Home » প্রচ্ছদ কথা (page 10)

প্রচ্ছদ কথা

উন্নয়নের সহিংসতা

আনু মুহাম্মদ ::

‘উন্নয়ন’ শব্দটি সকলের জন্য একই অর্থ বহন করে না। উন্নয়ন কি সকলের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে নাকি বহুজনের জীবন ও প্রকৃতির বিনিময়ে কতিপয়কে দানব বানাবে, তা নির্ভর করে উন্নয়নের গতিপথ কারা নির্ধারণ করছে তার ওপর। পুঁজির শাসনের মধ্যে যখন আমরা বাস করি, তখন যে কোনো উপায়ে পুঁজির সংবর্ধনকেই ‘উন্নয়ন’ নাম দিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হয়। তার পরিণতি যা-ই হোক না কেন, প্রচারণায় তৈরি করা একটা আচ্ছন্নতার কারণে উন্নয়নের সাথে ধ্বংস বা বিপন্নতার পার্থক্য ধরতে সমাজ অনেক সময়ই ব্যর্থ হয়।

বর্তমান সমাজে ‘উন্নয়ন’ নামে কতিপয়ের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভবন প্রক্রিয়াটি অন্তর্গতভাবেই সহিংস। পাওলো ফ্রেইরির ভাষায়, ‘Every relationship of domination, of exploitation,of oppression,is by definition violent, whether or not the violence is expressed by drastic means. In such a relationship, dominator and dominated alike are reduced to things – the former dehumanized by an  excess of power and later by lack of it.’ (The Practice of Freedom,1973) । অর্থাৎ এ রকম সমাজে প্রতিটি আধিপত্যের সম্পর্ক, প্রতিটি শোষণ ও নিপীড়নের সম্পর্ক নিজে থেকেই সহিংস; তাতে সহিংসতা খোলাখুলি ভয়াবহ চেহারায় দেখা যাক বা না যাক। এ রকম সম্পর্কের মধ্যে আধিপত্যকারী এবং আধিপত্যের শিকার-দুই পক্ষই বস্তুতে পরিণত হয়। প্রথম দল ক্ষমতার আতিশয্যে অমানুষ হয়, দ্বিতীয় দল মানুষের জীবন থেকে ছিটকে পড়ে ক্ষমতার অভাবে।

২. বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় মাথাপিছু এক হাজার ডলার অতিক্রম করায় বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আসলে সঠিকভাবে পরিমাপ করলে বাংলাদেশের জিডিপি এবং মাথাপিছু আয় আরো বেশি হবে। কারণ বাংলাদেশে হিসাব বহির্ভূত আয়ের অনুপাত হিসাবকৃত জিডিপির শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি। এর একটি বড় অংশ চোরাই অর্থনীতি, যা তৈরি হয় ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, কমিশন, রাষ্ট্রীয় প্রকল্প সম্পদ লুণ্ঠন, মাদক ব্যবসা, মানব পাচার, নিপীড়নমূলক যৌন বাণিজ্য ইত্যাদি অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিমাপ করার অনেকগুলো সমস্যা আছে। একটি দেশে জিডিপি অনেক বেশি হলেও টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে। কেননা জিডিপি বৃদ্ধি এমন সব উপায়ে হতে পারে যাতে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বিপন্ন হয়। সে জন্য জিডিপির গুণগত দিকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তাছাড়া মাথাপিছু আয় একটি গড় হিসাব। এ থেকে সমাজে আয় বিতরণের বা বৈষম্যের কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। সে জন্য যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে মাথাপিছু আয় বাড়লেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় অনেক নিম্ন পর্যায়ে থাকতে পারে, যেমন বাংলাদেশে আছে।

সে জন্যে মাথাপিছু আয় বেশি হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন। মিয়ানমারে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের সমান, অর্থাৎ তারাও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এছাড়া আছে ভারত, পাকিস্তান, সেনেগাল, জিবুতি, সুদান। নাইজেরিয়া একই গ্রুপে হলেও তাদের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ ভালো, এটা বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং আরো খারাপ।

৩. তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব এবং সেতু, সড়ক, ফ্লাইওভার, বহুতল ভবন ইত্যাদির তালিকার পাশাপাশি কত নদী-খাল-জলাশয় নর্দমায় পরিণত হলো, এর কত ভাগ দখল হয়ে গেল, কত নদী মরে গেল, কত পাহাড় ব্যক্তি দখলে গেল, কত পাহাড় সমতল বানিয়ে ভবন হলো, কত বন উজাড় হলো, বাতাস কত দূষিত হলো, ভূগর্ভের পানি কত নিচে নামল, নদীর পানি কত দূষিত হলো, বায়ু কত বিষাক্ত হলো, ফল সবজি মাছ মাংস কত বিষমুক্ত হলো, শিক্ষা চিকিৎসার ব্যয় কত বাড়ল, দেশ কত ঋণগ্রস্ত হলো, কত হাজার লাখ কোটি টাকা লুট ও পাচার হলো, কত জমি দখল হলো, খুন গুম হলো কত মানুষ, নিরাপত্তাহীনতা কত বাড়ল, ভর্তি নিয়োগ বাণিজ্য কত বাড়ল, ঘুষ দুর্নীতি কমিশন কত বাড়ল, নারী নির্যাতন খুন ধর্ষণ পাচার কত বাড়ল, প্রতিষ্ঠান কত বিপর্যস্ত হলো-এই তালিকাও রাখতে হবে। তাহলে উন্নয়নের চরিত্র বোঝা যাবে; এটি আদৌ টেকসই কিনা, এর সুফলভোগী কারা, এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সমৃদ্ধি না বিপন্নতা তৈরি হচ্ছে তা বোঝা সম্ভব হবে।

৪. পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি, সহিংসতার শুরু হয়েছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প দিয়ে। মানুষকে কিছু না জানিয়ে, মানুষ ও প্রকৃতির কথা না ভেবে, বিদেশী ঋণ নিয়ে কাজ শুরু হলো। এক রাতে এই প্রকল্পের ‘শুভ উদ্বোধনে’ গ্রাম শহর ডুবে গেল, লাখো মানুষ ভেসে গেল। এভাবেই বৈরিতা আর সহিংসতার বীজ বপন ঘটল। এটা পাকিস্তান আমলের ঘটনা। বাংলাদেশ একটুও বদলায়নি, তার ওপর ভর করেই এগিয়েছে। সরকার পরিবর্তনেও ধারার পরিবর্তন ঘটেনি। চার দশক ধরে সহিংসতা, সামরিকীকরণ, জবরদস্তি, নির্যাতন, দখল, জাতিগত অস্তিত্বের অস্বীকৃতি ও অবমাননা-এ সবই পার্বত্য চট্টগ্রামের দিনের পর দিনের কাহিনী। কত লাখ কোটি টাকা এর কারণেই অপচয় হলো, তার হিসাব নেই।

৫. ভবদহ এলাকার দরিদ্র, জলাবদ্ধতা-জর্জরিত কয়েক হাজার নারী-পুরুষ তাদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাতে এসেছিল; বিনিময়ে পুলিশ এই দুর্বল মানুষদের ওপর লাঠিচার্জ করেছে। বছরের পর বছর এই জলাবদ্ধতা কেন তা একটু জানতে চেষ্টা করলেই পরিস্কার হবে এটা প্রাকৃতিক কারণে হয়নি, হয়েছে  ‘উন্নয়ন’ নামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের কারণে। দেশের বহু নদী মারা গেছে এসব প্রকল্পের কারণে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা আরেকটি ফলাফল। বহু মানুষ যে নদী ভাঙন ও জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে শহরে উদ্বাস্তু, তারও বড় কারণ এই সব প্রকল্প। সরকার পরিবর্তনে এর ধারাবাহিকতার কোনো পরিবর্তন হয় না; কারণ এর সুবিধাভোগী অভিন্ন। এসব প্রকল্পে লাভবান হয় দেশ-বিদেশের কতিপয় গোষ্ঠী। তার মধ্যে বহু ‘বিশেষজ্ঞ’ও আছে, যারা এগুলোর কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু ভোগান্তি বহন করতে হয় মানুষকে, প্রতিবাদ করলেও যাদের আঘাত পেতে হয়। উন্নয়ন নামের এসব প্রকল্পের যথেষ্ট বিরোধিতা হয়নি বলেই দেশে নদী পাহাড় জমি জলাশয় এবং শেষ বিচারে অসংখ্য মানুষ দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।

৬. টাম্পাকো নামের কারখানা মুহূর্তে শ্মশানে পরিণত হয়েছে। দুনিয়া ভেঙে পড়ার এই আর্তি, এই হাহাকার, এই পোড়া মানুষের ভার কে বহন করবে? ৩৫ জন শ্রমিকসহ মোট ৩৯ জন পুড়ে মরলো আবারও। নিমতলী, তাজরীন, রানা….একই মডেল। যারা বেঁচে কাতরাচ্ছে, তাদের জীবন হবে দুর্বিষহ। প্রতিটি লাশের পরিবারের জন্য সরকার দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে খালাস। জনগণের টাকা দিয়ে সরকারের এই ‘মহানুভবতা’ কেন? মালিক কই? পুলিশ এখন মালিককে খুঁজে পাচ্ছে না। এমপি সাহেবের কারখানায় এই মৃতের সারি তো কোনো দুর্ঘটনা নয়-হত্যাকান্ড। জানা ছিল সমস্যা, সাপ্লাই ঠিক রাখার জন্য মেরামত করার সময় মেলেনি মালিকের। মুনাফা উঁচুতে রাখার অন্যতম উপায় খরচ কমানো। খরচ কমানোর অন্যতম উপায় মজুরি কম দেয়া বা না দেয়া, আর কারখানার মধ্যে কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ না করা। মুনাফার প্রবাহ বাড়াতে জেনেশুনে তাই মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

কোনো কারখানার যন্ত্রপাতি যদি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, কোনো কারখানা ভবন যদি ত্রু টিপূর্ণ হয়, তার দেখাশোনার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তাদের কাছে মালিকের মুনাফাই প্রধান বিবেচ্য। বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে মুনাফার কাছে মানুষ আর পরিবেশ সব তুচ্ছ। মুনাফা কম হলে বিনিয়োগের উৎসাহ পাবে না মালিকরা, বিনিয়োগ না হলে জিডিপি বাড়বে না। রাষ্ট্র তাই জিডিপি বাড়ানোর জন্য, কিছু লোকের বিত্তবৈভব বাড়ানোর জন্য কোরবানি দিচ্ছে মানুষ আর পরিবেশকে। মুনাফা উঁচুতে রাখার অন্যতম উপায় খরচ কমানো : কাজের পরিবেশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ না করা, পানি নদী বায়ু দূষণ রোধের যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা। এতে শ্রমিকের জীবন গেল, নদী বন খুন হলো, তাতে কোনো সমস্যা নেই। শ্রমিকের সংগঠন নেই বলে প্রতিরোধ নেই, তাই মালিকের যথেচ্ছাচারের সুবিধা আরো বেশি। আর মজুরি চাইলে, নিরাপত্তা চাইলে পুলিশ তো আছেই। যখন এক কারখানায় পুড়ে ছাই বা ধসে পিষ্ট শ্রমিকরা, তখন অন্য অনেক কারখানায় বকেয়া মজুরি আর ঈদ বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা মিছিল করছে। পুলিশ তাদের ওপরও চড়াও হচ্ছে। থানা আর মাস্তানদের অর্থ দিয়ে যদি সব ঠান্ডা রাখা যায়, মজুরি আর বোনাস দেবার কী দরকার? নিরাপত্তার জন্য খরচেরই বা কী দরকার? এই হত্যাকান্ডের দায়ভার প্রথমত মালিকের, দ্বিতীয়ত সরকারের। আর দুজনই একাকার।

