Home » প্রচ্ছদ কথা

প্রচ্ছদ কথা

একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

‘মনুষ্য ধর্ম’হারিয়ে যাচ্ছে। হারাচ্ছে রাজনৈতিক মর্যাদাবোধও। যে ‘রক্তপাতময়তা’ রাজনীতিকে বিভাজিত করেছে, পরস্পরকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার প্ররোচনা দিচ্ছে, তার মূল কারণ হচ্ছে, ন্যূনতম সুষ্ঠ একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ের প্রকৃত প্রতিফলনে প্রাতিষ্ঠানিকতা তো দুরের কথা, বিকাশমান কোন পথ তৈরী হয়নি। সবসময়ই ক্ষমতাসীনরা জনরায়কে মেনে নেয়াকে তাদের ‘অক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ‘প্রতিশোধ’র আশংকায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকত্বটুকুও আর অবশিষ্ট রাখেনি।

এক. সিইসি নুরুল হুদা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন, ভোট সুষ্ঠ হবে। এর মাঝে ইসি মাহবুব তালুকদার ‘বাগড়া দিলেন একথা বলে যে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সিইসি জানালেন, ইসি মাহবুব ‘অসত্য’বলেছেন। জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, একথা বলে সিইসি তার অস্তিত্বে আঘাত করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে নিট রেজাল্ট, নির্বাচন কমিশনের মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক কমিশনের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’র মতামতই গ্রহনীয় বলে জানালেন। কিন্ত জনগণ উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছেন, পার্লামেন্ট এবং মন্ত্রীসভা বহাল রেখে যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে বলে দাবি করছেন, তা নিয়ে তাদের মতবিরোধ প্রকাশ্য।

আরও উদ্বেগের যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন যে, বিএনপি ভূয়া ব্যালট ছাপাচ্ছে। কর্মীদের তিনি কোথায় এবং কোন কোন ছাপাখানায় এসব ব্যালট ছাপানো হচ্ছে, কর্মীদের তিনি তা খুঁজে বের করতে বলেছেন। ভোটের দিন মুজিব কোট পরে ভোটকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর এরকম আশঙ্কা এবং সন্দেহ নিশ্চয়ই তথ্যভিত্তিক। জনগণ এই সন্দেহের ভিত্তির যথার্থতা দেখতে চান – আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কথিত ভুয়া ব্যালট উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে।

দুই. কমজোরি গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে নির্বাচন সব দেশে সবকালে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত। এটি আসলে মাও সেতুং এর ভাষায় ‘রক্তপাতময় রাজনীতি’। ফলে এর মধ্যে মানবিকতার কোন স্থান নেই। সব নিয়ম, নীতি-নৈতিকতা ভঙ্গ করে জেতাটা হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র লক্ষ্য। আর সেটি যে কোন মূল্যেই। ’ভোটযুদ্ধ’ জয়ের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্নটিও জড়িয়ে যায়। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন প্রাণঘাতী হয়ে উঠে জয়-পরাজয়ের দিকে হাঁটতে থাকে, অনিবার্য পরিনতি হিসেবে।

সারাদেশে নির্বাচন ক্রমাগত সহিংস রূপ ধারন করতে করতে অবশেষে প্রাণ সংহারী হয়ে উঠে। যারা নির্বাচনের কাজটি পরিচালনা করছেন বা দেখ-ভালের কাজ করছেন, তাদের জন্য চাপ বাড়ছে। সেটা কতটা বোঝার জন্য সবশেষ ঐক্যফ্রন্টের সাথে ইসি’র বৈঠক একটি প্রমান। সিইসি’র সাথে উত্তেজিত বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ আলোচনা থেকে ওয়াক আউট করেন। অব্যবহিত পরে একজন কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য প্রমান করে সুষ্ঠ নির্বাচন বিষয়ে কমিশনেই রয়েছে মতানৈক্য।

