Home » প্রচ্ছদ কথা (page 11)

প্রচ্ছদ কথা

টার্গেট ‘সংখ্যালঘু’

হায়দার আকবর খান রনো ::

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা, মন্দির ভাঙ্গা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার পর এবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাওতাল পল্লীতেও একই ধরনের আক্রমণ করা হয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু অথবা আদিবাসী হবার কারণে যারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, তাদের উপর এই রকম হামলা কিছুদিন পর পরই হচ্ছে। বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি, বিশেষ করে জমি দখলের জন্য এই ধরনের জঘন্য কাজে অগ্রসর হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় মদদ অর্থাৎ সরকার দলীয় উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি এবং প্রশাসনের সমর্থন বা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের ঘটনা বা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে গঠিত এই দেশে এমনটি ভাবা না গেলেও এটাই এখন বাস্তব।

পাকিস্তানী ভাবাদর্শ-দ্বিজাতিতত্ত্বকে রাজনৈতিকভাবে ও সংস্কৃতিগতভাবে খন্ডন ও পরাভূত করা গিয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতে পেরেছিল। কিন্তু এই মহান যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিল যে রাজনৈতিক দল-তারা সেই সময় জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলেও তার সীমাবদ্ধতা যে ছিল, তা আমরা যারা সেই সময় যুদ্ধ করেছি, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। ’৭১-এর সংগ্রামের উত্তাপ থাকতে থাকতেই যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা ছিল বিরাট বড় ধাপ্পা। জনগণকে বোকা বানানোর কৌশল। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ? তদানীন্তন শাসকদল যে এই ব্যাপারেও খুব স্পষ্ট ও আন্তরিক ছিল না, তা তখনকার বেশ কিছু ঘটনাবলী দেখলেই বোঝা যাবে। আজকের প্রজন্ম অবশ্য সে সব কথা জানে না। কিন্তু আমার বয়েসী যারা, তারা তো চোখের সামনেই দেখেছে ঘটনাবলী।

তবু ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। এটি ছিল একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা এসে নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পাকিস্তানী ভাবাদর্শের সাথে আপোস করলেন, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ছেটে ফেললেন, সংবিধানকে ইসলামীকরণের উদ্যোগ নিলেন, মুসলিম লীগ, জামায়াতে প্রভৃতি দলকে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন এবং কাউকে কাউকে স্বীয় দলে ও মন্ত্রীসভায় স্থান দিলেন। এইভাবে রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা আবার ফিরে এলো। এরপর স্বৈরশাসক এরশাদ সংবিধানে যোগ করলেন ‘ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম।’ এরশাদের ভন্ডামির চূড়ান্ত পর্যায়। ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে গেল।

এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই নানাভাবে ওই অপশক্তির সাথে আপোস করেছে। কথায় ও পোশাকে নিজেদের অধিকতর মুসলমান পরিচয় তুলে ধরতে তারা তৎপর। আওয়ামী লীগও যে এই আপোস ও আত্মসমর্পণের পথ নিয়েছিল তাও বহু ঘটনা দ্বারা দেখানো যাবে। কিন্তু বিএনপি, যার একদা মধ্যপন্থী দল হিসাবে পরিচয় ছিল, সেই বিএনপির অধঃপতন ঘটেছিল অনেক বেশি ও দ্রুততর। জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ বিএনপি এখন পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও রূপান্তর ঘটেছে। একদা যেটুকু জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ কাজ করতো, এখন তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আওয়ামী নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনীর মধ্যে কোন আদর্শবোধ কাজ করে না। টেন্ডারবাজী, মাস্তানী, বেপরোয়া লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল, নদী দখল, পরের জমি দখল এবং লুটপাটের ভাগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ, যার পরিণতিতে নিজেদের লোকও যেমন প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে, তেমনি মায়ের পেটের শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়। এই সবই এখন শাসক দলের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। দখল করার প্রবৃত্তি যেখানে প্রধান সেখানে সবচেয়ে দুর্বল অংশের জমি সম্পত্তি দখল করার আকাঙ্খা থাকবে না কেন? সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাবে-এই তীব্র আকাঙ্খাই কাজ করেছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাতের এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে, অর্পিত সম্পত্তির নামে যে সকল হিন্দু সম্পত্তি দখল করা হয়েছে, তার ৬০ শতাংশ করেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে কয়েকটি জায়গায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী কারবার চালানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের দেশত্যাগ করানো। কারণ হিন্দুভোট আওয়ামী লীগের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ভাবে, হিন্দুরা দেশে থাকলে ভোটটা নিশ্চিত, আর দেশত্যাগ করলে জমিটা দখল করা যাবে।

নাসিরনগরের ঘটনায় শাসক দল যে জড়িত তার বহু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। জনৈক মন্ত্রী ও জনৈক সংসদ সদস্য হিন্দুর প্রতি বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলেছেন, অসভ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন- এমন অভিযোগও আছে। ইতোপূর্বে রামুর ঘটনাতেও আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে সকলেই জড়িত ছিল। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির বলেছেন, গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগের জামায়েতীকরণ হয়েছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত অভিযোগ করেছেন, ‘গত কয়েক বছরে সংখ্যালঘুদের ওপরে হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে অংশ নিতে দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি দলের লোকরা যদি এ ধরনের হামলায় জড়িত হয়, তাহলে এই দেশে হিন্দুরা আর বেশিদিন থাকতে পারবে না।’

দেখা যাচ্ছে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করার ক্ষেত্রে বড় দুটি দলেরই স্বার্থ রয়েছে। বিএনপির ক্ষেত্রে ভোটের হিসাব। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে জমি দখলের আকাঙ্খা।

হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাধারণ মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলার সহজ উপায় হল, ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগ আনা। নাসিরনগরের ক্ষেত্রেও দেখা গেল একজন নিরীহ গরিব হিন্দুর বিরুদ্ধে এমনই ভুয়া অভিযোগ তোলা হলো। সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতারও করা হলো। তারপরও হিন্দু বাড়িঘরে আক্রমণ করা হলো। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ছিল সন্দেহজনক। শাসক দল, প্রশাসন ও মৌলবাদী শক্তি-সবাই একত্রে হলে তো আসলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

কিছুদিন আগের আরেকটি ঘটনার কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে। শাসকদের স্নেহধন্য নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের সদস্য ও সংসদ সদস্য তার লোকজন নিয়ে জনৈক হিন্দু শিক্ষককে কানধরে উঠবস করিয়েছিলেন। অভিযোগ, উক্ত শিক্ষক নাকি ইসলামবিরোধী বক্তব্য রেখেছেন। হিন্দু নাগরিককে শায়েস্তা করার জন্য এর চেয়ে শস্তা ও সহজ উপায় আর কি আছে।

আমরা দেখলাম, সারাদেশের প্রগতিশীল মানুষ শিক্ষকের পক্ষে দাড়িয়েছিল। কিন্তু ওসমান পরিবারের পক্ষে দাড়িয়ে হিন্দু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সভা করে চরম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রেখেছিল হেফাজতে ইসলাম। কি চমৎকারভাবে মৌলবাদী হেফাজত ও শাসক আওয়ামী লীগ একত্রে মিলে গেল একজন হিন্দু শিক্ষককে মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত করার ও অপমাণিত করার ক্ষেত্রে। অথচ ২০১৩ সালে এই হেফাজতকে দিয়ে খালেদা জিয়া সরকার পতনের ও ইসলামী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন।

এখন শ্রেণী স্বার্থে সবাই এক কাতারে দাড়িয়েছে। লুটপাট যেখানে শ্রেণী বৈশিষ্ট, সেখানে বুর্জোয়া দলগুলোর মধ্যে কোন ফারাক থাকছে না। এই একই কারণে শাসক আওয়ামী লীগ সংবিধানে বড় বড় পরিবর্তন আনলেও এরশাদের অবদান ‘ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম’কে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এক সভায় মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অভিযোগ করেছেন, ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে রাজনীতি। ওই সংবিধানে ফিরে না গেলে রামু, সাথিয়া ও নাসিরনগরের মতো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

বলাই বাহুল্য, এটা মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কথা। সরকারের ভাষ্য নয়। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বলে দাবিদার, সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দল ও প্রশাসনের মদদে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়, তা ভাবতেও বিস্মিত হতে হয়। যে আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোট হল হিন্দু নাগরিকগণ, সেই আওয়ামী লীগের লোকজন হিন্দুর বাড়িঘর, মন্দিরের হামলা চালায়, অগ্নিসংযোগ করে, হিন্দুবিদ্বেষী বক্তব্য দেন, এটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। কারণ সবার উপরে শ্রেণী সত্য। আওয়ামী লীগ এখন যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে সেই শ্রেণী কোন উৎপাদক শ্রেণী নয়, তাহলো নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা বুর্জোয়া। আর লুটপাট করার সহজ টার্গেট হলো ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী।

বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করতে হলে নির্ভর করতে হবে বামশক্তির ওপর। নাসিরনগরের ঘটনা এই শিক্ষাটি আরেকবার তুলে ধরলো।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় : সিস্টেমে ধস

মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়কে বিশ্লেষকেরা নজিরবিহীন হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে এটাকে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক ঘটনা । কিন্তু ট্রাম্পের জয় কি সত্যিই পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল? সাম্প্রতিক  সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে যেসব সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিলে ট্রাম্পের জয়কে একেবারে স্বাভাবিক পরিণতিই বলা যায় ।

‘যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেম’ এতোদিন ধরে প্রচার-প্রচারণাসহ নানা মাধ্যমে ধামা-চাপা দিয়ে আসছিল যে, ওই সমাজটিতে কোনো বিভক্তি নেই, বিভাজন নেই, কোনো ভাঙ্গন নেই। কিন্তু এই নির্বাচনের অনিবার্য ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত বিভক্তি, ভাঙ্গন আর ফাটল এখন স্পষ্টাকারে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ঐক্যবদ্ধ সমাজ নয়; বিভক্ত । এই বিভক্তি আর ফাটল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকসহ সব ক্ষেত্রেই। ওই সমাজটিতে ধনী-গরীবের, সাদা-কালোর অর্থাৎ বর্ণবৈষম্যের, নারী-পুরুষের, বিশ্বাস আর আস্থার এমনকি সামগ্রিকভাবে  বিভক্তি বিদ্যমান । ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সংকট কবলিত সমাজেরই সত্যিকারের একজন প্রতিনিধি, এক বড় মাত্রার উদাহরণ, প্রতিচ্ছবি।

যদিও আশ্বাস রয়েছে, আশ্বস্ত করা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘‘গ্রেট এগেইন’’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে; কিন্তু বহু মার্কিনীর এতে রয়েছে অবিশ্বাস আর অনাস্থা । এ জন্যই তারা মাঠে নেমেছেন, প্রতিবাদ করছেন । যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভোটের ইতিহাসে এ ধরনের অবিশ্বাস অনাস্থা রীতিমতো অবিশ্বাস্য বলেই তারা মনে করছেন । সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল হচ্ছে ভাঙ্গন কবলিত সিস্টেমে ধস ।

আর এই সিস্টেমের ধস উপলব্ধি করে, ভাঙ্গন কবলিত সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখে সমগ্র বিশ্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ।

এসব সঙ্কট প্রকটভাবে চোখে পড়েনি; বরং চাপা পড়ে ছিল । বার্নি স্যান্ডার্সদের চোখে অবশ্যই পড়েছিল এবং তারা প্রবলভাবে তা বলেছিলেন । স্যান্ডার্স তৃতীয় কোনো ধারার সৃষ্টি করে রিপাবলিকান প্রার্থীর জয় আগে-ভাগে নিশ্চিত না করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্ধারে নেমেছিলেন । কিন্তু দুর্ভাগ্য তার এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির; সেইসাথে আমেরিকা ও বিশ্ববাসীরও । তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। ফলাফল এখন সবার সামনে ।

স্যান্ডার্স সঙ্কটগুলো চাপা না রেখে সমাধানের কথা বলেছিলেন । তিনি মনোনয়ন লাভের প্রয়াসে যেসব প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন, তাতে মার্কিন যুবসমাজে চমক সৃষ্টি হয়েছিল। এসব প্রশ্ন ছিল তাদের মনেও। ফলে তাদের মধ্যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটন কিন্তু এসব সঙ্কট সমাধানের দিকে যাননি । ফলে ভোটাররাও তার সাথে চলতে মন থেকে উৎসাহ পায়নি । হিলারি বরং নতুন নতুন সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন । একদিকে নিজের অবৈধ উপার্জন, ই-মেইল কেলেঙ্কারিতে বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছেন, অন্যদিকে ট্রাম্পের উল্টা-পাল্টা কথা ও কাজ থেকে ফায়দা হাসিলের সহজ পথে চলতে থাকায় নতুন নতুন জটিলতায় পড়েছেন।

মিডিয়া বিশ্লেষকেরা এখন এই ফলাফল নানাভাবে বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চাইছেন কেন এমনটা হলো। তারা মোটামুটিভাবে বিভিন্ন বর্ণগত ও পরিচিতিমূলক গ্রুপে ভোটারদের বিভক্ত করে তাদের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা এই সত্যটা অগ্রাহ্য করছেন, নির্বাচনটা পরিণত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যস্ত সামাজিক সঙ্কট ও পঙ্কিলতার ব্যাপারে একটা গণভোট। আর তাতে ট্রাম্প ঝোপ বুঝে কোপ দিতে পেরেছেন এবং বাজিমাত করেছেন।

ট্রাম্প কিন্তু নিজে কোনো ফ্যাক্টর নয়। তিনি বরং একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই গোষ্ঠীটি হলো যুদ্ধবাজদের দল। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ অর্থনীতি হিসেবে দেখতে চায়। যুদ্ধের ‘ম্যাকানিজম’ বহাল রাখতে হলে তাদের এমন একজন প্রার্থীর প্রয়োজন ছিল। ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রচারকালে প্রায়ই আবোল-তাবোল বকতে দেখা যেত। একটু ভালোভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, এগুলো মোটেই প্রলাপ ছিল না। অনেকের মনের কথাই তিনি এভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন।

কাজেই ট্রাম্পের বিজয় সত্যিকার অর্থে কোনো অঘটন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পরাশক্তিটি যেভাবে চলছিল, তার স্বাভাবিক পরিণতি ফুটে ওঠেছে এই ফলাফলে।

এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শ্রেণী যুদ্ধ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং পুলিশি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবেন। নির্বাহী শাখা ছাড়াও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ, সুপ্রিম কোর্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলে যাবে চরম ডানপন্থীদের হাতে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা ‘আবার গ্রেট’ হবে না, ঐক্যবদ্ধ থাকবে না, বরং নানাভাবে বিভক্ত হয়ে জঘন্য ধরনের পঙ্কিলতায় ডুবে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে সীমিত ভোটাধিকার, গর্ভপাতের অধিকার, অভিবাসন এবং এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও সম্ভবত আর থাকলো না।

এই কিছু দিন আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের সরে যাওয়া নিয়ে হৈ চৈ হয়েছিল। এর ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই ভয়ঙ্করভাবে এমনটা প্রত্যক্ষ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ বছর আগে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আসলে সেটা এখনো থামেনি। ধনী-গরিব লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্য রাজপথে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের কৃষ্ণাঙ্গদের গুলি করে হত্যার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, পুলিশি কুকুরের হানা, মরিচ স্পে, টেসার বুলেট নিক্ষেপ, গুলিবর্ষণ ইত্যাদি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় আফ্রিকান আমেরিকানদের দিকে তাক করা হয় তিন গুণ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২৬টি রাজ্যে শ্রমিকদের ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। এর ফলে এসব রাজ্যে আয় বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এসব রাজ্যেই শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

অনেক রাজ্যে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এ দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্লোরিডা। সেখানে এখনই ১০ লাখের বেশি লোকের ভোটাধিকার নেই। বঞ্চিতদের বেশির ভাগই আফ্রিকান আমেরিকান। নানা বিধিনিষেধের বেড়াজাল দিয়ে এসব লোককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এসব সমস্যার আর সুরাহা হচ্ছে না, এমনটাই ধরে নেওয়া যায়। অনিশ্চয়তার পথে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে না। তারা অবিশিষ্ট বিশ্বকেও একই দিকে নিয়ে যেতে পারে। সেটা আরো বড় ভয়ের কারণ।

আ’লীগের কাউন্সিল, না তৃতীয় প্রজন্মের অভিষেক?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

সাতষট্টি বছর বয়সী আওয়ামী লীগ সম্ভবত: ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা সময়টি উপভোগ করছে। গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা-জেলা থেকে কেন্দ্র, সর্বত্রই আওয়ামী লীগ। দেশ জুড়ে ছড়ানো লক্ষ লক্ষ বিলবোর্ডে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনার ছবি ক্রমশ: ছোট হচ্ছে, বড় হচ্ছে নামধারীদের ছবি এবং গুনকীর্তন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সংসদ সদস্যদের হাত ধরে ফুলের মালা দিয়ে ও নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ সহস্রাধিক নেতা-কর্মী এখন আওয়ামী লীগার। একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের ভাষায়, আওয়ামী লীগের ইশারা ছাড়া এখন গাছের পাতাও নড়ে না।

তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এখন একক এই দলের নামে সবকিছু হচ্ছে। মেগা সাইজের উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, কুড়ি বিলিয়ন ডলারের ওপরে রিজার্ভ, নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ মাথাপিছু আয় হাজার ডলারের ওপরে-সবকিছুর কৃতিত্ব দাবি করছে দলটি একজনের নামে। তিনি হচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি ধারাবাহিক দুই মেয়াদসহ তৃতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন। প্রথম মেয়াদে অবশ্য বলেছিলেন, বয়স ৫৭ পেরোলে অবসরে যাবেন। সম্ভবত: সেটি ছিল কথার কথা; অবসরে যাওয়া হয়নি। কাজ করছেন পূর্ণোদ্যমে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে আবারও অবসরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। দলীয় প্রধান হিসেবেও তার একটি দুর্লভ বিশ্বরেকর্ড রয়েছে- আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সূদীর্ঘ ৩৬ বছর। এবারের কাউন্সিলেও সভাপতি হবেন, কারণ তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সারাদেশে আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই প্রতিপক্ষবিহীন। বিএনপি দল হিসেবে এতটাই নির্জীব যে, কেন্দ্র ব্যতীত অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। বিএনপি নিজেরা নির্জীব হয়ে পড়েছে ও নির্জীব করাও হয়েছে নানা পন্থায়। জামায়াত-শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং মাঝে মাঝে সহিংস হামলায় অস্তিত্ব জানান দেয়। এজন্য প্রায় প্রতিপক্ষবিহীন রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ নিজেরাই এখন নিজেদের প্রতিপক্ষ। দেশের এমন কোন ইউনিয়ন, উপজেলা-জেলা নেই যেখানে আওয়ামী লীগের বিভাজন নেই। এখানে কর্মীর বিরুদ্ধে কর্মী, নেতার বিরুদ্ধে নেতা, দলের বিরুদ্ধে দল। যে নেতার যত অর্থ-নানা ধরনের ক্ষমতা- তার দাপট সবচেয়ে বেশি। এই দলীয় বিভাজন কোন আদর্শের নয়; এই বিভাজন-লড়াই সাম্রাজ্য বিস্তারের, ক্ষমতাবলয় সংহত করার, অর্থে-বিত্তে সর্বেসর্বা হওয়ার।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী মুসলিম লীগের সামন্ততান্ত্রিক ও জমিদার তোষণের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন এবং একটি গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল তারই উদ্যোগে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভাবনীয় সাফল্য, যা মুসলিম লীগের সামগ্রিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল, তার মূল স্তম্ভ ছিলেন ভাসানী, শেরে-বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী। এখনও ওই নির্বাচন হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নৌকার নির্বাচন হিসেবে ইতিহাসখ্যাত।

শিগগীরই ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। স্বায়ত্ত্বশাসন, বাঙালীর অধিকার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নীতির প্রশ্নে এই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং ১৯৫৭ সালে কাগমারীর ঐতিহাসিক সম্মেলনে প্রগতিশীল, উদার ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীদের নিয়ে মাওলানা নতুন দল গঠন করেন। দলের নাম ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। মার্কিনীদের প্রতি অনুরক্ত উর্দুভাষী আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সাথে দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিনতি ছিল এটি।

পাকিস্তানে মার্কিনীদের প্রভাববলয় গড়ে ওঠা, পাক মার্কিন সামরিক চুক্তি, সিয়াটো ও সেন্টো চুক্তিতে স্বাক্ষর প্রশ্নে ভাসানী ছিলেন তীব্র বিরোধী এবং অনমনীয়। পরিনামে আওয়ামী লীগে দুটো ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দল গঠনের পেছনে সামন্ততান্ত্রিক, ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক ধারণা পরিত্যাজ্য হয়েছিল। কারণ মাওলানা ভাসানীর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে সবসময়ই সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদী ধারণার বিরুদ্ধে ছিলেন। এই দ্বন্দ্বে  ভাসানীর বিশেষ স্নেহভাজন শেখ মুজিব অবস্থান নেন সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত নেতা হিসেবে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।

ভাসানীর অত্যন্ত স্নেহভাজন সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য শেখ মুজিব থেকে যান আওয়ামী লীগে। এর পরের ইতিহাস, বিশেষ করে প্রাক মুক্তিযুদ্ধ পর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের যে কোন নির্মোহ বিশ্লেষণে উঠে আসবে ষাটের দশকে পশ্চিমমুখীনতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক হিসেবে জনগনের ইচ্ছের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এ সময়কালে স্বায়ত্ত্বশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনগুলিতে আওয়ামী লীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে জনগনের মুক্তির আকাঙ্খা ধারন করতে সমর্থ হয়। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফা ঘোষণা করেণ এবং অচিরেই এটি বাঙালীর মুক্তি সনদে পরিনত হয়ে ওঠে। যদিও এর আগে তৎকালীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ব্যপক সমর্থন পায় এবং ৬ দফাসহ ওই সময়ের নানা ঘটনার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পরিনামে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দলটি পূর্ব বাংলায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনই ছিল বাঙালীর মুক্তি আন্দোলনের নির্ধারক, যা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিনত হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

ইতিহাসের এই সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিকতা মনে করিয়ে দেবার কারন, পাকিস্তানী সামরিক স্বৈরাচার ও শোষন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাতিগত ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানে আওয়ামী লীগের সাফল্যের মূলে ছিল, জনগনের অকুন্ঠ সমর্থন। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ জনগনের এই ইচ্ছাকে ধারন করতে তো পারেইনি বরং উল্টো যাত্রায় সামিল হয়েছিল স্বাধীনতার পরেই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরন হচ্ছে, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পর দলটি উদার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় চতুর্থ সংশোধনী পাশের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটি মুছে ফেলেছিল।

ফলে দলের মধ্যের ষড়যন্ত্রকারী নেতৃবৃন্দ ও কতিপয় বেসামরিক-সামরিক আমলার সম্মিলনে ’৭৫-এর বর্বরতম ট্রাজেডি সংঘটিত হয়। ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষকরা মনে করেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বাসনায় সুষ্ট জনবিচ্ছিন্নতা ট্রাজেডির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, যা সাধারন মানুষের কাম্য ছিল না। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম ধারক এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল ঐতিহাসিকভাবে গণতন্ত্র বিচ্যুতির দায় পরিশোধ করেছিল নির্মম ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে। পরিনামে নির্বাক-নিথর জনগন সাক্ষী হয়ে থাকে ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় ক্যু-পাল্টা ক্যু, অজস্র রক্তপাতের। গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্খায় পৃথিবীর কোন জাতিকে এত রক্ত দিতে হয়েছে- ইতিহাসে এরকম নজির বোধকরি আর নেই।

এই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পরিনাম ছিল সূদুরপ্রসারী। এ সময়েই রাজনীতিকদের হাত থেকে রাজনীতি বেরিয়ে যেতে থাকে। সামরিক আমলাতন্ত্র বেসামরিক আমলাতন্ত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আওয়ামী লীগ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। ১৯৬৬ সালে প্রায় সকল জেলে আটক থাকাকালে আমেনা বেগম আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন, যেমনটি ’৭৫ পরবর্তীকালে ধরেছিলেন জোহরা তাজউদ্দিন। কিন্তু অচিরেই দল দ্বিধাবিভক্তির পাশাপাশি অনেক উপদলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসা হয় আসন্ন দলীয় বিপর্যয় রোধ করার জন্য।

১৯৮১ থেকে ২০০৮ এর নির্বাচন পর্যন্ত একটি কালপর্ব ধরলে দেখা যাবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৮৩-৯০ পর্বে প্রথমে সামরিক শাসনকে স্বাগত জানিয়েছে, যেমনটি জানিয়েছিল ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। বিএনপি ও বাম দলগুলোর সাথে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, আবার ১৯৮৬’র নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। এরশাদের পতনের পরে সংসদীয় পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। তত্ত্বাবধায়ক  সরকার প্রতিষ্ঠায় জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। এ সময়েই এরশাদের সাথে যে সমঝোতা হয়েছিল পরবর্তীকালে সেটি অংশীদারীত্বে পরিনত হয়েছে।

১৯৯৬ সালে আওযামী লীগ ক্ষমতায় এসে কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল বাতিল করে শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন করেছিল। ফলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাটি নষ্ট হয়ে যায় দলীয়করণ ও কুক্ষিগত করার কারণে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে স্থুল কারচুপির অভিযোগ আনেন শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের মত সংসদ বর্জনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। সুতরাং দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ পর্ব অতিক্রম করলেও দেশের রাজনীতিতে সুস্থ গণতান্ত্রিক বাত্যাবরন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেননি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হয় তিন-চতর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। সম্ভবত: এই বিজয় দলটিকে পুনরায় স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ফলে  তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মত একটি পরীক্ষিত বিষয়কে সংস্কার না করে জনগনের অভিপ্রায়ের বিপক্ষে বাতিল করে দেয়া হয়। এর সূদুুরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল একটি একক নির্বাচন অনুষ্ঠান করার কারণ সিটি নির্বাচনে শেখ হাসিনা মেসেজটি পান যে, প্রচলিত ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশ নেয় তাহলে ফলাফল কি হতে পারে! রাজনীতির কূটচালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে।

