Home » প্রচ্ছদ কথা (page 18)

প্রচ্ছদ কথা

বাংলাদেশ কি আদৌ রিজার্ভের অর্থ ফেরত পাবে?

মোহাম্মদ হাসান শরীফ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের একটি অংশ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে বলে বদ্ধমুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। ফিলিপাইনের যে ক্যাসিনো থেকে ওই টাকা হস্তান্তর হয়েছিল, তার পরিচালক কিম অং কিছু অংশ এর মধ্যেই ফিলিপিনো সিনেট অনুসন্ধান কমিটির কাছে ফেরত দিয়েছেন। আরো একটি অংশ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে আশা কতটা বাসস্তবায়িত হয় সে নিয়েই এখন সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ এর মধ্যেই আইনের ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে। আর সেই ফাঁদ থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ ওই টাকা ফেরত পাবে কি না তা নিয়ে গভীর সন্দেহেরও সৃষ্টি হয়েছে।

ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং প্রথম দফায় দিয়েছিলেন ৮৬ হাজার ডলার। এরপর দ্বিতীয় দফায় দিয়েছেন ৮৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এছাড়া মঙ্গলবার সিনেটের শুনানিকালে ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আরো ৯৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার ফেরত দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে করে বাংলাদেশের আশাবাদী হওয়ার ভালো সম্ভাবনাই ছিল। কিন্তু মঙ্গলবারই বড় ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ দিন সিনেট কমিটির চতুর্থ দফা শুনানি হয়। বাংলাদেশকে প্রাপ্ত অর্থ ফেরত দেয়া নিয়ে সিনেট কমিটিতে বিতর্কও শুরু হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে।

ফিলিপাইনের সংবাদপত্র ইনক্যুইয়ারে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং সাক্ষ্য দিতে আসেন। তখনই বলা হয়, বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিরাপদ হেফাজতে রাখার জন্য সিনেট কমিটিকে ওই টাকা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি কমিটিকে জানান, এএমএলসি’র নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া ব্যাকে-আবাদ।

এই প্রশ্ন ওঠায় কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তেওফিস্তো গুইনগোনা ওং এবং তার আইনজীবী ইনোসেনসিও ফেরারের কাছে জানতে চান, তাদের হস্তান্তরিত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরে কোনো আপত্তি আছে কি না। এই প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান অং। তিনি মিনমিন করে কিছু বলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তার আইনজীবীর কাছে ছেড়ে দেন। আর আইনজীবী জানান, বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য নয়, ওই টাকা এএমএলসি’কে দেওয়া হয়েছে নিরাপদে রাখার জন্য।

আইনজীবী আইনের মারপ্যাঁচই কষেছেন। তিনি ফিলিপিনো আইনের দোহাই দিয়ে বলেন, কেউ দাবি করলেই তা পরিশোধ করা যায় না, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। তিনি জানান, বিশেষ তদন্ত কমিটির সম্মান রক্ষা করে তাদের অনুরোধেই ওই টাকা হেফাজতে রাখার জন্য তাদের কাছে তারা সমর্পণ করেছেন।

কিন্তু সিনেট কি এ ধরনের কোনো অনুরোধ করেছিল? এক সিনেটরই কিন্তু এই প্রশ্নটি করেছেন। টেমপোরে রালফ রেকটো জানান, কমিটি নিরাপদ হেফাজত করার জন্য অর্থ তাদের কাছে রাখার কোনো অনুরোধ তারা করেছিলেন কিনা তা তিনি মনে করতে পারছেন না। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটা রাজনৈতিক বিষয়েও পরিণত হয়ে গেছে।

সিনেটের সংখ্যালঘু গ্রুপের নেতা জুয়ান পঞ্চ এনরিল দৃশ্যত ওই টাকা বাংলাদেশে হস্তান্তর বিলম্বিত করার অবস্থানই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সম্মানিত চেয়ারম্যান, আমি মনে করি, আমরা বাংলাদেশকে এ কারণে সহায়তা করতে চেয়েছি, যাতে আমরাও যদি কখনো একই ধরনের সমস্যায় পড়ি, তবে যাতে সহায়তা পেতে পারি। এখন কথা ওঠছে, আমাদেরকে আমাদের আইন দেখতে হবে, যেভাবে তারা তাদের আইন বিবেচনা করবে। আর আমি মনে করি না যে, সিনেট কমিটি বা এমনকি খোদ সিনেট কোনো ব্যক্তিকে কারো কাছে কিছু সমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারে না, যতক্ষণ না এই প্রজাতন্ত্রের আদালত সেটা তাকে করতে বলে।’ এই বক্তব্যের পর গুইনগোনাও তার আগের অবস্থান থেকে দৃশ্যত সরে আসেন। তিনি নরম সুরে বলেন, কমিটি অংকে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য করতে চায় না, কেবল তাকে সম্মত করানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে এনরিল সন্তুষ্ট হননি। তিনি বলেছেন, কমিটি যদি কাউকে সম্মত করানোর চেষ্টা করে, তবে সেটা আসলে হয়ে যায় জরবদস্তি।

কাজেই অং যদি নিজ থেকে বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দিতে রাজি না হন, তবে ফিলিপাইনের সিনেট কমিটি তাকে বাধ্য করতে পারবে না, ওই পথে যাবেই না। বরং তাদেরকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আর আইনি-প্রক্রিয়া সব দেশেই কমবেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাছাড়া অং কিন্তু ইতোমধ্যেই সে দেশের বিরোধী দলের কিছু সমর্থন পেয়ে গেছেন। কাজেই অং এখন সহজে অর্থটা দিয়ে দেবেন, এমনটা মনে হচ্ছে না।

সবাই জানে, ওই টাকার মালিক বাংলাদেশ। কিন্তু এনরিল জানিয়েছেন, ওই টাকা এখন ফিলিপাইনের এখতিয়ারভুক্ত। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশের আইন মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশকে এই টাকা ফেরত দেওয়ার আগে সরকারকে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আমরা বিচারক হতে পারি না, আমরা কেবলই আইন প্রণয়ন করতে পারি।’

ফলে বেশ জটিলতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর অবশ্য বলেছেন, বেশির ভাগ অর্থই ফেরত পাওয়া যাবে।

 

বাঁশখালী হত্যাযজ্ঞ: উন্নয়ন নামে দখল, প্রতারণা আর জবরদস্তির নমুনা

আনু মুহাম্মদ ::

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা গন্ডামারা বড়ঘোনায় ৭ হাজারেরও বেশি বসতবাড়ি, কৃষিজমি, লবণ চাষের জমি ও চিংড়ি ঘের সমৃদ্ধ অঞ্চলে সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমতি দিয়েছে সরকার ঘনিষ্ঠ দেশের দ্রুত বিকাশমান ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপকে। এর সাথে যুক্ত আছে চীনা কোম্পানি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এস আলম গ্রুপ সেপকো ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন নামে একটি চীনা কোম্পানির সাথে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকার এস আলম গ্রুপের দুটো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে ১২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতি কিলোওয়াট ৬.৬১ টাকা দরে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর জন্য ৬০০ একর জমি দেখানো হয়। বিনিয়োগের শতকরা ৭৫ ভাগ চীনা কোম্পানি বহন করবে বলে জানানো হয়।

এসব চুক্তি সম্পাদিত হলেও কোন পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষার কথা শোনা যায়নি।পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষা ছাড়া এরকম কোনো প্রকল্প কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কেননা, এই সমীক্ষা থেকেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব কোনো প্রকল্প আসলে কতটা ক্ষতি করবে, আর কতটা লাভজনক হবে, আদৌ তা গ্রহণযোগ্য কিনা। বস্তুত, প্রথম থেকেই অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, জোরজবরদস্তি, ত্রাস দিয়ে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু। ৭ হাজারের বেশি বসতবাড়ি ছাড়াও এলাকায় আছে ৭০টি মসজিদ, মক্তব, কবরস্থান, শ্মশান, ১টি কারিগরী শিক্ষা বোর্ড, ২০টি ছোটবড় আশ্রয় কেন্দ্র, ১টি উচ্চবিদ্যালয়, ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি আলিয়া মাদ্রাসা, ৫টি কওমী মাদ্রাসা, ৫টি বাজার, ১টি সরকারি হাসপাতাল। এগুলি থাকার পরও স্থানীয় প্রশাসন মাত্র ১৫০টি বসতবাড়ি দেখিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্যগন্ডামারা বড়ঘোনায় ভূমি এস আলম গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করতে প্রতিবেদন প্রেরণ করে। জমি ক্রয় নিয়েও নানা অনিয়ম, ভয়ভীতির অভিযোগ অনেকদিনের। অনেকেই জমির যথাযথ দাম পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

