Home » প্রচ্ছদ কথা (page 4)

প্রচ্ছদ কথা

ন্যায্য দাবি নিয়ে আক্রান্ত তরুণেরা

আনু মুহাম্মদ ::

কোটা সংস্কারের আন্দোলন তৈরি হয়েছে কাজের খোঁজে তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। কাজ না করে চাঁদাবাজি বা অপরাধ করে জীবিকা অর্জনের পথে তারা যেতে চায় না। তারা মেধা ও যোগ্যতায় নিজেদের তৈরি করতে পারবে, তার ভিত্তিতে কাজ পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে এটাই তাদের দাবি। সরকার পক্ষ বারবার এই দাবিকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করেছে, অপপ্রচারের পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের যৌক্তিক দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে। এই দাবি জানাতে গিয়ে তারা যখন সরকারের ভয়ংকর রোষের শিকার হয়, যখন পুলিশ- ছাত্রলীগের আঘাতে জর্জরিত হয় ন্যায্য দাবি জানানো সাধারণ শিক্ষার্থীরা, তখন সেই আঘাত প্রতিটি নাগরিকের ওপরই এসে পড়ে। স্পষ্ট হয় শিক্ষা ও জনস্বার্থের প্রতি সরকারের বৈরী  ভূমিকা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বেকারত্বের হার বেশ কম, শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকেও কম। সর্বশেষ ‘শ্রমশক্তি জরীপ ২০১৬-১৭’ অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ, গত বছরের তুলনায় বেকারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৭ লাখ। প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা অনেক বেশি। কাজ পেতে আগ্রহী কেউ সপ্তাহে একঘন্টা কাজ করলেই যদি কর্মরত বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বলতে হবে বাংলাদেশ এখন পূর্ণ কর্মসংস্থান স্তরে আছে! কারণ বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কর্মসন্ধানী সবাই কিছু না কিছু উপার্জনমুখি বা উপার্জন বিকল্প কাজ করে। সাধারণত কর্মসময় ১৫ বছর বয়স থেকে ৬৫ বছর ধরা হলেও বাংলাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কাজ শুরু হয় ৫-৭ বছর থেকেই, আর তা অব্যাহত থাকে (যদি বেঁচে থাকতে পারেন) ৬৫ বছরের পরেও। এদেশে যারা নিজেদের শৈশবকে শৈশব হিসেবে পার করতে পেরেছেন তারা বিশেষ সুবিধাভোগী।

বেকারত্বের সংকীর্ণ সংজ্ঞা দিয়ে কর্মসংস্থান মাপা খুবই বিভ্রান্তিকর। কর্মঘন্টা, ধরন, আয়, নিশ্চয়তা এগুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। প্রবাসে প্রায় এক কোটি মানুষ কাজ করেন। তারপরও দেশে কাজের পরিমাণগত ও গুণগত অবস্থা ভালো নয়। কৃষিখাতের অনুপাত কমেছে, কর্মসংস্থানেও। কিন্তু শিল্প কারখানা খাতের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে পরিসেবা খাত। সেখানে স্থায়ী নিরাপদ কাজের সুযোগ খুবই কম। তাই অপ্রতিষ্ঠানিক কাজ, স্বকর্মসংস্থানেই বেশির ভাগ মানুষের নির্ভরতা। সরকারি সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরীপ অনুযায়ী দেশে কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক। এসব ক্ষেত্রে কাজের কোনো স্থিরতা নেই, আয় তুলনামূলক ভাবে অনেক কম, নিরাপত্তাও কম। স্নাতক  পর্যায়ের শিক্ষা নিয়েও অনেককে এ ধরনের কাজই খুঁজতে হচ্ছে। দোকান, মোবাইল, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, টিউশনি, কোচিং সেন্টার, অনলাইন বিভিন্ন সার্ভিস, কুরিয়ার, পরিবহণ, বিক্রয় প্রতিনিধি সহ এজেন্ট হিসেবে কাজ এগুলোই এখন শিক্ষিত তরুণদের কাজের এলাকা। ব্যাংক, এনজিও, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বিশেষ আগ্রহের জায়গা। সবচাইতে গুরুত্ব পাচ্ছে এখন বিসিএস ক্যাডার।

সচিব, যুগ্মসচিবসহ উচ্চ পদগুলোতে সংখ্যার তুলনায় নিয়োগ বেশি হলেও প্রয়োজনীয় নিয়োগে সরকারের অনীহা প্রবল। সর্বজন (পাবলিক) স্কুল কলেজে বহু হাজার পদ এখনও খালি। সরকারের বাজেট ক্রমশ বেড়ে যায়, অভূতপূর্ব উচ্চ ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেয় সরকার, কিন্তু প্রয়োজনীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে বলে টাকার অভাব। এসব পদপূরণ যে শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করে দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিরোধ করবার জন্যই যে দরকার সে বোধটুকু সরকারের মধ্যে দেখা যায় না। সরকার একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ করতে গেলে বলে অর্থ নেই। বছরের পর বছর কলেজগুলোতে পদ শূণ্য, শিক্ষক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ না করেই পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। বহু প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকের অভাবে ঠিকমতো ক্লাশ হয় না।

অন্যদিকে প্রায় ক্ষেত্রেই মেধা বা যোগ্যতার সাথে কাজ পাবার সম্পর্ক নেই। বহু প্রতিষ্ঠানে চাকুরির কথা উঠলেই ‘কতো টাকা’ লাগবে এই প্রশ্ন নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।  অদ্ভূত নৈরাজ্যে বা বাজারী সমাজের মধ্যে পড়েছি আমরা। নিয়োগের সময় মেধা বা যোগ্যতার চাইতে কে কত টাকা দিতে পারবে সেই প্রশ্ন ওঠে। চাকুরি এখন কিনতে হয়। যে টাকায় কেনা, তার চাইতে বেশি টাকা তোলার চেষ্টা তাই অনিবার্য। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের এসব জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ দেখতে হয় নিয়মিত। এদেশে যোগ্যতা অর্জন কঠিন, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া আরও কঠিন।

বিসিএস ক্যাডারের বিষয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ তরুণদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে আগের যেকোন সময়ের চাইতে বেশি। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক কলেজ শিক্ষার্থীদের এখন প্রধান ব্যস্ততা। স্নাতক উত্তীর্ণ হবার অনেক আগে থেকে এই বিষয়ে পড়াশোনাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ স্থায়ী নিরাপদ কর্মসংস্থানের আর কোনো ক্ষেত্র নেই।কিন্তু এতো ভরসা যার উপর সেখানে কোটার প্রতিবন্ধকতা দিনে দিনে ক্ষোভ বৃদ্ধি করেছে শিক্ষার্থীদের।

খুবই স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কোটা নিয়ে আলোচনা কারণ শতকরা ৫৬ ভাগের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য (এখন নাতি নাতনি যোগ হয়েছে)। এ বিষয়ে তাই কথাবার্তা খুব না হলেও ক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়েছে। এবারই তার বহি প্রকাশ ঘটেছে বেশি। স্পর্শকাতর হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানের কথা বিবেচনা করেই এ বিষয়ে কথা বলা উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো থেকেই আলোচনা হওয়া দরকার বেশি। এই আন্দোলনের প্রথম দিকে, ২০১৩ সালেই কেউ কেউ বলেছেন। বাবা মা উভয়েই মুক্তিযোদ্ধা, এরকম একজন সন্তান তানিম আহমেদ তখনই এতোটা কোটা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। বলেছেন, কোটার সুবিধা দেয়া হয় অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য। মুক্তিযোদ্ধারা অনগ্রসর নয়। https://opinion.bdnews24.com/2013/07/13/freedom-fighters-quota-a-son-explains-his-burden/

লায়লা হাসিন আমার ছাত্রী, এখন বিভাগে সহকর্মী। মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে লায়লা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, কখনও বাবার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কোনো সুবিধা নিতে চাইনি। বাবা আমাকে যোগ্য করে তুলেছেন, নিজের যোগ্যতার বলেই এ পর্যন্ত এসেছি। আমার সন্তানদের  আমি কোনো করুণার বস্তুতে পরিণত করতে চাই না। ওরা নিজেদের যোগ্যতা বলেই নিজেরা যতদূর যেতে পারে যাবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার, একজন শহীদের, নির্যাতিত মানুষদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে অবদান তাতে তাঁদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের ঋণ পরিশোধযোগ্য নয়। কিন্তু সেই মানুষদের তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ। শহীদদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই খন্ডিত। এগুলোর জন্যও সরকারের সাথে যেরকম যোগাযোগ ও চুক্তির ক্ষমতা লাগে, সেটা কজন মুক্তিযোদ্ধার আছে? কটি শহীদ পরিবার সে পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে? তারফলে গ্রামে প্রামে, শহরে বন্দরে এমন অনেক পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বোচ্চ ত্যাগ করে, সর্বোচ্চ লড়াই করেও পরে নিগৃহীত, বঞ্চিত হয়েছেন। শহরের সুবিধাভোগী পরিবারের কেউ কেউ এই পরিচয় নিয়ে নানাভাবে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারলেও শ্রমিক, ক্ষেতমজুরসহ শ্রমজীবী মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।  সরকার যদি সমস্যাজর্জরিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যথাযথভাবে যোগ্য করে তুলতে  ভূমিকা পালন করতো তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সম্মানজনক হতো।

মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে এখনও বির্তক এবং প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। এতো বছরেরও মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, যুদ্ধাপরাধী তালিকা সম্পূর্ণ হয়নি। আর তার কারণে সরকার বদলের সাথে সাথে তালিকার পরিবর্তন ঘটে। এক সরকারের অধীনেও বদলাতে থাকে। এখনও মাঝে মধ্যে পত্রিকায় খবর আসে রাজাকারের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়, ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে উচ্চ পদে আসীন। ক্ষমতাবানদের স্পর্শ থাকলে যে রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় তার প্রমাণ আমরা বহু পেয়েছি।