শক্তিশালী গণতন্ত্রে কর্তৃত্ববাদের স্থান নেই। ক্ষমতা সেখানে ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত নয়, বিকেন্দ্রীকৃত। সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব শক্তি থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে এবং প্রয়োগটি দেখা যায় দায়িত্ব নির্বিঘ্ন করতে। বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। এই প্রতিষ্ঠানিক শক্তি নির্বাচন পরিচালনাকারীদের এক ধরনের সুরক্ষা দেয় এবং গোটা বিষয়টি তারা ’রুলস অব বিজনেস ’ হিসেবে পরিচালনা করে থাকে। ফলে কারো মুখাপেক্ষী থাকতে হয়না।

কিন্তু কমজোরি গণতন্ত্রেও বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পরিচালনাকারীরা তাকিয়ে থাকেন শক্তিমান বা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দিকেই। অহেতুক তারা ক্ষমতাবানদের বিরাগভাজন হতে চান না। গা বাঁচিয়ে  কিভাবে শক্তিমান পক্ষগুলোর পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আসা যায়, সে কাজটিই পারঙ্গমতার সাথে তারা করে থাকেন। এই জায়গাটিতে তারা দৃষ্টিগ্রাহ্যরকম একপেশে এবং একদেশদর্শী।

বাংলাদেশ এ যাবতকাল পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন পরিচালনাকারী হিসেবে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান প্রদত্ত অভূতপূর্ব শক্তি এবং ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্ব আজ অবধি স্বাধীনভাবে, সক্ষমতার সাথে পালন করতে পারেনি, বলা যেতে পারে করেনি।

ফলে ’স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান’ বলে নির্বাচন কমিশনের কথা ফি-বছর জনগন শুনে আসছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ৫.৩ ধারায় বলা হয়েছিল,”নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে…”। কিন্তু এটি অধরাই থেকে গেছে। অনেকটাই ’কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ বা কখনই ছিল না। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এটিই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। যে তিনটি নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, তারাও যেভাবে চেয়েছে কমিশন ঠিক সেভাবেই নির্বাচন পরিচালনা করেছে।

তিন. বর্তমান  নির্বাচন কমিশনও তার বাত্যয় নয়- জনগন এটি বিশ্বাস করেন। এখন পর্যন্ত কমিশনের রোজনামচা দেখে বলতেই হবে, তারা নির্বাচনটি অংশগ্রহনমূলক করতে চাচ্ছেন, কিন্তু সুষ্ঠ নয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বাইরে যারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন, এমন প্রার্থীদের ওপর নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটছে। কর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেফতার চলছে। সবকিছু দেখে-শুনে, বিবেচনায় নিয়েই কি সিইসি বলেছেন তিনি আদতেই সুষ্ঠ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন?

প্রশ্নটি গুঞ্জরিত হতে শুরু করেছে, অচিরেই পল্লবিত হবে। একটি ভাল নির্বাচন না হলে শেষতক কি হবে? দশম সংসদ নির্বাচনে একক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতার ওপর ভর করে গত পাঁচ বছরের দাপটে শাসন জনগন প্রত্যক্ষ করেছে। আগামীতেও ’উন্নয়ন জোয়ার’ সচল রাখতে যদি সেরকম ব্যবস্থাই ফিরে আসে, তাহলে আপত্তিই বা কোথায়? এই প্রশ্নের সহজ কোন উত্তর নেই। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এতে লাভ কার? নির্বাচন ব্যবস্থা ভঙ্গুর হলে দল বা শাসন ব্যবস্থা-কোথাওই গণতন্ত্র বিকশিত হয়না। ফলে ন্যায্যতা ও আইনের শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সম্ভবনা তৈরী হয় চরমপন্থা ও অরাজনৈতিক শক্তির উত্থানের। সেজন্য আজকে যে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আনন্দিত এবং উল্লাসিত, সেটি নিকট ভবিষ্যতেই যে নেতিবাচক হয়ে উঠবে না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? মনে রাখতে হবে, একই ঘটনা পুনরায় আর ঘটেনা। কার্ল মার্কস হেগেল’কে উদ্বৃত করতেন এভাবে, ”ইতিহাস পূনরাবৃত্তি ঘটায়। তবে প্রথমটি যদি হয় সত্যি ও সঠিক, তাহলে পরেরটি অবধারিতভাবে কৌতুকপ্রদ’অথবা এর বিপরীত।

