Home » প্রচ্ছদ কথা (page 12)

প্রচ্ছদ কথা

আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা কতোটুকু

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন কি সমাগত এবং সেটি কি ২০১৭ সালের শেষার্ধে অনুষ্ঠিত হবে? এরকম একটি সম্ভাবনাময় আলোচনা যখন বাতাসে ভাসমান অবস্থায়, ঠিক তখনই নিউইয়র্ক সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোন মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়। যদিও সরকারের নীতি-নির্ধারকরা আকছার বলে আসছেন, ২০১৯-এর আগে কোন নির্বাচন নয়। এমনকি সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধরকরাও ওরকমটিই বলে আসছেন।

কিন্ত সরকার মুখে যাই বলুক একটি আগাম নির্বাচনের বিষয় তাদের ভেতরে ভেতরে আলোচিত হচ্ছে এরকম আভাস একাধিকবার পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা যতগুলি জনসভা করেছেন, সেখানেই তার সরকারের সাফল্য তুলে ধরে নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাইছেন। যদি মেয়াদ শেষেই নির্বাচন হয়, তাহলে স্বয়ং দলীয় প্রধান এখনই কেন এত গুরুত্ব সহকারে ভোট চাইছেন? নাকি এটি রুটিন প্রচারের অংশ?

২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় বলা হয়েছিল এটি ‘নিয়ম রক্ষার’। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে পরবর্তীকালে আন্দোলনের মাঠ ত্যাগ করায়, বলা যায় নাশকতা পরিত্যাগ করে ‘ক্ষ্যামা’ দিলে সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন বা এধরণের যে কোন আলোচনা থেকে সরে আসে। কারণ আলোচনায় বসিয়ে বা আন্দোলনের পথে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করার সকল অবস্থানই দলটি হারিয়ে ফেলতে থাকে বিএনপি নেতৃত্বের অযোগ্যতার কারণে। বিএনপির সীমাহীন ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের কূটকৌশল ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এবং সক্ষমতায় রাজনীতির গতিপথ সরকারের হাতেই ন্যস্ত হয়ে যায়।

২০১৪ সালের নির্বাচনকে নানাভাবে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা স্বত্ত্বেও ক্ষমতাসীনরা খুব ভালভাবেই জানে যে, সেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে  এখন পর্যন্ত গ্রহনীয় হয়নি এবং একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের ওপর তাগাদা রয়েছে। তবে হাতেগোনা দু’একটি দেশের সমর্থণ সরকারকে এ বিষয়ে অনেকটা নির্ভার রেখেছে। একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারেরও আগ্রহ রয়েছে এবং সেজন্য একটি সুবিধেজনক সময় তারা বের করতে চাইছে, যার ওপর তাদের থাকবে একক নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে, আগামী বছর নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেখার বিষয় হচ্ছে, এটি কি হবে একটি অনুগত কমিশন, নাকি সত্যিকারের স্বাধীন এবং শক্তিশালী কমিশন?

তবে, সরকার না চাইলে ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। হিসেব মত ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। মেয়াদ শেষের আগেই নির্বাচন প্রস্তুতির মধ্যে ক্ষমতাহীনদের কিছু লক্ষ্যভেদী কৌশল রয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের পরে আগামী নির্বাচন কৌশল অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠবে। সম্মেলনে নতুন আঙ্গিকে ঘোষণাপত্র পেশ করা হলে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দলীয় কৌশল ও দিক-নির্দেশনাগুলি অনুধাবন করা যাবে।

গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ সদস্যদের এলাকায় গিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পরবর্তী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের সম্ভাব্য তালিকা তৈরীর জন্য মাঠ পর্যায়ে খোঁজ-খবর করতে একাধিক সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বহুকাল আগে থেকে সরকারী প্রার্থী দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরন করা হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি আসনে অন্তত: পাঁচ জনের একটি তালিকা তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদেশী একটি জরিপ প্রতিষ্ঠানকে মাঠের অবস্থা জরিপ করে প্রতিবেদন তৈরীর দায়িত্বও দেয়া হয়েছে।

নির্বাচন ঘোষিত হলে এড়িয়ে যাবার কোন উপায় বিএনপির নেই। দলটির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহনের কোন বিকল্প নেই। তাদের বহুল কথিত “আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন বা সরকারকে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে বাধ্য করা’’-র কোন অবস্থায় ও অবস্থানে তারা নেই, অন্তত: ২০১৪-এর অভিজ্ঞতায়। ২০১৩-১৫ সালে আন্দোলন ও নাশকতা এবং এর পরিনাম বিএনপিকে বুঝিয়ে দিয়েছে রাজনীতির মূলধারায় টিকতে হলে নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। তাছাড়া এই মূহুর্তে বিএনপি সামান্য দর কষাকষির অবস্থানেও নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, খালেদা জিয়া, তারেক ও তাদের অনুগত কয়েক নেতাকে ছাড়াই তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা,  তারেকসহ অনুগতদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলির বিচার ২০১৭ সালের মধ্যে নিস্পন্ন হতে যাচ্ছে। মামলাগুলোয় সাজা হলে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিষয়টি পুরোপুরি আইনী জটিলতা ও আইনী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এরকম পরিস্থিতির সবরকম সুবিধে নেয়ার জন্য সরকার তৈরী আছে এবং এজন্যই আগামী নির্বাচনটি হবে তাদের অধীনে মেয়াদ শেষে বা সুবিধেজনক কোন সময়ে।

বিএনপির অপর চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, নির্বাচন হবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। মুখে বিএনপি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলছে বটে, কিন্তু দাবি আদায়ে তাদের কোন অঙ্গীকার বা সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। এটি বিএনপিও যেমন বোঝে, সরকারও তেমনি জানে। ফলে নির্বাচন হলে তাদের অংশ নিতে হবে। অংশ নিয়ে তাদের বক্তব্যের যথার্থতা প্রমান করতে হবে যে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকার ন্যূনতম নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম নয়। গত ইউপি নির্বাচন এর বড় উদাহরন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মত্ত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা কিছুটা অতীতকেন্দ্রীক নীতিগত ও আদর্শিক দ্বন্দ, তবে প্রায় সবটাই ক্ষমতার। রাজনৈতিক খেলায় গত আট বছর বিএনপি প্রায় পর্যদুস্ত ও বিপর্যস্ত। আর এই খেলায় ক্ষমতাসীনদের সফল করতে বিএনপির আত্মঘাতী প্রবণতা অনেকটা সহযোগিতা করেছে। সামরিক ছাউনিতে জন্ম নেয়া দলটি আশির দশকে মধ্যপন্থায় সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হলেও গত দু”দশকে তৈরী হয়েছে চরম ডানপন্থার ঝোঁক। এরপরেও দলটি সম্বিত ফিরে পায়নি। দল গোছানোর প্রচেষ্টায় গত কাউন্সিলের কথিত পুণর্গঠন এর সবচেয়ে বড় প্রমান।

এই আত্মঘাতী রাজনীতি সরকারের জন্য সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। নমুনা হচ্ছে, সারাদেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সাড়ে বাইশ হাজারেরও বেশি। খালেদা জিয়াসহ ১৫৮ নেতার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে সাড়ে চার হাজার। এর অনেকগুলি মামলাই বিচার প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যায়ে। এর পরিনতিই বলে দেবে, এসব মামলায় খালেদা, তারেকসহ নেতাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। আইনী প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলার বদলে তারেক আপাতত: প্রবাসেই থাকছেন-এটি নিশ্চিত।

সরকারের উৎসাহ ও সাম্প্রতিক প্রবণতায় মনে হচ্ছে, এ মূহুর্তে খালেদা ও তারেকের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পেতে উদগ্রীব। এক্ষেত্রে বিএনপির অভিযোগ, দলের দুই শীর্ষ নেতাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের আচরন ও পদক্ষেপ এই অভিযোগকে উস্কে দেয় এবং বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়ে একটি নির্বাচন আয়োজনের আভাস মেলে। এরকম সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে নির্বাচন হলে পুনরায় ক্ষমতাসীন হতে সরকারের আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই।