কোটা পরিচয় নিয়ে বর্তমানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানেরা তাই বড় যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। করুণা নয়, সম্মান তাঁদের প্রাপ্য। সরকার যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অনুপাত শতকরা ৩০ ভাগ করেছে, সন্তানের পর এখন নাতি পুতি পর্যন্ত কোটা সম্প্রসারিত করেছে এটা কি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালোবাসার জন্য, তাদের প্রতি দায়বোধের জন্য? বাস্তব পরিস্থিতি তা বলে না। বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায় যে, সরকার এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাবানদের বেশি বেশি কোটা রাখার আগ্রহ এই কারণে যে, এর মাধ্যমে তারা নিজেরা নিজেদের পছন্দমতো লোকজনকে চাকুরি দিতে পারে, সুবিধামতো নিয়োগ বাণিজ্য করতে পারে। সেজন্য ভুয়া সার্টিফিকেট এর জোয়ারে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর তাদের সন্তাননেরাও ভেসে যাচ্ছে। অলিখিত প্রবল একটি কোটা এখন অন্যসব কোটা পরিচালনা করছে সেটা হল ‘সরকারি দলের কোটা’। কোটা সংস্কারের পাশাপাশি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ- ‘সরকারি দলের কোটা’ বা দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের উৎস দূর করা।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন-নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র : রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্দরে-বাহিরে

তোফাজ্জ্বেল হোসেন মঞ্জু ::

রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির ও ভিতর ব্যাপারটা প্রথমেই পরিষ্কার করে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহির বলতে, যা কিছু প্রকাশিত, ঘোষিত এবং প্রতিটি পক্ষই নিজের বক্তব্য মেনে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভিতরের ব্যাপারটা অতটা প্রকাশিত নয়, কেউ বললেও প্রত্যাখান করছেন বা নিরব থাকছেন। আমরা বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যা কিছু গণমাধ্যমে পাচ্ছি সেটা বেশিরভাগ বাইরের রূপ। দ্বন্দ্বের বাইরের রূপটা মিথ্যা বা অসত্য বলছি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেতরের বিষয়টা প্রকাশিত ও জানা না গেলে দ্বন্দ্বটা পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবেনা। ভিতরের সত্য ঘিরে সব যুগে রহস্য থাকে। আমরা যাকে রাজনৈতিক গসিপ বলি তা দ্বন্দ্বের ভিতরের উপাদান ঘিরে। কিন্তু এটাও ঠিক চলতি রাজনৈতিক ধারায় ও ভিতরের সত্য জানার ও উদঘাটনের প্রচেষ্টা আছে। স্ট্রিং অপারেশন সেরকম একটি প্রচেষ্টা। স্ট্রিং অপারেশন এর মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যমে ও শাসকদলের মধ্যে অর্থের বিনিময় সহযোগিতার করার মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রিং অপারেশন বাইরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার – রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভিতরে আলো ফেলতে চেষ্টা করা হচ্ছে; সময় ও ইতিহাস ভিতরে সত্যটা তুলে ধরে। ভিতরের সত্য অনুসন্ধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দর্শণ গুরুত্বপূর্ণ। ভিতরের বিষয় বলতে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ক্ষেত্রে নয়া উদারনৈতিক, রক্ষণশীল, কর্তৃত্ববাদী দর্শনের পার্থক্যের কারণে ভিতরের বিষয় ব্যাখা বিশে¬ষণে পার্থক্য হয়। বলা হয়ে থাকে কোন চোখ থেকে দেখছি। এ চোখ তৈরী হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে। ব্যক্তি ও শ্রেণী স্বার্থে রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়, দেখার চোখ এক হয়না। এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বর্তমান রাজনীতির বাইরের ও ভেতরের বিষয় চিহ্নিত করতে হবে। বাইরের বিষয়গুলো অর্থাৎ নিবার্চন ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; এর ভিতরের বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকা ও রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তন আনার বহুমুখী কৌশল।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের পর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাহিরের দিকটায় রূপান্তর হয়েছে- এখন জোরেশোরে উন্নয়নের নামে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর শুরু ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন থেকে। এ নির্বাচনকে প্রতি-নির্বাচনই (Counter Election)  বলবো। নির্বাচনকে নির্বাচন দিয়ে ধ্বংস  না করা হলেও এর ক্ষয় করা হয়েছে। ১৫৪ জন সাংসদ প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন; এধরনের একটি নির্বাচনের বৈধতা অর্জন দেশে বিদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শাসকদলে। কিন্তু শাসকদল গিনেস বুক রেকর্ড তৈরী করে এ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সব প্রশ্নকে নিঃশেষ করতে সফল হয়েছেন।

শাসকদল এমন একটা অবস্থা তৈরী করলেন, নির্বাচন কিভাবে হয়েছে সেটা বড় কথা নয়- দেশ কিভাবে চলছে দেখুন, দূর্বল নয়, শক্তিশালী’র শাসন। শক্তিশালী শাসক ও শাসন আপনাকে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পৌঁছে দেবে- এভাবে কারো ধারণা থেকে নয়, শাসকদের অন্তর্গত দর্শণ থেকে বেরিয়ে আসে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র।

নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে সকলে যে যার কাজ করতে পারবেন, তবে কেউই সীমা লংঘন করতে পারবেন না, সীমা লংঘন করলেই শাস্তি ও বিতাড়ন। সীমার মধ্যে থাকলে শান্তি ও পুরষ্কার। মিলিয়ে দেখুন প্রধান বিচারপতি যতদিন সীমার মধ্যে ছিলেন, পুরষ্কার পেয়েছেন, যখনই সীমা লংঘন করেছেন তখনই ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। খালেদা জিয়া যখন আন্দোলন পরিহার করে ব্যক্তিগত দলীয় জীবন যাপন করেছেন, তখন বড় কোন শাস্তি ছিলনা, কিন্তু খালেদা জিয়া উন্নয়নমুখী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের হুমকি হতে পারেন, তখনই ভিন্ন পরিস্থিতি। তাদের মনোবাসনা, নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে ‘‘তাদের নির্বাচন’’ উন্নয়নের অন্তরায় না হয়। কাজেই ৫ই জানুয়ারী-২০১৪ এর মতো অতোটা নয়, ২০১৮/১৯ এর পোষাক পড়িয়ে ভদ্র নির্বাচন করা, যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করবে, সাংসদ নির্বাচিত হবেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন বর্তমান শাসক দল ও সরকার গঠন করবেন তারা-এটাই ভাবনা। বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরের চেহারাটা এরকমই দাড়িয়েছে।

ভিতরটা বোঝার মত তথ্য উপাত্ত কম। দ্বন্দ্বের ভিতরটা পরিষ্কার নয়, বিরোধী দলের কাছে তাদের প্রশ্ন হচ্ছে  খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন না আন্দোলন? এর মধ্যে আন্দোলনের কোন ঈঙ্গিত নাই, দানা বাঁধেনি আন্দোলনের বিষয়; আন্দোলনের খতম। এখানে প্রশ্ন দাড়িয়েছে নির্বাচন হবে, না নির্বাচন বয়কট। শ্লোগান কী হবে- খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন হবে না।

দ্বন্দ্বের ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে, কিভাবে শাসকদলে বৈরিতা করছে, করবে? নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় শক্তির সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সাধারণভাবে সরকারী কর্মচারীদের আগাম পুরস্কৃত করা হচ্ছে, গত দু’আমলে একদল উপকারভোগী তৈরী হয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের সফল যাত্রা শুরু হবে কি? রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এখন বর্তমান বাইরের ও ভিতরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের একটি কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। আপাতত: সকল অনুগত, সকল নিয়ন্ত্রিত নাগরিক কিন্তু সকলের চিন্তা, মনন প্রক্রিয়া, রাগ হিংসা নিয়ন্ত্রন পরিধির বাইরে থেকে যায়, এখানেই ভয়। এই ভীতি  শুধু যে শাসকদলের তাই নয়, জনগণেরও। কারণ চাপা রাগ-হিংসা বিষ্ফোরণ খুবই বিপজ্জনক হয় সকলের জন্যই।

 

 

শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দেখছি না

গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ::

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশসমূহে গত চার দশক ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে উন্নয়নের নামে। ’৬০-এর দিকে প্রথম উন্নয়ন দশকের মূল লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি (growth);; দ্বিতীয় দশকে লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমতা (growth with equity); তারপরের দশকে এলো বিকেন্দ্রীকরণ (decentralization); গণচেতনা (mass awareness) এগুলো; তারপর এখন উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন (participatory development), পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন উৎসাহে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মদদপুষ্ট বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। বাংলাদেশও এই রকম কৌশলের বাইরে থাকেনি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম বিভিন্ন উন্নয়ন (sustainable  development), নারী উন্নয়ন এগুলো। এই সমস্ত কৌশলই এসেছে দাতা দেশসমূহের প্রচেষ্টার ফলেও গণদারিদ্র্য দূর হয়নি বরং অনেক দেশে বেড়েই চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য দারিদ্র্য একটি বিশাল সমস্যা। বস্তুত আপেক্ষিক দারিদ্র  ক্রমেই চরম আকার ধারণ করছে এবং এটা সামাজিক একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক স্থিতিশীলতাও সঙ্গীন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো ‘টার্গেট গ্রæপ’ ভিত্তিক প্রকল্প দারিদ্র্য কিছুটা লাঘব করলেও সার্বিকভাবে দারিদ্র্য তেমন কমেনি। বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ পল্লী অঞ্চলে। অতএব দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং পল্লী উন্নয়ন এই দুটির যোগসূত্র রয়েছে। তবে এটা লক্ষ্য করা যায় যে, ‘উন্নয়ন’ শব্দটির অস্পষ্ট ব্যবহারের ফলে অনেক সময় মূল সমস্যা দারিদ্র্য আড়ালে থেকে যায়।

উন্নয়নকে সুশাসন ও গণতন্ত্র থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উদাহরণ দেয়া হয়, গণতন্ত্র ছাড়াও বিশ্বের কিছু দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন টেকসই ও সমতাভিত্তিক নয়। সেখানে শুধু বস্তুনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ভোগবাদের প্রসার হয়েছে। মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতা এগুলোর প্রাধান্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ওই পথে চলুক, আমরা সেটি চাই না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলাদেশের জন্য আন্দোলনটা বহু আগে থেকে শুরু হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান। বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনের যে ভিত্তি ছিল, সেটা ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ এবং এখানকার লোকজনকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা থেকে মুক্ত করা। অর্থনীতি মুক্তি অর্জন করার জন্য দরকার ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। বিভিন্ন দোলাচল, অনিশ্চয়তা ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এ পর্যায়ে এসেছি। আমাদের দেশে আসলে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নটা শুরু হয়েছে ১৯৯০ থেকে। প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার শুরু হলো এবং ১৯৯০-র পর ধারাবাহিকভাবে ভালোভাবেই অর্জনটা ছিল। তার পর আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, গার্মেন্ট এবং অন্যান্য সেক্টরে উত্তরোত্তর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এই কন্ট্রিবিউশনটা বিশেষ কোনো একটা সরকারের সময়ে হয়নি। ধারাবাহিকভাবে সব সরকারের সময় হয়েছে। তাই এখানে কৃতিত্ব কিন্তু সবার। একক কোনো সরকার এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে না। আবার ব্যর্থতার ব্যাপারেও এককভাবে কাউকে দোষ দিতে পারবে না।

