Home » প্রচ্ছদ কথা (page 19)

প্রচ্ছদ কথা

ড. আতিউরের পদত্যাগেই যেন সব শেষ হয়ে না যায়!

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়া, ঘটনা সংঘটিত হওয়ার এক মাসেও অর্থমন্ত্রীসহ সরকারকে বিষয়টি না জানানো প্রভৃতি বিষয় সামনে রেখেই এবং অনেক জল্পনা-কল্পনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করলেন। নৈতিক অবস্থান থেকেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমকে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমকে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীও তার এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করেছে। অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, এখানেই যেন সবকিছুর সমাপ্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেখার বিষয়, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে। সবাই চাইবে, সঠিক তদন্ত এবং তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে উন্মোচন করা হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের লুকোচুরি জনমনে সন্দেহই তৈরি করবে। ঘটনাটি গভর্নরের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সঠিক তদন্তে নজর দিতে হবে এখন, এটি সবাই চায়। এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে এর বিকল্প নেই। অর্থ চুরির সঙ্গে কারা জড়িত, সেটি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থ উদ্ধারেও চালাতে হবে জোর তৎপরতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে রিজার্ভের মোট ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় গেছে ২ কোটি ডলার। তার মধ্য থেকে ১ কোটি ৯৯ লাখ ডলার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাবে (অ্যাকাউন্টে) ফেরত এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকিং সচিব আসলাম আলম। তবে ফিলিপাইনে যাওয়া মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে হদিস মিলেছে মাত্র ৬৮ হাজার ডলারের। অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনে জব্দ হওয়া ছয়টি ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। সেই হিসাবে ফিলিপাইনে চলে যাওয়া মোট অর্থের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ৩২ হাজার ডলারের এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হলো, কিভাবে এই অর্থ ফেরত আসবে, কতো তাড়াতাড়ি আনা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চুরির বিষয়ে এখনো কুলকিনারা না হতেই অর্থ স্থানান্তর দিনক্ষণ নিয়ে দু’রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে এ চুরি হয়েছে ৪ ফেব্রুয়ারি বা ৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ দেশি বিদেশি তদন্ত সংস্থা প্রাথমিক তদন্তে ২৪ জানুয়ারি এ লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে। তথ্যের এ গরমিলে প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
চুরির দিনক্ষণের গরমিলের তথ্যে দু’দিনের ছুটির ফাঁদের যে কথা বলা হচ্ছে -তা সঠিক নয় বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ছুটি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের নিউইয়র্ক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। কিন্তু কাজটি যদি ২৪ জানুয়ারি (রোববার) হয়ে থাকে তাহলে ছুটির ফাঁদে পড়ার কোনো অবকাশ নেই।
ফিলিপাইনের পত্রিকা এনকোয়ারার ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই এই অর্থ চুরি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম এবং সুইফট কোড কন্ট্রোলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩০টি পেমেন্ট অ্যাডভাইজ পাঠায় ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের জন্য। আর এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এর মধ্যে ৫টি অ্যাডভাইজ অনার করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আর এই পাঁচটি অ্যাডভাইজে মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন উদ্ধারের দাবি করলেও এখনো ৮১ মিলিয়ন রয়েছে হ্যাকারদের হাতে।
এছাড়া গত ৯ মার্চ ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার জানায়, আরও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এই অর্থ দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। অবশ্য ঘটনাটি গত মাসের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকাউটেন্স অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগ দু’টি বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত। ওই দুই বিভাগ দেখাশোনায় মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন নির্বাহী পরিচালকও রয়েছেন। সার্বক্ষণিক এ কাজ করার জন্য তাদের বাড়তি সুবিধাও দেয়া হয়। তাহলে ছুটির দিনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যে যুক্তি দেয়া হচ্ছে তা অবান্তর।