একটি জাতীয় নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অব্যাহত চাপ ও আগ্রহ এবং তাদের লবি’র স্বক্রিয়তা সরকারকে কিছুকাল আগেও সমঝে চলতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জঙ্গী তৎপরতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের আপাত: সাফল্য দেখিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চাপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা সরকারকে স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতামত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছাড়া জঙ্গীবাদ দমন সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঢাকায় এসে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক  রাজনীতির ট্রেন্ড দেখে মনে হচ্ছে, সরকার রাজনীতিতে বিএনপিকে কিছুটা স্পেস দিলেও মামলা, গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

টিভি টক শো’গুলিতে সরকারপক্ষীয় বুদ্ধিজীবিরা যাই বলুন না কেন, সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ও বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির রিপোর্ট সরকারের জন্য মোটেই স্বস্তিকর নয়। সবকিছু উপেক্ষা করে, চাপ কাটিয়ে ২০১৮ সালের নির্বাচন এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় প্যাশন। ক্ষমতাসীনদের বড় স্বপ্ন ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী উদযাপনে। এটি নিশ্চিত করতে সরকার নির্বাচনে জিততে যে কোন কৌশল গ্রহন করতে পারে-এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

নির্বাচনে জেতার সামগ্রিক ক্ষেত্র তৈরী করার জন্য সরকারের কিছু পদক্ষেপ আগামীতে আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে। গ্রামীন জনপদে বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিগুলিকে দেয়া হচ্ছে অলিখিত নির্দেশ। একনেক সভায় পাশ করা হচ্ছে মেগা সাইজের সব প্রকল্প এবং এসব অবকাঠামোর উদ্বোধন ও সুপারসনিক গতিতে এগুলো বাস্তবায়নে সরকার আগ্রহী। এসব প্রকল্প নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়গুলো দেখেও না দেখার ভান করছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প নির্বাচনের আগেই সরকার শেষ করতে চায় এবং আগামী নির্বাচনে এই সেতুর বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম নির্বাচনী ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মূলত: গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়াকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন কাজকে দৃশ্যমান করে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনী বৈতরনী পাড় হতে চায়। এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বিএনপিকে সামাল দিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের পাশাপাশি ভাঙ্গন আনার জন্য সবরকম প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

বিএনপির মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বহুভাবে। একটি হচ্ছে, ভিন্নমাত্রার চাপ, অন্যটি হচ্ছে, নানারকমের প্রলোভন দেখিয়ে, মামলা-হামলার মাধ্যমে কাবু করে। এ লাইনে কিছুটা সাফল্য অর্জন করা গেলেও মূলধারার বিএনপির গায়ে এখনও খুব একটা আঁচড় কাটা যায়নি। বহিস্কৃত বিএনপি নেতা ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত তৃণমূল বিএনপির কার্যক্রমে সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকছে। ২০ দলীয় জোট থেকে নামসর্বস্ব দলগুলোকে বের করে নিয়ে আলাদা একটি প্লাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বিএনপির একটি অভিযোগের বাস্তবতা রয়েছে যে, সরকার হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে, যাতে বিএনপি আবারও নির্বাচনে অংশ না নিতে পারে।

দশম সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জনগন নির্ভর ছিলেন না। তার আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি নির্বাচনে ভরাডুবির পর সংসদ নির্বাচনে কি ঘটতে পারে সে মেসেজ তো তারা আগাম পেয়ে গিয়েছিলেন। ফলে প্রশাসন ও বাহিনী নির্ভর ঐ নির্বাচন অনুষ্ঠান জানিয়ে দিয়েছিল সরকার কতটা নির্ভরশীল প্রশাসনযন্ত্রের ওপর। এই নির্ভরতা অনিবার্যভাবে ক্ষমতাসীনদের যে চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য তেমন কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিও তাদের নেই। বিপরীতে বিএনপির অবস্থা আরো শোচনীয় এবং তারা রাজনীতির মূলধারায় ফিরতে ক্রমাগত যুজতে হচ্ছে নিজেদের ও ক্ষমতাসীনদের সাথে।

টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ভিত এখন অত্যন্ত সূদৃঢ়। রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন তাদের হাতে। এই দলকে ঘিরে বিশাল একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠি দাঁড়িয়ে গেছে। অপরিমেয় অর্থ-বিত্তের মালিক এই গোষ্ঠি। এদের সুফল প্রাপ্তি অব্যাহত ও নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ক্ষমতার সবুজ মাঠের দিকে। সেজন্যই আগামী জাতীয় নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তারা।

মেয়াদ পূর্ণ হবার আগে বেশ কয়েকবার গুজব সৃষ্টি হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোন ঝুঁকি নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। এজন্য তারা অপেক্ষা করে আছে খালেদা জিয়া, তারেকসহ বিএনপির প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার ফলাফলের ওপর। ঐ সকল মামলার বিএনপির প্রধান নেতৃত্ব দন্ডিত হলে নির্বাচনে যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, নয়া নির্বাচন কমিশন গঠিত সার্চ কমিটির বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহাবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, তারা ‘আজিজ’ মার্কা নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন না। সম্ভবত: তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এবারেও ‘কাজী রকিব উদ্দীন’ মার্কা কমিশনই গঠিত হবে, কিম্বা তার চেয়েও বেশি…!

২০১৫ সালেই যুদ্ধ-ব্যয় ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার, কিন্তু শান্তিতে?

ক্যামিলা স্কিপা ::

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল পিস ইনডেক্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালটি ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুাকপূর্ন ও খারাপ একটি খারাপ বছর। ঐতিহাসিক প্রবণতা অনুযায়ী, বৈশ্বিক শান্তি আরো নাজুক অবস্থায় পড়েছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে ২০১৫ সালেই বৈশ্বিক যুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ভয়াবহ মাত্রায় সন্ত্রাস দেখা গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত বছরই সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত লোক দেখা গেছে।

এই সহিংসতার মূল্য বিপুল। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ক্রয় ক্ষমতা মানদন্ডে (পিপিপি) ২০১৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য দিনে ৫ ডলারের সমান, কিংবা বৈশ্বিক বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) আয়তনের ১১ গুণ।

সহিংসতার ক্ষতি আসলে হিসাব করা উচিত মানবীয় ও আবেগগত মানদন্ডে। অবশ্য অর্থনীতিতে ক্ষতির হিসাবটাও বিবেচনায় আনা দরকার। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের সময় সহিংসতা প্রতিরোধ ও সংযত করার ব্যয় এবং সেইসাথে এর পরিণতিও পরিমাপ করা দরকার। এই বিবেচনাটা খুবই দরকার। কারণ সহিংসতা সংযত রাখতে ব্যয় করাটা দরকারি হলেও এটা অর্থনৈতিকভাবে মূলত অনুৎপাদনশীল।

সহিংসতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধে এবং এর পরিণামে যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে, সেটা পরিমাপ করার একটি পদ্ধতি হলো ‘আইইপি’ পদ্ধতি। এতে কেবল সামরিক ব্যয়ই হিসাব করা হয় না, বরং সেইসাথে নিরাপত্তা ও পুলিশের পেছনে অভ্যন্তরীণ ব্যয় এবং সশস্ত্র সংঘাত, নরহত্যা, সহিংস অপরাধ এবং যৌন নিপীড়নে ক্ষয়ক্ষতিও বিবেচনায় আনা হয়।

