জন্য মেরামত করার সময় মেলেনি মালিকের। মুনাফা উঁচুতে রাখার অন্যতম উপায় খরচ কমানো। খরচ কমানোর অন্যতম উপায় মজুরি কম দেয়া বা না দেয়া, আর কারখানার মধ্যে কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ না করা। মুনাফার প্রবাহ বাড়াতে জেনেশুনে তাই মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

কোনো কারখানার যন্ত্রপাতি যদি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, কোনো কারখানা ভবন যদি ত্রু টিপূর্ণ হয়, তার দেখাশোনার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তাদের কাছে মালিকের মুনাফাই প্রধান বিবেচ্য। বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে মুনাফার কাছে মানুষ আর পরিবেশ সব তুচ্ছ। মুনাফা কম হলে বিনিয়োগের উৎসাহ পাবে না মালিকরা, বিনিয়োগ না হলে জিডিপি বাড়বে না। রাষ্ট্র তাই জিডিপি বাড়ানোর জন্য, কিছু লোকের বিত্তবৈভব বাড়ানোর জন্য কোরবানি দিচ্ছে মানুষ আর পরিবেশকে। মুনাফা উঁচুতে রাখার অন্যতম উপায় খরচ কমানো : কাজের পরিবেশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ না করা, পানি নদী বায়ু দূষণ রোধের যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা। এতে শ্রমিকের জীবন গেল, নদী বন খুন হলো, তাতে কোনো সমস্যা নেই। শ্রমিকের সংগঠন নেই বলে প্রতিরোধ নেই, তাই মালিকের যথেচ্ছাচারের সুবিধা আরো বেশি। আর মজুরি চাইলে, নিরাপত্তা চাইলে পুলিশ তো আছেই। যখন এক কারখানায় পুড়ে ছাই বা ধসে পিষ্ট শ্রমিকরা, তখন অন্য অনেক কারখানায় বকেয়া মজুরি আর ঈদ বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা মিছিল করছে। পুলিশ তাদের ওপরও চড়াও হচ্ছে। থানা আর মাস্তানদের অর্থ দিয়ে যদি সব ঠান্ডা রাখা যায়, মজুরি আর বোনাস দেবার কী দরকার? নিরাপত্তার জন্য খরচেরই বা কী দরকার? এই হত্যাকান্ডের দায়ভার প্রথমত মালিকের, দ্বিতীয়ত সরকারের। আর দুজনই একাকার।

৭. ১৯৯৭ সালে মার্কিন কোম্পানির হাতে মাগুরছড়া বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এতে সরকারি দলিল অনুযায়ীও নষ্ট হয়েছে এমন পরিমাণ গ্যাস, যা প্রায় এক বছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের সমান। এর ক্ষতিপূরণ না দিয়ে অক্সিডেন্টাল নিজে লাভ করে নিয়ে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের কাছে ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়। ইউনোকল গ্যাস ‘রপ্তানি’র নামে পাচারের জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করে, কিন্তু জনপ্রতিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়। তার পরও অনেক মুনাফা নিয়ে এটিও ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়। আসে শেভরন। একের পর এক কেনাবেচা হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু এদের কারো গলায়ই ক্ষতিপূরণের কথা ওঠে না। এখন শেভরন অতিরিক্ত গ্যাস তুলে, লাউয়াছড়ার বিনাশ করে বিপুল মুনাফা পকেটে নিয়ে আরো অর্থ কামাইয়ের জন্য এই ব্যবসা বিক্রি করে চলে যাওয়ার আয়োজন করছে। বিভিন্ন মিডিয়া তাদের বিনিয়োগের কথা বলে ধন্য ধন্য করে, তার চেয়ে বেশি যে ক্ষতিপূরণের টাকা তাদের কাছেই আমাদের পাওনা, সেই কথার কোনাও শোনা যায় না। ক্ষতিপূরণ হিসাব করতে হবে যে পরিমাণ অনবায়নযোগ্য গ্যাস তারা নষ্ট করেছে, তা বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে আমদানির দাম ধরে। তার পরিমাণ কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

৮. ২০০৫ সাল থেকে আমরা ফুলবাড়ীতে জালিয়াত কোম্পানি এশিয়া এনার্জির (জিসিএম) উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরোধিতা করেছি। যথারীতি ‘উন্নয়নবিরোধী’সহ নানা অপবাদে ভূষিত হয়েছি, যুক্তি-তথ্য আর দেশের স্বার্থ না মেনে তখনকার চারদলীয় জোট সরকারও একদিকে কুৎসা অপপ্রচার, অন্যদিকে দমন-পীড়নের পথ নিয়েছে। বিশাল জনপ্রতিরোধক গুলি করে থামাতে চেয়েছে। খুন করেছে, পঙ্গু করেছে; কিন্তু টলাতে পারেনি মানুষকে। একপর্যায়ে সরকার নতি স্বীকার করে জনগণের সাথে চুক্তি করেছে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ তার নাম। এরপর আরো দু-তিন সরকার এলো। অঙ্গীকার সত্ত্বেও  চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, বারবার চেষ্টা হয়েছে এশিয়া এনার্জিকে পুন:প্রতিষ্ঠার। ফুলবাড়ীর কয়লা দেখিয়ে শেয়ার ব্যবসা করে কোম্পানি টাকা কামায়, কোনো সরকার আপত্তি করে না। শুধু ভাগ বসায় নিজের পকেটের জন্য। সন্ত্রাসী নিয়োগ, হামলা, মামলা, প্রচারণা চলে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে।

কোম্পানির টাকায় মন্ত্রী, এমপি, কনসালট্যান্ট, আমলা বিদেশে যায়। এসে বলে-কোনো ক্ষতি হবে না, দেখে এলাম জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া। আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলি, এই দেশ ভিন্ন, এখানে পানিসম্পদ সমৃদ্ধ, এখানে আবাদি জমি, এখানে ঘন জনবসতি। তা ছাড়া এই সম্পদ কেন বিদেশি কোম্পানি পাচার করতে পারবে? সব সম্পদ এই দেশের মানুষের কাজে লাগাতে হবে। অনেক ছলাকলা আর জোর-জবরদস্তি সত্ত্বেও   ফুলবাড়ী প্রতিরোধ কখনো দুর্বল হনি। তাই শেষ চক্রান্ত হয়েছে বড়পুকুরিয়া নিয়ে। সেখানে শুরু করে ফুলবাড়ীতে আসার ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে কোনোভাবেই প্রমাণ করা গেল না যে এটি বাংলাদেশে সম্ভব, বরং বারবার এটাই প্রমাণ হলো যে ভয়ংকর সর্বনাশ হবে।