২০০৯ থেকে ২০১৬। অনুকল এক রাজনৈতিক পরিবেশে গনতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রতিকূলে প্রবাহিত করার ঐতিহাসিক দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। সরকার তার নিজস্ব দল ও রাজনৈতিক শক্তির ওপরে নির্ভর করার বদলে প্রশাসন, পুলিশ ও দমননীতি নির্ভর হয়ে পড়ে। এ কারণে জনসমর্থন নয় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নীল নকশাটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পালে আরো বাতাস লাগে প্রায় কোন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকায়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এসময় একক ও কর্তৃত্ববাদী সবকিছৃ নিয়ন্ত্রণের আগ্রাসী সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবারতন্ত্রকে গ্রহনযোগ্য মনে না করা হলেও বাংলাদেশে প্রধান দল দুটিতে এটি জেঁকে বসেছে। বিএনপিকে যেমন ‘মায়ে-পুতে’র দল বলা হয় আগামী কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগও সেই ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সজিব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, রেজওয়ান এরা কাউন্সিলর হয়েছেন। বলা যেতে পারে, এবারের কাউন্সিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আনুষ্ঠানিক অভিষেকের এবং রাজনীতিতে জয় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন, সন্দেহ নেই। তরুন তুর্কীরা দলে জয়ের নেতৃত্ব চাচ্ছেন, শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্য এবং ক্ষমতাবলয়ে অবস্থান দৃঢ় করতে।

‘‘উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছে দুর্বার, এখন সময় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার”-আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের মূল শ্লোগান এটি। এরকম একটি শ্লোগান চমৎকৃত করতে পারে বা কসমেটিক উন্নয়নের সাফল্যগাথা আরো উজ্জীবিত করতে পারে, কিন্তু এর অন্ত:সারশূন্যতা অন্য জায়গায়। এই দেশের উন্নয়ন ভাবনায় ভীমরতি ঢুকেছে, যে কোন উপায়ে হীনপন্থা অবলম্বনে উন্নয়ন সাফল্য প্রচার করা হচ্ছে। অবকাঠামো, শিক্ষাক্ষেত্র, পরিবেশ- কোনকিছুই বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না উন্নয়ন সাফল্য প্রচারে।

যে কোন টেকসই উন্নয়নের সারকথা হচ্ছে, সুনীতি-সুশাসনের ভিত্তিতে পরিকল্পিত চেষ্টা। যে উন্নয়নের পেছনে সুনীতি-সুশাসন নেই, গায়ের জোরে উন্নয়ন চাপিয়ে দেয়া হয়, তার ভেতরে থাকে গলদ, দুর্নীতি আর ক্ষণস্থায়িত্ব। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উন্নয়ন মানুষকে কতটা ঝুঁকি ও বিপদে ঠেলে দেয়, আইয়ুব-এরশাদের কথিত উন্নয়ন ফল তার প্রমান রেখেছে অনেককাল আগে। মূলত: মানুষের অধিকার ও আকাঙ্খাকে দমিত রাখার জন্য এরকম চটকদার শ্লোগান সামনে নিয়ে আসা হয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের এবারের কাউন্সিল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে কথিত উন্নয়ন ভাবনায় আবর্তিত হবে-সে বিষয়ে সন্দেহ থাকছে না।

যুক্তরাষ্ট্রে এ কেমন নির্বাচন : যুদ্ধ মন্দা বর্ণবাদ জন-সংকটও কোনো ইস্যু নয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ :: ফ্রন্টলাইন অবলম্বনে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য আমেরিকানরা নভেম্বরে ভোটে যাচ্ছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, ২০১২ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত ভোটারদের অর্ধেকের সামান্য বেশি তথা ৫৭.৫ ভাগ ভোট দিয়েছিল। বাকি ভোটারেরা নির্বাচনের পরোয়া করেনি। তারা হয় ভোট দিতে যাওয়ার মতো সময় পাননি (সেখানে নির্বাচন হয় কর্মদিবসে) কিংবা কাজটি করার জন্য ভেতর থেকে তেমন ধরনের তাগিদও সৃষ্টি হয়নি। এবারের নির্বাচন সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থী দুজন সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত, বিতর্কিত দুই ব্যক্তি। জনমত জরিপে দেখা যায়, হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প একে অপরের খুবই কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছেন। ভোটাররা উদ্দীপ্ত হয়ে তাদের ভোট দিতে চান, এমন নয়। বরং প্রতিদ্বন্দ্বিকে অপছন্দ থেকে তারা ভোট দিতে চান।

এবারের নির্বাচনে কোন কোন ইস্যু প্রাধান্য পাচ্ছে? তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, কোটি কোটি আমেরিকানের দুরবস্থায় পড়া নিয়ে কোনো গভীর আলোচনা হচ্ছে না, নাগরিক অধিকার, জেন্ডার বৈষম্যও সেভাবে আলোচিত হচ্ছে না। প্রার্থী দুজনের কেউই এসব বিষয়কে প্রকাশ্য বিতর্কের মতো ইস্যু মনে করছেন না। যেসব ইস্যু ভেসে আসছে, সেগুলো যৌক্তিকাপূর্ণ কিনা তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এগুলোর মধ্যে দুটির কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় : হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্য এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজ। এগুলোই আকাশ-বাতাস মুখর করছে। ক্ষুধা আর অনাহার, ও যুদ্ধ, পুলিশের সহিংসতা, ভূমি অধিকারের মতো মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় আসছে না।

সামনে যা আসছে : একসময় ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিদদের অন্ধ গলিতে যেসব বিষয় ঘুরপাক খেত, এখন সেগুলোই প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের উপস্থিতি ঘোষণা করছে। ৯/১১ বার্ষিকীতে হিলারি ক্লিনটনের প্রায় পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি এই ধারণা উস্কে দিয়েছে, তিনি মারাত্মক অসুস্থ। হিলারি শিবির থেকে বলা হলো, তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। কিন্তু সেটাই পর্যাপ্ত বিবেচিত হলো না। তার বিশ্বাসযোগ্যতা কম হওয়ায় চরমপন্থীরা তিনি যে মিথ্যা বলছেন, সেটা প্রচার করার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। ক্লিনটন ফাউন্ডেশন, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুর্নীতি এবং ক্লিনটন পরিবারের সদস্যদেরও বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর মতো যৌক্তিক বিষয়গুলোও তেমন ঝড় তুলতে পারছেন না খোদ অভিযোগকারীদের একনিষ্ঠতার অভাবে। হিলারি ক্লিনটনের কাশিই সত্যি সত্যি তিনি আরো বড় কিছু গোপন (ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে করা চুক্তির কথা বলা যায় উদাহরণ হিসেবে) করছেন বলে অভিযোগ করাটা অবৈধ।

আবার মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটি বেশ বড় অংশ ট্রাম্পকে অবিশ্বাস ও অপছন্দ করে। তার ধুম-ধারাক্কা চালচলন, বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি উন্নাসিকতা, চাপাবাজি উদারপন্থীদের কাছে তাকে অভিশাপে পরিণত করেছে। তাকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিত্রিত করা সহজ। বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো উপযুক্তি নন, তিনি খুবই অস্থিরমতি, অনেকটাই ভাঁড়ের মতো। আর এটাই যারা হিলারি ক্লিনটনের প্রতি উৎসাহী নন, তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাবে। এখানে সাধারণভাবে যে বিষয়টা কাজ করছে, তা হলো ‘বিকল্পের দিকে তাকান,’ কিংবা আরো সহজভাবে বলা যায়, ‘দুই খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম খারাপকে ভোট দিন।’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে ট্রাম্প যে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন, ডেমোক্র্যাট শিবির সেটা লুফে নিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, পুতিন শক্তিশালী নেতা। আর বিস্ময় সৃষ্টি করে তিনি বলে ফেলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চেয়েও ভালো পুতিন। এটা উদারপন্থীদের মধ্যে ক্রোধের সৃষ্টি করেছে, তারা বাগাড়ম্বরতার সুচটি স্নায়ুযুদ্ধের এলাকায় সরিয়ে নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুতিন একটি বড় হুমকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। বিষয়টি ইউক্রেন ও সিরিয়ায় রুশ সম্পৃক্ততায় এবং ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ইন্টারনেট সিস্টেম রাশিয়ার হ্যাক করার সন্দেহের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