১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় ও ক্ষতি বিশ্ব জিডিপির ১৩.৩ ভাগের সমান। এই টাকাটা এই দুনিয়ার সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে চাইলে প্রতিটি লোক পাবে ১,৮৭৬ ডলার করে।  এই হিসাব করাটা দুটি কারণে খুবই দরকার। প্রথমত, এই ব্যয়ের ৭০ ভাগের বেশি করে সরকার তার সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায়; অর্থাৎ সরকারি ব্যয়ের বড় অংশটাই যাচ্ছে এই খাতে। বিশ্ব যদি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ হয়, তবে এই বিপুল সম্পদ অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ত, সহিংসতা ও সংঘাত অবসানের পরও যে ক্ষতিটা বিরাজ করতে থাকে, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ। তাতেও কিন্তু বিপুল খরচ হতে থাকে।

একটু নজর বুলালেই দেখা যাবে, সহিংসতা সৃষ্টি এবং সেটা থামানোর জন্য বিশ্ব অব্যাহতভাবে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় শান্তির পেছনে খরচ করছে অতি সামান্য। কেবল ২০১৫ সালেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কাজে ব্যয় হয়েছে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার; যা সশস্ত্র সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হওয়া ৭৪২ বিলিয়ন ডলারের মাত্র ১.১ ভাগ। দীর্ঘ মেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করছে, তাদের দরকার ৬.৮ বিলিয়ন ডলার, যা সংঘাতের ফলে অর্থনৈতিকভাবে যে ক্ষতি হচ্ছে তার মাত্র ০.৯ ভাগ।

ভবিষ্যত যাতে শান্তিপূর্ণ হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিরক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ।

বর্তমানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমগুলোর লক্ষ্য মূলত সংঘাত সৃষ্টি হলে সেটা থামানোর চেষ্টা করা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে চাইলে প্রয়োজন সংঘাত যাতে সৃষ্টিই না হয়, সেটার ব্যবস্থা করাই সবার আগে জরুরী।

শান্তি প্রতিষ্ঠা মিশনের লক্ষ্য হবে- সহিংস সংঘাত প্রতিরোধে জাতীয় সামর্থ্য জোরদার করা, এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা- যেগুলো টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে।

কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সহিংসতার পেছনে ব্যয় করছে বিপুল অর্থ, শান্তিতে খুবই সামান্য। অবশ্য, এ কারণেই শান্তির পেছনে ব্যয় বাড়ানোর অর্থনৈতিক যুক্তিও প্রবল হয়ে ওঠছে।

কোনো কোনো দেশে আরো শান্তির দাবি জোরদার হতে থাকলেও এবং তারা শান্তির চেষ্টা বাড়াতে থাকলেও সার্বিকভাবে বিশ্বজুড়ে সহিংসতা বাড়ছে। এতে করে দেশগুলোর মধ্যে আরো বেশি বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। কম শান্তিপূর্ণ দেশগুলো বেশি বেশি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে তারা আরো বেশি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ছে।

(লেখক- পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পিস।)

কর দেয়না কোটিপতিরা : চাপে স্বল্প আয়ের মানুষ

সরকারি হিসাবেই দেশে সোয়া লাখ কোটিপতি

এম. জাকির হোসেন খান ::

ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ কর ভারে নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত বা স্বল্প মানুষের আয়ের ওপর ব্যাপকমাত্রায় করারোপের কথা জানান দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৬ হাজার টাকা মাসিক আয় হলেই তাকে কর দিতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ অসম কর ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অনৈতিকভাবে উপার্জনের সুযোগ বন্ধ করার নির্দেশনার বিপরীত। উল্লেখ্য, গত জুন মাসেই ৩ লাখ টাকার বেশি আছে এমন ব্যাংক হিসাবগুলোকে করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০১৫ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন হিসাবের সংখ্যা সংখ্যা ৩১ লাখ ৮০ হাজার যার মধ্যে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান দুই’ই আছে। সঞ্চয়ী  হিসাবের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি, যার অধিকাংশ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং স্বল্প সংখ্যক উচ্চ মধ্যবিত্ত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দাড়ায়, আসলে যারা বৈধ এবং অবৈধভাবে কোটিপতি হয়েছে তারা কি ঠিকমতো কর দেয়? এনবিআর কি তাদেরকে করের আওতায় আনতে পেরেছে বা এমন কোন উদ্যোগ কী আছে?

ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে কিংবা চাকরিজীবিদের বেতনের ওপর উৎসে করারোপের মাধ্যমে এনবিআর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করছে। অর্থ বিল ২০১২ অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো ট্যাক্সপেয়ার্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) আছে এমন আমানতকারীদের থেকে ১০ শতাংশহারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। যাদের টিআইএন নেই তাদের মুনাফায় ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে জানান, গত ৭ বছরে দেশে বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবধারীদের  সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব ছিলো, ২০১৩ সালে ৯৮ হাজার ৫৯১টি, ২০১২ সালে ৯০ হাজার ৬৫৫টি এবং ২০১১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার ১৫০টি। কিন্তু ওই সংখ্যার মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যার হিসাব সংখ্যা একশ’রও বেশি। তাই ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা রয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কোটিপতির সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।

২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি উদ্যোগে এক কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে, এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিলো ৩৭ হাজার ১৭৭টি এবং মোট জমার পরিমাণ ছিলো এক লাখ ৫৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা ৩১ হাজার ৪২টি। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব তিন হাজার ৬৮৭টি, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার হিসাব আছে এক হাজার ৮৯টি। আর ৫০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক ছিল ২৪৮টি। তবে বেসরকারি হিসাবে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত প্রায় আড়াই লাখ কোটিপতি রয়েছে বাংলাদেশে। অথচ ১৯৭৫ সালে কোটি টাকার বেশি অর্থ আছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭টি।

বাস্তবে কোটিপতিদের উপার্জনের তুলনায় কর দাতার সংখ্যা রীতিমত হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে ১ কোটি টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন করদাতা। ২০১৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিলো ৫ হাজারের কিছু বেশি, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন, ২০১১ করবর্ষে সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী চূড়ান্ত হিসাবে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে এমন করদাতার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩০৩ জন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, বাঁকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার হিসাব বা সংশ্লিষ্ট কোটিপতিরা কেন এখনো কর আওতার বাইরে? এসব কোটিপতির সম্পর্কে কোনো তথ্য কি এনবিআর এর কাছে নেই? একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন করদানে সক্ষম মানুষ প্রায় ৯৬ লাখ। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে মাত্র ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯৪ জন করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। এর বিপরীতে আয়কর জমা পড়ে ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। শুধু কোটিপতি নয় প্রজাতন্ত্রের বা সরকারি কাজে নিয়োজিত ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর  মধ্যে প্রায় তিন লাখ কর্মকর্তা বৈধভাবে করযোগ্য অর্থ উপার্জন করলেও আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৬৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার। অর্থাৎ আয়কর রিটার্ন জমা দেন না ৭৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ব্যক্তি করদাতার সংখ্যা মাত্র ১০ লাখ।

কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই এনবিআর-এর অভিযানের প্রেক্ষিতে ল্যান্ড রোভার, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোটি কোটি টাকার গাড়ি রাস্তার পাশে আনাচে কানাচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোটি টাকার ওপরে (আমদানি শুল্কসহ) দাম এমন প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ি নিবন্ধিত আছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে। এর বাইরেও অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে অন্তত ৩০০ গাড়ি। বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ৪৯ হাজার বিলাসবহুল গাড়ির যে নিবন্ধন আছে তার মধ্যে মার্সিডিজ বেঞ্জই প্রায় ২৫ হাজার। একেকটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ও লেক্সাস গাড়ি কিনতে খরচ পড়ে গড়ে চার কোটি টাকা, বিএমডব্লিউ ও ল্যান্ড রোভার কিনতে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে। প্রশ্ন হলো- প্রায় ৪৯ হাজার গাড়ির মালিকও যদি কর দেয় তাহলে কোটিপতি করদাতার সংখ্যা মাত্র ৬ হাজারের বেশি হয় কিভাবে? শুধু তাই নয়, রিহ্যাব সূত্র অনুযায়ী, ধানমন্ডি, গুলশান এবং বনানীতে ফ্ল্যাটের মূল্য প্রতি বর্গফুট গড়ে ১৫ থেকে ২২ হাজার টাকা। সে হিসাবে এসব এলাকায় একেকটি মধ্যম মানের ফ্লাটের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। কয়েক হাজার প্লাট মালিকের মধ্যে কতজন ঠিকমতো কর দেয়?