ঘটনা তদন্তে সরকার অবশেষে একটি কমিটি গঠন করেছে। দেখার বিষয়, সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকতার সাথে সত্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ খোয়া যাওয়ার বিষয়টিরও সুরাহা নিয়ে সংশয় তৈরি হয় বৈকি। এবারের ঘটনার উপরই নির্ভর করছে সংশয় কাটানোর, তাতে সন্দেহ নেই। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতে কি ধরনের পরিবর্তন আনেন, সেদিকে নজর থাকবে সবার। এ কথা সত্য, সরকার যথেষ্ট ব্যবস্থা না নিলে কোনো গভর্নরের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতি, লুকোচুরি : অনেক প্রশ্ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন : বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনিয়ম ও জনগণের অর্থের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব যাদের সেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রির্জাভের অর্থ খোয়া গেছে। প্রশ্ন উঠছে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও। প্রকৃত ঘটনা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সুইফট কোডের মাধ্যমেই অর্থ লুটের ঘটনা ঘটেছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুইফট কোড নিয়ন্ত্রণ করা হয় ভারত থেকে। অর্থ লুটের পর নিয়ন্ত্রণে জড়িতদের বাংলাদেশে আসতে বলা হলেও তারা আসছে না। সুইফট তথা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন হলো বেলজিয়ামভিত্তিক আন্তব্যাংক আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে আন্তব্যাংক লেনদেনের পরিচিতি শনাক্ত করা হয়- যা মূলত সংকেতলিপি তথা কোডের মাধ্যমে করা হয়। এক্ষেত্রে লেনদেনের তারবার্তা (ওয়ার) এই কোডের মাধ্যমে আদান প্রদান করা হয়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইফট কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে বার্তা (ওয়ার) বিনিময় হয়েছে, সেটি ছিল বিশ্বাসযোগ্য (অথেনটিক)। এখন পর্যন্ত আমাদের নেটওয়ার্ক অপব্যবহার হয়েছে, এ রকম কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। যার মানে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো সুইফট কোড দিয়েই অর্থ সরানো হয়েছে। এক্ষেত্রে সহজেই প্রশ্ন করা সম্ভব যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ কী এই কোড পাঠানোর সঙ্গে জড়িত? তাহলে প্রশ্ন কে বা কারা হলো কে জড়িত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা দাবি করেছেন, ‘সার্ভার বাংলাদেশ থেকে হ্যাকড হয়নি। এটি দেশের বাইরে থেকে হয়েছে, যা আমাদের আওতার বাইরে। তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সার্ভার এরিয়া খুবই সুরক্ষিত। আইডি প্যানেলে ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ও এন্টি-ভাইরাস প্রুফ। এতে সুইফট কোড হ্যাকড হওয়া তো দূরের কথা, এর আইডি প্যানেলে তৃতীয় কোনো পক্ষের প্রবেশ করার সুযোগও নেই। সঙ্গত কারণে হ্যাকারদের মিশন এখানে কোনোভাবেই সফল হবে না। ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষও সাফ জানিয়ে দিয়েছে – তাদের দফতর থেকেও হ্যাকড হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাহলে প্রশ্ন হল- কথিত হ্যাকাররা কীভাবে হ্যাকড করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি করে নিয়ে গেল।
এ পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের খোয়া যাওয়া ৮৭ কোটি ডলার ফিলিপাইনের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পাচার হওয়ার চেষ্টা গত মাসে নস্যাৎ হয়ে যায়। যদিও তার কিছুদিন আগেই একই উৎস থেকে আসা ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেলে ঢুকে পড়ে এবং পরে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) স্থানীয় গ্রাহকদের নামে ছাড় করা হয়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে অনুপ্রবেশকৃত মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক নির্ভরশীল সূত্রে জানা গেছে, শ্রীলঙ্কা থেকে উদ্ধার করা দুই কোটি ডলার গিয়েছিল সে দেশের একটি ব্যাংকে নতুন খোলা এনজিও-র (বেসরকারি সংস্থা) হিসাবে। কনসালট্যান্সি বা পরামর্শক ফি হিসেবে ওই অর্থ স্থানান্তরের ‘পরামর্শ’ গিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকেতলিপি থেকে। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন শক্তিশালী হওয়ায় নতুন একটি হিসাবে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সন্দেহের চোখে দেখেছে। তখন ওই ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আনা হলে সেই অর্থ আটকে দেয়া হয়।
সূত্রটি আরও জানায়, ফিলিপাইনেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়ে জমা হয়। পরে সেখান থেকে অন্য হিসাবে সে সব অর্থ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের দুর্বলতা এবং ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকায় বড় অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেন সত্ত্বেও তা অনায়াসে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে চলে যায়। ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চুরি করা অর্থের বড় অংশই কয়েকটি ক্যাসিনোর হাত ঘুরে ফিলিপাইন থেকে বেরিয়ে হংকংয়ে চলে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের লুকোচুরি: গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুইফট কোডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে মজুদ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে মোট ১০ কোটি ১০ লাখা ডলার শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে পাচার করা হয়। অর্থ পাচারের পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংককে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘটনা জানায় এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেয়। কিন্তু ফিলিপাইনে পাচার হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ লাখ ডলার লুটেরা নিয়ে যেতে পেরেছে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো ৫ ফেব্রুয়ারির এ ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক এক মাসেরও বেশি সময় ধামাচাপা দিয়ে রাখে। এমনকি গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের সংবাদপত্র ‘দি ফিলিপিন্স ডেইলি ইনকোয়ারার’ অর্থ পাচারের প্রতিবেদন ছাপলেও ৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক লিখিত এক বিবৃতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আলোচিত এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে। একই দিন অর্থমন্ত্রী জানান, তিনি সংবাদপত্র থেকে অর্থ পাচারের কথা জেনেছেন, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে কিছুই জানায়নি। প্রশ্ন হলো- এতবড় ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংক কেন এতদিন চেপে রেখেছিল এবং এক মাসেরও বেশি সময় খোদ অর্থমন্ত্রীকেও তারা ঘটনা অবহিত করেনি কেন?
খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো স্পষ্টভাবে খোয়া যাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করেনি। এখনো তারা বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরি করছে। প্রশ্ন হলো, জনগণের অর্থ নিয়ে এত লুকোচুরি কেন? কেন্দ্রীয় সার্ভারের কম্পিউটারগুলো যাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় তারা খুবই প্রযুক্তি দক্ষ। এই সার্ভারের সবকিছু নিয়ন্ত্রণের জন্য কয়েকজন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞও রয়েছেন। যারা সুপার অ্যাডমিন হিসেবে কাজ করেন। আবার তাদের তত্ত্বাবধানে কাজ করেন আরও বেশকিছু অ্যাডমিন। তারা ফাস্টলাইনে থেকে আইডিগুলো পরিচালনা করেন। এদের প্রত্যেকে পৃথক আইডি ও আইপি ব্যবহার করে থাকেন। আবার কাউন্টার চেকিংয়ে তারা সার্ভারে কী করছেন তা প্রধান অ্যাডমিন পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হ্যাকারদের এমন আক্রমণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেই হ্যাকারদের লোক থাকতে পারে। আর এজন্য স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রযুক্তি জানা গোয়েন্দাদের এ অনুসন্ধান ও তদন্তে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্ভারের ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই বোঝা যাবে আসলে কী হয়েছিল। যদিও ম্যালওয়ার ভাইরাস আক্রমণের কথা বলা হচ্ছে। আদৌ কোনো ভাইরাস আক্রমণ করেছিল কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুরো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে। সবচেয়ে আশ্চার্যের বিষয় হলো, দেশে সাইবার বিশেষজ্ঞ দল, র‌্যাবের আইটি বিশেষজ্ঞ, আইসিটি মন্ত্রণালয় থাকা স্বত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক ভারতীয় সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞকে এ কাজে নিয়োজিত করেছে।
সবই জানতেন আরসিবিসি শাখার কর্মকর্তারা: ইনকোয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাকাতি সিটির জুপিটার স্ট্রিটে অবস্থিত ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন বা আরসিবিসি শাখায় মূল লেনদেনের ঘটনা ঘটেছিল। শাখাটির প্রধান এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিষদ বরাবর দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইয়ুচেংকো পরিবার পরিচালিত ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা লেনদেনের একেবারে আদি-অন্ত জানতেন। কয়েক মাস আগে সৃষ্ট ৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তহবিলগুলো জমা করা হয়েছিল এবং তা পেসোতে রূপান্তরিত করতে ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্রোকার ফিলরেমে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এরপর তা আরসিবিসি বরাবর স্থানান্তর করা হয় এবং তা চীনা বংশোদ্ভূত এক ফিলিপিনো ব্যবসায়ীর নামে রাখা হয়। আর সেখান থেকেই সেগুলো ক্যাসিনোতে পাঠানো হয়। ফিলিপাইনের এক সরকারি সূত্রের বরাতে ইনকোয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় ক্যাসিনো হয়ে অর্থগুলো হংকংয়ে জমা করতেন চীনা বংশোদ্ভূত ওই ফিলিপিনো ব্যবসায়ী।