এদিকে আমি যাচ্ছি না। আমি এখন আমাদের যে মূল চ্যালেঞ্জগুলো এবং সেখানে আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, রাজনৈতিক চিন্তাধারার কিছু কথা বলব। মানে রাজনৈতিক যে বিশ্লেষণ বা অর্থনীতির যে বিশ্লেষণ, সে বিষয়ে আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলব। প্রথমত, চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের অর্থনীতির দিক দিয়ে, যেগুলো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। প্রথম হলো আমরা যে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, সেটা এখন কিছুটা মন্থর, আবার বিনিয়োগও মন্থর হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দেখছি যে সরকারের যে নীতিগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা বা নীতিগুলো যে খুব সুষ্ঠু নীতি হয়েছে সেটাও নয়। আবার নীতিগুলো বাস্তবায়ন যারা করবে, আমলা এবং সরকারের যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে তাদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবহুল। সব শেষে সার্বিকভাবে যে উন্নয়নগুলো হয়েছে, বিশেষ করে সূচকের দিকটি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে গড় হিসেবে। কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা। যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল কিন্তু বহুলাংশে সাধারণ মানুষ পায় না। কারণ এখন আমরা দেখছি যে, দিন দিন কিন্তু ধনী-দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্তের ফারাক বাড়ছে; বঞ্চিতের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আপেক্ষিকভাবে কেউ বলতে পারে যে, আগে তো কেউ শার্ট পরত না, প্যান্ট পরতে পারত না, মোবাইল সবার কাছে আছে। সেটা হলো আপেক্ষিকভাবে। একজন রিকশাঅলার মোবাইল আছে, কিন্তু যে ৮ থেকে ১০ বছর আগে রিকশায় চড়তে পারত না, তারা এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাই ফারাকটা কী। একই ধরনের লোক একই কর্মদক্ষতা কিন্তু সে চলে যাচ্ছে কোথায়। বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে, এমনকি দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই এই অসম উন্নয়নটা অ্যাক্সেপ্টেবল নয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ব্যাপার। এ জন্য আমরা দেখছি যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা না থাকলেও অশ্চিয়তা আছে। কী হবে, না হবে। কী ধরনের সরকার হবে। আর এখন যে রাজনৈতিক অবস্থাটা আছে বা যে কোনো সময় রাজনৈতিক যে গভর্নমেন্ট আসে, সেখানে আমরা কিন্তু গুড গভর্নেন্স দেখতে পাচ্ছি না। সুশাসনের অভাব আছে। সুশাসনের অভাব মানে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই। কেউ যদি অন্যায় করে তার কোনো শাস্তি হয় না। সব থেকে মারাত্মক হলো রুল অব ল’ নেই। আইন আছে কিন্তু এটার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। রাজনীতির মেজর জিনিসটা যে খালি ভোট দিলে হয়ে গেল তা নয়। সুশাসন ছাড়া কিন্তু কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অনেকে বলে, কোনো কোনো দেশে তো মার্শাল ল’ ছিল। কোনো কোনো দেশে তো ডিক্টেটর ছিল। উন্নয়ন হয়েছে। গণতন্ত্র ছাড়া। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেখানে ১০ থেকে ২০ বছর পর দেখা গেছে, বেশিরভাগ লোকই দরিদ্র। তাই ওই পথে যাওয়া যাবে না। তার পর রেগুলেটরি বডি যেগুলো আছে, যেমন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। মানুষের বিবেচনায় তো কাজ করে না, যেভাবে গ্যাস-পেট্রলের দাম বাড়ে। বিটিআরসি নানারকমের নীতি দিচ্ছে। এগুলোর কোনো কনটিনিউটি থাকে না। সরকার চেঞ্জ হলে অন্য সরকার এসে পুরো সিস্টেমই পরিবর্তন করে দেয়। যদিও অনেক ভালো নীতি অনেক সময় নেয়। মোটামুটি যদি ধারাবাহিক থাকে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন ভারতেও কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক নীতিগুলো একেবারে চেঞ্জ হয়ে যায় না। মোদি এসে তো বলেননি যে, আমরা ইন্ডাস্ট্রি করব না। আমরা এক্সপোর্ট করব না। আমরা ম্যান পাওয়ার বাড়ব না। আমরা আইটি সেক্টরে কাজ করব না। তিনি বলছেন, আমি করব অন্যভাবে। লোকজন কিছু চেঞ্জ হবে। সেটা অন্য কথা। এটা আমেরিকায়ও করে। কিন্তু আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে এগুলো হয় না।

আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো একেবারেই হয়নি। লোকাল গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বলে কিছুই নেই। ঢাকা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ঢাকা থেকে করার ফলে যেটা হয়, আমাদের প্রত্যেকটি অঞ্চলের লোকজন কীভাবে বেঁচে থাকে, তাদের চাহিদা আমলে নেওয়া হয় না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ তাদের ভূমিকা নগণ্য। এখন আবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের বেতন দেবে তাদের আয় থেকে।

সরকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বেতন দিয়ে দিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। আর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের বেতন দেবেন না। এটা কোনো কথা হলো নাকি? ওদের কি ট্যাক্স পাওয়ার আছে? ওদের কি অথরিটি দেওয়া হয়েছে? গরিব মানুষদের ওপর আর কত ট্যাক্স চাপাবে? ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে, এক্সপোর্ট বাড়লে ট্যাক্স বাড়ে। ওদের কি এক্সপোর্টের ওপর ট্যাক্স ধার্য করার ক্ষমতা আছে? বা আয়ের ওপর ট্যাক্স বসানোর ক্ষমতা আছে? তাই সার্বিকভাবে আমি বলব, আমাদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, তা হলো গতানুগতিক। মার্কেট ইকোনমির ওপর, বাজারের ওপর ডিপেন্ড করে আমরা চলব এবং বাজার সবকিছু নির্দিষ্ট করবে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ঠিক করবে। সেভাবে যাবে। আর অর্থনীতিবিদরাও তখন চিন্তা-ভাবনা করছে যে, ঠিক আছে, বাজারের মধ্যে থেকেই আমরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বিবেচনা করব। তার মানে কিছু কিছু জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে একটু মলম দিলাম। কিন্তু পুরো শরীরে যখন নানা সিস্টেমেটিক ডিজিজ হয়। আমার যদি ইমিউন সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। আমার ব্লাড যদি দূষিত হয়। আমার নাকের মধ্যে ওষুধ দিলে, চোখের মধ্যে ওষুধ দিলে কী লাভ হবে। কোনো লাভ হবে না। এখন আমাদের তো হয়েছে সিস্টেমেটিক ডিজিজ। এক জায়গায় তো নয়। এটা সর্বগ্রাসী। পুরো সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই সিস্টেম মানে রাজনৈতিক সিস্টেম। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজারগুলো এবং লোকাল লেভেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো। স্কুলগুলো এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলোকেও প্রভাবিত করে পলিটিক্যাল মোটিভেশন।

ব্যাংকিং সেক্টর দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। বর্তমানে এ সেক্টরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব নীতিমালা ও আইন-কানুন আছে, কোম্পানি আইন আছে, আন্তর্জাতিক নর্মস আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব নীতিমালা ও আইন আছে, তা আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু এগুলো সঠিকভাবে পরিপালন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এর ফলে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট এবং নিচের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে কোথাও সুশাসন অনুসৃদ হচ্ছে না। সর্বত্রই মারাত্মক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এখন মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। পরিচালনা বোর্ড ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেবে। তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে সে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই শোনা যায় বা অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালনা বোর্ড ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে। এখন দেখা যায়, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই যেন বেশি উৎসাহী। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে তাদের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পরিচালনা বোর্ডের দ্বারা প্রায়ই নির্দেশিত হয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যে সবসময় দক্ষ হয়, তা নয়। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রæটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব নানা কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি দেখা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পরস্পর দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং এবং সুপারভিশনও খুব দুর্বল। যারা পরিচালনা বোর্ডে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ইন্টারেস্ট থাকে। তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন। নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদান বা চাকরি প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমনটি ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যারা নিয়োগ লাভ করেন, তাদের নিযুক্তি অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের ওপর। কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং পারফরম্যান্সের ওপর তার টিকে থাকা-না থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে, তার পক্ষে এমডি হিসেবে টিকে থাকায় কোনো সমস্যা হয় না। এজন্য দেখবেন কোনো কোনো ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত উচ্চ। এদের বেতন-ভাতা অনেক বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা পরিচালকদের কথাবার্তা শোনেন; তাদের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করেন। এতে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হলো কিনা, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিচালনা বোর্ড তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করতে চায়। পরিচালনা বোর্ডে অনেকেই থাকেন, যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি ব্যাংকের কাজে ব্যবহার করতে চান তাহলেই সমস্যা দেখা দেয়। ব্যবস্থাপনার মধ্যেও আবার অনেক লোক আছেন, যারা দক্ষ নন বা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি অদক্ষ বা দুর্বল হন, তাহলে তার প্রভাব সর্বত্রই পড়ে। এতে নিচের দিকের কর্মীরা নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অনিয়ম উপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই টপ ম্যানেজমেন্ট যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত করেন, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়বেই। কিন্তু আমাদের এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও সমস্যা রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে।

