Home » প্রচ্ছদ কথা (page 3)

প্রচ্ছদ কথা

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন কী আদৌ সক্ষম?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারন নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এখনকার জেনারেশন ভুলে গেলেও প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামানের “বিপুলা পৃথিবী” গ্রন্থ করতে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল। ড. আনিসুজ্জামান তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। লিখেছেন তিনি, “…. ৭ মার্চ ১৯৭৩ দেশের প্রথম সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের সন্নিহিত এলাকায়। দুই গাড়ি করে আমরা একসঙ্গে ভোট দিতে গেলাম-উপাচার্য ইন্নাছ আলী, রেজিষ্টার মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, ইংরেজী বিভাগের মোহাম্মদ আলী আর আমি। স্বাধীন দেশে এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি-মনের মধ্যে প্রচন্ড উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেলো। জানলাম, আমাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে”।

এক. বলা যায় ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগন তার স্বাধীন ইচ্ছে প্রকাশ করুক। শাসকশ্রেনী সবসময়ই ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন-শক্তিশালী, যোগ্য করে তুলতে চায়নি। সেই থেকে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রু টি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও এটি গ্রহনযোগ্য মান অর্জিত হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও  অর্থাৎ ২০০৮ সালে হুদা কমিশন যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিবাচকতা অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। যার একটি বড় উদাহরন দশম জাতীয় সংসদ  নির্বাচন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? সঠিক সময়ে, সব দলের অংশগ্রহনে মানসম্মত একটি নির্বাচন কি হবে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম? সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে গিয়ে অজস্র প্রশ্নবোধক ঝুলিয়ে দিয়েও তারা মনে করছেন, ঐ নির্বাচন সুষ্ঠ এবং অবাধ হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের আস্থা অর্জনে সক্ষম হলেও অন্যান্য দল ও জোটের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হচ্ছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, যা এখন আজ-কালের ব্যাপার। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত বছর ২৪ আগষ্ট থেকে শুরু করে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে। আলোচনাকালে দলগুলি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রায় সাড়ে চার’শ প্রস্তাব উপস্থাপনা করেছিল। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটি ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসছে, এবং আসতেই থাকবে অন্তত: নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।

প্রস্তাবগুলো হচ্ছে; ১. নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে? ২. নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করা হবে? ৩. নির্বাচনী আসনের সীমানা পুন:নির্ধারন করা হবে কিনা? ৪. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হবে কিনা? নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দেশের প্রধান দুই দল ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। সম্প্রতি ড. কামালের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট, যার বড় অংশীদার বিএনপি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটও নির্বাকালীন সরকার প্রশ্নে একই মেরুতে।

সরকারী দল ও তার মিত্ররা বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। তারা সবাই এখন এটিকে ‘সাংবিধানিক’ মনে করছেন এবং এর বাইরে চুল পরিমানও নড়বেন না-এই বক্তব্য জোরে-সোরে জানান দিতে ভুল করছেন না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি জোরে-সোরে তুলেছেন। এজন্য তারা প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের কথাও বলছেন।

নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য মনে করে নির্বাচনে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে নিয়োগের প্রয়োজন মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং ক্ষমতাসীন দলও তাই চায়। এ ব্যাপারে অন্যান্য দলের অবস্থান অনড়, তারা ইভিএম ব্যবহার চান না। সীমানা পুন:নির্ধারন প্রশ্নেও তাদের অবস্থান বিপরীত মেরুতে।

দুই. জরুরী প্রশ্নটি হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পর বিরোধী দাবি মেটানোর ক্ষমতা কমিশনের কতটুকু আছে এবং সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার ‘ইচ্ছাশক্তি’ আদৌ আছে কীনা? যদিও সুপ্রীমকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা আছে, সুষ্ঠ-অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন যে কোন আইন করতে পারবে – কিন্তু কোন কমিশনই এ পর্যবেক্ষণকে আমলে নিয়ে কোন আইন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং এই নির্বাচন কমিশনও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নতুন কোন নজির স্থাপন করবে বলে আভাস মেলেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের অতীত বলে, এখানে সবসময় নির্বাচন কমিশন সেই কার্যক্ষমতাই দেখিয়েছে, যেরকমটি নির্বাচনকালীন সরকার চেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলীয় হলে তাদের বিজয়ই অক্ষুন্ন থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। সে অর্থে নির্বাচন কমিশন সব সময় দলীয় সরকারের ইচ্ছেকেই প্রধান্য দিয়েছে।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলেও তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন সেভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্বাধীন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বাংলাদেশে তার কোন প্রমান অতীতে কোন নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলতে পারবে, নির্বাচনকালীন সরকারের ইচ্ছেকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়াসী হওয়ার মত সাহস বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেখাবে- আপাতত: এর চেয়ে দুরাশা আর কি হতে পাবে!

সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে অন্তত তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা অর্জণ করতে পারে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সরকারী কাজে গিয়ে নির্বাচন প্রচারনা চালাচ্ছেন, এটি মেনে নিয়ে কমিশন পূর্বতনদের নজির অব্যাহত রাখছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, অনুকূল পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত: নির্বাহী বিভাগের লাগামটি টেনে ধরতে পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হয় না। ইতিপূর্বে সিইসি আজিজ কমিশন, রকিব কমিশনের সাথে দৃশ্যত: বর্তমানটিও একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেলো নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীনতা ও পরাধীনতার যে নজির রেখে গিয়েছিল সেটি অব্যাহত থাকছে। ফলে ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটালে, মেরুদন্ড সোজা করে না দাঁড়ালে জনগনের আস্থা-বিশ্বাস সহসাই ফেরানো যাবে না।

তিন. এই দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনে কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। এখানে সংসদীয় ধারার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পিষ্ট করেছে জনগনকে। ফলে ক্ষমতাসীন কোন দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারণ দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স প্রকাশিত “বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫” সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত: এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোন নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহুদুরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়।

সংলাপের ফলাফল : ধারনার বাইরে কিছুই ঘটেনি

আমীর খসরু ::

রাজনীতি নিয়ে সামান্য চিন্তা-ভাবনা করেন, ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন এবং সামান্য বুদ্ধি-বিবেচনা যাদের আছে- তারা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীনদের সাথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ও ড. কামাল হোসেনকে শীর্ষ নেতা করে গঠিত জাতীয় ঐক্যফন্টের ‘সংলাপ’-এর ফলাফল নিয়ে বোধকরি অবাক হননি। সংলাপের পরে ড. কামাল হোসেন যেমনটি বলেছেন, ‘বিশেষ সমাধান পাইনি’ এবং মির্জা ফখরুলের ‘আমরা সন্তুষ্ট নই’ ধরনের মন্তব্যের বিষয়টি আঁচ করা গিয়েছিল আগেই। কারণ ড. কামাল হোসেনের চিঠির জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে রাজি হওয়ার বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার একটি কথাই আগাম জানান দিয়েছিল যে, ‘সংবিধান সম্মত’ সব বিষয় নিয়েই তারা আলোচনা করতে রাজি। আর এই ‘সংবিধান সম্মত’ কথাটি উল্লেখ করেই সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, তার একটি  ইঙ্গিত   তাদের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়। ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দিয়েছে তার প্রথম দফাতেই-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে।

এছাড়া অপরাপর যে দাবিগুলো যেমন- নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ অন্যান্য বিষয় কতটা মানা হবে- তা যে কেউই বুঝতে পারবেন। একটি বিষয় বিবেচনা করলেই সংলাপের পুর্বাপর সম্পর্কে সবকিছু পরিষ্কার হবে যে, ক্ষমতাসীন দল ‘সংবিধান’ বলতে বিদ্যমান সংবিধানকেই গণ্য করে। ইতিপূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলসহ যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে- তা তারা বিবেচনায় নেবেন না, এটাই তাদের দিক থেকে স্বাভাবিক।