৭. ১৯৯৭ সালে মার্কিন কোম্পানির হাতে মাগুরছড়া বিস্ফোরণ ঘটেছিল। এতে সরকারি দলিল অনুযায়ীও নষ্ট হয়েছে এমন পরিমাণ গ্যাস, যা প্রায় এক বছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের সমান। এর ক্ষতিপূরণ না দিয়ে অক্সিডেন্টাল নিজে লাভ করে নিয়ে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের কাছে ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়। ইউনোকল গ্যাস ‘রপ্তানি’র নামে পাচারের জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করে, কিন্তু জনপ্রতিরোধের কারণে ব্যর্থ হয়। তার পরও অনেক মুনাফা নিয়ে এটিও ব্যবসা বিক্রি করে চলে যায়। আসে শেভরন। একের পর এক কেনাবেচা হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু এদের কারো গলায়ই ক্ষতিপূরণের কথা ওঠে না। এখন শেভরন অতিরিক্ত গ্যাস তুলে, লাউয়াছড়ার বিনাশ করে বিপুল মুনাফা পকেটে নিয়ে আরো অর্থ কামাইয়ের জন্য এই ব্যবসা বিক্রি করে চলে যাওয়ার আয়োজন করছে। বিভিন্ন মিডিয়া তাদের বিনিয়োগের কথা বলে ধন্য ধন্য করে, তার চেয়ে বেশি যে ক্ষতিপূরণের টাকা তাদের কাছেই আমাদের পাওনা, সেই কথার কোনাও শোনা যায় না। ক্ষতিপূরণ হিসাব করতে হবে যে পরিমাণ অনবায়নযোগ্য গ্যাস তারা নষ্ট করেছে, তা বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে আমদানির দাম ধরে। তার পরিমাণ কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

৮. ২০০৫ সাল থেকে আমরা ফুলবাড়ীতে জালিয়াত কোম্পানি এশিয়া এনার্জির (জিসিএম) উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরোধিতা করেছি। যথারীতি ‘উন্নয়নবিরোধী’সহ নানা অপবাদে ভূষিত হয়েছি, যুক্তি-তথ্য আর দেশের স্বার্থ না মেনে তখনকার চারদলীয় জোট সরকারও একদিকে কুৎসা অপপ্রচার, অন্যদিকে দমন-পীড়নের পথ নিয়েছে। বিশাল জনপ্রতিরোধক গুলি করে থামাতে চেয়েছে। খুন করেছে, পঙ্গু করেছে; কিন্তু টলাতে পারেনি মানুষকে। একপর্যায়ে সরকার নতি স্বীকার করে জনগণের সাথে চুক্তি করেছে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ তার নাম। এরপর আরো দু-তিন সরকার এলো। অঙ্গীকার সত্ত্বেও  চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি, বারবার চেষ্টা হয়েছে এশিয়া এনার্জিকে পুন:প্রতিষ্ঠার। ফুলবাড়ীর কয়লা দেখিয়ে শেয়ার ব্যবসা করে কোম্পানি টাকা কামায়, কোনো সরকার আপত্তি করে না। শুধু ভাগ বসায় নিজের পকেটের জন্য। সন্ত্রাসী নিয়োগ, হামলা, মামলা, প্রচারণা চলে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে।

কোম্পানির টাকায় মন্ত্রী, এমপি, কনসালট্যান্ট, আমলা বিদেশে যায়। এসে বলে-কোনো ক্ষতি হবে না, দেখে এলাম জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া। আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলি, এই দেশ ভিন্ন, এখানে পানিসম্পদ সমৃদ্ধ, এখানে আবাদি জমি, এখানে ঘন জনবসতি। তা ছাড়া এই সম্পদ কেন বিদেশি কোম্পানি পাচার করতে পারবে? সব সম্পদ এই দেশের মানুষের কাজে লাগাতে হবে। অনেক ছলাকলা আর জোর-জবরদস্তি সত্ত্বেও   ফুলবাড়ী প্রতিরোধ কখনো দুর্বল হনি। তাই শেষ চক্রান্ত হয়েছে বড়পুকুরিয়া নিয়ে। সেখানে শুরু করে ফুলবাড়ীতে আসার ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে কোনোভাবেই প্রমাণ করা গেল না যে এটি বাংলাদেশে সম্ভব, বরং বারবার এটাই প্রমাণ হলো যে ভয়ংকর সর্বনাশ হবে।

যদি জনপ্রতিরোধ তৈরি না হতো, যদি অপমান অপবাদ নির্যাতন হামলা মামলা মোকাবেলা করে এই বিরোধিতা অব্যাহত না থাকত, তাহলে এত দিন উত্তরবঙ্গ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ পানির সর্বনাশ হতো সবচেয়ে বেশি, আর কয়লা সম্পদও কোম্পানির পকেট ভারী করে বিদেশে চলে যেত। তখন কি যারা একে উন্নয়ন দেখিয়ে দেশের সর্বনাশে উদ্যত হয়েছিল তাদের পাওয়া যেত?  না। আজ যখন এই আন্দোলনের ন্যায্যতা সরকারি গবেষণায়ই প্রমাণিত হচ্ছে, তখন তো এই মন্ত্রী এমপি আমলা ‘বিশেষজ্ঞ’দের নাম বিচারের তালিকায় স্পষ্ট করে লিখতে হবে। এদের খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, কারণ এসব লোকই এখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে ওকালতি করছে। ফুলবাড়ীর মতো সুন্দরবন রক্ষার লড়াইও দাঁড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তথ্য আর সর্বজনের সর্বপ্রাণের শক্তির ওপর। ইতোমধ্যেই আন্দোলনের নৈতিক বিজয় হয়েছে, প্রলাপ চলছে সুন্দরবনবিনাশী অসুরদের।

৯. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বহু সমস্যার একটি আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ভবন ও স্থান এখন সরকারি দলপুষ্ট লোকজনের দখলে। কোথায় তাহলে থাকবে শিক্ষার্থীরা? মেস করে থাকা ব্যয়বহুল এবং এখন নিরাপদও নয়। শিক্ষার্থীরাই সরকারকে সমাধান দিয়েছে, পুরনো কারাগারের স্থানে হল নির্মাণ করা হোক। এই প্রস্তাবই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। আরেকটি সমাধান হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ভবন দখলমুক্ত করে আবাসিক সমস্যার সমাধান এবং পুরনো কারাগারের স্থানে রমনা পার্কের মতো শ্বাস নেবার জায়গা বানানো। কোনোভাবেই আবাসিক হলের চেয়ে শপিং মল গুরুত্ব পেতে পারে না। এই জমির দিকে নজর আছে ভূমিদস্যু, দখলদারদের। একদিকে সর্বজনের শিক্ষার দাবি, অন্যদিকে সর্বজনের জমিতে কতিপয় গোষ্ঠীর ব্যবসার দাবি। সরকার যে দ্বিতীয় পক্ষের নানা প্রস্তাব নিয়েই বেশি আগ্রহী তা গত ২২ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা থেকেই স্পষ্ট হলো।

১০. ফরসা হবার ক্রিম, টুথপেস্ট, সাবান বা পাউডার, হরলিকস, গুঁড়া দুধ, কোক-পেপসি-টাইগার-ফ্রুটিকাসহ নানা নামের তথাকথিত এনার্জি  ড্রিংক ইত্যাদির বিজ্ঞাপনে অ্যাপ্রন পরা বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তার দেখা যায়। তারা আমাদের জানায় যে এগুলো খুবই কার্যকর বা স্বাস্থ্যকর বা শক্তিবর্ধক বা সৌন্দর্যবৃদ্ধির অমোঘ উপায়। আর বিজ্ঞানীর একটু অনুসন্ধানেই বের হয় ইউনিলিভারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সব প্রসাধন সামগ্রীতে ভয়াবহ প্লাস্টিক  কণা, কোক-পেপসি-ফ্রুটিকাসহ এনার্জি ড্রিংকে বিষ, হরলিকসে বিপজ্জনক উপাদান। বিজ্ঞান যেগুলোকে সর্বনাশা বলে, বিজ্ঞাপন সেগুলোকে মানুষের সামনে মনোহর করে হাজির করে। ক্রিম মেখে ফরসা হবার, বিষাক্ত জিনিস খেয়ে স্মার্ট হবার উন্মাদনা তৈরি হয়। বাজার বিস্তৃত হয়। জিডিপি বাড়ে। ঘরে ঘরে সর্বনাশ ঘটতে থাকে।

সুন্দরবন, বড়পুকুরিয়া, বাঁশখালী, রূপপুরসহ তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের পক্ষে ওকালতি করার জন্য আমরা যেসব বিশেষজ্ঞ দেখি, তারা ওই রকম বিজ্ঞাপনের অ্যাপ্রন পরা ডাক্তার/বিশেষজ্ঞের মতোই, অর্থের বিনিময়ে তারা বিষকে মধু হিসেবে হাজির করে। মুনাফার উন্মাদনায় কোম্পানি আর ‘সরকার’ একাকার হয়ে মানুষের শরীর ও জগৎকে বিষময় করতে করতে উন্নয়নের বাদ্য বাজায়।

১১. বিজ্ঞাপনী সংস্থা ভাড়া করা হয়েছে রামপাল প্রকল্পের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য। প্রচার ডিজাইনের অংশ হিসেবে আমদানি করা ভাড়াটে ‘বিশেষজ্ঞ’রা বেশ তৎপর। ভাড়াটে কথায় কোনো লাগাম থাকে না, তাই তারা বলতে পারে : ‘এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে, যাতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনোই বায়ুদূষণ হবে না, বরং দূষণ আরো কমে যাবে, সুন্দরবন আরো সুরক্ষিত হবে। পানি এতই বিশুদ্ধ করা হবে যে তা পান করাও সম্ভব হবে?’