কর প্রদানে কোটিপতিদের এ অনীহা নতুন কিছু নয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান এর মতে, এটা অপ্রত্যাশিত যে, এত কম সংখ্যক ব্যক্তি কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন। যতই দিন যাচ্ছে, কোটিপতিদের কাছ থেকে কর আদায় করা ততই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিয়ে কোটিপতিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ এনবিআরের গ্রহণ করা উচিত। এরপর তাদের যথাযথ আইনের আওতায় আনা উচিত। তা না হলে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে না। উল্লেখ্য, উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কর রাজস্ব এবং জিডিপি অনুপাত ৩৩.৮ শতাংশ থেকে ৩৩.৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে এ হার ৮%-১২% হলে ও বাংলাদেশের কর রাজস্ব অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশে নিম্ন রাজস্ব আয়ের প্রধান কারণ ব্যাপক কর ফাঁকি। গোপন বা অনৈতিক উৎস হতে উপার্জনের অবারিত সুযোগ থাকায় রাজস্ব  আয়ের ঘাটতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কালো অর্থনীতির সুযোগ বাড়ছে এবং সর্বোপরি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন নয়, করারোপ নীতি এবং কর ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত সময়কালে মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় হয় মাত্র ১,৪৫৫ কোটি টাকা, যা এনবিআরের ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সংশোধিত সর্বমোট রাজস্ব করের মাত্র ১.১৬ শতাংশ। এ ব্যবস্থা চলমান থাকায় অবৈধ অর্থ উপার্জন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পাচ্ছে। আর কর ফাঁকি দিয়ে উপার্জিত অবৈধ অর্থ বিদেশে কর-স্বর্গ বলে পরিচিত দেশসমূহে পাঁচার করে তা আবার দেশে নিয়ে আসলেও এনবিআর বা দুদক এসব অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে পারেনি বা চায়নি। উল্টো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রুই-কাতলাদের নির্বিচারে সততার সনদ দিয়েছে দুদক। উল্লেখ্য, এনবিআর সুত্রে জানা যায়, করস্বর্গ বলে খ্যাত বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, কেমান আইল্যান্ড, মরিশাস, পানামা, মাল্টা, ফিলিপাইনসহ বিভিন্নস্থানে বাংলাদেশীদের অবৈধ অর্থ পাচার হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটস বাজেট এবং পলিসি সেন্টার এর কূর্ট ওয়াইজ এবং নোয়াহ এর মতে, ‘করারোপে’র উল্লম্বন সমতা’র আওতায় নাগরিকের ওপর করারোপের ক্ষেত্রে কর প্রদানের সক্ষমতাকে বিবেচনা করার কথা এবং যার আওতায় নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় ধনীরা তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রদানের কথা’। এ প্রেক্ষিতে কর ব্যবস্থাকে সুষম এবং দারিদ্র-বান্ধব করে তোলার প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনবিআর এর সমন্বয়ে কোটিপতিদের করের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে দেশের প্রচলিত কর আইন সংশোধন করা; পরোক্ষ কর পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান বৃদ্ধি করে কর নীতিমালা দরিদ্রবান্ধব ও কর কাঠামো অধিকতর প্রগতিশীল করা; অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাতকে মূল্য সংযোজন করের আওতামুক্ত রাখা; আয়-বৈষম্য এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে (ব্যক্তি এবং কর্পোরেট দেশীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পসহ) আয়স্তর, আয়কর হার নির্ধারণ; ব্যক্তির টিআইএন, জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্টের নম্বর এবং কর প্রদান সংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ডাটাবেজের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা করা; একটি ন্যুনতম সীমার উর্দ্ধে সকল লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা প্রদান করা; সকল বৈধ টিআইএনধারীর নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করা; এবং সর্বেপারি সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ অটোমেশন এবং কার্যকর ই-গভর্নেন্স নিশ্চিত করা; কর ন্যায়পালের পদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করতে এনবিআরকে আইনী ক্ষমতা দেয়া জরুরি।

দুইদেশের বন্ধুত্বের কাঁটা : রামপাল থেকে ফারাক্কা

আনু মুহাম্মদ ::

যা মানুষকে কঠিন বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করছে, যে ক্ষতিপূরণ করা কখনোই সম্ভব নয়, যে ক্ষতি বহন করা মানুষের পক্ষে দু:সাধ্য সেই ক্ষতি নিয়েও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের হাসিঠাট্টা মিশ্রিত ‘কোনো ক্ষতি হয়নি’ ‘কিংবা হবে না’ শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত। তাঁরা তাঁদের দিক থেকে যে খুব অসত্য বলছেন তাও নয়, কেননা ক্ষতি তো তাদের হয়ইনি, হবেও না কোনোদিন। তাঁরা মানুষ ও জনপদের অপরিসীম ক্ষতি করেন, লাভবান হন এবং তারপর চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রথমে একটি বাঁধের কথা বলি। গত শতকের ৬০ দশকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর ওপর যখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ চলছিলো তখনই এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞও দীর্ঘমেয়াদে এই বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েই উচ্চকন্ঠ ছিলেন। কিন্তু এর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তা চালু হয়। এই বাঁধের কারণে এতো বছরে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে, বাংলাদেশের প্রধান একটি নদীর পানি প্রবাহ ভয়াবহ মাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তার ফলে এরসাথে সংযুক্ত আরও ছোটবড় নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল বহুমাত্রিক বিপর্যয়, শুধু যে এসব নদীর অববাহিকায় জীবন, জীবিকা, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই নয় প্রতিবেশগত ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়ে জীবনমান স্বাস্থ্য প্রাণবৈচিত্রও বিপদাপন্ন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য বের করা কঠিন। এই ফারাক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে নেমে আসা আরও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, আরও পরিকল্পনাধীন আছে। এর ওপর ‘নদী সংযোগ পরিকল্পনা’ নামে যে ভয়াবহ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত তা পুরা অঞ্চলে নদী ও নদীনির্ভর জীবন ও অর্থনীতির ওপর মরণ আঘাত দিতে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ওপর সম্পর্কিত সকল দেশের মানুষের অধিকার অস্বীকার করেই ভারত একের পর এক এসব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নিচ্ছে। আন্তজার্তিক পানি কনভেনশন অনুযায়ী এসব তৎপরতা অবৈধ, এবং বাংলাদেশের সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য ভারত দায় নিতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এর সুরাহা করবে কি, তার নিজের উন্নয়ন মডেলেই যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল ও দূষণ দিয়ে নদীর বাকি অস্তিত্বের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

নদীর ওপর যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণের সুবিধাভোগী বিশ্ব জোড়া নির্মাণ কোম্পানি, কনসালট্যান্ট, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের জোট গত শতকের শেষ কয়েক দশকে বিশ্বের বহুদেশে বন্যানিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সবুজ বিপ্লবের  নামে নদী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এসব কর্মসূচি নিয়েছে। এর বিরূপ ফলাফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ভাটার দেশগুলো যে বড় বিপর্যয়ের সামনে পতিত হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত বিশ্ব জোড়া। উজানের দেশগুলোতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সে কারণে জোরজবরদস্তি করে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশের মতামত ও অধিকারের তোয়াক্কা না করে যে বাঁধ চালু করেছে, শুকনো মৌসুমে পানি আটকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে ভেবেছে এতে ভাটির দেশের ক্ষতি হলে কি- ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, ঘটনা তা ঘটেনি। বরং ভারতের দিকে নতুন নতুন সমস্যা ক্রমে জমে এখন ভয়াল আকার ধারণ করেছে। এর শিকার হচ্ছে অনেক এলাকা, বিহার তার অন্যতম, এই বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিহারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এই বছরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলতে। এই দাবি বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের। কিন্তু ভারত পন্থী ও ভারত বিরোধিতার নামে পরিচালিত রাজনীতির দুষ্টচক্রের কারণে বাংলাদেশে এনিয়ে সুস্থ আলোচনা হয়না কখনো। কিন্তু সর্বসাধারণের মনের মধ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ আছে। বরাবর ভারত এটি উপেক্ষা করতে চেয়েছে ‘এগুলো নিছক ভারত বিদ্বেষী রাজনীতি’ এই আওয়াজ দিয়ে।