 

রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সংকট প্রলম্বিত, দ্রুত সমাধান হবে বলে মনে হয়না : ড. তোফায়েল আহমেদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংঘাত সহিংসতার কারণে ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগের পরিবেশ বিরাজমান এবং ক্রমাগতভাবে এটি বাড়ছে। সামগ্রিক বিবেচনায়  সর্বগ্রাসী অবিশ্বাসের পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে। এই পরিবেশ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করযে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং বিট্রানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. তোফায়েল আহমেদ। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আমীর খসরু

দলীয় বিবেচনায় ‘বসন্তের কোকিল’ও নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হয়ে যায় : ড. বদিউল আলম মজুমদার

নির্ধারিত সময়ে ভিসা না দেয়াসহ ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য কারণে এই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা ২০০৮ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের চাইতে অনেক কম হবে। ২০০৮ সালে বিদেশ থেকে আগত এবং বিদেশী সংস্থার ৫৯৩ জন; ২০০১ সালে ২২৫ জন বিদেশী পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষন করেছিলেন। এই বছরে এ সংখ্যা শতাধিক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যাও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক কম হবে। এনজিওব্যুরোর প্রক্রিয়াগত ধীরগতি এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কম সংখ্যক দেশী পর্যবেক্ষককে অনুমতি দেয়ায় এ নির্বাচনে ২৫ হাজার ৯২০ জন দেশী পর্যবেক্ষক অনুমতি পেয়েছেন। সাড়ে আট হাজার পর্যবেক্ষনে ইচ্ছুককে অনুমতি দেয়া হয়নি। অনুমতি দেয়া হয়নি কিছু কিছু দেশী সংগঠনকেও। ২৫ হাজারের মধ্যে দেশী পর্যবেক্ষকদের সংগঠন ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৫ হাজার জনকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। ২০০১ সালে দেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার এবং ২০০৮ সালে ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার। অর্থাৎ নির্বাচনে কম সংখ্যায় বিদেশী ও দেশী পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। ইতোমধ্যে দীর্ঘদিনের নির্বাচন পর্যবেক্ষককে সংস্থা ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ বলেছেন, এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন অভিজ্ঞ বেশ কছু পর্যবেক্ষকদের বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে বেশ কিছু নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সংযুক্ত হয়েছে যাদেরকে সত্যি বলতে আমরা চিনি না।  দেশী ও বিদেশী পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা কম হলে অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপরে এর কোনো প্রভাব পড়বে কিনাসহ সে সব বিষয়ে আলোচনা করেছেন নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন-এর প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন আমীর খসরু।

সরকার নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন নির্বাচনী মাঠে একটি একপেশে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শুধু একপক্ষই মাঠে রয়েছে, বাকিরা নামতে চাইলেও নানাবিধ বাধা-বিঘ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। আমাদের বুধবার-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরীক্ষায় অবতীর্ণ। কিন্তু  যে পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে তাতে পরীক্ষায় পাস না করার সম্ভাবনা প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে। নির্বাচন অর্থবহ না হলে আগামী সরকারটি বড় নৈতিক বৈধতা ও দেশী-বিদেশী গ্রহণযোগ্যতার সংকটে পড়বে। এছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির উপরে দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে বলেও কতনি মনে করেন। আমাদের বুধবার-এর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আমীর খসরু