তাই প্রকল্পের স্থান নির্বাচন, জমি ক্রয় ও অধিগ্রহণসহ নানা অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে এলাকার মানুষ প্রতিবাদ করে আসছিলেন গত বেশ কিছুদিন ধরে। সন্ত্রাসী ও দালালদের দাপটে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন মানুষ। এর আগেও হামলা হুমকির ঘটনা ঘটেছে। এলাকার মানুষ ঘনজনবসতিপূর্ণ এলাকা বাদ দিয়ে স্থান নির্বাচন, দালালদের বাদ দিয়ে জমির দাম সুষ্ঠুভাবে পরিশোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামতও দিয়েছিলেন। গত ২৩ মার্চ এএসপি, ইউএনও এবং ওসির উপস্থিতিতে গন্ডামারা ইউনিয়নের বাজারে শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বাঁশখালীর জনবহুল এলাকা বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ প্রকল্প করবার দাবি জানান। কিন্তু গত ২ এপ্রিল এস আলম গ্রুপের লোকজন আবারো এলাকায় গিয়ে হাজির হলে গ্রামবাসী তাদের বাধা দেন। এর সূত্র ধরে মামলা হয়, ৩ এপ্রিল ৭জন এলাকাবাসীকে গ্রেফতার করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ৪ এপ্রিল এর প্রতিবাদে ‘বসত-ভিটা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে সমাবেশ আহবান করা হয়। সমাবেশ বানচাল করবার জন্য পাল্টা সমাবেশ ডাকে কোম্পানি পক্ষের লোকজন। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। বিক্ষুব্ধ জনগণ সমাবেশ করতে গেলে প্রথমে পুলিশ পরে ৩০/৪০টি মোটরসাইকেলে সন্ত্রাসীরা এসে নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এতে অনেকে গুলিবিদ্ধ হন, আহতদের হাসপাতালে নিতেও বাধা দেয়া হয়। এইদিনই একজন নারীসহ কমপক্ষে ৫জন নিহত হয়েছেন। আশংকা, এই সংখ্যা আরও বাড়বে। স্থানীয় লোকজনের মতে, এই সংখ্যা ৯ জন পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই হত্যাকান্ডের দায় সরকার ও এস আলম গ্রুপের।

প্রশ্ন হলো, ‘উন্নয়ন’ যদি সত্যিকারের উন্নয়নই হয় তাহলে পরিবেশ অভিঘাত সমীক্ষা না করে জবরদস্তি কেনো? তা নিয়ে মানুষের কথা শুনতে অসুবিধা কী? মানুষের প্রতিবাদে সরকারের ভয় কোথায়? খবর প্রকাশে এতো বাধা কেনো? খোলাখুলি কথা বলতে অসুবিধা কী? না, কেউ কথা বলতে পারবে না, কোনো সভা সমাবেশ করা চলবে না। সন্ত্রাসী আর পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী লাগানো হবে জনগণের বিরুদ্ধে। এটাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। কারণ সরকার ঠিকই জানে এগুলো উন্নয়নের মুখোশ পরানো ধ্বংস, দখল আর লুন্ঠনের প্রকল্প। একই চেহারা আমরা দেখেছি ফুলবাড়ীতে; এখন দেখছি রামপাল, রূপপুর, মাতারবাড়ীতেও।

পাশাপাশি নানাকিছু দিয়ে বা ধমক দিয়ে মিডিয়া থেকে গায়েব করা হয় জনগণের প্রতিবাদ, যুক্তি, তথ্য। বাঁশখালীতে বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিবাদ চললেও এতোদিন তাই কোনো খবরই আসেনি সংবাদপত্রে, টিভিতে। বস্তুত জোরজবরদস্তি, প্রতারণা, ভয়ভীতি, দুর্নীতির ওপর ভর করে ‘উন্নয়ন’ নামের দখল, লুন্ঠন ও ধ্বংসের তৎপরতা চললে তা নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হবেই। যথাযথ স্বচ্ছতা, জনসম্মতি এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত না হলে জনগণ কোনো প্রকল্পই গ্রহণ করবে না।ভয়ভীতি কতোদিন মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে পারবে?

 

যখন শাসকের আর কোন প্রতিপক্ষের প্রয়োজন নেই

“Those who cast the votes decide nothing. Those who count the votes decide everything.”—- Joseph Stalin

আমীর খসরু ::

প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন পদ্ধতিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম জনগণের জন্য এই কারণে যে, তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য অন্তত একটি সুযোগ পেয়ে থাকেন একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তে। আর এই নির্বাচন হচ্ছে যাদের গণতন্ত্র নেই তাদের জন্য গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং যাদের গণতন্ত্র আছে তাদের ক্ষেত্রে ওই ব্যবস্থাটি আরও শক্ত-পোক্ত করার জন্য। গণতন্ত্র নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন তারা এখন বলছেন, গণতন্ত্রের পুরনো সংজ্ঞায় বিষয়টিকে দেখলে আর চলবে না। বর্তমান সময়ে গণতন্ত্র হচ্ছে ক্ষমতার অধিকতর বিকেন্দ্রায়ন। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে যাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি চলে না যায় তা নিশ্চিত করা। নির্বাচন হচ্ছে এই কারণে গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ মাত্র। তবে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনে নির্বাচনই সব কিছু এবং শেষ কথা- এমনটা যারা বিশ্বাস করেন তারা ভুল সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন প্রাপ্যগুলোকে বুঝিয়ে দিয়ে অন্যান্য যে সব অধিকারগুলো আছে যেমন বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতাসহ নানামুখী অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনুদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণী সব সময়ই নির্বাচনই হচ্ছে সব কিছু এমন একটা ধারণাকে স্বতঃসিদ্ধ করার প্রবল চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এটা ঠিক, নির্বাচনী গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে কতিপয়ের বা গোষ্ঠীর শাসনে রূপান্তরিত হতে বাধ্য।

কিন্তু এর উল্টোটা হচ্ছে, স্বৈরতান্ত্রিক এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় নির্বাচনকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং জনগণকে ভোলানোর জন্য উন্নয়নের শ্লোগান উঠে প্রবলভাবে। এই ধরনের শাসকেরা এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে এবং তাদের মনোজগতে এই বিষয়টি প্রবল যে, উন্নয়নের কথা বললে জনগণ আর গণতন্ত্রের কথা এবং গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ নির্বাচনের কথা বলবে না। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থাটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হলে ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব। আর এখানেই একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের আপত্তি। আপত্তি এই কারণে- তারা পালাবদল চায় না, বরং তারা তাদের ক্ষমতার জন্য জনগণের গণতান্ত্রিক আকাংখার বদল চায়। এরও কারণ হচ্ছে, নানা দোষ-ত্রুটি  সত্ত্বেও নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সচল-সজীব ও প্রাণবন্ত থাকলে জনগণের অধিকার কিঞ্চিৎ হলেও যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাশ্রয়ী পক্ষকে সামান্য হলেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়। এখানেই স্বৈরশাসকদের আপত্তি। তবে এ কথা বার বার বলা হচ্ছে যে, গণতন্ত্রই যে সর্বোচ্চ পন্থা তা নয়, তবে এর চাইতে ভালো পদ্ধতি আবিষ্কার এখনও পর্যন্ত হয়নি।

এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, গণতন্ত্রের সাথে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন যাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বলা যায়- সে বিষয়টিও জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোতে এর নাগরিকগণও কম ক্ষমতা ভোগ করেন। অর্থাৎ তাদের অধিকারগুলো থেকে সহজে বঞ্চিত করা যায়। আবার অর্থনৈতিক দিক থেকে সক্ষম বা উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকরা উচ্চ মাত্রায় অধিকার ভোগ করে। আমাদের মতো দেশে কতিপয়ের শাসন ও স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঘটে অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের কারণে, দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার জন্য।

এতো সবের পরেও আমাদের মতো দেশে নির্বাচনই হচ্ছে জনগণের একমাত্র ভরসা- যা থেকে এই জনগণ বার বার বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হওয়ার আগে জনগণের সম্মিলিত লড়াই, সংগ্রাম ছিল শক্ত-পোক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম সিঁড়ি বা ধাপটি অর্থাৎ নির্বাচনী ব্যবস্থাটি প্রথম দিন থেকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ, শাসকদের মনোজগতে তখনো অতীত বাসা বেধে আছে অর্থাৎ মনেপ্রাণে তারা গণতান্ত্রিক ছিলেন না। গণতন্ত্রের প্রতি যে অসীম ভালোবাস এবং শ্রদ্ধা থাকতে হয় সে শিক্ষাটিই হয়তো তারা পাননি।

এদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার ইতিহাসের দিকে যদি ফিরে তাকাই তাহলে দেখা যাবে, স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরেই ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নানা অনিয়ম হয়েছে- যা ছিল অবিশ্বাস্য। এরপরে দীর্ঘ সামরিক শাসনে আমরা দেখেছি জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এরশাদ জমানার ১৯৮৬, ১৯৮৮-এর নির্বাচন কেমন হয়েছিল তাও সবার জানা। ১৯৯০-এর পরবর্তী সময়কালের নির্বাচনগুলোতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যেও শুনতে হয়েছে সূক্ষ-স্থূল কারচুপি, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা কথা। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়কালের নির্বাচনগুলো যে কোনো অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে অতি স্বল্পস্থায়ী একটি সংসদের জন্য যে নির্বাচনটি বিএনপি সরকার করেছিল তা ছিল এর ব্যাতিক্রম।