এসব বিষয়গুলো সিএনএন, ফক্স, এনবিসি এবং অন্যান্য নেটওয়ার্কে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। গণতন্ত্র তাদের কাছে অনেকটা মার্বেল স্লাবে রাখা মরা ভেড়া বা মুরগির দেহ থেকে টেনে আনা বস্তু। বিশ্লেষক ও নির্বাচন সমীক্ষাকারীরা ভেবে মরছেন, হিলারি ক্লিনটনের স্বাস্থ্য কিংবা ট্রাম্পের বর্ণবাদ কিংবা স্রেফ পুতিন সত্যিই  আদৌ কোনো ইস্যু কি না। মার্কিন সমাজকে অস্থিরকারী রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর দিকে তারা তাকিয়েও তারা দেখছেন না। পুলিশের সহিংসতা, মার্কিন সমাজে ছড়িয়ে থাকা বন্দুক নিয়ে বলতে গেলে কোন আলোচনাই হয়নি। মিডিয়া যখন হিলারি-ট্রাম্প প্রতিযোগিতা নিয়ে মেতে রয়েছে, তখন টায়ার কিং নামের ১৩ বছরের এক আফ্রিকান-আমেরিকান শিশুকে পুলিশ অফিসাররা গুলি করে মেরে ফেলেছে। হত্যা করার সময় কিংয়ের হাতে একটা খেলনা বন্দুক ধরা ছিল। ঘটনাস্থল ওহাইয়োর কলম্বাস নগরীর মেয়র বলেছেন, ‘এই দেশে কিছু একটা ভুল রয়েছে। এটা আমাদের রাস্তায় মহামারী ডেকে আনছে। ১৩ বছর বয়সী ছেলেটা মারা গেল বন্দুক আর সহিংসতার প্রতি আমাদের আচ্ছন্নতার কারণে।’ এই সাংস্কৃতিক সমস্যাটি থাকা দরকার ছিল বিতর্কের সামনে ও কেন্দ্রে। কিন্তু স্থান পাচ্ছে এক প্রান্তে, কোনোক্রমে। ন্যাশনাল রাইফেল এসোসিয়েশনের সদস্য ট্রাম্প। আর মুভমেন্ট ফর ব্ল্যাক লাইভস এবং পুলিশ ইউনিয়নের মধ্যকার চাপে পৃষ্ট হচ্ছেন। তাদের কেউই বন্দুকবাজদের সাথে লড়াই করতে কিংবা বেকারত্ব, পুলিশের নির্মমতায় ছিন্নভিন্ন সমাজে কল্যাণ বয়ে আনতে আন্তরিক নন।

যে নিরন্তর যুদ্ধগুলো বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দুর্ভোগ বয়ে আনছে, সেগুলো অবসানের বিষয় বলতে গেলে বিবেচনাতেই আসছে না। হিলারি কিংবা ট্রাম্প কারোরই কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু দুজনের কেউই প্রতিদিন যে ২০ জন করে যুদ্ধফেরত সৈনিক আত্মহত্যা করছে, তা নিয়ে কোনো কথা বলছেন না। ২০১৪ সালে প্রায় ৭,৪০০ যুদ্ধফেরত সৈনিক আত্মহত্যা করেছেন। সংখ্যাটা ৯/১১-এ নিহতের দ্বিগুণ। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির ব্যাপারে সামান্যই বক্তব্য রয়েছে। অথচ আমেরিকান সামরিক শক্তির চাবুকে এশিয়ার এক প্রান্ত থেকে আফ্রিকার অপর প্রান্ত পর্যন্ত লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাচ্ছে।

এই যুদ্ধের কোনো শেষ সীমা নেই। এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটা হতে পারত একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। এই নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের কর্তব্য অবহেলা প্রসঙ্গে ‘বেনগাজি’র (লিবিয়ার এই নগরীতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ চারজন নিহত হয়েছিল) কথা উল্লেখ করা হয়- লিবিয়ার বিধ্বস্ত দ্বিতীয় নগরী হিসেবে নয়।

কোটি কোটি আমেরিকানের মারাত্মক দুর্ভোগ নিয়ে আলোচনাই হচ্ছে না। অথচ পাঁচ কোটি আমেরিকান গরিব অবস্থায় রয়েছে, তাদের অনেক মারাত্মক ক্ষুধায় মরছে। মহামূল্যবান সরকারি সম্পদ চলে যাচ্ছে সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সে। সম্প্রতি ওবামা ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বাবদ ৩৮ বিলিয়ন ডলার প্রদানের একটি চুক্তিতে সই করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে প্রতিটি মার্কিন করদাতার কাছ থেকে ৩০০ ডলার করে নেওয়া হবে। আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। পরিমাণটা ধারণারও বাইরে। নিজ দেশের জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের বদলে পুলিশ আর যুদ্ধের পেছনে অর্থ ঢালা যেন এই সিস্টেমের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

নভেম্বরে আমেরিকানরা ভোট দিতে যাচ্ছে। যে প্রার্থীকে অপছন্দ করে, তার ভয়ে তারা ভোট দেবে। আমেরিকান সমাজের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আলোচনায় থাকবে না। চাকরির নিরাপত্তা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, নিত্যপণ্যের মূল্য, ছুটি কাটানোর টাকা না থাকা, আরো সুন্দর জীবন কাটানোর স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের দুর্ভাবনা নিয়ে কারোই মাথাব্যথা নেই। তাদের এসব দুর্ভাবনা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের কথার কথায় কেবল স্থান পাচ্ছে। রাজনৈতিক-প্রক্রিয়ায় আস্থা রয়েছে সর্বনিম্ন অবস্থানে। বাক্সে ভোট ফেলার জন্য হাত বেশ দ্রুতই ওঠবে, কিন্তু এই তাড়াহুড়াকে উদ্দীপনা মনে করে যেন ভুল করা না হয়। এটা আসলে হতাশার লক্ষণ।

আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

তাজরীন ফ্যাশনস, রাণা প্লাজা, থেকে টাম্পাকো। এ আরেক ধরনের পাইকারী হত্যাকান্ড। মধ্যযুগে যেমন মৃত্যুকূপে ফেলে মানুষকে হত্যা করা হতো, সে রকম নানা নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই দেশে শ্রমিকদের জন্য হয়ে উঠছে যেন মৃত্যুকূপ। ব্যবসায়ী নামক কতিপয় অর্থপিশাচের লোভের বলি হয়ে ফি- বছর এই দেশে ধ্বসে পড়ে, চাপা পড়ে, আগুনে পুড়ে, বারুদে ঝলসে মারা যায় মানুষ। দেখ-ভালের কেউই নেই। আছে, তবে তারা মালিকের রক্ষক, জনগনের তো নয়ই। সেজন্যই বছরের পর বছর মারা পড়া হতভাগা মানুষগুলির পরিবার-পরিজন কোন নিরাপত্তা পায়নি-কারো কাছ থেকে।

মালিক পক্ষ এবং যারা দেশ চালান তারা যখন ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা, সাধারনরা ঈদ যাত্রায় পথের দুর্ভোগ সয়ে পরিবারের সাথে মিলন প্রত্যাশী-কোরবানীর পশুর রক্তপ্রবাহে উদ্বেলিত, হায় কে রাখে কার খোঁজ! ওই সময়টিতেই টঙ্গীতে জ্বলছিল টাম্পাকো ফুয়েলস লিমিটেডের কারখানা। হতভাগ্যরা আগুনে পুড়ে ভর্তা হচ্ছিল। ৩৪ জনের অধিক মানুষের দগ্ধ লাশ বের করে আনা হয় আগুন থেকে। সবশেষ খবর, ৩৯জন মারা গেছে। হাসপাতালে ভর্তি আরো অগুনতি। দুর্ঘটনার এতদিনেও শেষ হয়নি উদ্ধার তৎপরতা। স্বজনদের আর্ত আহাজারিতে ভারি বাতাস। পশুতে-মানুষে যেন তফাৎ নেই।

মালিক পক্ষের হাজারো অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রের নতজানু ও দুর্বল নজরদারির কারনে রাণা প্লাজা থেকে টাম্পাকো দুর্ঘটনায় আদম সন্তানের বীভৎস মৃত্যু বিবেকবানদের বিপন্ন করে দিয়েছে। একি মৃত্যু না গণহত্যা! ফায়ার সার্ভিস সর্বশক্তি দিয়ে স্বল্পসময়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনতে পারেনি। সময় লাগছে অনেক দিন, তারপরেও পুরোপুরি নয়। ফায়ার সার্ভিসের অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের সক্ষমতাই এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। আগুন নিভেছে একসময়, ধ্বসিয়ে দিয়েছে আশ-পাশ, বেঁচে যাওয়াদের ঝলসে যাওয়া দেহ, দগদগে ক্ষত মুছবে কিভাবে!

এরকম একটি কারখানার ভয়াবহ আগুন যে পানি বা গ্যাস দিয়ে নেভানো সম্ভব নয়, আরো আধুনিক প্রযুক্তি দরকার, তা কর্তৃপক্ষের ৩৪টি লাশের বিনিময়ে জেনেছে। কিন্তু এ জানার বিষয়টি তারা ভবিষ্যতে কাজে লাগাবে, নাকি সনাতনী ধারায় চলবে-এই বিষয়টি মোটেই পরিষ্কার নয়। ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরেও কারখানা থেকে নিখোঁজদের এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আরো অনেক ঘটনার মত সম্ভব হবে না, আত্মীয়-পরিজনরা এটি জেনে গেছেন। এখন অসহায় অপেক্ষা, কোন ক্ষতিপূরন বা আইনী সুবিচার তারা পাবেন কিনা?