নির্বাচন কমিশন নিজেই পাথরের মূর্তির ভূমিকা গ্রহণ করেছে : ড. ইফতেখারুজ্জামান

একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সব দলের সমান সুযোগ প্রাপ্তির পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামগ্রিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমাদের বুধবার-কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিতর্কিত। তিনি প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর যথাযথ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের বাইরের রাজনৈতিক দল এবং পক্ষগুলো নির্বাচনের মাঠে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যে প্রত্যাশা ছিল -তা পূরণ নিয়ে সংশয়-সন্দেহ দেখা দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। আমাদের বুধবার-এর পক্ষ থেকে সাক্ষাতকার নিয়েছেন আমীর খসরু

ভোটটি দিতে পারা না পারার শঙ্কা-উদ্বেগ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

মাও সে তুং যেমনটি বলেছিলেন-“যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি, আর রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ”– সে বিবেচনায় গত সাতচল্লিশ বছরই কী কাটলো যুদ্ধের মধ্যে? কারন কি এই যে, গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেললে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি রাজনীতি আর নাগরিকদের মিত্র থাকে না? বিশেষ করে দুর্বল নাগরিকদের সাথে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। সেজন্যই রাজনীতিতে কেবল অভিগম্যতা সেই সব নাগরিকদের বা পরিবারের, যারা সবল অর্থে-বিত্তে ও বংশ মর্যাদায়। দুর্বলরা কেবলই রক্তপাতময়তার বলি।

এক. বিজয়ের মাস এবং শীতের আমেজ- সব ছাপিয়ে উঠেছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। সর্বত্র আলোচনার বিষয় এখন একটি। খানিকটা আশা-আশঙ্কা অথবা নিস্পৃহতার দোলাচল। নির্বাচন হবে? হলে সুষ্ঠ হবে? জনমনে এই গুঞ্জরণ ও ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত আলোচনা ক্রমশ আকার নিচ্ছে। কারন হচ্ছে, অতীত তিক্ত এবং রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা। সাতচল্লিশ বয়সী বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে সারাটা কাল জুড়ে ছিল রক্তপাতময়-সহিংস এবং নিয়ন্ত্রিত।

জনগনের অভিজ্ঞতা বলছে, কোন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, এই দেশে অমন নির্বাচন কখনই সুষ্ঠ হয় না। অতীতে কখনও হয়নি। সামরিক সরকারগুলোর আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলি ছিল চরম প্রহসন ও সামরিক স্বৈরাচারের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার মহড়া। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে আওয়ামী লীগ খন্দকার মোশতাকসহ কয়েকজন নেতাকে জেতাতে নিজেরাই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে, যার ছিল সূদুরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিল থেকে শুরু করে প্রচারনাকালে ইতিমধ্যে খুন হয়েছে অনধিক ১০ জন। কোন দলের সেটি বড় প্রশ্ন নয়, তারা সবাই আদম সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী। এই হানাহানির মূল কারন হচ্ছে, নির্বাচনী মাঠটি মোটেই সমতল নয়। ক্ষমতাসীন দলের জন্য যতটা মসৃন, বিরোধী দলের জন্য ততটাই এবড়ো-থেবড়ো। এজন্য বড় দুই দল বা জোটের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে নেমেই হয় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন না হয় হামলা করছেন, ক্রমশ: হয়ে উঠছেন সহিংস।

হামলায় শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী প্রার্থী- সমর্থকরা এগিয়ে। তাই বলে ক্ষমতাসীনরা এর শিকার হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। মোট কথা একটি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশজুড়ে। জাতীয় সংসদ বহাল, এমপি পদে বহাল থেকে এক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন, অন্যদিকে রয়েছেন মামলার বোঝায় ন্যূব্জ ও তাড়া খাওয়া প্রার্থীরা। তাদের জন্য মাঠটি অবতল। যেমনটি ঘটেছে গত বুধবার, নির্বাচনী প্রচারকালে একজন প্রার্থীকে পূর্বাপর মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকছে।