তাহলে সংলাপের ভবিষ্যৎ কি, সে বিষয়ে যাবার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়ায় প্রয়োজন যে, বিএনপি যদি আন্দোলন সংগ্রামে যথেষ্ট শক্তিশালী ও সক্ষম হতো, রাজপথে সরব থাকতো, ক্ষমতাসীনদের সমান্তরাল প্রতিদ্বন্দ্বী হতো,  প্রথাপ্রতিষ্ঠানগুলো  কিছুটা হলেও পক্ষপাতমুক্ত  হতো এবং রাজনীনৈতিক পরিস্থিতির ওপরে নূন্যতম নিয়ন্ত্রন থাকতো  তাহলে ঐক্যফ্রন্টের নামে তারা সংলাপে যেতোও না, এমনকি সংলাপ চাইতও না। এসব বিষয়গুলো অনুপস্থিত বলেই সংলাপ চাওয়া হয়েছে সমান্তরাল মাঠ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে।

সংলাপের ফলাফল বিষয়ে আরো দুটো বিষয় উল্লেখ করা জরুরি বলে মনে হয়- ১) সংলাপ সরকারের তরফে ডাকা হয়নি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সংলাপের আবদার করেছে। ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ যাতে বিশেষ গুরুত্ব না পায় এবং অন্যান্য দলের সাথে সংলাপের মতোই সমান বলে বিবেচনা করা হয়, সে লক্ষ্যে  এখন সবার সাথে সংলাপ চলবে বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২) নভেম্বরের প্রথমের যেকোনো দিন তফসিল ঘোষণা করার আগে এ ধরনের সংলাপ চালিয়ে যেতে পারলে সরকারই লাভবান হবে, এ কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা- সব পক্ষের সাথে সংলাপ হচ্ছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে এবং এই লক্ষ্যে তারা যে কতোটা আন্তরিক, দেশী-বিদেশী সবাইকে এটা বোঝানো সহজ হবে বলে ক্ষমতাসীনরা মনে করছেন। মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই বলা হচ্ছিল সংলাপের কোনোই প্রয়োজন নেই।

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে সংলাপের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়েছে- এমন নজির নেই বললে চলে। নব্বই পরবর্তী বেসামরিক শাসনের সময়কালেও অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ২০১৩ সালে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেস দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতা এবং সংলাপ প্রচেষ্টাসহ এইবার ধরে এ সময়কালে অন্তত ছয়বার সংলাপ ও মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতের সংলাপে সভা-সমাবেশের অধিকারের যে কথা বলা হয়েছে তা এই প্রথম বলা হলো এমনটি নয়। প্রধানমন্ত্রী এর আগেও প্রকাশ্যে এমন কথা বলেছেন। আর গ্রেফতার-মামলা সম্পর্কে তালিকা চাওয়া হয়েছে। এই তালিকার ভবিষ্যৎ কি হবে সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সঠিক হবে বলে মনে করি না।

তবে বাহবা দিতে হয় এবং সাধুবাদ জানাতে হয় সেই সব মতলববাজ সংবাদমাধ্যম ও কতিপয় কথিত বিশ্লেষককে যারা এই সংলাপকে ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়ে জনমনে উচ্ছাস, উচ্চাশা, সমস্যা সমাধানের আশার-আলো জাগ্রত করার প্রানান্তকর চেষ্টা ও বড় কিছু পাওয়া যেতে পারে বলে ভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন বরাবরের মতোই-তাদেরকে। অবশ্য তারা এখনো যে থেমে থাকবেন, তা নয়।

আর সংলাপ ও নৈশভোজের নিট ফলাফল হচ্ছে- দু পক্ষের এক পক্ষ এখন ‘আন্তরিকভাবে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে; সমস্যার কিছু কিছু সমাধানও হয়েছে’ এবং অপরপক্ষ ‘পাইনি, হতাশ হয়েছি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে’- জাতীয় কথাবার্তা বলে সংলাপকে যে যার মতো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিএনপিসহ যেসব বিরোধী নেতারা টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে থাকেন তারা নেত্রীর বক্তৃতা শুনেছেন সামনাসামনি বসে।

খুব সংক্ষেপে সংলাপের ফলাফল হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভেদ, বিদ্বেষ, অনৈক্য ও চরম বৈরিতার ইতিহাসে আরো একটি নজির সৃষ্টি করা হয়েছে – যা জন-আকাঙ্খার সম্পূর্ণ বিপক্ষে, বিপরীতে।

চরমমাত্রার দমন-পীড়ন প্রহসন ও ভোট-ডাকাতির ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ : ক্যামেরুন স্টাইল

ফরেন পলিসি থেকে

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

রাজা না হয়েও পল বিয়ার বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সময় ধরে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বহাল থাকাটা কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়। তিনি ক্ষমতায় আছেন ৩৬ বছর ধরে, এখন সপ্তম মেয়াদের জন্য ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশকে ‘‘পরিচালনার’’ করার আসল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। সাংবিধানিক পরিষদ তাকে ক্ষমতায় রেখেছে, বিষয়টি এমনও নয়। তিনি রীতিমত ‘‘নির্বাচনে জিতে’’ তবেই ক্ষমতার মসনদে আছেন!

বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতে, যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদন্ডেই গত ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ক্যামেরুনের নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক। ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ভয়াবহ রকমের কম। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভয়ের কারণে কোনো কোনো এলাকায় এক শতাংশেরও কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলে কথিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর পরিচালিত কঠোর দমন অভিযানের ফলে অনেক ভোটকেন্দ্র বন্ধ থাকে, বাকিগুলোতে মূলত সৈন্যদেরই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

তবে ওই  দেশের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া আপনাকে জানাবে, নির্বাচন হয়েছে চমৎকার। আর তাদের বক্তব্যের সমর্থনে ’বাইরের পর্যবেক্ষকদের’ উদ্ধৃতিও দিয়ে হলেও প্রমাণ করতে চাইবে, নির্বাচন হয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ।

গত ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্যামেরুন রেডিও ও  টেলিভিশন (সিআরটিভি) একদল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সাক্ষাতকার প্রচার করে। এতে তারা দেশটির নির্বাচনের প্রশংসা করে একে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করেন। সিআরটিভিতে প্রদর্শিত ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নুরিট গ্রিনজার নামে অভিহিত এক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ক্যামেরুনের নির্বাচনকে ’চরমমাত্রার সুষ্ঠু’ বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার ব্যবস্থা প্রতারণা করার কোনো পথ ছিল বলে আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

তবে এখানে একটু জটিলতা আছে বৈকি; ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ক্যামেরুনে কোনো নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠায়ইনি। আর সিআরটিভিতে যাকে দেখা গেছে, তার সাথে গ্রুপটির কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে খোদ ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ট্রান্সপেরেন্সি’র মুখপাত্র মাইকেল হর্নসবে বলেন, ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচয় দানকারী এই লোক কে, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গেছে। সংগঠনটির মুখপাত্র ফরেন পলিসিকে বলেন, তবে আমি মনে করি, বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করার পরও এক লোক বারবার বলছেন, তিনি আমাদের প্রশিক্ষিত লোক।

অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধতার রঙ দিতে স্বৈরশাসকরা নতুন পদ্ধতি হিসেবে এই আশ্চর্য ব্যবস্থাটিকেই ক্রমবর্ধমান হারে ব্যবহার করছে। বহিরাগতদেরকে ব্যবহার করার এই বিশেষ কৌশলটি এখন দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আবার গণতন্ত্রী হিসেবে ভান করা দুনিয়ার সব স্বৈরাচারের মধ্যে পল বিয়া অন্যতম কড়িৎকর্মা। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনি অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বেশি ভুল করেছেন, কিন্তু তাতে তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বহাল থাকতে কোনো ব্যাঘাত ঘটাবে না।