এ দেশের নদী ও বনবিনাশী বিভিন্ন প্রকল্প, সড়ক-সেতু-ভবন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি, মানুষের জীবন ও সম্পদ নিয়ে ভয়াবহ সব চুক্তি, ঋণনির্ভরতা সৃষ্টি, জাতীয় সক্ষমতার ক্ষয় ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নামের কনসালট্যান্টদের ভূমিকা নীতি-কাঠামো প্রণয়ন ও যৌক্তিকতা নির্ধারণের, আমলাদের ভূমিকা তার বাস্তবায়নের পথ তৈরি। আর ক্ষমতায় থাকা সামরিক-বেসামরিক রাজনীতিবিদদের ভূমিকা ক্ষমতা খাটিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন। সবার সুবিধা যোগসাজশেই এগুলো হয়। কোনো কোনো অপকর্মের জন্য রাজনীতিবিদদের শাস্তি হয়, কখনো কখনো প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, ক্ষমতায় থাকা জেনারেলদেরও বিচার হয়; বিচার না হলেও জনগণের বিচারে তাদের পরিচয় নির্দিষ্ট হয়, কেউ চোর, কেউ প্রতারক, কেউ জালিয়াত ইত্যাদি। কিন্তু যে সব কাজের জন্য এসব তিরস্কার, সেগুলোর সাথে যুক্ত থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে, এমনকি জনধিক্কারেরও বাইরে থাকে বিশেষজ্ঞ নামের কনসালট্যান্ট বা লবিস্টরা, মিডিয়া আর সংশ্লিষ্ট আমলারা। অথচ তারাই তৈরি করে সর্বনাশের ভিত। (সৌজন্যে : সর্বজনকথা)

২০১৬ : জঙ্গীবাদীরা যে বার্তাটি দিয়ে গেল

আমীর খসরু ::

বিদায়ী বছরটি বাংলাদেশের জন্য আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে তেমন ঘটনাবহুল ছিল না। এ বছরটিতে ক্ষমতাসীনরা আগের ধারাবাহিকতায়ই মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেই বিরোধী মত, পথ, পক্ষ এবং অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে দমনের কৌশল গ্রহণ আগের মতোই করেছিল। যে কারণে রাজনৈতিক নানা নিপীড়ন-নির্যাতন, নিখোজ করে দেয়া, গুম, আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও জারী থাকবে কিনা- সে প্রশ্নটিই রেখে যাচ্ছে- ২০১৬। সরকারের অঘোষিত যে উদ্যোগ অর্থাৎ বিরোধী দলশূন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা-আপাতদৃষ্টিতে তা সফল হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিরোধী দলগুলো ক্রমাগত নির্জীব হয়ে যাচ্ছে; মানুষ রাষ্ট্রীয় নানা সন্ত্রাস, অনিয়মের বিরুদ্ধেও আর সোচ্চার নয়; সবাই যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন; আর এমন এক নিদারুন অস্বস্তিকর চুপ থাকার বা চুপ করিয়ে দেয়ার নীতি একটি রাষ্ট্রের জন্য যে কতোটা ভয়ংকরভাবে ক্ষতিকর তা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকুও এখন আর বাকি নেই। বাকি নেই বললে ভুল হবে, এটা লোপ পাওয়ানো হয়েছে বা পেয়েছে বহুকাল আগেই। আর বিষয়টি ইচ্ছাকৃত ও কৌশলগত। তবে একথাটি মনে রাখতে হবে যে, বিরোধী দল, মত, পথ, পক্ষকে আপাত দমন করা গেলেও, মানুষের মনোজগতকে কোনোভাবেই দমন করা যায় না এবং এর উপরে কোনো কর্তৃত্বই জারী করা নিস্ফল।

গণতন্ত্রের বদলে উন্নয়ন এবং অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র আর বেশি বেশি উন্নয়ন অগণতান্ত্রিক শাসকদের শ্লোগান বটে; তবে তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ মানকুর অলসন তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Rise and Decline of Nations: Economic Growth, Stagflation and Social Rigidities-এ দেখিয়েছেন, আমাদের মতো রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো আসলে Distributional coalition অর্থাৎ একটি ভাগবাটোয়ারাকারী পক্ষই রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে।

একথা জোর দিয়ে ২০১৬-তেও বারবার বলা হয়েছে যে, কি কি ব্যবস্থাবলী এবং প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে; কতো কতো উন্নয়ন করা হয়েছে – তার ফিরিস্তিও সরকারের দিক থেকে দীর্ঘ। তবে এই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য? জনগণ কিভাবে এবং কতোটুকু উপকৃত হয়েছে সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে? যদি জনগণ উপকৃত না হয়ে থাকে তাহলে ২০১৬ সালেও সেই একই প্রশ্ন ছিল- উন্নয়নের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা কতোটুকু? বাস্তব জবাব কি হবে তা আমরা সবাই জানি। অর্মত্য সেন তার গ্রন্থ The Idea of Justice -এ বলেছেন, ‘‘আনুষ্ঠানিকভাবে কি কি প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে’’।

জনগণের জন্য উন্নয়ন ভাবনার ক্ষেত্রে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক সামির আমিন বলেছেন, ‘‘উন্নয়নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করতে হলে প্রাথমিকভাবে জন-উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না, যা প্রয়োজন তাহলো- রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনগণের সমর্থন’’।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এসব কথা যাদের কাছে পৌছানো প্রয়োজন তাদের কাছে তা পৌছেনা অথবা যতোটা দেখা যাচ্ছে, তারা এতে আদৌ বিশ্বাসী নন।

বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো কার্যত স্থগিত রেখে; একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের অনুপস্থিতিতে জনগণের উন্নয়ন বাস্তবে কতোটা সম্ভব সে প্রশ্ন ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে এসে আবারও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রকট হয়েছে- জনগণের সাথে রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে সম্পর্ক তা কতোটা শিথিল হয়েছে-সে প্রশ্নটিও। এ কথাটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন, সচল-সজীব জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থায় জনগণ ভোটাধিকারের প্রথম ধাপটি পার হয়ে একে একে অন্যান্য অধিকারগুলো ভোগ করবেন-এটাই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। কিন্তু সে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকায় জনগণ এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, রাষ্ট্রের সাথে তাদের হয় বৈরিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে অথবা অবস্থাটা দাড়িয়েছে এমন যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি কোনোভাবেই জনগণের সাথে যে চুক্তিতে আবদ্ধ-তার বরখেলাপ হয়ে গেছে। আর এটি করা হয়েছে জনগণকে বিতাড়িত করার জন্য অত্যন্ত কৌশলে।

সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তারা নিজেদের পুরো মাত্রায় অপ্রাপ্তির বেদনায় পরাজিত বলে মনে করছে। কারণ তেল-গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিই হোক বা তাদের নামে উন্নয়নের বিষয়ই হোক- তা সবই হচ্ছে তাদেরকে না জানিয়ে, জন-আকাংখাকে পাত্তা না দিয়ে। অথচ সবই হচ্ছে তাদেরই নামে। রাষ্ট্রের পরিচালকেরা রাষ্ট্রের সাথে জনগণের তফাতের ওই সম্পর্কটি তৈরি করে চলছে, ওই পরাজিত মনে করার মনোবৃত্তিটি সৃষ্টির লক্ষ্যে। জনমনে সৃষ্ট এই মনোবৃত্তি আসলে পুরো রাষ্ট্রের জন্যই সৃষ্টি করে নানা ধরনের বৈকল্য, ব্যাধি, সামাজিক অনাচার।

বিদায়ী বছরটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল জঙ্গীবাদ। ২০১৬-তেই যে জঙ্গীবাদ বাংলাদেশে রাতারাতি আবির্ভূত হয়েছে বা এর অভ্যুদ্বয় ঘটেছে তা নয়। এর ইতিহাসটি বেশ দীর্ঘ না হলেও বেশ কয়েক বছরের। বিএনপির সময়ে ২০০৫ সালে দেশে একযোগে ৬০টি জেলায় বোমা হামলাসহ নানা ঘটনা ঘটেছিল। এরপরে ওই ঘটনার নায়ক শায়খ রহমান, বাংলাভাইসহ বেশ কয়েকজনকে ফাসি দেয়ার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ের জঙ্গীবাদীরা ছিল কম মাত্রার ‘রেডিক্যালাইজড’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিহীন, স্থানীয় অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছিল তখন। তবে তখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে ওই সময়ের জঙ্গীবাদ বর্তমানের মতো কৌশলগতভাবে ততোটা উন্নত ছিল না। তাছাড়া উচ্চবিত্তের সন্তান, ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে তারা কোনোভাবেই আকৃষ্ট করতে পারেনি। ওই সময়ের জঙ্গীবাদ সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ বড়জোর মাদরাসা পড়ুয়া কিছু মানুষের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। যতোদূর বোঝা যায় তাতে, তাদের উদ্যোগটি ভিন্ন ধারার ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল এবং তা ছিল স্থানীক বা এলাকাভিত্তিক।

ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা যখন জঙ্গীবাদী দলগুলোতে ঢুকে পড়েছে এবং একের পর এক ব্লগারসহ ভিন্ন চিন্তা ও মাত্রার মানুষদের উপর হামলা ও হত্যাকান্ড চালাতে থাকে- তখন সরকার একে প্রথমে অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল, পরে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার এবং আরও পরে স্থানীয় জঙ্গীদের কাজ বলে চালিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বেশ জোরেসোরেই তখন বলা হচ্ছিল- দেশে কোনো জঙ্গীবাদ নেই। যখন এসব কথা বলা হয়, ইতোমধ্যে ডজনেরও বেশি ব্লগার, প্রকাশক, লেখক এবং ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যার ঘটনা ঘটে গেছে। অথচ সরকার তখনো ছিল গণতন্ত্র না উন্নয়ন বিতর্কে বিভোড় এবং গণতন্ত্রের ছিটেফোটাটুকুতেও বাধাসৃষ্টিতে উদগ্রীব। গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি যে জঙ্গীবাদের উত্থানের ক্ষেত্র ও চারণভূমি-তা যতোই বলা হয়েছে-সরকার তা শোনেনি; শুনতে চায়নি। দেশে একদিকে রাজনীতিহীনতা, দুর্নীতি, হত্যা, গুমসহ অপশাসনের পরিস্থিতি চলতে থাকে; সাথে সাথে বেড়ে উঠতে থাকে জঙ্গীবাদ। আর এসব জঙ্গীরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক সংযোগ খুজতে থাকে। সরকারের দিক থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়টি কবুল করা হয়নি যে, বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট বা আইএস এবং আল কায়েদা রয়েছে। তবে ওই দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের কথা জানান দিয়েছে। এসব পাল্টাপাল্টি অবস্থার মধ্যে একজন ইতালীয় ও একজন জাপানী নাগরিক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যার কাজটি সম্পন্ন করে ফেলেছে জঙ্গীরা। এমনই অবস্থায় ২০১১৬-র পহেলা ও ২ জুলাই ঘটে যায় গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এই ঘটনা অনেকেরই নানা ধারণা পাল্টে দিয়েছে। যারা প্রচার করেছিল দেশে জঙ্গীবাদ নেই বা থাকলেও তা ততোটা প্রবল নয়-জঙ্গীরা তাদের কাছে ওই ঘটনার মধ্যদিয়ে ভিন্ন বার্তা পৌছে দিয়েছে। এছাড়া শুধুমাত্র কিছু মাদরাসা পড়ুয়া হতদরিদ্র মা-বাবার সন্তানরাই যে জঙ্গী হয়- এতো দিনের সে ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। আবারও সেই কথাটি প্রমাণিত হয় যে, গণতন্ত্রই রুখে দিতে পারে জঙ্গীবাদ।

জঙ্গীবাদ স্থায়ীভাবে রুখে দেয়ার ব্যাপারে এরপরেও সরকার ভিন্নমত পোষণ করে, ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছে। জনগণ এবং অপারপর দল, মত, পক্ষকে আস্থায় এবং সাথে নিয়ে জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ দমনের পথ পরিহার করে, স্বভাবসিদ্ধ রীতি অনুযায়ী তাদের নির্ভরতার স্থান হয়ে দাড়ায় আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনী। এতে বিভিন্ন সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার নানা ঘটনা বিভিন্নভাবে শোনা যেতে থাকে। শুনতে হয় পোশাকধারীদের পরিচয়ে কথিত জঙ্গী গ্রেফতারের নামে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। আইন-শৃংখলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু এর সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গীবিরোধী অভিযানের নামে কথিত নিখোজদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। আগে অভিভাবকগণ মুখ না খুললেও এখন তাদের সন্তানদের খবরাখবর জোগাড়ের চেষ্টা করছেন; বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; করুণ আকুতি নিয়ে দাবি জানাচ্ছেন সন্তান ফেরত পাওয়ার জন্য।

এসব যখন চলছে ঠিক তখনই আইএস এবং আল কায়েদা সিরিয়া, ইরাক থেকে নিজেদের বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে দেয়ার যে নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে-সে বিষয়ে বাংলাদেশের করণীয় কী- তা চাপাই পড়ে যাচ্ছে।

আপাত একটি স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করলেও এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, সত্যিকারেই কি জঙ্গী দমন সম্ভব হয়েছে? উত্তরটি নিশ্চয়ই হবে নেতিবাচক। কারণ গণতন্ত্রবিহীন সমাজে জঙ্গীবাদ-উগ্রবাদ সমূলে উৎপাটন এবং নির্মূল সম্ভব নয়। ২০১৬ সাল এটাই শিক্ষা দিয়ে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে।

জেলা পরিষদ নির্বাচন : মৌলিক গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক.