দুই. এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’। খোদ সিইসি সেটি প্রকাশ করেছেন। বোঝাই যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে ঠেকলে তাঁকে ‘বিব্রত’ ও ‘মর্মাহত’ হতে হচ্ছে। এর আগে আমরা আদালতকে ‘বিব্রত’ হতে দেখেছি। সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন, মামলাটি অন্য আদালতে স্থানান্তর করে। কিন্তু সিইসি’র ‘বিব্রত’ হওয়া নিয়ে কি হবে? তিনি শুধু ‘বিব্রত’ হয়েই থাকবেন নাকি রেফারীর ভূমিকায় শক্ত অবস্থান নিয়ে ‘হলুদ কার্ড’ এবং ‘লাল কার্ড’ ব্যবহার করা শুরু করবেন? অথবা বিব্রত হবেন এবং নিরপেক্ষতার নামে পক্ষাবলম্বন করবেন? তাদের এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশ এবং সুষ্ঠ নির্বাচন।

নির্বাচনী মাঠ সমতল হবে- সে সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ সরকারের অনুকূলেই থাকবে-জনমনের এই ধারনা কমিশন দুর করতে সক্ষম হবেন কী ? সম্ভাবনা ক্ষীণ। নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবলে সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সাহসী হতে পারবেন, সেটি দেখার জন্যও কি হাতে সময় আছে? বিগত ইউপি নির্বাচনে দেশ দেখেছে হত্যাকান্ড, সন্ত্রাস ও লাগামহীন জাল ভোট। তার আগের উপজেলা নির্বাচন ! সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে জনগন কখনই দেখেনি। এমনকি সক্রিয় হতেও না। বরং ধামাচাপা দিতে অতীতকালের ধারাবাহিক রেকর্ডটি বাজিয়েছে-“দু’একটি ঘটনা বাদে নির্বাচন মোটামুটি অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহনযোগ্য হয়েছে”। মাত্র ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনসমূহের নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়টিও ধামাচাপা দেয়া হয়েছে পুরোনো কায়দাই। এর ফলে সাধারন ভোটাররা সবচেয়ে বেশি আশঙ্কিত এটা ভেবে যে,  তার ভোটটি দিতে পারবেন তো ?

এবারের জাতীয় নির্বাচনের শুরুতেই অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে আরেকরকম সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজমান ছিল। অন্যদলের চেয়ে নিজ দলের ভেতরকার সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল বেশি। সেটি দুই বড় দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের মধ্যে ঘটেছে এবং নিহত হয়েছে আধা ডজন দলীয় নেতা-কর্মী। একটি দলের চেয়ারপার্সনের অফিস ভাংচুর হয়েছে। নেতা-কর্মীরা অবরুদ্ধ করেছে দলের মহাসচিবকে। এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে দেয়া প্রার্থীকে ঘোষণা করেছে অবাঞ্ছিত। এসবই নির্বাচনী শঙ্কায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, দেশী পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে আস্থাহীনতা এবং কমিশনের প্রতি ধোঁয়াশা- অদ্ভুত এক পরিস্থিতি তৈরী করছে। জনগনের বিশ্বাস প্রায় উঠে যাচ্ছে যে, নির্বাচন সুষ্ঠ হবে। দেখে-শুনে এই দেশের জনগনের মধ্যে অদ্ভুত একটি ধারনা গড়ে উঠছে যে, সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে এবং বিদেশীরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়! মনে করা হয়, তারা কারো প্রতি পক্ষপাত করে না। কিন্ত সেনাসদস্যদের মাঠে নামানোর তারিখ ১৫’র বদলে ২৪ ডিসেম্বর পেছানোয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ।