এখন আমাদের সময় এসেছে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার। সরকার গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, গতিশীলতা এনে সুষম ও টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে, এটাই এখন বিশেষ প্রয়োজন। সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ করপোরেশন সার্বিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। কিছু কিছু জায়গায় পাবলিক সেক্টরগুলো, করপোরেশনগুলোর মূল্য আছে। যেমন আমি উদাহরণ দিই বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ খাতে যখন আমাদের ক্রাইসিস হলো, তখন ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জের মতো একটা ৫০০, ৬০০ মেগাওয়াটা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করা যেত সরকারি উদ্যোগে এবং নিয়ন্ত্রণে। এটা করলে ইন্ডিভিজুয়াল কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট- যেটা দেখেছি বেসরকারি খাতে সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল কম হতো, জনগণ স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ পেত এবং সরকারি খাত থেকে ভর্তুকির খরচ কমে যেত। পাওয়ার সেক্টরে পাবলিক সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট থাকা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই থাকে। ইনডিপেন্ডেন্ট কিছু কিছু ছোট জায়গায় যেখানে গভর্নমেন্ট একেবারে পৌঁছাতে পারবে না, সেখানে পাওয়ার প্ল্যান্ট কিছু হতে পারে। তবে একেবারে ঢালাওভাবে সব প্রাইভেট সেক্টর করবে না।

মার্কেটিংয়ের বেলায় অ্যাগ্রিকালচার মার্কেটিংয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিন্তু মার্কেট একেবারে ছেড়ে দেওয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কমলা উৎপাদন করে। বিরাট একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ওরা ওটার কন্ট্রোলে থাকে উৎপাদকের স্বার্থ দেখার জন্য। এটা বাজারের হাতে ছেড়ে দেয় না। তার পর কানাডায় হুইট (গম) বোর্ড আছে। কানাডার ফার্মাররা যে গম উৎপাদন করে, তাদের স্বার্থে এটা কাজ করে এবং ভোক্তাদের স্বার্থও দেখে। আর এখানে কৃষকদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে ফটকাবাজ বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারীদের হাতে। গভর্নমেন্টের তো এখানে কতগুলো রুলস, কতগুলো ফ্যাসিলিটিস থাকবে। এখানে কিন্তু পাবলিক সেক্টর রুল আছে। এখানে পাবলিক সেক্টরের প্রয়োজন। অনেকে বলে, রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক সব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর পক্ষপাতী নই। বরং রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যদি সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসে, তবে প্রতিযোগিতামূলক আবহ সৃষ্টি হবে ব্যাংকিং খাতে। আসলে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী যদি একেবারে নাই থাকে, তখন দেখা যাবে কী অবস্থা। অন্যরা ইচ্ছামতো কাজ করবে। অতএব রাষ্ট্রয়ত্ত সব ব্যাংক ছেড়ে দিলে কিন্তু চলবে না। একটা, দুইটা, তিনটা কিন্তু রাখতে হবে। যেমন সোনালী ব্যাংক প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের বেতন দেয়। এখন প্রাইভেট ব্যাংকে দিলে কী করবে। টিচারদের বেতনও হয়তো পৌঁছাবে না সময়মতো। সরকারের টাকাটা নিয়ে রেখে দেবে। আরেকজনকে ধার দেবে। তার পর সরকার ট্রেজারি ফি জমা দিল কিন্তু এক মাস, দুই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকাটা পাঠালই না। তবে অবশ্য কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও স্বচ্ছ এবং জোরদার করা। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে এগুলোকে মুক্ত করতে হবে।

কয়েক বছর আগে ফরাসি অর্থনীতিবিদ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তার নাম জ্যাঁ তি হল। তার মূল বিষয়বস্তু হলো, কী করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মার্কেটকে লোকজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না। তবে নিয়ন্ত্রণ খুব সোজা কাজ নয়। আদেশ-নির্দেশে কাজ হবে না। মেকানিজম তৈরি করতে হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। কেউ যদি এটা না মানে তাহলে তার তখন কী পরিণতি হবে। ফাইন হবে। ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন এখনো এটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই সেই চিন্তাটা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমাদের অর্থনীতিবিদরাও সে চিন্তা করছেন। জ্যাঁ তি হল অন্য লেখকের সঙ্গে আর একটি বই লিখেছেন। ‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস’। ব্যাংকগুলো যা ইচ্ছা তাই করবে, লোকজনকে বিপদে ফেলে আমানত নিয়ে ইনভেস্ট করবে। এটার রেগুলেট করা। কেয়ারফুললি করতে হবে। রেগুলেটকারীরা নিয়ন্ত্রণকারী যেন না হয়। বিশেষ করে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল। যথাযথভাবে এটাকে দেখতে হবে।

গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে ফুড সিকিউরিটি। গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে সুশাসন। তার  মধ্যে সবাই থাকবে। প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করবে। একটা কথা আছে, বাংলাদেশে এখন সুশাসনের অভাব। ইনভেস্টমেন্টের আবহ নেই। পরিবেশ নেই। অবকাঠামোর বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রবলেম আছে। আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছি না। যত তাড়াতাড়ি আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম, সেটা পারছি না। একেবারেই যে স্থির হয়ে আছি সেটা নয়। রানওয়েতে কিছুক্ষণ চলার পর প্লেন টেক অফ করে। আমরা কিন্তু টেক অফ স্টেজে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, আসলে এখনো আমরা রানওয়েতেই আছি। তার মানে চলার গতি কম ও রানওয়েটা দীর্ঘ হচ্ছে। এখনো আমরা টেক অফ করে ওপরে উঠতে পারছি না। টেক অফ হলে আলটিমেটলি গ্রোথ রেটে আমরা ছয়, সাত, আট করে ওপরে উঠে যেতাম। সেটা হলে আমাদের দ্রুত একটা উন্নতি দেখতে পারতাম।

রাজনীতির চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগণের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটোই পাশাপাশি চলতে হবে। আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন, আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন- তাহলে কিন্তু স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমাদের অঙ্গীকার হবে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এতে দিনে দিনে কেবল সমস্যার পাহাড় জমছে, কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয়, আইনের শাসন আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি নিয়ে কিছু বলা যায়। সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকগুলোর অর্জন ভালো। আমরা প্রবৃদ্ধির ৬-এর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে গেছি। এটি ইতিবাচক। সার্বিক উন্নতি সন্তোষজনক। এ জন্য বাংলাদেশ একটা মডেল। দুর্বল দিকটা হল, অর্জনের এ ফলগুলো সমাজের নিচের স্তরে অপেক্ষাকৃত খুব কম পৌঁছেছে। ধরুন ধনাঢ্য শ্রেণী, যারা আগে একটা গাড়িতে চড়ত, তারা এখন একাধিক গাড়িতে চড়ছে। গরিব লোক আগে স্যান্ডেল পরত না, তারা স্যান্ডেল পরছে এবং কিছু মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এর বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। যেটা ভালো নিদর্শন নয়। উন্নয়নটা সমতাভিত্তিক হচ্ছে না। সমতাভিত্তিক উন্নয়ন না হলে তা টেকসই হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি এ দুটিই চেয়েছিলাম। সেটি পূরণ হচ্ছে কি? এখন আমরা শুধু প্রবৃদ্ধি দেখছি, সুষম বণ্টন দেখছি না।

(লেখক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বর্তমানে  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ।)

 

মাদক যুদ্ধ : ক্রসফায়ারেই কী সমাধান ?

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

ম্যানিলা সিটির কার্টিলো রামিরেজের মর্ত্যে উচ্চারিত শেষ শব্দটি ছিল “দৌড়াও”। এই চিৎকারই তার স্ত্রীর ভিক্টোরিয়ার প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু কোন সুযোগই পায়নি রামিরেজ। মুখোশধারী ছয় মোটরসাইকেল আরোহীর গুলি তাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। আলোকোচ্ছটায় বর্ণিল ম্যানিলায় তখন ১১ ডিসেম্বর ২০১৭’র রাত। ঠিক এক সপ্তাহ পরে তার একমাত্র কন্যা স্বামীসহ নিহত হয় ক্রসফায়ারে। এই খন্ডচিত্রটি ফিলিপাইনে চলতে থাকা ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর।

‘চরমপন্থী ’ প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতার্তের ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হওয়া “ওয়ার অন ড্রাগস” বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এরকম ভয়াবহ চিত্র এখন সারা ফিলিপাইনের নিত্যদিনের ঘটনা। সস্ত্রীক চাল কিনতে বাজারে যাওয়া রামিরেজ মাদক কারবারী ছিলেন কিনা তা প্রমানের আগেই পরিবারশুদ্ধ তাকে হত্যা করা হয়। ম্যানিলার দরিদ্র অধ্যূষিত এলাকাগুলিকে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-র  মূল্য দিতে হচ্ছে এভাবেই, জীবন দিয়ে।

অভিযোগ, তদন্ত এবং বিচার-সবই করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মারছে শত শত মানুষ। এর মধ্যে দুতার্তের প্রতিপক্ষরা রয়েছে, এমনকি মিন্দানাও শহরের মেয়র পর্যন্ত রয়েছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোষ্ট -এর ২০ জানুয়ারি’১৮ এবং ২০১৭-র ১৬ নভেম্বর সংখ্যার বিশেষ রিপোর্টের ভাষ্যে বলা হয়, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দুতার্তে সৃষ্টি করছেন ‘একটি এতিম জেনারেশন’- যা আগামীতে ফিলিপাইনে চরমপন্থা উস্কে দিতে পারে, কারণ হত্যাকান্ড শুরু হলে তার বিস্তৃতিই কেবল ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ চলছে অনেকটা ফিলিপিনো ষ্টাইলে। ‘আমরা জঙ্গীবাদ রুখে দিয়েছি। এখন আমরা দেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে চলেছি’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র এই বক্তব্য জানান দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকার অবশেষে জঙ্গীবাদ দমনের মত কঠোর অবস্থানে। তার পরিনাম আমরা দেখছি, কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে ইতিমধ্যে নিহতের সংখ্যা শ’ ছুঁতে চলেছে। অভিযান কতদিন অব্যাহত থাকবে সেটি পরিস্কার নয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্যমতে, অভিযোগ এবং প্রমান থাকলে সংসদ সদস্য বদি’রও রেহাই মিলবে না। সুতরাং ধরেই নেয়া যায় এক্ষেত্রেও অভিযোগ, তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার সর্বগ্রাসী। টাকার অংকে তো বটেই, সংখ্যায়, পরিমানে মাদক এখন মহামারী। কিশোর-তরুণদের বড় অংশ মাদকের কবলে। এর কারবার এতটাই অনিয়ন্ত্রিত এবং সর্বগ্রাসী যে, সরকারকে বন্দুকযুদ্ধে এর সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। এতে যারা নিহত হচ্ছেন তারা মূলত: ‘ক্যারিয়ার’ বা ‘পুশার’ এবং ‘এ্যডিক্ট’। কমন ব্যাক-গ্রাউন্ড হচ্ছে, কম-বেশি হতদরিদ্র পরিবারের কিশোররা চুরি-চোট্টামি, ছিঁচকে চুরি-ছিনতাই থেকে একসময় ভিড়ে গেছে মাদক কারবারে, কাজ করছে ড্রাগ চেইনের ‘লিংক’ হিসেবে। যে চেইনের শীর্ষে অমিত ক্ষমতাধররা।

বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্ত পথে বাংলাদেশে মাদক ঢুকছে কিভাবে? সরবরাহ উৎসপথে আটকে যাচ্ছে না কেন? এর মূল কারন হচ্ছে, চোরাচালানের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। আর এই কালো অর্থনীতি গ্রাস করছে সরকারের দায়িত্ববানদের। ঠেকানো যাদের দায়িত্ব, তারাই মাদক সরবরাহ নিশ্চিত করছেন। কারন তারা এই কারবারের অংশীজন। এইজন্যই সারাদেশ জুড়ে মাদকের বিস্তার।

বহুল উচ্চারিত মাদক ইয়াবা থেকে আয়কৃত টাকার পরিমান কেমন? ভিমরি খাওয়ার মত তথ্য আছে। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের হিসেব মতে,  মিয়ানমার থেকে বছরে বাংলাদেশে ৮০ কোটি পিস যার মাথাপিছু বরাদ্দ ৫ পিস। এর বাজারমূল্য কমপক্ষে ২৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ৬’শ কোটি বেশি নয়। মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গা বিতাড়নেই বাংলাদেশকে বিপদে ফেলেনি, ইয়াবা সরবরাহ করেও বিপদে ফেলেছে। এর সাথে জড়িত  উভয় দেশের অসৎ রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্য  ও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী (বিজিপি)।

কিছু সূত্র ধরিয়ে দেয়া যাক। বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নায়েক রাজ্জাককে মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশের সীমানা থেকে ২০১৬ সালে। তখন স্বরাষ্ট প্রতিমন্ত্রী, (এখন পূর্ণমন্ত্রী) বলেছিলেন, সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে এটি ঘটেছে। নয় দিনের মাথায় নায়েক রাজ্জাক ফেরত আসার পরে বিজিবি মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, এটি ভুল বোঝাবুঝির কারনে নয়। হাবিলদার লুৎফরের বদলে নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিজিপি মহাপরিচালকের ভাষ্যে সে সময় জানা গিয়েছিল, ২০১৪ সালের ২৭ মে বিজিপি’র গুলিতে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় নিহত হয়েছিলেন বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমান। ইয়াবা পাচারের  এই রুট থেকে প্রচুর ইয়াবা আটক করা হয়েছিল। একবছর পর নায়েক রাজ্জাক নাফনদীর এলাকা থেকে ১২ লাখ পিস ইয়াবা  আটক করেন। এইজন্যই তাকে অপহরন করা হয়। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, ইয়াবা চোরাচালানে কারা, কিভাবে যুক্ত এবং বিজিবি’র সৈনিকদের হত্যা, অপহরণের পেছনের মূল কারণও ইয়াবা ব্যবসা।

গত ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই রোহিঙ্গা সলিডারিটি নেতা হাফেজ সালাহ উল ইসলাম বৈঠক করছিলেন সৌদি নাগরিক আহমেদ সালেহ আল তান্দী’র সাথে টেকনাফের একটি বাড়িতে। বৈঠকটি হচ্ছিলো ২৬ কোটি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। বৈঠকরত অবস্থায় বাড়ির মালিক মাওলানা সৈয়দ করিমসহ সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরপরই ঘটনাস্থলে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেন গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেবার জন্য। পরে অবশ্য বিজিবি মহাপরিচালকের বরাতে প্রথম আলো’র খবর: আরএসও নেতা ও সৌদি নাগরিকের সাথে বৈঠকে বদির সংশ্লিষ্টতা নেই।

আরএসও নেতা হাফেজ এখন বাংলাদেশী ভোটার ও পাসপোর্টধারী। ২০১৩ সালেও সে গ্রেফতার হয়েছিল। সংসদ সদস্যের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন বলে কথিত এই হাফেজ ইয়াবা, অস্ত্র ব্যবসা এবং মানব পাচার ও জঙ্গী অর্থায়নে যুক্ত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী পাসপোর্টে মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে পাঠানোর নেপথ্যের ব্যক্তিও এই হাফেজ। এসব অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। তারপরেও রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা এসব বিষয় জানেন না, এটি বিশ্বাস করা কঠিন।

অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের ক্ষমতাবানরা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি ‘অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট’। অভিযোগ রয়েছে, এটি নিয়ন্ত্রন করছেন একজন সংসদ সদস্য ও মিয়ানমারের কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা। আর এই চোরাচালান ঠেকাতে গিয়ে বলি হচ্ছেন বিজিবি’র সদস্যরাও। নিহত, অপহৃত হয়েও ঠেকাতে পারছেন না মাদকের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইয়াবা চোরাকারবার সিন্ডিকেটটির নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী এবং জড়িতদের একাধিক তালিকা তৈরী করেছিল বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা। ২০১৩-১৪ সালে করা তালিকার শীর্ষে ছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য। তার পাঁচ ভাইসহ তালিকায় ছিল টেকনাফ যুবলীগ নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অনেকেরই নাম। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্টমন্ত্রী মাদকবিরোধী সপ্তাহের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে সাথে নিয়ে। সে সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসার সাথে বদি’র সম্পৃক্ততা নেই”। সেই তিনি এখন বলছেন, ‘বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, প্রমান নেই’।

গত বছর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বসবাস, ভোটার তালিকায় অর্ন্তভূক্তি পাসপোর্টের ব্যবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গমনাগমন, স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহন-সব ব্যবস্থাই করছে ক্ষমতাবানরা¡। এ যেন সরকারের ভেতরে আরেক সরকার । এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে ক্ষমতাবলয়, হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অস্ত্র ব্যবসা এবং এর সাথে উগ্রবাদী তৎপরতা মিলে-মিশে একাকার।

সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশেও ড্রাগ বা মাদকের ব্যবসা চলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। বিশেষ করে মৌলবাদী এবং জঙ্গী দলগুলোর অর্থের অন্যতম উৎস মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। অবৈধ এই ব্যবসা চালু রাখতে জঙ্গী-মৌলবাদী এবং শাসকশ্রেনীর ব্যক্তিবর্গ, রাজনীতিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসৎ ব্যক্তির সাথে গড়ে ওঠে অশুভ আঁতাত। দশকের পর দশক ধরে ভারত থেকে আসা ফেনসিডিল শীর্ষে ছিল। বছর কয়েক হলো সেটি এখন ইয়াবার দখলে। এজন্য বদলে গেছে চোরাচালানের রুট এবং ধরণ। কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি বদলায়নি।

মাদক ব্যবসার গোড়াশুদ্ধ উপড়ে ফেলা এবং যেকোন মূল্যে সিন্ডিকেট ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা সেটি কেউ জানে না। মাদক কারবারের মূলস্রোত অক্ষুন্ন রেখে মাঠ পর্যায়ে সরবরাহকারীদের বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার কতটা সমাধান বয়ে আনবে ? কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে এডহকভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরেক দফা উস্কে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ কারবার বন্ধে এডহক ভিত্তিতে বন্দুকযুদ্ধের সূচনার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক। গত শতকের সত্তর, আশি দশক এবং এর পরেও মেক্সিকো, কলম্বিয়া, বলিভিয়ায় এবং অধূনা ফিলিপাইনে পরিচালিত ‘ওয়ার অন ড্রাগস’-এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষ ও কমিউনিষ্ট নিধন। যা আসলে ওইসব দেশে মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে পারেনি ও করেওনি। যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচারে বাংলাদেশ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের আইনের সবশেষ সুযোগ দিয়ে বিচার নিশ্চিত করেছিল।

তাহলে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা কথিত আত্মরক্ষার্খে হত্যা হয়তো সাময়িক উপশম, কিন্ত দীর্ঘমেয়াদে?

সিদ্দিকুরের চোখ, ইউএনও’র হাতকড়া, অতি-উৎসাহী প্রশাসন আর ওবায়দুল্লাহরা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

এক. তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সিদ্দিকুর এখন জেনে গেছেন, তার চোখে হয়তো আর আলো নাও ফিরতে পারে। তাকে সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত: এইটুকু করুণা করা হয়েছে যে, তার চোখের চিকিৎসায় ভারতের চেন্নাই পাঠানো হবে। পুলিশ কমিশনার তার চোখে টিয়ার সেল লাগার ঘটনায় ইতিমধ্যেই ‘রহস্যময়তা’ খুঁজে পেয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত করে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ঐ তদন্ত রিপোর্টে সন্তুষ্ট না হলে তিনি আবার তদন্ত করাবেন।

পুলিশি নির্মমতা বা রহস্যময়তার শিকার হয়ে এই ছাত্রটি যখন চোখের আলো হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় রয়েছেন, ঠিক সে সময়ে খুলনায় ‘ছিনতাইকারী’ অভিযোগে এক যুবকের চোখ তুলে নিয়েছে পুলিশ। এইসব ভয়াবহ ঘটনা স্বাভাবিকভাবে যেমনটা হয়ঠিক তেমনি চাপা পড়তে যাবার সময় একজন ‘‘ভাগ্যবান’’ ইউএনও’র প্রতি অন্যায় আচরনের প্রতিবাদে সকল মহলের তৎপরতা সত্যিই চেখে পড়ার মতো। তাকে নিয়ে এখন সকল মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। সে তোলপাড় পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও, অবশ্য প্রশাসনের কর্মকর্তা হবার সুবাদে সংগত কারনও যে নেই তা নয়।