উদ্ধার তৎপরতায় এই যে সক্ষমতার অভাব সবসময় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ায়। কিন্তু তাতে কি? মালিক পক্ষের কেউ তো আর ক্ষতির শিকার হয় না। রবীন্দ্রনাথের “সামান্য ক্ষতি” কবিতার কথা মনে আছে? সেখানে মাঘের শীতে রাণী স্নান করে শত সখী পরিবৃত হয়ে আগুন পোহাবেন বলে গরিবদের কুটিরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। রাজা ছিলেন সদাশয়, শাস্তিস্বরূপ রাণীকে করেছিলেন ত্যাগ। কিন্তু এ রাষ্ট্র তো গরীব-সাধারনের পক্ষে নয়, সুতরাং মালিক পক্ষ ‘সামান্য ক্ষতি’ করলেও  আখেরে আইনও তাদের কিছু করতে পারে না।

বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, বার বার এরকম বীভৎস ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে মেনে নেয়া হবে? এটিকে নিছক দুর্ঘটনা থাকবে, নাকি পাইকারী হত্যাকান্ড হিসেবে অভিহিত করা হবে? রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা, মালিকদের সীমাহীন লোভ-অবহেলার কারনে বছরের পর বছর যে প্রাণহানিগুলো ঘটছে সেগুলি তো আসলে এক ধরনের মুনাফালোভী হত্যাকান্ড! আরো বড় প্রশ্ন, আগামীতে কি অপেক্ষা করছে? দেশের অনিরাপদ শিল্প-কারখানাগুলি কবে কর্মরতদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে?

শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির ঘটনা তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। তথ্য জানাচ্ছে, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বেশিরভাগ বাংলাদেশে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সারাবিশ্বে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বড় রকম ছয়টি দুঘটনার তিনটিই এই দেশে। এই দশকে শিল্প দুর্ঘটনায় নিহত এক হাজার ছয়’শ জনের মধ্যে এক হাজার দুই’শ জনই এই দেশের। সে হিসেবে নিহতের আশি শতাংশ হতভাগ্য বাংলাদেশের।

শিল্প-কারখানা দুর্ঘটনার নামে এই পাইকারী হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে সাধারন মানুষ ও দেশকে। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে রাস্তায় নামে পরিজনরা, সামনে নিয়ে অনিশ্চিত দিন-রাত। দেশের ভাবমূর্তি হয়ে পড়ে কালিমালিপ্ত। বিনিয়োগের সম্ভাবনা নষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক মহল রপ্তানির ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেয় নানা বিধি-নিষেধ। কোন কোন দেশ রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করে এসব ঘটনা। অন্তিমে যাই ঘটুক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ।

স্পেকট্রাম, তাজরীন, রাণা প্লাজা মাঝখানে ছোট-খাট অনেকগুলো এবং সবশেষ টাম্পাকোর ঘটনা বলে দিচ্ছে এরকম মৃত্যুকূপ আরো অনেক থাকতে পারে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এরকম ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। এগুলিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালানো অপপ্রয়াস মনে করিয়ে দেয় নিদারুন অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কথা। যদি পাঁচ বছর বা তারও পরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে তাহলে তা দুর্ঘটনা হতেও পারে। মনে আছে, রাণা প্লাজার ঐ ঘটনার পর পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজেএমইএ কবুল করে নিয়েছিল যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে ২০৫ টির মত দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বর্তমান জাতীয় সংসদের শতাধিক সদস্য বিভিন্ন শিল্প-কারখানার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিক। রাষ্ট্র যদি সংসদে শিল্প-কারখানার নিরাপত্তায় বিশেষ কোন আইন করতে চায়, তাহলে সংসদের তিন ভাগের এক ভাগ সদস্য চাইবেন না যে, এমন আইন হোক- যা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এই এক ভাগের সাথে অন্য সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করে দেয়। এজন্যই রাষ্ট্র ব্যর্থ। কারখানা নিরাপত্তার জন্য আইন রয়েছে। আইন ভাঙ্গা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শাস্তি হচ্ছে না।

সাধারন ধারনা হচ্ছে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় রাষ্ট্র, মালিক, শ্রমিক-সকল পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে সব মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হন না। দু’একজন ক্ষতির সম্মখীন হচ্ছেন। উদাহরন, তাজরীন গার্মেন্টস মালিক। মালিকরা হচ্ছেন পুঁজির ধারক। রাষ্ট্র এই পুঁজির পাহারাদার। কার্ল মার্কস বহুকাল আগে বলে গেছেন, মালিকের উৎপাদনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা। শ্রমিক কল্যাণ বা মানবকল্যাণ, কোনটিই নয়। সেজন্যই তার কাছে হিসেব হচ্ছে মুনাফার, শ্রমিকের জীবন নয়।

পুঁজির বিবেচনায় মালিক নিশ্চিত হতে চান, মুনাফার পরিমান কত আসবে! যদি বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাংশ মুনাফা আসে, ভাল। যদি ৫০ শতাংশ আসে, তাহলে ঐ মালিক ফাঁসির দড়িতে লটকে যাবার মত ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না। এটি এখন আমাদের রাষ্ট্রেও প্রবল হয়ে উঠেছে। এখানেও মালিকরা বিবেচনা করছেন, কারখানার ১০ শতাংশ শ্রমিক কথিত দুর্ঘটনায় মারা গেলে কি পরিমান ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে!

এই ক্ষতিপূরণের পরিমান যদি তার মুনাফার চেয়ে কম হয় তাহলে শ্রমিকের জীবন গুরুত্ব পায় না। মালিক তখন বিবেচনায় নেন, শ্রমিক মরলে মুনাফা থেকে কিছুটা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর মারা না গেলে মুনাফার পুরোটাই তার। যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে উদাহরন রয়েছে, কারখানায় প্রতি বছর তিনজন শ্রমিক মারা পড়তে পারে। তিনজনের জন্য ৫০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। কিন্তু ঐ তিনজন যদি বছরে কারখানার মুনাফার এক লাখ ডলার নিশ্চিত করতে পারে তাহলেও ক্ষতিপূরণ দেবার পরে ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে। আর মারা না গেলে পুরোটাই মুনাফা। এই নগদ লাভের স্বার্থে মালিক পক্ষ ভয়াবহ ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হচ্ছেন না।

এই দেশেও এখন মুনাফার হিসেব-নিকেষ প্রধান হয়ে উঠছে। মালিক পক্ষ উৎপাদন এবং সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধ্বসে পড়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া বা যে কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে তারা শতাংশের হিসেব কষেণ। ধরা যাক, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা শতাংশের চারভাগ। বাকি ৯৬ ভাগ তাদের ভরসা হওয়ার কারণে মুত্যুকূপের মত ঐসব শিল্প-কারখানা টিকে আছে। এখানে প্রত্যাশিত মুনাফার তুলনায় ঝুঁকির বিষয়টি নগন্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ কারণেই আইন এর প্রয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইনের দুর্বলতা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, সবলতা নিয়ে ততটা হয় না। মূলত: প্রয়োগের অভাবে। এখানে সবকিছু নির্ভর করে নির্বাহী আদেশের ওপর। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া প্রায় কোন ঘটনায় নড়া-চড়া লক্ষ্য করা যায় না। রাণা প্লাজা ট্রাজেডির পর মালিককে গ্রেফতার, উদ্ধার তৎপরতার সমন্বয়-সবকিছুতেই লেগেছিল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, এটি অব্যাহত আছে এখনও প্রায় সব ব্যাপারেই।

এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা তৈরী হয়েছে এই রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। সর্বোচ্চ নির্বাহীর দিকে তাকিয়ে থাকেন সবাই। কারণ, রাষ্ট্র-সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার তৈরীর বদলে ব্যক্তির ওপর সব দায় চাপিয়ে দিয়ে বসে থাকে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি যে সম্ভাবনা নয়, বরং সংকট-সেটি বার বার প্রমানিত হয়েছে। ‘চেইন অব কমান্ডে’র অভাব মূলত: এই নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয় সর্বোচ্চ ব্যক্তির দিকে। এর উৎস কি আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ? নাকি চর্চা-অভ্যাস, আনুগত্য বা চাটুকারিতার সব আমলের নিট ফলাফল?

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কি হবেই?

সিএনএন-এর বিশ্লেষন অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ ::

ভারত ও পাকিস্তান কি যুদ্ধে নামবে? প্রশ্নটা অনেক দিন থেকেই ছিল স্রেফ কথার কথা, প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দুই দেশই অনেক আগে থেকেই পরমাণু শক্তিধর; আর এটাই সেখানকার ১৪০ কোটি মানুষকে চেপে ধরে আছে। ২০ শতকের হানাহানির ধারাবাহিকতায় উভয় দেশই একাধিকবার যুদ্ধে নেমেছে, আবার তুলনামূলক শান্তির সময়ও অতিবাহিত করেছে।

কিন্তু তারপর?