যদি জনপ্রতিরোধ তৈরি না হতো, যদি অপমান অপবাদ নির্যাতন হামলা মামলা মোকাবেলা করে এই বিরোধিতা অব্যাহত না থাকত, তাহলে এত দিন উত্তরবঙ্গ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ পানির সর্বনাশ হতো সবচেয়ে বেশি, আর কয়লা সম্পদও কোম্পানির পকেট ভারী করে বিদেশে চলে যেত। তখন কি যারা একে উন্নয়ন দেখিয়ে দেশের সর্বনাশে উদ্যত হয়েছিল তাদের পাওয়া যেত?  না। আজ যখন এই আন্দোলনের ন্যায্যতা সরকারি গবেষণায়ই প্রমাণিত হচ্ছে, তখন তো এই মন্ত্রী এমপি আমলা ‘বিশেষজ্ঞ’দের নাম বিচারের তালিকায় স্পষ্ট করে লিখতে হবে। এদের খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, কারণ এসব লোকই এখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে ওকালতি করছে। ফুলবাড়ীর মতো সুন্দরবন রক্ষার লড়াইও দাঁড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তথ্য আর সর্বজনের সর্বপ্রাণের শক্তির ওপর। ইতোমধ্যেই আন্দোলনের নৈতিক বিজয় হয়েছে, প্রলাপ চলছে সুন্দরবনবিনাশী অসুরদের।

৯. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বহু সমস্যার একটি আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ভবন ও স্থান এখন সরকারি দলপুষ্ট লোকজনের দখলে। কোথায় তাহলে থাকবে শিক্ষার্থীরা? মেস করে থাকা ব্যয়বহুল এবং এখন নিরাপদও নয়। শিক্ষার্থীরাই সরকারকে সমাধান দিয়েছে, পুরনো কারাগারের স্থানে হল নির্মাণ করা হোক। এই প্রস্তাবই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। আরেকটি সমাধান হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভবন দখলমুক্ত করে আবাসিক সমস্যার সমাধান এবং পুরনো কারাগারের স্থানে রমনা পার্কের মতো শ্বাস নেবার জায়গা বানানো। কোনোভাবেই আবাসিক হলের চেয়ে শপিং মল গুরুত্ব পেতে পারে না। এই জমির দিকে নজর আছে ভূমিদস্যু, দখলদারদের। একদিকে সর্বজনের শিক্ষার দাবি, অন্যদিকে সর্বজনের জমিতে কতিপয় গোষ্ঠীর ব্যবসার দাবি। সরকার যে দ্বিতীয় পক্ষের নানা প্রস্তাব নিয়েই বেশি আগ্রহী তা গত ২২ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা থেকেই স্পষ্ট হলো।

১০. ফরসা হবার ক্রিম, টুথপেস্ট, সাবান বা পাউডার, হরলিকস, গুঁড়া দুধ, কোক-পেপসি-টাইগার-ফ্রুটিকাসহ নানা নামের তথাকথিত এনার্জি  ড্রিংক ইত্যাদির বিজ্ঞাপনে অ্যাপ্রন পরা বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তার দেখা যায়। তারা আমাদের জানায় যে এগুলো খুবই কার্যকর বা স্বাস্থ্যকর বা শক্তিবর্ধক বা সৌন্দর্যবৃদ্ধির অমোঘ উপায়। আর বিজ্ঞানীর একটু অনুসন্ধানেই বের হয় ইউনিলিভারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সব প্রসাধন সামগ্রীতে ভয়াবহ প্লাস্টিক  কণা, কোক-পেপসি-ফ্রুটিকাসহ এনার্জি ড্রিংকে বিষ, হরলিকসে বিপজ্জনক উপাদান। বিজ্ঞান যেগুলোকে সর্বনাশা বলে, বিজ্ঞাপন সেগুলোকে মানুষের সামনে মনোহর করে হাজির করে। ক্রিম মেখে ফরসা হবার, বিষাক্ত জিনিস খেয়ে স্মার্ট হবার উন্মাদনা তৈরি হয়। বাজার বিস্তৃত হয়। জিডিপি বাড়ে। ঘরে ঘরে সর্বনাশ ঘটতে থাকে।

সুন্দরবন, বড়পুকুরিয়া, বাঁশখালী, রূপপুরসহ তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের পক্ষে ওকালতি করার জন্য আমরা যেসব বিশেষজ্ঞ দেখি, তারা ওই রকম বিজ্ঞাপনের অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার/বিশেষজ্ঞের মতোই, অর্থের বিনিময়ে তারা বিষকে মধু হিসেবে হাজির করে। মুনাফার উন্মাদনায় কোম্পানি আর ‘সরকার’ একাকার হয়ে মানুষের শরীর ও জগৎকে বিষময় করতে করতে উন্নয়নের বাদ্য বাজায়।

১১. বিজ্ঞাপনী সংস্থা ভাড়া করা হয়েছে রামপাল প্রকল্পের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য। প্রচার ডিজাইনের অংশ হিসেবে আমদানি করা ভাড়াটে ‘বিশেষজ্ঞ’রা বেশ তৎপর। ভাড়াটে কথায় কোনো লাগাম থাকে না, তাই তারা বলতে পারে : ‘এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে, যাতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনোই বায়ুদূষণ হবে না, বরং দূষণ আরো কমে যাবে, সুন্দরবন আরো সুরক্ষিত হবে। পানি এতই বিশুদ্ধ করা হবে যে তা পান করাও সম্ভব হবে?’

এ দেশের নদী ও বনবিনাশী বিভিন্ন প্রকল্প, সড়ক-সেতু-ভবন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি, মানুষের জীবন ও সম্পদ নিয়ে ভয়াবহ সব চুক্তি, ঋণনির্ভরতা সৃষ্টি, জাতীয় সক্ষমতার ক্ষয় ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নামের কনসালট্যান্টদের ভূমিকা নীতি-কাঠামো প্রণয়ন ও যৌক্তিকতা নির্ধারণের, আমলাদের ভূমিকা তার বাস্তবায়নের পথ তৈরি। আর ক্ষমতায় থাকা সামরিক-বেসামরিক রাজনীতিবিদদের ভূমিকা ক্ষমতা খাটিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন। সবার সুবিধা যোগসাজশেই এগুলো হয়। কোনো কোনো অপকর্মের জন্য রাজনীতিবিদদের শাস্তি হয়, কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, ক্ষমতায় থাকা জেনারেলদেরও বিচার হয়; বিচার না হলেও জনগণের বিচারে তাদের পরিচয় নির্দিষ্ট হয়, কেউ চোর, কেউ প্রতারক, কেউ জালিয়াত ইত্যাদি। কিন্তু যে সব কাজের জন্য এসব তিরস্কার, সেগুলোর সাথে যুক্ত থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে, এমনকি জনধিক্কারেরও বাইরে থাকে বিশেষজ্ঞ নামের কনসালট্যান্ট বা লবিস্টরা, মিডিয়া আর সংশ্লিষ্ট আমলারা। অথচ তারাই তৈরি করে সর্বনাশের ভিত। (সৌজন্যে : সর্বজনকথা)