ক্ষমতায় থেকে গড়ে-বেড়ে ওঠা বিএনপি কম-বেশি একযুগ ক্ষমতার বাইরে। দমন-পীড়নে পিষ্ট। দলীয় চেয়ারপারসন দন্ডিত হয়ে জেলে। তার ডেপুটি ও পুত্রও দন্ডিত এবং বিদেশে অবস্থানরত। তাদের এমত প্রতীতি রয়েছে যে, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন। তাদের বিপক্ষে নেতিবাচক ভোটে তারা জিতে যাবেন। এটি ধরে নিয়ে নেতা-কর্মীরা চাঙ্গা। এজন্যই, তাদের ভাষায় সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য তারা মরিয়া। এই মরিয়া ভাব বজায় রেখে তারা কি কৌশল নেবেন, সেটিও দেখার বিষয়।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সব দলের ন্যায্যতা ও সুষ্ঠ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা হচ্ছে সংবিধানিক প্রথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব দেশে এটি করা হয় না ঠিক, কিন্তু ওয়েষ্ট মিনিষ্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে এটি প্রথা ও পালনীয় হিসেবে স্বীকৃত। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ন্যায্য প্রতিযোগিতার জন্য সংসদ ভেঙ্গে দেয়াটাই ‘সঠিক অভ্যাস’ বলে মনে করা হয়। যে যাই বলুক, এখানে সংসদ ও মন্ত্রীসভা বহাল রয়েছে- তার সুবিধা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই যাবে।

জনমনে যে বিষয়গুলি হামেশাই ঘুরে-ফিরে আসছে তা হচ্ছে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষ নেবে। আবার দু’চারজন বিশ্বাস করছেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন নির্বাাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। সেজন্য অন্তিমে একটি ভাল নির্বাচন দেখা যাবে। সাম্প্রতিক নজিরগুলো এই বক্তব্যের পক্ষে যায় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সন্ত্রাস ও দখলবাজির এন্তার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টদের বাড়ি তল্লাশিসহ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ ছিল।

এবারের আশঙ্কা, “গায়েবী” মামলার। যে কেউ আসামী হয়ে গ্রেফতার হতে পারে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে এসব আশঙ্কা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়েছে। যদিও মামলা-গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অতীতের মত পক্ষ হয়ে এসব অভিযোগ খন্ডণ করবেন, এমনটি আশা করা হচ্ছে না। এরই প্রতিফলন হিসেবে কি নির্বাচন কমিশন ‘বিব্রত’ হতে শুরু করেছেন? দেখার বিষয়, ‘বিব্রত’ হওয়ার পরে তাঁরা এর প্রতিকারে কি ধরনের কৌশল গ্রহন করেন?

নির্বাচনকে ঘিরে এরকম শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলাচলে সরকার মনে করছে, এগুলি কেবলই বিরোধী দলের অপপ্রচার। সরকারের নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময়মত নির্বাচন হবে। সহিংসতা মোকাবেলা করার কথাও বলছেন। অথচ দিয়েছিলেন লেভেল প্লেয়িং নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি । এমনকি ইভিএম ‘ম্যানিপুলেট’ না করার নিশ্চয়তা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার কথা। সরকার ও ক্ষমতাসীন মহল আকছার দাবি করে আসছেন, সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন তারা।

বাস্তবতা কি? বিরোধী দল ও জোট বলছে, এসব প্রতিশ্রুতিই সরকারের কৌশল। নির্বাচনকে নিজেদের মতো করার যে কোন সক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনমনেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারন অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, নির্বাচন এগিয়ে এলে রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি বইয়ে দেন এবং এর অধিকাংশ যে কথার কথা তা জানা হয়ে গেছে। উদাহরন, গত সিটি নির্বাচনে প্রায় সকল মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হলে ‘সিটি গভার্ণমেন্ট’ চালু করার কথা ইশতেহারে ও মুখে বলেছেন।

এরকম অবাস্তব এবং আকাশচারী সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা জনগনের ভোট নিতে চান। কারন রাজনীতিবিদ, অর্থে-বিত্তে প্রতাপশালী এবং কথিত সুশীল সমাজের কাছে জনগন এখনও বোকার স্বর্গে বাস করছে বলে ধারনা পোষণ করে থাকেন। কারণ, এদের প্রত্যেকেরই দল, সংঘ-সমিতি রয়েছে। কিন্তু এদেশে কেবল সাধারন মানুষের কোন দল নেই-ঠাঁইও নেই। নেই আপাত: কোন সংঘবদ্ধতা।

সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহত হতে পারেন!