স্বৈরশাসক আইয়ুবের বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্র এবং একইসাথে বিডি বা মৌলিক গণতন্ত্রীদের কথা অনেকেরই মনে আছে নিশ্চয়ই।  ওই সময়ে এক বিডি মেম্বর কোন এক গ্রামের হাটে গেছে গরু কিনতে। দরদাম শুরু করতেই শান্ত-শিষ্ট  গরুটি হঠাৎ বিডি মেম্বরের দিকে তেড়ে এল গুঁতোতে। বিক্রেতা-ক্রেতা দুজনেই অবাক। পাশ থেকে একজন বললেন, বিডি মেম্বর  তো! পরে এই খবরটি তৎকালীন ইত্তেফাকের স্থানীয় সংবাদদাতা ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন। ইত্তেফাক তখন ওই খবরটি বেশ গুরুত্বের সাথেই প্রকাশ করলো “চিনিল কেমনে” এমন শিরোনামে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে পতিত এরশাদের সাগরেদরা যেমন ‘গণদুশমন’ নামে আখ্যায়িত হয়েছিল, তেমনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ও পতিত আইয়ুবের শাগরেদ বিডি মেম্বর-চেয়ারম্যানরাও ‘গণদুশমন’ হিসেবে কুখ্যাতি লাভ করেছিল।

বিডি মানে হচ্ছে বেসিক ডেমোক্রেসি বা বুনিয়াদী গণতন্ত্র। সামরিক জান্তা প্রধান আইয়ুবের দাবি ছিল এটি তার উদ্ভাবন। ১৯৫৯ সালের ২৬ অক্টোবর উদ্ভট এই বুনিয়াদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পাকিস্তানে চালু করেছিল আইয়ুবের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার। আসলে এটি ছিল ব্রিটিশ অপকৌশল। এই পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না এবং এই ব্যবস্থায় যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারা ছিলেন জোতদার বা ভূস্বামী শ্রেনীর; যারা শতবছর ধরে এলাকার রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রন করেছেন। এরাই ছিল আইয়ুব বা জান্তা সরকারের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এবং এদের ভোটে পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক পদ্ধতি চালু করা হয়।

আত্মজীবনী ‘ফ্রেন্ডস, নট মাষ্টার্স’ গ্রন্থে আইয়ুব জানাচ্ছেন “ বুনিয়াদী গণতন্ত্রীদের ভিড়েই তাদের এলাকার উন্নয়ন স্নায়ুতন্ত্র তৈরী হবে। সব ধরনের স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক দায়- দায়িত্ব ওই  কেন্দ্রের  মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে। …বুনিয়াদী গণতন্ত্রীরা পর্যায়ক্রমে সরকারী সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রন করবেন এবং সেগুলি জনসংস্থা হিসেবে কাজ করতে শুরু করবে, সমাজে উদ্দীপনা তৈরী করবে এবং নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিগুলিকে স্বাধীন করে তুলবে। এটি দেশে একটি গতিশীল ও প্রত্যয়ী নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয়”।

শুনতে খুবই চমৎকার শোনাচ্ছে! তবে মনে রাখতে হবে, আইয়ুবের জান্তা সরকার ছিল সিভিল-মিলিটারী আঁতাতের ফসল এবং খুবই শক্তিশালী সামরিক- বেসামরিক ব্যুরোক্রেসি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে আষ্টে-পৃষ্টে আটকে ফেলেছিল। আমলা-কর্মচারীরা হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। রাজনীতিবিদরা ছিলেন অচ্ছুৎ! সেখানে বুনিয়াদী গণতন্ত্রের যারা প্রতিনিধিত্ব করছিল ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশটি এবং জান্তা শাসনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে গ্রামীন সমাজে গজিয়ে ওঠা একটি নব্য টাউট শ্রেনী। কমবেশি দুই যুগের ব্যবধানে বাংলাদেশে জিয়া ও এরশাদের গ্রাম সরকার, যুব কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদকে কেন্দ্র করে গজিয়ে ওঠা টাউট শ্রেনী এখন গ্রামীন ও নগর কাঠামোয় সমাজ ও রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে দলগুলোর কাছে আদৃত এবং একই ধারায়।

১৯৫৯ সালে আইয়ুব যখন ‘বিডি ব্যবস্থা’ চালু করেন তখন ধারনা করা না গেলেও অচিরেই বুনিয়াদী গণতন্ত্রীরা নির্বাচকমন্ডলী হিসেবে বাঙালীদের ওপর জেঁকে বসে। ১৯৬০ সালে প্রথম বিডি নির্বাচনের পর আইয়ুব আস্থা ভোটের আয়োজন করে ৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন (দেড় দশক পরে প্রথমে জেনারেল জিয়া ও পরের দশকে জেনারেল এরশাদ বাংলাদেশে সামরিক শাসনের আওতায় এরকম আস্থা ভোটের আয়োজন করে ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন)। আইয়ুব আত্মকথায় লিখেছেন, “ আমার কাছে এটি সম্পুর্ন পরিস্কার যে, আমাদের শিক্ষা, রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও অর্থনৈতিকমান উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উন্নীত না হওয়া পযর্ন্ত মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা বহাল থাকবে।

দুই.

ইতিহাসে প্রথমবারে মত জেলা পরিষদ নির্বাচনের পথে হাঁটছে। পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থায় গোপন ব্যালটে নির্বাচকমন্ডলীর ভোট আইয়ুব আমলের বুনিয়াদী গণতন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ফলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে বিডি বললে অপলাপ বা ভুল হবে কী? স্থানীয় সরকারের মধ্যে সর্বোচ্চ বা কুলীন স্তর হলেও স্বাধীনতার পরে এই প্রথম পরোক্ষ ভোটের নির্বাচন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা উল্লেখ রয়েছে, ১৮৮৫ সালে গঠিত জেলা পরিষদ ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ড নামে স্বাধীন তহবিলসহ স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান ছিল। আইয়ুব আমলে নাম পাল্টে হয়ে যায় কাউন্সিল।

স্বাধীনতার পরে আবার নাম পাল্টে জেলা বোর্ড। ১৯৯২ সালের ৩০ জুলাই থেকে অনধিক ৬ মাসের মধ্যে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ও ছিল। সেই রায়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে দুই যুগ পরে এই নির্বাচন হচ্ছে কি? কিন্তু পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করতে সুপ্রিম কোর্টের আরও একটি রায় রয়েছে। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত পরোক্ষ ভোটের ব্যবস্থা সম্বলিত গ্রাম পরিষদ আইনটি বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট। সবচেয়ে বড় উদাহরন হচ্ছে, অনির্বাচিত ব্যক্তি কোন স্তরে থাকবে না- এই যুক্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে পঞ্চদশ সংশোধনীর আওতায়, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের আমলেই।

১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থার সরকার প্রবর্তিত হওয়ার পর নির্বাচকমন্ডলীর মাধ্যমে প্রকাশ্য ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী লীগ হাইকোর্টে রিট করেছিল। যুক্তি ছিল, সংবিধানে বলা আছে, প্রশাসনের সকল পর্যায়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আবার আওয়ামী লীগই সংবিধানের ব্যতয় ঘটিয়ে অনির্বাচিত প্রশাসকদের দিয়ে জেলা পরিষদ চালিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, এখন আবার দলীয়-নির্দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদে নির্বাচিতদের ভোটে গঠিত নির্বাচকমন্ডলীর মাধ্যমে দলীয় মনোনীতদের অংশগ্রহণে ইতিহাসের প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, জেলা পরিষদে পরোক্ষ ভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা সাংবিধানিক প্রশ্ন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায়ই সরকার এই নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এটি আদালত অবমাননা কিনা, সে সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই আদালত নেবে। মামলাটি ১৪ বছর ধরে বিচারাধীন। পরোক্ষ ভোটে জেলা পরিষদ গঠন কেন অসাংবিধানিক নয়- এই মর্মে সরকারের ওপর উচ্চ আদালতের রুল জারি থাকলেও সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় এবং নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে উদাসীন। ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক আদেশে বলেছিলেন, বিষয়টি সংবিধানের ২৬ ধারা অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের সাথে জড়িত।

আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে যুক্ত এই প্রশ্ন মীমাংসা না করে জেলা পরিষদ নির্বাচন করা অনুচিত। আইনের চোখে বিষয়টি ‘সাবজুডিস’ এবং পরোক্ষ ভোটে নির্বাচন আয়োজন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। দুই হাজার সালে সংসদে মাত্র ২৫ মিনিটে এই আইনটি পাশ হয়েছিল। সে সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিটটি করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরপর তাদের ক্ষমতার পাঁচ বছর (২০০১-০৬) মেয়াদে জেলা পরিষদ আইন সংশোধন, বাতিল বা নির্বাচন- কোনটিই করেনি। অথচ বিএনপি এখন দু:খে-কষ্টে কূল না পেয়ে আগত জেলা পরিষদ নির্বাচন বয়কট করেছে।

 

তিন.