২০১৬ : জঙ্গীবাদীরা যে বার্তাটি দিয়ে গেল

আমীর খসরু ::

বিদায়ী বছরটি বাংলাদেশের জন্য আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে তেমন ঘটনাবহুল ছিল না। এ বছরটিতে ক্ষমতাসীনরা আগের ধারাবাহিকতায়ই মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেই বিরোধী মত, পথ, পক্ষ এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে দমনের কৌশল গ্রহণ আগের মতোই করেছিল। যে কারণে রাজনৈতিক নানা নিপীড়ন-নির্যাতন, নিখোজ করে দেয়া, গুম, আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও জারী থাকবে কিনা- সে প্রশ্নটিই রেখে যাচ্ছে- ২০১৬। সরকারের অঘোষিত যে উদ্যোগ অর্থাৎ বিরোধী দলশূন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা-আপাতদৃষ্টিতে তা সফল হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিরোধী দলগুলো ক্রমাগত নির্জীব হয়ে যাচ্ছে; মানুষ রাষ্ট্রীয় নানা সন্ত্রাস, অনিয়মের বিরুদ্ধেও আর সোচ্চার নয়; সবাই যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন; আর এমন এক নিদারুন অস্বস্তিকর চুপ থাকার বা চুপ করিয়ে দেয়ার নীতি একটি রাষ্ট্রের জন্য যে কতোটা ভয়ংকরভাবে ক্ষতিকর তা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকুও এখন আর বাকি নেই। বাকি নেই বললে ভুল হবে, এটা লোপ পাওয়ানো হয়েছে বা পেয়েছে বহুকাল আগেই। আর বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ও কৌশলগত। তবে একথাটি মনে রাখতে হবে যে, বিরোধী দল, মত, পথ, পক্ষকে আপাত দমন করা গেলেও, মানুষের মনোজগতকে কোনোভাবেই দমন করা যায় না এবং এর উপরে কোনো কর্তৃত্বই জারী করা নিস্ফল।

গণতন্ত্রের বদলে উন্নয়ন এবং অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র আর বেশি বেশি উন্নয়ন অগণতান্ত্রিক শাসকদের শ্লোগান বটে; তবে তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মানকুর অলসন তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Rise and Decline of Nations: Economic Growth, Stagflation and Social Rigidities-এ দেখিয়েছেন, আমাদের মতো রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো আসলে Distributional coalition অর্থাৎ একটি ভাগবাটোয়ারাকারী পক্ষই রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে।

একথা জোর দিয়ে ২০১৬-তেও বারবার বলা হয়েছে যে, কি কি ব্যবস্থাবলী এবং প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে; কতো কতো উন্নয়ন করা হয়েছে – তার ফিরিস্তিও সরকারের দিক থেকে দীর্ঘ। তবে এই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য? জনগণ কিভাবে এবং কতোটুকু উপকৃত হয়েছে সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে? যদি জনগণ উপকৃত না হয়ে থাকে তাহলে ২০১৬ সালেও সেই একই প্রশ্ন ছিল- উন্নয়নের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা কতোটুকু? বাস্তব জবাব কি হবে তা আমরা সবাই জানি। অর্মত্য সেন তার গ্রন্থ The Idea of Justice -এ বলেছেন, ‘‘আনুষ্ঠানিকভাবে কি কি প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে’’।

জনগণের জন্য উন্নয়ন ভাবনার ক্ষেত্রে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক সামির আমিন বলেছেন, ‘‘উন্নয়নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে জন-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো- রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন’’।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এসব কথা যাদের কাছে পৌছানো প্রয়োজন তাদের কাছে তা পৌছেনা অথবা যতোটা দেখা যাচ্ছে, তারা এতে আদৌ বিশ্বাসী নন।

বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো কার্যত স্থগিত রেখে; একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের অনুপস্থিতিতে জনগণের উন্নয়ন বাস্তবে কতোটা সম্ভব সে প্রশ্ন ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে এসে আবারও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রকট হয়েছে- জনগণের সাথে রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে সম্পর্ক তা কতোটা শিথিল হয়েছে-সে প্রশ্নটিও। এ কথাটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, সচল-সজীব জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় জনগণ ভোটাধিকারের প্রথম ধাপটি পার হয়ে একে একে অন্যান্য অধিকারগুলো ভোগ করবেন-এটাই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। কিন্তু সে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকায় জনগণ এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, রাষ্ট্রের সাথে তাদের হয় বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে অথবা অবস্থাটা দাড়িয়েছে এমন যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি কোনোভাবেই জনগণের সাথে যে চুক্তিতে আবদ্ধ-তার বরখেলাপ হয়ে গেছে। আর এটি করা হয়েছে জনগণকে বিতাড়িত করার জন্য অত্যন্ত কৌশলে।

সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তারা নিজেদের পুরো মাত্রায় অপ্রাপ্তির বেদনায় পরাজিত বলে মনে করছে। কারণ তেল-গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিই হোক বা তাদের নামে উন্নয়নের বিষয়ই হোক- তা সবই হচ্ছে তাদেরকে না জানিয়ে, জন-আকাংখাকে পাত্তা না দিয়ে। অথচ সবই হচ্ছে তাদেরই নামে। রাষ্ট্রের পরিচালকেরা রাষ্ট্রের সাথে জনগণের তফাতের ওই সম্পর্কটি তৈরি করে চলছে, ওই পরাজিত মনে করার মনোবৃত্তিটি সৃষ্টির লক্ষ্যে। জনমনে সৃষ্ট এই মনোবৃত্তি আসলে পুরো রাষ্ট্রের জন্যই সৃষ্টি করে নানা ধরনের বৈকল্য, ব্যাধি, সামাজিক অনাচার।

বিদায়ী বছরটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গীবাদ। ২০১৬-তেই যে জঙ্গীবাদ বাংলাদেশে রাতারাতি আবির্ভূত হয়েছে বা এর অভ্যুদ্বয় ঘটেছে তা নয়। এর ইতিহাসটি বেশ দীর্ঘ না হলেও বেশ কয়েক বছরের। বিএনপির সময়ে ২০০৫ সালে দেশে একযোগে ৬০টি জেলায় বোমা হামলাসহ নানা ঘটনা ঘটেছিল। এরপরে ওই ঘটনার নায়ক শায়খ রহমান, বাংলাভাইসহ বেশ কয়েকজনকে ফাসি দেয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ের জঙ্গীবাদীরা ছিল কম মাত্রার ‘রেডিক্যালাইজড’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিহীন, স্থানীয় অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছিল তখন। তবে তখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে ওই সময়ের জঙ্গীবাদ বর্তমানের মতো কৌশলগতভাবে ততোটা উন্নত ছিল না। তাছাড়া উচ্চবিত্তের সন্তান, ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে তারা কোনোভাবেই আকৃষ্ট করতে পারেনি। ওই সময়ের জঙ্গীবাদ সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ বড়জোর মাদরাসা পড়ুয়া কিছু মানুষের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। যতোদূর বোঝা যায় তাতে, তাদের উদ্যোগটি ভিন্ন ধারার ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল এবং তা ছিল স্থানীক বা এলাকাভিত্তিক।

ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা যখন জঙ্গীবাদী দলগুলোতে ঢুকে পড়েছে এবং একের পর এক ব্লগারসহ ভিন্ন চিন্তা ও মাত্রার মানুষদের উপর হামলা ও হত্যাকান্ড চালাতে থাকে- তখন সরকার একে প্রথমে অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল, পরে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার এবং আরও পরে স্থানীয় জঙ্গীদের কাজ বলে চালিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বেশ জোরেসোরেই তখন বলা হচ্ছিল- দেশে কোনো জঙ্গীবাদ নেই। যখন এসব কথা বলা হয়, ইতোমধ্যে ডজনেরও বেশি ব্লগার, প্রকাশক, লেখক এবং ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যার ঘটনা ঘটে গেছে। অথচ সরকার তখনো ছিল গণতন্ত্র না উন্নয়ন বিতর্কে বিভোড় এবং গণতন্ত্রের ছিটেফোটাটুকুতেও বাধাসৃষ্টিতে উদগ্রীব। গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি যে জঙ্গীবাদের উত্থানের ক্ষেত্র ও চারণভূমি-তা যতোই বলা হয়েছে-সরকার তা শোনেনি; শুনতে চায়নি। দেশে একদিকে রাজনীতিহীনতা, দুর্নীতি, হত্যা, গুমসহ অপশাসনের পরিস্থিতি চলতে থাকে; সাথে সাথে বেড়ে উঠতে থাকে জঙ্গীবাদ। আর এসব জঙ্গীরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক সংযোগ খুজতে থাকে। সরকারের দিক থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়টি কবুল করা হয়নি যে, বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট বা আইএস এবং আল কায়েদা রয়েছে। তবে ওই দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের কথা জানান দিয়েছে। এসব পাল্টাপাল্টি অবস্থার মধ্যে একজন ইতালীয় ও একজন জাপানী নাগরিক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যার কাজটি সম্পন্ন করে ফেলেছে জঙ্গীরা। এমনই অবস্থায় ২০১১৬-র পহেলা ও ২ জুলাই ঘটে যায় গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এই ঘটনা অনেকেরই নানা ধারণা পাল্টে দিয়েছে। যারা প্রচার করেছিল দেশে জঙ্গীবাদ নেই বা থাকলেও তা ততোটা প্রবল নয়-জঙ্গীরা তাদের কাছে ওই ঘটনার মধ্যদিয়ে ভিন্ন বার্তা পৌছে দিয়েছে। এছাড়া শুধুমাত্র কিছু মাদরাসা পড়ুয়া হতদরিদ্র মা-বাবার সন্তানরাই যে জঙ্গী হয়- এতো দিনের সে ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। আবারও সেই কথাটি প্রমাণিত হয় যে, গণতন্ত্রই রুখে দিতে পারে জঙ্গীবাদ।

জঙ্গীবাদ স্থায়ীভাবে রুখে দেয়ার ব্যাপারে এরপরেও সরকার ভিন্নমত পোষণ করে, ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছে। জনগণ এবং অপারপর দল, মত, পক্ষকে আস্থায় এবং সাথে নিয়ে জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ দমনের পথ পরিহার করে, স্বভাবসিদ্ধ রীতি অনুযায়ী তাদের নির্ভরতার স্থান হয়ে দাড়ায় আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী। এতে বিভিন্ন সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার নানা ঘটনা বিভিন্নভাবে শোনা যেতে থাকে। শুনতে হয় পোশাকধারীদের পরিচয়ে কথিত জঙ্গী গ্রেফতারের নামে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। আইন-শৃংখলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু এর সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গীবিরোধী অভিযানের নামে কথিত নিখোজদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। আগে অভিভাবকগণ মুখ না খুললেও এখন তাদের সন্তানদের খবরাখবর জোগাড়ের চেষ্টা করছেন; বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; করুণ আকুতি নিয়ে দাবি জানাচ্ছেন সন্তান ফেরত পাওয়ার জন্য।

এসব যখন চলছে ঠিক তখনই আইএস এবং আল কায়েদা সিরিয়া, ইরাক থেকে নিজেদের বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়ার যে নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে-সে বিষয়ে বাংলাদেশের করণীয় কী- তা চাপাই পড়ে যাচ্ছে।

আপাত একটি স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করলেও এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, সত্যিকারেই কি জঙ্গী দমন সম্ভব হয়েছে? উত্তরটি নিশ্চয়ই হবে নেতিবাচক। কারণ গণতন্ত্রবিহীন সমাজে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ সমূলে উৎপাটন এবং নির্মূল সম্ভব নয়। ২০১৬ সাল এটাই শিক্ষা দিয়ে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে।

২০১৬ : বিশ্বজুড়ে উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদের উত্থান

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফিলিপাইনে রডরিগো দুদার্তে, রাশিয়ায় ভ্লামিদির পুতিন, ভারতে নরেন্দ্র মোদি, জাপানে শিনজো অ্যাবে, চীনে শি জিনপিং, তুরস্কে রজব তাইয়্যেপ এরদোগান, মিসরে আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, …। তালিকাটা ছোট নয়। তাদের মধ্যে মিল কোথায়?

সবাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়ী। তবে উদার, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশের যে স্বপ্ন তাদের পক্ষ থেকে দেখানো হয়েছিল, তারা এখন সবাই ওই পথের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকের যাত্রী। যুক্তির কথা, সহমর্মিতার ভাষা, ভালোবাসার স্বপ্নের বিপরীত পথের অগ্রগামী পথিক। শঙ্কা জাগছে, ১৯৩০-এর দশকের পর উদার গণতন্ত্র এখনই সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখে পড়েছে। অবশ্য কারো কারো মতে, পরিস্থিতি এখনো তত খারাপ হয়নি; বরং সামনে আরো খারাপ দিন আছে। কিছু দিনের মধ্যে ইউরোপে গুরুত্বপূর্ণ ৯টি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এগুলো ইউরোপকে বদলে দিতে পারে। সেই স্রোত পৃথিবীর প্রতিটি কোণে অনুভূত হতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সে নির্বাচন হবে আগামী এপ্রিল-মে মাসে; অস্ট্রিয়ায় ডিসেম্বরে। সেখানে নাৎসিদের প্রতিষ্ঠিত কট্টর অভিবাসনবিরোধী, মুসলিম বিদ্বেষী ফ্রিডম পার্টিই ক্ষমতায় চলে আসতে পারে, এবং তা বেশ বড় ব্যবধানেই। জার্মানিতে নির্বাচন অক্টোবরে। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে মুসলিমবিদ্বেষী ‘আলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি’ বেশ ভালো ফল করেছে। অ্যাঙ্গেলা মারকেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট পার্টির করুণ অবস্থা ফুটে ওঠেছে। উদার অভিবাসননীতির কারণেই তার এই দশা হয়েছে বলে অনেকে মনে করছে। ইতালিতে  ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচন হবে। ডিসেম্বরের গণভোটে হেরে গেছে প্রধানমন্ত্রী ম্যাত্তিও রেনজির দল। সেখানে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট ভালো ফল করতে পারে।