কিন্তু বাংলাদেশের অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে রীতিটি গড়ে উঠছিল তার বিদায় সূচিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে। বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই অন্যান্য কোনো দেশে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। একদলীয়, ভোটারবিহীন এমন নির্বাচন ইতিহাসে নজিরবিহীন। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্তর্ধান ও বিলুপ্তি ঘটানো হলো ওই দিনটিতে। এরপরে উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌর নির্বাচন এবং সবশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবই একই বৈশিষ্ট্যের, অভিন্ন চরিত্রের। কোনো হেরফের এখন তাদের তৈরি নির্বাচনী পদ্ধতির ক্ষেত্রে আর হচ্ছে না। এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনের অর্থই হচ্ছে- বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হওয়া, হুমকি, দখল, হামলা, আগুন, ভাংচুর, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যা, খুন এবং নির্বাচনের সময়ে ও আগে-পরে নানাবিধ মামলা। বর্তমান সরকার পুরো বৃত্তই সম্পন্ন করে ফেলেছে।

আগেই বলা হয়েছে গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা হচ্ছে- ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটি এই কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রবিহীন শাসনামলের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এই সময়কালে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনগুলোও মারাত্মক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ এবং নানা দোষে দুষ্ট। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনামলে যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং এক কথায় ভোট বলতে আর তখন কিছুই হয়নি।

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নানা কারণে নজিরেরও বেশি সৃষ্টি করেছে। এই নির্বাচনের প্রথম দুই দফায় ভোটের নামে কি হয়েছে তা সবারই জানা। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কমপক্ষে ৮৩ জন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৩শ’র মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে প্রায় দুইশটিতে প্রধান বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী থাকতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। আর খুন-জখম এখনো অব্যাহত আছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হচ্ছে- এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের নৌকা প্রতীক পেলে তিনিই বিজয়ী। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ ক্ষমতাসীনদের এমন মনোভাব ও ইচ্ছার ইঙ্গিত পেয়ে গেছে। আর কাজও হচ্ছে সে মতো। তাহলে কি এটা ধরে নেয়া যায়, এই কারণেই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে?

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে যে বিশাল এবং সীমাহীন ক্ষতিটি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তাহলো- তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ‘ক্ষমতার উগ্রতা, দম্ভ ও শক্তিমত্তা প্রদর্শন’ ছড়িয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের অবনতিশীল অভ্যন্তরীণ শৃংখলা আরও ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হবে, তারও আলামত দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হবে, যার ফলশ্রুতিতে হানাহানি আরও বাড়বে। অর্থাৎ একদলীয় শাসনের বিষয়টি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও পড়বে।

নির্বাচন ব্যবস্থার বিদায়ের মধ্যদিয়ে তিনটি বিষয় স্পষ্ট যে, এক, রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে তা আরও ব্যাপকতর বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে। যে শূন্যতা ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে পুরো ব্যবস্থার ভারসাম্যে, তাতে শূন্যতা আরও বাড়বে। দুই, এই বিপর্যয়কর শূন্যতার মধ্যদিয়ে বিদ্যমান পুরো ব্যবস্থাটি টাল-মাটাল হয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। আর এ থেকে বের হওয়া কতোটা সম্ভব তা বলা মুশকিল। তিন, এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচাইতে বেশি। তাদের জনবিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে, ব্যাপক মাত্রায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিয়ে কেন এই ভয়ংকর খেলা? এর জবাব হচ্ছে, এ সবই করা হচ্ছে জনমনে অধিকতর ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। কারণ ক্ষমতাসীনরা চায়, জনগণের মধ্যে যাতে কোনো দিনই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের আকাংখাটি আর বিদ্যমান না থাকে। আর তেমন এক ভীতিকর, ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই সব আয়োজন। আগেই বলেছি, যেকোনো শাসকের জন্য জনবিচ্ছিন্নতাই হচ্ছে তার প্রধানতম শত্রু । কারণ যেকোনো শাসক সীমাহীন শূন্যতার মধ্যে পড়ে গেলে, তার আর প্রতিপক্ষের প্রয়োজন হয় না।

রিজার্ভ চুরির অজানা কাহিনী

 

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন::

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা বাংলাদেশ সরকার জানতে পারে অনেক পরে। কিন্তু এর আগের ঘটনা অনেকের কাছে অজানা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বিষয়ে একটি চিত্র তুলে ধরে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এর আয়োজন চলে ২০১৫ সালের মে মাস থেকে। এই মাসে ফিলিপাইনের রিজাল কর্মাশিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের একটি শাখায় সন্দেহভাজন চারজনের নামে চারটি আলাদা ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এর প্রায় আট মাস পর আসল ঘটনার সূত্রপাত।

অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং এর জন্য ব্যাংকটির গভর্নর ও দুই ডেপুটি গভর্নরের অপসারণের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। আর ‘ব্যাপক মাত্রায় অযোগ্য’ আখ্যা লাভের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তার উল্লেখ অবান্তর। এরই মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি’ হিসেবে অভিধা পাওয়া ঘটনাটি এমন এক গোলকধাঁধা সামনে হাজির করেছে, যার উৎসানুসন্ধানের চেষ্টা করছেন ব্যাংকার, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

গত ৫ ফেব্রুয়ারির পর ব্যাংক, ক্যাসিনো, কম্পিউটার আর কোটি ডলারের সমন্বয়ে এমন এক নাটকীয়তায় ঘটনাগুলো উন্মোচিত হয়েছে, যা হলিউডি সিনেমা থেকে কোনো অংশে কম নয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তাবেষ্টিত লেনদেন ঘরের প্রিন্টারটি নষ্ট অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে কর্মকর্তারা আগের দিনের লেনদেনের তালিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হন। পরদিন কর্মকর্তারা ব্যর্থ হন সুইফট সিস্টেমে ঢুকতে, যেখানে বারবার এ বার্তা দেয়া হচ্ছিল যে, ‘একটি ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা পরিবর্তিত হয়েছে।’ এর পর ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল রোববার, যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির দিন। আর বাংলাদেশের জন্য সপ্তাহের শুরুর দিন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি গড়িয়ে যায় সোমবার পর্যন্ত। পুরো ঘটনাটিতে সময়ের ব্যবহার ছিল সুক্ষতা ও নৌপুন্যে ভরপুর। কারণ চীনা নববর্ষ উদযাপনের জন্য সোমবার ছিল ফিলিপাইনের সরকারি ছুটির দিন। আর এ সময়ের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও শ্রীলংকার এনজিওতে টাকা স্থানান্তর করা হয় মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। সেতু, বিদ্যুকেন্দ্র ও ঢাকা মেট্রোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের নামে এ অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ লেনদেনটি করেছে, কারণ তাদের তা করতে বলা হয়েছে। এভাবেই সুইফটের মতো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিগুলো কাজ করে থাকে। আর যেহেতু ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোয়  গেছে, সেহেতু দেশটির কর্তৃপক্ষ হারিয়ে যাওয়া ওই অর্থ শনাক্ত করতে পারেনি, আইনী জটিলতার জন্যে। কারণ ফিলিপাইনে ক্যাসিনোর ওপর অর্থ পাচাররোধী (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং) আইন প্রযোজ্য নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে ব্যাংকের (আরসিবিসি) শাখা থেকে ওই অর্থের সিংহভাগ উত্তোলন করা হয়েছে সেখানকার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ছিল নষ্ট।

এ সাইবার চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দায়িত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করা। লেনদেনের পুরো চক্রটিতে হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ কেউ জড়িত। অথবা একটি ম্যালওয়্যার, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা বিষয়ে চরম অবহেলা কিংবা হতে পারে গোটা নিরাপত্তা কাঠামোরই ত্রুটি। দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ব্যাংকিং খাতের লেনদেনের জন্য স্বয়ংক্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের নিরাপত্তা-বিষয়ক প্রশ্নটি। এ ঘটনা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রশ্ন হাজির করেছে, যা মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যের নিরাপত্তার মূলনীতির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর অনুমোদনের জন্য সুইফটের ওপর নির্ভর করে। আলোচ্য ঘটনায় স্বত্বভোগী অ্যাকাউন্টগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলের মাধ্যমে সুইফটই অনুমোদন দিয়েছে। যদিও সুইফট বার্তা পাঠানোর কোড চুরির তত্ত্বটি পুরো নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।

ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোয় গেছে। আর এটি বিস্ময়ের কিছু নয় যে, ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনের অধীন নয়। এ আইনী অস্ত্রের অনুপস্থিতিই হচ্ছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। এটি তদন্তকে অনেক জটিল করে তুলেছে। কারণ ক্যাসিনোগুলো তদন্তে অংশ নিতে বা সহায়তা করতে বাধ্য নয়। নীতিগতভাবে তদন্ত সেখানেই বন্ধ হয়ে যাবে, যেখান থেকে ওই অর্থ আর্থিক খাত থেকে বেরিয়ে গেছে, আর তা হারিয়ে যাবে অবৈধ অর্থ পাচার নেটওয়ার্কের অন্ধকারে।