সদ্য কৈশোর পেরোনো এজন তরুণ সিদ্দিকুর কী জানেন, আমাদের এই রাষ্ট্র-সরকার-সমাজ সাড়ে চার দশক ধরে কিছু খুবই সামান্য ব্যত্যয় ছাড়া এক অস্বাভাবিক পথে হাঁটছে? অর্ধসত্য- সত্য-মিথ্যের মিশেল দিয়ে যে কোন বিষয়কে ধামাচাপা দেয়ার ক্ষেত্রে এখন কোন দ্বিধা নেই, রাখ-ঢাক নেই। ধারাবাহিক পলিসি অব ডিনায়েল (প্রত্যাখান বা না বলার নীতি) ও অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং জনমানুষের মনোজমিনে জায়গা করে নিচ্ছে। এই রোগ একদিকে গণতন্ত্রের (?) প্রাতিষ্ঠানিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে, তেমনি শাসকশ্রেনীর বিভিন্ন অঙ্গকে লাগামহীন ও বেপরোয়া করে তুলছে।

দুই. ১৯৯৫ সালে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছিল। অমন বদলি আকছার হয়েই থাকে। কিন্তু ঐ বদলিটিকে কেন্ত্র করে পরবর্তীকালে অনেক ঘটন-অঘটন সৃষ্টি হয়েছিল। এটি ছিল প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র অফিশিয়ালদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের- ফলশ্রুতি। ড. কামাল সিদ্দিকী সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্যসচিব। আরেক সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ‘জেলা গেজেটিয়ার’ পদে বদলি আদেশের ফাইলটি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাক্ষরের জন্য তিনি উপস্থাপন করেন।

খানিকটা গুরুত্বহীন জেলা গেজেটিয়ার পদে সাধারনত অতিরিক্ত সচিবদের দেয়া হয়। স্বাক্ষরের আগে প্রধানমন্ত্রী তার মুখ্যসচিবের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সব ঠিক আছে কিনা এবং কোন সমস্যা হবে কিনা? মুখ্যসচিব তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, না, কোন সমস্যা নেই। এভাবে, সে সময়ের ‘‘জাদরেল’’ সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীর অভ্যন্তরীন কোন্দলের শিকার হয়েছিলেন এবং তাকে কেন্দ্র করে যা যা ঘটেছিল, তা ইতিহাস। ঘটনার অভিন্ন বর্ণনা শুনেছিলাম সে সময়ের দু’জন কর্মকর্তার কাছে, যাদের একজন এখন প্রয়াত।

পরবর্তী ঘটনা অনেকের জানা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কিভাবে সরকারের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে পরবর্তীতে ‘জনতার মঞ্চ’গঠন করেছিলেন, সচিবালয়ে বিদ্রোহ ঘটেছিল এবং এসব ঘটনা সরকার পতনে কি ভূমিকা রেখেছিল- সেগুলি পরের সরকারগুলোর কাছে উদাহরন হয়ে আছে। নির্মোহভাবে বলা যায়, এর মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনের বারোটা বেজেছিল, রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে আমলাতন্ত্র  একেবারেই ‘পার্টিজান’ হয়ে যায়; যার মন্দ-ভাল ফল গত দেড়যুগ ধরে দেশের মানুষ ভোগ করছে।

ম.খা. আলমগীর জাদরেল সিএসপি, একাত্তরের ময়মনসিংহের এডিসি, লাইমলাইটে আসেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ এর একজন বাস্তবায়নকারী, খাল-কাটাখ্যাত এবং সিভিল-মিলিটারী সরকারের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে। প্রয়াত: জিয়ার প্রতি অনুরক্ত এই আমলা মূলত: ১৯৯৫ সালের ওই ঘটনার পর বিসিএস প্রশাসন সমিতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগের গুডবুকে চলে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তার প্রাপ্তিযোগ এবং পুন:পুন নির্যাতনের শিকার হওয়া, সকলেরই জানা আছে।

তিন. তারিক সালমান সিভিল ব্যুরোক্রেসির জুনিয়র সদস্য। সৎ, নিষ্ঠাবান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে ধারনা পাওয়া যাচ্ছে। আগৈলঝড়া ও বরগুনা সদরে ইউএনও হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তার কৃত অনেক বিষয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে। তিনি বরিশালের সেরনিয়াবাত পরিবারের আর্শীবাদপুষ্ট ক্ষমতাসীন দলের কথিত হাইব্রিড ও দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি শক্ত অবস্থান বজায় রেখে চলেছিলেন। যেটি পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের, গ্রেফতার ও হাজতবাসকে ত্বরান্বিত করে।

কর্মকালে তিনি তার জেলা প্রশাসকদ্বয়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, এমনকি বিভাগীয় কমিশনারেরও। একথা সকলেই জানেন, ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে এসময়কালের প্রায় সব জেলার জেলা প্রশাসকগন, বিভাগীয় কমিশনারবৃন্দ ও উপজেলা নির্বাহী আফিসারগন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের প্রতি কতটা অনুগত এবং ‘পার্টিজান’। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা রয়েছে । তারিক সালমান এর বাইরে ছিলেন বলে ধারনা তৈরী হয়েছে।

তার বিষয়ে ঘটনাক্রম এরকম; আগৈলঝড়ার ইউএনও থাকাকালীন একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারী শিশুর আঁকা শেখ মুজিবের ছবি তিনি স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রনপত্রে ‘লোগো’ হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি ‘বিকৃত’ ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে- এমত অভিযোগে জেলা প্রশাসক তাকে শোকজ করেন। ইউএনও উত্তর দেন, যা জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অত:পর দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বা আনা হয় একজন সাবেক বিএনপি নেতা, বর্তমান বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট ওবায়দুল্লাহ সাজুকে।

তিনি ইউনিও’র বিরুদ্ধে সিএমএম আদালতে মামলা ঠুকে দেন। বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে ‘হৃৎকম্পন’ হচ্ছিলো এবং যারপরনাই ব্যথিত হয়েছেন-অভিযোগে ওবায়দুল্লাহ আদালতকে জানান। সমন পেয়ে ইউএনও আদালতে হাজির হলে জামিনযোগ্য মামলায় তিনি জামিন পান নাই, সংক্ষিপ্ত হাজতবাসের দুই ঘন্টা পরে নাটকীয়ভাবে জামিন পান। শুরু হয় সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দল ও বিচার প্রশাসনের অনেক কুৎসিত তথ্য প্রকাশিত হতে থাকে।

পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সিভিল প্রশাসন ইউএনও’র ঘটনায় বিষ্ময় ও ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ত্বরিৎ হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী ইউএনও’র প্রতি এই আচরনে যুগপৎ  বিষ্মিত ক্ষুব্দতা প্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীন দলও সচকিত হয়ে ওঠে। ‘এস্কেপ গোট’ হিসেবে ওবায়দুল্লাহ দল থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত হন। বরিশাল ও বরগুনার জেলা প্রশাসকদ্বয়কে প্রত্যাহার করা হয় এবং সিএমএম আলী হোসেনের বদলির সুপারিশ সুর্প্রীম কোর্টে পাঠানো হয়।

বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি দেখে যে হৃৎকম্পন হচ্ছিলো তা কতটা বন্ধ হয়েছে জানা না গেলেও সাময়িক বহিষ্কৃত ওবায়দুল্লাহ ইউএনও’র বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিয়েছে। বরিশাল আওয়ামী লীগ ওবায়দুল্লাহ’র বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছে, যদিও এর কোন মূল্য নেই। উল্টোটা হলেও তারা স্বাগত জানাতো। কারণ, বিশেষ একটি পরিবারের ‘ফ্রাঙ্কেনষ্টাইল’ ওবায়দুল্লাহ ও বরিশাল আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত হয় কাদের মাধ্যমে-ক্ষমতাসীনদের কেন্দ্রের তা অজানা নেই।

চার. ক্রমশ: অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র-সমাজে ইউএনও তারিক সালমানের ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের ত্বরিৎ প্রতিক্রিয়া সিভিল প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু অন্যান্য বিভাগ ও জনগনকে কতটা আশ্বস্ত করলো, সে প্রশ্ন থেকেই যাবে? কারণ, একজন ইউএনও যখন ব্যাংক ম্যানেজারকে প্রকাশ্যে চড়-থাপ্পড় মারছেন, সংসদ সদস্য শিক্ষককে কান-ধরে ওঠবস করাচ্ছে; একজন কলেজ শিক্ষক ফরিদউদ্দিনকে দিগম্বর করে রাজপথে ঘোরানো হচ্ছে এবং সহকারী কমিশনার শিক্ষককে লাঞ্চিত করছে কিংবা পুলিশ শিক্ষকদেরকে পেটাচ্ছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাবীতে মিছিলে নির্বিচারে ‘‘ব্যবস্থা’’ নেয়া হচ্ছে -এরকম ছবি বা খবর মিডিয়ায় অসংখ্যবার প্রকাশিত হলেও সকলে বেশ নির্লিপ্ত থাকছেন। পাঠক, এগুলো সামান্য কয়েকটি ঘটনা মাত্র, অনেকেই এর চেয়েও ঢেড় বেশী ঘটনার খবর রাখেন, তা সত্য বলে মানি।

অসহিষ্ণু সরকার, সংসদ সদস্যবৃন্দ, প্রশাসনযন্ত্র তথ্য প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারাকে ভালভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন। অতি বিতর্কিত এই আইনটি সরিয়ে দেয়ার কথা উঠছে, তবে দ্বিমতও আছে কর্তাদের। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯ ধারা মূলত: ৫৭ ধারার প্রায় অবিকৃত প্রতিস্থাপন। এসব আইনের চর্চায় সরকার হয়তো সুখ-স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে, কিন্তু জনগনের সুখ-স্বস্তি কেড়ে নিয়ে ক্রমশ: নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।

অতি সম্প্রতি শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে প্রশাসনের বিরোধ বা সখ্যতার প্রেক্ষাপটে প্রাক-নির্বাচনী বছরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম এবং নিকট ভবিষ্যতে এর প্রভাব তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য।

ষোড়শ সংশোধনী রায় : কেন ক্ষমতাসীনদের এতো ক্ষোভ ?