স্থানীয় সরকারের সবকটি পর্যায়কে ক্ষমতাসীন দল দলীয় নেতাকর্মীদের ‘পুনর্বাসন মঞ্চ’ এবং আর্থিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলি দখলে রাখা ও সর্বগ্রাসী-জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার মূল কারণ হচ্ছে, তৃনমূল রাজনৈতিক অর্থায়নকে দলীয় নিয়ন্ত্রনে রাখা। এজন্য অংশ বিশেষ মার্কার, আবার নির্দলীয়-সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারের সকল কাঠামোর নির্বাচনকেও কমেডি বা ট্রাজেডির পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশাসন-পুলিশসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেও।

সেক্ষেত্রে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ দলীয় নিয়ন্ত্রনে থাকলে ওই অর্থ,বিত্ত, ক্ষমতা দলীয় নেতা-কর্মীদের পরিপুষ্ট করবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের সকল কাঠামোয় দলীয় নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিশ্চিত করতে চায় ক্ষমতাসীনরা। ফলে ভোটের অপসংস্কৃতি বিদ্যমান থাকবে-এটাই উদ্দেশ্য বলে মনে করা যায়। এক্ষেত্রে ধরে নেয়া হয়েছে, যে কোন উপায়ে ভোটে জিততেই হবে। কিছুকাল পরে মানুষ সবটাই ভুলে যাবে এবং জয়ী দলের সাথেই হাঁটবে।

এজন্যই জেলা পরিষদের প্রশাসক পদটিতে দলের বঞ্চিত ও ক্ষুব্দ জেলা নেতাদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল আইন-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করেই। এর পেছনেও কাজ করেছে জেলা পরিষদের বিপুল সম্পদ ও আর্থিক সামর্থ্যরে বিবেচনা। স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১৪-১৫ অর্থবছরের রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জেলা পরিষদসমুহের অনুকূলে গত ৫ বছরের বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ৪শ কোটি টাকা। এর বাইরে পরিষদের বিভিন্ন স্থাপনা, ভূমি, ফেরি ঘাট, হাট-বাজার ইজারা থেকে রয়েছে বিশাল আয়।

দেশের বিভিন্ন জেলা- উপজেলার দলীয় কোন্দল, বানিজ্যিক ভাগাভাগিসহ আর্থিক অবস্থান ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের আর্থিক পুনর্বাসনের জন্য প্রথমে প্রশাসক এবং সবশেষে পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা পরিষদ দখলে নেয়ার আয়োজন সম্পন্ন। নির্বাচনের ধরন ও পদ্ধতির কারণে আইয়ুব আমলের বিডি নির্বাচনের মত জেলা পরিষদে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে কারো নির্বাচিত হওয়া সম্ভব নয়। তা সে দলীয় মনোনয়ন বা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হোকনা কেন!

ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের আশা, একজন সৎ, যোগ্য ও দক্ষ মানুষ নির্বাচিত হলে জেলার অনেক উন্নয়ন সম্ভব। অথচ তিনি নিজেও অন্তরে জানেন, এমন মানুষ দলে থাকলেও নির্বাচনের মাঠে হালে পানি পাবেন না। তার নিশ্চয়ই জানা আছে, ঢাকা জেলা পরিষদ থেকে বাদ পড়া প্রশাসক হাসিনা দৌলার বিরুদ্ধে দুদক ১৫টি দুর্নীতি মামলা করেছে। প্রশাসক থাকাকালীন হাসিনা দৌলা ২০১১-১৪ মেয়াদে ঢাকা জেলায়  ৬ হাজার ৪৮৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, যার ৭৭ শতাংশই ভুয়া। দেশের অন্য ৬৩টি জেলা পরিষদ কি এর থেকে খুব বেশি ব্যাতিক্রম? তার কারণ হচ্ছে, জেলা পরিষদও বিবেচিত হচ্ছে, দলের লোকের আর্থিক পরিপুষ্টতার অন্যতম উৎস হিসেবে।

চার.

তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন কনসাল ব্লু মেটাকাফ ১৯৬৮ সালে `East Pakistan Basic Democrats Plus Rural Public Works’ শীর্ষক সমীক্ষায় দেখিয়েছিলেন, ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জেলাওয়ারী যে নির্বাচন হয়েছিল, তার সাথে পূর্ত কর্মসূচি বা সরকারি বরাদ্দের সর্ম্পক রয়েছে। সে সময়ে গভর্নর মোনায়েম খান ১৯৬৮-৬৯ এবং ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরে যথাক্রমে ৩০ কোটি ও ৪০ কোটি রুপি খরচের ঘোষনা দিয়েছিলেন। মেটাকাফ লিখেছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সময়ে ছিল ওই ঘোষনা। জনগণ কিন্তু জানে, সত্তরের ঐতিহাসিক ও অবাধ নির্বাচনের ফলাফল কি হয়েছিল!

সংলাপের ফলাফল কী হবে?

আমীর খসরু ::

আগামী বছরখানিক সময়ের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং এ ধরনের একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে- এমনটা ধরে নিয়ে ও চিন্তা-ভাবনা মাথায় নিয়ে বিএনপি কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে। কৌশলের প্রথমটি হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে সব দলকে নিয়ে একটি সংলাপ অনুষ্ঠানে সরকারকে সম্মত করা। সে মতে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া ইতোমধ্যে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে। আর এরই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহবান জানানো হয়েছে একটি সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য- যার মাধ্যমে কিনা নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে একটি সার্চ কমিটি গঠিত হতে পারে। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে অর্থাৎ বঙ্গভবন থেকে এমত একটি সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা হয়েছে। ডিসেম্বরেই এই সংলাপটি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।

তবে প্রথমেই বিএনপির কৌশল গ্রহণের কারণ ও প্রেক্ষাপটটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। যেসব কারণগুলো রয়েছে তার কয়েকটি হচ্ছে- এক. ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত এই দলটি অর্থাৎ বিএনপি কোনোভাবেই জনগণের কাতারে এসে দাঁড়াতে পারেনি এবং কোনো জনসম্পৃক্ত ইস্যুতেই তারা কখনোই সম্পৃক্ত হয়নি। বিএনপি যতোটা না বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যক্তিকেন্দ্রীক বিষয়কে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর চেষ্টা করেছে, তার ছিটেফোটা সময় ব্যয় বা চিন্তা পর্যন্ত তারা করেনি জনসম্পৃক্ত কোনো ইস্যুতে। দুই. আগাগোড়া নেতৃত্বের পর্যায়ে সিদ্ধান্তহীনতা, চরম পর্যায়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সমন্বিত ও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণই তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। লন্ডনে বসে থাকা তারেক নির্ভরতা দলটিকে যতোটা না লাভের মুখ দেখিয়েছে তার চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ লোকসানের মধ্যে তাদের পড়তে হয়েছে। তারেক বন্দনায়ই অনেক সময় ব্যয় করেছে কতিপয় নেতা। এতে যে শীর্ষ পর্যায়ের সায় ছিল না, তা বলা যাবে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঢাকা না লন্ডন-এমন দোদুল্যমানতা বিএনপির জন্য সীমাহীন ক্ষতির কারণ হয়েছে। ওই সময় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চূড়ান্ত পর্যায়ে তৈরি থাকলেও, একমাত্র মির্জা ফখরুল বাদে অন্য তেমন কোনো কেন্দ্রীয় নেতাই মাঠের ধারে-কাছেও ছিলেন না। তিন. এই অবস্থায় ২০১৫ সালে আন্দোলনের ডাক দিয়ে শেষ পর্যন্ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে নতুন একটি আন্দোলনের উদ্যোগ পর্যন্ত নিতে না পারায় দলটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চার. স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই-এ দলটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সীমাহীন অভিযোগ উঠলেও শীর্ষ পর্যায়ের নির্লিপ্ততা বহু নেতাকর্মীকে যেমন ক্ষুদ্ধ করেছে, তেমনি মনোবলও ভেঙ্গে দিয়েছে অনেকের। বিশেষ করে মতলবী প্রার্থী বাছাই দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাচ. দলটি নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে অধিকমাত্রায় বিদেশী শক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিএনপি মনে করছে, পশ্চিমা শক্তিসহ বিদেশীরা নির্বাচন এনে দেবে ও  বিএনপি তাতে অংশ নেবে এবং জনগণ তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে দলটিকে জয়লাভ করিয়ে দেবে। বিশেষ করে দলটি ভারত প্রশ্নে সীমাহীন দ্যেদুল্যমানতার পরিচয় দিয়েছে। ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর বিজয়ে দলটির উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের ধারণা ছিল, মোদী ক্ষমতায় এলে ভারতই সবকিছু ঠিকঠাক করে দেবে। আন্তর্জাতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়াবলী সম্পর্কে ধারণা না থাকলে যা হয়- দলটির ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। ছয়. শেষমেষ দল গোছাতে ব্যর্থ হয়ে, কেন্দ্রীয় সম্মেলন দিয়ে দল গোছানো ও দলকে বেগবান করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় সম্মেলন দেয়া হলেও এতে কোনো কাজ হয়নি; শুধুমাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হয়েছেন মাত্র। সাত. সব মিলিয়ে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো ইস্যুতেই দলটি সরকারকে বাধ্য করার মতো কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারেনি।

দুই.

বিএনপি নতুন করে আন্দোলন শুরুর অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন প্রশ্নে সংলাপের কৌশল নিয়েছে।  সরকারি দল এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ২০১২ সালেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সংলাপ করেছিলেন নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে একটি সার্চ কমিটি গঠনসহ এ জাতীয় কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য। তার কি ফলাফল হয়েছে তা সবারই জানা আছে। ৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি যেভাবে চাইবেন, সেইভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। আমরা তা মেনে নেবো। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক সেটাই আমরা চাই। আজকে গণতন্ত্রের যে সুষ্ঠু ধারা সৃষ্টি হয়েছে, সেটা অব্যাহত থাকুক।’ তাহলে এক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে কিভাবে মূল্যায়ন করেন? এখানে আরও একটি প্রশ্ন জরুরি যে, নতুন যে নির্বাচনটি হবে তাই বা কোন ধরন এবং ধারা অনুসরণ করবে?

তবে একটি বিষয় কেউ উল্লেখ করছেন না যে, নির্বাচন কমিশন পুনঃগঠন সংবিধানের ১১৮ ধারা মোতাবেক রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার হলেও বাস্তবে তিনি কি ইচ্ছা থাকলেও বা চাইলেই ক্ষমতাসীন সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেন? সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘….বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সকল দলের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি যেভাবে চাইবেন, সেই ভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। আমরা তা মেনে নেবো।’ কিন্তু  সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেনঃ

তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়েই দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও তা প্রধানমন্ত্রী মেনে নেবেন কিনা? কাজেই সরকার কতোটা আন্তরিক এবং সদিচ্ছাপ্রবন হবে, তার উপরই আগামী সংলাপের ফলাফলটি নির্ভর করছে। আন্তরিকতা যদি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও একে কেন্দ্র করে যা যা হয়েছিল সেমতো হয়, তাহলে আগাম বলে দেয়া যায় যে, এবারেও সংলাপের ফলাফল কি হবে?

বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের দূরত্ব কতোটুকু?