ফারাক্কার জন্য ক্ষতি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার প্রমাণ সুন্দরবন। সুন্দরবন যেসব নদী ও শাখানদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল সেই নদীগুলো আবার গঙ্গা-পদ্মার পানি প্রবাহের সাথে সংযুক্ত। ফারাক্কা কাজ শুরুর পর থেকে নদীগুলোর রুগ্নতাপ্রাপ্তিতে তাই সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সুন্দরবনে বিপরীত থেকে সমুদ্রের নোনাপানির প্রবাহ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে যায়। এক গবেষণার ফলাফলে তাই দেখা যায়, ‘গঙ্গা নদীর মিঠা পানি গড়াই হয়ে পশুর নদ ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হয়। ফারাক্কা বাঁধের পর পানি প্রবাহ কমে গেছে।.. মিঠা পানির প্রবাহ কম থাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে বনের মধ্যে। এ কারণে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারছে না। ..বাঁধ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘনমিটার পলিযুক্ত মিঠা পানি গ্রহণ করেছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘনমিটার পানি প্রবাহ প্রয়োজন। কম পানি প্রবাহ থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি বনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরীগাছের বেঁচে থাকা কঠিন।’ (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি সুন্দরবনকে অনেকদিক থেকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশের জন্য শুধু নয় ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী প্রবাহ এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা বা দায়বদ্ধতা যদি দুদেশের সরকারের থাকতো তাহলেও ফারাক্কা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও নতুন চিন্তা দেখা যেতো। কিন্তু তা না থাকার ফলে দশকের পর দশক ফারাক্কা প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি করে গেছে। সুন্দরবনকে এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা না করে, একই দৃষ্টিভঙ্গীর দাপটে, বরং এর ওপর মরণ কামড় দেবার প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, সেটি হলো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর প্রধান উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ভারতের এনটিপিসি, এই কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারতের একটি কোম্পানি, এর জন্য ঋণ যোগান দেবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক (এরজন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ সরকার) এবং সব লক্ষণ বলছে কয়লাযোগান দেবে ভারতের কয়লা কোম্পানি। তারমানে কাগজেপত্রে ৫০:৫০ মালিকানা ও মুনাফা দেখানো হলেও বিনিয়োগ, নানাকিছু বিক্রি, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সবকিছুতেই ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির লাভ। বিপরীতে বাংলাদেশের শুধুই ক্ষতি, সুন্দরবন হারানোর মতো অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি, বহুলক্ষ মানুষের জীবনজীবিকার ক্ষতি, কয়েককোটি মানুষের জীবন নিরাপত্তার ঝুঁকি, তারপরও ঘাড়ে ঋণ আর আর্থিক বোঝা। কিন্তু ক্ষতি কি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? না। প্রকৃতি অবিচ্ছিন্ন, সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে তার সর্বনাশ আসা ঠেকানো যায় না। সেজন্য সুন্দরবন বাংলাদেশ অংশে বিপর্যস্ত হলে ভারতের অংশের সুন্দরবনও তার থেকে বাঁচবে না। তাই কলকাতায় সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের বিরুদ্ধে এক সমাবেশে সংহতি জানাতে এসেছিলেন সেই এলাকার কয়েকজন অধিবাসী। তাঁদের একজন আমাকে বললেন, ‘আমরা ঐ এলাকায় ৫০ লক্ষ মানুষ বসবাস করি। সুন্দরবনের ক্ষতি হলে আমাদের সর্বনাশ। তাই আমরাও এই লড়াই-এ আছি।’

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সবসময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে বহুবিধ কারণে। এগুলো মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, কেননা ভারতের শাসকগোষ্ঠী একের পর এক বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক কিংবা ক্ষতিকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফারাক্কা এর একটি, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী সংযোগ পরিকল্পনা, অবিরাম সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের সীমান্ত, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ঋণ দিয়ে বেশি দামে জিনিষপত্র কিনতে বাধ্য করা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, তারপরও মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে।

পুরনো উন্নয়ন মডেলে নদীসহ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্বকেই মানুষের ক্ষমতা আর উন্নয়নের প্রদর্শনী ভাবা হতো, এখন তার পরিণাম যতো স্পষ্ট হচ্ছে ততোই ভুল সংশোধনের পথ খুঁজছে মানুষ। এমনকি বাঁধ ভেঙে হলেও নদীকে স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, প্রকৃতির সাথে সমন্বয় করে উন্নয়ন চিন্তা ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশকেও সেই পথই ধরতে হবে। ততোদিন অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না, সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা যাবেনা। ফলে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ চিরস্থায়ী শত্রুতার বোধে পরিণত হবে। বন্ধুত্ব নাম দিয়ে তৈরি কোম্পানি হবে শত্রুতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যম।

আমরা চাই না এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। ‘কোনো ক্ষতি হয়নি, কোনো ক্ষতি হবে না’ প্রলাপ দিয়ে সত্য আড়াল করা যাবে না। সেজন্য আমরা চাই দুইদেশের দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বের স্বার্থেই বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার দ্রুত এই প্রকল্প থেকে সরে আসবেন। আমরা এখনও আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুইদেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, বন্ধুত্ব হবে প্রকৃতই পরস্পরের বিকাশমুখি। দুইদেশের সজাগ মানুষ জনপন্থী উন্নয়নের ধারার জন্য যৌথ চিন্তা ও লড়াই শক্তিশালী করলে নিশ্চয়ই দুইদেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধুত্বেরভিত শক্তিশালী হবে।

খেলাপি ঋণ : তিন মাসের ব্যবধানেই ৪ হাজার কোটি টাকা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন ::

খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। অব্যবস্থাপনা ও  ঋণের কারণে প্রতি মাসেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের বিশাল অংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত। এতে ব্যাংকিং শৃংখলা আরও ভেঙে পড়তে পারে। তারা আরও বলছেন, কিছু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই দুর্নীতি এবং অনিয়মের সাথে যুক্ত। এদের যোগসাজশে ঋণ দেয়া হয়। যার কারণে ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে খেলাপিতে রূপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে জুন পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা; যা মোট ঋণ বিতরণের ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ। গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই। জুন প্রান্তিকে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ২৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ স্বাভাবিকভাবে সামান্য কিছুমাত্রায় বিশ্বের সর্বত্র দেখা যায়। কারণ ব্যাংকিং একটি ব্যবসা। অন্য যে কোনো ব্যবসার মতো ব্যাংকিং ব্যবসাতেও সামান্য ক্ষতি হতে পারে। উন্নত বিশ্বের হিসাব মতে একটি ব্যাংকে শতকরা ১ ভাগ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ হতে পারে। এর পরিমাণ কখনও বেড়ে গিয়ে ২ শতাংশ হলে ব্যাংক সতর্কতা অবলম্বন করে। উল্লেখ্য, ব্যাংক ঋণের ওপরে যে মুনাফা ধার্য করে, তারই একটি অংশ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের ক্ষতি পোষাতে ব্যয় হয়ে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলদেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে খেলাপি ঋণের অংক রীতিমতো ভয়াবহ। সব ব্যাংক মিলে ঋণ শ্রেণীবিন্যাসিত করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। উপরন্তু, আরও ৪০ হাজার কোটি টাকার অধিক শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে; অর্থাৎ প্রদর্শিত হিসাব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এ দুটি হিসাব যোগ করলে বর্তমানে ১ লাখ কোটি টাকা শ্রেণীবিন্যাসিত হয়েছে। এর সোজাসাপ্টা অর্থ দাঁড়ায়, ব্যাংকগুলো জনগণের গচ্ছিত আমানত থেকে ১ লাখ কোটি টাকা নষ্ট করেছে। এটি জনগণের আমানতের খেয়ানত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এ সমস্যাটিকে পর্যালোচনার সুবিধার্থে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। এক. সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক এবং তা জনগণের উদ্বেগের কারণ। দুই. বেসরকারি ব্যাংকগুলো- যেখানে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ সরকারি ব্যাংকের চেয়ে কম হলেও এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে।  রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংকটের প্রধান কারণ সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও অনিয়ম। এর বিপরীতে বেসরকারি ব্যাংকের সংকটের জন্য দায়ী প্রধানত আগ্রাসী ব্যাংকিং এবং সেই সঙ্গে ৭-৮টি ব্যাংকের অসাধু মালিক পক্ষের কারসাজি। সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, চেয়ারম্যান এবং পর্ষদ সদস্য নিয়োগদান করে থাকে সরকার। সরকারি ব্যাংকের টপ ম্যানেজমেন্টের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা তথা সার্বিক গভর্ন্যান্স। ব্যবস্থাপনার তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্ট দুর্নীতিপরায়ণ ও অনিয়মবাজ হলে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ধীরে ধীরে দুর্নীতিবাজ হয়ে পড়ে এবং পুরো প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বেসিক ব্যাংক। বেসিক ব্যাংক এ দেশের অন্যতম ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই ব্যাংকের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ সাধারণত দেড় শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতো। কিন্তু এই ব্যাংকটিতে সরকার যখন আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করল, তখন   তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করলে অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংকারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগদান করা হলো । এ দুটি নিয়োগই সরকার প্রদত্ত। এখন এই ব্যাংকটির শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ ৬ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সরকার এই দুটি নিয়োগ পরিহার করতে পারলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না বলেই ধারণা।

প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই বিগত ৫-৭ বছর যাবৎ নিয়োজিত চেয়ারম্যান, কিছু পর্ষদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষেরই অনেকে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দায়ী ছিলেন বলে  ধারণা। এ কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অনবরত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণের আমানত নষ্ট হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রসারের একটি কারণ হল দুর্নীতিবাজদের ও অনিয়মকারীদের আইনি দায়মুক্তি। ব্যাংকিং কোম্পানি অ্যাক্টের বিধানমতে ব্যাংকের কোনো পরিচালক বা চেয়ারম্যান অথবা সম্পূর্ণ বোর্ডের দ্বারা জনগণের আমানতের ক্ষতি হচ্ছে- এমন ধারণা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব ব্যক্তিকে অপসারণ করতে পারে, এমনকি পর্ষদও ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু ওই আইনেই যোগ করা হয়েছে যে, চেয়ারম্যান, পর্ষদ সদস্য বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অপসারণ করতে পারবে না। এ কারণেই সরকারি ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকবৃন্দ কোনো রকমের দায়বদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৫৬ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আর বাকি ব্যাংকগুলোর কাছে রয়েছে ৫০ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপি ঋণ। অন্যদিকে, শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ হিসাব করলে দাঁড়ায় মোট খেলাপি ঋণের ৬৪ শতাংশ। বাকি ৪৬ ব্যাংকে খেলাপি রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ না করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ও বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ শতাংশের দিক দিয়ে কমলেও পরিমাণের দিক দিয়ে বেড়েছে।

২০১৪ সালের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আলোচ্য সময়ে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিমাণ ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। দেখা গেছে, ২০১৫ সালে কৃষি খাতে ২৮০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ঋণ বিপরীতে খাতটিতে ৪০ দশমিক শূণ্য ৬ বিলিয়ন ঋণ খেলাপি হয়েছে। বাণিজ্যিক ঋণে ১ হাজার ২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৮৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ। শিল্প ঋণে ৭৫৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ঋণের বিপরীতে ৭৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন খেলাপি ঋণ হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতে নেয়া ৭৩৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬১ দশমিক ০৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৪টি খাত উল্লেখ করে খাতভিত্তিক ঋণের চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হওয়া মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে ৫ খাতে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৬৩ শতাংশ রয়েছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে বৃহৎ শিল্পে। শীর্ষ পাঁচটি খাতের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বিবিধ খাতে রয়েছে ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, আমদানি অর্থায়নে ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সেবা খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং কৃষি খাতে রয়েছে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ। আবাসন, রফতানিসহ বিভিন্ন ১৭টি খাতে রয়েছে ১৫দশমিক ৭০ শতাংশ।

ফারাক্কা থেকে রামপাল

আনু মুহাম্মদ ::

গত শতকের ৬০ দশকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর ওপর যখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ চলছিলো তখনই এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞও দীর্ঘমেয়াদে এই বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েই উচ্চকন্ঠ ছিলেন। কিন্তু এর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তা চালু হয়। এই বাঁধের কারণে এতো বছরে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে, বাংলাদেশের প্রধান একটি নদীর পানি প্রবাহ ভয়াবহ মাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তার ফলে এরসাথে সংযুক্ত আরও ছোটবড় নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল বহুমাত্রিক বিপর্যয়, শুধু যে এসব নদীর অববাহিকায় জীবন, জীবিকা, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই নয়, প্রতিবেশগত ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়ে জীবনমান স্বাস্থ্য প্রাণবৈচিত্রও বিপদাপন্ন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য বের করা কঠিন। এই ফারাক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে নেমে আসা আরও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, আরও পরিকল্পনাধীন আছে। এর ওপর ‘নদী সংযোগ পরিকল্পনা’  নামে যে ভয়াবহ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত- তা পুরা অঞ্চলে নদী ও নদী-নির্ভর জীবন ও অর্থনীতির ওপর মরণ আঘাত দিতে যাচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ওপর সম্পর্কিত সকল দেশের মানুষের অধিকার অস্বীকার করে ভারত একের পর এক এসব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি নিচ্ছে। আন্তজার্তিক পানি কনভেনশন অনুযায়ী এসব তৎপরতা অবৈধ, এবং বাংলাদেশের সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য ভারত দায় নিতে বাধ্য।

নদীর ওপর যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণের সুবিধাভোগী বিশ্বজোড়া নির্মাণ কোম্পানি, কনসালট্যান্ট, প্রকৌশলী, কিছু ব্যবসায়ীদের জোট গত শতকের শেষ কয়েক দশকে বিশ্বের বহুদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সবুজ বিপ্লবের  নামে নদীপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এসব কর্মসূচি নিয়েছে। এর বিরূপ ফলাফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ভাটার দেশগুলো যে বড় বিপর্যয়ের সামনে পতিত হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত বিশ্বজোড়া। উজানের দেশগুলোতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সেকারণে জোরজবরদস্তি করে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশের মতামত ও অধিকারের তোয়াক্কা না করে বাঁধ চালু করেছে, শুকনো মৌসুমে পানি আটকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে ভেবেছে এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হলে কি, ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, ঘটনা তা ঘটেনি। বরং ভারতের দিকে নতুন নতুন সমস্যা ক্রমে জমে এখন ভয়াল আকার ধারণ করেছে। এর শিকার হচ্ছে অনেক এলাকা, বিহার তার অন্যতম, এই বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিহারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এই বছরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলতে। এই দাবি বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের। কিন্তু ভারত পন্থী ও ভারত বিরোধিতার নামে পরিচালিত রাজনীতির কারণে বাংলাদেশে এনিয়ে সুস্থ আলোচনা হয়না কখনো। কিন্তু সর্বসাধারণের মনের মধ্যেই এবিষয়ে ক্ষোভ আছে। বরাবর ভারত এটি উপেক্ষা করতে চেয়েছে ‘এগুলো নিছক ভারত বিদ্বেষী রাজনীতি’ এই আওয়াজ দিয়ে।