তা হলে কী ফরাসি বিপ্লব যে স্বপ্নের হাতছানি দিয়েছিল, সেটির অবসান হতে চলেছে? ফরাসি বিপ্লবে কেবল প্যারিসের নয়, সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা ছিল। নেপোলিয়নের রাজকীয় সেনাবাহিনী ফ্রান্সের সাথে সাথে মুক্তি, সাম্য আর ভ্রাতৃত্ববোধেরও গৌরবও প্রচার করেছিল। অবশ্য মনে রাখতে হবে, এর কয়েক দশক পর ঐক্যবদ্ধ জার্মানিতে যে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়, তা বিশ্বের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর জয়ধ্বনি তোলা হয়। জাতীয়তাবাদের উপাদান কোনো না কোনোভাবে সব সমাজেই ছিল এবং রয়েছে। রাষ্ট্র, নাগরিক এবং বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য এর দরকার রয়েছে বলেই মনে করা হয়।

কিন্তু এখন অনেক দেশই সার্বজনীন, নাগরিক জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি উদারনৈতিক চেতনা প্রত্যাখ্যান করে একই রক্ত ও একই মাটিকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের দিকে ছুটছে। সবাইকে নিয়ে, সবার সাথে এগিয়ে যাওয়ার নীতি বাদ দিয়ে নিজেরা আরো জমাটবদ্ধ হয়ে অন্যদের দূরে ঠেলে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে।

তাহলে কি নাৎসিবাদের মতো উগ্র-জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসছে? ১৯৩০-এর দশকের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়। উত্তর কোরিয়ার মতো দুই একটি দেশ বাদ দিলে সর্বগ্রাসী, সর্বব্যপ্ত একনায়কতন্ত্র অন্য কোথাও নেই। কিন্তু তবুও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের স্রোত বইছে বিপুল বেগে; কিন্তু অন্যভাবে; তবে এখানেও মিল আছে। হিটলার, মুসোলিনিরা ভোটে জয়ী হয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। এখনকার সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও ভোটেই তারা নির্বাচিত হচ্ছেন। আর যেসব দেশে গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি, সেখানে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা উন্নয়নের কথা বলছেন, অনেক সময় অন্ন, বস্ত্র নিশ্চিত করার কথা বলে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে? প্রশ্নটা অনেক দিন ধরেই ঘোরাফেরা করছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৬১তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ভাবনাটি জোরালো করেছে। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার করার মতো ঘোষণা জোরেসোরে দিয়েই তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটে জয়ের জন্য জাতিগত বা বর্ণগত সংহতি কাজে লাগানোর চেষ্টা একেবারে নতুন নয়। এই ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও তা করেছেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট বাগাতে তিনি একবার বলেছিলেন, মিট রমনি পাস করলে ‘আবার তোমাদের শৃঙ্খলে বাঁধবেন।’ তবে সেটা ওই একবারই; সেটা তেমন জোর পায়নি। আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসে ট্রাম্পের মতো উগ্র শ্লোগান আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টপ্রার্থী দেননি। তার কথা আর কাজের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু হবে, কেউ জানে না।

ট্রাম্পের জয় বিশ্বজুড়ে সমমনা নেতাদের উৎসাহিত করেছে। যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির নাইজেল ফারাগে, বেক্সিটের অন্যতম পুরোধা, ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের সাথে দেখা করে তাকে অভিনন্দিত করে এসেছেন। হাঙ্গেরির অভিবাসনবিরোধী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান উল্লসিত হয়ে বলেছেন, ‘আমরা আসল গণতন্ত্রে ফিরতে পারি… কী সুন্দর পৃথিবী!’

এই ফলাফল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। ফরাসিরা এখন ধরে নিতে পারে আগামী বছরের নির্বাচনে ন্যাশনাল ফ্রন্টের ক্যারিশমেটিক নেতা ম্যারিঁ লে পেন হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। এর মানে বিশ্বায়ন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে ফ্রান্সের সরে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত। লে পেন আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে ফ্রান্সকে ইউরো থেকে সরিয়ে আনবেন, ইইউ’র সদস্যপদ থেকে বের হওয়ার জন্য ফ্রেক্সিটের ব্যবস্থা করবেন। ফ্রান্সের বিদায় মানে একক ইউরোপিয়ান মুদ্রারও পতন। আবার ফ্রান্সের সরে যাওয়া মানে ইইউ’র নিশ্চিত মৃত্যু।

অথচ মাত্র কিছু দিন আগেও ইউরোপিয়ান এলিটরা মনে করেছিলেন, জাতীয় পরিচিতি লুপ্ত হয়ে মহাদেশীয় চরিত্র রূপ নেবে। কিন্তু ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, হাঙ্গেরির ফিদেজস, পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিজ পার্টি, অস্ট্রেয়ার ফ্রিডম পার্টি তাদের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে দিয়েছে। মিস লে পেনের কথাই মূলত তাদের মুখ দিয়েও উচ্চারিত হচ্ছে। ফ্রান্সকে আবার গ্রেট করার বুলি কপচিয়ে তিনি মাত করতে যাচ্ছেন।

ট্রাম্পের মতো মুসলিম অভিবাসী বিরোধী কথা খোলামেলাভাবে লে পেন বলেন না। আইনজীবী হওয়ার কারণে তিনি আইনের মারপ্যাঁচ ভালোই জানেন। তিনি কেবল জানিয়েছেন, তিনি প্রকাশ্য জীবন থেকে ধর্মকে সরিয়ে রাখবেন। তবে আসলে তিনি কী চান, তার একটা মহড়া হয়েছে ২০১৫ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনের সময়। তখন দুই নারীকে সামনে আনা হয়েছিল। একজনের গালে ছিল তিন রঙা ফরাসি পতাকা আাঁকা, অপরজন বোরকা পরা। দুজনের সামনে লেখা ছিল : ‘প্রতিবেশী হিসেবে কাকে চান, তার আলোকে ভোট দিন।’