আফ্রিকায় গণতন্ত্র বিকাশে নিয়োজিত অমুনাফামূলক সংস্থা ‘ভ্যানগার্ড আফ্রিকা’র নির্বাহী পরিচালক জেফরি স্মিথ বলেন, ক্যামেরুন ও অন্যান্য স্থানে সত্যিকার অর্থে যা ঘটছে তা অতি মাত্রায় অবমাননাকর, দমনমূলক। আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার কাজটি কোনো না কোনোভাবে করে নেবে।

এই কৌশলের মধ্যে যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য প্রধান শক্তি যাতে বিব্রতকর হওয়ার মতো কোনো অবস্থায় না পড়ে, সে দিকে নজর রাখা হয়। বিয়ার এলাকাটি ছোট হলেও অত্যন্ত শক্তিধর লবিং গ্রুপ আর গণসংযোগ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাইরের দুনিয়ার কাছ থেকে মর্যাদা কেনার প্রয়াসে তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির মিডিয়া ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সংস্পর্শ বজায় রাখে।

ক্যামেরুনে ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রথম নারী প্রার্থী কাহ উল্লাহ তার দেশকে ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের বিষয়টি মাথায় রেখেই ক্যামেরুনের বিরোধী দল বাস্তবে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, তার দল, আমলাতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও এমনকি বেসরকারি মিডিয়ার বেশির ভাগের (যেগুলো দলের ক্যাডার আর সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনা করে) বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তিনি বলেন, ভোটের দিন আমাদের দলের প্রতিনিধিদের ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া হুমকি, ঘুষ প্রদানের ব্যাপার তো রয়েছেই। বিরোধী দল হিসেবে আমাদেরকে সারাক্ষণ ভোটকেন্দ্রগুলোর পাশে ধাওয়ার শিকার হতে হয়’’।

ক্যামেরুনের সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিল। এই পরিষদের সদস্যদের নিয়োগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান পল বিয়া। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই পরিষদের সদস্যদের অভিযোগ শোনার কথা ছিল। কিন্তু তারা প্রার্থীদের তাদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ দাখিলের সুযোগ না দিয়েই চলে যান।

ক্যামেরুনের উচ্চমর্যাদার অ্যাংলোফোন মানবাধিকার আইনজীবী এনকোনখো ফেলিক্স অ্যাগবোর বাল্লা অতিসম্প্রতি সাংবিধানিক পরিষদে বলেন, যেকোনো নির্বাচনী চ্যালেঞ্জেই আসুক না কেন, রায় যাতে পল বিয়ার পক্ষে যায় সে ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছিলেন। তিনি ফরেন পলিসিকে বলেন, বিচারকেরা যার ওপর নির্ভরশীল, তাকে তো আর ক্ষেপাতে পারে না, তারা তাদের প্রভূর বিরুদ্ধে যেতে পারে না। এসব লোক কখনোই বিয়াকে নির্বাচনে হারতে দেবে না।

বিয়া বছরের পর বছর ক্ষমতায় রয়েছেন তার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার এলিটদের কাছে টেনে, বিভক্ত বিরোধীদের দুর্বল করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে- যারা নির্বাচন নজরদারি করে, তাদের নতজানু করে।

সহিংসতা ও দীর্ঘ দিনের বেপরোয়া দুর্নীতি ক্যামেরুনের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিয়া তার পুনঃনির্বাচনের জন্য প্রধান প্রধান যুক্তি হিসেবে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকানের মতো প্রতিবেশীদের তুলনায় তার দেশের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।  স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাব-সাহারিয়ান আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নাটালি লেতসা বলেন, দশকের পর দশক ধরে বিয়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলে আসছেন, আমাদের প্রতিবেশীদের দিকে তাকান, নাইজেরিয়াকে দেখুন, কী বিশৃঙ্খলা চলছে। আমরা স্থিতিশীল, আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা গর্ব করার মতো শক্তিশালী দেশ।

তিনি বলেন, যেসব তথ্য সম্পর্কে দেশবাসী সহজে জানতে পারে না, সেগুলোই বিয়ার সরকার তোতাপাখির মতো আউরিয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচন : আবার ফিরে আসুক জনআস্থা ও শংকাহীন পরিবেশ

আমীর খসরু ::

গণতান্ত্রিক শাসন যে একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ প্যাকেজ- তা জনগণের মনোজগত থেকে মুছে ফেলতে পারাটাই হচ্ছে  বিদ্যমান গণতন্ত্রের বড় সংকট। অনেক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে একশ্রেণীর শাসকদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টাটি অব্যহত ছিল যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র অর্থাৎ নির্বাচনের অপরনাম গণতন্ত্র – এমন ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা। গণতন্ত্রকে সামগ্রিক বিবেচনা, পরিমন্ডল ও এর ব্যপ্তি থেকে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারাটাই যেমন ওই শাসককূলের জন্য সাফল্যের বিষয়, তেমনি এটাই অগণতান্ত্রিক শাসন বজায় ও জারী রাখা এবং শাসন ব্যবস্থায় জনঅংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা দূরে রাখার লক্ষ্যে ‘‘অগণতান্ত্রিক শাসন’’ একটি কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম একট ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু এর বিপরীতে ওই নির্বাচনকেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বলে প্রতিষ্টিত করার যে প্রচেষ্টাটি শুরু হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সম্ভবও হয়েছে। আর এখান থেকেই সামগ্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটের মধ্যে পড়ে। শুধুমাত্র ওই শাসন ব্যবস্থাই যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রও সংকটের মধ্যে পড়েছে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র এবং পরিপূর্ণ ও পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র এক কথা নয়, এটা হতেও পারে না। কিন্তু কতিপয় শাসক ও ক্ষমতাসীনদের সাফল্য হচ্ছে – ধীরে ধীরে এর বিপরীত কাছটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করতে পারা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের এক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার কারণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি স্তর বা ধাপ হিসেবে গণ্য হতে হবে রাষ্ট্র এবং সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রায় বিদ্যমান গণতন্ত্র রয়েছে এমন রাষ্ট্রে কতৃত্ববাদী শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র -এমন ধারণাটি এখন মোটামুটিভাবে জনমনেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর ফলে জনগণকে যেমন ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে বিতাড়ন করা যায়, তেমনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব যে জনগণের বুঝ-ব্যবস্থার বিষয় বা এতে তাদের অংশগ্রহণ একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, তা মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে এমন ধারণাটি তৈরি করা হয়েছে যে, জনগণ ভোট দেবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত প্রদান তাদের কর্ম নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মূল সংকট- যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।

নির্বাচনকেন্দ্রীক এই ধারণাটি এখন শুধুমাত্র আর দুর্বল, ভঙ্গুর ও স্বল্পমাত্রার গণতন্ত্রের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন দেশে কতৃত্ববাদী শাসকদের মধ্যেও এটি সংক্রামিত হতে শুরু করেছে।

কাজেই গণতন্ত্রের এই পুরো অব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থেকে জনগণকে বাদ দেয়া হচ্ছে,  শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অধিকার বিলুপ্ত হতে বসেছে এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্র এখন আর জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তির’ পর্যায়ে নেই। আর এ কারণেই রাষ্ট্র এখন কতিপয়ের এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন নামক ব্যবস্থাটিও বিলুপ্তির পথে। এটি গণতন্ত্র তো বটেই, খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি সীমাহীন সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনি রাষ্ট্রের সাথে জনগণের একটি বিশাল দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান দুজন ব্যক্তি অর্থাৎ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সামির আমিনকে স্মরণ করা যায়।

অমর্ত্য সেন ‘দ্য আউডিয়া অফ জাস্টিস’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গনতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কন্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ সামির আমিন ‘প্রতিরোধের বিশ্বময়তা’ (ফরাসী ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতি জনসমর্থন’।

কাজেই গণতন্ত্র, শাসক, ক্ষমতাসীনদের মনের মধ্যে ও মনোজগতে সার্বক্ষণিক বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকতে হবে।

দুই.