ফারাক্কার জন্য ক্ষতি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার প্রমাণ সুন্দরবন। সুন্দরবন যেসব নদী ও শাখানদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল সেই নদীগুলো আবার গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহের সাথে সংযুক্ত। ফারাক্কা কাজ শুরুর পর থেকে নদীগুলোর রুগ্নতাপ্রাপ্তিতে তাই সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সুন্দরবনে বিপরীত থেকে সমুদ্রের নোনাপানির প্রবাহ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে যায়। এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদপত্রের রিপোর্টে বলা হয়, ‘গঙ্গা নদীর মিঠা পানি গড়াই হয়ে পশুর নদ ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হয়। ফারাক্কা বাঁধের পর পানিপ্রবাহ কমে গেছে।… মিঠা পানির প্রবাহ কম থাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে বনের মধ্যে। এ কারণে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারছে না। …বাঁধ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘনমিটার পলিযুক্ত মিঠা পানি গ্রহণ করেছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘনমিটার পানিপ্রবাহ প্রয়োজন। কম পানিপ্রবাহ থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি বনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরীগাছের বেঁচে থাকা কঠিন।’ (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি সুন্দরবনকে অনেকদিক থেকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশের জন্য শুধু নয় ভারত বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা বা দায়বদ্ধতা যদি দুদেশের সরকারের থাকতো তাহলে ফারাক্কা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও নতুন চিন্তা দেখা যেতো। কিন্তু তা না থাকার ফলে দশকের পর দশক ফারাক্কা প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের ক্ষতি করে গেছে। একই কারণে সুন্দরবনকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা না করে বরং এর ওপর মরণ কামড় দেবার মতো একটি প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, সেটি হলো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর প্রধান উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ভারতের এনটিপিসি, এই কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারতের একটি কোম্পানি, এর জন্য ঋণ যোগান দেবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক (এরজন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ সরকার) এবং সব লক্ষণ বলছে, কয়লাযোগান দেবে ভারতের কয়লা কোম্পানি। তারমানে কাগজেপত্রে ৫০.৫০ মালিকানা ও মুনাফা দেখানো হলেও বিনিয়োগ, নানাকিছু বিক্রি, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সবকিছুতেই ভারতের বিভিন্ন কোম্পানির লাভ। বিপরীতে বাংলাদেশের শুধুই ক্ষতি, সুন্দরবন হারানোর মতো অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি, বহুলক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি, কয়েককোটি মানুষের জীবন নিরাপত্তার ঝুঁকি, তারপরও ঘাড়ে ঋণ আর আর্থিক বোঝা।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সবসময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে বহুবিধ কারণে। এগুলো মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না, কেননা ভারতের শাসকগোষ্ঠী একের পর এক বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক কিংবা ক্ষতিকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফারাক্কা এর একটি, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী সংযোগ পরিকল্পনা, অবিরাম সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ঋণ দিয়ে বেশি দামে জিনিষপত্র কিনতে বাধ্য করা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চেপে বসা ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ চিরস্থায়ী শত্রুতার বোধে পরিণত হবে। কেননা সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা যাবেনা। বন্ধুত্ব নাম দিয়ে তৈরি কোম্পানি হবে শত্রুতা চিরস্থায়ীকরণের মাধ্যম।

আমরা চাই না এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। সেজন্য আমরা চাই- ভারতের সরকারকে এই প্রকল্প থেকে বিরত রাখতে, ভারতের সজাগ মানুষ সরব হবেন। আমরা এখনও আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুই দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে। দুইদেশের সজাগ মানুষ জনপন্থী উন্নয়নের ধারার জন্য যৌথ লড়াই শক্তিশালী করলেই কেবল দুইদেশের মানুষের বন্ধুত্ব বিকশিত হবে।

রামপাল প্রকল্প নিয়ে সরকার এতো অনমনীয় কেন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. গুরুভার একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। বাংলাদেশের উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ নাকি শাসকরা? প্রশ্নটি এ কারণে যে, দেশের উন্নয়ন দর্শনটি আসলে কি? পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ফ্লাইওভার নির্মান- তাহলে মেগাসাইজের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাহবা পেতেই পারে। কিন্তু বড় হিসেব হচ্ছে, এই উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ আছে, নাকি আছে লুটপাট? সেজন্যই কি ক্ষমতায় থাকাকালে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষা, শব্দ উচ্চারন বদলে যায় উন্নয়ন চিৎকারে।

ষাটের দশকে সামরিক একনায়ক আইয়ুব খান উন্নয়ন করেছিলেন, তৎকালে পাকিস্তানের উভয় অংশে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু খোদ পশ্চিম পাকিস্তানেই এই উন্নয়নের বিরুদ্ধে ঝড় উঠেছিল। এমন উন্নয়ন স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে এদেশ দেখেছে। ঢাকা কথিত তিলোত্তমা হয়েছে। রাস্তঘাট, ব্রীজ-কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়নের বন্যা বয়ে গেছে। তারপরেও এরশাদের পতন ঘটেছে গণআন্দোলনে। কারণ ঐসব স্বৈরশাসকদের কথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ ছিল না, ছিল একটি দালাল গোষ্ঠী ও অবারিত লুটপাট।

আশির দশকে লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে স্বৈরশাসকরা রাজনৈতিক বৈধতার সংকট কাটিয়ে উঠতে মেগা সাইজের সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসব উন্নয়ন দায় বা লায়াবিলিটিজে পরিনত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং মডেলের উন্নয়ন প্রচার করে যারা এদেশকে সমকক্ষ করার কথা বলছেন, তারা আপাত তৃপ্তি পেতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ঐসব দেশে রাজনৈতিক বৈধতার সংকট থাকলেও উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। আছে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন।

এই ধরনের উন্নয়ন দর্শন বা উন্নয়নে একটি অন্তর্নিহিত অসৎ লক্ষ্য থাকে। সেটি হচ্ছে, একটি লুটেরা পুঁজিপতি শ্রেনী সৃষ্টি করা। এ ধরনের পুঁজি শক্তিমানকে আরো শক্তিশালী করে তোলে এবং দালাল-দলদাস শ্রেনীকেও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মূল কারণ হচ্ছে, ক্ষমতা বলয়কে সংহত রাখা। এই পুঁজির মালিকরা এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, তারা দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কোন প্রকার আয়-বাণিজ্য না করেও জনগনের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারে। কারণ ক্ষমতা বলয়ের বাইরের জনগোষ্ঠি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে ধুঁকতে থাকে।

উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ না থাকলে ঐ উন্নয়ন জনস্বার্থ নিশ্চিত করে না। করে না বলেই পৃথিরীর দেশে দেশে শাসকদের উচ্চাভিলাষী অনেক পরিকল্পনা জনগন প্রত্যাখ্যান করছে এবং করেছে। ২০০৬ সালের ২৬ আগষ্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ি এরকম উদাহরন সৃষ্টি করেছিল। সে সময়ে এশিয়া এনার্জির সাথে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সম্পাদিত উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের মত গণবিরোধী, অশুভ চুক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল ফুলবাড়ির সবস্তরের মানুষ।

ফুলবাড়ি আন্দোলন অচিরেই গণবিদ্রোহে রূপ নিয়েছিল। এশিয়া এনার্জির পক্ষে বিএনপি সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে হতাহত হয়েছিল অনেক মানুষ। এখানেই শেষ ছিল না, তারা সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সাধারন মানুষের ওপর। এই দুস্কর্মে সরকার সাথী পেয়েছিল স্থানীয় সংসদ সদস্যকে, যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। তারপরেও গণমানুষের রুখে দাঁড়ানোর কারণে সরকার বাধ্য হয়েছিল চুক্তি বাতিল করতে। সেজন্যই রক্তাক্ত ফুলবাড়ি আন্দোলন দেশের সম্পদ রক্ষায় হয়ে উঠেছে স্মারক দিবস।

রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে ভারতের সাথে একটি অসম চুক্তি এবং সুন্দরবন ধংসের আশঙ্কা থেকে চলতি বছর ফুলবাড়ি হত্যা দিবস হয়ে উঠেছে আরো প্রাসঙ্গিক। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হচ্ছে। তৈরী হচ্ছে গণআন্দোলনের ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিকভাবেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফুলবাড়ির ক্ষেত্রে গণআন্দোলন ও বিশেষজ্ঞ মতামত সে সময়ের সরকার আমলে নিতে চায়নি। বর্তমান সরকারও রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে কোন দোহাই মানছে না।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ির কয়লা আহরনের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ও বিপদের আশঙ্কার মত রামপাল প্রকল্পের শুরুতেই সুন্দরবন ধংসের আশঙ্কা দানা বেঁধেছে। এক্ষেত্রে সকল সুপারিশ ও বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। কারন সব উন্নয়ন প্রকল্প মানেই যে জনস্বার্থ সংরক্ষণ, সেরকম কোন ধারনাই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। বরং অভিযোগটি প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে যে, সুন্দরবন ধংসের সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে বর্তমান সরকার।

দুই. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরপর দুই মেয়াদ ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে নিশ্চিত করেছেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের কোন ক্ষতি করবে না। তার অবস্থানের কথা সাফ জানিয়ে দিয়ে বলেছেন, সরকার এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করবেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনকে সরকার প্রধান দেখছেন, দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা, বিনিয়োগকে থামানোর চেষ্টা হিসেবে। গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই তিনি সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

অন্তর্নিহিত কারন কি অন্যত্র? রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির গুরুত্ব কি শুধুমাত্র ১৩৪০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ? অনেকে ধারণা করছেন যে, এর পেছনে কাজ করছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুটিও। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে প্রভাব বলয় বিস্তারে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিযোগিতা, সেখানে প্রকল্প এলাকাটি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হতে পারে আন্তর্জাতিক শক্তিমানদের জন্য একটি কৌশলগত এলাকা। এজন্যই আন্দোলন, প্রতিবাদ, সমীক্ষা, সুপারিশ- সবকিছুই উপেক্ষিত হতে চলেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে সরকার ছাড় দিতে রাজি নয়।

চলতি বছরের ১২ থেকে ১৪ মার্চ সুন্দরবনের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ এর যৌথ নিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুন্দরবন মৈত্রী’ নামে তিনদিন ধরে চলা এই মহড়ার ঘোষণায় বলা হয়েছিল, সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করা, পুরো এলাকায় উভয়পক্ষ থেকে টহল বৃদ্ধি, বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্র রুটে সন্দেহভাজন নৌযানে হানা দেয়া। মহড়ার দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় পক্ষ হাড়িয়াভাঙ্গা ও রায়মঙ্গল নদীতে নৌযানে হানা দেয়ার মহড়াও অনুষ্ঠিত করে।

রামপাল প্রকল্পে ভারতের সহায়তা এবং এই জয়েন্ট ভেঞ্চার কি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থে? সুন্দরবনের মত বিশ্বঐতিহ্য ও প্রতিবেশগত সংবেদনশীল অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে সহযোগিতার বিষয়টি অনেক আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের সাথেও যুক্ত বলে ধারণা করা হয়। এখানে সহযোগিতা ছাড়াও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান ও উন্নয়নে ভারতের ১৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিপোর্টগুলি ছিল চোখে পড়ার মত।

বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের অন্যতম ছিল পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর। এখানে বিনিয়োগ দৌড়ে আছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড। এর আগে সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মানে সম্ভাব্যতা যাচাই ও ৯৯% তহবিল দেয়ার চীনা প্রস্তাব থেকে সরকার সরে আসে। এরপরে পায়রা বন্দর এবং জাপানী বিনিয়োগে মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যাপারে সরকার গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে পায়রা বন্দর উদ্বোধন করা হয়েছে।

তিন. এই বিদ্যুতকেন্দ্রটির আরেকটি হিসেব- ব্যবসায়িক লাভালাভ। এটি ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে আমদানীকৃত কয়লা আসবে সুন্দরবনের নদীপথে। এতে খরচ কম, লাভ বেশি এবং তা অবশ্যই ভারতের ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে, বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে এখানে ভারতীয় বিনিয়োগের মস্ত ক্ষেত্র তৈরী হবে। কারণ মংলায় রয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, যেটি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত লোভনীয়। সুতরাং বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মান সম্পন্ন হলে ঐসব বিনিয়োগের জন্য এনে দেবে মহার্ঘ সুবিধা।

ইতিমধ্যে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন ঘোষিত এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে শিল্প, কলকারখানা স্থাপনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। মংলা, রামপাল, শরনখোলা ও মোড়েলগঞ্জে ভারী শিল্প স্থাপনে জমি কেনার হিড়িক পড়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রতাপশালী নেতা, দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা কিনে নিয়েছেন সংলগ্ন এলাকার প্রায় ১০ হাজার একর জমি। ১৫০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকার মধ্যে ঢালাওভাবে শিল্প স্থাপনে ছাড়পত্র দেয়া প্রসঙ্গে পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর বক্তব্য চমৎকৃত করে দেয়ার মত। তার মতে, ‘‘দেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার, আবার শিল্পও দরকার। আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি’’।

মন্ত্রীকে স্মরণ করানোর প্রয়োজন পড়ে না, কারণ রাষ্ট্রীয় গেজেট তিনি নিশ্চয়ই পড়েন। রাষ্ট্রপতির পক্ষে উপসচিব স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে, “প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট ও পরিবর্তন হবে এমন কোন কাজ করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দুষনকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না”। প্রসঙ্গত: এর আগে বন বিভাগ সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা বনের বর্ধিত অংশ বা প্রভাবিত প্রতিবেশ ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করে বসে আছে।

চার. ২০১২ সালে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের প্রস্তুতি ও পরবর্তীকালে বিএনপি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের দু’চারটি বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, পাছে ভারত অসন্তুষ্ট হয়। গেল কিছুদিন ধরে বিএনপি হঠাৎ করে সরব হয়ে উঠেছে। এখন তারা মনে করছে, এটি দেশবিরোধী প্রকল্প এবং বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবন ধংস হয়ে যাবে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানকে দেশবিরোধী ও গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, সুন্দরবনকে ধংসের চক্রান্ত সফল হতে দেয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আবুল মকসুদ যথার্থই বলেছেন, “বিএনপি তাদের রাজনৈতিক কারণে প্রকল্পের যেটুকু বিরোধিতা করছে, তা একেবারে দায়সারা এবং একধরনের চাতুর্য’’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আকমল হোসেন বলেছেন, “ ফুলবাড়ির ঘটনায় বিরোধীদলও ভাল কিছু কথা বলেছিল, এখনকার বিরোধীদলও সেই সীমাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এসবের মূল্য নেই। এশিয়া এনার্জি, এনপিটিসি-দুটোই বিদেশী কোম্পানী। তখনকার বিএনপি সরকার এশিয়া এনার্জিকে বিশেষ ক্ষমতা ও সহায়তা দিয়েছে। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে শুধু এনপিটিসি নয়, ভারতকে একের পর এক সুবিধে দিয়ে চলেছে।

বাম ঘরানার বিভিন্ন সংগঠন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সুশীল সমাজ যখন রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে জনসমর্থন তৈরী করছেন, আন্দোলন সংগঠিত করছেন, আন্দোলনকে তীব্র করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ও আন্দোলনের সমর্থন দান মূলধারার আন্দোলনকারীদের সমস্যা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে অতীতে জামায়াতের ডাকা হরতালে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি-কারণ জামায়াত-বিএনপি জোটসঙ্গী। এর ফলে সুবিধে হয়েছে সরকার পক্ষের। এটা নিয়ে এখন নানা ব্লেম গেম খেলা হবে।