অভিবাসীবিরোধী অবস্থান থেকে সুইডেনও পিছিয়ে নেই। ২০১০ সালে জাতীয়তাবাদী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটস বলেছিল, মুসলিম ঢলের কারণে তাদের কল্যাণ তহবিলে অর্থের টান পড়ছে। অভিবাসীবিরোধী শ্লোগানের জেরেই দলটির জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়ছে।

নেদারল্যান্ডসের গির্ট উইল্ডার্সও মুসলিমবিরোধী নেতা। তিনিও তার দেশে বেশি মুসলিম দেখার আশা করছেন না। আগামী মার্চের নির্বাচনে তার দল প্রথম না হলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তার জাতীয়তাবাদী শ্লোগান। দেশটি নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও ক্রিমিয়া দখল করে নেওয়া, ইউক্রেনের একটি অংশে হামলা চালানো রুশদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চীনের অবস্থাও প্রায় একই ধরনের। সেখানেও শি জিনপিং ‘চীনা স্বপ্ন’ দেখাচ্ছেন। সেখানে দেশপ্রেম শিক্ষার আয়োজন চলছে প্রাথমিক থেকে ডক্টরেট পর্যায় পর্যন্ত। চীনারা মনে করছে, তার হাত ধরে আবার মহাচীন বাস্তবে ধরা দেবে।

মিসরের স্বৈরতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ সিসি দেশের সব সম্পদ ব্যয় করছেন এই আইডিয়া প্রচার করতে যে, তিনিই তার জাতির পিতা। তার সরকার সবকিছুর জন্যই ইসলামপন্থীদের দায়ী করছেন। এমনকি গত বছর আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবল বর্ষণের পর বন্যা দেখা দিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুসলিম ব্রাদারহুডকে দায়ী করে বলেছিল, তারা সব ড্রেন বন্ধ করে দিয়েছে। নিজেকে ফারাওদের সমমর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই মূলত তিনি মহা-জাকজমকের সাথে ৮ শ’ কোটি ডলারের নতুন সুয়েজ খালের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন করেছেন।

তুরস্কের রজব তাইয়েব এরদোগান ‘নতুন তুরস্ক’ গড়ার পথে এগুচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি ১৪৫৩ সালের কনস্টানটিনোপল জয়ের বার্ষিকীতে বিশাল সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। অনেকেই বলছে, তিনি বিরোধীদের নির্মূল করতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন।

ভারতে ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল বিজয় ঘটে। নরেন্দ্র মোদির হিন্দুৎভায় বা হিন্দুত্ববাদিতায় অ-হিন্দুদের স্থান রয়েছে অতি সামান্যই। সর্বগ্রাসী হিন্দুত্ব থেকে কোনো কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় প্রাধান্যকে কেন্দ্র করে সেক্যুলারবাদীদের কোণঠাসা করে ফেলছে।

এমনটা কেন হচ্ছে? অনেক তত্ত্বের কথাই বলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়া। উন্নত দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি যত কমছে, বৈষম্য তত বাড়ছে, বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থনও পাল্লা দিয়ে  হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষিতরা হয়তো ভালোই করছে, কিন্তু কায়িক শ্রমিকদের অবস্থা করুণ হচ্ছে। আউটসোর্সিং উন্নত দেশের গরিবদের অবস্থা আরো খারাপ করে দিচ্ছে। দায় চাপছে বিশ্বায়ানের ওপর। এর বিরুদ্ধে কথা বলে এই কায়িক শ্রমিক শ্বেতাঙ্গ ভোটাররাই জিতিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্পকে। লে পেনও এই সূত্র ধরে আগামী নির্বাচনে ভালো করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোনো কোনোটিতে প্রবৃদ্ধি উচ্চতর মাত্রায় দেখা যায়, বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থনও বেশি মনে হয়। কিন্তু লোভাতুর কর্মকর্তা, নোংরা বাতাস লোকজনকে ভয়ঙ্কর সমস্যায় ফেলছে। সিসি কিংবা পুতিনের মতো জাতীয়তাবাদী লৌহমানবেরা সব ভুল থেকে দৃষ্টি সরাতে সস্তা জাতীয়তাবাদকে ভালোভাবেই ব্যবহার করছেন।

আবার মুসলিম সংখ্যা বড় করে দেখিয়েও উগ্রপন্থীরা ভীতি ছড়াচ্ছে। মুসলিমরা ইউরোপ, আমেরিকা দখল করে নেবে- এমন ভয় সেখানকার লোকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট।

আরেকটি কারণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও নতুন জাতীয়তাবাদের গতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেসবুক আর টুইটার লোকজনকে মূলধারার মিডিয়ার পরিশীলিত তথ্যকে এড়িয়ে সমমনা গ্রুপ তথ্যের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগও থাকে না। আবার যখন যাচাই-বাছাই হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। ট্রাম্পের টুইট মুহূর্তেই কোটি কোটি লোকের কাছে চলে যায়।

অর্থনীতি একটা বড় কারণ। একটা কথা অনেকেই জোর দিয়ে বলছেন, উদীয়মান মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা ক্ষমতাসীনেরা পূরণ করতে পারছে না। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত যেভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, তা এখন আর কোনোভাবেই হচ্ছে না। অনেকে এর দায়ভার সরলভাবে বিশ্বায়নের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বায়ন নয়, বরং নতুন নতুন প্রযুক্তিই সম্ভবত এর জন্য দায়ী। প্রযুক্তি নিজের কাজটি করছে ঠিকই, কিন্তু আগের সময়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আয় যেভাবে বাড়তো, এখন তা হচ্ছে না। প্রযুক্তি আর জীবনমানকে সেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে না।

তাছাড়া মানুষের প্রত্যাশা যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে তারা পাচ্ছে না। ফলে যে ব্যবধান বাড়ছে, তা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। এর ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, তাদের সন্তানরা তাদের চেয়েও খারাপ অবস্থায় পড়বে; এটা তাদেরকে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় তথা নিজেরা ভালো থাকাটা আমাদেরকে সংকীর্ণ লাভ-লোকসানের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে থাকে। আমরা নিজেরা যখন ভালো করতে থাকি, তখন কিন্তু অন্যরা কে কী করলো, তা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাই না। ওই সময়টাতেই আমরা কিন্তু বঞ্চিত, অভাবগ্রস্তদের দিকে তাকাই, তাদের প্রতি উদার, সহিষ্ণু হই। কিন্তু আমরা যতটুকু পাওয়ার আশা করি, ততটা না পেলে অন্যদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হই। তখনই আমাদের নবাগতদের দেখলে ভয় জাগে, মনে হয় তারা বুঝি আমাদের অধিকারটাই কেড়ে নিচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকারজুড়ে অভিবাসী ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষ দেখা যায়, তার নেপথ্যে এই কারণটিই সক্রিয় বলে অনেকের ধারণা। সেখানকার মানুষজন মনে করছে, তারা বুঝি তাদের চাকরি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কেড়ে নেবে।