সি আর আবরার ::

গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদের সদস্যরা সর্বোচ্চ আদালতের ওপর তুমুল আক্রমণ চালিয়েছেন। ষোড়শ সংশোধনী খারিজ করে দেওয়া ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে তারা তিক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ওই সংশোধনীতে অসদাচরণ এবং অক্ষমতাজনিত কারণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরকে অপসারণে পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে ক্ষমতাসীন দলের রথী-মহারথীরা ওই বিষয়ে তৈরি হয়ে আসার জন্য সিনিয়র এমপিদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। মিত্র দলের নেতাদেরও এ বিষয়ে কথা বলার জন্য প্ররোচিত করা হয়েছিল। তারা দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের মনের ‘ঝাল’ ঝেড়েছেন। তারা রায়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে নিন্দা করতে তাদের ‘ক্ষোভ’ উগরে দিয়েছেন। তাদের বিষোদগারে, এটা কারো কারো মনে হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়টি ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।’ জনৈক প্রভাবশালী এমপি তার সহকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘শত্রুদের সাথে শত্রু র মতোই আচরণ করতে হবে, প্রয়োজন হলে তাদেরকে ঠান্ডা করে দিতে হবে।’ বিচারকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘রায়ের মাধ্যমে তাদের অভিশংসন থামানো যাবে না।’ তিনি ‘নিজেদের ভুল সংশোধনের জন্য’ বিচারকদের পরামর্শও দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের এক মিত্র দলের নেতা ‘বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পেয়ে একে ‘সংসদের সার্বভৌমত্বে’ হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমপিরা তাদের অবস্থানে ছিলেন দ্ব্যর্থহীন। তারা জোর গলায় বলেন, খারিজ করা সংশোধনীটি ছিল ‘১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ ধারা পুনঃবহালের’ লক্ষ্যে একটি অপরিহার্য প্রয়াস, তারা ‘সংবিধানের মৌলিক চরিত্র লঙ্ঘন করতে পারেন না।’ ক্ষমতাসীন জোটের আরেক নেতা বিচারপতিদের স্মরণ করিয়ে দেন, এই পার্লামেন্টেই তাদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে, ‘মাত্র কয়েক দিন আগে’ তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, এমপি মহোদয়েরা কোর্টের রায় এবং ১০ অ্যামিকাস কিউরির (তাদের ৯ জনই সংশোধনীটি বাতিল করার সুপারিশ করেছেন) পর্যবেক্ষনের মধ্যে তাদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি । তারা প্রধান বিচারপতি এবং দুই অ্যামিকাস কিউরি- ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের অনভিপ্রেত সমালোচনা করেন। একজন উর্ধ্বতন মন্ত্রী দাবি করেন, রায়ে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানকে তার আদর্শ বিবেচনা করেন। ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে ‘সুযোগসন্ধানী,’ ‘বিবেকবর্জিত,’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দুই অ্যামিকাস কিউরির একজনের শ্বশুর যে ‘পাকিস্তানের নাগরিক’ এবং অপরজনের ‘জামাতা যে ইহুদি’ সেটা জোর দিয়ে বলতে কোনো কসুর করা হয়নি!

যারা এই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন বিকশিত হওয়ার জন্য দশকের পর দশক ধরে সংগ্রাম করেছেন, তাদের জন্য ওই সন্ধ্যার কার্যক্রমটি ছিল বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। তাদের যুক্তি যে কেবল সংসদীয় শিষ্টাচারের বরখেলাপ এবং রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও আইন পরিষদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির মূলনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, সেইসাথে তারা ছিলেন ভ্রান্ত ও স্বার্থন্বেষকও।

এমপিরা দাবি করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করার কাজটি ছিল ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ এবং ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ পরিকল্পনা বানচাল করা। ২০১০ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্ট আরো তিনটি সাংবিধানিক সংশোধনী- পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ- বাতিল করেছে। বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে ‘মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং সপ্তম সংশোধনী বিষয়ক রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। ফলে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করা যায়, আওয়ামী লীগ এমপিরা যদি ওইসব রায়কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বিবেচনা না করেন, তবে তারা ষোড়শ সংশোধনীর ব্যাপারে এমনটা কেন করছেন?

তাদের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিটিও শূন্যগর্ভ মনে হয়। ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা যদি ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল্যবোধ ও কার্যকারিতার বিষয়টি এত প্রবলভাবেই অনুভব করে থাকেন, তবে তারা সেটাকেই কেন অবিকলভাবে ফিরিয়ে আনার জন্য সংসদে বিল কেন আনছেন না? দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এ ধরনের উদ্যোগ যে সফল হবে, তা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়।

ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করেনি এবং এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃত্ব-বহির্ভূত কাজ করেছে বলে এমপিদের জোরালো দাবি হালে পানি পায় না। স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলেই অনুধাবন করা যায়, বিচার বিভাগ থেকে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে পার্লামেন্টের কাছে সমর্পণ করার মানে হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করা এবং সেইসূত্রে সংবিধানের মূল কাঠামোকে দুর্বল করা।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তৃতাবাজির তোড়ে আরেকটি বিষয় পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গেছে যে, ১৯৭২ সালের সংবিধান থেকে পার্লামেন্টের বিচারপতিদের অপসারণের বহুল আলোচিত ব্যবস্থাটি উচ্ছেদ ও বাতিল করাটা প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারেরই কর্ম। তারাই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটা করেছিলেন।

সংসদে ৯ জুলাইয়ের বক্তব্যের সারমর্ম প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে, এমপিরা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে আছেন কিনা। জবাব দ্ব্যর্থহীনভাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ৯৪(৪)-এ সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতি তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে স্বাধীন থাকবেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাহী সরকার বা সংসদ সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে পারবে না। কার্যপ্রণালীতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি কার্যক্রম নিয়ে থাকা কোনো প্রশ্ন, প্রস্তাব উত্থাপনযোগ্য নয়’ (ধারা ৫৩, ৫৪ ও ১৩৩)। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সংসদ সদস্যরা সংসদে যে কথাই বলুন না কেন, ধারা ৭৮-এর আলোকে থাকা দায়মুক্তির সুবিধাটি নিয়ে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে- এমন কোনো বিবৃতি বা মন্তব্য করতে পারবেন না’ (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ, ঢাকা : মল্লিক ব্রাদার্স, ২০১২)।

এটাও উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, কার্যপ্রণালীতে ব্যক্তিগত ধরনের কোনো অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে এমপিদের। ফলে এটা খুবই সম্ভব যে, অ্যামিকাস কিউরি প্রশ্নে অরুচিকর মন্তব্য করে এমপিরা তাদের প্রণীত কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

সম্মানিত এমপিরা জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল পাকিস্তানেই বিচারপতিদের অপসারণে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ রয়েছে। তারা বলেন, বেশির ভাগ দেশেই এই ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে দেওয়া আছে। এ ধরনের দাবির পক্ষে প্রমাণের ওপর আলোকপাত করা যাক। ২০১৫ সালে কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘কমপেনডিয়াম অব অ্যানালাইসিস অব বেস্ট প্রাকটিস অন দি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেনিউর অব রিমোভাল অব জাজেজ আন্ডার কমনওয়েলথ প্রিন্সিপালস’-এ বলা হয়েছে, কমনওয়েলথভুক্ত ৪৮টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে সংসদীয় অপসারণ ব্যবস্থা (৩৪.৩%), ৩০টির মতো দেশে নির্বাহী ও আইনপরিষদ থেকে আলাদা একটি সংস্থা (৬২.৫%) রয়েছে। বাকি দুটি দেশে রয়েছে মিশ্রব্যবস্থা (৩.২%)।

কমনওয়েলথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ সংসদীয় অপসারণব্যবস্থায় কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত, তথ্যানুসন্ধান এবং মূল্যায়নে স্বাধীন, বহিরাগত সংস্থার  সম্পৃক্ত করার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সম্মানিত এমপিরা আমলে নিতে পারতেন, যে ১৬টি দেশ সংসদীয় অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের ১২টিই তথ্য তদন্তের দায়িত্বটি আইনপ্রণেতাদের ওপর রাখেনি। তারা এর বদলে আইন পরিষদ ও নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা একটি সংস্থার ওপর এ  দায়িত্বটি দিয়েছে। কেবল শ্রীলঙ্কা, নাউরু ও সামোয়োর অনুসরণ করে বিচারক অপসারণে একচ্ছত্র পার্লামেন্টারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে বাংলাদেশ।

সমীক্ষায় সতর্কতা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, সংসদীয় অপসারণ পদ্ধতি ‘প্রয়োগ করা হলে মারাত্মক সাংবিধানিক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।’ এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই কক্ষবিশিষ্ট পদ্ধতিই অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা বর্তমানে সম্ভব নয়।

এক সিনিয়র মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, একজন অ্যামিকাস কিউরি ভারতে বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি এমন ধারণা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়েছেন যে, মনে হতে পারে, দেশটিতে এখনো সংসদের অপসারণের পুরনো পদ্ধতি চালু আছে। বাস্তবে ভারত, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশ বিচারপতি অপসারণে পার্লামেন্টকে দেওয়া ক্ষমতা হ্রাস করে সরকারি প্রভাবমুক্ত একটি ব্যবস্থার ওপর ন্যস্ত করেছে। সংবিধানের ৭০ ধারায় আবদ্ধ আমাদের এমপিদের নতুন বাস্তবতার প্রতি যথাযথ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আইন প্রণয়ন বিভাগের অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া এবং বিচারপতি অপসারণ প্রশ্নে সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের প্রায় সার্বজনীনভাবে বহাল থাকার ভ্রান্ত দাবি এই দেশের গণতন্ত্রের জন্য কলাণকর নয়। আশা করা যেতে পারে, যুক্তিই জয়ী হবে এবং রাষ্ট্রের সব অঙ্গ ক্ষমতা বিভাজনের মৌলিক ধারণা এবং আইনের শাসনের প্রতি যথাযথভাবে শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

(লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

রামপালে ক্ষমতাসীনদের ‘শিল্প-বানিজ্য’ নগরী

শাহাদত হোসেন বাচ্চু ::

কম-বেশি ১৮৬টি ভারী-মাঝারি শিল্প স্থাপনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে, সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায়। সরকার এখন বলছে, ইউনেসকো’র শর্ত মেনে আপাতত: সুন্দরবনের আশে-পাশে বড় ধরনের শিল্প অবকাঠামোর অনুমোদন দেয়া হবে না। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার মেনে চলবে ইউনেসকো’র শর্ত-সুপারিশ। সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টার। তার মতে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ নয়, চলবে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সুন্দরবন থাকুক আর না থাকুক উন্নয়ন চলবেই- এ ব্যাপারে সরকার প্রধান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই উন্নয়ন জোয়ারে এতকাল কোন বাধা পাত্তা না পেলেও যেইমাত্র শর্তসাপেক্ষে ইউনেসকো খসড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যা এখনোও চুড়ান্ত নয়, ঠিক অমনি সরকার সেটি লুফে নিয়েছে। প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এবং সবশেষ জ্বালানী উপদেষ্টা ফলাও করে সেটি প্রচার করেছেন। গেল কয়েকদিন জ্বালানী উপদেষ্টা মিডিয়ায় দারুন সরব- ইউনেসকো যা বলেছে তার বাইরে যাবেনই না-হাক-ডাক, ভাব যেন তেমনই!