বাংলাদেশেও আগামী জানুয়ারি নাগাদ একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্য নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে জনগণের মধ্যে এবং দেশে বিদেশে নানা মহলে। যদিও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আদৌ সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনে বিভিন্ন সরকার নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করেছে এবং জনগণকে ক্রমাগত ওই নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকেও দূরে সরিয়ে নেয়ার ও রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ গত কয়েক বছরের নির্বাচনগুলোর পরে জনমনে নির্বাচন সম্পর্কেই একদিকে যেমন শংকা, ভীতির সৃষ্টির হয়েছে, তেমনি নির্বাচন সম্পর্কে একটি অনাগ্রহের আবহ তৈরি হয়েছে। এটি অনেকেরই বিশ্বাস যে, নির্বাচনে জনগণের অংশীদারিত্ব বা অংশগ্রহণ থাকতেই হবে- এই স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের এখন আর প্রয়োজন পড়ে না। তবুও এবারের নির্বাচনটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, একই ঘটনার একইভাবে দ্বিতীয়বার আর ঘটে না।

তিন.

আগামী যে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তা নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি এবং নির্বাচনের একটি আবহ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। তবে মাত্র মাস তিনেক আগে যেমন পরিস্থিতি, পরিবেশ ও প্রস্তুতি প্রত্যাশিত – তা নানা কারণে অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। বিরোধী দলগুলো থেকে বারবার বলা হচ্ছে- নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নেই। বিএনপি দাবি করছে, গেলো কিছু দিনেই নতুন করে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজারের বেশি মামলায় ৮৫ হাজার জনের নাম দেয়া হয়েছে। অজ্ঞাতনামা রয়েছে তিন লাখের বেশি। এসব মামলাকে গায়েবী বলছেন সংবাদমাধ্যমসহ অনেক বিশিষ্টজনরা। আগের মামলা তো রয়েছেই। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলা হচ্ছে দেশে-বিদেশে। সম্প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রীক একটি আইনের খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের সমান সুযোগও অনুপস্থিত বলেই কার্যত দেখা যাচ্ছে। এর  সবকিছু মিলিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশী-বিদেশীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রীক একটি শংকা, সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এরই স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অদ্ভূত এক জোটসঙ্গী এরশাদের কণ্ঠেও। গত শনিবার ঢাকায় এক জনসভায় খোদ এরশাদ বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় আছে। নির্বাচন কখন হবে জানি না।’

শুধু যে রাজনৈতিক দল, দেশী-বিদেশী নানা পক্ষ নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন তা নয়, ঠিক একই সাথে জনগণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাশীল হতে চায়। এখন সরকারেরই দায়িত্ব হবে- হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থাকে পুনরায় যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ নির্বাচন দিয়েই গণতন্ত্রের যাত্রাটি আবার শুরু হোক-এমনটি প্রত্যাশা করা নিশ্চয়ই অন্যায্য হবে না।

‘রাষ্ট্র আমাদেরও’- এই বোধ পুন:প্রতিষ্ঠার স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন

সি আর আবরার ::

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের কিশোরেরা দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় রচনা করেছে। বাংলাদেশের পরিবহন খাতের সব নোংরামি সমাধান করার তাদের অধিকারের বিষয়টি ঘোষণা করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার লোক প্রাণ হারায়, লাখ লাখ লোক আহত হয়। তাদের অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। এসব ঘটে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন করার বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নাগরিক সমাজ দশকের পর দশক করে আহ্বান জানাতে থাকলেও তা  এই খাতের সংশ্লিষ্টদের কানে ঢোকেনি। রাজনীতিবিদ, ভাড়ায় খাটা স্বঘোষিত ইউনিয়নকর্মী ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি লোকজনের সমন্বয়ে কায়েমি স্বার্থেন্বেষী মহল সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক পুলিশ) বজ্রমুষ্টি প্রতিষ্ঠা করেছে, আইন-শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ ভন্ডুল করে দিয়েছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দায়মুক্তি ভোগ করে এই মহলটি আদালতের আদেশ বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ও রুখে দিতেও সফল হয়।

সাধারণ মানুষের এ ধরনের অসহায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের শেষদিকে একটি বাসের চাপায় দুই কলেজছাত্র নিহত হলে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ছাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির, তিনি জাহাজ চলাচল মন্ত্রীও, অনুভূতিশূন্য ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য বিক্ষোভকারীদের বিচার পাওয়া ও সমস্যার সুরাহার ব্যাপারে প্রশাসনের প্রতি আস্থা কমে গিয়ে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়। অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য শহর ও নগরীতে দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে শত শত, হাজারে হাজারে রাস্তায় নেমে এসে বিচার ও রাস্তায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ববরণ কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাতে থাকে। তারা নিবন্ধিত ও চলাচলযোগ্য যানবাহন কেবলমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই যাতে চালাতে পারে, এ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনটির বাস্তবায়নের দাবি জানাতে থাকে।

ট্রাফিক পুলিশের অদক্ষতা ও দুর্নীতি এবং পরিবহন সিন্ডিকেট ও তাদের গডফাদারদের সাথে তাদের যোগসাজসে হতাশ হয়ে ছাত্ররা ঢাকা নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধু হয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ছাত্ররা, মূলত কিশোর, স্কুলের পোশাক পরে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে, রোদ-বৃষ্টিতে প্রচন্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়েও সফলভাবে এমন এক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে যা অতীতে কোনো সময়ই এই মেট্রোপলিটান নগরী দেখতে পায়নি।

নিবন্ধিত ও চলাচল উপযোগী গাড়ি কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে চালানো নিশ্চিত করার কাজটি করে  তরুণ তুর্কিরা। তারা গাড়ির যাত্রীদের সিট বেল্ট বাঁধতে পরামর্শ দিয়েছে, মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরতে, পথচারীদের ফুটপাথ, জেব্রা ক্রসিং, ফুট ব্রিজ ব্যবহার করতে অনুরোধ করেছে। মোড়ে রিকশাগুলো যাতে এলোমেলোভাবে না চলে, তাতেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো প্রধান প্রধান রাস্তায় এক লেনের খালি রাখা হয় জরুরি যানবাহন চলাচলের জন্য।

স্ব-নিয়োজিত কিশোর আইনপ্রয়োগকারীরা ভদ্র, তবে দৃঢ়। যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই এক সিনিয়র মন্ত্রীকে তার পথ পরিবর্তন করে সঠিক পথে চলতে বলে। যথাযথ নিবন্ধন কাগজপত্র সাথে না থাকায় আরেক মন্ত্রীকে তারা গাড়িটি ছেড়ে দিতে বলে। আইন সমুন্নত রাখার চেতনায় যথাযথ নথিপত্র না রাখায় তারা ডিআইজি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও নৌবাহিনীর গাড়ি থামিয়ে দেয়।

তবে গাড়িচালকেরা যখন তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস কাগজপত্র প্রদর্শন করতে চায়নি, তখন কোনো কোনো পরিস্থিতিতে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি ভাংচুর করেছে। কোনো কোনো মোড়ে বিক্ষোভকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যান চলাচলে বিরূপ প্রভাব পড়ে, পথচারীদের বেশ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও ছাত্র বিক্ষোভকারীরা মোটামুটিভাবে নগরবাসীর কাছ থেকে উষ্ণ সাড়া পায়। সামাজিক মাধ্যমে তাদের প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। জনসাধারণ তাদেরকে আশ^স্ত করে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কিছু সমস্যা ও জটিলতা তারা মেনে নিতে প্রস্তুত। অনেকে তো এমনও বলে, যানজটের প্রচন্ড কষ্ট এবং তাদের স্বার্থের সাথে বলতে গেলে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, রাজনৈতিক দলগুলোর এমন মিছিল-সমাবেশের কারণে তাদের যে ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তার তুলনায় এই সাময়িক দুর্ভোগ অনেক ভালো।