১২টি সংস্থার তদন্তে কোনো ক্লু বের হয়নি। উদঘাটন হয়নি কোনো রহস্যও। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা তদন্ত এখনও সন্দেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তদন্তে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটি তদন্ত সংস্থা, ফিলিপাইন সরকার, ফিলিপাইনের জড়িত ব্যাংক আরসিবিসি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার সন্দেহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরটিজিএস প্রকল্পকে ঘিরে। গোয়েন্দাদের ধারণা, অক্টোবরে এ সিস্টেমে কাজ করতে গিয়ে সুইফট শাখার তথ্য খোয়া গেছে। সেই তথ্য কাজে লাগিয়েছে অপরাধীরা। প্রথম দিকে ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানাকে নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও পরে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি পরামর্শক হিসেবে দুই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ। এদিকে, নিখোঁজ হওয়ার ছয় দিন পর আইটি বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহাকে ফেরত পাওয়া গেছে। চুরির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর এ সম্পর্কে বক্তব্য রাখায় রহস্যজনকভাবে তিনি নিখোঁজ হন। এ ঘটনার পর তার পরিবার থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ তাও নেয়নি। এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নতুন গভর্নর ফজলে কবির।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি তিন সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গত ১৫ মার্চ গঠন করা হলেও ৮ দিন পর কমিটি গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছেন। এর আগে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। এই কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অর্ন্তবর্তীকালীন রিপোর্ট এবং ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে বলা হলেও এখনো তদন্ত কাজে কোন অগ্রগতি নেই বললেই চলে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস। জানা গেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মার্কিন ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হবে কিনা সে প্রশ্নে আইনজীবীদের সাথে সলা-পরামর্শ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনাকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের চরম গাফিলতি বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চুরি যাওয়া অর্থ ফেরাতে আইনী লড়াইয়ের ভিত্তি গড়ে তোলা হচ্ছে।

ব্লুমবার্গের এক  প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আলোচিত এই অর্থ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের প্রায় আটশ কোটি টাকা নিউইয়র্ক ফেডারেল ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব টাকা ফেডারেল ব্যাংক থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায়। তবে হ্যাকারদের বানান ভুলের কারণে একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরও  প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার লেনদেন বানচাল হয়ে গেছে। জেরুজালেম-ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি সাইবারআর্কের একজন উর্ধ্বতন পরিচালক আন্দ্রে ডালকিন এক ইমেইলে ব্লুমবার্গকে বলেছে, ‘বানান ভুলের ওপর নির্ভরতা কোনো নিরাপত্তা নীতি হতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অ্যাকাউন্টের গতিবিধি যদি পর্যবেক্ষণ করত, তারা দ্রুতই অস্বাভাবিক গতিবিধি শনাক্ত করতে পারত। আর এসব সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্তের জন্য তাদের তৃতীয় পক্ষের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরও করতে হতো না।’ টাকা খোয়া যাওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নিউইয়র্কের ফেডারেল ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের জন্য ফেডারেল ব্যাংকের বিরুদ্ধে এনেছেন অনিয়মের অভিযোগ। এ বিষয়ে আইনি লড়াইয়ের কথাও বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই পরিস্থিতিকে যোগ্যতার সঙ্গে সামাল দিতে পারেনি বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

ব্লুমবার্গের  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এমন একটি ব্যাংক ডাকাতি ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও তৎপর হওয়া  প্রয়োজন ছিল। এমন ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যেসব অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশের  প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশীক রিজার্ভের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে, তাদের জন্য এই ঘটনাটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অর্জুনা মাহেন্দ্রন সিঙ্গাপুরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এই ঘটনার পর নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে খতিয়ে দেখছে। ফেডারেল ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মেসেজিং সিস্টেমকেও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মূল চালিকাশক্তি হলো জনবল। তারা অলস হয়ে পড়ে এবং তারা বাজে অভ্যাস গড়ে তোলে।’

একই ধরনের আরও ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের ‘গভীর উদ্বেগ’ থাকা দরকার বলে মন্তব্য করেছে সিঙ্গাপুরের ডিলয়িট্টে টুশে থমাতসু কনসালট্যান্টের পার্টনার ভিক্টর কিয়ং। তিনি বলেছেন, ‘এটা ভয়াবহ। নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই যদি এমন ভুল থাকে, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোও হয়তো খুব বেশি সুরক্ষিত নয়।’ ক্যানবেরা-ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (এএসপিআই)  প্রকাশিত ২০১৫ সালের ‘সাইবার ম্যাচিউরিটি’ র্যাংকিংয়ে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো নিজেদের  প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে সুসঙ্গত সাইবার নীতিমালা চালু করেছে। তবে থাইল্যান্ড বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর  প্রতিরক্ষা আরও উন্নত হওয়া  প্রয়োজন বলে জানিয়েছে এএসপিআই। এই রাংকিং-এ বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে তাদের পরবর্তী রাংকিং-এ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এএসপিআইয়ের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক টোবিয়াস ফিকিন বলেছে, এটা কৌত‚হলোদ্দীপক যে বাংলাদেশ সরকার তাদের নিজেদের ব্যাংকের থেকে মনোযোগ সরাতে ফেডারেল ব্যাংকের দিকে আঙুল তুলেছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনার এক তদন্তকারীকে উদ্বৃত করে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইনফরমেশন সিস্টেম কর্মীদের অগোচরেই জানুয়ারি মাসে ব্যাংকের সিস্টেমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ম্যালওয়্যার বা ক্ষতিকর সফটওয়্যার কোড। এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার নেই জানিয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখে হ্যাকাররা হানা দেয় ব্যাংকের সিস্টেমে। এএসপিআইয়ের টোবিয়াস ফিকিন বলেছে, ‘আমরা জানি না কীভাবে ওই ম্যালওয়্যার সিস্টেমে  প্রবেশ করানো হয়েছিল। তবে ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতি ও ব্যাংকের কর্মীদের ব্যাংকে আসা-যাওয়ার সব তথ্যই জানা ছিল হ্যাকারদের। সাইবার সিকিউরিটির  প্রসঙ্গে সবসময়ই সব থেকে দুর্বল স্থানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।’

স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা

হায়দার আকবর খান রনো ::

এই নিবন্ধের শিরোনামে স্বাধীনতা সংগ্রাম কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ বললে ’৭১ সালের নয় মাসের সময়কালের মধ্যে আলোচ্য প্রসঙ্গটি সীমাবদ্ধ থাকে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, আরো আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক চেতনা থেকে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তরণ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উস্মেষ, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ডাক এবং সর্বশেষ পর্যায়ে মহান সশস্ত্র যুদ্ধ – সব কয়টি পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কথাটি গ্রহণ করলে। ’৪৭ থেকে ’৭১-এর প্রতিটি পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের অবদান বিশাল এবং সেটাই স্বাভাবিক। শ্রেণী শোষণ থেকে আরম্ভ করে সব ধরনের শোষণ, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি, কমিউনিস্টরাই সর্বকালে সর্বদেশে লড়াই করে এসেছে। বুর্জোয়া নেতৃত্বও নানা ধরনের সামাজিক অবিচার, লিঙ্গ বৈষম্য ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু শ্রেণী স্বার্থের কারণে তারা প্রায়শ দৃঢ়তার সঙ্গে লড়তে পারে না, মাঝপথে আপোষ করে।

অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসও তাই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এসেছিল ভারতের বুর্জোয়ার সঙ্গে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের আপোষের মাধ্যমে দেশটিকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখন্ডিত করে, পাকিস্তান নামক এক আজব ধর্মভিত্তিক দেশ তৈরি করে। ভারতের ইতিহাসবিদগণের অধিকাংশই ভারতের স্বাধীনতার একক কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসকে। মহাত্মার নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের বিরাট গুরুত্বকে অস্বীকার করবো না। কিন্তু এর পাশাপাশি আরো দুটি স্রোত ছিল যাকে অস্বীকার করা হবে ইতিহাসকে খন্ডিতভাবে দেখা। একটি ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবল স্রোত, ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে সূর্যসেন ও পরে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের সশস্ত্র যুদ্ধ যার অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি স্রোত ছিল শ্রমিক-কৃষকের লড়াই যার নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা।

একইভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীতে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল অবদানকে উপেক্ষা করার একটি প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অথবা মিডিয়ার প্রচারের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বামপন্থীদের অবদানকে হয় অস্বীকার করেন অথবা যতোটা সম্ভব ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। একথা অস্বীকার করা যাবে না, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদের বিশাল জাগরণ ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিস্ময়কর বিজয় এবং ছয় দফার প্রতি তার অনমনীয় অঙ্গীকার এবং ১৯৭১-এর মার্চের ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চের ভাষণ সব কিছুই জাতিকে দ্রুত স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবের মতো অতো বিশাল মাপের নেতৃত্বও আর আসেনি। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ’৭১-এর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সবটাই আওয়ামী লীগের একক কৃতিত্ব বলে যে দাবি তা ইতিহাস বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে শেখ মুজিবের বিপরীতে জিয়াউর রহমানকে দাঁড় করানোর যে প্রবণতা তা নেহায়েতই হাস্যকর। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তার যেটুকু ভূমিকা ছিল সেটুকু স্বীকার করতে আমাদের কার্পণ্য থাকা উচিত নয়। শেখ মুজিবের নাম করে তিনি যে রেডিও ভাষণ দিয়েছিলেন (২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল, চট্টগ্রাম), তা সেই সময় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু একজন  মেজর ডাক দিলেন আর সবাই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল গোড়া থেকেই। এখানে বামপন্থী বলতে আমি কমিউনিস্ট পার্টি এবং মওলানা ভাসানীকে বোঝাচ্ছি। মওলানা ভাসানী একদা মুসিলম লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান-পরবর্তীকালে ভাসানীর যে উত্তরণ ঘটেছিল তাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং শ্রমিক কৃষক মেহনতী মানুষের সমর্থক ও প্রচারক এবং কমিউনিস্টদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। তাই পাকিস্তান আমলে ভাসানীই ছিলেন সব বামপন্থীর নেতা। ষাটের দশকে কমিউনিস্ট শিবিরে বিভক্তি ও বহুধা বিভক্তি এসেছিল। কমিউনিস্টদের কোনো কোনো অংশের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্কের অবনতিও হয়েছিল। আবার কমিউনিস্টদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্বও উপস্থিত করেছিল। এই সব কারণে বুর্জোয়া ইতিহাসবিদ ও বুর্জোয়া লেখক এবং মিডিয়ার পক্ষে সহজ হয়েছিল বামপন্থীদের সম্বন্ধে একটি নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরে ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করা। এই প্রবন্ধের খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বামপন্থীদের ভূমিকা কিছুটা হলেও তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

দুই.

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যে পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল এবং যে পাকিস্তানের পক্ষে এই বাংলার মুসলমান জনগণ রায় প্রদান করেছিল ১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে ভোটদান মারফত, সেই পাকিস্তান সম্পর্কে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দ্রুতই মোহ ভাঙ্গতে শুরু করে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে অনেকটা কলোনির মতো ভাবতে শুরু করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও লুণ্ঠন, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন- এগুলো সব শ্রেণীর মানুষের অভিজ্ঞতায় আসতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও সংগঠিত হতে থাকে। পাকিস্তান আমলের প্রথম পর্বেই গড়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলন। বাঙালির ভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়া এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে মতলব এটেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তা একেবারে আপনাআপনি হয়নি। ভাষা আন্দোলনের পেছনেও ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টি। সামনের কাতারে থেকে যারা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরবর্তী জীবনে তাদের অধিকাংশ বামপন্থী শিবিরের সঙ্গেই ছিলেন।

স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গটি প্রায় প্রথম থেকেই উত্থাপিত হয়েছিল। সেক্ষেত্রে এককভাবে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৪৮ সালেই মওলানা ভাসানী প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদে প্রদেশের জন্য অধিকতর ক্ষমতার দাবি উত্থাপন করে বলেন, ‘ব্রিটিশের শাসন মানি নাই, এবারও কেন্দ্রের হুকুমদারী মানবো না।’ ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল সেই দলের সেই সময়ের কর্মসূচিতেও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছিল। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগেই দলটির নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণেরও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উত্তরণের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই রকম একটার পর একটা পথ অতিক্রম করেই চব্বিশ বছরের মাথায় এসে জনগণ প্রস্তুত হয়েছিল সেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে- যে পাকিস্তানের জন্য একদা এই দেশের জনগণই ভোট দিয়েছিল।

১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রায় একই সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই দলে যোগদান করেন। তার আগে তিনি করাচিতে বসবাস করছিলেন। সেখানে তিনি জিন্নাহ মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি বিবৃতির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে দাবি করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে কোন নেতৃত্ব ও কোন শ্রেণীর কি ধরনের ভূমিকা ছিল তা বোঝার ক্ষেত্রেও এই সব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন ও ২১ দফা দাবি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, যদিও সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা ফজলুল হকের বিরোধিতার কারণে যুক্তফ্রন্টে কমিউনিস্ট পার্টিকে নেয়া হয়নি। ২১ দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্ব সহকারে এসেছিল।

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে সমঝোতা করে মাত্র ১৩ জন সংসদ সদস্য নিয়েও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি বোল পাল্টালেন এবং আওয়ামী লীগের এতদিনকার মেনিফেস্টোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। একটি হলো বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে। আরেকটি হলো স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে। সোহরাওয়ার্দী সাম্রাজ্যবাদী সামরিক চুক্তি যথা পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি সিয়াটো-সেন্টোর সমর্থনে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের দালালি করেছিলেন। মওলানা ভাসানী নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ভাসানী ও বামপন্থীরা ছিলেন বরাবরই দৃঢ়ভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। বাঙালি বুর্জোয়া নেতৃত্ব কখনোই এতো দৃঢ়তার সঙ্গে ও এতো স্পষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিতে পারেনি।

স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে মওলানা ভাসানী ও তার কমিউনিস্ট বন্ধুরা বরাবরের মতোই দৃঢ় ছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী বললেন, পাকিস্তানের সংবিধানে নাকি ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হয়েছে। জনগণকে বোকা বানানোর এবং জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে দেয়ার এটা ছিল অনৈতিক কৌশল। সেই সময় বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী যে ঐতিহাসিক ‘আসসালাম ওয়ালাইকুম’ উচ্চারণ করেছিলেন সেটাই ছিল প্রথম প্রকাশ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার হুমকি। যদি ঐতিহাসিকভাবে বিচার করতে হয় তাহলে দেখবো যে এটাই ছিল প্রথম স্বাধীনতার ডাক। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য সময় তখনো প্রস্তুত ছিল না। এর ঠিক ১০ বছর পর ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ব্যাখ্যা করে খুবই র‌্যাডিক্যাল ছয় দফা পেশ করেছিলেন তখন তা সারাদেশে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিল। অথচ ১৯৫৬ সালে দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিনের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান উপরোক্ত দুটি প্রশ্নেই সোহরাওয়ার্দীর সমর্থনে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে ভাসানীকে ত্যাগ করতে হলো নিজের হাতে গড়া দল এবং তিনি গঠন করলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা সংক্ষেপে ন্যাপ।

১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ছয় দফা দেয়ার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে দৃঢ় ছিল না। অন্যদিকে ভাসানী ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবিতে ছিল অবিচল। ষাটের দশকে আন্তর্জাতিকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলন দ্বিধাবিভক্ত হলে, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু কমিউনিস্টদের সব অংশ পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন।

১৯৬৬ সালে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল। সুখেন্দু দস্তিদার-মহম্মদ তোয়াহা-আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন মার্কসবাদী লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে (১৯৬৭) গৃহীত কর্মসূচিতে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার’ শ্লোগান তোলা হয়েছিল। এই প্রথম কোনো একটি পার্টি তার লিখিত দলিলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ষাটের দশকে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেখানে বলা ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে একই সঙ্গে বিপ্লব হবে না। তার মানে প্রকারান্তরে কমিউনিস্টদের উভয় অংশেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বতন্ত্রভাবে বিপ্লবের কথা ভেবেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীন হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, এমন ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন বামপন্থীরাই। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি তুলে ধরার পর আওয়ামী লীগের তরুণ অংশের মধ্যে একটা নতুন অবস্থা তৈরি হয়েছিল, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

’৬৮-’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উল্লম্ফন ঘটেছিল। কিন্তু তখনো প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক আসেনি। অবশ্য সেই সময় কমিউনিস্টদের বিভিন্ন অংশ এবং তাদের ছাত্র সংগঠনসমূহ স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার শ্লোগান তুলেছিলেন। সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন বাংলার স্বাধীনতাকে মূল কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৯৭০ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের একাংশের নেতৃত্বে পল্টনের জনসভা থেকে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’র কর্মসূচি প্রকাশ্যে উত্থাপন করা হয়েছিল। এটাই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। এর জন্য উক্ত সভায় বক্তৃতা করার অপরাধে সামরিক আদালত কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননকে সাত বছর কারাদন্ডে দন্ডিত করেছিল, তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করে। একইভাবে মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ এক বছর কারাদন্ডের সাজা লাভ করেছিলেন (অনুপস্থিতিতে)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্র এই ভাবেই প্রস্তুত হয়েছিল এবং সেখানে যে বামপন্থীদের বিশাল ভূমিকা ছিল তা ভুলে গেলে অথবা তাকে ছোট করে উপস্থিত করলে তা হবে ইতিহাসকে অস্বীকার করা। আজকাল ইতিহাস বিকৃতির কথা উঠছে নানাভাবে। বড় বড় বুর্জোয়া দল নিজের মতো করে ইতিহাস লিখতে চায়। তার মধ্যে সত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ আছে। বুর্জোয়া দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে ইতিহাসবিকৃতির অভিযোগ তোলে। কিন্তু সব বুর্জোয়া দলই বামপন্থীদের ভূমিকাকে অস্বীকার বা ছোট করে দেখানোর ক্ষেত্রে ঐকমত্যে রয়েছে।

তিন.