আমীর খসরু ::

সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী খোন্দকার আবু আশফাককে পুলিশ বুধবার আটক করে ‘ভিন্ন এক পদ্ধতিতে’। দোহার থানার ওসির সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া ভাষ্য মোতাবেক – প্রার্থী  আবু  আশফাকের নিরাপত্তার জন্যই তাকে আটক করে পুলিশ কাস্টোডিতে নেয়া হয়।

১৯৭০-এর প্রথমদিকের ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কালে একটি ঘটনা বোধ করি অনেকেরই মনে নেই অথবা জানা নেই । সেই সময়ে ভিয়েতনামে ঘটে যাওয়া দুনিয়া কাঁপানো একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান সাংবাদিক পিটার আর্নেট তখন এ্যসোসিয়েটেড প্রেস বা এপির ভিয়েতনাম বিষয়ক সংবাদদাতা। পিটার আর্নেটের ওই সময়কালের একটি প্রতিবেদন ছিল এই রকম- যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তখন ভিয়েতনামের একটি গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। ঘটনাটির খবর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পৌছালে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন গ্রামটি ধ্বংস করো হলো? জবাবে সেই ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা জবাব দিয়েছিলেন- “We had to destroy the village in order to save it.”  অর্থাৎ ‘গ্রামটিকে রক্ষার  জন্যই ওই গ্রামটিকে আমাদের ধ্বংস করে দিতে হয়েছে।’ সাম্প্রতিক যেসব ঘটনাবলী ঘটছে তাতে কর্মকর্তাদের ভাষ্য শুনে ওই ঘটনা বারংবার মনে পড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে প্রতিপক্ষের উপরে হামলা, ভাংচুর, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটে চলেছে। ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিবের গাড়িবহরে হামলা ও ভাংচুর, নোয়াখালীতে যুবলীগ নেতা নিহত হওয়াসহ সংবাদ মাধ্যমের হিসাব মোতাবেক আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর প্রথমদিনেই কমপক্ষে ১৮টি স্থানে সহিংস রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে। বুধবার সংঘর্ষের ঘটনাবলী ঘটেছে ১৭ জেলায়। এতে হামলা-ভাংচুর, সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩২ জন। বৃহস্পতিবারও ২৩ জেলার বিভিন্নস্থানে হামলা, সংঘর্ষ, বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশের বিশাল এক এলাকা এখন নির্বাচনী সহিংসতার কবলে।  আর এটি করা হচ্ছে, মূলত ক্ষমতাসীন দল ও  আইন শৃংখলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাধ্যমে।