কিশোরদের বিক্ষোভ কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাদের জন্য মায়েরা স্নাকস ও বোতলের পানি নিয়ে আসে। এক ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত শিশু বিক্ষোভকারীদের খিচুরি খাওয়াচ্ছেন। এটি কিশোরদের প্রতি সমর্থনের গভীরতা প্রকাশ করে। বিক্ষোভের চতুর্থ দিনে অভিভাবক, মা-বাবাসহ সাধারণ মানুষ র‌্যালিতে যোগ দেয়। যথেষ্ট হয়েছে আর নয়- এই ছিল তাদের কথা। তারা সবাই সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করার দাবি জানায়। বিক্ষোভকারীদের ন্যায়সঙ্গত বক্তব্য সেলিব্রেটিদেরও উদ্দীপ্ত করে। ছাত্রদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পীরাও এগিয়ে আসে। তারা একসাথে জাতীয় কবির উদ্দীপনাময় রণসঙ্গীত ‘চল চল চল’ গায়।

অনেক দিক থেকেই এই বিক্ষোভ অনন্য। কিশোরেরা আবেদনময়ী শ্লোগান, কবিতা ও গান রচনা করে, গায়। এটি আইনের শাসনে প্রতি কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং আইন কিভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে, তারই একটি প্রদর্শনী। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কর্মসূচি নয় এটি, বরং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যে কত জরুরি, তার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যবস্থা। এটি রাজনৈতি ক্ষমতা দাবি করার ব্যাপার নয়, বরং এর মাধ্যমে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিক্ষোভকারীরা প্রমাণ করেছে, দায়িত্ব পালনের সদেচ্ছা ও দায়বদ্ধতা থাকলে রাষ্ট্রীয় অর্থপুষ্ট পেশাদার বাহিনীগুলো দশকের পর দশক ধরে যে কাজ করতে পারছে না, তা-ও করা সম্ভব।

ছাত্ররা সরকারের কাছে তাদের ৯ দফা দাবি পেশ করে। ছাত্রদের ব্যাপক তৎপরতা ও জনগণের কাছ থেকে প্রবল সমর্থন পাওয়ায় সরকার এসব দাবির কিছু অবশ্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এসব দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে মন্ত্রীদের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরও তা রক্ষা করা হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ায় তারা রাজপথ ছেড়ে দিতে অনীহা প্রকাশ করে। কোটা আন্দোলনের প্রতি প্রধানমন্ত্ররি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ধীরে চলো কৌশল এখনো তাদের মনে গেঁথে রয়েছে।

একইভাবে নতুন পরিবহন আইনের প্রতিশ্রুতির প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে অতি সামান্য। অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই তারা মনে করছে, নতুন আইনের ব্যাপারে কথার ফানুশ নয়, বরং প্রয়োজন বিদ্যমান আইন ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া ও সিনিয়র মন্ত্রীদের আন্দোলনটিকে বিএনপি-জামায়াতের ছলাকলা হিসেবে অভিহিত করার ফলে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে আরো সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক দিনে প্রাণঘাতী অস্ত্র হাতে মুখোশধারী লোকদের, তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও শ্রমিক শাখার কর্মী বলে অভিযোগ রয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ পলকা বিশ্বাস আরো কিছুটা ক্ষয়ে দিয়েছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই বৈধ ও জনপ্রিয় নাগরিক আন্দোলন একটি খোলা প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাবে। এই ইস্যুর ন্যায়সঙ্গত, যৌক্তিক ও আশু সমাধানের দায়িত্ব পুরোপুরি সরকারের কাঁধে। এই ঘটনার প্রধান উস্কানিদাতা মন্ত্রীর পদ থেকে কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতির পদ থেকে শাজাহান খানের অপসারণ উত্তপ্ত পরিবেশ অনেকাংশেই প্রশমিত করতো। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার সত্যিকার ব্যবস্থা ও  ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নই সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করবে। ছাত্রদের ওপর যেকোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শন, বিদ্রুপ করা ও শক্তিপ্রয়োগ করা হলে (কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এ ধরনের পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে) পরিস্থিতির আরো ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।

বিক্ষোভকারীদের দখলে থাকা রাস্তায় একটি পোস্টারে লেখা ছিল : ‘রাষ্ট্রের মেরামত কাজ চলছে : সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ আমরা আশা করতে পারি, কর্তৃপক্ষ তাদের আহ্বানে কর্ণপাত করবে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সত্যি সত্যিই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

(সি আর আবরারঅধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

শিশু-কিশোররাই ফিরিয়ে এনেছে সাহস-দ্রোহ আর জীবনের জয়গান

শাহাদত হোসেন বাচ্চু:

রাজধানীসহ সারাদেশ এখন শিশু-কিশোরারণ্য। কিছু প্লাকার্ড চোখে পড়ছে। অসামান্য, অনবদ্য। “উই ওয়ান্ট সেইফ বাংলাদেশ…উই ওয়ান্ট জাস্টিস”- দাবি নিয়ে শিশু-কিশোররা রাস্তায়। এ দাবি আপামর জনগনের; কিন্তু তারা সাহস হারিয়ে ফেলেছে, দ্রোহ অবশিষ্ট নেই। রাস্তায় নেমে আমাদের শিশুরা সেই সাহস-দ্রোহ ফিরিয়ে এনেছে। জীবন থেমে নেই। জীবনের জয়গান ফিরিয়ে আনতে সারা বাংলাদেশ এখন রাস্তায়। প্রতিপক্ষ পুলিশ এবং পরিবহন শ্রমিকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। মন্ত্রী, বিচারপতি, সরকারী কর্তাদের ড্রাইভারদের লাইসেন্স নেই ! শিশুরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে  দিচ্ছে, এক অরাজক বাংলাদেশে কতটা অনিরাপদ আমরা !

এক. লিখতে বসে ভয় হচ্ছে। ভয় পেয়েছেন কর্তারাও। শিক্ষামন্ত্রী স্কুল বন্ধ করে দিয়ে ভয়-তড়াস ঠেকাতে চাইছেন। শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। পিটিয়ে, কাঁদানে গ্যাস-রাবার বুলেট ছুঁড়েও ঘরে ফেরানো যাচ্ছে না অদম্যদের। তারা বিচার চায়। নিরাপদ সড়ক চায়। সরকার বিচার দিতে পারে না, নিরাপত্তা দিতে পারে না। বদলে পিটিয়ে, জখম করে বিচারপ্রার্থীদের দমাতে চায়। আর দাবি মেনে নেয়ার প্রহসন করে !

ভয় হচ্ছে! কতরকম ভয়ে এখানে মানুষ মরছে। প্রকৃতির হাতে মরছে। শক্তির হাতে মরছে। গুম হয়ে, ‘বন্দুকযুদ্ধে মরছে’। অস্বাভাবিকতার হাতে মরছে। দায়িত্ব জ্ঞানহীনতায় মরছে। দেখার কেউ নেই বলে মরছে। চলছে মৃত্যুর মিছিল। আরো মরছে সুশাসনের অভাবে। কি বলবো, “এই মৃত্যুর উপত্যকা আমার দেশ নয়”-বল্লেই কি দেশ বদল হয়ে যাবে? কিংবা আমাদের সন্তানেরা ফিরে পাবে এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড”র মত দেশ?