আমীর খসরু ::

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের কয়েকটি দেশে চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ওই সব দেশের সাধারণ মানুষ নিদারুণভাবে আক্রান্ত, তাদের জীবন বিপর্যস্ত, ভবিষ্যত বিপন্ন। যুদ্ধপীড়িত সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেনসহ কয়েকটি দেশ আছে যাতে ওই সব যুদ্ধের আসল কুশীলবরা বহিঃদেশীয়। যেকোনো যুদ্ধই সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে; এখন ওই সব দেশগুলোতেও তাই ঘটছে। এ কথাটি বলা যেতে পারে যে, গণতন্ত্রের দীর্ঘকালীন অনুপস্থিতি এবং জনগণকে পরিপূর্ণভাবে উপেক্ষা করার কারণে এসব যুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়েছে। এ কথাও ঠিক, অন্যদের যুদ্ধ হচ্ছে ওই সব দেশের মাটিতে; আর সাধারণ মানুষ হচ্ছে এর অনিবার্য একমাত্র ভিকটিম।

পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারেও একটি ‘যুদ্ধ’ চালানো হচ্ছে একপক্ষীয়ভাবে; তবে সে যুদ্ধটি প্রথাগত বা ট্রাডিশনাল ধারনা থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। ওই দেশের শাসকরা নিজ দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান এই যুদ্ধের নাম দিয়েছে ‘শত্রু  নিধন’। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে যা ঘটছে তার সাথে এই হত্যাযজ্ঞটিকে পুরোপুরি এক এবং অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বা চরিত্রের তা কখনোই বলা যাবে না। মিয়ানমারে যা চলছে তা হচ্ছে, ঠান্ডা মাথায় গণহত্যা। একটি জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে, জাতিটিকে নির্মূল করার একপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ চলছে। অসংখ্য মানুষ নিহত হচ্ছেন; গ্রাম-নগর-জনপদ পুড়ছে, লুট হচ্ছে; মানুষ দেশান্তরী হচ্ছেন। খ্রিস্টপূর্ব তিনশ বছর আগে দার্শনিক পন্ডিত চানক্য বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী এবং শিশু’। এর ভয়াবহ দিকটা আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

মিয়ানমারের এই চলমান গণহত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হবে, এই গণহত্যাটি যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার জন্য বিচ্ছিন্নভাবে চালানো হচ্ছে তা নয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তেই গণহত্যাযজ্ঞের বাস্তবায়ন কাজটি চালাচ্ছে সেদেশটি নানা পন্থায়। শুধুমাত্র একজন অতিকট্টর সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধভিক্ষুর ইন্ধনেই এবং নেতৃত্বে বৌদ্ধভিক্ষুরা ও বৌদ্ধ মৌলবাদী কিছু লোকজন এই হত্যাকান্ড চালাচ্ছে-এমন প্রচারণা কেউ কেউ করতে চাইলেও এটা সত্য নয়। বরং বাস্তব হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এমনটা যে কোনোক্রমেই সম্ভব নয় তা স্পষ্ট। এক্ষেত্রে দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচি’র ভূমিকা যে রীতিমতো ভয়ংকর এবং নিকৃষ্ট তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

এককালের বার্মা এবং হালের মিয়ানমারে এই ধরণের গণহত্যা সবসময়ই কমবেশি চলেছে। ’৭০ এবং ’৯০-এর দশকে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছে মূলত আরাকান এলাকা থেকে। ২০১২ সালেও এমনটা ঘটেছে। ২০১৪ সাল থেকে এই পর্যন্ত দফায় দফায় গণহত্যা চলছে। জাতিসংঘ, আসিয়ান এবং এর ভুক্ত দেশগুলোসহ পশ্চিমী দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এর প্রতিবাদ করলেও তা যে জোরালো ও সোচ্চার নয় -তা বোঝাই যাচ্ছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অনেকেরই ধারণা, বিশেষ করে পশ্চিমী দুনিয়ার দেশগুলো যতোটা না নিজ স্বার্থ আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে ‘নতুন গণতন্ত্র’প্রাপ্ত মিয়ানমারে অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদ আর অর্থনৈতিক লোভের কারণে; ঠিক তেমনভাবে তারা সোচ্চার নয় মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। তাদের কাছে তাহলে কি মানবাধিকারের চাইতেও নিজ স্বার্থ বড় হয়ে দাড়িয়েছে সাম্প্রতিক এবং অতীতের অনেক ঘটনাবলীর মতোই।

এ কথাটি সত্য যে, বিভিন্ন দেশে যেমন উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক উত্থান এবং ফলশ্রুতিতে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে, মিয়ানমারকে সে অবস্থা থেকে এখন আর মোটেই আলাদা করা যাবে না। মিয়ানমার অচিরেই এসব কারণে অনিবার্যভাবে বিপন্ন, বিপর্যস্ত হবে এটাও নিশ্চিত। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মিয়ানমারের ‘নব্য গণতন্ত্র’। মিয়ানমারের চলমান ঘটনাবলীতে ধর্মের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব ও সাম্প্রদায়িকতার জোশ মিয়ানমারের সমাজে ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তারী ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। ওই সাম্প্রদায়িকতার ছোয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশে লেগেছে এবং বর্তমানে যা ঘটছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে আরও ঘটবে তাতে সন্দেহ নেই। এটা মনে রাখতে হবে, ১৯৬২ থেকে বার্মায় সামরিক শাসন চলেছে। সামরিক শাসনত্তোর বেসামরিক শাসকদের সময়ে এহেন গণহত্যা এবং সংখ্যালঘু নিধন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ওই দেশটিতে বেসামরিক শাসন আবারও বিপন্ন হবে।

আরেকটি বিষয়ও আলোচনার দাবি রাখে। উগ্র জাতীয়তাবাদীদের উত্থান পুরো আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভারসাম্যকে বিপদাপন্ন করবে। এর সুযোগ মিয়ানমারের বর্তমানের বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে কাজ করা পশ্চিমা শক্তিও যে নেবে তাও অচিরেই স্পষ্ট হবে।

এক্ষেত্রে মাও সেতুং ১৯৩৮ সালের মে মাসে  যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, ‘‘যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতির ধারাবাহিক রূপ, এই অর্থে যুদ্ধই হচ্ছে রাজনীতি এবং যুদ্ধ নিজেই রাজনৈতিক প্রকৃতির কার্যকলাপ। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে এমন একটা যুদ্ধও ঘটেনি, যার কোনো রাজনৈতিক প্রকৃতি ছিল না।…’’ (রেড বুক, র‌্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, কলকাতা ১৯৯৭)।

দুই.

মিয়ানমারে যে গণহত্যা চলছে তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নানামাত্রিকভাবে পড়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশের উপরে। ১৯৭৮ সালে দলে দলে মিয়ানমারের শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সরকারি হিসেবের চাইতে বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। ওই সময় এবং পরবর্তীকালে আড়াই থেকে ৫ লাখ বর্মী রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে ওআইসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ দেনদরবার শুরু করলেও তেমন কোনো কাজই হয়নি। বরং দিনে দিনে এই সংখ্যা বেড়েছে এবং বাড়ছে। গত কয়েকদিনেই জাতিসংঘের হিসেবে কমসেকম ১০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী নানা বাধা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ দেশে যেসব রোহিঙ্গা এসেছে তাদের একটি অংশ সরকার পরিচালিত ক্যাম্পে না থেকে মিশে গেছে বাংলাদেশীদের মধ্যে। জঙ্গী এবং উগ্র মৌলবাদী কর্মকান্ডে অংশ নেয়ার নজিরও তাদের কেউ কেউ স্থাপন করেছে। তাছাড়া বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছে বিশাল অংশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এখানে ’৮০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধে পাকিস্তানের পেশোয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে আফগান শরণার্থীরা যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল ওই সময়ে এবং  পরবর্তীকালে, সে কথাটি বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের স্মরনে রাখা উচিত।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় ধরনের দুর্বলতা হচ্ছে: বাংলাদেশ যতোটা প্রতিবেশী ভারতের সাথে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ করে থাকে, দুই দেশের মধ্যকার যোগাযোগ ও নৈকট্য যতোটা গাঢ় ও দৃঢ়- মিয়ানমার অপর প্রতিবেশী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সম্পর্কের দূরত্ব অনেক অনেক দূরের। এই দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে যোজন যোজন ফারাক। বাংলাদেশের দিক থেকে যেভাবে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী হয়ে উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল-তা বাংলাদেশ কখনই করেনি। বিভিন্ন সময়ে এমন প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও ঢাকা বরাবর নিশ্চুপ থেকেছে অথবা এড়িয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালে এবং পরবর্তী কয়েকটি সময়ে বার্মার সাথে চলনসহ সম্পর্ক রক্ষার জন্য বাংলাদেশ চীনের স্মরণাপন্ন হলেও, সরাসরি মিয়ানমারের সাথে কার্যকর সম্পর্কটুকু গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশ থেকে যোজন যোজন দূরত্বের একটি দেশ মিয়ানমার । থাইল্যান্ড থেকে জাপানসহ অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশের যতো সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা রয়েছে, মিয়ানমারের সাথে তার ছিটেফোটাও নেই। অথচ বাংলাদেশ ‘লুক ইস্ট পলিসি’ গ্রহণ করলেও মিয়ানমার যেন রয়ে গেছে অতিদূরত্বের কোনো একটি দেশ হিসেবে।

এ কথাটিও স্মরণ করা জরুরি যে, বার্মা চীনের প্রভাব বলয়ে থাকার পরেও ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ৭ম দেশ হিসেবে। ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেঙ্গুন সফর করে সম্পর্কোন্নয়নের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বাণিজ্য চুক্তি। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমার সফর করেন এবং সে সময় সম্পর্কোন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। ২০০১ সালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বার্মা সফর করেছিলেন। এর আগেপড়ে নামকাওয়াস্তে অনেক উদ্যোগ নেয়া হলেও বাংলাদেশের শাসকদের মনোজগতে, মনস্ততত্ত্বে রয়ে গেছে অনেক অনেক দূরত্ব সৃষ্টির একটি প্রয়াস।

অথচ ভারতের কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া সংক্রান্ত ঘটনায় দিল্লী-রেঙ্গুন সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপোড়েন ও দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। এখন ভারতের উদ্যোগেই মিয়ানমার এবং ভারতের সম্পর্ক অতিমাত্রায় চমৎকার ও উন্নততর। এক্ষেত্রে ভারতই তাদের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যেগুলোর স্বার্থে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে সফলও হয়েছে। ভারত এই সম্পর্কোন্নয়ন প্রচেষ্টায় নি:সন্দেহে নানামুখী সাফল্য অর্জন করেছে, তা স্বীকার করতেই হবে। চীন মিয়ানমারের বঙ্গোপসাগরীয় পোর্ট সিতওয়ে পাবে এমন প্রত্যাশায় অর্থ ব্যয় করলেও শেষ পর্যন্ত ভারত ওই সমুদ্র বন্দরটি পেয়ে যায়; যদিও এটি একটি ছোট উদাহরন মাত্র। তাছাড়া বর্তমানে ভারত এবং মিয়ানমারের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের নানা দিক নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে ও অগ্রগতিও সন্তোষজনক বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় দাড়িয়ে আছে বাংলাদেশ?

কূটনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য বয়ান রয়েছে; আর তা হচ্ছে- ‘কে প্রতিবেশী হবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কোন রাষ্ট্র বন্ধু হবে তা নির্ধারণ করা গেলেও, প্রতিবেশী নির্ধারণ করা যায় না’। বাংলাদেশকে এই বিবেচনায় পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করতে হবে এবং চালাতে হবে কূটনৈতিক উদ্যোগ। কিন্তু সীমাহীন দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের বিশাল ঘাটতি।

নির্বাচন কমিশন গঠন : শুভবুদ্ধি ও সদিচ্ছার আলামত দেখার ব্যর্থ প্রতীক্ষা

আমীর খসরু ::

রাজনীতিতে এবং শাসনকাজে মাঝে মাঝে নীরবতা এবং সব কিছুই চুপচাপ ঠিকঠাক চলছে – অনেকের ধারণা মতে এমন একটি সময়কাল বর্তমানে অতিক্রান্ত হচ্ছে। জনঅংশগ্রহণ যদিও এই গণতান্ত্রিক সমাজে দিনে দিনে কমেছে এবং এর দেখা পাওয়াটা এখন দুষ্কর। তবে জনঅংশগ্রহণবিহীন কথিত গণতন্ত্রে কতোটা সিস্টেমের অন্তর্গত দুর্বলতা অথবা শাসকসৃষ্ট এহেন পরিস্থিতি – তা নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হতে পারে। আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক এবং রাজনীতিতে অতিসজ্জন বলে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ বছরেই এ ধরনের নীরবতামূলক পরিস্থিতির বিদ্যমানতায় বেশ কিছুটা শংকা প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য সৈয়দ আশরাফের প্যাটার্নটাই এমন যে, তিনি আকার-ইঙ্গিতে বহু কথা বলেন, বহু কথা না বলেই। বিষয়টা এমন যে, ‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোনো কথা না বলে।’ এসব নীরবতাকে কখনো কখনো অস্বস্থিকর, যাকে ইংরেজিতে ‘আনইজি কাম’ বলা হয়ে থাকে। আর এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে কোন কিছু নিয়েই এখন আর প্রকাশ্য কোনো মাথা ব্যথা নেই। দিনে দিনে পরিস্থিতি যা দাড়াচ্ছে তাতে এসব বিষয়ে তাদের মাথাও যেমন থাকবে না, তেমনি ব্যথারও কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রথমেই অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা বৃহদাকার ধারন করায় প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। তবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার প্রণেতা এবং দার্শনিকরা নিজেরাই এ কথা গোড়াতেই কবুল করে নিয়েছেন যে, আদতে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থাটি ঘুরেফিরে সেই কতিপয়ের শাসনই পরিণত হয়- যদি না আগেভাগে যথাযথ ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বর্তমানে ‘আমার ভোট আমি দেবো’ এমন ব্যবস্থাটি অর্থাৎ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষমতাই আর চালু নেই। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বহু দেশে এমনটা ঘটছে। তবে এখানে জোর দিয়েই একটি কথা বলতে হচ্ছে, নির্বাচন বা ভোট যখন গণতন্ত্রের অপর নাম হয়ে দাড়ায় অথবা সমাথর্ক বলে কতিপয়কেন্দ্রীক শাসন এবং স্বৈরশাসকগণ স্বজ্ঞানে, কূটকৌশলের অংশ হিসেবে যখন এমনটা চর্চা বা প্র্যাকটিস করতে শুরু করলো -তখনই প্রকৃত গণতন্ত্রের ছিটেফোটাও যা বাকি ছিল, তারও বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। কারণ নির্বাচন বা ভোট এবং গণতন্ত্র যে এক কথা নয়, সাধারণের মনোজগত থেকে সে কথাটি পর্যন্ত স্বৈরশাসকবর্গ সুকৌশলে মুছে দিয়েছে। বাংলাদেশও কোনোক্রমেই এর বাইরে নয়।

এক্ষেত্রে অবিভক্ত পাকিস্তানের বহু উদাহরণ দেয়া যায়। গণতান্ত্রিক পথ-প্রথা, পদ্ধতি ভাঙ্গার জন্য প্রথমে মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেছিলেন আইয়ুব। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তার শুরুটা যেসব কারণে হয়েছিল তার অন্যতমটি ছিল গণতন্ত্র। অর্থাৎ স্বাধীনতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রাপ্তি ও চর্চার মধ্যদিয়ে সবার জন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শুধুমাত্র ভোটই যে গণতন্ত্র এমন একটি অপকৌশল বাস্তবায়ন করা হয় শাসকবর্গের পক্ষ থেকে, দেশটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অল্পকাল পরেই। যার স্পষ্ট আলামত প্রথমবারে দেখা যায় ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এরপরে ছোট বড় যতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার প্রায় সবই অনুষ্ঠিত হয়েছে দলীয়, নানাবিধ প্রভাব আর পেশী ও অস্ত্রশক্তির উপর ভর করে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পরে সামরিক শাসন আমলের নির্বাচনে আমরা আইয়ুব খানের নির্বাচনের প্রতিচ্ছবি দেখেছি কমবেশি। আমাদের দেখতে হয়েছে হ্যাঁ-না ভোট, এরশাদ জামানার নানা কিসিমের নির্বাচন।

একটি বিষয় বলতেই হবে, যৎসামান্য হলেও নির্বাচন জনগণের জন্য গণতন্ত্র প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও সুরক্ষা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে জনমনে সামান্য হলেও অধিকার আদায়ের শক্তিটুকু দিয়ে থাকে; যার সবকিছুই এখন বিদায় নিয়েছে। একথাটিও বলতে হবে, ১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের বিদায়ের পরে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে একে একে নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানোর যে ত্বরিৎ কর্মটি আমরা নানা সময়ে বাধ্য হয়ে প্রত্যক্ষ করেছি, তা প্রতিবারই নিত্যনতুন কৌশল উদ্ভাবনকারী এবং অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে ২০১৪’র ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন তথাকথিত ভোটদান পর্বকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নেতিবাচক ইতিহাস হিসেবেই বহু বহুকাল বিবেচিত হবে। অথচ এ কথাও আমাদের স্মরণে আছে, ২০০৮-এ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে নানা সুন্দর সুন্দর কথা বলা হয়েছিল। এতে আরো নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল; যার দু’একটির উল্লেখ করা প্রয়োজন। নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারের প্রধান ৫টি বিষয়ের ৫.৩ দফায় নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পদ্ধতির ইতিবাচক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। ওই ইশতেহারে ভিশন ২০২১-এর প্রথম দফায়ই বলা হয়েছিল, ‘একটি নির্ভরযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা, নিয়মিত নির্বাচন, সরকারের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হবে।’

এসব প্রতিশ্রুতির পরে শুধু সংসদ নির্বাচনই নয়, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, এমনকি বাজার-স্কুল কমিটির নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন পক্ষের নানা তেলেসমাতি আমাদের দেখতে হচ্ছে ও হয়েছে। নির্বাচনকে অকার্যকর মাধ্যম হিসেবে পরিণত করে এমন প্রথা-পদ্ধতি ও ঐতিহ্যকে নির্বাসনে পাঠানোর যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্নের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক  সরকার ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়। অর্থাৎ পরে জিগিরও তোলা হয়- গণতন্ত্র নয়, উন্নয়ন।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এমন ওলোট-পালট অবস্থার প্রেক্ষাপটে বর্তমানে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন হঠাৎ কেন জানি সরগরম হয়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন সম্পর্কে যে ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, তা যে নতুন কোনো উদ্ভাবন বা আবিষ্কার তা মনে করার কোনো কারণ নেই। বিএনপির প্রধান যে দাবি তা হচ্ছে – একজন যোগ্য ও নিরপেক্ষ প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনারদের তালাশ-তল্লাশি করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা। তাছাড়া সামরিক বাহিনীকে নির্বাচনকালীন কিছু ক্ষমতা প্রদানের জন্যও বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিএনপি রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ চায়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী অর্থাৎ সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি গঠন করবেন।

বাস্তবে আওয়ামী লীগ বিশেষভাবে জানে যে, বাস্তবে কি ঘটতে যাচ্ছে। আর বিএনপি এতোকাল পরেও নানা অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হয়ে রাষ্ট্রপতির শুভবুদ্ধি ও সদিচ্ছার উন্মেষ ও উদয়ের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির শুভবুদ্ধির বা সদিচ্ছার মূল্য আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান অনুযায়ী কতোটুকু দেবে বা শুভবুদ্ধির অংকুর কতোটুকু বাড়তে দেবে-তা তাদের উপরই নির্ভর করে। সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও  ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেনঃ

তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।

কাজেই ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন যথারীতি সাংবিধানিক নিয়মে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমেই গঠিত হবে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিএনপির ১৩ দফার মধ্যে প্রকারান্তরে সরকারের সাথে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্যের কথা আকার ইঙ্গিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এবারে এবং আগেও আওয়ামী লীগ এসব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সব সময়ই রাজনৈতিক সংলাপ এবং জাতীয় ঐকমত্যের প্রস্তাব নাকচ করে দিচ্ছে-এবারেও দিয়েছে। বিএনপির সাংগঠনিকসহ নানা রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এনিয়ে নানা ফায়দা লুটবে- এটাই স্বাভাবিক।

তাহলে প্রশ্ন উঠে যে, ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে কেন একটি সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছিল? যতোদূর জানা যায়, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পরে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকগণ এটা মনে-প্রাণে দেখাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা হলেও অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ ও সদিচ্ছার কোনোই কমতি নেই। কিন্তু লোক দেখানো ওই ব্যবস্থা যেমন বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার নয়, তেমনি তা হয়ওনি।

এবারেও ঐকমত্য, সংলাপ, বিএনপির কথা মতো সার্চ কমিটি গঠন এবং এ জাতীয় কর্মকান্ডের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা ও শুভবুদ্ধির উদয় হবে-তা মনে করার আদৌ কোনো কারণ নেই। শুভবুদ্ধির উদয় এবং সদিচ্ছার উত্থান ঘটতো যদি বিএনপি তার নেতৃত্বের দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শন করে আওয়ামী লীগকে বাধ্য করতে পারতো। বিএনপিকে এ বিষয়টিকেও মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন ও ১৩ দফা প্রস্তাবনা যদি রাজনৈতিক কৌশল হয়েই থাকে তবে তা অচিরেই ব্যর্থ হবে। এখানে বিএনপির বড় দুর্বলতা হচ্ছে, বিএনপি নিজেই।

বৈষম্যপূর্ণ কর্মহীন প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘রাজনৈতিক উচ্ছাস’

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অনেক অর্থনীতিবিদই বলেছেন, জিডিপির মধ্যে একটি দেশের মানুষের উন্নয়ন, সন্তুষ্টি বা সমৃদ্ধি পরিমাপের কিছু নেই। এসব বোঝার জন্য ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। তাদের মতে, জিডিপি দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাপা যায়, কিন্তু দেশের মানুষের ভালো-মন্দের কিছুই বোঝা যায় না। একটি সুষম অর্থনীতির দেশ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে; অর্থাৎ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ও সুখী জীবন যাপন করবে, চরম বৈষম্য ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাবে। কিন্তু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধিও এসবের নির্দেশক নয়। অর্থাৎ জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ কতটা ভালো আছে তা জানার জন্য যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো জিডিপির বাইরে পাঁচটি সূচক ব্যবহার করার ঘোষণা দেন। এগুলো হলো- ভালো চাকরি, সরকারি নীতির ভালো-মন্দ, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও সুস্বাস্থ্য।