১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো পরিপূর্ণভাবে লেখা হয়নি। এ কথা ঠিক, এ যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের হাতে। ইতিপূর্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র বিজয়ের কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়টি তখনি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। তারাই গঠন করেছিল প্রবাসী সরকার। আর শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানে আটক থাকলেও যুদ্ধরত মানুষের জন্য তিনিই ছিলেন সব অনুপ্রেরণার উৎস।

কিন্তু এতদসত্তে¡ও এ সুমহান যুদ্ধকে আওয়ামী লীগের একক অবদান বলে চিত্রিত করার যে প্রয়াস দেখা যায়, তা সর্বৈব ভ্রান্ত! এই মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেকগুলো স্রোত ছিল। বামপন্থীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ যুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব হাজির করেছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এই দুই কারণে বামপন্থীদের বিশাল অবদান কিছুটা খাটো হয়ে গিয়েছিল। বুর্জোয়া লেখকরাও এ কথাকে সামনে এনে বামপন্থীদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার সুযোগ পেয়েছেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যে নানাবিধ স্রোত  ছিল তার সবটার খবর প্রবাসী সরকার জানতো না এবং সরকারি মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেও সবটা ছিল না।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছোট ছোট সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। মার্চের শেষ সমপ্তাহেই প্রথমে থানার রাইফেল নিয়ে এবং পরে পশ্চাৎপসরণরত বাঙালি সৈনিক ও ইপিআর সদস্যদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করে শিবপুরে গঠিত হয়েছিল মুক্তিফৌজ। তখনো প্রবাসী সরকার গঠিত হয়নি। কিন্তু সে জন্য নরসিংদী জেলার শিবপুরের মুক্তিকামী তরুণরা অপেক্ষা করেননি। মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শিবপুরের এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল অসম সাহসী এক মহান যুদ্ধ, যার পরিচালনায় ছিলেন বামপন্থীরা। এ রকম বামপন্থীরা এবং অন্যরাও বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন যা এখনো পর্যন্ত লিপিবদ্ধ করে ইতিহাস রূপে তুলে ধরা হয়নি।

১৯৭১ সালের ১ ও ২ জুন কলকাতার বেলেঘাটায় যুদ্ধরত কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দল এবং গণসংগঠনসমূহ মিলিত হয়ে গঠন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি। এ সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণাপত্র তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকার করেই সমন্বয় কমিটি সরকারকে সহযোগিতাও যেমন করবে, তেমনি স্বতন্ত্রভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এ সমন্বয় কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দল ছিল ন্যাপ (ভাসানী) ও ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ যার নেতৃত্বে সারাদেশে ১৪টি সশস্ত্র ঘাটি এলাকা ছিল। প্রধান ঘাটি ছিল নরসিংদী জেলার শিবপুরে। সীমান্ত থেকে বহু দূরে ও রাজধানীর নিকটস্থ এ শিবপুরে অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছে এবং অনেক শহীদ হয়েছেন। এ অঞ্চলের বামপন্থী বিপ্লবীরাই ডিসেম্বরে নরসিংদীতে অবস্থিত পাকিস্তানের মিলিটারি ক্যাম্প দখল করেছিলেন। শিবপুরের যুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এই যুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বই রচনা করেছেন হায়দার আনোয়ার খান জুনো – ‘একাত্তরের রণাঙ্গন-শিবপুর।’ এ বইটিকে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরা যেতে পারে এবং বামপন্থীদের অধীনস্থ ঘাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসনিক সামাজিক ব্যবস্থা কেমন ছিল তার একটা ধারণাও পাওয়া যেতে পারে।

শিবপুর থেকে অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। এছাড়া ভারতের কলকাতা ও আগরতলা থেকেও মুক্তাঞ্চলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা হয়েছিল। সমন্বয় কমিটির যুদ্ধ কৌশল ছিল দ্বিবিধ। এক. দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা ঘাটি গড়ে যুদ্ধ করা। সেক্ষেত্রে প্রধানত শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রই ছিল আমাদের অস্ত্র সংগ্রহের প্রধান উৎস। আমরা ভারত সরকারের কোনো রকম সাহায্য পাইনি। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে মুক্তিবাহিনীর মধ্যে আমাদের কর্মীদের ঢুকিয়ে দেয়া। কারণ মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুট করার ক্ষেত্রে বাম কমিউনিস্ট ন্যাপ কর্মীদের বাদ দেয়ার নির্দেশ ছিল। তবে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নুরুজ্জামান (তিনি নিজেও মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন), মেজর জলিল, মেজর মনজুর আহমেদ প্রমুখের যথেষ্ট সহযোগিতা আমরা পেয়েছিলাম। তারা বামপন্থীদের ঘাটি এলাকায় অস্ত্র সরবরাহ পর্যন্ত করেছিলেন। বামপন্থীদের পক্ষে সবচেয়ে আন্তরিক ছিলেন সেক্টর কমান্ডার কর্নেল নুরুজ্জামান।

বামপন্থীদের আরেক অংশ মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলিতভাবে বাহিনী গড়ে তুলেছিল, যা ছিল সরকারি মুক্তিফৌজ থেকে স্বতন্ত্র। ভারত সরকার তাদের স্বতন্ত্রভাবে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মৈত্রীর কারণে ভারত সরকার এটা করতে বাধ্য হয়েছিল। সিপিবির মনজুরুল আহসান খান এই বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন যার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপের সাতজন সদস্য বেতিয়ারার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

বামপন্থীদের অন্যান্য অংশের মধ্যে সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন মুক্তিসেনারা বরিশাল ও ঢাকার কয়েকটি অঞ্চলে সাহসী যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ সম্পর্কে মূল্যায়নে ভ্রান্তি থাকলেও ইপিসিপি-এর বিভিন্ন অংশও বিচ্ছিন্নভাবে সাহসী যুদ্ধ করেছেন। যেমন নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকায় যথা চর জঙ্গলিয়া ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে ঘাটি এলাকা তৈরি হয়েছিল মহম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বে।  সশস্ত্র তৎপরতা রামগতি ও সুধারাম থানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

দেবেন শিকদার, আবুল বশারের নেতৃত্বাধীন বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির বিএম কলিমুল্লাহর নেতৃত্বে চাঁদপুরে এক বিশাল বাহিনী ও ঘাটি এলাকা গড়ে উঠেছিল।  ঢাকায় যুদ্ধরত ক্র্যাক প্লাটুনেও ছিলেন বামপন্থী ছাত্র কর্মীরা। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটির অধীনস্থ বরিশাল অঞ্চলের যুদ্ধ (অধ্যাপক আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন), কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম অঞ্চলের যুদ্ধ, বাগেরহাটে রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ও বিশাল গেরিলা বাহিনী এবং সাতক্ষীরার তালা থানায় কামেল বখতের নেতৃত্বাধীন গেরিলা সংগ্রাম বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। এ সংক্ষিপ্ত রচনায় সেই আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের বিশাল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ হবে। এ জন্য এখনো যারা জীবিত আছেন, তারা লিখতে পারেন। এছাড়াও মিডিয়া ও গবেষকরাও এগিয়ে আসতে পারেন।

এ ছোট নিবন্ধটি লিখতে লিখতে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল কামেল বখতের বুদ্ধিদীপ্তি ও তারুণ্যে ভাস্বর চেহারাটি। তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার তালা অঞ্চলে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির সংগঠক। তালায় তার নেতৃত্বে বিশাল মুক্ত অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। নভেম্বরের কোনো এক সময় তিনি এসেছিলেন কলকাতায় আমার সঙ্গে দেখা করতে এবং তালার পরিস্থিতি সম্পর্কে রিপোর্ট করতে। ঠিক হয়েছিল আমিও যাব তালায়। দিন তারিখ ঠিক হয়েছিল। যাওয়ার পথ জানা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখের আগেই আরেকটি খবর এলো। কামেল বখত নিহত হয়েছেন। শোনা গেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো অংশ ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল বিশ্বাসঘাতকতা করে।

এ রকম আরও অনেকের কথাই মনে পড়ছে। সব নাম লেখা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও সব নামই সংরক্ষিত হওয়া দরকার। বেশি দেরি হলে শহীদদের নামও হারিয়ে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধে যার যা অবদান তা যেন আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখি। বামপন্থীদের ভূমিকাসহ সবার ভূমিকাকেই ইতিহাসের পাতায় স্থান দিতে হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অবিকৃত ইতিহাস তুলে ধরার কাজটিই হবে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সৎ রাজনীতিবিদদের কর্তব্য।

বন্ধ করুন সুন্দরবন বিনাশী কর্মকান্ড

ম. ইনামুল হক :