কোন বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের নীতি-কুশলীরা ভাবছেন? এই দেশ নিয়ে তারা গর্ব করেন উন্নয়নে ভাসিয়ে দেয়ার। স্বপ্ন দেখান মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার। কৌশল নির্ধারন করেন, পরিকল্পনাও গ্রহন করেন। কিন্তু তারা জানেন না এর বাইরেও একটি সমাজ অবয়ব পাচ্ছে। মূলধারার কুশীলবরা সে খবর কতটুকু রাখেন, জানি না। এজন্যই শিশু শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দেখে তারা চমকে উঠছেন। কারণ নব্বইয়ের পরে এই বাংলাদেশকে তারা ভুলেই গিয়েছিলেন।

দুই. রাষ্ট্র-সরকারের সবস্তরে একধরনের ‘অপরাধীকরণ’ (Criminalization)  দৃশ্যমান। আইনের শাসন এবং বিচারহীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অসহনশীলতা এবং বৈষম্য এক দেশকে অনেক দেশে রূপান্তরিত করছে। এর বিপরীতে জন অসন্তোষ এবং মানুষের অধিকারগুলিকে কর্তৃত্ব ও শক্তি দিয়ে দলিত করা হচ্ছে। সরকারের ভেতরের সরকার এই পন্থাকে উস্কে দিচ্ছে, মদত দিচ্ছে আবার চরমপন্থায় দমনও করছে। বিচারহীনতার বিপরীতে ‘অপরাধী মনোজমিন’ স্থায়িত্ব লাভ করছে।

‘অপরাধী মনোজমিন’র একটি বড় উদাহরন পরিবহন সেক্টর। এখানে একটি মাফিয়া চক্র বাংলাদেশে সবকালে সক্রিয়। তারা সর্বকালে সরকারের অংশ হয়ে ভেতরের সরকার। এখানে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বেসরকারী খাতে পরিবহন কোম্পানীগুলির মালিক। আবার তারাই শ্রমিক নেতা। বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী শাহজাহান খান এবং মশিউর রহমান রাঙ্গা পরিবহন শ্রমিকদের দুই শীর্ষ নেতা। এরা চাইলে সারাদেশে জনদুর্ভোগ নামিয়ে আনতে পারে। নামিয়ে আনতে পারে ভয়াবহ নৈরাজ্য।

যাত্রীসেবায় সরকার কোন আইনী উদ্যোগ নিতে গেলেই ভেতরকার সরকার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য যাত্রীদের পক্ষে প্রণীত কোন আইনই জনগনের পক্ষে যায়না। পরিবহন মালিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষ এবং মন্ত্রী-আমলা সবাই একাট্টা হয়ে যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে, পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির হয়, পরিমান বছরে হাজার কোটি টাকা। এজন্য এই সেক্টর সবসময় ক্ষমতাসীনদের দখলে  ধারাবাহিক নৈরােজ্যর কবলে থাকে। সঙ্কটে পড়লে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অংশ হয়ে পড়ে।

পরিবহন সেক্টরে মালিকদের লাভালাভই প্রধান বিষয়। শ্রমিকদের কাজটি অমানবিক এবং অমর্যাদার। জীবনমানের উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কখনও। সেজন্য তারাও পথে পথে নানা সুযোগ নেয় বাড়তি আয়ের আশায়। শ্রমিকদের পেশাগত জীবনে বেতন-মর্যাদা প্রদানে এই সেক্টরে কোন সিষ্টেম গড়ে তোলেনি। মালিকদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর জীবন-জীবিকা নির্ভর। ফলে একটি প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে এই সেক্টরে আকৃষ্ট করা যায়নি, কাজে লাগানোও হয়নি।

অন্যদিকে সরকার পক্ষ, যখন যারাই ক্ষমতায় থেকেছেন, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিকদের ব্যবহার করেছেন। সরকার থেকে কোন দায়িত্বশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অথরিটি তৈরী হলেও তারাও ‘মাফিয়া চক্র’ ভাঙ্গতে পারেণি। ফল হয়েছে, ব্যক্তি খাতে এই সেক্টর গড়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলাকে সঙ্গী করে। শ্রমিকদের নিয়ে কিছু রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা ‘মাফিয়াতন্ত্র’ গড়ে তুলে সর্বকালে সরকারের অংশ হয়েছে।

তিন. সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুঘর্টনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন। বক্তব্য ছিল, “আমার এ কথাগুলো অনেকে পছন্দ করবেন না, কিন্তু যা বাস্তব তাই বলছি। রাস্তায় চলার নিয়ম আছে, তা আমরা কতটা মানি। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসছে, আমরা একটি হাত তুলে রাস্তায় নেমে গেলাম। যারা পথচারী তাদেরও কিছু নিয়ম-কানুন জানা দরকার, মানা দরকার” (সূত্র: বণিকবার্তা ৩ মে ২০১৮)। আবার,“আপনি বাসে চড়ে যাচ্ছেন, কেন আপনি হাত বাইরে রাখবেন? আপনারা (সাংবাদিক) যার হাত গেল তার জন্য কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু সে যে নিয়ম মানছে না সে কথা তো বলছেন না” (সূত্র: বণিক বার্তা ৩ মে ’১৮)।

তাঁর কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় পরের দিনই। দেরী করেননি মন্ত্রী শাহাজান খান। ৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটলে কেবল চালকদের দোষী বলা ঠিক নয়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাত্রীদেরও খামখেয়ালীপনা থাকে। দুর্ঘটনা রোধে শুধু চালকদের সচেতন হলে চলবে না, যাত্রী ও পথচারীকে সচেতন হতে হবে। কেউ রাস্তা পার হওয়ার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলেন, কেউ জানালার বাইরে হাত রেখে গাড়িতে যাতায়াত করেন। এই কারনেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে” (প্রথম আলোঃ ৫ মে ’১৮)।

প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে পথচারীদের অসচেতনতার কথা বলেছেন, দায়িত্বহীনতার কথা বলেছেন, তা হয়তো ক্ষেত্রবিশেষ সত্য। অথবা এ বিষয়ক তথ্য তিনি যাদের কাছ থেকে পান তারা হয়তো দুর্ঘটনার এমত কারণই তুলে ধরেণ। কিন্তু এগুলিই কি চূড়ান্ত সত্য! দুর্ঘটনার প্রধান কারন? আর এই স্পষ্টবাদী সত্যকথন কী মর্মান্তিক বেদনা লাঘব করে? দুই বাসের নষ্ট প্রতিযোগিতার খেসারত হিসেবে জীবন দিতে হচ্ছে সম্ভামনাময় আগামীর। এই করুণ মৃত্যুতে জনমনে প্রতিক্রিয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘রাষ্ট্রাচারসুলভ’ কিনা জানা নেই, তবে তার মন্ত্রী, এমপিরা এই বক্তব্য লুফে নিয়েছেন সাথে সাথেই।

চার. আপনি কি এমন কোন দেশ খুঁজে পাবেন, যেখানে সুনির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের দায়ে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্মঘট, অবরোধ চালিয়ে যেতে পারে কোন সংগঠন? হ্যা পারে, বাংলাদেশে। মন্ত্রী শাহজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা’র নেতৃত্বে শ্রমিকরা আদালতের বিপক্ষে জনজীবনে নৈরাজ্য নামিয়ে আনতে পারে! আর নির্বিকার পুলিশ পরিবহন শ্রমিকদের বিপক্ষে কোন এ্যাকশনে যায় না। কিন্তু এই পুলিশই নির্বিচার লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ে, পিপার স্প্রে করে, জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনস্বার্থ নিয়ে যেকোন সমাবেশ-আন্দোলনে। শিশু-কিশোররাও বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পায় না।