এখন যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তাকে নিছক আর অসম্ভব আর চাপাবাজি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, খুবই গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারত দাবি করছে, তারা পাকিস্তান-সংলগ্ন নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালিয়েছে। ঘটনাবলীর ভারতীয় ভাষ্য হলো, তারা একটি সন্ত্রাসী লঞ্চিং প্যাডে হামলা করেছে। আক্রান্ত স্থানটি কোনো সন্ত্রাসী ঘাঁটি ছিল না বলে পাকিস্তান দাবি করেছে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা তাদের দুই সৈনিকের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

সর্বশেষ যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে তা হলো ১৮ সেপ্টেম্বর ভারত-শাসিত কাশ্মিরে একটি সেনা ঘাঁটিতে হামলায় ১৮ সৈনিকের নিহত হওয়া। ওই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনা-বিষয়ক মহাপরিচালক ঘোষণা করেন, হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীরা ‘পাকিস্তানি চিহ্নযুক্ত’ সরঞ্জাম বহন করেছিল।

এই অভিযোগটি সামাজিক মাধ্যমযোগে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইট করেন, ‘পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, একে এই পরিচিতিতেই চিহ্নিত ও নিঃসঙ্গ ও এঘরে করতে হবে।’

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির মহাসচিব রাম মাধব ফেসবুকের আশ্রয় নেন : ‘একটা দাঁতের জন্য পুরো চোয়াল।’ তিনি দৃশ্যত, ভয়াবহ প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেছেন।

ভারতের অনেক টিভি চ্যানেলে ক্রমাগত যুদ্ধের সুর তোলা হতে থাকে, সেটা বাড়তে বাড়তে প্রাইমটাইমের প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়ে পড়ে। ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়, এমন একটি ইংরেজি সংবাদ চ্যানেলের হোস্ট অর্নব গোস্বামী পাকিস্তানের প্রতি তার ক্রোধ প্রকাশ করেন আরো প্রবলভাবে এই বলে : ‘তাদেরকে পঙ্গু করে দেওয়া দরকার, আমাদের উচিত তাদেরকে তাদের হাঁটুর মধ্যে নামিয়ে দেওয়া।’ তার অতিথিদের মধ্যে একজন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এক জেনারেল। তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে বলেন : ‘আমাদেরকে অবশ্য অ-সন্ত্রাসী পন্থায় পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে হবে।… জাতির একটু স্বস্তি দরকার।’

কিন্তু উভয় দেশে তৈরি হয়ে থাকা পরমাণু অস্ত্র ভান্ডার নিয়ে কী হবে? সেটা ভয় দেখানোর হাতিয়ার হয়েই থাকবে?

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জি ডি বকশির কাছে জবাবটা পরিষ্কার, ‘পাকিস্তান আকারে ভারতের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। আমরা আমাদের অস্ত্র ভান্ডারের অল্প কিছুও যদি প্রয়োগ করি তবে পাকিস্তানি পাঞ্জাব, যেখান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসে : ৮০০ বছরে সেখানে আর কোনো ফসল ফলবে না।’ তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘আসুন আমরা নিজেদের ভয় পাওয়া থেকে বিরত থাকি।’

পাকিস্তানও জবাব দিয়ে চলে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সরতাজ আজিজ এক বিবৃতি দিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তারা যেসব ভিত্তিহীন ও দায়িত্বহীন অভিযোগ করছেন তার দেশ সেগুলো সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করছে।’

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র সিএনএনকে বলেন, ভারত-শাসিত কাশ্মিরের পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের নজর সরিয়ে নিতে ভারত বেপরোয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি দৃশ্যত কাশ্মিরের বিক্ষোভ ও উত্তেজনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

পাকিস্তানেও উত্তেজনা চলছে। ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় এক ভারতীয় সাংবাদিককে সেখান থেকে চলে যেতে বলেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে।

বিরাজমান বাস্তবতা :

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অজয় শুল্কা বলেন, ‘আমরা যে বাগাড়ম্বরতা দেখছি, তা চালিয়ে নেওয়া খুবই সহজ।’ তিনি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার স্ট্যাটেজিক সম্পাদক।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর যে হামলাটি হয়েছে, সেটি পাকিস্তান থেকে হয়েছে বলে যে অভিযোগটি ভারত করেছে, এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। জানুয়ারিতে উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবে ভারতীয় আরেকটি ঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল। স্থানটি পাকিস্তান সীমান্ত থেকে বেশি দূরে নয়। তাছাড়া ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার কথা বলা যায়। তাতে নিহত হয়েছিল ১৬৪ জন।

ভারতীয় কর্মকর্তারা এইসব হামলার জন্য পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্কিত করা অব্যাহত রেখেছেন। আর ইসলামাবাদ তাদের যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে।

এ ধরনের যেকোনো হামলার সময়ই কড়া ভারতীয় প্রতিক্রিয়ার দাবি ওঠে। ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় (ভারত) সরকার জনসাধারণের চিৎকারে নয়, বাস্তবতায় চালিত হয়। তারা বোঝে, তারা যদি পাকিস্তানে হামলা চালায়, তা ভারতের অনুকূলে হবে না।’ শুক্লা উল্লেখ করেন, কোনো ধরনের হামলা চালানোর জন্যই কৌশলগতভাবে ভারত প্রস্তুত নয়। তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তা হলো ‘পরিকল্পনা-প্রক্রিয়ায় ব্যর্থতা।’ শুক্লার মতে, এই বাস্তবতা কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না যে, পাকিস্তানের রয়েছে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, ‘আমরা ধারাবাহিক সম্পর্কের মধ্যে রয়েছি। যেকোনো ধরনের হামলার যে পরিণতি হবে, তা লোকজন কল্পনাও পারছে না।’

আগের যেকোনো হামলার চেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বরের হামলাটি ছিল সম্ভবত ভিন্ন। কারণ এবার প্রতিশোধ গ্রহণের দাবিটি ওঠেছে খোদ ভারত সরকারের ভেতর থেকে। ফলে মুখ রক্ষার জন্য হলেও কিছু একটা করা দরকার হয়ে পড়েছে।

ভারতীয় বিক্ষোভকারীরা ১৯ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

ভারতে যে বাগাড়ম্বরতা চলছে, তা পাকিস্তান লক্ষ করছে। ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক মোশাররফ জাইদী, যিনি একসময় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি বলেন, ‘ভারতে যে ব্যথা ও ক্রোধের আবেগ দেখা যাচ্ছে, তা বোধগম্য। কিন্তু হামলার মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা যে, হামলাকারীরা জৈশ-ই-মোহাম্মদের এবং গ্রুপটি পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের সাথে সম্পর্কিত- তা পুরোপুরি কান্ডজ্ঞান-বহির্ভূত, পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে পরিহাসমূলক বিষয়।’ জাইদী বলেন, পাকিস্তান হয়তো ১৯৯০-এর দশকে কাশ্মিরে সক্রিয় গ্রুপগুলোর প্রতি সমর্থন দিত, কিন্তু পাকিস্তান সে পথ থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে যে বক্তব্য রাখছেন, পাকিস্তানের নীতি এখন পুরোপুরি সে অনুযায়ীই চলছে। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে এটা হবে আত্মঘাতী নীতি। পাকিস্তান এখন তার অর্থনীতি জোরদার করার চেষ্টা করছে। দেশটি এখন নিজেকে চীনের মতো দেশের জন্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।’

পাকিস্তানকে নিঃসঙ্গ করার ভারতের কঠোর বক্তব্য উভয় পক্ষের যুদ্ধবাজদের জন্য হবে পোয়াবারো। জাইদির মতে, এ ধরনের বক্তব্য যুক্তির কথাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে সবশেষ খবর হচ্ছে, সীমান্তে উত্তেজনা এড়াতে দুই দেশের দুই নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।

বৈশ্বিক কূটনীতি :

কয়েক দশক নয়া দিল্লী পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল। দেশটি ছিল জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠা। লক্ষ্য ছিল দেশটিকে পরাশক্তির প্রভাব থেকে দূরে রাখা। কিন্তু সদ্য কারাকাসে অনুষ্ঠিত ন্যাম সম্মেলনে ১৯৬১ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটির প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব ছিল না। এর বদলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকতে চেয়েছেন। ২০১৪ সালের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে তার আটবার সাক্ষাত হয়েছে, ২০১৬ সালে এখন পর্যন্ত তিনবার।

মোদির পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্টভাবে অনেক বেশি গোছালো ও সিদ্ধান্তসূচক। সম্ভবত এই কারণেই তার সমর্থকেরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অনেক বেশি শক্তিপ্রদর্শনমূলক পদক্ষেপ আশা করে।

তবে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই পুরোপুরি আচ্ছন্নকারী বিষয় হচ্ছে প্রবৃদ্ধি, কিন্তু যুদ্ধ নয়; আর সেটাই গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানকে আক্রমণ করার গণদাবির প্রতি ভারত কর্ণপাত করেনি এবং তা তার কৌশলতগত স্বার্থকে ভালোভাবেই রক্ষা করেছে।

সম্প্রতি প্রভাবশালী পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮১ ভাগ ভারতীয় মোদির প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে, ৬১ ভাগ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার পদক্ষেপকে সমর্থন করে; আর ৭৩ ভাগ ভারতীয় পাকিস্তানের প্রতি বিরূপ, ৫৬ ভাগ দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার পক্ষে।

বিশ্বের বেশির ভাগই আশা করে, মোদি জরিপের সংখ্যাটির দিকে নজর দেবেন, জ্বালাময়ী বক্তৃতা বা সামাজিক মাধ্যমের প্রতি নয়।