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের প্রতিনিধির দাবি, ২০১৫ সালের মে মাসে ম্যানেজারকে ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারাই এ আদেশ দেন। এ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খুলতে গিয়ে আরসিবিসি ব্রাঞ্চের ম্যানেজারকে ৫টি আইডি কার্ড সরবরাহ করা হয়। তবে কার্ডগুলোতে যেসব পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে তার সবগুলোই কাল্পনিক। ঘটনা প্রকাশের পর এখন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এ ব্যাপারে মুখ খোলার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইনকোয়ারার। কারণ তার আশঙ্কা, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সব দায় তার গায়ে দিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে যে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হয়েছে তা বিভিন্ন হাত হয়ে ক্যাসিনোতে চলে যায়। এসব টাকা জুয়ার আসর থেকে আবার নগদ টাকায় রূপান্তরের পর চলে যায় হংকংয়ের একটি অ্যাকাউন্টে। এদিকে আরও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। এই অর্থ দেশটির ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে পাচারের চেষ্টা চলছিল। যদিও ঘটনাটি গত মাসের। কিন্তু ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর এর আগে ১০১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) হ্যাকাররা নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখান থেকে শ্রীলংকার ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করা ২০ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনা হয়েছে বলে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঘটনাও অনেক আগের কিন্তু জানা গেল মাত্র ৭ মার্চ।
পত্রিকাটি বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, ওই ঘটনার মাত্র ক’দিন আগে ৮১ মিলিয়ন ডলার একই উৎস থেকে ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকিং সিস্টেমে ঢুকেছিল এবং তা রিজাল কমার্সিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) এক স্থানীয় ক্লায়েন্টের কাছে আসে। যে ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে। যেখান থেকে গ্রাহকের হাতে চলে যাওয়া টাকা একটি ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারের কাছে পাঠানো হয়েছিল এবং পরে তা সিটি অব ড্রিমস ও মিদাসের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোতে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সে অর্থগুলো জুয়ার আসরে নিয়ে বাজি ধরার উপযোগী করা হয়। আর শেষ পর্যন্ত আবার সেগুলোকে নগদ অর্থে পরিবর্তন করে হংকংয়ের একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
৮৭০ মিলিয়ন ডলার চুরি বানচাল করার পর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফিলিপাইনের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনা। তবে এ ঘটনা নাকি আরসিবিসি ব্যাংকের কর্মকর্তারা আগে থেকেই জানতেন। ফিলিপাইনের এক সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের নেয়া টাকাগুলো স্থানীয় ক্যাসিনো হয়ে হংকংয়ে জমা করেছেন চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপাইনের ওই ব্যবসায়ী। ব্যাংকটির ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের দাবি, ২০১৫ সালের মে মাসে ম্যানেজারকে ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাই এ আদেশ দেন। এ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খুলতে গিয়ে আরসিবিসি ব্রাঞ্চের ম্যানেজারকে ৫টি আইডি কার্ড সরবরাহ করা হয়। যে কার্ডগুলোতে ব্যবহৃত পরিচয় ছিল কাল্পনিক। ঘটনা প্রকাশের পর এখন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য তৈরি রয়েছেন বলে পত্রিকাটি তাদের খবরে প্রকাশ করেছে।
আরও প্রশ্ন: একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের পুরো আর্থিক খাতকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে দলীয় পরিচয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনারও সমাধান হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। কারসাজি করে এখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, যাদের সাথে ক্ষমতাসীনদের কারো কারো সাথে সখ্যতা আছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি সরকার। হলমার্ক, ডেসটিনির মতো নামসর্বস্ব কোম্পানিও সাধারণ জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও তা উদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। সর্বশেষ এটিএম কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে দুষ্কুতিরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বহু উদাহরণ তো রয়েছেই। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হলো, কারসজি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ নেয়ার ঘটনা। কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি, কোনো বিচার শেষ হয়নি, এমনকি কাউকে শাস্তি বা জবাবদিহি করতে হয়নি। এ কারণে দুবৃর্ত্তরা শতগুণ উৎসাহিত হয়ে এ ধরনের কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, তা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও কর্তৃপক্ষ নানা কথা তৈরি করছে, লুকোচুরি করছে বিষয়টি নিয়ে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এ-সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হলেও এত বড় ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর এবং সরকার প্রধান কোনো বক্তব্যই দেয়নি। কাজেই প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি, যে বাংলাদেশ ব্যাংক হরহামেশা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলে, তারা এখন কি বলবেন?