শুক্রবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের গাড়িবহরেও হামলা হয়েছে। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বের হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠের ‘স্থিতিস্থাবকতা বা ভারসাম্য’ বিনষ্ট করা হচ্ছে – যার ফল স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহভাবে নেতিবাচক হতে বাধ্য। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সব ঘটনার খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না, আসতে দেয়াও হয় না। কাজেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা যে কতো বিশাল এবং ভীতিকর তার সামান্য হলেও কিছুটা আচ করা যাচ্ছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খবর দিচ্ছে-বুধবার আর বৃহস্পতিবার- দুইদিনেই বিএনপির প্রার্থীসহ দুইশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর প্রথম আলো স্পষ্ট করেই বলেছে, বিএনপিকে চাপে রাখতেই গ্রেফতার, হামলা, বাধার ঘটনা ঘটছে। আসলে কোন দল বা জোট প্রার্থীকে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ না বিএনপি প্রার্থীদের বাধা দেয়া হচ্ছে সেটি বড় ও মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচনের জন্য সমান সুযোগ প্রাপ্তির যে আকাঙ্খাটুকু জনমনে ছিল তা যে কোথাও বিদ্যমান নেই; বরং এর উল্টো পরিস্থিতি বিরাজমান – তা চোখে আঙুল দিয়ে আর দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, এতোসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কোনো কার্যকর ভূমিকাই দৃশ্যমান নয়। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা যে এরকমটি হবে, সাধারণ মানুষ ইতোপূর্বেই তার আলামত  টের পাচ্ছিলেন বা আচ করতে পারছিলেন। এ কারণে আমজনতা নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকায় অবাক তো হয়ইনি, বিস্ময়ের কোনো বিষয়ও নয় ওই ভূমিকা। এটা সবারই ধারণা ছিল যে, এমনটাই হবে। সাধারণ মানুষ এমনটাও ধারণা করেছিল যে, প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের সম্ভাব্য ভূমিকা কি হতে পারে? তবে কিছুটা কৌতূহল জেগেছে এই কারণে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এত্তোসব সহিংস ঘটনাবলীতে শুধুমাত্র ‘বিব্রত ও মর্মাহত হয়েছেন’। এর মধ্যদিয়ে একটি বিষয় প্রমাণিত হলো যে, সিইসিও বিব্রত ও মর্মাহতবোধ করতে পারেন। এটুকু এখনো অবশিষ্ট আছে। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।

তবে সিইসি’’র এমন বক্তব্য তার এবং পুরো নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব আর ব্যর্থতাই প্রমান করে। এমন অসহায়ত্ব থাকলে জনমনে আস্থাহীনতা ও ভীতির সৃষ্টি হয়। ওই বক্তব্য সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্য হচ্ছে- ‘‘নির্বচন কমিশন একটি এ্যকশন ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠান। কোনো ঘটনায় তার বিব্রত হওয়া বা মর্মাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কমিশন চাইলে যেকোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করতে পারে।”

কিন্তু সাথে সাথে এ বিষয়টিও যেকোনো কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে ক্ষমতাসীন দলের অর্ন্তদ্বন্দ্বে ঢাকার আদাবরে ২ জনের নিহত হওয়াসহ ওই সময় যেসব ঘটনাবলী ঘটেছে তাতে নির্বাচন কমিশন কঠোর হলে এখনকার ঘটনাবলী হয়তো এড়ানো যেতো। সিইসি ওই সময় এও বলেছিলেন, পুলিশ প্রশাসন অন্যায্য কিছু করছে না।

এদিকে, প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই এমন সহিংস রক্তারক্তির ঘটনাবলীর পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময়ে প্রার্থীরা বৈধ অস্ত্র বহন করতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কেন চুপচাপ? বিগত নির্বাচনগুলোতে বৈধ অস্ত্রও সংশ্লিষ্ট থানায় বা  আইনী হেফাজতে রাখার বিধান ছিল। এবারই তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।

যে ধারায় ও পর্যায়ে হামলা, গ্রেফতার, সহিংসতা চলছে এবং চালানো হচ্ছে এবং প্রশাসনের যে ভূমিকা তাতে সাধারণ মানুষের মন ও মনোজগতে বিদ্যমান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শংকা এতোটুকুও তো কমেইনি, বরং দিনে দিনে বাড়ছেই। এ কারণেই সর্বত্র একটি প্রশ্নই এখন উচ্চারিত হচ্ছে- ‘আমরা আমাদের ভোটটি শেষ পর্যন্ত ‘সহি-সালামতে’ দিতে পারবো তো?’ এই ভীতি, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, শংকা দূর করতে না পারার ব্যর্থতা পুরোটাই নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, সিইসি যতোই বিব্রত ও মর্মাহত হবেন, জনমনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সংশয় -সন্দেহ ততোই বাড়তেই থাকবে। আসলে পুরো পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং কর্মকান্ডে সাধারণ ভোটাররাই সত্যিকার অর্থে বিব্রত, মর্মাহত।