সুন্দরবনের শেলা নদীতে আবার জাহাজডুবি। গত ১৯ মার্চ দিবাগত রাতে সি হোর্স-১ নামের এই জাহাজটি ১২৩৫ টন কয়লা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নোয়াপাড়া যাবার পথে তলা ফেটে গেলে ডুবে যায়। এর ফলে নদীর পানি, এর মাছসহ জলজ প্রানী ও জীবসমূহের কি ক্ষতি হয়েছে এবং হবে তা’ হিসেব করা কঠিন। তবে সুন্দরবনের এই নৌ পথে এই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় রয়েছে। এর আগে ২০১৪ সুন্দরবনের চান্দপাই রেঞ্জের ভেতরে সাউদার্ণ স্টার-৭ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ তলা ফুটো হয়ে ডুবে গেলে ৩,৫৭,৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সুন্দরবনের নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক দূষণ। সুন্দরবন ২৬৯ প্রজাতির বিচিত্র পাখি, ডাঙ্গার প্রাণী, মাছ ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল এবং ৩৩৪ প্রজাতির বিশেষ গাছপালার বন। ১৮৭৫ সালে একে ‘সংরক্ষিত বন’ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে এর স্থলভূমি মোট ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে জলভূমি মোট ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭৭ সালে সমুদ্র তীরবর্তী মোট ৩২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি ‘বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯২ সালে একে রামসার সাইটভুক্ত এবং ১৯৯৭ সালে একে ইউনেস্কোর World Heritage Sites এর তালিকাভুক্ত করা হয়। তাই কোনরকম দুর্ঘটনা যা’ এই এলাকার জীব পরিবেশকে বিপর্যস্ত করতে পারে তা’ যে কোন সচেতন ও সংবেদনশীল ব্যক্তির কাছে উদ্বেগের বিষয়।

সুন্দরবন বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হওয়া সত্বেও এর অতি নিকটে রামপালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথভাবে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। এই প্রকল্প সুন্দরবনকে ধ্বংস করে, এলাকার জলপরিবেশ, জনগণের কৃষিজমি বিনাশ করে, এলাকার মানুষকে উদ্বাস্তু ও নিঃস্ব করে সম্পূর্ণ ভারতীয় স্বার্থে হচ্ছে। কেবল সরকারী উদ্যোগে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নয়, ওরিয়ন কোম্পানীর আরেকটি কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর নড়াইল ও সাতক্ষীরা এলাকায় যেসব শিল্প কল কারখানা আছে ও ক্রমশঃ গড়ে উঠছে, সেগুলির পরিচালন জনিত এবং নদীপথে জাহাজ চলাচল জনিত বর্জ্য সুন্দরবন ও তার আশেপাশের অনন্য জলপরিবেশকে নষ্ট করছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বলেছেন, ‘বাগেরহাটের রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবনের কিছু ক্ষতি হবে, কিন্তু পিছিয়ে আসা যাবে না।’ তা’হলে বাংলাদেশে সরকার রয়েছে কেন? জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবী করে যাঁরা ক্ষমতায় বসে রয়েছেন, তাঁরা কোন কথা বলছেন না কেন?

সুন্দরবনে গত ১৯ মার্চ জাহাজডুবির পর নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, এরপর থেকে শেলা নদীতে আর কোন কার্গো জাহাজ চলবে না। তাঁর এই কথাটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য? সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয় সে জন্যে এর উত্তর দিয়ে মংলা নদী থেকে ঘাসিয়াখালী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার কাটা যে গুরুতত্বপূর্ণ নৌ রুটটি আছে এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর থেকে চালু করা খালটি ব্যবহার করলে সুন্দরবনকে এড়িয়ে যাতায়াতের দৈর্ঘ কমে যায় এবং আর্থিক ও সময়ের দিক থেকে প্রভুত সাশ্রয় হয়। বরিশালের গাবখানের সাথে মিলে মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ভারত বাংলাদেশের নৌ প্রটোকল অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক রুটও বটে। এই পথ দিয়েই ভারত নদীপথে আসামে পণ্য আনা নেয়া করে। মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি ৪০ বছর ড্রেজিং ছাড়াই চলেছে। এই রুটটি ২০০১ সাল থেকেই নাব্যতা হারাতে থাকে। ২০০৯/১০ সালে বিআইডাব্লিউটিসির রকেট স্টীমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পণ্যবাহী জাহাজগুলি জোয়ার ভাটা হিসাব করে চলাচল করলেও ২০১১ সালে রুটটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথটি চালু করা হয়। এরপর থেকে মংলা ও খুলনা এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজগুলিকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীপথে ১৫০ কিলোমিটার পথ বেশী পাড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে।

হিমালয় থেকে আসা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশে রয়েছে মৌসুমী বায়ু প্রভাবিত ছয়টি ঋতুর বিশেষ প্রকৃতি। কিন্তু উন্নয়নের নামে বাংলার এই প্রকৃতি আজ শেষ, খাল বিল নদী নালা, গরু ছাগল মাছ পাখী শেষ, এমনকি গাছপালা ফল শস্যও শেষ। সারা বিশ্বে এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এলাকাগুলিই সবচেয়ে মূল্যবান, যার মধ্যে সুন্দরবন একটি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে এই সুন্দরবনের ক্ষতি করবে তা’ আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি। আমরা বলেছি, কেন্দ্রটি মারাত্মক বায়ুদূষণ করবে, মিঠা ও লোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট হবে, জাহাজ চলাচলের কারণে বর্জ্য ও শব্দদূষণ হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি; ফলে সুন্দরীসহ সুন্দরবনের গাছপালা ধ্বংস হবে, বাঘ ও অন্যান্য স্থলজ প্রাণীরা বাসস্থান হারাবে, মাছেরা লোপাট হবে, পাখীরা থাকবে না। বাংলাদেশে সুন্দরবন প্রকৃতির শেষ নিদর্শন। সুন্দরবন শেষ হলে বাংলাদেশ শেষ হবে। আমরা তাই সুন্দরবনকে শেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চাই না।

মংলা ঘষিয়াখালী নৌ রুটটি বন্ধ হবার পর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীর নৌপথটি চালু করায় স্থানীয় জলজ ও বন পরিবেশের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে বলে পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়ে আসছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও এই পথটি বন্ধ করার কথা বারবার বলা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। গত ১৯ মার্চ জাহাজ ডুবির পর শেলা নদী দিয়ে কার্গো জাহাজ বন্ধ করার সরকারী সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকে সেটাই দেখবার বিষয়। (প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকচেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইন্সটিটিউট)

বিএনপি’র কাউন্সিল : এসব কী শুধুই কথার কথা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু :

ক্ষমতা হারানোর সাত বছর পরে এবারের কাউন্সিলে বিএনপি প্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হতে পারে তাঁর দিব্যদর্শন ঘটেছে। নাকি তিনি আর দশ কথার মত অনেকগুলি নীতি নির্ধারনী বিষয়ে বক্তব্য দিলেন, যার মর্মার্থ সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ শোনার অপেক্ষায় রইলাম। তাঁর ভাষণ লিখিয়েদের ধন্যবাদ, অনেকগুলি মৌলিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের অবতারনা করা হয়েছে, নব্বইয়ের শীত মৌসুমে এরশাদ পতনের পর জোটগত ও দলগতভাবে যেগুলি বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে খালেদা বা হাসিনা সরকার বিকাশমান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দেশকে নিয়ে গেছেন উল্টো যাত্রায়।

কাউন্সিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরনে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে”।

এই বক্তব্য খালেদা জিয়ার! এটি অবিশ্বাস্য! এটি শুনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই বক্তব্য তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস বা ধারন করেন? যার দলে গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এক হাজার একটা প্রশ্ন আছে তিনি বলছেন, ক্ষমতায় গেলে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। বিএনপির গঠনতন্ত্র যদ্দুর জেনেছি দলে চেয়ারপার্সন নিরঙ্কুশ, এবারের কাউন্সিলেও সেটি প্রমানিত। কাউন্সিল তাঁকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেভাবে চান সেভাবেই কমিটি গঠিত হবে।

দলে এরকম অবিসংবাদিত ক্ষমতার অধিকারী কোন ব্যক্তি সরকারের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতায় আসীন হলে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আজকের সামগ্রিক সংকটের মূলে রয়েছে ব্যক্তির হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পূঞ্জিভূত হওয়া। গত সাত বছরে প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিষয়ে প্রতিদ্বদ্বীকে ইঙ্গিত করে যদি খালেদা জিয়ার এই দিব্যদর্শন ঘটে থাকে, তাহলে প্রথমেই দলের অভ্যন্তরে তাঁর সীমাহীন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য এনে সততার পরীক্ষা দিতে হবে। প্রমান করতে হবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিনি আসলেই বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য চান এবং ক্ষমতায় গেলে তিনি এভাবেই সেটি করতে চান।

কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের পুণঃনির্বাচন প্রমান করেছে তাদের প্রতিপাদ্য “মুক্ত করবই গণতন্ত্র” কতটা অসাড়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জয়-জয়কারের এই দেশে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দলে প্রতিদ্ব›দ্বীতাহীন, ক্ষমতায় থাকলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ আর নতুন কিছু নয়। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নিয়ে তাদের হা-হুতাশ এবং সমালোচনার নৈতিক অধিকার এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে। অপর  অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা এতে খুশি, তিনি বলেছেন, “নাটকটা ভালই করেছে”।

গোটা কাউন্সিলের দৃশ্যমান একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। ছয় বছর পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। দলের পূর্ণ মহাসচিব হবেন। প্রয়াত: মান্নান ভূঁইয়ার পরে সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ হিসেবে ফখরুল এই পদে বসবেন। সেটি ঝুলে থাকল চেয়ারপার্সনের ইচ্ছায়-অনিচ্ছার ওপর। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত এক বা দ্বিতীয় নেতৃত্বের দলে সাধারন সম্পাদক কিংবা মহাসচিবের পদ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি কমবেশি সকলের জানা। তারপরেও ষাট দশকে তাজউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারনে যধেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়াও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন।

এটি মধ্যপন্থী দল থেকে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া বিএনপির চলমান বিপর্যয় কাটাতে পুরানো নেতৃত্বকেই বহাল রাখা হয়েছে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতামত্ত বিএনপি কখনই ভাবেনি ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সে সময়ে রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র হাওয়া ভবন এবং এর আর্শীবাদপুষ্টরা কাউকেই মানুষ মনে করতে রাজী ছিলেন না। ক্ষমতা হারিয়ে তারেক রহমানের লন্ডন চলে যাবার পরে বিএনপির দোর্দন্ড প্রতাপশালী নেতারা মামলা, জেল ও সরকারের রোষানল থেকে রক্ষা পাবার ক্রমশ: নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাসে উটপাখির মত বালুতে মুখ গুঁজে লুকিয়ে পড়েন।

বহু ধারা এবং মত-পথের সমন্বয়ে গঠিত দলটিতে এখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব সুস্পষ্ট। সাবেক বামরা অনেকটা কোনঠাসা ছিলেন। তবে মির্জা ফখরুল মহাসচিব  হলে এই ধারাটি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ডানদের দৌরাত্মে এই দল সামগ্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে, প্রতিরোধ বা ক্ষমতাসীনদের পুন:নির্বাচনে বাধ্য না করতে পারায়। এটি আরো ত্বরান্বিত হয়, ২০১৫ সালের শুরুতে হরতাল-অবরোধের নামে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করায়। সরকার দেশে-বিদেশে এই সুযোগে বিএনপিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় এবং যৎকিঞ্চিৎ সাফল্য লাভ করে।

দল হিসেবে বিএনপির এই বিপর্যয়, দুর্গতির কারণ তাদের শীর্ষ পর্যায়ে এখনও অনুদঘাটিত। এটি অনুদঘাটিতই থেকে যাবে কারণ, একটি একক নেতৃত্বের পরিচালিত দলে কখনই প্রশংসা ছাড়া ব্যর্থতার মূল্যায়ন হয় না। ফলে জনসমর্থনপুষ্ট এই দল কেন ব্যর্থ হল, কঠিন দুঃসময়ে পতিত হল-এসব বিশ্লে¬ষণ কখনই হবে না। আগেই বলেছি, বহু ধারা ও মত-পথের এই দলকে সমন্বিত রাখতে পারে একমাত্র ক্ষমতা। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে এই কাঠামোর একটি দলে যে যে দুর্গতি এবং দৈন্য হওয়ার কথা তার সবকিছুই এখন বিএনপির গোটা অবয়বে স্পষ্ট।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার সময় জামায়াতের মত একটি অপরাধ প্রবণ দলের খপ্পরে পড়ার মত বৃহৎ ভুল, অক্ষমতা, অন্যায্যতা, অন্যায় সর্বোপরি রাজনৈতিক অপরিপক্কতার কারণে আজকের যে পরিস্থিতি-এর কোন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন নেতা-কর্মীদের সামনে বিএনপি উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। ২০০৯ ও ২০১৬ সালের কাউন্সিলে এর সকল দায় তারা চাপাতে চেয়েছে এক/এগারো সেনা সমর্থিত সরকার ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। দল হিসেবে ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ সময়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে সামগ্রিক ব্যর্থতা উঠে আসেনি।

অনুদঘাটিত, অনির্ণেয় এসব ভুল ও অক্ষমতার পূনরাবৃত্তি অব্যাহত রেখেছে দলটি। দেশের রাজনীতিতে, দলের অভ্যন্তরে-কোন ক্ষেত্রেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়নি গত সাত বছরে কেন তারা একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলো না। এর অনিবার্যতায় সংঘবদ্ধ, সৃজনশীল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় যেতে পারছে না দলটি। এই অচলাবস্থার মধ্যে বাধ্য-বাধকতার একটি কাউন্সিল করছে বিএনপি। যেন এই কাউন্সিল ছিল খালেদা জিয়া আর তারেক রহমানের বিনা প্রতিদ্ব›দ্বীতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য! দলের এমন পরিস্থিতিতে তারা কিভাবে আগামী গণতন্ত্রের সারথী হবে?

রাজনীতির একটি সন্ধিক্ষণে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসন-পুলিশ সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশে মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলের নামটি যারা টিকিয়ে রাখছেন, খালেদা জিয়া কাউন্সিলের আগে তাদের নিয়ে একদিনের জন্যও বসেননি। ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে তাদের বক্তব্য শোনেননি। মাঠ পর্যায়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রণোদনা যোগাতে পারেননি। বিএনপির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জ হবে, মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শীর্ষ নেতৃত্বের দুরত্ব লাঘব।

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির একটি চটকদার শ্লোগান রয়েছে। চটকদার বলা হচ্ছে, কারণ দলটির অবয়বে কোথাও এই শ্লোগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অতীত-বর্তমানে যেসব দলগুলো ছিল তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। কাউন্সিলে বিএনপির শ্লোগান ছিল, “দুর্নীতি দু:শাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ”। সন্দেহ নেই, শ্লোগান হিসেবে এটি অসামান্য ও তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু যে দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দুঃশাসন নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই, তার কোন ব্যাখ্যা-মীমাংসা ছাড়া এরকম শ্লোগান চটক-চমক সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র চায় বিএনপি। এজন্য প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বিএনপিকে, দলে কি গণতন্ত্র চায় তারা? যে দলটির নেতৃত্বই উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, কন্যা-জায়া-জননী সেখানে এই শ্লোগানের অসাড়ত্ব বুঝতে পন্ডিত হওয়া লাগে না। এবারের কাউন্সিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখতে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথে যায়নি।  শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, মাইকে ঘোষণা হবে, হাত উঁচিয়ে সমর্থন ব্যক্ত হবে। অথচ দলটির গঠনতন্ত্রের বিধানঃ জাতীয় কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হবেন।

ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধানেই। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে যে বাক্যটি যুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একচ্ছত্র করা হয়েছিল, বাহাত্তরের সংবিধানে সেই বাক্যের প্রেসিডেন্ট শব্দটি মুছে প্রধানমন্ত্রী বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি আওয়ামী লীগ কখনও স্বীকার করেনি। অপরপক্ষে বিএনপি পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা পর্যন্ত একনায়কতান্ত্রিকতা দুর করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিভাবে আরো নিরঙ্কুশ করা যায়, সেই পথেই হেঁটেছে।

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সামনে এই সুযোগটি এসেছিল যখন দেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরছে। কিন্তু বিএনপি বাহাত্তরের সংবিধানের ৫৫ অনু্েচ্ছদ, যেখানে মন্ত্রীসভাকে নিঃস্ব করে  প্রধানমন্ত্রীকে সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল, সেটি পুণরুজ্জীবিত করে ক্ষান্ত দেয়নি, দলত্যাগ সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদও তারা আরো কঠোর করে (পঞ্চদশ সংশোধনীতে যেটি বাদ পড়েছে), যাতে প্রধানমন্ত্রীর আসন টলে না যায়। সে সময়ে জরুরী অবস্থা জারীতে এবং সংসদ ডাকা ও বাতিল করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান ছিল না, সেটিও যুক্ত করা হয়।

আওয়ামী লীগও এসব ক্ষেত্রে বিএনপিকে অনুসরণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীকে সকল কর্তৃত্ব ও দলে তাঁর নিরঙ্কুশ প্রধান্য বজায় রেখেছে। সুতরাং বিএনপি নেতার বক্তব্য যে কথার কথা নয় সেটি প্রমান করতে অতি দ্রুত সংস্কার কমিটি করে সহসাই তার খসড়া জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে। খালেদা জিয়া কাউন্সিলে শুধু হাসিনামুক্ত নির্বাচনের বিষয়টি স্পষ্ট করলেন, কিন্তু তিনি বা তাঁর দল নির্বাচনকালীন সরকার চায় (তারা অবশ্য এখন আর তত্তাবধায়ক সরকার বলছেন না, বলছেন নিরপেক্ষ সরকার), এর কোন পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা অজতক জাতির সামনে হাজির করতে পারলেন না।