চরম ডানপন্থীরা এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছে। আর তাদের বিরুদ্ধে উদারপন্থীরা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। কারণ বন্ধ্যাত্ব তো তাদের আমলেই হয়েছে। অবস্থা আরো করুণ হচ্ছে, তারা যেন নেতৃত্বশূন্যও হয়ে পড়ছে। বিকল্প যেন চোখেই পড়ছে না। ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ছে উদার গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অনেকে বলেছিলেন, উদার গণতন্ত্রই ইতিহাসের শেষ কথা। কিন্তু ইতিকথার পরও যে আরো কথা থাকে, সেটাই যেন সামনে এসে পড়েছে।

তবে আশার কথাও আছে। উদারমনারাও সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার করতে পারে। ফেসবুক, টুইটারকেন্দ্রিক স্রোত হয়তো স্থায়ী হবে না। আবার মূলধারায় ফিরে যেতে পারে সবাই।

আরেকটি আশার কথা হলো, শিক্ষিত লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে মাত্র ৫ ভাগ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেত, বর্তমানে যায় ৪০ ভাগ; তারা উদার ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য।

আর যে অভিবাসীসহ যেসব কারণে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেটাও নতুন পথে  চলতে শুরু করেছে। তরুণরাও কিন্তু ঠিকই উদার পথে ঝুঁকবে। কারন ওটাই হচ্ছে-আশার, প্রত্যাশার, প্রাপ্তির; আর ওই পথই- নিজকে, সমাজেকে এবং সমন্বিতভাবে ভালোবাসার পথ!

এতো তথ্য গোপন আর গোজামিল দিয়ে রামপাল প্রকল্প কেন?

এম. জাকির হোসেন খান ::

বিতর্কিত ইআইএ প্রতিবেদনে অষ্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানির কথা বলা হয়েছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী কয়লা আমদানি সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনার অভাবে ভারত থেকে অধিক সালফার যুক্ত নিম্নমানের কয়লা আমদানির মাধ্যমে সস্তা দামে  জ্বালানি চাহিদা মেটানোর নামে প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদানকারী সুন্দরবনকে ঝুকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। যদিও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য বিবেচনায় অর্র্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি দামি কয়লা বিদ্যুৎ। ত্রুটিপূর্ণ ইআইএ প্রতিবেদনেও নিম্নমানের কয়লা ব্যবহারের কথা স্বীকার করা হয়েছে, অথচ তা অস্বীকার করে সরকার দাবি করছে, রামপাল কেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লা উন্নতমানের এবং এতে কম মাত্রার সালফার থাকবে। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা রয়েছে তার যোগান দিতে ভারতীয় নিম্নমানের সালফার যুক্ত কয়লা ডাম্পিং এর যে পরিকল্পনা চলছে গত ৩০ মে ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা তা জানিয়ে দিয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘কয়লার যথেষ্ট রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার অভ্যন্তরীন চাহিদা কমছে। কোল ইন্ডিয়া বাংলাদেশে বাস্তবায়িত সুপার-ক্রিটিক্যাল থার্মাল মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য কয়লা রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করছে’। নিম্নমানের কয়লা রফতানির মাধ্যমে প্রতি বছর ভারতীয় কোম্পানির হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও কয়লার দূষণে ক্ষতির দায় একমাত্র বাংলাদেশের জনগণকেই নিতে হবে। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনায় রেখেই ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২০১০ সালের ইআইএ গাইডলাইনে অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিলোমিটার সীমার মধ্যে এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে যা নিরাপদ নয়, তা বাংলাদেশে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবনের ৯ কি.মি. এর মধ্যে কোন বিবেচনায় নিরাপদ হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইন অনুযায়ী, শিল্প এলাকা বা শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা বা ফাঁকা জায়গা ছাড়া এ ধরনের প্রকল্পের ছাড়পত্র দেওয়ার নিয়ম নেই। রামপাল প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বপক্ষে অবস্থান ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান বিষয়ে হাইকোর্টের রুল থাকলেও এবং প্রদত্ত অবস্থানগত ছাড়পত্রে পরিবেশগত, কারিগরী ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হলে অবস্থানগত ছাড়পত্র বাতিল করা হবে মর্মে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে; অথচ ইআইএ প্রতিবেদন দাখিল না করেই প্রকল্পের কাজ শুরু করে কোম্পানি। সুন্দরবন একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেস্ট), যার আইনগত অভিভাবক (লিগ্যাল কাস্টুডিয়ান) বন বিভাগ। কিন্তু এই প্রকল্পের অবস্থানগত ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর বন বিভাগের মতামত গ্রহণ করেনি। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিকভাবে নির্মোহভাবে ইআইএ সম্পাদনের নিয়ম থাকলেও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইআইএ আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান (সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল এন্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস – সিআইজিআইএস) কর্তৃক সম্পাদনের ফলে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা থাকায় এটি নিরপেক্ষতার মানদন্ড অর্জন করতে পারেনি।

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রযুক্তি (ইএসপি) ব্যবহার করে উৎপাদিত ছাই বাতাসে ওড়া শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হবে দাবি করে সরকার। বাস্তবতা হলো, দূষিত ধোঁয়া বাতাসের মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে দূরে সুন্দরবনের ভেতরে ছড়িয়ে এসিড বৃষ্টি ঘটাবে, যে বিষয়ে ইউনেসকো ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপক‚লীয় অঞ্চলে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড়-এর ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে, ফলে বিজ্ঞানীদের আশংকা স্বাভাবিক এর চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতার জলোচ্ছাস হবে। আর যদি লাখ লাখ টন কয়লা এবং উৎপাদিত ছাই পশুর নদী বা সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালগুলোতে ঝড়ো বাতাসে উড়ে এসে পড়ে তবে তা কিভাবে রোধ করা সম্ভব হবে তার কোনো উত্তর ইআইএ প্রতিবেদনে নেই। ঝড়-দূর্যোগ থেকে উপকূল অঞ্চলের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করলে সুন্দরবনের ক্ষেত্রে লাভ ক্ষতির হিসাবে কোনোভাবেই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে যাবেনা এবং সম্ভবত এ জন্যই ইআইএ প্রতিবেদনে ওই সংক্রান্ত কোনো বিশ্লেষন নেই।

আর ইউনেসকোর প্রতিবেদনে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ভাটিতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি নিয়ে যথাযথ উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও বাংলাদেশের নদ-নদী ও সুন্দরবনকে লবণাক্ততা থেকে বাঁচাতে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে। সরকার জানায় গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ন্যায্য পানি পাচ্ছে। আর বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গত ৪৬ বছরেও গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি, কোন যাদুবলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তা বাস্তবায়ন করতে পারবে সরকার? এটা তো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, ফারাক্কার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেনা এবং ফলে, সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ায় সুন্দরি গাছের আগা মরে যাচ্ছে আশংকাজনক হারে।