বাংলাদেশ এক দশকের বেশি সময় ধরে ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে। গেল অর্থবছরে সেটি ৭ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে দাবি করছে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে কি মানুষের অবস্থার খুব কী বেশি উন্নতি হয়েছে? এ প্রবৃদ্ধি কর্মহীন ও বৈষম্যপূর্ণ। কর্মহীন প্রবৃদ্ধি কথাটি প্রথম ব্যবহার করে ইউএনডিপি। সংস্থাটি ১৯৯৩ সালে তাদের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এই পদবাচ্য সর্বপ্রথম ব্যবহার করে। এই প্রতিবেদনের ভাষ্য মতে, বিশ্বের অনেক দেশই এই এক নতুন পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে। এসব দেশে উচ্চ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। এমন এক কর্মহীন প্রবৃদ্ধি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তাই আমাদের ভাবতে হবে কর্মহীন প্রবৃদ্ধি না বাড়িয়ে দেশকে কী করে আমরা কর্মসমৃদ্ধ প্রবৃদ্ধির বলয়ে উন্নীত করতে পারি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে জানা যায়- ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি; বরং কর্মসংস্থান কমছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহযোগিতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রণীত ‘এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক পর্যালোচনায় এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে এ সংস্থাটি বলেছে, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর থেকে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। একই সময়ে কর্মসংস্থানের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছর থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১১ শতাংশ।  এ সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি না বেড়ে বরং কমে যায়। এ সময় কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিদেশি কর্মীরা যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে, তাও এ দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভ‚মিকা রাখছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে হ্যাকাররা যে আট কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করেছে, সেটিও চলতি অর্থবছরের জিডিপির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  এ টাকা ফেরত পাওয়া গেলেও নতুন করে জিডিপিতে যোগ করা হবে না। প্রবাস থেকে বাংলাদেশিরা যে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠায় বছর বছর, তার জায়গাও নেই জিডিপির হিসাবে। এক্ষেত্রে দুটি দেশের কথা ভাবা যাক। দুটি দেশই এক বছরে ১০০ টাকার পণ্য ও সেবা উৎপাদন করেছে। অর্থাৎ তাদের জিডিপি সমান। কিন্তু একটি দেশের সরকার ১০০ টাকার মধ্যে ৯০ টাকা অপ-ব্যবহার করেছে। আরেক দেশের সরকার ১০০ টাকা জনগণের কল্যাণে সমহারে ব্যয় করেছে। এই দুই দেশের মধ্যে কোনটি ভালো, তা জিডিপি দেখে বোঝা যায় না। ফলে শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঠিক চিত্রও বোঝা যায় না। তা সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলো জিডিপির উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিসের মতে, জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা পরিমাপের সঠিক উপায় নয়। এটি নাগরিকের অবস্থার ভালো-মন্দ তুলে ধরতে পারে না। ২০০৯ সাল বাদে প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। কিন্তু বেশির ভাগ নাগরিকের জীবনমান ৩৩ বছর আগের মানের চেয়েও খারাপ দশায় পৌঁছেছে। অর্থনীতির সুফল চলে গেছে সর্বোচ্চ সম্পদশালীদের কাছে। আর নিচের দিকে এখন যে মজুরি রয়েছে, প্রকৃত অর্থে এটি ৬০ বছর আগের মজুরির চেয়ে কম।

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করেছে ধনীক শ্রেণী। বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে মানুষের সম্পদ বেড়েছে তিনগুণ; আর প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা সংস্থা ক্রেডিট সুসির সাম্প্রতিক  এক জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন বাড়তে থাকায় বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে। ক্রেডিট সুসির তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মোট প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২৬ লাখের বেশি। আর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি এসে তা ১০ কোটি ৭২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দুই হাজার সালে বাংলাদেশের মানুষের হাতে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ছিল। ১৫ বছরের মাথায় তা বেড়ে হয়েছে ২৩৭ বিলিয়ন। ক্রেডিট সুসির হিসেবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি। পূর্ণবয়স্ক নাগরিকদের ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তার পরিমাণ মাথাপিছু দশ হাজার ডলার বা ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার কম। বাকিদের সম্পদের পরিমাণ গড়ে দশ হাজার থেকে এক লাখ ডলারের মধ্যে। এদের মধ্যে ১২ লাখ বাংলাদেশিকে ‘মধ্যবিত্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ক্রেডিট সুসি, যাদের প্রত্যেকের হাতে অন্তত ১৭ হাজার ৮৮৬ ডলারের সম্পদ রয়েছে। মানুষের সম্পদ বাড়লেও বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অবস্থানের খুব একটা নড়চড় হয়নি।  দুই হাজার সালে বাংলাদেশিদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল বৈশ্বিক সম্পদের শুন্য দশমিক ১ শতাংশের কম; এখনও তাই।

সরকার গেল কয়েক দিনে দাবি করছে, তারা দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে পেরেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ এখনো খাদ্য সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের খাদ্য সংকট প্রকট। এমনকি তিনবেলা পেটপুরে খাওয়া তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইচ্ছেমতো বৈচিত্র্যময় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না; তারা অপুষ্টিরও শিকার। নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও এখনো প্রতি তিনজনে একটি শিশু নিপীড়নের শিকার। নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও গত কয়েকবছরে দেশের অতি অপুষ্টিহীনতার হার সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। দেশের গ্রামাঞ্চল ও বস্তিতে এ প্রবণতার হার বেশি। সরকারের কথা সত্য ধরে নিলে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ হতদরিদ্র। এরা অনেকেই ভিক্ষুক; দুই বেলা খেতে পায় না। হতদরিদ্র এসব লোকজন তাদের ভাগ্যকে অভিসম্পাত দেয়। অথচ তাদের স্বজন এবং পরিবারের লোকজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ দিয়েছে, চরম নির্যাতন ভোগ করেছে,  দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এই ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ হচ্ছে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ। এর অর্থ হচ্ছে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ দুই বেলা খেতে পায় না। জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিদিন-প্রতিরাত সংগ্রাম করে তারা, বেদনায় অশ্রু বিসর্জন করে নীরবে-নিভৃতে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আনন্দ তাদের কাছে অপরিচিত শব্দ। তারা শুধু শুনতে পায় কান্না, নবজাতকের আর্তনাদ, প্রবীণের আহাজারি। বিশ্বের প্রায় ১৭৫টি দেশ আছে যাদের মোট জনসংখ্যা দুই কোটির কম। সাম্প্রতিক হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী লোকজনের পরিমান হচ্ছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যার অর্থ হচ্ছে- প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ সীমার নিচে বসবাস করে। এই চার কোটি মানুষ সত্যিই গরিব।

হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে বা খানা আয় ও ব্যয় জরিপ মোতাবেক এ দেশের আয়-বৈষম্য পরিমাপক ’গিনি সহগ’ ২০০৫ সালে শূন্য দশমিক ৪৬৭ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং ২০১০ সালের একই জরিপে ওই সহগ শূন্য দশমিক ৪৬৫-এ রয়ে গেছে। তার মানে ওই পাঁচ বছরে আয়-বৈষম্য আর না বাড়লেও কমানো যায়নি। (২০১৫ সালের হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভের ফল এখনো পাওয়া যায়নি)। কোনো দেশের গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৫ অতিক্রম করলে ওই দেশকে ‘উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; আমরা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ২০১০ সালের উপাত্ত মোতাবেক এ দেশের ১০ শতাংশ ধনী ব্যক্তি দেশের ১০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৮ গুণ বেশি আয় ও সম্পদের মালিক। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের, এ কে খান ও ইস্পাহানি (অবাঙালি)। ওই বাংলাদেশেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২০১৫ সালে কোটিপতির সংখ্যা ৫৭ হাজার অতিক্রম করেছে। গত ২৬ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে এক কোটি টাকার বেশি আমানতের অ্যাকাউন্ট রয়েছে লক্ষাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল একটি ক্ষুদ্র অথচ ধনীক জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়ার বিপদ সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যাথা নেই।

মোট আয়ে দরিদ্রদের আয়ের অংশ ১৯৯১-৯২ সালে ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ; যা ২০১০ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২২ শতাংশে। নিম্ন মধ্যবিত্তদের আয়ের অংশও এ সময়ে ১০ দশমিক ৮৯ থেকে ৯ দশমিক ১০ শতাংশে নামে। আর মধ্যবিত্তদের আয়ের অংশ ১৫ দশমিক ৫৩ থেকে কমে গিয়ে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে যায়। অন্যদিকে সবচেয়ে উপরের ১০ শতাংশের আয়ের অংশ ২৯ দশমিক ২৩ থেকে বেড়ে ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশে উঠে যায়। এসব পরিসংখ্যান (যেগুলো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ থেকে প্রাপ্ত) থেকে এটা স্পষ্ট যে, আয়ের বণ্টনের দিক থেকে দেখলে গত দুই দশকে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অবস্থার অবনতি ঘটেছে, আর উচ্চবিত্তরা উঠেছে উপরের দিকে।

আয়ের বণ্টনে অসাম্য বৈষম্যের একটি মাত্র দিক। আসলে বৈষম্য বহুমাত্রিক বিষয়; আয় ছাড়াও রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে শ্রেণীবৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য। শিক্ষার কথাই ধরা যাক। এ কথা বলতে হবে যে, দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের জন্য শিক্ষা খাতে অনেক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এ শ্রেণীর শিশু-কিশোররা যে ধরনের স্কুলে যায় আর সেসব স্কুলে কী মানের শিক্ষা দেয়া হয়, সেটা উচ্চবিত্তদের শিক্ষার মানের সঙ্গে তুলনা করলেই এক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্রটি কিছুটা হলেও পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যে বিরাট, তা সহজেই বলা যায়। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে চিত্রটা এত পরিষ্কার নয়। শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য হয়তো কমেছে, কিন্তু জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বেতন ও মজুরির ক্ষেত্রে এ কথা কি জোর দিয়ে বলা যায়? খুব সম্ভবত না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত থেকে দেখা যায় যে, ২০০৫-১০ সময়কালে গ্রাম ও শহরের মধ্যে গড় আয়ের পার্থক্য কমেছে। বস্তুত গত কয়েক দশকে গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে, ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ সুসংবাদের পেছনেও রয়েছে শ্রেণীবৈষম্য। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ১৯৯১-৯২ থেকে গ্রামাঞ্চলেও আয় বণ্টনে অসাম্য বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন হতে প্রাপ্ত আয় থেকে দরিদ্র ও নিম্নবিত্তরা উচ্চবিত্তদের তুলনায় কম সুফল পেয়েছে।

অনেক কারণেই অসাম্য বৃদ্ধি কাম্য নয়। প্রথমত. নৈতিক অবস্থান থেকে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, শুধু প্রবৃদ্ধিও যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে অসাম্যের লাগাম টেনে রাখা উচিত। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাজার সৃষ্টি ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। সুতরাং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আয় দ্রুত বাড়লে তা ভোগ ও চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে-এটা বোঝার জন্য শক্তিশালী অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। চতুর্থত, উচ্চপ্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাস (এবং সম্পূর্ণভাবে দূর করা) যদি লক্ষ্য হয়, তাহলেও অসাম্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কেন? প্রবৃদ্ধি হলেই তো দারিদ্র্য কমে যাওয়ার কথা। অবশ্যই প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমানোর একটি জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি যথেষ্ট নয়। কী ধরনের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী প্রশ্ন- অসাম্য কমছে না বাড়ছে, সে বিষয়টি। উন্নয়নের নিম্ন স্তরে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য যে হারে বাড়ে, উপরের স্তরে কিন্তু সে হার কমে যায়। সুতরাং এখন লক্ষ রাখতে হবে যে, দারিদ্র্য হ্রাসের হারে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। দারিদ্র্য হ্রাসের হার ধরে রাখতে হলে অসাম্য হ্রাসের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।