 

 

নদী-বন ধ্বংসে আর কতো বিনাশী আয়োজন

হায়দার আকবর খান রনো ::

ফারাক্কা বাধ যখন নির্মিত হয়, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। ফলে সেদিকে নজর দেয়ার সুযোগ আমাদের হয়নি। ভারত তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সাহায্য করেছিল, তা কখনোই ভোলার নয়। কিন্তু একই সময়ে ভারত যে বাংলাদেশের জন্য এতো বড় সর্বনাশ করে চলছিল, সেদিকটি দেখার সময়-সুযোগ অবকাশ কোনটাই হয়নি আমাদের। ভারতের উচিত হয়নি, ভাটির দেশের সাথে কোন রকম সমঝোতা না করে গঙ্গা নদীর উপর বাধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার তদানীন্তন পূর্ব বাংলার (আজকের বাংলাদেশ) ভবিষ্যত স্বার্থ নিয়ে তো কখনোই মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথম বিপদের দিকটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার বিখ্যাত ফারাক্কা মার্চ বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করে তুলেছিল।

সেই জন্য মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতবিরোধী’ বলে বদনাম কুড়াতে হয়েছিল। কিন্তু জনগণের নেতা কুৎসার প্রতি কর্ণপাত না করে যা সত্য, জনগণের যা ন্যায্য দাবি তা তুলে ধরতে কখনো পিছপা হননি।

ভারত বিরোধীতার দুটো দিক আছে। একটি হলো- ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অন্ধভারত বিরোধীতা, যা পাকিস্তানি রাজনীতির সম্প্রসারণ মাত্র। ঐতিহাসিক কারণেই এই ধরনের ভারত-বিরোধীতার সাথে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি জড়িত থাকে; যা একদা মুসলিম লীগ করেছিল। জামায়াত ও বিএনপির রাজনীতিও তাই। অন্যটি হলো- ভারত একদা আমাদের স্বাধীনতার জন্য সাহায্য করেছিল বলে যে ভারতের সব অন্যায় আচরণ মেনে নিতে হবে, এ তো কোনো কাজের কথা হলো না। আমরা লক্ষ্য করছি, শাসকবর্গ ভারতের প্রতি একপেশে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে চলেছে। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং কিভাবে ঢাকায় অবস্থান করে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন সে কথা তো ফাঁস করে দিয়েছিলেন বর্তমান সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদ। এছাড়া প্রতিদিন ভারতের বিএসএফ যেভাবে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে, তা কি কোন বন্ধুত্বের লক্ষণ? বন্ধুত্ব কখনো একতরফা হয় না।

বাংলাদেশের জন্য ভারত সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর যে কাজটি করেছে তাহলো-ভাটির দেশকে বঞ্চিত করে গঙ্গা-তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানি সরিয়ে ফেলা। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তা তারা পারে না। কিন্তু গায়ের জোরে করছে। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশ সরকার মৃদুকণ্ঠেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে না।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নদীশূন্য, এমনকি পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এমন আশংকা করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তথ্য, উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

মরার উপর খাড়ার ঘা। এবার ভারত ও বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রীয় কোম্পানী মিলে সুন্দরবনও শেষ করতে চলেছে। সুন্দরবনের গা ঘেষে বাগেরহাটের রামপালে যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে উজাড় পর্যন্ত হয়ে যাবে, এমন আশংকা করেছেন বিশেষজ্ঞগণ। গণপ্রতিবাদও গড়ে উঠেছে দেশব্যাপী। কিন্তু সরকার জেদ ধরে বসে আছে, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ওখানেই করবে। ক’দিন আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা বলেছি, এতে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাতাসের তাপ বৃদ্ধি পাবে, ছাই ও কয়লার কণা বনাঞ্চলে ও নদীতে ছড়িয়ে পড়বে, পশুর নদীর পানি ব্যবহার করে তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে ইত্যাদি। এতো বড় সর্বনাশ না করার জন্য আমরা অনেক বলেছি। সরকার বলেছেন, ওসব নাকি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। তাদের উন্নত প্রযুক্তির কারণে নাকি কোনো ক্ষতিই হবে না। এমনকি সরকার একথাও বলছেন যে, রামপাল নাকি সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে। আমরা বলছি ১৪ কিলোমিটারের চেয়েও কম দূরত্বে (বাফার জোন ধরলে নয় কিলোমিটারেরও কম)। সরকার দূরত্ব নিয়েও অবান্তর কথা বলছেন।

এবার জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোও বলেছে, সুন্দরবনের নিকটস্থ রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে। এই প্রকল্প এবং মংলা বন্দরের পাশে আরেকটি প্রস্তাবিত প্রাইভেট কোম্পানীর কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে ইউনেস্কো আপত্তি জানিয়েছে। আপত্তির কারণ হিসেবে আমরা এ পর্যন্ত যে সকল কথা বলে এসেছি, সেই একই কথা তারাও বলেছেন। কারণ বিজ্ঞান তো দুই রকম হতে পারে না। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯০০ ফুট উচু চিমনি দিয়ে যে তাপ বের হবে তা বাতাসকে উত্তপ্ত করবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে নদীর পানি ব্যবহার করা হবে, তা দূষিত আকারে আবার নদীতে ফেলা হবে। প্রতিদিন অনেক জাহাজ যাতায়াত করবে। তার শব্দ দূষণ তো আছেই। তাছাড়াও নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য ৩৫ কিলোমিটার নদীপথ খনন করা হবে। এতে ৩ কোটি ২১ লাখ ঘনমিটার মাটি নদী থেকে উত্তোলন করা হবে। ফেলা হবে কোথায়? সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ গাছপালা জীববৈচিত্র দারুনভাবে হুমকির মুখে পড়বে। গত দুই বছরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেল, সার, সিমেন্ট ও কয়লাবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনার উল্লেখ করে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এতো দুর্ঘটনার পরও জাহাজ চলাফেরার ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল, তা নেয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারকে রামপাল প্রকল্প বাতিল করার জন্য আহবান জানিয়েছে। দেখা যাক, এবার সরকার কি করে?

জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। সেটি হলো- ফারাক্ক বাধ সংক্রান্ত। গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনটি বলছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুন্দরবনের নদীসমূহে মিষ্টি পানি প্রবাহ কমে গেছে। পানির স্রোতও কম। ফলে সাগরের লবণাক্ত পানি অনেক বেশি। ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনের গাছ কম জন্মাচ্ছে। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকেই অনেক বিজ্ঞানী একথা বলেছিলেন। ফারাক্কার অন্যান্য বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়টিও ছিল। তাহলে সুন্দরবন ধ্বংসের প্রক্রিয়া চার দশকের আগের থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধ্বংসের বাকি কাজটি দ্রুতই সম্পন্ন হবে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার যেন ভারতের সাথে আলোচনা করে পদ্মার পানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। আমি জানি না, সরকার সেই উদ্যোগ নেবে কি না। অন্তত অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। তারপরেও দেখা যাক, ভারত তাতে সাড়া দেবে কি না।

ফারাক্কার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গের অনেক নদী হারিয়ে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার আটটি নদী এবং বাগেরহাটের ২৩টি নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের অপরিকল্পিত সুইস গেট নির্মাণের কারণেও চলনবিলের বিভিন্ন নদনদী ও বিল জলাশয় পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে তিস্তা নদীতে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে যে বাধ দিয়েছে, তাতে উত্তরবঙ্গের বহু নদী হারিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায়, প্রমত্ত পদ্মায় ধুধু বালি। তিস্তা নদীতে পানি নেই।

প্রকৃতিকে এইভাবে হত্যা করা বড় ধরনের অপরাধ, যে কাজটি ভারত সরকার নির্বিচারে করেই চলেছে।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে একদিকে আমরা পানিশূন্য হচ্ছি, অন্যদিকে খোদ ভারতের বিহারেও ব্যাপক বন্যা হচ্ছে। ভারতের অঙ্গরাজ্য বিহারের মুখমন্ত্রী নিতিশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। হায়! একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে। একদা নাকি উগ্রভারত বিরোধীরা ফারাক্কা বাধ ভেঙ্গে ফেলার জন্য শ্লোগান  দিত। এখন স্বয়ং ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একই কথা বলছেন।

বস্তুত ইঞ্জিনিয়ারিং দিক দিয়ে ফারাক্কা একটি ব্যর্থ প্রকল্প। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য এই বাধটি নির্মাণ করা হয়েছিল; কিন্তু তা সফল হয়নি। এখন এটাকে ভেঙ্গে ফেলা ও বন্ধ করাই উত্তম হবে। বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের জনগণের স্বার্থে, কল্যানে। পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলাই উচিত, এটা হচ্ছে আধুনিক চিন্তা। পরিবেশকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু পরিবেশের উপর জবরদস্তি করতে গেলে ফল খারাপ হবে। এই উপলব্ধি কি ভারত-বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের আছে?