সুন্দরবন – আগ্রাসী উন্নয়নের নতুন শিকার

Sundarbanদেওয়ান মওদুদুর রহমান : প্রাণ ও প্রকৃতির অনন্য এক জাদুঘর আমাদের সুন্দরবন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, স্বাদুপানির ডলফিন, নোনাজলের কুমির, দুরন্ত হরিণ, সুন্দরী, গেওয়া, গরানএসব কিছু মিলিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন হয়ে উঠেছে আশ্বর্য এক বিস্ময়। অথচ এই সুন্দরবনেরই একেবারে নিকটে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প।

প্রায় দু’বছর ধরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ, যৌথ কোম্পানী গঠন, সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ সহ নানা কর্মযজ্ঞ চলতে থাকলেও প্রকৃতিপ্রেমী সচেতন মহলের ধারণা ছিল হয়তোবা কোন এক পর্যায়ে সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে বিধ্বংসী এ প্রকল্প হতে সরকার সরে আসবে। কিন্তু সর্বশেষ গত এপ্রিলে ভারতের সাথে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট তিনটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তিকে অনেকেই দেখছেন কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে।

উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে বিদ্যুৎ। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মানুষগুলোর কাছে গত নির্বাচনে এ সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রতি ছিল বিদ্যুৎ সমস্যা দূরীকরণ। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকট উত্তরণে ১৩২০ মেগাওয়াটের এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে যে সুন্দরবন এলাকাকেই বেছে করা হবে সেটি কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জ্বালানী হচ্ছে কয়লা। কয়লা খনি ব্যবসার প্রসারে পরিবেশ সংরক্ষণের উপায় হিসেবে আধুনিককালে সিসিএস (পধৎনড়হ পধঢ়ঃঁৎব ধহফ ংঃড়ৎধমব) নামে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় সেটি আদতে কোন কাজে আসে না। তাই রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক দূষণ যে বাতাসমাটিপানির মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রাণপ্রকৃতিতে চরমতম আঘাত হানবে তা বলাই যায়। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে প্রয়োজন হবে ৪৭ লক্ষ টন কয়লা যা জাহাজযোগে নিয়ে আসা হবে ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। সুন্দরবনের বুকের উপর দিয়ে বয়ে চলা পশুর নদীর উপর দিয়ে দূষিত কয়লা বোঝাই জাহাজগুলো চলাচল করবে বছরের প্রায় ২৩৬ দিন। এতে পরিবহনকালে কয়লার ভাঙ্গা টুকরা, তেল, ময়লা আবর্জনা দিয়ে সুন্দরবনের পানি দূষিত হবে। সৃষ্ট ঢেউয়ে পাড় ভাঙবে। উন্মুক্ত চলাচলের সুযোগে সুন্দরবনে চোরাই শিকারী বাড়বে। এই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পোড়ানোয় তৈরী হবে বিষাক্ত ধোয়া। যাতে থাকবে সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রজেন অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। এছাড়া আর্সেনিক, পারদ, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, রেডিয়াম এগুলোর মারাত্মক দূষণ তো রয়েছেই। এতে এসিড বৃষ্টি হবে, যা কিনা উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর জন্য মারাতœক হুমকি।

থাইল্যান্ডের মাই মোহ’তে ২৬২৫ মেগাওয়াটের অনুরূপ একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে বৃষ্টির পানিতে সালফেটের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। সালফার দূষণে জমির ফলন কমে গেছে। এসিড বৃষ্টির ফলে ওই অঞ্চলের গাছপালা মরে যাচ্ছে। চীনের সানঝি নগরী এক সময় পরিচিত ছিল ফুল ও ফলের নগরী হিসেবে। অথচ মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে কয়লা দূষণে এখন তা ধূসর পাহাড় আর কালো পানির শহরে পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট ইয়ুগ্যাং গ্রোট্টি’র হাজার বছরের ঐতিহ্য হালের কয়লা দূষণে এতটাই ভঙ্গুর হয়ে গেছে যে, সামান্য স্পর্শেই পাথর খসে পড়ে। তাই যতই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হোক না কেন অনূরূপ ঘটনা সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও ঘটবে।