অথচ এত বড় প্রতারণা কী মেনে নেয়া যায়? ইতিমধ্যে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন সুন্দরবনের দশ কিলোমিটারের মধ্যে ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই কিনেছেন কম-বেশি তিন হাজার একর জমি। দল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, নেতৃবৃন্দ কিনেছেন প্রায় সাত হাজার একর। একুনে দশ হাজার একর জমি কেনা হয়েছে এবং কেনার হিড়িক পড়ে গেছে।

এসব জমি তো আর বসতবাড়ি, রেষ্টহাউস বা বাংলো বানানোর জন্য কেনা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে ভাগ্যবান নেতা, যিনি এর আগে চিংড়ি ঘেরের ম্যানেজার ছিলেন, তিনি মোংলার জয়মনিরগোল এলাকায় কিনেছেন প্রায় দুশো একর জমি। নিশ্চয়ই বসবাসের জন্য নয়! দেশের খ্যাতনামা শিল্পগোষ্ঠি ওরিয়ন, বসুন্ধরা, সামিট, ইনডেক্সসহ নামী-দামী কর্পোরেট গ্রুপেরা সুন্দরবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার জলা-জমি কিনে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই শিল্প, কল-কারখানা স্থাপনের জন্য ?

খুলনা-মোংলা হাইওয়ের মাঝামাঝি থেকে শেষ মাথায় গেলে যে কারো মনে হবে- এখানে গড়ে উঠছে মেগা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল শিল্পাঞ্চল।  চিংড়ি ঘের,  গ্যাস প্ল্যান্ট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরীগুলির শিল্পবর্জ্য নিঃসরিত হচ্ছে। মিশকালো ধোঁয়া ও ফ্লাই এ্যাশ মিশে যাচ্ছে সুন্দরবনে। মোংলার সাম্পানঘাটে বিশাল আকৃতির সাইনবোর্ডঃ ‘‘এলাকাটি সরকার ঘোষিত প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা’’। কিন্তু খোদ সরকারই সুন্দরবন ঘেঁষে জয়মনিরগোলে নির্মান করেছে বিশাল সাইলো বা খাদ্যগুদাম।

মোংলা ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চলের বিশাল সারির পর রামপালের দিকে যেতে দুই পাশে যে জমি মাত্র কিছুকাল আগেও ফাকা ছিল, আজ তার এতটুকুও জমি ফাঁকা নেই। সবই প্রস্তাবিত অথবা নির্মানাধীন শিল্প কারখানার দখলে। অথচ গোটা অঞ্চল প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ-এর অন্তর্ভুক্ত। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার নয়টি উপজেলায় ইতিমধ্যে ১৪০ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে চ’ড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনের দুই কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মাহববুবুল আলম হানিফ ‘সানমেরিন শিপইয়ার্ড’ নির্মানের ছাড়পত্র পেয়ে গেছেন।

ছাড়পত্র প্রসঙ্গে বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল চমৎকৃত করে দেবার মত। তার মতে, “দেশের জন্য সুন্দরবনও দরকার, আবার শিল্প-কারখানাও দরকার। আমরা এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্দ্রী বরাবরে উপস্থাপন করছি”। বন ও পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠির তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে। কারণ, সুন্দরবন রক্ষা করতেই হবে-এটি তাদের প্রধানতম কাজ।

প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ এবং জ্বালানী উপদেষ্টাকে স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে না, তাদের রাষ্ট্রীয় গেজেট নিশ্চয়ই পড়তে হয়, পড়েন, জানেনও। রাষ্টপতির পক্ষে উপসচিব স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে; “প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিব বৈশিষ্ট্য নষ্ট ও পরিবর্তন হবে, এমন কোন কাজ করা যাবে না। মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দ দুষনকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না”। প্রসঙ্গত: সরকার সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার এলাকা প্রভাবিত প্রতিবেশ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের একজন, সংসদ সদস্য, একদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফ কী জানেন না যে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় চিংড়ি ঘের করতে হলে পবিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগে? গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা একসাথে কতগুলি রাষ্ট্রীয় আইন ভেঙ্গে চলেছেন!

এক. সুন্দরবনের চারপাশে দশ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) কোন বাণিজ্যিক কর্মকান্ড স্থাপনা নিষিদ্ধ হলেও দাকোপের সুতারখালীতে ৩৫ একর বিশিষ্ট চিংড়ি খামার এবং দোতলা ও একতলা স্থাপনা নির্মান করেছেন হানিফ।

দুই. ঘের স্থাপনের বেড়িবাঁধ কেটে সুন্দরবনের পশুর নদ থেকে নিয়মিত লবন পানি ঘেরে প্রবাহিত করা হচ্ছে।

তিন. ঘেরের মাঝে অবস্থিত কালীমন্দিরের জায়গা তিনি ইজারা নিয়েছেন এবং একটি পুকুর ভরাট করে জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলেছেন।

চার. আরেকটি মন্দির নির্মান করছেন। পানি শোধনাগার স্থাপন করেছেন।

পাঁচ. চিংড়ি খামারে তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর ব্যবহার করে মারাত্মক শব্দদুষন সৃষ্টি করছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের পাঁচ ধারায় বর্ণিত ইসিএ  এলাকায় নিষিদ্ধ এসব কর্মকান্ড করে সরাসরি রাষ্ট্রীয় আইন লংঘন করছেন…..।

এখন দেখা যাক, সুন্দরবন এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানে সরকার প্রধানের অবস্থান কি? কারণ তার নিজের এবং অনুসারীদের ভাষায়,“বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে দেশের একবিন্দু ক্ষতি হতে পারে না। তার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই”! সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানে অনমনীয়। এক্ষেত্রে তিনি দেশ- বিদেশে সকল বাধা উপেক্ষা ও অতিক্রম করেছে; এমনকি ভারতে এরকম দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প পরিত্যক্ত হবার পরেও।

প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে যুক্তি হাজির করেছেন নানাসময়ে। তার উল্লেখযোগ্য যুক্তিগুলো হচ্ছে; উন্নয়ন করতে গেলে জলা- বনের কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করতেই হবে। উন্নয়নের সুফল সে ক্ষতি পুষিয়ে দেবে। এখন উন্নত প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করলে পরিবেশের ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় হবে। ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে। সারাদেশে বিদ্যুতের জোয়ার এলে দু’চারটে ক্ষতি মানুষ ভুলে যাবে। যে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র ফেরত এনেছি, একই প্রক্রিয়ায় উন্নয়নবিরোধী সব তৎপরতা থামিয়ে দেয়া যাবে।

ষাট দশকে পাকিস্তানের সেনাশাসক আইয়ুব খান কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, পাহাড়ীদের দুর্দশা যাই হোক, বিদ্যুতের উন্নয়ন তা ভুলিয়ে দেবে। আইয়ুবের উন্নয়ন তত্ত¡ মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। কাপ্তাই থেকে যে বিদ্যুৎ এসেছে সে তুলনায় অর্থনৈতিক, পরিবেশ-প্রতিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয়। পাহাড়ীরা উচ্ছেদ হয়েছে, জলমগ্নতায় বদলেছে তাদের জীবন। এই উন্নয়ন প্রকল্পকে জীবনহানির সমতুল্য চিহ্নিত দশকের পর দশক তারা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে।

এই সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সামরিক খাতে। পাহাড়ে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করতে হয়েছে। এক দেশের মধ্যে ‘দুই চিন্তা’ জন্ম নিয়েছে। একই দেশের অধিবাসীরা পরস্পরকে শত্রæ ভেবে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে বহু বছর। কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রকৃতি ও মনুষ্য জীবন বিবেচনায় সবচেয়ে ক্ষতিকর উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

এই ধরনের উন্নয়ন দর্শন বা উন্নয়ন লক্ষ্যটি সৎ-স্বচ্ছ হয় না। কারণ এরকম তথাকথিত উন্নয়ন কেন্দ্রে মানুষ থাকে না, উন্নয়নও আসলে উদ্দেশ্য নয়। জনস্বার্থ তো কোন বিষয়ই নয়। এসব একপর্যায়ে পরিবেশ- প্রতিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। এজন্যই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদাহরন নিয়ে আসতে হয়েছে। উন্নয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যেন-তেন প্রকারে শক্তি প্রয়োগের নীতিতে জনভাবনার বিপরীতে উন্নয়ন অনেক সময় কদর্য পরিনতি ডেকে আনে। এরকম অজ¯্র উদাহরন থাকা সত্তে¡ও রামপালের বিষয়ে সরকার প্রধান অনমনীয়ই থেকে যাচ্ছেন।

এই নিবন্ধ লেখার সময় জানা গেল, ইউনেস্কো ১২ জুলাই সুন্দরবন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারে। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে বাংলাদেশে ইউনেস্কো প্রতিনিধি বিয়েট্রিকা কালডুন এ খবর জানিয়েছেন। তার মতে, গত ২ জুলাই থেকে পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে শুরু হওয়া বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় প্রকল্প অনুমোদন, বাতিল কোনটিই করা হয় না। সম্মেলন শুরুর আগে গত মে মাসে সুন্দরবনের ওপর তৈরী হওয়া খসড়া সিদ্ধান্তের কিছু বিষয়ে সংশোধন আসতে পারে। তবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত খুব শিগগিরই।

এরই মধ্যে গত রোববার থেকে সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় দাবি করে আসা হচ্ছে, ইউনেস্কো রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে। শুধু একটি কৌশলগত সমীক্ষা করতে বলেছে ২০১৮ সালের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের ব্যাপারে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির কোন আপত্তি নেই।