সরকারের নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান সারাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির শীর্ষ ফোরাম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশানের কার্যকরী সভাপতি। বাস ও ট্রাক শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা। বিষ্ময়ের বিষয় হচ্ছে এই দুই মন্ত্রী সরকারী বাসভবনে আদালতের দন্ডের বিরুদ্ধে যে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আদালত বা সরকার কোন ব্যবস্থা তো দুরের কথা , প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখাননি।

গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ১৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১২৩ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৫৫৫৮ জন। এদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই মানুষই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি (সূত্র: ডেইলী ষ্টার- ৩০ এপ্রিল ২০১৮)। সাম্প্রতিককালে সড়ক হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। গত ২৩ জুন মাত্র ২৪ ঘন্টায় সড়কে নিহত হয়েছে ৪৫ জন। এরমধ্যে ৩৯ জনই কর্মক্ষম ব্যক্তি। গাইবান্ধায়্ বেপরোয়া গতির বাস উল্টে নিহত হয়েছে ১৮ জন (সূত্র: প্রথম আলো ২৪ জুন, ২০১৮)।

National Committee to Protect Shipping, Roads & Railways  নামক একটি সামাজিক সংগঠন গবেষণায় সড়ক দূর্ঘটনার সাতটি কারন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে, বেপরোয়া গাড়ি চালনা।  ক্রমানুসারে অন্যগুলি হচ্ছে, অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন গাড়িচালক, ওভারটেকিং ও ওভারলোডিংয়ের বিপদজনক প্রবণতা, ট্রাফিক আইন না মানা, অযোগ্য ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ও যান চলাচলের অযোগ্য সড়ক, চালকের বিরতীহীন ও বিশ্রামহীন গাড়ি চালনা। এই সাতটি কারনের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারন, পরিবহন সেক্টরে বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম।

পাঁচ. এক বিশৃঙ্খল, অরাজক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের হাতে প্রতিনিয়ত সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুর হারকে বাড়াচ্ছে। পৃথিবীতে সড়ক, নৌ, রেলপথ ও আকাশ পথে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন সকলে। বাংলাদেশে এরকম কোন দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ আছে বলে জানা নেই। থাকলে অনেকদিন আগেই চরম বিশৃঙ্খল এবং মাফিয়া কবলিত পরিবহন সেক্টর মুক্ত হয়ে সুষ্ঠ ও মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারতো। তাহলে এই অযাচিত মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে হ্রাস পেত।

সড়ক নিরাপত্তায় আরেকটি আইনের খসড়া প্রণীত হয়েছে। তাদের নিয়েই যারা কিনা, পরিবহন সেক্টরের ‘মাফিয়াচক্র’। এই আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের প্রায় কাউকে যুক্ত করা হয়নি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, এটিও আরেকটি প্রহসন হবে। প্রমান হচ্ছে, সড়কমন্ত্রী জানিয়েছেন দেশে ৩৬ লাখ গণপরিবহনের মধ্যে ১৮ লাখই অবৈধ। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করলে, ১৮ লাখ অবৈধ যানবাহনের মালিক, ড্রাইভার ও অন্যান্যদের আটক করতে হবে। ধরেই নেয়া যায়, বরাবরের মত আন্দোলন-বিক্ষোভ সামাল দিতে সরকার কিছু চটকদার বক্তব্য দিচ্ছে, দাবি মানার ভান করছে থাকবে। অন্তিমে জনগনের সাথে প্রহসন অব্যাহত থাকবে কারন তারা কতিপয়ের, সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়!

কোটা সংস্কার আন্দোলন : হাতুড়ি, রিমান্ড, নিস্ক্রিয়তা এবং কটাক্ষ

সি আর আবরার ::

বেসামরিক আমলাতন্ত্রে নিয়োগের বিতর্কিত ও পৃষ্ঠপোষকতামূলক কোটাব্যবস্থা সংস্কারের পর্যালোচনার দাবি জানাতে গিয়ে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররা ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতার মুখে পড়েছে। ৩০ জুন তারা কোটা সংস্কার প্রশ্নে গ্যাজেট প্রজ্ঞাপন জারির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক একটি পদ্ধতিকে অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার স্বার্থেন্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ এবং ‘সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তারা আর সময় ক্ষেপণ না করে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের সংগঠকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘সফলভাবে’ সংবাদ সম্মেলন ভন্ডুল করে দেয়। আর এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের উৎসাহী অনুসারীদের হাতে ভিন্নমত প্রকাশকারী ছাত্রদের ওপর দমনপীড়নের নতুন মাত্রা শুরু হয়।

কয়েকটি ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নিস্ক্রিয়তায় মনে হয়েছে তারা অপরাধমূলক কাজে সহায়তা করছে এবং অন্য কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, তারা বিপুল উৎসাহে বিক্ষোভকারী, তাদের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে। সুস্পষ্টভাবে অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করে তাদেরকে আইন লঙ্ঘনের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার বদলে তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারীদের খুঁজছে, আটক করছে ও রিমান্ডে নিচ্ছে। তারা শক্তি প্রদর্শন করে শিক্ষক, অভিভাবক ও উদ্বিগ্ন নাগরিকদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। মন্ত্রীদের পাশাপাশি বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও এমনকি ভিসিরাসহ এস্টাবলিশমেন্টের অ-রাষ্ট্রীয় গ্রুপগুলো ক্ষুব্ধ ছাত্রদের ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ হিসেবে অভিহিত করার  ক্ষেত্রে সুর মেলাচ্ছে।

মিডিয়ায় সহিংসতার মাত্রা ও তীব্রতা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অংশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের রড, বাঁশ, এমনকি হাতুড়ি দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সিনিয়র  নেতাদের ছবি ও ফুটেজ অহরহ দেখা যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের প্রতি বিনা উস্কানিতে সহিংসতা চালানো, ছাত্রীদের হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করার বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সাক্ষী-প্রমাণ প্রিন্ট মিডিয়ায় এই সহিংসতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এসব কিছু সত্ত্বেও সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীল কোনো সদস্যের এ ধরনের কাজের সমালোচনা করা তো দূরের কথা, এগুলো ঠিক হয়নি পর্যন্ত তারা বলেননি। তার পরেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে অপরাধীরা ভিন্নমত দমনের জঘন্য এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবাধ সুযোগ পেয়েছে। গত ১৫ জুলাই অবস্থার আরো অবনতি ঘটে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের দুই বিবেকবান শিক্ষক সহিংসতায় আহতদের সাথে সংহতি প্রকাশ করার কারনে অপদস্ত হন।

সহিংসতামূলক কাজ করে অপরাধীরা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের পবিত্রতাই লঙ্ঘন করেনি, ভিন্নমত প্রকাশের প্রতীকি সৌধ শহিদ মিনারের অলঙ্ঘনীয়তাও নস্যাৎ করেছে। প্রতিবাদকারীদের শান্ত করার জন্য সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সব ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা চালায় ; গুম ও ধর্ষণ; বাঁশ, রড, চাপাতি, এমনকি হাতুড়ি নিয়ে হামলা করে, নিগৃহীত ও অপহরণ করার হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনও করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে, তা দ্রুততার সাথে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সাভার, রংপুর ও দেশের আরো অনেক নগরীতে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসকে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রাখার নামে অনৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করে সংগঠনটি ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার কাজে জড়িতদের’ হাত থেকে মুক্ত করার তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ।