অথচ এসব উদ্বেগকে আমলে না নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এর বিরুদ্ধেও। বৈশ্বিক কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন এ প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হচ্ছিল না তখন আইএফসি ভারতের আইসিআইসিআই, এইচডিএফসি, আইডিএফসি, কটক মাহিন্দ্র, ইয়েস ও অ্যাক্সিম ব্যাংককে ৫২ কোটি ডলার জোগান দিচ্ছে; যার মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করেছে ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল (আইডিআই) নামে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাংক কয়লাভিত্তিক কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা না করার ঘোষণা দিয়েছিলো, যা অনেকটা ফাঁকাবুলিতে পরিণত হয়েছে।

‘‘অর্থনৈতিকভাবেও এ প্রকল্পটি পুরোপারি ঝুঁকিপূর্ণ, যা বাংলাদেশকে ‘ফাঁকা পকেট’-এ পরিণত করবে এবং এ থেকে বাংলাদেশ কখনো বেরও হতে পারবে না” বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে যে ব্যয় হয়, রামপাল প্রকল্পে তার চেয়ে ৩২ ভাগ বেশি ব্যয় ধরায় ভর্তুকি না দেওয়া হলে প্রকল্পটির উৎপাদন খরচ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান গড় খরচের চেয়ে ৬২% বেশি হবে বলে জানিয়েছে ভারতের ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় ৫ লাখ গাছের চারা লাগানোর চিন্তা করছে। বন বিভাগের উদ্যোগে কৃত্রিমভাবে একটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল চকোরিয়াতেও করা হয়েছিলো, তার অস্তিত্ব এখন কোথায়? পরিবেশ বা বন রক্ষায় যদি সত্যি সরকার প্রতিশ্রুতিশীল হতো তাহলো গত ১০ বছরে শালবনের প্রায় ৮০% হারিয়ে গেলো কিভাবে? ২০১৪ এর ১৭ অক্টোবর গাজীপুরে বন বিভাগের ২৭ একরের বেশি বনভূমি জোর করে অবৈধ দখল নেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আটজন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং ওই আট নেতার মালিকানা দাবির পক্ষে পাঁচ মন্ত্রী সুপারিশ করেন। ক্ষমতাবানরা একের পর এক নদ-নদী, খাল বিল দখল এবং দূষণ করছে নির্বিচারে। সরকার ও বেসরকারি মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ইটিপি চালু না রেখেই পানির উৎস দূষণ করছে? শীতলক্ষা, বুড়িগঙ্গা, বালু নদী চরম দূষণের শিকার হলো কিভাবে?

সুন্দরবন রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথাযথ কারণও রয়েছে। গত কয়েকদিন আগেই একটি সংবাদে জানা যায়,৩০০ শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সুন্দরবনের আশপাশের গ্র্রামগুলোতে প্রায় ১০ হাজার একর জমি কিনেছেন। জমি কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের মধ্যে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠী ও সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন। উল্লেখ্য, সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তর এই এলাকাতেই ১৫০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে।

আশার দিক হলো, গত সেপ্টেম্বর ২০১৬ এ হেগ-এ অবস্থিত সর্বোচ্চ অপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিসি) একটি কৌশলপত্রের ‘মামলা বাছাই ও অগ্রাধিকারকরণ’ অনুচ্ছেদে প্রাকৃতিক সম্পদের বেআইনি আত্মসাৎ, ভূমি দখল অথবা পরিবেশ ধ্বংশের বিচারে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বাংলাদেশ বা এর যেকোন নাগরিক কথিত ভদ্রবেশি, দেশপ্রেমিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কারীকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে (নিউইয়র্ক টাইমস, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)। সুতরাং যে বা যারা নদ, নদী, বন ও পরিবেশ ধ্বংশের সাথে জড়িত এবং কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাচ্ছেন তাদের জন্য নতুন এ আইনটি এক ধরনের সতর্কবাতা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল অধ্যাদেশ ১৯৮২ এ জমি অধিগ্রহণের ফলে জমির মালিক ছাড়া ঐ জমির ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের ক্ষতিপূরণের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর নির্ভরশীল স্বত্বাধিকারহীন মানুষের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে স্বীকৃতি পায় নি, যা আন্তর্জাতিক অধিগ্রহণ নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক (টিআইবি, ২০১৫)। সরকার পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ না করে প্রাথমিকভাবে অধিগৃহীত ১৮৩৪ একর জমি জোরপূর্বক অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রকল্প এলাকার সকল জমির মালিকের প্রতিবাদ সত্বেও তা উপেক্ষা করে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত খুলনার তৎকালীন মেয়রের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণ ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন ঘটিয়ে বলপ্রয়োগে জমির মালিকদের উচ্ছেদের অভিযোগ করেছেন জমির মালিকরা (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ এপ্রিল ২০১২)। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে লেখক নিজে প্রকল্প এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করতে সরেজমিনে পরিদর্শনে মেশিনের সাহায্যে ভূমি ভরাটের কাজ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে আলোচনায় স্থানীয় জমির মালিক সহ প্রতিবাদী জনগণের ওপর পুলিশী হয়রানির কথা জানতে পারেন, এমনকি লেখককে পুলিশ ঘেরাও অবস্থাতেই আলোচনা করতে হয়।

ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিনাশ হলে জলবায়ু পরিবর্তনে শিকার বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আরো ঝুঁকিতে পড়বে তা নির্ধিদ্বায় বলা যায়। আর শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৬ই জুলাই যে মন্তব্য করেছিলেন তা হয়তো ক্ষমতাসীনরা ভুলে গেছেন। তিনি বলেছিলেন ‘‘… আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে যে সুন্দরবন রয়েছে এইটা হলো বেরিয়ার। এটা যদি রক্ষা করা না হয় তাহলে একদিন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ এ পর্যন্ত সমস্ত এরিয়া সমুদ্রের মধ্যে চলে যাবে এবং এগুলো হাতিয়া, সন্দীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার যদি সুন্দরবন শেষ হয়ে যায় তো সমুদ্র যে ভাঙন সৃষ্টি করবে সেই ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনও উপায় আর নাই’’। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ভূমিকা রাখার জন্য ইউনেপ পুরস্কার প্রাপ্ত ক্ষমতাসীন সরকার জলবায়ুর ঝুঁকি বিবেচনায়  ইউনেস্কো’র দাবি মেনে অবিলম্বে রামপাল, ওরিয়ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ সব ধরনের শিল্প স্থাপন বন্ধ করে সুন্দরবনকে রক্ষা করবে, এটাই প্রত্যাশা জনগণের।