আধুনিককালে কার্বন দূষণের ভয়াবহতা বিবেচনায় শুন্য নির্গমণ নীতি ব্যবহার করা হয়। অথচ এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে ৯১৫০ ঘনমিটার হারে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের পর ঘন্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার হারে পশুর নদীতে ফেলা হবে। গ্রীষ্মে এ পানির তাপমাত্রা থাকবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর শীতে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এক্ষেত্রে একদিকে কার্বন দূষনে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর অন্যদিকে, তাপীয় দূষণে মাছের বৈচিত্র আশংকাজনকভাবে কমে যাবে। ঠিক এমনিভাবে ইন্দোনেশিয়ার সিলাসাপ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তাপীয় দূষণে মাছের সংখ্যা কমে গেছে প্রায় ৫০ ভাগ।

এ প্রকল্পে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম একেবারে স্পষ্ট। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশাল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণে স্থানীয় মানুষের দাবিদাওয়া আমলে নেয়া হয়নি। ৫ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার ব্যাপারে কোন চিন্তা করা হয়নি। শত শত কোটি টাকার ফসল, গবাদি পশু, হাসমুরগীমাছের খামার আর স্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কোন বিকল্প চিন্তা করা হয়নি। কাজ শুরুর পূর্বে কোন পরিপূর্ণ পরিবেশগত সমীক্ষা রিপোর্ট (ইআইএ) করা হয়নি। আর সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে বাস্তব সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়নি।

প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ হারুণ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে সুন্দরবন ও এর আশেপাশের এলাকায় প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব বিষয়ক একটি গবেষণা করা হয়েছে। এই গবেষণায় পরিবেশগত প্রভাবের দিকগুলো ৩৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই প্রভাব কতটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হবে সেটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। এই ৩৪টি ক্যাটাগরির ২৭ টিতেই পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। ৭টি ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নই একমাত্র বাস্তবিক ইতিবাচক পরিবর্তন। বাকি ৬ টিকে ইতিবাচক হিসেবে বলা হলেও সুন্দরবন ধ্বংসে সে প্রভাবগুলো ‘টনিকে’র মত কাজ করবে। ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে রামপাল ও তদঃসংশ্লিষ্ট এলাকায় নগরায়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও হাট বাজার সৃষ্টি। কিন্তু বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যাংগ্রোভ বনকে ঘিরে যদি শিল্পের প্রসার হয় কিংবা জনবসতি গড়ে ওঠে তবে সে বন আর কতদিন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা ভেবে দেখবার বিষয়।

আধুনিককালে এ ধরণের বড় কোন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মোকাবেলা করা হয় দুই উপায়ে। প্রথমটি হচ্ছে, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থান, যার মাধ্যমে পরিবেশ আইন ভঙ্গের কঠোর শাস্তি দ্রুত সময়ে নিশ্চিত করা যায়। আমাদের দেশে এ দুটি জিনিসেরই বড় অভাব। আর তাইতো বুড়িগঙ্গায় আশ্রয় পায় নর্দমার পানি, গয়নাঘাট খাল ভরাট করে তৈরী হয় বিশাল বিপণী বিতান আর তিতাসের বুক চিরে তৈরি হয় চলাচলের রাস্তা।

যেই উন্নয়নের সিড়ি প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পরিবেশ ধ্বংসের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় সেই উন্নয়ন অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হতে যাচ্ছে সেই উন্নয়নের বাহন যেখান থেকে পাওয়া যাবে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আর বিলীন হয়ে যাওয়া সুন্দরবনের বিস্তৃত ন্যাড়া ভূমি।।