কথাকে কাজে পরিণত করার একটি ঘটনায় শহিদ মিনারে প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ছাত্রী আক্রান্ত হয়েছেন। আরেক ঘটনায় এক কোটা সংস্কার সমর্থককে লাইব্রেরি থেকে টেনে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লাইব্রেরিয়ানের সামনে প্রহার করার সময় তাকে আহত করে। কয়েকটি ঘটনায় ছাত্রলীগ প্রতিবাদকারী ছাত্রদের আটক করে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাদেরকে আইন-শৃঙ্খলা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে। শীর্ষস্থানীয় প্রতিবাদকারীদের তাদের বাড়িতে ও হলে গিয়ে ভয়াবহ পরিণতির জন্যে হুমকি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ রকমের হতাশাজনক। প্রতিবাদকারীদের রক্ষা করা ও উদ্বেগ প্রশমিত করতে বলতে গেলে কিছুই করা হয়নি। দিনের পর দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতা চলা ও এতে ক্যাম্পাস জীবন বিঘ্নিত হলেও প্রক্টর এমন দাবিও করলেন যে, ‘এ ধরনের হামলা হওয়ার কোনো খবর তার জানা নেই’। তিনি দাবি করলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া গেলে, তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি হামলা ও হয়রানি থেকে ছাত্রদের রক্ষা করতে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হলেও একজন মাত্র শিক্ষক ক্যাম্পাস সহিংসতার প্রতিবাদে নগ্ন পায়ে ক্যাম্পাসে এসে তার বিরক্তি প্রকাশ  করায় আসল কারন রেখে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বিরল সাফল্য লাভ করেছে। সহিংসতার শিকারদের প্রতি সমর্থন, সহানুভূতি প্রদর্শন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দীর্ঘ ঐতিহ্য ছুঁড়ে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতিগুলো হামলাকারীদের  পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া ভীতিকর যদি না-ও হয়ে থাকে, অন্তত তা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন কোটা সংস্কারপন্থী ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ভন্ডুল করার কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ায়, তখন পুলিশ সদস্যরা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহন না করে বরং শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ খালি করে দেয়। এ ধরনের যেকোনো সহিংস ঘটনার পর হামলাকারীদের গ্রেফতার করার বদলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকারদের আটক, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিচ্ছে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক মাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি, ভিডিও ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুস্পষ্ট উদাসিনতা দেখা যায়। ডেইলি স্টারসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে হামলাকারীদের ছবি, নাম ও পদবি (ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে তারা রয়েছে) প্রকাশ করেছে। তারা অবাধে ক্যাম্পাসজুড়ে বিচরণ করলেও হামলার শিকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধাওয়ার মুখে পড়ছে। এক্ষেত্রে খুব কম সংশয়ই আছে যে, আইনকে নিজের ধারায় চলতে দেওয়া হলে বেশির ভাগ হামলাকারীই ক্ষতিকর অস্ত্র বহন, দৈহিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি সাধন, অন্যায়ভাবে আটক ও অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত হতো। মরিয়ম ফারার বক্তব্য ছিল মর্মভেদী। ছাত্রলীগের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে তাকে থানায় নিয়ে আরেক দফা অপদস্থ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি ভাবতাম, থানা হবে নিরাপদ, কিন্তু এটা মনে হয়েছে দ্বিতীয় দোজখ।’

ছাত্রদের সক্রিয়বাদী বা অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিক ও পাকিস্তানি পুলিশের গৃহীত বাড়াবাড়িকে লজ্জায় ফেলে সরকারি হাসপাতালগুলো মারাত্মক আহত অন্তত দুজন কোটা সংস্কারবাদী ছাত্রকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করেছে। একটি ঘটনায় মা-বাবা অভিযোগ করেছেন, আহত ছাত্রকে একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকেও চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা সংস্থাগুলো সময় ক্ষেপণ না করে নির্দোষ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে, এমনকি আহতদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে সফলও হয়েছে। সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেটরা কোন যুক্তিকে এসব আবেদন মঞ্জুর করেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। হতভাগ্য ছাত্ররা তাদের ও জাতির ভবিষ্যতকে আক্রান্ত করতে পারে এমন সরকারি নীতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করার তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করছিল। তারা হামলকারী নয়, বরং হৃদয়হীন সহিংসতার শিকার।

বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হতাশা বোধগম্য। প্রধানমন্ত্রী ‘কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্তি’ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্তে¡ও বলতে গেলে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি। মনে রাখতে হবে, ছাত্ররা কিন্তু পুরো কোটাব্যবস্থা বাতিল চায়নি। দীর্ঘ নীরবতা ও প্রায় নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে নিয়মিতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘অবগত নই,’ ‘নির্দেশনা নেই,’ ‘অগ্রগতি নেই,’ ‘প্রধানমন্ত্রী ফেরার পর সিদ্ধান্ত,’ ‘ঈদের পর গ্যাজেট’ ইত্যাদি বিভ্রান্তমূলক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছিল। কয়েক মাস আগে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সাথে আলোচনার সময় শিগগিরই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার প্রতিশ্রতি দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও প্রতিশ্রুতিটি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। সর্বশেষ দফার বিক্ষোভের পরই কেবল ৩ জুলাই কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।

বৈধ চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে অন্যায় ও ভ্রান্ত বক্রোক্তি ও কটাক্ষের আশ্রয় গ্রহণের দিকে ধাবিত করছে। এর ফলে এমনকি আইনমন্ত্রী বলে ফেলেছেন, বিএনপি ও জামায়াতই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে উস্কানি দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগৈর শক্তিশালী সাধারন সম্পাদকও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলার জন্য ছাত্রলীগের দায়দায়িত্ব নাকচ করে দিয়ে তিনি যুক্তি দেখান যে, এখন সেখানে ছাত্রলীগের কোনো কমিটিই যেহেতু নেই, তাই সংগঠনটিকে দায়ী করার কোনো অবকাশই নেই। মন্ত্রী কি সত্যিই জনগণকে বিশ্বাস করাতে চান যে কমিটি ভেঙে দেওয়া হলে ছাত্রলীগের সদস্যরা গুটিয়ে যায় ? পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে যে, একসময়ে তেজোদীপ্ত ছাত্রকর্মী হিসেবে পরিচিত এক সিনিয়র মন্ত্রী গত এপ্রিলে প্রতিবাদকারীদের রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ঢাবির ভিসির বাসভবন ভাংচুরকারীদের দায় কোটা সংস্কার কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা-ই যদি হবে, তবে কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে হামলাকারীদের শাস্তি প্রদান করা? যদি তাই না হবে তবে প্রশ্ন করা যায় কিনা, ঘটনা কী  এতোই বিস্বাদপূর্ণ যে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়?

গোয়েন্দা না হলেও পুলিশের অদৃশ্য পোশাক পরিহিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলন আসলে ‘অন্তর্ঘাত চালানোর লক্ষ্যে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন।’ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি একই ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করে একে ‘অপ:শক্তির কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের সাথে বেশ খোলামেলাভাবেই বলেছেন, প্রতিবাদকারীদের ভিডিও ফুটেজ তাকে ‘তালেবান, আল শাবাব ও বোকো হারামের উস্কানিমূলক ভিডিও বার্তার’ কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।

কোটা সংস্কার অ্যাক্টিভিস্টদের বৈধ দাবির প্রতি সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সঙ্গী-সাথীদের প্রতিক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে জনগণ ও তাদের সমস্যা থেকে তাদের গভীর বিচ্ছিন্নতার কথাই প্রকাশ করছে। এটি যেকোনো ধরনের সম্মিলিত প্রতিরোধে তাদের নাজুকতাই প্রকাশ করছে। এতে আরো সুস্পষ্ট হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয় পক্ষপাতিত্ব কেবল অপরাধের শিকারদের রক্ষা করতেই ব্যর্থ হচ্ছে না, সেইসাথে অমানবিক, অবৈধ ও প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে থাকা ব্যবস্থার সংঘর্ষিক তৎপরতাও শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

একথাটি মনে রাখতে হবে যে, তরিকুলের ওপর হাতুড়ির আঘাত কেবল তার পা বা মেরুদন্ডেরই ক্ষতি করেনি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

(সি আর আবরার- অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)