২০১৫ :: জনমনে আতংক উদ্বেগ আর জঙ্গীবাদের নতুন উত্থানের বছর

আমীর খসরু

বছরটি শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক সংঘাতসহিংসতার মধ্যদিয়ে। কারণ ছিল এর আগের বছরের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে। আর বছরটি শেষ হচ্ছে প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান পৌর নির্বাচনকে ঘিরে উত্থাপিত নানা অনিয়ম, আচরণবিধি লংঘন এবং ছোটবড় নির্বাচনকেন্দ্রীক সহিংসতার মধ্যদিয়ে। বছরটি জুড়ে ছিল আগে থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট নানা বিপদ। আর ওই ভারসাম্যহীনতার কারণে রাজনৈতিক শূন্যতা গাঢ় হয়ে বড় সংকটের দৃশ্যমাণ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ওই কারণে বছরটিতে জঙ্গীবাদী কার্যক্রমের নতুন উত্থান ঘটে। আগের চেয়ে শক্তিমান হিসেবে আবির্ভূত হয় তারা এবং নতুন মাত্রায়। পুরো বছরটি জুড়ে রাজনৈতিক শূন্যতার যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে তা আগামীতে কমবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি ও কর্তৃত্ববাদীতার কারণে। বিস্তারিত »

২০১৫ :: রাষ্ট্র এখন শক্তিমানের মিত্র

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Coverদুই হাজার পনের খ্রিষ্টাব্দ। বছরটি ছিল দেবদূত শিশুদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ। কি দেশে অথবা বিদেশে। ২০১৪ এর শেষে ঢাকায় পানির পাইপে পড়ে যাওয়া শিশু জিয়াদের মৃতদেহ আর ভূমধ্যসাগরের কূলে শিশু আয়লান কূর্দীর নিথর দেহ মিলে মিশে একাকার। তফাৎ এই যে আয়লান মরে যাওয়ার পরে ক্ষণিকের জন্য হলেও জেগে উঠেছিল বিশ্ববিবেক, আর বাংলাদেশে বেড়েছে হতাশাবেদনা। জনপ্রতিরোধ হয়ে গেছে স্তিমিত। আর এই ডিসেম্বরের গোড়াতে আরেক শিশু নীরব ম্যানহোলে পড়ে জঞ্জালের মত ভেসে গেছে বুড়িগঙ্গায়। মরে গিয়ে সম্ভবত: বেঁচেছে সে। বিস্তারিত »

রাষ্ট্রকে অধিকতর নিপীড়ক করার অবিরাম প্রচেষ্টা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Coverএক.আমি বলেছিলাম, ভাইয়া যদি খুব টর্চার করে? ভাইয়া বলেছিল,‘তুই তো জানিস আমি কত টাফ। ওরাও সেটা বুঝে গেছে। ওরা আমাকে ব্রেক করার জন্য এমনভাবে টর্চার করেছে বাইরে কোথাও কাটেনি, ভাঙেনি। কিন্তু ভেতরটা মনে হয় চুর চুর হয়ে গেছে! দেখিস আম্মাকে যেন বলিস না এসব কথা’। মা, তুমি জোর করলে, তাই বলে দিলাম। ভাইয়া কিন্তু মানা করেছিল(৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ডায়রি)

একজন মা তার ডায়রিতে লিখেছেন, হৃদয় বিদারক এসব কথা। না, তার সেই ছেলে আর ফিরে আসেনি, যে হত্যাকারীরা তার কোল খালি করেছিল, বহু বছর তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলেনি। বিস্তারিত »

রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না কিন্তু এরশাদ থাকবে সাথে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Cover২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যে এই নিবন্ধটি লেখার সময় বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে (www.bangabhaban.gov.bd) সাবেক রাষ্ট্রপতিদের তালিকাক্রম ৯ ও ১০ নম্বরে জিয়াউর রহমান এবং ১৩ ও ১৪ নম্বরে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নাম দেখা যাচ্ছে। যাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আর কোন স্বীকৃতি দিতে রাজি নন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এরকম সম্বোধন তিনি আদালত অবমাননা হিসেবে মনে করছেন। এর মধ্য দিয়ে দেড় দশককালের সামরিক ও কথিত গণতান্ত্রিক শাসনকে আদালতের রায়ের উল্লেখ করে অবৈধ আখ্যায়িত করছেন। যদিও দেড় দশককালের অবৈধ শাসনামলের বিরোধী দলের ভূমিকায় তার দল সরকার পরিচালনায় অংশ নিয়েছে এবং তিনি নিজে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে জাতীয় সংসদে ভূমিকা পালন করেছেন। অবশ্য এই প্রসঙ্গে তিনি বলেননি সেটি বৈধ কি অবৈধ ছিল।

গত ২৬ নভেম্বর গণভবনে একটি সভায় প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না। বিস্তারিত »